১৭. রাজনারায়ণ দত্তের শয্যাকণ্টকী

রাজনারায়ণ দত্তের শয্যাকণ্টকী হয়েছে। একটুক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকলেই তাঁর সর্বশরীরে জ্বালা ধরে, তৎক্ষণাৎ উঠে ছটফটিয়ে বেড়ান। সমস্তক্ষণ শরীরে এতটা অস্থিরতা, বসে থাকলে মনে হয় পায়চারি করলে ভালো লাগবে, আবার তাতেও একটু পরেই ক্লান্তি বোধ হয়, তখন ইচ্ছা হয় বিছানায় একটু গড়িয়ে নিতে। কিন্তু তারও উপায় নেই।

রাতের পর রাত ঘুম নেই। রাজনারায়ণ দত্তের বদনমণ্ডল রক্তবর্ণ, তাঁর অন্তরে দাউ দাউ করে জ্বলছে ক্ৰোধ। এত অপমানিত তিনি জীবনে আর কখনো হননি।

আজ বৈকালেই রাখুটিয়ার জমিদার স্বয়ং এসেছিলেন তাঁর গৃহে। সেই মানুষটি মাত্র এই কয়েকদিনেই একেবারে শুষ্ক বিবৰ্ণ হয়ে গেছেন। শত অনুরোধেও তিনি বৈঠকখানায় এসে আসন গ্রহণ করলেন না। ল্যাণ্ডো থেকে নেমে এসে তিনি রূপোয় মোড়া ছড়িখানিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন দ্বারের কাছে। রাজনারায়ণ দত্ত অতি বিনীতভাবে তাঁকে বলেছিলেন, যা হবার তা তো হয়ে গ্যাচেই, আসুন আপনার সঙ্গে দুটো কথা কয়ে আমি একটু জুড়োই।

সেই শীর্ণকায় বৃদ্ধ বিষণ্ণ-ত্ৰুদ্ধ কণ্ঠে বললেন, না, আপনাকে শুধু একটা কথা শুধোতে এলুম। দত্তজা, আপনি জেনে শুনে আমার এ সর্বনাশ করলেন কেন?

রাজনারায়ণ দত্ত স্তম্ভিত হয়ে রইলেন। সহসা কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। জেনে শুনে? জন্মণ দত্ত জেনে শুনে কথার খেলাপ করবেন? তিনি একজন সাধারণ ফড়ে-দালালের মতন মিথ্যাবাদী?

তিনি সেই বৃদ্ধের তীব্র দৃষ্টির সম্মুখে যেন সোজা তাকাতে পারছেন না। কোনোক্রমে বললেন, মহাশয়, আপনার সর্বনাশ হয়েচে, আমার হয়নি? আমার আর পুত্র নেই, যদি থাকতো, তবে আপনার সম্মান বাঁচাবার জন্য…

রাখুটিয়ারাজ পুরো কথা শুনলেন না, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পেছন ফিরে ধীরে ধীরে গিয়ে আবার ল্যাণ্ডোতে চড়ে বসলেন। রাজনারায়ণ দত্ত তাঁকে বিদায় জানাতে পর্যন্ত পারলেন না, রাখুটিয়ারাজ অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে রয়েছেন। অভিমানী বৃদ্ধ তখন অশু সংবরণের চেষ্টা করছেন প্ৰাণপণে।

দোর্দণ্ড প্রতাপশালী রাজনারায়ণ দত্তের বাড়ি বয়ে এসে কেউ এমনভাবে কখনো অপমান করে যাবার সাহস পায়নি। অথচ তিনি কিছুই করতে পারলেন না। তাঁর মস্তক ঘূর্ণিত হতে লাগলো। তিনি যেন জ্ঞান হারিয়ে সেখানেই পড়ে যাবেন।

রাখুটিয়ার জমিদারের সর্বনাশের জন্য রাজনারায়ণ দত্ত দায়ী তো বটেই। ওঁর কনিষ্ঠা কন্যার সঙ্গে রাজনারায়ণ নিজের পুত্ৰ মধুর বিবাহ ঠিক করেছিলেন। পাটীপত্র হয়ে গেছে, বিবাহের দিনও ধার্য হয়েছে। আর মাত্র বাইশ দিন বাকি। কন্যাপক্ষ নিমন্ত্রণ পর্যন্ত শুরু করে দিয়েছিলেন।

বিবাহ ভেঙে যাওয়ায় সেই কন্যার নামে কলঙ্ক বর্তে গেল। আর ঐ কন্যার বিবাহ দেওয়া সম্ভব হবে? এই অন্যপূব পাত্রীর জন্য আর কোনো সদ্বংশজাত পাত্র পাওয়া যাবে না।

ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে রাজনারায়ণ দত্ত মধ্যে মধ্যে আঃ আঃ শব্দ করতে লাগলেন। যেন তাঁর সবঙ্গে বৃশ্চিক দংশন হচ্ছে। এ সময় তাঁকে একটু সান্ত্বনা দেবারও কেউ নেই। পত্নী জাহ্নবী তো মূছাঁ যাচ্ছেন ঘন ঘন। তাঁকে আর বাঁচানো যাবে কিনা কে জানে! এত মেহ, ভালোবাসা, প্রশ্রয় দিয়েছিলেন মধুকে, অথচ সে তার পিতার মানসম্মান সব ধুলোয় লুটিয়ে দিতে একটুও দ্বিধা করলো না?

রাজনারায়ণের ভ্রাতুষ্পুত্র প্যারীমোহন মধুর খোঁজে চতুর্দিকে ছুটোছুটি করছে কয়েকদিন ধরে। তিন দিন আগে মধু খৃষ্টান হয়ে গেছে, তা আর কিছুতেই রোধ করা যায়নি। প্যারীমোহন তবুও চেষ্টা করছে যদি মধুকে এখনো বাড়িতে ফিরিয়ে আনা যায়।

সকালবেলা সে এসে উঁকি মারলো রাজনারায়ণ দত্তের কক্ষে। সারারাত্রি চোখের পাতা জোড়েনি, বিধ্বস্ত চেহারায় একটি কৌচে শূন্য দৃষ্টি মেলে বসে আছেন তিনি।

প্যারীমোহন মৃদুকণ্ঠে বললো, বড়খুড়া, একটা কথা কইবো? একবার কৃষ্ণমোহনবাবুকে ডাকি? উনি আসতে রাজি হয়েছেন।

রাজনারায়ণ দত্ত ভ্ৰ কুঞ্চিত করে বললেন, কৃষ্ণমোহন? ঐ কেলে কেরেস্তানটা? ও আমার বাড়ির দিকে এলে আমি পাইক লেলিয়ে ওর হাড় গুড়ো করে দেবো!

প্যারীমোহন বললো, আজ্ঞে, এখন আর মিছামিছি। রাগ করে কী হবে। যা হবার তো হয়েইচে। এখন রেভারেণ্ড কৃষ্ণমোহনের সাহায্য নিলে মধুর খোঁজটা অন্তত পাওয়া যায়।

—রেভারেণ্ড? ছোঃ! ও ব্যাটা বামুনের ঘরের চাঁড়াল। পয়সার লোভে জাত খুইয়েচে।

—তবু ওনার কথা সাহেবরা মানে-গোণে!

–ওর নাম আমার সামনে আর কখনো উচ্চারণ করিস না, প্যারী! আমার আর মাথা গরম করিয়ে দিসনি!

—যতদূর সন্ধান পেয়েচি, মধু অ্যাখুন। পাদ্ৰী ডিয়ালট্রি সাহেবের বাড়িতে রয়েচে। আমি যদি পারি, একবার তাকে বাড়িতে নিয়ে আসবো?

–না।

—বড়খুড়া, একবার মধুর জননীর কথা ভেবে দেখুন। তিনি যে দিনরাত হা মধু, কোথায় মধু কচ্চেন আর মুচ্ছে যাচ্ছেন। তেনাকে বাঁচাবার কথাটি একবার ভাববেন না?

—তুই ছেলেমানুষ, প্যারী। তুই সব বুজিস না, সে আসবে না। তুই কেন উপযাচক হয়ে মান খোয়াতে যাবি? তুই জানিস না, কেল্লার মধ্যে সে যখন সাহেবদের কোলে বসেছেল, তখন আমি আমার বন্ধু ভূকৈলাশের রাজা সত্যশিরণ ঘোষালকে পাটিয়েচিলুম। এমন বেয়াদপি ছেলে যে তাঁর সঙ্গে পর্যন্ত দেকা করলে না। অতবড় একটা মানী লোক মুখ চুন করে ফিরে এলেন!

—মধু আমাকে ফেরালে তো আর আমার মান যাবে না। সে আমার ভাই। সে আমি যেমন করে পারি তাকে ধরে নে আসবো। আপনি ওকে মারধোর করবেন না বলুন? আপনি কথা দিন।

—তুই পারবি নি। কেন মিছিমিছি হয়রাণ হবি।

—সে দায়িত্ব আমার। চেষ্টা তো করতে হবে। এর মধ্যে মধুকবে ফস করে বিলেত পালিয়ে যায়, তার ঠিক আচে কি? কৃষ্ণমোহনবাবুর বাড়িতে আর দু-তিন জন ভদ্রলোক বসে ছেলেন। বলাবলি করছেলেন যে মধুর তো তেমন খৃষ্টান হবার আগ্ৰহ ছেল না। বিলেত যাবার দিকেই ওর ঝোঁক। পাদ্রীরা ওকে বিলেত পাঠাবে বলেই…

রাজনারায়ণ দত্ত এবার গর্জে উঠলেন। সামান্য স্বার্থের জন্য কেউ বংশানুক্রমিক ধর্মবিসর্জন দিতে পারে, এই চিন্তাই তাঁকে বেশী পীড়া দেয়।

—পাদ্রীরা ওকে বিলেত পাঠাবে? কেন, আমার পয়সা নেই? আমি ওকে সাতবার বিলেত ঘুরিয়ে আনতে পারি, সে ক্ষমতা আমার আচে। কেন পাঠাইনি জানিস? সে তার মাকে একদিন কী বলেছেল তুই শুনিসনি? বাঙালী মেয়েদের চেয়ে নাকি ইংরেজ মেয়েদের রূপ-গুণ একশো গুণ বেশী। দিনের পর দিন স্নান করে না। গায়ের গন্ধে ভূত পালায়, সেই ন্যাব লোগা ইংরেজ মাগীগুলো আমাদের বাঙালী মেয়েদের চে ভালো? হিন্দু মেয়েরা নেকাপড়া শেকে না। মাথায় ঘোমটা দেয়। পায়ে জুতো ইস্টাকিন দিয়ে বিবি সেজে পথে পথে ধেই ধেই করে বেড়ায় না বলে মধু তাদের বে করবে না। বলেছেল। এই অবস্থায় ওকে বিলেত পাঠালে। আর রক্ষে ছেল? ও সেখানেই এক বেড়ালমুখীকে বে। করে ফেলতো না? তাহলেও তো সেই জাত খোয়ানোই হতো। সেইজন্যই আমি ভেবে রেকিচিলুম, আগে জোর করে ওর বেটা দি, হিন্দু কলেজেও এক বছর পড়া বাকি আচে, সেটা সেরে নিক, তারপর না হয় বিলেত পাঠানো যাবে! তার আগেই ছেলে আমার মাথায় বজ্রাঘাত কল্লে!

প্যারীমোহন বললো, মধুর ঐ তো দোষ, বড় চঞ্চল। আমি যেমন ভাবে পারি বলে কয়ে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঠিক নিয়ে আসবো। খৃষ্টান হয়েচে বলে কি ওকে বাড়ি ছাড়া করতে হবে? হাজার হোক, ও তো আমাদেরই মধু। প্ৰায়শ্চিত্ত করিয়ে আবার মধুকে স্বজাতে নিয়ে আসবো। আপনি যেন অমত করবেন না। অন্তত খুড়ীমার মুখ চেয়ে—

এদিকে মধু আর্চবিশপ। ডিয়ালট্রির বাড়িতে মহা আনন্দেই রয়েছে। এখন শহরের যাবতীয় মানুষ শুধু তার কথা নিয়ে মেতে আছে, এতেই মধুর রক্তে উত্তেজনার সঞ্চার হয়। সমস্ত সংবাদপত্রে তার খবর। খৃষ্টান তো আরও অনেকেই হয়েছে। কিন্তু নেটিভ ও সাহেব মহলে এতখানি হৈচৈ-এর সৃষ্টি করতে পেরেছে আর কে, সে, মধুসূদন দত্ত ছাড়া?

কবিতার জন্য পিতামাতাকেও পরিত্যাগ করতে হয়, কবি পোপের এই বাণী সে তার জীবনে সার্থক করে তুলেছে। তার বন্ধুরা ভেবেছিল সে পারবে না। পারবে না? ওরা মধুকে এখনো চেনে না। রাজনারায়ণ দত্ত ভেবেছিলেন জোর করে তার বিয়ে দেবেন। রাজনারায়ণ দত্ত ছেলেকে এখনো চেনেননি।

তবু বন্ধুদের জন্যই মধুর একটু একটু মন কেমন করে। বিশেষত গৌরের জন্য। গৌরকে একদিনও সে চোখের দেখা না দেখে থাকতে পারতো না। গৌরের সঙ্গে তার অনেক গল্প বাকি আছে। গঙ্গানারায়ণের বিবাহ হয়ে গেল এর মধ্যে, নিশ্চয়ই সেই উপলক্ষে বন্ধুরা দুশো মজা করেছে।

গৌরকে সে আসতে বলেছিল, তবু সে আসে না কেন? গৌর কি তার উপরে এখনো ক্রুদ্ধ হয়ে আছে? না, না, বাকি পৃথিবীর যে যাই বলুক, তাতে মধুর কিছু আসে যায় না। কিন্তু গৌর যদি তাকে ভুলে যায়, তাহলে সে আঘাত মধু সইতে পারবে না।

কাগজ-কলম নিয়ে মধু গৌরকে একটা চিঠি লিখতে বসলো।

আশ্চর্য, তার প্রথমেই মনে পড়লো একটা বাংলা কথা। ও গৌর। দুদিন চার দিনেতেই এত! কথাটা বার বার উচ্চারণ করলো। সে। এই কথার সঠিক ইংরেজি তার মনে এলো না। অথচ বাংলা অক্ষরও লিখবে না সে। এখন সে খৃষ্ট্ৰীয় ধর্মে দীক্ষা নিয়ে ইংরাজদের সমতুল্য হয়েছে, এখন তো আর ঐ নেটিভদের সামান্য ভাষা ব্যবহার করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

ও গৌর, দু-চার দিনেতেই এত!!এই বাক্যটি সে প্রথমে লিখলে রোমান হরফে। তারপর ইংরেজিতে চিঠি শুরু করলো; তুই যদি সত্যিই আমায় দেখতে চাস, তাহলে এখানে, এই ওল্ড চার্চ মিশন রো-তে চলে আয়। তুই নিশ্চয় বলবি, তোর গাড়িভাড়া নেই। ঠিক আচে, একটা পাল্কি ভাড়া করে সোজা চলেই আয় না, আমি ভাড়া মিটিয়ে দেবো। আমার কাচে এখানে ঢের ঢের টাকা রয়েচে। মিঃ কার-এর কাচ থেকে ছুটি নিয়ে চলে আয়…।

কাম, ব্ৰাইটেস্ট গৌর দাস, অন আ হায়ার্ড পালকি
অ্যাংড সি দাই অ্যাংকশাস ফ্ৰেংড, এম এস ডি

সে চিঠি পেয়েও গৌর এলো না। মধুর মন খারাপ ক্রমশ পরিব্যাপ্ত হতে লাগলো। এক নতুন জগতে প্ৰবেশ করেছে সে, এত উৎসাহ উদ্দীপনা, এ সব কথা কি গৌরকে না জানালে চলে?

সে আবার একটি চিঠি লিখলো :

প্রিয় বন্ধু আমার, এক কবি তাঁর প্ৰেয়সীকে বলেছিলেন, ক্যান আই সীজ টু লাভ দী! নো! সেই কথাই আমি বলচি, আমার এক প্রিয়তর জনকে, এক বন্ধু, খাঁটি, (কী দুর্লভ এ জিনিস) খোঁটি বন্ধুকে।–তুই কেমন আচিস? কখনো ভাবিস না যে আমি তোকে ভুলে যাবো।–তুইও যেন আমায় ভুলিস না। কবিতা লিকচি-কোথায় ছাপা হবে জানিস, খোদ লণ্ডনে! ভাবতে পারিস? বেণীর সঙ্গে দেখা হয়? কী আশ্চর্য ব্যাপার, বেণীকে আমি পছন্দ করি না, বেণীও আমায় দেখতে পারে না, অথচ কদিন ধরে বেণীর কথা বার বার মনে পড়চে। অন্য বন্ধুদের কথাও প্রায়ই ভাবি-ভূদেব মেডেলটা পেয়েচে?–তুই আসচিসনি কেন একবার। আয়, গৌর আয়, পালকি ভাড়া করে আসিস। আমি তো বলচিই…

গৌরদাস এরপর এলো বটে, কিন্তু সঙ্গে প্যারীমোহনকে নিয়ে। প্যারীমোহন এর আগেও দু একবার এসেছে মধুর কাছে কিন্তু তার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়নি। প্যারী খোঁজ খবর নিয়ে জেনেছিল, গৌরদাসের কথাতেই মধু বশীভূত হতে পারে। সেইজন্য সে গৌরদাসের সঙ্গে এসেছে।

মধু ছুটে গিয়ে গৌরকে জড়িয়ে ধরতে গিয়ে পশ্চাতে প্যারীমোহনকে দেখে থমকে গেল। ছদ্ম কোপের সঙ্গে বললো, প্যারীদাদা, তুমি ফের এয়োচো? আমি তো বলেই দিয়িচি, তোমাদের ও প্রস্তাব আমি মানবো না, মানবো না, মানবো না! তোমাদের কথা মতন আমি বিলেত যাওয়া এখন স্থগিত রেখিচি, তোমরা আর কী চাও?

প্যারীমোহন বললো, মধু, তুই একবারটি অন্তত বাড়ি চ।

মধু বললো, এ বাড়িতে আমায় মধু মধু বলে ডেকো না। এখন আমার নাম মাইকেল।

বলেই সে হা হা করে উচ্চশব্দে হেসে উঠলো। দুরন্ত শিশুর মতন হাসি। যেন সে কোনো অভিনব ফন্দীতে গুরুজনদের জব্দ করেছে।

গৌর বললো, মধু, তোর মাকে আমি কথা দিয়িচি, তোকে একবার নিয়ে যাবো।

মধুসঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললে, গৌর, তুই অন্য যা কিছু অনুরোধ করা শুধু ও কথা বলিসনি!

—কেন, এটা কি অন্যায় অনুরোধ?

—এ সব তুই বুঝবিনি।

প্যারীমোহন বললো, খুড়ী ঠাকুরানীর কষ্ট যে আমরা চোখে দেখতে পারি না। আর। শোকে দুঃখে। একেবারে পাগলের মতন হয়ে গ্যাচেন। মধু, তোর একবারও ইচ্ছে করে না। অমন স্নেহময়ী জননীকে দেখে আসতে?

মধু উত্তর দিল, প্যারীদাদা, তুমি প্রতিদিন এই একই কথা বলো কেন? এর উত্তর তো আমি অনেকবার দিয়িচি।

গৌর বললো, মিস্টার মাইকেল এম এস ডাট, তুমি যদি আর আমার কথা না শোনো, তবে আমায় এখানে আসবার জন্য পেড়াপীড়ি করো কেন? আমি আর আসবো না।

মধু গৌরের হাত চেপে ধরে বললো, তুই মিথ্যেই রাগ করচিস গৌর। তুই সব জানিস না। মাকে দেখতে আমার সাধ হবে না কেন? আমিও তো মায়ের হাতের পাখার বার্তাস খাবার জন্য ছটফট করাচি। এই বসন্ত ঋতুতেই কেমন ঘাম ছুটচে দেকচিস তো। পাঙ্খা পুলার যতই হাওয়া করুক, কিন্তু আমার মায়ের হাতপাখার বার্তাস যেমন ঠাণ্ডা, তেমন আর কিছুই না। কিন্তু আমি বাড়ি গেলেই বাবা পাইক প্যায়দা দিয়ে আমায় আটক করে দেবেন।

প্যারীমোহন সঙ্গে সঙ্গে বললো, না, না, ঠাকুর খুড়া নিজে আমায় কথা দিয়েচেন। কেউ তোকে আটকাবে না।

গৌর বললো, আমি দায়িক রইলুম, তুই আবার ইচ্ছে মতন ফিরে আসবি। মধু বললো, তুই লিকেচিলি, কুক্ষণে ডিয়ালট্রি সাহেব এদেশে এয়েচিলেন বলেই আমি খৃষ্টান হয়েচি। তোর এ ধারণা ভুল। তোরা জানিস, আমার উপর জোর করে কিচু করিয়ে নেবার সাধ্যি কারুর নেই। পরম পিতা যীশুর পাদপদ্মে আমি নিজেকে সঁপে দিতে চেয়েছি স্বেচ্ছায়। আমি কারুর জোর-জবরদস্তি মানি না।

—বেশ মানলুম। তুই তা হলে মাকে দেখতে যাবি কি না?

–প্যারী তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললো, আমাদের পাল্কিওয়ালাটা চলে গ্যাচে বোধ হয়। আর একটা পাল্কি ডেকে আনি?

মধু বললো, রও, রও, প্যারীদাদা, অমন হটমট কারচো কেন? যাবো বলে কি এখুনি যাবো? আজি চার্চে একটা মেমোরিয়াল সার্ভিস রয়েচে, সেটা অ্যাটেণ্ড করতেই হবে। তারপর, কাল, না, কালও হবে না। ক্যাপটেন রিচার্ডসন কাল এখানে ডিনার খেতে আসচেন। পরশু যেতে পারি। ধরো, পরশু। সকাল এগারোটায়।

গৌর বললো, তুই বুঝি তোর মায়ের সঙ্গেও অ্যাপয়েণ্টমেণ্ট করে দেখা করতে যেতে চাস?

–অফ কোর্স? হোয়াই নট?

–চার্চে মেমোরিয়াল সার্ভিস তো সন্ধ্যাকালে। এখন এই সকালবেলা, তোর যেতে আপত্তি কী? তুই এখন যেতে চাস তো বল, নইলে তোর যা খুশী করিস!

মধু কাঁধ ঝাঁকাল। তারপর আপন মনে বলে উঠলো, বিকজ আই লাভ, রেসপেকট অ্যাণ্ড অনার দী, অ্যাণ্ড থিংক ইউ আর আ ম্যান অফ অনেস্টি? ঠিক আচে, চল।

কেউ একটুও অতিরঞ্জিত করে বলেনি, জাহ্নবী দেবী তখনও নিজ কক্ষের ভূঁয়ের ওপর বাহ্যজ্ঞান রহিত হয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে আছেন। খোলা চুল লুটোচ্ছে পাশে। তাঁর একটি হাত যেন শক্ত সিমেন্টের মেঝেকেই আঁকড়ে ধরতে চাইছে।

জুতো না খুলেই মধু দ্রুত এসে কাছে বসে পড়ে ডাকলো, মা!

সেই ডাকে যেন ঘরের মধ্যে বজ্ৰপাত হলো। যেন প্ৰবল একটি আঘাতে জাহ্নবী তড়াক করে উঠে পড়ে ভয়ার্ত গলায় বললেন, কে?

পর মুহূর্তেই ঘোর কেটে গেল। তিনি পুত্রকে জড়িয়ে ধরে উন্মাদিনীর মতন বলতে লাগলেন, মধু, মধু, মধু, মধু। মধুও সঙ্গে সঙ্গে বলতে লাগলো মা, মা, মা, মা।

প্রথমিক উচ্ছ্বাস কেটে যাবার পর জাহ্নবী তাঁর হৃদয়ের নিধির দিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ম্লান গলায় বললেন, বাছা, তুই আমায় এমন দাগ দিলি? দিতে পারলি?

মধু বললো, মা, দ্যাখো, আমি তো তোমার সেই মধুই রয়িচি। আমার চোখ, মুখ, কান, হাত, পা কিছুই কি বদলেচে? আমি কি অন্য রকম কথা কইচি? আমার মনের বিশ্বাস শুধু অন্য রকম হয়েচে। কিন্তু তোমার ছেলে তো তোমারই রয়েচে, মা!

-ওরে, কত মানুষের ছেলেদের যমে কেড়ে নিয়ে যায়। তোকে সাহেবরা কেড়ে নিয়ে গেল আমার কোল থেকে।

—আমায় কেউ কেড়ে নেয়নি। এই দ্যাখো না, আমি নিজের ইচ্ছেতে এসিচি তোমার কাচে।

–তুই আবার চলে যাবি?

প্যারীমোহন গিয়ে খবর দিয়েছিল রাজনারায়ণ দত্তকে। প্ৰথমে তিনি আসতে চাননি। ছেলে এসে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তবে তিনি ছেলের সঙ্গে কথা বলবেন। প্যারী প্ৰায় হাতে পায়ে ধরে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে তাঁকে একবার নিয়ে এলো। কেননা, প্যারীর ভয় ছিল, মধু শুধু তার মায়ের সঙ্গে দেখা করবার কড়ারে এসেছে, হয়তো শুধু মাকে দেখেই চলে যাবে। তাতে রাজনারায়ণ দত্ত আরও অপমানিত হবেন।

দ্বারের কাছে এসে দাঁড়ালেন রাজনারায়ণ দত্ত। তাঁর ছায়া এসে পড়লো মধুর শরীরে। রাজনারায়ণের মুখ উৎকট গাভীর্য মাখানো। যেন সেই গাম্ভীৰ্য দিয়েই তিনি তাঁর আহত অহঙ্কার ঢাকতে চান। মধুও ঘাড় শক্ত করে রইলো।

মাত্র বৎসরকাল আগেও পিতা ও পুত্র ছিল দুই বন্ধুর মতন। আর এখন যেন মুখোমুখি দুই যুযুধান।

রাজনারায়ণ জলদ স্বরে বললেন, আমি পুরুত বামুনদের সঙ্গে কথা কয়িচি। প্ৰায়শ্চিত্তি করবার কোনো অসুবিধে হবে না। তারা নিদেন খুঁজে বার করেচে। দু-পাঁচশো বামুনকে শাল-দোশাল দিয়ে একদিন পেট পুরে খাইয়ে দিলেই হবে। আর তোকে এক গলা গঙ্গাজলে দাঁড়িয়ে পঞ্চগব্য খেয়ে দুটো চারটে মন্ত্র উচ্চারণ করতে হবে। শুভস্য শীঘ্ৰং, আমি ব্যবস্থা নিচ্চি, এ হস্তপ্তার মধ্যেই সব হয়ে যাবে।

মধু উঠে দাঁড়িয়ে তেজের সঙ্গে বলে উঠলো, বাবা, আপনি একটা কথা শুনে রাখুন, যদি আকাশে চন্দ্ৰ সূৰ্য না ওঠে, যদি পুবের বদলে পশ্চিমে সূর্যের উদয় হয়, তা হলেও আমি প্ৰায়শ্চিত্ত করবো না! আমি নিজের জ্ঞান বুদ্ধি মতে খৃষ্টান হয়িচি! আমি বর্বর হিন্দু সমাজ ছেড়ে সুসভ্য ইংরাজদের সমকক্ষ হয়িচি!

ক্ৰোধে রাজনারায়ণের শরীর কম্পিত হতে লাগলো। তিনি বললেন, দূর হয়ে যা! আর কোনোদিন যেন তোর মুখ আমার দেখতে না হয়।

লম্বা অলিন্দ ধরে হাঁটতে লাগলেন রাজনারায়ণ। বিড় বিড় করে বলতে লাগলেন, ও আমার ছেলে নয়! ও আমার কেউ নয়! বিধর্মী, ও কালসৰ্প। ওকে আমি মন থেকে মুচে ফেলবো। দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো।

এক জায়গায়। থমকে দাঁড়িয়ে রাজনারায়ণ আবার ভাবলেন, আমার পুত্র নেই। আমি মলে আমার মুখাগ্নি করার কেউ রইলো না। আমাকে পুন্নাম নরকে যেতে হবে।

মুখমণ্ডল কঠিন করে তিনি সেইক্ষণেই শপথ নিলেন, তিনি আবার বিবাহ করবেন। আর একটি পুত্র সন্তান তাঁর চাই-ই চাই।

মধুর বেশ সুবিধেই হয়ে গেল। পিতার এবম্বিধ কঠিন ব্যবহার গৌর প্রত্যক্ষ করেছে। সুতরাং এ রকম একজন বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষী থাকার ফলে অন্যান্য বন্ধু ও শুভার্থীদের কাছে মধু এর পর থেকে অনয়াসেই বলতে পারে, পিতা চান না, সে বাড়ি ফিরবে। কী করে? মাঝে মাঝে সে অবশ্য লুকিয়ে চুরিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করতে আসে এবং মুঠো মুঠো টাকা পকেট ভরে নিয়ে যায়। বিলাসিত তার অহংকারের আশ্রয়। প্রচুর অর্থ না থাকলে তার স্বস্তি হয় না।

প্রথম কিছুদিন তার অসুবিধে হলো পড়াশুনোর ব্যাপারে। শিক্ষা অর্জনে তার অদম্য উৎসাহ। কিন্তু হিন্দু কলেজে তার প্রবেশ অধিকার নেই। হিন্দু ছাড়া আর কোনো ছাত্র সেখানে পড়তে পারে না। বেশ কয়েক মাস মধু বিভিন্ন পাদ্রীদের গৃহে অবস্থান করে তাঁদের কাছ থেকেই পাঠ গ্ৰহণ করতে লাগলো। এই যুবকটির মেধা ও আগ্রহ দেখে বহু সাহেবই মুগ্ধ ও বিস্মিত। তাঁরাই পরামর্শ দিলেন মধুকে বিশপস কলেজে ভর্তি হবার জন্য।

বিশপস কলেজে আবাসিক ছাত্র হওয়া রীতিমতন ব্যয়সাপেক্ষ ব্যাপার। প্ৰতি মাসে ষাট টাকা করে লাগে। মায়ের কাছ থেকে নিয়মিত এত টাকা পাবার সম্ভাবনা নেই, তাই মায়ের মারফৎ কথাটা সে তার পিতার কানে তোলালো। রাজনারায়ণ দত্ত নিজের পুত্রকে অস্বীকার করলেও লোকে এখনো মধুকে বলে, রাজনারায়ণ দত্তের ছেলে। এর পরেও মধু যদি পাদ্রীদের কাছে ভিক্ষাজীবী হয়, তাতে রূপেরায়ণেরই মান ক্ষুব্ধ হবে। পত্নীর হাত দিয়েই তিনি পুত্রের জন্য মাসিক একশো টাকা বরাদ্দ করে দিলেন।

বিশপস কলেজে মধু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছাত্র। সেখানে খাঁটি ইওরোপীয় যুবকেরা পড়ে, আর রয়েচে কিছু দেশীয় খৃষ্টান। নিঃসন্দেহে এদের সকলের মধ্যে মধু সবচেয়ে বেশী উজ্জ্বল। ক্লাসিকাল ল্যাঙ্গোয়েজ বিভাগে মধু গ্ৰীক, ল্যাটিন, হিব্রু এবং সংস্কৃত শিক্ষা করতে লাগলো গভীর মনোযোগের সঙ্গে। ভাষা শিক্ষায় তার দ্রুত কৃতিত্বে শিক্ষকরা মুগ্ধ। আবার এই মধুই এক একদিন ক্লাসে অসম্ভব দৌরাত্ম্য করে। কলেজের নিয়ম শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে প্রায়ই। সন্ধ্যাকালে সে বিলাসী পরিচ্ছদে ভূষিত হয়ে প্রমোদ সন্ধানে যায়, যখন ফেরে, তখন তার মস্তক ও পদদ্বয় টালমাটাল।

কলেজে ভর্তি হবার প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই মধু একটা গণ্ডগোল বাধিয়ে তুললো। সে দেখলো যে, ইওরোপীয় ছাত্র ও দেশী খৃষ্টান ছাত্রদের দু রকম পোশাক। সে ভেবেছিল, খৃষ্টান ধর্মে কোনো জাতিভেদ নেই, মানুষে মানুষে সমভ্ৰাতৃত্বই এই ধর্মের সার কথা। তবে দু রকমের পোশাক কেন?

মধু ইওরোপীয় ছাত্রদের মতন কালো ক্যাসিক, কোমরবন্ধ ও চতুষ্কোণ টুপী পরিধান করে ক্লাসে এলো একদিন। সব ইওরোপীয় ছাত্ররা আড়াচোখে দেখতে লাগলো তাকে। শিক্ষক মহাশয় পড়ানো বন্ধ করলেন এবং অধ্যক্ষ মহাশয় ছুটে এলেন। তিনি মধুকে বললেন, প্রিয় বৎস, যদি ক্যাসিক পরিধান করিতেই চাও তো সাদা রঙের পরিধান করিও।

মধু উঠে দাঁড়িয়ে বললো, না, মহাশয়। হয়। ইওরোপীয় পোশাক পরিধান করিব, নয় তো আমার পছন্দ মতন দেশীয় পোশাক।

অধ্যক্ষ বললেন, বেশ, দেশীয় পোশাকেই আসিও।

মধু মুচকি হেসে তখুনি মনে মনে মতলব ভেঁজে নিল। এবং পরদিন ক্লাসে সে বাধিয়ে দিল আরও এক হুলুস্থূল কাণ্ড। লেখাপড়া সব মাথায় উঠলো, সমস্ত কলেজের ছাত্ররা নিজ নিজ ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে এসে দেখতে লাগলো মধুকে। সেদিন মধুপরেছে সাদা সিল্কের কাবা, গলায় বহু রঙের কাজ করা শালের কার্ফ এবং মাথায় উকিলদের মতন বিরাট রঙীন পাগড়ি। মধু যেন সেদিন কোনো গো অ্যাজ ইউ লাইক প্ৰদৰ্শনীর নায়ক। আবার ছুটে এলেন অধ্যক্ষ।

এমন ছেলেকে একটি ধমীয় বিদ্যালয়ে রাখা নিরাপদ নয়। অধ্যক্ষ ও কলেজ কর্তৃপক্ষ মধুকে নিয়ে একটি সভায় বসলেন। সেদিনই মধুর নাম কাটা যেত, কিন্তু রেভারেণ্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় পরামর্শ দিলেন, মধুর ওপর যদি এমন কঠোর নীতি প্রয়োগ করা হয়, তা হলে এর পর আর সম্ভ্রান্ত বংশের ছেলেদের খৃষ্টধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করা সুদূরপরাহত হবে। অনেক বিচার বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ কৃষ্ণমোহনের পরামর্শই মেনে নিলেন। মধু ইওরোপীয় ছাত্রদের মতনই পোশাক পরিবার অনুমতি পেল।

এরপর মাইকেল এম এস ডট পাক্কা সাহেব। ক্লাস করবার সময় তার পাদ্রীদের মতন পোশাক আর তার সায়ংকালীন প্রমোদযাত্রায় ইংলিশ কোট ও মাথায় বীভার হ্যাট।

আবার একদিন অধ্যক্ষ নিজ কক্ষে ডেকে পাঠালেন মধুকে। ঈষদুষ্ণ কণ্ঠে তিনি প্রশ্ন করলেন, বৎস, তুমি গতকল্য গীর্জায় উপাসনার সময় হাসিয়াছিলে কেন?

মধু বললো, আমাদের মাননীয় পাদ্রী বাংলাভাষায় উপদেশ দিতেছিলেন কিনা!

অধ্যক্ষ ভর্ৎসনা করে বললেন, তুমি নিজে বঙ্গবাসী, তবু বঙ্গভাষা শুনিলে তোমার হাস্য উদ্রেক হয়? ছিঃ!

বাংলা ভাষাকে মধু নিজের জীবন থেকে ত্যাগ করেছিল। সে এখন খৃষ্টান, ইংরেজদের স্বজাতি, সে ইংরেজি ভাষায় কাব্য রচনা করে অমর হবে। বাংলা ভাষা দিয়ে তার প্রয়োজন কী? কিন্তু গীর্জার উপাসনায় অকস্মাৎ বাংলা ভাষার ব্যবহার তার বিস্ময় উদ্রেক করে।

অধ্যক্ষের প্রশ্নের উত্তরে সে বললো, মহাশয়, উপাসনার সময় আমাদের মাননীয় পাদ্রী কী ধরনের বাংলা বলিতেছিলেন, আপনি জানেন কি? তিনি বলিতেছিলেন, আমরা তাম্বু ফেলিলাম, সন্ধ্যা হইল, বায়ু বহিল, কুকুর-বিড়াল বৃষ্টি পড়িল, কল্য উঠাইয়া লইলাম, এবং অন্য স্থানে তাম্বু গাড়িলাম! এই কি বাংলা? বাংলা ভাষা। এত যাহা তাহা নহে। এই ধরনের বিলাতি বাংলা শুনিলে হাস্যই আসে, ইহার পরিবর্তে ইংরাজি বলাই শ্রেয়।

এর পরের ঘটনাটি অবশ্য আরও অনেক গুরুতর। সেটি ঘটেছিল ডাইনিং হলে।

সন্ধ্যার সময় ছাত্রেরা ইচ্ছে মতন বাইরে ঘুরে আসে। কে কোথায় যায়, তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই। তবে নৈশভোজের ঘণ্টাধ্বনির সময় সব ছাত্রের ডাইনিং হলে এসে উপস্থিত হবার কথা। মধু অবশ্য দু একদিন অধিক রাত করে ফেলে, কিন্তু ইতিমধ্যেই তার সম্পর্কে নিয়ম কানুন। একটু শিথিল। সে যতই উচ্ছঙ্খলতা প্ৰদৰ্শন করুক, অধ্যয়নের ব্যাপারে সে যে এই কলেজের গৌরব। কোনো কোনো ছুটির দিনে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে মধু শুধু দুবেলা আহারের সময় ছাড়া আর একবারও নিজের ঘর থেকে নিৰ্গত হয় না। অনবরত শুধু বই পড়ে যায়।

সেরকমই একটি দিনে মধু নৈশভোজের ঘণ্টাধ্বনি শুনে ডাইনিং হলে উপস্থিত হয়েছে। সারাদিনের পরিশ্রমে সে ক্লান্ত। তবু আহার সেরেই সে আবার বই নিয়ে বসবে। ইদানীং সে এতই ব্যস্ত যে গৌরদাস বসাকের চিঠির উত্তর দেবারও সময় পায় না। মূল ভাষায় সে ভার্জিল ও হোমার পড়তে শুরু করেছে।

ইউরোপীয় প্রথা অনুযায়ী আহারের পূর্বে দু এক পেগ হাল্কা সুরা পরিবেশন করা হয়। সারাদিন মধু কিছু পান করেনি, তাই সে ঐটুকু সুরার জন্যই উন্মুখ হয়েছিল। হঠাৎ সে দেখলো, পরিচারক শুধু শ্বেতাঙ্গ ছাত্রদেরই সুরা পরিবেশন করে গেল, কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গদের গেলাস শূন্যই পড়ে রইলো।

ক্ৰোধে কুঞ্চিত হয়ে গেল মধুর মুখ। এই ক্ৰোধ সে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে, প্রথমে সে জিভের সুমন্ত্র দিয়ে একটা উচ্চ শিস দিল। তারপর ডান হাতের অর্জনী হেলন করে ডাকলে স্টুয়ার্ড, কাম হিদার!

পরিচারকটি এগিয়ে আসার পর মথু নিজের শূন্য গেলাসটির দিকে ইঙ্গিত করে বললো, এটি পূর্ণ করোনি কেন?

পরিচারক বললো, আজ আমাদের ভাণ্ডারে সুরা কিছু কম আছে, তাই সকলকে দেওয়া যায়নি।

মধু বললো, তাহলে সব ইওরোপীয় ছাত্ররা পেল কী করে? একজনও দেশীয় ছাত্ৰ পায়নি কেন? তোমার যদি অল্প সুরা থাকে, তবে প্রথম থেকে শুরু করে যে-কজন পাবে তো পাবে। এটাই নিয়মসঙ্গত নয় কি?

পরিচারকটি কাঁচুমাচু হয়ে বললো, আমাদের ওপর নির্দেশ আছে, প্রথমে শ্বেতাঙ্গ ছাত্রদের, তারপর

মধু উঠে দাঁড়িয়ে সিংহগর্জনে বললো, ইউ বী। ড্যামড্‌! দোজ ইনস্ট্রাকশানস বী ড্যামড্‌!

সঙ্গে সঙ্গে মধু নিজের শূন্য গেলাসটা ছুঁড়ে মারলো মাটিতে। শুধু নিজেরটা নয়, আশপাশের কয়েকজন কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্রের গেলাস তুলে নিয়ে সে ঝন ঝন শব্দে ভাঙতে লাগলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *