১৬. যদুপতি গাঙ্গুলী এবং অম্বিকাচরণ সান্যাল

কলুটোলার কেশবদের বাড়ির সভা থেকে বেরিয়ে যদুপতি গাঙ্গুলী এবং তার বন্ধু অম্বিকাচরণ সান্যাল পদব্ৰজে বাড়ি ফিরতে লাগলো। উভয়েই থাকে নিকটস্থ এক পল্লীতে। অম্বিকাচরণ সম্প্রতি প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষকতার কাজ পেয়েছে, যদুপতি শিক্ষকতা করে অরিয়েণ্টাল সেমিনারিতে।

বৃষ্টি পড়ছে অল্প অল্প, পৌষ মাসের অকাল বৃষ্টি, বেশীক্ষণ থাকার সম্ভাবনা কম। এ বৎসর শীত কিছুতেই জাঁকিয়ে পড়লো না, বৃষ্টির মধ্যে ফিনিফিনে বাতাসে। তবু কিছুটা শীতের ধারা আছে, সেই বাতাস ও বৃষ্টিকে উপভোগ করতে করতে দুই বন্ধুতে হাঁটতে লাগলো। দুজনেরই গায়ে র্যাপার, অম্বিকাচরণ এক সময় তার র্যাপার দিয়ে মাথায় মুড়ি দিয়ে নিল। রাত্রি বেশী নয়, তবু পথ প্রায় জনশূন্য।

দুই বন্ধুরই জ্ঞানতৃষ্ণা প্রবল, কিন্তু নিছক গ্ৰন্থপাঠে যেন ঠিক তৃপ্তি হয় না, বুকের মধ্যে একটা আকৃতি থেকে যায়। সে আকৃতি যে কিসের জন্য, তাও স্পষ্ট নয়। আসলে ভিত টলে গেছে। এতকাল ধরে বোঝানো হয়েছিল যে মানুষের জীবনকে যা ধারণ করে থাকে, তার নামই ধর্ম। যারা ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে মত্ত, যারা যারা সাকার কিংবা নিরাকার ঈশ্বরকে অভিভাবক মনে করে, তাঁর উদ্দেশ্যে কাঁদে কিংবা প্রার্থনা জানায়, তারা শুধু বিশ্বাস করে, এবং বিশ্বাসের মধ্যেই শান্তি। যদুপতি আর অম্বিকাচরণ নতুন কালের শিক্ষা গ্ৰহণ করার ফলে বিনা প্রশ্নে কোনো কিছুই বিশ্বাস করতে বা মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। তাদের ধর্মের নাম যুক্তি। এবং যুক্তির আক্রমণে প্রচলিত কোনো ধৰ্মই তাদের কাছে টেকে না। কিন্তু যুক্তির যত বড় ক্ষমতাই থাক, তা কখনো মানুষের বন্ধু কিংবা সৰ্ব্বক্ষণের হৃদয়-সঙ্গী হতে পারে না, যুক্তি মানুষকে বড় নিরালা করে দেয়।

শহরের যেখানে যেখানে জ্ঞান, বুদ্ধির চাচা হয় এই দুই বন্ধু সেখানে নিয়মিত যায়। এক সময় তারা দুজনেই ব্ৰাহ্ম সমাজে যাতায়াত করতো। কিন্তু কিছুদিন হলো ব্ৰাহ্মদের সম্পর্কে এই বন্ধুদ্ধয়ের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে। হিন্দু ধর্মের আড়ম্বর পরিত্যাগ করার নামে ব্ৰাহ্মরাও যেন এক নতুন ধরনের আড়ম্বরের প্ৰচলন করতে চলেছে। যুক্তির বদলে ভক্তির অনুপ্রবেশ ঘটেছে তাঁদের মধ্যে। ইদানীং ব্ৰাহ্মদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে। মতবিরোধ, বিশৃঙ্খলা, তাঁদের মূল আচার্য দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রাগে ও অভিমানে কলকাতা ছেড়ে চলে গেছেন হিমালয় পাহাড়ে।

যদুপতি ও অম্বিকাচরণ নবীন সিংহের বাড়ির বিদ্যোৎসাহিনী সভায় যায়, আবার তরুণ বাখী। কেশবের বাড়ির আলোচনা সভাতেও আসে। তবু যেন ঠিক মন ভরে না।

অম্বিকাচরণের স্ত্রী থাকে তাদের দেশের বাড়িতে। ইদানীং শহরে সব দ্রব্যই অগ্নিমূল্য, বেতনের টাকায় সংসার চালনা করা রীতিমতন কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। কলকাতার জনসংখ্যা হু-হু করে বাড়ছে, জীবিকার সন্ধানে দেশের নানান অঞ্চল থেকে মানুষ ধেয়ে আসছে। এখানে। জলা জমি ভরাট করে ব্যাঙের ছত্রাকের মতন নিত্য নতুন গজিয়ে উঠছে ঘর-বাড়ি। এই অবস্থায় স্ত্রীকে এনে কলকাতায় সংসার পাতবার ভরসা পাচ্ছে না। সে থাকে একটি মেস বাড়িতে।

যদুপতি বিপত্নীক। দু বৎসর আগে তার স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে, আত্মীয়, বন্ধুদের অনেক পীড়াপীড়িতেও সে আর দার পরিগ্রহ করেনি। বিগত স্ত্রীর স্মৃতি তার মনে প্রবলভাবে জাগরূক। যদুপতির মূল বাড়ি কুষ্ঠিয়ায়, কলকাতাতেও তার পিতা একটি ছোট বসত বাড়ি বানিয়েছিলেন, সেখানে সে এখন একা থাকে।

ভদ্র গৃহস্থেরা এই শীতের বৃষ্টির রাতে সবাই এর মধ্যে পথ ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে। ঘরে। যে দু-চারজনকে দেখা যায়, তারা প্ৰায় সবাই ফুর্তিখের মাতাল। যদিও বেশী মাতাল হয়ে পথের ওপর দৌরাত্ম্য করলে তাদের গ্রেফতার করে কোতোয়ালিতে আটক করার হুকুম জারি হয়েছে। তবু তাতে মদ্যপদের হুটোপটি কমেনি কিছুমাত্র। পুলিশের উৎকোচ পাবার আর একটি উপায় হয়েছে শুধু। বারবনিতাদের সঙ্গে বেলেল্লা করতে করতে লম্পটরা সন্ধা-ব্রাত্রি থেকেই রাজপথের ওপর ঘুরে বেড়ায়। আজ অবশ্য তাদের সংখ্যাও কম।

দুজনে কিছুক্ষণ হাঁটলো নিঃশব্দে। আজ একটা গাড়ি নিতে পারলেই ভালো হতো। কিন্তু এমন রাত্রে গাড়ি পাওয়াও দুষ্কর। কেরাঞ্চি গাড়িগুলি সন্ধ্যার পরই উধাও হয়ে যায়। পাল্কি-বেহার এমন বৃষ্টি-বাদল দেখে নিশ্চয়ই কোথাও গাঁজা টানতে বসে গেছে। পথে গাড়ি-ঘোড়াও দেখা যাচ্ছে না। বড় একটা। বৃষ্টি বেশ জোরে আসছে।

যদুপতি হঠাৎ বললো, আমার আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে না। অম্বিকাচরণ চমকে উঠে বললো, সে কি কথা? কেন ভাই? যদুপতি বললো, কেন বেঁচে থাকবো তার একটি, বেশী নয়, একটি মাত্র সুসংগত যুক্তি দেখাতে পারো?

—বাঃ, একটি কেন, অসংখ্য যুক্তি রয়েচে। সবচে বড় যুক্তি তো এই যে বেঁচে থাকবে বেঁচে থাকারই জন্য!

—তোমার কথাটি একটু ব্যাখ্যা করে বলে ভাই অম্বিকাচরণ!

—এ কী উপনিষদের শ্লোক যে ব্যাখ্যা করতে হবে? এ তো অতি সাধারণ কথা।

—এমন সাধারণ কথার উপর নির্ভর করে, এমন সাধারণ ভাবে আমি বাঁচার ইচ্ছা করি না। এ কি পশুর জীবন যে কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই প্ৰাণ ধারণ করবো?

–তোমার এমন শ্মশান বৈরাগ্য হঠাৎ জাগলো কেন ভাই! একবার তো শ্মশানে গিয়ে নাকাল হয়েছেলে। কয়েকটা ডোম ছোঁড়া তোমায় আচমকা ধাকিয়ে জলে ফেলে দিসলো না?

-এর নাম কী শ্মশান বৈরাগ্য? বিনা উদ্দেশ্যে মানুষ হয়ে বেঁচে থাকা মানে কি নিছক বসুমতীর ভার বৃদ্ধি করা নয়?

—তুমি তোমার স্বৰ্গতা পত্নীকে নিয়ে আর কোনো নতুন কবিতা রচেছো?

—আমি আর কবিতা লিখি না। কবিতা রচনা করাও অর্থহীন। কবিতা জিনিসটা সম্পূর্ণ একটা যুক্তিহীন ব্যাপার নয়?

–হা-হা-হা–

—তুমি হাসচো, অম্বিকা?

—যদু, তোমার রোগটি বেশ কঠিন মনে হচ্চে। কোনো কবি যদি কখনো কবিতাকে যুক্তিহীন, অর্থহীন বলে, তখন বুঝতে হবে, হি হ্যাজ ক্রসড্‌ দি বাউণ্ডারি লাইন।

—তুমি আমার প্রশ্ন কিন্তু এড়িয়ে যাচ্চো, ভাই অম্বিকা!

—ঐ দাখো।

-কী?

-ওকে দ্যাখো।। ও কেন বেঁচে রয়েচে বা বেঁচে থাকতে চাইছে তা বলতে পারো?

 

বহুবাজারে পথের মোড়ে এক ইটের পাঁজায় ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক লাল শাড়ী পরা যুবতী। বয়স সতেরো-আঠারোর বেশী মনে হয় না। হাতের একটি লাল রুমাল সে ঘুরিয়ে চলেছে, বৃষ্টিতে যে ভিজে যাচ্ছে সর্বাঙ্গ সে খেয়াল নেই। এই রাত্রে সে পথের ওপর কী জন্য দাঁড়িয়ে আছে, তা এক নিমেষ তাকালেই বোঝা যায়।

অম্বিকাচরণ সেদিকে একবার চেয়েই বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নিল।

যদুপতি বললো, দ্যাখো, নারীকে সবাই বলে অবলা। অথচ ওর কোনো ভয় নেই, এমন দুর্যোগের মধ্যে পথের ওপর একলা দাঁড়িয়ে রয়েচে। একেই বলে শুধু বাঁচার জন্য বাঁচা। বাঁচতে তো হবেই, কেন না, মৃত্যুর পর যে আর কিচু নেই। তুমি যুক্তির কথা বলছেলে, মৃত্যুর পর সবই যুক্তিহীন।

মেয়েটি ওদের দেখে একটু এগিয়ে এসে বললো, এই!

দুই বন্ধু কৰ্ণপাত করলো না। তারা যুক্তি বিষয়ে আলোচনা করতে করতে এগোতে লাগলো।

মেয়েটি আবার বললো, এই, আমায় নেবে? নাও না, তোমাদের যেখানে খুশী, যতক্ষণ খুশী, আমায় নাও না।

যদুপতি ধমক দিয়ে বললো, যাঃ! বিরক্ত করিসনি!

মেয়েটি পিছু পিছু আসতে আসতে বললো, দুজনে মিলে নাও! দুটো ট্যাকা দিও!

যদুপতি বললো, যা, যাঃ! বলচি, এখেনে সুবিধে হবে না।

—একটা ট্যাকা দিও, আর জলে ভিজতে পাচ্চিনি! দুজনে আট আনা, আট আনা।

অম্বিকাচরণ একটা আধলা তার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললো, এই নে, আমাদের পিছু ছাড়!

মেয়েটি এবার রেগে গিয়ে গালাগাল শুরু করলো। আ মর মিনসে, আমায় ভিকিরি পেইচিস? ড্যাকরা, ছুঁচো, আট আনা পয়সা দেবার মুরোদ নেই, আমার কোঁচার পত্তন? আমি কি ঘাটের মড়া? দ্যাক না আমার রঙ দুখ্যানা, দু ট্যাকার কমে যাই না—

যদুপতি অম্বিকাচরণের হাত ধরে টেনে দ্রুত এগিয়ে গেল।

 

প্ৰথমে অম্বিকাচরণের বাসস্থান পড়ে। সে দ্বারের সামনে এসে বললো, এবার তোমায় শুভনিশি জানাই ভাই, যদু। বেঁচে থাকার যুক্তি বিষয়ে চিন্তাটা আজ রাতের জন্য মুলতুবী রেখো। আমাদের স্বৰ্গগতা বৌঠানের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানিয়েই বলচি, এবার তোমার আর একটি বিবাহ করার সময় হয়েচে। বিবাহ করলে পুত্র কলত্রে ঘর ভরে গেলে বুঝবে, বেঁচে থাকার আর একটি যুক্তিও রয়েচে!

যদুপতি গভীর ভাবে জিজ্ঞেস করলো, অর্থাৎ?

অম্বিকাচরণ বললো, অর্থাৎ, তখন বুঝবে, অপরের জন্য বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করে। পত্নীর প্রতি প্ৰেম, সন্তানের জন্য মেহ, এগুলিও তো বেঁচে থাকার উপকরণ।

যদুপতির আর তর্ক করার দিকে মন নেই। সে হাত তুলে বিদায় জানিয়ে হাঁটতে শুরু করলো।

কিছুদূর গিয়ে থমকে দাঁড়ালো সে। কী ভেবে আবার পিছনে ফিরলো। অম্বিকাচরণের গৃহের সামনে এসে দেখলো, দ্বার বন্ধ হয়ে গেছে। সে আর ডাকলো না, চলতে লাগলো উল্টো দিকে।

বহুবাজারের মোড়ে সেই যুবতীটি আবার ইটের পাঁজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রুমাল ঘোরাচ্ছে। যদুপতি একেবারে তার মুখোমুখি এসে থেমে এক দৃষ্টে চেয়ে রইলো তার দিকে।

যুবতীটির মুখে ছড়িয়ে গেল খুশীর হাস্য। সে বললো, এসচো? নকখীসোনা আমার, মানিক আমার, এসচো? ভালো করে দ্যাকো, আমি ফ্যালনা নাই, রোগা শালিক পকখীটি নই।

যদুপতি তীক্ষ্ণ কণ্ঠে প্রশ্ন করলো, তুমি কত রাত এখেনে দাঁড়িয়ে থাকবে?

যুবতীটি বললো, আর ডাঁড়াবো না! তুমি এসচো, আর আমার চিন্তা নেই। তুমি আমায় নেবে। আজ কেউ আমায় নেয়নি গো!

–এস আমার সঙ্গে।

–আমায় একটা ট্যাকা দিও অন্তত!

–এসো।

যুবতীটিকে নিয়ে যদুপতি কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে এলো নিজের গৃহে। দ্বার খুলে দেবার পর বাড়ির ভৃত্যটির প্রায় বাকরহিত হবার মতন অবস্থা। তার বাবুটি অতি বিশুদ্ধ চরিত্রের, কখনো বাড়িতে ভিখারিণী এলেও তার সঙ্গে কথা বলে না। রাত্ৰিবেলা এরকম একজন স্ত্রীলোককে নিয়ে তার বাবু ফিরবে, তা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। স্ত্রীলোকটি কী জাতীয়, তা ভৃত্যটিও বোঝে।

যদুপতি কিছুই গ্রাহ্য করলো না। ভৃত্যকে সংক্ষিপ্ত আদেশ দিল, তুই দোর লাগিয়ে শুয়ে পড়। তারপর যুবতীকে নিয়ে উঠে এলো দ্বিতলে।

দ্বিতলের এক কক্ষের চৌকাঠে পা দিয়ে যুবতীটি অনুনয়ের সুরে বললো, ওগো, একটা ট্যাকা ঠিক দেবে তো? যদি দুটো ট্যাকা দিতে পারো, তা হলে বড় ভালো হয়।

যদুপতি বললো, আমি তোমায় স্বৰ্ণালঙ্কার দেবো! সত্যিই সে দেরাজ খুলে দুটি সোনার অঙ্গুরীয় বার করে মেয়েটির হাতে দিয়ে বললো, এই নাও, আরও দেবো।

ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে যদুপতি একটা গামছা নিয়ে এলো। যুবতীটিকে বললো, অনেক ভিজেচো, মাথা মুচে নাও। তোমার নাম কী?

—আমার একটা নাম বসন্তকুমারী আর একটা নাম ক্ষেমী।

—তোমার খিদে পেয়েচে?

—খুব। তাতে কিচু হবে নাকে। আমি বাড়ি গিয়ে খাবো। আংটি দিলে, একটা ট্যাকা দেবে না?

যদুপতি আবার বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। তার রাত্রির আহার ঢাকা দেওয়া থাকে। তার নিজের একটুও আহারের বাসনা নেই। সে এক বাটি ক্ষীর নিয়ে ফিরে এসে বললো, বসন্তকুমারী, তুমি এটা খাও, আমি দেখি।

ক্ষেমী বললো, ওমা, এখুন খাবো কী? না, না, এখুন না, আগে তুমি আমায় নাও।

বললো, তুমি বসো ওটার ওপর।

মেয়েটি হতভম্বর মতন বসলো সেখানে।। যদুপতি বসলো তার সামনে মেঝের ওপর। তারপর হাত দুটি জোড় করে বললো, তুমি আমার মা!

ক্ষেমীর চক্ষু দুটি বিস্ফারিত হয়ে গেল। তার এই ক্ষুদ্র জীবনেই অনেক রকম উন্মাদ দেখেছে, কিন্তু এটি আবার কী রকম?

যদুপতি বললো, শুধু দুটি খেতে পাওয়ার জন্য তুমি বেঁচে রয়েচো, তোমার খাওয়া আমি দেখি। হে জননী, দুটি আহারের জন্য তোমায় পথে দাঁড়াতে হয়?

ক্ষেমী বললো, কী কবে, বাড়িতে যে নোক আসে না রোজ সাধে কি আর রাস্তায় ডাঁড়াই। রাস্তায় ডাঁড়িয়ে চিলুম বলেই তো তোমায় পেলুম। হ্যাঁ গা, তুমি মা মা কচ্চো কেন? আমি তোমার মা হতে যাবো কেন, তুমি ভদ্দরনোক!

—তুমি যে মাতৃজাতি! লাজ-লজ-ধর্ম সব বিসর্জন দেবে শুধু দুটি আহারের জন্য? এর চে কি মরণ ভালো নয়? এসো মা, তোমাতে আমাতে দুজনে গঙ্গায় ঝাঁপ দিয়ে মারি। আমরা সন্তান হয়ে যদি মায়ের দুঃখ ঘোচাতে না পারি—

এসব কী বলচো গো! আমার ভয় কচ্চে! আমি মত্তে যাবো কোন আল্লাদে? বাড়িতে যে এক গাদা মুখ হাঁ করে রয়েচে, তাদের গুষ্টির পিণ্ডি কে জোগাবে?

–তোমার রোজগারে আরও লোক খায়?

—তবে তাদের কে খাওয়াবে? ভগবান? এঃ!

—তুমি ওদের জন্যই বেঁচে রয়েচো?

—কে জানে বাবা অতি কতা? তুমি আমায় নেবে তো নাও, নইলে আমি বাড়ি যাই। মরণের কতা! তুমি আমায় মেরে ফেলবে নাকি?

—না, মা, আমি তোমায় পুজো করবো।

—শোনো কতা! কেন, আমায় পুজো কর্বে কেন? আমি কি ওলাইচণ্ডী ঠাকুর? অ্যাই যাঃ। কী বলে ফেললুম! নমো, নমো।

—তুমি সব ঠাকুরের চেয়ে বড়। তুমি মা। তোমার পুজো করবো। সন্তানের কাঁচ থেকে পুজো পেয়েও কি তুমি আর কোনোদিন মান খুইয়ে পথে দাঁড়াবে? এর চে যে ভিক্ষে করাও ভালো।

—কে অমনি অমনি আমায় ভিককে দেবে? কটা আধলাই বা পাবো?

—তুমি মা, তোমার পাপে সন্তানের পাপ, তোমরা যদি এত নীচে নামো, তবে সন্তানরা যে মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতেই পারবে না।

—আমি তোমার কতা কিচুই বুঝচিনি। আমায়। তবে বাড়ি যেতে দাও। যদুপতি ক্ষেমীর পায়ের পাতা দুহাতে চেপে ধরলো।

ক্ষেমী আঁতকে উঠে বললো, ওমা, ওমা, ভদ্দরনোকের ছেলে, আমার পা ধরলে, আমার একেই এত পাপ–ছাড়ো, ছাড়ো।

যদুপতি ব্যাকুলভাবে বললো, আমি শুধু মুখের কথা বলিনি। আমি সত্যিই তোমার পুজো করবো। ফুল-দুর্বো দিয়ে। এতদিন লোকে তোমায় যত অপমান করেচে, সব ধুয়ে যাবে, তুমি আবার মঙ্গলময়ী মা হবে।

ক্ষেমী কেঁদে ফেলে বললো, ওগো, আমরা বড় দুকখী, কেন আরও দাগ দিচ্চো আমায়? সাধ করে কেউ পাপের পথে নামে!

—আবাব পুণ্যের পথে উঠে যাও!

—ওগো ছাড়ো, পা ছাড়ো। বেশ, কাল থেকে ভিককে কর্বো, পা ছাড়ো, আর পাপ বাড়িও না।

যদুপতি কেঁদে ফেলে বললো, তোমার যখন যা দরকার আমার কাচ থেকে চেয়ে নিও, কিন্তু আজ থেকে তুমি মহিয়সী হও! তুমি সন্তানের নিকট আদর্শ হও!

যদুপতির আবেগের স্পর্শে ক্ষেমীও আপ্লুত হয়ে গেল। এবং একসঙ্গে কাঁদতে লাগলো দুজনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *