১৪. এখানে তিনদিন কেটে গেল

এখানে তিনদিন কেটে গেল কাজের মধ্যে। সোমনাথ মন্দির নিয়ে বইটার ভূমিকা লিখতে গিয়ে ক্রমশই বড় হয়ে যাচ্ছে। এই কাজের মধ্যেও মাঝে মাঝে মনে পড়ে, আল্পস পাহাড়ে যাওয়া হল না! চমৎকার সুযোগ ছিল। সে জন্য একটু একটু মনখারাপ হয়। তখন জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকেন বাইরের দিকে। এখানকার পাহাড়ে বরফ জমে না বটে, কিন্তু অন্যরকম সুন্দর। কত বড় বড় গাছ। পাহাড়ের আড়ালে যখন সূর্য ড়ুবে যায়, তখন মনে হয়, ওই দিকটাতেই যেন স্বর্গ। আর চার-পাঁচদিন কাটাতে পারলেই কাকাবাবুর কাজ শেষ হয়ে যাবে।

আরও দুদিন পর সকালবেলা কাকাবাবু ঘোড়ায় চেপে বেড়াতে বেরিয়েছেন। আজকের বাতাসে একটু একটু ঠান্ডা ভাব। কাকাবাবু একবার ঘড়ি দেখলেন। ঘোড়াটা চলছে দুলকি চালে। কাকাবাবু নানারকম পাখির ডাক শুনতে শুনতে এগোচ্ছেন খাদের দিকে। ওখান থেকে উপত্যকা অনেক অনেক নীচে। তাকিয়ে থাকলে গা শিরশির করে, তবু দেখতে ভাল লাগে।

আর-একটা ঘোড়ার পায়ের খটখট আওয়াজ শুনে কাকাবাবু ভাবলেন, যদু বুঝি ঝরনা থেকে জল নিয়ে আসছে। যদুর যত্নের কোনও ত্রুটি নেই, প্রতিদিন তিন-চারবার জল এনে দেয়। রান্নাও বেশ ভাল।

কয়েকটা বড় গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল অন্য এক অশ্বারোহী। তার মুখে একটা কালো রঙের মুখোশ। কাকাবাবুর চিনতে কয়েক মুহূর্ত মাত্র দেরি হল। এ তো সেই কর্নেল!

কাকাবাবু বললেন, খুঁজে পেয়েছ জায়গাটা? আমি তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।

কর্নেল বলল, খুঁজে পাওয়া এমন কী শক্ত ব্যাপার? আমি কালকেই এসে লক্ষ করছিলাম, তুমি কোনও পুলিশের ব্যবস্থা করেছ কিনা!

কাকাবাবু বললেন, সেই জন্যই এত দূরে এসেছি। এখানে কোনও পুলিশ আসবে না। অন্য কেউ আসবে না। তুমি মুখোশ পরেছ কেন?

কর্নেল বলল, বেশ করেছি। শোনো রায়চৌধুরী, আজই হবে শেষ ড়ুয়েল। দ্যাখো, আমি আড়াল থেকে কিংবা পিছন থেকে আক্রমণ করিনি। সামনাসামনি এসেছি। তুমি রেডি? আগেই ঠিক ছিল, যখন-তখন দেখা হয়ে যাবে।

কাকাবাবু বললেন, হ্যাঁ, আমি রেডি।

কর্নেল বলল, এবারে অস্ত্র বেছে নেওয়ার প্রশ্ন নেই। যার যেমন খুশি অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।

কর্নেল আস্তে আস্তে কথা বলছিল, হঠাৎ চেঁচিয়ে বলল, স্টার্ট।

তারপরেই ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়ে একটা বোমা ছুড়ে মারল কাকাবাবুর দিকে।

কাকাবাবু পকেট থেকে রিভলভার বের করেও গুলি চালানোর সময় পেলেন না। বোমাটা এসে লাগল তার গায়ে। তিনি ঘোড়া থেকে পড়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে অজ্ঞান।

লড়াইটা শুরু হতে না-হতেই শেষ।

কর্নেল ঘোড়া থেকে না নেমে অপেক্ষা করতে লাগল খানিকটা দূরে। যেবোমাটা কাকাবাবুর গায়ে লেগেছে, সেটা একটা গ্যাস বোমা। সেটা থেকে এখনও গলগল করে বেরোচ্ছে ধোঁয়া। বোমার আঘাতে নয়, গ্যাসেই জ্ঞান। হারিয়েছেন কাকাবাবু।

ধোঁয়া শেষ হয়ে গেলে কর্নেল কাছে এসে হাঁটু গেড়ে বসল কাকাবাবুর কাছে। তার নাকের কাছে হাত দিয়ে বুঝতে চাইল এখনও নিশ্বাস পড়ছে কিনা। পকেট থেকে বের করল নীল রঙের দড়ি। প্রথমে কাকাবাবুর দুহাত, তারপর দুপা, সারা শরীর পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বাঁধল। ঘোড়ার পিঠে ঝোলানো একটা ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে ছিটিয়ে দিতে লাগল কাকাবাবুর মুখে।

একটু পরেই চোখ মেলে কাকাবাবু প্রথমে ভাবলেন, বৃষ্টি পড়ছে বুঝি। তিনি বৃষ্টিতে ভিজছেন। তারপর পুরোপুরি চোখ মেলে দেখলেন, আকাশ। বৃষ্টি নেই। তার মনে পড়ল, ঘোড়ার পিঠ থেকে তিনি পড়ে গিয়েছেন। সেই জন্যই কি জ্ঞান হারিয়েছেন? ধড়মড় করে উঠে বসতে গিয়ে টের পেলেন, তার সারা শরীরে ব্যথা। হাত-পা বাঁধা। নড়াচড়ারও ক্ষমতা নেই। সামনে দুপা ফাঁক করে বীরদর্পে দাঁড়িয়ে আছে কর্নেল।

সে হ্যা-হ্যা করে হেসে বলল, রায়চৌধুরী, দ্যাখো, আমি ভদ্রলোক। সামনাসামনি ড়ুয়েল লড়ে তোমাকে হারিয়েছি।

কাকাবাবু কোনওক্রমে বললেন, তুমি ভদ্রলোকও নও, ইংরেজিও ভাল জানেন না। ড়ুয়েল মানে বুঝি বোমা ছোড়া?

কর্নেল বলল, আর্মিতে আমার শার্প শুটার হিসেবে সুনাম ছিল। রিভলভার, বন্দুকে তুমি আমার সঙ্গে পারতে না। কিন্তু আমার ডান হাতটায় একটা চোট লেগেছে, কিছুদিন অস্ত্র ধরতে পারব না। তাই তোমাকে আগেই বলে নিয়েছি, যে-কোনও উপায়ে …। আসলে তুমি কীভাবে মরবে, তা জানো না এখনও। তোমাকে আমি পাহাড়ের উপর থেকে খাদে ফেলে দেব। তুমি গড়াতে গড়াতে নামবে, সেটা আমি দেখব। পাথরে লেগে তোমার মাথাটা ছাতু হয়ে যাবে, হাত-পা ভেঙে একটা মাংসপিণ্ড হয়ে পড়বে নীচে। তাতে আমার গায়ের জ্বালা মিটবে।

কাকাবাবুর নড়াচড়ার উপায় নেই। কর্নেল তাকে মাটি থেকে তুলে একটা ঘোড়ার পিঠে শুইয়ে দিল একটা আলুর বস্তার মতো। ঘোড়াটাকে টানতে টানতে নিয়ে এল খাদের কাছে। সেখানে এসে আবার এক ধাক্কা দিয়ে কাকাবাবুকে ফেলে দিল মাটিতে। ভাঙা দেওয়ালের এক জায়গায় কাকাবাবুকে টেনে এনে শুইয়ে দিল, কাকাবাবুর মাথাটা ঝুলে রইল খাদের দিকে।

সে কাকাবাবুর চুলের মুঠি ধরে হিংস্র গলায় বলল, রায়চৌধুরী, এই তোর শেষ মুহূর্ত। আর তোর বাঁচার কোনও উপায় আছে? ভগবানকে ডাক। তার মুখটা কাকাবাবুর মুখের একেবারে কাছে। সে তার চুলের মুঠি ধরে ঝাকাচ্ছে।

কাকাবাবু ফিসফিস করে বললেন, এই তো ভুল করলে! আমার এত কাছে আসা উচিত হয়নি। আমার আর-একটা অস্ত্রের কথা তুমি জানো না।

কর্নেল বলল, অস্ত্র? আর কী অস্ত্র!

কাকাবাবু বললেন, আমার চোখ। তাকাও চোখের দিকে। তুমি তো জগমোহন!

চুলের মুঠি ছেড়ে দিয়ে দারুণ অবাক হয়ে কর্নেল বলল, হ্যাঁ, তুমি কী করে জানলে?

কাকাবাবু বললেন, আমি সব জানি। জগমোহন, তুমি এবার ঘুমিয়ে পড়ো। ঘুমিয়ে পড়ো, ঘুমিয়ে পড়ো।

কর্নেল বলল, তুমি কি আমাকে হিপনোটাইজ … সে আর কথা শেষ করতে পারল না। তার চোখ বুজে এল। সে বসে পড়ল কাকাবাবুর পায়ের কাছে। তার থুতনিটা ঠেকে গেল বুকে।

এত সহজে যে ওকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া যাবে, কাকাবাবু আশাই করেননি। তিনি এবার ছটফট করতে লাগলেন। শরীরের বাঁধন খুলবেন কী করে? হাতও নাড়তে পারছেন না। বেশিক্ষণ কর্নেলের ঘোর থাকবে না। কয়েক মিনিটের মধ্যে কাকাবাবু নিজেকে মুক্ত করতে না পারলে কর্নেল আবার জেগে উঠবে। যদুকে এখান থেকে চিৎকার করে ডাকলেও সে শুনতে পাবে না। তবু কাকাবাবু তাকে ডাকলেন দুবার। কোনও লাভ হল না।

কাকাবাবু অসহায়ের মতো এদিক-ওদিক মাথা নাড়ছেন। পাঁচ মিনিট পরেই কর্নেল আবার মাথাটা সোজা করল। আস্তে আস্তে বলল, কী হল? আমার মাথা ঘুরছিল!

সে আর-একবার কাকাবাবুর দিকে তাকাতেই কাকাবাবু বললেন, তুমি জগমোহন? তুমি জগমোহন?

কর্নেল বলল, হ্যাঁ।

কাকাবাবু এবার আদেশের সুরে বললেন, জগমোহন, আমি যা বলব, তুমি তাই-ই শুনবে?

কর্নেল বলল, হ্যাঁ, শুনব।

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কাছে ছুরি আছে?

কর্নেল বলল, ছুরি? জানি না।

কাকাবাবু বললেন, দ্যাখো, তোমার পকেট খুঁজে দ্যাখো।

কর্নেল সব পকেট খুঁজেও ছুরি পেল না। বুকপকেট থেকে বের করে আনল একতাড়া চাবি। সেই চাবির রিং-এ একটা ছোট্ট লাল রঙের ভাঁজ করা ছুরি।

কাকাবাবু আবার আদেশের সুরে বললেন, জগমোহন, ওই ছুরি দিয়ে কাটো।

কর্নেল বলল, কী কাটব? গলা?

কাকাবাবু বললেন, না, ইডিয়েট। আমার গলা কাটতে বলিনি। বাঁধন কাটো। আগে হাতের।

কাকাবাবুর গায়ের উপর ঝুঁকে কর্নেল দড়ি কাটতে শুরু করল। অত ছোট ছুরি দিয়ে শক্ত দড়ি কাটতে অনেক সময় লাগার কথা।

কাকাবাবু ধৈর্য ধরতে পারছেন না। তিনি জানেন, বেশিক্ষণ কর্নেলকে সম্মোহিত করে রাখা যাবে না। ওর জ্ঞান ফিরে এলেই বিপদ।

একটা রোবটের মতো আস্তে আস্তে ঘষে ঘষে ছুরিটা দিয়ে দড়ি কাটছে। কর্নেল। ছোট হলেও ছুরিটায় বেশ ধার আছে।

হঠাৎ একটু পরেই থেমে গিয়ে মাথা সোজা করল কর্নেল। এদিক-ওদিক মাথা ঝাকাল কয়েকবার।

তারপর সে আপন মনে বলল, এটা আমি কী করছি? রায়চৌধুরীর ফাঁদে পা দিয়েছি? ওই চোখ দিয়ে ও আসলে হিপনোটাইজ করছিল। ওর চোখ দুটো আমি গেলে দেব।

সে কাকাবাবুর চোখ গেলে দেওয়ার জন্য ছুরি তুলল।

হাতের বাঁধন প্রায় কেটে এসেছিল, এবার জোরে এক হ্যাঁচকা টান মারতেই ছিঁড়ে গেল। ঠিক সময়ে কর্নেলের ছুরি সমেত হাতটা ধরে ফেললেন কাকাবাবু।

শুয়ে থাকলে বেশি জোর পাওয়া যায় না, নইলে কাকাবাবুর হাতের জোর সাংঘাতিক। কর্নেল প্রায় হাতটা নামিয়ে আনছে, কাকাবাবু বাঁ হাত দিয়ে ওর নাকে একটা ঘুসি কষালেন। এত শক্তিশালী ঘুসি কর্নেল জীবনে খায়নি। সে আঁক করে আওয়াজ করে উঠল। ঝরঝর করে রক্ত পড়তে লাগল তার নাক দিয়ে।

সেইটুকু সময়ের অমনোযোগেই কাকাবাবু ছুরিটা কেড়ে নিলেন ওর হাত থেকে। সেটা ওর গলায় ঠেকিয়ে বললেন, ছোট হলেও এ-ছুরিটা তোমার গলা ফুটো করে দিতে পারবে।

কর্নেল ঘেন্নার ভঙ্গি করে বলল, এঃ, এত মারামারির পর শেষ পর্যন্ত ছোট্ট একটা ছুরি! কাটো দেখি আমার গলা। কাটো!

কাকাবাবু সেই ধারালো ছুরিটা একবার বুলিয়ে দিলেন ওর গলায়। উপরের চামড়া কেটে রক্ত বেরিয়ে গেল।

কর্নেল বলল, ওসব আমি গ্রাহ্য করি না। এবার আমি তোমাকে ঠেলে ফেলে দেব। আর দেরি নয়!

কাকাবাবুর মাথাটা খাদের দিকে ঝুলছে এখনও। জোরে ধাক্কা দিলেই তিনি গড়াতে শুরু করবেন। এইটুকু ছুরি দিয়ে কর্নেলকে ঘায়েল করা যাবে না, তিনি বুঝেছেন। তিনি উঠে বসতেও পারছেন না। কর্নেলেও তাকাচ্ছে না তাঁর চোখে চোখে।

সে কাকাবাবুকে ঠেলা শুরু করতেই কাকাবাবু প্রথমটা এমন ভাব দেখালেন যে, তিনি আর পারছেন না। হাল ছেড়ে দিয়েছেন। শত্রুপক্ষকে অসাবধান করে দেওয়ার এটা একটা উপায়।

কর্নেল বলল, পাঁচ গুনব, তুমি শেষ হয়ে যাবে, রায়চৌধুরী। এক, দুই…

কাকাবাবু প্রাণপণে খানিকটা মাথা তুলে দুহাতে চেপে ধরলেন কর্নেলের মাথা। ওর মাথা ধরেই তিনি উঠে বসলেন।

কর্নেল দারুণ চেষ্টা করে কাকাবাবুর দুহাতের মুঠি থেকে নিজের মাথা ছাড়িয়ে নিতে গেল, পারল না। তখন সে-ও দুহাতে টিপে ধরল কাকাবাবুর গলা। যেন দুজন আদিম মানুষ। এখনও কোনও অস্ত্রের ব্যবহার জানে না। এখনও হাত দিয়ে লড়াই করে। কাকাবাবুর এক পা খোঁড়া বলেই হাতে জোর বেশি। তিনি কর্নেলের মাথাটা কয়েক বার ঠুকে দিলেন পাশের পাঁচিলে। কয়েক বারের পর কর্নেলের হাত আলগা হয়ে এল। মাথায় অত আঘাতে তার জ্ঞান চলে গেল।

কাকাবাবু একটুক্ষণ হাঁপালেন জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে। তারপর নিজের সব বাঁধন খুলে কর্নেলকে বাঁধলেন।

একটু আগে যা ছিল, এখন ঠিক যেন তার উলটো হয়ে গেল। কর্নেলের ঘোড়ার পিঠের ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে কাকাবাবু প্রথমে নিজে খানিকটা জল খেয়ে নিলেন, খানিকটা জল ঢেলে দিলেন কর্নেলের মুখে।

কর্নেল চোখ মেলে তাকাতেই কাকাবাবু বললেন, এবার সত্যিই খেলা শেষ। তুমি আমাকে এই খাদে ঠেলে ফেলে দিতে চাইছিলে, তাই না? এবারে দ্যাখো, আমি তোমাকে আরও কত কঠিন শাস্তি দেব। তুমি একটু একটু করে শেষ হয়ে যাবে।

পা থেকে গলা পর্যন্ত দড়ি বাঁধা অবস্থায় কর্নেলকে কাকাবাবু শুইয়ে দিলেন। ওরই ঘোড়ায়। তারপর বাড়িটার কাছে এসে ঘোড়াটাকে বেঁধে রাখলেন একটা গাছের সঙ্গে।

যদুকে ডেকে তিনি সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে বললেন। ফিরে যেতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *