১৩. প্ৰাণগোপালের উপনয়ন

বিধুশেখরের নাতি প্ৰাণগোপালের উপনয়ন উপলক্ষে নবীনকুমার অনেকদিন পর এলো এ বাড়িতে। অতি শৈশবে সে তার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা গঙ্গানারায়ণের হাত ধরে এখানে অনেকবার এসেছে। তখন তাকে আদর করার জন্য নারীগণের মধ্যে কাড়াকড়ি পড়ে যেত।

পারিবারিক গণ্ডি ছাড়িয়ে নবীনকুমার এখন বাইরের পৃথিবীকে চিনতে শুরু করেছে, মাসী-পিসী, দিদি-খুড়ো-জ্যাঠাদের সঙ্গে অহেতুক বিশ্ৰাম্ভালাপ আর সে পছন্দ করে না। নিমন্ত্রণাদি ছাড়া আর আসা হয় না এখানে।

একমাত্র দৌহিত্রর উপনয়নে বিধুশেখর ধুমধামের আয়োজন করেছেন বিস্তর। প্ৰাণগগোপালকে নিয়ে তাঁকে বিস্তর ঝঞ্ঝাট পোহাতে হয়েছে। প্ৰাণগোপালের পিতামহ। শিবলোচন কিছুতেই দাবি ছাড়েতে চান না, তিনি তাঁর পৌত্রের ওপর অধিকার বজায় রাখতে চান। প্ৰাণগোপাল যেমন বিধুশেখরের একমাত্র নাতি, তেমনি শিবলোচনেরও ঐ একটিই নাতি বৈ আর নেই।

গরীব ব্ৰাহ্মণের এই স্পর্ধা বিধুশেখরের কিছুতেই সহ্য হয় না! শিবলোচনের পুত্রকে বিধুশেখর ঘরজামাই করেছিলেন, তাঁর কন্যার সঙ্গে বিবাহই হয়েছিল ঐ শর্তে। ঘর-জামাইয়ের মৃত্যু হলে তার সন্তান তো মাতুলালয়েই থাকবে স্বাভাবিকভাবে! ঐ পূজারী ব্ৰাহ্মণ শিবলোচনের কতখানি সামর্থ্য আছে প্ৰাণগোপালকে মানুষ করার? বিধুশেখর এরই মধ্যে ঐ অষ্টমবর্ষীয় বালকের জন্য তিনজন শিক্ষক রেখেছেন।

শিবলোচন মামলা করার আস্ফালন করেছিলেন, তাতে অবশ্য হেসেছিলেন বিধুশেখর। ঐ মুখটা জানে না যে, ন্যায়-অন্যায়ের বিচারের ওপরেই শুধু হারজিত নির্ভর করে না। ধনীর সঙ্গে মামলা করে কখনো জয়ী হতে পারে না কোনো দরিদ্র। আর কিছু না, শুধু মামলাটিকে চার-পাঁচ-ছয় বৎসর ধরে চালিয়েই বিধুশেখর ওঁকে সর্বস্বান্ত করে দিতে পারেন।

শেষ পর্যন্ত মামলা-মোকদ্দমার দিকে যাননি শিবলোচন। কিন্তু হালও ছাড়েননি। প্ৰতি মাসে একবার দুবার করে এসে আর্জি জানিয়ে দেন। অন্তত একবার সামান্য কয়েকদিনের জন্যও তিনি প্ৰাণগোপালকে নিয়ে যেতে চান স্বগৃহে। ও ছেলে কি তার পিতার ভিটেয় একবারও পা দেবে না? এর পিতামহী যে একবারও ওকে চক্ষেও দেখলেন না। পুত্রের শ্বশুরালয়ে কখনো জননীকে আসতে নেই, নইলে তিনি নিজেই এসে দেখে যেতে পারতেন।

কিন্তু বিধুশেখর এ ব্যাপারেও অত্যন্ত কঠোর। তাঁর মুখের বাক্য অনড়। একবারের জন্যও তিনি প্রাণগোপালকে প্রেরণ করতে রাজি নন। তাঁর মতে, দরিদ্র মাত্রেই কুটিল ও লোভী। অভাব মানুষকে নীচে নামায়। নিজের পুত্রকে ঘরজামাই হতে দিতে রাজি হয়েছিলেন কেন শিবলোচন, অর্থলোভেই তো! নাতিকে নিয়ে যাবার আবেদনের পশ্চাতেও নিশ্চয়ই কোনো কু-মতলব আছে!

শিবলোচনকে ইদানীং আর এ গৃহে প্ৰবেশ করতেই দেওয়া হয় না। তবু তিনি আসেন এবং দ্বারের বাইরে দাঁড়িয়ে সতৃষ্ণ নয়নে তাকিয়ে থাকেন। যদি একবার দূর থেকেও নাতির মুখ দেখা যায়।

প্ৰাণগোপালের উপনয়নের দিনেও তার পিতৃকুলের কারুর নিমন্ত্রণ হয়নি। শিবলোচন সম্পর্কটা এমনই তিক্ত করে ফেলেছেন যে, ওঁদের কারুর মুখদর্শন করতেও আর ইচ্ছে হয় না বিধুশেখরের। এব্যাপারে তিনি তাঁর কন্যা সুহাসিনীর মতামত জিজ্ঞেস করেছিলেন।

—ওদের সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখতে চাই না, মা! প্যাঁচালো বামুন পাঁচজন বিশিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে বসে কোন কতা বলবে, তার ঠিক কী! হয়তো নাকে কান্না শুরু করবে! তারচে ওদের না ডাকাই ভালো! তুই কী বলিস?

সুহাসিনী আর পিতার কথার ওপর কোন কথা বলবে! তা ছাড়া, শ্বশুরকুলের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই স্থাপিত হয়নি। বিবাহের পর মাত্র সাতদিন সে শ্বশুরালয়ে ছিল একবার, তাঁদের কারুর মুখই তার ঠিক মতন স্মরণ হয় না।

—সে আপনি যা ভালো বুজবেন, বাবা!

নির্লজ্জ শিবলোচন তবু কোথা থেকে খবর পেয়ে আজও দ্বারের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। এমন দিনে তিনি নাতিকে একবার আশীর্বাদ করতে চান। বিধুশেখরের তুলনায় শিবলোচন আরও বেশী বৃদ্ধ। সত্তরের কাছাকাছি বয়েস, শরীরটা ভাঙা-চোরা। একটি বহু ব্যবহৃত কাষায় বস্ত্র ও উত্তমাঙ্গে নামাবলী, এ ছাড়া অন্য কোনো পোশাক তিনি কখনো ব্যবহার করেন না।

 

সুহাসিনীর বিবাহের সময় অতিথি আপ্যায়নের ভার ছিল গঙ্গানারায়ণের ওপর। সুহাসিনীর পুত্রের অন্নপ্রাশনের সময় সেই ভার নবীনকুমারের ওপর বর্তেছে। নবীনকুমারকে দেখে সুহাসিনীর বার বার মনে পড়ছে তার গঙ্গাদাদার কথা। নবীনকুমারের এখন যা বয়েস, তার বিবাহের সময় গঙ্গানারায়ণেরও প্রায় এই বয়েসই ছিল। অথচ দুই ভ্রাতার মধ্যে কত প্ৰভেদ। গঙ্গানারায়ণ ছিল লাজুক, নম্র স্বভাবের। বেশী লোকজনের মধ্যে সে অস্বস্তি অনুভব করতো, অন্দরমহলে এসে সে নারীদের চোখের দিকে চোখ তুলে চাইতে পারতো না। সেই তুলনায় নবীনকুমার একেবারে বিপরীত। এত সপ্রিতিভ, চঞ্চল এবং সামান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে সে হুকুমের সুরে কথা বলে। ধুতির ফুল-কোঁচাটি এক হাতে ধরে সে দ্বারের কাছে দাঁড়িয়ে পূৰ্ণবয়স্কদের মতন ব্যবহার করছে মাননীয় অভ্যাগতদের সঙ্গে। তার উজ্জ্বল চক্ষু দুটি সে সোজা অপরের মুখের দিকে তুলে ধরে।

বিন্দুবাসিনীর কথাও এদিনে কয়েকবার চকিতে মনে পড়ে সুহাসিনীর। কিন্তু দিদির মুখচ্ছবিখানি সে মন থেকে মুছে দিতে চায়। দিদি বড় মন্দভাগিনী ছিল, সুহাসিনীর মতন একটি সন্তানও সে পায়নি। বৈধব্যজীবনের নিষ্ঠাও রক্ষা করতে পারলো না সে, সবাই জানে দিদি গঙ্গানারায়ণের সঙ্গে কলঙ্কিনী হয়েছিল। সে মরে বেঁচেছে। এ গৃহে তার স্মৃতিরও কোনো স্থান নেই, বিশেষত আজকের মতন শুভদিনে।

অতিথিদের খাওয়া প্ৰায় শেষ হয়ে এসেছে, এই সময় নবীনকুমার একবার অন্দরমহলে এলো জল পান করবার জন্য। লোকজনের সঙ্গে অনবরত কথা বলতে বলতে কণ্ঠ শুষ্ক হয়ে যায়।

সুহাসিনী তাকে দেখে বললো, এই ছোট্‌কু, শোন।

সুহাসিনী এখন বাইশ বছরের যুবতী। তার শরীর একটু ভারির দিকে, একখানা নতুন গরদের শাড়ি পরিহিত অবস্থায় তাকে বেশ মা-মা দেখায়।

নবীনকুমার কাছে এগিয়ে যেতেই সুহাসিনী তার কপালে একটি চুম্বন দিয়ে শুধু বললো, ছোট্‌কু—। তারপরই তার দুই চক্ষু দিয়ে দরদর ধারে অশ্রু বৰ্ষিত হতে লাগলো।

নবীনকুমার বিস্মিত হয়ে বললো, এ কি, সুহাসিনীদিদি!

সুহাসিনী বললো, ছোট্‌কু, আজ বড় গঙ্গাদাদার কতা মনে পড়চে রে! আমায় কত ভালোবাসতেন। আমি গঙ্গাদাদার গলা জড়িয়ে ধরে পিঠে কিল মাতুম! গঙ্গাদাদা আমাদের ছেড়ে কোতায় চলে গেল রে!

নবীনকুমার নির্বাক হয়ে রইলো। গঙ্গাদাদাকে সেও খুব ভালোবাসতো। কারুর কারুর উপস্থিতিতেই ভালোবাসার ঘ্ৰাণ পাওয়া যায়। গঙ্গাদাদা কাছে এলেই সে রকম লাগতো। একটি দিনের কথা তার এখনো মনে আছে। পিতার মৃত্যুর পর তাদের সম্পত্তি ভাগাভাগি হচ্ছিল, প্রায় সবই নবীনকুমারের ভাগে,গঙ্গানারায়ণকে বিশেষ কিছুই দেওয়া হয়নি। তাই নিয়ে বিম্ববতী আপত্তি তোলায় গঙ্গানারায়ণ বলেছিল, মা, ছোট্‌কুর পাওয়া আর আমার পাওয়া তো একই কথা, তুমি অমন কেন বলচো? তখন নবীনকুমারের অনেক কম বয়েস, অতশত বোঝার ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু আজও স্মরণে এলে সে বুঝতে পারে, গঙ্গানারায়ণের ঐ কথার মধ্যে ঈর্ষার লেশমাত্র ছিল না। তবে, গঙ্গানারায়ণের নিরুদ্দিষ্ট বা মৃত বলে ঘোষিত হবার পর আর বেশী দিন নবীনকুমার তার দাদার স্মৃতি ধরে রাখতে পারেনি।

আজ সুহাসিনীর কান্না তার কাছে এমনই আকস্মিক মনে হলো যে সে কোনো উত্তরই দিতে পারলো না।

সেখানে অন্য একজন স্ত্রীলোক এসে পড়ে বললো, ওমা, সুহাসিনী, তুই কাঁদচিস? কী হলো গা?

সুহাসিনী তাড়াতাড়ি চক্ষু মুছে বললো, না, না, কিচু না!

তারপর সে নবীনকুমারের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে বললো, আমাদের সেই ছোট্‌কু, কত বড়টি হয়েচে, কেমন সুন্দর, কেমন বুদ্ধিমান, দেকে এত ভালো লাগলো—

সেই স্ত্রীলোকটি সুহাসিনীর প্রতি সহানুভূতি জানাবার জন্যই যেন চক্ষে আঁচল দিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো, আহা, আজ যদি গোপালের বাবা বেঁচে থাকতেন-ওগো তিনি থাকলে যে সব্বাঙ্গসোন্দর হতো–

এই সময় নবীনকুমার বার-বাড়ির দিকে সরে পড়লো। স্ত্রীলোকের কান্নার সামনে দাঁড়াতে তার বিষম অস্বস্তি লাগে।

বিধুশেখর আর আগেকার মতন উৎসব গৃহের সমস্ত স্থল ঘুরে ঘুরে পরিদর্শন করতে পারেন না। বহুমুত্র ব্যাধিটি আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, ইদানীং দ্বিতীয় চক্ষুটির দৃষ্টিও যেন কিছুটা স্নান লাগে। তিনি বাইরে একটি আরাম কেদারায় বসে সব রকম খবরাখবর নিচ্ছেন। তাঁর বাড়িতে ভৃত্যপরিচারক এবং আশ্রিত আত্মীয়স্বজনের অভাব নেই, তাদের প্রত্যেকের ওপরেই নির্দিষ্ট কাজের ভার দেওয়া আছে। তবু তিনি মাঝে মাঝেই নবীনকুমারকে ডেকে জানতে চান সব কিছু।

ব্ৰাহ্মণদের দান ও নিমন্ত্রিতদের ভোজনাদি শুরু হয়েছিল। দ্বিপ্রহর থেকে, শেষ হলো প্ৰায় রাত দশটার তোপ দাগার সময়। বিধুশেখরের জ্যেষ্ঠা কন্যা নারায়ণী এ বাড়ির কর্ত্রী, তিনি বলে রেখেছিলেন যে নবীনকুমারকে তিনি তাঁর সামনে বসিয়ে খাওয়াবেন। বৃহৎ একটি রূপোর থালায় ষোড়শ ব্যঞ্জন সাজিয়ে তিনি ডেকে পাঠালেন নবীনকুমারকে।

সারাদিন ধরে লোকজনের সঙ্গে কথা বলে ও অনেকবার ছাদে-নিচে ওঠা-নমা করে নবীনকুমার ক্লান্ত, তার আর আহারে রুচি নেই। নারায়ণী তবু জোর করে তাকে খেতে বসালেন। অনেক আত্মীয়া-অনাত্মীয়া নারী উপস্থিত সেখানে। বিম্ববতীও রয়েছেন। যারা নবীনকুমারের চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠা এবং অনেকদিন পর তাকে দেখছে, তারা সকলেই নবীনকুমারের হঠাৎ যৌবনে উপনীত হওয়ায় মুগ্ধ ও বিস্মিত। সবাই বলছে, ওমা, এই তো কদিন আগেও একেবারে ছেলেমানুষটি ছেল, এখুন দিব্যি বাবু হয়ে উঠেচে যে গো! আর কত কাজের ছেলে, সব দিকে নজর!

আর যারা বয়সে ছোট, তারাও বিস্ফারিত নেত্ৰে দেখছে নবীনকুমারকে, কেউ অন্য একজনের কানে কানে বলছে, ওমা দ্যাক, দ্যাক, গোঁপ আচে! গোঁপ আচে!

কিছুদিন আগে স্বগৃহে মঞ্চ বেঁধে নবীনকুমার নাটকের অভিনয় করেছিল এবং তাতে সে রাজকুমারীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিল বলে সে অনেকের কাছে বিশেষ দ্রষ্টব্য হয়ে উঠেছে। চিকের আড়ালে বসে অনেক নারী ও বালিকা দেখেছিল সেই নাটক। নবীনকুমারের অভিনয়-কলা নৈপুণ্যের সুখ্যাতিও বেরিয়েছিল সংবাদপত্রে। সেই সময় নবীনকুমারের সবে সূক্ষ্ম গোঁফের রেখা উঠেছিল মাত্র, কিন্তু রাজকুমারীর গোঁফ থাকা কোনোক্রমেই উচিত নয় বলে পরামাণিক দিয়ে চেছে ফেলা হয়েছিল ওষ্ঠ। তার ফলে এখন তার বেশ কালচে রঙের গোঁফের রেখা দেখা দিয়েছে।

সামান্য একটু খেয়েই নবীনকুমার উঠে পড়তে যাচ্ছিল, নারায়ণী বললেন, ওমা, উঠচিস কী! খা খা, আর একটু খা, একটু পায়েস মুখে দে অন্তত—

নবীনকুমার ততক্ষণে জলের গেলাসে হাত ড়ুবিয়েছে। বিম্ববতী বললেন, ঐ ওর স্বভাব, এই এইটুকুনি পাখির আহার যেন!

নবীনকুমার বললো, সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকে থেকে শিরদাঁড়া ব্যথা হয়ে গ্যাচে। এবার গিয়ে ঘুমুবো! একবার গোপালের সঙ্গে দেকা করে যাই।

এই কথা শুনে নারায়ণী তাকালেন সুহাসিনীর মুখের দিকে। ওরা কিছু বলবার আগেই বিম্ববতী বললেন, আজ আর গোপালের সঙ্গে দেখা করতে হবে না। যা শুয়ে পড়গো!

নবীনকুমার কৌতুকের সঙ্গে বললো, একবার দেকে আসি, নেড় মাতায় গোপালাটাকে কেমন দেকাচে!

নারায়ণী বললেন, গোপাল এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েচে!

—এই তো একটু আগে তার গলা পেলুম। বসে বসে টাকা গুণছেল। খুব টাকা চিনেচে ছেলেটা!

নারীরা চুপ করে রইলো।

যজ্ঞ সমাপ্ত হলে উপবীত গলায় দেবার পর প্রাণগোপালকে দ্বিতলের একটি কক্ষে পৃথক করে রাখা হয়েছে। এখন সে তিনদিন ব্ৰহ্মচারী হয়ে থাকবে, ব্ৰাহ্মণ ছাড়া অন্য কোন জাতের মানুষের মুখ দর্শন করবে না।

নবীনকুমার উঠোনে এসে দাঁড়াতেই এক ভৃত্য এলো তার হাতে জল ঢেলে দিতে। হাত মুখ প্রক্ষালন করে নবীনকুমার বললো, গোপালকে একবার দেকেই আমি চলে যাবো।

বিম্ববতী বললেন, থাক না, এখুন। আর যাসনি!

–কেন?

—এখুন ওর কাচে যেতে নেই!

ঠিক তখনই এ বাড়ির এক আশ্রিত যুবক এসে নারায়ণীকে জিজ্ঞেস করলো, ও বড়দিদি, গোপাল দুধ খেতে চাইচে। এখুন কি কিচু দেওয়া যায়?

নবীনকুমারের এবারে খটকা লাগলো। সে তাকালো সবার মুখের দিকে। তারপর ঝাঁঝালো গলায় জিজ্ঞেস করলো, কী ব্যাপার? তোমরা আমায় নিষেধ কচ্চো কেন? এই তো এ গেসলো গোপালের ঘরে। আমি একবার গেলে কী দোষ।

নারায়ণী বললেন, ও তো বামুন।

বিম্ববতী তার সঙ্গে যোগ করলেন, বামুন ছাড়া আর কারুর যেতে নেই।

নবীনকুমারের মুখখানা বিবৰ্ণ হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। সে এই প্রথার কথা বিন্দুবিসর্গ জানতো না। সে ব্ৰাহ্মণ নয় বলে প্ৰাণগোপালের সঙ্গে দেখা করতে পারবে না? আজি সারাদিন সে প্ৰাণগোপালের পৈতের জন্য খািটলো, আজ সকালেও প্রাণগোপাল তাকে চুপি চুপি জিজ্ঞেস করেছিল, ছোট্‌কুমামা, তুমি আমায় ইসপ্রিং-এর হাতি দিচ্চো তো, তোমায় বলেচিলুম-সেই প্ৰাণগোপালের মুখ দেখা তার এখন নিষেধ? এতদিন সবাই বলেছে, সে এ বাড়িরও ছেলেরই মতন, কিন্তু আসলে তা নয়, সে অব্রাহ্মণ, সে এদের চেয়ে ছোট!

আর একটিও কথা না বলে নবীনকুমার হন।হন করে এগিয়ে গেল দ্বারের দিকে। সমস্ত ব্ৰাহ্মণ জাতির প্রতি তার ক্ৰোধ উদ্দীপিত হলো। সে যখন আরও অনেক ছোট ছিল, একবার কৌতুক ও গোঁয়াতুমি করে টিকি কেটে নিয়েছিল এক ব্ৰাহ্মণের। সেই কথা মনে পড়ে গেল তার।

দ্বার দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় সে দেখলো, নামাবলী গায়ে জড়ানো এক বৃদ্ধ ব্ৰাহ্মণ দ্বারবানদের কাছে কী বলে যেন কাকুতি-মিনতি করছে। নবীনকুমার প্রাণগোপালের ঠাকুদাদা শিবলোচনকে চেনে না, তার বৃত্তান্তও জানে না। শিবলোচনকে সে মনে করলো কোনো ভিখারী।

তাকে দেখে নবীনকুমারের আরও রাগ জাগ্রত হলো। সে মনে মনে বললো, এই তো ব্ৰাহ্মণের দশা! অনাহূত হয়েও এখানে সুখাদ্যের লোভে ছোঁক ছোঁক করাচে। অথচ, এর মাতায় একটা বৃহৎ টিকি আর গলায় কালীঘাটের পাণ্ডাদের মতন একটা মোটা পৈতে আচে বলে এরও অধিকার রয়েচে প্ৰাণগোপালের মুখ দেকার!

সে দ্বারবানদের এক ধমক দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, এই বুড়োটা এখেনে কী চায়? বলে দিসনি যে বামুনবিদায় দুপুরে হয়ে গ্যাচে!

শিবলোচন নবীনকুমারের দিকে এগিয়ে এসে বলতে গেল, বাবা আমি শুধু একটিবার—

নবীনকুমার সে কথায় কৰ্ণপাত না করে দ্বারবানদেরই আবার হুকুম দিল। লুচি মণ্ড দু-চারখানা এনে একে দিয়ে বিদেয় কর!

তারপর সে দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগলো নিজের গৃহের উদ্দেশ্যে।

 

এদিকে সুহাসিনী কেঁদে ফেললো আবার।

নারায়ণীকে জড়িয়ে ধরে বললো, দিদি, কী অলুক্ষণে ব্যাপার হলো, ছোট্‌কু রাগ করে চলে গ্যালো।

নারায়ণী বললেন, আমি কী করি বল! ছোট্‌কু হঠাৎ না জেনে এ রকম বললো—

বিম্ববতী সুহাসিনীর পিঠে হাত বুলিয়ে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, তুই এমন উতলা হচ্ছিস কেন মা? অলক্ষণ কেন হবে? ছোট্‌কু ওরকম অবুঝের মতন হঠাৎ ক্ষেপে যায়। আবার কাল দেকিস, একেবারে ঠাণ্ডা জল হয়ে গ্যাচে।

সুহাসিনী মুখ ফিরিয়ে বললো, ছোটমা, ছোট্‌কু একবার দেখতে গেলেই বা কী দোষ হতো? বিম্ববতী বললেন, ওমা, তা আবার হয় নাকি! শাস্তরের নিয়ম-তিনদিন পরেই তো ও আবার গোপালকে দেকতে পাবে।

—শাস্তরের এমন নিয়ম কেন?

–সে কত কী আমরা জানি?

—ছোট্‌কু আমার ছোট ভাই, আমাদের আর কোনো ভাই নেই, ছোট্‌কুই আমাদের একমাত্র ভাই, সে আবার বামুন-অবামুন কি, ছোট মা?

–তা বললে কী চলে?

নারায়ণী বললেন, আর ও নিয়ে মাতা ঘামাসনি। ছোট্‌কুকে পরে আমি ডেকে সব বুঝিয়ে বলবোখন। এখুন, চল, ভাঁড়ার বন্ধ কত্তে হবে, ছিষ্টির কাজ বাকি রয়েচে!

এই সামান্য ঘটনাতেও কিন্তু নবীনকুমারের মনে খুব তীব্র প্রতিক্রিয়া হলো। পরের দিন সে আর ও বাড়িতে গোলই না।

বিম্ববতী তাকে বোঝাতে এলে সে বললো, আমি আর কোনোদিন জ্যাঠাবাবুদের বাড়ি যাবো না। তুমি আমায় অনুরোধ করো না, মা। যে-বাড়িতে গেলে আমায় পদে পদে ভেবে চলতে হবে যে কোথায় আমার যাওয়া উচিত, আর কোথায় আমার যাওয়া উচিত নয়, সেখানে আমার যাবার দরকারটা কী! এখুন মনে পড়েচে, ছেলেবেলা খেলতে খেলতে একদিন আমি ওঁদের ঠাকুরঘরে ঢুকে পড়িচিলুম, তখুন জ্যাঠাইমা আমায় বকুনি দিয়েচিলেন!

—তা বলে কি তুই জাত-ধম্মো মানবি না নাকি ছোট্‌কু? বামুনরা হলো সবচে। ওপরে, ওনারা যা পারেন, সব কি আমরা পারি?

—তোমার সঙ্গে আমি তাক্কো করবো না, মা! তুমি শুধু আমায় ও বাড়িতে আর যেতে বলো না।

—অদ্ভুত কতা বলিস তুই ছোট্‌কু। ওরা আমাদের কত আপন। গোপালের পৈতে হয়ে গেল, ঐ পৈতের সময়েই যা একটু-অন্য সময় তুই ও বাড়ির যেখেনে খুশী সেখেনে যেতে পারিস!

-ঠাকুর ঘরে ছাড়া!

যথাসময়ে এ কথা বিধুশেখরেরও কানে উঠলো। তাঁর চলৎ শক্তি কমে গেছে বটে। তবু সেকালের রাজাদের মতন তিনি চক্ষু দিয়ে শোনেন এবং কান দিয়ে দেখেন।।

সংবাদটি শুনে বিধুশেখর দোদুল্যমান হলেন। লোকাচার অনুযায়ী সদ্য উপবীতধারী ব্ৰহ্মচারীর মুখ দর্শন করার অধিকার নেই নবীনকুমারের। সেই হিসেবে তাঁর কন্যারা নবীনকুমারকে বাধা দিয়ে ঠিক কাজই করেছে। কিন্তু নবীনকুমার তো আসলে ব্ৰাহ্মণই। মহাভারতে সূতপুত্র নামে পরিচিত কৰ্ণ যেমন ऊांजळ श्फडिহা।

বিধুশেখর কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে রইলেন। ছোট্‌কু বলেছে, সে আর কখনো এ বাড়িতে আসবে না। বয়েস কম, মস্তিষ্ক উষ্ণ, হয়তো এই মনোভাব তার বেশী দিন থাকবে না। ছোট্‌কু এ বাড়িতে আর কখনো আসবে না, এ কখনো হয়? তাঁর সব কিছুই তো ছোট্‌কুর। আজ যদি তিনি হঠাৎ মারা যান, তা হলে ছোট্‌কুই হবে প্ৰাণগোপালের অভিভাবক। এক সময় ছোট্‌কুকে সব সত্য কথা বলতে হবে, অন্তত মৃত্যুর আগে-অথচ বিম্ববতীর কাছে তিনি প্ৰতিজ্ঞাবদ্ধ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *