০৯. সন্তুর মাথায় একটা ব্যাণ্ডেজ বাঁধা

সন্তুর মাথায় একটা ব্যাণ্ডেজ বাঁধা। তাকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। রাত তিনটের সময়। আল মামুনের লোকেরা তাকে যখন গাড়ির মধ্যে ছুঁড়ে দিয়েছিল, তখন একটা লোহার রডে লেগে তার মাথা ফেটে যায়। মাথার চুল একেবারে ভিজে গিয়েছিল রক্তে। আল মামুনের লোকেরা তা দেখেও তার কোনও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেনি। ডাগো আবদাল্লা তাকে এখানে ফিরিয়ে আনবার পর হানি আলকাদি নিজে তার ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে, ওষুধ লাগিয়ে, ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দিয়েছে।

সন্তু কিন্তু বেশ চাঙ্গাই আছে। ঐ আঘাতে সে একটুও কাবু হয়নি। কিংবা হলেও বাইরে তা প্রকাশ করছে না। বরং তার একটু আনন্দই হচ্ছে। দিল্লিতে পাঁজরায় গুলি খেয়ে কাকাবাবু কয়েকদিন ব্যাণ্ডেজ বেঁধে ছিলেন, এখন সেও অনেকটা কাকাবাবুর সমান-সমান হল।

ভোরের আলো ফোঁটার আগেই কাকাবাবু বেরিয়ে পড়েছেন সন্তুকে নিয়ে। সঙ্গে ডাগো আবদাল্লা। সে-ই চালাচ্ছে গাড়ি। সন্তু সুস্থ আছে দেখে কাকাবাবু আর দেরি করতে চাননি। কাজটা তিনি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চুকিয়ে ফেলতে চান।

গাড়িতে যেতে-যেতে কাকাবাবু সন্তুকে জিজ্ঞেস করলেন, সন্তু, তুই জানিস পিরামিডের মধ্যে কী করে ঢুকতে হয়? তোর কি ধারণা যে, পিরামিডের গায়ে একটা দরজা থাকে আর সেই দরজা খুলে ভেতরে ঢোকা যায়?

এই ব্যাপারটা সন্তুর জানা নেই। দরজা না থাকলে ভেতরে ঢোকা যাবে কী করে?

কাকাবাবু আবার জিজ্ঞেস করলেন, তোর কি ধারণা পিরামিডের ভেতরটা ফাঁপা? ভেতরে সব ঘর-টির আছে?

সন্তু আরও অবাক হয়ে গেল! ফাঁকা না হলে ভেতরে ঘর-টর থাকবে কী করে? অনেক ছবিতেই সে দেখেছে যে, পিরামিডের মধ্যে মন্ত-মস্ত হলঘরের মতন, তাতে অনেক জিনিসপত্র, মূর্তি, পাথরের কফিন ইত্যাদি থাকে। তা হলে কাকাবাবু এরকম বলছেন কেন?

কাকাবাবু দুদিকে মাথা নেড়ে বললেন, না রে, পিরামিডের গায়ে দরজা নেই। ভেতরটা ফাঁপাও নয়, ভেতরে ঘর-টর কিছু নেই। পিরামিডগুলো হচ্ছে সলিড পাথরের ত্রিভুজ।

সন্তু জিজ্ঞেস করল, তা হলে রাজা-রানিদের কবর কোথায় থাকত?

সেগুলো বেশির ভাগই মাটির নীচে। শুধু রাজা-রানিদের সমাধি নয়, তাঁদের ব্যবহার করা অনেক জিনিসপত্রও সেখানে থাকত। এমনকী খাট-বিছানা পর্যন্ত। অধিকাংশই সোনার। ক্লিয়োপেট্রার শোবার খাট, চুটিজুতো পর্যন্ত সোনার তৈরি ছিল। এই সব মূল্যবান জিনিসপত্র যাতে চোরে চুরি করে নিয়ে না যেতে পারে, তাই ঐ সব সমাধিস্থানের ঢোকার পথটাও খুব গোপন রাখা হত। পিরামিডের গা হাতড়ে কেউ সারাজীবন খুঁজলেও ভেতরে ঢোকার পথ পাবে না।

তাহলে সাহেবরা পিরামিডের ভেতরে ঢুকল কী করে?

পিরামিডের ভেতরে না, পিরামিডের নীচে। অনেক দূরে একটা সুড়ঙ্গের মুখ থাকে। সেখান দিয়ে যেতে হয়। সাহেবরা এক-এক করে সেই সব সুড়ঙ্গের পথ খুঁজে বার করেছে। খুব কষ্ট করে ঢুকতে হয়। স্যার ফ্রিণ্ডার্স পেট্রি নামে একজন ইংরেজ এই সব আবিষ্কারের জন্য বিখ্যাত। এক-একটা পিরামিডের তলায় গিয়ে তিনি কত যে ধনরত্ন পেয়েছেন, তার ঠিক নেই। তবে স্যার ফ্রিণ্ডার্সও প্রথম দুএকটা সমাধিস্থানের ভেতরে ঢুকে দেখেছিলেন, তাঁরও আগে চোরেরা অন্য দিক থেকে সুড়ঙ্গ কেটে এসে ভেতরে ঢুকেছিল। আমার ধারণা, মুফতি মহম্মদ এই স্যার ফ্রিণ্ডার্সের দলে গাইডের কাজ করতেন। উনি অনেকদিন সাহেবদের কাছে প্ৰথমে মালবাহক কুলি, তারপর গাইডের কাজ করেছিলেন, তা তো শুনেছিস মান্টোর কাছে।

হ্যাঁ। তারপর গাইডের কাজ ছেড়ে বিপ্লবী হলেন।

সাহেবরা পিরামিডের সুড়ঙ্গ দিয়ে ভিতরে গিয়ে সমস্ত সোনার জিনিস আর দামি-দামি জিনিস বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে দেখে এ-দেশের অনেক লোক চটে গিয়েছিল। মুফতি মহম্মদ তো নিজের চোখেই দেখেছেন, সাহেবরা মিশরের সম্পদ লুট করছে। তাই তিনি বিপ্লবী দল গঠন করেছিলেন, এই সব আটকাবার জন্য। হয়তো তিনি নিজেও কোনও-কোনও সমাধিস্থান থেকে সোনাদানা তুলে নিয়ে গিয়ে সেসব তাঁর দলের কাজে লাগিয়েছেন।

উনি ছবি একে-একে সেই সব সোনা কোথায় লুকোনো আছে তাই বুঝিয়ে গেছেন, তাই না?

না রে, আমি মিথ্যে কথা বলি না। আমি যে সবাইকে বলেছি যে, মুফতি মহম্মদের শেষ ইচ্ছাপত্রে টাকা-পয়সা, সোনাদানার কথা কিছু নেই, তা সত্যিই। উনি সেসব কিছু জানিয়ে যাননি।

ডাগো আবদাল্লা মুখ ফিরিয়ে বলল, গিজার বড় পিরামিড তো এসে গেছে, এফেন্দি। এবার কোন দিকে যাব?

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, হানি আলকাদির গাড়ি কোথায়?

ডাগো বলল, ওদের গাড়ি একটু আগেই পৌঁছে গেছে। সামনে থেমে আছে।

ওদের ওখানেই থেমে থাকতে বলে। তুমি ডান দিকে চলো।

আর কিছুক্ষণ বাদে আর-একটি মাঝারি আকারের পিরামিডের কাছে এসে কাকাবাবুর নির্দেশে গাড়ি থামল।

গাড়ি থেকে নেমে কাকাবাবু চারদিকে তাকালেন। ধারে কাছে কোনও লোকজন দেখা যাচ্ছে না। তবে বালির ওপর একটা গাড়ির চাকার দাগ রয়েছে। হয়তো আগের দিন কোনও টুরিস্টের গাড়ি এসেছিল।

কাকাবাবু বললেন, ডাগো, আমি এই পিরামিডের নীচে যাব।

ডাগো কাকাবাবুর দিকে একদৃষ্টি চেয়ে রইল। করুণ হয়ে এল। তার মুখখানা। আস্তে আস্তে বলল, আপনি যাবেন, এফেন্দি?

কাকাবাবু হাসলেন। তারপর সন্তুর দিকে ফিরে বললেন, কেন ও এই কথা বলছে জানিস? আগেরবার যখন আমি ইজিপ্টে এসেছিলাম, তখন ডাগো সব। সময় আমার সঙ্গে-সঙ্গে থাকত। ওকে নিয়ে আমি অনেক সমাধিতে নেমেছি। তখন আমার দুটো পাই ভাল ছিল। ডাগো ভাবছে, এখন এই খোঁড়া পা নিয়ে আমি আর নীচে নামতে পারব না!

কাকাবাবু ডাগোকে বললেন, তুমি সঙ্গে থাকলে আমি নিশ্চয়ই পারব। আগেরবার আমরা এর মধ্যে একসঙ্গে নেমেছিলাম মনে নেই?

ডাগো বলল, আপনার কষ্ট হবে, এফেন্দি!

তা হোক, তুমি কাজ শুরু করে দাও!

গাড়ি থেকে কয়েকটা জিনিসপত্র নামানো হল। তিনটে শক্তিশালী টর্চ ওঁজে নেওয়া হল তিনজনের কোমরে। একটা ছোট ঝোলাব্যাগ কাকাবাবু চাপিয়ে দিলেন সন্তুর কাঁধে।

পিরামিড থেকে প্রায় পাঁচশো গজ দূরে ডাগো শুয়ে পড়ল এক জায়গায়। হাত দিয়ে বালি সরাতে লাগল। তারপর বেরিয়ে পড়ল একটা কাঠের পাটাতন। সেটা সরিয়ে ফেলতেই দেখা গেল একটা অন্ধকার গর্ত নেমে গেছে। যেন পাতালে।

কাকাবাবু বললেন, কাঠের পাটাতনের বদলে এখানে আগে পাথর চাপা দেওয়া থাকত। তার ওপর অনেকখানি বালি ছড়িয়ে দিলে আর কারুর বুঝবার উপায় ছিল না। খুব সাবধানে নামবি কিন্তু সন্তু। একটু পা পিছলে গেলেই অনেক নীচে গড়িয়ে পড়ে যাবি।

ঠিক হল, ডাগো যাবে সবচেয়ে আগে, মাঝখানে কাকাবাবু, সবশেষে সন্তু। ডাগো একটা মোটা দড়ি আলগা করে জড়িয়ে দিল তিনজনের কোমরে। এখানে ক্রাচ নিয়ে গিয়ে কোনও লাভ নেই বলে কাকাবাবু সে-দুটো রেখে গেলেন বাইরে।

সুড়ঙ্গটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে নীচের দিকে। দুদিকের দেওয়ালে দুহাতের ভর দিয়ে বসে-বসে নামতে হয়। হাতের বেশ জোর লাগে।

সন্তু ভাবল, নীচে নামবার কী অদ্ভুত ব্যবস্থা। অবশ্য হাজার হাজার বছর আগে এই ব্যবস্থাটাই বোধহয় সবচেয়ে সুবিধেজনক ছিল।

কাকাবাবুর যে দারুণ কষ্ট হচ্ছে তা বুঝতে পারছে সন্তু। ওঁর ভাঙা পাটার ওপরেও জোর পড়ছে। কিনা। মাঝে-মাঝে কাকাবাবু মুখ ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করছেন, তুই ঠিক আছিস তো, সন্তু?

কাকাবাবুর মুখ ভর্তি চন্দনের ফোঁটার মতন ঘাম।

ওপরের আলো খানিকটা মাত্র ভেতরে ঢোকে, তারপরেই ঘুরঘুটি অন্ধকার। ডাগো কী কায়দায় যেন একটা টর্চ জেলে বগলে চেপে আছে। আর মাঝে-মাঝে আরবি ভাষায় কী যেন বলে উঠছে। হয়তো কোনও প্রার্থনামন্ত্ৰ!

মিনিট দশেক পরে ওরা পৌঁছে গেল সমতল জায়গায়। ঘড়িতে দশ মিনিট কাটলেও মনে হয় যেন কয়েক ঘণ্টা লেগে গেছে।

তিনটে টর্চের আলোয় দেখা গেল সেখানে একটি চৌকো ছোট ঘর। ঘরটা একেবারে খালি। দেওয়ালেও কোনও ছবি নেই। ঘরের একটা দেওয়ালে, নীচের দিকে একটা চৌকো গর্ত। তার মধ্য দিয়ে একটা সরু পথ। সেই পথে খানিকটা যাবার পর আর-একটি দেওয়াল, সেই দেওয়ালের গায়ে একটি লোহার দরজা। দেখলেই বোঝা যায়, সেই দরজাটা নতুন বসানো হয়েছে, আগে অন্যকিছু ছিল।

দরজাটা ঠেলা দিতেই খুলে গেল। তারপরই একটি বিশাল হলঘর। এখানকার দেওয়ালে বড়-বড় ছবি আঁকা। কিন্তু জিনিসপত্তর কিছু নেই।

কাকাবাবু বললেন, সব নিয়ে গেছে। আগেরবার এসেও অনেক কিছু দেখেছিলাম। তাই না, ডাগো?

ডাগো বলল, হ্যাঁ, এফেন্দি। কিছুই থাকে না। চোরেরা সব নিয়ে নেয় বলে গভর্নমেন্ট এখন নিজেই তুলে নিয়ে গিয়ে মিউজিয়ামে রাখে।

কাকাবাবু বললেন, বেশি সময় নষ্ট করা যাবে না। ডাগো, সেই ল্যাবিরিন্থটা কোথায়?

ডাগো বিস্মিতভাবে বলল, সেটাতেও যাবেন? আপনার আরও কষ্ট হবে। এক কাজ করি, এফেন্দি। আমি আপনাকে পিঠে করে নিয়ে যেতে পারি।

তার দরকার হবে না। তুমি পথটা খুঁজে বার করে। আমার জায়গাটা ঠিক মনে পড়ছে না।

হলঘরটা পার হয়ে এক জায়গায় এসে ডাগো একটা চৌকো পাথরের স্ল্যাব সরাল। তার মতন শক্তিশালী লোক ছাড়া অতবড় পাথর সরাতে যে-সে পারবে না। তারপর একটা ছোট গোল জায়গা। সেখানে মেঝেতে শুয়ে পড়ে সে আবার একটা পাথরের পাটাতন সরিয়ে ফেলল। এখানে আবার আর-একটা সুড়ঙ্গ।

কাকাবাবু বললেন, এইখানে আমাদের যেতে হবে, সন্তু।

তারপর তিনি ডাগোকে বললেন, আর তোমাকে যেতে হবে না। তুমি ফিরে যাও!

দারুণ চমকে উঠে ডাগো বলল, কী বলছেন, এফেন্দি? আমি যাব না? আমাকে বাদ দিয়ে আপনি এই বাচ্চাকে নিয়ে যাবেন কী করে?

ঠিক পেরে যাব। তুমি বড় হলটায় অপেক্ষা করে, কিংবা ওপরেও উঠে যেতে পারো। আমরা ফেরার সময় তোমাকে ডাকব?

না, না, না, তা হয় না! আপনাকে এখানে ফেলে রেখে গেলে হানি আলকাদি আমায় আস্ত রাখবে না?

হানি আলকাদির সঙ্গে আমার এই রকমই কথা আছে। আমি যা দেখতে পাচ্ছি, তা আমি দেখার আগে, অন্য কেউ জানতে পারবে না। মুফতি মহম্মদের এটা আদেশ। এই আদেশ তো সকলকে মানতেই হবে। তোমাকে অনেক ধন্যবাদ, ডাগো। তুমি আমাদের যা উপকার করলে, তার কোনও তুলনা নেই। তোমাকে ছাড়া আর কারুকে বিশ্বাস করে আমি এখানে আসতে পারতুম না।

ডাগো মুখ গোঁজ করে দাঁড়িয়ে রইল।

সন্তুর কাঁধে হাত দিয়ে কাকাবাবু ঢুকে পড়লেন সেই ল্যাবিরিন্থের মধ্যে। কাকাবাবু বললেন, তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই, সন্তু। ভেতরটা খুব আঁকাবাঁকা। একটু অন্যমনস্ক হলেই মুখে গুতো লাগবে। আগেরবার আমার নাক থেতলে গিয়েছিল। এখন কি বুঝতে পারছিস যে, আমাদের মাথার ওপরে রয়েছে একটা বিরাট পিরামিড?

সন্তুর বুক টিপটপ করছে। মাটির কত নীচে, জমাট অন্ধকার ভরা এক সুড়ঙ্গ। আর কি ওপরে ওঠা যাবে? যদি হঠাৎ একটা পাথর ভেঙে ফেরার পথ বন্ধ হয়ে যায়? ডাগে সঙ্গে থাকায় তবু খানিকটা ভরসা ছিল।

সন্তুর কাঁধ ধরে কাকাবাবুকে লাফিয়ে-লাফিয়ে আসতে হচ্ছে। সন্তু টর্চ জ্বেলে এগোচ্ছে খুব সাবধানে। একটুখানি অন্তর-অন্তরই সুড়ঙ্গটা বাঁক

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ভয় পাচ্ছিস নাকি রে, সন্তু?

সন্তু শুকনো গলায় বলল, না।

আমরা কোথায় যাচ্ছি, তা বুঝতে পারছিস?

না।

এক-একটা সমাধিস্থান খুব গোপন রাখা হত। কেন যে এত গোপনীয়তা তা জানা যায় না। হয়তো দামি জিনিসপত্র অনেক বেশি রাখা হত। সেখানে। এটা সেইরকম একটা গোপন সমাধিতে যাবার পথ; কত কষ্ট করে এরকম সুড়ঙ্গ বানিয়েছে। হয়তো এই সমাধিতে যাবার আরও কোনও রাস্তা আছে, যা আমরা এখনও জানি না। রাজা-রানিরা কি এত কষ্ট করে যেতেন?

আমরা কোন সমাধিতে যাচ্ছি?

রানি হেটেফেরিসের গল্প তোকে বলেছিলুম, মনে আছে?

হ্যাঁ, সেই যে কফিনের মধ্যে যাঁর মমি খুঁজে পাওয়া যায়নি?

হ্যাঁ, হ্যাঁ। লোকের ধারণা, এই জায়গাটা ভুতুড়ে। সেই মমিটাকে মাঝে-মাঝে দেখতে পাওয়া গেছে, আবার মাঝে-মাঝে সেটা অদৃশ্য হয়ে গেছে। তোর ভূতের ভয় নেই তো?

অ্যাঁ? না!

মুফতি মহম্মদ নামে একজন বৃদ্ধ কী সব ছবি এঁকেছিলেন, তা দেখে আমাদের কি এত কষ্ট করে এত দূরে আসার কোনও দরকার ছিল, বল?

সন্তু এ-কথার কী উত্তর দেবে! সে কিছুই বলল না।

কাকাবাবু আবার বললেন, আমি এলুম কেন জানিস? ঐ যে মুফতি মহম্মদ নির্দেশ দিলেন, তুমি আগে নিজে যাচাই করে দেখো, সেইজন্যই আমার কৌতূহল হল। এটা যেন বৃদ্ধের এক চ্যালেঞ্জ।

টর্চের আলো এবারে একটা ফাঁকা জায়গায় পড়ল। সুড়ঙ্গটা শেষ হয়ে গেছে! সুড়ঙ্গটা খুব বেশি লম্বা নয়।

ফাঁকা জায়গাটিতে কয়েক ধাপ সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরের দিকে। সেই সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসার পর একটি বেশ বড় চৌকো ঘর।

কাকাবাবু বললেন, এই হল রানি হেটেফেরিসের সমাধিস্থান। এক সময় নাকি এখানে অতুল ঐশ্বৰ্য ছিল। একজন রানির যত জিনিস ব্যবহারে লাগে, সেই সব কিছু। ওরা বিশ্বাস করত কি না যে, রাজা-রানিরা আবার হঠাৎ একদিন বেঁচে উঠতে পারে। তখন সব কিছু লাগবে তো!

ঘরটার ঠিক মাঝখানে একটি কারুকার্যকরা পাথরের কফিন। আরও তিন-চারটে কফিন ছড়ানো রয়েছে এদিক-ওদিক।

বড় কফিনটা দেখিয়ে কাকাবাবু বললেন, এই হচ্ছে রানি হেটেফেরিসের সারকোফেগাস। তার আগে দেখা যাক, এর মধ্যে রানির মমি আছে কি না! যদি থাকে, তা হলে দারুণ একটা আবিষ্কার হবে।

সারকোফেগাসের ওপরে রানির ছবি আঁকা। কাকাবাবুর সঙ্গে ধরাধরি করে সন্তু ঢাকনাটা সরিয়ে ফেলল।

ভেতরটা ফাঁকা।

কাকাবাবু মুচকি হেসে বললেন, জানতুম।

সন্তু জিজ্ঞেস করল, অন্য কফিনগুলো খুলে দেখব?

কোনও লাভ নেই। পৃথিবীর নানা দেশের মিউজিয়ামে মমিগুলো ভাল দামে বিক্রি হয়। চুরি যাবার ভয়ে সব মমি সেইজন্য ওপরে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

সন্তু টর্চের আলো ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে দেখতে লাগল দেওয়ালগুলো। প্রত্যেক দেওয়ালেই অসংখ্য ছবি। এইগুলোই হিয়েরোগ্লিফিকস। বোধহয় রানির জীবনকাহিনী লেখা আছে। কত শিল্পী, কত পরিশ্রম করে ঐ সব ছোট-ছেট ছবি এঁকেছে। কাকাবাবুও ঘুরে-ঘুরে দেওয়ালগুলো পরীক্ষা করতে-করতে এক জায়গায়। থমকে দাঁড়ালেন।

এইবার সন্তু, মুফতি মহম্মদের শেষ ইচ্ছার কথা তোকে জানাতে হবে। কারণ, তোর সাহায্য ছাড়া এর পর আমার আর কিছু করার সাধ্য নেই। তুই দেখা মানেই আমার দেখা।

সন্তু ছিল উল্টো দিকের দেওয়ালের কাছে। সে তাড়াতাড়ি এদিকে চলে এল।

কাকাবাবু, আমি অনেকটা আন্দাজ করেছি। এই ঘরে ঢুকেই বুঝতে পেরে গেছি।

তুই বুঝতে পেরে গেছিস? কী বুঝেছিস শুনি?

রানি হেটেফেরিসের মমি এখানেই কোথাও লুকোনো আছে। আর সেই লুকোনো জায়গাতেই মুফতি মহম্মদ সোনা আর টাকা পয়সা লুকিয়ে রেখেছেন।

কাকাবাবু ভুরু কুঁচকে খানিকক্ষণ চেয়ে রইলেন সন্তুর দিকে। তারপর হেসে ফেলে বললেন, অনেকটা ঠিকই ধরেছিস তো। তবে টাকা পয়সার কথা নেই এর মধ্যে। মুফতি মহম্মদের শেষ ইচ্ছের কথা জানলে অনেকে ভাববে পাগলামি। উনি ছবি এঁকে যা জানাতে চাইছিলেন, তা হল এই; উনি খুব সংক্ষেপে লিখেছিলেন, আমি তোকে বুঝিয়ে বলছি। উনি এক সময় সাহেবদের কাছে গাইডের কাজ করতেন। সেই সময়েই আল বুখারি নামে আর-একজন গাইডের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব হয়। আল বুখারি অনেকগুলো পিরামিডের নীচে এবং গোপন সমাধিস্থানে ঢোকার রাস্তাও আবিষ্কার করেছিল। কিন্তু সেইসব আবিষ্কারের কৃতিত্ব সাহেবরাই নিয়ে নিত। একজন সাহেবকে জব্দ করার জন্যই আল বুখারি মুফতি মহম্মদের সাহায্য নিয়ে রানি হেটেফেরিসের মমি এক জায়গায় লুকিয়ে রাখে। মজা করবার জন্য। ওরা সেই মমিটাকে মাঝে-মাঝে বার করে এনে সারকোফেগাসের মধ্যে রেখে দিত, মাঝে-মাঝে আবার সরিয়ে ফেলত। সেই থেকে ভূতের গল্প রটে যায়। এ রকম ব্যাপার মাত্র দুতিনবারই হয়েছিল। কিন্তু লোকে বিশ্বাস করত যে, রানির মমি প্রত্যেক বছর একবার করে ফিরে আসে। যাই হোক, আল বুখারি একটা দুর্ঘটনায় মারা যায়, মুফতি মহম্মদ গাইডের কাজ ছেড়ে বিপ্লবীদের দলে যোগ দেন। সেই থেকে মমিটা লুকোনো অবস্থাতেই আছে। মৃত্যুর আগে মুফতি মহম্মদ জানিয়ে দিতে চান যে, সেটা কোথায় আছে। কিন্তু এর মধ্যে যদি অন্য কেউ সেই গোপন জায়গাটা জেনে ফেলে মমিটা সরিয়ে ফেলে থাকে, তা হলে মুফতি মহম্মদ মিথ্যেবাদী হয়ে যাবেন। সেইজন্যই তিনি আগে আমাকে যাচাই করে নিতে বলেছেন।

সেই লুকোনো জায়গাটা কোথায়?

সেটা তোকে খুঁজে বার করতে হবে। এই দ্যাখ, এই দেওয়ালের গায়ে মাঝে-মাঝে খাঁজ কাটা আছে। এই খাঁজে খাঁজে পা দিয়ে তুই ওপরে উঠতে পারবি? তোর কাঁধের ব্যাগটাতে দ্যাখা শক্ত নাইলনের দড়ি, লোহার হুক এই সব আমি এনেছি, যদি কাজে লাগে ভেবে।

সন্তু ব্যাগ খুলে জিনিসগুলো বার করল। তারপর বলল, আমার ওসব লাগবে না, আমি এমনিই উঠতে পারব।

খাঁজে খাঁজে পা দিয়ে সন্তু দেওয়াল বেয়ে উঠে গেল ওপরে।

কাকাবাবু টর্চের আলো ফেলে বললেন, ঐ যে রানির ছবি দেখছিস, এরপর ডান দিকে পরপর নটা ছবি গুনে যা! গুনেছিস? এইবারে দশ নম্বর ছবিটার ওপর জোরে ধাক্কা দে।

সন্তু ধাক্কা দিল, কিন্তু কিছুই হল না।

কাকাবাবু বললেন, আরও জোরে ধাক্কা দিতে হবে। আল বুখারি। আর মুফতি মহম্মদ দুজনেই গোটাগোটা জোয়ান ছিলেন নিশ্চয়ই। তা ছাড়া বহু বছর জায়গাটা খোলা হয়নি।

সন্তু প্ৰাণপণ শক্তিতে দুম-দুম করে ধাক্কা দিতে লাগল। তাও কিছুই হল না!

কাকাবাবু একটুক্ষণ চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, দ্যাখ তো, ঐ এক থেকে দশ নম্বর ছবির মতন। ছবি তোর মাথার কাছে ছাদেও আঁকা আছে কি না!

হ্যাঁ, আছে।

ঐখানে ধাক্কা দে।

এবারে ছাদের সেই জায়গাটায় ধাক্কা দিতেই সন্তুর হাত অনেকখানি ভেতরে ঢুকে গেল। সেখানকার একটা পাথর ভেতরে সরে গেছে। সেখানে আরও ধাক্কা দিতে দিতে একজন মানুষ গলে যাবার মতন জায়গা হয়ে গেল।

টর্চ জ্বালতে পারবি? দ্যাখ তো, ওখানে কী আছে!

মেজেনিন ফ্লোরের মতন জায়গাটা। ভেতরে একটা কফিন আছে।

ঐটাই খুলে দেখতে হবে। ভেতরে ঢুকতে পারবি তো? খুব সাবধানে।

সন্তু মাথা গলাতেই নীচে বেশ জোরে একটা শব্দ হল। সন্তু চমকে গিয়ে আবার মাথাটা বার করে আনল। নীচের দিকে তাকিয়ে যা দেখল তাতে তার রক্ত হিম হয়ে গেল একেবারে।

যেখানে শব্দটা হয়েছিল, কাকাবাবু টর্চের আলো ঘুরিয়েছেন সেই দিকে। সেখানে একটা কফিনের ঢাকনা খুলে গেছে। তার মধ্য থেকে আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াচ্ছে একটা মূর্তি। একটা মমি যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

সেই মূর্তি দেখে টর্চসুদ্ধ কাকাবাবুর হাতটাও কেঁপে গেল একবার। তারপর তিনি অস্ফুট গলায় বললেন, আল মামুন r

সত্ত্বও এবার চিনতে পারল। কিন্তু আল মামুন। এখানে আগে থেকেই এল কী করে? কাকাবাবু তো কারুকেই বলেননি যে, তিনি কোথায় যাবেন।

আল মামুনের গায়ে একটা সাদা কাপড় জড়ানো। সেটা খুলে ফেলে সে একটা লম্বা ছুরি বার করল। তারপর হিংস্র গলায় বলল, বিদেশি কুকুর। নিমকহারাম! আমি কলকাতায় গিয়ে তোর সঙ্গে দেখা করেছি। আমি দিল্লিতে মুফতি মহম্মদের সঙ্গে তোদের দেখা করিয়ে দিয়েছি। আর তুই ঐ কুত্তা আলকাদির দলে যোগ দিয়েছিস?

কাকাবাবু অনেকটা আপন মনে বললেন, একটাই ভুল করেছি। আমি। মিউজিয়ামের কিউরেটর মান্টোর কাছে রানি হেটেফেরিসের কথা বলে ফেলেছিলাম। সে বুঝি তোমার দলে, আল মামুন? কিংবা জোর করে তার কাছ থেকে কথা আদায় কলে ফেলেছ! তুমি এত কষ্ট করে এখানে এলে কেন আল মামুন! মুফতি মহম্মদের যদি লুকোনো টাকা পয়সা কিছু থাকেই, তুমি তো তার অর্ধেক ভাগ পাবে।

অর্ধেক! ঐ শয়তানটাকে আমি অর্ধেক দেব? আমি মুফতি মহম্মদের উত্তরাধিকারী। আমি তার সম্পদের সন্ধান পেয়ে গেছি। এখন তোমাকে আর ঐ খোকাটাকে আমি এখানেই শেষ করে দিয়ে যাব। এই সম্পদের কথা পৃথিবীর আর কেউ জানবে না।

তুমি আমাদের খুন করবে? তুমি ধৰ্মভীরু লোক, এরকম একটা অন্যায় করলে তোমার বিবেকে লাগবে না?

কেউ দেখবে না, কেউ জানবে না, তাতে আবার বিবেকের কী আসে যায়?

আল মামুন, তোমার মতন খুনিদের আমি কিন্তু খুব কঠিন শাস্তি দিই!

আল মামুন ছুরি তুলে এগিয়ে আসতেই কাকাবাবু মাটি থেকে নাইলনের দড়িটা তুলে নিলেন। সন্তু ভাবল, ওপর থেকে আল মামুনের মাথার ওপর লাফিয়ে পড়বে কি না!

কাকাবাবু দড়িটা নিয়ে শপিং করে চাবুকের মতন শব্দ করে বললেন, আগেকার দিনে তলোয়ার আর চাবুকের লড়াইয়ের কথা শোনোনি?

বলেই তিনি চাবুকের মতন সেই দড়ির এক ঘা কষলেন আল মামুনের মুখে।

লড়াইটা শেষ হতে এক মিনিটও লাগল না। লম্বা দড়ির সঙ্গে ছুরি দিয়ে আল মামুন লড়তে পারলই না মোটে। কাকাবাবু তাকে অনবরত মারতে লাগলেন। আল মামুনের হাত থেকে ছুরি খসে পড়ে গেল। যন্ত্রণায় চিৎকার করতে লাগল সে। কাকাবাবু, দড়ির ফাঁস তার গলায় লাগিয়ে হ্যাঁচকা টান দিতেই সে মাটিতে পড়ে গেল। দড়ির বাকি অংশটা দিয়ে কাকাবাবু তার হাত-পা বেঁধে ফেললেন।

তারপর যেন কিছুই হয়নি এই ভঙ্গিতে হাত নেড়ে তিনি সন্তুকে বললেন, যা, ভেতরটা দেখে আয়।

সন্তুর পা কাঁপিছিল। নিজেকে একটুখানি সংযত করে সে টাৰ্চটা মুখে চেপে নিল, তারপর দুহাতে ভর দিয়ে মাথাটা গলাল ভেতরে।

ঠিক সেই মুহূর্তে তার মনে পড়ল রিনির মুখটা। রিনি তাকে ঠাট্টা করেছিল। বলেছিল গরুর শিঙের ওপর বসে থাকা একটা মশা! এখন সে একা মুফতি মহম্মদের সম্পদ আবিষ্কার করতে যাচ্ছে। কলকাতার পিকনিক গার্ডেনসের সেই থানাটার কথাও তার মনে পড়ে গেল এক ঝলক। সেই দারোগ যদি তাকে এই অবস্থায় দেখতেন!

ভেতরে ঢুকে গিয়ে সন্তু উবু হয়ে বসে টর্চ জ্বালল। তার গা ছমছম করছে। কেন যেন তার ধারণা হল, এখানে একটা অজগর সাপ থাকতে পারে। কাশ্মীরের সেই শুকনো কুয়োটার মধ্যে যে-রকম ছিল।

কিন্তু সেসব কিছু নেই। একটা শুধু কফিন, আর এক পাটি চটি পড়ে আছে। আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে সে কফিনের ঢাকনা খুলল।

খুলতেই বুকটা ছাঁত করে উঠল তার। সেখানে সত্যিই একটা মমি রয়েছে। সন্তু ভূতের ভয় পায় না, তবু তার হাত-পা ঠকঠক করে কাঁপছে। কিছুতেই নিজেকে সামলাতে পারছে না। সে।

তার দৃঢ় বিশ্বাস এই মমির গায়ে জড়ানো ব্যাণ্ডেজের মধ্যেই কিংবা এর নীচে প্রচুর ধনরত্ন আছে। কিন্তু সেটা পরীক্ষা করে দেখার জন্য সে হাত তুলতেই পারছে না।

অতি কষ্টে সন্তু চোখ বুজে হাতটা ছোঁয়াল মমির গায়ে। এবারে তার কাঁপুনি থেমে গেল। ভাল করে মমিটা পরীক্ষা করল। কয়েকখানা হাড় ছাড়া আর কিছুই টের পাচ্ছে না। মমির তলাতেও কিছু নেই।

মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই সন্তু বুঝে গেল, তার আশা ব্যর্থ হয়েছে। ধনসম্পদ লুকিয়ে রাখা থাকলে তা তো একটু-আধটু হবে না। অনেক হবার কথা। থাকলে ঠিকই টের পাওয়া যেত।

হতাশভাবে ফিরে এসে সন্তু গর্তটাতে মুখ বাড়িয়ে বলল, কাকাবাবু, কিছু নেই!

মমি নেই? হ্যাঁ, মমি আছে। রানির মমিই মনে হচ্ছে, কিন্তু টাকা পয়সা বা সোনা-টোনা একটুও নেই!

মুফতি মহম্মদ তো টাকা পয়সার কথা বলেননি! তোকে আর-একটা কাজ করতে হবে। দ্যাখা তো, ঐ ঘরের দেয়ালে বা ছাদে বা কফিনের গায়ে কোনও ছবি আঁকা আছে কি না?

সন্তু দেখে এসে বলল, হ্যাঁ, আছে। কফিনের ঢাকনার ভেতরের দিকে পাঁচটা ছোট ছোট ছবি আছে।

কাকাবাবু, ঝোলাব্যাগটা সন্তুর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, এর মধ্যে কাগজ-কলম আছে। তুই তো একটু-আধটু ছবি আঁকতে পারিস, খুব সাবধানে ঐ ছবিগুলো কপি করে নিয়ে আয় তো!

ছবিগুলো কপি করতে সন্তুর আরও দশ মিনিট লাগল। তারপর চিটিজুতোটা কুড়িয়ে নিয়ে সে নেমে এল। জুতোটা চামড়া বা রবারের নয়। কোনও ধাতুর। সোনারও হতে পারে। ওপরে শ্যাওলা জমে গেছে।

কাকাবাবু আল মামুনের মুখের ওপর টর্চ ফেলে বললেন, তোমাকে আমি খুলে দিচ্ছি না।

আল মামুন বলল, আমাকে বাঁচাও। তোমাকে আমি দশ লাখ টাকা দেব!

তুমি আমাদের খুন করতে চেয়েছিলে! তার বদলে তুমি অন্তত একটা দিন মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করো।

সন্তুকে নিয়ে কাকাবাবু সেই হলঘর থেকে বেরিয়ে ঢুকে পড়লেন সুড়ঙ্গে। সেটা পার হতেই ডাগো আবদাল্লাকে দেখতে পাওয়া গেল। সে অধীরভাবে ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল। তারপর আর ওপরে উঠতে কোনও অসুবিধে হল না।

হানি আলকাদি কোথা থেকে ছুটে এসে কাকাবাবুর হাত জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করল, মিঃ রায়চৌধুরী, ইউ গট ইট?

কাকাবাবু বললেন, শোনো, মনটা শক্ত করো। দুঃসংবাদ শুনে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যেও না। মুফতি মহম্মদের গোপন কথা হচ্ছে রানি হেটেফেরিসের মমি। সেটা আবিষ্কারের কৃতিত্ব তুমি নাও বা যে-ই নাও, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। সেখানে টাকা পয়সা বা অস্ত্রশস্ত্ৰ কিছুই পাওয়া যায়নি। এই এক পাটি চটি পাওয়া গেছে, বোধহয় এটা সোনার তৈরি। কে এটা ফেলে গেছে জানি না। এর অর্ধেক তুমি ইচ্ছে করলে আল মামুনকে দিতে পারো। সে অবশ্য নীচে শুয়ে আছে। বিকেলের দিকে কোনও লোক পাঠিয়ে তাকে উদ্ধার করতে হবে।

হানি আলকাদি রাগের চোটে চটটা ছুঁড়ে ফেলে দিল দূরে!

কাকাবাবু বললেন, আমার এখন বিশ্রাম দরকার একটু। আমি ক্লান্ত। এখানে একটা রেস্ট হাউস তৈরি হয়েছে না?

আগের রাতে ঘুম হয়নি, তার ওপর এত উত্তেজনা ও পরিশ্রম। সন্তু আর কাকাবাবু দুজনেই ঘুমোল প্রায় সন্ধে পর্যন্ত।

সন্তু জেগে উঠে দেখল, রিনি, সিদ্ধার্থ বিমান সবাই এসে বসে আছে। সিদ্ধার্থ বিমানের কাছে খবর পেয়ে কাল রাতেই এখানকার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। আজ তারা খুঁজতে-খুঁজতে গিজাতে এসে পৌঁছেছে।

রিনি বলল, সন্তু, সব ঘটনা আমি আগে শুনব। তার আগে তুই আর কারুকে বলতে পারবি না।

কাকাবাবু ঠিক করলেন, তখুনি কায়রোর দিকে রওনা হবেন। ডাগো আবদাল্লাকে তিনি অনেক টাকা বখশিশ দিলেন। তারপর তাকে বললেন, একটু পরেই সে গিয়ে যেন আল মামুনকে মুক্তি দিয়ে আসে।

ডাগো বলল, সে তো চলে গেছে।

কাকাবাবু বললেন, আমার কাছ থেকে সে বিদায় না নিয়ে চলে গেল? হতেই পারে না। তার খোঁজ নিয়ে দ্যাখো।

একটু খোঁজাখুঁজি করতেই তাকে এক আরবের বাড়িতে পাওয়া গেল। সেও ঘুমোচ্ছিল। মনের দুঃখেও তো মানুষের খুব ঘুম পায়।

কাকাবাবু তাকে একলা একটু দূরে ডেকে নিয়ে গেলেন। তারপর বললেন, আমি চলে যাচ্ছি। তোমার কোনও উপকার করতে পারলুম না, সেজন্য দুঃখিত।

হানি আলকাদি বিষন্নভাবে বলল, তবু যে তুমি মুফতি মহম্মদের কথা রাখবার জন্য এত দূরে ছুটে এসে এত কষ্ট করলে, সে জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।

চোখে কৌতুকের ঝিলিক দিয়ে কাকাবাবু বললেন, তবে বোধহয় কিছু একটা তুমি পেয়ে যাবে। শুধু একটা মমি দেখবার জন্য কি মুফতি মহম্মদ আমাকে এত দূর পাঠিয়েছিলেন? এ মমিটাও একটা সংকেত!

হানি আলকাদি বলল, তার মানে?

কাকাবাবু পকেট থেকে একটা কাগজ বার করলেন। তারপর বললেন, রানির লুকোনো কফিনের গায়ে কয়েকটি ছবি আঁকা আছে। সেগুলোও আসলে সংকেত-লিপি। সেটা আমি তোমার জন্য অনুবাদ করে দিয়েছি। তাতে লেখা আছে, ফারাও আসেমহেট তৃতীয়র সমাধিস্থান। তৃতীয় কক্ষ। ডান দিকের দেওয়ালের ওপর দিকে ঠিক পাঁচটি ছবি আঁকা আছে। আমার মনে হয়, সেই ছবি আর এই কফিনের গায়ের ছবি মুফতি মহম্মদের আঁকা। খুব সম্ভবত সেখানে কিছু লুকিয়ে রাখা আছে। সেখানে কী আছে না আছে তা আমি আর দেখতে চাই না। তুমি গিয়ে দ্যাখো, যা আশা করছি তা হয়তো ওখানেই পেতে পারো। গুড লাক!

আনন্দে চকচক করে উঠল হানি আলকাদির চোখ। সে দুহাতে জড়িয়ে ধরল কাকাবাবুকে। বারবার বলতে লাগল, ধন্যবাদ, রায়চৌধুরী, ধন্যবাদ। আমরা তোমার কাছে কৃতজ্ঞ!

কাকাবাবু খানিকটা অস্বস্তির সঙ্গে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললেন, ঠিক আছে, ঠিক আছে, এ আর এমন কী ব্যাপার!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *