০৮. ভাইজাগে ট্রেনটা পৌঁছল

ভাইজাগে ট্রেনটা পৌঁছল মাঝরাতের পর।

একটা ট্যাক্সি নিয়ে কাকাবাবু পার্ক হোটেল-এর দিকে গেলেন না। হংসরাজ নামে আর একটা ছোটখাটো হোটেলে উঠলেন, দুটো ঘর ভাড়া নিলেন। দুটো ঘরের মাঝখান দিয়ে একটা দরজা রয়েছে।

কাকাবাবু জোজোকে বললেন, এখানে দুটো খাট রয়েছে, তুই ইচ্ছে করলে আমার সঙ্গে এ-ঘরে শুতে পারিস। পাশের ঘরেও থাকতে পারিস। কাল সন্ধের আগে আমাদের কোনও কাজ নেই। আমি স্রেফ ঘুমোব। কাল সন্ধের আগে তুই ঘর থেকে এক-পাও বেরুবি না। ফোন করে ঘরে খাবার আনাবি। তোর যখন ইচ্ছে খাবি, আমার জন্য অপেক্ষা করবি না।

তারপর সত্যিই কাকাবাবু পরদিন অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমোলেন। তারপর ব্রেকফাস্ট খেয়ে, স্নানটান করে আবার শুতে গেলেন। দুপুরবেলা জোজো একবার ডাকল, তবু তিনি চোখ না মেলেই বললেন, আমি লাঞ্চ খাব না, তুই খেয়ে নে।

বিকেলবেলায় উঠে বসে চা-বিস্কুট খেলেন।

জোজোকে বললেন, প্যান্ট-শার্ট পরে নে, আমরা এখন বেরুব। শোন জোজো, এর পর তোকে আমি যা-যা করতে বলব, তুই চটপট করে যাবি। কোনও প্রশ্ন করবি না। মনে থাকবে?

জোজো মাথা নাড়ল।

কাকাবাবু নিজেও তৈরি হয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন।

হোটেলের সামনে একটুক্ষণ অপেক্ষা করার পর একটা ট্যাক্সি পাওয়া গেল। কাকাবাবু ড্রাইভারকে বললেন, আগে একটা বাজারে চলো।

ট্যাক্সিটা শহরের মাঝখানে একটা বাজারের কাছে এসে থামল। কাকাবাবু নিজের মানিব্যাগটা জোজোকে দিয়ে বললেন, তুই ভেতরে গিয়ে খুঁজে তিন-চারটে নাইলনের দড়ি আর তিন-চারটে গামছা কিনে নিয়ে আয়। চারটে করেই আনিস।

কাকাবাবু গাড়িতেই অপেক্ষা করতে লাগলেন।

একটু পরে জোজো জিনিসগুলো কিনে আনার পর কাকাবাবু ড্রাইভারকে বললেন, সমুদ্রের ধারে চলো!

একটু-একটু বৃষ্টি পড়ছে, রাস্তা ফাঁকা। সন্ধে হয়ে গেছে। বেলাভূমি অনেকটা পার হওয়ার পর কাকাবাবু ডান দিকে বেঁকতে বললেন। তারপর একটু এদিক-ওদিক ঘুরে একটা মাঠের ধারে থামতে বললেন।

ড্রাইভারকে বললেন, এখানে একটু অপেক্ষা করুন, আমাদের বেশিক্ষণ লাগবে না।

জোজোকে বললেন, জিনিসগুলো নিয়ে আয় আমার সঙ্গে।

সেই মাঠের মধ্যে একটি মেয়েদের হস্টেল। গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছে দরোয়ান। বৃষ্টির জন্য সে দেওয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বিড়ি খাচ্ছে, বন্দুকটা পাশে নামানো।

কাকাবাবুরা কাছে আসতেই সে জিজ্ঞেস করল, কী চাই? কাকাবাবু বললেন, সুপারিনটেনডেন্টের সঙ্গে দেখা করতে চাই। দরোয়ানটি রুক্ষভাবে বলল, এখন হবে না।

কাকাবাবু মিনতি করে বললেন, আমার বিশেষ দরকার। পাঁচ মিনিটের জন্য।

দরোয়ানটি বলল, বলছি তো হবে না। ছটার মধ্যে আসতে হবে।

কাকাবাবু ফস করে রিভলভার বের করে বললেন, মাথার ওপর হাত তোলো, ভেতরে চলো, একটু চেঁচালে মাথার খুলি উড়িয়ে দেব।

ভয়ে লোকটার চোখ কপালে উঠে গেল, কাকাবাবু তাকে প্রায় ঠেলে নিয়ে চললেন। ভেতরের একটা প্যাসেজে ঢোকার পর কাকাবাবু বললেন, জোজো, গামছা দিয়ে এর মুখ বেঁধে ফেল, তারপর হাত আর পা বেঁধে দে।

দরোয়ানটিকে দাবড়ানি দিলেন, একটুও নড়বে না।

জোজো চটপট ওকে বেঁধে ফেলল। সে আস্তে-আস্তে বসে পড়ল মাটিতে।

ভেতরে একটা বেশ বড় উঠোন। তার একপাশে সুপারিনটেনডেন্টের অফিসঘর। তিনি একজন মাঝবয়সী মহিলা, তাঁর চেয়ে কিছু কমবয়সী এক মহিলা তাঁর সহকর্মী, দুজনেই কাকাবাবু ও জোজোকে দেখে মুখ তুলে তাকালেন।

বয়স্কা মহিলাটি বললেন, কী চাই? কে আপনাদের ভেতরে আসতে দিয়েছে?

কাকাবাবু রিভলভারটা তুলে বললেন, এটার জোরে ঢুকেছি। এটা কী জানেন তো?

জোজো বলল, রোজ দুপুরে হিন্দি সিনেমা দেখায় টিভিতে। রিভলভার কী, তা সব মেয়েও জানে। সব হিন্দি সিনেমায় থাকে।

কাকাবাবু বললেন, তোকে এত কথা বলতে হবে না। তুই দরোয়ানের বন্দুকটা নিয়ে এসে দাঁড়া। আর কোনও দরোয়ান বা গার্ড দেখলে সোজা গুলি করবি।

মহিলা দুজনের দিকে তাকিয়ে বললেন, চেঁচাবেন না, মুখ খুললেই সোজা গুলি চালাব। আমার কথা লক্ষ্মী মেয়ের মতন শুনলে কোনও ক্ষতি করব না। মাথার ওপর হাত তুলে ঘর থেকে বেরিয়ে আসুন। দুজনেই।

ওই একটি দরোয়ান ছাড়া এই হস্টেলে আর কোনও পুরুষকর্মী নেই। উঠোনের একপাশে ঝুলছে একটা লোহার ঘণ্টা।

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, এখানে সবসুন্ধু কজন মেয়ে আছে?

বড় দিদিমণি বললেন, এখন আছে বিয়াল্লিশজন।

কাকাবাবু বললেন, সবাইকে নীচে ডাকুন। এই ঘণ্টা বাজালে সবাই নেমে আসবে? বাজিয়ে দিন!

ছোট দিদিমণিটি খুব জোরে-জোরে ঘণ্টা বাজিয়ে দিল।

হুড়মুড় করে নেমে এল মেয়েরা। পাহাড়ি নদীর ঢলের মতন। কলকল-কলকল শব্দ করে। সকলে একই রকম ফ্রক পরা, একই বয়সী, প্রায়

একই রকম চেহারা।

কাকাবাবু একটা থামের আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে বড় দিদিমণিকে বললেন, সবাইকে সার বেঁধে পাশাপাশি দাঁড়াতে বলুন।

মেয়েরা সকলেই একসঙ্গে কথা বলছে, হাসছে, গোলমাল করছে। বড় দিদিমণির কথা তারা শুনতেই পাচ্ছে না। তিনি বারবার বললেন, লাইন করে দাঁড়াও। কয়েকটি মেয়ে চেঁচিয়ে বলছে, কেন, কেন, কী হয়েছে, কী হয়েছে?

কাকাবাবু আড়াল থেকে সামনে এসে রিভলভারটা ওপরে তুলে একবার ফায়ার করলেন।

মেয়েরা ভয়ে শিউরে উঠে আঁ-আঁ করে উঠল।

জোজো বন্দুকটা তুলে বলল, চুপ, সবাই চুপ।

সঙ্গে-সঙ্গে সব কলকলানি থেমে গেল। মেয়েরা কেউ কিছু বুঝতে পারছে। ব্যাপারটা। চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে রইল।

কাকাবাবু বললেন, রাধা গোমেজ কার নাম? সামনে এগিয়ে এসো।

রাধা দুপা এগিয়ে দারুণ বিস্ময়ের সঙ্গে বাংলায় বলল, আপনি? কাকাবাবু, আপনি…

কাকাবাবু এক ধমক দিয়ে বললেন, চুপ! একটাও কথা বলবে না।

জোজোকে বললেন, ওই মেয়েটার মুখটা বেঁধে ফেল। হাত ধরে টেনে নিয়ে আয়।

কাকাবাবু বড় দিদিমণির ঘাড়ে রিভলভার ঠেকিয়ে বললেন, আমরা শুধু এই একটি মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছি। কারও কোনও ক্ষতি করব না। আমরা চলে যাওয়ার পর দশ মিনিট পর্যন্ত কেউ নড়বে না। আমার কথার অবাধ্য হলে বোমা দিয়ে পুরো বাড়িটা উড়িয়ে দেব।

জোজো টানতে-টানতে মুখবাঁধা অবস্থায় নিয়ে এল রাধাকে।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে দরজাটা টেনে বন্ধ করে হুড়কো, লাগিয়ে দিলেন কাকাবাবু। তারপর গেট পেরিয়ে মাঠের মধ্য দিয়ে দ্রুত এগোতে এগোতে বললেন, জোজো, এবার ওর মুখের বাঁধনটা খুলে দে। ট্যাক্সি ড্রাইভার যেন কিছু সন্দেহ না করে। বেশ সহজেই কাজটা হয়ে গেল।

গামছাটা ভোলা হতেই রাধা অভিমানের সঙ্গে বলল, কাকাবাবু আপনি ডাকলেই তো আমি চলে আসতাম। আমার মুখ বাঁধতে বললেন কেন?

কাকাবাবু হেসে ফেলে বললেন, বেশ একটা নাটক হল, না? সবাই দেখল একটা খোঁড়া লোক, কিন্তু দারুণ হিংস্র, কথায় কথায় গুলি চালাতে পারে, সে একটা ফুটফুটে মেয়েকে জোর করে লুঠ করে নিয়ে গেল। পুলিশের কাছে বর্ণনা দিতে ওদের অসুবিধে হবে না। আমি এটাই চেয়েছিলাম।

জোজো জিজ্ঞেস করল, কাকাবাবু, আমার সম্পর্কে ওরা কিছু বলবে না?

কাকাবাবু বললেন, সব মেয়েই তোর সম্পর্কে বলবে, একটা বেশ সুন্দর মতন ছেলে সঙ্গে ছিল, খুব স্মার্ট। আমরা দুজনে মিলে একটা ডাকাতের টিম।

ট্যাক্সিতে উঠে তিনি বললেন, হোটেলে ফিরে চলল। ট্যাক্সিতে কাকাবাবু ওদের চুপ করে থাকার ইঙ্গিত করলেন। হোটেলের ঘরে এসে তিনি বললেন, রাধা, তোমাকে কেন ধরে এনেছি সেটা তোমার জানা উচিত। তার আগে বলো, মঞ্চাম্মা কি তোমার নতুন মায়ের নাম?

রাধা বলল, হ্যাঁ। দলের সব লোক বলে মঞ্চাম্মা। বাবা বলেন মঞ্চি। নতুন মা কী করেছে?

কাকাবাবু বললেন, আমার ওপর তার খুব রাগ, কেন জানি না। আমাকে প্রায় খতম করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। পারেনি।

রাধা বলল, আমি বলেছিলাম না? আমি আপনাকে সাবধান করে দিয়েছিলাম।

কাকাবাবু বললেন, তুমি বলেছিলে ওদের স্মাগলিংয়ের কারবার। কিন্তু এর মধ্যে যে ওরা আবার মূর্তি চুরি করার কারবারে লেগে পড়েছে, তা জানব কী করে?

রাধা জোজোর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, তুমি সন্তুদাদা?

কাকাবাবু বললেন, না, ও সন্তুর বন্ধু জোজো।

রাধা বলল, ও হ্যাঁ, হ্যাঁ জোজোকে চিনি। জোজোর কথাও জানি।

কাকাবাবু বললেন, সন্তুকে কারা যেন ধরে নিয়ে গেছে। সম্ভবত তোমার বাবা-মায়েরই দলের লোক। সেইজন্য তোমাকে আমি জামিন হিসেবে রেখে দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই এ-খবর ওদের কাছে পৌঁছে যাবে। তোমাকে আমি যতক্ষণ ধরে রাখব, ততক্ষণ ওরা সন্তুর কোনও ক্ষতি করতে পারবে না!

রাধা জিজ্ঞেস করল, সন্তুদাদাকে কি আমাদের বাড়িতে নিয়ে গেছে? তা হলে আমি সে বাড়ি চিনিয়ে দিতে পারি।

কাকাবাবু বললেন, সেটা ওরাও বুঝবে। তোমাকে ধরে আমি বাড়িতে পৌঁছে যেতে পারি, সেইজন্য ওখানে সন্তুকে রাখবে না। ওখানে কোনও প্রমাণও রাখবে না।

জোজো বলল, আমার মনে হয়, আরাকু পাহাড়ের ওখানেই কোথাও সন্তুকে লুকিয়ে রেখেছে।

কাকাবাবু বললেন, সে এলাকায় আমি দুদিন কাটিয়েছি। আমাদের পক্ষে সেখান থেকে সন্তুকে বার করা অসম্ভব! পুলিশও পারবে না। রাধা, রাত জাগলে তোমার কষ্ট হয়?

রাধা বলল, না, ইচ্ছে করলে আমি রাত জাগতে পারি।

কাকাবাবু বললেন, আজ সহজে ঘুমোবার আশা নেই। এখন পাশের ঘরটায় গিয়ে তুমি জোজোর সঙ্গে গল্প করতে পারো। একটু বাদে আমরা কিছু খেয়ে নেব। রাত বারোটার পর আমরা বেরোব।

জোজো জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাব?

কাকাবাবু বললেন, বেড়াতে।

রাধা আর জোজো দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠল, বেড়াতে?

কাকাবাবু হাসতে-হাসতে বললেন, বেশি রাতেই তো বেড়াতে ভাল লাগে। তখন আমরা সমুদ্র দেখব। গান গাইতেও পারি। রাধা, তুমি গান জানো?

রাধা বলল, না। আমি পিয়ানো শিখছি।

কাকাবাবু বললেন, জোজো বেশ ভাল গান গায়। আমরা জোজোর গান শুনব। এখন বরং একটু বিশ্রাম করে নাও।

রাধা আর জোজো দুজনেই উত্তেজনায় ছটফট করছে। কাকাবাবু এমন ভাব দেখাচ্ছেন, যেন কিছুই হয়নি। চেয়ারে বসে পা দুটো লম্বা করে ছড়িয়ে দিয়ে মাথাটা হেলিয়ে দিলেন।

রাধা আর জোজো চলে গেল পাশের ঘরে।

একটু পরে কাকাবাবু টেলিফোনের ডায়াল ঘোরালেন। দু-তিনবারের চেষ্টায় পাওয়া গেল রাজমহেন্দ্ৰীকে। হালকা গলায় তিনি বললেন, হ্যালো, রাজমহেন্দ্ৰী, খবর কী? খানিকটা বৃষ্টি পড়ে আজ হাওয়াটা বেশ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, তাই না?

রাজমহেন্দ্ৰী দারুণ ব্যস্ত হয়ে বললেন, মিঃ রায়চৌধুরী, আপনি কোথায়? দুদিন ধরে আপনার কোনও সন্ধানই পাওয়া যাচ্ছে না। আরাকু ভ্যালির ও. সি. কিছু বলতে পারছে না। এদিকে দিল্লি থেকে আপনার খোঁজ করা হচ্ছে, দু-তিনটে মেসেজ এসেছে। আপনাকে খুঁজে বার করার জন্য আমরা একটু বাদে পুলিশ বাহিনী পাঠাচ্ছিলাম।

কাকাবাবু ওসব কথার পাত্তাই না দিয়ে বললেন, আজ সন্ধেবেলা মেয়েদের হস্টেল থেকে কারা যেন একটি কিশোরী মেয়েকে রিভলভার দেখিয়ে লুঠ করে নিয়ে গেছে, সে-খবরটা শোনেননি?

রাজমহেন্দ্ৰী খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়ে বললেন, হ্যাঁ, মানে সেই খবর তো একটু আগেই রেডিয়োতে বলল, আপনারই মতন ডেসক্রিপশানের একজন লোক, সঙ্গে একটি অল্পবয়সী ছেলে, সন্ধের পর মেয়েদের হস্টেলে ঢুকে..একটা মেয়েকে গাপ করা হয়েছে…আপনি সেকথা জিজ্ঞেস করছেন কেন? ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি না।

কাকাবাবু বললেন, বুঝবেন, বুঝবেন, আস্তে-আস্তে বুঝবেন। মেয়েটিকে যে গাপ করা হল, পুলিশ খোঁজাখুঁজি করবে নিশ্চয়!

রাজমহেন্দ্রী বললেন, বাঃ, খুঁজবে না? এটা পুলিশের ডিউটি!

কাকাবাবু একটু হেসে বললেন, তা তো বটেই। কিন্তু আপনাদের পুলিশ কতটা ডিউটিফুল? আজ রাত থেকেই খোঁজাখুঁজি শুরু করবে?

রাজমহেন্দ্ৰী অসহিষ্ণুভাবে বললেন, মিস্টার রায়চৌধুরী, আপনি কী বলতে চাইছেন, বুঝতে পারছি না!

কাকাবাবু বললেন, আপনার পুলিশদের বলুন, ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই, সে-মেয়েটি ভাল আছে, নিরাপদে আছে। কালকেই ফিরে যাবে।

রাজমহেন্দ্ৰী জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কোথায় আছেন? দিল্লি থেকে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইছে

কাকাবাবু তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, কাল সকালে, কাল সকালে অন্য কথা হবে। আমিই আবার ফোন করব।

রাজমহেন্দ্ৰীকে আর কিছু বলতে না দিয়ে তিনি ফোন রেখে দিলেন।

রাত বারোটার সময় তিনি বললেন, জোজো, রাধা, এবার চলল বেরুনো যাক।

বাইরে এসে বললেন, চমৎকার ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে, ট্যাক্সি নিয়ে কী হবে, চলো আমরা হেঁটেই যাই।

সন্ধেবেলা একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে, এখন আকাশ ঝকঝকে পরিষ্কার। এত রাতে রাস্তায় মানুষজন প্রায় নেই। দু-একটা গাড়ি যাচ্ছে মাঝে-মাঝে।

একটা ঢালু রাস্তা দিয়ে সমুদ্রের দিকে নামতে নামতে কাকাবাবু বললেন, রাধা, তুমি সব সময় আমার পাশে-পাশে থাকবে, একটুও দূরে চলে যেয়ো না, কেমন?

জোজো বলল, কাকাবাবু, রাধাকে ছেলে সাজিয়ে আনলে ভাল হত না? তা হলে ওকে কেউ চিনতে পারত না। আমার শার্ট-প্যান্ট ওকে ফিট করে যেত।

রাধা বলল, আমাদের ইস্কুলের থিয়েটারে আমি পুরুষের পার্ট করেছি। গোঁফ লাগিয়ে দিয়েছিল। আমার বাবাও প্রথমে বুঝতে পারেননি।

কাকাবাবু মুচকি মুচকি হাসতে লাগলেন।

সমুদ্রের ধারটা একেবারেই নির্জন। সন্ধের সময় বেশ ভিড় থাকে, অনেক ফেরিওয়ালা ঘোরে, এখন কেউ নেই।

মাঝে-মাঝেই বাঁধানো বসবার জায়গা। একটা জায়গা বেছে নিয়ে কাকাবাবু বসলেন, মাঝখানে রাধা। কাকাবাবু পাজামা-পাঞ্জাবির ওপর একটা চাদর জড়িয়ে এসেছেন। রাধাকে বললেন, তোমার শীত করলে আমার চাদরটা নিতে পারো।

এখন ঢেউয়ের শব্দ বেশ জোর। দূরে ডলফিন্স নোজ পাহাড়টা দেখা যাচ্ছে অস্পষ্টভাবে। তার ওপারে লাইট হাউসের আলো ঘুরে-ঘুরে যাচ্ছে। বাঁ দিকে, দূরের পার্ক হোটেলের পাশেও আর একটা লাইট হাউস। আজ অবশ্য সমুদ্রে কোনও জাহাজ দেখা যাচ্ছে না।

রাধা বলল, আমাদের শহরটা খুব সুন্দর, না? একসঙ্গে পাহাড় আর সমুদ্র। জোজো, তুমি এরকম আর কোনও শহর দেখেছ?

জোজো বলল, কত দেখেছি! ইতালির ক্যাপ্রিতে। একবার মেক্সিকোতে পাহাড় থেকে সমুদ্রে ডাইভ দিলাম, জলের তলায় একটা প্রবাল দ্বীপ।

কাকাবাবু বললেন, ওসব গল্প এখন থাক। গান হোক। জোজো, তুই এই গানটা জানিস, যাবই, আমি, বাণিজ্যেতে যাবই…

জোজো বলল, খানিকটা জানি, সব কথা মনে নেই।

কাকাবাবু বললেন, আমি মনে করিয়ে দিচ্ছি, নীলের কোলে শ্যামল সে দ্বীপ প্রবাল দিয়ে ঘেরা। শৈলচূড়ায় নীড় বেঁধেছে সাগর বিহঙ্গেরা…।

জোজোর গানের গলাটি বেশ ভাল। সে পরপর গান গেয়ে যেতে লাগল। রাধা গান জানে না বলেছিল, সেও মোটামুটি ইংরেজি গান গাইতে পারে।

কাকাবাবু বললেন, আমিও কয়েকটা ইংরেজি গান জানি। শুনবে?…মাই হার্ট ইজ ডাউন, মাই হেড ইজ টার্নিং অ্যারাউন্ড, আই হ্যাড টু লিভ আ লিটু গার্ল ইন কিংস্টন টাউন..। একজন লোক তার ছোট মেয়েকে রেখে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে।

গান থামিয়ে কাকাবাবু বললেন, আচ্ছা রাধা, এখন তোমার বাবা এসে পড়ে যদি বলেন, রাধা, উঠে এসো। আমার কাছে চলে এসো! তখন তুমি কী করবে?

রাধা চট করে কোনও উত্তর দিতে পারল না। জোজো বলল, আমি তো শুনলুম, ওর বাবা

কাকাবাবু তাকে বাধা দিয়ে বললেন, তুই এখন চুপ কর। ওকে ভেবেচিন্তে বলতে দে।

রাধা খানিকটা দ্বিধার সঙ্গে বলল, আমার বাবা, আর যাই হোক, আমাকে ভালবাসে। বিশ্বাস করুন।

কাকাবাবু বললেন, কেন বিশ্বাস করব না? বাবা মেয়েকে ভালবাসবে, মেয়ে বাবাকে ভালবাসবে। এটাই তো স্বাভাবিক। বাবার কথাও তোমার। শোনা উচিত। আমাকে তো তুমি দুদিন মাত্র দেখেছ। কিন্তু আমিও তো সন্তুকে খুব ভালবাসি। যে-কোনও উপায়ে আমি সন্তুকে উদ্ধার করতে চাইব, তাই না?

রাধা বলল, সে তো নিশ্চয়ই!

কাকাবাবু বললেন, সুতরাং সন্তুকে ফেরত না পেলে আমি তোমাকে যেতে দেব না। তোমার বাবা এসে ডাকলেও আমি তোমাকে জোর করে ধরে রাখব। কিন্তু তোমার কোনও ক্ষতি হবে না। তুমি ভয় পেয়ো না যেন!

রাধার চোখ ছলছল করে উঠল। ধরা গলায় সে বলল, কাকাবাবু, আপনার পাশে থাকলে আমি মোটেই ভয় পাব না!

কাকাবাবু বললেন, জোজো, তোকেও কিন্তু ঘাবড়ালে চলবে না।

মানুষজন নেই, তবে রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে মাঝে-মাঝে। দু-একটা ট্যাক্সি। রাস্তার দিকে পেছন ফিরে বসে আছে ওরা। জোজো আবার গান ধরল।

আরও ঘণ্টাখানেক কেটে যাওয়ার পর একটা গাড়ি খুব জোরে ব্রেক কষে থামল।

মুখ না ফিরিয়েই কাকাবাবু বললেন, এসে গেছে মনে হচ্ছে। ঠিক যা ভেবেছিলাম!

জোজো চট করে দেখে নিয়ে সভয়ে বলল, কাকাবাবু, ওরা পাঁচজন!

কাকাবাবু এবার ধীরেসুস্থে রাস্তার দিকে ফিরলেন। গাড়ি থেকে পাঁচজন নেমে ছড়িয়ে পড়েছে। দুপাশে দুজনের হাতে রিভলভার। মাঝখানে একজন রিভলভার হাতে এগিয়ে আসছে।

কাকাবাবু বললেন, ঠিক হিন্দি সিনেমার মতন, তাই না?

জোজো বলল, ইংরেজি সিনেমার নকল।

যে-লোকটি এগিয়ে আসছে, তার দিকে তাকিয়ে রাধা অস্ফুট স্বরে বলল, বাবা!

কাকাবাবু বললেন, ইনিই তা হলে মিস্টার গোমেজ। নমস্কার। অস্ত্রশস্ত্রগুলো পকেটে ভরে রাখুন। তারপর আলোচনা করা যাক!

গোমেজ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, মিস্টার রায়চৌধুরী। তোমার খেলা শেষ। একবার তুমি হাত ফসকে পালিয়েছ। এবার কোনও চালাকি করলে তোমায় গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেব।

কাকাবাবু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, কতবার যে কতজন আমাকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেবে বলে শাসিয়েছে! একবারও কিন্তু কেউ পারেনি।

গোমেজ বলল, আগে তুমি কাদের পাল্লায় পড়েছ জানি না। এবার তুমি আর বাঁচবে না। রাধা, উঠে আয়!

কাকাবাবু বললেন, রাধা এখন যাবে না। আগে কথাবার্তা শেষ হোক!

গোমেজ বলল, কথা কীসের? মেয়েকে আগে ছাড়ো, নইলে তিন দিক থেকে গুলি চলবে। তোমার পালাবার কোনও রাস্তা নেই।

কাকাবাবু বললেন, তোমার মেয়েকে ধরে রাখার ইচ্ছে আমার নেই। খুব ভাল মেয়ে, চমৎকার স্বভাব। ওকে ছেড়ে দিচ্ছি, তার আগে আমার ভাইপো সন্তুকে এনে দাও!

গোমেজ বলল, আমি কি এখানে দরাদরি করতে এসেছি নাকি? আমি ঠিক তিন গুনব, তার মধ্যে রাধাকে ছেড়ে না দিলে ওপাশের ছেলেটিকে প্রথমে মারব।

কাকাবাবু এক ঝটকায় গায়ের চাদরটা সরিয়ে ফেললেন, দেখা গেল, তাঁর রিভলভার রাধার কানের কাছে ঠেকানো।

তিনি বললেন, আমি কি ভ্যাবাগঙ্গারামের মতন তোমাদের হাতে ধরা দেওয়ার জন্য এখানে বসে আছি? আমি কি ঘাস খাই? টোপ ফেলে তোমাদের এখানে টেনে এনেছি। জানতাম, তোমরা ঠিক সন্ধান পাবে। মেয়েকে উদ্ধার করা তোমার কাছে সম্মানের প্রশ্ন। নিয়ে যাও মেয়েকে, তার আগে সন্তুকে এনে দাও। ব্যস, সব চুকে যাবে, আমি তোমাদের ব্যাপারে আর মাথা ঘামাব না।

গোমেজ থমকে দাঁড়িয়ে গিয়ে এদিক-ওদিক তাকাল।

কাকাবাবু বললেন, আমার রিভলভারের সেটি ল্যাচ খোলা। আমার মায়াদয়া নেই। তোমরা আর একটু এগোলে আমি গুলি চালাব, ওর মাথাটা ছাতু হয়ে যাবে। মেয়েকে কোনওদিন ফেরত পাবে না। বেশিক্ষণ সময় নেই। পুলিশকে সব বলা আছে। তাজ হোটেলের সামনের গলিতে দু গাড়ি পুলিশ অপেক্ষা করছে। আমাকে মারার চেষ্টা করলে তোমরাও পালাতে পারবে মা। সন্তু কোথায়?

গোমেজ শুকনো গলায় বলল, সে কোথায়, আমরা জানি না।

কাকাবাবু বললেন, তোমাদের লোকই তাকে ধরেছে। আমার ওপর তোমাদের রাগ। অন্য কেউ তাকে ধরতে যাবে কেন?

গোমেজ বলল, আমাদের হাতে সে এখন নেই। সে পালিয়েছে।

কাকাবাবু বললেন, মিথ্যে কথা। তোমাকে বিশ্বাস করি না। রাধাকে উঠে দাঁড়াবার ইঙ্গিত করে তিনি বললেন, শোনো গোমেজ, তোমাকে আমি ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা সময় দিচ্ছি। কাল ঠিক এই সময়ে, এইখানে সন্তুকে হাজির করবে, তখনই তোমার মেয়েও ফিরে যাবে তোমার কাছে। ঠিক চব্বিশ ঘণ্টা সময়।

গোমেজের একজন সহকারী একটু এগোবার চেষ্টা করতেই কাকাবাবু প্রবল ধমক দিয়ে বললেন, এবার আমি পাঁচ গুনব। তার মধ্যে তোমরা আমার রাস্তা ছেড়ে না দিলে এ-মেয়েটা মরবে, গুলির শব্দ পেলেই পুলিশের গাড়ি ছুটে আসবে। পেছন ফিরে তাকালেই পুলিশের গাড়ি দেখতে পাবে।

গোমেজ হাত তুলে তার সঙ্গীদের থামার ইঙ্গিত করে বলল, রাজা রায়চৌধুরী, আমার মেয়ের গায়ে যদি একটি আঁচড়ও লাগে, তা হলে তুমি পৃথিবীর যেখানে পালাও, তোমায় আমি ঠিক শেষ করব।

কাকাবাবু বললেন, তার আগে দেখো যেন আমার ভাইপো সন্তুর গায়েও একটি আঁচড়ও না লাগে! আমার প্রতিশোধও অতি সাঙ্ঘাতিক। কাল এখানে সন্তুকে নিয়ে এসো, আমি তোমাদের জেন্টলম্যান্স ওয়ার্ড দিচ্ছি, রাধাকেও অক্ষতভাবে ফেরত পাবে।

তিনি রাধার কানে রিভলভারটা ঠেকিয়ে রেখে এগোতে লাগলেন। গোমেজরা সরে গেল।

খানিকটা এগিয়ে তিনি বললেন, জোজো, আমার একটা ক্রাচ পড়ে আছে, সেটা তুলে নিয়ে আয়। আলো জ্বেলে একটা কী গাড়ি আসছে দেখ তো, ট্যাক্সি নাকি? হাত তুলে থামা।

সেটা নয়, কিন্তু পরের গাড়িটা ট্যাক্সি। আগে জোজো আর রাধাকে তুলে দিয়ে কাকাবাবু পেছন ফিরে গোমেজকে বললেন, আমাদের ফলো করার চেষ্টা

কোরো না। কোনও লাভ নেই।

ট্যাক্সিতে উঠে কাকাবাবু ড্রাইভারকে বললেন, পিস্তল দেখে ঘাবড়িয়ো না ভাই। সিনেমার শুটিং হচ্ছে। তোমার গাড়িরও ছবি উঠে যাবে। এখন খুব জোরে চালাও তো!

মাথা হেলান দিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, রাধা, ভয় পেয়েছিলে নাকি?

রাধা জোরে-জোরে দুদিকে মাথা ঘুরিয়ে বলল, না, একটুও না।

জোজো বলল, আপনি যখন বললেন, সেটি ল্যাচ খোলা, তখন আমি একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। যদি অ্যাসিডেন্ট হয়ে যেত?

কাকাবাবু রিভলভারটার মুখ জানলার বাইরে দিয়ে ট্রিগার টিপলেন। শুধু খটখট শব্দ হল।

হাসতে-হাসতে তিনি বললেন, আমি গুলি ভরিইনি ওইজন্য! সাবধানের মার নেই। রাধার গায়ে গুলি লাগবার ঝুঁকি কি আমি নিতে পারি?

জোজো বলল, উরি সর্বনাশ! গুলিই ভরেননি! যদি ওদের সঙ্গে শেষপর্যন্ত ফাইট করতে হত? আমি জানি, আপনি ইচ্ছে করলে ওদের তিনজনকেই আগে গুলি করতে পারতেন, অরণ্যদেবের মতন।

কাকাবাবু বললেন, অরণ্যদেব প্রত্যেকবার পারেন, আমি মাঝে-মাঝে ফসকে যাই। দরকার কী ওসব ঝঞ্ঝাটের। ওদের ভয় দেখিয়েই তো কাজ আদায় করা গেল।

জোজো বলল, পুলিশের গাড়ি কি সত্যি ছিল? না কি সেটাও ওদের ভয় দেখালেন মিথ্যে কথা বলে?

কাকাবাবু হাসতে-হাসতে বললেন, মাঝে-মাঝে ওরকম বলতে হয়। এটাকে বলতে পারিস সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার। ওদের মনের জোরের। সঙ্গে আমার মনের জোরের যুদ্ধ। ক্রিমিনালদের সাধারণত মনের জোর কম হয়। ওরা আসলে ভিতু।

ট্যাক্সিটাকে নানা রাস্তায় ঘুরিয়ে তারপর হোটেলের কাছে এনে ছেড়ে দিলেন। পেছনে কোনও গাড়ি আসেনি।

এত রাত্তিরেও হোটেলের লবিতে কাউন্টারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন লম্বা লোক। পুরোদস্তুর সুট-টাই পরা, মাথায় টুপি।

কাকাবাবুকে দেখে মাথা থেকে টুপিটা খুলে তিনি বললেন, নমস্তে রাজা রায়চৌধুরী। এত রাতে কোথায় বেরিয়েছিলেন?

কাকাবাবু একটুও অবাক না হওয়ার ভান করে বললেন, নরেন্দ্র ভার্মা যে। তুমি এত রাতে, কোথা থেকে এলে? আমরা তিনজনে একটু সমুদ্রের ধারে বেড়াতে গিয়েছিলাম। কী চমৎকার হাওয়া!

নরেন্দ্র ভার্মা বললেন, এত রাতে এই শহরে কেউ বেড়াতে যায় বলে শুনিনি। তা ছাড়া চতুর্দিকে তোমার সব বন্ধু ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের কারুর সঙ্গে দেখা হল না?

কাকাবাবু বললেন, নাঃ, কোনও বন্ধুর সঙ্গে তো দেখা হল না! এখানে এসে দেখা হল, তুমিই তো আমার একমাত্র বন্ধু!

নরেন্দ্র ভার্মা বললেন, রাজা, তোমার কী কাণ্ড বলো তো! আরাকু ভ্যালির গেস্ট হাউসে তুমি নেই। এখানকার পার্ক হটেলে তোমার জিনিসপত্র পড়ে আছে। সেখানেও ফেরোনি। অন্য হোটেলে উঠেছ, সেকথা পুলিশকে জানিয়ে রাখবে তো? আমরা খুঁজে-খুঁজে হয়রান!

কাকাবাবু বললেন, পুলিশকে জানাব? তোমাকে বলেছিলাম না, সরষের মধ্যে ভূত থাকে অনেক সময়? কেন, আমাকে এত খোঁজাখুঁজি করার কী আছে? তোমারও তো বম্বে না কোথায় খুব কাজ ছিল, ফিরে এলে কেন?

নরেন্দ্র ভার্মা বললেন, ফিরতে হল দিল্লির ঠেলা খেয়ে। রাজা, তোমার সঙ্গে খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। এই ছেলেমেয়ে দুটিকে ওপরে পাঠিয়ে দাও।

কাকাবাবু বললেন, এত রাতে আবার কাজের কথা কীসের? কাজের সময় কাজ, খেলার সময় খেলা, আর ঘুমের সময় ঘুম, এই না হলে স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যায়। তোমার জরুরি কথাটা চটপট সংক্ষেপে বলে ফেলো তো!

নরেন্দ্র ভার্মা কাকাবাবুকে একপাশে টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ভাইজাগের স্মাগলিং নিয়ে দিল্লি খুব চিন্তিত। প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত ব্যস্ত হয়ে গেছেন। এখান থেকে প্রচুর অস্ত্র, বিশেষত হাত-বোমা পাচার হচ্ছে শ্রীলঙ্কায়। এটা বন্ধ করতেই হবে, না হলে দু দেশের সম্পর্ক আরও খারাপ হবে। সারা দেশের পুলিশকে অ্যালার্ট করে দেওয়া হয়েছে। দিল্লির কর্তারা তোমারও সাহায্য চান। তোমাকে সবরকম ক্ষমতা দেওয়া হবে। তুমি এখানকার চোরাচালান-বিরোধী অভিযানটা পরিচালনা করবে।

কাকাবাবু কঠিন মুখ করে বললেন, দেখো নরেন্দ্র, তুমি জানো না বোধ হয় যে, ওরা সন্তুকে ধরে রেখেছে। সন্তুর প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে আমি কোনও কিছুই। করতে পারব না। সন্তুকে উদ্ধার করা আমার প্রথম কাজ। তার আগে আমি স্মাগলিং-টাগলিং নিয়ে মাথা ঘামাতে চাই না। আমার পক্ষে অসম্ভব!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *