০৮. দুপুরবেলা বেশ জোর বৃষ্টি

দুপুরবেলা বেশ জোর বৃষ্টি হয়ে গেল খানিকক্ষণ। তারপর আকাশ একেবারে পরিষ্কার। বেশ কয়েকদিন পর ঝকঝকে নীল আকাশ দেখা গেল।

হেডমাস্টারমশাই ইস্কুল থেকে ফেরার পর সবাই মিলে বারান্দায় চা খেতে বসলেন।

কথায়-কথায় হেডমাস্টারমশাই বললেন, দিনহাটার একটা ইস্কুলে কে একজন লোক দু লক্ষ টাকা দান করেছে। হঠাৎ এত টাকা পেয়ে সবাই অবাক! টাকাটা কে দিয়েছে, তা জানা যাচ্ছে না।

কাকাবাবু বললেন, ত্যাপা নামে একটি গরিবের ছেলে একসময় ওই ইস্কুলে পড়ত। বিদেশে গিয়ে সে খুব বড়লোক হয়েছে। খুব সম্ভবত টাকাটা সে-ই দান করেছে!

হেডমাস্টারমশাই বললেন, আমাদের গ্রামের টোবি দত্তও তো খুব বড়লোক। তার মামাদের অত বড় বাড়িটা কিনেছে। আমাদের ইস্কুলের বাড়িটা সারানো দরকার, সে কিছু টাকা দিলে পারত! দিয়েছে মোটে পাঁচ হাজার টাকা!

মণিকা গরম-গরম বেগুনি আর পেঁয়াজি ভেজে এনেছে মুড়ির সঙ্গে। তোফা খাওয়া হল।

মণিকা জিজ্ঞেস করল, কাকাবাবু আজ সন্ধেবেলা কী করা হবে? মিলিটারির সেই সাহেব আসবেন?

কাকাবাবু বললেন, ঠিক জানি না। কোনও খবর পাইনি।

মণিকা বলল, আজ কিন্তু আমি আপনাদের সঙ্গে যাব। সকালে আপনারা কোচবিহার শহরে গিয়েছিলেন, তখন আমাকে ইস্কুলে যেতে হল!

কাকাবাবু হাসলেন।

একটু বাদে হেডমাস্টারমশাই বেরিয়ে গেলেন এক জায়গায় ছাত্র পড়াতে। মণিকা বাথরুমে গা ধুতে গেল।

কাকাবাবু সন্তুকে ফিসফিস করে বললেন, আজ সন্ধের সময় আমরা এক জায়গায় যাব। সেখানে মণিকাকে কিছুতেই নিয়ে যাওয়া যাবে না। কিন্তু ও ছাড়তে চাইবে না। কী করা যায় বল তো?

সন্তু বলল, আমরা চুপিচুপি এখনই কেটে পরি?

কাকাবাবু বললেন, আরও ঘণ্টাখানেক দেরি আছে। তা ছাড়া ওকে কিছু না বলে গেলে বেচারি খুব দুঃখ পাবে। একটা কাজ করা যায়। তুই বরং আজ থেকে যা এখানে। তুই ওর সঙ্গে গল্প করবি। আমি ঘুরে আসি।

সন্তু সঙ্গে-সঙ্গে প্রবল আপত্তি জানিয়ে বলল, না, আমি থাকব না। আমি যাব!

কাকাবাবু বললেন, তা হলে এক কাজ কর। দুজনে একসঙ্গে বেরনো যাবে না। তুই আগেই সরে পড়। তুই গিয়ে নদীর ধারে লুকিয়ে বসে থাক। সেই প্রথমবার যেখানে বসেছিলাম, যেখানে তোকে কুকুরটা আক্রমণ করেছিল। ঝোপঝাড়ের মধ্যে বসে থাকবি, নদীর ওপারেও থাকতে পারিস, কেউ যেন তোকে দেখতে না পায়।

সন্তু তক্ষুনি জুতো-মোজা পরে তৈরি হয়ে নিল। তারপর এক দৌড়ে বেরিয়ে গেল রাস্তায়।

কিছুক্ষণ পর কাকাবাবু ক্রাচ দুটো বগলে নিয়ে যেই ঘর থেকে বেরিয়েছেন, অমনই মণিকা জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাচ্ছেন?

কাকাবাবু বললেন, যাই, একটু বেড়িয়ে আসি।

মণিকা বলল, সন্তু কোথায় গেল?

কাকাবাবু অম্লানবদনে বললেন, ও তো পাঁচটার বাস ধরে কোচবিহার টাউনে চলে গেল!

কেন?

ও যে তোমাদের আগুন পাখির ছবিগুলো তুলেছিল, তার প্রিন্টগুলো দেখার জন্য ছটফট করছিল। তা ছাড়া, কলকাতায় একটা ফোন করতে হবে।

রাত্তিরে ফিরবে কী করে? আর তো বাস নেই!

অনির্বাণ যদি গাড়ি নিয়ে আসে, তা হলে তার সঙ্গে ফিরবে। না হলে থেকে যাবে।

আমাকে না বলে চলে গেল, ভারী দুষ্টু তো! দাঁড়ান কাকাবাবু, আমি চটি পরে আসি, আমিও যাব আপনার সঙ্গে!

কাকাবাবু অপলকভাবে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইলেন মণিকার দিকে। এই মেয়েটির সাহস আছে। ধরাবাঁধা গণ্ডির বাইরে যেতে চায়। এরকম মেয়ে বেশি দেখা যায় না। তবু আজ ওকে সঙ্গে নেওয়ার ঝুঁকি খুব বেশি।

তিনি আস্তে-আস্তে মাথা নেড়ে বললেন, না মণিকা, আজ আমি একাই। যাব।

মণিকা ভুরু তুলে বলল, এই গ্রামের মধ্যে আপনি একা কোথায় বেড়াবেন? আমি আপনাকে সব চিনিয়ে দেব।

কাকাবাবু নরম গলায় বললেন, চিনিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। আমি নদীর ধারে ঘুরব। তোমাকে সঙ্গে আসতে হবে না। শুধু তাই নয়, তোমাকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে, এর পরেও তুমি একা একা বেরিয়ে পড়বে না। আমি যতক্ষণ না ফিরি, তুমি বাড়িতে থাকবে।

মণিকা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, কেন, আমি আপনার সঙ্গে গেলে কী হয়েছে? কেন নেবেন না আমাকে?

কাকাবাবু বললেন, ফিরে এসে বলব। ফিরে এসে তোমাকে একটা অদ্ভুত গল্প শোনাব। কিন্তু প্রতিজ্ঞা রইল, তুমি কিছুতেই আজ রাতে বাইরে বেরোবে না।

কাকাবাবু মণিকার মাথার চুলে হাত বুলিয়ে একটু আদর করলেন। তারপর মণিকাকে সেই অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রেখে বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে।

গ্রামের রাস্তা দিয়ে তিনি হাঁটতে লাগলেন আস্তে-আস্তে। যেন তিনি অলসভাবে ভ্রমণ করছেন। টোবি দত্তর বাড়ির ধারেকাছে ঘেঁষলেন না। নদীর ধারে যখন পৌঁছলেন, তখন বিকেল প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমের আকাশ। লাল। সন্তুকে কোথাও দেখা গেল না। কাকাবাবু আকাশের দিকে তাকিয়ে একটুক্ষণ সূর্যাস্তের শোভা দেখলেন।

নদীর ওপর থেকে একটা শিসের শব্দ ভেসে এল।

কাকাবাবু দুবার মাথা ঝোঁকালেন। তারপর নেমে পড়লেন নদীতে। নদীতে জল বেশি নেই, কিন্তু মাঝখানে বড় বড় পাথর। অন্য লোকেরা অনায়াসে বসে যেতে পারে। কিন্তু ক্রাচ নিয়ে যাওয়ার বেশ অসুবিধে। কাকাবাবু খোঁড়া পা-টা ঠিকমতন মাটিতে পাততে পারেন না, তবে সেই পায়েও একটা বিশেষ ধরনের জুতো পরে থাকেন। সেই জুতো খোলার অনেক ঝামেলা বলে তিনি প্যান্ট-জুতো ভিজিয়ে ফেললেন।

অন্য পাড়ে ওঠার পর সন্তু একটা ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে বলল, আমি টোবি দত্তর বাড়ির দিকে নজর রেখেছি। ছাদে কাউকে দেখা যায়নি।

কাকাবাবু সে-কথায় কোনও গুরুত্ব না দিয়ে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, দ্যাখ, কিছু কিছু গাছের ডাল কেউ হেঁটেছে বোঝা যাচ্ছে।

সন্তু বলল, জঙ্গলের গাছ কাটা তো অপরাধ।

কাকাবাবু বললেন, পুরো গাছ কাটেনি। ডালপালা ছাঁটা তেমন অপরাধ নয়। মনে হয়, জঙ্গলের মধ্যে কেউ একটা রাস্তা বানাতে চেয়েছে।

কাকাবাবু ঘড়ি দেখলেন। তখনই নদীর এ-ধারে একটা গাড়ির আওয়াজ শোনা গেল। একটা কালো রঙের জিপ গাড়ি থেকে নেমে এল অনির্বাণ।

কাকাবাবুর পাশে দাঁড়িয়ে সে জিজ্ঞেস করল, আমরা কোন দিকে যাব?

কাকাবাবু বললেন, একটু দাঁড়াও। আগে ব্যাপারটা একটু বুঝে নিতে হবে।

এবার তিনি টোবি দত্তর বাড়ির দিকে ফিরে দাঁড়ালেন। আবছা অন্ধকারে বাড়িটাকে জনমনুষ্যহীন মনে হয়।

কাকাবাবু বললেন, টোবি দত্তর বাড়ির ছাদে গভীর রাতে একটা জোরালো আলো জ্বলে। কেন সে আলোটা জ্বালে, এর একটা সহজ উত্তর আমাদের মনে আসেনি।

অনির্বাণ বলল, কাকাবাবু, আপনার কাছে উত্তরটা সহজ মনে হতে পারে, আমাদের কাছে কিন্তু খুবই জটিল।

কাকাবাবু বললেন, জটিল কেন হবে? আলোটা সে জ্বালে দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য।

অনির্বাণ বলল, হ্যাঁ, তা ঠিক। কিন্তু কার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য?

কাকাবাবু বললেন, তোমার!

অনির্বাণ চমকে গিয়ে খানিকটা অবিশ্বাসের সুরে বলল, আমার জন্য?

কাকাবাবু বললেন, হ্যাঁ, তোমার মতন পুলিশের বড়কর্তাদের জন্য! সে গোপনে কিছু করতে চাইলে নিশ্চয়ই এরকম একটা তেজি আলো জ্বালাত না। এই আলো তো লোকের নজরে পড়বেই। সে জানান দিতে চায়, আমি এরকম একটা আলো জ্বেলেছি, তোমরা এসে দ্যাখো!

আমরা এসে কী দেখব?

তুমি পুলিশের বড়কর্তা। মন্ত্রীদের আর ভি আই পি-দের দেখাশুনো করতেই তোমাদের সময় কেটে যায়। তুমি ব্যস্ত লোক, নিজে এসে দেখতে পারোনি। তোমার স্পাইদের মুখে খবর পেয়েছ। তারা তোমাকে ঠিক খবর দেয়নি।

এখানকার থানার দারোগাও রিপোর্ট করেছে এই অদ্ভুত আলোর কথা।

সেটাও ভুল রিপোর্ট।

কেন, ভুল বলছেন কেন? হয় তোমার স্পাই কিংবা দারোগা ভাল করে দেখেনি। অথবা ইচ্ছে করে ভুল খবর দিয়েছে। এসে থেকে শুনছি, আলোটা আকাশের দিকে জ্বলে, মেঘ ফুঁড়ে যায়। কিন্তু আমি নিজের চোখে দেখলাম, আলোটা আকাশের দিকে কিছুক্ষণ জ্বলে বটে, তারপর বেঁকে যায়। এই জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে পড়ে, আর অনেকক্ষণ থাকে। অর্থাৎ টোবি দত্ত প্রথমে ওপরের দিকে আলো ফেলে যেন বলতে চায়, এই যে দ্যাখো আমার শক্তিশালী আলো। এবার সেই আলো আমি জঙ্গলে ফেলছি।

জঙ্গলে কী আছে?

সেটাই তো এখন আমরা দেখতে যাব। এরকম একটা সংকেত সে দিয়ে যাচ্ছে, কেউ গ্রাহ্য করেনি। এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটাকে চাপা দেওয়ার জন্য ইউ এফ ও, টি উ এফ ওর ধাপ্পা দেওয়া হয়েছে। খবরের কাগজে, রেডিয়োতে ইউ এফ ও নিয়েই গালগল্প ফাঁদা হয়েছে, এই আলোটার কথা কেউ বিশেষ পাত্তাই দেয়নি!

ইউ এফ ওর ধাপ্পা কে দিয়েছে? আমরা তো দিইনি! পুলিশ থেকে আমরা জানিয়েছি যে কর্নেল সমর চৌধুরীর হেলিকপটার গেছে ওখানে!

হ্যাঁ, কিন্তু তুমি আর সন্তু মনে-মনে বিশ্বাস করে ফেলেছ যে, আর-একটা কোনও উড়ন্ত চাকিও ওখানে আসে! কিন্তু গ্রামের লোক কী বলেছে? গ্রামের লোক সাধারণ হেলিকপটার চেনে না? এখন এমন কোন গ্রাম আছে, যেখানকার লোক হেলিকপটার দেখেনি? নর্থবেঙ্গলের লোক তো আরও বেশি দেখেছে।

হ্যাঁ, হেলিকপটার এখন সবাই চেনে।

তবু এখানকার গ্রামের লোক বলেছে, আগুন ছড়াতে-ছড়াতে আর বিকট শব্দ করতে-করতে একটা কিছু অদ্ভুত আকাশযান এখানে আসে। হঠাৎ সব আলো নিভিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। সন্তু আর আমিও সেরকমটি দেখেছি। ঠিক তো? গ্রামের লোক কি একবারও বলেছে যে, দু-একবার তারা ওইরকম অদ্ভুত উড়ন্ত চাকি দেখেছে, আর দু-একবার দেখেছে কর্নেল চৌধুরীর সাধারণ হেলিকপটার? প্রত্যেকবার তারা একই জিনিস দেখেছে! মণিকা কিংবা তার বাবা হেলিকপটার চেনে না, তা তো নয়!

অনির্বাণ আর সন্তু দুজনেই যেন স্তম্ভিত হয়ে গেল।

অনির্বাণ আস্তে-আস্তে বলল, মাই গড! তার মানে, কর্নেল সমর চৌধুরীই তিনবারের চেয়ে বেশি হেলিকপটার নিয়ে এসেছেন?

কাকাবাবু বললেন, অবশ্যই। তিনি হেলিকপটারটাকে আলোটালো দিয়ে সাজিয়ে, আগুনের পিচকিরি ছোটাতে-ছোটাতে নিয়ে এসেছেন। কেমিক্যাল আগুন সহজেই তৈরি করা যায়, সিনেমায় যেরকম দেখায়!

সন্তু বলল, কর্নেল চৌধুরী যে নিজের মুখেই বললেন, পরশু রাতে উনি হেলিকপটার নিয়ে আসেননি? সেইজন্যই আমি আরও ভাবলাম…

কাকাবাবু বললেন, উনি মিথ্যে কথা বলেছেন!

সন্তু তবু বলল, ওঁর ফ্লাইট লেফটেনান্ট যে সাক্ষী দিলেন…

কাকাবাবু বললেন, তাকে শিখিয়ে রাখা হয়েছিল। উনি জানতেন, আমরা। গিয়েই ওই কথা জিজ্ঞেস করব। সেইজন্য পাশের ঘরে একটি লোককে সাজিয়ে রেখেছিলেন। হয়তো ওই লোকটিকেও তিনি সঙ্গে নিয়ে আসেন!

অনির্বাণ বলল, কর্নেল চৌধুরী এরকম মিথ্যে কথা বলবেন কেন?

কাকাবাবু বললেন, সেটা ওঁকেই জিজ্ঞেস করতে হবে। হয়তো উনি ইউ এফ ও কিংবা উড়ন্ত চাকির গুরুত্ব ছড়িয়ে আনন্দ পান। পৃথিবীতে অন্যান্য জায়গাতেও দেখা গেছে, কোনও-কোনও লোক উড়ন্ত চাকির গুজব ছড়িয়ে মজা করার জন্য ছোট প্লেন কিংবা বেলুন উড়িয়ে উদ্ভট সব কাণ্ড করেছে!

অনির্বাণ বলল, কর্নেল চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করলে উনি নিশ্চয়ই হা-হা করে হেসে উঠে বলবেন, প্র্যাকটিক্যাল জোক! পুলিশকেও ধোঁকা দিয়েছি! ওঁরা, আর্মির লোকেরা পুলিশকে একটু অবজ্ঞার চোখে দেখেন।

কাকাবাবু বললেন, প্র্যাকটিক্যাল জোক হতে পারে, আবার অন্য কিছু হতে পারে।

এবার তিনি জঙ্গলের দিকে ফিরে বললেন, টোবি দত্ত জঙ্গলের মধ্যে আলো ফেলে কিছু দেখাতে চায়। কিন্তু কেউ সেটা দেখতে চায়নি। এইজন্য গাছের ডালপালা ঘেঁটে, রাস্তা মতন বানিয়েছে, যাতে আলোটা যায় অনেক দূর পর্যন্ত!

অনির্বাণ বলল, চলুন, আমরা গিয়ে দেখি।

কাকাবাবু বললেন, হেঁটে যেতে পারলেই ভাল হত। কিন্তু কতদূর যেতে হবে তা তো জানি না। অন্ধকারে ক্রাচ নিয়ে আমি বেশিদূর যেতে পারব না। জিপেই যেতে হবে। আস্তে-আস্তে এই রাস্তাটা ধরে চালাতে বলো!

অনির্বাণ বলল, ড্রাইভার আনিনি। আমিই চালাব।

জঙ্গলের ভেতর এরই মধ্যে অন্ধকার নেমে এসেছে। থেমে গেছে পাখির ডাক। এই বনে মানুষ বিশেষ আসে না, মাঝে-মাঝে হাতির উৎপাত হয় বলে শোনা যায়। হাতিদের যাওয়া-আসার একটা রাস্তা আছে। একবার দুজন কাঠুরেকে হাতির পাল পদদলিত করেছিল। সে প্রায় তিন বছর আগের কথা। টোবি দত্ত তখনও এখানে আসেনি। হাতি দেখাবার জন্য টোবি দত্ত নিশ্চয়ই এদিকটায় আলো ফেলে না।

একটু দূর যাওয়ার পর কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, অনির্বাণ, তুমি জাপানে খোঁজ নিয়েছিলে?

অনির্বাণ বলল, কলকাতার আই বি থেকে জাপানে ফোন করেছিল। আপনি ঠিকই আন্দাজ করেছেন। টোবি দত্ত এক জাপানি মহিলাকে বিয়ে করেছিল। কিছুদিন আগে সেই স্ত্রীটি গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যায়। তারপর থেকেই টোবি দত্তর মাথায় গোলমাল দেখা দেয়। তাকে একটি মানসিক চিকিৎসার হাসপাতালে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছিল। চাকরিও ছাড়তে হয় সেইজন্য।

কাকাবাবু বললেন, হুঁ। আমি এইরকমই কিছু ভেবেছিলাম। টোবি দত্ত এ আর অভদ্র ধরনের ব্যবহার করে। এইরকম স্বভাব নিয়ে কি সে জাপানে গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করতে পারত? জাপানিরা অতি ভদ্র হয়। তা হলে নিশ্চয়ই হঠাৎ কোনও কারণে টোবি দত্তর স্বভাবের পরিবর্তন হয়েছে। এমনও হতে পারে, মাথার গোলমাল হওয়ার পর থেকেই তার সব পুরনো কথা মনে পড়ে গেছে। এখানকার লোকেরা এক সময় তার ওপর কত খারাপ ব্যবহার করেছিল, সেইসব ভেবে-ভেবে রাগে ফুঁসতে থাকে।

অনিবার্ণ বলল, রাগ জিনিসটা কিন্তু মানুষের খুব ক্ষতি করে।

কাকাবাবু বললেন, মাঝে-মাঝে রেগে ওঠা ভাল। সব সময় ভাল নয়।

সন্তু জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা কাকাবাবু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনও রাগ করতেন?

কাকাবাবু বললেন, নিশ্চয়ই করতেন। হয়তো রেগে চঁচামেচি করতেন না। ভেতরে-ভেতরে ফুঁসতেন। ওঁর একটা কবিতা আছে, নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস … সেটা পড়লেই মনে হয়, লেখার সময় উনি খুব রেগে ছিলেন।

অনির্বাণ বলল, আর তো রাস্তা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বড়বড় ঝোপ ঠেলে গাড়ি চালানো মুশকিল।

কাকাবাবু ঝুঁকে দুপাশ দেখে বললেন, এখানেও কিছু কিছু গাছের ডাল কাটা হয়েছে। আলোটা এদিকেই আসে। তুমি যতদূর পারো চালাও। তারপর নেমে পড়তে হবে।

অনির্বাণ বলল, জঙ্গলে আর কিছুই তো দেখা গেল না এ পর্যন্ত। এদিকে আলো ফেলে কী দেখাতে চায় টোবি দত্ত?

কাকাবাবু হেসে ফেলে বললেন, হয়তো শেষপর্যন্ত দেখা যাবে কিছুই নেই। তখন যেন আমার ওপর সব দোষ চাপিয়ো না। ভুল তো হতেই পারে। এটা আমার একটা থিয়োরি।

একটু বাদে জিপটা থেমে গেল। জল-কাদায় চাকা পিছলে যাচ্ছে, সামনে বড়বড় ঝোপ।

অনির্বাণ বলল, আর বোধ হয় সামনে এগিয়ে লাভ নেই। আজকের মতন এখান থেকেই ফেরা যাক।

কাকাবাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন, নেমে পড়ো, নেমে পড়ো!

তিনিই প্রথম নেমে একটা পেন্সিল টর্চ জ্বাললেন। কাছেই একটা গাছের সদ্য কাটা ডাল পড়ে আছে। ডালটা তুলে নিয়ে পরীক্ষা করে বললেন, হ্যাঁ, এইদিকেই এগোতে হবে।

ঝোপঝাড় ঠেলে-ঠেলে যেতে কাকাবাবুরই অসুবিধে হচ্ছে বেশি। তবু তিনি যাচ্ছেন আগে-আগে।

অনির্বাণ বলল, এই সময় যদি একটা হাতির পাল এসে পড়ে?

সন্তু বলল, তা হলে আমাদের খুঁড়ে তুলে লোফালুফি খেলবে!

কাকাবাবু বললেন, কোনওক্রমে যদি একটা হাতির পিঠে চেপে বসতে পারিস, তা হলে হাতিটা আর তোকে নামাতে পারবে না।

অনির্বাণ বলল, অত সহজ নয়। হাতিটা তখন একটা বড় গাছের গুঁড়িতে পিঠ ঘষবে। তাতেই চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে যাব!

সন্তু বলল, সামনে একটা আলো!

কাকাবাবু সঙ্গে-সঙ্গে টর্চ নিভিয়ে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন, চুপ, কেউ শব্দ কোরো না। ঝোপঝাড়ের আড়ালে, বেশ খানিকটা দূরে দেখা যাচ্ছে মিটমিটে আলো। সেই আলোর আশেপাশে কী আছে, তা দেখা যাচ্ছে না। কোনও শব্দও নেই।

একটুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ওরা টিপে টিপে এগোতে লাগল।

কাকাবাবু মাঝে-মাঝে মাটির দিকে টর্চ জ্বেলে রাস্তা দেখে নিচ্ছেন।

আরও খানিকটা যাওয়ার পর চোখে পড়ল একটা ভাঙা বাড়ি। প্রায় ধ্বংসস্তৃপই বলা যায়। কোনও এক সময় হয়তো কোচবিহারের রাজারা এখানে এই নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে শখের বিশ্রাম ভবন বানিয়েছিলেন। এখন ভেঙেচুরে শেষ হয়ে যাচ্ছে, কেউ খবরও রাখে না। বাড়িটার একটা কোণ থেকে আলোটা আসছে।

কাকাবাবু বললেন, টোবি দত্ত তা হলে এই বাড়িটাকেই দেখায়।

অনির্বাণ বলল, এইরকম একটা ভাঙা বাড়ি দেখাবে কী জন্য? আলো জ্বলছে যখন, সাধারণ চোর-ডাকাতদের আখড়া হতে পারে। তার জন্য ওর এত আলোটালো ফেলার কী দরকার?

কাকাবাবু বললেন, ধরো, যদি তোমাদের ইউ এফ ও কিংবা উড়ন্ত চাকির অদ্ভুত প্রাণীরা এখানে বাসা বেঁধে থাকে?

অনির্বাণ বলল, উড়ন্ত চাকি যে আসেনি, তা তো প্রমাণ হয়ে গেছে।

কাকাবাবু বললেন, কিছুই প্রমাণ হয়নি। কারা এই ভাঙা বাড়িতে আলো জ্বেলেছে, তা না দেখা পর্যন্ত সবটা বোঝা যাবে না।

কাকাবাবু আবার এগোতে যেতেই অনির্বাণ তাঁকে বাধা দিয়ে বলল, দাঁড়ান। ওর ভেতরে ঠিক কতজন আছে তার ঠিক নেই। আমরা মাত্র তিনজন। এক কাজ করা যাক, আমরা এখন ফিরে যাই। তারপর পুলিশ ফোর্স নিয়ে আবার এসে পুরো বাড়িটা ঘিরে ফেলব।

কাকাবাবু একটুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, ফিরে যাব? ভেতরটা দেখার এত ইচ্ছে হচ্ছে, ফিরে এসে যদি কিছুই না পাই! ততক্ষণে যদি সব ভোঁ-ভাঁ হয়ে যায়? তুমি বরং ফিরে যাও অনির্বাণ। আরও পুলিশ ডেকে আনন। আমি আর সন্তু এই দিকটা সামলাই ততক্ষণ।

অনির্বাণ বলল, অসম্ভব! আপনাদের দুজনকে ফেলে রেখে আমি চলে যেতে পারি? আমিও তা হলে এখানে থাকব।

০৮. দুপুরবেলা বেশ জোর বৃষ্টি

দুপুরবেলা বেশ জোর বৃষ্টি হয়ে গেল খানিকক্ষণ। তারপর আকাশ একেবারে পরিষ্কার। বেশ কয়েকদিন পর ঝকঝকে নীল আকাশ দেখা গেল।

হেডমাস্টারমশাই ইস্কুল থেকে ফেরার পর সবাই মিলে বারান্দায় চা খেতে বসলেন।

কথায়-কথায় হেডমাস্টারমশাই বললেন, দিনহাটার একটা ইস্কুলে কে একজন লোক দু লক্ষ টাকা দান করেছে। হঠাৎ এত টাকা পেয়ে সবাই অবাক! টাকাটা কে দিয়েছে, তা জানা যাচ্ছে না।

কাকাবাবু বললেন, ত্যাপা নামে একটি গরিবের ছেলে একসময় ওই ইস্কুলে পড়ত। বিদেশে গিয়ে সে খুব বড়লোক হয়েছে। খুব সম্ভবত টাকাটা সে-ই দান করেছে!

হেডমাস্টারমশাই বললেন, আমাদের গ্রামের টোবি দত্তও তো খুব বড়লোক। তার মামাদের অত বড় বাড়িটা কিনেছে। আমাদের ইস্কুলের বাড়িটা সারানো দরকার, সে কিছু টাকা দিলে পারত! দিয়েছে মোটে পাঁচ হাজার টাকা!

মণিকা গরম-গরম বেগুনি আর পেঁয়াজি ভেজে এনেছে মুড়ির সঙ্গে। তোফা খাওয়া হল।

মণিকা জিজ্ঞেস করল, কাকাবাবু আজ সন্ধেবেলা কী করা হবে? মিলিটারির সেই সাহেব আসবেন?

কাকাবাবু বললেন, ঠিক জানি না। কোনও খবর পাইনি।

মণিকা বলল, আজ কিন্তু আমি আপনাদের সঙ্গে যাব। সকালে আপনারা কোচবিহার শহরে গিয়েছিলেন, তখন আমাকে ইস্কুলে যেতে হল!

কাকাবাবু হাসলেন।

একটু বাদে হেডমাস্টারমশাই বেরিয়ে গেলেন এক জায়গায় ছাত্র পড়াতে। মণিকা বাথরুমে গা ধুতে গেল।

কাকাবাবু সন্তুকে ফিসফিস করে বললেন, আজ সন্ধের সময় আমরা এক জায়গায় যাব। সেখানে মণিকাকে কিছুতেই নিয়ে যাওয়া যাবে না। কিন্তু ও ছাড়তে চাইবে না। কী করা যায় বল তো?

সন্তু বলল, আমরা চুপিচুপি এখনই কেটে পরি?

কাকাবাবু বললেন, আরও ঘণ্টাখানেক দেরি আছে। তা ছাড়া ওকে কিছু না বলে গেলে বেচারি খুব দুঃখ পাবে। একটা কাজ করা যায়। তুই বরং আজ থেকে যা এখানে। তুই ওর সঙ্গে গল্প করবি। আমি ঘুরে আসি।

সন্তু সঙ্গে-সঙ্গে প্রবল আপত্তি জানিয়ে বলল, না, আমি থাকব না। আমি যাব!

কাকাবাবু বললেন, তা হলে এক কাজ কর। দুজনে একসঙ্গে বেরনো যাবে না। তুই আগেই সরে পড়। তুই গিয়ে নদীর ধারে লুকিয়ে বসে থাক। সেই প্রথমবার যেখানে বসেছিলাম, যেখানে তোকে কুকুরটা আক্রমণ করেছিল। ঝোপঝাড়ের মধ্যে বসে থাকবি, নদীর ওপারেও থাকতে পারিস, কেউ যেন তোকে দেখতে না পায়।

সন্তু তক্ষুনি জুতো-মোজা পরে তৈরি হয়ে নিল। তারপর এক দৌড়ে বেরিয়ে গেল রাস্তায়।

কিছুক্ষণ পর কাকাবাবু ক্রাচ দুটো বগলে নিয়ে যেই ঘর থেকে বেরিয়েছেন, অমনই মণিকা জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাচ্ছেন?

কাকাবাবু বললেন, যাই, একটু বেড়িয়ে আসি।

মণিকা বলল, সন্তু কোথায় গেল?

কাকাবাবু অম্লানবদনে বললেন, ও তো পাঁচটার বাস ধরে কোচবিহার টাউনে চলে গেল!

কেন?

ও যে তোমাদের আগুন পাখির ছবিগুলো তুলেছিল, তার প্রিন্টগুলো দেখার জন্য ছটফট করছিল। তা ছাড়া, কলকাতায় একটা ফোন করতে হবে।

রাত্তিরে ফিরবে কী করে? আর তো বাস নেই!

অনির্বাণ যদি গাড়ি নিয়ে আসে, তা হলে তার সঙ্গে ফিরবে। না হলে থেকে যাবে।

আমাকে না বলে চলে গেল, ভারী দুষ্টু তো! দাঁড়ান কাকাবাবু, আমি চটি পরে আসি, আমিও যাব আপনার সঙ্গে!

কাকাবাবু অপলকভাবে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইলেন মণিকার দিকে। এই মেয়েটির সাহস আছে। ধরাবাঁধা গণ্ডির বাইরে যেতে চায়। এরকম মেয়ে বেশি দেখা যায় না। তবু আজ ওকে সঙ্গে নেওয়ার ঝুঁকি খুব বেশি।

তিনি আস্তে-আস্তে মাথা নেড়ে বললেন, না মণিকা, আজ আমি একাই। যাব।

মণিকা ভুরু তুলে বলল, এই গ্রামের মধ্যে আপনি একা কোথায় বেড়াবেন? আমি আপনাকে সব চিনিয়ে দেব।

কাকাবাবু নরম গলায় বললেন, চিনিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। আমি নদীর ধারে ঘুরব। তোমাকে সঙ্গে আসতে হবে না। শুধু তাই নয়, তোমাকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে, এর পরেও তুমি একা একা বেরিয়ে পড়বে না। আমি যতক্ষণ না ফিরি, তুমি বাড়িতে থাকবে।

মণিকা কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, কেন, আমি আপনার সঙ্গে গেলে কী হয়েছে? কেন নেবেন না আমাকে?

কাকাবাবু বললেন, ফিরে এসে বলব। ফিরে এসে তোমাকে একটা অদ্ভুত গল্প শোনাব। কিন্তু প্রতিজ্ঞা রইল, তুমি কিছুতেই আজ রাতে বাইরে বেরোবে না।

কাকাবাবু মণিকার মাথার চুলে হাত বুলিয়ে একটু আদর করলেন। তারপর মণিকাকে সেই অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রেখে বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে।

গ্রামের রাস্তা দিয়ে তিনি হাঁটতে লাগলেন আস্তে-আস্তে। যেন তিনি অলসভাবে ভ্রমণ করছেন। টোবি দত্তর বাড়ির ধারেকাছে ঘেঁষলেন না। নদীর ধারে যখন পৌঁছলেন, তখন বিকেল প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমের আকাশ। লাল। সন্তুকে কোথাও দেখা গেল না। কাকাবাবু আকাশের দিকে তাকিয়ে একটুক্ষণ সূর্যাস্তের শোভা দেখলেন।

নদীর ওপর থেকে একটা শিসের শব্দ ভেসে এল।

কাকাবাবু দুবার মাথা ঝোঁকালেন। তারপর নেমে পড়লেন নদীতে। নদীতে জল বেশি নেই, কিন্তু মাঝখানে বড় বড় পাথর। অন্য লোকেরা অনায়াসে বসে যেতে পারে। কিন্তু ক্রাচ নিয়ে যাওয়ার বেশ অসুবিধে। কাকাবাবু খোঁড়া পা-টা ঠিকমতন মাটিতে পাততে পারেন না, তবে সেই পায়েও একটা বিশেষ ধরনের জুতো পরে থাকেন। সেই জুতো খোলার অনেক ঝামেলা বলে তিনি প্যান্ট-জুতো ভিজিয়ে ফেললেন।

অন্য পাড়ে ওঠার পর সন্তু একটা ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে বলল, আমি টোবি দত্তর বাড়ির দিকে নজর রেখেছি। ছাদে কাউকে দেখা যায়নি।

কাকাবাবু সে-কথায় কোনও গুরুত্ব না দিয়ে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, দ্যাখ, কিছু কিছু গাছের ডাল কেউ হেঁটেছে বোঝা যাচ্ছে।

সন্তু বলল, জঙ্গলের গাছ কাটা তো অপরাধ।

কাকাবাবু বললেন, পুরো গাছ কাটেনি। ডালপালা ছাঁটা তেমন অপরাধ নয়। মনে হয়, জঙ্গলের মধ্যে কেউ একটা রাস্তা বানাতে চেয়েছে।

কাকাবাবু ঘড়ি দেখলেন। তখনই নদীর এ-ধারে একটা গাড়ির আওয়াজ শোনা গেল। একটা কালো রঙের জিপ গাড়ি থেকে নেমে এল অনির্বাণ।

কাকাবাবুর পাশে দাঁড়িয়ে সে জিজ্ঞেস করল, আমরা কোন দিকে যাব?

কাকাবাবু বললেন, একটু দাঁড়াও। আগে ব্যাপারটা একটু বুঝে নিতে হবে।

এবার তিনি টোবি দত্তর বাড়ির দিকে ফিরে দাঁড়ালেন। আবছা অন্ধকারে বাড়িটাকে জনমনুষ্যহীন মনে হয়।

কাকাবাবু বললেন, টোবি দত্তর বাড়ির ছাদে গভীর রাতে একটা জোরালো আলো জ্বলে। কেন সে আলোটা জ্বালে, এর একটা সহজ উত্তর আমাদের মনে আসেনি।

অনির্বাণ বলল, কাকাবাবু, আপনার কাছে উত্তরটা সহজ মনে হতে পারে, আমাদের কাছে কিন্তু খুবই জটিল।

কাকাবাবু বললেন, জটিল কেন হবে? আলোটা সে জ্বালে দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য।

অনির্বাণ বলল, হ্যাঁ, তা ঠিক। কিন্তু কার দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য?

কাকাবাবু বললেন, তোমার!

অনির্বাণ চমকে গিয়ে খানিকটা অবিশ্বাসের সুরে বলল, আমার জন্য?

কাকাবাবু বললেন, হ্যাঁ, তোমার মতন পুলিশের বড়কর্তাদের জন্য! সে গোপনে কিছু করতে চাইলে নিশ্চয়ই এরকম একটা তেজি আলো জ্বালাত না। এই আলো তো লোকের নজরে পড়বেই। সে জানান দিতে চায়, আমি এরকম একটা আলো জ্বেলেছি, তোমরা এসে দ্যাখো!

আমরা এসে কী দেখব?

তুমি পুলিশের বড়কর্তা। মন্ত্রীদের আর ভি আই পি-দের দেখাশুনো করতেই তোমাদের সময় কেটে যায়। তুমি ব্যস্ত লোক, নিজে এসে দেখতে পারোনি। তোমার স্পাইদের মুখে খবর পেয়েছ। তারা তোমাকে ঠিক খবর দেয়নি।

এখানকার থানার দারোগাও রিপোর্ট করেছে এই অদ্ভুত আলোর কথা।

সেটাও ভুল রিপোর্ট।

কেন, ভুল বলছেন কেন? হয় তোমার স্পাই কিংবা দারোগা ভাল করে দেখেনি। অথবা ইচ্ছে করে ভুল খবর দিয়েছে। এসে থেকে শুনছি, আলোটা আকাশের দিকে জ্বলে, মেঘ ফুঁড়ে যায়। কিন্তু আমি নিজের চোখে দেখলাম, আলোটা আকাশের দিকে কিছুক্ষণ জ্বলে বটে, তারপর বেঁকে যায়। এই জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে পড়ে, আর অনেকক্ষণ থাকে। অর্থাৎ টোবি দত্ত প্রথমে ওপরের দিকে আলো ফেলে যেন বলতে চায়, এই যে দ্যাখো আমার শক্তিশালী আলো। এবার সেই আলো আমি জঙ্গলে ফেলছি।

জঙ্গলে কী আছে?

সেটাই তো এখন আমরা দেখতে যাব। এরকম একটা সংকেত সে দিয়ে যাচ্ছে, কেউ গ্রাহ্য করেনি। এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটাকে চাপা দেওয়ার জন্য ইউ এফ ও, টি উ এফ ওর ধাপ্পা দেওয়া হয়েছে। খবরের কাগজে, রেডিয়োতে ইউ এফ ও নিয়েই গালগল্প ফাঁদা হয়েছে, এই আলোটার কথা কেউ বিশেষ পাত্তাই দেয়নি!

ইউ এফ ওর ধাপ্পা কে দিয়েছে? আমরা তো দিইনি! পুলিশ থেকে আমরা জানিয়েছি যে কর্নেল সমর চৌধুরীর হেলিকপটার গেছে ওখানে!

হ্যাঁ, কিন্তু তুমি আর সন্তু মনে-মনে বিশ্বাস করে ফেলেছ যে, আর-একটা কোনও উড়ন্ত চাকিও ওখানে আসে! কিন্তু গ্রামের লোক কী বলেছে? গ্রামের লোক সাধারণ হেলিকপটার চেনে না? এখন এমন কোন গ্রাম আছে, যেখানকার লোক হেলিকপটার দেখেনি? নর্থবেঙ্গলের লোক তো আরও বেশি দেখেছে।

হ্যাঁ, হেলিকপটার এখন সবাই চেনে।

তবু এখানকার গ্রামের লোক বলেছে, আগুন ছড়াতে-ছড়াতে আর বিকট শব্দ করতে-করতে একটা কিছু অদ্ভুত আকাশযান এখানে আসে। হঠাৎ সব আলো নিভিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়। সন্তু আর আমিও সেরকমটি দেখেছি। ঠিক তো? গ্রামের লোক কি একবারও বলেছে যে, দু-একবার তারা ওইরকম অদ্ভুত উড়ন্ত চাকি দেখেছে, আর দু-একবার দেখেছে কর্নেল চৌধুরীর সাধারণ হেলিকপটার? প্রত্যেকবার তারা একই জিনিস দেখেছে! মণিকা কিংবা তার বাবা হেলিকপটার চেনে না, তা তো নয়!

অনির্বাণ আর সন্তু দুজনেই যেন স্তম্ভিত হয়ে গেল।

অনির্বাণ আস্তে-আস্তে বলল, মাই গড! তার মানে, কর্নেল সমর চৌধুরীই তিনবারের চেয়ে বেশি হেলিকপটার নিয়ে এসেছেন?

কাকাবাবু বললেন, অবশ্যই। তিনি হেলিকপটারটাকে আলোটালো দিয়ে সাজিয়ে, আগুনের পিচকিরি ছোটাতে-ছোটাতে নিয়ে এসেছেন। কেমিক্যাল আগুন সহজেই তৈরি করা যায়, সিনেমায় যেরকম দেখায়!

সন্তু বলল, কর্নেল চৌধুরী যে নিজের মুখেই বললেন, পরশু রাতে উনি হেলিকপটার নিয়ে আসেননি? সেইজন্যই আমি আরও ভাবলাম…

কাকাবাবু বললেন, উনি মিথ্যে কথা বলেছেন!

সন্তু তবু বলল, ওঁর ফ্লাইট লেফটেনান্ট যে সাক্ষী দিলেন…

কাকাবাবু বললেন, তাকে শিখিয়ে রাখা হয়েছিল। উনি জানতেন, আমরা। গিয়েই ওই কথা জিজ্ঞেস করব। সেইজন্য পাশের ঘরে একটি লোককে সাজিয়ে রেখেছিলেন। হয়তো ওই লোকটিকেও তিনি সঙ্গে নিয়ে আসেন!

অনির্বাণ বলল, কর্নেল চৌধুরী এরকম মিথ্যে কথা বলবেন কেন?

কাকাবাবু বললেন, সেটা ওঁকেই জিজ্ঞেস করতে হবে। হয়তো উনি ইউ এফ ও কিংবা উড়ন্ত চাকির গুরুত্ব ছড়িয়ে আনন্দ পান। পৃথিবীতে অন্যান্য জায়গাতেও দেখা গেছে, কোনও-কোনও লোক উড়ন্ত চাকির গুজব ছড়িয়ে মজা করার জন্য ছোট প্লেন কিংবা বেলুন উড়িয়ে উদ্ভট সব কাণ্ড করেছে!

অনির্বাণ বলল, কর্নেল চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করলে উনি নিশ্চয়ই হা-হা করে হেসে উঠে বলবেন, প্র্যাকটিক্যাল জোক! পুলিশকেও ধোঁকা দিয়েছি! ওঁরা, আর্মির লোকেরা পুলিশকে একটু অবজ্ঞার চোখে দেখেন।

কাকাবাবু বললেন, প্র্যাকটিক্যাল জোক হতে পারে, আবার অন্য কিছু হতে পারে।

এবার তিনি জঙ্গলের দিকে ফিরে বললেন, টোবি দত্ত জঙ্গলের মধ্যে আলো ফেলে কিছু দেখাতে চায়। কিন্তু কেউ সেটা দেখতে চায়নি। এইজন্য গাছের ডালপালা ঘেঁটে, রাস্তা মতন বানিয়েছে, যাতে আলোটা যায় অনেক দূর পর্যন্ত!

অনির্বাণ বলল, চলুন, আমরা গিয়ে দেখি।

কাকাবাবু বললেন, হেঁটে যেতে পারলেই ভাল হত। কিন্তু কতদূর যেতে হবে তা তো জানি না। অন্ধকারে ক্রাচ নিয়ে আমি বেশিদূর যেতে পারব না। জিপেই যেতে হবে। আস্তে-আস্তে এই রাস্তাটা ধরে চালাতে বলো!

অনির্বাণ বলল, ড্রাইভার আনিনি। আমিই চালাব।

জঙ্গলের ভেতর এরই মধ্যে অন্ধকার নেমে এসেছে। থেমে গেছে পাখির ডাক। এই বনে মানুষ বিশেষ আসে না, মাঝে-মাঝে হাতির উৎপাত হয় বলে শোনা যায়। হাতিদের যাওয়া-আসার একটা রাস্তা আছে। একবার দুজন কাঠুরেকে হাতির পাল পদদলিত করেছিল। সে প্রায় তিন বছর আগের কথা। টোবি দত্ত তখনও এখানে আসেনি। হাতি দেখাবার জন্য টোবি দত্ত নিশ্চয়ই এদিকটায় আলো ফেলে না।

একটু দূর যাওয়ার পর কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, অনির্বাণ, তুমি জাপানে খোঁজ নিয়েছিলে?

অনির্বাণ বলল, কলকাতার আই বি থেকে জাপানে ফোন করেছিল। আপনি ঠিকই আন্দাজ করেছেন। টোবি দত্ত এক জাপানি মহিলাকে বিয়ে করেছিল। কিছুদিন আগে সেই স্ত্রীটি গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যায়। তারপর থেকেই টোবি দত্তর মাথায় গোলমাল দেখা দেয়। তাকে একটি মানসিক চিকিৎসার হাসপাতালে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছিল। চাকরিও ছাড়তে হয় সেইজন্য।

কাকাবাবু বললেন, হুঁ। আমি এইরকমই কিছু ভেবেছিলাম। টোবি দত্ত এ আর অভদ্র ধরনের ব্যবহার করে। এইরকম স্বভাব নিয়ে কি সে জাপানে গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করতে পারত? জাপানিরা অতি ভদ্র হয়। তা হলে নিশ্চয়ই হঠাৎ কোনও কারণে টোবি দত্তর স্বভাবের পরিবর্তন হয়েছে। এমনও হতে পারে, মাথার গোলমাল হওয়ার পর থেকেই তার সব পুরনো কথা মনে পড়ে গেছে। এখানকার লোকেরা এক সময় তার ওপর কত খারাপ ব্যবহার করেছিল, সেইসব ভেবে-ভেবে রাগে ফুঁসতে থাকে।

অনিবার্ণ বলল, রাগ জিনিসটা কিন্তু মানুষের খুব ক্ষতি করে।

কাকাবাবু বললেন, মাঝে-মাঝে রেগে ওঠা ভাল। সব সময় ভাল নয়।

সন্তু জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা কাকাবাবু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনও রাগ করতেন?

কাকাবাবু বললেন, নিশ্চয়ই করতেন। হয়তো রেগে চঁচামেচি করতেন না। ভেতরে-ভেতরে ফুঁসতেন। ওঁর একটা কবিতা আছে, নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস … সেটা পড়লেই মনে হয়, লেখার সময় উনি খুব রেগে ছিলেন।

অনির্বাণ বলল, আর তো রাস্তা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বড়বড় ঝোপ ঠেলে গাড়ি চালানো মুশকিল।

কাকাবাবু ঝুঁকে দুপাশ দেখে বললেন, এখানেও কিছু কিছু গাছের ডাল কাটা হয়েছে। আলোটা এদিকেই আসে। তুমি যতদূর পারো চালাও। তারপর নেমে পড়তে হবে।

অনির্বাণ বলল, জঙ্গলে আর কিছুই তো দেখা গেল না এ পর্যন্ত। এদিকে আলো ফেলে কী দেখাতে চায় টোবি দত্ত?

কাকাবাবু হেসে ফেলে বললেন, হয়তো শেষপর্যন্ত দেখা যাবে কিছুই নেই। তখন যেন আমার ওপর সব দোষ চাপিয়ো না। ভুল তো হতেই পারে। এটা আমার একটা থিয়োরি।

একটু বাদে জিপটা থেমে গেল। জল-কাদায় চাকা পিছলে যাচ্ছে, সামনে বড়বড় ঝোপ।

অনির্বাণ বলল, আর বোধ হয় সামনে এগিয়ে লাভ নেই। আজকের মতন এখান থেকেই ফেরা যাক।

কাকাবাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন, নেমে পড়ো, নেমে পড়ো!

তিনিই প্রথম নেমে একটা পেন্সিল টর্চ জ্বাললেন। কাছেই একটা গাছের সদ্য কাটা ডাল পড়ে আছে। ডালটা তুলে নিয়ে পরীক্ষা করে বললেন, হ্যাঁ, এইদিকেই এগোতে হবে।

ঝোপঝাড় ঠেলে-ঠেলে যেতে কাকাবাবুরই অসুবিধে হচ্ছে বেশি। তবু তিনি যাচ্ছেন আগে-আগে।

অনির্বাণ বলল, এই সময় যদি একটা হাতির পাল এসে পড়ে?

সন্তু বলল, তা হলে আমাদের খুঁড়ে তুলে লোফালুফি খেলবে!

কাকাবাবু বললেন, কোনওক্রমে যদি একটা হাতির পিঠে চেপে বসতে পারিস, তা হলে হাতিটা আর তোকে নামাতে পারবে না।

অনির্বাণ বলল, অত সহজ নয়। হাতিটা তখন একটা বড় গাছের গুঁড়িতে পিঠ ঘষবে। তাতেই চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে যাব!

সন্তু বলল, সামনে একটা আলো!

কাকাবাবু সঙ্গে-সঙ্গে টর্চ নিভিয়ে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন, চুপ, কেউ শব্দ কোরো না। ঝোপঝাড়ের আড়ালে, বেশ খানিকটা দূরে দেখা যাচ্ছে মিটমিটে আলো। সেই আলোর আশেপাশে কী আছে, তা দেখা যাচ্ছে না। কোনও শব্দও নেই।

একটুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ওরা টিপে টিপে এগোতে লাগল।

কাকাবাবু মাঝে-মাঝে মাটির দিকে টর্চ জ্বেলে রাস্তা দেখে নিচ্ছেন।

আরও খানিকটা যাওয়ার পর চোখে পড়ল একটা ভাঙা বাড়ি। প্রায় ধ্বংসস্তৃপই বলা যায়। কোনও এক সময় হয়তো কোচবিহারের রাজারা এখানে এই নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে শখের বিশ্রাম ভবন বানিয়েছিলেন। এখন ভেঙেচুরে শেষ হয়ে যাচ্ছে, কেউ খবরও রাখে না। বাড়িটার একটা কোণ থেকে আলোটা আসছে।

কাকাবাবু বললেন, টোবি দত্ত তা হলে এই বাড়িটাকেই দেখায়।

অনির্বাণ বলল, এইরকম একটা ভাঙা বাড়ি দেখাবে কী জন্য? আলো জ্বলছে যখন, সাধারণ চোর-ডাকাতদের আখড়া হতে পারে। তার জন্য ওর এত আলোটালো ফেলার কী দরকার?

কাকাবাবু বললেন, ধরো, যদি তোমাদের ইউ এফ ও কিংবা উড়ন্ত চাকির অদ্ভুত প্রাণীরা এখানে বাসা বেঁধে থাকে?

অনির্বাণ বলল, উড়ন্ত চাকি যে আসেনি, তা তো প্রমাণ হয়ে গেছে।

কাকাবাবু বললেন, কিছুই প্রমাণ হয়নি। কারা এই ভাঙা বাড়িতে আলো জ্বেলেছে, তা না দেখা পর্যন্ত সবটা বোঝা যাবে না।

কাকাবাবু আবার এগোতে যেতেই অনির্বাণ তাঁকে বাধা দিয়ে বলল, দাঁড়ান। ওর ভেতরে ঠিক কতজন আছে তার ঠিক নেই। আমরা মাত্র তিনজন। এক কাজ করা যাক, আমরা এখন ফিরে যাই। তারপর পুলিশ ফোর্স নিয়ে আবার এসে পুরো বাড়িটা ঘিরে ফেলব।

কাকাবাবু একটুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, ফিরে যাব? ভেতরটা দেখার এত ইচ্ছে হচ্ছে, ফিরে এসে যদি কিছুই না পাই! ততক্ষণে যদি সব ভোঁ-ভাঁ হয়ে যায়? তুমি বরং ফিরে যাও অনির্বাণ। আরও পুলিশ ডেকে আনন। আমি আর সন্তু এই দিকটা সামলাই ততক্ষণ।

অনির্বাণ বলল, অসম্ভব! আপনাদের দুজনকে ফেলে রেখে আমি চলে যেতে পারি? আমিও তা হলে এখানে থাকব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *