০৮. এয়ারপোর্টে

কাকাবাবু সন্তুর প্রথম ফোন পাওয়ার পরই বেরিয়ে গিয়েছিলেন, দুপুরে আর বাড়িতে আসেননি। ফিরলেন প্রায় রাত আটটার সময়।

সারা দিনের রিপোর্ট দেওয়ার জন্য সন্তু ছটফট করছিল। কাকাবাবু না ফিরলে সে বাড়ি থেকে বেরোতে পারছিল না। একবার শুধু দৌড়ে গিয়ে ছবিগুলো নিয়ে এসেছে। অনেকগুলো ছবিই উঠেছে বেশ ভাল।

কাকাবাবু ক্লান্ত হয়ে ফিরেছিলেন। প্রথমেই স্নান করলেন, তারপর নিজের ঘরে এক কাপ কফি নিয়ে বসার পর সন্তু বলল, কাকাবাবু, আমি সকাল পৌনে দশটা থেকে বিকেল চারটে পর্যন্ত অসিত ধরকে ফলো করেছি, তারপর ওকে হারিয়ে ফেললাম। আর কোনও উপায় ছিল না। এতে কোনও কাজ হল কি?

কাকাবাবু বললেন, তুই আগাগোড়া দারুণ উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দিয়েছিস। কোনও পেশাদার গোয়েন্দাও এত ভালভাবে কাজটা করতে পারত না।

সন্তু বলল, চুনির মালাটা যে অসিত ধর নিয়েছে, সেটা তো বোঝা গেছে। সেই মালাটা আছে গ্রিন ভিউ হোটেলে একটা মেয়ের কাছে। সেটা কী করে উদ্ধার হবে?

কাকাবাবু একগাল হেসে বললেন, ও মালাটা নকল।

সন্তু আঁতকে উঠে বলল, অ্যাঁ নকল? কী করে জানা গেল?

কাকাবাবু বললেন, অসিত ধর অতি চালাক। ও জানত, ওকে ফলো করা হবে। তাই আগাগোড়া তোদের সঙ্গে মজা করেছে। বউবাজারে গয়নার দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, সেখানে কোনও মালা বিক্রি করেনি, কিছু কেনেওনি। চোরাই চুনির মালার জন্য সে-দোকান সার্চ করা হয়েছিল, সব কর্মচারীরা একবাক্যে বলেছে, ওরকম কোনও মালা দোকানে আসেনি। অসিত। ওখানে কয়েকটা আংটি নিয়ে দর করছিল। শেষ পর্যন্ত কিছু কেনেনি অবশ্য! ব্যাঙ্কে গিয়েও সে কোনও চেক কিংবা টাকা জমা দেয়নি, শুধু দু হাজার টাকা। তুলেছে। সেটা কিছুই না। থিয়েটার রোডে একটা বাড়িতে যে-ফ্ল্যাটে গিয়েছিল, সেই ফ্ল্যাটের মালিক অসিতের মামা হন। অসিত তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। সেই ভদ্রলোক আগে পুলিশে কাজ করতেন, এখন রিটায়ার করেছেন। তাঁকে কোনওক্রমেই সন্দেহ করা যায় না।

সন্তু বলল, দাঁড়াও, দাঁড়াও! অসিত ধর যে থিয়েটার রোডের একটা বাড়িতে গিয়েছিল, সেটা তো তোমাকে এখনও বলিনি। তুমি জানলে কী করে?

কাকাবাবু কয়েক পলক সন্তুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, তুই সাদা গাড়িটা দেখিসনি?

সন্তু বলল, হ্যাঁ, দেখেছি! ওটা কাদের গাড়ি?

পুলিশের গাড়ি!

আমি তো ভেবেছিলাম গুণ্ডাদের। কালো চশমা-পরা লোকটাকে আমার গুণ্ডা মনে হয়েছিল।

অনেক সময় গুণ্ডা আর সাধারণ পুলিশদের চেহারার তফাত বোঝা যায়। সাদা গাড়িতে সাদা পোশাকে পুলিশ ছিল।

হঠাৎ সন্তুর খুব অভিমান হল। পুলিশই যদি সারাদিন অসিতকে ফলো করে যাবে, তা হলে সন্তুর এত কষ্ট করার কী দরকার ছিল?…

সন্তু অভিযোগের সুরে বলল, পুলিশ ছিল, তা হলে কাকাবাবু, তুমি আমাকে পাঠালে কেন?

কাকাবাবু সন্তুর তোলা ছবিগুলো দেখতে-দেখতে বললেন, পুলিশ যে যাবে, তা আমি আগে জানতাম না রে সন্তু। পুলিশ কমিশনার বলেছিল, অসিতের ব্যাপারে আমাকে কোনও সাহায্য করতে পারবে না। তবু সে গোয়েন্দা দফতরকে বলে অসিতের পেছনে লোক লাগিয়েছিল। আমি পরে জেনেছি। তোর যাতে কোনও বিপদ না হয়, সেদিকেও নজর রেখেছিল পুলিশ। যাই হোক, তুই যৈমনভাবে দেখেছিস, তেমনভাবে তো পুলিশ দেখতে পারে না। তুই আজ পাকা ডিটেকটিভের মতন কাজ করেছিস। পুলিশ তো এত ছবি তোলেনি!

সন্তু তবু নিরাশ গলায় বলল, চুনির মালাটা নকল? আমি ভেবেছিলাম..

কাকাবাবু বললেন, আমি নিজে গ্রিন ভিউ হোটেলে সে মেয়েটির ঘরে গিয়ে দেখেছি। মেয়েটির নাম রাজিয়া। ওর মায়ের নাম নাজিয়া সুলতানা। ওরা লন্ডনে থাকে, কলকাতায় বেড়াতে এসেছে। অসিত লন্ডনেই ওদের চেনে। মেয়েটিকে একটা মালা উপহার দিয়েছে, সেটা চুনি তো নয়ই, আসল পাথরও নয়, ঝুটো। তোদের ঠকাবার জন্যই অমনভাবে দেখিয়ে-দেখিয়ে অসিত মালাটা দিয়েছে।

সন্তু বলল, তা হলে অসিত ধর বীরভূমের সেই পুরনো বাড়ি থেকে কী চুরি করেছে, তা জানা গেল না?

কাকাবাবু বললেন, নাঃ! জানা গেল না। আমার মাথাতেও কিছুই আসছে। হয়তো ও কিছুই চুরি করেনি। আগাগোড়াই আমাদের সঙ্গে প্র্যাকটিক্যাল জোক করছে।

দরজার সামনে এসে দাঁড়াল এ বাড়ির কাজের লোক রঘু। সাড়ে নটা প্রায় বাজে। সন্তু ভাবল, রঘু নিশ্চয়ই খেতে যাবার জন্য তাড়া দিতে এসেছে।

রঘু বলল, নীচে একজন ভদ্রলোক ডাকছে। ওপরে আসবার জন্য খুব পেড়াপিড়ি করছে!

কাকাবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, এত রাতে আবার কে ওপরে আসতে চায়। দেখে আয় তো, সন্তু!

সন্তু নীচে চলে গেল। সদর দরজা দিয়ে বাইরে উঁকি মারতেই সে দারুণ চমকে গেল। এরকম অবাক সে কখনও হয়নি।

বাইরে দাঁড়িয়ে আছে অসিত ধর!

অসিত হেসে বলল, তোমার নামই তো সন্তু, তাই না? আজ সারাদিন কলকাতা দেখা হল কেমন? মাঝে-মাঝে সারা শহরটা এরকম ঘুরে দেখা ভাল।

সন্তুর মুখ দিয়ে কোনও কথাই বেরোল না।

অসিত সন্তুর মাথার চুলে হাত দিয়ে আদর করে বলল, তুমি খুব ব্রাইট বয়। চলো, তোমার কাকাবাবুর সঙ্গে একবার দেখা করে আসি!

সন্তু প্রায় মন্ত্রমুগ্ধের মতন অসিতকে নিয়ে এল ওপরে। অসিতের ব্যবহারের মধ্যে অপছন্দ করার কিছু নেই।

কাকাবাবুর ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে অসিত বেশ নাটকীয়ভাবে বলল, নমস্কার, মিস্টার রায়চৌধুরী, নমস্কার। ভাল আছেন? পায়ের ব্যথাটা কমেছে?

কাকাবাবু বললেন, নমস্কার। আসুন, ভেতরে এসে বসুন।

অসিত একটা সোফায় এসে বসল। এখানেও তার হাতে সেই কালো ব্যাগ। সারা মুখ হাসিতে ভরিয়ে বলল, তা হলে কী ঠিক হল শেষ পর্যন্ত? বোঝা গেল কিছু? আমি বিমানদের বীরভূমের বাড়ি থেকে কিছু চুরি করেছি, না। করিনি?

কাকাবাবু বললেন, আমি হার স্বীকার করছি। আমি এখনও কিছু বুঝতে পারিনি। হয়তো আপনাকে মিথ্যে সন্দেহ করেছি।

অসিত হা-হা করে খুব জোরে হেসে উঠল, তারপর বেশ তৃপ্তির সঙ্গে বলল, আপনি হার স্বীকার করছেন তা হলে? আপনি বিখ্যাত লোক, আপনি অনেক রহস্যের সমাধান করেছেন শুনেছি। আপনার মুখে হার-স্বীকারের কথা শোনাটা একটা নতুন ব্যাপার, কী বলুন?

কাকাবাবু বললেন, নিজের ভুল স্বীকার করতে আমার কোনও লজ্জা নেই। আপনি তা হলে কিছু নেননি ওখান থেকে?

হ্যাঁ, নিয়েছি।

নিয়েছেন? সত্যি, কিছু নিয়েছেন?

সে কথা তো আপনার কাছে আগেই স্বীকার করেছি! আসল প্রশ্ন ছিল, আমি কী নিয়েছি? এবার বলে দিই?.

আগে বলুন, সে-জিনিসটা কোথায় লুকোনো ছিল?

হুঁ! সেটাই বড় কথা। আগে অনেকেই খুঁজেছে। সব্বাই বোকা! চোখ থাকলেও অনেকে অনেক জিনিস দেখতে পায় না। মিস্টার রায়চৌধুরী, আপনার কি মনে আছে যে, বিমানকে আমি বলেছিলাম, তার পাগলা-দাদুর ঘরের খাটের যে চারটে পায়া, সেগুলো বেশ দামি?

সেই খাটের পায়াগুলো আমিও দেখেছি। কাঠের ওপর নানারকম কারুকার্য করা। সেগুলোর কিছু দাম পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই!

আপনি আসল ব্যাপারটাই দেখেননি, মিস্টার রায়চৌধুরী। ও ঘরে ঢোকা মাত্র আমি চিনতে পেরেছিলাম। ইতালির ফ্লোরেন্স শহরে বড় লাোকেরা ওই ধরনের খাটের পায়া ব্যবহার করত দুশো-আড়াইশো বছর আগে। ওই খাটের পায়াগুলো মাঝখান থেকে খোলা যায়। ভেতরে গর্ত থাকে। সেই গর্তে বড়লোকেরা দামি-দামি জিনিস লুকিয়ে রাখত।

কাকাবাবু সন্তুর দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বললেন, আমার আবার পরাজয়! অসিত ঠিকই বলেছে, খাটের পায়ার মধ্যে দামি জিনিস লুকিয়ে রাখার একটা প্রথা এক সময় ছিল ইউরোপে। বিমানরা তা জানে না। আমিও খেয়াল করিনি। কারণ আমি ধরেই নিয়েছিলাম, আসল দামি জিনিস অসিত আগেই নিয়ে চলে গিয়েছে!

অসিত বলল, এমন কিছু দামি জিনিস নয়। নবাবের দেওয়া চুনির মালা-টালা যে একেবারে বাজে গপ্পো, তা আপনি স্বীকার করবেন? হিরে-জহরত নিয়ে যারা কারবার করে, তারা এসব খবর রাখে। গত পঞ্চাশ বছরের মধ্যে এরকম চুনির মালার কথা কেউ শোনেনি। আমার ধারণা, নবাব সিরাজ যদি সেরকম কোনও মালা দিয়েও থাকেন, তা হলেও ওবাড়ির কোনও পূর্ব পুরুষ পঞ্চাশ-ষাট বছর আগেই সেটা বিক্রি করে দিয়েছেন।

কাকাবাবু বললেন, আমারও তাই মনে হয়। অমন একটা মালা ওবাড়ির দূর সম্পর্কের আত্মীয় এক পাগলের ঘরে থাকা সম্ভব নয়!

অসিত বলল, কিন্তু ওই ধরনের খাটের পায়া দেখেই আমার সন্দেহ হয়েছিল, ভেতরে কিছু লুকোনো আছে। খাটটা বেশ ভারী, সেটা তুলে পায়াগুলো খুলে দেখতে গেলে অনেকটা সময় লাগবে। সেইজন্যই আপনাকে ও-ঘর থেকে কিছুক্ষণের জন্য সরিয়ে দেওয়ার দরকার ছিল, তাই আপনাকে আমি একটা আছাড় খাইয়েছিলাম। আমি দুঃখিত। তবে, আপনার যে অত জোরে লাগবে, পায়ের আধখানা নখ উড়ে যাবে, তা আমি বুঝিনি। ভেবেছিলাম, আপনার মাথায় খানিকটা চোট লাগবে, সবাই আপনাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে!

কাকাবাবু বললেন, তাই-ই হয়েছিল। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। বিমানরা ব্যস্ত হয়ে আমাকে ও-ঘর থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল, ডাক্তার ডাকল..

অসিত বলল, সেই সুযোগে আমি নিরিবিলিতে ঘরখানা ভাল করে খুঁজলাম, খাটের পায়া চারটেও খুলে দেখলাম।

এবার অসিত কালো ব্যাগটা খুলে বার করল একগাদা পুরনো কাগজ। সেগুলো গোল করে গোটানো।

কাগজগুলো কাকাবাবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে অসিত বলল, এগুলো বাজে কাগজ নয়। নানারকম জমির দলিল। বিমানবাবুকে পড়ে দেখতে বলবেন। হয়তো উনি আরও কিছু সম্পত্তি পেয়ে যেতে পারেন। ওঁর মামাদের যে অন্য জায়গাতেও জমিটমি ছিল, তা বোধ হয় উনি জানতেন না!

কাকাবাবু একটা দলিল খুলে দেখলেন।

অসিত বলল, তিনখানা খাটের পায়ায় এইসব দলিল ছিল। আর একখানায়…

অসিত কোটের পকেটে হাত দিয়ে বার করল দুটো কাগজের মোড়ক। একটাতে রয়েছে চারখানা ছোট ক্রস। ক্রিশ্চান পাদ্রীরা যেগুলো গলায় ঝোলান।

অসিত বলল, ধুলো জমে গেলেও এগুলো সোনার তৈরি। একটার পেছনে লেখা রয়েছে সেন্ট জোসেফ চার্চ, গোয়। মনে হয়, বিমানবাবুর পাগলাদাদুর গুরু ছিলেন যে পাদ্রী, তাঁর জিনিস।

আর-একটা কাগজের মোড়ক খুলে অসিত জিজ্ঞেস করল, এগুলো কি চিনতে পারছেন?

কাকাবাবু মোড়কটি হাতে নিলেন। সন্তু পাশ থেকে হুমড়ি খেয়ে দেখে বলে উঠল, এগুলো তো পুঁতি।

অসিত হেসে বলল, ছাদের ওই ঘরটায় অনেক ঝিনুক ছিল, পুঁতির মালা ছিল মনে আছে? পাগলদের খেয়াল, অত পুঁতির মালা জমিয়ে তিনি হয়তো

অন্যদের ঠকাতে চাইতেন। কিন্তু এগুলো পুঁতি নয়, খাঁটি মুক্তো!

কাকাবাবু বিস্ময়ের সঙ্গে বলে উঠলেন, মুক্তো? এত ছোট-ছোট?

অসিত বলল, হ্যাঁ, মুক্তো। আমি গয়নার দোকানে দেখিয়েছি। পুরনো খবরের কাগজ খুললে দেখতে পাবেন, বছর চল্লিশেক আগে গোয়র সমুদ্রের ধারে কিছু কিছু ঝিনুকের মধ্যে মুক্তো পাওয়া যাচ্ছিল। তাই নিয়ে হইচই হয়েছিল খুব। দলে-দলে লোক ছুটে গিয়েছিল গোয়ায়। সবাই ঝিনুক কুড়োতে শুরু করল। বিমানের পাগলা-দাদুটিও ঝিনুক কুড়িয়েছিলেন অনেক। এই বারোটা মুক্তো তিনি পেয়েছিলেন।

কাকাবাবু বললেন, সেইজন্যই ঘরে অত ঝিনুক!

অসিত বলল, মুক্তো পেয়ে তিনি ঝিনুকগুলোও ফেলেননি। চার-পাঁচশো ঝিনুক খুলে একটা মুক্তো পাওয়া যেত! তবে, এগুলো মুক্তো হলেও কিন্তু তেমন দামি নয়। জাপানে এরকম মুক্তো অনেক পাওয়া যায়। এক-একটার দাম বড়জোর পাঁচশো টাকা।

কাকাবাবু বললেন, পাগলা-দাদু এগুলো কাউকে দিয়েও যাননি, কেউ খুঁজেও পায়নি।

অসিত বলল, তা হলে এগুলো আবিষ্কারের কৃতিত্ব আমার?

কাকাবাবু বললেন, অবশ্যই। বিমানরা এগুলোর অস্তিত্বই জানে না। কাঠের পায়াগুলো এমনিই বিক্রি করে দিত কোনও কাঠের মিস্তিরির কাছে। সুতরাং এগুলো তোমারই প্রাপ্য!

অসিত কালো ব্যাগটা বন্ধ করে বলল, মিস্টার রায়চৌধুরী, আমি চোর নই। অন্যের জিনিস আমি নেব কেন? এই চারটে সোনার ক্রস আর বারোটা মুক্তোর দাম বেশ কয়েক হাজার টাকা তো হবেই। এর কিছু আমি চাই না। এগুলো আপনি সব বিমানবাবুদের দিয়ে দেবেন!

কাকাবাবু বললেন, আমি দেব কেন? তুমিই নিজে দিয়ে এসো।

অসিত বলল, আপনি দিলে আপনিও খানিকটা আবিষ্কারের কৃতিত্ব পাবেন। আপনি বলবেন যে, আপনি সন্দেহ করেছিলেন বলেই আমি এগুলো ফেরত দিয়েছি।

কাকাবাবু বললেন, আমি তো কৃতিত্ব চাই না। আমি তো স্বীকারই করছি যে, আমি তোমার কাছে হেরে গিয়েছি।

অসিত বলল, তবু এগুলো আপনার কাছেই থাক। বিমানবাবুর সঙ্গে দেখা করার আমি সময় পাব না।

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে অসিত সন্তুর দিকে তাকিয়ে হাসল।

সন্তুর কাঁধে চাপড় মেরে বলল, জানি, এই ছেলেটির মনের মধ্যে এখন কোন্ কথাটা ঘুরপাক খাচ্ছে। ও ভাবছে, খাটের পায়ার মধ্যে আরও কিছু ছিল কি? আরও কোনও দামি জিনিস? সেটা আমি নিয়ে পালাচ্ছি।

সন্তু ঠিক সেই কথাটা ভাবছিল, তাই লজ্জা পেল।

অসিত বলল, কী হে সন্তু, আমায় সার্চ করে দেখবে নাকি?

কাকাবাবু বললেন, না, না! এই দামি জিনিসগুলো তুমি নিজে থেকে ফেরত দিয়ে গেলে। অন্য কেউ হলে হয়তো দিত না। কেউ কিছু জানতেও পারত না।

অসিত বলল, খাটের পায়ার মধ্যে অন্য আর কিছু ছিল না। এটা একেবারে ধ্রুব সত্য। এ-বিষয়ে আমি ওয়ার্ড অব অনার দিয়ে যাচ্ছি।

কাকাবাবু বললেন, নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই!

অসিত বলল, এবার আমি চলি! আপনাকে নিয়ে আমি খানিকটা মজা করেছি, এই ছেলেটাকে আজ সারাদিন কলকাতা শহরে ঘুরপাক খাইয়েছি। এ জন্য আশা করি আমার ওপর রাগ পুষে রাখবেন না। তবে, আপনার পায়ের ওই আঘাতটার জন্য আমি দুঃখিত। সত্যি দুঃখিত! একদিন আসবেন আমাদের বাড়িতে। অনেক পুরনো-পুরনো জিনিস আছে, দেখে আপনার ভাল লাগবে। আচ্ছা, নমস্কার!

কাকাবাবু বললেন, সন্তু, তুই ওকে সদর দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আয়।

অসিত হাসিমুখে বেরিয়ে গিয়ে সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে নামতে লাগল।

এই লোকটা কাকাবাবুকে হারিয়ে দিয়ে গেল, কাকাবাবু কিছুই করতে পারলেন না, এটা কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না সন্তু। এরকম আগে কোনওদিন হয়নি। লোকটা অতি ধুরন্ধর।

সদর দরজাটা বন্ধ রয়েছে। আর পাঁচখানা সিঁড়ি মাত্র বাকি, এই সময় সন্তু তাড়াহুড়ো করে আগে যাওয়ার ভান করে অসিতের পায়ে পা দিয়ে একটা ল্যাং মারল।

অসিত ধড়াম করে আছাড় খেয়ে গড়িয়ে পড়ে গেল। তার হাত থেকে ছিটকে গেল কালো ব্যাগটা।

সন্তু চেঁচিয়ে বলে উঠল, ইস, কী হল? আপনার লাগল? ইস, ছি-ছি-ছি, আমি দেখতে পাইনি। আমি ভাবলুম, আগে গিয়ে দরজাটা খুলে দেব।

অসিতের বেশ লেগেছে। তার নাক দিয়ে ফোঁটা-ফোটা রক্ত পড়ছে। আস্তে-আস্তে উঠে দাঁড়িয়ে সে রুমাল দিয়ে রক্ত মুছতে লাগল।

কালো ব্যাগটা খুলে গিয়েছে। তার থেকে বেরিয়ে এসেছে শুধু একটা বই। আর কিছু নেই। সন্তু নিজেই ব্যাগটা তুলে নিয়ে একবার ঝাড়ল। লোকটা সত্যি কথাই বলেছে তা হলে, ব্যাগে আর কিছু লুকিয়ে রাখেনি।

অসিত চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, তোমার কাকাবাবুকে আমি আছাড় খাইয়েছিলুম, তুমি আমাকে ফেলে দিয়ে তার শোধ নিলে, তাই না? স্মার্ট বয়। ঠিক আছে, এজন্য তোমাকে আমি ক্ষমা করলাম।

বইটা কুড়িয়ে নিয়ে ব্যাগে ভরল অসিত। বেরিয়ে এল রাস্তায়। এ-বেলাও সে একটা ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে রেখেছে। ট্যাক্সিতে উঠে অসিত বলল, কাটাকুটি তো? এর পর নিশ্চয়ই আমাদের বন্ধুত্ব হবে!

ট্যাক্সিটা স্টার্ট নিয়ে চলে গেল।

দরজা বন্ধ করে সন্তু উঠে এল কাকাবাবুর ঘরে।

কাকাবাবু সন্তুর তোলা ছবিগুলো মন দিয়ে দেখছেন। টেবল ল্যাম্প জ্বেলে একখানা ছবি ভাল করে দেখার জন্য সেই আলোর নীচে ধরলেন। জুতোর দোকানে সন্তু যে ছবি তুলেছিল, তার একটা। ছবিটা খুব স্পষ্ট। দোকানে অনেক ভিড়, তার মধ্যে বসে অসিত বই পড়ে যাচ্ছে।

ড্রয়ার থেকে একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস বার করে কাকাবাবু ছবিটাকে আরও বড় করে দেখতে লাগলেন। আপনমনে বললেন, লোকটার সত্যিই খুব বুদ্ধি, না রে সন্তু? আমাদের একেবারে জব্দ করে দিয়ে গেল। জিনিসগুলো পর্যন্ত ফেরত দিয়ে গেল?

সন্তু বলল, কাকাবাবু, অসিত ধর নিজেও কি ক্রিশ্চান? সব সময় বাইবেল নিয়ে ঘোরে কেন?

কাকাবাবু যেন শুনতেই পেলেন না সন্তুর কথাটা। তিনি ছবিটার ওপর ঝুঁকে পড়েছেন।

সন্তু বলল, আমি সারাদিন ওকে ওই বইটা পড়তে দেখেছি। খুব ভক্ত ক্রিশ্চান?

কাকাবাবু হঠাৎ মুখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন, অ্যাঁ? কী বললি?

সন্তু বলল, অসিত ধর কি ক্রিশ্চান? এইমাত্র ওর ব্যাগটা খুলে গেল, দেখলাম শুধু একটা বাইবেল…

কাকাবাবু বিস্ফারিত চোখে সন্তুর দিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইলেন। হাতের ছবিটা আবার দেখলেন।

তারপর নিজের গালে পটাশ করে এক চড় মেরে বললেন, হোয়াট আ ব্লাডি ফুল আই অ্যাম!

তারপর প্রায় লাফিয়ে উঠে বললেন, সন্তু, লোকটা চলে গেল? শিগগির চল, ওকে ধরতে হবে!

ক্রাচ না নিয়ে কাকাবাবু লাফিয়ে বেরোতে যাচ্ছিলেন, সন্তু তাড়াতাড়ি ক্রাচ দুটো ওঁর বগলে গুঁজে দিল। কাকাবাবু সিঁড়ি দিয়ে এমনভাবে হুড়মুড়িয়ে নামতে লাগলেন, সন্তুর ভয় হল উনি পড়ে না যান।

রাস্তায় এসেই কাকাবাবু চিৎকার করে বললেন, ট্যাক্সি! শিগগির একটা ট্যাক্সি ডাক।

রাত প্রায় দশটা বাজে। এখন সহজে ট্যাক্সি পাওয়া যায় না। হাজরার মোড়ের দিকে যেতে হবে। কাকাবাবুর এত ধৈর্য নেই। অস্থিরভাবে বলতে লাগলেন, আঃ, দেরি হয়ে যাচ্ছে, যে-কোনও উপায়ে একটা ট্যাক্সি।

এমন সময় একটা গাড়ি এসে থামল ওদের সামনে। জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বিমান জিজ্ঞেস করলেন, কাকাবাবু, কোথায় যাচ্ছেন?

বিমানকে দেখে খুশি হওয়ার বদলে কাকাবাবু বললেন, ইডিয়েট!

নিজেই দরজা খুলে গাড়িতে উঠে পড়ে ধমকে বললেন, শিগগির চলো, এলগিন রোড।

বিমান ভ্যাবাচাকা খেয়ে বলল, কেন? কী হয়েছে?

কাকাবাবু বললেন, তুমি একটা আস্ত গবেট। পাগলা-দাদুর ঘরটা অতবার খুঁজে দেখেছিলে, কিন্তু অত দামি জিনিস যে চোখের সামনে পড়ে আছে, তা বুঝতে পারোনি? যার দাম কয়েক কোটি টাকা!

বিমানের পাশে বসা দীপা প্রায় কেঁদে ফেলে বলল, অ্যাঁ কয়েক কোটি টাকা? সেই চুনির মালা?

কাকাবাবু বললেন, মালা না ছাই! সে মালা পাওয়া গেলেও তার দাম হত। কয়েক হাজার মাত্র। আর এর দাম দশ কোটি টাকা তো হবেই। শুধু টাকা দিয়েও এর দাম কষা যায় না!

বিমান বলল, কী জিনিস? কী জিনিস?

কাকাবাবু বললেন, আগে অসিতের বাড়ি চলো!

বিমান গাড়ির স্পিড দারুণ বাড়িয়ে দিয়ে বলল, কী জিনিস, কাকাবাবু, বলুন, বলুন!

কাকাবাবু বললেন, একখানা বাইবেল!

দীপা যেন অগাধ জলে পড়ে গিয়ে বলল, বাইবেল? তার আবার অত দাম হয় নাকি? পাগলা-দাদুর ঘরে তো অনেকগুলো বাইবেল ছিল।

এবার সন্তু ফিসফিস করে বলল, গুটেনবার্গ বাইবেল?

কাকাবাবু বললেন, এই দ্যাখো, সন্তুও জানে। অথচ তোমরা জানো না?

দীপা বলল, গুটেনবার্গ বাইবেল কী রে, সন্তু? আমরা তো জানি বাইবেল বিনা পয়সায় পাওয়া যায়। তা হলে ওটার অত দাম কেন?

সন্তু বলল, গুটেনবার্গ বাইবেল হল পৃথিবীর সবচেয়ে প্রথম ছাপা বই। আমি এনসাইক্লোপিডিয়াতে পড়েছি, সে বাইবেল এখন পাওয়া যায় না। সেই বাইবেল পৃথিবীর সবচেয়ে দামি জিনিস। কালেক্টারস আইটেম। কিছুদিন আগে একখানা পাওয়া গিয়েছিল, লন্ডনে নিলামে সেটার দাম উঠেছিল দশ কোটি টাকা।

কাকাবাবু বললেন, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রথম ছাপা বই নয়। সাহেবদের অনেক আগে জাপান আর কোরিয়ার লোকেরা কাঠের ব্লক দিয়ে বই ছাপা শিখেছিল।

বিমান বলল, আমি যতদূর জানি, ইউরোপে প্রথম বই ছাপে ক্যাক্সটন।

কাকাবাবু বললেন, সে তো ইংল্যান্ডে। গুটেনবার্গ তারও আগে। জোহান গুটেনবার্গ ছিলেন একজন জার্মান। তিনি আবিষ্কার করেছিলেন মেটাল টাইপ। সেই টাইপ সাজিয়ে বই ছাপা। এতকাল তাই-ই চলেছে। গুটেনবার্গ ছিলেন সত্যিকারের প্রতিভাবান। কিন্তু তাঁর টাকাপয়সা ছিল না। অন্যের কাছ থেকে ধার করে একটা প্রেস বানিয়েছিলেন। নিজের আবিষ্কার করা টাইপ দিয়ে মাত্র কয়েকখানা বাইবেল ছাপার পরেই তাঁর প্রেস বিক্রি হয়ে যায়। ১৪৫৫ সালে সেই প্রথম ছাপা কয়েকখানা বাইবেল পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্লভ বই।

দীপা প্রায় অজ্ঞান হওয়ার মতন ঢলে পড়ে গিয়ে বলল, দশ কোটি টাকা? ওঃ ওঃ ওঃ! আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেল?

বিমান বলল, পাগলা-দাদুর ঘরে আরও অনেক বাইবেলের সঙ্গে গুটেনবার্গ বাইবেল মিশে ছিল? আমরা চিনব কী করে?

কাকাবাবু বললেন, অসিতের অভিজ্ঞ চোখ। এক নজর দেখেই চিনেছে। ল্যাটিন ভাষায় লেখা, প্রত্যেক পাতার নীচে হাতে আঁকা রঙিন ছবি।

বিমান বলল, আমার পাগলা-দাদু ওই বাইবেল পেলেন কী করে?

কাকাবাবু বললেন, গোয়া। সেন্ট জোসেফ চার্চ। আগেই আমার মনে পড়া উচিত ছিল। ওই বাইবেলের এক কপি গোয়ার সেন্ট জোসেফ চার্চে সযত্নে রাখা ছিল। অনেক বছর আগে সেটা রহস্যময়ভাবে উধাও হয়ে যায়। অনেক বইতে একথা লেখা আছে। খুব সম্ভবত তোমার পাগলা-দাদুর যিনি গুরু ছিলেন, তিনি সেটা সরিয়েছিলেন। বিক্রি করতে পারেননি কিংবা চাননি। তিনি মারা যাওয়ার পর সেটা তোমার পাগলা-দাদুর কাছে আসে।

রাত্তিরবেলা ফাঁকা রাস্তা, গাড়ি চলেছে দারুণ জোরে। এলগিন রোড প্রায় এসে গেল।

কাকাবাবু বললেন, অসিতের কী সাহস, আমার বাড়িতে, আমার সামনে সেই বাইবেল নিয়ে বসে ছিল। অন্য জিনিসগুলো ফেরত দেওয়ার নাম করে ধোঁকা দিয়ে গেল আমাকে। সন্তু যদি জুতোর দোকানে অত ভাল ছবি না তুলত, আর বাইবেলের কথা না বলত, তা হলে আমিও কিছুই বুঝতে পারতাম না! ছবিতে অসিতের হাতে যে বই, সেই পাতাটার ছবি আমি আগে দেখেছি।

সন্তু বলল, সারাদিন ও বাইবেলটা সঙ্গে নিয়ে ঘুরছে। কেউ কিছু সন্দেহ করেনি।

গাড়িটা জোরে ব্রেক কষল অসিতের বাড়ির সামনে। সবাই হুড়মুড় করে নামল গাড়ি থেকে।

সদর দরজা বন্ধ। তিনতলায় আলো জ্বলছে না। বিমান ঘন-ঘন বেল বাজাতেই দোতলার বারান্দা থেকে একজন বলল, কে?

বিমান বলল, দরজাটা খুলে দিন, পুলিশ।

লোকটি এসে দরজা খুলতেই সবাই তাকে প্রায় ঠেলে সরিয়ে উঠে গেল সিঁড়ি দিয়ে।

এত গোলমাল শুনে তিনতলায় ফ্ল্যাটের দরজা খুলে দাঁড়িয়েছে কাজের লোকটি।

বিমান জিজ্ঞেস করল, বাবু কোথায়? অসিতবাবু? লোকটি অবাক হয়ে বলল, বাবু তো চলে গিয়েছে। কোথায়? বিলেত চলে গিয়েছেন, বাবু! বিলেত গিয়েছেন? কখন? সাড়ে আটটার সময় সুটকেস নিয়ে চলে গেলেন।

কাকাবাবু ততক্ষণে ঢুকে পড়েছেন ফ্ল্যাটের মধ্যে। সন্তুও সব ঘর খুঁজে দেখল। অসিত ধর কোথাও নেই।

কাকাবাবু বললেন, এখান থেকেই সে আমার বাড়িতে গিয়েছিল। তারপর চলে গিয়েছে। রাত সাড়ে বারোটার সময় এয়ার ইন্ডিয়ার একটা ফ্লাইট আছে দমদম থেকে। এখনও গেলে তাকে ধরা যেতে পারে।

সন্তু বলল, আর যদি ট্রেনে বম্বে কিংবা দিল্লি যায়। সেখান থেকে প্লেনে ওঠে? আজ ট্রেনের টিকিট কাটতে গিয়েছিল!

কাকাবাবু বললেন, ট্রেনে গেলে এখন তাকে ধরার কোনও উপায় নেই। বম্বে-দিল্লি এয়ারপোর্টে জানিয়ে দিতে হবে। তার আগে দমদম গিয়ে একবার দেখা যাক। হয়তো ট্রেনের টিকিট কাটাও তার ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা।

সবাই দুমদাম করে নেমে এল নীচে। গাড়িতে উঠেই বিমান বলল, সবাই সিট ধরে বসে থাকো। আমি খুব জোরে চালাব। হঠাৎ ব্রেক কষলে ঝাঁকুনি লাগবে।

দীপা বলল, অ্যাকসিডেন্ট কোরো না। মরে গেলে আর অত টাকা পেয়েই বা লাভ কী হবে?

কাকাবাবু গম্ভীরভাবে বললেন, বাইবেলটা পাওয়া গেলেও তার টাকা তোমরা পাবে না।

বিমান বলল, আগে তো জিনিসটা উদ্ধার করা হোক। তারপর ওসব চিন্তা করা যাবে।

কাকাবাবু বললেন, বইটা একবার দেশের বাইরে নিয়ে গেলে আর উদ্ধারের কোনও আশা নেই। এ-দেশের কাস্টমস বা পুলিশের লোকেরা ও-বই দেখে চিনতে পারবে কি না সন্দেহ।

বাকি রাস্তা প্রায় কেউ কোনও কথা বলল না। গাড়ি ছুটল ঝড়ের বেগে। আধঘন্টার মধ্যে পৌঁছে গেল এয়ারপোর্টে।

বিদেশের যাত্রীরা যেখান থেকে চেক ইন করে, সেখানে বাইরের লোকদের ঢুকতে দেওয়া হয় না। কাকাবাবু সেই গেটের কাছে যেতেই একজন বন্দুকধারী রক্ষী তাঁকে আটকাল। কাকাবাবু তাকে ঠেলে ঢোকার চেষ্টা করতেই আর একজন রক্ষী এসে বলল, কী করছেন? আপনাকে অ্যারেস্ট করা হবে।

এইসব সাধারণ রক্ষী কাকাবাবুকে চেনে না। জোর করে ভেতরে ঢোকা যাবে না।

খানিকটা দূরেই দেখা গেল, সিকিউরিটি চেকের লাইন। তার সামনের দিকে দাঁড়িয়ে আছে অসিত। সে-ও কাকাবাবুদের দেখতে পেল। তার মুখে কোনও ভয়ের ছাপ ফুটল না। বরং সারা মুখে হাসি ছড়িয়ে সে একটা হাত তুলে কাকাবাবুর উদ্দেশে বলল, টা-টা!

তারপর সে ঢুকে গেল ভেতরে।

এখনও কিছুটা সময় আছে। একবার প্লেন ছেড়ে গেলে আর কিছু করা যাবে না।

কাকাবাবু একজন পুলিশকে জিজ্ঞেস করলেন, এয়ারপোর্টে যে এস পি থাকেন, তাঁর নাম নজরুল ইসলাম না? নামটা আমার মনে আছে।

পুলিশটি বলল, হ্যাঁ।

সেই নজরুল ইসলাম সাহেব কোথায়?

তিনি কোয়ার্টারে আছেন।

শিগগির একবার তাঁকে ডাকুন। বিশেষ দরকার।

দরকার আমাকে বলুন। যে-কেউ বললেই কি আমাদের বড় সাহেবকে এয়ারপোর্টে আসতে হবে?

প্রতিটি মিনিট মূল্যবান। অকারণ তর্ক করে সময় নষ্ট করার কোনও মানে হয় না।

কাকাবাবু এবার ক্রাচ তুলে সাঙ্ঘাতিক রাগের সঙ্গে বললেন, এবার আমি কাচ ভাঙব, অনেক কিছু ভেঙে হাঙ্গামা বাধাব, তখন এস পি-কে আসতেই হবে। যান, নজরুল ইসলামকে বলুন, আমার নাম রাজা রায়চৌধুরী। আমি পুলিশ কমিশনারের বন্ধু। আমার বিশেষ প্রয়োজনে ডাকছি। শিগগির যান।

কাকাবাবু এবার একটা টেলিফোন বুথে পুলিশ কমিশনারকে ফোন করলেন বাড়িতে। তিনি বাড়িতে নেই। এক জায়গায় নেমন্তন্ন খেতে গিয়েছেন। সেখানকার টেলিফোন নাম্বার জানিয়ে দিয়েছেন বাড়িতে।

সেই নাম্বারে ফোন করলেন কাকাবাবু। একজন তোক ধরে বলল, হ্যাঁ, তিনি আছেন, ডেকে দিচ্ছি।

তারপর আর কেউ আসে না। কোনও সাড়া-শব্দ নেই। ধৈর্য হারিয়ে কাকাবাবু বারবার ক্রাচটা ঠুকছেন মাটিতে। বাড়ি থেকেই এই ফোনটা করা উচিত ছিল, তখন মনে পড়েনি।

একটু পরেই একজন বলল, হ্যালো।

পুলিশ কমিশনারের গলা চিনতে পেরেই কাকাবাবু ধমক দিয়ে বললেন, এখানে এত বড় একটা সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার হচ্ছে, আর তুমি আরাম করে নেমন্তন্ন খাচ্ছ?

পুলিশ কমিশনার হেসে বললেন, আরে, রাজা, কী ব্যাপার বলো আগে! নেমন্তন্ন খেতে এসে কী দোষ করলাম?

কাকাবাবু বললেন, সেই অসিত ধর, তুমি তো তখন বিশ্বাস করোনি, সে একটা দশ কোটি টাকার জাতীয় সম্পত্তি নিয়ে পালাচ্ছে!

কমিশনার বললেন, অ্যাঁ দশ কোটি টাকা? ঠিক বলছ? আমি এক্ষুনি চলে আসব এয়ারপোর্টে?

কাকাবাবু বললেন, তুমি আসতে-আসতে পাখি উড়ে যাবে। প্লেন ছাড়বে এক্ষুনি। দরকার হলে ওকে প্লেনের ভেতরে গিয়েও গ্রেফতার করতে হবে। সেই ব্যবস্থা করো।

এই সময় নজরুল ইসলাম চলে এলেন। তিনি বললেন, মিস্টার রায়চৌধুরী, আমি তো আপনাকে চিনি। কী ব্যাপার বলুন তো?

কাকাবাবু বললেন, এই ফোনে কথা বলুন!

পুলিশ কমিশনার কী সব নির্দেশ দিতে লাগলেন, আর নজরুল ইসলাম বলতে লাগলেন, হ্যাঁ সার! না, সার! ইয়েস সার। অবশ্যই সার!

ফোন রেখে দিয়ে তিনি কাকাবাবুকে বললেন, চলুন?

অন্যদের সেখানেই অপেক্ষা করতে বলে নজরুল ইসলাম কাকাবাবুকে তুলে নিলেন নিজের জিপে। সেই জিপ চলে এল এয়ারপোর্টের টারম্যাকে।

বিশাল প্লেনটা দাঁড়িয়ে আছে বেশ খানিকটা দূরে। সিঁড়ির কাছে লাইন দিয়েছে যাত্রীরা। অসিতের সামনে দশ বারোজন রয়েছে।

জিপটা একেবারে কাছে এসে থামল। কাকাবাবু নেমে গিয়ে অসিতের কাঁধে হাত দিয়ে শান্তভাবে বললেন, বইটা দাও!

অসিত মুখ ফিরিয়ে বলল, শেষ পর্যন্ত বুঝেছেন তা হলে? অনেক দেরি হল, তাই না? আমি এক্ষুনি প্লেনে উঠব। আমাকে আটকাবার কোনও ক্ষমতা আপনার নেই।

কাকাবাবু বললেন, বইটা জাতীয় সম্পত্তি। একশো বছরের বেশি পুরনো কোনও বই দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া যায় না। এটা বেআইনি।

নজরুল ইসলাম বললেন, আপনি লাইন থেকে বেরিয়ে আসুন। বইটা না দিলে আপনাকে অ্যারেস্ট করব।

অসিত এবার কটমট করে দুজনের দিকে তাকাল। তারপর ব্যাগটা খুলে বইটা হাতে নিয়েই ব্যাগটা ছুড়ে মারল কাকাবাবুর মুখে।

কাকাবাবু এরকম কিছুর জন্য তৈরি ছিলেন, ব্যাগটা তাঁর মুখে লাগল না, তার আগেই লুফে নিলেন সেটা।

অসিত ফস করে পকেট থেকে একটা লাইটার বার করে চিৎকার করে বলল, দেব না। বইটা পুড়িয়ে ফেলব। দেব না!

গণ্ডগোল দেখে ভয়ে অন্য যাত্রীরা ছিটকে সরে গেল দূরে। দুজন সিকিউরিটি গার্ড রাইফেল তুলল। নজরুল ইসলামও রিভলভার বার করে উঁচিয়ে ধরলেন অসিতের দিকে।

অসিত বিকৃত গলায় চিৎকার করে উঠল, খবদার! আমার কাছ থেকে কাড়তে এলেই এটা আমি পুড়িয়ে দেব। নষ্ট করে দেব।

নজরুল ইসলাম বললেন, আপনি পাগল নাকি? আমি যদি গুলি করি। এক সেকেণ্ডের মধ্যে আপনি শেষ হয়ে যাবেন। বইটার কোনও ক্ষতি করতে পারবেন না।

কাকাবাবু বললেন, না, না, গুলি করার কোনও দরকার নেই। আমি জানি, অসিত কিছুতেই ও বই নষ্ট করবে না। ও বইয়ের মর্ম অসিত জানে। দাও, অসিত, বইটা আমাকে দাও।

অসিত বলল, দেব না, দেব না, কিছুতেই দেব না। এটা আমার আবিষ্কার! আমি ছাড়া কেউ খুঁজে পায়নি। এত বছর ধরে পড়ে ছিল।

কাকাবাবু কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে বললেন, দাও, অসিত, বইটা দাও!

অসিত বলল, কাছে এলে আমি আপনাকে শেষ করে দেব। খুন করব।

কাকাবাবু তবু আর-একটু এগিয়ে বললেন, দাও, অসিত! আমি জানি, তুমি মানুষ খুন করতে পারো না।

অসিত এবার কান্নায় ভেঙে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ল মাটিতে। বইটা ছুঁড়ে দিল সামনের দিকে।

কাকাবাবু বইটা তুলে নিয়ে কপালে ছোঁয়ালেন।

তারপর নজরুল ইসলামের হাতে বইটা দিয়ে বললেন, সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে বইটা আপনাকে দিলাম। এটা সারা দেশের সম্পদ। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে জমা থাকবে, সব মানুষ দেখতে পাবে।

তারপর তিনি অসিতের হাত ধরে বললেন, ওঠো, অসিত। তুমিই এটা আবিষ্কার করেছ। আবিষ্কারক হিসেবে তোমার নামই লেখা থাকবে। তোমার জন্যই তো আমরা এটা পেলাম।

অসিতকে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরলেন কাকাবাবু।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *