০৭. হাটখোলার মল্লিক বাড়ি

হাটখোলার মল্লিক বাড়িতে জগাই মল্লিকের কনিষ্ঠ সন্তান চণ্ডিকাপ্ৰসাদের মনে একটাই শুধু খেদ, সে আর তার মধ্যমাগ্রজ মিলে তাদের পিতার শ্রাদ্ধ উৎসব করতে পারলো না এখনো। এ বাড়িতে বিবাহযোগ্য এমন কোনো পুত্র বা কন্যা নেই যে তার বিবাহ উপলক্ষে খুব ধুমধাম করা যায়। বধূরা কোনো নতুন সন্তানও প্রসব করেনি যে তার অন্নপ্রাশনে জাঁকজমক করা যাবে। একটা কোনো সামাজিক উপলক্ষ তো চাই। খ্যামটা নাচ কিংবা বাঈ-নাচ বসত বাড়িতে ঠিক জমে না। আর দোল-দুর্গোৎসবে পোস্তার রাজবাড়ি কিংবা রানী রাসমণিকে কিছুতেই হার মানানো যাবে না। যতই ধুমধাম করো, লোকে তবু ঐ দুই বাড়িতেই ছুটবে।

লোকে কথায় কথায় বলে, শোভাবাজার রাজবাড়িতে ছেলের বিয়ের নেমন্তন্ন পেয়েছিলুম বটে! তেমনটি আর কেউ দেখাতে পারলে না! কিংবা হাটখোলার দত্ত বাড়িতে সেই যে মুখে-ভাত হয়েছেল, তাকেই না বলে মুখে ভাত, ধন্যি ধন্যি, হাজার হাজার লোকের মুখে পোলাও কালিয়া উঠেছিল। সেদিনকে। কিংবা ছেরাদ হয়েছেল সেই জোড়াসাঁকোর রামকমল সিংগীর, সে একেবারে রঙের গোলাম তুরুপ, তার ওপর আর কেউ দেখাতে পারলে না।

এই মল্লিক বাড়িতে এখন শুধু একটি শ্রাদ্ধেরই অবকাশ আছে। তখন দেখানো যায় রামকমল সিংহের ছেলেরাই বা কতখানি আর চণ্ডিকাপ্রসাদও কত বড় বাপের ব্যাটা। কিন্তু চণ্ডিকাপ্ৰসাদের এই অভিলাষ মেটাবার জন্য তার পিতার কোনোই তৎপরতা নেই। জগাই মল্লিক যেন অজার, অমর। তাঁর বয়েস বর্তমানে প্রায় একশো ছুঁই-ভুঁই, তবু এখনো তিনি সজ্ঞানে সুস্থ শরীরে রয়েছেন। কানে শুনতে পান না, তাঁর দন্তহীন মুখের বাক্য একটিও কেউ বুঝতে পারে না, তবু তিনি চলাফেরায় সক্ষম।

চণ্ডিকাপ্ৰসাদ তার ব্যাপকে দেখে। কখনো দীর্ঘশ্বাস ফেলে এবং কখনো কখনো ক্ৰোধে দাঁত কড়মড় করে। অবশ্য যতক্ষণ চণ্ডিকাপ্ৰসাদ সুস্থ অবস্থায় বাড়িতে থাকে। ইদানীং এই চিন্তাটি যেন তার মস্তিষ্কে গেথে গেছে, এক এক সময় সে ক্ষিপ্ত হয়ে পিতাকে মারতে যায় আর চিৎকার করে বলে, হারামজাদা বুড়ো, বলচি যে তোর ছোরাদে দেশসুদ্ধ কাঁপিয়ে দেবো। তাও মরবিনি! আয়, আজ তোরই একদিন কি আমারই একদিন।

ভৃত্যরা তৈরিই থাকে, তারা যথাসময়ে চণ্ডিকাপ্ৰসাদকে ধরে ফেলে।

বাইরে থেকে নেশায় টপ ভুজঙ্গ অবস্থায় বাড়িতে ফেরার সময় সে জড়িত গলায় হাঁক পাড়তে থাকে, মরেচে? বুড়োটা মরেচে? অ্যাঁ? যে আমায় আগে সু-সু-সু-সু-সুসংবাদ দিবি, তাকে পাঁচ মোহর বকশিস কবলাবো। মরেচে, অ্যাঁ?

সেই সময় জগাই মল্লিক। দ্বিতলের বারান্দার লোহার রেলিং ধরে ঠিক দশমেসে শিশুর মতন পা বেঁকিয়ে নাচে। আর মুখ দিয়ে ম-ম-ম-ম শব্দ করে।

একদিন জুড়ি গাড়ি থেকে চণ্ডিকাপ্ৰসাদকে কয়েকজন ভৃত্য মিলে ধরাধরি করে নামালো। তার বাহ্যজ্ঞান নেই। কিন্তু সমস্ত শরীরটা তাড়কা রোগীর মতন কাঁপছে, আর গাঁজলা বেরুচ্ছে মুখ দিয়ে।

এক যবনী বেশ্যার বাড়িতে নাচের পাল্লা দিতে গিয়ে চণ্ডিকাপ্ৰসাদ চেতন হারিয়ে মাটিতে পড়ে যায়, সেই থেকে আর জ্ঞান ফেরেনি।

এ গৃহে এমনই অব্যবস্থা যে কে কার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে, তারও ঠিক নেই। জগাই মল্লিকের মধ্যম পুত্ৰ কালীপ্রসাদই গৃহকতা, কিন্তু বিলাসিত ও রঙ্গ-তামাশায় তিনিও কম যান না। তবে কালীপ্রসাদের একটি অন্তত গুণ আছে, তিনি মত্ত অবস্থায় কখনো গৃহে আসেন না। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর একাধিক রক্ষিতালয় আছে, মাঝে মাঝে সে-সব জায়গায় তিনি কিছুদিনের জন্য ড়ুব দিয়ে থাকেন। আবার স্বগৃহে, পরিবারের মধ্যে কয়েকদিন সুস্থ অবস্থায় কাটিয়ে যান। হয়তো সেই কারণেই বিষয়সম্পত্তি সব এর মধ্যে গোল্লায় যায়নি। কিংবা, জগাই মল্লিকের জ্যেষ্ঠপুত্ৰ কৰ্মবীর চিত্তপ্ৰসাদ এমন শক্ত বাঁধনে তাঁদের বিষয়সম্পত্তি বেঁধে দিয়ে গেছেন যে তার কিছু নষ্ট হবার বদলে দিন দিন যেন শ্ৰীবৃদ্ধিই হচ্ছে।

চণ্ডিকাপ্ৰসাদকে যেদিন অচৈতন্য অবস্থায় বয়ে আনা হয় দৈবাৎ সেদিন কালীপ্রসাদ গৃহেই ছিলেন। তিনি ব্যস্ত হয়ে কনিষ্ঠ ভ্রাতার চিকিৎসার জন্য বড় বড় ডাক্তার কবিরাজ আনালেন। তাঁরা একে একে সকলেই ফিরে গেলেন মুখ গোমড়া করে। ভাবগতিক দেখে মনে হয়। পিতৃশ্ৰাদ্ধ করার সৌভাগ্য বুঝি চণ্ডিকাপ্ৰসাদের হলো না, বরং চণ্ডিকাপ্ৰসাদেরই শ্ৰাদ্ধ বুঝি তার পিতাকে দেখতে হবে।

একদিন দুপুরে নিজের মহল ছেড়ে কুসুমকুমারী এলো মোঝ মহলে পীড়িত খুড়শ্বশুরের অবস্থা জানতে। চণ্ডিকাপ্ৰসাদের পত্নী দুর্গামণির সঙ্গ তার ভালো লাগে। এ বাড়িতে একমাত্র দুর্গামণির কাছেই কুসুমকুমারী দুটো মনের কথা কইতে পারে।

দুর্গামণি চণ্ডিকাপ্ৰসাদের তৃতীয়পক্ষ। কলকাতার ধনী পরিবারের একটি নিয়ম এই যে বাবুদের বাইরে যে-কটি রক্ষিতাই থাকুক না কেন, বাড়িতে একটি স্ত্রী রাখতেই হবে। এক স্ত্রী মরলে আবার আর একটি। কায়স্থ বা বৈশ্য সম্প্রদায়ের মধ্যে বহু-বিবাহের বিশেষ চল নেই, কিন্তু এক পত্নী বিয়োগের পর আর একটি পত্নী আনতে কোনো দোষ নেই। বাবু হয়তো মাসের মধ্যে একদিনও রাত্রে নিজ শয্যায় শয়ন গ্ৰহণ করেন না। কিন্তু অন্তঃপুর শূন্য রাখা চলবে না। বাড়িতে একজন কষ্ট পেয়ে কান্নাকাটি না করলে রক্ষিতালয়ে আমোদ যেন ঠিক জমে না।

ভাগ্যবানের বউ মরে। প্রতিটি নতুন বিবাহ মানেই নতুন করে অর্থ এবং অলঙ্কার প্রাপ্তি। চণ্ডিকাপ্ৰসাদের ভাগ্য সেই হিসেবে ভালো, তার প্রথমা পত্নী মারা গেছে বিবাহের দু বৎসরের মধ্যে, দ্বিতীয়া পত্নী এ গৃহে এক বৎসর অবস্থান করেই আত্মঘাতিনী হয়েছিল।

দুর্গামণি কান্নাকাটি কিংবা আত্মঘাতিনী হবার মতন পাত্রীই নয়। সে অতিশয় তেজস্বিনী ও আত্মসম্মানসম্পন্না যুবতী। তার পিত্ৰালয় ফরাসডাঙ্গায়, সেখানে সে কিঞ্চিৎ লেখাপড়াও শিখেছিল। তার নরাধম স্বামীকে সে প্রথম দিকে সুপথে আনবার অনেক চেষ্টা করেছিল, পারেনি। এখন সে নিজেই পারতপক্ষে তার স্বামীর মুখ দেখতে চায় না।

দুর্গামণি একটি পশমী আসনে নকশা বুনছিল, কুসুমকুমারীকে দেখে বললো, আয়, বোস।

কুসুমকুমারী জিজ্ঞেস করলো, খুড়ী, উনি কেমন আচেন গো?

দুর্গামণি বললো, ঐ একই রকম।

–জ্ঞান ফেরেনি?

–না।

–ডাক্তাররা কী বলে গ্যালেন আজ?

—ডাক্তাররা কী বলে গ্যাচেন তা আমিও বুঝিনি, তুইও বুঝবিনি। যদি ওঁর নিয়তিতে থাকে, তবে বাঁচবেন!

—ওঁর নিয়তি, না তোমার নিয়তি?

–আমার নিয়তি নিয়ে আমি মাতা ঘামাইনাকে। তুই তো জানিস, আমি মাচ, মাংস খেতে ভালোবাসি না। উনি গেলেন কি রইলেন তাতে আমার ভারি এলো গেল।

কুসুমকুমারী চোখ কপালে তুলে বললো, ওমা, এ কি অলুক্ষণে কতা! ছিছি, খুড়ী, এমন কক্ষনো বলতে নেই। অন্য কেউ শুনলে কী ভাববে।

দুর্গামণি ফিক করে হেসে ফেলে বললো, আমি বুঝি অন্যের কাচে বলতে গ্যাচি! শুধু তোকেই তো বলি এ সব কতা।

–সত্যি খুড়ী, তোমার বড্ড সাহস।

দুর্গামণি মোটেই অবলা অন্তঃপুরিকদের মতন নয়। সে বেশ লম্বা, শরীরের গড়নটিও ভালো। চণ্ডিকাপ্ৰসাদ প্রায়ই তাকে প্ৰহার করে। চণ্ডিকাপ্ৰসাদের তো গুণের ঘাট নেই, স্ত্রীকে প্রহার করাও তার বাসনা চরিতার্থ করার একটি অঙ্গ। দুর্গামণি একবার মাত্র একজন দাসীকে সঙ্গে নিয়ে গোপনে তার পিত্ৰালয় ফরাসডাঙ্গায় চলে গিয়েছিল। চণ্ডিকাপ্ৰসাদ লোক পাঠিয়ে তার পত্নীকে আবার জোর করে ফিরিয়ে আনে। দুর্গামণির পিতার অবস্থা হঠাৎ পড়ে গেছে, তাই ধনী জামাইকে প্রতিহত করার ক্ষমতা তার নেই। সেবার চণ্ডিকাপ্রসাদ দুর্গামণিকে খুব প্রহার করায় দুর্গামণিও উলটে দু-এক ঘা দিয়েছিল। কুসুমকুমারী নিজের চক্ষে দেখেছে যে দুর্গামণি নেশায় সংজ্ঞাহীন তার স্বামীর গালে ঠাস ঠাস করে চড় মারছে।

দুর্গামণির আর একটি কাণ্ড দেখেও অভিভূত হয়ে গিয়েছিল কুসুমকুমারী। দুর্গামণি নিজের হাতে একটি পত্র লিখেছিল ঈশ্বরচন্দ্ৰ বিদ্যাসাগরকে। সেই পণ্ডিত বিধবাদের বিবাহ দেবার জন্য সপ্তরিখী ঘেরা অভিমনুর মতন লড়াই করছেন এবং এখন রাজদরবারে একটি আবেদন পাঠিয়েছেন। দুর্গামণি লিখেছিল, আপনার উদ্দেশ্যে শতকোটি প্ৰণাম। আপনি সার্থক হইলে লক্ষ লক্ষ দুভাগিনী আপনার পায়ে পূজা দিবে। আপনি এ অধীনার প্রণাম লিউন। আপনি চিরায়ু হউন।

নিজের হাতের একটি স্বর্ণবলয় খুলে সেই চিঠির সঙ্গে পাঠিয়ে দিয়েছিল দুর্গামণি।

কুসুমকুমারী জিজ্ঞেস করেছিল, বিধবাদের বের জন্য তুমি এত আকুল হলে কেন গো, খুড়ী?

দুর্গামণি বলেছিল, জীয়ন্তে মরা কতটা শুনিচিস? আমি হলুম গে স্বামী জীয়ন্তে বিধবা। তোর দশাও তো একই।

কুসুমকুমারী দুর্গামণির পাশে বসলো। দুর্গামণির বেশ আঁকার হাত আছে। কোনো ছবি না দেখেই সে আসনের ওপর ফুল, লতাপাতা সেলাইতে ফুটিয়ে তুলতে পারে। অনেকগুলি এমন সুন্দর সুন্দর আসন সে বানিয়েছে। তবে, এই আসন সে কার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করে? কোন হৃদয়েশ্বরকে সে এই আসনে বসাবে? তার কেউ নেই।

দুর্গামণি জিজ্ঞেস করলো, তেরটি আজ কেমন আচে? আজ তেমন চাঁচানি শুনিনি যেন!

স্বামীর প্রসঙ্গ উঠলেই কুসুমকুমারীর মুখখানি স্নান হয়ে যায়। দুর্গামণির মতন তার অবস্থা নয়। কুসুমকুমারী ইচ্ছে করলেই তার পিত্ৰালয়ে চলে যেতে পারে। সেখানে সে আদরের কন্যা। তার বাবা তাকে নিয়ে যেতেও চান। এবং তার স্বামী তাকে ফিরিয়ে আনবে না, সে জ্ঞানই তার নেই। কিন্তু কুসুমকুমারীর মা বলেন, ওরে কুসোম, নারীর জীবনে পতিই সব। দ্যাক, তুই এখনো সেবা যত্ন করে তাকে বাঁচাতে পারিস কি না। তাকে ছেড়ে তুই এখেনে থাকলে তোকে যে সারা জীবন দগ্ধাতে হবে!

কুসুমকুমারী বললো, তিনি আজ সকাল থেকেই ঘুমুচ্চেন!

দুর্গামণি বললো, ভালো। ঘুমুনোই ভালো। আমার এক এক সময় মনে হয়, ঐ পাগলের কাচে কাচে থেকে তুইও না এক সময পাগল হয়ে যাস!

—ও কথা বলে না, খুড়ী। আমার ভয় করে।

—তোকে তো আমি ভয়ই দেখাচ্চি।

পাশের ঘরে হুড়মুড় করে একটা শব্দ হতেই চমকে উঠলো দুজনে। তারপর ছুটে গেল সেদিকে।

ঘোরের মধ্যে পাশ ফিরতে গিয়ে পালঙ্ক থেকে নীচে পড়ে গেছে চণ্ডিকাপ্রসাদ। যদিও মেঝেতে পুরু গালিচা পাতা, কিন্তু পালঙ্কটিও বেশ উঁচু। নিশ্চয়ই খুব লেগেছে। চণ্ডিকাপ্ৰসাদ অবশ্য মুখ দিয়ে কোনো শব্দ উচ্চারণ করেনি, চোখও মেলেনি।

কুসুমকুমারী ব্যাকুলভাবে বলে উঠলো, খুড়েঠাকুর পড়ে গ্যাচেন। ও খুড়ী, ধরে ধরো, তোমাতে আমাতে তুলে দিই।

দুর্গামণি কড়া গলায় বললো, ডাঁড়া! এই ছুঁবি না। কত পাঁচ জাতের মেয়েমানুষে ওকে ছোঁয়, সাতজন্মে চান করে না, ওকে ছুঁতে আমার ঘেন্না করে।

কুসুমকুমারী বিস্ময়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেল।

তারপর সে বাইরে বেরিয়ে গলা চড়িয়ে ডাকলো, চন্ননবিলাসী! চন্ননবিলাসী!

দুর্গামণির নিজস্ব দাসীটি ডাক শুনে উপস্থিত হতেই সে বললো, যেদো আর মেধোকে ডেকে নিয়ায়। বাবু পড়ে গ্যাচেন, তুলতে হবে।

যেদো আর মেধো এই বাবুর পেয়ারের চাকর। তাদের কাছাকাছি থাকার কথা সব সময়। কিন্তু তখুনি খোঁজাখুঁজি করে তাদের পাওয়া গেল না। শেষ পর্যন্ত দেউড়ির বাইরে থেকে ধরে আনতে হলো তাদের, তারা সেখানে বসে গাঁজা টানছিল।

ততক্ষণ মেঝেতেই পড়ে রইলো চণ্ডিকাপ্রসাদ, দুর্গামণি তাঁর পাশে এসে একবার নাড়ি দেখলে না পর্যন্ত।

তবু শত্ৰুরের মুখে ছাই দিয়ে চণ্ডিকাপ্রসাদ ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতে লাগলো।

চণ্ডিকাপ্ৰসাদের বয়েস এখন চল্লিশ। তার জীবনের এখনো অনেক কিছু বাকি আছে। অতি অল্প বয়েস থেকেই সে কুসঙ্গে পড়েছে ও সুরা ও নারীতে মজেছে বলে জীবনের অন্য কোনো ভালো দিকের কথা সে জানেই না। সে জানে না স্নেহ-মমতার মূল্য। সামান্য বিদ্যাশিক্ষাও করেনি বলে সে নিজের ঘেরাটোপের বাইরের জগতের কথাও কিছু জানে না। সে শুধু জানে, টাকা ছড়াতে পারলে কিছু লোক সব সময় ঘিরে থাকে ও নানাভাবে খাতির করে। যত টাকা ছাড়াও, তত বেশী খাতির।

যতদিন তার চলাফেরার ক্ষমতা ঠিক মতন হলো না, ততদিন সে দুর্গামণিকে নানাভাবে জ্বালাতন করলো। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে হাজার গণ্ডা হুকুম। কোনো মানুষকে সুস্থির হয়ে বসে থাকতে দেখা তার পছন্দ হয় না। বেশ কয়েক বছরের মধ্যে সে দুর্গামণির সঙ্গে এতদিন একটানা থাকেনি। দুর্গামণি তার কাছ ঘেঁষতে চায় না বলে সে প্ৰথমে বিস্ময়, তারপর ক্ৰোধ প্ৰকাশ করতে শুরু করে। এবং হুমকি দেয়, দেখিস মাগী, তোর তেজ ভাঙবো। আমি আর একটা বিয়ে করবো!

একদিন মদ্যপান না করে যে থাকতে পারে না, সেই ব্যক্তি পুরো এগারো দিন গলায় একবিন্দু ঢালেনি। চিকিৎসকদের কড়া নির্দেশ, তার কাছে যেন কোনোক্রমেই সুরা না পৌঁছোয়। অবশেষে যেদো ও মেধোর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে দ্বাদশ দিনের মাথায় সে একটি সুরার বোতল হস্তগত করলো এবং তা থেকে কাঁচা চুমুক দিয়ে অনেকখানি টেনে নিল একসঙ্গে। সূরা নয়, যেন জাদু! তাতেই সে আবার জেগে উঠলো শেরের মতন। রীতিমতন একটি হুংকার দিল পর্যন্ত।

তখনই সে বেরুবে। তার প্ৰিয় পোশাক পরে নিল সে। পাজামা, রামজামা, কোমরবন্ধ, মাথায় বাঁ-কান-ঢাকা টুপী। হাতে একটি লাল রুমাল। সেই রুমাল ঘোরাতে ঘোরাতে সে পরেরো মনেরো ভাবো বুঝিতে কি পারে পরে গাইতে গাইতে নামতে লাগলো সিঁড়ি দিয়ে। যাবার সময় দুর্গামণির সঙ্গে একটি বাক্য বিনিময় পর্যন্ত করলো না।

সদরে সিংহদ্বারের সামনে তার পিতার সঙ্গে দেখা হলো। জগাই মল্লিক। তখন দুজন ভৃত্য সমভিব্যাহারে বৈকালিক ভ্ৰমণ সেরে ফিরছেন। তাকে দেখে মাথায় একটি চাঁটি মারার লোভ অতিকষ্টে দমন করলো চণ্ডিকাপ্ৰসাদ। শুধু রোষকশায়িত নেত্ৰে তাকিয়ে বললো, ভেবেছিলে আমিই আগে পটোল তুলবো! বড় মজা, না?

তারপর থেকে চণ্ডিকাপ্ৰসাদের নিয়মিত জীবনযাত্রা শুরু হলো। সেই দু-তিনদিন অন্তর একবার করে চূড়ান্ত নেশাগ্ৰস্ত অবস্থায় বাড়ি ফেরা টাকার খোঁজে। এর মধ্যে বৈচিত্র্য কিছু নেই।

কয়েকদিন পর আর একটি বৈচিত্ৰ্য ঘটালো কুসুমকুমারীর স্বামী অঘোরনাথ।

বড় পরিতাপের বিষয় এই যে, এ পরিবারের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানটিই উন্মাদ। অঘোরনাথ জ্ঞানপিপাসুমেধাবী যুবক ছিল। কাকাদের ভ্ৰষ্টাচার তাকে একটুও স্পর্শ করতে পারেনি। কিন্তু ধর্ম-উন্মাদনায় বিঘ্ন ঘটায় সে মস্তিষ্ক ঠিক রাখতে পারলো না।

অঘোরনাথ গোড়ার দিকে থাকতো চুপচাপ, কোনো কথা না বলা কিংবা আপন মনে অর্থহীন শব্দ উচ্চারণই ছিল তার রোগের লক্ষণ। কিছুদিন হলো সে হিংস্র হয়ে উঠেছে। দীর্ঘকায় সুপুরুষ সে। শরীরে দারুণ শক্তি, একটি ভূত্যের গলা টিপে তাকে প্রায় হত্যাই করেছিল একদিন। তার থেকেও ভয়াবহ কথা, সে একদিন তার ঘুমন্ত জননীকে পাঁজাকোলা করে তুলে তিনতলা থেকে ছুঁড়ে ফেলতে গিয়েছিল নীচে। সেদিন একটা কেলেঙ্কারিই হয়ে যেত। আর একটু হলে।

অঘোরনাথকে এখন লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। বাড়ির একটি অতি বৃদ্ধা দাসী ছাড়া সে আর কারুকে চিনতে পারে না। সেই দাসীটিই তাকে প্রত্যহ দু বেলা খাইয়ে দেয়। আর কেউ ধারে কাছে ঘেঁষলেই সে চোখ ঘূর্ণিত করে গর্জন শুরু করে দেয়।

হঠাৎ একদিন কোন উপায়ে যেন অঘোরনাথ শিকল খুলে বেরিয়ে এলো। প্রথমেই সে একটি বৃহৎ অতি সুদৃশ্য চীনে মাটির পাত্ৰ ভাঙলো আছাড় দিয়ে। তারপর অদূরে তার জননীকে দেখে তাড়া করে গেল।

সারা বাড়িতে একটা দারুণ ত্রাসের সৃষ্টি হলো। ভূমিকম্পের সময় দিশাহারা মানুষের মতন সকলে ছুটলো এদিকে ওদিকে। মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া বাঁকড়া চুল, মুখভর্তি গুম্ফ-দাড়ি, কোমরে শুধু একটু ফালি জড়ানো, অঘোরনাথকে দেখায় যেন ভয়ংকর রুদ্রের মতন। আজ বুঝি কারুর রক্ত না নিয়ে ছাড়বে না।

ভৃত্যকুল ও দ্বারবানরা ছুটে এলো তাকে সামলাবার জন্য। কিন্তু কেউ কাছে আসতে সাহস করে না। অঘোরনাথ যার দিকে তাকায়, সে-ই প্ৰাণভয়ে দৌড়োয়। চিৎকার চাঁচামেচিতেও কান পাতা দায়। কেউ ভগবানের নাম জপছে। কেউ বলছে কেল্লায় খবর পাঠাতে।

কালীপ্রসাদের দুই পুত্র শিবপ্রসাদ ও অম্বিকাপ্ৰসাদ দ্বিতলের বারান্দা থেকে নানাপ্রকার নির্দেশ দিতে লাগলো ঐ উন্মাদকে ধরবার জন্য। তাদের নিজেদের এগোবার সাহস নেই। অঘোরনাথ তখন নীচতলার উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে। তার জননী ওপর থেকে হাপুসা নয়নে কেঁদে বলছেন, ওরে, ওকে তোরা বাইরে যেতে দিসনি। তাহলে আর ওকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। ওরে, যেমন করে পারিস ধরা! আমি একছড়া সোনার হার দেবো, যে ধরবে–

শিবপ্রসাদ ও অম্বিকাপ্ৰসাদের নির্দেশে দ্বারবানেরা শেষ পর্যন্ত বড় বড় লাঠি এনে পেটাতে লাগলো অঘোরনাথকে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সে মার খেতে লাগলো এবং গজরাতে লাগলো। একটা সুবিধে এই যে, মনুষ্যেতর প্রাণীদের মতন অঘোরনাথ কোনো অস্ত্র ধারণ করতে ভুলে গেছে। কোনো এক ভোজপুরীর হাতের লাঠি যদি কেড়ে নিয়ে সে রুখে দাঁড়াতো, তাহলে অনেকেই ঘায়েল হতো। তার বদলে, মার খেতে খেতে সে এক সময় পড়ে গেল মাটিতে তখন দশ-বারোজনে মিলে তাকে চেপে ধরে আবার শিকল নিয়ে এসে বাঁধলো।

অঘোরনাথকে শিকল বাঁধা অবস্থায় টানতে টানতে ফিরিয়ে আনা হলো তার কক্ষে। যেন বিরাট একটা যুদ্ধ জয় করা গেছে, এইভাবে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললো সকলে।

শুধু বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদতে লাগলেন অঘোরনাথের জননী। তিনি কপাল চাপড়ে চাপড়ে বলতে লাগলেন, কী কুক্ষণেই তোকে আমি নিষেধ করিছিলুম, বাপ আমার! আমার কী কুগ্ৰহ! তুই বেহ্ম হ, কেরেস্তান হ, তোর যা খুশী, শুধু একবার সাদা চোখ মেলে চা, আমায় একবার মা বলে ডাক। অঘোর, বাপ আমার, একবার চেয়ে দ্যাখ।

তাঁর পাশে পুত্তলির মতন দাঁড়িয়ে রয়েছে কুসুমকুমারী। তার যেন কথা বলারও শক্তি নেই। অঘোরনাথ যদি তাকে তাড়া করে যেত, তবে সে বুঝি পলায়ন করতেও পারতো না। তার স্বামীকে সকলে মিলে যখন বাঁশ পেটা করে মারছিল, তখন সেও শিউরে শিউরে উঠছিল। কুসুমকুমারী যেন আর সহ্য করতে পারছে না।

শাশুড়ির কান্না শুনতে শুনতে কুসুমকুমারীরও যেন এক সময় মতিভ্রম হলো। সে হঠাৎ দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো তার স্বামীর শিকল বাঁধা পায়ের ওপর। সেখানে মাথা কুটিতে কুটতে সে বলতে লাগলো, আপনি ভালো হয়ে উঠুন, আপনি ভালো হয়ে উঠুন। হে ঠাকুর, ওনাকে ভালো করে দাও!

অঘোরনাথ চোখ মেলে দেখলো একবার। সেই চোখে বিস্ময়। ভাবখানা যেন, এ আবার কে? বেশ কিছুক্ষণ সে কুসুমকুমারীকে দেখলো। তারপর, পায়ের ওপর যেন কোনো পোকামাকড় পড়েছে এই ভঙ্গিতে সে দু পায়ে সজোরে ঝাঁকুনি দিল একবার। তাতেই কুসুমকুমারী ছিটকে গিয়ে দেয়ালের কাছে পড়লো এবং দেয়ালে ঠুকে তার মাথা ফেটে গেল।

তখন ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়া হলো কুসুমকুমারীকে।

অনেক পরে কুসুমকুমারী সুস্থ হয়ে যখন ভালোভাবে চোখ মেললো, তখন দেখলো, তার শিয়রের কাছে বসে আছে দুর্গামণি। সে কুসুমকুমারীর সারা গায়ে নরম হাত বুলোচ্ছে।

কুসুমকুমারীকে চোখ মেলতে দেখে দুর্গামণি উঠে গিয়ে ঘরের অর্গল বন্ধ করলো। তারপর ফিরে এসে শয্যার ওপর আবার বসে সে উষ্ণ স্বরে বললো, তুই ওর পায়ে পড়তে গেলি কেন?

কুসুমকুমারী কোনো উত্তর দিতে পারলো না।

দুর্গামণি আবার বললো, বল, চুপ মেরে আচিস কেন? বল?

কুসুমকুমারী ধীরে ধীরে বললো, কী জানি, খুড়ী, মাতাটা কেমন যেন গুলিয়ে গেল!

—বলোচিলুম না, ঐ পাগলের সঙ্গে থাকতে থাকতে তুইও একদিন পাগল হবি! শোন, আমি একটা কথা বলবো, তুই করতে পারবি?

কুসুমকুমারী তার নীল, কোমল ছলছল চক্ষু দুটি স্থাপন করলো দুর্গামণির মুখে।

–একদিন ওকে বিষ খাইয়ে দে! সব জ্বালা জুড়োক; আমার কাচে বিষ আচে, তুই খাওয়াতে পারবি?

—তুমি কী বলচো, খুড়ী?

—ঠিকই বলচি! ও পাগল আর কোনোদিন ভালো হবে না। তুই বিধবা হ, তোর আমি আবার বিয়ে দেবো। তোর জন্যই তো আমি সাগরকে চিঠি দিয়েচি! আমি তো কুড়িতে বুড়ি, আমার জীবন শেষ, কিন্তু তোর অল্প বয়েস।

—খুড়ী!

—বুকে সাহস আন, কুসোম! ভালো করে বাঁচতে শেক! মাতাল, পাগল—এদের সঙ্গে কেন আমরা ঘর করবো? আমাদের সাদ-আহ্লাদ নেই! আমি সব সময় বিষ কাচে রাকি, কারুকে আমি ভয় পাই না! তোকে যা বললুম, পারবি?

পাশ ফিরে দুর্গামণির কোলে মাথা গুঁজে কুসুমকুমারী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে লাগলো, অমন কতা বলো না খুড়ী, ও সব কতা শুনলেও যে পাপ!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *