০৭. ডলি নামের মেয়েটি

ডলি নামের মেয়েটি খুব যত্ন করে খাইয়ে দিল কাকাবাবুকে। তারপর মুখ ধুইয়ে, তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে দিল। তারপর বলল, এবার চলুন, কাকাবাবু।

সন্তুর দিকে ফিরে বলল, সন্তু, তুমি সব জিনিসপত্তর গুছিয়ে টুছিয়ে নাও।

সন্তু পড়েছে মহা মুশকিলে। সে বুঝতে পারছে যে, এখন এই সার্কিট হাউস ছেড়ে অচেনা কোনও মাসির বাড়িতে যাওয়া তাদের উচিত নয়। চারদিকে যেন বিপদের গন্ধ। সার্কিট হাউসে। তবু অনেক লোকজন আছে, পাহারা দেবার ব্যবস্থা আছে। আমির লোকেরাও নিশ্চয়ই এখানে একবার খোঁজ-খবর নিতে আসবে। অথচ এই মহিলাটি এমন জোর করছে, যেন যেতেই হবে।

অবশ্য আরও একটা ব্যাপার আছে। কাকাবাবু সন্তুর হাতে খেতে চান না। সন্তুর সঙ্গে ভাল করে কথাও বলেন না। বোধহয় তিনি আর সন্তুকে চিনতেই পারছেন না। এই অবস্থায় কাকাবাবুর দেখাশুনো করা তো একা সন্তুর পক্ষে সম্ভব নয়। আর একজন কারুর সাহায্য দরকার।

তবু সন্তু আমতা আমতা করে বলল, এখন না গিয়ে বিকেলে গেলে হয় না?

ডলি বলল, কেন, বিকেলে কেন? এখন গাড়ি এনেছি, বিকেলে গাড়ি পাব না। তা ছাড়া মা তোমাদের জন্য ইলিশ আর গলদা চিংড়ি আনতে দিয়েছেন।

কাকাবাবু যোগীপুরুষদের মতন হাত দুটো ওপর দিকে তুলে বললেন, এই যে! শিগগির

সন্তু ওই ভঙ্গিটার মানে বোঝে। কাকাবাবু গেঞ্জি পরে আছেন, এখন তিনি জামা পরতে চান। তাঁকে জামা পরিয়ে দিতে হয়। হাত উঁচু করতেও কাকাবাবুর কষ্ট হয়। ওইভাবে বেশিক্ষণ থাকতে পারেন না।

অর্থাৎ কাকাবাবু যেতে চাইছেন!

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সন্তু চটপট জিনিসপত্র গুছিয়ে ফেলল। কিন্তু তারপরই তার মনে পড়ল, সার্কিট হাউস ছেড়ে গেলে এখানকার বিল মেটাবে কে? সন্তুর কাছে মোটে দশ টাকা আছে। কাল রাত্তিরে প্রকাশ সরকার বলেছিল, কাকাবাবুর জন্য যা খরচপত্তর হবে সব ভারত সরকার দিয়ে দেবে। কিন্তু সে-সব ব্যবস্থা করবার ভার প্রকাশ সরকারের ওপর। সেই প্ৰকাশ সরকারই তো নেই।

ডলি বলল, চলো, চলো, আর দেরি করছ, কেন?

সন্তু বলল, আমাদের তো যাওয়া হবে না। সব জিনিসপত্র নিয়ে চলে গেলে আমাদের বিল মেটাবে কে?

ডলি তক্ষুনি এ সমস্যার সমাধান করে দিল।

সে বলল, তা হলে জিনিসপত্তর এখন নেবার দরকার নেই, সব এখানেই থাক। ঘরে তালা দিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়ি। পরে আমার বাবা এসে টাকা পয়সা দিয়ে বিল মিটিয়ে সব জিনিসপত্তর নিয়ে যাবেন।

আর আপত্তি করা যায় না, এবার যেতেই হবে।

সন্তু আর ডলি কাকাবাবুর দুদিকে গিয়ে দাঁড়াল, কাকাবাবু ওদের দুজনের কাঁধে হাত রাখলেন, সেইভাবে তিনজনে বার হল ঘর থেকে।

দরজায় তালা লাগাবার সময় সন্তুর মনে পড়ল, কাকাবাবুর কাছে এমন কয়েকটা দরকারি জিনিস থাকে, যা তিনি কখনও হাতছাড়া করতে চান না। তিনি যেখানেই যান, একটা কালো হ্যাণ্ডব্যাগ তাঁর সঙ্গে থাকে। এবারে কাকাবাবু সেই ব্যাগটা নিয়ে যাবার কথা কিছুই বললেন না। ব্যাগটা নিয়ে যাওয়া উচিত, না। এখানেই রেখে গেলে ভাল হয়, তা সন্তু বুঝতে পারল না।

তবু সন্তু জিজ্ঞেস করল, কাকাবাবু, কালো ব্যাগটা—

কাকাবাবু বললেন, কার ব্যাগ।? কিসের ব্যাগ।? কেন ব্যাগ।? আমি ব্যাগ-ট্যাগের কথা কিছু জানি না।

সন্তু আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। দরজায় তালা লাগিয়ে দিল।

হাঁটা শুরু করার পর কাকাবাবু ডলিকে জিজ্ঞেস করলেন, মা লক্ষ্মী, তুমি আগে আমাকে কতবার দেখেছি?

ডলি বলল, অনেকবার। এই তো শেষবার দেখা হল, বছর চারেক আগে, আমরা পুজোর সময় কলকাতায় গিয়েছিলুম, তখন আপনার সঙ্গে দেখা হল–আপনার অবশ্য মনে থাকবার কথা নয়, আপনি ব্যস্ত লোক।

কাকাবাবু বললেন, কেন মনে থাকবে না? খুব মনে আছে। সেবার রাস্তায় খুব জল জমেছিল, তুমি জলে ভাসতে ভাসতে এসে থামলে আমাদের বাড়ির সামনে।

ডলি একটু চমকে গিয়ে বলল, জলে ভাসতে ভাসতে? হ্যাঁ, রাস্তায় জল জন্মেছিল বটে, তবে হাঁটু পর্যন্ত। আমি তো জলে ভাসিনি।

কাকাবাবু বললেন, ভাসোনি? বাঃ, বললেই হল! তুমি একবার ড়ুবলে, একবার ভাসলে। একবার ড়ুবলে, একবার ভাসলে। একবার ড়ুবলে–

কাকাবাবু ওই একই কথা বলে যেতে লাগলেন বারবার।

সার্কিট হাউসের ঘরগুলোর সামনে দিয়ে একটা লম্বা টানা বারান্দা। সেই বারান্দার অন্য দিক দিয়ে দুজন লম্বামতন লোক জুতোর শব্দ করে হেঁটে আসছে এদিকে।

ডলি বলল, চলো, সন্তু, আমরা উঠোন দিয়ে নেমে যাই। আমাদের গাড়িটা ওই দিকেই আছে।

সন্তুর কেন যেন মনে হল, ওই লোক দুটি তাদের খোঁজেই আসছে। শত্ৰু, না মিত্র? শত্রু হলেও এখন পালাবার কোনও উপায় নেই। সুতরাং দেখাই যাক না। সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

লোক দুটি ওদের সামনে এসে দাঁড়াল। কাকাবাবুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল। একজন, আপনিই তো মিঃ রায়চৌধুরী?

কাকাবাবু যদি কিছু উল্টো-পাল্টা বলেন এই ভয়ে সন্তু আগে থেকেই তাড়াতাড়ি বলে উঠল, হ্যাঁ, হ্যাঁ, উনিই।

প্ৰথমজন বলল, নমস্কার। আমার নাম শিশির দত্তগুপ্ত। আমি এখানকার ডি এস পি। আর ইনি অরিজিৎ দেববর্মন, এখানকার হোম ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি সেক্রেটারি। কাল রাত্তিরে আমরা দিল্লি থেকে একটা মেসেজ পেয়েছি যে, আপনি এখানে এসেছেন। তাই আপনার সঙ্গে একটু আলাপ করতে এসেছি।

কাকাবাবু লোক দুটির দিকে একদৃষ্টি তাকিয়ে রইলেন, কোনও কথা বললেন না।

শিশির দত্তগুপ্তর মাথার চুল কোঁকড়া-কোঁকড়া, বেশ বড় একটা গোঁফ আছে, সেটাও কোঁকড়া মনে হয়। আর অরিজিৎ দেববর্মনের মাথার ঠিক মাঝখানটায় একটা ছোট গোলমতন টাকা। তাঁর গোঁফ নেই।

অরিজিৎ দেববর্মন বললেন, ডঃ প্ৰকাশ সরকার কোথায়? তাঁরও তো আপনাদের সঙ্গে থাকবার কথা। আপনারা কি বাইরে কোথাও যাচ্ছিলেন?

সন্তু বলল, প্ৰকাশ সরকারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!

শিশির দত্তগুপ্ত বললেন, খুজে পাওয়া যাচ্ছে না? তার মানে?

সন্তু বলল, সকালবেলায় উনি আমাদের কিছু না বলে কোথায় চলে গেছেন। এতক্ষণেও ফেরেননি!

অরিজিৎ দেববর্মন বললেন, স্ট্রেঞ্জ! এ রকম তো হওয়া উচিত না। মিঃ রায়চৌধুরীকে ফেলে রেখে উনি চলে গেলেন? চলুন, ঘরে বসা যাক, পুরো ব্যাপারটা শুনি।

ডলি কাকাবাবুর হাতটা নিজের কাঁধ থেকে ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করে বলল, তা হলে আমি চলে যাই?

শিশির দত্তগুপ্ত একদৃষ্টিতে ডলিকে দেখছিলেন, এবার ভুরু কুঁচকে বললেন, তোমার নাম চামেলি না? তুমি এর মধ্যেই আবার কাজ শুরু করে দিয়েছ? আপনারা একে চেনেন? আগে দেখেছেন কখনও?

সন্তু আমতা-আমতা করে বলল, মানে, ঠিক চিনি না, তবে ইনি বললেন, ইনি আমার এক মাসির মেয়ে–মানে, মাসতুতো বোন, আমাদের যেতে বললেন ওঁর সঙ্গে…

শিশির দত্তগুপ্ত বললেন, মাসতুতো বোন? তারপরই হেসে উঠলেন হা-হা করে।

এতক্ষণ বাদে কাকাবাবু চামেলি ওরফে ডলির দিকে তাকিয়ে আবার বললেন, একবার ভাসলে, একবার ড়ুবলে।

সঙ্গে সঙ্গে চামেলি ওরফে ডলি কেঁদে উঠল হাউহাউ করে।

কাকাবাবুকে ছেড়ে শিশির দত্তগুপ্তর একটা হাত চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, স্যার, আমায় বাঁচান। আপনি আমায় বাঁচান। ওরা আমায় মেরে ফেলবে।

শিশির দত্তগুপ্ত বাঁকাভাবে বললেন, আবার নাটক করছ? তোমার অভিনয় আমি ঢের দেখেছি।

চামেলি ওরফে ডলি বলল, সত্যি বলছি, স্যার। আমি বাইরে বেরুলেই ওরা মেরে ফেলবে। আমায়। আপনি আমাকে বাঁচান।

ওরা মানে কারা?

তাদের চিনি না। কয়েকজন গুণ্ডামতন লোক, তারা বলেছে, যদি কাজ উদ্ধার করতে না পারি, তা হলে তারা আমাকে প্ৰাণে মেরে ফেলবে।

কাজ মানে, কী কাজ?

কাকাবাবুকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে কোনওরকমে এখান থেকে নিয়ে যেতে বলেছিল। বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।

কোথায় গাড়ি? কী রঙের গাড়ি? কত নম্বর?

নম্বর জানি না। কালো রঙের অ্যাম্বাসাডর।

শিশির দত্তগুপ্ত তক্ষুনি পেছন ফিরে দৌড়ে চলে গেলেন গেটের দিকে।

চামেলি ওরফে ডলির কান্নাকাটি শুনে আরও কয়েকজন লোক ভিড় করে এসে দাঁড়িয়েছে। সত্যি-সত্যি চোখের জলে চামেলির গাল ভেসে যাচ্ছে।

অরিজিৎ দেববর্মন বললেন, আপনাদের ঘর কোনটা? চলুন ভেতরে গিয়ে বসা যাক।

সন্তু বলল, আপনি একটু কাকাবাবুকে ধরুন, উনি নিজে নিজে হাঁটতে পারেন না। আমি ঘরের তালা খুলছি।

চামেলি তখনও ফুসে ফুসে কাঁদছে। অরিজিৎ দেববর্মন কড়া গলায় বললেন, কান্না থামাও! তুমি রায়চৌধুরীকে অন্যদিকে ধরে।

ওরা কাকাবাবুকে ধরে ধরে ফিরিয়ে আনতে লাগল। সন্তু যখন চাবি দিয়ে তালা খুলছে, সেই সময় একটা অদ্ভুত কাণ্ড করল চামেলি। সে কাকাবাবুকে এক ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল অরিজিৎ দেববর্মনের গায়ে। টাল সামলাতে না। পেরে দুজনেই পড়ে গেলেন মাটিতে।

সন্তু অবাক হয়ে পেছন ফিরে ব্যাপারটা দেখে চামেলিকে তাড়া করতে যাচ্ছিল, অরিজিৎ দেববর্মন বললেন, থাক, ছেড়ে দাও। বোকা মেয়ে, এইভাবে কেউ পালাতে পারে।! ঠিক ধরা পড়ে যাবে।

কাকাবাবু বললেন, চিংড়ি মাছের মালাইকারি, ইলিশ মাছে শর্ষে বাটা…ফসকে গেল, ফসকে গেল!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *