০৭. জোজোর বুকটা ধকধক করছে

জোজোর বুকটা ধকধক করছে। সন্তু এতটা রসিকতা করবে না তার সঙ্গে। সে নেই, নিশ্চয়ই তার কোনও বিপদ হয়েছে। কাকাবাবুকে সে কী বলবে? যে লোকদুটো তাস খেলছিল, তারাই ছিল স্পাই। জোজো কতবার বলেছে, তবু সন্তু বিশ্বাস করতে চায়নি।

কাকাবাবু যে জায়গাটায় আছেন, সে জায়গাটার নাম যেন কী? ফক্কা ভ্যালি? তামান্না ভ্যালি? কুঝিকমিক ভ্যালি? একটু আগে এত করে মুখস্থ করল, তবু এখন মনে পড়ছে না। মনে না পড়লে সেই স্টেশনে নামবে কী করে? নামটা লিখে রাখা উচিত ছিল। টিকিটও তো সন্তুর কাছে। যাঃ, কী হবে, বিনা টিকিটের যাত্রী হিসেবে তাকে পুলিশে ধরবে?

সন্তুর ব্যাগটাও রয়ে গেছে। তার মানে সে ইচ্ছে করে কোথাও নামেনি। এক হতে পারে, সন্তু কোনও কারণে, অন্য কামরায় লুকিয়ে পড়েছে, ঠিক স্টেশনে এসে পড়বে। তাই আসুক, তাই আসুক। তারপর সন্তুকে জোজো বেশ কয়েকটা গাঁট্টা মারবে, আগে তো সন্তু আসুক!

দুটো-তিনটে ছোট-ছোট স্টেশনে দাঁড়াবার পর ট্রেনটা একটা মাঠের মধ্যে থামল। জোজো দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। পাশ দিয়ে একটা লোক সেখানেই নেমে পড়তে-পড়তে বলল, অ্যাকু ভ্যালি।

জোজো চমকে উঠল। নামটা মনে পড়ে গেছে। কিন্তু আরাকু আর অ্যাকু কি একই জায়গা?

মাঠের মধ্যে একটি যোলো-সতেরো বছরের ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। সে জোজোর দিকে হাতছানি দিয়ে বলল, কাম কাম, অ্যাকু ভ্যালি।

ট্রেন আবার হুইশল দিয়েছে। জোজো ব্যাগদুটো নিয়ে লাফিয়ে নেমে পড়ল। স্টেশন নেই, প্ল্যাটফর্ম নেই, টিকিট চেকারও নেই। শুধু একটা বোর্ডে লেখা আছে আরাকু ভ্যালি। স্টেশন এখনও তৈরিই হয়নি।

সেই ছেলেটি জোজোর ব্যাগদুটো বইবার ভঙ্গি করে বলল, টুরিস্ট লজ?

জোজোর মতো শহুরে পোশাক পরা যাত্রী আর সেই কামরায় ছিল না। সেইজন্যই জোজোকে দেখে সে ভেবেছে, এখানেই নামবে। বাইরের লোকরা এখানে বেড়াতে আসে, এই ছেলেটি জিনিসপত্র বইবার কাজ করে।

চলন্ত ট্রেনটার দিকে চেয়ে রইল জোজো। শেষ মুহূর্তেও সন্তু নামল না। জোজোর বুকটা হতাশায় ভরে গেল। একা-একা সে এখন কী করবে?

টুরিস্ট লজ যখন আছে, সেখানেই কাকাবাবুর খোঁজ পাওয়া যেতে পারে।

যত এলেবেলে জায়গা ভেবেছিল জোজো, তেমন নয়। পাকা রাস্তা দিয়ে বাস চলে, একটা বাসস্ট্যান্ডও আছে। রাস্তার দুধারে বেশ কিছু দোকানপাট, ভাতের হোটেলও রয়েছে। হোটেলের বাইরের বোর্ডে লেখা আছে কী কী খাবার পাওয়া যায়। জোজো দেখে নিল, চিকেন কারি, মাটন কারি, ডিমের ঝোল কিছুরই অভাব নেই। খুব একটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নয়, কিন্তু খাওয়া তো যাবে।

টুরিস্ট লজ বেশ বড় হয়, এটা টুরিস্ট গেস্ট হাউস। সেখানে পৌঁছে জোজো আর-একটা দুঃসংবাদ পেল।

রাজা রায়চৌধুরী এখানে একটি ঘর নিয়েছিলেন বটে, কিন্তু দুদিন ধরে তিনি ফেরেননি। তিনি যে গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই গাড়ির ড্রাইভার ফিরে এসেছে। গাড়ি খারাপ হয়ে গিয়েছিল, সে পরদিন মেকানিক নিয়ে গিয়ে সারিয়েছে, কিন্তু সেখানে রাজা রায়চৌধুরীর সন্ধান পাওয়া যায়নি। তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন।

গেস্ট হাউসের ম্যানেজার রাগরাগ ভাব করে বলল, সেই ঘরের তালা খুলে দেখা গেছে, একটা ব্যাগে দু-তিনটে জামা কাপড় ছাড়া দামি জিনিস কিছু নেই। আগে থেকে ভাড়ার টাকা নেওয়া হয়নি, খোঁড়া লোকটি নিশ্চয়ই ভাড়া ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছে।

কাকাবাবুর নামে এরকম অপবাদ সহ্য করতে পারল না জোজো। তার কাছে এখনও সাড়ে তিনশো টাকা আছে। এখানকার ঘরভাড়া ষাট টাকা। সে বলল, তিনদিনের ঘরভাড়া আমি এখনই দিয়ে দিচ্ছি। উনি নিশ্চয়ই ফিরে আসবেন। ওই ঘরে আমি থাকব।

ঘরে ঢুকে খাটের ওপর হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল জোজো। বুকটা ফাঁকা-ফাঁকা পাগছে। সন্তুকে ছাড়া সে কোথাও একা যায়নি। সন্তুও নেই, কাকাবাবুও নেই, এখন সে কী করবে? মাথা ঠাণ্ডা রেখে ভেবেচিন্তে ঠিক করতে হবে।

এখানে দুপুরের খাবার পাওয়া যাবে না। খেতে হবে বড় রাস্তার ধারের কোনও হোটেলে। জোজোর যদিও খিদে পেয়েছে, তবু যেতে ইচ্ছে করছে না। একলা-একলা হোটেলে বসে খেতে কেমন যেন বোকা-বোকা লাগে।

বাথরুমের কলে টপ-টপ করে জল পড়ছে। জোজো একবার উঠে গিয়ে কলটা বন্ধ করার চেষ্টা করল, কিন্তু সেটা টাইট হয় না। অনবরত জল পড়ার শব্দ শুনলে বিচ্ছিরি লাগে।

ভেবেচিন্তে কিছুই ঠিক করতে না পেরে জোজো শুয়েই রইল। খিদেয় পেট চিনচিন করছে। তবু সে মনেমনে বলল, সন্তু কিছু খেয়েছে কি না জানি না। সেইজন্য আমিও খাব না।

সে আশা করতে লাগল, কাকাবাবু নিশ্চয়ই যে-কোনও মুহূর্তে ফিরে আসবেন। কাকাবাবু এলেই নিশ্চিন্ত। কাকাবাবু ঠিক সন্তুকে খুঁজে বার করবেন।

এক সময় সে ঘুমিয়ে পড়ল।

 

তার ঘুম ভাঙল দরজায় ঠকঠক শব্দ শুনে। ধড়মড় করে উঠে বসে সে দেখল, এর মধ্যে বিকেল পেরিয়ে সন্ধে হয়ে গেছে। ঘর অন্ধকার।

আলো জ্বেলে সে দরজা খুলল।

একজন বেশ লম্বা-চওড়া লোক কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের দৃষ্টি কটমটে ধরনের।

জোজোর বুকটা ভয়ে কেঁপে উঠল, এও একজন স্পাই?

লোকটি জিজ্ঞেস করল, রাজা রায়চৌধুরী কোথায়?

জোজো শুকনো মুখে বলল, উনি ফেরেননি।

লোকটি কড়া গলায় বলল, ফেরেননি মানে? দু দিন ধরেই তো ফেরেননি শুনেছি। কোথায় গেছেন তুমি জানো না? তুমি কে?

জোজো বলল, আমি ওঁর … মানে উনি আমার কাকা।

লোকটি বলল, পরশু যখন ওঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়, তখন তো কোনও ভাইপো-টাইপো ছিল না। তুমি কোথা থেকে এলে?

জোজো বলল, কলকাতা থেকে। আপনি কে?

লোকটি বলল, আমার নাম বিসমিল্লা খান। এখানকার থানার ও. সি.।

জোজো হাঁফ ছেড়ে বলল, ওঃ পুলিশ। যাক, বাঁচা গেল। আপনার সঙ্গে আমার অনেক কথা আছে। আপনি ভেতরে এসে বসবেন?

বিসমিল্লা খান ভুরু নাচিয়ে বলল, তাই নাকি, আমার সঙ্গে কথা আছে। কিন্তু আমি তো এখানে বসতে পারব না। তুমি আমার সঙ্গে থানায় চলো। ভাইজাগ থেকে ঘন-ঘন ফোন আসছে। মিস্টার রাজা রায়চৌধুরীকে খুঁজে বার। করতে না পারলে আমার চাকরি চলে যাবে।

জিপে চড়ে একটুক্ষণের মধ্যেই ওরা পৌঁছে গেল থানায়।

নিজের চেয়ারে বসে বিসমিল্লা বলল, আমার সন্ধেবেলায় চা খাওয়া হয়নি। তুমি চা খাও তো?

জোজো ঘাড় হেলাতেই বিসমিল্লা চায়ের জন্য হাঁক দিল। সঙ্গে সঙ্গে ঝনঝন করে ফোন বাজল।

দুকাপ চায়ের সঙ্গে এল এক প্লেট বিস্কুট। বিসমিল্লা এখনও ফোনে কথা বলে যাচ্ছে, জোজো লোভীর মতো চার-পাঁচখানা বিস্কুট খেয়ে ফেলল।

ফোন নামিয়ে রেখে বিসমিল্লা বলল, আবার ডি আই জি সাহেব খোঁজ নিচ্ছিলেন। রাজা রায়চৌধুরী কোথায় গেলেন, তুমি কিছু জানো না?

জোজো বলল, না, জানি না। আমার বন্ধু সন্তুও হারিয়ে গেছে।

বিসমিল্লা দুহাত ঝাঁকিয়ে বলল, অ্যাঁ? আবার একজন হারিয়ে গেছে? সবাই এখানে হারাতে আসে কেন? অন্য জায়গায় হারালেই পারে। আমি এত পারব কী করে? আমার এখানে একখানা মাত্র জিপ। তা দিয়ে আমি থানা সামলাব, না লোক খুঁজতে বেরোব।

জোজো ঘাবড়ে গিয়ে চুপ করে গেল।

বিসমিল্লা টেবিলের ওপর ঝুঁকে পরে বলল, আর তুমি? তুমিও হারিয়ে গেছ নাকি?

জোজো বলল, আজ্ঞে না। আমি হারিয়ে যাইনি। আমি তো আপনার সামনেই বসে আছি।

বিসমিল্লা জিজ্ঞেস করল, তোমার বন্ধু, তার কী হয়েছে, সে কোথায় হারিয়েছে?

জোজো বলল, সে আমার সঙ্গে আসছিল। চলন্ত ট্রেন থেকে তাকে আর দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।

বিসমিল্লা এবার চেয়ারে হেলান দিয়ে বলল, চলন্ত ট্রেন থেকে? বাঁচা গেল! সেটা আমার দায়িত্ব নয়। রেল-পুলিশকে খবর দাও। স্টেশনমাস্টারকে জানিয়েছ?

জোজো বলল, আরাকু ভ্যালিতে নামলুম, সেখানে স্টেশনই নেই। স্টেশনমাস্টারকে পাব কোথায়?

বিসমিল্লা বলল, হুঁ, ওখানে স্টেশন নেই বটে। কিন্তু আর-একটু দূরে শুধু আরাকু নামে একটা স্টেশন আছে। সেখানে স্টেশনমাস্টার আছে। সেখানে গিয়ে যা বলার বলো! অবশ্য সেখানে খবর দিলেও কিছু লাভ হবে না। তারা কিছুই করতে পারবে না। চলন্ত ট্রেন থেকে কেউ হারাতে পারে নাকি? নিশ্চয়ই অন্য কোনও স্টেশনে নেমে গেছে।

জোজো বলল, ট্রেনটা একটা অন্ধকার টানেলের মধ্যে ঢুকেছিল, তারপর আর তাকে দেখা গেল না।

বিসমিল্লা বলল, তা হলে হারিয়ে যায়নি, অদৃশ্য হয়ে গেছে। এটা আলাদা কেস। তোমার কাছে সেই বন্ধুর কোনও ছবি আছে?

জোজো বলল, না, ছবি তো নেই।

বিসমিল্লা বলল, বা বা বা বা। সে অদৃশ্য হয়ে গেছে, তার ছবিও তোমার কাছে নেই। তা হলে কী করে বুঝব যে তোমার সঙ্গে একজন বন্ধু ছিল? যদি বলি, কেউ ছিল না? কিংবা, তুমিই তাকে চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছ?

জোজো আঁতকে উঠে বলল, অ্যাঁ! না না, সন্তু আমার শ্রেষ্ঠ বন্ধু, তাকে আমি ফেলে দেব কেন?

বিসমিল্লা বলল, লোকে কেন খুন করে, কেন ডাকাতি করে, সে তারাই ভাল জানে! মোট কথা, চলন্ত ট্রেন থেকে কেউ কখনও অদৃশ্য হয় না। তুমি যা বললে, তাতে তোমাকেই জেলে ভরে দেওয়া উচিত।

জোজো কাঁচুমাচু মুখে চুপ করে গেল।

বিসমিল্লা বলল, তোমাদের ব্যাপার কী বলো তো? তোমার কাকা অদৃশ্য হয়ে গেছেন। তোমার বন্ধু অদৃশ্য হয়ে গেল। তুমিও কি এখানে অদৃশ্য হওয়ার জন্য এসেছ? এর আগেও তো এখানে অনেক বাঙালি এসেছে, তারা তো কেউ অদৃশ্য হয়নি।

জোজো মিনমিন করে বলল, আমার অদৃশ্য হওয়ার একটুও ইচ্ছে নেই, বিশ্বাস করুন!

বিসমিল্লা বলল, তা হলে যাও, টুরিস্ট লজে গিয়ে শুয়ে থাকো। এই রাত্তিরে তো কিছু করা যাবে না। ভাল করে দরজা-টরজা বন্ধ করে ঘুমোবে। খবরদার, অদৃশ্য হোয়ো না। কাল সকালে তোমার কাকাবাবুকে খুঁজতে বেরোব। চতুর্দিকে এত পাহাড়, এর মধ্যে কোথায় খুঁজব, তাই বা কে জানে! ভাইজাগের বড়কর্তারা তো কিছু বুঝবে না।

আর দুজন লোক ঘরে ঢুকে বিসমিল্লার সঙ্গে কথা বলতে লাগল। একটু পরে সে মুখ তুলে বলল, তুমি আর বসে রইলে কেন, তোমাকে তো ধরে রাখছি না। তুমি যেতে পারো।

জোজোর খুব অভিমান হল। ফেরার সময়ে আর তাকে গাড়ি দেবে না? তাকে হেঁটে যেতে হবে। সে এখানকার রাস্তা চেনে না।

আস্তে-আস্তে সে বেরিয়ে এল থানা থেকে। রাস্তা একেবারে অন্ধকার। কিছু লোক অবশ্য হাঁটছে টর্চ জ্বেলে। দূরে দেখা যাচ্ছে কিছু দোকানের আলো।

ঠিক কোনও কারণ নেই, তবু জোজোর গা ছমছম করতে লাগল। সন্তু কোথায় গেল সে কিছুই বুঝতে পারছে না। পুলিশও কোনও সাহায্য করল না। কাকাবাবুও কোথায় লুকিয়ে রইলেন?

টুরিস্ট গেস্ট হাউসের ঘরটা কেমন স্যাঁতসেঁতে, এমনিতেই দমবন্ধ হয়ে আসে। রাত্তিরে ওই ঘরে তাকে একলা থাকতে হবে? জোজো কোনওদিনই রাত্তিরে একা শুতে পারে না। অন্যরা শুনলে হাসবে তাই সে বলে না, কিন্তু সে ভূতের ভয় পায়। এরকম অচেনা জায়গায় একা থাকা তো আরও ভয়ের ব্যাপার। সন্তু তাকে কী বিপদেই না ফেলে গেল!

একটা দোকানে ঢুকে জোজো পেট ভরে রুটি-মাংস খেয়ে নিল। পেটে খিদে থাকলে ঘুমই আসত না। সমস্ত দরজা-জানলা বন্ধ করে দিয়ে চাদর মুড়িসুড়ি দিয়ে কোনওমতে রাতটা কাটিয়ে দিতে হবে।

জোজো ঘরে তালা লাগিয়ে চাবিটা পকেটে নিয়ে বেরিয়েছিল। ফিরে এসে দেখল, তালা নেই। দরজাটা ঠেলতেই খুলে গেল।

জোজোর বুকটা কেঁপে উঠল খুব জোরে। একবার সে ভাবল, পেছন ফিরে দৌড় মারবে কি না। তার বিছানায় কে যেন শুয়ে আছে!

দরজা ঠেলার শব্দ পেয়ে লোকটি মুখ ফেরাল। যেমন ভয় পেয়েছিল, তেমনই হঠাৎ জোয়ারের মতো আনন্দে জোজোর বুক ভরে গেল। সে ব্যাকুলভাবে ডেকে উঠল, কাকাবাবু! আপনি ফিরে এসেছেন?

কাকাবাবুও বেশ অবাক হয়ে বললেন, জোজো, তুই! ওরা যে বলল, একজন ছেলে এসেছে। তাই আমি ভাবলাম, সন্তু বুঝি চলে এসেছে হঠাৎ। তোরা দুজনেই এসেছিস? সন্তু কোথায়?

জোজো এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। দেওয়ালে হেলান দিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল, দুহাত চাপা দিল মুখে।

কাকাবাবু উঠে এসে বললেন, এ কী রে জোজো, কী হল। কাঁদছিস কেন?

জোজো আর কথা বলতেই পারছে না।

কাকাবাবু তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, তোকে তো কখনও কাঁদতে দেখিনি। জোজোকে মহা বীরপুরুষ বলেই তো জানি। কত দেশ-বিদেশ ঘুরেছিস!

একটু পরে কিছুটা সামলে নিয়ে জোজো চোখ মুছতে মুছতে বলল, সন্তু নেই। আমরা একসঙ্গে ট্রেনে আসছিলাম, হঠাৎ অন্ধকারের মধ্যে… সন্তু কোথায় চলে গেল… নিশ্চয়ই কেউ ধরে নিয়ে গেছে…. থানা থেকে কোনও সাহায্য করল না।

কাকাবাবু বললেন, বোস তো! সবটা খুলে বল।

জোজোর মুখে সব ঘটনাটা শুনে কাকাবাবু একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর আপন মনে বললেন, সন্তুকে ধরে নিয়ে গেছে। তোকে আর সন্তুকে ওরা চিনল কী করে? আমি ওদের হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর ওরা নিশ্চয়ই এই গেস্ট হাউস আর ভাইজাগের হোটেলে নজর রেখেছিল। ভেবেছিল আমি এর কোনও এক জায়গায় ফিরব। ভাইজাগের পার্ক হোটেলের লবিতে ওদের কোনও লোক ছিল, সে তোদের কথাবার্তা শুনেছে।

জোজো বলল, একটা লোক বারবার আমাদের আরাকু ভ্যালিতে যাওয়ার কথা বলছিল।

কাকাবাবু বললেন, সে-ই অন্য দুজন লোককে তোদের সঙ্গে সঙ্গে পাঠিয়েছে।

জোজো উত্তেজিতভাবে বলল, আমি বলেছিলুম, আমি বলেছিলুম, স্পাইরা আমাদের ফলো করছে, সন্তু বিশ্বাস করেনি।

কাকাবাবু বললেন, সন্তু যে বেশি-বেশি সাহস দেখাতে চায়। জোজো বলল, এখানকার থানার ও. সি., কী যেন নাম, বড়ে গোলাম আলি কী যেন, তিনি কোনও সাহায্য করতে রাজি হলেন না। সন্তুর কথা শুনলেনই না ভাল করে। তবে, আপনার জন্য খুব চিন্তিত।

কাকাবাবু সে-কথা না শুনে বললেন, সন্তু ঘাবড়াবে না, আগেও অনেকবার এরকম হয়েছে। কিন্তু এই লোকগুলো খুব নিষ্ঠুর। আমাকে তো মেরে ফেলার অনেক চেষ্টা করেছে, পারেনি। সন্তু পালাবার চেষ্টা করলে যদি প্রাণে মেরে ফেলে?

জোজো জিজ্ঞেস করল, ওরা কারা?

কাকাবাবু চিন্তিতভাবে বললেন, ওদের তো চিনি। কিন্তু ওরা যে কেন আমার সঙ্গে এত শত্রুতা করছে, সেটাই বুঝতে পারছি না। হয়তো পুরনো কোনও রাগ আছে। হয়তো ওদের দলের কাউকে আগে কখনও শাস্তি দিয়েছি।

হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়ে যাওয়ায় কাকাবাবু উঠে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত হয়ে বললেন, জোজো, শিগগির সব জিনিসপত্র গুছিয়ে নে। একটু পরেই একটা ট্রেন আছে, তাতে ফিরে যাওয়াই ভাল। আমি যে এখানে ফিরে এসেছি তা ওরা টের পেয়ে যাবে। রাত্তিরে এখানে হামলা হতে পারে। চল, চল, পালাই। ওদের বোঝাতে হবে যে, আমরা ভয় পেয়েছি।

হুড়োহুড়ি করে জামাকাপড় ব্যাগে ভরে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন দুজনে।

কাকাবাবু বললেন, এ-যাত্ৰায় টর্চ আনিনি সঙ্গে, এটা একটা মস্ত ভুল হয়েছে। দেখিস জোজো, অন্ধকারে যেন হোঁচট খেয়ে পড়িস না।

তিনটে ব্যাগই জোজোকে নিতে হয়েছে, কাকাবাবু হাঁটছেন ক্রাচ নিয়ে, এক হাতে রিভলভার। তীক্ষ্ণ নজরে দেখছেন, কেউ পেছনে আসছে কি না।

লাইনের ধারে মিনিট দশেক দাঁড়াবার পরই ট্রেনটা এসে গেল।

অধিকাংশ কামরাই ফাঁকা। জোজো আর কাকাবাবু যে কামরায় উঠলেন, সেটাতে আর একজনও যাত্রী নেই। তবে আলো জ্বলছে।

কাকাবাবু বললেন, টিকিট কাটা হল না…. চেকার এলে ভাড়া মিটিয়ে দিলেই হবে।

জোজো বলল, সন্তু যেখান থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে, সেই জায়গাটা আমি দেখিয়ে দিতে পারব।

কাকাবাবু বললেন, দেখলেও বিশেষ লাভ হবে না। এখানে শুধু পাহাড়ের পর পাহাড়। এর মধ্যে কোনও মানুষ লুকিয়ে থাকলে খুঁজে বার করা অসম্ভব!

জোজো জিজ্ঞেস করল, কাকাবাবু, এই দুদিন আপনি কোথায় ছিলেন?

কাকাবাবু বললেন, সে খুব রোমহর্ষক কাহিনী। এত ঝাটে আমিও আগে কখনও পড়িনি।

সংক্ষেপে তিনি জোজোকে ব্যাপারটা জানালেন।

অন্ধকারে পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালাতে-চালাতে কাকাবাবু কোথায় যে চলে গিয়েছিলেন তার ঠিক নেই। পাহাড় ছেড়ে নীচে নামার রাস্তা কিছুতেই খুঁজে পাননি। দু-একবার গাড়ি অ্যাসিডেন্ট হতে যাচ্ছিল। একবার তো খাদে পড়ে যাচ্ছিলেন প্রায়।

তারপর হঠাৎ গাড়িটা বন্ধ হয়ে গেল এক জায়গায়। আর কিছুতেই স্টার্ট নেয় না। কাকাবাবু দেখলেন গাড়িতে আর এক ফোঁটাও পেট্রল নেই। রাত তখন তিনটে।

তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, গাড়িতে বসে থাকা আরও বিপজ্জনক। মঞ্চাম্মা নামে সেই মহিলা আর তার দলবল তাঁকে ধরার জন্য ধাওয়া করে আসবেই।

তিনি গাড়ি ছেড়ে, কোনওরকমে হ্যাঁচোড়-প্যাঁচোড় করে রাস্তা থেকে উঠে গেলেন খানিকটা ওপরে। একটা বড় পাথরের আড়ালে বসে রইলেন। এখানে তাঁকে কেউ দেখতে পাবে না। খোঁজাখুঁজির জন্য ওরা ওপরে উঠে এলেও তিনি পাথরের আড়াল থেকে গুলি চালাতে পারবেন।

ভোরের আলো ফোটার একটু পরেই আর-একটা গাড়ি চলে এল সেখানে। তার থেকে তিনজন তোক আর সেই মঞ্চাম্মা নামের মহিলাটা নামল। পরিত্যক্ত জিপটায় উঁকিঝুঁকি মেরে তারা তাকাল পাহাড়ের দিকে। খানিকটা কাছাকাছি খোঁজাখুঁজি করল। কাকাবাবু ওপর থেকে ওদের দেখতে পাচ্ছেন, ওরা তাঁকে দেখতে পাচ্ছে না।

তারপর নিজেদের গাড়ির সঙ্গে অন্য জিপটাকে বেঁধে নিয়ে ওরা চলে গেল।

কাকাবাবু তখনও বুঝতে পারছেন না, তিনি কোনদিকে গেলে আরাকু ভ্যালি পৌঁছবেন। ম্যাপটা হারিয়ে গেছে। তবু ভাগ্যিস জিপটার মধ্যে তাঁর ক্রাচদুটো পাওয়া গিয়েছিল।

রাস্তাটা যেদিকে ঢালু হয়ে গেছে, সেদিকে খানিকটা এগিয়েও লাভ হল না। হঠাৎ সেটা খাড়া হয়ে আবার উঠে গেছে ওপরের দিকে।

খানিক পরে আর একটা গাড়ির আওয়াজ পেতেই তিনি সতর্ক হয়ে গেলেন। অন্য কারও গাড়ি হলে তিনি লিফ্ট চাইতে পারেন, কিন্তু যদি গুন্ডাদেরই গাড়ি হয়?

সাবধানের মার নেই। কাকাবাবু আবার রাস্তা ছেড়ে ওপরের দিকে উঠে একটা পাথরের আড়াল খুঁজলেন। যা ভেবেছিলেন ঠিক তাই। দুদিক থেকে দুটো গাড়ি এল, দুটোই গুন্ডাদলের। তারা পাগলের মতো কাকাবাবুকে খুঁজছে। কিছুতেই যেন তাঁকে বেঁচে ফিরতে দেবে না।

কাকাবাবু বুঝতে পারলেন, পাকা রাস্তা দিয়ে তাঁর হাঁটা চলবে না। যে-কোনও সময় একটা বাঁকের আড়াল থেকে ওদের গাড়ি এসে পড়তে পারে, তখন গা-ঢাকা দেবেন কী করে?

তাঁকে এগোতে হবে রাস্তা ছেড়ে ওপরের ঝোপঝাড় ঠেলে। দু বগলে ক্রাচ নিয়ে সেভাবে চলা কি সহজ কথা? এক ঘণ্টা হেঁটেই ক্লান্ত হয়ে যান।

সারাদিন ধরে ওদের দলের সঙ্গে কাকাবাবুর লুকোচুরি খেলা চলল।

অন্ধকার নেমে আসার পর তিনি আর এক-পাও এগোতে সাহস করলেন না। যে-কোনও মুহূর্তে খাদে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা। শরীরও আর বইছিল না। প্রায় দুদিন কিছু খাওয়া হয়নি। মাঝে-মাঝে গর্তে জমে থাকা বৃষ্টির জল পান করতে বাধ্য হয়েছেন। খাদ্য জুটবে কোথায়? পাহাড়ের কোনও গাছেই ফল নেই, গাছের পাতা তো খাওয়া যায় না!

সারারাত তিনি একটা বড় গাছের তলায় ঘুমোলেন।

পরদিন কিছুটা ঘোরাঘুরি করার পর তিনি দেখতে পেলেন একটা ছোট্ট ঝরনা। সেটা দেখে তিনি অনেকটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। ঝরনার জল নিশ্চিন্তে পান করা যাবে, তা ছাড়া ঝরনা সবসময় নীচের দিকে যায়। অনেক ঝরনা মিলে সমতলে গিয়ে নদী হয়। ঝরনাটাকে অনুসরণ করতে পারলে সমতলে গিয়ে পৌঁছবেন।

ঝরনায় নেমে তিনি ছপছপ করে এগোচ্ছিলেন। তবু একটা মুশকিল হল। মাঝে-মাঝে সেই ঝরনাটা বয়ে যাচ্ছে একেবারে রাস্তার পাশ দিয়ে। রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে দু-একটা গাড়ি। সে-গাড়ি ওই গুন্ডাদের, না অন্যদের, তা বুঝবার উপায় নেই, ঝুঁকিও নেওয়া যায় না। ওরা এখনও খুঁজছে, হাল ছাড়েনি, তাই দূরে গাড়ির আওয়াজ পেলেই কাকাবাবুকে লুকোতে হয়েছে।

শেষপর্যন্ত সমতলে পোঁছে, একটা ট্রাক ধরে তিনি কাকুতি-মিনতি করেছেন। সেই ট্রাকটা ছিল কাঠবোঝাই, তারা একজন খোঁড়া মানুষকে দেখে দয়া করে নামিয়ে দিয়ে গেছে গেস্ট হাউসের কাছে।

কাকাবাবু বললেন, জানিস জোজো, একবার ওরা আমাকে প্রায় ধরে ফেলেছিল। ঝরনাটার পাশ দিয়ে যাচ্ছি, এক জায়গায় দেখি, ওদের তিনজন গাড়ি থামিয়ে রাস্তায় নেমে কীসব শলাপরামর্শ করছে। আমি চট করে লুকিয়ে পড়লাম। ওরা যতক্ষণ না চলে যায়, ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। কিন্তু ইচ্ছে করলেই আমি আড়াল থেকে গুলি চালিয়ে ওদের জখম করে গাড়িটার দখল নিয়ে নিতে পারতাম। কিন্তু নেহাত প্রাণরক্ষার জন্য শেষ মুহূর্তে ছাড়া মানুষের ওপর গুলি চালাতে ইচ্ছে করে না। তাই এত কষ্ট পেয়েও আমি ওদের ছেড়ে দিয়েছি।

জোজো বলল, মূর্তি-চোরগুলো এত মরিয়া হয়ে উঠেছে, ওই মূর্তিগুলো খুব দামি বুঝি?

কাকাবাবু বললেন, তা জানি না। আমি তো ভাল করে দেখিইনি। প্রোফেসর ভার্গব বলেছিলেন, এই মূর্তিগুলোর ইতিহাসের দিক থেকে খুব দাম আছে, কিন্তু বাজারে বিক্রি করলে বা বিদেশে বিক্রি করলে কত দাম পাওয়া যাবে, সে সম্পর্কে কিছু শুনিনি। এবারে গিয়ে ওঁকে জিজ্ঞেস করতে হবে।

কাকাবাবু একটা হাই তুলে বললেন, এবারে বড় পরিশ্রম গেছে রে! দু রাত্তির ঠিকমতন ঘুমোতে পারিনি। খুব ক্লান্ত লাগছে।

জোজো বলল, এত জায়গা, আপনি শুয়ে পড়ন না!

কাকাবাবু বললেন, আমরা ঝটপট চলে এসেছি। ওরা বোধ হয় আমাদের ট্রেনে ওঠাটা টের পায়নি। তবু সাবধানে থাকতে হবে। আমি যদি ঘুমিয়ে পড়ি, তুই পাহারা দিতে পারবি?

জোজো বললে, কেন পারব না? আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমোন।

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, আমার রিভলভারটা যদি তোর কাছে রাখি, দরকার হলে তুই গুলি চালাতে পারবি তো?

জোজো ঠোঁট উলটে বলল, ইজি! একবার সাহারা মরুভূমিতে তিন-তিনটে বেদুইন-ডাকাত আমাদের ঘিরে ফেলেছিল। আমাদের সঙ্গে যে আমর্ড গার্ড ছিল, সে বেচারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। আমি তার হোলস্টার থেকে টপ করে রিভলভারটা তুলে নিয়ে চোখের নিমেষে গুলি চালালুম। তিনটে ডাকাতই ঘায়েল।

কাকাবাবু হা-হা করে হেসে উঠে বললেন, বাঃ, এই তো ঠিক জোজোর মতন কথা। এতক্ষণ বড্ড চুপচাপ ছিলি। তোর মুখে এইরকম কথা শুনতেই আমার ভাল লাগে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *