গণ্ডারটা দাঁড়িয়ে আছে একটা ছোট্ট টিলার ওপরে। তার পেছন দিকে দেখা যাচ্ছে শুধু আকাশ। গণ্ডারটা এমন স্থির হয়ে রয়েছে, যেন মনে হয় একটা পাথরের মূর্তি।

ম্যানেজার ফিলিপ তাদের গণ্ডার দেখাবার ছল করে এতদূর নিয়ে এসেছিল, এবারে সত্যি-সত্যি সেই গণ্ডার নিজে থেকেই দেখা দিল।

কাকাবাবু সন্তুর হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে দুজনেই বসে পড়েছেন মাটিতে। তিনি ফিসফিস করে বললেন, এবারে আস্তে-আস্তে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়। ওর দিকে চোখ রেখে। গণ্ডার এমনিতে মানুষ মারে না। কিন্তু ও আমাদের দেখতে পেলেই চটে যেতে পারে। মাটিতে শুয়ে থাকলে দেখতে পাবে না।

সন্তু উপুড় হয়ে শুয়ে মাটিতে চিবুক ঠেকিয়ে বলল, কিন্তু ও যদি এদিকেই ছুটে আসে?

কাকাবাবু বললেন, ও যদি আমাদের পিঠের ওপর দিয়ে চলে যায়, তা হলে ট্যাঙ্ক চাপা পড়লে যে অবস্থা হয়, আমাদেরও সেই দশা হবে। আশা করি, ও ভদ্রতা দেখিয়ে অন্য দিকে চলে যাবে। আর যদি সত্যি এদিকে দৌড়ে আসে, তা হলে আমরা দুজনে গড়িয়ে যাব, বুঝলি। তাতে অন্তত একজন বাঁচব।

গণ্ডারটি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, এদিকেই তাকিয়ে আছে, কী দেখছে কে জানে! অন্য বড় জন্তুরা একসঙ্গে অন্তত তিন-চারজন থাকে, গণ্ডারটি কিন্তু একলা। বিশাল তার চেহারা। গণ্ডারটি যখন টিলার ওপাশ দিয়ে উঠে এসেছে, তখন এই দিকেই তার যাওয়ার ইচ্ছে।

হঠাৎ পেছনে একটা শব্দ হতে সন্তু চকিতে একবার পেছনে তাকাতেই তার বুক হিম হয়ে গেল। তাদের পেছনে, ঠিক পেছনে নয়, ডান দিকে কোনাকুনি দাঁড়িয়ে আছে তিনটি হাতি, তিনটি দাঁতাল, তাদের মধ্যে একটি শুড় তুলে ডাকছে।

কাকাবাবু বললেন, শুয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার উপায় নেই রে, সন্তু। একদম চুপ করে থাক, একটুও নড়াচড়া করবি না।

সন্তু একবার ভাবল, সামনে বা পেছনে তাকবে না। অথচ না-তাকিয়ে পারছেও না। গণ্ডারটি যেমন এক জায়গায় স্থির হয়ে আছে, তেমনি হাতি তিনটিও আর এগোচ্ছে না, তবে তিজনেই একসঙ্গে শুঁড় দোলাচ্ছে ঘন ঘন।

এক-একটা মিনিট যেন এক-এক ঘণ্টা। কতক্ষণ ওরা দাঁড়িয়ে থাকবে? ওরা কি পরস্পরকে তাড়া করবে, মাঝপথে সন্তুদের চিড়েচ্যাপ্টা করে দিয়ে? গণ্ডার আর হাতিদের মধ্যে শত্ৰুতা থাকে, না বন্ধুত্ব?

একসময় গণ্ডারটি পেছন ফিরে আস্তে আস্তে নেমে গেল টিলার অন্য দিকে। যে পথ দিয়ে এসেছিল, সেই পথে; সন্তু সঙ্গে-সঙ্গে ধড়মড় করে উঠে বসল। তার ধারণা, এবারে বাঁচতে হলে হাতিদের কাছ থেকে ছুটে পালাতে হবে।

কিন্তু হাতিগুলাও পেছন ফিরেছে। তারাও গদাই লস্কর চালে ফিরে যেতে লাগল।

কাকাবাবু উঠে বসে কোটের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন, এইসব জানোয়াররা কী ভদ্র দেখলি? ওরা একদল অন্যের কাছ ঘেঁষাৰ্ঘেষি করতে চায় না, আবার কেউ কারও পথও আটকায় না। গণ্ডারটা হাতিদের পথ ছেড়ে দিল, হাতিরাও ভাবল, গণ্ডারটাই থাক, আমরা ফিরে যাই।

সন্তু আচ্ছন্ন গলায় বলল, সত্যি ওরা ফিরে গেল? আমাদের দেখতে পায়নি?।

আরে ওদের কাছে আমরা তো এলেবেলে। আমাদের দেখলেও ওরা গ্রাহ্যই করত না। আমরা কার জন্য বেঁচে গেলাম বল তো? গণ্ডারটার জন্য, না হাতিগুলোর জন্য? বলা শক্ত।

হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গিয়ে কাকাবাবু বললেন, কিন্তু ভেবে দ্যাখ তো, যারা লুকিয়ে শিকার করে, যাদের বলে পোচার, সেইরকম দুজন যদি এখানে উপস্থিত থাকত আমাদের বদলে, তা হলে কী হত? এরকম নির্জন জায়গায়, গণ্ডারটা, হাতিগুলো, একটাও বাঁচত না। আজকাল লাইট মেশিনগান দিয়ে এইসব বড় বড় জানোয়ার মেরে ফেলাও খুব সোজা।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, চল, আবার যাত্রা শুরু করি। ওই যে সামনের বড় গাছটা দেখছিস ওই দিকে যাব। একটা নির্দিষ্ট কিছু দেখে এগোতে হবে, নইলে এত বড় মাঠের মধ্যে দিক হারিয়ে ফেলব।

এক-পা-বাঁধা মোরগের মতন কাকাবাবু লাফিয়ে লাফিয়ে এগোতে লাগলেন। সন্তু দেখল, একটু বাদেই ঘামে কাকাবাবুর পিঠ একেবারে ভিজে গেছে। এরকমভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে যাওয়া দারুণ পরিশ্রমের ব্যাপার। এমনভাবে মানুষ কত দূর যেতে পারে? তবু কাকাবাবুর অদম্য উৎসাহ।

বড় গাছটার কাছে পৌঁছে সন্তু ভাবল এখানে একটু বিশ্রাম নেওয়া হবে, কিন্তু কাকাবাবু সেখানে না থেমে বললেন, চল, হাফিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত ওই সামনের বাঁশঝাড়টা অবধি যাই, অবশ্য ওটার খুব কাছে যাওয়া ঠিক হবে না, ভেতরে কোনও জন্তু থাকতে পারে।

আর-একটু যাওয়ার পরই সন্তু শুনতে পেল, কাকাবাবু ঠিক হাপরের মতন নিশ্বাস ফেলছেন। সন্তু কাকাবাবুর হাত চেপে ধরে বলল, কাকাবাবু, থামো, থামো! এবার একটু বিশ্রাম নিতেই হবে। আমি আর পারছি না।

কাকাবাবু দাঁড়িয়ে পড়ে বুক ভরে কয়েকবার শ্বাস নিলেন। তারপর ঘড়ি দেখে বললেন, দেড়টা বাজে। তোর খিদে পেয়ে গেছে, না রে? আমরা নটার সময় হেভি ব্রেকফার্স্ট খেয়ে বেরিয়েছি। অন্যদিন এই সময় তেমন খিদে পায় না। কিন্তু আজই বেশি খিদে পাবে। খিদে জিনিসটা খুব পাজি, সুবিধে অসুবিধে গ্রাহ্য করে না।

সন্তুর পেটে দাউদাউ করে খিদের আগুন জ্বললেও সে সে-কথা ভাবছে না। সে ভাবছে, দুঘণ্টা তো কেটে গেল, এখনও জনমানবের সামান্য চিহ্নও নেই। প্ৰান্তরটির চেহারা আগেও যে-রকম ছিল, এখনও সে-রকম। তবে হোটেল থেকে বেরিয়েই এক ঘণ্টার মধ্যে যত জন্তু-জানোয়ার দেখা গিয়েছিল, এদিকে ওদের সংখ্যা খুবই কম। সেই গণ্ডার ও হাতি তিনটের পর মাঝখানে ওরা শুধু দুটো উটপাখি দেখতে পেয়েছিল। সে-দুটো দেখে কাকাবাবু বলেছিলেন, ইশ, কোনওরকমে যদি ওদের ধরে ওদের পিঠে চাপা যেত! ওরা ঘণ্টায় ত্ৰিশ মাইল বেগে ছোটে।

এরকম অবস্থার মধ্যেও কাকাবাবুর কথা শুনে হেসে ফেলেছিল সন্তু।

কাকাবাবু আবার বললেন, কিতদিন তো আমরা সকালে খেয়ে বেরোই। রাত্তিরের আগে আর খাওয়াই হয় না। মনে কর, আজকের দিনটাও সে-রকম?

সন্তু বলল, কাকাবাবু, রাত্তিরে আমরা কোথায় খাব?

সন্তুর পিঠে চাপড়ে দিয়ে কাকাবাবু বললেন, হবে, হবে, একটা কিছু ব্যবস্থা হয়ে যাবে। আগে থেকেই অত ঘাবড়াচ্ছিস কেন? চল, বাঁশঝাড়টা পেরিয়ে আর-একটা কোনও নিশানা ঠিক করি। থামলে চলবে না?

বাঁশঝাড়ের কাছাকাছি গিয়ে ওদের থামতে হল। এই প্রথম ওরা দেখতে পেল সাপ।

আফ্রিকাতে কোনও কিছুই কম-কম নয়। আমাদের দেশে একসঙ্গে একটা-দুটো সাপ দেখতে পাওয়াই যথেষ্ট, এখানে ওরা বাঁশঝাড়ের বাইরেই দেখতে পেল এগারোটা। ভেতরে আরও কত আছে কে জানে!

কয়েকটা সাপ বাঁশগাছে জড়িয়ে আছে, কয়েকটা কাছাকাছি মাটিতে কিলবিল করছে। সবগুলোরই রং কালো, তবে আকারে খুব বড় নয়। জায়গাটা স্যাঁতসেঁতে। মাটিতে অনেক গর্ত।

কাকাবাবু থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে নাক কুঁচকে বললেন, এই একটা প্ৰাণীকে দেখলেই আমার ঘেন্না হয়। সাপও নিরীহ প্ৰাণী, মানুষকে সহজে কামড়ায় না। জানি, কিন্তু আমি সাপের দিকে তাকাতে পারি না, আমার গা গুলিয়ে ওঠে। আমি রিভলভার দিয়ে দুবার দুটো সাপ গুলি করে মেরেছি। এখন যদি সঙ্গে রিভলভারটা থাকত…

বলতে বলতে থেমে গিয়ে কাকাবাবু হঠাৎ ফিক করে হেসে ফেললেন।

সন্তু অনেকক্ষণ ধরেই রিভলভারটার কথা ভাবছে। কাকাবাবুর সঙ্গে সেটা থাকলে ওই হোটেল-ম্যানেজার ফিলিপ কি এত সহজে তাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়ে কাপুরুষের মতন পালাতে পারত? প্লেনে বন্দুক-পিস্তল নিয়ে ওঠা নিষেধ বলেই কাকাবাবু সেটা সঙ্গে আনেননি।–তা ছাড়া, এবারে তো স্রেফ বেড়াতে আসা।

সন্তুর মনের কথাটাই যেন বুঝতে পেরে কাকাবাবু বললেন, রিভলভারটা সঙ্গে আনিনি, ভালই হয়েছে। আনলে একটা-কিছু রক্তারক্তি কাণ্ড হয়ে যেত। ওই যে ফিলিপ, ওর চোখ দেখেই বোঝা যায়, লোকটা সাঙ্ঘাতিক নিষ্ঠুর। হি ইজ অ্যা কিলার। তুই তো জানিস, সন্তু, আমি রিভলভার তুলে লোকদের ভয় দেখাই, চট করে কাউকে গুলি করতে পারি না। কিন্তু ওই ফিলিপ সহজে ভয় পাবার পাত্র নয়, আমি ওর দিকে রিভলভার তুললেই ও এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে দিত।

কাকাবাবু, ওই ফিলিপের মতন লোককে মায়াদয়া না করে গুলি করাই উচিত।

দ্যাখ না, পরে ওকে শান্তি দিই। কী রকম!

পরে মানে? ওর সঙ্গে কি আমাদের আর দেখা হবে?

বাঁশঝাড়টাকে পাশ কাটিয়ে ওরা আর-একটা কিছু নিশানা ঠিক করার জন্য থামল। ঠিক সোজাসুজি আর কোনও বড় গাছটাছও চোখে পড়ে না। মেঘের গায়ে জেগে উঠেছে একটা বিশাল পাহাড়। তার চুড়া বরফে ঢাকা।

সন্তু একবার চোখ কাঁচকাল। সে সত্যি-সত্যি ওরকম একটা সুন্দর পাহাড় দেখছে, না। ওটা তার চোখের ভুল?

কাকাবাবু পাহাড়টা আগে দেখতে পাননি। সন্তু ডেকে দেখাতেই তিনি বললেন, বাঃ, এতদূর থেকেও যে দেখা যায়, জানতুম না তো! ওটা কী পাহাড় জানিস? ওই হচ্ছে কিলিমাঞ্জারো। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের লেখা আছে, মোজ অব কিলিমাঞ্জারো, পড়িসনি বুঝি? এবারে ফিরে গিয়ে পড়ে নিস!

যদি ফিরতে পারি।

ফিরবি না কেন? আবার ঘাবড়াচ্ছিস। তুই কি ভাবছিস, এই মরুভূমির মতন মাঠে আমরা মরে পড়ে থাকব; তা হতেই পারে না! রাজা রায়চৌধুরী এভাবে মরার জন্য জন্মায়নি। আগে ওই ফিলিপটিকে শাস্তি দিতে হবে, অশোক দেশাই আর নিনজানেকে জেলে ভারতে হবে, তবে তো অন্য কথা!

কাকাবাবু, কাকাবাবু, এটা কী? আমার পায়ে, আমার পায়ে…

সন্তুর চিৎকার শুনে কাকাবাবু কেঁপে উঠলেন।

সন্তু ট্রাউজার্স পরে আছে, তার বাঁ পায়ে পেঁচিয়ে ধরেছে একটা সাপ, তার মুখটা ওপরের দিকে, মাঝে-মাঝে একটা লকলকে জিভ বার করছে।

এই প্রথম ভয় পেয়ে গেলেন কাকাবাবু। তাঁর মুখখানা রক্তশূন্য ফ্যাকাশে হয়ে গেল, সাপটাকে দেখে একবার তিনি ঘেন্নায় দৃষ্টিটা সরিয়ে নিলেন, বোধহয় এক মুহূর্তের জন্য তিনি ভাবলেন, এবারে আর সন্তুকে বাঁচানো সম্ভব হল না।

একদম নড়বি না, না নড়লে ও কিছু করবে না…

পকেট থেকে একটা রুমাল বার করে কাকাবাবু ডান হাতে জড়িয়ে নিলেন। তারপর বিদ্যুতের গতিতে সেই হাতটা দিয়ে চেপে ধরলেন সাপটার মাথা। প্রবল শক্তিতে সন্তুর পা থেকে সাপটার প্যাঁচগুলো খুলে, সেটাকে আছড়াতে লাগলেন মাটিতে। চার-পাঁচ বার সেরকম আঘাতেই সাপটা অক্কা পেয়ে গেছে, তবু কাকাবাবু থামছেন না। মেরেই চলেছেন।

সন্তু এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখল। আর কোনও সাপ আছে কি না। এ জায়গাটা শুকনো, গর্ত-টর্তও নেই। বাঁশঝাড়টার পাশ দিয়ে আসবার সময়ই নিশ্চয় এই সাপটা কোনওরকমে সন্তুর পায়ে জড়িয়ে গেছে।

এক সময় মরা সাপটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে কাকাবাবু বললেন, সন্তু, তোকে কামড়ায়নি তো? প্যান্টটা গুটিয়ে দ্যাখ।

সন্তু বলল, না, কামড়ায়নি, সে-রকম কিছু টের পাইনি।

তবু প্যান্টটা তুলে দ্যাখা। ওটা হাঁটুর ওপরে ওঠেনি, ওই পর্যন্ত কোনও ক্ষত-টত আছে কি না! এগুলো কী সাপ আমি জানি না।

সন্তু প্যাণ্ট গুটিয়ে ভাল করে দেখল। একটুও রক্ত-টক্ত চোখে পড়ল না।

তোর বমি পাচ্ছে না? কিংবা ঘুম পাচ্ছে না, সন্তু?

না।

কাকাবাবু এবারে নিজেই শুয়ে পড়লেন মাটিতে। রুমালটা তিনি ফেলে দিয়েছেন, হাত দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, এবারে আমি সত্যিকারের টায়ার্ড ফিল করছি রে, সন্তু। কেন জানিস? কয়েক মুহূর্তের জন্য আমার মনের জোর একেবারে চলে গিয়েছিল। সাপ দেখলে আমার ঘেন্না হয়, ভেবেছিলুম, ওটাকে আমি ধরতে পারব না, তোকে বাঁচাতে পারব না। একবারের চেষ্টায় ওকে ধরতে না পারলে কোনও উপায় ছিল না, তোকে বা আমাকে ঠিক কামড়ে দিত।

কাকাবাবু চোখ বুজলেন।

সন্তুও ঝিম মেরে বসে বইল। তার বদলে কাকাবাবুর পায়ে যদি সাপটা জড়াত, তা হলে সে কি সাপটার মাথা ওইভাবে চেপে ধরতে পারত?

সন্তুর চোখের পাতা জুড়ে আসছে। এই অবস্থায় কি কারও ঘুম পায়? সাপে কামড়ালে নাকি ঘুম আসে। তা হলে কি সাপের বিষ কোথাও লেগেছে?

একটু পরেই কাকাবাবু উঠে বসে বললেন, চল, চল, সময় নষ্ট করলে চলবে না। অনেকটা সময় চলে গেল।

কাকাবাবু উঠে আবার লাফিয়ে লাফিয়ে চলা শুরু করলেন। এর মধ্যেই তিনি হালকা মেজাজটা ফিরে পেয়েছেন। সন্তুকে বললেন, সব জিনিসেরই কিছু-না-কিছু উপকারিতা আছে। এই যে আমি লাফিয়ে লাফিয়ে যাচ্ছি, এর উপকার কী বল তো? আমার পায়ে কোনও সাপ জড়াতে পারবে না। তুই সাবধানে দেখে দেখে আয়।

সন্তু বলল, এবার আমরা কোন দিকে যাব!

সামনে কোনও বড় গাছ বা ঝোপঝাড়ও দেখা যাচ্ছে না। শুধু দেখা যাচ্ছে বরফ-ঢাকা পাহাড়ের চুড়া।

কাকাবাবু কপালে হাত দিয়ে রোদ আড়াল করে সেই পাহাড়টার দিকে একদৃষ্টি চেয়ে থেকে বললেন, মোজ অফ কিলিমাঞ্জারো। এই নামটার মধ্যে কী নতুনত্ব আছে জানিস? আছে বিস্ময়। এখান দিয়ে বিষুব রেখা গেছে, অর্থাৎ এই জায়গাটা খুব গরম হবার কথা। অথচ এখানেও পাহাড়ের মাথায় বরফ জমে। যাক গে, আমাদের ওই পাহাড়ের ডিরেকশানে যাওয়া ঠিক হবে না। বাঁশঝাড়টাকে ঠিক পেছনে রেখে এগিয়ে যাওয়াই ভাল।

আবার খানিকটা যেতেই দেখা গেল অনেকগুলো হাড়গোড় পড়ে আছে। ঠিক যেন একটা মানুষের কঙ্কাল।

সন্তু কাকাবাবুর হাত চেপে ধরতেই তিনি বললেন, ভয় পেলি নাকি? মানুষ নয়, মোষ-টোষের কঙ্কাল মনে হচ্ছে।

ফিলিপের সঙ্গে গাড়িতে আসার সময়ও এরকম কঙ্কাল কয়েক জায়গায় চোখে পড়েছিল। ফিলিপ বলেছিল, সিংহ তো মোষ বা হরিণ মেরে অর্ধেকটা খেয়ে চলে যায়। বাকি মাংস হায়েনা, শেয়াল, শকুনে খায়। হাড়গুলো পড়ে থাকে। বহু বছর পড়ে থাকে।

কিন্তু চলন্ত গাড়িতে বসে দেখা আর অসহায় অবস্থায় হাঁটতে-হাঁটতে চোখে দেখার মধ্যে অনেক তফাত। মনে হয়, যে সিংহ ওই মোষটাকে মেরেছিল, সে কাছাকাছি কোথাও আছে।

কাকাবাবু বললেন, একটা ভাল ব্যাপার এই যে, এদিকে আমরা জেব্রা, হরিণ, মোষ বা ওয়াইল্ড বিস্টের ঝাঁক দেখতে পাইনি। ওরা থাকলেই কাছাকাছি সি নেকড়ে, লেপার্ড, চিতা, হয়েনা। এই সব হিন্ত্রে পণ্ড থাকত। ७dbश्

সন্তুর মনে হল, এখন সিংহ-টিংহ কিছু একটা সামনে পড়ে গেলেও কিছুই আসে যায় না। ওরা এই ধূসর প্রান্তর কোনও দিনই পার হতে পারবে না।

সামনে জমিটা উঁচু-নিচু হয়ে গেছে। সোজা যেতে গেলে ওদের এখন খানিকটা উঁচুতে উঠতেই হবে।

কাকাবাবু আকাশের সূর্যের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমরা মোটামুটি দক্ষিণদিকেই যাচ্ছি। যদি তানজানিয়ার সীমান্তে পৌঁছতে পারি, তা হলে নিশ্চয়ই মানুষজনের দেখা পেয়ে যাব।

সন্তু খানিকটা হতাশভাবে বলল, কাকাবাবু, ফিলিপ যে-জায়গাটায় আমাদের ফেলে দিয়ে গেছে, সে নিশ্চয়ই হিসেব করে দেখে নিয়েছে। সে জানে, ওখান থেকে আর কোনও দিনই আমরা মানুষের কাছে পৌঁছতে পারব না।

কাকাবাবু মৃদু ধমক দিয়ে বললেন, আবার তুই ওই সব অলক্ষুনে কথা বলছিস? ফিলিপ কি জানে যে, একটা খোঁড়া লোকও বিনা ক্ৰাচে দশ মাইল পার হতে পারে এই মাঠের মধ্য দিয়ে? আমরা দশ মাইলের বেশি চলে এসেছি।

লাফিয়ে লাফিয়ে চলা এমনিতেই কষ্টকর, উঁচুতে ওঠা আরও অনেক বেশি কষ্টের। কাকাবাবু সেই চেষ্টা করতে যেতেই সন্তু বলল, তুমি এখান দিয়ে উঠে না, চলো, আমরা খানিকটা ঘুরে যাই। অন্য কোথাও নিচু জায়গা নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে।

না, তাতে সুবিধে হবে না। এইরকম ফাঁকা জায়গায় একটা অন্তত দিক ঠিক না রাখলে আমরা গোলকধাঁধায় পড়ে যাব। একই জায়গায় বার বার ঘুরব। চল, আমি ঠিক পেরে যাব।

কাকাবাবু দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে রইলেন, যাতে মুখ দিয়ে না নিশ্বাস বেরোয়। জোরে জোরে লাফিয়ে তিনি সন্তুর আগে উঠে এলেন ওপরে। তারপর বুক ভরে নিশ্বাস নিতে নিতে বললেন, এইবার আমাদের একটু বেঁকতেই হবে।

মাঠটা যেখানে ঢালু হয়ে গেছে, সেখানটা একটা ঘাসবন। তারপর অনেকটা ফাঁকা জায়গায় উইঢিপির মতন কী সব উঁচু-উঁচু হয়ে আছে। ডান দিকের কোণে ছোট ছোট গাছের একটা জঙ্গল। এক-মানুষ উঁচু গাছ।

কাকাবাবু বললেন, ওই ঘাসবনে ঢোকা ঠিক হবে না। নেকড়ে আর লেপার্ডদের লুকিয়ে থাকার প্রশস্ত জায়গা। ওই উইঢিপিগুলোকেও আমার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না। ওখানে ইদুরের গর্ত থাকলে সাপও থাকবে। তার থেকে বরং ওই জঙ্গলটাই নিরাপদ। গাছগুলো ফাঁকা ফাঁকা আছে, ভেতরটা দেখা যাবে। তা ছাড়া, ছোট গাছ ভেঙে দুটো লাঠি তৈরি করতে হবে। হাতে একটা কিছু অন্তত অস্ত্র থাকলে মনে আরও জোর পাওয়া যাবে, কী বল? তা ছাড়া, একটা লাঠি আমার এই পায়ে জড়িয়ে নিলে আমি আর-একটু ভালভাবে লাফাতে পারব। চল, আমরা ওপর দিয়েই ডান দিকে এগিয়ে যাই, তারপর নীচে নামব।

 

হঠাৎ কুপকুপ করে বৃষ্টি নেমে গেল। বেশ রোদ ছিল আকাশে, কখন মেঘ এসে গেছে, ওরা খেয়ালও করেনি। এতক্ষণে সন্তু খেয়াল করল যে, তেষ্টায় তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। জামাটামাগুলোও ঘামে ভিজে সপাসপে হয়ে আছে। একেবারে। এই বৃষ্টিস্নান বেশ ভালই লাগল ওদের। সন্তু আকাশের দিকে মুখটা হাঁ করে রইল। এ ছাড়া জল পান করার তো কোনও উপায় নেই।

মাটি এখানে এত শুকনো যে, বৃষ্টি পড়ামাত্ৰ শুকিয়ে যাচ্ছে। হোটেলে থাকতে কে যেন বলেছিল, কয়েক মাস ধরে এখানে খরা চলছে। ঘাসবনটার রংও কেমন যেন হলদেটে হয়ে গেছে।

খানিকক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজেই সন্তুর শীত করতে লাগল। রীতিমতন কাঁপুনি দিচ্ছে শরীরে। কাকাবাবু নিজের কোটটা আগেই খুলে নিয়েছিলেন, সন্তুকে বললেন, সোয়েটারটা খুলে ফ্যাল। শীত লাগলেও গায়ে ভিজে সোয়েটার থাকা ঠিক নয়।

সৌভাগ্যের বিষয়, মিনিট দিশেকের মধ্যেই থেমে গেল বৃষ্টি। আবার রোদ্দুরের ঝিলিক দেখা গেল।

কাকাবাবু বললেন, ঘাসবনটা পার হয়ে এসেছি, এখন কোনাকুনি যেতে পারলে জঙ্গলটায় তাড়াতাড়ি পৌঁছনো যেত। কিন্তু এই উইঢিপিগুলোর পাশ দিয়ে যাওয়া কি ঠিক হবে? এক কাজ করা যাক।

উঁচু জায়গাটায় কিছু কিছু পাথর ছড়ানো আছে। কাকাবাবু কয়েকটা বড় বড় পাথর তুলে নিয়ে একটা উইটিপি টিপ করে ছুঁড়তে লাগলেন। তাঁর দেখাদেখি সন্তুও কয়েকটা পাথর ছুঁড়তে লাগল একই টিপি লক্ষ করে।

গোটাতিনেট পাথর একটা টিপির গায়ে লাগতেই একটা কাণ্ড ঘটল। তলা থেকে মাঝারি সাইজের একটা প্ৰাণী লাফ দিয়ে বেরিয়ে এসেই ছুটিল প্ৰাণপণে। কাছাকাছি গর্ত থেকে বেরিয়ে এল ওই রকম আরও দুতিনটে। এত জোরে তারা ছুটতে লাগল, যেন ওলিম্পিক প্রতিযোগিতায় নাম দিয়েছে।

কাকাবাবু চেঁচিয়ে উঠে বললেন, দাঁতাল শুয়োর। এগুলোকে বলে ওয়ার্ট হগ। এরা গর্তে লুকিয়ে থাকে।

এরা মানুষকে অ্যাটাক করে?

কী জানি! তবে এগুলো তো তেমন বড় নয়। আসল ওয়াইন্ড বোর অনেক পেল্লায় পেল্লায় সাইজের হয়। যাকগে, ওদের কাছাকাছি না যাওয়াই ভাল।

ওরা যে উঁচু জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটা যেন হঠাৎ থেমে যাওয়া একটা ঢেউয়ের পিঠের মতন। দুদিকটা ঢালু। এখানে সুবিধে হচ্ছে এই যে দুদিকের অনেকখানি দেখা যায়। দুদিকেই কোনও আশার চিহ্ন নেই।

ঢেউয়ের পিঠের ওপর দিয়ে এগোতে এগোতেই ওরা জঙ্গলটার কাছে পৌঁছে গেল। এবারে নামতে হবে। ঢালু জায়গা দিয়ে লাফিয়ে-লাফিয়ে ওঠার চেয়েও নামা অনেক শক্ত। যে-কোনও মুহূর্তে উল্টে পড়ে যাবার সম্ভাবনা।

কাকাবাবু বসে পড়ে দু হাত দিয়ে ঘযটাতে ঘষাটাতে নামতে লাগলেন। সন্তু দাঁতে দাঁত চেপে ভাবল, ওই ম্যানেজার ফিলিপটাকে ফাঁসি দেওয়া উচিত! ওকে যদি এখন হাতের কাছে পাওয়া যেত…

নীচে নেমেই সে কাকাবাবুকে জিজ্ঞেস করল, নাইরোবিতে যারা আমাদের সাবধান করতে চেয়েছিল, তারা কি জানত যে, এখানে আমাদের এই অবস্থা হবে?

কাকাবাবু বললেন, মনে হয় খানিকটা জানত। এখন ভেবে দাখ, সে আমাদের উপকারই করতে চেয়েছিল। যে গাড়ি চাপা দিতে এসেছিল, আমাদের শুধু ভয় দেখানেই ছিল তার উদ্দেশ্য। ইচ্ছে করলেই সে আমাদের একজনকে অন্তত চাপা দিয়ে মেরে ফেলতে পারত। ফোন করে সে-ই আমাদের ফিরে যেতে বলেছিল।

তা হলে সে কে? সে কি আমাদের কোনও বন্ধু? অমলন্দা-মঞ্জবৌদির তো এতখানি জানার কথা নয়। তা ছাড়া গাড়ি চাপা দিতে আসার ব্যাপারটা তো অমলদার হতেই পারে না!

না, অমল নয়। সে নিশ্চয়ই এমন একজন কেউ, যে শত্ৰুপক্ষের মধ্যে থেকেও আমাদের বন্ধু।

কাকাবাবু, অশোক দেশাই কী করে আমাদের শত্ৰু হল? আমেদাবাদ থেকে তার কোকা ভুলাভাই দেশাই আমাদের এখানে পাঠিয়েছেন।

ভুলাভাই নিশ্চয়ই তাঁর ভাইপোর আসল ব্যবসাটা জানে না। অশোক দেশাইও আগে বুঝতে পারেনি। আমি হ্যারি ওটাংগোর এতটা খোঁজখবর নেব।

বিকেল হয়ে গেল, এখনও আমরা কোনও মানুষের চিহ্ন দেখলুম না।

আরও ঘন্টা-দেড়েক দিনের আলো থাকবে। চল, জঙ্গলে ঢুকে দুখানা লাঠি তো বানাই আগে।

জঙ্গলের কাছাকাছি এসে শোনা গেল, সেখানে গাছপালার মধ্যে নানারকম শব্দ হচ্ছে, কারা যেন সড়সড় করে গাছের ডাল ভাঙছে। দুজনেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। মানুষ আছে জঙ্গলের মধ্যে।

কাকাবাবু ফিসফিস করে বললেন, হাতি! হাতির পাল ঢুকেছে! আমাদের ঢোকার আশা নেই। বসে পড়। আর কিছু করার নেই এখন।

একটা পাথরের চাইয়ের আড়ালে ওরা বসার জায়গা করে নিল। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকতে দেখা গেল। চলন্ত হাতির পা। ছোট, বড়, নানারকম। হাতিদের পুরো একটা যৌথ পরিবার। এখানকার গাছগুলোতে সদ্য কাঁচা-কাঁচা সবুজ সবুজ পাতা গজিয়েছে। এই গাছ বোধহয় হাতিদের প্রিয় খাদ্য।

প্ৰায় এক ঘণ্টা পরে হাতির পাল বেরিয়ে এল জঙ্গল থেকে। প্ৰায় পনেরো ষোলোটা। তাদের মধ্যে সবচেয়ে যেটা বড়, সেটা যেন একটা চলন্ত পাহাড়। এক-একটা কানই যেন দুর্গাপুজোর বিরাট পাখার মতন। দাঁত দুটো যেন দুটো সাদা থাম। আবার, ওই দলে খুব ছোট-ছোট দুধের বাচ্চাও রয়েছে। দেখলে গণেশ-গণেশ মনে হয়। এক-একটা বাচ্চা পিছিয়ে পড়লেই মা-হাতি ঘুরে তাকিয়ে ডাকছে।

পুরো দলটাই আছে বেশ খোশমেজাজে। এদিকে-ওদিকে তাকাচ্ছে না। আস্তে আস্তে পা ফেলে, শুঁড় দোলাতে দোলাতে চলেগেল ঘাসবনের দিকে।

আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে, যখন বনের মধ্যে আর কোনও শব্দ পাওয়া গেল না, তখন কাকাবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, চল?

হাতির পাল আসায় একটা সুবিধে হল এই যে, তারা অনেক গাছের ডাল ভেঙে রেখে গেছে, সন্তুদের আর সে পরিশ্রম করতে হল না। বরং পছন্দমতন দুখানা ডাল বেছে নিতে পারল।

কাকাবাবু বললেন, এই তো বেশ চমৎকার হল। এবার আমি অনেক সহজে যেতে পারব। চল, তাড়াতাড়ি বনটা পেরিয়ে যাই। অন্ধকার হয়ে গেলে এখানে থাকা ঠিক হবে না।

এই বনে বেবুন ছাড়া আর কোনও প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেল না। মাটিতে কয়েকটা বেবুনকে ঘুরতে দেখে সন্তু প্ৰথমে মানুষ ভেবে চমকে উঠেছিল। আশার ছলনা! তার মনটা দমে গোল আবার। সারাদিনের পরিশ্রমে পা আর চলতে চাইছে না। পেটের মধ্যে খিদোঁটা ধিকিধিক করে জ্বলছে।

জঙ্গলটা পার হবার পর একটুক্ষণ যেতেই দেখা গেল, একদিকের আকাশ লাল হয়ে গেছে। সূর্য ড়ুবতে বসেছে। হাতির পাল তাদের অনেকটা সময় খরচ করিয়ে দিয়েছে।

কাকাবাবু বললেন, তাই তো রে, একটু বাদেই অন্ধকার হয়ে যাবে, আর তো হাঁটা যাবে না। রাত্তিরের জন্য একটা ব্যবস্থা করতে হবে?

সন্তু চুপ করে রইল। তার শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে।

ফাঁকা জায়গায় খানিক দূরে ছাতিমগাছের মতন ডালপালা-ছড়ানো একটা গাছ একা দাঁড়িয়ে আছে। তার ওপাশে আর কিছুই দেখা যায় না!

চল সন্তু, ওই গাছতলায় গিয়ে আমরা বসি। একটু জিরিয়ে নেওয়া যাক। তুই তো গাছে উঠতে পারবি? তুই গাছে উঠে বসে থাকবি রাতটা, আমি নীচে বসে পাহারা দেব।

এত দুঃখের মধ্যেও সন্তুর হাসি পেল। সামান্য একটা লাঠি নিয়ে কাকাবাবু কী পাহারা দেবেন?

গাছতলায় পৌঁছেই সন্তু ধপাস করে শুয়ে পড়ল।

কাকাবাবু বসে পড়ে, বিড়বিড় করে বললেন, এমন একটা বাজে জঙ্গল, তাতে কোনও ফলের গাছও নেই। হাতির খাবার হবার জন্যই যেন জঙ্গলটা তৈরি হয়েছে, মানুষের জন্য নয়।

তারপর নিজের ডান পায়ে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন, এতক্ষণ ধরে লাফিয়ে আমার পা-টা ফুলে গেছে। কাল সকালে হাঁটতে মুশকিল হবে।

এরপর দুজনে চুপ করে বসে রইল। বেশ কিছুক্ষণ। সব কথা ফুরিয়ে গেছে। সমস্ত আকাশটা লালচে হয়ে গেল এর মধ্য, তারপর আস্তে আস্তে কালোর ছোঁয়া লাগতে লাগল। একঝাঁক চিল না বাজপাখি না শকুন কী যেন উড়ছে। ওদের মাথার উপরে। কয়েকটা এসে বসল ছাতিমের মতন গাছটার মগডালে।

এক সময় কাকাবাবু ক্ষোভের সঙ্গে বল উঠলেন, তা হলে কি ওই ম্যানেজার ফিলিপটাই জিতে যাবে? আমরা হারব? না, তা হতেই পারে না?

সন্তু কান খাড়া করে বলল, কাকাবাবু, কিসের শব্দ? কুকুর ডাকছে?

কোথায়। আমি তো কোনও শব্দ শুনতে পাচ্ছি না।

হ্যাঁ, আমি শুনেছি। একবার। ওয়াইল্ড ডগস?

সন্তু তড়াক করে উঠে পড়ে সেই জঙ্গলের দিকে মুখ ফিরিয়ে দেখল, সার বেঁধে আট-দশটি মানুষের মতন কী যেন প্রাণী যাচ্ছে। বুকে বুকে, লাফিয়ে লাফিয়ে। বেবুন নয়, বেবুনের চেয়ে অনেক বড়।

কাকাবাবু, গেরিলা! গেরিলা?

ধ্যাত! কী বলছিস! এখানে আবার গেরিলা আসবে কোথা থেকে? এদেশে গেরিলা নেই। ভয় পেয়ে তোর মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি?

ওই যে, ওই যে!

কাকাবাবু এবারে দেখতে পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি আনন্দে চিৎকার করে বললেন, মানুষ! মানুষ! ওই তো মানুষ যাচ্ছে। সন্তু, ডাক, ডাক, গলা ফাটিয়ে ডাক?

ঝট করে নিজের জামাটা খুলে তিনি লাইটার জ্বলে তাতে আগুন ধরিয়ে দিলেন। তারপর সেই জ্বলন্ত জামা লাঠির ডগায় জড়িয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে তিনিও চ্যাঁচাতে লাগলেন, হেলপ! হেলপ!

মানুষের মতো যে-দলটি নাচতে নাচতে যাচ্ছিল, তারা বোধহয় ওদের ডাক শুনতে পায়নি, কিন্তু আগুন দেখতে পেয়েছে। তারা থমকে দাঁড়াল। তারপর সবাই একসঙ্গে কু-কু-কু ধরনের শব্দ করে ছুটে এল এদিকে।

কাকাবাবু জয়ের আনন্দে হেসে বললেন, আগুন দেখে যারা ছুটে আসে, তারা মানুষ ছাড়া আর কিছু হতে পারে না! সন্তু, উঠে দাঁড়িয়ে হাত দুটো মাথার ওপর তুলে রাখ। লাঠি ধরিস না।

তিনি নিজেও আগুন সমেত ডাণ্ডাটা ফেলে দিয়ে ওইরকম হাত উঁচু করে দাঁড়ালেন।

মানুষের মতন দলটি ঝড়ের বেগে ছুটে এল। ওদের কোনওরকম কথা বলার সুযোগ দিল না। তাদের দুজন সন্তু আর কাকাবাবুকে পিঠে তুলে নিয়ে আবার দৌড়ল।

Share This