০৭. এলগিন রোডে

সকাল আটটা থেকে এলগিন রোডে অসিত ধরের বাড়ির উলটো দিকের ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে সন্তু। কাকাবাবু আসেননি, বাড়ির নাম্বার আর অসিত ধরের চেহারার একটা নিখুঁত বর্ণনা দিয়ে দিয়েছিলেন।

প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট কেটে গেল, তবু অসিত ধরের দেখা নেই। এমনিতে সন্তু ঘন্টার পর ঘন্টা হাঁটতে পারে, কিন্তু এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে তার পায়ে ব্যথা করছে। এক-একবার একটা ল্যাম্পপোস্টের গায়ে হেলান দিচ্ছে। সে একবার ভাবল, ট্রাফিক পুলিশরা সারা দিন দাঁড়িয়ে থাকে কী করে?

সকালবেলায় সবাই ব্যস্ত, কতরকম মানুষ যাচ্ছে হনহনিয়ে। সন্তুই শুধু দাঁড়িয়ে আছে এক জায়গায়। অন্যরা কী ভাবছে? কেউ যদি তাকে সন্দেহ করে?

কাছাকাছি কোনও চায়ের দোকানও নেই যে, সেখানে গিয়ে বসবে।

সন্তু একটা ছাই রঙের প্যান্ট ও সাদা শার্ট পরে এসেছে। ইচ্ছে করে বেশি রংচঙে পোশাক পরেনি, যাতে তার প্রতি লোকের দৃষ্টি না পড়ে। কাঁধে ঝোলানো একটা সাধারণ ব্যাগ, তাতে রয়েছে দু-একখানা গল্পের বই, আর ক্যামেরা।

প্রায় সাড়ে নটার সময় অসিত ধর নেমে এল রাস্তায়। সুট-টাই পরা, পুরোদস্তুর সাহেবি পোশাক পরা, হাতে একটা চামড়ার ব্যাগ। সন্তু রাস্তা পেরিয়ে তার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল।

অসিত প্রথমে হাত তুলে একটা চলন্ত ট্যাক্সি থামাবার চেষ্টা করল। সেটা থামল না। তখন সে হাঁটতে লাগল বাঁ দিকে।

নেতাজি সুভাষ বসুর বাড়ির সামনে দুখানা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে আছে। সন্তুর মনটা নেচে উঠল আনন্দে। একেই বলে ভাগ্য। একসঙ্গে দুখানা ট্যাক্সি, সন্তুর কোনও অসুবিধাই হবে না।

অসিত প্রথম ট্যাক্সি ড্রাইভারের সঙ্গে জানলা দিয়ে দু-একটা কথা বলল। ড্রাইভারটি রাজি হয়ে খুলে দিল দরজা।

সে ট্যাক্সিটা স্টার্ট করার পরই সন্তু ঝট করে উঠে পড়ল দ্বিতীয়টায়। এ ট্যাক্সির ড্রাইভার মিটার ঘোরাবার আগে সন্তুর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাবে?

সন্তু ব্যস্তভাবে বলল, জলদি, জলদি, ওই সামনের ট্যাক্সিটাকে ফলো করুন।

ড্রাইভারটি ভুরু তুলে বলল, তার মানে?

সন্তু বলল, ওই ট্যাক্সিটাকে ফলো করুন! দূরে চলে যাবে।

ড্রাইভারটি বলল, কেন, ফলো করব কেন?

সন্তু অস্থির হয়ে বলল, কী মুশকিল! বলছি যে ট্যাক্সিটা হারিয়ে যাবে, শিগগির চলুন।

ইয়ার্কি হচ্ছে?

আপনার সঙ্গে ইয়ার্কি করব কেন? আমার কাছে টাকা আছে, আমি ভাড়া যত লাগে দেব, আপনি ট্যাক্সি চালাবেন।

কই, দেখি টাকা।

এই তো দেখুন না। এবার দয়া করে তাড়াতাড়ি চলুন। স্পিড় নিন। আগের গাড়িটাকে ধরতে হবে।

কেন, ধরতে হবে কেন?

ওই ট্যাক্সিতে একজন…একজন ডেঞ্জারাস ক্রিমিনাল বসে আছে।

ওই লোকটা যদি ক্রিমিনাল হয়, তা হলে তুমি কে?

আমি, মানে আমি, আমার বিশেষ দরকার।

চোর-পুলিশ খেলা হচ্ছে? নামো, নামো আমার গাড়ি থেকে।

তর্ক করে লাভ নেই। অসিতকে নিয়ে অন্য ট্যাক্সিটা রাস্তার গাড়ির ভিড়ে মিলিয়ে গেছে। ড্রাইভারটাকে একটা ভেংচি কেটে সন্তু নেমে পড়ল।

কত ইংরেজি বইতে সে পড়েছে কিংবা বিদেশি সিনেমায় দেখেছে যে, রাস্তায় ঝট করে একটা ট্যাক্সি ধরে আগের গাড়িটাকে ফলো করতে বললে, ড্রাইভার বিনা বাক্যব্যয়ে অমনই ফলো করে। কলকাতার ট্যাক্সি ড্রাইভারগুলো এক-একটি জ্যাঠামশাই! কোথায় যাবে, কেন যাবে, সব জিজ্ঞেস করা চাই।

প্রথম চেষ্টাতেই ব্যর্থ। সন্তু বিরক্ত মুখে হাঁটতে লাগল। শম্ভুনাথ হাসপাতালের কাছে আর-একটি ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সন্তুর একটা কথা মনে পড়ল। অসিত ট্যাক্সিতে ওঠার সময় বলেছিল, বউবাজার। সেখানে গিয়ে একবার খুঁজে দেখা যেতে পারে। যদিও বউবাজার স্ট্রিট চেনা রাস্তা, সেখানে অসিত এর মধ্যে কোন্ বাড়িতে ঢুকে পড়বে কে জানে। তবু চেষ্টা করা যেতে পারে।

এই ট্যাক্সির কাছে গিয়ে সন্তু জিজ্ঞেস করল, বউবাজার যাবেন?

ড্রাইভারটি সন্তুর আপাদমস্তক দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, কোনও রুগি যাবে? কিসের রুগি?

সন্তু বলল, না, অন্য কেউ যাবে না। আমি একা যাব।

ড্রাইভারটি বলল, বাসে চলে যাও। অনেক শস্তা পড়বে!

এবার সন্তু বুঝল। তার বয়েসী ছেলেরা কলকাতা শহরে একা একা ট্যাক্সি চড়ে না, ট্রামে বাসে যায়। তাই ট্যাক্সি-ড্রাইভাররা তাকে পাত্তা দিচ্ছে না। কিন্তু ট্রামে বাসে চেপে কি কাউকে ফলো করা যায়?

আর একটু হাঁটতে-হাঁটতে সন্তুর মাথায় একটা বুদ্ধি এল। কলকাতায় এখন তো গাড়িও ভাড়া পাওয়া যায়। অনেক জায়গায় সে Rent A Car সাইনবোর্ড দেখেছে। কাকাবাবু তাকে পাঁচশো টাকা দিয়ে দিয়েছেন, এই টাকায় সারাদিনের জন্য একটা গাড়ি ভাড়া করা যেতে পারে অনায়াসে।

এদিকে কোথায় Rent A Car আছে? খুব দরকারের সময় ঠিক সেই জিনিসটাই পাওয়া যায় না। আগে থেকেই এসব চিন্তা করা উচিত ছিল। যাই হোক, কাকাবাবু বলেছেন উপস্থিত বুদ্ধি খাটাতে। কোনও পেট্রোল পাম্পে গেলে ওরা নিশ্চয়ই গাড়ির খবর দিতে পারবে।

ভবানীপুরের দিকে একটা পেট্রোল পাম্প আছে। কিন্তু সেখানে জিজ্ঞেস করতে হল না, পাম্পের পাশেই সন্তু একটা গাড়ি ভাড়ার সাইন বোের্ড দেখতে পেল। সেখানে ব্যবস্থা হয়ে গেল সহজেই। ড্রাইভার সমেত গাড়ি পাওয়া যাবে, ঘন্টা হিসাবে ভাড়া দিতে হবে। আড়াইশো টাকা জমা দিয়ে দিল সন্তু। তার বেশি ভাড়া হলে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া যায়।

নতুন একটা গাড়িই পাওয়া গেল। ড্রাইভারটি তেইশ-চব্বিশ বছর বয়েসের, বেশ চটপটে ধরনের। গাড়িতে ওঠার পর সন্তু যেন নিজের বয়েসের চেয়েও বড় হয়ে গেল। গাড়িটাকে নিজের গাড়ি বলে মনে করা যায়।

সে বলল, প্রথমে বউবাজার চলুন।

ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল, বউবাজারে কোথায়?

সন্তু বলল, কোথায় মানে? বউবাজার মানে বউবাজার!

ড্রাইভার বলল, বউবাজার রাস্তাটা তো শিয়ালদা থেকে আরম্ভ আর ডালহাউসিতে শেষ। সেইজন্যই জিজ্ঞেস করছি, কোন্ দিকে যাব!

সন্তু বলল, শিয়ালদা থেকে শুরু করুন, ডালহাউসি পর্যন্ত চলুন। আর-একটা কথা শুনে রাখুন। আমি টাকা দিয়ে গাড়ি ভাড়া করেছি, আমি যেখানে খুশি যাব। কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, এসব কিছু জিজ্ঞেস করবেন না!

গাড়িটা শিয়ালদার দিক থেকে বউবাজারে ঢুকে চলে এল রাইটার্স বিল্ডিং পর্যন্ত। তারপর ড্রাইভারটি জিজ্ঞেস করল, এবার?

সন্তু নিজেই বুঝতে পারছে না, এত বড় রাস্তায় কোথায় সে অসিতকে খুঁজবে। কোন্ বাড়িতে সে গেছে, তা জানা অসম্ভব। কিন্তু এখন ফিরে গিয়ে কাকাবাবুকে যদি বলতে হয়, অসিতকে সে হারিয়ে ফেলেছে, তার চেয়ে লজ্জার আর কিছু হতে পারে না।

সে ড্রাইভারটিকে বলল, গাড়ি ঘুরিয়ে নিন, আবার শিয়ালদার দিকে চলুন।

গাড়িটা আবার শিয়ালদার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, তখন সন্তু চেঁচিয়ে উঠল, থামান, থামান।

ড্রাইভারটি ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষল।

উলটো দিকে একটা ট্যাক্সি থৈমে আছে। সন্তু সেদিকে চেয়ে রইল একদৃষ্টিতে। হঠাৎ তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

অসিত যখন এলগিন রোডে ট্যাক্সিতে চাপে, সেই সময়টার দৃশ্যটুকু সে প্রাণপণে নিখুঁতভাবে মনে করার চেষ্টা করছিল। ট্যাক্সিটার নাম্বার সে ভাল করে দেখেনি, কিন্তু শেষে দুটো জিরো ছিল। আর ড্রাইভারটির মুখে তিন-চারদিনের খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। এই তো সেই ট্যাক্সি।

ট্যাক্সিটার মিটার ডাউন করা, আর ড্রাইভারটি এমনভাবে গা এলিয়ে দিয়ে বিড়ি খাচ্ছে যে বোঝা যায়, কেউ তাকে ভাড়া করে রেখেছে। এই ড্রাইভারের কাছ থেকে কায়দা করে জেনে নেওয়া যায়, অসিত কোথায় নেমেছে।

ট্যাক্সিটা দাঁড়িয়ে আছে একটা বড় গয়নার দোকানের সামনে। আবার বুক কেঁপে উঠল সন্তুর। নবাবের সেই চুনির মালা এখানে বিক্রি করতে এসেছে অসিত?

গাড়ি থেকে নেমে অন্য ফুটপাথে চলে এল সন্তু। দোকানটার সামনে দিয়ে হেঁটে গেল। হ্যাঁ, ঠিক, একটু ভেতর দিকে চেয়ারে বসে আছে অসিত, মন দিয়ে কথা বলছে একজনের সঙ্গে।

খবরটা এক্ষুনি জানানো দরকার কাকাবাবুকে। টেলিফোন পাওয়া যাবে কোথায়? ইংরেজি ছবিতে দেখা যায়, ওদের দেশের রাস্তার মোড়ে মোড়ে পাবলিক টেলিফোনের কাচের ঘর থাকে। আমাদের দেশে সেসব কিছু নেই। পোস্ট অফিসে ফোন করা যায়, কিন্তু সেখানে সব সময় লোক থাকে। কেউ টেলিফোন করলে অন্যরা কান খাড়া করে সব কথা শোনে।

বেশি দূর যাওয়া যাবে না, অসিত যদি বেরিয়ে পড়ে।

কাছাকাছি একটা ওষুধের দোকানে ঢুকে পড়ে সন্তু কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, একটা ফোন করতে দেবেন? আমার খুব দরকার। যা পয়সা লাগে দেব।

দোকানের একজন কর্মচারি বলল, দু টাকা।

সন্তু ডায়াল ঘোরাতে ঘোরাতে মনে-মনে বলতে লাগল, হে ভগবান, যেন, নাম্বারটা পাওয়া যায়। টেলিফোনের দেবতা কে? বিশ্বকর্মা? হে বিশ্বকর্মা, যেন নাম্বারটা পাওয়া যায় তাড়াতাড়ি।

একবারেই পাওয়া গেল। কাকাবাবুর গলা শুনেই সন্তু বলল, কাকাবাবু, পার্টি এখন বউবাজারেএকটা গয়নার দোকানে, পার্টি অনেকক্ষণকথা-কলছ।

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, দোকানটার নাম কী?

সন্তু উঁকি দিয়ে দোকানটার নাম দেখে নিয়ে বলল, এস. পি. জুয়েলার্স!

কাকাবাবু বললেন, ঠিক আছে। তুই নজর রাখ।

সন্তু বলল, আমি আর ওকে চোখের আড়ালে যেতে দিচ্ছি না!

ফোন রেখে সন্তু দোকান থেকে বেরিয়ে গাড়িতে এসে বসল। ট্যাক্সিটা থেমে আছে। অসিতের বেরোবার নাম নেই।

কাঁধের ঝোলা থেকে সন্তু একটা বই আর ক্যামেরাটা বার করল। এমনিই গয়নার দোকানটার ছবি তুলল দুখানা।

সন্তুর গাড়িটার একটু আগেই আর-একটা সাদা রঙের গাড়ি থেমে আছে। তাতে বসে আছে দুজন লোক। লোক দুটো পেছন ফিরে মাঝে-মাঝে সন্তুকে দেখছে। এরা কারা?

মিনিটদশেক বাদে গয়নার দোকান থেকে বেরোল অসিত। হাতে সেই কালো ব্যাগ। ওই ব্যাগ ভর্তি কি হার বিক্রির টাকা?

অসিত ফুটপাথে দাঁড়িয়ে এদিক-ওদিক তাকাল, তারপর একটা সিগারেট ধরাল।

সেই ফাঁকে অসিতের একটা ছবি তুলে নিল সন্তু।

সামনের সাদা গাড়িটা থেকে একজন লোক নেমে গিয়ে ঢুকে গেল ওই গয়নার দোকানে। অসিতের ট্যাক্সিটা স্টার্ট দিতেই সাদা গাড়িটাও চলতে শুরু করল।

সন্তু বেশ অবাক হয়ে গেল। এই সাদা গাড়িটাও অসিতকে ফলো করছে। নাকি?

বউবাজার আর কলেজ স্ট্রিটের মোড়ের কাছে ট্র্যাফিক জ্যাম। গাড়িগুলো নড়ছে না। সন্তু ছটফট করতে লাগল। অসিত কিন্তু মন দিয়ে একটা বই পড়ছে, কোনওদিকে তাকাচ্ছে না।

কিসের জন্য এমন জ্যাম হয়েছে দেখার জন্য সন্তু গাড়ি থেকে নেমে গেল। অসিতের ট্যাক্সিটা ডান পাশের দ্বিতীয় সারিতে একটু এগিয়ে আছে। অসিতকে ভাল করে দেখার জন্য সন্তু সেই ট্যাক্সির পাশ দিয়ে হেঁটে গেল। অসিতের ব্যাগে নিশ্চয়ই কয়েক লক্ষ টাকা আছে, তবু জ্যাম নিয়ে তার কোনও চিন্তা নেই, সে বই পড়ে যাচ্ছে মন দিয়ে।

একেবারে সামনের দিকে এসে সন্তু দেখল একটা লরি থেকে অনেকগুলো বস্তা পড়ে গেছে মাটিতে, লরিটাও বোধ হয় খারাপ হয়ে গেছে, সেইজন্য অন্য গাড়িগুলোও যেতে পারছে না। একজন পুলিশ কনস্টেবল এসে হম্বি-তম্বি করছে সেখানে।

একটু বাদে রাস্তা পরিষ্কার হল। ডান দিকে ঘুরে গিয়ে খানিক দূরে অসিতের ট্যাক্সিটা থামল। পাশেই একটা ব্যাঙ্ক। অসিত ওখানে টাকাগুলো জমা দেবে? সত্যিই অসিত ঢুকে গেল ব্যাঙ্কের মধ্যে।

অন্য সাদা গাড়িটাও এখানে থেমেছে। তার থেকে কালো চশমা পরা একজন লোক নেমে ব্যাঙ্কের মধ্যে চলে গেল অসিতের পেছন-পেছন। এই সাদা গাড়ির লোকেরা কি অসিতের কাছ থেকে টাকাগুলো কেড়ে নেওয়ার মতলবে আছে? ব্যাঙ্কের ভেতরে গিয়ে ডাকাতি করবে?

অসিত ট্যাক্সিটা ছাড়েনি। কাকাবাবু বলেছেন, অসিত কোথায় যায়, কার সঙ্গে দেখা করে, সেইসব লক্ষ রাখতে। অসিত ব্যাঙ্কে টাকা জমা দিতে গেলে তো সন্তু বাধা দিতে পারবে না! ডাকাতরা অসিতের ওপর হামলা করলেই বা সে কী করবে?

সন্তু গাড়িতে বসে রইল। একটা বই খুলেও পড়তে পারল না। প্রত্যেক মুহূর্তে তার মনে হচ্ছে ব্যাঙ্কের মধ্যে গোলাগুলির আওয়াজ শুনতে পাবে।

সেরকম কিছুই হল না।

মিনিট দশেক বাদে অসিত বেরিয়ে এল ব্যাঙ্ক থেকে। ট্যাক্সিতে ওঠার আগে আবার সে চারদিকটা একবার দেখে নিল। সন্তু মাথাটা নিচু করে নিল, যাতে তার দিকে অসিতের নজর না পড়ে।

অসিতের ট্যাক্সি এবার চলতে লাগল উত্তর কলকাতার দিকে। আবার অসিত বই খুলে পড়তে শুরু করেছে। সন্তু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, সাদা গাড়িটাও আসছে পেছনে-পেছনে।

কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়া ছাড়িয়ে গিয়ে অসিতের ট্যাক্সি থামল একটা বড় জুতোর দোকানের সামনে। সন্তুকে অবাক করে অসিত ঢুকে গেল সেই জুতোর দোকানের মধ্যে। এটা কি জুতো কেনার সময়? বড় বড় চোর ডাকাতদের কারও হঠাৎ জুতো কেনার শখ হয়, এটা কেমন যেন অদ্ভুত।

জুতোর দোকানে সবাই ঢুকতে পারে। সন্তু নিজের জন্য একটা চটিই না হয় কিনে ফেলবে। সেও ভেতরে চলে এল।

দোকানটাতে বেশ ভিড়। সেল্সম্যানরা সবাই ব্যস্ত। অসিত একটা জায়গায় বসল, কিন্তু সন্তু আর কোনও চেয়ার খালি পেল না। সে দাঁড়িয়ে রইল একপাশে। সাদা গাড়ি থেকে কালো চশমা পরা লোকটাও নেমে এসেছে। চশমায় লোকটার চোখ ঢাকা, কোন দিকে তাকায় তা বোঝা যায় না। এই লোকটা কার ওপর নজর রাখছে? এমন কী হতে পারে যে, এই লোকটা অসিতের বডি গার্ড? কিন্তু বডি গার্ড গাড়ি করে ঘুরছে, আর অসিত কেন ট্যাক্সিতে? কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।

অসিত হাতের কালো ব্যাগটা পাশে না রেখে কোলের ওপর নিয়ে বসে আছে। সন্তু এসে দাঁড়াল ঠিক তার পেছনে।

একটু বাদে একজন সেলসম্যান এল অসিতের কাছে। অসিত গম্ভীরভাবে বলল, চটি দেখান। বাড়িতে পরার ভাল চটি।

সেলসম্যান বলল, আপনার পায়ের মাপটা দেখি, সার!

অসিত পা থেকে জুতো-মোজা খুলে ফেলল।

সেলসম্যানটি দু জোড়া চটি আনতেই অসিত সেগুলো পায়ে না দিয়েই বিরক্তভাবে বলল, এগুলো কী এনেছেন? আমি কম দামি জিনিস চাইনি। সবচেয়ে ভাল ডিজাইনের কী কী চটি আছে দেখান!

সেলসম্যানটি বলল, ভেতর থেকে আনতে হবে। একটু বসবেন সার? আপনার পায়ের সাইজ দশ নম্বর। দশ নম্বরের চটির বেশি ডিজাইন নেই। পেছনের গোডাউন থেকে আনব, পাঁচ মিনিট লাগবে।

অসিত বলল, ঠিক আছে, আনুন।

কালো ব্যাগটা খুলে একটা বই বার করে সে পড়তে লাগল ওইটুকু সময়, কাটাবার জন্য।

সন্তু উঁকি মেরে দেখল, বইটার প্রত্যেক পাতার তলায়-তলায় রঙিন ছবি।

এই সময় একটা কাণ্ড ঘটল। দারুণ সাজগোজ করে একজন খুব ফর্সা মহিলা ঢুকলেন সেই দোকানে। সঙ্গে ছোটখাটো একটা দল। মহিলার মুখখানা কেমন যেন চেনা-চেনা মনে হল সন্তুর।

দোকানের সব লোক ফিসফাস করতে লাগল। অনেকে সেই মহিলার কাছে এগিয়ে গেল। একজন কেউ চেঁচিয়ে বলল, ডিম্‌প্‌ল! ডিম্‌প্‌ল!

মহিলাটি হিন্দি সিনেমার নায়িকা। সন্তু হিন্দি সিনেমা দেখে না, কিন্তু সারা কলকাতার দেওয়ালে এইসব নায়িকার এত ছবি থাকে যে, মুখগুলো চেনা হয়ে। যায়।

হিন্দি সিনেমার নায়িকা এই দোকানে এসেছে জুতো কিনতে, তাই হইচই পড়ে গেল সারা পাড়ায়। দোকানের বাইরে ভিড় জমে গেল। দোকানের ম্যানেজার বলল, ছবি তুলে রাখতে হবে, ক্যামেরা, ক্যামেরা!

দু-তিনটে ক্যামেরা বেরিয়ে পড়ল।

অসিত হিন্দি সিনেমার নায়িকাটিকে গ্রাহ্য করল না। একবার শুধু ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আবার মন দিল বইয়ের পাতায়।

বাইরে থেকেও অনেক লোক ক্যামেরা নিয়ে ঢুকে এল। সবাইকে ছবি তুলতে দিতে হবে। নায়িকাটির তাতে কোনও আপত্তি নেই। দোকানের ঠিক মাঝখানে তিনি পোজ দিয়ে দাঁড়ালেন। অনেকগুলি ক্যামেরার ফ্ল্যাশ বা জ্বলে উঠল।

সন্তুই বা এই সুযোগ ছাড়বে কেন? সেও তার ক্যামেরা বার করল। কিন্তু নায়িকার ছবি তুলল মোটে একটা, আর তিনখানা ছবি তুলল শুধু অসিতের। এত ফ্ল্যাশ জ্বলছে যে, অসিত কোনও সন্দেহ করল না। অসিতের খুব ক্লোজআপ ছবি তুলে নিল সন্তু, যদিও এত ছবি কী কাজে লাগবে সে জানে না, কিন্তু একটা কিছু তো করতে হবে।

সেই নায়িকাকে নিয়ে সবাই এমন ব্যস্ত হয়ে পড়ল যে, অসিতের কাছে আর কেউ এলই না। অসিত ঘড়ি দেখল, দশ মিনিট কেটে গেছে।

বেশ রাগের সঙ্গে সে আবার মোজা-জুতো পরল, তারপর গটমট করে বেরিয়ে গেল।

সন্তু ভেবেছিল, জুতো কেনাটা একটা ছুতো, অসিত নিশ্চয়ই এখানে কারও সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। জুতো কেনার ছলে কোনও গোপন কথা বলা কিংবা কোনও জিনিস পাচার করে দেওয়া সহজ।

কিন্তু সেরকম কিছুই হল না। কালো ব্যাগটা নিয়ে অসিত আবার ট্যাক্সিতে উঠে গেল।

এ-পাড়ায় অনেক জুতোর দোকান। কিন্তু অন্য কোনও দোকানে আর গেল অসিত। জুতো কেনার দরকার নেই, না খুব রেগে গেছে?

এবার অসিতের গাড়ি চলে এল ডালহাউসিতে। ট্রেনের টিকিটের বড় অফিসটার সামনে থামল। ট্রেনের টিকিট কাটবে? কোথাকার টিকিট কাটছে, সেটা জানা খুব দরকার। সন্তুও ঢুকে পড়ল সেখানে। টিকিট কাটার অনকেগুলো লাইন। অসিত কিন্তু কোনও লাইনে দাঁড়াল না। একপাশের একটা ছোট দরজা দিয়ে ঢুকে গেল ভেতরে। সন্তুও সেখান দিয়ে ঢুকতে যেতে একজন লোক তাকে আটকাল। ভেতরে যাওয়া নিষেধ। অসিত নিশ্চয়ই কোনও চেনা লোকের নাম বলেছে। ভেতর থেকে সে টিকিট কাটবে।

অগত্যা সন্তুকে ঘোরাঘুরি করতে হল বাইরে। সাদা গাড়ির কালো চশমা পরা লোকটাও বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।

সেখান থেকে বেরিয়ে অসিত গেল সার্কুলার রোড আর ল্যান্সডাউনের মমাড়ের কাছে একটা দোকানে। এখানে পুরনো দামি-দামি জিনিস বিক্রি হয়। অ্যান্টিকের দোকান। অসিতেরও এই ব্যবসা।

দোকানের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে মাত্র মিনিট পাঁচেক কথা বলল, কিছু নিল না কিংবা দিল না। অন্তত দেখা গেল না সেরকম কিছু। কাউন্টারের লোকটা তার চেনা, সে হাসিমুখে বারবার অসিতকে হাত ধরে টেনে ভেতরে বসাবার চেষ্টা করল, অসিত বলল, সময় নেই, খুব ব্যস্ত আছি।

দুপুর প্রায় বারোটা। আকাশে গনগনে রোদ। প্রথম প্রথম সন্তু যতটা উত্তেজনা বোধ করছিল, এখন তা অনেকটা থিতিয়ে আসছে। অসিত কোথায় যেন যাচ্ছে, তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু সন্তু আর কী করতে পারে? এর চেয়ে বেশি কাছাকাছি গেলে অসিত বুঝে যাবে।

থিয়েটার রোডের দুটো দোকানেও থামল অসিত। একটা ফ্ল্যাট বাড়িতে ঢুকে লিফট দিয়ে ছ তলায় উঠে গেল। সন্তু সাহস করে একই লিফটে উঠে গেল ওর সঙ্গে। অসিত বাঁ দিকের একটা ফ্ল্যাটে বেল বাজাল। দরজা খুলে একজন অসিতকে দেখে কী যেন বলল, আনন্দের সঙ্গে। লোকটা যেন

অসিতেরই অপেক্ষায় ছিল। সন্তু তাড়াতাড়ি ডান দিকের একটা অচেনা ফ্ল্যাটে . বেল বাজাল, তার বুক ঢিপ ঢিপ করছে। অসিত তার দিকে মনোযোগ দেয়নি, ওদিকের লোকটি অসিতকে ভেতরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল, এদিকের ফ্ল্যাটের দরজা তখনও খুলল না, বোধ হয় ভেতরে কেউ নেই। সন্তু আর দেরি না করে নেমে গেল নীচে।

অসিত কিন্তু ট্যাক্সিটা ছাড়েনি। সাদা গাড়িটাকে আর দেখা যাচ্ছে না।

এবার আধ ঘন্টা বাদে নীচে নামল অসিত। এর মধ্যে সন্তু গাড়িতে বসে বসে তার নোট বুকে টুকে নিয়েছে অসিত কোথায়-কোথায় গেছে। গয়নার দোকান, ব্যাঙ্ক, জুতোর দোকান, রেলের টিকিটের অফিস, অ্যান্টিক শপ, ফোটোগ্রাফি শপ, ঘড়ির দোকান, থিয়েটার রোডের বলাকা বাড়ির ফ্ল্যাট নং ৬বি।

ট্যাক্সিটা খুব কাছেই একটা হোটেলের মধ্যে ঢুকে পড়ল।

এই হোটেলটার বাইরের বাগানে অনেকগুলো রঙিন ছাতা পোঁতা আছে। তার নীচে একটা করে টে। অসিত বসল সেরকম একটা টেবলে। বোঝ যাচ্ছে, এবার সে লাঞ্চ খাবে।

সন্তুরও খিদে পেয়ে গেছে। পকেটে এখনও আড়াইশো টাকা আছে। সেও এখানে খেয়ে নিতে পারে। গাড়ির ড্রাইভারকে সে জিজ্ঞেস করল, আপনি খেয়ে এসেছেন? আপনি এখানে খাবেন?

ড্রাইভারটি বলল, সে খেয়ে-দেয়েই ডিউটি করতে এসেছে। এখন কিছু খাবে না।

সন্তু হোটেলের বাগানে অসিতের থেকে খানিকটা দূরের একটা ছাতার তলায় বসল। বেয়ারা আসবার পর সে অর্ডার দিল তন্দুরি নান আর রেশমি কাবাব। এত বড় হোটেলে সন্তু আগে কখনও একা একা আসেনি। তার বয়েসী আর কেউ নেইও এখানে।

অসিতের টেবিলে এসে বসল দুটি মেয়ে। একজনের বয়েস সতেরো-আঠারো, আর একজনের তিরিশের কাছাকাছি। আগে থেকেই ওদের আসার কথা ছিল? না, এখানে হঠাৎ দেখা হয়ে গেল, তা ঠিক বোঝা গেল না। তবে বেশ ভালরকম চেনা, তা বোঝা গেল!

এবার কোটের পকেট থেকে একটা লাল পাথরের মালা বার করল অসিত। সন্তুর চোখ দুটো ছানাবড়া হওয়ার উপক্রম। এই সেই নবাব সিরাজদ্দৌল্লার দেওয়া চুনির হার! এরকম সবার সামনে বার করে দেখাচ্ছে অসিত? অবশ্য এখানে অন্য কেউ ওটার কথা জানে না।

একজন বেয়ারা ওদের টেবিলে অর্ডার নিতে এসেও হাঁ করে মালাটা দেখতে লাগল। মেয়ে দুটিও এ একবার, ও একবার মালাটা হাতে নিয়ে দেখছে।

সন্তু একটা জয়ের নিঃশ্বাস ফেলল। যাক, ওই বিখ্যাত মালাটা যে অসিত চুরি করেছে, তা প্রমাণ হয়ে গেল। নিজের চোখেই তো দেখল সন্তু। এর পর কাকাবাবু যা করবার করবেন।

ক্যামেরাটা বার করে যেন এমনিই নাড়াচাড়া করছে, এমন ভান করে সন্তু খচাখচ কয়েকটা ছবি তুলে ফেলল ওই টেবিলের। মেয়ে দুটির ছবি তোেলা থাক, পরে কাজে লাগবে।

সাদা গাড়ির কালো চশমা পরা লোকটাকে এখন আবার দেখা গেল এখানে। সে কোনও টেবিলে বসল না, শুধু একবার পাশ দিয়ে ঘুরে গেল। সন্তু তারও ছবি তুলে নিল চট করে। এ-লোকটা যদি গুণ্ডা হয়, তা হলে একেও পরে চেনা যাবে। অবশ্য কালো চশমার জন্য তার মুখখানা ভাল বোঝা যাচ্ছে না। তবে লম্বা, গাঁট্টাগোট্টা চেহারাটা গুণ্ডাদেরই মতন।

অসিত তার কালো রঙের ব্যাগটা পাশে নামিয়ে রাখেনি, এখানেও কোলের ওপর রেখেছে। ব্যাগটাতে আরও কী আছে? টাকা? এমনকী হতে পারে যে, এই মেয়ে দুটো চুনির হারটার দাম আগেই দিয়ে দিয়েছে, অসিত ব্যাঙ্ক থেকে সেই চেক ভাঙিয়ে নিল?

ওরা অনেক খাবারের অর্ডার দিয়েছে। সন্তু আস্তে-আস্তে খেতে লাগল। বেশ খানিকটা সময় লাগবে মনে হচ্ছে। সন্তু এক গেলাস লস্যি নিল।

কালো চশমা-পরা লোকটা দূরে ঘোরাঘুরি করছে। ওর কাছে যদি রিভলভার থাকে, তা হলে তো এখন ওই দামি চুনির হারটা কেড়ে নেওয়া কিছুই নয়। লোকটা নিচ্ছে না কেন?

যে-মেয়েটির কম বয়েস, সে এখন মালাটা গলায় পরে আছে। রোদ্দুরে ঝকঝক করছে লাল রঙের পাথরগুলো।

ওদের খাওয়া শেষ হতে দেরি আছে। সন্তু ঝট করে একবার উঠে গেল। বাগানের রেস্তরাঁর একপাশেই হোটেল। এখানে লোক থাকে। লবিতে ফোন রয়েছে কয়েকটা। সন্তু পয়সা ফেলে ফোন করল বাড়িতে।

কাকাবাবু নেই, মা ধরলেন।

সন্তু একটু নিরাশ হয়ে বলল, কাকাবাবু নেই? ফিরলেই বলবে, গ্রিনভিউ হোটেল, একটি সতেরো বছর বয়েসী মেয়ে, চুনির মালা!

মা দারুণ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী বললি?

সন্তু বলল, মনে রাখতে পারবে না? গ্রিনভিউ হোটেল, একটি সতেরো বছর বয়েসী মেয়ে..

তার মানে কী?

তোমাকে মানে বুঝতে হবে না। শুধু কথাগুলো মনে রাখবে!

গ্রিনভিউ হোটেল? তুই সেখানে কী করছিস?

কাজ আছে। কাজ আছে।

একটা সতেরো বছরের মেয়ে। তার সঙ্গে তোর কী করে ভাব হল? সন্তু, ওইসব হোটেলের মেয়েদের সঙ্গে ভাব করতে তোকে কে বলেছে?

আঃ, কে বলেছে যে আমার সঙ্গে ভাব হয়েছে? তার সঙ্গে আমার কোনও কথাই হয়নি!

তবে তার কথা বলছিস কেন?

তা তুমি বুঝবে না। শুধু কথাগুলো মনে রাখবে।

তুই দুপুরে বাড়িতে খেতে আসবি না?

না।

ফোন রেখে সন্তু আবার তাড়াতাড়ি নিজের জায়গায় ফিরে গেল।

ওরা বিল মেটাচ্ছে। সন্তু আগেই বিল দিয়ে দিয়েছে, নিজের থলেটা তুলে নিয়ে চলে গেল এক কোণে।

ওরা খাবার টেবিল ছেড়ে চলে গেল হোটেলের লবির দিকে। সেখানে গিয়ে দাঁড়াল লিফটের সামনে। ওই হোটেলেরই কোনও ঘরে মেয়ে দুটি থাকে তা হলে! কেননা, অল্প বয়েসী মেয়েটি চাবি চেয়ে আনল কাউন্টার থেকে।

লিফট থামার পর অল্প বয়েসী মেয়েটি ঢুকে গেল, অসিত আর অন্য মহিলাটি গেল না। দূর থেকে সন্তু দেখল, সেই কম বয়েসী মেয়েটির গলায় দুলছে চুনির মালা। অন্য মহিলাটি ও অসিত হোটেল থেকে বেরিয়ে এসে ওদের ট্যাক্সিতে উঠল।

সন্তু একবার ভাবল, বাচ্চা মেয়েটা হোটেলের ঘরে একলা থাকবে, ওর কাছ থেকে এখন যদি চুনির মালাটা কেউ কেড়ে নেয়? সন্তুর কি উচিত মেয়েটার ঘরের বাইরে পাহারা দেওয়া? কিন্তু মেয়েটা লিফটে উঠে কোন্ তলায়, কত নম্বর ঘরে গেল কে জানে!

তা ছাড়া কাকাবাবু তাকে বলেছেন, অসিতকে ফলো করতে।

অসিতদের ট্যাক্সি এল নিউ মার্কেটে। এখানে বিভিন্ন দোকানে ঘুরে ঘুরে ওরা গেঞ্জি, রুমাল, মোজা কিনল অনেকগুলো। এক দোকান থেকে চটিও কিনল অসিত। সন্তু পেছন-পেছন ঘুরছে, তার আর কিছুই করার নেই।

নিউ মার্কেটে কেনাকাটা সেরে অসিত সেই মহিলাকে নিয়ে ইডেন গার্ডেনের পাশ দিয়ে চলে এল গঙ্গার ধারে। খানিকটা যাওয়ার পর এক জায়গায় ট্যাক্সিটা থামাল। তার থেকে নেমে এবার অসিত ভাড়া মিটিয়ে দিল, খালি ট্যাক্সিটা ঘুরে চলে গেল উলটো দিকে।

গঙ্গার ধার দিয়ে অলসভাবে পাশাপাশি হাঁটছে অসিত আর সেই মহিলাটি। দুজনে মাথা নেড়ে কী যেন বলছে। কেউ রাস্তা দিয়ে আস্তে-আস্তে হাঁটলে, তাকে গাড়ি নিয়ে ফলো করা যায় না। সেটা বিচ্ছিরি দেখায়। সন্তুও গাড়িটাকে এক জায়গায় থামতে বলে নেমে পড়ল। অসিত এখনও তাকে লক্ষ করেনি। একবারও তার দিকে ফিরে চায়নি। একজন ছোট ছেলে অনুসরণ করবে, এরকমটা কেউ ভাবতে পারে না।

সন্তু ঠিক করল, অসিতের খুব কাছাকাছি গিয়ে হাঁটবে। ওরা কী কথা বলছে, তা শোনার চেষ্টা করবে।

কিন্তু কিছুই শোনা গেল না। ওদের কাছাকাছি যেতেই অসিত সেই মহিলাকে নিয়ে একটা সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল জলের ধারে। সেখানে একটা নৌকো থেমে আছে। নৌকোর মাঝির সঙ্গে দু-একটা কী কথা বলে ওরা নৌকোয় উঠে গেল, মাঝিটিও দড়ি খুলে দিল। সন্তু মহা ফাঁপরে পড়ে গেল। এবার কী করা যায়? কাছাকাছি আর কোনও নৌকো নেই। একটু দূরেই গোটা দু-এক জাহাজ দাঁড়িয়ে আছে। অসিতদের নৌকোটা সেইদিকেই যাচ্ছে, একটু বাদেই জাহাজের আড়ালে চলে যাবে।

সেই সাদা রঙের গাড়িটাকে অনেকক্ষণ দেখেনি সন্তু। হঠাৎ কোথা থেকে খুব জোরে এসে থামল। কালো চশমা পরা লোকটি নেমে এসে দৌড়ে গঙ্গার ধারে রেলিং-এর কাছে গিয়ে দেখল অসিতদের নৌকোটা। মনে হল, এই লোকটাও খুব হতাশ হয়েছে। গাড়ি নিয়ে তো কোনও নৌকোকে ফলো করা যায় না। গঙ্গায় আরও অনেক নৌকো ভাসছে, কিন্তু এখানে ঘাটের কাছে একটাও নেই।

কালো চশমা-পরা লোকটা আবার ফিরে এল নিজের গাড়ির কাছে। একবার যেন সন্তুর দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। কিংবা অন্য কোনও কারণেও হাসতে পারে। তার গাড়িটা স্টার্ট নিয়েই ফুল স্পিডে চলে গেল হাওড়া ব্রিজের দিকে।

সন্তু ক্যামেরা বার করে নৌকোটার ছবি তোলার চেষ্টা করল। কিন্তু শাটার টেপা গেল না। তার মানে ফিল্ম শেষ।

সন্তুর মনে হল, আর অসিতকে ফলো করা মানে বৃথা চেষ্টা। শুধু-শুধু গাড়ি ভাড়া বাড়বে। নৌকো থেকে অসিত কোথায় নামবে, তার কি কোনও ঠিক আছে? গঙ্গার ওপারে চলে যেতে পারে।

গাড়িতে উঠতেই ড্রাইভারটি জিজ্ঞেস করল, এবার কোথায় যাব? ট্যাক্সিটা তো চলে গেল, লোকটাকে এখন কোথায় পাবেন?

সন্তু ধমক দিয়ে বলল, আপনাকে বলেছি না, কোথায় যাব, কেন যাব জিজ্ঞেস করবেন না। এখন আমার বাড়িতে চলুন।

ড্রাইভারটি ধমক খেয়েও মজা করে বলল, আপনার বাড়ি কোথায়, সেটা কি আমার জানার কথা? আপনি কি রাজভবনে থাকেন?

সন্তু বলল, সোজা চলুন। তারপর বাঁ দিকে।

একদম বাড়ির সামনে না গিয়ে কাছাকাছি এসে গাড়িটাকে ছেড়ে দিল সন্তু। বাড়ি চিনিয়ে দেওয়া উচিত নয়। ড্রাইভারকে আর কিছু টাকা দিতে হল।

সন্তুদের পাড়াতেই একটা ফোটোগ্রাফির দোকান আছে, সেখানে এক ঘন্টার মধ্যে ফিল্ম ডেভেলাপ করে প্রিন্ট দেয়। সন্তুর নতুন ক্যামেরা, তাই ছবিগুলো দেখার খুব ইচ্ছে। ফিমের রোল্টা খুলে সেখানে জমা দিয়ে বাড়ি ফিরে গেল সন্তু।

2 thoughts on “০৭. এলগিন রোডে

  1. আমার পড়া শ্রেষ্ঠ উপন্যাস সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাকাবাবু সিরিজ।অনুভূতির চরম শিখরে পৌছে গেছি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *