০৫. সকালের আলো

জানলা দিয়ে এসে পড়েছে সকালের আলো। কাছেই ডেকে চলেছে একটা চিল। অনেক দূরে কারা যেন কথা বলছে। খুব মিষ্টি এক ঝলক বাতাসের স্পর্শে কাকাবাবু চোখ মেলে তাকালেন।

প্রথমে তিনি বুঝতেই পারলেন না, এটা কোন দিন। তিনি কতক্ষণ শুয়ে আছেন। মাথাটা ভারী মনে হতেই হাত দিয়ে দেখলেন অনেকখানি ব্যাণ্ডেজ বাঁধা। তারপর তিনি টের পেলেন তাঁর যে-টা ভাল পা, সেই পা-টাতেও খুব ব্যথা।

ওই পায়ের ব্যথাটার জন্যই কাকাবাবুভয় পেয়ে গেলেন। যাঃ, এই পা-টাও ভাঙল নাকি? তা হলে সারাজীবনের মতন একেবারে পঙ্গু হয়ে থাকতে হবে?

তিনি ডাকলেন, বিমান, বিমান। ঘরে ঢুকল দীপা।

খাটের কাছে এসে বলল, আপনার ঘুম ভাঙাইনি। চা দেব? এখন কেমন লাগছে? খুব ব্যথা আছে?

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, আমার কী হয়েছিল বলো তো?

দীপা চোখ বড় বড় করে বলল, উঃ কী কাণ্ড! যা ভয় পেয়েছিলাম। ছাদের ঘরটায় আপনি পা পিছলে পড়ে গেলেন। পাথরের টালিগুলো সব আলগা হয়ে আছে। একটাতে তো আমিও পড়ে যাচ্ছিলাম আর একটু হলে! কাকাবাবু মনে করার চেষ্টা করে বললেন, হ্যাঁ, আছাড় খেয়েছিলাম। একটা পাথর উলটে গেল!

দীপা বলল, আপনার মাথা ফেটে রক্তারক্তি। তখনও বুঝতে পারিনি যে পায়ে কিছু হয়েছে। কিন্তু আপনার একটু জ্ঞান ফিরতেই আপনি পা-টা চেপে ধরে আঃ আঃ করতে লাগলেন। মনে হল যেন পায়েই বেশি যন্ত্রণা হচ্ছে..

কাকাবাবু উত্তেজিতভাবে বললেন, কী হয়েছে আমার পায়ে? কম্পাউণ্ড ফ্র্যাকচার?

দীপা বলল, ভাগ্যিস সেরকম কিছু হয়নি। বিমান ঘাবড়ে গিয়ে পানাগড় চলে গেল। এ-গ্রামে ভাল ডাক্তার নেই। একজন বড় ডাক্তার নিয়ে এল পানাগড় থেকে। তিনি আবার অথোপেডিক সার্জেন। খুব ভাল করে দেখে বললেন, পায়ে কিছু হয়নি, শুধু বুড়ো আঙুলের নখ আধখানা উড়ে গেছে। সেইজন্যই অত ব্যথা। তবে, আপনার মাথায় তিনটে স্টিচ করতে হয়েছে, রক্ত বেরিয়েছে অনেকটা।

কাকাবাবু এবার যেন খানিকটা আশ্বস্ত হয়ে বললেন, মাথায় তিনটে সেলাই এমন কিছু নয়। পায়ে তা হলে বড়রকমের কোনও ক্ষতি হয়নি।

বাঃ, অর্ধেকটা নখ উড়ে গেছে, তাও কম নাকি?

নখ উড়ে গেলে আবার নখ হবে। এটা কবে হয়েছে? আজ, না কাল, না পরশু?

কাল সকালে।

তা হলে তারপর কাল সারা দিন আমি কী করলাম?

বাঃ, এতবড় একটা অ্যাকসিডেন্ট হল, তারপরও কি আপনি ঘুরে বেড়াবেন নাকি? আপনার খুব যন্ত্রণা হচ্ছিল বলে ডাক্তার আপনাকে ঘুমের ইঞ্জেকশান দিয়েছিলেন। তার মধ্যেও আপনি জেগে উঠেছিলেন মাঝে-মাঝে।

সেসব কিছু মনে পড়ছে না। এমন বিচ্ছিরিভাবে আছাড় খেয়ে তোমাদের খুব বিপদে ফেললাম।

আমাদের আবার কী বিপদ?

বিপদ মানে দুশ্চিন্তা।

হ্যাঁ, দুশ্চিন্তা তো হয়েছিল খুবই। কিন্তু ডাক্তারটি খুব ভাল। উনি অনেকক্ষণ ছিলেন। আপনার নাম জানেন আগে থেকে। উনি বলে গেছেন যে ভয়ের কিছু নেই। উনি আজ আবার আসবেন।

বিমান কোথায়?

বাড়ি ভাঙার লোকজন সব আসতে শুরু করেছে। এ বাড়ির নতুন মালিকও এসেছে, বিমান তার সঙ্গে কথা বলছে। লোকটা বলে কী জানেন? বলল, আপনারা এ-পাশটায় থাকুন, আমরা অন্য-পাশটা ভাঙতে শুরু করে দিই। আমি বলে দিয়েছি, তা চলবে না। আমরা চলে গেলে তারপর ওসব

শুরু হোক গে। আমি আওয়াজ সহ্য করতে পারব না।

এতক্ষণে কাকাবাবুর মুখে সামান্য একটু হাসি ফুটল।

তিনি বললেন, বাড়ির একদিকে আমরা থাকব, আর-একটা দিক ভাঙা শুরু হয়ে যাবে, এটা সত্যিই অদ্ভুত। আর বুঝি দেরি করতে পারছে না?

এই সময় বিমান ঘরে ঢুকে বলল, কাকাবাবু! অল রাইট? ওফ! আমার এবাড়িতে আপনার যদি বড় রকম কোনও ক্ষতি হত, তা হলে সারাজীবন আমার দুঃখের শেষ থাকত না।

দীপা বলল, বলেছিলাম না এটা একটা অপয়া বাড়ি। আর ওপরের ওই ঘরটা, ওটা একটা ভুতুড়ে ঘর। ঢুকলেই গা ছমছম করে। ওই ঘরটাই আগে ভেঙে ফেলা উচিত।

কাকাবাবু বললেন, অ্যাকসিডেন্ট ইজ অ্যাকসিডেন্ট। তা যে কোনও জায়গায় হতে পারে।

চা এল। কাকাবাবু চায়ে চুমুক দিতে লাগলেন।

বিমান বলল, অসিত আপনার কাছে দুঃখপ্রকাশ করেছে। আপনার সঙ্গে দেখা করে যেতে পারল না।

কাকাবাবু চমকে উঠে বললেন, অসিত চলে গেছে?

বিমান বলল, হ্যাঁ, আজ ভোরবেলাই চলে গেল। আমাদের গাড়ি পানাগড়ে গিয়ে ওকে ট্রেন ধরিয়ে দেবে। সেই গাড়িতেই ডাক্তারবাবুকে নিয়ে আসবে।

কেন, এত তাড়াতাড়ি চলে গেল কেন?

ও বলল, আর থেকে তো কোনও লাভ নেই। এ-বাড়ির সব কিছুই ওর দেখা হয়ে গেছে। কলকাতায় কাজও আছে কী একটা।

ওর পছন্দমতন জিনিসপত্র কিছু পেল? ভাল কোনও অ্যান্টিক?

ও বলল, দামি জিনিস কিছু নেই। বড়মামা সবই বেচে দিয়েছে। শুধু কয়েকটা ঘড়ি, বুঝলেন কাকাবাবু, একতলায় গুদামঘরগুলোয় কয়েকটা ভাঙা দেওয়াল ঘড়ি পড়ে ছিল, একেবারেই অকেজো, ভেতরের কলকজা নেই। সেইগুলো দেখে অসিত বলল, পুরনো ঘড়ির কিছু দাম আছে বিদেশে। আমি তো ওগুলো একেবারে ফেলেই দেব ঠিক করেছিলাম। আর একটা ক্যামেরা। আগেকার দিনের এক্সকম প্লেট ক্যামেরা ছিল, তেপায়া স্ট্যাণ্ডের ওপর দাঁড় করিয়ে, মাথায় কালো কাপড় মুড়ি দিয়ে ছবি তোলা হত, সেই ছিল একটা। তা-ও ভাঙা, বহুকাল ব্যবহার করা হয়নি। এই ক্যামেরাও তো ফিল্ম দিয়ে ছবি ভোলা যায় না, কাচের প্লেট লাগত, সেপ্লেটও পাওয়া যায় না। ওটাও ফেলে দেওয়ারই জিনিস ছিল। কিন্তু অসিত বলল, ওটার জন্য এক হাজার টাকা দাম দেবে। আমি অবাক! আর একটা ড্রেসিং টেবিলের হাতল। টেবিলটা নেই, শুধু কাচের হাতলটা পড়ে ছিল, সেটাও ওর পছন্দ। সব মিলিয়ে তিন হাজার টাকা দাম ধরেছে। যা পাওয়া যায় তাই লাভ!

ইস, জিনিসগুলো আমার দেখা হল না। সব নিয়ে গেছে?

হ্যাঁ। এক জায়গায় প্যাক করে দেওয়া হয়েছে। তবে আপনাকে বলছি কাকাবাবু, একদমই রদ্দি জিনিস। আমাদের দেশে কেউ এক পয়সাও দাম দিত না। হয়তো বাতিকগ্রস্ত সাহেবরা কিনতে পারে। শুনেছি অস্ট্রেলিয়ানরা এইসব জিনিস বাড়িতে ছড়িয়ে রাখে, যাতে লোকে ভাবে ওদের বংশ অনেক পুরনো।

ওপরের ঘরে কিছু পায়নি অসিত?

নাঃ! সারা দুপুর ধরে প্রতিটি জিনিস তন্নতন্ন করে দেখেছে। প্রতিটি ঝিনুক, পুঁতি, কাচের টুকরো। ওর কাছে ম্যাগনিফাইং গ্লাস ছিল, আর একটা কী যেন চোখে লাগাবার যন্ত্র, সব কিছু দিয়ে পরীক্ষা করে দেখল। সব বাজে জিনিস। শুধু বলল, খাটের চারটে পায়ার কিছু দাম আছে। অনেকরকম লতাপাতার কাজ রয়েছে, ওরকম এখন পাওয়া যায় না। তবে, অসিত কাঠের জিনিস কেনে না। ও বলল, কলকাতায় অ্যান্টিক ডিলাররা এই চারটে পায়ার জন্য অন্তত দু হাজার টাকা দিতে পারে।

দীপা বলল, যাই বলল প্লেট ক্যামেরার দাম আরও বেশি হওয়া উচিত ছিল। আমি শুনেছি, পুরনো ক্যামেরার অনেক দাম হয়।

বিমান বলল, আরে, ওই ক্যামেরাটা যে ছিল, তাই তো জানতুম না। একতলার একটা ভাঙা ঘরে অনেক আবর্জনার মধ্যে পড়ে ছিল। অসিতই তো খুঁজে বার করল। অসিত না দেখতে পেলে আমি ওটাকে ক্যামেরা বলে চিনতেই পারতুম না। আর সব বাজে জিনিসের সঙ্গে চলে যেত!

কাকাবাবু বললেন, অসিতের বাড়ি গেলে ওই ঘড়ি আর ক্যামেরা দেখতে দেবে নিশ্চয়ই?

বিমান বলল, তা দেবে না কেন? ও বলে গেল, আগামী পনেরো তারিখে ওর টিকিট কাটা আছে। লন্ডনে যাবে। তার আগে পর্যন্ত কলকাতাতেই ৩১২

থাকবে।

কাকাবাবুর গায়ের ওপর একটা পাতলা চাদর দেওয়া ছিল। সেটা সরিয়ে ফেলে খাট থেকে নামবার জন্য পা বাড়ালেন।

দীপা অমনই ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, ও কী করছেন? ও কী করছেন? নামবেন না!

কাকাবাবু অবাক হয়ে বললেন, কেন, নামব না কেন?

দীপা বলল, এই অবস্থায় আপনি হাঁটাচলা করবেন নাকি? না, না, শুয়ে থাকুন।

কাকাবাবু বললেন, সামান্য একটু মাথা ফেটে গেছে আর পায়ের আধখানা নখ ভেঙে গেছে বলে আমি শুয়ে থাকব? এ তো ভারী আশ্চর্য কথা!

বিমান বলল, কাকাবাবুকে তুমি আটকাতে পারবে না। এর চেয়ে অনেক খারাপ অবস্থায় কাকাবাবু পাহাড়ে পর্যন্ত উঠেছেন।

কাকাবাবু বললেন, আধ ঘন্টার মধ্যে আমি তৈরি হয়ে নিচ্ছি। তারপর ছাদের ঘরে যাব। সে ঘরটা তো আমার দেখাই হয়নি।

ঠিক আধ ঘন্টা পরে কাকাবাবু পোশাক বদলে বেরিয়ে এলেন ঘর থেকে। বগলে ক্রাচ কিন্তু খালি পা।

বিমানকে দেখে বললেন, ব্যথার জন্য পায়ে জুতো পরতে পারলাম না। আমার রবারের চটিটাতেও সুবিধে হচ্ছে না। তোমাদের একজোড়া চটি দিতে পারো?

বিমানের চটি পায়ে গলিয়ে কাকাবাবু উঠে এলেন ছাদে। বিমান তাড়াতাড়ি তালা খুলে দিল। ঘরের একটা জানলা খোলাই ছিল, রাত্তিরে সেখান থেকে বৃষ্টির ছাঁট এসেছে, মেঝেতে একটু একটু জল জমে আছে।

কাকাবাবু প্রথমেই ভাঙা পাথরটার দিকে তাকালেন।

পাথরটা আর ঠিকমতন লাগানো হয়নি, সেখানে একটা গর্ত। এই ঘরের মেঝেতে কোনও দামি জিনিস পোঁতা আছে কি না তা জানার জন্য গর্ত খুঁড়েও দেখা হয়েছিল। গর্তটার ওপরে পাথরখানা ঠিক মাপমতন বসেনি।

বিমান বলল,সাবধান, কাকাবাবু, আরও অনেক পাথর আলগা আছে!

কাকাবাবু বললেন, এরকম বাজে অ্যাকসিডেন্ট আমার কখনও হয়নি।

তারপর তিনি ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন।

দীপা জিজ্ঞেস করল, এত যে সব বইটই রয়েছে, এগুলোর কোনও দাম নেই?

বিমান বলল, এসব ছেঁড়াখোড়া বই কে কিনবে? কিলো দরে পুরনো কাগজওয়ালার কাছে বিক্রি করতে পারো, কিন্তু কলকাতা পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যাবে?

দীপা একটা বই তুলে নিয়ে বলল, এই বইটা তো তেমন ঘেঁড়েনি। মলাট ঠিক আছে।

বিমান বলল, ওখানা তো বাইবেল! বিনা পয়সায় পাওয়া যায়। বড় বড় হোটেলের প্রত্যেক ঘরে একখানা করে বাইবেল থাকে, খুব সুন্দর ছাপা আর বাঁধাই, যে-খুশি নিয়ে যেতে পারে।

কাকাবাবু ক্রাচ দুটো পাশে রেখে মেঝেতে বসে পড়লেন। চারদিকে ঝিনুক আর পুঁতির মালা ছড়ানো। আগে তিনি দেখতে লাগলেন বইগুলো। অনেকগুলোই বাইবেল। ইংরিজিতে আর পর্তুগিজ ভাষায়। কিছু ধর্মের বই। কিছু পত্রপত্রিকা। বেশ কয়েকটি নাটক। অনেক বইয়ের পাতা ছেঁড়া। এসব বইয়ের সত্যিই কোনও দাম নেই। কিছু হাতের লেখা কাগজও রয়েছে। সেগুলো কিছুই প্রায় পড়া যায় না। বিমানের খ্রিস্টান দাদুও বোধ হয় পাগল অবস্থায় এসব লিখেছিলেন।

দীপা পুঁতির মালা কয়েকটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করতে শুরু করেছে। বিমান বলল, আর কতবার দেখবে? অনেকবার তো দেখেছ? ওগুলো খুবই সাধারণ। কোনও দাম নেই।

কাকাবাবু কয়েকটা ঝিনুক তুলে নিয়ে দেখলেন। খাটের নীচে, ঘরের কোণে কোণে রাশিরাশি ঝিনুক।

দীপা বলল, পাগলাদাদু ঝিনুক কুড়িয়ে কুড়িয়ে মুক্তো খুঁজতেন বোধ হয়। দু-একটা মুক্তোটুক্তো আমাদের জন্য রেখে যেতে পারলেন না?

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, এই ঘর থেকে কোনও দামি জিনিস আগে পাওয়া গেছে কি?

বিমান বলল, আমি যতদূর জানি, কিছুই পাওয়া যায়নি।

কাকাবাবু একটা কালো রঙের চৌকো ছোট বাক্স দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ওটার মধ্যে কী ছিল?

দীপা ঠোঁট উলটে বলল, ওটাও তো আমি খালিই দেখেছি। ভেতরে একটা মোহর-টোহরও নেই। একটা প্লাস্টার অব প্যারিসের যিশু মূর্তি ছিল, তাও ভাঙা।

কাকাবাবু বাক্সটা খুলে দেখলেন, খুবই পুরনো বাক্স, ভেতরটায় একসময় লাল ভেলভেটের লাইনিং ছিল, এখন তা কুচিকুচি হয়ে গেছে।

দীপা বলল, দেখলে মনে হয় গয়নার বাক্স।

কাকাবাবু বললেন, ওরকম এক বাক্সভর্তি গয়না থাকলে তা তো আগে থেকে হাওয়া হয়ে যাবেই। তা ছাড়া গির্জার পাদ্রির সঙ্গে উনি থাকতেন, গয়না পাবেন কোথায়?

হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে কাকাবাবু বললেন, আচ্ছা, জানলার কাছে একটা খুব চকচকে জিনিস দেখে এগোতে গিয়ে আমি যে আছাড় খেয়ে পড়লাম, সেটা কী ছিল?

বিমান বলল, সেটাও কিছুই না। একটা প্রিজমের টুকরো। রোদ পড়ে সেটা ঝকঝক করছিল।

দীপা বলল, ওই যে কতকগুলো লম্বা-লম্বা ম্যাপ রয়েছে, ওগুলোর কোনওটার মধ্যে কোনও গুপ্তধনের সঙ্কেত নেই তো? উনি বলতেন কেন যে ওঁর কাছে সাত রাজার ধন এক মানিক আছে?

বিমান বলল, ওসব পাগলের প্রলাপ। যার কাছে সত্যিকারের দামি জিনিস থাকে, সে কি চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে বলে? ম্যাপগুলো হাতে আঁকা নয়, সাধারণ ছাপা ম্যাপ। এ-ম্যাপ সব জায়গায় পাওয়া যায়।

একটা লম্বা করে গোটানো ম্যাপ সে তুলে দিল কাকাবাবুর হাতে। কাকাবাবু দেখলেন, সেটা গোয়া, দমন আর দিউ এই তিন জায়গার ম্যাপ। ওইগুলি ছিল পর্তুগিজ কলোনি। দুটো একই রকম ম্যাপ পশ্চিম ইউরোপের। কোনও ম্যাপেই কিছু আলাদা দাগটাগ নেই।

কাকাবাবু বললেন, এর মধ্যে গুপ্তধনের সঙ্কেত থাকলেও তা বোঝার সাধ্য নেই আমাদের।

বিমান বলল, ছোটবেলায় আমার পাগলাদাদুর গলায় ঝোলানো একটা সোনার ক্রস দেখতাম। সেটাই বোধ হয় ওঁর একমাত্র দামি জিনিস ছিল। সেটা উনি গলা থেকে কক্ষনো খুলতেন না। মাঝে-মাঝে তিনি সেটায় চুমু খেতেন।

দীপা বলল, সেটা কে নিল?

বিমান বলল, কে জানে কে নিয়েছে! ওঁর মৃত্যুর সময় তো আমি এখানে ছিলাম না!

কাকাবাবু বললেন, বসো, এ-ঘরের সব কিছু দেখা হয়ে গেছে। এবার নীচে যাওয়া যাক! একটা মজার ব্যাপার কী জানো, পরশুদিন রাত্তিরবেলা আমি এই ছাদে একা-একা ঘুরে গেলাম, তখন ভূতের দেখা পেলাম না। অথচ দিনের বেলা এই ঘরের মধ্যে আমাকে ভূতে ঠেলা মারল?

দীপা চমকে উঠে বলল, আপনাকে ভূতে ঠেলা মেরেছে!

কাকাবাবু একগাল হেসে বললেন, তবে কি আমি এমনি-এমনি পড়ে গেলাম?

দীপা বলল, না, না, আমি তো আপনার পাশেই ছিলাম। কেউ আপনাকে ঠেলা মারেনি।

নীচে নেমে আসার পর খবর পাওয়া গেল যে পানাগড় থেকে ডাক্তারবাবু এসেছেন।

ডাক্তারের নাম শিবেন সেনশর্মা, বয়েস বেশ কম, সুন্দর চেহারা। কাকাবাবুকে দেখে বলল, এ কী, আপনি হাঁটাচলা শুরু করেছেন? পায়ের আঙুলে ব্যথা নেই?

কাকাবাবু বললেন, হ্যাঁ। ব্যথা আছে। তবে শুয়ে থাকলে ব্যথার কথাটা বেশি মনে পড়ে।

ডাক্তার কাকাবাবুর মাথার ব্যাণ্ডেজ খুলে ক্ষতটা পরীক্ষা করল, আবার বেঁধে দিল নতুন ব্যাণ্ডেজ। তারপর পা দেখে একটু চিন্তিতভাবে বলল, আঙুলটা একটু ফুলেছে কেন? আর একটা ইঞ্জেকশান দিতে হবে। আপনার কিন্তু এইরকম পা নিয়ে এখন হাঁটাচলা করা উচিত নয়। একটু বিশ্রাম নেওয়া দরকার।

দীপা বিমানকে বলল, চলো, কাল আমরা কলকাতায় ফিরে যাই। আর এখানে থেকে কী হবে?

বিমান বলল, চলো, আমার আপত্তি নেই। নতুন মালিক বাড়িটা ভাঙার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে…

ডাক্তার হাত ধুতে ধুতে বলল, এই বাড়িটা ভাঙা হচ্ছে… আচ্ছা, আপনাদের পরিবারে একটা চুনির মালা ছিল, যেটা নবাব সিরাজদ্দৌল্লা উপহার দিয়েছিলেন আপনাদের এক পূর্ব পুরুষকে, সেটা একবার দেখতে পারি?

বিমান ভুরু তুলে বলল, নবাব সিরাজদ্দৌল্লার দেওয়া চুনির মালা? আমি কখনও শুনিনি তো সে মালার কথা!

ডাক্তার বলল, সে কী! আমি আমাদের বাড়িতে গল্প শুনেছি। আপনাদের বাড়িতে একজন ক্রিশ্চান হয়েছিলেন, তিনি সেই মালাটা চুরি করে পালিয়েছিলেন। তারপর গোয়াতে গিয়ে সেটা বিক্রি করতে যেতেই ধরা পড়ে যান। তাই না?

বিমান হেসে বলল, ওসব গল্পই। ক্রিশ্চানদাদু কিছু চুরি করেননি। গোয়াতে গিয়ে ধরাও পড়েননি।

ডাক্তার বলল, তিনি তো পাগল হয়ে গিয়েছিলেন? এ বাড়িতে এসে আবার কী করে সেই মালাটা হাতিয়ে লুকিয়ে ফেলেন।

দীপা বলল, সেটাই তবে সাত রাজার ধন এক মানিক। নবাব সিরাজের দেওয়া চুনির মালা!

বিমান বলল, ধ্যাত! আমি কোনওদিন সেরকম মালার কথা শুনিনি। আমার মার কাছেও শুনিনি।

ডাক্তার বলল, আমাদের এদিকে কিন্তু অনেকেই শুনেছে। কান্না আর রক্ত নামে একটা যাত্রা হয়, সেটাতেও আপনাদের এবাড়ির চুনির মালার কথা আছে। নবাব সিরাজদ্দৌল্লা মালাটা আপনাদের এক পূর্বপুরুষের বিয়েতে উপহার দিয়েছিলেন। সিরাজকে যেদিন মেরে ফেলা হয় মুর্শিদাবাদে, সেদিন আপনাদের এই বাড়িতে মালাটা থেকে ফোঁটা-ফোঁটা রক্ত পড়ছিল।

কাকাবাবুর ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল।

বিমান বলল, গাঁজাখুরি গল্প আর কাকে বলে!

ডাক্তার বলল, কান্না-টান্নার ব্যাপারগুলো নিশ্চয়ই বানানো। কিন্তু একরকম একটা ঐতিহাসিক মালা আপনাদের এখানে বোধ হয় সত্যিই ছিল। সেটার খোঁজ পাননি? আপনার পাগলাদাদু তো ছাদের ওপরে একটা ঘরে থাকতেন। সেই ঘরটা খুঁজে দেখেছেন ভাল করে?

বিমান কাকাবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, আর কি খুঁজতে কিছু বাকি আছে? আমার আগে আরও কতজন ও ঘরের সব কিছু ওলোট-পালোট করে দেখেছে?

দীপা বলল, তবু, মনে করো, ওই ঘরে যদি অত দামি জিনিসটা থেকে যায়? আমরা চলে যাব… নতুন মালিক এসে বাড়ি ভাঙার সময় যদি পেয়ে যায় সেটা? তা হলে কি আর আমাদের দেবে?

বিমান এবার খানিকটা বিরক্তভাবে বলে উঠল, বলেছি ওরকম কিছু দামি জিনিস এখানে নেই। কোনও এক সময় থাকলেও বড়মামা সব বিক্রি করে দিয়ে গেছেন। ঠিক আছে, সন্দেহ মেটাবার জন্য ছাদের ঘরটা আজ আমি নিজেই ভাঙব। লোক ডাকিয়ে দেয়াল ভেঙে, মেঝের পাথর সরিয়ে দেখা হবে! তারপর নিশ্চিন্ত হবে তো!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *