০৫. ঠাণ্ডার জন্য বারান্দায় বেশিক্ষণ থাকা যায় না

ঠাণ্ডার জন্য বারান্দায় বেশিক্ষণ থাকা যায় না। মূর্তিটাও ফেলে রাখা যায় না বাইরে। সন্তু আর জোজো ধরাধরি করে মূর্তিটা নিয়ে এল কাকাবাবুর ঘরে।

।মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে কাকাবাবু বললেন, এটা রেখে দিয়ে বেশ উপকারই হচ্ছে দেখছি। নরেন্দ্র রাত্তিরে কোথায় থাকছে জানি না। কয়েকটা নম্বর দিয়ে গেছে, দেখি কোথায় তাকে পাওয়া যায়।

একটা নম্বর টিপতেই একজন লোক ধরে বলল, সেখানে নরেন্দ্র ভার্মা নেই। সে একটা অন্য নম্বর দিল। সেখানে পাওয়া গেল তাঁকে।

কাকাবাবু বললেন, কী নরেন্দ্র, ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি? নরেন্দ্র বললেন, না, ঘুমোইনি। কিন্তু তুমি এত রাত পর্যন্ত জেগে আছ? কী ব্যাপার, কোনও অসুবিধে হয়েছে নাকি?

না, কোনও অসুবিধে হয়নি। এমনিই ঘুম আসছে না। তুমি নতুন কোনও সূত্র পেলে?

সন্তুদের কাছে তো শুনেছই, মন্দির দুটোতে কিছু পাওয়া যায়নি। এখন আমাদের মাথায় একটা অন্য চিন্তা এসেছে। সত্যিই কি মূর্তিটা এখান থেকে চুরি গেছে, না অন্য কিছু হয়েছে? হয়তো মূর্তিটা লালপাথর গ্রাম থেকেই চুরি হয়ে গিয়েছিল, পুরুতরা সেকথা আমাদের জানায়নি। কিংবা আসবার পথে কোথাও হারিয়ে ফেলেছে। কারণ, মূর্তিটা এখানে আনার পর তো আর কেউ দেখেনি!

আর কেউ দেখেনি?

না। পুরুত দুজনের কথাই এতক্ষণ বিশ্বাস করা হয়েছে। সেইজন্য লালপাথর গ্রামে গিয়ে আসল খবর নেওয়া দরকার। অতি দুর্গম জায়গা, টেলিফোন নেই, জিপগাড়িতেও শেষ পর্যন্ত পৌঁছনো যায় না, কয়েক কিলোমিটার হেঁটে যেতে হয়। দুজন খুব দক্ষ পুলিশ অফিসারকে আজ রাত্তিরেই সেখানে পাঠানো হচ্ছে। তারা কাল দুপুরের মধ্যে ফিরে আসবে।

তারা কি রওনা হয়ে গেছে?

এই তো গাড়িতে উঠতে যাচ্ছে।

তাদের যেতে বারণ করো।

বারণ করব? কেন?

ওদের যেতে হবে না। বরং তুমি চলে এসো এখানে। দেরি কোরো না।

তোমার ওখানে যাব? এত রাত্তিরে? কী ব্যাপার খুলে বলো তো?

নরেন্দ্র, তুমি তো আগে এত কথা জিজ্ঞেস করতে না! আসতে বলছি, চলে আসবে!

ঠিক আছে, আসছি!

ফোন বন্ধ করে কাকাবাবু বললেন, সন্তু, মূর্তিটা একটা কম্বল দিয়ে ঢেকে রাখ। নরেন্দ্র আসার পর বেশ একটা নাটক করতে হবে!

সন্তু বলল, আমি এখনও ভাবছি, মূর্তিটা কে ফেরত দিয়ে গেল? এখানেই বা দিল কেন? নিশ্চয়ই তোমাকে চেনে। তুমি এসেছ বলে ভয় পেয়ে গেছে!

কাকাবাবু বললেন, আমাকে এখানে কে চিনবে? পুলিশরাই চেনে না।

জোজো বলল, ওই নৃপেন হালদার চিনেছে। সে হয়তো আরও অনেককে বলে দিয়েছে।

কাকাবাবু বললেন, শুধু মুখের কথা শুনেই আমার মতন একজন খোঁড়া মানুষকে ভয় পাবে? চোরেরা এত ভিতু হয় না।

সন্তু বলল, চোর ধরা পড়ল না। অথচ চুরি করা জিনিস আপনি আপনি ফিরে এল, এরকম আমি আগে কখনও শুনিনি।

কাকাবাবু বললেন, চোরকে নিয়ে আমাদের আর মাথা ঘামাবার দরকার নেই। আমরা তো এখানে আসতেই চাইনি৷ কালই মানালির দিকে চলে যাব।

নরেন্দ্র পৌঁছে গেলেন দশ মিনিটের মধ্যে।

খাটের ওপর কাকাবাবুর দুপাশে স আর জোজো বসে আছে কম্বল মুড়ি দিয়ে। ঘরে একটিমাত্র চেয়ার।

কাকাবাবু বললেন, এসো নরেন্দ্র, বোসো ওই চেয়ারে।

নরেন্দ্র বললেন, কী ব্যাপার বলো তো? এত রাতে তোমরা সবাই জেগে বসে আছ?

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, বলতে পারো, কোন জানোয়ারকে দেখলে মনে হয় গজক্ষয় কিংবা মূষিক বৃদ্ধি?

নরেন্দ্র হকচকিয়ে গিয়ে বললেন, অ্যাঁ? তার মানে?

কাকাবাবু বললেন, একটা হাতি অনেক ছোট বনে গেছে, কিংবা একটা ইঁদুর খুব বড় হয়ে গেছে, এটা কোন জানোয়ারকে দেখলে মনে হয়?

এটা জিজ্ঞেস করার জন্য তুমি আমায় ডেকে এনেছ?

পারলে না? তা হলে এটা বলো, লাল রং হয় টকটকে, কালো হয় কুচকুচে, সাদা হয় ধপধপে, হলদে কী হয়?

রাজা, তুমি আমার সঙ্গে ইয়ার্কি করছ?

আরে না, না। হঠাৎ এইসব প্রশ্ন মাথায় এলে রাত্তিরে ঘুম আসে না। আর একটা আছে। সব পাখি বাসা বাঁধে, কোকিল কেন বাসা বাঁধে না?

ধপাস করে চেয়ারটায় বসে পড়ে নরেন্দ্র বললেন, প্রথমটার উত্তর, শুয়োর। দ্বিতীয়টার উত্তর, ক্যাটকেটে। আর তৃতীয়টা, পাখিদের মধ্যে কোকিলই একমাত্র শিল্পী। আর কী আছে বলো!

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, জীবনে তুমি কবার চমকে উঠেছ?

নরেন্দ্র বললেন, নরেন্দ্র ভার্মা সহজে চমকায় না। অন্তত গত দশ বছর কোনও কিছুতেই চমকাইনি। আর কোনও ধাঁধাটাঁধা দিয়ে আমাকে চমকে দেবে?

কাকাবাবু বললেন, তোমার কান থেকে যদি একটা মুরগির ডিম বের করি, তুমি চমকাবে না?

নরেন্দ্র কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, ম্যাজিশিয়ানরা এরকম অনেক খেলা দেখায়, তাতে অবাক হওয়ার কী আছে?

কাকাবাবু খাট থেকে নামলেন।

দরজার পাশে রাখা মূর্তিটার ওপর থেকে একটানে কম্বলটা সরিয়ে ফেলে বললেন, দ্যাখো তো, এটা কীরকম ম্যাজিক?

নরেন্দ্রর চোখ দুটো রসগোল্লার মতন গোল হয়ে গেল। লাফিয়ে উঠে বললেন, এটা কী?

তারপর মূর্তিটার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে সেটার গায়ে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন, হ্যাঁ, এই তো ভূতেশ্বরের মূর্তি। একেবারে অরিজিনাল। ম্যাজিক তো নয়। রাজা এটা তুমি কোথায় পেলে?

কাকাবাবু বললেন, তবে নাকি নরেন্দ্র ভার্মা কখনও চমকায় না?

নরেন্দ্র অভিভূত ভাবে বললেন, তুমি একটা জিনিয়াস!

কাকাবাবু গম্ভীর ভাবে বললেন, ভেবেছিলে আমাকে জব্দ করবে। জোর করে ধরে নিয়ে এসে এমন একটা কঠিন কেস দেবে, যেটার আমি কিছুই করতে পারব না। সবাইকে বলবে, দেখেছ, দেখেছ, রাজা রায়চৌধুরী সামান্য একটা চোরের কাছেও হেরে যায়।

নরেন্দ্র বললেন, যাঃ, কী যে বলো! তবে সত্যি কথা বলছি, এবারে মনে হয়েছিল, আমরা কেউই পারব না। সময় যে কম। দুদিনের মধ্যে উদ্ধার করতে

পারলে… যাক, ধড়ে প্রাণ এল! দারুণ একটা বিপদ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, কত কী হতে পারত! উফ! এবার বলো তো, কী করে তুমি এমন অসাধ্যসাধন করলে? আমরা যখন মন্দির দুটো দেখতে গিয়েছিলাম, তখন তুমি বুঝি একা একা অন্য জায়গায় খোজ করেছ?

উত্তর না দিয়ে কাকাবাবু শুধু মুচকি হাসলেন।

নরেন্দ্র সন্তু আর জোজোর দিকে তাকালেন। তাদের দুজনেরই ঠোঁটে হাসি আঁকা।

জোজো হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠল। সন্তু তাকে একটা খোঁচা মেরে বলল, এই, জোরে জোরে তো হাসার কথা নয়!

নরেন্দ্র বললেন, তোমরা আমাকে বোকা বানাচ্ছ? মূর্তিটা কোথা থেকে পাওয়া গেল, সেটা আমার জানা দরকার।

কাকাবাবু বললেন, জিনিসটা পাওয়া নিয়ে কথা। পেয়ে গেছ, ব্যস! তবে, তোমাদের যদি কোনও পুরস্কার দেওয়ার ব্যাপার থাকে, তা হলে সন্তু আর জোজোকে দিয়ো। ওদের দুজনকেই মূর্তিটা ধরাধরি করে ঘরে আনতে আমি দেখেছি।

নরেন্দ্র জিজ্ঞেস করলেন, সন্তু এটা কোথায় পেলে তুমি?

সন্তু বলল, আমি তো জানি না। জোজো জানে।

জোজো বলল, ভ্যাট! আমি তো তখন ঘুমোচ্ছিলাম। তুই-ই তো আগে দেখলি।

নরেন্দ্র একটা বড় নিশ্বাস ফেলে বললেন, মূর্তিটা তা হলে নিয়ে যাই? কত লোক দুশ্চিন্তা করছে, আমার অফিসাররা সবাই এখনও জেগে আছে।

ভারী মূর্তিটা গাড়িতে তোলার জন্য সন্তু আর জোজো সাহায্য করল নরেন্দ্রকে। গাড়ির দরজা বন্ধ করার আগে নরেন্দ্র বললেন, মূর্তিটা পেয়ে এত খুশি হয়েছি যে, তোমাদের দুষ্টুমির ঠিক উত্তর দিতে পারলাম না। পরে একদিন মজা দেখাব। রাজাকে সুষ্ঠু!

ঘরে ফিরে এসে ওরা দুজনেই হাসিতে ফেটে পড়ল। নরেন্দ্র খুবই বুদ্ধিমান মানুষ, তাঁকে হতভম্ব করে দেওয়া সোজা কথা নয়। কাকাবাবুও হাসতে হাসতে বললেন, অনেকদিন পর বেশ খাঁটি আনন্দ পাওয়া গেল। চোরদের ধন্যবাদ দেওয়া উচিত।

পরের দিন সকালে মানালিতে যাওয়া হল না। নরেন্দ্র কিছুতেই যেতে দিলেন না। শিবরাত্রির উৎসব দেখে যেতেই হবে। তার আগে কোনও গাড়িও পাওয়া যাবে না।

মিছিল দেখার জন্য অনেক আগে থেকে জায়গা নিতে হয়। শহর একেবারে ভিড়ে ভিড়াক্কার। সব লোক চলেছে মেলার মাঠের দিকে। দূর দূর গ্রাম থেকেও আসছে হাজার হাজার মানুষ। এত ভিড়ের মধ্যে শেষ পর্যন্ত আর গাড়িতে যাওয়া যায় না। পুলিশ এক জায়গায় সব গাড়ি থামিয়ে দিচ্ছে, বাকিটা পথ হেঁটে যেতে হবে।

ক্রাচ বগলে নিয়ে হাঁটতে অসুবিধে হচ্ছে কাকাবাবুর। লোকে ঠেলছে। অনবরত। তার অবস্থা দেখে একজন পুলিশ এগিয়ে এল সাহায্য করতে। এখন সব পুলিশই কাকাবাবুকে চিনে গেছে।

তবু তিনি উলটো দিকের একজন লোককে দেখে থমকে গেলেন। এই লোকটাকেই তিনি সেতুর কাছে গাড়ি চালাতে দেখেছিলেন। মাথায় মস্ত বড় সাদা পাগড়ি, মুখ ভর্তি দাড়ি গোঁফ, হাঁটু পর্যন্ত ঢোলা জামা পরা।

কাকাবাবু সন্তুকে জিজ্ঞেস করলেন, এই লোকটিকে চিনতে পারছিস?

সন্তু বলল, কাল না পরশু গাড়িতে দেখলাম।

কাকাবাবু বললেন, আগে কখনও দেখিসনি?

সন্তু বলল, মনে তো পড়ছে না।

কাকাবাবু বললেন, আমি কোনও মানুষের মুখ একবার দেখলে কিছুতেই ভুলি। তবে কবে দেখেছি, কোথায় দেখেছি, তা সবসময় মনে পড়ে না। সেটা মনে না পড়লে মনটা খচখচ করে। হ্যাঁ, এই মুখ আমি কোথাও দেখেছি ঠিকই।

সামনের দিকে কীসের জন্য যেন জ্যাম হয়ে গেছে। কেউ এগোতে পারছে না। পাগড়িওয়ালা লোকটিও দাঁড়িয়ে পড়েছে কাছেই। সে কিন্তু মেলার মাঠের দিকে যাচ্ছে না, যাচ্ছে উলটো দিকে।

কাকাবাবু পাগড়িওয়ালার একেবারে গা ঘেঁষে দাঁড়ালেন। তারপর লোকটার সঙ্গে একবার চোখাচোখি হতেই কাকাবাবু নিচু গলায় বললেন, বঁ ঝুর!

লোকটিও সঙ্গে সঙ্গে বলল, বঁ ঝুর!

কাকাবাবু ইচ্ছে করে পা হড়কে যাওয়ার ভঙ্গি করে লোকটির গায়ে ঢলে পড়লেন। মুখে বললেন, পারদো, পারদো! পারদোনে মোয়া।

লোকটি কাকাবাবুকে সোজা হয়ে দাড়াতে সাহায্য করতে করতে বলল, দা কর! দা কর!

তারপরেই তার চোখে ফুটে উঠল দারুণ বিস্ময়। কাকাবাবুর দিকে তাকিয়েই ফিরিয়ে নিল মুখ। সঙ্গে সঙ্গে গায়ের জোরে অন্য লোকদের ঠেলেঠুলে অন্যদিকে চলে গেল।

কাকাবাবু আপন মনে বললেন, হু, শুধু চোখ দেখেও মানুষকে চেনা যায়।

সন্তু আর জোজোর দিকে তাকিয়ে বললেন, তোরা ওই লোকটাকে খুঁজে বের করতে পারবি? শুধু দেখবি, মেলার উলটো দিকে কোথায় যাচ্ছে, পনেরো মিনিট সময়। না পেলে চলে আসবি। দুজনে দুদিকে যা। সন্তু আর জোজো ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল।

পুলিশটি কাকাবাবুকে একটা উঁচু জায়গায় বসিয়ে দিল। এখানে বিশিষ্ট লোকদের জন্য কয়েকটা চেয়ার রাখা আছে। সামনে রেলিং। এর মধ্যেই শোনা যাচ্ছে মিছিলের বাজনা।

এই দিনটাতে সমস্ত সরকারি কর্মচারী, পুলিশ, আগেকার রাজা ও জমিদারদের বংশধররাও আসেন দেবতাদের শোভাযাত্রা দেখতে। ধনী পরিবারের মহিলাদেরও আসতে হয় খানিকটা পায়ে হেঁটে। মেলার মাঠ লোকে গিসগিস করছে। কাকাবাবুদের জায়গাটা উঁচু বলে দেখতে অসুবিধে নেই, শোভাযাত্রা এইদিক দিয়ে ঘুরে মেলার মাঠে পৌঁছবে।

সন্তু আর জোজো ফিরে আসতে না আসতেই মিছিল শুরু হয়ে গেল।

জোজো বলল, আমি লোকটাকে দেখতে পেয়েছি। একটা দোকানে ঢুকল চা খেতে।

সন্তু বলল, আমি যে দেখলাম লোকটা ভিড়ের বাইরে গিয়েই একটা গাড়িতে উঠে সঙ্গে সঙ্গে স্টার্ট দিল।

জোজো বলল, তুই ভুল দেখেছিস। অন্য লোককে দেখেছিস।

সন্তু বলল, তুই যে ঠিক দেখেছিস, তার প্রমাণ কী।

জোজো বলল, লোকটা বোধ হয় এখনও সেই দোকানে বসে আছে। চল, দেখিয়ে দিচ্ছি।

কাকাবাবু বললেন, মিছিল শুরু হয়ে গেছে, এখন আর যাওয়া অসম্ভব। যাক, দরকার নেই। এমন কিছু ইম্পর্টেন্ট নয়।

সন্তু জিজ্ঞেস করল, কাকাবাবু, তুমি কি মনে করতে পেরেছ, লোকটাকে কোথায় দেখেছ?

কাকাবাবু বললেন, বোধ হয় পেরেছি। তবে এখনও একশো ভাগ নিশ্চিত নই।

জোজো জিজ্ঞেস করল, আপনি কি লোকটার সঙ্গে কথা বলছিলেন তখন? কী যেন ভাষা বললেন?

কাকাবাবু বললেন, ওসব কথা পরে হবে। আমরা কথা বললে অন্য লোকের অসুবিধে হচ্ছে। এখন দেখো সামনের দিকে।

মিছিলের আগে আগে আসছে বাজনদারদের দল। কতরকমের বাজনা! কাড়াকাড়া, শিঙা, ভেঁপু, ঢাক-ঢোল। এক একটা পেতলের ভেঁপু কী বিরাট, একজন তা কঁাধে করে বয়ে যাচ্ছে, আর একজন বাজাচ্ছে। মানুষজনের পোশাকেরও কত রং! চতুর্দিক ঝলমল করছে একেবারে।

পুরুতদের কাঁধে চড়ে আসছেন এক-একটা গ্রামের দেবতা। পালকি কিংবা সিংহাসনে। অনেকটাই ফুলে ফুলে ঢাকা। এক একটা পালকি আবার সাজানো হয়েছে হাঁসের মতন কিংবা নৌকোর মতন। অনেক জ্যান্ত মানুষও দেবতা সেজেছে। বাঘছাল পরা, খালি গায়ে ছাই মাখা, হাতে ত্রিশূল, মাথায় সত্যি সত্যি। একটা সাপ জড়ানো। সেই জ্যান্ত শিব একটা ঠেলাগাড়িতে দাঁড়িয়ে হাত তুলে সবাইকে আশীর্বাদ করছেন।

সন্তু বলল, এই শীতের মধ্যে খালি গায়ে আছে কী করে?

জোজো বলল, একরকম গাছের শিকড় আছে, সেটা চিবুলে গা গরম হয়ে যায়। হিমালয়ে পাওয়া যায় কিংকারু গাছ, তার শিকড় একবার এক সাধু আমার বাবাকে দিয়েছিল। তার একটুখানি চিবিয়েছি, অমনি মনে হল, আমার গায়ে একশো পাঁচ ডিগ্রি জ্বর! জামা, গেঞ্জি সব খুলে ফেলতে হল।

সন্তু বলল, বিশল্যকরণীর নাম শুনেছি। কিংকারু গাছের নাম শুনিনি কখনও।

জোজো বলল, ওটা খুব গোপন। খুব কম লোকই জানে। তোকে বলে ফেললাম!

কাকাবাবু বললেন, আমাদের ভূতেশ্বর কখন আসবে? তোরা কি বুঝতে পারছিস, এই ভিড়ের মধ্যে অনেক সাদা পোশাকের পুলিশ ছড়িয়ে আছে?

জোজো বলল, সাদা পোশাকে থাকলে বুঝব কী করে?

কাকাবাবু বললেন, ধর্মীয় উৎসবে বেশি পুলিশ থাকলে ভাল দেখায় না। তবু যাতে কোনওরকম গণ্ডগোল না হয়, তাই পুলিশরা অন্য পোশাকে দর্শক সেজে থাকে। পুলিশদের মুখের মধ্যে কিছু একটা ছাপ থাকে, যে-জন্য আমি তাদের দেখলেই চিনতে পারি। ওই যে দেখ না, কোণের রেলিংয়ের ধারে যে লোকটা পঁড়িয়ে আছে, দেখলে মনে হবে, সাদাসিধে গ্রামের লোক। ওর লম্বা জামাটা কোমরের কাছে এক জায়গায় ফুলে আছে লক্ষ করেছিস? ওখানে গোঁজা আছে রিভলভার!

জোজো জিজ্ঞেস করল, এই মিছিল কখন শেষ হবে?

কাকাবাবু বললেন, আমাদের তেত্রিশ কোটি দেবতা। তার মধ্যে তো মাত্র কয়েকশো এসেছে শুনেছি। দু-তিন ঘণ্টা তো লাগবেই।

জোজো বলল, একটু একটু খিদে পেয়ে যাচ্ছে।

সন্তু বলল, এই ভিড় ঠেলে এখন কোথাও যাওয়ার উপায় নেই। চুপ করে বসে থাক।

শোভাযাত্রা চলছে তো চলছেই। কোনওটা ছোট দেবতা, কোনওটা বড় দেবতা। এক এক সময় বাজনা বেড়ে যাচ্ছে। নাচছে একদল মানুষ। বহু লোক ছবি তুলছে নানারকম ক্যামেরায়। তাদের মধ্যে সাহেবও আছেন।

যদিও সবই খুব সুন্দর, তবু দেখতে দেখতে এক সময় একঘেয়ে লাগে। ঘণ্টা দু-এক কেটে গেছে, হঠাৎ সন্তু চেঁচিয়ে উঠল, ওই তো আমাদের ভূতেশ্বর!

একটা বেশ সিংহাসনে বসানো হয়েছে সেই ভূতেশ্বর মূর্তি। অন্যান্য মূর্তির চেয়ে এই মূর্তিটা আলাদা ভাবে চেনা যায়। প্রায় পঁচিশ-তিরিশ জন মানুষ সিংহাসনের সামনে আর পেছনে ধেই ধেই নাচছে। বাজনাও বাজছে খুব।

কাকাবাবু হেসে বললেন, এই ভূতেশ্বর মূর্তিটা আমাদের হয়ে গেল, তাই না? আমরাও লালপাথর গ্রামের মানুষ!

সন্তু বলল, এই মিছিলে এই ভূতেশ্বর মূর্তি না থাকলে সত্যিই মানুষজন খেপে যেত। চোরটাকে ধন্যবাদ জানানো উচিত।

জোজো বলল, আমাদের কোনও পুরস্কার দেবে নাকি রে?

সন্তু বলল, যদি দেয়, তুই কী চাইবি?

জোজো বলল, আমরা এখানে যতবার ইচ্ছে আসব। আমাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে।

কাকাবাবু বললেন, এটা একটা ভাল ইচ্ছে। বললেই ওরা আনন্দের সঙ্গে রাজি হয়ে যাবে মনে হয়।

জোজো বলল, আমাদের ভূতেশ্বর তো দেখা হয়ে গেল। এবার আমরা যেতে পারি না?

সন্তু বলল, দাঁড়া, ভিড়টা একটু কমুক। কিছু কিছু লোক এর মধ্যেই মেলার মাঠের দিকে চলে যাচ্ছে। ওখানে অনেকরকম নাচ-গান হবে।

মিনিট দশেক পরে হঠাৎ পর পর দুবার প্রচণ্ড আওয়াজ হল। খুব জোরে বাজ পড়ার মতন। কিন্তু আকাশে একটুও মেঘ নেই। যুদ্ধের সময় প্লেন থেকে যখন বোমা পড়ে, তখনও এই রকম শব্দ হয়।

কোথা থেকে শব্দটা এল, ঠিক বোঝা গেল না। মিছিলে কেউ বোমা ফেলেছে? মিছিলটা থেমে গেছে, সবাই ভয়-পাওয়া মুখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে।

একটু পরেই আবার একটা ওই রকম প্রচণ্ড শব্দ। এবার বোঝা গেল, মিছিলে নয়, শব্দটা আসছে খানিকটা দূর থেকে।

জোজো জিজ্ঞেস করল, কীসের শব্দ?

কাকাবাবু বললেন, এখান থেকে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। লোকজন দৌড়োদৌড়ি শুরু করেছে, এর মধ্যে যাওয়াটা ঠিক হবে না। এখানেই বসে থাকো।

খানিকবাদে একজন পুলিশ অফিসার এসে কাকাবাবুদের ডেকে নিয়ে গেল।

একটা পুরনো বাড়ি, তার বাইরে লেখা আছে, সেটা রাজবাড়ি। সেই বাড়ির একটা হল ঘরে নরেন্দ্র আর চার-পাঁচজন পুলিশ অফিসার বসে আছেন। সকলেরই উৎকট গম্ভীর মুখ।

কাকাবাবুকে দেখেই নরেন্দ্র উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, রাজা, একটা সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড হয়েছে।

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, বোমাগুলো কোথায় ফাটল? নরেন্দ্র বললেন, বোমা নয়, ডিনামাইট। জেলখানায়। অত্যন্ত শক্তিশালী। উৎসবের জন্য অনেকেই আজ এখানে এসেছে, জেলখানাতে কয়েকজন মাত্র প্রহরী। সেই সুযোগে কারা এই ডিনামাইট ফাটিয়েছে, জেলের এক দিকের দেওয়াল সম্পূর্ণ উড়ে গেছে। অন্তত বাইশ জন কয়েদি পালিয়েছে, তার মধ্যে চোদ্দোজনই বিদেশি!

কাকাবাবু বললেন, মাণ্ডি একটা ছোট জায়গা। এখানকার জেলে এত বিদেশি ছিল কেন?

নরেন্দ্র বললেন, এখানে খুব ড্রাগ স্মাগলিং হয়। সেই চোরাকারবারীদের মধ্যে কিছু দেশি লোক থাকে, বিদেশিও থাকে। মাঝে মাঝে ধরাও পড়ে। এক বছর আগে বিদেশি চোরাকারবারীদের একটা বড় গ্যাং ধরা পড়েছিল। তাদের কারুর পাঁচ বছর, কারও সাত বছর কারাদণ্ড হয়েছে, সেই দলটাই পালিয়েছে।

কাকাবাবু বললেন, সময়টা ওরা ঠিক বেছে নিয়েছিল। ওদিকে কারওর নজর ছিল না।

নরেন্দ্র বললেন, চলো রাজা, তুমি একবার জেলখানাটা দেখে আসবে!

কাকাবাবু বললেন, আমি দেখে কী করব?

নরেন্দ্র বললেন, জায়গাটা একবার নিজের চোখে দেখলে তুমি হয়তো কিছু বুঝতে পারবে।

কাকাবাবু হাত জোর করে বললেন, মাফ করো, নরেন্দ্র, এর মধ্যে আমি আর নিজেকে জড়াতে চাই না। এখন তোমাদের কাজ ওই পলাতক কয়েদিদের খুঁজে বার করা, তাতে আমি আর কী সাহায্য করতে পারি?

নরেন্দ্র বললেন, এখানে এত পাহাড়, এত লুকোবার জায়গা, খুঁজে বার করা কি সোজা কথা।

ভূপিন্দর সিং বললেন, আপনি এত সহজে মূর্তিটা উদ্ধার করে দিয়ে আমাদের বাঁচিয়েছেন। আপনি জাদু জানেন। আপনি নিশ্চয়ই একটা উপায় বাতলে দিতে পারবেন।

কাকাবাবু তাঁর দিকে ফিরে বললেন, মাপ করুন সিংজি। আমি জাদু জানি না। একটা পেরেছি বলেই যে এটা পারব, তার কোনও মানে নেই। কয়েদিদের খোঁজাখুঁজি করার জন্য পাহাড়ে ছোটাছুটি করা কি আমার পক্ষে সম্ভব? আমরা বেড়াতে এসেছি, একটু নিশ্চিন্তে বেড়াতে দেবেন না?

এর পরে প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে সবাই কাকাবাবুকে ঝুলোঝুলি করতে লাগল।

কাকাবাবু জেদ ধরে রইলেন। তিনি আর কিছুতেই এখানে থাকতে রাজি নন। আজই মানালি চলে যেতে চান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *