০৩. তিনটি স্থানীয় ছেলেমেয়ে

সকালবেলা প্রথমে কাকাবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এল তিনটি স্থানীয় ছেলেমেয়ে। এরা একটা ক্লাবের সদস্য, ওদের নাম রাজীব, নাসের আর এলা। নাসেরকে কাকাবাবুর একটু চেনাচেনা মনে হল। বোধহয় আগে কোথাও দেখেছেন।

ব্রেকফাস্ট খাওয়া হয়ে গিয়েছে। জোজো আর সন্তু জামা-প্যান্ট পরে বাইরে যাওয়ার জন্য তৈরি। কাকাবাবুই এখনও আলস্য করছেন, রাত্তিরের পোশাক ছাড়েননি। আজ গঙ্গার ওপারে খোশবাগ দেখতে যাওয়ার কথা।

এলা বলল, কাকাবাবু, আজ বিকেলে আমাদের ক্লাবের একটা সাহিত্যসভা আছে। সেখানে আপনাকে বিশেষ অতিথি হতে হবে।

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা আমাকে চিনলে কী করে? কী করে জানলে, আমরা এই হোটেলে আছি?

নাসের বলল, আমি তো আপনার বাড়িতে গিয়েছিলাম। আপনি নানাসাহেবের সিন্দুক উদ্ধার করলেন, তখন আমরা কয়েকজন আপনার ইন্টারভিউ নিতে গিয়েছিলাম। এখানে আপনার মতো বিখ্যাত কোনও লোক এলে সবাই জেনে যায়।

এলা বলল, এই জেলার ডি এম ইন্দ্রজিৎ দত্ত। তিনি আজ আমাদের ফাংশনের প্রধান অতিথি। বহরমপুর থেকে আসছেন। তিনিই তো বললেন, আপনাকে ধরতে।

কাকাবাবু বললেন, তোতামাদের সভায় কী হবে?

রাজীব বলল, প্রথমে হবে পরিবেশ দূষণ নিয়ে আলোচনা। তারপর কবিতা আর গল্প পাঠ।

কাকাবাবু হেসে বললেন, ওরে বাবা, সেখানে গিয়ে আমি কী করব? আমি বক্তৃতাও দিতে পারি না, গল্প-কবিতাও কখনও লিখিনি!

নাসের বলল, আপনি দু-চার কথা বললেই আমরা অনেক উৎসাহ পাব।

কাকাবাবু বললেন, কত সব গুণিজন আসবেন। তাঁদের মধ্যে আমি বসলে কী মনে হবে জানো তো? হংস মধ্যে বকো যথা। সবাই হাঁস আর

আমি একটা বক।

এলা বলল, মোটেই তা নন। আপনি তো রাজা। কোনও কথা শুনব না, আপনাকে যেতেই হবে।

কাকাবাবু বললেন, না না। তোমরা বরং সন্তু আর জোজোকে নিয়ে যাও। ওরা ভবিষ্যতে লেখক হতেও পারে।

জোজো বলল, আমি এখনও লিখতে শুরু করিনি। আর ঠিক দুবছর পরে…তখন লিখব, সেটাই হবে বেস্ট। আর টুয়েন্টি-টুয়েন্টিতে পাব নোবেল প্রাইজ।

কাকাবাবু বললেন, আর মাত্র পনেরো বছর বাদে? তা হলে আর দেরি করলে হবে না জোজো। এখনই শুরু করো।

রাজীব সন্তুকে জিজ্ঞেস করল, তুমিও লেখো নাকি ভাই?

সন্তু লজ্জা পেয়ে মুখ নিচু করে বলল, না না! আমি শুধু পড়ি।

জোজো বলল, সন্তু সাঁতারে চ্যাম্পিয়ন, দারুণ সাইকেল চালায়, রিভলভারও চালাতে পারে। ক্যারাটে জানে। যাদের এত গুণ থাকে, তারা লিখতে টিখতে পারে না। আমি ওসব কিছুই পারি না। তাই আমি লেখক হব।

সকলে হেসে উঠল।

এই সময় বারান্দার দরজার কাছে এসে দাঁড়াল পুরোদস্তুর পুলিশের পোশাক পরা একজন। কোমরের বেল্টে পিস্তল, হাতে একটা বেঁটে লাঠি। এ

অবশ্য কাল সন্ধেবেলায় গঙ্গার ধারের সেই পুলিশটি নয়।

এ বলল, কাকাবাবু, একটু আসতে পারি?

কাকাবাবু মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন।

পুলিশটি ভিতরে এসে কাকাবাবুর দুই হাঁটু ছুঁয়ে অভিবাদন করে বলল, স্যার, আমি লোকাল থানার সাব-ইনস্পেক্টর জাভেদ ইমাম। আমি আপনার একজন ভক্ত। আপনার সঙ্গে কয়েকটা কথা বলতে পারি?

কাকাবাবু বললেন, নিশ্চয়ই পারো। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসো।

জাভেদ অন্য তিনজনের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমাদের তো চিনি। তোমরা একটু বাইরে যাবে?

কাকাবাবু জোর দিয়ে বললেন, না, ওরা কেন বাইরে যাবে? ওদের সঙ্গে আমার কথা শেষ হয়নি। তোমার যা বলবার ওদের সামনেই বলতে পারো।

জাভেদ থতমত খেয়ে একটুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, কাল সন্ধের পর গঙ্গার ঘাটে আপনার সামনে একটা ঝঞ্ঝাট হয়েছিল?

কাকাবাবু হালকাভাবে বললেন, এমন তো কিছু ঝাট নয়। একটা সুন্দর চেহারার ছেলে ঘোড়া ছোটাচ্ছিল। ভাল করে এখনও হর্স-রাইডিং শেখেনি। হুড়মুড় করে ঘোড়াসুদ্ধ আমার গায়ের উপর এসে পড়ছিল আর কী! তাই আমি দুটো ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করে ঘোড়াটাকে থামাই। তুমি জানতে এসেছ তো, আমার সেই রিভরভারের লাইসেন্স আছে কিনা? আছে। তোমাকে দেখাচ্ছি!

জাভেদ বলল, না না। আপনার তো লাইসেন্স থাকবেই। আপনাকে কত বিপদআপদে পড়তে হয়। আমি জানতে চাইছি, বোকা-হাঁদা কনস্টেবলটা আপনাকে চিনতে পারেনি। সে আপনার সঙ্গে কোনও খারাপ ব্যবহার করেনি তো?

কাকাবাবু বললেন, না। ওসব নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না।

জাভেদ বলল, সেই লোকটি আপনার দিকেই ঘোড়া নিয়ে ছুটে আসছিল কেন?

কাকাবাবু বললেন, আশ্চর্য ব্যাপার। সেটা আমি জানব কী করে? সেই লোকটিকেই তো জিজ্ঞেস করা উচিত। কালকের পুলিশটি কিন্তু তাকে কিছুই জিজ্ঞেস করেনি। সেও কিছুই না বলে চলে গেল।

নাসের জিজ্ঞেস করল, জাভেদভাই, কে ঘোড়া চালাচ্ছিল?

জাভেদ বলল, সেলিম। তাকে চেনো? এ শহরের সবাই তাকে খুব পছন্দ করে। নিশ্চয়ই ঘোড়াটাকে সামলাতে পারেনি।

কাকাবাবু বললেন, ঘোড়াটার নামে দোষ দিয়ো না। খুব ভাল জাতের ঘোড়া। যাই হোক, আমি ব্যাপারটাকে কোনও গুরুত্ব দিতে চাই না!

জাভেদ কথা ঘুরিয়ে বলল, কাকাবাবু, আপনি কাল হাজারদুয়ারি দেখতে গিয়েছিলেন?

কাকাবাবু বললেন, হ্যাঁ। তবে পুরোটা তো আমি ঘুরে দেখিনি। শুধু অস্ত্রাগার। বাকিটা সন্তু আর জোজো দেখেছে।

জাভেদ বলল, আপনি যখন অস্ত্রাগারে ছিলেন, তখন সেখানে তো আরও অনেক লোক ছিল, তাই না? তাদের মধ্যে কাউকে আপনার সন্দেহজনক চরিত্রের বলে মনে হয়েছিল?

কাকাবাবু বললেন, না। এ-কথা জিজ্ঞেস করছ কেন?

জাভেদ বলল, কালই অস্ত্রাগার থেকে একটা মূল্যবান জিনিস চুরি গিয়েছে।

কাকাবাবু বললেন, তাই নাকি? কী চুরি গিয়েছে?

জাভেদ বলল, মহম্মদি বেগের ছুরি।

কাকাবাবু রীতিমতো অবাক হয়ে বললেন, সে কী? সেটা তো এমন কিছু দামি জিনিস নয়। আর কিছু চুরি যায়নি?

জাভেদ বলল, না, আর কিছু চুরি যায়নি। শুধু যে কাচের বাক্সটার মধ্যে ছুরিটা ছিল, সেটাই নেই!

কাকাবাবু বললেন, মিউজিয়াম থেকে মাঝে মাঝে কিছু জিনিসপত্র চুরি যায়, সেগুলো গোপনে বিদেশে পাঠিয়ে বেশি দামে বিক্রি করা যাবে বলে। কিন্তু মহম্মদি বেগের ছুরির কী দাম আছে? বাইরের কেউ তো মহম্মদি বেগকে চিনবেই না। কী করে চুরি হল? ওই ঘরে দুজন পাহারাদার ছিল দেখেছি।

জাভেদ বলল, কী করে চুরি হল, তা এখনও কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আপনারাই বোধহয় শেষ দেখেছেন ছুরিটাকে।

কাকাবাবু বললেন, তার মানে কি আমার উপরেই সন্দেহ পড়ছে? আমিই সরিয়েছি? কিন্তু ওসব ছুরিটুরি জমাবার শখ তো আমার নেই।

জাভেদ জিভ কেটে বলল, না না, সে সন্দেহ করব কেন? আমি বলতে এসেছি, আপনি তো সেই সময় কাছাকাছি ছিলেন, যদি আমাদের একটু সাহায্য করতে পারেন।

কাকাবাবু মাথা নেড়ে বললেন, আমি কী কী পারি না তা বলছি। আমি চুরি-ডাকাতির ব্যাপারে কিছু করতে পারি না। কোথাও খুনটুন হলে ডিটেকটিভদের মতো সেই রহস্যের সমাধান করতেও শিখিনি। গুপ্তধন উদ্ধারের জন্য ছোটাছুটি করাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি ইতিহাস নিয়ে নাড়াচাড়া করতে ভালবাসি। ইংরেজদের ফাঁকি দিয়ে নানাসাহেব কোথায় লুকিয়েছিলেন, সম্রাট কনিষ্কের পাথরের মুন্ডুটা কোথায় গেল, আন্দামানের আদিবাসীদের মধ্যে একটা অনির্বাণ আলো কী করে জ্বলে, এইসব রহস্য নিয়ে মাথা ঘামানো আমার শখ, বুঝলে?

জাভেদ বলল, তা তো জানিই। তবু, আপনি যখন এখানে আছেন…

কাকাবাবু বললেন, শোনো। অস্ত্রাগার দেখে বেরিয়ে আসার পর আমি যখন সিঁড়িতে বসে আছি, তখন একটা ঘটনা ঘটেছিল। কোথা থেকে একটা যাত্রাপার্টির লোক এসে, তাদের দুজন লর্ড ক্লাইভ আর সিরাজ সেজে লড়াই শুরু করে দিল। অনেক লোক ভিড় করে দেখতে লাগল সেই কাণ্ড। মিউজিয়ামের গার্ডরাও বোধহয় উঁকিঝুঁকি দিয়েছিল। তাদের সেই অন্যমনস্কতার সুযোগে কেউ ওই কাচের বাক্সটা সরিয়ে ফেলতে পারে। আমি যদি পুলিশের লোক হতাম, তা হলে ওই যাত্রাদলের খোঁজ করতাম। কেন ওরা ঠিক ওইখানে বাজনাটাজনা বাজিয়ে খেলা দেখাতে লাগল।

জাভেদ কিছু বলার আগেই হোটেলের মালিক এসে বললেন, স্যার, একটু আসতে পারি? আপনার জন্য একটা চিঠি আছে।

কাকাবাবু বললেন, আসুন, আসুন অয়স্কান্তবাবু!

ধুতি আর ফতুয়া পরা হোটেলের মালিকটি বললেন, আমার পুরো নামটা স্যার কেউ আর বলে না। সবাই বলে, কান্তবাবু। বাবা এমন শক্ত নাম রেখেছিলেন!

ওঁর পিছনে একজন লম্বামতো ভদ্রলোক। তার হাতে একটা চিঠি। বাংলায় টাইপ করা সংক্ষিপ্ত চিঠি। কাকাবাবু সেটা পড়তে লাগলেন।

মান্যবর শ্রী রাজা রায়চৌধুরী মহাশয়,
আপনার নাম আমি অনেক শুনেছি। আপনি শ্রদ্ধেয় মানুষ। আপনার সঙ্গে আলাপ করার জন্য আমি খুবই আগ্রহী। যদি এই গরিবের বাড়িতে একবার পদধূলি দেন, ধন্য বোধ করব। আমার নিজেরই আপনার কাছে যাওয়া উচিত ছিল। কিঞ্চিৎ অসুবিধের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। আমি আপনার অপেক্ষায় বসে থাকব। দুপুরে এই অধমের গৃহেই দুটি ডাল-ভাত খাবেন।
ইতি—
দীন আমির আলি

কাকাবাবু চিঠিটা নামিয়ে রেখে জিজ্ঞেস করলেন, এই দীন আমির আলি কে?

জাভেদ বলল, আমির আলি? তিনিই তো এই শহরের এখন সবচেয়ে নামী লোক। বিরাট বড়লোক। একখানা বাড়ি যা বানিয়েছেন, আগেকার আমলের নবাবদের প্যালেসের মতো।

কাকাবাবু বললেন, চিঠিতে লিখেছেন, গরিবের বাড়ি। অধমের গৃহ। একেবারে বিনয়ের অবতার!

এলা বলল, উনি খুব ভাল মানুষ। সকলের সঙ্গে এত চমৎকার ব্যবহার করেন!

নাসের বলল, কাকাবাবু, আপনি যান, ওঁর সঙ্গে কথা বললে আপনার ভাল লাগবে। উনি বাঙালি নন। কিন্তু এত ভাল বাংলা শিখেছেন, রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতা মুখস্থ বলতে পারেন।

কাকাবাবু লম্বা লোকটিকে বললেন, ঠিক আছে। ওঁকে বলবেন, চিঠির জন্য ধন্যবাদ। আমি পরে কোনও এক সময় যাওয়ার চেষ্টা করব।

লম্বা লোকটি বলল, স্যার, আমি ওঁর ম্যানেজার। আপনাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য আমি গাড়ি এনেছি। উনি আপনাদের জন্য পথ চেয়ে বসে আছেন।

কাকাবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, কেন। এখনই যেতে হবে কেন? আজ সকালে আমরা অন্য জায়গায় যাওয়ার প্ল্যান করে ফেলেছি।

ম্যানেজারটি হাত জোড় করে বলল, স্যার, আমির আলি সাহেব অসুস্থ, হার্ট অ্যাটাক হয়ে গিয়েছিল, উনি সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে পারেন না, তাই নিজে আসতে পারলেন না। যে-কোনও সময় ওঁকে আবার হাসপাতালে ভরতি করতে হতে পারে। তাই যদি এখনই একবার আসেন, আপনার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।

কান্তবাবু বললেন, একবার ঘুরে আসুন না স্যার। না হয় বেশিক্ষণ থাকবেন না।

কাকাবাবু জোজো আর সন্তুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী রে, যাবি নাকি?

জোজো চিঠিখানা পড়ছিল, সে বলল, আমি মোটেই শুধু ডাল-ভাত খেতে চাই না!

সন্তু বলল, আগেই তোর খাওয়ার কথা!

কাকাবাবু বললেন, ওখানে বেশিক্ষণ থাকব না। আমি তা হলে পোশাক বদলে আসি।

নাসের বলল, আমরা উঠছি। বিকেলবেলা আসব আপনাদের নিয়ে যেতে।

কাকাবাবু বললেন, মিটিং-এ আমি যাচ্ছি না। দ্যাখো, যদি ওদের নিয়ে যেতে পারো!

হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ঝকঝকে নতুন গাড়ি। উর্দি-পরা ড্রাইভার।

কাকাবাবুরা তিনজন বসলেন পিছনে। সন্তু ফিসফিস করে জোজোকে বলল, বেশি বড়লোকদের বাড়িতে আমার কীরকম ভয়ভয় করে। কীরকম ব্যবহার করতে হবে বুঝি না। যদি কিছু ভুল হয়ে যায়!

জোজো ঠোঁট উলটে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, আরে দুর, কত বড়লোক আমি দেখেছি। খাম্বাজপুরের রাজবাড়ি দেখলে তোর চোখ ট্যারা হয়ে যেত। সে বাড়ি এত বড় যে, বাড়ির মধ্যে টয় ট্রেন চলে।

সন্তু বলল, তার মানে? বাড়ির মধ্যে ট্রেন চলে?

জোজো বলল, হ্যাঁ, বাড়ির মধ্যে উঠোনটা দশখানা ফুটবল মাঠের সমান। বসবার ঘর থেকে খাবার ঘর, কেউ হেঁটে যায় না। উঠোনে গিয়ে ছোট ট্রেনে উঠতে হয়। সে বাড়িতে গেলেই নতুন জুতো পরতে দেয়, আর হাতে লাগাতে হয় গ্লাভস, যাতে কোথাও ধুলো-ময়লা না লাগে। ট্রেনটাও চলে ইলেকট্রিকে, তাই ধোঁয়া হয় না।

সন্তু জিজ্ঞেস করল, সেই খাম্বাজপুরটা কোথায়?

কাকাবাবু বললেন, বোধহয় গুলবাজপুরের পাশে, তাই না?

জোজো গম্ভীরভাবে বলল, না, আপনি একটু ভুল বলেছেন কাকাবাবু, দুবরাজপুরের পাশে।

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, সে রাজবাড়িতে আর কী কী আছে?

জোজো বলল, আমরা যখন গিয়েছিলাম, তখন খুব গরমকাল। আকাশে মেঘ আছে, কিন্তু বৃষ্টির দেখা নেই। রাজার সভায় একজন ম্যাজিশিয়ান ছিলেন। ম্যাজিশিয়ান মানে সায়েন্টিস্ট। তিনি ইচ্ছে করলেই মেঘ থেকে বৃষ্টি নামাতে পারেন। আমাদের খুব গরমে কষ্ট হচ্ছে দেখে বিকেলবেলা সেই সায়েন্টিস্ট একটা ছোট্ট প্লেনে চেপে উপরে উঠে গেলেন। প্লেনটা মেঘের মধ্যে ঢুকে যেতেই ঝরঝর করে বৃষ্টি শুরু হল। আর সঙ্গে সঙ্গে রাজবাড়ির চারদিকে মাইকে মেঘমল্লার গান বাজতে লাগল।

কাকাবাবু বললেন, বাঃ, ওরকম চমৎকার জায়গা দ্যাখার সুযোগ আমাদের কখনও হল না।

তারপর তিনি সামনের দিকে ঝুঁকে ম্যানেজার ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলেন, আপনাদের আমির আলি সাহেব কী করেন?

ম্যানেজার বললেন, উনি এখন আর কিছু করেন না। বয়স হয়েছে, শরীরও ভাল না। তবে লখনউতে ওঁদের খুব বড় ব্যাবসা আছে, উনি নিজেই সেই ব্যাবসাটা অনেকটা বাড়িয়েছেন। এখন বেশিরভাগ সময় এখানেই এসে থাকেন। স্যার, উনি গরিব-দুঃখীদের অনেক টাকা দান-ধ্যান করেন। কেউ যদি এসে বলে, টাকার অভাবে মেয়ের বিয়ে দিতে পারছে না, উনি বিয়ের সব খরচ দিয়ে দেন।

কাকাবাবু বললেন, আমাকে যে চিঠিটা দিলেন, সেটা কি উনি নিজে লিখেছেন!

ম্যানেজার বললেন, না, স্যার। উনি মুখে বলেছেন, আমরা টাইপ করেছি। এঁরা লখনউয়ের লোক, বাঙালি তো নন। তবে আলি সাহেব বাংলা বলতে পারেন, পড়তেও পারেন। লিখতে জানেন না এখনও।

খানিক পরে গাড়িটা এসে থামল এক জায়গায়। শহর ছাড়িয়ে কাটারা মসজিদের কাছাকাছি।

প্রথমে দেখা গেল একটা বেশ উঁচু সাদা রঙের গেট। তার উপরে কয়েকজন মানুষ বসতেও পারে। বোধহয় উৎসবের সময় বাজনদাররা ওখানে বসে সানাইটানাই বাজায়।

গেটের একদিকে পাথরের প্লেটে উর্দুতে কী যেন লেখা। আর-একদিকে ওরকমই পাথরের প্লেটে বাংলায় বড় বড় অক্ষরে লেখা, চেহেল সুতুন।

জোজো সেটা পড়ে বলল, এটা বাড়ির নাম? এর মানে কী?

কাকাবাবু সেই নামটার দিকে বেশ কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বললেন, চেহেল সুতুন। এর মানে হচ্ছে চল্লিশটা থামওয়ালা বাড়ি। কী ম্যানেজারবাবু, তাই না?

ম্যানেজারবাবু বললেন, আজ্ঞে, আমি ঠিক বলতে পারব না। আমি এখানকার লোক, বাংলা ছাড়া অন্য কিছু জানি না।

কাকাবাবু আপন মনেই বললেন, এটা একটা বিশেষ বাড়ির নাম।

গেটের পাশে দুজন মিলিটারির মতো পোশাক পরা দরোয়ান। তারা স্যালুট করে লোহার দরজা খুলে দিল। গাড়িটা ঢুকে গেল ভিতরে।

দুপাশে বাগান, মাঝখান দিয়ে লাল সুরকির রাস্তা। আসল বাড়িটা অনেকটা ভিতরে। দূর থেকে খুব একটা বড় বাড়ি মনে হয় না। তবে বাগান অনেকখানি। এ বাড়ির রংও ধপধপে সাদা।

কয়েক ধাপ সিঁড়ি দিয়ে ওঠার পর একটা বেশ চওড়া বারান্দা, আগাগোড়া মার্বেল পাথরের। সেই বারান্দার ওদিকে কয়েকটি ঘর।

বারান্দার এক কোণ থেকে দুটো মস্ত বড় কুকুর ছুটে এল এদিকে। জোজোর মুখ শুকিয়ে গেল ভয়ে, সে কাকাবাবুর গা ঘেঁষে দাঁড়াল।

কুকুর দুটো কাছে আসবার আগেই একটা ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এল। একজন মাথায় পাগড়ি-পরা লোক। সে শিস দিতেই কুকুর দুটো থেমে গেল।

কাকাবাবু বললেন, ভাল জাতের কুকুর। ডোবারম্যান। পাহারার ব্যবস্থা বেশ ভালই দেখছি।

পাগড়ি-পরা লোকটি বিনীতভাবে বলল, আসুন, এদিকে আসুন।

ঘরটির মধ্যে খয়েরি রঙের পুরু কার্পেট পাতা। প্রায় চোদ্দো-পনেরোটা সোফাসেট, অন্তত চল্লিশ-পঞ্চাশজন লোক একসঙ্গে বসতে পারে। উপরে ঝুলছে তিনখানা ঝাড়বাতি।

দরজার কাছে সবাইকে জুতো খুলতে হল। সেখানেই রাখা আছে অনেক ভেলভেটের চটি, বিভিন্ন পায়ের মাপের। নিজেদের মাপমতো পরতে হল সেই চটি।

সন্তু জোজোকে ফিসফিস করে বলল, এ তো তোর সেই বোম্বাগড়ের রাজবাড়ির মতো।

জোজো বলল, বোম্বাগড় নয়, খাম্বাজপুর। সেখানকার চটিগুলো আরও ভাল।

পাগড়ি-পরা লোকটি কাকাবাবুকে বলল, আপনার রিভলভারটা আমাকে দিন, যাওয়ার সময় আবার নিয়ে যাবেন।

কাকাবাবু লোকটির মুখের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে রইলেন। তারপর আপত্তি না জানিয়ে পকেট থেকে রিভলভারটা বের করে দিয়ে দিলেন লোকটির হাতে।

একটা সোফায় কাকাবাবুর দুপাশে বসল জোজো আর সন্তু। এত বড় বাড়ি, কিন্তু ভিতরে কোনও লোকজনের সাড়া পাওয়া গেল না।

কাকাবাবু একটু ভুরু কুঁচকে বসে রইলেন। লখনউয়ের ব্যবসায়ী, এখানে এত বড় বাড়ি বানিয়ে আছেন। কাকাবাবু তাকে চেনেন না, কোনওদিন দ্যাখেননি, তবু কাকাবাবুর সঙ্গে তার এমন কী জরুরি কথা থাকতে পারে?

অন্য দিকের দরজা দিয়ে একজন তোক একটা ট্রে হাতে নিয়ে ঢুকল। তিনটি লম্বা কাচের গেলাস, উপরে লেস দিয়ে ঢাকা, তার মধ্যে ঘন সাদা রঙের শরবত।

জোজো বলল, দুধ মনে হচ্ছে। আমি খাব না।

সন্তু একটা গেলাস নিয়ে চুমুক দিয়ে বলল, দুধ না। পেস্তা আর মালাই।

জোজো এবার দুচুমুকেই নিজের গেলাস শেষ করে বলল, মন্দ নয়। আর-এক গেলাস চাইলে দেবে?

কাকাবাবু বললেন, চাইলে হয়তো দেবে। কিন্তু চাইতে নেই। তুমি বরং আমারটা খাও।

জোজো বলল, না না। আমি সন্তুর সঙ্গে ইয়ারকি করছিলাম। আর খেতে চাই না।

আর-একজন লোক একটা বড় ট্রে ভরতি ফল নিয়ে এল। কমলা, বেদানা, কলা, আঙুর।

জোজো বলল, ধুত, ফল কে খাবে?

সন্তু বলল, আসছে, আসছে। এরপর কচুরি-শিঙাড়া।

জোজো বলল, সকালেই কচুরি খেয়েছি। শিঙাড়া ফিঙাড়াও এখন চলবে না।

সন্তু বলল, তারপর আসবে রেশমি কাবাব, রুমালি রুটি …

ম্যানেজারবাবুটি একটা হুইল চেয়ার ঠেলে নিয়ে এলেন, সেই চেয়ারে বসে আছেন একজন খুব রোগা চেহারার বৃদ্ধ, সাদা পাজামা আর পাঞ্জাবি পরা, মাথার চুলও একেবারে সাদা। তার উপরে আবার একটা ছোট্ট সাদা টুপি।

বৃদ্ধটি হাত জোড় করেই আছেন, চেয়ারটি কাছে আসার পর তিনি পরিষ্কার বাংলায় বললেন, নমস্তে, নমস্তে রায়চৌধুরীবাবু। আপনি পদধূলি দিয়েছেন বলে আমি ধন্য হয়েছি। আপনার মতো মহান লোককে চাক্ষুষ করাও সৌভাগ্যের ব্যাপার।

বৃদ্ধ চেয়ার থেকে উঠে কাকাবাবুর হাঁটু ছুঁয়ে প্রণাম করতে এলেন।

কাকাবাবু তাকে বাধা দিয়ে বললেন, এ কী, এ কী, কী করছেন? না না, বসুন। আমি আপনার চেয়ে বয়সে ছোটই হব।

বৃদ্ধ বললেন, তাতে কী হয়েছে। মানুষ গুণে বড় হলে তাকেও প্রণাম করতে হয়। আপনাকে কত লোক চেনে, আমি তো একজন সামান্য মানুষ!

কাকাবাবু বললেন, কেউই সামান্য নয়, আমি সব মানুষকেই সমান মনে করি। তা ছাড়া আমি এমন কিছু গুণীও নই।

বৃদ্ধ বললেন, আমার নাম দীন আমির আলি। আমি লখনউয়ে থাকি।

কাকাবাবু বললেন, এখানে এত বড় বাড়ি বানিয়েছেন। তার মানে, আপনারা আসলে বাঙালি?

আমির আলি বললেন, আমরা সাত পুরুষের লখনউয়ের বাসিন্দা। তার মানে তো সেখানকারই লোক হলাম, তাই না? আমার বাবা-মা কেউ এক ফেঁটাও বাংলা জানতেন না।

তবে আপনি এত বাংলা শিখলেন কী করে?

আমি বাচ্চা বয়স থেকে উর্দু অনুবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখার অনুবাদ পড়তাম। খুব ভাল লাগত। তখনই মনে হত, যদি বাংলা শিখে মূল লেখা পড়ি, তা হলে নিশ্চয়ই আরও ভাল লাগবে। লখনউয়ে অনেক বাঙালি থাকে। আপনাদের অতুলপ্রসাদ সেনের নামে লখনউয়ে একটা রাস্তাও আছে। আমাদের বাড়ির কাছেই থাকতেন অমর সান্যাল, তিনি খুব ভাল গান গাইতেন, তার কাছে একটু একটু করে বাংলা শিখতে শুরু করি। বাংলা কী অপূর্ব সুমধুর ভাষা!

উর্দুও খুব মিষ্টি ভাষা! এখন তো আপনি চমৎকার বাংলা বলেন।

প্রথম প্রথম বাংলা বললে আমার বাড়ির লোক হাসত। আমার এক কাকা অবশ্য রাগ করে বলত, খবরদার, আমার সামনে বাংলা বলবি না। বাংলা তো হিন্দুদের ভাষা। একদম ভুল কথা। লখনউয়ে হিন্দুরাও তো উর্দু বলে। বাংলাদেশের মুসলমানরাও তো বাঙালি, তাই না?

তা তো ঠিকই!

সন্তু আর জোজো চোখাচোখি করল। এইসব কথা বলার জন্য এই বুড়ো লোকটি কাকাবাবুকে এখানে ডেকে এনেছেন? আসল কথাটা কী?

আমির আলি বললেন, এখন আমি রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও বঙ্কিমচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ আরও অনেকের লেখা পড়ি। যখনই সময় পাই, বাংলা পড়তেই ভাল লাগে। এখন আমার গোস্ত-বিরিয়ানিও পছন্দ হয় না, মাছের ঝোল-ভাত খাই রোজ। ডাল আর বেগুনভাজাও। আমার রক্তেই বাঙালিআনা ঢুকে গেছে। হয়তো কোনও এক সময় আমার কোনও পূর্বপুরুষ বাঙালি ছিল।

কাকাবাবু বললেন, তা তো হতেই পারে! একসময় ভারতের অনেক জায়গা থেকে অনেক জাতের মানুষ এই বাংলায় এসে থেকে গিয়েছে। তেমনই অনেক বাঙালিও গিয়েছে দূর দূর দেশে। আপনি যেমন বললেন, লখনউয়ে অনেক বাঙালি আছে, তেমনই আছে রাজস্থানে, গোয়ায়, গুজরাতে?

আমির আলি বললেন, পাঁচ বছর আগে আমার প্রথম হার্টের অসুখ হয়। তার পরেই আমি একবার মুর্শিদাবাদ ঘুরতে এসেছিলাম। আশ্চর্য ব্যাপার, এখানে এসে আমি অনেক সুস্থ বোধ করেছি। এখানকার জল-হাওয়া আমার শরীরের পক্ষে ভাল। তাই এখানে বাড়ি বানিয়েছি। লখনউ থেকে প্রায়ই এখানে চলে আসি। এখন আমার বাড়ির লোকেরাও কিছু কিছু বাংলা শিখে গিয়েছে।

কাকাবাবু খানিকটা অধৈর্য হয়ে বললেন, বাঃ খুব ভাল! আচ্ছা, এখন তবে উঠি? আমাদের অন্য জায়গায় যেতে হবে। আপনার সঙ্গে আলাপ করে খুশি হলাম।

আমির আলি বললেন, সে কী! এখানে দুটি খেয়ে যাবেন না? সব ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে।

কাকাবাবু বললেন, না, খাওয়া হবে না। আমাদের কয়েকটা জায়গায় যাওয়ার কথা আছে। আমার ভাইপোরা আগে মুর্শিদাবাদে আসেনি।

কাকাবাবু উঠে দাঁড়িয়েছেন, আমির আলি তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন এক দৃষ্টিতে।

তারপর ভাঙাভাঙা গলায় বললেন, রায়চৌধুরী সাহেব, আমি আপনাকে ডেকে আনিয়েছি ক্ষমা চাইবার জন্য। আপনি ক্ষমা না করলে আমি কিছুতেই শান্তি পাব না।

কাকাবাবু খুব অবাক হয়ে বললেন, ক্ষমা? হঠাৎ একথা বলছেন? কীসের জন্য ক্ষমা? আমি তো আপনাকে দেখিইনি কখনও।

আমির আলি বললেন, কাল সন্ধেবেলা গঙ্গার ধারে আপনার একটা অ্যাক্সিডেন্ট হতে যাচ্ছিল। একটা ঘোড়া গিয়ে পড়ছিল আপনার গায়ে। ছি ছি ছি ছি। যদি আপনার কিছু হয়ে যেত, তা হলে কত বড় ক্ষতি হত দেশের। ইস, ভাবতেই পারছি না।

তারপর তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে ম্যানেজারকে বললেন, ওকে ডাকুন!

ম্যানেজার দৌড়ে বাড়ির ভিতরের দিকে গিয়ে একজনকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এলেন। এ সেই কালকের সিনেমার নায়কের মতো যুবকটি।

আমির আলি বললেন, এ আমার ছোট ছেলে সেলিম। এই সেলিমই কাল ঘোড়া চালাচ্ছিল। নতুন শিখছে, সামলাতে পারেনি। কতবার ওকে বলেছি, এখানে কত বড় বাগান, তার মধ্যে আগে প্র্যাকটিস কর। তা না, ও বাইরে যাবেই যাবে?

কাকাবাবু বললেন, শুধু বাগানে ঘুরতে ভাল লাগবে কেন? রাস্তা দিয়ে। ছোটালে পুরোপুরি শেখা হয় না।

আমির আলি ছেলেকে বললেন, সেলিম, রায়চৌধুরী সাহেবকে কদমবুসি করো। মাপ চাও!

সেলিম ঘাড় শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল, মুখেও কিছু বলল না।

জোজো সন্তুর দিকে চেয়ে ভুরু নাচাল। অর্থাৎ সে জিজ্ঞেস করতে চাইল, কদমবুসি মানে কী রে?

সন্তু আলতোভাবে কাঁধ ঝাঁকাল। অর্থাৎ সে নিজেও মানে জানে না।

সেলিমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কাকাবাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন, না না, ওসব দরকার নেই। ওসব আমি পছন্দ করি না। এই তো হাত মেলাচ্ছি।

কাকাবাবু সেলিমের দিকে একটা হাত বাড়িয়ে দিতে সেও এক হাত বাড়িয়ে করমর্দন করল। কী যেন একটা বলল, তা বোঝা গেল না।

সেলিম আজকে পাক্কা সাহেবদের মতো সুট পরে আছে। দেখাচ্ছেও সাহেবদের মতো।

কাকাবাবু বললেন, আমিও একসময় খুব ঘোড়া চালিয়েছি। প্রথম প্রথম দু-একবার পড়েও গিয়েছি। ওরকম তো হয়ই!

কাকাবাবুর খোঁড়া পায়ের দিকে তাকিয়ে আমির আলি জিজ্ঞেস করলেন, সেই জন্যই কি আপনার একটা পা…

কাকাবাবু বললেন, না। এটা অন্য অ্যাক্সিডেন্ট।

আমির আলি বললেন, তা হলে আপনি আমাকে আর আমার ছেলেকে ক্ষমা করলেন তো?

কাকাবাবু বললেন, নিশ্চয়ই! ও ঘটনা আমি মনেও রাখব না। অ্যাক্সিডেন্ট ইজ অ্যাক্সিডেন্ট।

তারপর হেসে ফেলে বললেন, আপনারা কি ভেবেছিলেন, আমি খুব রেগে আছি, রাগের চোটে আপনাকে বা আপনার ছেলেকে গুলি করে ফেলতে পারি? তাই ঢোকার মুখে আমার রিভলভারটা রেখে দেওয়া হল?

আমির আলি বললেন, আরে ছি ছি ছি ছি! তাই করেছে বুঝি? ওরা তো আপনাকে চেনে না। আসলে সিকিউরিটির জন্য এই বাড়ির মধ্যে কোনও অস্ত্র নিয়ে ঢোকা নিষেধ। এখনই ফেরত দিতে বলছি!

এর পরেও আমির আলি কাকাবাবুদের বিদায় নিতে দিলেন না। না খাইয়ে ছাড়বেন না কিছুতেই।

খাওয়ার ব্যবস্থা দেখে জোজো খুব খুশি।

আমির আলি সাহেব যতই বাঙালি খাবারের ভক্ত হয়ে থাকুন না কেন, এখানে কিন্তু শুধু ডাল-ভাত আর মাছ নয়, বিরিয়ানি, রোগন জুস, কোপ্তাকালিয়া, কিছুরই অভাব নেই। তিনি নিজে অবশ্য একটুখানি ভাত আর মুরগির সুপ খেলেন।

সেলিম অবশ্য খাবারের টেবিলে কাকাবাবুদের সঙ্গে যোগ দিল না। সে নাকি দুপুরে কিছুই খায় না, অনেক কিছু খায় রাত্তিরে।

এই দুপুর রোদ্দুরেও সে বাগানে ঘোড়া ছুটিয়ে বেড়াচ্ছে। দেখা যাচ্ছে খাবার ঘরের জানলা দিয়ে। কাকাবাবু একটুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে আপন মনে বললেন, ভালই তো শিখেছে।

আমির আলি সন্তু আর জোজোর সঙ্গে একটাও কথা বলেননি। ওরাও তাই চুপচাপ। কিন্তু বেশিক্ষণ চুপচাপ থাকা জোজোর পক্ষে সম্ভব নয়।

সে খেতে খেতে একসময় ফস করে জিজ্ঞেস করল, সেলিম সাহেব কি সিনেমা করেন?

আমির আলি ভুরু কুঁচকে বললেন, সিনেমা?

জোজো বলল, দু-একটা হিন্দি সিনেমায় ওঁকে দেখেছি মনে হচ্ছে?

আমির আলি খানিকটা বিরক্তভাবে বললেন, না, বাজে কথা। আমরা খানদানি বংশের লোক। সিনেমা-থিয়েটার আমরা পছন্দ করি না। আমি জীবনে কোনও ফিল্ম বা নাটক দেখিনি। সেলিম ইঞ্জিনিয়ার। সে আমার ব্যাবসা দেখবে।

কাকাবাবু বললেন, আপনি বাংলা এত ভালবাসেন। আপনার ছেলেমেয়েরাও কি বাংলা বইটই পড়ে?

আমির আলি বললেন, আমার আরও দুই মেয়ে, এক ছেলে আছে। তারা বাংলা নিয়ে মাথা ঘামায় না। লখনউ ছেড়ে এখানে আসতেও চায় না। কিন্তু শুধু সেলিম মুর্শিদাবাদ খুব পছন্দ করে। প্রত্যেকবার আমার সঙ্গে আসে, অনেকদিন থেকে যায়। এখানে লোকজনদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে খানিকটা বাংলা শিখেছে। আপনি আমার এই ছেলেটিকে দোয়া করবেন।

কাকাবাবু বললেন, দয়া? না না, দয়া করবার কী আছে!

আমির আলি বললেন, দয়া না, দোয়া।

জোজো জিজ্ঞেস করল, দোয়া মানে?

আমির আলি বললেন, আশীর্বাদ।

কাকাবাবু বললেন, ও হ্যাঁ হ্যাঁ। আমি ঠিক শুনতে পাইনি। নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই!

খুব বেশি খাওয়া হয়েছে, তাই হোটেলে ফিরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেই হল। তা ছাড়া আজ হঠাৎ গরম পড়ে গিয়েছে, রোদ বেশ চড়া।

বিকেলের দিকে চা খেয়েই বেরিয়ে পড়া হল। এখন আকাশ আবার মেঘলা হয়ে এসেছে। গরমও কম।

গঙ্গার ঘাটে ফেরি নৌকোয় অনেকে এপার-ওপার যায়। কাকাবাবু একটা আলাদা নৌকো ভাড়া করলেন।

নদীতে এখন বেশি জল নেই। ওপারে পৌঁছোতেও বেশি সময় লাগল না, কারণ, নৌকোটা মেশিনে চলে। আগে বইঠার শব্দ হত ছপছপছপ, এখন শব্দ হয় ভট-ভটভট।

এপারের ঘাটে খোশবাগের রাস্তা দেখানো আছে। নৌকো থেকে নামবার। পর জোজো জিজ্ঞেস করল, খোশবাগ মানে কী রে!

কাকাবাবু বললেন, জোজোর দেখছি সব কথায় মানে জানার খুব ইচ্ছে হয়েছে। সন্তু, বলতে পারবি?

সন্তু বলল, বাগ মানে তো বাগান। কলকাতায় বি-বা-দী বাগ, আজাদ হিন্দ বাগ। আর খোশ মানে…

কাকাবাবু বললেন, খোশ মানে খুশি। খুশির বাগান, সুন্দর বাগান। এটা আসলে একটা সমাধিস্থান। কিন্তু নানা ফুলের গাছটাছ দিয়ে খুব সুন্দরভাবে সাজানো। এটা বানিয়েছিলেন নবাব আলিবর্দি, তার মায়ের জন্য। তারপর তাকে এবং তার পরিবারের সকলকেই সমাধি দেওয়া হয় এখানে।

জোজো বলল, আমরা এটা দেখতে এসেছি কেন? সমাধিস্থানে তো দেখবার কিছু থাকে না। এর চেয়ে বরং সাহিত্যসভাটায় গেলে ভাল হত।

সন্তু বলল, তাজমহলও তো একটা সমাধিস্থান। সেখানে লক্ষ লক্ষ লোক যায়।

জোজো তর্ক করার ঝোঁকে বলল, যাঃ, কী বলছিস! তাজমহলে কেউ সমাধি দেখতে যায় না। বাড়িখানাই কী চমৎকার, পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্য। এই সমাধিস্থানটা মোটেই তেমন কিছু সুন্দর নয়।

কাকাবাবু বললেন, তা ঠিক, সমাধিস্থানে সত্যিই দেখার কিছু থাকে না। তবে, বিখ্যাত লোকের সমাধিস্থানে এলে সেইসব মানুষদের কথা মনে পড়ে। খানিকটা রোমাঞ্চ হয়। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের সমাধি আছে এখানে, তাই এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে। তবে তোমার মতো যারা ইতিহাস নিয়ে মাথা ঘামাতে চায় না, তাদের কাছে গুরুত্ব নেই। ঠিক আছে, আমরা এখানে। বেশিক্ষণ থাকব না।

সন্তু বলল, আমি ভাল করে দেখতে চাই।

পুরো সমাধিস্থানটা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। তার মধ্যে ছড়িয়ে আছে অনেক সমাধি। একটা উঁচু জায়গায় পাশাপাশি রয়েছে বেশ কয়েকটি সমাধি।

সেখানে এসে কাকাবাবু একটা সাদা-কালো পাথরের সমাধি দেখিয়ে বললেন, এটাই নবাব আলিবর্দির।

সন্তু বলল, আর সিরাজের কোনটা?

কাকাবাবু আঙুল তুলে বললেন, ওই যে পুব দিকেরটা।

সন্তু সেখানে গিয়ে হাত জোড় করে নমস্কার জানাল। তার দেখাদেখি জোজোও পাশে দাঁড়িয়ে কপালে হাত ছুঁইয়ে একটা সেলাম ঠুকে দিল।

সিরাজের সমাধির পায়ের কাছে তাঁর বেগম লুতফুন্নেসার সমাধি। সেখানে একজন লোক সেই সমাধিতে মাথা ঠেকিয়ে চুপ করে বসে আছে।

কাকাবাবু বললেন, জোজো, তোমাদের একটা গল্প বলি। এই যে দেখছ, আলিবর্দির সমাধির উপরের পাথরটা ফাটা। এটা কেন হয়েছে জানো? পলাশির যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতক মিরজাফরের কথা বিশ্বাস করে সিরাজ তার সৈন্যদের ফিরে আসার হুকুম দিল। সেই ভুলটা না করলে সিরাজ হয়তো যুদ্ধে জিতে যেতেও পারত। সমাধিস্থানের মধ্যে আলিবর্দি সেই ভুলের কথা টের পেয়ে চিৎকার করে সিরাজকে বলতে চেয়েছিলেন, না না, সৈন্যদের ফিরিয়ো না। আলিবর্দি সমাধি থেকে উঠতে চেয়েছিলেন বলেই উপরটা ফেটে গিয়েছে!

জোজো বলল, যাঃ, একদম আজগুবি কথা! মানুষ মরে গেলে আবার কথা বলতে পারে নাকি?

কাকাবাবু হাসতে হাসতে বললেন, আগেই তো বলেছি, গল্প! লোকে এইসব গল্প বানায়। শুনতে বেশ লাগে। তা বলে বিশ্বাস করার দরকার নেই। আমরা তো সকলে জানি ভূত বলে কিছু নেই। তা বলে ভূতের গল্প শুনলে কি গা ছমছম করে না?

সন্তু বলল, কাকাবাবু, ওই লোকটিকে দেখুন!

লুতফার সমাধিতে মাথা ঠেকিয়ে সেই লোকটি একইরকমভাবে বসে আছে। কাকাবাবু তাকে ভাল করে দেখে বললেন, তাই তো। আমির আলি সাহেবের ছোট ছেলে সেলিম। তোরা এখানে একটু অপেক্ষা কর। ওর সঙ্গে আমার একটা কথা আছে।

তিনি সেলিমের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন।

সেলিম চোখ বুজে আছে, কিন্তু কাছাকাছি কোনও মানুষ এলে সবাই টের পায়। তা ছাড়া কাকাবাবুর ক্রাচে খটখট শব্দ হয়েছে।

সেলিম মুখ তুলে তাকাতেই কাকাবাবু বললেন, আসসালাম আলাইকুম সেলিম সাহেব।

সেলিম বেশ বিরক্তভাবে বলল, আলাইকুম আসসালাম।

কাকাবাবু বললেন, তোমাকে বিরক্ত করতে চাই না, শুধু একটা প্রশ্ন করব?

সেলিম কড়া গলায় বলল, আমাকে তুমি বলার পারমিশন আপনাকে কে দিয়েছে? আপনি আমাকে কতদিন চেনেন?

কাকাবাবু থতমত খেয়ে বললেন, দুঃখিত, দুঃখিত। আমাদের এদিকে বয়স খুব ছোট হলে তুমিই বলে ফেলি। দুঃখিত। আমি আবার বলছি, আপনাকে একটা সোজাসুজি প্রশ্ন করতে পারি?

সেলিম বলল, গো অ্যাহেড!

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, গতকাল গঙ্গার ধারে আপনি কি ইচ্ছে করে আমার দিকে ঘোড়াটা চালিয়ে দিয়েছিলেন?

সেলিম বলল, ইয়েস!

কাকাবাবু বললেন, আমিও তাই বুঝেছি। সত্যি কথাটা বলার জন্য ধন্যবাদ। তা হলে আর-একটা সত্যি কথা জিজ্ঞেস করি, কেন? আপনি কি আমাকে চেনেন? আমি কি আপনার সঙ্গে কখনও শত্রুতা করেছি?

সেলিম বলল, না। আপনাকে চিনি না। শত্রুতার প্রশ্নই ওঠে না।

তা হলে আমাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন কেন?

নো। মেরে ফেলতে তো চাইনি। আই ওয়ান্টেড, ঘোড়ার পায়ের ধাক্কা লেগে আপনি আহত হবেন, কয়েকটা দিন হাসপাতালে থাকবেন, দ্যাটস অল!

সে কী! আপনি আমাকে চেনেন না, কোনও শত্রুতাও নেই। তবু আমাকে আহত করে হাসপাতালে পাঠাতে চাইবেন কেন?

তার কারণ, কয়েকজন লোক আমাকে জানিয়েছে, ইউ আর আ ট্রাবলসাম ম্যান। আপনি অন্য লোকদের ব্যাপারে নাক গলান। অন্য লোকের কাজে বাধার সৃষ্টি করেন। আমরা একটা কাজ করতে যাচ্ছি, সেই জন্যই কিছুদিন আপনাকে এখান থেকে সরিয়ে রাখা দরকার।

ভারী আশ্চর্য ব্যাপার। আজ সকালের আগে আমিও আপনাদের চিনতাম। আপনারা কী কাজ করতে যাচ্ছেন, সে সম্পর্কেও আমার কোনও ধারণাই নেই। আপনাদের ব্যাপারে আমি মাথা গলাব কী করে? আপনি সত্যি কথা বলছেন বলেই জিজ্ঞেস করছি, আপনারা কী কাজ করতে যাচ্ছেন?

একজন মানুষকে খুন করা হবে।

কাকাবাবু সহজে অবাক হওয়ার ভাব দেখান না। কিন্তু সেলিম এমন ঠান্ডা মাথায় কথাটা বলল যে, তিনি কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন।

তারপর জিজ্ঞেস করলেন, খুন করবেন?

সেলিম একইরকমভাবে বলল, ইয়েস, খুন করা হবে। কোনও প্রমাণ থাকবে না।

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, কাকে?

সেলিম এবার চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, আমি কি এতই বোকা যে, সে নামটা আপনাকে জানিয়ে দেব?

কাকাবাবু বললেন, তা ঠিক। কিন্তু কেন খুন করবেন, তা জানতে পারি কি?

সেলিম বলল, সেটাই বা আপনাকে জানাতে যাব কেন? এটা আমার প্রাইভেট ব্যাপার।

কাকাবাবু বললেন, বেশ। আপনারা আমাকে আহত করে হাসপাতালে পাঠাতে চেয়েছিলেন। সেটা হয়নি। আমি দিব্যি বহাল তবিয়তে আছি। এরপর আর ওরকম চেষ্টা করলেও পারবেন না। আমি সাবধান হয়ে যাব। আপনারা যে ভেবেছিলেন, অন্যের ব্যাপারে নাক গলানো আমার অভ্যেস, যদি সত্যিই এবার নাক গলাই?

সেলিম বলল, আপনারা মুর্শিদাবাদ বেড়াতে এসেছেন। আজ সন্ধের মধ্যে যতটা পারেন দেখে নিন। কাল সকালেই এ-জায়গা ছেড়ে চলে যান। সেটাই আপনাদের পক্ষে ভাল হবে।

কাকাবাবু এবার হেসে ফেলে বললেন, চলে যাব? তাই নাকি? আমি কোথায় থাকব কিংবা থাকব না, সেটা অন্য কেউ ঠিক করে দেবে? এরকম তো কখনও হয়নি। আমি এখানে আরও তিন-চারদিন থাকব ঠিক করেছি।

সেলিম বলল, আপনার প্ল্যান চেঞ্জ করুন। কাল না ফিরে গেলে আর কোনওদিনই ফিরতে পারবেন না এখান থেকে।

কাকাবাবু বললেন, এটা একটা চ্যালেঞ্জ? সেলিম বলল, ইয়েস। চ্যালেঞ্জ!

কাকাবাবু বললেন, আমি চ্যালেঞ্জ নিতে ভালবাসি। ঠিক আছে, দেখা যাক।

তিনি ফিরে এলেন সন্তুদের কাছে।

সন্তু বলল, ওদের বাড়িতে সেলিম তো কোনও কথাই বলেনি। এখানে এত কথা কী বলছিল?

কাকাবাবু বললেন, সে তোরা পরে শুনবি।

তারপর আপন মনে বললেন, এমনও হতে পারে, ছেলেটা পাগল। তবে পাগলরাও এক-এক সময় খুব বিপজ্জনক হয়।

ওঁদের নৌকোটা অপেক্ষা করছিল, কাকাবাবুরা উঠে পড়ার পর আবার ভটভট শুরু হল। একটুখানি যাওয়ার পর নৌকোর মাঝিটি বলল, বাবা, আমাদের বাড়ি এই পাশের গাঁয়ে। সেখানে একটু থামব। আমার বউকে কয়েকটা টাকা দিয়ে আসতে হবে, চাল কিনবে।

কাকাবাবু বললেন, তোমার গ্রামের নাম কী? সে বলল, রহিমপুর। বেশিক্ষণ লাগবে না। যাব আর আসব।

কাকাবাবু বললেন, ঠিক আছে, চলো!

নৌকোটা যখন মাঝনদী থেকে ঘাটের দিকে এগোচ্ছে, তখন কিছু লোকের হইচই শোনা গেল। তারা যেন কিছু একটা ভয়ে চাচাচ্ছে।

আর-একটু যেতেই শোনা গেল, লোকেরা বলছে, কুমির! কুমির! ধনাকে কুমিরে নিয়ে গেল!

খানিকটা গভীর জলে দেখা গেল, একটি ছেলে খাবি খাচ্ছে। সে একবার জলের উপর একটা হাত তুলছে, একবার ড়ুবে যাচ্ছে।

জোজো বলল, ওই ছেলেটাকে কুমিরে ধরেছে নাকি! কী হবে?

তখনই ঝপ করে একটা শব্দ শুনে সকলে আবার চমকে ফিরে তাকাল।

সন্তু জলে ঝাঁপ দিয়েছে।

জোজো দারুণ ভয় পেয়ে বলল, কাকাবাবু, সন্তু, সন্তু… ওকে কুমিরে খেয়ে ফেলবে… কী হবে?

কাকাবাবু কিছু না বলে স্থিরভাবে তাকিয়ে রইলেন। পকেটে হাত দিয়ে রিভলভারটা ছুঁলেন একবার। কিন্তু রিভলভার দিয়ে তো কুমির মারা যায় না!

সন্তু ড়ুবন্ত ছেলেটার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে জোরে জোরে সাঁতার কেটে।

কাকাবাবু মাঝিকে বললেন, ওদের পাশে নিয়ে চলো।

তিনি জুতো খুলতে লাগলেন। তৈরি হলেন নিজেও জলে লাফ দেওয়ার জন্য।

সন্তু সেই ছেলেটির হাত ধরল, তারপর দুজনেই ড়ুবে গেল।

কাকাবাবু ঝাঁপ দেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছেন, তখনই সন্তু আবার মাথা তুলে বলল, ঠিক আছে।

জোজো ফ্যাকাশে মুখে বলল, ঠিক আছে মানে কী? কুমিরটা কোথায়?

কাকাবাবু দাঁড়িয়েই ছিলেন।

সন্তু আরও কয়েকবার ড়ুবে গেল, আবার উঠল। তারপর ছেলেটিকে নিজের বুকের উপর রেখে চিতসাঁতার কেটে এগিয়ে এল নৌকোর দিকে।

ঘাটের লোকেরা তখনও চিৎকার করছে।

কাকাবাবু আর মাঝি দুজনে মিলে টেনে তুলল সন্তু আর ছেলেটিকে।

সন্তু বলল, কুমিরটুমির কিছু নেই। ছেলেটা এমনিই ড়ুবে যাচ্ছিল।

ছেলেটির মুখোনা ভয়ে ছাই রঙের হয়ে গিয়েছে। কথাই বলতে পারছে। কোনওরকমে কয়েকবার দম নিয়ে বলল, আমার পায়ে কামড়ে দিয়েছিল।

কাকাবাবু বললেন, তোমার কোনও পায়ে তো দাগ নেই। রক্তও বেরোয়নি!

সন্তু বলল, হয়তো কিছুতে ঠোক্কর মেরেছে। বড় মাছটাছ হতে পারে! তাতেই ভয় পেয়ে ও সাঁতার ভুলে গেছে!

মাঝিটি বলল, এ নদীতে তো কুমির নাই। কত মানুষ সাঁতরায়। কোনওদিন দেখি নাই কুমির। একবার একটা-দুটো শুশুক এসেছিল।

কাকাবাবু তাকে ধমক দিয়ে বললেন, কুমির নাই, তো আগে বলোনি কেন? গ্রামের লোকরাই বা কুমির কুমির বলে অযথা চাচাচ্ছে কেন? কেউ ছেলেটাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেনি!

মাঝিটা মুগ্ধভাবে সন্তুর দিকে তাকিয়ে বলল, এই ছেলেবাবুটির তো ভারী সাহস!

সন্তু নিজের গায়ের জামা নিংড়োতে নিংড়োতে বলল, এতে এমন কিছু সাহস লাগে না।

মাঝি বলল, কুমির নাই, কিন্তু হঠাৎ তো আসতেই পারে। বর্ষার সময় কোনওবার তো পুকুরেও কুমির আসে।

জোজো বলল, যদি সত্যি কুমির হত, তা হলে কী করতিস?

সন্তু বলল, অত ভাবলে চলে না। আর দেরি হলে ছেলেটা ড়ুবে যেত!

ঘাটের লোকরা সকলে এখন চুপ। তারা হাঁ করে এই নৌকোর মানুষদের দেখছে।

ধনা নামের ছেলেটা নৌকো থেকে নেমেই একজন মহিলাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল।

কাকাবাবু বললেন, নৌকোটা অন্য একটা জায়গায় নিয়ে চলো। এখানে থাকলে এই লোকরা অনেক কথা বলবে। আমাদের নামিয়ে খাতির করতে চাইবে। ওসব দরকার নেই।

মাঝিটি নৌকো চালিয়ে দিয়ে কাচুমাচুভাবে বলল, আমার বাড়িতে যাব না?

কাকাবাবু বললেন, যাবে, নিশ্চয়ই যাবে। আর-একটু দূরে গিয়ে নামো। তোমার জন্যই তো ছেলেটি বেঁচে গেল।

মাঝিটি বলল, কী যে বলেন বাবু! এই ছেলেবাবুটিই তো অসাধ্যসাধন করল।

কাকাবাবু বললেন, তুমি গ্রামের বাড়িতে যাবে বলেই তো আমরা এদিকে এলাম। মাঝনদীতে থাকলে এদিককার চেঁচামেচি শুনতেও পেতাম না, ছেলেটির ড়ুবে যাওয়ার ব্যাপারটা জানতেও পারতাম না।

কাকাবাবু সন্তুর প্রশংসা করলেন না। শুধু তার ভিজে চুলে একবার আদরের হাত বুলিয়ে দিলেন।

পকেট থেকে একশো টাকার একটা নোট বের করে মাঝিটিকে বললেন, এটা তোমার বউকে দিয়ে বলো, শুধু যেন চাল না কিনে আজ তোমাদের বাড়িতে মাছ-মাংসও রান্না হয়!

তাঁর মনের মধ্যে একটা কথা ঘুরতে লাগল। সন্তু নিঃস্বার্থভাবে, নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়েও একটি ছেলেকে বাঁচাল। আর সেলিম ঠান্ডা মাথায় একজন মানুষকে খুন করতে চায়। কত রকম মানুষ আছে এই পৃথিবীতে।

আজ আর অন্য কোথাও যাওয়া হবে না। সন্তুর ভিজে জামাকাপড়ই আগে পালটানো দরকার।

মাঝিটি ফিরে আসার পর যাওয়া হল হোটেলে।

সেখানে নাসের নামের ছেলেটি বাইরে বসে আছে। ওদের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেলেও কাকাবাবুদের সে সেখানে নিয়ে যাবেই যাবে।

অগত্যা যেতেই হল। কিন্তু কাকাবাবু কিছুতেই মঞ্চে উঠতে কিংবা বক্তৃতা দিতে রাজি হলেন না। পিছন দিকে বসে সব শুনতে লাগলেন। অনেকে। নিজেদের কবিতা পাঠ করছে, কেউ কেউ আবৃত্তি করল অন্যদের কবিতা। একজন মাঝবয়সি লোক একখানা জ্বালাময়ী বক্তৃতাও দিয়ে ফেলল, কিন্তু কার বিরুদ্ধে যে তার রাগ, তা কাকাবাবু বুঝতে পারলেন না।

জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইন্দ্রজিৎ দত্ত এলেন একেবারে শেষের দিকে।

তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে বসিয়ে দেওয়া হল মঞ্চে। তিনি জরুরি কাজে আটকে পড়েছিলেন বলে দুঃখ প্রকাশ করলেন। তারপর দর্শকদের মধ্যে কাকাবাবুকে দেখতে পেয়ে হাতছানি দিয়ে ডেকে বললেন, কাকাবাবু, আপনি আসুন, আপনার অভিজ্ঞতার কথা সবাই শুনতে চায়।

কাকাবাবু হাত নেড়ে জানালেন, তিনি যাবেন না। তার মাথার মধ্যে ঘুরছে। শুধু সেলিমের কথা। সে একজনকে খুন করবে। সে কাকে খুন করতে চায়, সেটা না জানলে তিনি লোকটিকে বাঁচাবার চেষ্টা করবেন কী করে? সেলিম কি আজ রাতেই কাজটা সেরে ফেলতে চায়? বোধহয় না। সে কাল সকাল পর্যন্ত সময় দিয়েছে তাঁকে এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য।

অনুষ্ঠান শেষে ইন্দ্রজিৎ দত্ত কাকাবাবুর সঙ্গে হোটেলে এলেন আড্ডা দিতে।

প্রথমেই তিনি বললেন, কাকাবাবু, বহরমপুরের মিটিং-এ আপনি মূর্তিগুলো সম্পর্কে যা বলেছিলেন, তাই-ই মিলে গেছে। বড় অষ্টধাতুর বিষ্ণু মূর্তিটা পাল আমলের। অন্য দুটো অত পুরনো নয়। কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ি থেকে একসময় চুরি গিয়েছিল। কলকাতার পণ্ডিতরাও সেই মত দিয়েছেন।

কাকাবাবু বললেন, যাক, তা হলে আর আমার কোনও দায়িত্ব রইল না।

ইন্দ্রজিৎ জিজ্ঞেস করলেন, আপনাদের মুর্শিদাবাদ বেড়ানো কেমন হচ্ছে?

কাকাবাবু বললেন, ওদের জিজ্ঞেস করো। জোজো ঠোঁট উলটে বলল, এমন কিছু দেখবার নেই। সবই তো ভাঙাচোরা বাড়ি!

ইন্দ্রজিৎ বললেন, তা ঠিক। হিরাঝিল, মোতিঝিল, এইসব দারুণ দারুণ বাড়ি কিছুই নেই। আশ্চর্য ব্যাপার, নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদ নাকি লন্ডনের মতন ছিল, এখন তা একেবারেই বোঝা যায় না। প্রায় সবই নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। এখন লোকে এই হাজারদুয়ারি আর কাটরার মসজিদই শুধু দেখতে যায়।

সন্তু বলল, জোজোর হাজারদুয়ারি পছন্দ হয়নি। ও আরও বড় বড় সব রাজবাড়ি দেখেছে। আমার কিন্তু ভাল লেগেছে খুব।

কাকাবাবু বললেন, এখানে আমির আলির নতুন বাড়িটাও দেখবার মতো। আচ্ছা, লখনউয়ের ব্যবসায়ী এখানে এসে অত বড় বাড়ি বানালেন কেন?

ইন্দ্রজিৎ বললেন, শুনেছি তো এই জায়গাটা ওঁর খুব পছন্দ। ভদ্রলোক খুব দান-ধ্যান করেন। এখানকার মানুষ ওঁকে খুব পছন্দ করে।

কাকাবাবু বললেন, আমার সঙ্গে আলাপ হয়েছে। সত্যিই ভাল লোক। ওঁর এক ছেলে সেলিমও এখানেই বেশিরভাগ থাকে।

ইন্দ্রজিৎ বললেন, হ্যাঁ, সেও অতি ভদ্র। সকলের সঙ্গে বিনীত ব্যবহার করে। আজ পর্যন্ত কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছে বলে শোনা যায়নি।

জোজো বলল, তা হতে পারে। কিন্তু ও লোকটা কাকাবাবুর কাছে ক্ষমা চায়নি।

ইন্দ্রজিৎ অবাক হয়ে বললেন, তার মানে? ক্ষমা চাইবার মতো কী কাজ করেছে সেলিম?

কাকাবাবু বললেন, সে কিছু না। অতি সামান্য ব্যাপার। জোজো, আমরা বলেছি না, ওটা আমরা ভুলে যাব?

ইন্দ্রজিৎ বললেন, ও কাকাবাবু, আপনি তো এখানে এসেই একটা দারুণ কাজ করে ফেলেছেন।

এবার কাকাবাবুর অবাক হওয়ার পালা। তিনি বললেন, আমি আবার কী দারুণ কাজ করলাম?

ইন্দ্রজিৎ বললেন, আপনি পুলিশকে খুব সাহায্য করেছেন।

কাকাবাবু আবার বললেন, পুলিশকে সাহায্য করেছি? কই, কিছু তো করিনি!

ইন্দ্রজিৎ বললেন, জাভেদ নামে একজন ইনস্পেক্টর এসেছিল, আপনি তাকে একটা টিপস দিয়েছেন, তাতেই তো মহম্মদি বেগের ছুরিটা উদ্ধার করা গেল।

কাকাবাবু বললেন, তাই নাকি?

ইন্দ্রজিৎ বললেন, ওটা চুরি যাওয়ার ঠিক আগে হাজারদুয়ারির সামনে একটা যাত্রাপার্টি এসে নানারকম বাজনা বাজিয়ে লড়াই-লড়াই খেলা দেখাচ্ছিল। আপনি সেই যাত্রাপার্টির খোঁজ নিতে বলেছিলেন। তাদের খোঁজ পেতেই সব ব্যাপারটা ফাঁস হয়ে গেল। সেই যাত্রাপার্টির লোকরা স্বীকার করেছে যে, কোনও একজন লোক তাদের বলেছিল, ঠিক ওই সময় ওই জায়গায় গিয়ে খেলাটা দেখাতে। ওই খেলা দেখার জন্য সকলে ভিড় করেছিল, হাজারদুয়ারির গার্ডরাও উঁকিঝুকি মারছিল, সেই সুযোগে চোর ওই ছুরিটা সরিয়ে ফেলে। সেই সূত্র ধরে কে টাকা দিয়েছিল, তাও জানা গেল। সেই লোকটা বলল, তাকে টাকা দিয়েছে অন্য একজন।

কাকাবাবু বললেন, চোর ধরা পড়েছে শেষ পর্যন্ত?

ইন্দ্রজিৎ বললেন, পুলিশ খুব ভাল কাজ করেছে, তবু একটু দেরি করে ফেলেছে। মূল টাকাটা যে দিয়েছিল, পুলিশ তার বাড়িতেও পৌঁছে গেল। সে বাড়িতে শুধু একজন কাজের লোক ছিল। সে বলল, পুলিশ আসার কিছুক্ষণ আগেই তিনজন লোক তার মালিকের কপালে বন্দুক ঠেকিয়ে ধরে নিয়ে গেছে। সে বাড়ি সার্চ করে অবশ্য ছুরিটা পাওয়া গিয়েছে।

কাকাবাবু বললেন, সামান্য একটা ছুরির জন্য এত কাণ্ড! কেন?

ইন্দ্রজিৎ বললেন, সেটা নিশ্চয়ই জানা যাবে। কারা ওকে ধরে নিয়ে গেল, সেটাও দেখতে হবে।

কাকাবাবু বললেন, সেই লোকটি কে? ইন্দ্রজিৎ বললেন, তার নাম ফিরোজ শাহ। হিন্দু না মুসলমান তা বোঝা যাচ্ছে না। এই ফিরোজ বেশির ভাগ সময় থাকে লন্ডনে। ওখানে ব্যাবসা করে। ও নাকি এখানকারই কোনও মেয়েকে বিয়ে করতে চায়। তাই আসে মাঝে মাঝে। ওর এক আত্মীয়ের একটা বাড়ি আছে এখানে। সেই আত্মীয়ও এখন বেঁচে নেই। একজন কাজের লোক নিয়ে একা থাকে।

সন্তু জিজ্ঞেস করল, ছুরিটা চুরি করতে গেল কেন?

ইন্দ্রজিৎ বললেন, সে তো ওকে জেরা না করলে জানা যাবে না। তবে অন্য লোকটি বলেছে, ওর নাকি নানা দেশের ছুরি জমানোর শখ। যারা ওকে ধরে নিয়ে গিয়েছে, তারা কিন্তু ছুরিটা নেয়নি, কিছুই নেয়নি। বোধহয় ওরা অপহরণ করেছে টাকার জন্য। এরকম তো প্রায়ই ব্যবসায়ীদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে।

জোজো বলল, অ্যাবডাকশন! এরপর টাকা চাইবে। কিন্তু চাইবে কার কাছে? ওর তো বাড়িতে একজন কাজের লোক ছাড়া আর কেউ নেই বললেন?

ইন্দ্রজিৎ বললেন, সেটাও ঠিক। দেখা যাক। পুলিশ এর মধ্যে তল্লাশি শুরু করেছে।

কাকাবাবু বললেন, ছুরিটা এখন কোথায়? থানায়? খুব সাবধানে রাখতে বলো। হয়তো এর মধ্যে অন্য কোনও ব্যাপার আছে!

কিছুক্ষণ পর খাবারের ডাক পড়ল।

আজ শুধু দুরকমের মাছ আর মিষ্টি দই। এ হোটেলের রান্না বেশ ভাল।

এখন হোটেলে বেশি লোক নেই, দোতলাটা প্রায় ফাঁকা। কাকাবাবুরা দুটো ঘর নিয়েছেন। সন্তুদের পাশের দুটো ঘর তালাবন্ধ।

খাওয়ার পর সন্তু আর জোজো বলল, ওরা একটু ঘুরে আসবে। রাত্তিরবেলা। হাজারদুয়ারি কেমন দেখায়, ওরা দেখতে চায়।

কাকাবাবু আপত্তি করলেন না। শুধু বললেন, একটু সাবধানে, চোখকান খোলা রাখিস। তোদের যদি কেউ অপহরণ করে, তা হলে টাকা চাইলে আমি তো দিতে পারব না। অত টাকা পাব কোথায়?

জোজো বলল, আমাদের যদি কেউ অপহরণ করে, তবে তার কপালে দুঃখ আছে।

কাকাবাবু হাসলেন, এটা জোজো ঠিকই বলেছে।

ওরা চলে যাওয়ার পর কাকাবাবু একা বসে রইলেন বারান্দায়।

একটু পরেই তিনি ঘোড়ার খুরের শব্দ পেলেন। সেলিম আজও ঘোড়া ছোটাচ্ছে? আর তো কাউকে ঘোড়া চালাতে দেখা যায়নি এখানে। ঘোড়াটা অবশ্য থামল না।

কাকাবাবুর মাথায় ঘুরছে সেলিমের কথা। অত বড় লোকের ছেলে, সকলে তাকে ভদ্র, ভাল ছেলে বলে জানে। অথচ সে একটা মানুষ খুন করতে চাইছে। কেন? সেটা কিছুতেই বোঝা যাচ্ছে না।

ইন্দ্রজিৎকে এই কথা জানিয়ে কোনও লাভ হত না। একটা খুন হলে তারপর পুলিশ তৎপর হয়ে ওঠে। কিন্তু খুন হওয়ার আগে তা নিয়ে পুলিশ মাথা ঘামাবে কেন? কত লোকই তো বলতে পারে, আমি অমুককে খুন করব। কিন্তু সত্যি সত্যি কজন খুন করে? সেলিমকে সবাই পছন্দ করে, শুধু শুধু পুলিশ তার উপরে নজরও রাখবে না।

সন্তুরা ফিরে এল ঘণ্টাখানেক পরে। দুজনেই ফুর্তিতে আছে বেশ।

আর-একটু গল্প করার পর কাকাবাবু বললেন, এবার তোরা শুয়ে পড়। কাল সকালে বেরিয়ে বাকি জায়গাগুলো দেখে নিতে হবে।

কাকাবাবু নিজের ঘরে এসে দরজা লক করে দিলেন। দরজাটা বেশ মজবুত, বাইরে থেকে খোলা যাবে না।

এ ঘরের তিনটে জানলা। তিনি সব জানলা বন্ধ করে ঘুমোতে পারেন না। প্রত্যেকটা জানলার কাছে দাঁড়িয়ে দেখলেন, একটা জানলার কাছে একটা গাছ আছে। অন্য দুটো জানলার কাছাকাছি কিছু নেই, একেবারে ফাঁকা। তিনি শুধু গাছের কাছের জানলাটা বন্ধ রাখলেন।

রিভলভারটা রাখলেন বালিশের নীচে। একটু পরেই তার ঘুম এসে গেল।

কাকাবাবুর ঘুম খুব পাতলা। সামান্য শব্দেই ঘুম ভেঙে যায়। একসময় ধুপ করে একটা শব্দ হতেই তিনি ধড়মড় করে উঠে বসলেন।

কোনও একটা জানলা দিয়ে একটা গোলমতন জিনিস এসে পড়েছে ঘরের মেঝেতে। অভ্যেসবশত কাকাবাবু সঙ্গে সঙ্গে রিভলভারটা হাতে নিয়ে জানলা দুটোর দিকে তাকালেন। সেখানে কেউ নেই।

গোলমতো জিনিসটা থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে! কাকাবাবু খাট থেকে নেমে এসে সোজা জিনিসটার কাছে এলেন। বোমা নাকি? ক্রমশ ধোঁয়া বাড়ছে। বোমা হোক আর যাই হোক, এটাকে এক্ষুনি ফেলে দিতে হবে। রিভলভারটা পকেটে রেখে তিনি জিনিসটা তুলতে গেলেন।

তখনই তাঁর মাথা ঘুরতে লাগল। পা দুটো দুমড়ে বসে পড়লেন মাটিতে। তিনি বুঝতে পারলেন, এটা ক্লোরোফর্মের ধোঁয়া। আর বেশিক্ষণ তিনি সজ্ঞানে থাকতে পারবেন না।

খুট করে শব্দ হল, কেউ চাবি দিয়ে খুলে ফেলল দরজা। ছায়ামূর্তির মতন তিনজন মানুষ ঢুকল ঘরে। কাকাবাবু দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু উঠে দাঁড়াতে পারছেন না। ওই গোল জিনিসটা তুলে ওদের দিকে ছুড়ে মারতে চাইলেন। কিন্তু হাত অবশ হয়ে গেছে। তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন মাটিতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *