০৩. জিনিসটির নাম সিগারেট

শীতের এক সকালে বেণ্টিঙ্ক নামক একটি জাহাজ এসে ভিড়লো কলকাতার পোতাশ্রয়ে। জাহাজটি এসেছে মান্দ্ৰাজ প্রেসিডেন্সি থেকে। অন্যান্য অনেকের সঙ্গে সেই জাহাজ থেকে নামলেন এক কালো রঙের পাক্কা সাহেব। হ্যাট, কোট, প্যান্ট, বুট জুতো পরিহিত। এঁর ওষ্ঠে সাদা লম্বা একটি পদার্থ, যার এক প্রান্ত থেকে ধূম উদগীরিত হচ্ছে। কাগজের মখ্যে তামাক পাকানো এই জিনিসটির নাম সিগারেট, কলকাতাবাসীর চক্ষে এ বস্তুটি নতুন।

এই কৃষ্ণকায় সাহেবটিই স্বৰ্গত উকিল রাজনারায়ণ দত্তের একমাত্র পুত্ৰ মধুসূদন। তবে মধু নামে যে উচ্ছঙ্খল, প্রতিভাবান, কোমল, হঠকারী, উদ্ধত যুবকটি এক সময় কলকাতা শহর মাতিয়ে তুলেছিল, সে আর নেই, তার বদলে ইনি একজন স্থূলকায়, মধ্যবয়সী, ক্লান্ত চেহারার পুরুষ। মধুসূদনের বয়েস এখন বত্ৰিশ, কিন্তু তাঁর চেহারায় যৌবনের দীপ্তি নেই, বরং এরই মধ্যে যেন প্রৌঢ়ত্বের ছাপা পড়েছে।

সুদীর্ঘ আট বৎসরকাল মধুসূদন মান্দ্রাজে প্রবাসী ছিলেন। একদা বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়পরিজন কারুকে কোনো সংবাদ না দিয়ে গোপনে তিনি কলকাতা পরিত্যাগ করেছিলেন, তখন বুকে কত আশা ছিল, ভবিষ্যতের কত পরিকল্পনা ছিল। তার কিছুই ফলেনি। আজ কলকাতার অনেকের চোখেই তিনি মৃত, জাহাজঘাটায় তাঁকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য একজনও দাঁড়িয়ে নেই। তবু মধুসূদন এদিক ওদিক তাকাতে লাগলেন, যদি একটিও চেনা মুখ চোখে পড়ে। কেউ নেই। ইতোমধ্যে কলকাতার অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে। মধুসূদন এখন কোথায় যাবেন, কোথায় থাকবেন, তারও ঠিক নেই। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মধুসূদন মালপত্র একটি ছ্যাকরা গাড়িতে তুলে বললেন, চলো ফেরীঘাট, বিশপস কলেজ মে যায়ে গা!

মান্দ্রাজে মধুসূদনের ভাগ্যে জুটেছে ব্যর্থতার পর ব্যর্থতা। খৃষ্টান হয়েছিলেন বিলাত যাবার লোভে, কিন্তু অদ্যাপি সে সুযোগ ঘটেনি। মান্দ্রাজে গিয়ে ভেবেছিলেন, ইওরোপীয় সমাজের সঙ্গে মিশে গিয়ে উচ্চ কোনো পদে নিযুক্ত হবেন। কিন্তু সেখানেও তাঁর নেটিভ আখ্যা ঘোচেনি, জীবিকার্জনের জন্য তাঁকে গ্ৰহণ করতে হয়েছিল সামান্য স্কুল মাস্টারি। কবি খ্যাতির মোহে রচনা করেছিলেন মিল্টনের অনুকরণে গাথা-কাব্য, তাঁর সেই ইংরেজি কাব্যের সমাদর হয়নি। কেউ কেউ পিঠ চাপড়ানি দিয়েছে মাত্র, কলকাতার সংবাদপত্র তাঁর রচনারীতি নিয়ে পরিহাস করেছে। মধুসূদন মনে করতেন বাঙালী মেয়েদের তুলনায় ইওরোপীয় রমণীরা শতগুণে শ্রেষ্ঠা, সেই মোহে মান্দ্রাজে যাবার অত্যন্নকালের মধ্যেই তাঁর ছাত্রীস্থানীয়া এক নীলকর সাহেবের কন্যা রেবেকাকে বিবাহ করেছিলেন। চারটি পুত্ৰ-কন্যার জন্ম দিয়েও সে বিবাহ সুখের হলো না, স্থায়ী হলো না। পুত্ৰ-কন্যা সমেত রেবেকাকে পরিত্যাগ করে আবার এক ফরাসী যুবতীর সঙ্গে পত্নীভাবে বসবাস করছিলেন।

কবি হতে গেলে পিতামাতার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে নেই, এই আহরিত বদ্ধমূল বিশ্বাসে মধুসূদন মান্দ্রাজে গিয়ে পিতামাতার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগই রাখেননি। প্রথম প্রথম বন্ধুবান্ধবদের চিঠি লিখতেন। যে প্রাণপ্রতিম সুহৃদ গৌরদাসকে একদিন না দেখলে থাকতে পারতেন না, প্রবাসে বিচ্ছিন্ন হয়ে সেই গৌরদাসকে প্রথম দিকে নিয়মিত উচ্ছ্বাসপূর্ণ চিঠি লিখতেন, তারপর এক সময় তাতেও ভাঁটা পড়লো। চোখের বার হলেই মনের বার হয়ে যায়। কলেজ জীবনের বন্ধুরা সকলেই সংসারী হয়ে নানা কর্মে ব্যাপৃত হয়ে পড়ে, আর সেই প্ৰাণের টান থাকে না। পর পর কয়েক বৎসরের নীরবতার পর কলকাতার অনেকের মনেই সন্দেহ দেখা দিল যে, মধু আর বেঁচে আছে কি নেই। সে যেমন যথেচ্ছাচারী, তার পক্ষে আকস্মিক মৃত্যু অসম্ভব কিছু নয়।

একমাত্র গৌরদাসের ভালোবাসাই অকৃত্রিম এবং একনিষ্ঠ। তিনি একদিনের তরেও তাঁর প্রিয় বন্ধু মধুকে ভোলেননি। এই আট বৎসর ধরেও মধুর জন্য তিনি ব্যাকুল হয়ে আছেন। পত্র লিখেও মধুর কাছ থেকে উত্তর না পেয়ে তিনি হাল ছাড়েননি। মান্দ্রাজের ইংরেজি পত্রপত্রিকা আনিয়ে তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে দেখেন, তাতে মধুর কোনো লেখা আছে কি না। অনেক লেখাতেই মধু নিজের নাম দেয় না, কিন্তু রচনারীতি গৌরদাসের এতই পরিচিত যে গৌরদাস একটি লাইন দেখলেও চিনতে পারবেন।

খৃষ্টান হবার পর মধুসূদন প্রায় পাঁচ বৎসর কাটিয়েছেন বিশপস কলেজের ছাত্রাবাসে। তারপর আট বৎসর মান্দ্রাজে। এই এক যুগের অধিককাল কলকাতার জীবনের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। এই সময়ের মধ্যে এ দেশে ও সমাজে যে বিরাট পরিবর্তন এসেছে, মধু তার কোনো সন্ধানই রাখেন না।

পুত্ৰ-বিরহে জাহ্নবী দেবী ধরাধাম পরিত্যাগ করে চলে গেছেন অকালে। ক্রুদ্ধ উন্মত্ত রাজনারায়ণ জাহ্নবী দেবী জীবিত থাকতেই পার পর শিবসুন্দরী, প্ৰসন্নময়ী এবং হরকামিনী নামে তিনটি সদ্বংশীয়া রূপলাবণ্যবতী কন্যার পাণি গ্ৰহণ করেন। আর একটি পুত্র তাঁর চাই-ই, বিধমী মধুকে তিনি ত্যাজ্য করেছেন, তার হাতের জল তিনি নেবেন না। এবং অপুত্ৰক অবস্থায় মৃত্যুর পর পুন্নাম নরকে তিনি কিছুতেই যেতে রাজি নন। কিন্তু পুত্ৰ-বিরহের ওপর সপত্নী-জ্বালায় পীড়িত হয়ে জাহ্নবী দেবী অভিশাপ দিয়েছিলেন স্বামীকে, আমি যদি সতী হই, তবে আর কোনো পত্নী দ্বারা তোমার সন্তান উৎপন্ন হবে না। শেষ পর্যন্ত হলোও তাই, দ্বিতীয় পুত্রের মুখ দেখা ভাগ্যে ঘটলো না, নিদারুণ মনস্তাপ নিয়ে রাজনারায়ণ এক সময় মৃত্যুবরণ করলেন।

পিতার মৃত্যুসংবাদ মধুসূদনের কানেও পৌঁছোয়নি এক বৎসরের মধ্যে। আত্মীয়-জ্ঞাতিরা রাজনারায়ণের বিষয় সম্পত্তি গ্রাস করে নেওয়ার জন্য চুলেচুলি শুরু করেছিল। তারা রটিয়ে দিয়েছিল যে মধুসূদন মৃত, সুতরাং নিকট জ্ঞাতিরাই সম্পত্তি ভাগ বাটোয়ারা করে নেবে। তাছাড়া, সে জীবিত থাকলেই বা কী, হিন্দু আইনে বিধমী সন্তান পিতৃ সম্পত্তির অধিকার হারায়। সেই কারণেই নিম্নবর্ণের, দরিদ্র শ্রেণীর হিন্দুরাই সাধারণত মুসলমান বা খৃষ্টান হয়েছে, অবস্থাপন্ন, ধনী হিন্দুরা সহসা ধর্মান্তরিত হয় না। তবে সম্প্রতি খৃষ্টান মিশনারীদের প্ররোচনায় সরকার লেকসালোসি নামে এক আইন প্রণয়ন করেছেন, এই আইন বলে ধর্মান্তরিত পুত্র পৈতৃক সম্পত্তির দাবীদার হতে পারে। তবে এ পর্যন্ত অবশ্য কেউ এই নতুন আইনের প্রয়োগ পরীক্ষা করেনি।

রাজনারায়ণের নিজস্ব বাসগৃহটিও অন্যেরা দখল করে নিচ্ছে শূনে ব্যাকুল হয়ে উঠলেন গৌরদাস বসাক। এ বাড়ি মধুর প্রাপ্য। অথচ কোথায় মধু? সে সময় রেভারেণ্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় কোনো কাৰ্য উপলক্ষে মান্দ্রাজে যাচ্ছিলেন, তাঁর হাতে মধুর নামে একটি চিঠি দিয়ে গৌরদাস তাঁকে অনুরোধ করলেন যে প্রকারে হোক মধুকে খুঁজে বার করতে। কৃষ্ণমোহনের মাধ্যমেই আবার কলকাতার সঙ্গে মধুসূদনের যোগসূত্র স্থাপিত হলো।

মধুসূদন কলকাতায় এসেছেন অর্থ সংগ্রহের আশায়। মান্দ্রাজে দারিদ্র্য তাঁকে পীড়া দিয়েছে। পিতার কতখানি এবং কী প্রকার সম্পত্তি আছে, সে সম্পর্কে মধুসূদনের কোনো ধারণা নেই। পুত্রের মতন রাজনারায়ণও ছিলেন বিলাসী, ভোগী পুরুষ। যাদৃচ্ছিা দু হাতে অর্থ উড়িয়েছেন। মান্দ্রাজে। দ্বিতীয়া পত্নীকে রেখে মধুসূদন এক জাহাজ ভাড়ার ঝুঁকি নিয়ে কলকাতায় এসেছেন এই উদ্দেশ্যে যে, পৈতৃক সম্পত্তি যদি কিছু পাওয়া যায়, তবে তা বিক্রয় করে সংগৃহীত অর্থ নিয়ে আবার ফিরে যাবেন মান্দ্রাজে।

কলকাতায় তাঁর থাকার কোনো জায়গা নেই। তাঁর মতন। খৃষ্টানকে কোনো হিন্দু বন্ধু স্বগৃহে আশ্রয় দেবে কিনা, সে সম্পর্কে ঘোর সন্দেহ আছে। সেই জন্যই মধুসূদন সোজা গিয়ে উঠলেন বিশপস কলেজে রেভারেণ্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোয়াটারে। পৌঁছেই দ্রুত চিঠি পাঠালেন গৌরদাস বসাকের কাছে।

গৌরদাস পত্রপাঠ হাজির। বহুকাল পর দুই বন্ধুতে দেখা।

মধুসূদন আগের মতন আর ছুটে গিয়ে গৌরদাসকে আলিঙ্গন করে তাঁর গণ্ড চুম্বনে সিক্ত করলেন না। শুধু উঠে দাঁড়িয়ে গৌরদাসের প্রসারিত দক্ষিণ হস্ত ধরে ঝাঁকুনি দিতে দিতে বললেন, অ্যাডসুম! আই অ্যাম হিয়ার!

বিস্ময়ে বেদনায় গৌরদাস বললেন, এ কী চেহারা তোর হয়েছে, মধু!

গৌরদাসের চোখে ভাসে সেই ছিপছিপে কৃষ্ণবর্ণ যুবকটির শরীর। তার বদলে মধু যে এখন শুধু স্থূলাকার হয়েছে তাই-ই নয়, মুখখানি ফোলাফোলা, চোখের নীচে গভীর কালো দাগ, সবঙ্গে অমিতাচারের ছাপ। কণ্ঠস্বর ভাঙাভাঙা।

মধুসূদন হেসে বললেন, বাটু গাউর, ইউ আর অ্যাজ হ্যান্ডসাম অ্যাজ এভোর। গৌরদাসেরও পরিবর্তন হয়েছে অনেক, কালপ্রবাহ কারুকেই স্পর্শ দিতে ভোলে না। গৌরদাস এখন সম্ভ্রান্ত গৃহস্থ, উচ্চপদস্থ চাকুরে, হিন্দু কলেজের অন্যান্য মেধাবী ছাত্রের মতন তিনিও এখন একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। এরই মধ্যে তাঁর দুবার পত্নী বিয়োগ হয়েছে, সেই শোকের ছাপ আছে তাঁর চোখে। তবে তাঁর মুখশ্ৰী প্ৰায় আগের মতনই সুন্দর বটে।

মধুসূদন সমস্ত কথাবার্তাই বলছেন ইংরেজিতে। বাংলা তিনি প্রায় ভুলেই গেছেন। গৌরদাসকে চিঠি পাঠিয়ে তিনি ছটফট করছিলেন। কৃষ্ণমোহনের বাড়িতে মদ্যপানের সুবিধে নেই, পাদ্রীকৃষ্ণমোহন ও ব্যাপারের ঘোর বিরোধী।

মধুসূদন বললেন, চল গাউর, আমরা কোথাও যাই। আর কিছু না হোক, শহরটা একবার ঘুরিয়া দেখিয়া আসি।

গৌর বললেন, আমি গাড়ি এনিচি। আগে খিদিরপুরে যাবো। তোর নিজের বাড়ি দেকবার সাধ হয় না?

—আমায় সে বাড়িতে ঢুকিতে দিবে?

—কেন দেবে না? দু-একদিন আগে গিয়ে আমি হাম্বিতম্বি করে এসিচি। প-বাবু আর বা-বাবুকে বলে দিইচি, খবরদার, মধু শিগগিরই এসে পড়বে, তার আগে আপনারা কিছুটি করবেন নাকো!

—সে কি, তুই আমার আগমন বাত চতুর্দিকে রটাইয়া দিয়াছিস নাকি? আমি কিছুকাল সংগোপনে থাকিতে চাই।

—না, আরকারুকে বলিনি। তবে, এত গোপনতাই বা কেন? বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দেকা করবিনি?

—আমার লজ্জা হয়, গাউর। পূর্বে সগৌরবে উন্নত মস্তকে হেথায় পরিভ্রমণ করিতাম। এখন আসিয়াছি। ভিখারির মতন।

—কে বলে তুই ভিকিরি! তুই আমাদের সকলের প্রিয় সেই মধু!

—তোদের সকলের প্ৰিয় হইবার মতন আমার আর কী আছে বল, গাউর।

—তুই আমায় গাউর গাউর করিসনি তো। গৌর বলা! সব বিষয়ে ইংরেজি কেতা ধরিচিস বলে কি আমাদের নামগুলোও ইংরেজি করে ফেলবি!

—সরি, আই অ্যাম প্রফিউজলি সরি, মাই ডিয়ারেস্ট গৌর। বাঙ্গালা আমার মুখে একেবারেই আইসে না।

—তোকে আমি চিঠিতে অনেকবার লিকিচিলুম যে, তুই বাংলা শেখ। বাংলা ছাড়া আমাদের আর গতি নেই। তোর কবিত্বশক্তি তুই বাংলায় প্রয়োগ কর।

—সে আর এ জীবনে হইবে না! বন্ধুদের সংবাদ কী বলা ভূদেব, বন্ধু, ভোলানাথ, রাজনারায়ণ, লতিফ ইহারা সব কে কেমন রহিয়াছে। উহারা আমাকে মনে রাখিয়াছে কি?

—কেন মনে রাকবে না? দেকা হবে, আস্তে আস্তে সবার সঙ্গেই দেকা সাক্ষাৎ হবে। তবে রাজনারায়ণ এখুন থাকে মেদিনীপুরে।

—আর গঙ্গানারায়ণ? দ্যাট শাই, ইনট্রোভার্ট ফেলো? আমি উহাকে খুব পছন্দ করিতাম।

—গঙ্গানারায়ণ তোরই মতন বহুদিন নিরুদেশ। কেউ তার খবর জানে না।

গৌরদাসের জুড়ি গাড়ি অপেক্ষা করছিল গঙ্গার এ পারে। দুই বন্ধুতে নৌকোয় নদী পেরিয়ে এসে সেই গাড়িতে উঠলো। খিদিরপুরের কাছাকাছি আসবার পর মধুসূদন হঠাৎ গৌরদাসের হাত চেপে ধরে বললেন, না, গৌর, আমি যাইব না! ঐ গৃহে আমার মাতা প্ৰাণ বিসর্জন দিয়াছেন, সেই শূন্য ভবনে আমি কোন প্ৰাণে প্রবেশ করিব?

গৌরদাস ঈষৎ শ্লেষের সঙ্গে বললেন, এতদিন বুঝি মায়ের কতা মনে ছেল না? মৃত্যুশয্যায় একবার তো দেকা দিতেও আসিসনি!

মধুসূদন ভগ্নকণ্ঠে বললেন, সত্যই আমি অপরাধী। আমি কৃতঘ্ন! তুই আমাকে যা বলিবি বল।

মধুসূদনের দু চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়াতে লাগলো। সাহেব মানুষদের যে যেখানে সেখানে চক্ষের জল ফেলতে নেই, সে কথা খেয়াল রইলো না তাঁর।

এক সময় মধু এ বাড়ির সামনে গাড়ি থেকে নামলেই তিন চারজন ভৃত্য ছুটে আসতো তার হুকুম শোনবার জন্য। আজ সেখানে দ্বারবান, ভৃত্য একজনও নেই। বাড়ির ভিতরটা যেন খাঁ খাঁ করছে! মনে হয় জনশূন্য।

সিঁড়িতে পা দিয়ে মধুসূদন আবার কাতর হয়ে পড়লেন। এককালে তিনি সুহৃদদের নিয়ে কত প্রমোদ রঙ্গ করেছেন এ বাড়িতে, এখানে কত প্রিয় স্মৃতি লেগে আছে। আজ সব কিছুই যেন ভগ্নদশা। নড়বড় করছে সিঁড়ির রেইলিং। এক সময় চতুর্দিকে ঝাড়বাতি জ্বলতো, এখন ছিন্ন ছিন্ন অন্ধকার বুলিছে মাথার ওপরে।

গৌরদাস হাঁক দিলেন, কই, কে আছো? কেউ এখানে আছো?

কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। যেন পরিত্যক্ত, হানা বাড়ি।

গৌরদাস বললেন, আর তা হলে ওপরে গিয়ে কাজ নেই। বরং দিনের বেলায় আর একদিন আসা যাবেখন।

মধুসূদন বললেন, একবার আমার শয়ন কক্ষটি দেখিব।

গৌরদাস বললেন, এই অন্ধকারের মধ্যে আর সেখানে কী দেকবি!

মধুসূদন বললেন, একবার স্বহস্তে দেওয়ালগুলি স্পর্শ করিব। দেখিতে চাই, উহারা আমাকে চিনতে পারে কি না!

উভয়ে উঠে এলেন দ্বিতলে। অলিন্দটি পুরোপুরি অন্ধকার নয়, সম্মুখস্থ অপর একটি অট্টালিকার আলোকচ্ছটা কিছুটা এসে পড়েছে সেখানে কিছুকাল আগেও এ অঞ্চল জনবিরল ছিল, এখন অনেক বাড়ি উঠছে।

মধুর ঘরের দ্বারটি ভেজানো, একটু ঠেলা দিতেই খুলে গেল। ভিতরে আসবাবপত্র কিছুই নেই, কারা যেন নিয়ে গেছে সে সব। শুধু চারটি শূন্য দেওয়াল। এক সময় এখানে স্তুপীকৃত হয়ে থাকতো মধুর বইপত্র, যেখানে সেখানে ছড়ানো থাকতো তার রকমারি পোশাকআশাক।

গৌরদাসের কাঁধে ভর দিয়ে মধুসূদন আবার ক্ৰন্দন করতে লাগলেন। ভগ্নকণ্ঠে বারবার বলতে লাগলেন, গৌর, কী ছিল, আর কী হইল! সেইসব দিন কোথায় গেল? মনে পড়ে, এই কক্ষে, এক পালঙ্কে তুই আর আমি একত্ৰ শয়ন করিয়াছি! কী উন্মাদের মতন ভালোবাসিয়াছি তোকে, কোনো নারীর প্রতিও এত আকর্ষণ বোধ করি নাই–

গৌরদাস চমকিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, কে?

দ্বারের সামনে এক শ্বেতবসনা মূর্তি। গৌরদাসের প্রশ্নেও সেই মূর্তি নিথর নীরব।

কান্না থামিয়ে মধুসূদনও ভয় পেয়ে গেলেন; অন্ধকারের মধ্যে ঐ মূর্তিটি হঠাৎ এলো কী করে? যেন অপার্থিব কোনো কিছু—

গৌরদাস আবার জিজ্ঞেস করলেন, কে?

কোনো উত্তর নেই।

তখন গৌরদাস সাহস করে এগিয়ে গিয়ে ভালো করে দেখে বললেন, ও আপনি? সারা বাড়ি অন্ধকার কেন?

মধুসূদনের তখনো ভয় কাটেনি। তিনি বারবার প্রশ্ন করতে লাগলেন, কে? গৌর, কে?

মধু কলকাতা ত্যাগ করার পরও গৌরদাস কয়েকবার এসেছেন এ বাড়িতে। জাহ্নবী দেবীর মৃত্যুশয্যায় গৌরদাস এসে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। মধুর চেয়ে এ বাড়ির সংবাদ তিনি অনেক বেশী রাখেন।

গৌরদাস বললেন, ইনি হরকামিনী দেবী। মধু, ইনি তোমার একজন জননী।

মধুসূদন ঈষৎ বিরক্তভাবে বললেন, অন্ধকারে প্ৰেতাত্মার মতন উনি দাঁড়াইয়া রহিয়াছেন কেন? কথা কহেন না কেন?

গৌরদাস বললেন, শোকে দুঃখে উনি অমন স্তব্ধ হয়ে গ্যাচেন।

মধুসূদন বললেন, আমার আবার কয়টি জননী? ইঁহাকে আমি কক্ষনো চক্ষে দেখি নাই!

গৌরদাস বললেন, ইনি তোমার বাপের চতুর্থ পত্নী। আমি এনাকে আগে দেকিচি।

গৌরদাস সেই রমণীকে জিজ্ঞেস করলেন, মা, আপনার এখানে বাতি নেই? আপনি এখেনে একা একা রয়েচেন কেন? বাড়িতে আর কোনো লোকজন নেই?

এবার মহিলা বললেন, একজন চাকর থাকে, তাকে বাজারে পাঠাইছি। আপনেরা খাড়ান, আমি বাতি নিয়া আসি।

অনতিবিলম্বেই মহিলা একটি সেজবাতি নিয়ে এলেন হাতে ঢেকে। সেই আলোয় দেখা গেল। রমণী অতি অল্প বয়সিনী, ষোড়শী বা সপ্তদশী বড় জোর, বৈধব্যের কারণে মাথার চুল অতি ছোট করে ছাঁটা। মুখখানি দেখলে মনে হয়, যেন বিষাদ প্রতিমা।

হরকামিনী ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কে? কোথা থানে আসছেন?

গৌরদাস মধুসূদনের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ইনি আপনার পুত্র, এর নাম মধু, বোধ করি আপনি এর কতা শুনে থাকবেন।

হরকামিনী ঠিক উন্মদিনীর মতন এক পা এক পা করে এগিয়ে এসে হাতের বাতিটি মধুসূদনের মুখের সামনে তুলে অদ্ভুত করুণ স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি মধু? এতদিন পরে এলে? সব যে শেষ বাবা!

তারপরই তিনি ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠে বললেন, ওগো আমার আর কেউ নাই! আমি কোথায় যাবো?

মধুসূদন বিব্রত হয়ে এক পা পিছিয়ে গেলেন। অপরের কান্না তিনি সহ্য করতে পারেন না। তিনি গৌরদাসকে বললেন, গৌর, তুই এই রমণীকে অনুবাদ করিয়া বুঝাইয়া বলিয়া দে যে, আমি উহাকে বলিতেছি, মাতা, আপনি এই গৃহে যতদিন খুশী অবস্থান করুন।

গৌরদাস বললেন, তুই কি বাংলায় মা অবধি বলতে ভুলে গিচিস? তুই নিজের মুখে বল, মা, আপনি থাকুন!

নিজের প্রায় অর্ধেক বয়েসী এক যুবতীকে মাতৃ সম্বোধন করে মধুসূদন সেই কথাই জানালেন।

হরকামিনীর সত্যিই পাগল-পাগল দশা। মধুসূদনের মুখের বিকৃত বাংলা তিনি বুঝতে পারছেন না। ক্ৰন্দন করতে করতে তিনি মধুসূদনকে আলিঙ্গন করতে এলেন। মধুসূদন অতিকষ্টে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললেন, গৌর, ইহাকে বুঝাও, এ গৃহ হইতে কেহ ইহাকে সরাইবে না!

তারপর আর বিলম্ব না করে বেরিয়ে এলেন সে ঘর থেকে।

এর কয়েকদিন পর গৌরদাস একদিন নিজের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করলেন কয়েকজন বন্ধু ও কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিদের। এই উপলক্ষে তিনি মধুসূদনকে কলকাতার বিদ্বজ্জন সমাজে পরিচয় করিয়ে দিতে চান।

মধুসূদনের বিষয় সম্পত্তির নিষ্পত্তি করতে অনেক সময় লাগবে। এদিকে তিনি একেবারে কপর্দকশূন্য। কিছু একটা রোজগারের সুরাহা না হলে তাঁর পক্ষে কলকাতায় থাকা অসম্ভব। দুরাত্মা আত্মীয়রা কোথা থেকে একটি জাল উইল দাখিল করেছে, সুতরাং সম্পত্তি এখন গভীর জলে। তাছাড়া, গৌরদাসের আন্তরিক বাসনা, মধু আর মান্দ্রাজে না ফিরে কলকাতাতেই থেকে যাক।

সেই আসরে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত রয়েছেন প্যারীচাঁদ মিত্রের ছোট ভাই কিশোরীচাঁদ মিত্ৰ। তিনি পুলিশ কোর্টের জুনিয়র ম্যাজিস্ট্রেট। তাঁর স্ত্রী খিদিরপুরের মেয়ে, এক সময় মধুসূদনের বাড়িতে যাতায়াত করতেন এবং তাঁকে মধুদাদা বলে সম্বোধন করতেন। খিদিরপুরের বাড়ি নিয়ে মামলা বেধেছে বলে মধুসূদনের এখন কলকাতায় অবস্থানের কোনো স্থিরতা নেই। কিশোরীচাঁদের সহধর্মিণী স্বামী মারফত বলে পাঠিয়েছেন যে, মধুসূদন তাঁদের দমদমের বাগান বাড়িতে এসে থাকতে পারেন। সেখানে অতি সুন্দর উদ্যান রয়েচে এবং অনেকগুলি কক্ষসমন্বিত একটি বাড়ি। কিশোরীচাঁদ সাগ্রহে মধুসূদনকে তাঁর বাড়িতে অতিথি হবার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন।

শুধু তাই নয়, কিশোরীচাঁদ বললেন, পুলিশ কোর্টে তাঁর অধীনে একটি কেরানীর পদ খালি আছে। মধুসূদন ইচ্ছে করলে সেই চাকুরিটি নিতে পারেন।

গৌরদাস প্রমুখ অনেকেই এ প্রস্তাবকে সোল্লাসে স্বাগত জানালেন। এই তো মধুর চমৎকার হিল্লে হয়ে যাবে।

মধুসূদনের মুখখানি বিবৰ্ণ হয়ে গেল। কেরানীর চাকরি। এদের এতদূর স্পর্ধাযে তাঁকে এমন প্রস্তাব দিতে পারে! যে ব্যক্তি বাইরন বা স্কটের মতন লেখক হতে চায়, সে করবে পুলিশ কোর্টে কেরানীর চাকরি?

কিশোরীচাঁদ বললেন, বেতন নেহাত মন্দ না, আপাতত একশত কুড়ি টাকা দেবে, ভবিষ্যতে পদোন্নতির আশা আছে।

গৌরদাস বললেন, তুই চুপ করে আছিস যে মধু? কিশোরীচাঁদবাবু অতিশয় সহৃদয় মানুষ।

কিশোরীচাঁদ বললেন, আপনি আমার গাড়িতে আমার সঙ্গেই যাতায়াত করতে পারবেন, মিঃ ডাট্‌।

মধুসূদন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এরা ধরেই নিয়েছে যে, এই চাকরি তাঁর মতন একজন বেকারের পক্ষে লোভনীয়। যাতায়াত ও বাসগৃহেরও অসুবিধে নেই। পকেট শূন্য। এর মধ্যেই মধুসূদনকে পর-মুখাপেক্ষী হতে হয়েছে। ঋণ করতে হয়েছে কয়েকজনের কাছে। আর উপায় কী! মধুসূদন, বললেন, ইহা তো আমার পক্ষে পরম সৌভাগ্যের কথা!

মধুসূদন চলে গেলেন দমদমের বাগান বাড়িতে। কিশোরীচাঁদের সঙ্গে রোজ অফিসে যাতায়াত করেন। কিশোরীচাঁদ অবশ্য মোটেই তাঁর সঙ্গে কর্মচারীর মতন ব্যবহার করেন না, তিনি ঠিক বন্ধুর মতন।

দমদমের এই বাগান বাড়িতে প্রায়ই অনেকে আলাপচারির জন্য আসেন। প্রচুর পানাহার, তর্কবিতর্ক, সঙ্গীত ও সাহিত্যচৰ্চা হয়। মধু এমনিতে বেশ মজলিশী স্বভাবের, নানাপ্রকার গল্পগুজবে তাঁর জুড়ি নেই, মুখে মুখে এখনো তিনি ইংরেজি কবিতা বানাতে পারেন, কিন্তু এক এক সময় তাঁর খুব অসুবিধে হয়। অহংকারী মধুর তখন নিজেকে মনে হয়, বকের দলের মধ্যে এক হংস। সেই সময় তিনি চুপ করে শুধু সুরার গেলাসের দিকে মনঃসংযোগ করেন।

কিশোরীচাঁদের এই বাড়িতে অনেক কৃতবিদ্য ব্যক্তি আসেন। এঁরা ইংরেজি সাহিত্যে ডাকসাইটে পণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও আজকাল প্ৰায়ই কথা বলেন বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে। রামগোপাল ঘোষ, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, রামতনু লাহিড়ী, প্যারীচাঁদ মিত্র প্রমুখকে মধুসূদন ছাত্র বয়েস থেকেই চেনেন, এঁরা হিন্দু কলেজের গোড়ার যুগের ছাত্র, ডিরোজিওর প্রত্যক্ষ শিষ্য, এ দেশে পশ্চিমী ধ্যানধারণা তো ছড়িয়েছেন। এরাই। আর ইদানীং এরা মেতেছেন বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে। কেউ কেউ আবার প্যান্ট কোট ছেড়ে ধুতি-মেরজাই-চাদর পরে দিশিবাবু সেজে আসেন। কে এক ঈশ্বরচন্দ্ৰ বিদ্যাসাগর নাকি বিধবাদের বিয়ে দেবে বলে মেতেছে, সে সম্পর্কেও এদের দারুণ উৎসাহ! প্ৰায়ই সে প্রসঙ্গ আসে, আর ঐরা তখন রৈ-রৈ করে ওঠেন এবং প্রখ্যাত রাজা রাধাকান্ত দেবের মুণ্ডপাত করেন। মধুসূদনের এ সময়ে কথা বলার কিছুই থাকে না। হিন্দুরা বিধবাদের পুনর্বিবাহ দিতে পারবে, এ তাঁর বিশ্বাস হয় না। এই যে সেদিন তাঁর তরুণী বিমাতা হরকামিনীকে দেখে এলেন, তাঁর তো সারা জীবনটাই নষ্ট হয়ে গেল। হিন্দুরা পারবে ঐ অসহায় বিধবাকে কোনো সুপথ দেখাতে?

একদিন হঠাৎ কিশোরীচাঁদের দাদা প্যারীচাঁদ মিত্রের সঙ্গে মধুসূদনের বাকদ্বন্দ্ব বেধে গেল। সন্ধ্যায় বাগানবাড়ির এক প্রান্তে সরোবরের বাঁধানো ঘাটে আসর বসেছে। আজও কথা চলছে বাংলা ভাষার বইপত্র বিষয়ে। প্যারীচাঁদের বন্ধু, মাউন্ট এভারেস্টের সূত্রে প্রখ্যাত রাধানাথ সিকদার এখন আপন যত্নে বাংলা শিক্ষা করে নিয়েছেন এবং নিজে লিখছেনও কিছু কিছু। রাধানাথ ও প্যারীচাঁদ যুগ্মভাবে প্ৰকাশ করছেন একটি পত্রিকা, স্ত্রীলোক এবং অল্পশিক্ষিতরাও যাতে পড়ে বুঝতে পারে এমন সরল বাংলায় সেখানে সব কিছু লেখা হয়, পত্রিকাটির নামটিও অতি সরল, মাসিক পত্রিকা। মধুসূদন কিশোরীচাঁদের কাছ থেকে নিয়ে দু-একবার উল্টে দেখেছেন সে পত্রিকাটি। তাঁর বিবমিষা হয়েছে। সে পত্রিকায় প্যারীচাঁদ ধারাবাহিকভাবে লিখছেন একটি উপন্যাস, নাম আলালের ঘরের দুলাল, ছোটলোক চাঁড়ালদের মতন ভাষায় লেখা। অথচ সেই লেখাঁটির জন্যই নাকি তুমুল সোরগোল পড়ে গেছে। সারা দেশে।

মধুসূদন বিরক্তি সহকারে শুনছিলেন ওঁদের কথাবার্তা, খানিক বাদে নেশার মাত্রা কিছুটা চড়লে তিনি ইংরেজিতে বলে উঠলেন, হোয়াট ট্র্যাস ইউ আর রাইটিং, প্যারীচাঁদবাবু? ইহা কি ভদ্রলোকের ভাষা? গৃহ মধ্যে লোকে দাস-দাসীদের সহিত যে ভাষায় কথা বলে, তাহাও কি আপনি সভ্যসমাজে আনিতে চান! গৃহ মধ্যে আপনি যেমন তেমন পোশাকে থাকিতে পারেন, গামছা জুড়াইয়াও ঘুরিতে পারেন, কিন্তু ভদ্রমণ্ডলীতেও কি সেই পোশাক পরিধান করিয়া আসিবেন?

প্যারীচাঁদ চমকিত হয়ে তাকালেন মধুসূদনের দিকে। তারপর একটু কৃপার হাস্য দিয়ে বললেন, আমরা কথা বলছি বাংলা সাহিত্য নিয়ে, আপনি সে বিষয়ে কিছু বুঝবেন না, মিঃ ডাট।

মধুসূদন তবুও বললেন, আমি আপনার ঐ পত্রিকার রচনা পাঠ করিয়াছি। উহা কি সাহিত্য? এইরূপ ভাষায় সাহিত্য হয়? বাংলা তো জেলে-জোলা-তাঁতীদের ল্যাঙ্গোয়েজ! সংস্কৃত হইতে প্রচুর শব্দ আমদানি করিয়া তবু এই ভাষাকে কিছুটা ভদ্রস্থ করা যাইতে পারে।

প্যারীচাঁদ বললেন, মিঃ ডাটু, আমি বলচি, শুনে রাখুন। সংস্কৃতের দিন গ্যাচে। এই যে খাঁটি চলতি মুখের ভাষা আমি ব্যবহার করচি, দোকবেন একদিন সবাই আমার এই ভাষাতেই লিকবে, আমার প্রবর্তিত এই ভাষা বঙ্গে চিরস্থায়ী হবে!

মধুসূদনও তৎক্ষণাৎ সগর্বে বললেন, মোটেই তাহা নহে। ছিছি, সাহিত্য একটি পবিত্র জিনিস, তাহা লইয়া আপনারা বাল-ক্রীড়া করিতেছেন! এই কুৎসিত বাংলা ভাষায় যদি কিছু রচনা করিতেই হয় তবে অগ্ৰে ইহার উন্নতি করিতে হইবে। দেখিবেন, আমি যে ভাষার সৃষ্টি করিব, তাহাই হইবে চিরস্থায়ী।

—আপনি ভাষা সৃষ্টি করবেন? কোন ভাষা? ল্যাটিন, গ্ৰীক, তামিল?

-না, বাংলা।

সকলে সমস্বরে হো-হো করে হেসে উঠলো। হাসির কথাই বটে, যে ব্যক্তি ইংরেজি ছাড়া বাংলাতে কথাই বলে না, দু-চারটি বাংলা শব্দ উচ্চারণ করতে গেলেও ভুল করে, সে কিনা বড়াই করে বাংলা ভাষা সৃষ্টি করার!

প্যারীচাঁদ বিদ্রুপ করে বললেন, আপনি বাংলা লিকবেন? কোন কালে? এই কলিকালে, না সত্যযুগে?

মধুসূদন গুম হয়ে রইলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *