০২. পুরু এ বাড়িতেই থেকে গেছে

পুরু এ বাড়িতেই থেকে গেছে। সন্তুর কাছে সে ভাল করে বাংলা শিখবে।

পুরু কোনওদিন ট্রামে চাপেনি। ভিড়ের বাস দেখলে সে আঁতকে ওঠে। রাস্তা পার হওয়ার সময় সে সন্তুর হাত চেপে ধরে থাকে।

সন্তু জিজ্ঞেস করে, তোমাদের দেশেও তো অনেক গাড়ি। সেখানে রাস্তা পার হও কী করে?

পুরু হাসে। রাস্তায় সে তো গাড়িতেই থাকে। ওদের ওখানে রাস্তা দিয়ে বিশেষ কেউ হাঁটে না। সবাই গাড়ি চেপে পার্কে গিয়ে সেখানে হাঁটে কিংবা দৌড়ায়।

সন্তু বলে, তার মানে, তোমাদের দেশে পথিক নেই?

বুঝতে না পেরে পুরু জিজ্ঞেস করে, হোয়াট ইজ পথিক?

সন্তু বলে, রাস্তার আর-একটা নাম পথ। পথ দিয়ে যারা হাঁটে, তারা পথিক। তুমি আর আমি এখন পথিক।

পুরু বলে, পথিক। পথিক। বাঃ। আই অ্যাম আ পথিক। সাউন্ডস গুড!

সন্তু বলে, উঁহুঃ, অত ইংরিজি বললে তো চলবে না। তোমার বাবা বারণ করেছেন। সাউন্ডস গুড, বাংলায় কী হবে?

পুরু বলল, ভাল শব্দ হয়।

সন্তু বলল, না, ঠিক হল না। শুনতে ভাল লাগে।

পুরু জিজ্ঞেস করল, ওই লোকটি কী সেল করছে?

সেল নয়। বিক্রি। ও ফুচকা বিক্রি করছে।

পুচকা?

পুচকা নয়, ফুচকা।

ফুসকা?

ফুসকা শুনলে মনে হবে ফোসকা! ফোসকা নয়, ফুচকা, খাবার জিনিস।

আমি কেতে পারি?

কেতে নয়, খেতে। আমরা তো খুব খাই। তুমি খেলে যদি তোমার পেটের অসুখ হয়? তোমাদের তো রাস্তায় জল খাওয়া বারণ।

তবু খেয়ে ডেকটে চাই।

ডেকটে নয়, দেখতে। ঠিক আছে, একটা মোটে খাও।

একটা ফুচকা খাওয়ার পর পুরু বলল, ডেলিশাস। ভাল, খুব ভাল। পর পর চারটে ফুচকা খেয়ে ফেলল পুরু।

পেছন থেকে সন্তুর পিঠে চাপড় মেরে একজন বলল, কী রে, একা-একা ফুচকা খাওয়া হচ্ছে?

মুখ ফিরিয়ে সন্তু বলল, জোজো! আমরা তো তোর বাড়িতেই যাচ্ছিলাম। একা নয় রে, এই আমাদের নতুন বন্ধু, এর নাম পুরু। আলেকজান্ডারের দেশ গ্রিসে ওর জন্ম।

জোজো সঙ্গে-সঙ্গে বলল, আমারও জন্ম নেপোলিয়ানের দেশ কার্সিকায়। তাই আমার আর-একটা নাম কৌশিক।

সন্তু বলল, ওরা এখন আমেরিকার কানেটিকাটে থাকে।

জোজো বলল, আমিও কানেটিকাটে থেকেছি। বাবা যেবারে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের ভূতের ভয়ের চিকিৎসা করতে গেলেন, তখন প্রেসিডেন্ট সাহেব চুপি চুপি কানেটিকাটের একটা বাড়িতে আসতেন। কাছেই তো সমুদ্র, তাই না?

পুরু অবাক হয়ে দেখছে জোজোকে।

সন্তু বলল, পুরু আগে কখনও ফুচকা খায়নি।

জোজো বলল, কেন, আমেরিকাতেও তো ফুচকা পাওয়া যায়। তবে, ওখানে তেঁতুল জলের বদলে ভেতরে আইসক্রিম ভরে দেয়।

পুরু এবার জিজ্ঞেস করল, হোয়াট ইজ টেঁটুল?

সন্তু বলল, তেঁতুল, একরকমের টক টক ফল।

পুরু জিজ্ঞেস করল, কোন গাছে হয়?

জোজো বলল, অদ্ভুত প্রশ্ন। আম কোন গাছে হয়? আম গাছে। জাম কোন গাছে হয়? জাম গাছে। তেমনি তেঁতুলও হয় তেঁতুল গাছে। ফলের নামেই গাছের নাম। কিংবা গাছের নামে ফলের নাম।

সন্তু বলল, ও তো অত কিছু জানে না। তেঁতুল গাছ কখনও দেখেইনি।

জোজো বলল, আমিও তো আখরোট গাছ দেখিনি। তা বলে কি ভাবব, আখরোট হয় কলা গাছে?

সন্তু এবার হেসে ফেলে বলল, তুই দেখিসনি, এমন কিছু কি আছে পৃথিবীতে? সত্যিই তুই আখরোট গাছ দেখিসনি?

জোজো বলল, একবার মাত্র দেখেছি, ম্যাডাগাস্কারে। ভাল মনে নেই।

পুরু আস্তে-আস্তে বলল, আমি একটা টেটুল গাস দেকব!

জোজো ভুরু তুলে বলল, টেঁটুল আবার কী? গাস?

সন্তু বলল, ও ভাল বাংলা জানে না।

জোজো বলল, তা বলে গাছকে গাস বলবে? ঘাস খায় নাকি? এ জংলি ভূতটাকে কোথায় পেলি রে সন্তু?

সন্তু বলল, জংলি ভূত কী বলছিস। ও আমেরিকায় থাকে।

জোজো বলল, আমেরিকায় বুঝি জংলি ভূত নেই? অনেক আছে।

সন্তু বলল, আর কতক্ষণ এরকম চালাবি রে জোজো?

তারপর পুরুর দিকে ফিরে বলল, তুমি কিছু মনে কোরো না। কারও সঙ্গে প্রথম আলাপে জোজো এইরকম ইয়ার্কি-ঠাট্টা করে।

জোজো এবার হাত বাড়িয়ে পুরুর একটা হাত ধরে বলল, গ্ল্যাড টু মিট ইউ। আমার নাম জোজো।

সন্তু বলল, ওর সঙ্গে ইংরিজি বলবি না। ও বাংলা শিখছে।

জোজো বলল, কোনও চিন্তা নেই। আমি সাতদিনে ওকে এমন বাংলা শিখিয়ে দেব–ও নিজেই অবাক হয়ে যাবে। প্রথমেই ওকে একটা তেঁতুল গাছ দেখাতে হবে। ন্যাশনাল লাইব্রেরির কাছে একটা বড় ঝকড়া তেঁতুল গাছ আছে, চল সেখানে যাই।

সন্তু বলল, দাড়া, এখন যাব না। একটা কাজের কথা আছে। পরশুদিন আমরা একটা জায়গায় বেড়াতে যাচ্ছি। তুই যাবি তো?

জোজো বলল, কোথায়?

সন্তু বলল, উত্তরবঙ্গে। এখান থেকে ট্রেনে করে যাব, তারপর নিউ জলপাইগুঁড়ি থেকে গাড়িতে–একটা জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে থাকব। ফরেস্ট বাংলো রিজার্ভ করা আছে।

পুরু বলল, এই, টোমরা এত ইংলিশ বলছ কেন? ট্রেনে, ফরেস্ট বাংলো, রিজার্ভ।

জোজো বলল, আমরা কিছু কিছু ইংরিজি শব্দ বলি, সেগুলোও বাংলা হয়ে গেছে। চেয়ার, টেবিল, আলমারি এগুলোর বাংলাই হয় না। ট্রেন, হ্যাঁ, ট্রেনও বাংলা।

সন্তু বলল, বইতে পড়েছি, আগে লোকেরা রেলগাড়ি বলত। এখন আর কেউ বলে না।

পুরু বলল, কোনটা কোনটা ইংরিজিটা বাংলা হবে না, হাউ ড়ু ইউ, মানে কী করে বুঝা যাবে?

জোজো বলল, শুনতে শুনতে বুঝে যাবে। পুরু বলল, ফরেস্ট মানে তো ঝংগল।

জোজো বলল, ঝংগল নয়, জঙ্গল। বনজঙ্গল। সবসময় আমরা ফরেস্ট বলি না, বন কিংবা জঙ্গলই বলি। ফরেস্ট বাংলোটাও বন-বাংলো হতে পারে। তবে বাংলোটা বাংলোই।

সন্তু বলল, জোজো, পরশুদিন ঠিক সন্ধে সাতটায় তোকে আমরা বাড়ি থেকে তুলে নেব!

জোজো বলল, পরশুদিন? এই রে! পরশুদিন তো যেতে পারব না।

সন্তু বলল, কেন?

জোজো বলল, তোরা আর দুএকদিন পরে যেতে পারিস না?

সন্তু বলল, ট্রেনের টিকিট কেনা হয়ে গেছে। তোরও টিকিট আছে। বাংলো ঠিক করা আছে। পুরুরা বেশিদিন থাকবে না। আর তো পেছোনো যাবে না।

পুরু বলল, টিকেট?

সন্তু বলল, তোমরা বলো টিকেট, আমরা বাংলায় বলি টিকিট। টিকেটও চলতে পারে, তার আর বাংলা করার দরকার নেই।

জোজো বলল, পরশুদিনই আমার এক মাসির বিয়ে। সেদিন আমায় থাকতেই হবে। মা কিছুতেই ছাড়বে না।

সন্তু বলল, তা হলে তুই পরের দিন চলে আয়। কিংবা তার পরের দিন।

জোজো বলল, আমি একলা একলা কী করে যাব?

সন্তু বলল, ট্রেনের টিকিটটা বদলে নিলেই হবে। ওখানকার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট, মানে জেলাশাসক, কাকাবাবুর খুব চেনা। তাঁর কাছে খোঁজ করলেই তিনি তোকে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।

জোজো ঠোঁট উলটে বলল, একা একা কি আর যেতে ইচ্ছে করবে?

পুরু বলল, আমি একা বস্টনে যেতে পারি।

জোজো বলল, বস্টনে যাওয়া আর জঙ্গলে যাওয়া কি এক, বল ভাই?

সন্তু বলল, চলে আয়, চলে আয়।

জোজো বলল, তুই আমাকে নিয়ে যেতে চাস না।

সন্তু বলল, সে কী রে? তোর টিকিট পর্যন্ত কাটা হয়ে গেছে। এর মধ্যে হঠাৎ তোর মাসির বিয়ে হবে, তা কী করে জানব? তোর কত মাসি রে?

জোজো বলল, পঁচানব্বইজন।

সন্তু বলল, মোটে? আরও পাঁচজন বেশি হওয়া উচিত ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *