০২. দোকান বন্ধ হয়ে গেছে

দোকান বন্ধ হয়ে গেছে, তবু ভেতরে বসে গুপী স্যাকরা দুর্গাপ্ৰদীপ জেলে রাংঝালের কাজে মগ্ন। সেই সময় ঝাঁপ ঠেলে ঢুকলো রাইমোহন। সে এতই লম্বা যে ছোট দোকান ঘরটিতে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, মাথা ঝুঁকিয়ে রইলো। তার পরণে সিমলের ফিনফিনে ধুতি, হলুদ রঙের বেনিয়ান, গলায় শান্তিপুরের ড়ুরে উড়নি আর পায়ে ইংলিশ জুতো। বাঁ হাতের মণিবন্ধে এক ছড়া গোরের মালা জড়ানো। সে মাঝে মাঝে এই রকম সময়েই দোকানে আসে, তাই গুপী স্যাকরা অবাক হলো না, একটা ছোট কাঠের টুল এগিয়ে দিয়ে বললো, বসুন ঘোষালমশাই।

রাইমোহন বসলো, হাঁটু দুটো উঁচু হয়ে রইলো। জেব থেকে পিতলের পানের কৌটো বার করে তার থেকে একটা পান মুখে পুরলো, একটা গুপীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো, নিবি নাকি?

বহুক্ষণ আগুনের শিখার সামনে বসে থাকার জন্য গুপীর কপাল থেকে টপটপ করে ঘাম ঝরছে। বাঁ হাত দিয়ে ঘাম মুছে, ডান হাত বাড়িয়ে বললো, দেন একটা। আর কী সংবাদ বলেন। অনেকদিন আপনি ইদিকে আসেননি, তাই পাড়া-বেপাড়ার অনেক খবরও শুনিনি।

রাইমোহন বললো, সবচে জবর খবর হলো গে চূড়ো দত্তর রাঢ়কে কাল কে যেন ছুরি মেরে পালিয়েচে, আজ সকালে দেখা গেল সে মুখ ভেটকে পড়ে আচে।

গুপী বললো, চুড়োবাবুর কোন রাঢ়? তেনার তো একটি নয়, গণ্ডাখানেক।

—ইটি হলো গে বৌবাজারের। আমার হীরেমনির পাশের কোঠায় থাকতো।

—আহা হা, সে তো শুনিচি অপরূপ সুন্দরী ছেল।

—হ্যাঁ, কলকেতা থেকে একটা তারা খসে গেল। চুড়ো দত্তর কি ভেউ ভেউ করে কান্না! নিজের বাড়ির মাগ মলেও কেউ অমন কাঁদে না।

—কে মারলে? চুড়োবাবুর রাঢ়ের কাছ ঘেঁষা তো কম সাহসের কথা নয়।

—তুই কখনো ঘ্যৗষবার চেষ্টা করিছিলি নাকি?

—আরে রাম রাম! আমি তো চুনোপুঁটিস্য চুনোপুঁটি! আপনার মুখেই শুনিচি এসব।

—চুড়োর কান্নার বহর দেখে মনে হচ্চে, সে-ই গুণ্ডা ভাড়া করে মারিয়েচে। পাখি নাকি উড় উড়ু কচ্চিল, রসিক দত্তরও চোখ পড়েচিল ঐ মেয়েছেলেটির ওপর। চূড়োবাবুর হাত ছাড়িয়ে কারুর পালাবার সাধ্য আচে?

—রাম কহো, রাম কহো! এসব নোংরা কথা শুনলেও পাপ। আর কী সংবাদ বলেন!

—চেতলাগঞ্জে আজ অনেকগুলো চালের নৌকো ভিড়েচে দেকলুম, চালের দর। এবার একটু পড়বে মনে হয়।

—এয়েচে চালের নৌকো? দু-তিন মাস ধরে যা অখাদ্য চাল জুটছিল।

—না রে, বাঙালদেশ থেকে বেশ ভালো চাল এয়েচে।

—আজ বিকেলে কেল্লা থেকে গুপুস গুপুস করে অনেকবার তোপ দাগলো। বিলেত থেকে কেউকেটা একজন এলো মনে হয়।

—কোম্পানির ডিরেকটির বোর্ডের একজন জবর মেম্বর এয়েচে। কী নাম যেন, ভুলে গেলুম ছাই।

—আপনি কি এখন বেরুচ্চেন না বাড়ি ফিরচেন, ঘোষালমশাই?

—এই সন্ধেরাতে বাড়ি ফিরবো কি রে! আমার কি নোনা লেগেচে যে বাড়িতে বসে কাঁচা থোড় চিবুবো! একটা বাজনা শুনতে পাচ্চিস?

—হ্যাঁ, অনেকক্ষণ থেকে শুনচি। কিসের বাজনা বলুন তো!

—আজ যোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে খুব ধূমধাম। দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাতি হয়েচে, তাই গোড়াদের ব্যাণ্ড পার্টি আনিয়েচে।

—তা আপনার নেমন্তন্ন নেই?

—আজ শুধু সাহেবদের। বাঈ নাচ হবে। দিশি লোকদের নেমন্তন্ন হলো গে কাল। আমার তো নেমন্তন্ন লাগে না, খাওয়া-দাওয়া দেখলেই ঢুকে পড়ি।

—ছেলে হলো করি?

—দেবেন্দ্রবাবুর। দ্বারকানাথের বড় ছেলে। দেবেন্দ্রর এক মেয়ে হয়ে মারা গিইছিল। এবার প্রথম ছেলে জন্মালো। নতুন বংশধর এলো, খুব ধুমধাম তো হবেই।

—দেবেন্দ্রবাবু তো বড়মানুষীতে বাপকেও ছাড়িয়ে যাবেন বোধহয়।

—ব্যাপকে টেক্কা না দিলে আর বড়মানুষী কী? মনে নেই, একবার শুধু সরস্বতী পুজো করেই এক লাখ টাকা ওড়ালো? খরচের বহর দেখে দ্বারকানাথ পর্যন্ত হাঁ!

—উনি তো আবার হীরে মুক্তেগ গলায় পরেন না, পায়ে।

—পায়ে কি বলচিস? জুতোয়। জুতের ওপর হীরে মুক্তে বসিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেল!

—কালে কালে কত কী দেকবো!

—ওরা তো টাকার ওপর গড়াগড়ি দেয়। দ্বারকানাথের বাড়িতে টাকার গোনাগুণতি হয় না, দাঁড়িপাল্লায় ওজন করে। দেবেন্দ্ৰ হিন্দু কলেজে ভত্তি হয়েছেন। ও কলেজটা তো একটা স্নেচ্ছদের আড্ডা। কেউ জাত ধম্মো মানে না। দুজো সাহেব মারা গেলেও তেনার চেলা-চামুণ্ডোগুলান রয়ে গ্যাচে। সেগুলো আবার এককাঠি বাড়া। দেবেন্দ্র যাতে বয়াটে হয়ে না যায়, তাই দ্বারকানাথ ছেলেকে কালেজ ছাড়িয়ে এনে বিষয়কন্মে লাগালেন, আর ছেলেও পুজো-আচ্চার নাম করে দু হাতে দেদার টাকা উড়াচে। বয়েস তো সবে তেইশ চব্বিশ, এর মধ্যেই দেবেন্দ্র যা খেল দেখাচে, কাপ্তেনীতে সবাইকে ছাপিয়ে যাবে।

গুপী বললো, তাতে আপনাদেরই লাভ।

রাইমোহন বললো, এদিকে আমাদের রামকমল সিংগীরও এক ছেলে হলো। এতকাল তো পরের ধনে পোদ্দারি কচ্ছেল, এবার নাকি নিজের মুরদেই—

—নাকি বলছেন কেন?

—যা শুনবো, তাই বিশ্বোস করবো, এমন বান্দা আমি নই! রামকমল সিংগীর বোয়ের ছেলে হয়েচে কিন্তু সে ছেলে রামকমল সিংগীর না। কার, তা কে জানে!

—আরে ছি ছি ছি ছি। রাম কহো। ও-কতা বলবেন না। পাড়াশুদ্ধ সকলে জানে, আর যেখানে যাই গণ্ডগোল থাক, রামকমল সিংগী মশায়ের পরিবার অতি সতী সাধ্বী মেয়েছেলে।

—আরো রাখা রাখা। সতী! বেণ্টিঙ্ক সাহেব এমন কানুন করে গেলেন তা গোটা দেশটার পোঙা মারা গেল।

—কী করেচেন, সে সাহেব?

—ঐ যে খানাকুলের ম্লেচ্ছটি সাহেবদের জপালো আর সাহেবরাও তার কতা শুনে নেচে উঠলো। সতীদাহ রদ করে গেলেন বেণ্টিঙ্ক, তার ফলে দেশ থেকে সতীই উধাও হয়ে গেল। একটা সতী মেয়ে আমায় দেকা তো?

 

গুপী চুপ করে গেল। এ-সব কথা নিয়ে আলোচনা করতে সে ভয় পায়। রাইমোহন ঘোষালের না। হয়। জিভের আড় নেই। কিন্তু সে ছাপোষা মানুষ।

—এবার আপনার নিজের সংবাদ বলেন ঘোষালমশাই।

অন্য জেব থেকে এক ছড়া সোনার হার বার করে রাইমোহন বললো, এটা দ্যাক তো, এটার জন্য কত দিতে পারবি?

হার ছড়া হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে গুপী বললো, এটা আবার কোথা থেকে আনলেন? আপনার কি জিনিস ফুরোয় না?

—এটা আমার নাতির।

—নাতির জিনিসটে বিককিরি করবেন? আহা, সে বেচারি মনে দুঃখু পাবে না?

—সে দুঃখু পেল তো আমার বয়েই গেল। সে কি এখানে আচে, গত বছর সে স্বগ্‌গে গ্যাচে, সেখেনে সোনাদানার কত ছড়াছড়ি! নে, ওজন করে দ্যাক!

এটা একটা খেলা। গুপী বেশ ভালোই জানে যে এটা রাইমোহনের নাতির গয়না নয়, আর রাইমোহনও জানে যে বিক্রির জন্য যে-সমস্ত গয়না সে আনে তা কোথা থেকে আসে, গুপীর জানতে বাকি নেই। তবু প্ৰত্যেকবারই একটু এ-রকম গল্প কথা হয়।

গুপী নিক্তি বার করলো। সেদিকে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে রইলো রাইমোহন। এই লোকটির বয়েসের গাছ-পাথর নেই। কেউ বয়েস জিজ্ঞেস করলে রাইমোহন হাসে। কিংবা রসিকতা করে বলে, এই ধরে না কেন বারো কি তেরো! দেকাছে না, বগলে চুল গজায় নি এখনো?

রাইমোহন মাকুন্দ, শরীরখানা শুধু শক্ত হাড়ের ওপর চামড়া দিয়ে মোড়া, সেইজন্যই তার উচ্চতা যতখানি, তার চেয়েও ঢাঙা দেখায়। খড়গনাসা, অতিশয় ধূর্তের মতন চোখ, কথাবাতায় দারুণ তুখোড়। রাইমোহন এ শহরে যজ্ঞের বিড়াল।

—আপনার সোনা আচে ডেড় ভরি টাক!

রাইমোহন আমনি ধমক দিয়ে উঠলো, কতটা হাত ঝোলালি? অ্যাঁ?

গুপী বললে, হাত ঝুলিয়েচি? এই দেকুন না।

—আরো রাখা রাখা। কতায় আচে, স্যাকরার ওজন আর মামুদপুরের গাজন। মারামারি কাটাকাটি হবেই! ভালো করে দ্যাক!

—পুরো ডেড় ভরি! তা আপনার উনিশ টাকা দর ধরলে—

—উনিশ টাকা কি রে ব্যাটা? বিশ টাকা দর উঠেচে।

— সে হলো পাকা সোনার দর।

—আমি কি তোর কাচে কাঁচা সোনা এনেচি!

অনেকক্ষণ দরদরি হলো। গুপী কিছুতেই সাড়ে আঠাশ টাকার বেশী দেবে না, রাইমোহনও তিরিশ টাকা না নিয়ে ছাড়বে না, শেষ পর্যন্ত উনত্ৰিশে রফা হলো। টাকাগুলো গুণে নিয়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়েই রাইমোহন গুতো খেল ঘরের চালে। মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বেরিয়ে পড়লো।

শনিবারের রাত, রাস্তায় বেশ ভিড়। জ্যোৎস্না রাত বলে অন্ধকার তেমন মিশমিশে নয়, কাছাকাছি বাড়িগুলো থেকেও আলোর রেশ এসে পড়েছে, অনেক পথচারীর হাতে লণ্ঠন। দুই গরুর গাড়ির মাঝখানে আটকা পড়েছে একটা ফিটন গাড়ি, তার ওপর থেকে চ্যাঁচাচ্ছে সহিস আর ভেতরে বসে এক সৌখিনবাবু বলছেন, আঃ সর না, কী আপদ! গরু এমন ল্যাজের ঝাপটা মারছে, তা প্ৰায় বাবুর মুখে এসে লাগে। গাড়োয়ানের জোর ছপটি খেয়ে হঠাৎ একটা বলদ এত জোরে ছুটলো যে গাড়িশুদ্ধ গিয়ে পড়লো রাস্তার ধারের পুকুরে। লোকেরা আরো মলো মলো, গ্যালো গ্যালো, ধর ধর বলে চেঁচিয়ে উঠলো। সেই সুযোগে ফিটন গাড়ি বেরিয়ে গেল খাপখপিয়ে। চিৎপুরের রাস্তার দু পাশে বিরাট বিরাট নর্দমা। গাড়ি ঘোড়ার আওয়াজ ছাপিয়েও শোনা যায় মানুষের গলা। রাস্তা দিয়ে যাবার সময় কেউ চুপচাপ হাঁটে না, কে কার কথা শুনছে ঠিক নেই, তবু সকলেই কিছু না কিছু বলছে।

এরই মধ্যে চলেছে একটা ছোট মিছিল, তাতে দুজন ঢোল বাজাচ্ছে। একজনের হাতে একটা দাউ দাউ করা মশাল আর বাকি লোকরা গান জুড়েছে, ভোলা বোম ভোলা বড় রঙ্গিলা লেংটা ত্রিপুরারি শিরে জটাধারী ভোলার গলে দোলে হাড়ের মালা।

রাইমোহনের ঠোঁটে সব সময় একটা বাঁকা হাসি থাকে। সে ভিড়ের মধ্য দিয়ে চলেছে পাশ কাটিয়ে কাটিয়ে। হঠাৎ একজন লোকের সঙ্গে তার ধাক্কা লেগে গেল। সে রাইমোহনের আপাদমস্তক দেখে নিয়ে স্থলিত গলায় বললো, আমি ছিকেষ্ট বাগানের পেয়ারা, না না, ভুল বল্লম গো, আমি পেয়ারা বগানের ছিকেষ্ট, তুমি কে বাবা, তাল গাছ??

লোকটির মুখ দিয়ে ভুরিভুরিয়ে বেরুচ্ছে সরাবের গন্ধ। তার কথা শুনে খিলখিল করে হেসে উঠলো। অদূরে দাঁড়ানো তিনটি মেয়ে। তাদের তিনজনেরই হাতে লাল রঙের রুমাল।

রাইমোহন জিজ্ঞেস করলো, মশায়ের লেগেচে?

লোকটি বললো, না, না, লাগবে কেন? যেন গাদা বোটের গায়ে নদীর ঢেউ, একটু দুলে উঠিচি শুধু।

রাইমোহন ডিবেটা বার করে বললো, নিন। একটা পান আজ্ঞা করুন।

অমনি মেয়ে তিনটি আমায়-দাও, আমায় দাও বলে এগিয়ে এলো। খালি হয়ে গেল রাইমোহনের ডিবে। সে এক হাতে চেপে জেব সামলে রইলো যাতে টাকাগুলো না। এই তলে-গোলে অদৃশ্য হয়ে যায়।

একটি মেয়ে বললো, হাতে গোরের মালা, কার গলায় পরাবে গো?

অন্য একটি মেয়ে তার হাত চেপে ধরে বললো, আমার ঘরে চলো।

আর একটি অন্য হাত চেপে ধরে বললো, না গো, আমার ঘরে এসো, আমার ঘর খুব কাচে।

মাতালটি বললো, যাব বাবা! আমি কি এঁটো–কলাপাতা? আমায় কেউ দেকাচে না। মেয়েগুলোর কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে, তাদের থুতনি ধরে একটু আদর করে আবার এগিয়ে গেল রাইমোহন।

হেদোর কোণে কুচকুচে কালো রঙের একটি দিশি খৃস্টান প্ৰভু যীশুর মহিমাকীর্তন করছে। তার পাশে হাতে বিলিতি লণ্ঠন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গোলগাল মুখ একজন সাহেব। কাছেই ভুর করে রাখা আছে অনেকগুলো বাইবেল। একটু পরেই যখন ঐ বাইবেল বিলি হবে, তখন এক অক্ষরও ইংরেজি পড়তে পারে না। এমন লোকেরা ওগুলো নেবার জন্য কড়াকড়ি করবে। অনেক সময় রাস্তার ধারের নর্দমায় ডানা উল্টে পড়ে থাকতে দেখা যায় ভালো মরোক্কো চামড়ায় বাঁধানো বাইবেল। তবু পাদ্রীদের উৎসাহে ঘাটতি নেই।

বউবাজার পাড়ার একটি দোতলা বাড়িতে ঢুকে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে রাইমোহন হাঁকলো, হীরেমনি, ও হীরোমনি! আসবো?

নীল রঙের জমকালো শাড়ি পরা একটি মেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললো, তুমি আজ এয়েচো? তোমার কি ভয় ডর নেই গা?

রাইমোহন হাসতে হাসতে ওপরে উঠে এসে বললো, ভয় পেলে আর কোথায় নুকোবো? তোমার কাচে ছাড়া? কেন, কী হয়েচে? পাড়া একদম ফাঁকা দেকচি যে!

হীরোমনি বললো, কাল রেতে অমন কাণ্ড হলো, আজ আর কেউ এ পাড়ায় আসবে? এক তুমিই আচো ঘাটের মড়া।

রাইমোহন বললো, কেউ আসবে না, বা বা বা বা। শুনে প্ৰাণ জুড়িয়ে গেল, তা হলে আজ আমি একই জমাবো।

ঘরের মধ্যে জাজিমের ওপর ফরাস পাতা। দরজার ঠিক সামনের দেয়ালে ঝুলছে একটি কালীঘাটের পট, একটা বেড়াল মাছ মুখে নিয়ে পালাচ্ছে। ফরাসের ওপর তিন চারটে লাল ভেলভেট মোড়া তাকিয়া, তার একটাতে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে একটি এক বছরের বাচ্চা ছেলে।

বেশ মৌরসীপাট্টা করে বসে রাইমোহন বললো, সকালে একবার উঁকি মারতে এয়েছিনু এদিকে। অনেক পাহারোলা দেকলুম। পাহারোলা পাহারোলায় ছয়লাপ একেবারে।

হীরোমনি বললো, দুজন সাহেব পুলিশও এয়েছিল!

—তা আসবে না? একি তোর আমার মরণ, চুড়ো দত্তর রাঢ়, স্বয়ং গবৰ্ণর জেনারেল যে আসেননি-মোতিবিবির কত বড় ভাগ্য বল, সাহেবরা পর্যন্ত তার লাশ দেখতে এয়েছেল!

—আহা গো, সে চোকে দেকা যায় না! কী নিদায়ের মত মেরেচে, শরীলটা একেবারে ফাল-ফালা করে দিয়েচে।

—ঐ জন্যই তো তোকে বলি, কখনো বাঁধা বাবু রাকবি না। ছাড়া পাখি হয়ে থাকবি, এ ডালে বসবি, ও ডালে ঠোকরাবি।

—আমি মোতিকে বলিচিলুম, চুড়োবাবু বড় বদরাগী লোক, ওঁয়াকে চটাতে যাসনি—তা তো শুনলো না, ফাঁট দেখিয়ে বললো, কোন পরোয়া করে তুহার চুড়োবাবুক! এখন বোঝা!

—যাক গে, গেচে তো গেচে। আচ্ছা হীরেমনি, তুই যে বললি আজ আর কেউ আসবে না। ভয়ে, তা হলে তুই অ্যাত সেজেগুঁজে বসেছিলি কোন নাগরের জন্যে র্যা? আমার জন্যে বুঝি?

—আহা হা, সাজ করেচি, সে আমার অব্যেশ। ওনার জন্যে! ভারী মুরোদ! হাতে নেই কানাকড়ি দরজা খোলো বিদ্যোধরী।

রাইমোহন বেনিয়ানের ওপর হাতের থাবড়া মারতেই রূপোর টাকা ঝনঝনিয়ে উঠলো। এক গাল হেসে বললো, মুরোদ নেই! আজি একশো সিক্কা টাকা এনিচি। নোকরকে ডাক, বোতল আনা।

হীরোমনি বললো, আবগারির দোকান বন্ধ হয়ে গেচে, এখন আবার কোতায় বোতল পাবে?

রাইমোহন হেসে বললো, ওর কাচেই বোতল রাকা থাকে, একটু ঘুরে ঘেরে এসে নিজেরই নুকোনো বোতল বার করে দেবে। দুটো পয়সা বেশী নেবে, এই যা!

—দাঁড়াও বাপু, ছেলেটাকে রেখে আসি পাশের ঘরে। তুমি তো পেটে একটুখানি পড়লেই অমনি হল্লা শুরু করবে।

—হল্লা কি রে, গান শোনাবো। তোকে নিয়ে আমি নতুন গান বেঁধেছিা!

—থাক, আর আমায় নিয়ে গান বাঁধতে হবে না। বড় বড় বাবুদের নিয়ে গান বাঁধে, তাই করো গে।

—বাবুদের নিয়ে গান বাঁধি তো রোজগারের জন্য, আর তোকে নিয়ে বাঁধবো রসের গান। তোকে শিকিয়ে দেবো, তুই গাইবি। তোর গলাটি এত মধুর।

হীরোমনি ঘুমন্ত ছেলেকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল। রাইমোহন বললো, দিব্যি চাঁদপানা মুখখানি হচ্চে দিন দিন। হ্যাঁরে হীরেমনি, এ ছেলে কার রে?

—কার আবার, আমার!

—সে তো বুঝলুম। ওর বাপ কে?

—তা জেনে তোমার কী দরকার। ভগমন আমাকে দিয়েচেন ছেলে।

—ভগবান? কোন বাড়ির ভগবান? দত্তবাড়ি, ঠাকুরবাড়ি, শীলবাড়ি, দেবেদের বাড়ি, মল্লিকদের বাড়ি, কত ভগবান আচে। এর ওপর আবার আচে সাহেব-ভগবান! তা কোন ভগবান তোকে দিলে?

—তুমি চুপ মারো তো।

—ছেলে আমার নয় তো রে? আমি অবশ্য ভগবান নই, আমি ওনাদের পায়ের কুকুর।

—মুখে মারবো মুড়ো ব্যাটা! ঘরের মাঝখানে একটা কাটা দরজা, সেখানে ঝুলছে ভারি মখমলের পদাঁ। সেই পদাৰ্থ ঠেলে হীরোমনি ছেলেকে নিয়ে গেল পাশের ঘরে।

একটু পরেই এলো মদের বোতল। অন্য দিনের তুলনায় আজ এ পাড়া সত্যি বেশ নিস্তব্ধ। প্রত্যেক সন্ধ্যেতে এদিকে হাসির ফোয়ারা আর ঘুঙুরের ঝমোঝমানিতে বাতাস কাঁপে।

রাইমোহন সাধারণত কোনো কাপ্তেনের স্যাঙাত হয়ে এ সব জায়গায় আসে। খরচ খচা সব সেই কাপ্তেনের। তাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে রাইমোহনের এমন অভ্যোস হয়ে গেছে যে সন্ধ্যেরাতে আর কিছুতেই নিজের বাড়িতে মন টেকে না। একমাত্র হীরেমনির কাছেই সে মাঝে মাঝে একা আসে। হীরোমনি এ পাড়ায় এসেছে বছর চারেক, বয়েস মাত্ৰ সতেরো-আঠারো।

আজ নিজেই কাপ্তেনের ভঙ্গিতে তাকিয়া হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে হাতের গেলাসে চুমুক দিতে দিতে রাইমোহন বললো, একটা গান ধর না—

হীরোমনি বললো, তুমিই তো আজ গান শোনাবে বললে—

রাইমোহন চোখ বুজে খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে তান ধরলো, সোনার বৃক্ষে রূপের পাতা, সেথা বসেছে এক হীরেমন পাখি–

হাতটা এগিয়ে এনে সে হীরামনির গাল টিপে আদর করলো।

কিন্তু এই আসর ভেঙে গেল অকস্মাৎ।

হীরেমনিকে সবে মাত্র দু-এক লাইন গানের আখির শুনিয়েছে রাইমোহন, এই সময় বাড়ির সদরে একটা গাড়ি থামার আওয়াজ হলো। হীরেমনির নোকর রামদাস ছুটতে ছুটতে ওপরে এসে দরজায় ঘা দিয়ে বললো, সরকারবাবু আয়ে হেঁ, সরকারবাবু!

রাইমোহন শায়িত অবস্থা থেকে ধড়মড় করে উঠে বসে বললো, নিশ্চয়ই জগমোহন সরকার!

হীরোমনি ভুরু কুঁচকে বললো, তুমি উঠচো কেন, তুমি বসো!

রাইমোহন জিভ কেটে উত্তর দিল, মাতা খারাপ! আর এখানে আমার ঠাঁই আচে! জগমোহন সরকার এয়েচে, আমি তো তার তুলনায় একটা ছারপোকা।

হীরোমনি তার হাত চেপে ধরে বললো, না তুমি বসো। রামদাস, বাবুকে বলে দে, আজ দেকা হবে না। আজ আমার শরীল। খারাপ।

–অমন করিস নি, হীরে! বাবু ফেরাতে নেই। বাবু হলো গে লক্ষ্মী, এমন হাতের লক্ষ্মী কি পায়ে ঠেলতে আচে?

—ওসব বাবু আজ ফিরে গেলে আবার কাল আসবে। তুমি সৌন্দর গান শোনাচ্চিলে, আজ তুমিই থাকো।

—আরে আমি কি কখনো বাবু হতে পারি? আমার বাপ ঠাকুরদা তো আর নুনের দেওয়ানি করেনি বা সাহেবদের তল্পি বইতেও পারেনি। আমি তো তোর পড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা। তুই টাকার খোঁটা দিচ্চিলি, আমি বল্লুম, এক শো টাকা এনিচি। আরো এক শো টাকা একসঙ্গে কি আমি চোখে দেকিচি কখনো? আমি বড়জোর বিশ-পঁচিশের খদ্দের!

—এই নিমকহারামের মতন কতা বলো না। তোমার ঠেঙে কখনো আমি টাকা নিইচি? ভগমনের দয়ায় আমার টাকার অভাব নেই।

—কতার কতা বললুম। আমি পালাই, তুই বাবুকে ডাক। জুতো জোড়া আবার কোতায় গেল!

—তুমি পালাতে চাইচো কেন? আমার টাকার দরকার নেই। আমি বলচি তুমি থাকো।

—জগমোহন সরকারকে ফেরাসনি। উনি আবার ফিমেল উদ্ধারের ব্ৰত নিয়োচেন, মনে বড় দুঃখু পাবেন। মানী লোক!

—তবে যাও, বেরোও! দূর হও!

—আহা, তা বলে আমনভাবে ভাগিয়ে দিসনি। সবাই নাতি ঝাঁটা মারে বলে কি তুইও মারবি? একটু আদর করে যেতে বল। এখন আমি যাই-ই বা কী করে। জগমোহন সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসচেন, নামতে গেলে ওঁর ঘাড়ে পড়বো।

 

সিঁড়িতে দুপদাপ শব্দ হচ্ছে। জগমোহনের বিশাল বাপু, নেশার ঝোঁকে পা দুটিও এখন টলমল, রামদাসের কাঁধে হাত দিয়ে উঠছেন উনি। ওপরে এসে হীরেমনির ঘরের বন্ধ দরজায় দুম দুম করে কিল মারতে লাগলেন।

হীরোমনি বললো, যাও, দরজা খুলে দাও গে?

রাইমোহন ফিসফিস করে বললো, বাবু আমাকে এখানে দেকালে মহা চটিতং হয়ে যাবেন রে!! পক্ষী হলে জানলা দিয়ে উড়ে যেতুম। এখন কী করি!

—শালিক পাখির মতনই তো ভয়ে কাঁপচো।

রাইমোহন চোখ বুজে ঠোঁট ফাঁক করে নিঃশব্দে হাসলো একটুক্ষণ। তারপর কোমর দুলিয়ে নাচতে শুরু করলো।

—ভয়ে তোমার মাতাটাতা খারাপ হয়ে গেল নাকি গো?

–ভয়ে নয় রে, ভয়ে নয়, আনন্দে। আজ জগমোহন সরকারকে বাগে পেয়িচি। শোন, আমি পাশের ঘরে নুকিয়ে থাকবো, তুই যেন কিছু ফাঁস করে দিসনি।

জগমোহন হেঁড়ে গলায় বললো, কইগো হীরেমনি, দরজা খোলো!

হীরোমনি বললো, আজ আপনি ফিরে যান। আজ আমার শরীল ভালো নেই।

জগমোহন সরকার বললেন, আমি তোমার শরীর মন সব ভালো করে দেবো। আমার কাছে মোক্ষম দাওয়াই আছে।

হীরেমনিকে চোখ দিয়ে দরজা খোলার ইঙ্গিত করে রাইমোহন সুড়ৎ করে চলে গেল পাশের ঘরে। ভেজিয়ে দিল দরজাটা।

জগমোহন সরকার ঘরের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে একটি মস্ত বড় ঢেঁকুর তুললেন। হাতের ছড়িটা মাটিতে ফেলে ভূড়ির ওপর দু হাত রেখে পরম তৃপ্তির মুখভঙ্গি করে বললেন, কই হীরেমনি, তোমার শরীর তো কিছু খারাপ নয়। বদনকমলটি যেন আরও প্রস্ফুটিত হয়েছে, ইচ্ছে হয় ভ্রমর হয়ে গিয়ে আমি বসি। আমি অনেকদিন পর এলুম, অনেক দিন পর তোমায় দেকলুম।

হীরোমনি বললো, তাই তো ভাবচি। কলকেতা শহরে মেয়েমানুষ গিসগিস কচ্চে, হঠাৎ এই অধীনাকে আপনার মনে পড়লো?

জগমোহন সরকার বললেন, মনে তো সততই পড়ে। কিন্তু বড় বেশী কাজে জড়িয়ে পড়েছি এদানি। মুখ তুলবারও সময় পাই না। আজ তোমার সঙ্গে দুটি মনের কথা কইতে এলুম।

—বসুন। বাতাস করবো? একটু সরবৎ বানিয়ে এনে দোবো?

—সরবৎ! সুধাপান করতে এলুম, আর তুমি বলছে সরবতের কথা! শরীর খারাপের কথা তুলে আমাকে ফেরাতে চাইছিলে কেন, প্রিয়ে?

—অনেক রাত হয়েচে তো, শোবার উদ্যুগ কচ্চিলুম!

—বেশী রাত না হলে আমি আবার বেরুতে পারি না। ছোঁড়ার দল ঘোরাঘুরি করে, কে কখন দেকে ফেলবে। মহৎ কাজে নামার অনেক বিপদ, বুঝলে হীরেমনি, সব সময় পেছনে ফেউ লেগে থাকে।

জগমোহন সরকার বসলেন। হীরেমনি তখনো দূরে দাঁড়িয়ে আছে দেখে বললেন, এসো, কাছে এসো, একটু আলিঙ্গন দাও, বুকটা জুড়োক। বুকটা বড় খাঁ খাঁ করে আজকাল।

ভেজানো দরজাটা চুলের মতন ফাঁক করে সেখানে চোখ দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো রাইমোহন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *