০১. সাইকেল চালানো শেখা

সাইকেল চালানো শেখার জন্য সন্তুকে এখন ভোরবেলা বালিগঞ্জ লেকে আসতে হয়। ওদের পাড়ার পাৰ্কটা মেট্রো রেলের জন্য খুড়ে ফেলা হয়েছে, সেখানে এখন খেলাধুলো করার উপায় নেই।

ভোরবেলাতেই বালিগঞ্জ লেকে বেশ ভিড় থাকে। বহু বয়স্ক লোক আসেন মর্নিং ওয়াক করতে। অল্পবয়েসী ছেলেমেয়েরা দৌড়য়। অনেকে রোয়িং করে। কালীবাড়ির উল্টে দিকের গ্রাউন্ডটায় ফুটবলের কিক প্র্যাকটিস হয়। লেকের পেছন দিকটায় যেখানে লিলিপুল আছে, সেখানকার রাস্তাটা অনেকটা নির্জন। ঐ জায়গাতেই দুতিনটে দল সাইকেল শেখে।

সাড়ে পাঁচটার সময় সন্তু বেরিয়ে পড়ে বাড়ি থেকে। সঙ্গে থাকে রকুকু। সন্তুর নিজের সাইকেল নেই। কুনালদের বাড়িতে একটা পুরনো সাইকেল ছিল। কুনালের বাবা ডাক্তার, তাঁর চেম্বারের কম্পাউণ্ডারবাবু এই সাইকেলটা ব্যবহার করতেন। কম্পাউণ্ডারবাবু চাকরি ছেড়ে দেশে চলে গেছেন তিন-চার মাস আগে, সাইকেলটা নিয়ে যাননি। কুনাল সেই সাইকেলটা নিয়ে কিছুদিন প্যাড়ল করতে করতে চালানো শিখে গেছে। সেই দেখাদেখি সন্তুরও সাইকেল শেখার শখ হয়েছে।

কুনালকে ডাকতে হয় না, সে তৈরি হয়েই থাকে। কিন্তু মুশকিল হয় বাপিকে নিয়ে। বাপিদের বাড়িতে সবাই খুব দেরি করে ওঠে। ওদের বাড়ির সামনে গিয়ে অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করলেও কেউ সাড়া দেয় না। সন্তু আর কুনাল যখন রাস্তা থেকে বাপির নাম ধরে ডাকতে থাকে, তখন রকুকুও ঘেউঘেউ করতে শুরু করে দেয়।

শেষ পর্যন্ত বাপি চোখ মুছতে মুছতে দোতলার বারান্দায় এসে বলে, এক মিনিট দাঁড়া বাথরুম থেকে আসছি।

তারপরেও বাপি পনেরো মিনিট কাটিয়ে দেয়। লেকে পৌঁছতে-পৌঁছতে রোদ উঠে যায়।

খুব ছেলেবেলায় সন্তু ট্রাইসাইকেল চালিয়েছিল, কিন্তু দু চাকার সাইকেল চালানো খুব শক্ত ব্যাপার। একটু-একটু ভয়ে গা-শিরশির করে। সাইকেলটায় ওঠার পর কুনাল আর বাপি তাকে দুদিকে ধরে থেকে ঠেলতে থাকে। তারপর দুজনে নির্দেশ দেয়, জোরে প্যাড়ল কর, সামনে তাকিয়ে থাক, শরীরটা হালকা কর, এত স্টিফ হয়ে আছিস কেন?

কুনাল আর বাপি হঠাৎ একসময় তাকে ছেড়ে দিলেই সন্তুর চোখে সমস্ত পৃথিবীটাই যেন দুলতে থাকে, হাত দুটো লগাবগ করে। সন্তু চেঁচিয়ে ওঠে, এই, এই পড়ে যাব, ধর, ধর

ওরা দুজন হাসতে-হাসতে দৌড়ে এসে আবার ধরে ফেলে।

এই রকম দুদিন ধরে চলছে। আজ তৃতীয় দিন। আজ সত্ত্বর অনেকটা ভয় কেটে গেছে। সাইকেলে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে শরীরটা আর আড়ষ্ট হয়ে যাচ্ছে না। বাপি আর কুনাল মাঝে-মাঝে ছেড়ে দিচ্ছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, আজ এখানে আরও চারটে দল এসেছে, এক দলের সঙ্গে আর-এক দলের যে-কোনও সময় ধাক্কা লেগে যেতে পারে। উল্টোদিকে অন্য কোনও দলকে দেখলেই সন্তু নাভাস হয়ে যাচ্ছে।

প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট ছোটাছুটি করার পর একসময় বাপি সন্তুর পিঠে চাপড় মেরে বলল, এইবার তুই নিজে চালা, সন্তু। এই কুনাল, ছেড়ে দে!

সন্তুর আর হাত কাঁপল না, সে সোজা সাঁ-স্যা করে বেরিয়ে গেল। দারুণ আনন্দ হচ্ছে সন্তুর, চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, শিখে গেছি; শিখে গেছি! চিৎকার করার বদলে সন্তু ক্রিং ক্রিং করে বেল বাজাতে লাগল।

কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আবার সব বদলে গেল। আবার হাত কাঁপছে, হ্যাণ্ডেলটা এদিক-ওদিক ঘুরে যাচ্ছে, পায়ে যেন জোর কমে গেছে। সন্তুর ধারণা হল, সে এক-একা অনেকটা দূরে এসে গেছে, কুনাল আর বাপি দৌড়ে এসে তাকে ধরতে পারবে না। কী হবে? এই রে, এই রে, সাইকেলটা হেলে যাচ্ছে…

পেছন থেকে বাপি চেঁচিয়ে বলল, ভাল হচ্ছে, চালিয়ে যা সন্তু, সামনের দিকে তাকিয়ে-

ঠিক এই সময়ে বাঁ দিকের রাস্তা দিয়ে আর-একটা দল এসে পড়ল। এখন পাশ কাটাতে না-পারলেই মুখোমুখি কলিশান। সন্তু মোটে সোজা চালাতে শিখেছে, এদিক-ওদিক ঘুরতে জানে না। কুনাল বলেছিল, সাইকেলে সব সময় বাঁদিকে টার্ন নেবার চেষ্টা করবি, ডান দিকে হঠাৎ টার্ন নেওয়া ডিফিকাল্ট। কিন্তু এখানে বা দিকে টার্ন নিতে গেলে যে সোজা লেকের জলে নেমে যেতে হবে।

উল্টোদিকের দলটা সন্তুর একেবারে কাছে এসে চেঁচিয়ে সাবধান করে দিল, বাঁদিক চেপে… বাঁদিক চেপে!

সন্তু আর কিছু চিন্তা না করে ডান দিকে ঘুরিয়ে দিল হ্যাণ্ডেল। পরের মুহূর্তটা সে চোখে কিছু দেখতে পেল না। কী যেন ওলোট-পালোট হয়ে গেল পৃথিবীতে। একটা গাছে ধাক্কা খেয়ে সন্তু ছিটকে পড়ে গেল, তারপর সাইকেলটাও পড়ল তার ঘাড়ের ওপর।

কোনওরকম ব্যথা বোধ করার আগেই সন্তু ভাবল, চোখ দুটো ঠিক আছে। তো? পায়ের হাড় ভেঙে গেছে?

রকুকু ছুটে আসছিল সন্তুর পেছন পেছন। সাইকেলটা পড়ে যেতে দেখে সে ভয় পেয়ে একটু দূরে সরে গিয়ে ঘেউঘেউ করে ডাকতে লাগল।

সাইকেলটা সরিয়ে সন্তু উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করেও পারল না। একজন মর্নিং ওয়াকার সাইকেলটা তুলে ধরে জিজ্ঞেস করলেন, খুব লেগেছে নাকি, খোকা? আমার হাত ধরে ওঠবার চেষ্টা করে।

ততক্ষণে কুনাল আর বাপি এসে পৌঁছে গেল সেখানে।

কুনাল বলল, এই ওষ্ঠ, তোর কিছু হয়নি।

বাপি বলল, জলে না নামিলে কেহ শেখে না। সাঁতার/সাইকেল শেখে না। কেহ না খেলে আছাড়!

মর্নিং ওয়াকার ভদ্রলোক বললেন, না হে, ওর বেশ ভালই লেগেছে মনে হচ্ছে, হাঁটুর কাছে রক্ত বেরোচ্ছে!

কুনাল বলল, আমার ওর থেকে ঢের বেশি রক্ত বেরিয়েছিল। সাইকেল শিখবে, আর একবারও রক্ত বেরুবে না?

ভদ্রলোকটি আবার হাঁটা শুরু করে দিলেন।

কুনাল আর বাপি দুহাত ধরে সন্তুকে টেনে তুলল। কুনাল বলল, সাইকেলটা টাল খেয়ে গেছে শুধু, আর কিছু হয়নি ভাগ্যিস!

সন্তু মাঝে-মাঝে ফুলপ্যান্ট পরলেও সাইকেল চালাবার জন্য পরে এসেছে শর্টস আর গেঞ্জি। তার একটা হাঁটুর নুন-ছাল উঠে গিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসছে। ফোঁটা ফোঁটা। সেখানে খানিকটা জ্বালা করলেও আসল ব্যথা হচ্ছে সন্তুর বাঁ। পায়ের গোড়ালিতে।

এক পা চলার চেষ্টা করেই সন্তু উঃ করে চেঁচিয়ে উঠল। যন্ত্রণায় প্রায় চোখে জল এসে গেল তার।

বাপি বলল, কী রে, তুই এত সব বিপদের মধ্যে অ্যাডভেঞ্চার করতে যাস, আর সামান্য একটু পায়ের ব্যথায় কেঁদে ফেললি?

সন্তু বলল, ভীষণ লাগছে, মাটিতে পা ফেলতে পারছি না।

কুনাল বলল, জোর করে হাঁটার চেষ্টা কর, একটু বাদে ঠিক হয়ে যাবে!

সন্তু বলল, যদি ফ্র্যাকচার হয়ে থাকে?

কুনাল বলল, ধ্যাত, অত সহজে ফ্র্যাকচার হয় না।

রকুকু আবার এর মধ্যে সন্তুর পা চেটে দিতে চায়। সন্তু কুনালকে বলল, ওর গলার চেনটা বেঁধে নে।

Vbry

এর পরে আর সাইকেল চালাবার প্রশ্ন ওঠে না। কুনাল সাইকেলটা ঠিক করে নিল। বাপির কাঁধে ভর দিয়ে সন্তু হাঁটতে লাগল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। তার সত্যি খুব কষ্ট হচ্ছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে আছে, কোনও কথা বলছে না।

খানিকক্ষণ চলার পর বাপি বলল, কী রে, তুই যে এখনও ল্যাংচাচ্ছিস? জোর করে বাঁ পাটা ফেলার চেষ্টা কর।

সন্তু ধরা গলায় বলল, কিছুতেই পারছিনা। হাড় ভেঙে গেছে নিশ্চয়ই।

বাপি হাসতে হাসতে বলল, যাঃ, তা হলে কী হবে? তুই তো আর কোনও অ্যাডভেঞ্চারে যেতে পারবি না। তোর কাকাবাবুর একটা পা তো, ইয়ে, মানে ডিফেকটিভ। তুইও যদি খোঁড়া হয়ে যাস, তা হলে তো তোকে আর উনি সঙ্গে নেবেন না!

কুনাল বলল, এই বাপি, ওরকম নিষ্ঠুরের মতন কথা বলিস না। ওর পা আবার ঠিক হয়ে যাবে।

সন্তুর মুখখানা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। বাপি তো ঠিকই বলেছে। সে খোঁড়া হয়ে গেলে তো কাকাবাবুকে আর কোনও সাহায্য করতে পারবে না। তার জীবনের সব কিছু শেষ হয়ে গেল?

খানিকটা পথ পার হবার পর কুনাল জিজ্ঞেস করল, একটা রিকশায় উঠবি, সন্তু?

সন্তু দুদিকে মাথা নাড়ল। বাড়ির সামনে রিকশা থেকে নামলে মা ভয় পেয়ে যাবেন। আগেই মাকে কিছু বলার দরকার নেই। বিমানদার দাদা ডাক্তার, তাঁকে দেখিয়ে নিতে হবে একবার।

সন্তুদের বাড়ির কাছেই বিমানদাদের বাড়ি। বিমানদা পাইলট, তিনি বাড়ি নেই, নিউ ইয়র্কে গেছেন। বিমানদার দাদাও নাসিং হোমে চলে গেছেন জরুরি কল পেয়ে। দুপুরবেলা তিনি বাড়িতে খেতে আসেন, সেইসময়ে সন্তুকে আবার আসতে হবে।

কাছেই একটা স্টেশনারি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন কাকাবাবু, কী যেন কিনছেন। ক্রচ না নিয়ে কাকাবাবু হাঁটতে পারেন না, তবু প্ৰত্যেকদিন সকালে তাঁর মর্নিং ওয়াকে বেরুনো চাই।

সন্তু প্ৰথমে কাকাবাবুকে দেখতে পায়নি। বাপি তার কাঁধে চাপ দিয়ে বলল, এই সন্তু দ্যাখ.

সন্তু মুখ ফিরিয়ে দেখল কাকাবাবু তার দিকেই চেয়ে আছেন। সন্তুকে খোঁড়াতে দেখে তিনি মিটমিটি হাসছেন, মুখে কিছু বললেন না!

অন্য যে-কোনও বাড়ির বাবা-কাকারা তাঁদের বাড়ির ছেলেকে এইরকম অবস্থায় দেখলে দারুণ ব্যস্ত হয়ে উঠতেন। হাঁ-হাঁ করে ছুটে এসে বলতেন, অ্যাঁ, কী হয়েছে? কী করে পড়লি? হাড় ভেঙে গেছে? ইত্যাদি ইত্যাদি। কাকাবাবু সন্তুকে ঐ অবস্থায় দেখে পাত্তাই দিলেন না।

এমন কী, একটু বাদে বাড়ি ফিরেও কাকাবাবু মাকে কিছুই বললেন না।

সন্তু নিজের ঘরে গিয়ে চুপ করে বসে রইল। এখন দুতিন ঘণ্টা তার পড়ার সময়, ঘর থেকে না বেরুলেও চলবে। ব্যথাটা ক্রমশই বাড়ছে, বাঁ পায়ের গোড়ালির কাছটা বেশ ফুলে গেছে। একটু আয়োডেক্স মালিশ করলে হত। আয়োডেক্সের একটা টিউব ছিল যেন বাড়িতে কোথায়, কিন্তু দরকারের সময় তো সেসব কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে না। মায়ের কাছেও চাইতে সাহস পাচ্ছে না। সন্তু জানে, মা জানতে পারলে এক্ষুনি কোনও ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবেন, তারপর এক্স-রে, তারপর আরও কত কী! পায়ে প্লাস্টার করিয়ে শুইয়ে রাখবেন এক মাস। ঐ প্লাস্টার জিনিসটা সন্তু একদম পছন্দ করে না। এক মাস বিছানায় শুধু শুধু শুয়ে থাক…অসহ্য!

বিমানদার দাদা অবনীদা নিজে খেলাধুলো করেন। তিনি নিশ্চয়ই একটা সহজ ব্যবস্থা করে দেবেন। মা সকালের দিকে অনেকটা সময় স্নান আর রান্না নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, সহজে টের পাবেন না।

বেলা এগারোটা আন্দাজ সন্তু বারান্দায় খটখট শব্দ পেয়ে বুঝল কাকাবাবু আসছেন তার ঘরে। পড়ার টেবিল থেকে সন্তু মুখ ফিরিয়ে তাকাল।

দরজার সামনে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে কাকাবাবু ভুরু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী রে, বাড়িতে কারুকে কিছু বলিসনি তো? পা যদি ভেঙে গিয়ে থাকে, তা হলে কি এমনি-এমনি সারবে?

সন্তু কী উত্তর দেবে ভেবে পেল না।

কাকাবাবুঘরের মধ্যে ঢুকে ক্রাচ দুটো নামিয়ে রাখলেন। তারপর বললেন, এদিকে আয়, হাটবার চেষ্টা কর, দেখি কতদূর কী হয়েছে!

কাকাবাবু গুরুজন হয়ে তার পায়ে হাত দেবেন, এটা ভেবে সন্তু আপত্তি জানাতে যাচ্ছিল। কিন্তু আপত্তি জানিয়েও কোনও লাভ নেই।

সন্তু এক পায়ে লাফাতে লাফাতে চলে এল কাকাবাবুর কাছে। কাকাবাবু বসে পড়ে সন্তুর বাঁ পাটা দু হাতে ধরলেন। সন্তুর গা শিরশির করছে। ঐখানটায় হাত দিলেই ব্যথা।

কাকাবাবু বললেন, হুঁ, বেশ ফুলেছে দেখছি!

তারপর পাটা বেশ জোরে চেপে ধরে সন্তুর চোখে চোখ রেখে বললেন, শোন, যতই ব্যথা লাগুক, চাঁচানো চলবে না। কিন্তু। দেখি কী রকম তোর মনের জোর। মন শক্ত করেছিস তো? এক, দুই…তিন!

কাকাবাবু স্যাট করে সন্তুর গোড়ালিটা ঘুরিয়ে দিলেন। সন্তুর মুখখানা মস্ত বড় হাঁ হয়ে গেল, তবু সে কোনও শব্দ করল না। মনে হল যেন কাকাবাবু তার পায়ের হাড় ভেঙে দিলেন মট্‌ করে।

কাকাবাবু বললেন, যা, ঠিক হয়ে গেছে, আর কিছু হবে না।

সন্তু প্ৰকাণ্ড বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে বলল, ঠিক হয়ে গেছে?

কাকাবাবু বললেন, মট্‌ করে একটা শব্দ পেলি না? তাতেই তো হাড় আবার সেট হয়ে গেল। তোর গোড়ালিটা একটু ঘুরে গিয়েছিল।

উঠে দাঁড়িয়ে কাকাবাবু বললেন, আমি অনেককাল পাহাড়ি লোকেদের মধ্যে কাটিয়েছি তো। সেখানে তো ডাক্তার পাওয়া যায় না, ওরা এইরকমভাবে চিকিৎসা করে। আমি ওদের কাছ থেকে শিখেছি।

সন্তুর দৃষ্টি অমনি কাকাবাবুর পায়ের দিকে চলে গেল।

কাকাবাবু বললেন, তুই ভাবছিস তো আমার পাটা কেন এইভাবে সারাতে পারিনি? আমার পায়ের ওপর এই অ্যাত্তো বড় একটা পাথরের চাই এসে পড়েছিল, এখানকার হাড়গোড় একেবারে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। পাটা যে কেটে বাদ দিতে হয়নি। তাই যথেষ্ট। তুই এবারে একটু হাঁটার চেষ্টা করে দ্যাখ তো!

আশ্চর্য ব্যাপার, পায়ে এখনও ব্যথা আছে যদিও, তবু সন্তু দুপা ফেলে হাঁটতে পারছে।

কাকাবাবু বললেন, আমার মনে হচ্ছে ঠিক হয়ে গেছে। তবু একবার বিমানের দাদায় কাছে গিয়ে দেখিয়ে নিস।

গরমের ছুটি, তাই স্কুল-কলেজ বন্ধ। সারাদিন সন্তু বাড়িতেই বসে রইল। পায়ের ব্যথা ক্রমশই কমে যাচ্ছে আর সন্তুরও মন ভাল হয়ে উঠছে। বিকেলে অবনীদার চেম্বার যাবার পর তিনি ওর পা দেখে বললেন, কই, কিছু হয়নি। তো। একটু আধটু মচুকে গেলে চিন্তার কী আছে? বাড়িতে গিয়ে মাকে বলো একটুচুন-হলুদ গরম করে ওখানটায় লাগিয়ে দিতে।

পরদিন ভোরবেলা সন্তুর ঘরের দরজায় খটখট শব্দ হল। দরজা খুলে সন্তু দেখল কাকাবাবু দাঁড়িয়ে আছেন।

কাকাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, সাড়ে পাঁচটা বেজে গেল, আজ আর সাইকেল শিখতে যাবি না?

সন্তু আকাশ থেকে পড়ল। সাইকেল? সাইকেল শেখার চিন্তা তো সে মন থেকে একেবারে মুছে ফেলেছে। ঐ অপয়া সাইকেলটার জন্যই তো কাল থেকে অত কষ্ট পেতে হল। কী হয় সাইকেল শিখে? এটা গাড়ির যুগ। আর একটু বড় হয়ে সন্তু গাড়ি চালানো শিখবে।

সন্তু বলল, আমি আর সাইকেল শিখব না, কাকাবাবু!

কাকাবাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কেন? সাইকেল কী দোষ করল? তুই পড়ে গেছিস, সেটা তো সাইকেলের দোষ নয়। কিছু একটা শিখতে শিখতে মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া মোটেই ঠিক নয়।

সন্তু তবু গাইগুই করে বলল, পায়ে এখনও একটু-একটু ব্যথা, যদি আবার লেগেটেগে যায়?

কাকাবাবু বললেন, আবার লেগে গেলে আবার সারবে। সাইকেল শেখাটা ভয় পেয়ে একবার ছেড়ে দিলে আর শেখা হবে না। যা, যা, বেরিয়ে পড়! সাইকেলটা একবার শিখে নিলে দেখবি ভবিষ্যতে কত কাজে লাগবে?

সন্তু ভেবেছিল, আজ বেশ অনেকক্ষণ বিছানায় শুয়ে থাকবে। কাকাবাবুর তাড়নাতে তাকে বেরিয়ে পড়তেই হল। কুনালের বাড়ির দিকে যেতে-যেতে সে ভাবল, কাকাবাবু সাইকেল শেখার ওপর এত জোর দিচ্ছেন কেন? এবারে যেখানে যাওয়া হবে, সেখানে কি সাইকেল চালানো দরকার হবে?

সন্তুর মন বলছে, শিগগিরই কোথাও যাওয়া হবে। লম্বা, ফসর্গ মতন একজন বুড়োলোক প্রায়ই আসছেন কাকাবাবুর কাছে। লোকটি ঠিক সাহেব নয়, আবার ভারতীয় বলেও মনে হয় না। লোকটি কাকাবাবুকে কোথাও নিয়ে যেতে চান। সন্তু একদিন শুনতে পেয়েছিল, বুড়ো লোকটি ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলছেন, ইউ কাম. আই উইল মোক অল অ্যারেঞ্জমেন্টস।

কাকাবাবু বলেছিলেন, দাঁড়ান, যাওয়াটা ওয়ার্থহোয়াইল হবে কি না আগে চিন্তা করে দেখি!

লোকটি যে কোথায় যাওয়ার কথা বলছেন, সেটা সন্তু বুঝতে পারেনি। লোকটি কি কাশ্মীরি? কিংবা কাবুলের লোক?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *