০১. মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে

মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরিয়েছে আজ সকালে। রাস্তা থেকে হকার খবরের কাগজটা ছুঁড়ে দিয়ে গেছে একটু আগে, সেটা পড়ে আছে দোতলার বারান্দার কোণে।

সন্তু কিন্তু ঘুমিয়ে আছে এখনও। আজ যার রেজাল্ট বেরুবার কথা, তার কি এত বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকা উচিত? একটু চিন্তা-ভাবনা নেই?

আসলে সন্তু সারা রাত প্ৰায় ঘুমোতেই পারেনি। ছট্‌ফটু করেছে বিছানায় শুয়ে। মাঝে-মাঝে উঠে জানলার বাইরে তাকিয়ে দেখেছে ভোর হল কি না। বুকের মধ্যে টিপা-টিপ শব্দ। ভয়ে সে সত্যি-সত্যি কাঁপছিল। আশ্চর্য ব্যাপার, পরীক্ষা দেবার সময় সন্তুর একটুও ভয় হয়নি, তারপর যে এই তিন মাস কেটে গেল তখনও একদিনের জন্য কোনও ভয়ের চিন্তা মনে আসেনি। কাল সন্ধেবেলা সুমন্ত যেই বলল, জনিস, আজই রেজাল্ট আউট হতে পারে! তারপর থেকেই সন্তুর বুক-কাঁপা শুরু হয়ে গেল। যদি সে ফেল করে!

সব কটা পরীক্ষায় মোটামুটি ভালই সব প্রশ্নের উত্তর লিখেছে সন্তু। কিন্তু কাল রাত্তিরেই শুধু তার মনে হল, যদি উত্তরগুলো উল্টোপাল্টা হয়ে যায়? অঙ্কগুলো যদি সব ভুল হয়? অঙ্কের পেপারের সব উত্তর সন্তু মিলিয়ে দেখেছে বটে, কিন্তু মাঝখানের প্রসেসে যদি কিছু লিখতে ভুল হয়ে থাকে?

ফেল করলে যে কী লজ্জার ব্যাপার হবে, তা সন্তু ভাবতেই পারছিল না। বন্ধুরা সব এগারো-বারোর কোর্স পড়তে চলে যাবে। আর সে পড়ে থাকবে পুরনো ক্লাসে! নিচু ক্লাসের বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেদের সঙ্গে পড়তে হবে তাকে? সন্তু ফেল করলে মা-বাবা-কাকাবাবু-ছোড়দিরা সবাই সন্তুর দিকে এমন অবহেলার চোখে তাকবেন, যেন সন্তু একটা মানুষই নয়!

ফেল করার সবচেয়ে খারাপ দিক হল, তা হলে আর কাকাবাবু নিশ্চয়ই তাকে অন্য কোনও অভিযানে সঙ্গে নিয়ে যাবেন না! বাবা বলবেন, পড়াশুনো নষ্ট করে পাহাড়-জঙ্গলে ঘুরে-বেড়ানো? কক্ষনো চলবে না!

এই সব ভাবতে ভাবতে, সারা রাত ছটুফটিয়ে, শেষ পর্যন্ত এই ভোরের একটু আগে সন্তু অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছে।

কাকাবাবু ছাড়া এ বাড়িতে সবাই একটু দেরিতে ঘুম থেকে ওঠে। তা ছাড়া ভুপাল থেকে ছোড়দি বেড়াতে এসেছে বলে কাল অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা হয়েছে। আজ আবার রবিবার। কারুর উঠবার তাড়াও নেই। সন্তু কাল রাত্তিরে কারুকে বলেওনি যে আজ তার রেজাল্ট বেরুবে।

কাকাবাবু ভোরবেলা উঠে। বেড়াতে বেরিয়ে গেছেন। প্ৰথমে ঘুম ভাঙল ছোড়দির। বিয়ের আগে ছোড়দিই। সকালবেলা চা তৈরি করে বাবা আর মাকে ঘুম থেকে তুলত। আজও ছোড়াদিই চা বানিয়ে এনে ঠিক সেই আগের মতন বাবার ঘরের দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল, চা কিন্তু রেডি!

বাবা চায়ের টেবিলে এসেই অভ্যাস মতন বললেন, খবরের কাগজটা কই রে?

ছোড়দি বারান্দাটা ঘুরে দেখে এসে বলল, এখনও কাগজ দেয়নি।

আসলে হয়েছে কী, বারান্দায় কয়েকটা ফুলগাছের টব আছে তো। তারই একটা টবের পেছনে গোল করে বাঁধা কাগজটা লুকিয়ে আছে।

চা পানের সময় কাগজ পড়তে না পারলে বাবার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। তিনি বিরক্তভাবে বললেন, কী যে হয়েছে আজকাল সব ব্যবস্থা, ঠিক সময়ে কাগজ আসে না। আর এক কাপ চা করি

মা বললেন, সন্তু এখনও ওঠেনি? ওকে ডাক।

ছোড়দি বলল, ডাকছি। সন্তু কি এখনও সকালে দুধ খায়, না অন্য কিছু খায়?

মা বললেন, পাহাড়-পর্বতে ঘুরে ঘুরে ওরাও এখন ওর কাকার মতন খুব চা খাওয়া অভ্যোস হয়ে গেছে। শুধু দুধ খেতে চায় না।

ছোড়দি আবার চায়ের জল চাপিয়ে ডাকতে গেল সন্তুকে।

বাড়িতে বেশি লোকজন এলে সন্তুর পড়াশুনোর অসুবিধে হয়। সেই জন্য এখন সন্তুকে ছাদের ঘরটা একলা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ওখানেই সে রাত্তিরে ঘুমোয়।

ডাকতে এসে ছোড়দি দেখল। সন্তুর চোখ দুটো বোজা থাকলেও দুটো জলের রেখা নেমে আসছে। তলা দিয়ে। বুকটা মুচুড়ে উঠল ছোড়াদির। আহা রে, ছেলেটা ঘুমিয়ে-ঘুমিয়ে কোনও দুঃখের স্বপ্ন দেখছে।

সন্তুর গায়ে ধাক্কা দিয়ে ছোড়দি ডাকল, এই সন্তু, সন্তু! ওঠ!

দুবার ডাকতেই সন্তু চোখ মেলে তাকাল। কিন্তু কোনও কথা বলল না।

ছোড়দি জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে রে? মুখখানা এমন কেন? কী স্বপ্ন দেখছিলি?

এবারেও সন্তু কোনও উত্তর দিল না। মনে-মনে বলল, আজকের সকালের পর আর তাকে কেউ ভালবাসবে না।

ছোড়দি আদর করে সন্তুর হাত ধরে উঠিয়ে দিয়ে বলল, আমন শুকনো মুখ করে আছিস কেন? চল, নীচে চল।

হঠাৎ সন্তুর মনে পড়ল, আজ রবিবার। আজ তো স্কুল খোলা থাকবে না। রেজাল্ট তো আনতে হবে ইস্কুল থেকে। তা হলে আর-একটা দিন সময় পাওয়া গেল! কালকের আগে তার রেজাল্ট জানা যাবে না।

দ্বিতীয় কাপ চা পেয়ে বাবা বললেন, আঃ, এখনও কাগজ এল না?

ছোড়দি বলল, দেখছি আর একবার।

ছোড়দি ছুটে গেল বারান্দায়।

সন্তুর জন্য মা স্পেশাল চা বানিয়ে দিয়েছেন। অনেকখানি দুধের মধ্যে একটুখানি চা। তা-ও কাপে নয়, বড় গেলাসে। সেই গেলাসটা ধরে সন্তু গোঁজ হয়ে বসে আছে।

এবারে ছোড়দি টবের আড়াল থেকে কাগজটা পেয়ে গেল। সূতো খুলে প্রথম পাতাটা পড়তে-পড়তে এগিয়ে এসে বলল, আজ মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে!

সন্তু যেন পাথর হয়ে গেছে, তার নিশ্বাস বন্ধ। মা বললেন, তাই নাকি? এই সন্তু, তোদের আজ রেজাল্ট বেরুবে, তুই জানতিস না?

সন্তু অন্যদিকে তাকিয়ে থেকে এমনভাবে একটু আস্তে মাথা নাড়ল যার মানে হ্যাঁ-ও হয়, না-ও হয়।

বাবা বললেন, তোর রেজাল্ট তো ইস্কুলে আসবে! এক্ষুনি ইস্কুলে চলে যা!

সন্তু খসখসে গলায় বলল, আজ রবিবার!

ছোড়দি বলল, আমাদের সময় তো কলেজ স্ট্রীটে রেজাল্ট ছাপা বই বিক্রি হত। এখন হয় না?

বাবা বললেন, কী জানি! কিন্তু রবিবার হলেও আজ ইস্কুল খোলা রাখবে নিশ্চয়ই। ছেলেরা রেজাল্ট আনতে যাবে না?

ছোড়দি বলল, এই তো ফার্স্ট বয়। আর ফার্স্ট গার্লের ছবি বেরিয়েছে। ফার্স্ট হয়েছে সৌমিত্র বসু, নরেন্দ্রপুর। আর মেয়েদের মধ্যে ফার্স্ট হচ্ছে কাকলি ভট্টাচাৰ্য, বীরভুম। সেকেন্ডেরও নাম দিয়েছে। ওমা, এক সঙ্গে দুজন সেকেণ্ড হয়েছে, ব্র্যাকেট, অভিজিৎ দত্ত আর সিদ্ধার্থ ঘোষ। সন্তু, তুই এদের কারুকে চিনিস নাকি রে?

সন্তুর উত্তর দেবার ক্ষমতা নেই। এক্ষুনি যেন তার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসবে। ক্রমশই তার বদ্ধমূলক ধারণা হয়ে যাচ্ছে যে, সে ফেল করেছে!

কান্না লুকোবার জন্য সন্তু বাথরুমে ছুটে চলে গেল।

ছোড়াদির কাছ থেকে কাগজটা নিয়ে নিলেন বাবা। অন্য খবরের বদলে তিনি রেজাল্টের খবরটা পড়তে লাগলেন মন দিয়ে। খবরের কাগজের লোকেরা কী করে আগে থেকে খবর পেয়ে যায়? কালকের রাত্তিরের মধ্যেই ফার্স্ট হওয়া ছেলেমেয়েদের বাড়ির ঠিকানা খুঁজে হাজির হয়েছে, ছবি তুলেছে, তাদের বাবা-মায়ের ইন্টারভিউ নিয়েছে। কাকলি ভট্টাচার্যের মা বলেছেন, তাঁর মেয়ে লেখাপড়াতেও যত ভাল, খেলাধুলোতেও তো। অনেক মেডেল পেয়েছে।

কাগজ পড়তে-পড়তে বাবা হঠাৎ এক সময় বলে উঠলেন, এঃ রাম!

মা জিজ্ঞেস করলেন, কী হল?

বাবা বললেন, দেখেছ, কাণ্ড! আমাদের সন্তুটা কী খারাপ করেছে!

মা আর ছোড়দি দুজনেই এক সঙ্গে চমকে উঠে বলল, অ্যাঁ? কী বললে?

বাবা বললেন, এই তো প্ৰথম দশজনের নাম দিয়েছে। তার মধ্যে দেখছি তলার দিকে সন্তুর নাম।

মা আর ছোড়দি ততক্ষণে দুপাশ দিয়ে কাগজের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে।

মা বললেন, কই কই?

ছোড়দি বলল, এই তো, সুনন্দ রায়চৌধুরী। বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট ইস্কুল!

বাবা জিজ্ঞেস করলেন, এ আমাদের সন্তুই তো?

মা বললেন, তবে আবার কে হবে! ওর নাম রয়েছে, ইস্কুলের নাম রয়েছে…সন্তু, এই সন্তু, কোথায় গেলি?

বাবা বললেন, ওদের ইস্কুলে ঐ নামে অন্য কোনও ছেলে নেই তো?

মা বললেন, আহা হা! অদ্ভুত কথা তোমার। ওদের ক্লাসে ঠিক ঐ নামে

আর কেউ থাকলে সন্তু আমাদের এতদিন বলত না? সন্তু, কোথায় গেল! এই সন্তু–

বাবা কাগজটা সরিয়ে রেখে দিয়ে বললেন, ছি ছি!

মা দারুণ অবাক হয়ে গেলেন। চোখ বড় বড় করে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, তার মানে? ছেলে এত ভাল রেজাল্ট করেছে, আর তুমি ছি ছি?

বাবা বললেন, ফিফথ হল। ফার্স্ট হতে পারল না?

মা বললেন, ফিফথ হওয়াই কি কম নাকি? যথেষ্ট ভাল করেছে। আমি তো আশাই করিনি-

বাবা বললেন, যে ফিফথ হতে পারে, সে আর-একটু মন দিয়ে পড়লে ফাস্টও হতে পারত!

ছোড়দি বলল, ভাল হয়েছে সন্তু ফার্স্ট হয়নি! ও ফার্স্ট হলে সৌমিত্র বসু সেকেণ্ড হত! তা বলে তার বাবার মনে দুঃখ হত না?

মা বললেন, ছেলেটা বাথরুমে ঢুকে বসে রইল, নিশ্চয়ই এখনও কিছুই জানে না! এই মুন্নি, ওকে ডাক না।

ছোড়দি ছুটে গিয়ে বাথরুমের দরজায় দুম-দুম করে কিল মেরে বলল। এই সন্তু, সন্তু!

সন্তু কোনও সাড়া দিল না।

ছোড়দি বলল, শিগগির বেরো! কী বোকার মতন এতক্ষণ বাথরুমে বসে আছিস।

সন্তুর ইচ্ছে, সে আজ সারাদিন আর বাথরুম থেকে বেরুবে না। এইখানেই বসে থাকবে।

দরজা খোল না। কী হয়েছে, জানিস? কাগজে বেরিয়েছে, তুই ফিফথ হয়েছিস।

একটা পিংপং বলা যেন সন্তুর বুকের মধ্যে নোচানাচি করতে লাগল। কী বলল ছোড়দি? সে ভুল শোনেনি তো!

খটাস করে বাথরুমের দরজা খুলে সন্তু জিজ্ঞেস করল, কী বললে?

তুই ফিফথ হয়েছিস।

ঠাট্টা করছ আমার সঙ্গে?

কাগজে নাম ছাপা হয়েছে তোর। দেখবি আয় বোকারাম?

ফিফথ হওয়ার ব্যাপারটায় তেমন গুরুত্ব দিল না। সন্তু। তার মানে সে পাশ করেছে? সত্যি সত্যি পাশ! ইস্কুলের পড়া শেষ!

সন্তু ছুটে গেল কাগজ দেখতে।

সেই মুহূর্তে টেলিফোন বেজে উঠল। সন্তুর এক মামা ফোন করেছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কাগজে মাধ্যমিকের রেজাল্টে এক সুনন্দ রায় চৌধুরীর নাম দেখছি। ওকি আমাদের সন্তু নাকি?

ছোড়দি বলল, হ্যাঁ। বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই ইস্কুলের নামও তো রয়েছে পাশে।

মামা বললেন, কোথায় সন্তু। দে না তাকে ফোনটা। তাকে কনগ্রচুলেশানস জানাই।

মায়ের মুখখানা আনন্দে ঝলমল করছে। বাবার মুখখানা কিন্তু দুঃখী-দুঃখী। তিনি বললেন, যাই বলো, ফিফথ হওয়ার কোনও মনে হয় না। ফাস্ট-সেকেন্ড হতে পারলে তবু একটা কথা। নইলে ফিফথই হও আর টুয়েলফথই হও, একই কথা!

ছোড়দি বলল, মোটেই এক কথা নয়। দশ জনের মধ্যে নাম থাকা মানে তো সন্তু স্কলারশিপ পাবে।

মা বললেন, পাবেই তো! তাও তো এ-বছর ওর কতগুলো দিন সেই নষ্ট হয়েছে নেপালে! পড়ার বইয়ের চেয়ে গল্পের বই ও বেশি পড়ে—।

সন্তু ফোন ছেড়ে দিতেই মা ওকে জড়িয়ে ধরে বললেন, তুই ফার্স্ট ডিভিশন পেলেই আমরা খুশি হতুম রে সন্তু! তুই যে এতখানি ভাল করবি…। যা, বাবাকে প্ৰণাম কর!

ছোড়দি বলল, মা, দারুণ একটা খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে কিন্তু। সন্তুর সব বন্ধুদের ডেকে-

সন্তু এখনও ভাল করে কথা বলতে পারছে না। সে এতই অবাক হয়ে গেছে! পাশ করা সম্পর্কেই তার সন্দেহ ছিল, আর সে কিনা স্কলারশিপ পেয়ে গেল!

বাবা বললেন, ফার্স্ট হলে কাগজে ওর ছবি ছাপা হত!

মা বললেন, ফের তুমি ওরকম কথা বলছ? নেপালে সেবার ঐ রকম কাণ্ড করবার পর প্রত্যেকটা কাগজে সন্তুর ছবি বেরিয়েছিল তোমার মনে নেই? এর চেয়ে অনেক বড় ছবি।

এই সময় কাকাবাবু ফিরলেন বাইরে থেকে। ঘরে ঢুকে বললেন, কী ব্যাপার। এত গোলমাল কিসের?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *