গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প

গরম ভাত অথবা নিছক ভূতের গল্প
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

ওরা আসে নিশুতি রাতে। প্রতি অমাবস্যায়।

তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার চারদিক শুনশান অদৃশ্যা মনে হয় এখানে কেউ বেঁচে নেই, কোনো বাড়িঘর নেই। বাতাসে গাছের ডগাগুলো কাঁপে, বাঁশবনে একটা বাঁশের সঙ্গে আর একটা বাঁশের ঘষা লেগে শব্দ হয় কর-র-র কর, কর-র-র কর! লিচু গাছে ঝাঁক বেঁধে বসে বাদুড়, দু’একটা প্যাঁচা খ্যারখেরে গলায় ডাকে, পাঁচলা মোড়ের বড় অশথ গাছটায় একটা তক্ষক ঠিক সাতবার তকখোতকখো করে ঐ তক্ষকটা নাকি সাড়ে তিনশো বছর ধরে বেঁচে আছে।

সেই সময় ওরা আসে। ঝুমঝুম ঝুমঝুম শব্দের সঙ্গে লণ্ঠনের আলোয় কাঁপতে থাকে কয়েকটা ছায়া।

তখন শোনা যায় খকর খক করে কোনো পুরোনো রুগীর কাশির শব্দ, দু’একটা শিশু তেড়ে কেঁদে ওঠো তখন বোঝা যায়, এই অন্ধকার-ঢাকা নিস্তব্ধ ভূমিতেও মানুষের জীবন বহমান।

দু’একটা জানলা খুলে যায়। দাওয়ায় এসে দাঁড়ায় কয়েকটি ছায়ামূর্তিা আলো ও ঝুমঝুম শব্দ কাছে এগিয়ে আসে তারা পাঁচলা মোড়ের অশথতলায় থামো।

মোট এগারোজন উঠতি বয়েসের ছেলে। তাদের সঙ্গে দুটি লণ্ঠনা দু’জনের হাতে দুটি বর্শা, চারজনের পায়ে ঘুঙুর বাঁধা। লণ্ঠন দুটো মাটিতে রেখে তারা প্রথমে শীত কাটাবার জন্য হাতে হাত ঘষে, শরীরের যেখানে সেখানে ধপাধপ করে চাপড়ে মশা মারে। তারপর তারা সকলে মিলে বিকট মোটা গলায় একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে

হে রে রে রে রে রে রে
জাগো রে, গ্রামবাসিগণ জাগো রে।

পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ এই চারদিকে ফিরে ফিরে তারা চারবার হুঙ্কার দেয় একরকম তারপর অন্যরা গোল হয়ে ঘিরে দাঁড়ালে তার মধ্যিখানে এসে ঘুঙুর পরা চারজন পা ঝুমঝুমোয়া সবাই তালে তালে হাততালি দেয়। হঠাৎ শুরু হয়ে যায় গান

ভূত কিনিতে এয়েছি ভাই ভূত কিনিতে এয়েছি
ভূতের তেলে ওষুধ হবে স্বপ্ন আদেশ পেয়েছি।
বিপিন খুড়োর নতুন কলে
তুলসীপাতা গঙ্গাজলে
ভূতের কেঠো হাড়ের গুঁড়ো মিশায়ে রস খেয়েছি
ভূত কিনিতে এয়েছি ভাই ভূত কিনিতে এয়েছি।

তাদের সেই তারস্বরে গান ও ঘুঙুরের শব্দে অশথগাছের কয়েকটি কাক হঠাৎ ঘুম ভেঙে কা কা-কা করে ওঠো দু’তিনটে শেয়াল ছুটে পালায়। কাছেই কোনো বাড়ির দাওয়ায় তামাক টানার মটমট শব্দ শোনা যায়।

ওরা আবার গায়
ভূতের নাতি ভূতের পুতি বুড়ো হাবড়া ছোঁড়াছুঁড়ি
যেমন তেমন ভূত পেলে ভাই হবে না আর ছাড়াছাড়ি।
মামদো ভূত বা ব্রহ্মদৈত্যি
দেখাও যদি তিন সত্যি
দশটি করে টাকা পাবে হাতে হাতে দোকানদারি
সেই টাকায় খাও মণ্ডা মিঠাই করে সবে কাড়াকাড়ি।
ভূত জিনিতে, ও ভাই ভূত জিনিতে
ভূত কিনিতে, ও ভাই ভূত কিনিতে
ভূত জিনিতে এয়েছি ভাই ভূত কিনিতে এয়েছি
ভূতের তেলে ওষুধ হবে স্বপ্ন আদেশ পেয়েছি।
দশ টাকা! দশটাকা! দশ টাকা!
এক এক ভূত দশটাকা! হাতে হাতে গরমাগরম। দশটাকা।

গান শেষ করার পরও নাচ থামতে চায় না। বিশেষত বেঁটে নিতাইয়ের। সে নাচতে ভালোবাসে। সুরেন্দ্র তার দিকে একটা বিড়ি এগিয়ে দিয়ে বলে, নে, খা। তখন নিতাই থামে। সুরেন্দ্রর বুকখানা লোহার দরজার মতন। মাথায় ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল, হাতে একটা বর্শা। তার চোখে মুখে বেশ একটা তৃপ্ত ভাবা গানখানি সেই বেঁধেছে কিন্তু নিজে গাইতে পারে না। অন্যরা যখন গায়, তখন সে হাততালি দেয় চোখ বুজে।

আর একটা বর্শা বিনোদের হাতে সে বর্শাটিকে পতাকা দণ্ডের মতন সামনে ঝুঁকিয়ে ধরে আছে। সেই বর্শার সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা একটি জন্তু জন্তুটা একবার ছটফট করতেই বিনোদ বলে, আরে শালা, এখনো তেজ যায়নি।

বর্শাটা ঘুরিয়ে সে জন্তুটাকে একবার মাটিতে আছড়ায়। ঝনঝন করে শব্দ ওঠে।

সকলে বিড়ি ধরিয়ে একটু বিশ্রাম নেয়। এর পরের গান হবে মালো পাড়ায় বটগাছের নীচে।

সুরেন্দ্র রাস্তা ধরে খানিকটা এগিয়ে গিয়ে হাঁক মারে, ও পবন ঠাউদ্দা, জেগে আছো নাকি?

যে বাড়ির দাওয়া থেকে তামাক টানার মটমট শব্দ আসছে, সেখান থেকে উত্তর আসে আছি রে! আয়, আয় ইদিকে!

পবনের বয়েস চার কুড়ি, পাঁচ কুড়ি তা সে নিজেই জানে না। শরীরটা বেঁকে গেছে। সব ক’খানা হাড় পরিষ্কার গোনা যায়। তার পাঁচ ছেলের মধ্যে তিনজন মারা গেছে, দুটি নাতিও গত হয়েছে কিন্তু পবনের আর যাওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।

সবাই এসে ঐ দাওয়ায় বসে লণ্ঠন দুটো নামিয়ে রাখে পাশে যে যে নেচেছিল, এই শীতের মধ্যেও তাদের গায়ে চকচক করে ঘাম।

নিতাই জিজ্ঞেস করে, জলের কলসীটা কোথায়, ঠাকুদ্দার বাইরে আছে নাকি?

পবনের ছোট ছেলে নিবারণও উঠে এসেছে চোখ মুছতে মুছতে সে এক ঘটি জল নিয়ে আসো নিতাই আলগোছে টাগরা ভিজিয়ে প্রায় অর্ধেকটা জল শেষ করে দেয়। নিবারণের ছেলেমেয়ে দুটো দরজার পাশ থেকে কুতকুত করে চেয়ে দেখো

পবন একবার কোটা পাশে নামিয়ে রাখতেই বিনোদ সেটা তুলে নিয়ে টান মারে। তারপরই মুখবিকৃতি করে বলে, এ রাম রাম! এটা কি ঠাউদ্দা? একি তামাক?

পবন ফোকলা দাঁতে ফ্যাকফ্যাক করে হাসে খুব মজা পেয়েছে সে।

নিতাইয়ের পাশে বসা ঘনাই বললো, কেন, কি হয়েছে? দেখি তো?

ঘনাইও হুঁকোতে টান মারে, সঙ্গে সঙ্গে ওয়াক থু থু করে ওঠে।

পবন হাসতে হাসতে বলে, তোরা পারবি না। একেলে ছেলে তো আমার সহ্য হয়।

—এ তো তামাক নয়, এটা কী খাচ্ছো তুমি?

—তামাক পাবো কোথায়? তামাকের দাম কত জানিস? আমার ছেলে আমাকে তামাক কিনে দেবে? একটা পয়সা ঠেকায় না!

—তবে কল্কেতে তুমি কী ভরেছো?

—অনেক কালের তামাক টানা অভ্যেস, না মলে যাবে না তামাক পাই না, তাই শুকনো আমপাতা আর একটুখানি গোবর দিয়ে মশলা তৈরি করেছি। আমার তো বেশ লাগে।

—অ্যাঁ! থুঃ! অভক্তি!

তামাকের বদলে দুজনকে গোবর খাইয়ে খুব হাসতে থাকে পবন।

নিবারণ তার বাপের উদ্দেশে বলে, মরণকালে বুদ্ধিশুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে একেবারে!

নিতাই আর ঘনাই কয়েকটা চোখাচোখা গালাগাল দেয়া নিবারণের ছেলেমেয়ে দুটি দরজার পাশ থেকে হিহি করে হাসে।

পবন অন্যদের মন্তব্য অগ্রাহ্য করে। কিন্তু ছেলের উদ্দেশে বলে, মরার খোঁটা দিচ্ছিস কেন রে? আয়ু যখন ফুরোবে, তখন মরবে।! তার আগে কথা কী?  

নিবারণ বললো, ফের যদি তোমাকে গোবর নিয়ে ঘাঁটাঘাটি করতে দেখি—

সুরেন্দ্র মাঝখানে বাধা দিয়ে বললো, আহা থাক। এই নাও ঠাউদ্দা, একটা বিড়ি খাবা নাকি?

পবন বিড়িটা খপ করে তুলে নিয়ে বললো, বেঁচে থাক, বাবা। ধনে পুত্রে লক্ষ্মী লাভ হোক। আর একটা বিড়ি দিবি? কাল সকালে খাবো।

সুরেন্দ্র জিজ্ঞেস করলো, ঠাউদ্দা, ভূত-টুতের সন্ধান পেলে না একটাও? তুমি তো জানতে অনেক?

পবন বললো, জানতাম তো দেখিছিও কতা নিজের চোখে দেখিছি। বাড়ির কাছে, এই পাঁচলা অশথতলায় পেত্নী দাঁড়িয়ে থাকতে দেখিছি। একবার পড়েছিলাম মেছোভূতের পাল্লায়। হিজলমারির বিল থেকে মাছ ধরে নে আসছি। অমনি সেই শালা ভূত আমার পেছু নেছে। দু’কদম যাই আর সে বলে, মাঁছ দে না—ও বন, মাঁছ পেঁ নাঁ—তারপর দেখি একটা না তিনডে ভূত, শেষমেষ আমি মাছ ফেলে-ফালে দে দৌড়–

—তা একটা ভূত ধরে দিতে পারলে না?

—এখন তো আর দেখি না তোদের দেখলি বোধ হয় ভয় পায়। এই তো পরশুদিন সন্ধ্যেবেলা আমি এই দাওয়ায় বসে বসে হুঁকো টানছি, দেখি কি, গোয়ালঘরের পাশ দিয়ে লাল বেনারসী শাড়ি পরা এক বউ পিদিম হাতে নিয়ে পুকুরঘাটের দিকে যাচ্ছে। পষ্ট দেখলাম আমি ডাকলাম, ও মা, তুমি কে? কোথায় যাও? তা কোনো সাড়াও দেয় না।

—সে তুমি নিবারণকা’র বউকে দেখেছো।

—হা আমার পোড়া কপাল! আমার ছেলের বউ বেনারসী শাড়ি পাবে কোথায় রে ছোঁড়া! তার একখানাও জ্যান্ত শাড়ি আছে কিনা সন্দেহা এ দেখলাম এক সোন্দর বউমানুষ, গা-ভর্তি গয়না

—দৌড়ে গিয়ে জাপটে ধরলে না কেন?

—আমার কি পায়ে সে জোর আছে? নেবারণও তখন বাড়িতে ছেলে না—আমি তারে দুবার। ডাকতে না ডাকতেই চোখের সামনে অদিরিশ্য হয়ে গেল। হ্যাঁরে সুরেন, সত্যিই ভূত ধরলে তুই দশ টাকা দিবি?

—নিশ্চয়ই দেবো। পকেটে টাকা নিয়ে ঘুরছি। নগদানগদি দাম পাবে।

পবন তার ঘোলাটে চোখ মেলে নিজের ছেলের দিকে তাকায় লোভগলায় ঝামটা দিয়ে বলে, একটু বনবাদাড়ে ঘুরলেও তো পারিস নগদা নগদি দশ টাকা এই বাজারে কে দেয়? দশখানা তাগড়াই মানকচুরও দশ টাকা দাম ওঠে না। হাত খালি, বসেই তো আছিস।

নিবারণ বললে, তুমি চুপ করো। ভূত আবার ধরা যায় নাকি? আমি কোনোদিন ভূত দ্যাখলামই না এখন পর্যন্ত!

পবন বিড়বিড় করে বললো, চোখ থাকলেই দেখা যায়। এ গেরামে মোট সতেরোডা সতেরো রকমের ভূত আছে, আমি নিজের চক্ষে দেখিছি। এক-একটা দশটাকা, কম কথা?

বিনোদের বর্শার সঙ্গে বাঁধা প্রাণীটা আবার নড়ে-চড়ে উঠলো।

নিবারণ চমকে উঠে বললো, ওটা কি?

বিনোদ বললো, ওটা একটা শ্যাজা। ওলাইচণ্ডীতলার সামনে রাস্তার ওপর দিয়ে দৌড়ে পালাচ্ছিল, বর্শা দিয়ে গিঁথে ফেললাম। কড়া জান শালার, এখনো মরে নি।

নিবারণের ছেলেমেয়ে দুটি এবার দরজার কাছে দৌড়ে দৌড়ে এলো শজারুটাকে দেখতে বড় বড় কাঁটাগুলো ফুলিয়ে মাটির ওপরে থুবু হয়ে বসে আছে শজারুটা মেয়েটির পরনে একটা ইজের ছেলেটি একেবারে ন্যাংটা। নিবারণ ওদের তাড়া দেয়, যা ঘরে যা, যা! মেয়েটির বয়েস তেরো। সে দুহাত আড়াআড়ি করে রেখেছে বুকের ওপরে এক পলক শজারুটাকে দেখে নিয়ে সে ভেতরে চলে গেল। ছেলেটি নড়লো না।

নিবারণ জিজ্ঞেস করলো, কী করবি এটাকে নিয়ে?

বিনোদ বললো, কেটে মাংস খাবো।

–জ্যান্ত রাখতে পারলে বিককিরি করতে পারতি, ভালো দাম পেতি।

–জ্যান্ত শ্যাজা ধরা কি সোজা কথা? কলাগাছের খোল থাকলে হতো তা তখন পাই কোথায়? শালা এখনও নড়াচড়া করছে, কিন্তু বেশীক্ষণ আর বাঁচবে না। পেটটা এ-ফোঁড় ওফোঁড় করে দিয়েছি।

–শালারা আমার ওঠোনের কচুগাছের তলা খুঁড়ে খেয়ে যায়। কখন আসে, টেরও পাই না। এক একদিন শেষরাতে ঝমঝম শব্দ শুনি, উঠে এসে আর দেখি না।

—ভূত ধরার ঠেঙে শ্যাজা ধরা সোজা, তাও পারিস না?

পবন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। শজারুর মাংসের ভারি চমৎকার স্বাদা লাল লাল মাংস, কত নরম, আর তেলে ভরা। ইস, কতকাল সে মাংসই খায় নি এখান থেকে বিনোদের বাড়ি প্রায় ক্রোশখানেক দূরে। কাল দুপুরবেলা যদি হেঁটে হেঁটে যাওয়া যায়, গিয়ে বলবে, অ বিনোদ, একটু মাংস চাখতে এলাম তাহলে কি আর দেবে না একটু?

কথায় কথায় বেশ সময় গেল। সুরেন্দ্র উঠে দাঁড়িয়ে বললো, চলো এবার যাওয়া যাক। ঠাউদ্দা, তুমি কাছাকাছি বাড়ির সব লোকেদের ডেকে বলল, ভূত খুঁজে দেখুক, এক এক ভূত দশ টাকা ধরতেও হবে না, দেখিয়ে দিলে আমরাই ধরে নেবো, কিন্তু একেবারে চোখের সামনে স্পষ্ট দেখিয়ে দিতে হবে।

—ভূত কিনে তুই কী করবি রে? সত্যিই ভূতের তেল হয়?

সুরেন্দ্র মুচকি হেসে বললো, দেখই না কী হয়। কত লোকের কত রোগ সারিয়ে দেবো।

—তোর জন্য আমার ভয় হয় রে। শেষে তুই-ও ভূতের হাতে মারা যাবি। ওনাদের রাগ তো জানিস না, কোনোদিন বাগে পেলে তোর ঘাড়টা মটকে দেবো।

সুরেন্দ্র হা-হা করে হাসে। কিছুদিন আগে হলেও সে সদর্পে অনেক কথা বলতো। বুক চাপড়ে জানিয়ে দিত, কোনো ভূতের বাপের সাধ্য নাই তার ধারে কাছে আসে। কিন্তু এখন আর সে ওসব কিছু বলে না। ফাদার পেরেরা তাকে নিষেধ করে দিয়েছেন। কথায় শুধু কথা বাড়ে।

পবন আবার বললো, তোর বাপকেও ভূতে ঘাড় মটকেছিল। আমি নিজের চোখে দেখিছি, খাল-পাড়ে পড়েছিল মানুষটা, চোখ দুটো ওল্টানো, ভয়ে কালসিটে পড়ে গিয়েছিল মুখে।

সে কতকাল আগেকার কথা ও কথা শুনলে সুরেন্দ্রর আর দুঃখ হয় না। সে বললো, সেইজন্যই তো ভূত ধরার ব্যবসা খুলিছি। বিনোদের মা শাঁকচুন্নী দেখে পা পিছলে পড়ে গিয়েছিল জলে নেতাইয়ের বাপকে তাড়া করেছিল আলেয়া ভূত। ঘনাইয়ের মামা ভির্মি খেয়েছিল তিনবার চল চল, উঠে পড় সবাই।

কিন্তু ওরা উঠতে গিয়ে দেখলো, দুটো হারিকেনের মধ্যে একটা নেই।

নিতাই বললো, আরে, আর একটা হ্যারকেন কোথায় গেল? এই তো রাখলাম এখানে!

পবন বললো, দুটো তো আনিস নি, একটাই তো ছিল।

বিনোদ জোর দিয়ে বললো, এঃ! দুটো হ্যারিকেন এনে রেখেছি আমরা!

—তা হলে যাবে কোথায়? দ্যাখ না, অশথতলায় ফেলে এসেছিস কিনা। ভুলও তো হতে পারে।

—মোটেই এত ভুল হয় না। নেতাই একটা হ্যারকেন এনেছে, আর সুখেন একটা।

নিবারণ মিনমিন করে বললো, তা হলে হ্যারকেন যাবে কোথায়? চোখের সামনে থেকে তো। ভূতে নিয়ে যায় নি!

সুরেন্দ্র বললো, তোমার ছেলেমেয়ে শ্যাজা দেখতে এয়েছিল। ওদেরই কেউ হাতে বাগিয়ে নিয়ে গেছে।

নিবারণ ঘরের মধ্যটায় উঁকি দিয়ে বললো, কই, ওরা তো নেয় নি, ঘরের মধ্যে অন্ধকার!

নিতাই বললো, ওসব চালাকি করো না নিবারণকা। আমরা ঘরের মধ্যে খুঁজে দেখবো। একি মামদোবাজি?

নিবারণ বললো, ঘরের মধ্যে তোর কাকী শুয়ে আছে, আর তুই ঘরে ঢুকবি? আমাদের চোর ভেবেচিস?

—তা হলে হ্যারকেন গেল কোথায়?

—আমরা হ্যারিকেন নিয়ে কী করবো রে গুয়োরব্যাটা? এক ফোঁটা ক্রাচিন কেনার মুরোদ আছে আমার? ঘরে একটা পয়সা নেই। দুদিন চাল কিনিনি।

ছেলেকে সমর্থন করে পবন বললো, পয়সা থাকলে আমি গোবর পুড়িয়ে খাই?

সুরেন্দ্র বললো, তোমার ছেলেমেয়েদের ডাকো নিবারণকা। আমি ওদের জিজ্ঞেস করবো।

গলার আওয়াজ পিতা-উচিত গম্ভীর করে নিবারণ ডাকলো, পান্তি, গেনু, ইদিকে একবার শুনে যা!

মেয়েটি বেরুলো না, এলো ছেলেটি।

সুরেন্দ্রর আগে নিবারণই জিজ্ঞেস করলো, হ্যারকেন নিয়েছিস? ছেলে দুদিকে মাথা নেড়ে শুকনো গলায় বললো, আমি নিইনি।

সুরেন্দ্রজিজ্ঞেস করলো, এই গেনু, তোর দিদি কোথায়?

গেনু বাড়ির পেছনের অন্ধকারের দিকে হাত দেখিয়ে উত্তর দিল, ঐ সেথায় গেছে।

—কেন, ঐদিকে গেছে কেন?

—মার সঙ্গে গেছে।

নিতাই ঠাট্টার সুরে বললো, নিবারণকা, তোমার বউ-মেয়েতে মিলে ভূত খুঁজতে গেছে নাকি?

পবন ধমক দিয়ে বললো, অমন অনাছিষ্টি কথা কবিনে নেতাই পোয়াতী বউ রাতবিরেতে যাবে ভূতের সন্ধানে? আঁটকুড়ি পেত্নীর নজর লাগলে পেটের ছেলে পেটেই মরে থাকবে। বাহ্যিখানার ওধারে আমি কতদিন পেত্নী দেখিছি।

নিতাই ঝংকার দিয়ে বললো, তাহলে পুতের বউ রাতবিরেতে ওদিকে যায় কেন? নিবারণ বললো, তোর কাকীর উদুরী অসুখ আছে।

—তা আমাদের হ্যারকেন নিয়ে গেছে, বলে গেলেই পারতো!

—কে তোদের হ্যারকেন নেছে? নিলে আমরা দেখতে পেতাম না?

—আরে, এ তো মহাজ্বালা! আমাদের হ্যারকেন কি শূন্যে উড়ে গেল।

সুরেন্দ্র বললো, চল, ওদিকে গিয়ে দেখে আসি।

পবন কিংবা নিবারণ নড়লো না। অন্যরা দল বেঁধে গেল বাড়ির পেছনের অন্ধকারের দিকে।

খানিকটা দূরেই একটা আমলকী গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছে পান্তি। এই শীতের মধ্যেও তার কোমরে ইজের আর খালি গা কিশোরী মেয়ের বুকে যে জিনিস শব্দ করে তার যৌবনের আগমন জানান দেয়, সে সেখানে তার দু’হাত চাপা দিয়ে আছে।

ওদের দেখেই সে তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো, ইদিকে আসবেন নে, ইদিকে আসবেন নে!

কাছেই একটা ঝোপের আড়ালে হারিকেনের ক্ষীণ আলো সেদিকে একপলক তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিয়ে সুরেন্দ্র বললো, হ্যারকেনটা জিজ্ঞেস করে আনিস নি কেন? আমরা পাঁচলা মোড়ে দাঁড়াচ্ছি, কাজ হয়ে গেলে দিয়ে যাবি।

নিতাই রসিকতা করে বললো, আর ওদিকে পেত্নী-টেত্নী দেখলে আমাদের চেঁচিয়ে ডাকিস, কপাৎ করে গিয়ে ধরে নে আসবো! দশ টাকা পাবি।

ঘরের দাওয়ায় বসে পবন বললো, খালধারে চৌধুরীবাড়ির বাবু একবার একটা ভূত ধরিছিলেন, জীবন্ত কঙ্কাল। কত ঝটাপটি করিছিল, কিন্তু কর্তাবাবু দড়ি দিয়ে বেঁধে ফ্যাললেন। আহা, আমাদের ভাগ্যে ওরকম হয় না। নগদ দশটা টাকা, সাতসের চাল খরিদ করা যায়!

গেনু জিজ্ঞেস করলো, দাদু, তুমি সত্যি ভূত দেখেছো?

পবন বললো, হ্যাঁরে দাদু, কতবার!

—আমাকে, একবার দেখাবে? দূর থেকে একবারটি দেখবো!

—দেখবি, ভাগ্যে থাকলে ঠিকই দেখবি। তবে না দেখাই ভালো।

দূরের দলটার দিকে তাকিয়ে নিবারণ বললো, শালাদের বড় টাকার গরমাই হয়েছে!

একটু পরে ঘুঙুরের রুনুরুনু শব্দ তুলে ওরা আবার চলে গেল দূরে হারিকেনের আলোও মিলিয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে অমাবস্যার রাত্রির মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল বাড়িটা।

সুরেন্দ্রকে নিয়ে গ্রামের লোক খুব ধন্দে পড়েছে। বেশ কিছুদিন সবাই ভুলেই ছিল ওর কথা। ওর বাপ মারা যাবার পর ওদের বংশটাই মরে হেজে যেতে বসেছিল। ওর যখন বারো তেরো বছর বয়েস, তখন চৌধুরীবাবুদের বাড়িতে রাখালি করতো। একদিন মেজোবাবুর চটি জোড়া পড়ে ছিল বৈঠকখানার সিঁড়িতে, ও ছোঁড়াটা সেটা হাত দিয়ে না সরিয়ে পা দিয়ে সরাতে গিয়েছিল, অমনি চোখে পড়ে গেল মেজোবাবুর। প্রচণ্ড ঠ্যাঙানি খেয়ে ধুকতে লাগলো উঠোনে পড়ে। ছোঁড়ার নাকি চুরি-টুরির হাতটানও হয়েছিল। ঠ্যাঙানি খাবার দিন বিকেলবেলা ছোঁড়া গ্রাম ছেড়ে পালালো। তারপর শোন। গিয়েছিল ছোঁড়াটা শহরে গিয়ে সাইকেলের দোকানে পাম্প দেয়। তারপর কেউ ওর খোঁজ রাখে নি।

সে এখন আবার ফিরে এসেছে মস্তো জোয়ান মদ্দ হয়ে। কোন ফেকটরিতে নাকি কাজ করে, গায়ে রঙিন রঙিন জামা, হাতে ঘড়ি। বিড়ির বদলে সিগ্রেটই বেশী খায়। একদিন চৌধুরীবাবুদের বাড়ির সামনে গিয়ে থুক করে থুথু ফেললে। একবার না, তিনবার। এমন কাণ্ড এ গ্রামে কেউ কক্ষনো করে নি।

ও-বাড়িতে অবশ্য কত্তাবাবুরা কেউ থাকেন না এখন এক গোমস্তা শুধু টিমটিম করছে। গোমস্তাবাবু বুড়োমানুষ, তিনি আর কী করবেন, ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখলেন শুধু পাইক বরকন্দাজ তো নেই আর একটাও এখন সংবৎসরের ধানই ওঠে না।

গ্রামে কতকগুলান চ্যালা-চামুণ্ডা জুটেছে সুরেন্দ্রর। ফি-হপ্তায় শনি-রবিবার সে বাড়ি আসে। নিজেদের পোড়ো ভিটেয় আবার ঘর তুলেছে, সেখানে চ্যালাগুলোকে নিয়ে হুল্লোট করে খাওয়া দাওয়া ভালোই জোটে কিনা ওখানে। গত মাসে ওরা পূর্বপাড়ার বহুকালের মজা দীঘিটা সাফ করতে গিয়েছিল সাফ হয়েছে না ঘেঁচু হয়েছে, শুধু জলে নেমে দাপাদাপি সবাই জানে, ঐ দীঘিতে যখ আছে, প্রতি বছর একজন করে মানুষ টেনে নেয়। ওদের দলেরও একজন মরতে বসেছিল। মাঝপুকুরে ডুব দিয়ে মাটি তুলতে গিয়ে আর দম পায় নি। হাঁক-পাঁক করতে করতে যখন উঠলো তখন মুখখানা নীল হয়ে গেছে। তবু ওদের আক্কেল হয় নি, আবার সামনের হপ্তায় নামবে।

আর এক ঢং হয়েছে, অমাবস্যার রাত্তিরে দল বেঁধে কেত্তন গাইতে গাইতে ঘোরে। গাঁয়ের অকর্মা ছোঁড়াগুলো এই এক কাজ পেয়েছে। সুরেন্দ্র নিশ্চয় ওদের নেশাভাঙের খরচাপাতি দেয়। কয়েকজনকে নাকি শহরের ফেকটরিতে চাকরিও জুটিয়ে দেবে বলেছে। সেটাই বড় টোপা।

ভূত কেনার অছিলায় সুরেন্দ্র কী বলতে চায়, তা অনেকেই বুঝেছে। সবাই তো আর ঘাসে মুখ দিয়ে থাকে না। কিন্তু এতকাল এতলোক যা নিজের চক্ষে দেখেছে, তা মিথ্যে হয়ে যাবে? আর

ভূতগুলোও হয়েছে মহা ফেরেববাজ, সুরেন্দ্রর দল দেখলে কিছুতেই সামনে আসে না। ভূতেরাও। ওকে ভয় পায়। যা ষণ্ডামার্কা চেহারা, ভূতের বাবাও ওকে ভয় পাবো

দিন দিন তেজ বাড়ছে সুরেন্দ্রর ক্রমাগতই রেট বাড়াচ্ছে সো আগে ছিল দশ টাকা, তারপর বিশ, তারপর পঞ্চাশ, এখন একেবারে একশো টাকায় তুলেছে। এক ভূত ধরায়ে দিলে একশো টাকা। ধরাতেও হবে না, দূর থেকে দেখায়ে দিলেই হবে, আর দু’জন সাক্ষী রেখে দেখালেই হবে। একশো টাকা শুনলেই মাথার রক্ত ছনছন করো এ বাজারে একশো টাকা কে দেয়? মানুষের জীবনের দাম নাই, আর একখানা ভূতের দাম একশো টাকা! শালাকে ভূতে ঘাড় মটকায় না কেন?নাকি ভূতেরাই নিজেদের দাম চড়াচ্ছে আর আড়ালে বসে মিটিমিটি হাসছে!

সুরেন্দ্র নাকি প্রথম প্রথম গাঁয়ে এসে নিতাইদের বলেছিল, মানুষের আত্মা বলে কিছু নাই। কথাটা শুনলেই গা ছমছম করে। মানুষের আত্মা নাই? তাহলে কোথা থেকে আসা আর কোথায় যাওয়া? এ-জন্মে দুঃখ কষ্ট সহ্য করলেও পরকালে সুখের আশা থাকে। আত্মাই যদি না থাকে, তা হলে আর পরকাল কী? হারামজাদা! এসব কথা যে বলে, মেরে তার মুখ ভেঙে দিতে হয়! প্রথমটা শুনেই মনে হয়েছিল, সুরেন্দ্র নিশ্চয়ই কেরেস্তান হয়েছে। তাহলে শালাকে একঘরে করার। কোনো অসুবিধে ছিল না। কিন্তু কেরেস্তান তো নয়, গত বছর যে ও ধুমদাম করে দুর্গোপুজো করলে।

দুর্গোপুজো নিয়ে গত বছর একটা কাণ্ডই হয়েছিল। এ-গাঁয়ে একখানাই দুর্গোপুজো হয়, চৌধুরীবাবুদের বারবাড়িতে চিরটাকাল যেমন হয়ে আসছে। গত পাঁচ সাত বছর ধরে বাবুরা কেউ গাঁয়ে আসেন না। জমিদারি লাটে উঠেছে, আয়পত্তর কিছু নেই, তাহলে আর আসবেন কেন? শুধু আছে ঐ এক পেল্লায় ভাঙা বাড়ি বাবুরা আর পুজোর খরচাও দেন না। কিন্তু মায়ের পুজো তো আর বন্ধ হতে পারে না। তাই গাঁয়ের পাঁচজনা মিলে ভাগাভাগি করে খরচাপত্তর দিয়ে পুজোটা সারা হয় নমো নমো করে।

গত বছর সুরেন্দ্র আর তার দলবল বললে, গাঁয়ের লোকের পয়সাতেই যদি পুজো হয় তো সে পুজো হবে গাঁয়ের মাঝখানে চালা বেঁধো জমিদারদের বাড়িতে হবে কেন? যে জমিদারদের কানাকড়ির মুরোদ নেই, সে কেন শুধু শুধু পুণ্যি লুটবে?…ব্যাটার এখনো রাগ আছে চৌধুরীদের ওপরে। যে বাড়িতে বরাবর দুর্গোৎসব হয়, হঠাৎ একবার বন্ধ হয়ে গেলে সে বাড়ির ওপর মায়ের অভিশাপ নেমে আসে। সে কথা সুরেন্দ্র জানো আরে ব্যাটা, জমিদারবাবুরা এখন তো মরমে মরেই আছে, তুই আর এখন কতটা মারবি! অমন দুর্দান্ত ছিলেন মেজোবাবু, তাঁর ছোটছেলে এখন জেল খাটছে। কলেজে পড়ার সময় মার-দাঙ্গা করতে গিয়েছিল। মেজোবাবুর আর এক ছেলে রেলের গার্ডা হে-হে-হে-হে!

শেষ পর্যন্ত সুরেন্দ্র প্রাইমারি স্কুলের মাঠে দুর্গোপুজো করিয়ে ছাড়লে। শহর থেকে চাঁদার বই ছাপিয়ে এনে পয়সা তুললে সব ঘর থেকো দুর্গোপুজোর ঠিক আগেই ধান ওঠে, লোকের হাতে দু-পাঁচটা পয়সা থাকে। গাঁয়ের যে পাঁচটা ভদ্দরলোক আগের বছর পুজোর সময় সদ্দারি করতেন, তেনারাও ওদের সঙ্গে কোনো তক্কো-ঝঞ্চাটে গেলেন না। যে-বাবুরা আগের বছর চাঁদা দিতেন পঁচিশ টাকা, তাঁরা দিলেন পাঁচ টাকা। সুরেন্দ্র মাঠের মাঝখানে ছাউনি বেঁধে মাকে নিয়ে এলো।

অষ্টমী পুজোর দিন মাঝরাতে সুরেন্দ্রর সে কি নাচ! ক’বোতল মাল টেনেছিল কে জানে? চোখ দুটো জবাফুলের মতন লাল, মাথায় ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল, মোষের মতন চেহারা, ব্যাটাকে দেখাচ্ছিল নন্দী-ভৃঙ্গীর মতন। দু’হাতে দুটো ধুনুচি নিয়ে নাচতে নাচতে সে কি মা মা বলে চেল্লানি! নেশার ঝোঁকে পায়ের ঠিক নেই, এক একবার ঢলে পড়ছে, ধুনুচিতে গনগনে আগুন, একবার তা সবসুষ্ঠু হুমড়ি খেয়ে পড়লো। আগুন লেগে যে ওর চোখ দুটো কানা হয় নি, সে ওর। সাত পুরুষের ভাগ্যিা পড়লে তো আর ওঠেই না। ওর শাগরেদরা ওর নাম ধরে ডাকাডাকি করে, হাত ধরে টানাটানি করে, তবু কোনো সাড়া নেই। অতবড় লাশকে টেনে তোলে কার সাধ্যি! শেষ পর্যন্ত নেতাই যখন এক কলসী জল এনে ওর মাথায় ঢেলে দিতে যাবে, সেই সময় নিজেই লাফিয়ে উঠে হো-হো করে হাসতে লাগলো। ঢং! এতক্ষণ ঢং করছিল! যত সব নেশাখোরের কাণ্ড!

মেজোবাবুর যে ছেলে এখন জেল খাটছে, গত বছর পুজোর ঠিক পরপরই এসেছিল একবার গাঁয়ে। সঙ্গে দুই বন্ধু। আগে বাবুরা আসতেন মোটরগাড়িতে, এ ছেলে এলো মোটর সাইকেলে। তা ভালোই করেছে, মোটর সাইকেলের বেশ একখানা জমিদার-জমিদার শব্দ আছে। অতবড় চৌধুরীবাড়ির দু’তিনখানা ঘরও এখন আস্ত আছে কিনা সন্দেহ। উঠলো সেখানেই বুড়ো গোমস্তাবাবু নিশ্চয় ছোটবাবুর কাছে সব লাগানি-ভাঙানি দিয়েছে। পরদিন পাঁচুমুদির দোকানে ছোটবাবু নিজে এসে জিজ্ঞেস করলো, বলতে পারো, সুরেন কোথায় থাকে?

পাঁচুমুদি সাবধানে বললো, কোন সুরেন?

ছোটবাবু বললো, যে এবার গাঁয়ে বারোয়ারি পূজা করিয়েছে! সে নাকি আবার ভূত ধরার দলও গড়েছে?

পাঁচুমুদি বললো, তার বাড়ি তো পাঁচলা মোড় ছাড়িয়ে আরও এক মাইল, গাঁয়ের একেবারে কিনারে। কিন্তু রোজ তো সে গাঁয়ে থাকে না।

কিন্তু সেদিন রবিবার, সুরেন্দ্র ঠিকই থাকবে।

সবাই ভাবলো, এবার সুরেন্দ্রর সঙ্গে লাগবে ছোটবাবুর। অবস্থা পড়ে গেছে, তবু তো জমিদারি রক্ত শরীরে, ফুটফুটে সুন্দর চেহারা এরকম চেহারার মানুষ আজকাল গাঁ দেশে একদম দেখাই যায় না। যখন জমিদারি ছিল, তখন দু’চারজন অন্তত ছিল। এখন সব শহরে।

আগেকার দিন তো নেই যে ছোটবাবু পাইক পাঠিয়ে সুরেন্দ্রকে ধরে এনে জুতাপেটা করবে। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে নিজেই মোটর সাইকেলে চলে গেল ফটফটিয়ে। তারপর সুরেন্দ্রর সঙ্গে তার যে কি কথা হলো, তা কেউ জানে না। তবে খানিকবাদে দেখা গেল, ছোটবাবু আর তার বন্ধুরা হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসছে সুরেন্দ্রর ঘর থেকে। কী একটা কথার পর ছোটবাবু সুরেন্দ্রর কাঁধ চাপড়ে দিতে চায়, কিন্তু সুরেন্দ্র অত্যধিক লম্বা বলে ছোটবাবুর হাত ঠিক মতন পৌঁছোয় না। বরং ছোটবাবু পকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট বার করতেই কিছু জিজ্ঞেস না করে সুরেন্দ্র তার থেকে একটা তুলে নিল। একেই বলে কলিকাল! দূর থেকে নিবারণ এটা নিজের চোখে দেখেছে।

কোনো কারণ না থাকলেও ছোটবাবুর প্যাকেট থেকে সুরেন্দ্রর ঐ সিগ্রেট তুলে নেওয়া দেখে নিবারণের মনে পড়েছিল সুরেন্দ্রর সেই কথা, মানুষের আত্মা নাই’। ওঃ, ভাবলেই যাতনা হয়। অবশ্য সুরেন্দ্র পরে একথা স্বীকার করতে চায়নি। যোগেন মাস্টার জিজ্ঞেস করেছিল।

পাশাপাশি দু’গাঁয়ের মাঝখানে একটা ইস্কুল। সেই ইস্কুলে সরকারী নতুন মাস্টাররা আসে। শুধু থেকে গেল যোগেন মাস্টার। যোগেন মাস্টার বিকেলের দিকে নদীর ধারে একা-একা বসে থেকে সূর্য ডোবা দেখে ভাবুক মানুষ।

সেই যোগেন মাস্টার হাটবারে একদল লোকের মাঝখানে জিজ্ঞেস করেছিলেন, হ্যাঁ গো সুরেন, তুমি নাকি বলেছো মানুষের আত্মা নেই?

সুরেন্দ্র কখনো পড়েনি যোগেন মাস্টারের কাছে। সে বিড়ি লুকোয় না। কিন্তু চ্যাটাং চ্যাটাং কথাও বললো না। ঘাড় চুলকে জবাব দিল, সে তো আপনারাই ভালো জানেনা আমি মুখ্যসুখ মানুষ, আমি কি অত বুঝি? আমি কখনো আত্মা দেখি নাই!

যোগেন মাস্টার গোঁফ-এঁটো-করা হাসিতে মুখ ভরিয়ে বললেন, আরে পাগল, এই যে বাতাসে আমরা নিশ্বাস নিই, সে বাতাস আমরা চোখে দেখতে পাই? তার মানে কি বাতাস নেই?

যারা শুনছিল, তারা মাথা নাড়ল। হ্যাঁ, জব্দ করেছে বটে যোগেন মাস্টার! এবার বল ব্যাটা, বাতাস নাই!

সুরেন্দ্র বললো, বাতাস চোখে দেখা যায় না, কিন্তু ধরা যায়।

যোগেন মাস্টার বললো, বাতাস ধরা যায়? বলো কি হে? কেউ কখনো তা পেরেছে? বুকের মধ্যে একটুখানি বাতাস ধরে রাখখা, অমনি প্রাণ-পাখি ছটফট করে উঠবে। কী, উঠবে না? তোমরা কী বলে?

সকলে মাথা নাড়লো।

কাছেই দাঁড়িয়েছিল একটা বেলুনওয়ালা। সুরেন্দ্র একটা নেতানো বেলুন খপাৎ করে তুলে নিয়ে ফুঁ দিয়ে ফুলিয়ে সেটাকে লাউ করে ফেললো। তারপর সেটার ঠুঁটো চেপে ধরে হাত উঁচিয়ে বললো, এই দ্যাখেন মাস্টারমশাই, বাতাস ধরলাম আপনি বুঝিয়ে দ্যান তো, আত্মাকে ধরা যায় এই ভাবে? আপনি বুঝিয়ে দিলেই আমি মেনে নেবো।

মাস্টার বললো, আত্মাকে ধরবে? ও চিন্তাও করো না বাপা উনি কখনো ধরা-ছোঁওয়া দেন না। নৈনং ছিদ্রন্তি অং বং চং। তার মানে হলো গে, আত্মাকে কখনো ছ্যাঁদা করা যায় না, তাঁকে আগুনে পোড়ানো যায় না, জলে ডোবানো যায় না। আত্মা অজর অমর।

সুরেন্দ্র বললো, মানুষ মরে গেলে যখন তাকে পোড়ানো হয়, তখন কি ফুস করে আত্মটা মুখ দিয়ে বেরিয়ে যায়? কোথায় যায়?

মাস্টার বললো, তখন তা পরমাত্মার সঙ্গে মিশে যায়। পরমাত্মা হলো ঈশ্বর।

সুরেন্দ্র বললো, অ।

মাস্টার বললো, কি, কথাটা পছন্দ হলো না? তুমি মানলে না?

সুরেন্দ্র বললো, মানবো না কেন? আপনার মতোন পড়া-লেখা লোক যখন বলছেন, তখন কি আর ভুল বলবেন?

যোগেন মাস্টারের জয়ে সবাই বেশ খুশী হয়ে অবাকও হয় খানিকটা সকলেই ভেবেছিল, সুরেন্দ্র ফাটাফাটি তক্কো করবে মাস্টারের সঙ্গে। বেলুনটা ফুলিয়ে সে বেশ একটা তাক লাগিয়ে দিয়েছিল তারপর সে এত সহজে মেনে নিল লক্ষ্মী ছেলের মতন?

যোগেন মাস্টার বেশ পরিতৃপ্ত হয়ে সুরেন্দ্রর গা চাপড়ে দিলেন। যেন সে একটা বেশ ভালো। ছাত্তর। তারপর আবার জিজ্ঞেস করলেন, তুই নাকি ভূত ধরার ব্যবসা খুলেছিস?

সুরেন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, আজ্ঞে হ্যাঁ শহরের এক বাবু আমাকে অর্ডার দেছেনা একটা ভূত যোগান দিলেই আড়াইশো টাকা পাবো। আমি কিনবো একশো টাকায়। আমার মোটা লাভ এই দ্যাখেন, এই হাট থেকে ব্যাপারীরা প্যাঁজ কিনে নে যাচ্ছে সাতাশ টাকা মণ দরে। শহরে। পাইকারি রেটে ছাড়বে পঁয়তিরিশ টাকায়। আমিও তেমনি চালানি ব্যবসা ধরেছি।

যোগেন মাস্টার এ হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ করে হেসে উঠলেন।

সুরেন্দ্রও ঠিক সেই তালে তাল মিলিয়ে হাসতে লাগলো। যেন সে সত্যিই বেশ একটা মজার কথা বলেছে।

—পেয়েছিস একটাও?

–না।

—হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ একি ছেলেখেলা! ভূতের ব্যবসার কথা বাপের জন্মে শুনিনি এসব কথা মন থেকে বাদ দাও। এ বড় সাঙ্ঘাতিক জিনিস, কখন কী হয়ে যায় বলা যায় না।

সুরেন্দ্র আবার একটা বিড়ি ধরিয়ে বললো, আপনার বাড়িতে একদিন যাবো মাস্টারমশাই। হাটের মধ্যে দাঁড়িয়ে সব কথা হয় না। আপনি জানেন, আমার বাবাকে ভূতে গলা টিপে মেরেছিল?

মাস্টার বললো, হ্যাঁ শুনেছি।

সুরেন্দ্র বললো, আমার বাবার ট্যাঁকে সেদিন ধান-বেচা টাকা ছিল তার এক আধলাও পাওয়া যায়নি। কে নিল সেই টাকা, আত্মা না পরমাত্মা? কার বেশী টাকার দরকার? আপনার ঠেঙে জেনে আসবো। গাঁয়ের একটা লোকও সেদিন সাক্ষী দেয়নি।

পুরোনো খালটা মজে হেজে গেছে। সরকার থেকেই সেই খালটা নতুন করে কাটাচ্ছে এবার। পাশের গাঁয়ের রহমান সাহেব সেই খাল কাটার ইজারা নিয়েছেন। এ-খাল দিয়ে আবার জল বইলে এ-তল্লাটে চাষের সুবিধে হবে এই কথাটা ভেবে নিবারণ নিজেকে নিজে ভ্যাঙচায়।

আড়াই বিঘে জমি ছিল, গত ফাগুনে তা বন্ধক রাখতে হয়েছে। না রেখে উপায় ছিল না, নিবারণ নিজেই বড় শক্ত অসুখে পড়েছিল যদি তার ছেলে, মেয়ে, বউ বা বাপের অসুখ হতো, সে জমি বন্ধক দিত না কিছুতেই, কিন্তু সে নিজে তাদের সংসারে একমাত্র রোজগেরে পুরুষ, সে মরে গেলে আর সকলকে বাঁচাতে কে? তার বাপ তো তিনকেলে বুড়ো। কুটোটি নাড়ার পর্যন্ত ক্ষমতা নেই। তবু এখনো রাসে খিদে আছে। মরেও না কিছুতেই তার অন্য ভাইরা কেউ বাপকে নেয়নি নিজেদের সংসারে। শুধু নিবারণেরই যত জ্বালা।

মহাজনকে সে বলে রেখেছে, ভাগচাষের স্বত্ব তারই থাকবে। নিজের জমিতেই সে ভাগচাষী হবে। ধান উঠে গেলে ঐ জমিতে সে ফুলকপি বসাবো।

সরকার বাহাদুর খাল কাটাচ্ছেন! আর দু’বছর আগে কাটাতে পারেনি, যখন জমিটুকুন নিবারণের নিজেরই ছিল? এখন ভাগচাষ করে সে সংসারের পেট ভরাবে, না বন্ধকী দেনা শুধবে?

দৈনিক পঞ্চাশজন লোক লাগে খাল কাটার জন্য সারা গাঁয়ের লোক গিয়ে হামলে পড়েছিল। কারুর হাতে এখন কাজ নেই। নিবারণরা বংশ-পেশায় ঘরামী। এখন কাজ জোটে না। এক কাহন খড়ের দাম চব্বিশ টাকা। যাদের হাতে দু’পয়সা আছে, তারা টালি দিয়ে চাল ছাইছে, সেজন্য শহর থেকে মিস্তিরি আসে।

রহমান সাহেব নিজেদের গাঁ সোনামুড়ি থেকেই মাটি কাটার মজুর নিয়েছিলেন পঞ্চাশজন। সেই নিয়ে পরশুদিন খুব হাল্লা হয়ে গেল। খালটা দু’ গাঁয়ের মাঝখানে, তা হলে শুধু এক গাঁয়ের লোক কাজ পাবে কেন? এ-গাঁয়ে কাজের মানুষ নেই?

রহমান সাহেব ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। সব শুনেটুনে উনি ঠিক করে দিয়েছেন, প্রতিদিন এ-গাঁ থেকে পঁচিশজন, ও-গাঁ থেকে পঁচিশজন কাজ পাবে। এক লোক পরপর দু’দিন কাজ পাবে না। সাড়ে চার টাকা রোজ, আর একবেলা খোরাকি।

নিবারণ গতকাল কাজ পেয়েছিল আজ পাবে না। ঘরামীর ছেলে শেষ পর্যন্ত মাটি কাটা কুলি। আজকাল অত কিছু ভাবলে চলে না। ভাত এমন চীজ, খোদার সঙ্গে উনিশ বিশা

আজ তার কাজ নেই, তবু নিবারণ খালধারের দিকে যাচ্ছে। অন্য কোনো কাজও তো নেই এখন, তবু ওসব দেখতে ভালো লাগে।

যেতে যেতে তার বার বার মনে পড়ছে সুরেন্দ্রর কথা। সুরেন্দ্রকে সে কিছুতেই পছন্দ করতে পারছে না। সুরেন্দ্রর স্বাস্থ্য ভালো। পকেটে পয়সা ঝমঝমিয়ে বেড়ায়। এসব মানুষ একবার গ্রাম ছেড়ে শহরে গেলে আর ফেরে না। সুরেন্দ্র ফিরলো কেন? আবার বিদায় হলেই তো পারে। পকেটে তার শয়ে শয়ে টাকা, কিন্তু এমনি তো সে কারুকে দেবে না। ভূত কেনার বায়না! নিবারণের গা জ্বালা করে। একশোটা টাকা পেলে তার এখন কতদিকে সুরাহা হতো। সেই টাকা একজনের পকেটে আছে, অথচ সে পাবে না। এই পৃথিবীতে কারুর থাকে প্রয়োজনের চেয়েও অনেক বেশী, আর কেউ প্রয়োজনটুকুও মেটাতে পারে না, এটাই বুঝি নিয়ম! কতজনে কত ভূত দেখে, তার ভাগ্যে জোটে না একটাও! সন্ধের পর সে এদিক ওদিক তাকিয়ে খোঁজে, চমকে ওঠে দু’একবার, তারপর ভালো করে চোখে কচলে দেখো না, একটা কলাগাছ, কিংবা বেল গাছ। দূর, দূর! তখন আরও রাগ হয় সুরেন্দ্রর ওপর।

খালপাড়ের উঁচু বাঁধটার ওপরে এসে দাঁড়ায় নিবারণা বুক চিতিয়ে নিশ্বাস নেয়। খালি পেটে বেশী হাওয়া খেলে পেট ঘুলিয়ে ওঠো মন খারাপ লাগে। পঞ্চাশটা লোক একসঙ্গে মাটি কাটছে, ওরা যেন সবাই আলাদা, নিবারণ ওদের কেউ নয়। আর খানিক বাদেই ওরা নগদ সাড়ে চারটে টাকা পাবে, নিবারণ পাবে না। কদিন ধরেই তার বউটা পেট ব্যথায় কাতরাচ্ছে। রাত্তিরবেলা ঘুঙিয়ে ঘুঙিয়ে কাঁদে। এই সময় ওর একটু ভালো-মন্দ খাওয়ার দরকার। একটু দুধ পেলে শরীরের পুষ্টি হতো, পেটের বাচ্চাটা… কিন্তু দুধ…কতদিন আগে পয়সা দিয়ে দুধ কিনেছে, মনেই পড়ে না নিবারণের পুকুরের ধারে কলমীশাকপাতা আপনি জন্মায়, কদিন ধরে সেই কলমীশাক সেদ্ধ আর ফ্যান ভাত চলছে।

আকাশটাকে গাঢ় লাল রঙে ভাসিয়ে সূর্যদেব অস্ত যাচ্ছেন। এই সময় আকাশটাকে ভগবানের রাজবাড়ির মতন মনে হয়। সেদিকে হাত তুলে মনে মনে নিবারণ বললো, এ-জন্মে অনেক দুঃখ কষ্ট পেয়ে গেলাম, হে ভগবান, পরজন্মে একটুখানি সুখ দিয়ো, যেন দুবেলা পেটপুরে দুটো ভাত খেতে পাই। আর ছেলেপুলেগুলোদের হাতে একটু নাড়ুবাতাসা দিতে পারি।

ডানদিকে, খানিকটা দূরে, নিমগাছটার তলায় একটা ছোটখাটো জটলা। বিনা পয়সায় দু’এক টান বিড়ি খাওয়ার লোভে নিবারণ সেই দিকে এগিয়ে গেল এবং গিয়েই একটা চমকপ্রদ খবর শুনলো। সঙ্গে সঙ্গে একটা হিংস্র আনন্দে জ্বলে উঠলো তার চোখ দুটো। সে যেন এবার তার সব পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবে।

উত্তেজিত আলোচনার মধ্যে জোর করে মাথা গলিয়ে নিবারণ জিজ্ঞেস করলো, ওসব কথা ছাড়ো দিকিনি! কেউ নিজের চোখে দেখেছে?

সোনারং গ্রামের বাঙাল চারু বললো, নিজের চোখে দেখিনি কি চাটাম মারছি নাকি?

নিবারণ ব্যগ্রভাবে জিজ্ঞেস করলো, এখনো আছে?

—এই তো ভানু দেখে এয়েছে একটু আগে। মাটিতে গইরে ছটফটাচ্ছে!

—সত্যি রে, ভানু?

ভানু অতি সরল নির্বোধ লোক। কুড়ি-বাইশ বছর বয়েস থেকেই তার মাথায় টাক সবাই জানে। সবাই জানে, মিথ্যে কথা বানিয়ে বলার ক্ষমতা পর্যন্ত নেই ভানুরা।

ভানু বললো, হ্যাঁ দেখিছি, কালো জাম গাছটার তলায়। মাটিতে পড়ে ছটফট করছে আর গ্যাঁজলা বেরুচ্ছে মুখ দিয়ে। ওঝা এয়েছে। এমন ধুনো জ্বেলেছে না, চোখজ্বালায় আমি আর তিষ্ঠুতে পারলাম না।

নিবারণ রাগ করে বললো, ওঝা? তোদের শালার কি ঘটে বুদ্ধি হবে না কোনোদিন? সুরেন্দ্রকে খবর দিস নি কেন? সে বাঞ্চোৎ যে বড় তড়পায়! সে হারামীর বাচ্চাটা আজ দেখাক তার কতখানি মুরোদা

ভানু বললো, সুরেন্দ্র তো টাউনে?

—শালাকে টাউন থেকে ধরে নিয়ে আয়। ওর ইচ্ছে মতন তেনারা কী শুধু ছুটির দিনে দেখা দেবেন?

–মাঝে মাঝে রাত্তিরবেলা সুরেন্দ্র টাউন থেকে বাড়ি ফিরে আসে। কোন মাগীকে নাকি ওর মনে ধরেছে।

–তবে ডাক না শালাকে।

সকলে হৈ-হৈ করে খালপাড়ের বাঁধ থেকে নেমে গ্রামের দিকে ছুটে গেল।

সুরেন্দ্রর বাড়ি গ্রামের এক টেরেয়। বাড়ির লপ্তের ধানী জমি এককালে তাদেরই ছিল তার। বাপ ছিল খুব শক্ত হাতের চাষী। কথাবার্তায় কাউকে রেয়াৎ করতো না। অল্প জমিতে গায়ে খেটে সে নিজের বউ-ছেলেকে দু’বেলা খাইয়ে-পরিয়ে রেখেছিল।

সে জমি-জেরাত সব গেছে, কিন্তু বাড়িটি এখনো আছে। গ্রামের এই এক অদ্ভুত নিয়ম সব সময় ফন্দী-ফিকির করে এ ওর জমি কিংবা বাগান নিজের ভাগে নিয়ে নিতে চায়। মিথ্যে মোকদ্দমা লাগে। তা ছাড়া গা-জুয়ারি দখল তো আছেই। কিন্তু অন্যের বসতবাড়ি কেউ চট করে দখল করতে চায় না। সব গ্রামেই একখানা দুখানা বসতবাড়ি ফাঁকা পড়ে থাকে, মালিকের কোনো পাত্তা নেই, দিনেরবেলা ঘুঘু চরে সেখানে, তবু অন্য কেউ সে বাড়িতে চট করে বাস করতে আসে না। তাতে বাস্তুদেবতা অসন্তুষ্ট হন। অভিশাপ দেনা সেইজন্যই, এমন কি পাশের বাড়ির লোক ও আত্মীয়-কুটুম হঠাৎ এসে পড়লে নিজেদের বাড়িতে জায়গা না থাকলেও তাদের সেই ফাঁকা বাড়িতে থাকতে পাঠায় না। বরং সেটা পোড়ড়া বাড়ি হয়ে যাক, তাও ভালো লোকে জানালা-দরজাগুলো খুলে নিয়ে জ্বালানি করে।

সুরেন্দ্র নিজেদের বাড়িটাতে জানালা কপাট বসিয়ে আবার বাসযোগ্য করে তুলেছে। শহরে তার ফ্যাকটরির পাশে নিজস্ব কোয়ার্টার আছে। সেখানে পাকা নর্দমা আর কলের জলা তবু সুরেন্দ্র আজকাল প্রায়ই গ্রামের বাড়িতে এসে থাকতে ভালবাসে। এই মাটি তাকে টানে। এক একদিন মাঝরাত্তিরে নিজের ঘরে একা শুয়ে থেকে সুরেন্দ্র আপনমনে কাঁদে। গলগল করে চোখের জল বেরোয়। অতবড় দশাসই লোকটা যে কাঁদতে পারে, তা কেউ বিশ্বাস করবে না। সুরেন্দ্র কাঁদে একা। তার খুব কষ্ট হয় তার মায়ের কথা ভেবে। একদিন নিষ্ঠুরের মতন সে তার মাকে ছেড়ে চলে যায়। চৌধুরীবাবুরা বিনা দোষে তাকে শুয়োর পেটা করার ফলে রাগে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল সে। মায়ের কথাও তখন তার মনে পড়েনি। সে পালিয়েছিল তার মা খেতে না পেয়ে কেঁদে কেঁদে মরে গেছে। এই ঘরে। তার মায়ের নাকি ওলাউঠা হয়েছিল বলে গাঁয়ের কেউ তাকে ছোঁয়নি, তিনদিন ধরে বাসি মড়া পড়েছিল এখানে তারপর থেকে আর ভয়ে কেউ এ-বাড়ির পাশ মাড়াতো না।

সুরেন্দ্র এতদিন বাদে ফিরে এসেছে এই গাঁয়ের ওপর প্রতিশোধ নিতে এখন তার পকেটে টাকা আছে, শরীরে বল আছে, মনে জোর আছে—তবু সে আর তার মাকে ফিরে পাবে না।

নিঃশব্দে চোখের জল ফেলতে ফেলতে সুরেন্দ্র এক একবার ভাবে, একদিন সে এ গ্রামেরই কোনো মেয়েকে বিয়ে করবো তাহলে তখন হয়তো এ গ্রামের ওপর তার রাগ পড়ে যাবে। কিন্তু সেরকম মেয়ে কই? কারুকেই চোখে ধরে না। রূপের কথা ছেড়েই দাও, একটারও স্বাস্থ্য ভালো নয়। কারুর ভালো করে বুকটুকুও ওঠেনি।

বাইরে থেকে কে যেন মোটা গলায় ডাকে, সুরেন্দ্র! সুরেন্দ্র!

ঠিক যেন তার বাবার গলা।

সুরেন্দ্র শুয়ে শুয়ে হাসে। গাঁয়ের উটকো ছেলেরা তাকে নানারকম ভাবে ভয় দেখাবার চেষ্টা করেছে অনেকবার টিনের চালে চেলা ছুঁড়েছে, জলে ডোবানো বেড়াল ছেড়ে দিয়েছে ঘরের মধ্যে একদিন তক্কে তক্কে থেকে সুরেন্দ্র কয়েকটা ছোঁড়াকে ধরে ফেলে বেধড়ক ধোলাই দিয়েছিল। তারপর থেকে ওসব উৎপাত অনেকটা কমেছে, কিন্তু দু-চারজন এখনো তার পেছনে লেগে আছে। আবার ধরতে পারলে হয়।

আবার ‘সুরেন্দ্র, সুরেন্দ্র’ বলে ডাক উঠতেই সে বাইরে বেরিয়ে এলো। কেউ নেই। আকাশে

তৃতীয়ার ফালি চাঁদ। কয়েকটা চামচিকে উড়তে উড়তে চাঁদের দিকে চলে যাচ্ছে। পরপর চারটে নারকোল গাছের সব কটা পাতা এখন হাওয়ায় উত্তরমুখো।

কেউ নেই, তবু কে ডাকলো?

সুরেন্দ্র চারদিকে ঘুরে ঘুরে তাকায়। খানিক আগে সন্ধে হয়েছে। এর মধ্যেই গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে মোহনিদ্রা। সুরেন্দ্র নিজের কপাটবুকে হাত বুলিয়ে মনে মনে বললো, ওরকম হয়। একলা থাকলে ওরকম শোনা যায়। আর বেশীদিন একলা থাকতে ইচ্ছে করে না।

অন্ধকারের মধ্যে দূর থেকে কারা যেন হেটে আসছে। সাত আটজন মানুষ। তারা আসছে প্রায় দৌড়ে দৌড়ে, এ বাড়ির দিকেই। সুরেন্দ্র স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো।

দলের প্রথমেই আছে নিতাই। সে লাফাতে লাফাতে এসে বললো, সুরেনদা, ও সুরেনদা, জবর খবর আছে! আমি তোমার কাছেই আসছিলাম, পথে এনাদের সঙ্গে দেখা হলো। জবর খবর!

সুরেন্দ্র বিনা উত্তেজনায় বললো, কী খবর?

সোনারং গাঁয়ের সর্বানন্দ দাসের পুতের বউকে ভূতে ধরেছে। সুরেন্দ্র ঠাট্টা করে বললো, বটে? কতখানি ভাং খেয়েছিস? এবার অন্য চার-পাঁচজন এগিয়ে এসে বললো, সাচ্চা কথা। সর্বানন্দের ছেলে বিভূতির বউকে পেত্নীতে ধরেছে। সকাল থেকে মাটিতে পড়ে ছটফটাচ্ছে। তার মুখ দিয়ে কথা বলছে পেত্নীটা।

কী সব কুচ্ছিত কথা!

ঠাট্টার সুরটা বজায় রেখেই সুরেন্দ্র বললো, বটে! কী কুচ্ছিত কথা বল তো শুনি?

—সে তুমি গেলেই নিজের কানে শুনতে পাবে।

—আপনারা কেউ শোনেন নি? কেউ চোখে দেখেছেন?

 নিবারণ উগ্র গলায় বললো, আলবৎ দেখেছে। এই তো চারু আর ভেনো—দু’জনেই দেখেছে। ওঝা এসেও সে পেত্নীকে ভাগাতে পারছে না।

—সর্বানন্দের ছেলে বিভূতি কোথায়?

—সে তো দুর্গাপুরে কাজ করে।

—ওদের বাড়ির কেউ আছে এখানে? ওদের বাড়ির কেউ তো ডাকতে আসে নি আমাকে?

—কেন, আমরা বললে তুই যাবি না? আমাদের কথা কথা নয়? আমরা কি ফ্যালনা?

–দ্যাখো, আমি সাফ কথা বলি সর্বানন্দের বাড়ি দু’আড়াই মাইলের রাস্তা অতখানি রাস্তা উড়ো কথা শুনে যদি শুধুমুধু যেতে হয়, তার চেয়ে ঘরে বসে কেত্তন গাওয়া অনেক ভালো!

–নাকি তুই ভয় পাচ্ছিস এখন?

সুরেন্দ্র এবার হাসলো। এত বয়স্ক লোকদেরও তার খুব ছেলেমানুষ বলে মনে হয়। এদের মাথায় গোবর। সে বললো, আমার এমন লাভের কারবার তাতে কী ভয় পেলে চলে? কিন্তু খাঁটি মাল পাচ্ছি কোথায়?

—এবার গিয়েই দ্যাখ না।

–যাচ্ছি তা হলো কিন্তু গিয়ে যদি দেখি ভাঁওতা, তা হলে কিন্তু উত্তম ফুস্তুম করে ছাড়বো আমি আমার সঙ্গে মাজাকি করো না। আমি সরল কথার মানুষ

সুরেন্দ্র ঘরের মধ্যে ফিরে গেল রেডি হয়ে নিতে। অন্যরা বাইরে দাঁড়িয়ে রইলো। শুধু নিতাইয়ের অধিকার আছে ঘরে ঢোকার।

সুরেন্দ্র একটা ঝোলার মধ্যে কয়েকটা জিনিস ভরে নিচ্ছে। একটা ছোট টিনের বাক্স, তার মধ্যে কী আছে, নিতাই জানে না। একটা টর্চা এক বান্ডিল ব্যান্ডেজের কাপড়। আর একটা বিলিতি মদের (দিশিবিলিতি) খালি বোতল।

নিতাই জিজ্ঞেস করলো, সুরেনদা, খালি বোতলটা নিচ্ছো কেন?

একগাল হেসে সুরেন্দ্র বললো, জানিস না? এই বোতলের মধ্যেই পেত্নীটাকে ভরবো। ভূত পেত্নীরা বোতলকে বড় ডরায়। যেই বোতলটা তুলে ধরবো, অমনি তার মধ্যে সুরুৎ করে এসে ঢুকে পড়বে। তুইও ওদের কথায় নেচেছিস?

ঝোলাটা কাঁধে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে সুরেন্দ্র বললো, চলো।

কয়েক পা এগিয়েই নিবারণ তাকে জিজ্ঞেস করলো, টাকা এনেছিস তো সুরেন? একশো টাকা দিবি বলে কথা দিয়েছিস, আজ তোর টাকা খসবে।

সুরেন্দ্র নিষ্ঠুরের মতন উত্তর দিল, তা নিয়ে তোমার মাথাব্যথা কেন নিবারণকা? ভালো মাল পেলে আমি ভালো দাম দেবো। টাকা যদি পায় তো পাবে সর্বানন্দ দাস, তোমাকে কি তার থেকে একটা পয়সাও দেবে?

নিবারণ খানিকটা চুপসে গেল। তবু সে মনে মনে বললো, তা আমি পেলাম আর না পেলাম, তবু তোর পকেট থেকে টাকা খসতে দেখলেই আমার আনন্দ হবে। হারামীর বাচ্চা, তোর তেজ আজ ভাঙবে!

সর্বানন্দ দাসের অবস্থা এককালে বেশ সচ্ছল ছিল। এখন আর তেমন রমরমা নেই, জমিজায়গা বেহাত হয়ে গেছে, তবু তার বড় ছেলে শহরে চাকরি করে বাড়িতে টাকা পাঠায়। বাড়িটা বেশ সুন্দর মস্তবড় উঠোনের চারপাশে চারটি ঘর আর সে বাড়ি ঘিরে রয়েছে অনেকগুলো সুপুরিগাছ। রান্নাঘরের পাশ দিয়ে একটি সুপুরিগাছ ঘেরা পথ চলে গেছে পুকুরপাড় পর্যন্ত উঠোনের এককোণে একটি বড় কালোজাম গাছ।

বাড়িটি এখন ভিড়ে ভিড়াক্কার। সেই ভিড় সামলাবার চেষ্টাও কারুর নেই। যার যা খুশী করছে, লোকের চ্যাঁচামেচিতে কান পাতা যায় না। সেই সঙ্গে ধূপধুনোর ধোঁয়া। একটা হ্যাজাকের আলো ঘিরে উড়ছে অসংখ্য পোকা।

সর্বানন্দের পুত্রবধূ শান্তি শুয়ে আছে উঠোনে। তার সর্বাঙ্গের পোশাক ভেজা, মাথার চুল জলকাদায় মাখামাখি চোখ দুটি বন্ধ, মুখ দিয়ে ফেনা বেরুচ্ছে অনবরতা শরীরটা কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ, মাঝে মাঝে হঠাৎ বেঁকে দুমড়ে উঠছে, যেন অসহ্য যন্ত্রণায়।

বড় একটা মাটির মালসায় টিকের আগুন জ্বেলে তাতে একটু একটু ধুনো দিচ্ছে সর্বানন্দ নিজে। আর শান্তির পাশে বসা ওঝা অনবরত মন্ত্র পড়ে যাচ্ছে চোখ বুজে, তার হাতে একটা ঝাঁটা।

ওঝাটি বেঁটে বাঁটকুলা এ গ্রামের মহাদেব ওঝার ছিল দারুণ নামডাকা আশপাশের দশ বিশখানা গাঁ থেকে তার বায়না হতো। চেহারাও ছিল সাঙ্তিক, দেখলে ভয় ও ভক্তি—দুটোই জাগতো। মেয়েমানুষের মতন কোমর পর্যন্ত চুল, এদিকে গালভর্তি চাপ দাড়ি, টকটকে লাল রঙের কাপড় পরা, চোখ দুটিও সেইরকম লাল, হাতে একটা ডাণ্ডা। এই মহাদেব ওঝা নাকি মন্ত্রের জোরে ভুত-প্রেতদের তিড়িংবিড়িং করে নাচাতে পারতো। মাস ছয়েক আগে সেই মহাদেব ওঝা মারা গেছে। সে নাকি নিজের শরীরের মধ্যে একসঙ্গে দুটো ভূত ঢুকিয়ে আটকে রাখতে গিয়েছিলা

পুরুতের ছেলে পুরুত হয়, তেমনি ওঝার ছেলেও ওঝা হয়েছে। কিন্তু বাপের চেহারা পায় নি ছেলে। বয়েস তার মাত্র কুড়ি-বাইশ, দেহটি নাদুসনুদুস। তা হোক, বাপের কাছ থেকে মন্ত্রগুলো তো সব পেয়েছে। তার আর একটি বড় গুণ আছে, সে জিভ দিয়ে নিজের নাক ছুঁতে পারে।

মহাদেবের ছেলের নাম সুবল। সে মাটিতে জোড়াসন করে বসে খুব ভাব দিয়ে মন্ত্র পড়ে যাচ্ছে, আর বউটি যেই মাঝে মাঝে বেঁকে দুমড়ে উঠছে, অমনি সে হাতের ঝাঁটা দিয়ে সপাং সপাং করে পিটোচ্ছে। মহাদেব ওঝা নাকি মারের চোটে রক্ত বার করে দিতা সুবল অত জোরে মারতে না পারলেও তার গালাগালির জোর আছে। শান্তি একবার বেশী করে হাত-পা ছুঁড়তেই সুবল ওঝা এক হাতে তার চুলের মুঠি চেপে ধরে মারতে মারতে বললো, যা, যা আবাগীর বেটি, শতেক-ভাতারী, দূর হ! দূর হয়।

সুরেন্দ্র ভিড় ঠেলে এসে উঠোনের মাঝখানে দাঁড়ালো। মিশমিশে কালো যমদুতের মতন তার চেহারা। রাগে চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে গেছে। প্রথমেই তার ইচ্ছে হলো, সুবল হারামজাদাকে ক্যাঁৎ ক্যাঁৎ করে দুটো লাথি কষায় শুয়োরের বাচ্চাটা মেয়েছেলেদের গায়ে হাত তোলো সুরেন্দ্র দু’পা এগিয়েও গেল তার দিকে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মারলো না তার মনে পড়লো ফাদার পেরেরার কথা। নিতান্ত আত্মরক্ষার কারণে ছাড়া কারুকে মারতে নেই। যখন তখন মারামারি করে জন্তুরা। তুমি তো মানুষ, সুরেন্দ্র

সে ঝুঁকে সুবলকে বললো, দেখি কর্তা ছাড়ো ছাড়ো! আমি একটু দেখবো!

আজ যদি মহাদেব ওঝা থাকতো, তাহলে তুলকালাম কাণ্ড বেধে যেত একটা। মহাদেব ওঝার কাজে কেউ কখনো সাহস করে নি। সুরেন্দ্রর মতন সা-জোয়ানকেও গ্রাহ্য করতো না সে, তার গায়েও শক্তি কম ছিল না। কিন্তু ছেলেটি হয়েছে অকালকুষ্মাণ্ড।

সুবল মিনমিন করে বললো, আমার কেস, তুমি দেখবার কে? বেটিকে এই তাড়ালুম বলে! আর একটুখানি!

সুরেন্দ্র তাকে পোকামাকড়ের মত অগ্রাহ্য করে বললো, সরো সরো!

তারপর সর্বানন্দকে জিজ্ঞেস করলো, কী হয়েছিল?

সর্বানন্দ বিবর্ণ মুখে একটা হাত তুলে বললো, ঐ জামগাছটা—

সুবলই এবার বাকিটা বলে দিল আজ ভোরবেলা বাসি কাপড়ে এই বউটি ঘর থেকে বেরিয়েছে। তখনও ভালো করে সূর্য ওঠে নি। ঘর থেকে উঠোনে পা দিয়েই দেখলো, তিনটে কই মাছ। একটা বড় মাটির হাঁড়িতে কাল রাত থেকে কইমাছ জিয়োনো ছিল। এ বাড়িতে প্রায়ই এরকম জিওল মাছ রাখা থাকে। কোনোক্রমে হাঁড়িটা কাত হয়ে পড়েছিল, তার থেকে বেরিয়ে এসেছে কয়েকটা মাছ। বেড়ালে যে খেয়ে ফেলে নি, তাই ভাগ্যিা বেড়াল অবশ্য জ্যান্ত কইমাছকে ভয় পায়। বউ তাড়াতাড়ি মাছগুলোকে ধরে হাঁড়িতে ভরলো সেই আঁশ হাত না ধুয়েই মুছে ফেললো কাপড়ে তারপর ঘুমচোখে জল খালাস করে আবার ঘরে ফিরে শুতে যাবে, এমন সময়–

এই পর্যন্ত বলে সুবল থামলো। উপস্থিত অন্যান্য লোকেরা এই ঘটনা ইতিমধ্যে প্রায় বার পঞ্চাশেক শুনেছে, তবু সুবল খানিকটা নাটকীয় করবার জন্য বললো, ঐ জামগাছটা, ঐ জামগাছে ওঁৎ পেতে বসেছিল দুটিতে, দুই দুষ্ট আত্মা, ওরা তো এইসব সুযোগই খোঁজে। বাসি কাপড়ে আঁশ হাত মুছেছে, তার ওপর পেচ্ছাপ করে এসে পায়ে জল দেয় নি, বউ যেই জামগাছতলা দিয়ে আসছে, অমনি গাছের একটা ডাল নীচু হয়ে নেমে এসে মারলো একটা ঝাপটা। ব্যাস, সেই যে পড়ে গেল উঠোনে, আর তাকে নড়ানো যায় না।

সুরেন্দ্র জিজ্ঞেস করলো, অত ভোরে আর কেউ জেগেছিল? কেউ দেখেছে সে বউ কইমাছ ধরেছিল? কিংবা পায়ে জল দেয় নি?

সুবল বিজ্ঞের মতন বললো, দেখতে হবে কেন? আমি তো কেস দেখেই বুঝে নিয়েছি! ঐ যে বারান্দায় জিওল মাছের হাঁড়িটা এখনো রয়েছে।

সুরেন্দ্র বললো, হুঁ।

সুবল বললো, প্রমাণ চাও? দেখবে?

হাতের ঝাঁটা দিয়ে শান্তিকে খুব জোরে একটা বাড়ি মেরে বললো, হারামজাদী, ছোটলোকের নাঙী, বল বল, বউ বাসি কাপড়ে মাছ ধরে নি?

শান্তির মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরুলো, উঁ উঁ।

—ঐ দ্যাখো, স্বীকার পেয়েছে। আরও শুনবে?

আবার সে শান্তিকে ঝাঁটা মেরে বললো, খাগী বল, গাছের ডাল নীচু হয়ে এসে ওর মাথায় মারে নি?বল, মারে নি?

এবার শান্তির মুখ দিয়ে স্পষ্ট আওয়াজ বেরুলো, মেঁরেচে, মেঁরেছে!

সুবল সগর্বেমুখ ঘুরিয়ে তাকালো।

সুরেন্দ্র সুবলের হাত থেকে ঝাঁটাটা কেড়ে নিয়ে ফেলে দিল দূরে।

শান্তি এ-গ্রামের মেয়ে নয়। সর্বানন্দের মামার বাড়ি রসাপাগলা গ্রামে বেড়াতে গিয়ে সর্বানন্দ এই মেয়ে পছন্দ করে এসেছিল। মেয়েটি কিছু লেখাপড়া জানে। সর্বানন্দের ছেলে বিভূতি মহকুমা শহর থেকে বি-এ পাস দিয়ে এসেছে, তার সঙ্গে এ মেয়েকে মানিয়েছে ভালো। ঘরের বউ হয়েও শান্তি জোড়া বিনুনি করতো অনেকদিন। শহরে খরচ বেশী বলে বিভূতি এই দু’বছর হলো বউকে গ্রামের বাড়িতে রেখেছে। সেই ন’মাসে ছ’মাসে একবার আসে। এখনো বাচ্চাকাচ্চা হয় নি, ইতিমধ্যে সন্দেহ দেখা দিয়েছে যে বউ বাঁজা।

সুরেন্দ্র তাকিয়ে রইলো শান্তির দিকে একটু আগে উপুড় হয়েছিল এখন সে চিৎ হয়েছে, একটা হাত চাপা পড়েছে পিঠের তলায়, মুখটা মাটির দিকে ফেরানো। ভরা যৌবনের এক নারী এতগুলো লোকের চোখের সামনে পড়ে আছে মাটিতে, ভিজে কাপড় সেঁটে গেছে গায়ের সঙ্গে, আঁচলটা অজগর সাপের মতন গোল হয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে আছে পায়ের কাছে, কোমরের কষিও আলগা। চোখ দুটো খোলা, কিন্তু সে চোখে কোনো দৃষ্টি নেই।

বাঁজা মেয়েদের স্বাস্থ্য ভালো হয়। সুরেন্দ্র এ পর্যন্ত দু-গাঁয়ের মধ্যে শান্তির মতন সুন্দরী আর দেখেনি

সুবল বললো, একসঙ্গে দু’দুটো দুষ্ট আত্মা এসে বসেছিল ঐ জামগাছে। মদ্দাটা এখনো বসে আছে ওখানে, আমি গাছটার চারপাশে গণ্ডি কেটে দিয়েছি, এদিকে আসতে পারবে না। পেত্নীটা সেঁধিয়েছে বউয়ের শরীলে। একসঙ্গে ছাড়া দুটোতে যাবে না।

সুরেন্দ্র এগিয়ে গেল জাম গাছটার দিকে। সুবল চেঁচিয়ে বললো, ওদিকে যেও নি, গায়ে বাতাস লেগে যাবে, তোমার গায়ে বাতাস লেগে যাবে বলে দিচ্ছি। মদ্দাটা এখনো বসে আছে। দ্যাখো না, হাওয়া বাতাস নেই, তবু ডগার ডালটা আপনাআপনি নড়ছে।

ফ্যাকাশে জ্যোৎস্নায় সত্যিই মনে হয়, জাম গাছের ডগার ডালটা দুলছে একটু একটু।

ভিড়ের মধ্যে থেকে কে একজন বললো, ও যেতে চায় যাক না।

সুরেন্দ্র নীচু হয়ে তার খাকি প্যান্ট গুটিয়ে ফেললো হাঁটু পর্যন্ত, তারপর তরতর করে উঠে গেল জাম গাছে। সবচেয়ে মোটা ডালটার ওপর এক পায়ে দাঁড়িয়ে হেঁড়ে গলায় চেঁচিয়ে উঠলো, কোথায় সে?

সুবল বললো, আরো ওপরে, একেবারে ডগায়। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, হাসছে ব্যাটা আর একটু ওপরে ওঠো, টেরটি পাবে।

সুরেন্দ্র বুঝল ওর চালাকিটা। জাম গাছের ডাল তেমন মজবুত নয়। তাদের বাড়িতে একটা জাম গাছের পিঁড়ি ছিল, কথা নেই বার্তা নেই একদিন এমনিই সেটা মাঝখান থেকে ফেটে দু’ভাগ হয়ে গেলা। এখন সে তার এতবড় শরীরটা নিয়ে যদি আরও ওপরে ওঠে, তাহলে হঠাৎ ভেঙে পড়ে যাবে। আর না উঠলে ওরা বলবে, সে হেরে গেল।

কোমরের বেল্টটা খুলে সে একটা গোল ফাঁস করলো। তারপর পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে ডিঙি মেরে যতটা লম্বা হওয়া সম্ভব লম্বা হয়ে, বেল্টের ফাঁস দিয়ে ধরতে পেরেই সে মট করে ডাল ভেঙে সেটা হাতে নিয়ে নেমে এলোনীচে।

গাছের ডালটা সে সুবলের নাকের কাছে এগিয়ে দিয়ে বললো, এর মধ্যে তোমার মদ্দা ভূতটা বসে আছে!

সুবল ভয় পেয়ে মাথাটা পিছিয়ে নিল খানিকটা।

শান্তি এর মধ্যে উঠে বসেছে আর ফিকফিক করে হাসছে। সুরেন্দ্রর দিকে হাতছানি দিয়ে বললো, এই শোনোনা, শোনো।

সবাই চেঁচিয়ে উঠলো, ডেকেছে, পেত্নীটি ওকে ডেকেছে।

সুরেন্দ্র খানিকটা হকচকিয়ে গেল। ঠিক যেন স্বাভাবিক মানুষের মতন গলা। তবে কি বউটা এতক্ষণ নকল যাত্রা করছিল? সুবলের হাতে এত মার খেয়েও?

পাকানো আঁচলটা তুলে নিয়ে শান্তি গায়ে জড়িয়ে ভদ্র হলো। সেই রকমই ফিকফিকিয়ে হেসে হাতছানি দিয়ে সুরেন্দ্রকে বলতে লাগলো, এই শোনো, শোনো, শোনো না—

সুরেন্দ্র এগিয়ে গিয়ে বললো, কী?

—শোনো। আরো কাছে এসো—

আর একটু এগিয়ে সুরেন্দ্র বললো, কী?

শান্তি মাটির ওপর চাপড় মেরে বললো, বসো, এখানে এসে বসো। লজ্জা কি? আমাকেও তোমার লজ্জা? তুমি যে আমার নাগর! বসো—

সুরেন্দ্র মাটিতে বসলো।

শান্তি বললো, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে। কানে কানে বলবো—

সুরেন্দ্র বললো, ঐখান থেকেই বলো—

পা ঘষটে ঘষটে শান্তি নিজেই চলে এলো সুরেন্দ্রর কোলের কাছে। তার মাথাটা ধরে টানলো। সুরেন্দ্র খুবই অস্বস্তিতে পড়েছে। শান্তি তার কানে কানে কী যেন বলতে চায়।

সুরেন্দ্রর কানের কাছে মুখ ঠেকিয়ে শান্তি ফিসফিস করে কী যেন বলতে লাগলো। সুরেন্দ্র বুঝতে পারলো না তার একটাও বর্ণা এক সময় সে উঃ বলে চেঁচিয়ে উঠলো। শান্তি তার কান কামড়ে ধরেছে। সুরেন্দ্র ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিল শান্তিকে। তার কান দিয়ে দরদর করে রক্ত গড়াচ্ছে।

জনতা হেসে উঠলো হো হো করে। সুরেন্দ্রর দুর্দশা দেখে তারা দারুণ মজা পেয়েছে। সেইদিন থেকে তার নাম হয়ে গেল, কানকাটা সুরেন!’

কিন্তু জনতার হাসিও থেমে গেল শান্তির অকস্মাৎ হাসিতে শান্তি হি হি হি হি করে হেসে উঠলো, তার ঠোঁটের পাশে রক্ত। তারপর একটা অদ্ভুত বিকট গলা বার করে বললো, এই সুরেন্দ্র, আমাকে বিয়ে করবি? আয় না! বিয়ে করবি? তোতে আমাতে পাটক্ষেতে লুকিয়ে থাকবো। বিয়ে করবি? এই সুরেন্দ্র! আয় না!

সবাই জানে, সর্বানন্দের ছেলের বউ শান্তি লাজুক মেয়ে। পাঁচজনের সামনে সে কক্ষনো রা। কাড়ে না। বিশেষত শ্বশুরের সামনে সে কোনদিনও এরকমভাবে খারাপ কথা বলবে না। তা ছাড়া এ তো শান্তির গলা নয়, তার ভেতর থেকে অন্য কেউ কথা বলছে।

শান্তি আবার হাসতে লাগলো হি হি হি হি করে। মানুষে সেরকম হাসতে পারে না। ঠিক যেন দুটো ছুরিতে ঠোকাঠুকি হচ্ছে। শুনলেই গা ছমছম করে। অনেকেই ভয় পেয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল।

সুরেন্দ্র রুমাল দিয়ে তার কানটা চেপে ধরে আছে। রক্তে ভিজে গেছে তার ঘাড়ের কাছের জামা।

শান্তি এবার সুরেন্দ্রর বুকের ওপর হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে বললো, খেলবি? আমার সঙ্গে খেলবি? এই সুরেন্দ্র, আয় না খেলবি, হি-হি-হি-হি।

স্ত্রীলোকের গায়ে হাত তোলা বিষয়ক বিধিনিষেধ ভুলে গেল সুরেন্দ্র সে নিজেই এবার শান্তির চুলের মুঠি ধরে মাথাটা সরিয়ে নিয়ে দু-গালে সপাটে দুটো থাপ্পড় কষালো। সুরেন্দ্রর মাথায় রাগ চড়ে গেছে।

চড় খেয়ে শান্তি আবার নেতিয়ে পড়লো মাটিতে।

যারা ভয় পেয়ে পালিয়ে গিয়েছিল, তাদের মধ্যে আবার কয়েকজন ফিরে এসেছে। কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ। সুরেন্দ্র রক্ত মুছছে কান থেকে।

হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে থেকে নিবারণ বললো, এই সুরেন্দ্র, এবার টাকা বার কর, টাকা দে!

আর পাঁচজন বললো, হ্যাঁ, এবার টাকা দিতে হবে। সর্বানন্দদা, ওকে ছেড়োনা, ধরো।

সুরেন্দ্রজিজ্ঞেস করলো, কিসের টাকা?

—তুই যে বলেছিলি চোখের সামনে ভূত দেখালে একশো টাকা দিবি? দে শালা সেই টাকা! এই মাত্তর কী দেখলি?

সুরেন্দ্র বললো, কী দেখলাম!

—এখন ন্যাকা সাজছিস! সবাই সাক্ষী দেবে, তুই পঞ্চাশবার বলেছিস নিজের চোখে ভূত দেখলে একশো টাকা দিবি! এই মাত্তর দেখলি না?

সুরেন্দ্র বললো, না দেখিনি।

–মিথ্যে কথা। টাকা মারবার মতলব দে টাকা। সৰ্বানন্দদা, ওকে ছেড়ো না ধরো, আজ আর ছাড়ান ছুড়িন নেই। বড় টাকার গরমাই দেখায়—

অনেকে মিলে গোল হয়ে এগিয়ে আসছে সুরেন্দ্রর দিকে। ওরা সুরেন্দ্রকে একসঙ্গে চেপে ধরবো রোগা, খেতে না-পাওয়া, ভীতু নিবারণের উৎসাহই যেন সবচেয়ে বেশী সে ঐ টাকার একটা আধলাও পাবে না, তবু তো সুরেন হারামজাদার দেমাক ঠাণ্ডা করা যাবে! সুরেন্দ্রর নিজের দলের ছেলে নিতাই পর্যন্ত এই কাণ্ড দেখে পেছনে লুকিয়েছে, সে আর মুখ খুলছে না। শান্তি বউদির ব্যাপার-স্যাপার দেখে তার বুক কাঁপছে।

সুরেন্দ্র সামনের দু’জনকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে পা ফাঁক করে দাঁড়াল, তারপর জামার তলার কোমর থেকে একটা মস্ত বড় ভোজালি টেনে বার করে বললো, খবরদার, আমার সঙ্গে এঁটেলবাজি করতে এসো না, তা হলে আমি রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবো!

এবার দৌড়ে পালাতে গিয়ে এ ওর ঘাড়ের ওপর উল্টে পড়লো। সুরেন্দ্রটা একটা খুনে, ঠিকই বোঝা গিয়েছিল আগে!

সুরেন্দ্র হাওয়ায় ভোজালি ঘুরিয়ে বললো, আমি এক কথার মানুষ। একশো টাকা দেবো। বলিছি, আসল মাল পেলে ঠিকই দেবো। তা বলে আমাকে বাজে মাল, ভুষি মাল গছাবে? একটা মৃগী রুগী, তাই দেখিয়ে টাকা চাইছো? অ্যাঁ!

ভাঙা জামগাছের ডালটা মাটিতে তিনবার আছড়ে বললো, এর মধ্যে মদ্দা ভূত আছে? কোথায় সে শালা? নাকি আমাকে দেখেই পালিয়েছে।

ঝোলা থেকে খালি বোতলটা বার করে সুবলের সামনে ঠাস করে রেখে সে বললো, সাপুড়ে যেমন সাপ ধরে, সেই রকম একটা ভূত ধরে দাও দিকি আমাকে! তুমি তো ভূত ধরে বেড়াও। এই বোতলটার ছিপি আটকে দেবার পর যদি আপনাআপনি লাফায়, তবে আমি এক্ষুনি তোমাকে একশো টাকা দেবো। এক্ষুনি। এই দেখো টাকা।

সুরেন্দ্র পকেট থেকে একগোছা এক টাকার নোট বার করে দেখালো। কিছু না পেরে সুবল বললো, যা যা!

মাটিতে হাঁটুগেড়ে বসে সুরেন্দ্র ভোজালিটা পাশে নামিয়ে রাখলো। তারপর শান্তির নেতিয়ে পড়া একটা হাত তুলে নাড়ি দেখতে লাগলো।

সর্বানন্দ এতক্ষণে খানিকটা সাহস সঞ্চয় করে বললো, এই, তুমি আমার বউয়ের গায়ে হাত ছুঁইয়ো না।

সুরেন্দ্র তাকে এক ধমক দিয়ে বললো, চোপ! একটু আগে তোমার ছেলের বউ আমার কানে কানে কী বলেছে, জানো?যদি সবার সামনে বলি দিই, তোমার মুখে চুনকালি পড়বে

সর্বানন্দ চুপসে গেল সঙ্গে সঙ্গে। ওঝার ছেলে সুবল কিন্তু এত সহজে তার দাবি ছাড়তে চায় না। দর্শকদের মধ্যে যে কজন দূর থেকে তখনও উঁকিঝুঁকি মারছিল, তাদের উদ্দেশে সে বলল, তোমরা দেখলে, তোমরা পাঁচজনা দেখলে, ও আমার কেস কেড়ে নিচ্ছে। এ বাড়ি থেকে আগে আমার ডাক পড়েছিল—

সুরেন্দ্র বললো, এতক্ষণ ধরে তো ভ্যাজর ভ্যাজর করলে, ধরতে পেরেছো পেত্নীটাকে?

সুবল বললো, তুমি সরো। এবার আমি ভূতডামরতন্ত্র শুরু করবো। বেটি ধরা না পড়ে যাবে কোথায়?

সুরেন্দ্র বললো, রাখো তোমার ভূতডামরতন্ত্র! তুমি তোড়লতন্ত্রের নাম শুনেছো? সে হলো গে। সব তন্ত্রের বাবা। এইবার দ্যাখো, আমি সেই তোড়লতন্ত্র শুরু করছি!

সুরেন্দ্র তার ঝোলা থেকে টিনের বাক্সটা বার করে খুললো। তার মধ্যে ইঞ্জিকশানের সিরিঞ্জ আর টুকিটাকি ওষুধা একটা অ্যাম্পিউল ভেঙে সবটা ওষুধ ভরে নিল সিরিঞ্জে। তারপর ডগাটা উঁচু করে হাওয়া বার করলো।

সবাই শঙ্কিত বিস্ময়ে চুপ।

সুরেন্দ্র সর্বানন্দকে বললো, ভয় পেয়ো না, আমার সুঁই দেওয়ার অভ্যাস আছে। ফাদার পেরেরার নাম শুনেছো? মস্ত বড় ডাক্তার আমাকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নিয়ে নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। খাইয়ে পরিয়ে আমাকে মানুষ করেছেন তেনার কাছ থেকে সুঁই দেওয়া শিখেছি।

প্যাট করে সিরিঞ্জের সুঁচটা সে ফুটিয়ে দিল শান্তির ডান বাহুতে। পাকা কম্পাউন্ডারের মতন তার ভঙ্গি। শান্তি একটুও শব্দ করলো না। সবটুকু ঢেলে দিয়ে সঁচটা বার করে সুরেন্দ্র সর্বানন্দকে বললো, তোমার ছেলের বউয়ের হিস্টিরি অসুখ হয়েছে। এখন দশ বারো ঘণ্টা ঘুমোবো তারপর জেগে উঠলে ভাল করে খেতে দিও। সেরে যাবে। যাও, এবার ঘরে নিয়ে শুইয়ে দাওগে। উঃ, কানটা একেবারে ফালা ফালা করে দিয়েছে!

সর্বানন্দ বললো, বউয়ের গায়ে এখন এত শক্তি যে পাঁচজন মিলেও ওকে আগে ধরে রাখতে পারে নি। ঘরে নিয়ে যাবো কী করে?

সুরেন্দ্র বললো, হুঃ।

তারপর দক্ষযজ্ঞের শিবের মতন সে শান্তিকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল মাটি থেকে। সর্বানন্দকে বললো, কোন ঘরে শোয় দেখিয়ে দাও, বিছানায় রেখে আসছি।

বারান্দা পেরিয়ে দরজা দিয়ে ঢোকার মুখে সে সর্বানন্দের দিকে তীব্র ঘৃণার চোখে তাকালো। তারপর নীচু গলায় বললো, পোয়াতী বউটাকে বুঝি এইভাবে মেরে ফেলতে চাও? ছিঃ! তোমরা না ভদ্রলোক?

তিনদিন ধরে বৃষ্টি আর বৃষ্টি। বিশ্বাসই হয় না যে এটা শীতকাল। ঠিক যেন বর্ষার ধারা।

সারা গায়ে জল-কাদা মেখে সন্ধের সময় টলতে টলতে বাড়ি ফিরছে নিবারণা নেশাভাঙ কিছু করে নি, তবু তার পায়ে জোর নেই। শরীর যেন আর বয় না। যে-কোনো সময় যে-কোনো জায়গায় পড়ে যাবে। তার বুকে সারা বিশ্বের হতাশা।

মহাজনের কাছ থেকে কর্জ নিয়ে নিবারণ তার বন্ধকী জমিতে ফুলকপির চারা লাগিয়েছিল মাত্র পাঁচ দিন আগে বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে গেল। এই সময় এত বৃষ্টির কথা সে স্বপ্নেও ভাবে নি এ যেন ঈশ্বরের অভিশাপা আজ আবার পাশের জমির আল ভেঙে গিয়ে জল ঢুকে পড়লো। কপির চারাগুলো সব পচে যাবে। কিছু কিছু চারা তুলে ফেলার চেষ্টা করেছিল নিবারণ, কিন্তু অর্ধেকের বেশীই বাঁচাতে পারে নি। মহাজনের সঙ্গে শর্ত ছিল পঞ্চাশ-পঞ্চাশ

সে তো গেল ভবিষ্যতের কথা, কিন্তু আজ? কাল দুপুর থেকে মাটি কাটা বন্ধ হয়ে গেল। এই বৃষ্টির মধ্যে মাটি কেটে কোনো লাভ নেই। অথচ আজই ছিল নিবারণের পালা। আজ কাজ থাকলে সে নিজের খোরাকির ভাত আর নগদ সাড়ে চারটে টাকা পেতা এখন মনে হচ্ছে, সাড়ে চার টাকায় কত কিছু কেনা যায়! মাত্র সাড়ে চার টাকায় এক পৃথিবী ভর্তি সুখা

রহমান সাহেব বলেছেন, আজ যারা কাজ পেলো না, কাল যদি বৃষ্টি থামে, তবে তারাই কাজ পাবে আগে। আর কালও যদি বৃষ্টি থাকে? তাহলে পরশু। মোট কথা নিবারণের কাজ বাঁধা। এখন কাল বা পরশু পর্যন্ত নিবারণকে পেটে কিল মেরে বেঁচে থাকতে হবে।

নিবারণ ক্রুদ্ধ দু’চোখে আকাশের দিকে তাকালো। মেঘও মানুষের এত শত্রুতা করে? ছোট ছোট ফুলকপির চারাগুলো দেখলেও চোখ জুড়িয়ে যায়, ঠিক যেন মায়ের কোলে মুখ লুকোনো শিশু, আকাশের দেবতাদেরও একটু মায়া হলো না তাদের মেরে ফেলতে? ফুলকপির চারাগুলো কাঁদছিল ডুকরে ডুকরে, নিবারণ শুনেছে।

কাদার মধ্যে পা হড়কে যেতেই নিবারণের কোমরের কষি একটু আলগা হয়ে গেল, আর অমনি তার ট্যাঁক থেকে টুপুস করে খসে পড়লো একটা ছোট্ট কাঁচের শিশি তার মধ্যে রয়েছে কালো-হলদে রঙের লম্বা লম্বা ছ’খানা ওষুধা অন্ধকারে কাদার মধ্যে শিশিটা আবার গেল কোথায়? নিবারণ রোগা রোগা আঙুল দিয়ে সেটাকে খুঁজতে লাগলো। বিরক্তিতে তার গা জ্বলে যাচ্ছে। তার কিছুই ভাল লাগছে না।

পাওয়া গেল শিশিটা। ভেতরে কাদা ঢোকে নি তো? না, ওপরে একটা রবারের ছিপি আছে, হাওয়াও ঢুকতে পারে না। শিশিটা খুঁজে পেয়ে আনন্দ হবার বদলে নিবারণের ইচ্ছে হলো সেটা ছুঁড়ে ফেলে দেয়।

সোনারং-এর হেলথ সেন্টারের ডাক্তারবাবুর খুব মাছ ধরার শখা এক এক রোববার এক এক পুকুরে মাছ ধরতে যান। গত রোববার এসেছিলেন চৌধুরীবাবুর বাড়ির পেছনের মজা দীঘিতে পান্তি আর গেনু ঘুরঘুর করছে সেখানে মাছ ধরারই ঝোঁক ডাক্তারবাবুর, মাছ খাওয়ার লোভ নেই। একটার বেশি মাছ ধরা পড়লে বাকিগুলো অন্যদের বিলিয়ে দেন। সবাই জানে সেদিন ডাক্তারবাবুর ছিপে একটাও মাছ ধরা পড়ে নি অবশ্য, কিন্তু তিনি একবার এসেছিলেন নিবারণের বাড়িতে অল্পবয়েসী ডাক্তারবাবুটি ছোট ছেলেমেয়েদের সঙ্গে গল্প করেন খুবা পান্তি আর গেনুই টেনে এনেছিল ডাক্তারবাবুকে। ওরা ওদের দাদুকে ভালোবাসে। ক’দিন ধরে পবন খুবই অসুস্থ, কথা বলার ক্ষমতাও প্রায় নেই।

তা ডাক্তারবাবু পবনকে দেখে অনেক লম্বা লম্বা কথা বলে গিয়েছিলেন। এটা খাওয়াতে হবে, সেটা খাওয়াতে হবে। নিবারণ সে সব কথা এক কান দিয়ে শুনে আর এক কান দিয়ে বার করে দিয়েছে। তার বাপ বুড়ো হয়েছে, এবার মরবে। তা নিয়ে আর আদিখ্যেতা করার কি আছে? শীতের শেষটাতে পুরোনো রুগীরা টপাটপ মরে। গতবারেও এই সময়ে পবন শয্যা নিয়েছিল? সেবার খুব আশা করেছিল নিবারণ যে বাবা এবারেই যাবে। শুধু শুধু বেঁচে থেকে সে তো পৃথিবীর এক রত্তি উপকারে আসে না। ওমা, বুড়ো ক’দিন বাদেই হাত-পা ঝেড়ে আবার উঠে বসলো। অবশ্য এবার আর পার পাবে না।

আজ বৃষ্টির মধ্যে খালধারে ঝাড়া দু’ঘণ্টা নিবারণ বসেছিল গাছতলায়। যদি হঠাৎ বৃষ্টি থামে, যদি মাটিকাটা শুরু হয়। সে সময় ছাতা মাথায় দিয়ে বাঁধের ওপর দিয়ে কলে যাচ্ছিলেন ডাক্তারবাবু। নিবারণকে দেখে থামলেন। ডাক্তারবাবুটি আবার সবার সঙ্গে আপনি আজ্ঞে করে কথা বলেন। কপালে হাত ঠেকিয়ে নমস্কার করে তিনি নিবারণকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার বাবা কেমন আছেন?

এসব জায়গায় শুধু শুধু কথা বাড়িয়ে লাভ নেই তাই নিবারণ বলেছিল, ভালো।

—আমার ওখানে একবার আসবেন। আমি কয়েকটা ওষুধ লিখে দেব, আপনার বাবাকে একটা টনিক খাওয়ানো দরকার—

নিবারণ চুপ করে ছিল। ডাক্তারবাবু আবার বলেছিলেন, আজই আসতে পারেন। এই ধরুন ঘণ্টাখানেক বাদে। আমি তার মধ্যেই ফিরে আসবো।।

সেই সময়, যেন নিবারণ নয়, তার ভেতর থেকে অন্য কেউ কথা বলে উঠেছিল, ডাক্তারবাবু, আমরা গরীব, ভগবান আমাদের দুবেলা পেটের ভাতও দেন নি, আমরা কি ঐ সব দামী ওষুধ খেতে পারি?

ডাক্তারবাবুটির জোড়া ভুরু। তিনি তাঁর বড় বড় কালো দুটি চোখ নিবারণের মুখের ওপর স্থির ভাবে রেখে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে ছিলেন। তারপর নিজের হাতের মস্তোবড় ব্যাগটা খুলে এই ওষুধের শিশিটা নিবারণকে দিয়ে বললেন, এটা দিনে দুটো করে খাওয়াবেন। ভাত খাওয়ার পর আজ না হোক, কাল পরশু আমার ওখানে একবার আসুন, দেখি আমি কী ব্যবস্থা করতে পারি।

নিবারণ কোনো কথা বলছে না দেখে তিনি একটুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বললেন, কখনো আশা ছাড়তে নেই।

তখনও নিবারণের আনন্দ হয় নি। রাগই হয়েছিল এক এক সময় মানুষের দয়া দেখলেও রাগ হয়। ডাক্তারবাবু যদি আর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বড় বড় উপদেশের কথা বলতেন, তাহলে নিশ্চয়ই নিবারণ মনে মনে তাঁকে বাপ মা তুলে গাল দিতা সহ্য হয় না, কিছুই সহ্য হয় না।

অন্ধকারে কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে ওষুধের শিশিটা হাতে নিয়ে নিবারণের মুখে একটা হাসি ফুটে উঠলো। যা না-ক্রোধ, না-ঘৃণা, না-উপহাস, না-দুঃখ, না-করুণার। সে হাসিটা অন্যরকম, বড় দুর্বোধ্যা ডাক্তারটি বললেন, ওষুধটা দু’বেলাতে ভাত খাওয়ার পর খাওয়াবেন। ডাক্তারটা বোকা, কিছুই শেখে নি। এখন নিবারণ যদি ওষুধটা ছুঁড়ে ফেলে দেয়, তাহলে কি তার পাপ হবে?

ওষুধটা ফেললো না নিবারণ। যাই হোক, দামী জিনিস তো। সে আবার হেঁটে চললো। মাঝারি ধারায় অবিরাম বৃষ্টি পড়ে যাচ্ছে। এই সময় পৃথিবীতে নিবারণ ছাড়া কেউ নেই। সে তার বাড়ির দিকে যাচ্ছে। এখন পথিবীতে তার সবচেয়ে ঘৃণার জায়গা তার নিজের বাড়ি, তবু সে সেখানেই যাবে।

আর বেশী দূর নেই। রাস্তার মাঝখানেই খানিকটা জল জমে আছে, সেইখানে নিবারণ তার পায়ের কাদা ধুয়ে নিল। তারপর সামনে তাকাতেই আঁতকে উঠলো সে।

তার বাড়ির সামনে বাতাবীলেবু গাছটায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কে! বৃষ্টির মধ্যে ভাঙা ভাঙা অন্ধকারে দেখা যায় এক প্রেত! নিবারণের প্রাণটা যেন এসে আটকে গেল গলার কাছে। প্রথমেই তার মনে হলো, পিছন ফিরে দৌড় দেয়। প্রেতের বুকের পাঁজরার সবকটা হাড় স্পষ্ট, কঙ্কালসার একটা হাত সামনে বাড়ানো। নিবারণ মুখ দিয়ে একটা আওয়াজ করলো, আঁ আঁ।

প্রেতমূর্তি তখন নাকি ভাঙা গলায় বললো, কে, নিবারণ এলি?

পেছনে ফিরে পালাতে গিয়েও থেমে গিয়ে নিবারণ বললো, ধুর শালা!

সকালবেলাও নিবারণ যাকে দেখে গেছে বিছানার সঙ্গে একেবারে লাগা, ওঠার ক্ষমতা নেই, কথা বলার শক্তি নেই, সে যে এই বৃষ্টির মধ্যে রাত্তিরে উঠে এসে দাঁড়াবে—একথা তো নিবারণ কল্পনাই করে নি! এ যে কইমাছের মতন কড়া জান! হারামীর বাচ্চা, শালা!

নিবারণ এক ধমক দিয়ে বললো, তুমি আবার বাইরে এয়েছো কেন? কথা বলতে গিয়ে হাঁপাচ্ছে, তার গলাও খখানা খোনা মনে হয়। সে বললো, তুই এখনো ফিরিস নি। যা বৃষ্টি বাদলা, আমি চিন্তা করছিলাম।

নিবারম দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এ যে স্পষ্ট কথা বলে তাহলে কি এ যাত্রাতেও বেঁচে গেল! হা ভগবান, আরও কতদিন এ বোঝা বইতে হবে?

পবন জিজ্ঞেস করলো, কিছু এনেছিস?

নিবারণ বললো, কী?

—চাল-আটা কিছু আনিস নি?

—কোতা থেকে আনবো? তোমার বাপের কাছ ঠেঙে? আজ মাটি কাটার কাজ হয় নি। আজ আমার যেটুকু সর্বনাশ বাকি ছিল, তাও হয়ে গেছে!

—কিছুই আনিস নি?

ট্যাঁক থেকে শিশিটা বার করে নিবারণ বললো, ওষুধ এনেছি। ডাক্তারবাবু বিনিপয়সায় ওষুধ দিলেন তোমার জন্য। নাতি-নাতনী দুটোকে খুব জপিয়েছে তো, তারা ডাক্তারবাবুকে ধরেছিল।

পবন ওষুধের ব্যাপারটার কোনো গুরুত্বই না দিয়ে বললো, চাল-আটা কিছুই আনিস নি? আজ সারাদিন বাড়িতে আখা ধরে নি!

সেই মুহূর্তে নিবারণ তার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করে ফেললো। সে দৃঢ় গলায় বললো, আমাদের আর এখানে কোনো আশা নেই। কাল চলে যাবে। টাউনে গিয়ে রেল ইস্টেশনে ভিক্ষে করে খাবো।

পবন খুব উৎসাহের সঙ্গে বললো, তাই চল।

—তুমি যেতে পারবে?

–কেন পারবো না? একটু ধরে নিয়ে যাবি।

—যেতে পারো ভালল, না হলে তুমি বাড়ি পাহারা দেবে। ছেলেমেয়ে দুটো ঘুমিয়ে পড়েছে, বউ শুয়ে শুয়ে জেগে আছে। চোখ দুটি বিবর্ণা সারা শরীরের মধ্যে শুধু পেট ছাড়া আর সবজায়গাতেই স্বাস্থ্যহীনতা প্রকটা।

ঘরে ঢুকে নিবারণ গম্ভীরভাবে বললো, আজ কিছু আনতে পারিনি।

বউয়ের মুখে কিছু ভাবান্তর দেখা গেল না।

—ঘরে কিছু আছে?

বউ দেয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললে, না।

নিবারণ অসম্ভব জোরে চিৎকার করে বললো, নেই কেন? আমি এখন খাবো কি? কাল রাত্তিরে যে খানিকটা আটা বেঁচেছিল?

বউ একটুও উত্তেজিত হলো না। সেই রকমই মুখ ফিরিয়ে থেকে বললো, বিকেল পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছিলাম, তারপর পান্তি আর গেনু জল দিয়ে সেই আটা খেয়ে ফেলেছে।

হেঁড়া কাঁথাটা গায়ে দিয়ে পবন শুয়ে পড়েছিল, সে হঠাৎ উঠে বসে ছেলের পক্ষ নিয়ে আলাদা একটা দল পাকাবার চেষ্টা করলো কুটিল চোখে সে একবার তার পুত্রবধূ, একবার তার ছেলের দিকে তাকিয়ে বললো, দ্যাখ না, আমাকে পর্যন্ত একটু দেয় নি নিজেরাই সব খেলা আমি কতবার বললাম, ও বউ, আমাকে একটু দো আজ আমার জ্বর ছেড়েচে, আজ আমার খিদে বেশী হবে, অন্তত আমাকে ছটাক খানেক দো কিংবা আমাকে না দিস, ছেলেটার জন্য একটু রাখ, সারাদিন খেটেখুটে আসবে—সেকথা গ্রাহ্যই করলো না। নিজেরাই গাণ্ডেপিণ্ডে খেলে—

বউ এবার দেয়াল থেকে চোখ ফেরালো শ্বশুরের দিকে এমনভাবে তাকালো যেন সেই দৃষ্টিতেই তাকে ভস্ম করে দেবো কনুইতে ভর দিয়ে আধা-বসা হয়ে কণ্ঠে বিষ ঝরিয়ে সে বললো, খালভরা, তোমার মরণ নেই? একথা বলার আগে তোমার জিভ খসে গেল না? ছেলেমেয়ে দুটো খেয়েছে, আমি নিজে একটা দানাও ছুঁয়েছি? আমার পেটে একটা শব্দুর, তবু। আমি কিছু খাইনি। আর তোমার নোলাটাই বড়ো হলো? ভারী যে ছেলের জন্য দরদ! নিজে তিনবার রান্নাঘরে গিয়ে ঘুটঘাট করে আসসা নি? ছেলের জন্য তুমি রাখতে? সব জানা আছে আমার। অলপ্লেয়ে, তুমি মরতে পারো না? মরলে আমার হাড় জুড়োয়!

পবন ছেলের দিকে চেয়ে বললো, দেখলি? দেখলি?

নিবারণ কোনো পক্ষই নিল না। তার ইচ্ছে হলো, ঘুমন্ত ছেলেমেয়ে দুটোকে জোরে জোরে লাথি কষায় বাপকে লাথি কষায়, বউকেও খাবার দরকার ছিল তার একার। কাল যদি ভগবান করেন বৃষ্টি বন্ধ হয়, তাহলে না খেয়ে কুঁকতে ধুকতে সে মাটি কাটতে যাবে কী করে? সে নিজে না বাঁচলে আর কেউ বাঁচবে? সে কথা এরা কেউ বোঝে না সকলেই রাক্ষুসে খিদে নিয়ে হাঁ করে আছে।

কালও যদি বৃষ্টি না থামে, তাহলে যেতেই হবে টাউনে। রেল ইস্টিশনে মাথা গোঁজার জায়গা জুটে যাবে। টাউনে কেউ না খেয়ে মরে না। টাউনের লোকদের ওপর ভগবানের অশেষ দয়া।

বউ তখনও গজগজ করে যাচ্ছিল, নিবারণ প্রচণ্ড এক ধমক দিয়ে বললো, চোপ!

দরজার বাইরে থেকে জল গড়িয়ে আসে ঘরের ভেতরে, তাই সেই জল আটকাবার জন্য দরজার কাছে একটা ন্যাতা পেতে রাখা আছে। সেই ভেজা ন্যাতাটা তুলে নিয়ে নিবারণ হাতপায়ের কাদা মুছলো। এখন এই অন্ধকারের মধ্যে তার পুকুরে যাবার ইচ্ছে নেই। ঢকঢক করে এক ঘটি জল খেয়ে শুয়ে পড়লো।।

পাশাপাশি একখানা বড় ঘর আর ছোট ঘর। মাঝখানের দরজাটা আজকাল খোলাই থাকে। ছোটঘরের জানালাটা নিশ্চয়ই খোলা রয়েছে, গুঁড়ো গুঁড়ো বৃষ্টির ছাঁট আসছে এ ঘর পর্যন্ত। নিবারণ ভাবলো, তার বাপ ভিজছে, ভিজুক। আজও তো চলাফেরার ক্ষমতা রয়েছে, নিজে উঠে বন্ধ করতে পারে না? নিবারণের গায়ে যদি বেশী ছাঁট লাগে, সে পা দিয়ে ঠেলে মাঝের দরজাটা বন্ধ করে দেবো

কোনো শব্দ নেই, শুধু টিনের চালে কাকের পায়ের আওয়াজের মতন বৃষ্টি ছেলেমেয়ে দুটি অঘোরে ঘুমোচ্ছে, আর জাগে নি তারপর ঘুমোয় গর্ভিণী, কিন্তু খালি পেট নিয়ে নিবারণের কিছুতেই ঘুম আসে না। আর এক অসুস্থবৃদ্ধের তো সহজে ঘুম আসবার কথা নয়।

খানিকবাদে পবন কোঁ কোঁ শব্দ করে ওঠে।

নিবারণ জিজ্ঞেস করলো, কী হলো আবার?

পবন শ্বাস টেনে টেনে বলে, কিছু না দু’দিন ভাত খাইনে, বড় খিদে পায়।

নিবারণ ওষুধের শিশিটা তার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলে, এই নাও, খাও।

পবন শ্বাস টেনে টেনে বলে, কিছু না। দু’দিন ভাত খাইনে। বড় ছোট সবকটা ক্যাপসুলই মুখে পুরে চিবোতে থাকে। খচর মচর শব্দ হয়।

একটু পরে সে আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, উফ! কতদিন তামাক খাই না। বউয়ের কাছে একটু আগুন চাইলাম, দিল না।

—তুমি চুপ করবে?

বুড়ো চুপ করে যায়, তবু মুখ থেকে চাপা কোঁ কোঁ শব্দ বেরোয় নিঃশ্বাসের সঙ্গে।

তারপর আরও অনেকক্ষণ বাদে, তখনও নিবারণ ঘুমোয়নি, জানালা দিয়ে একফালি আলো ঢুকে দেওয়ালের গায়ে দু-এক পলক কাঁপে, আবার মিলিয়ে যায়। কিছু দূরে শোনা যায় ক্ষীণ রুনুঝুনু শব্দ।

নিবারণ কান খাড়া করে থাকে। ওরা আসছে। আশ্চর্য, এই বৃষ্টি বাদলার মধ্যেও বেরিয়েছে ওরা! নিবারণের পেটের মধ্যে ধিকিধিকি করে জ্বলে অহেতুক রাগ। ওদের পকেটে টাকা আছে, গায়ে শক্তি আছে, তাও ওরা এইসব আমোদ আহাদ করতে পারে। ওরা নিবারণের মতন লোকদের আরও কষ্ট দেবার জন্য আসো কান-কাটা সুরেন্দ্রটা মরে না কেন? কত লোক বে ঘোরে মরে, ওর মরণ হয় না?

ওরা পাঁচলার মোড়ের গাছতলায় এসে পৌঁছে গেছে মনে হয়। ঘুঙুরের শব্দের সঙ্গে ভেসে আসে টুকরো টুকরো গান

ভূতের নাতি ভূতের পুতি…বুড়ো হাবড়া ছোঁড়াছুঁড়ি
যেমন তেমন ভূত পেলে ভাই…
ভূত কিনিতে, ও ভাই ভূত কিনিতে…
শ’টাকা শ’টাকা…
 এক এক ভূত এক এক শো টাকা…

পবন দুবার কেশে ওঠো বোঝা যায় সেও জেগে আছে। নিবারণ জিজ্ঞেস করে, বাবা ও বাবা?

তোমার কষ্ট হচ্ছে?

পবন বলে, না।

–বাবা, তুমি ভূত দেখেছো কখনো, সত্যি করে কও তো!

–হ্যাঁ, দেখিছি। অনেকবার দেখিছি।

–কারা ম’লে ভূত হয়? সকলেই ম’লে ভূত হয়?

—যারা অপঘাতে মরে, মরার পরেও যাদের আহিঙ্কে থেকে যায়।

নিবারণ হঠাৎ উঠে পড়ে দরজার কাছে দাঁড়ায়। অন্ধকারের মধ্যে আরও গাঢ়তর অন্ধকার। হয়ে দেখা যায় শরীরটা।

পবন জিজ্ঞেস করে, ওঠলি যে? বাইরে যাবি?

নিবারণ বললো, না। বাবা, তুমি ম’লে…

পবন বলে, হ্যাঁ, আমি ভূত হবে নিশ্চয়। সে কি আর তোকে বলতে হবে…নাতি নাতনী দুটোর মুখ চেয়েও…সুরেন্দ্রকে ডেকে আনিস…আমি বোতলে ঢুকে যাবো, তুই একশো টাকা…

তারপরই চিঙ্কার ও কান্না মিশিয়ে সে বলে ওঠে, ও বাবা নেবারণ, আমাকে মারিস না, আর দুটো দিন অন্তত বাঁচতে দে, আমি দুটো দিন…একটু গরম ভাত দিস…দুটো দিন একটু পেট ভরে খেয়ে যাই…এক ছিলিম তামাক…ও বাবা নেবারণ, তোর পায়ে পড়ি…আর দুটো দিন…একটু গরম ভাত…তোর পায়ে পড়ি, ও বাবা নেবারণ, আর দুটো দিন…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *