অদৃশ্য বাঁশি

অদৃশ্য বাঁশি

আমি জীবনে তিনবার সেই বাঁশি শুনেছি।

সুন্দর, মিষ্টি সেই বাঁশির সুর শুনলেই আমার চোখে একটা ছবি ভেসে ওঠে। একটা চোদ্দো পনেরো বছরের রাখাল ছেলে একটা মোষের পিঠে চড়ে বাঁশি বাঁজাচ্ছে।

ক্যালেন্ডারে কৃষ্ণের যেমন ছবি থাকে, তেমন নয় কিন্তু। সে কৃষ্ণ বাঁশি বাজায় গাছতলায় বসে। মোষের পিঠে চাপা কৃষ্ণর কোনও ছবি আমি দেখিনি। কিন্তু বিহারে বেশ কয়েকবার দেখেছি, রাখাল ছেলেরা মোষের পিঠে চেপে দুলতে-দুলতে যায়। কিন্তু তাদের কারুর হাতে বাঁশি থাকে না।

প্রথমবার শুনেছিলাম মধ্যপ্রদেশে বস্তারের জঙ্গলে।

আমি আর আমার বন্ধু শক্তি হেঁটে-হেঁটে যাচ্ছিলাম মুড়িয়া ঘাটের দিকে। দিনেরবেলা। শীতকালের পরিষ্কার আকাশ। খুব বেশি শীত নেই, গায়ে রোদের ছোঁয়া লাগলে আরাম হয়।

জঙ্গলটা বেশ পরিষ্কার, বড়-বড় গাছ, কিন্তু ঝোপঝাড় বিশেষ নেই। অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। সুরকি বেছানো লাল রঙের রাস্তা। রায়পুরের থানার দারোগা বলে দিয়েছেন, এই জঙ্গলে ভয়ের কিছু নেই, ছোটখাটো ভাল্লুক, বেরোয় মাঝে-মাঝে। তাও দিনেরবেলা তাদের দেখা যায় না।

মাত্র সাড়ে ছমাইল রাস্তা, হেঁটে যেতে বড়জোর দু-ঘণ্টা লাগবে।

এক ঘণ্টার মতন হেঁটেছি সেখানটায় জঙ্গল বেশ ঘন, মানুষজন কিছু নেই। কোনও শব্দও নেই।

হঠাৎ শুনতে পেলাম একটা বাঁশির সুর।

শুনে মনে হল, জঙ্গলে অনেকে গরু-মোষ চরাতে আসে নিশ্চয়ই কোনও রাখাল ছেলে আপন মনে বাঁশি বাজাচ্ছে।

এদিক-ওদিক তাকিয়ে কোনও গরু-মোষ দেখা গেল না। অথচ বাঁশির আওয়াজটা বেশ কাছেই। শক্তিকে জিগ্যেস করলাম, কোথায় বাঁশি বাজছে বলো তো?

শক্তি বলল, বাঁশি? কোথায় বাঁশি?

আমি বললুম, একটু মন দিয়ে শোনো।

শক্তি চোখ কুঁচকে মাথাটা একটু হেলিয়ে থেকে একটু পরে বলল, ধুৎ। কিছু শুনতে পাচ্ছি না তো!

আশ্চর্য ব্যাপার, শক্তি শুনছে না, অথচ আমি শুনতে পাচ্ছি স্পষ্ট। শুধু তাই নয়, সুরটা যেন চুম্বকের মতন টানছে।

শক্তি এগোতেই আমি তার হাত ধরে টেনে বললাম, দাঁড়াও, পুরোটা শুনে যাই।

শক্তি বলল, পাগল হলে নাকি? গাছের পাতায় বাতাসের সরসর শব্দ হচ্ছে, তুমি তাই শুনে ভাবছ–

আমি শুধু বাঁশি শুনছি না, কল্পনায় দেখতেও পাচ্ছি, মোষের পিঠে চেপে একটি কিশোর বাঁশি বাজাচ্ছে তন্ময় হয়ে।

শক্তির সঙ্গে আমার ঝগড়া হওয়ার উপক্রম। শক্তি এগোবেই, আমি বসে পড়লাম রাস্তার ধারে একটা পাথরের ওপর।

একটু কাছেই চ্যাঁচামচি—গোলমাল শুনে চমকে উঠলাম।

কয়েকজন উলটো দিক থেকে ছুটতে ছুটতে আসছে। তাদের চিৎকার শুনলে মনে হয়, কোনও কারণে ভয় পেয়েছে খুব।

কাছে আসতেই দেখা গেল, তাদের মধ্যে একজনের সারা গায়ে রক্ত, তাকে অন্যরা কোলে করে আনছে।

আমাদের দেখে তারা বলল, ভাগো, ভাগো।

কী হয়েছে? কী হয়েছে?

তাদের বেশি কথা বলার সময় নেই। লোকটিকে এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। আহত লোকটির বুক থেকে ভলকে-ভলকে রক্ত বেরুচ্ছে।

সংক্ষেপে তারা জানাল, এখান থেকে একটু দূরেই দুটো প্রকাণ্ড ভাল্লুক রয়েছে রাস্তার ওপরে। তারাই আক্রমণ করেছে ওদের। ওরা জঙ্গলে কাঠ কাটতে আসে। আগে কখনও এমন বিপদে পড়েনি।

বলাই বাহুল্য, আমরাও দৌড়াতে লাগলুম ওদের সঙ্গে।

রায়পুরের দারোগাটি আমাদের ভুল বুঝিয়েছিল। যে জঙ্গলে ছোট-ছোট ভাল্লুক আছে, সেখানে কি বড় ভাল্লুক থাকতে পারে না? আর তারা শুধু রাত্রিতেই বেরুবে, দিনেরবেলা বেরুবে না, এমনকী কথা দিয়েছে কারুর কাছে?

আমরা খানিকটা এগুলে, ভাল্লুক দুটো আমাদেরও আক্রমণ করতে পারত। তাহলে বাঁশির আওয়াজটাই বাঁচিয়ে দিল আমাদের। কিন্তু কে সেই বাঁশি বাজাল?

একথা অন্যদের বললেও তো কেউ বিশ্বাস করবে না। শক্তি আমার সঙ্গে ছিল, সে-ও বিশ্বাস করবে না। কিন্তু বাঁশির আওয়াজ যে আমি শুনেছি, তাতে কোনও ভুল নেই। এবং ভাল্লুকের ঘটনাটাও সত্যি। শক্তি একটা ভ্রমণ কাহিনিতে লিখেছে।

দ্বিতীয়বার সেই বাঁশি আমি শুনতে পাই কয়েক বছর পর। কল্যাণেশ্বরী ডাকবাংলোয়। সেবারে আমার সঙ্গে কেউ ছিল না।

সেবারে কোনও বিপদ থেকে বাঁচার মতনও কিছু ঘটেনি।

কল্যাণেশ্বরীর বাংলোটি খুব নিরিবিলি। সেখানে আমি এক মাস ছিলাম। লেখার জন্য।

সরকারি বাংলো, তাই ভাড়া খুব সামান্য। চৌকিদার ও রান্নার লোক আলাদা, তারা দুজনে খুব ঝগড়া করে বটে, কিন্তু আমার যত্নের কোনও ত্রুটি হয় না। রান্নার লোকটির হাত খুব চমৎকার। এখানে নানান রকমের মদ পাওয়া যায়। আর পাঁঠার মাংসের স্বাদও কলকাতার চেয়ে অনেক ভালো।

আমি মাঝে-মাঝে কলকাতার ভিড় থেকে পালিয়ে গিয়ে কোথাও একা দিনের-পর-দিন কাটিয়ে দেওয়া বেশ উপভোগ করি। লেখাতেও মন বসে।

একা থাকায় বিপদও আছে। বাইরের বিপদ নয় ভেতরের বিপদ।

কয়েকদিন থাকবার পর হঠাৎ মন খারাপ হয়। সে মন খারাপের কোনও ব্যাখ্যা নেই। কোনও কিছু না পাওয়ার জন্য নয়। এমনকী নারীসঙ্গ থেকে বঞ্চিত হওয়ার জন্যও নয়। এক-একসময় মেয়েদের সঙ্গে খানিকটা দূরত্ব রেখে মনে মনে তো আরও নিবিড় করে পাওয়া যায়। অবশ্য বেশি দিনের জন্য নয়। অন্তত দিন পনেরো কোনও নারীকেই না দেখে কাটিয়ে দেওয়া যায়। ষোলো দিনের দিন ছটফটানি শুরু হবেই।

আমি ঠিক পনেরো দিনের জন্যই গিয়েছিলাম কল্যাণেশ্বরী ডাকবাংলোয়। দোতলার ঘরটি চমৎকার। এই বাংলোটি ফাঁকাই থাকে বেশিরভাগ সময়, অন্তত আমি থাকার সময় আর কেউ আসেনি।

ছদিনের মাথায় আমার আচমকা মন খারাপ শুরু হয়ে গেল। যেন ভাইরাস জ্বরের মতন। কোথা থেকে আসে কে জানে। একবার মন খারাপ হলে তা বাড়তেই থাকে। কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। অ্যাসিডিটি হয়নি, গায়ে ব্যথা নেই, শরীর বেশ সুস্থই আছে, তবু খাবারের স্বাদ হারিয়ে গেল। এই সময় হয়তো আশেপাশে মানুষজন থাকলে খানিকটা চাঙ্গা হওয়া যায়। কিন্তু আমি পনেরো দিনের আগে ফিরবই না প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছিলাম। এবং সে প্রতিজ্ঞা ভাঙারও কোনও ইচ্ছে জাগল না।

লেখাও বন্ধ হয়ে গেল।

এরকম সময়, বেঁচে থেকে লাভ কী, কেন পাতার-পর-পাতা লিখছি, না লিখলেই বা ক্ষতি কী। আমার জীবনের কী মূল্য আছে। এই ধরনের আজে-বাজে চিন্তাই বেশি আসে।

তখনও আমি বিয়ে করিনি।

দু-তিনজন বান্ধবীর কথা চিন্তা করে মনটা ফেরাবার চেষ্টা করি। এবং বাস্তবে যা সম্ভব নয়, মনে মনে তাদের সমস্ত জামা-কাপড় খুলে ফেলারও অসুবিধে নেই। তবু কয়েক মুহূর্ত বাদেই তাদের শরীর মিলিয়ে যায়। কে না কে আমাকে কিছুটা বিদ্রুপ করেছে, আমার চেয়ে অন্য কাজের প্রতি বেশি মনোযোগ দিয়েছে, সেইসব কথা ও দৃশ্য উঠে আসে মনের ভেতর থেকে।

শেষপর্যন্ত এমনই অবস্থা হল, লিখতে তো ইচ্ছে করেই না, বরং যে কয়েক পাতা লিখেছি, তাও ছিঁড়ে ফেলতে হয়।

দুপুরবেলা চিত হয়ে শুয়ে যাই, ঘুমও আসে না।

এরকমভাবে একদিন, দুদিন, তিনদিন কেটে যাওয়ার পর, যখন আমি মন খারাপের একেবারে শেষ সীমায় নেমে গেছি, তখনও বেজে উঠল সেই বাঁশি।

ধড়ফড় করে বিছানা ছেড়ে নেমে এসে দাঁড়ালাম জানলার কাছে। সামনে অনেকখানি ফাঁকা মাঠ, ঝোপঝাড়, ঘাসে ভরা, বড় গাছ নেই। অন্য দিন এখানে গরু-মোষ চরতে দেখেছি।

আজও কয়েকটা গরু-মোষ রয়েছে ইতস্তত, কিন্তু কোনও রাখালকে দেখা যাচ্ছে না। বাঁশি কিন্তু বেজেই চলেছে। আর সে সুর এমনই বাস্তব যে আমার দৃঢ় বিশ্বাস হল, কাছাকাছি কেউ নিশ্চিত সেই বাঁশি বাজাচ্ছে।

আমি তড়বড়িয়ে নীচে নেমে এসে ছুটে গেলাম বাইরে।

ও দিকের মাঠটায় কেউ নেই। অন্যদিকে খানিকটা জঙ্গলের মতন, সেখানেও কেউ নেই।

ভুতুড়ে ব্যাপার নাকি? ভূতে বাঁশি বাজায়, এমন কখনও শুনিনি। ভূত না হলে, দৈব ব্যাপার? আমার মতন একজন বদ্ধমূল অবিশ্বাসীর জন্য কোনও দেবতা এসে বাঁশি বাজাচ্ছে কেন? এটাও বিশ্বাসযোগ্য নয়।

বাঁশির আওয়াজ বেশ মৃদু আর সুমধুর। মিনিটদশেক পরে যেন হাওয়ার মিশিয়ে গেল।

তারপর সারা বিকেল সেই বাঁশির কথা ভাবতে-ভাবতেই আমার অনেক সময় কেটে গেল। এরকম এক-একটা ধাঁধার সমাধান করতে না পারলে কিছুতেই স্বস্তি পাওয়া যায় না। মধ্যপ্রদেশের কবলে আমি যে বাঁশির সুরটা শুনেছিলাম, আজকের সুর ঠিক একই রকম।

দু-জায়গায় রাখাল, এতখানি দূরত্ব, ঠিক একই সুরে বাজাবে? লোক সঙ্গীতের সুরের মিল থাকে, তা বলে এতটা মিল?

এটা আমার নিছক কল্পনা? আগেরবার, আমি স্পষ্ট শুনেছি। অথচ শক্তি শুনতে পায়নি।

কিন্তু কল্পনা আর বাস্তবের প্রভেদ বোঝার বয়েস আমার এখনও হয়নি? কোনও রকম অলৌকিক ব্যাপারেই যে আমার বিশ্বাস নেই!

ভাবতে-ভাবতে আমার ঘুম এসে গেল।

জেগে উঠলুম প্রায় সাতটার সময়। শরীরটা বেশ ঝরঝরে হয়ে গেছে।

এককাপ চা খাওয়ার পর খুঁজতে লাগলাম কলমটা। এবার লেখার প্যাডে কলমটা চলতে লাগল সাবলীলভাবে।

তৃতীয়বার সেই বাঁশি শুনি আরও সাড়ে চার বছর পর।

একটা সাহিত্যসভা উপলক্ষে গিয়েছিলাম ত্রিপুরায়। উদ্যোক্তারা আমাদের খাতির করে এক রাতের জন্য সিপাহিজলা ডাকবাংলোয় রাত কাটাবার ব্যবস্থা করেছিল। দলে আমরা চারজন, আর দেখাশুনো করার জন্য স্থানীয় দুজন।

জঙ্গল ও জলাভূমির পাশে ডাকবাংলোটি ভারী মনোরম।

এসব জায়গায় একলা এলে প্রকৃতির দিকে যতটা মনোযোগ দেওয়া যায়, দল বেঁধে এলে তার উপায় থাকে না।

কিছুক্ষণ আহা-আহা করার পরই মন চলে যায় খাওয়াদাওয়ার দিকে। সঙ্গে পানীয়ও থাকবে অবশ্যই। তারপর আড্ডা। পানীয়ের মাত্রা যত চড়ে, আড্ডা ততই হয়, কেউ অন্যের কথা শুনতে চায় না।

সেই সময় আমার পক্ষে একা থাকাটাই ছিল বিপজ্জনক।

একা হয়ে পড়লেই আমি এক সাংঘাতিক দ্বন্দ্বে কাতর হয়ে যাই, কোনটা সঠিক পথ তা বুঝতে পারি না কিছুতেই। তার চেয়ে আড্ডা, হইহল্লা ও মদ্যপানে মেতে থাকলে তবু বিলক্ষণ ভুলে থাকা যায়।

আমি যদি চাই, যে মুহূর্তে বলব, এসো, তক্ষুনি অপর্ণা আমার হবে। সেসব কিছু ছেড়ে চলে আসবে আমার কাছে।

আর আমি যদি না চাই, যদি দ্বিধা করি, যদি প্রকৃত পৌরুষ দেখাবার বদলে দুর্বল হয়ে পড়ি, তাহলে সে চলে যাবে সদ্য পাশ করা এক ডাক্তারের সঙ্গে।

অপর্ণাও যে আমাকে ভালোবাসে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই, না হলে সে আমার ইঙ্গিতমাত্র সবকিছু ছেড়ে কাছে চলে আসতে চাইবে কেন?

কিন্তু আমি একটু দ্বিধা করলেই সে আরেকজনের সঙ্গিনী হবে, এ আবার কী ধরনের ভালোবাসা? এরকম মনে হতে পারে, কিন্তু আমি জানি, অপর্ণার কোনও দোষ নেই। সে ভালোবাসা নিয়ে দরাদরি করতে চায় না।

একট পচে যাওয়া বনেদি বাড়ির মেয়ে অপর্ণা। বিশাল একটা অট্টালিকা, কিন্তু সে অট্টালিকার রন্ধ্রে-রন্ধ্রে ঘুণ ধরে গেছে। বিরাট পরিবার, সেখানে কেউ কারুকে ভালোবাসে না, মায়াদয়া নেই, সম্পত্তি ভাগাভাগি নিয়ে হিংসে ও সন্দেহের বিষের ছোঁয়া সে-বাড়িতে ছেয়ে আছে সবসময়।

অপর্ণা মরিয়া হয়ে সে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চায়। মাঝে-মাঝে সে অসুখে ভুগছে। ও বাড়িতে থাকলে ওর মতন সূক্ষ্ম, স্পর্শকাতর মেয়ে বেশিদিন বাঁচবে না।

আর আমি দরিদ্র, উদ্বাস্তু পরিবারের ছেলে। দুখানা ঘরের ফ্ল্যাটে মা-বাবা, ভাই-বোনদের সঙ্গে থাকি। সেখানে অপর্ণাকে টেনে আনা যায়? সদ্য একটা চাকরি পেয়েছি বটে, সামান্য ধরনের, সে উপার্জনে অন্য জায়গায় সংসার পাতাও সম্ভব নয়। তা ছাড়া বাবা অসুস্থ, তিনি এতদিন সংসার। টেনেছেন, এখন আমি তাঁর পাশে দাঁড়াবার বদলে যদি নিজে বিয়ে করে আলাদা হয়ে চলে যাই, সেটাও হবে চরম স্বার্থপরতা। অমানবিকতা। সেই গ্লানি মনের মধ্যে থাকলে, ভালোবাসা কতদিন টিকবে? আমার অপরাধবোধ অপর্ণাকেও যন্ত্রণা দেবে।

তরুণ ডাক্তারটিকে যে অপর্ণা ভালোবাসে, তা নয়, মোটামুটি পছন্দ করে। মেয়েরা নিজের প্রেমিক ছাড়াও আরও পুরুষকে তো পছন্দ করতেই পারে। পুরুষরা এরকম করে না? ডাক্তার ছেলেটিরই ঝোঁক বেশি।

আমি বুঝতে পারি, ডাক্তারটির সঙ্গে অপর্ণা চলে গেলে একটা সুস্থ জীবন পেতে পারে। সে ছেলেটির মা ছাড়া আর কেউ নেই, তা ছাড়া বিদেশে যাওয়ার কথা চলছে।

আমাদের মাঝখানে ঝুলে আসে ভালোবাসা।

কিন্তু শুধু ভালোবাসা যে নিজের পায়ে বেশিদিন দাঁড়াতে পারে না। কয়েকটা খুঁটি লাগে। তা যে একটাও আমার নেই।

কিন্তু অপর্ণাকে অন্যের কাছে চলে যেতে দিলে আমার পৌরুষে চরম ঘা পড়বে না? নিজেকে কোনওদিন ক্ষমা করতে পারব? একটি মেয়ে যাকে আমি সত্যিকারের ভালোবাসি, সে-ও আমাকে মনপ্রাণ দিয়ে চাইছে, সে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রশ্নও তোলেনি, তবু আমি তাকে প্রত্যাখ্যান করব? আমি কি তাহলে পুরুষ নামের অযোগ্য হয়ে যাব না?

বরাবরই আমি ব্যক্তিগত ব্যাপারে গোপনীয়তা প্রিয়। নিজের সমস্যার কথা অন্য কারুকে জানাতে পারি না। বন্ধুরা কেউ কিছুই জানে না।

সিপাইজলার ডাকবাংলোতে খাওয়াদাওয়া ও আড্ডা চলল অনেক রাত পর্যন্ত। যে-যেখানে পারে ঘুমিয়ে পড়েছে।

আমার চোখে ঘুম নেই, আমি এসে বসলাম সামনের বারান্দায়।

প্রথম রাতে অন্ধকার ছিল, এখন জ্যোৎস্না ফুটেছে। সময়ের বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে চিকচিক করছে সেই জ্যোৎস্না। লম্বা লম্বা গাছগুলো যেন দূরের আকাশের প্রান্ত ছুঁয়ে ছবি হয়ে আছে। এ-দিক ও দিক উড়ছে জোনাকি।

আমি সেদিকে তাকিয়ে আছি বটে, কিন্তু দেখছিনা। চোখের সামনে ভেসে উঠছে অপর্ণার মুখ। ত্রিপুরায় আসবার আগে অপর্ণার সঙ্গে যখন দেখা হয়েছিল, তখন সে কাঁদছিল নিঃশব্দে। এখনও দেখতে পাচ্ছি তার সেই কান্নাভরা মুখ।

সেই মুখ যেন একটা প্রশ্নচিহ্ন, কিন্তু উত্তর দিতে পারছি না আমি।

তখনই বেজে উঠল সেই বাঁশি। সেই একই সুর।

এবার আর খোঁজাখুঁজির জন্য ব্যস্ত হলাম না। জানি, খুঁজে লাভ নেই। এই সাড়ে চার বছরের মধ্যে এই বাঁশির কথা অনেকবার ভেবেছি। এর মধ্যেও দু-তিনবার সঙ্কট এসেছে আমার জীবনে, তখন কিন্তু বাঁশি শুনিনি। আমার প্রয়োজন বা ইচ্ছে মতন এ-বাঁশি বাজবে না।

যখন বাজবার তখন এমনিই বাজবে এই বাঁশি। এর জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করে থাকতে হবে।

মন দিয়ে শুনলাম সেই সুর। এবারও কিছুক্ষণ পর হঠাৎ থেমে গেল। আমি আপনমনে ফিসফিস করে বললাম, অপর্ণা, তুমি ডাক্তারটির সঙ্গে চলে যেও। আমি মুছে যাব তোমার জীবন থেকে।

যাকে ভালোবাসি, তাকে দুঃখ কষ্টের মধ্যে টেনে আনার বদলে তাকে সুস্থ ও সুখী দেখতে চাইব না? তাতে অপর্ণা এবং সারা পৃথিবীর মানুষ আমাকে কাপুরুষ কিংবা নপুংসক যা-ই ভাবুক।

সেই বাঁশির রহস্যের খানিকটা সমাধানের ইঙ্গিত পেয়েছিলাম একবার। পুরোটা নয়, একটুখানি। যেন একটা বিশাল কালো পরদা হঠাৎ সামান্য ফাঁক হয়েও আবার ওদিকের দৃশ্য ঢেকে দিল।

অপর্ণাকে আমি মন থেকে মুছে ফেলতে সক্ষম হয়েছিলাম। মানুষের জীবনে দ্বিতীয় প্রেম আসতেই পারে। প্রথম প্রেমের মুখখানি অস্পষ্ট হয়ে যেতে শুরু করে, যেমন অপর্ণার মুখ আমার আর মনে পড়ে না, শুধু থাকে কিছুটা বেদনাবোধ। সে সুখী জীবন পেয়েছে, জেনে ভালোও লাগে।

দ্বিতীয় নারী আসে অনেক গাঢ়ভাবে। তখন ভালোবাসা স্থাপন করা যায় অনেক শক্ত ভিতের ওপর। নিছক ভুল বোঝাবুঝিতে সে ভিত কাঁপে না।

অনেক বছর পরের কথা, শক্তি ও আমি সস্ত্রীক কয়েকটা দিন কাটিয়েছিলাম পাঁচমারির সরকারি বাংলোয়। এখন আর আমাদের বাউণ্ডুলে মতন ঘুরে বেড়াতে হয় না, এখন চাইলেই ভালো ভালো থাকার জায়গা পাওয়া যায়, আমন্ত্রণকারীরা গাড়ি দেয়।

এখানে শুধুই বিশ্রাম। বেশি ভিড় নেই, মাত্র চারজন। খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থার জন্যও চিন্তা নেই। রাত্রিতে খাওয়ার পরও কিছুক্ষণ গল্প হয় বারান্দায় বসে। আমাদের স্ত্রী দুজন একসময় ঘুমোতে যায়, শক্তি ও আমি আরও কিছুক্ষণ বসে থাকি প্রায় নিঃশব্দে।

সেদিন শক্তিকে সারাদিনই অন্যমনস্ক মনে হয়েছে। মাঝে-মাঝে ঝিলিক দিয়ে গেছে বিষণ্ণতা। যখনই ও লিখতে পারে না, তখনই ওর এমন হয়।

একসময় শক্তি বলল, এখানে কে বেহালা বাজায় বলো তো?

আমি বললাম, বেহালা? জানি না তো? শুনিনি।

শক্তি অবাক হয়ে বলল, শুনতে পাচ্ছ না? এই তো বাজছে এখন। মনে হয়, ওপরের ঘরে কেউ থাকে। একজন বুড়ো মতন লোক, সাদা ধপধপে দাড়ি।

আমার সর্বাঙ্গে শিহরণ হল। শক্তি শুনতে পাচ্ছে বেহালার সুর, অথচ আমি ঝিঝির ডাক ছাড়া আর কিছুই শুনছিনা।

তবে কীসব মানুষের জন্যই আলাদা-আলাদা সুর থাকে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *