মৃত্যুখনি

ভলিউম ৩ – মৃত্যুখনি – তিন গোয়েন্দা – রকিব হাসান – সেবা প্রকাশনী

এই যে, কিশোর, দুই সুড়ঙ্গের ঢাকনা তুলে উঁকি দিয়েই বলল মুসা আমান, জানন, কার সঙ্গে দেখা হয়েছে?

মুসার পেছনে হেডকোয়ার্টারে ঢুকল রবিন মিলফোর্ড।

হেডকোয়ার্টার মানে পুরানো বাতিল একটা ট্রেলার-মোবাইল হোম, পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ডের পাহাড় প্রমাণ লোহালকড়ের জঞ্জালের তলায় চাপা পড়েছে অনেক দিন আগে, বাইরে থেকে দেখা যায় না। ভেতরে ঢোকার জন্যে কয়েকটা গোপন পথ বানিয়ে নিয়েছে তিন গোয়েন্দা, তারই একটা দুই সুড়ঙ্গ।

জানি, বলল ডেস্কের ওপাশে সুইডেল চেয়ারে বসা কিশোর পাশা, মেরিচাচী। আজ ভোর ছটায় উঠে নাস্তা খাইয়ে জোর করে রাশেদ চাচাকে পাঠিয়েছে একটা গ্যারেজে, পেপারে বিজ্ঞাপন দিয়েছে ওখানে নাকি অনেক পুরানো মাল বিক্রি হবে, জিনিসপত্রের লিস্ট দেখে খুব পছন্দ হয়েছে চাচীর।

ঘড়ির দিকে তাকাল সে। সোয়া একটা বাজে। এতক্ষণে নিশ্চয় এসে পড়েছে চাচা। ট্রাক বোঝাই করে মালপত্র নিয়ে এসেছে। বোরিস আর রোভার একা পারছে না, নামানোর জন্যে আমাদেরকেও দরকার। তাই ওয়ার্কশপে খুঁজতে এসেছে চাচী, আসার সময় তাকেই দেখে এসেছ।

হলো না, হাসল রবিন। ভুল করলে মিস্টার শার্লক হোমস, চেয়ারে বসতে বসতে বলল সে। কিশোর পাশাও ভুল করে তাহলে।

চাচী নয়, কিশোর, চাচী নয়, মুখ টিপে হাসল মুসা। অনুমান করো তো, আর কে হতে পারে?

উঁ-হুঁ, পারছি না, অবাক হয়েছে যেন কিশোর। তোমরাই বলো।

ধীরে বন্ধু, ধীরে, খুব মজা পাচ্ছে সহকারী গোয়েন্দা, এত তাড়াহুড়ো কেন? এসেছি, দু-দণ্ড বসি, জিরাই, তারপর বলব। এখন কেমন লাগছে? কোন রহস্য যখন বুঝি না, আমাদের ধাধায় রেখে খুব তো মজা পাও। এখন?

না ভাই, আর থাকতে পারছি না, আগ্রহে সামনে ঝুকে এল কিশোর। বলো না, বলেই ফেলো।

তাহলে ভবিষ্যতে আর ভোগাবে না তো আমাদের?

না।

রবিনের দিকে তাকাল মুসা। কিরবিন, বলব?

মাথা কাত করল রবিন। কিশোরের হাবভাব সন্দিহান করে তুলছে তাকে। এভাবে আগ্রহ প্রকাশ করবে কিশোর পাশা?…নাহ ঠিক মানাচ্ছে না স্বভাবের, সঙ্গে…

সকালে বাজারে গিয়েছিলাম, বলার জন্যে উদগ্রীব হয়ে আছে মুসা, এতক্ষণ চেপে রাখতে তারই কষ্ট হয়েছে। দেখা হয়ে গেল জিনার সঙ্গে।

জিনা? ঝট করে সোজা হলো কিশোর।

আরে হ্যাঁ, জিনা। আমাদের জরজিনা পারকার।

তাই নাকি? আমি তো জানতাম নিউ মেসিকোয় ছুটি কাটাচ্ছে ও, চাচার র‍্যাঞ্চে। তার মা-বাবা গেছেন জাপানে, সেখানে এক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে যোগ দেবেন মিস্টার পারকার।

তুমি জানতে? কই বলোনি তো।

জিজ্ঞেস তো করোনি। যাকগে, কোথায় এখন জিনা?

পারকার হাউসে, জবাব দিল রবিন। মুসার কাছে শুনলাম, কিছু জিনিসপত্র নিতে এসেছে, শুছিয়ে নিচ্ছে হয়তো।

জ্বী না, জনাবেরা। আমি এখানে,পর্দা সরিয়ে ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়ে এল জিনা। পরনে রঙচটা জিনসের প্যান্ট, গায়ে ধবধবে সাদা সিল্কের ওয়েস্টান শার্ট,

যেন এই মাত্র নামল ঘোড়ার পিঠ থেকে।

হাঁ হয়ে গেল মুসা আর রবিন।

মিটিমিটি হাসছে কিশোর।

তু-তুমি! তোতলাচ্ছে মুসা কিশোরের দিকে চেয়ে। আমাদের বোকা…দুত্তোর! নিজের ওপর রেগে গেল সে। ভেবেছিল কিশোরকে জব্দ করবে, উল্টে তাদের দুজনকেই এমন চমকে দিল গোয়েন্দাপ্রধান। হতাশ চোখে রবিনের দিকে তাকাল মুসা।

তুমি বাড়ি যাওনি? মবিন জিজ্ঞেস করল জিনাকে।

না, বাজার থেকে সোজা চলে এসেছি। এই তো, আমিও ঢুকলাম, তোমরাও ঢুকলে।

তবে না বলেছিলে, বাড়ি যাবে? ক্ষোভ ঢেকে রাখতে পারল না মুসা, যেন সব দোষ জিনার।

বলেছিলাম, কিন্তু যাইনি। ইচ্ছে করেই যাওনি, আমাদের জব্দ করার জন্যে।

আরে, কি মুশকিল? আমি জানি নাকি, তুমি এসে এরকম করবে কিশোরের সঙ্গে। এতই যদি ঠকানোর ইচ্ছে ছিল, আগে বললে না কেন আমাকে?

আরে দূর, রাখো তো, ধমক দিয়ে দুজনকে থামাল রবিন। কি ছেলেমানুষী করছ? মুসা, তখনই বলেছিলাম, এসবের দরকার নেই, পারবে না কিশোরের সঙ্গে। ও সব সময় এক ধাপ এগিয়ে থাকে।

খামোকা লজ্জা দিচ্ছ, রবিন, বাধা দিল কিশোর। এটাতে আমার কোন মত ছিল না, নিতান্ত ভাগ্যক্রমেই ঘটে গেছে, জিনা তোমাদের আগে জল এসেছে যাকগে, জিনা, বসো। তা কি মনে করে?

এমনি। চাচার কাজ ছিল রকি বীচে। জিজ্ঞেস করল আসব নাকি? ভাবলাম, তোমাদের সঙ্গে দেখা করে যাই। তাছাড়া কয়েকটা জিনিস রয়েছে বাড়িতে, নিয়ে যাব।

কবে যাচ্ছ? আজই?

আগামীকাল।

ভালই কাটছে তাহলে ছুটি।

দারুণ, মাথা ঝাঁকি দিল জিনা, মুখের ওপর এসে পড়ল এক গোছা রোদেপোড়া তামাটে চুল, সরালো। যা একখান কেস পেয়েছি না। উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে বড় বড় তামাটে দুটো চোখের তারা।

কেস? মুসার রাগ পানি।

হ্যাঁ, ওপরে নিচে মাথা দোলাল জিনা। চাচার চোখে ধূলো দেয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু আমি তা হতে দেব না।

কেন বোকা নাকি তোমার চাচা?

তুমি যে কি বলো, মুসা, চাচা বোেকা হবে কেন? আমার বাপের ফুফাত ভাই কোয়েনটিন উইলসনকে বোকা বলে কার সাধ্য? স্টক মার্কেটে অনেক টাকা কামিয়েছে, নিউ মেকসিকোয় র‍্যাঞ্চ আর জায়গা কিনে এখন ক্রিস্টমাস গাছের ব্যবসা ফেঁদেছে। এমনিতে খুব চালাক। কিন্তু মানুষের ব্যাপারে একেবারে দিল-দরিয়া, সবাইকেই বিশ্বাস করে, সেজন্যে ঠকেও মাঝে-মধ্যে, তা-ও শিক্ষা হয় না।

তুমি তাহলে মানুষ চেনো কলতে চাও, হাসল মুসা।

সবাইকে চিনি বলাটা ঠিক হবে না, রাগল না জিনা, কিন্তু মুসার খেচাটা ফিরিয়ে দিল, তবে হদ্দ বোকা, আর হারামী লোক দেখলেই চিনতে পারি। কিশোরের দিকে ফিরল। চাচা যে জায়গাটা কিনেছে, সেটা আগে মাইনিং কোম্পানির ছিল। একটা খনি এখনও আছে, নাম ডেথ ট্যাপ মাইন।

মৃত্যুখনি, বিড়বিড় করুল কিশোর।, আরিাব, সাংঘাতিক নাম তো,চোখ বড় বড় করল মুসা। তা কি পাওয়া যায় এই খনিতে? ডাইনোসরের হাড়?

রূপা, মুসার কথা গায়ে মাখল না জিনা। খনিটা এখন মৃত। রূপাও ফুরিয়েছে। ওরকম নাম দেয়ার কারণ, এক মহিলা ওটাতে পড়ে মরেছিল। টুইন লেকসে খনির আশেপাশে এখনও নাকি মাঝে-সাঝে ওই মহিলার ভূত দেখা যায়। আমি এর একটা বর্ণও বিশ্বাস করি না। তবে শয়তানের ছোঁয়া আছে ওখানে। খনি আর তার আশপাশের অনেক জায়গা কিনে নিয়েছে এক ব্যাটা। রোদে পোড়া গালের চামড়ায় রক্ত জমল তার। কিছু একটা কুকাজ করছে হারামীটা, বদমতলব আছে। আরও মজা কি জানো, ব্যাটা জমেছেও টুইন লেকসে।

সেটা কি অপরাধ নাকি? অবাক হলো রবিন।

না। তবে কেউ জন্মের পর পরই যদি কোনও জায়গা ছেড়ে চলে গিয়ে কোটিপতি হয়ে ফিরে আসে, অনেক জায়গা কিনে বসবাস শুরু করে আর ভাব দেখায়, আহা আমার মাতৃভূমি, আমি তোমায় কত ভালবাসি।তাহলে গা জ্বলে? আস্ত ভণ্ড! লোকটা ব্যাটল সাপের চেয়েও বদ। খনির মুখ আবার খুলেছে সে। লোহার গ্রিল দিয়ে বন্ধ করা ছিল, সে খুলেছে, তারপর খনির মুখে পাহারায় রেখেছে এক বাঘা কুকুর। ওই মরা খনিতে কি পাহারা দেয়? ঝকঝকে নতুন জিনস আর শক্ত হ্যাট পরে ঘুরে বেড়ায় ব্যাটা, একেবারেই বেমানান। মেয়েদের মত নখের যত্ন করে আবার। বলল, ব্যাটাছেলের এই ন্যাকামি সহ্য হয়? চুপ করল জিনা। ছেলেরা কেউ কিছু বলছে না দেখে আবার মুখ খুলল, খনির ধারে-কাছে ঘেঁষতে দেয় না কাউকে। ব্যাপার সুবিধে ঠেকছে না আমার। চাচার ঠিক নাকের সামনে কিছু একটা করছে সে। চাচা বুঝতে পারছে না বটে, কিন্তু আমি সন শয়তানী বের করেই ছাড়ব।

আল্লাহ তোমার সহায় হোন, শান্তকণ্ঠে বলল মুসা।

মুসার ছাল ছাড়ানোর জন্যে মুখ খুলতে যাচ্ছিল জিনা, এই সময় স্পীকারে ডাক শোনা গেল, জিনা?

উঠে গিয়ে ট্রেলারের ছাতে বসানো পেরিস্কোপ সর্বদর্শন-এ চোখ রাখল রবিন। একজন লোক, সাদা চুল, বড় গোঁফ। মেরিচাচীও সঙ্গে আছেন।

আমার চাচা, উঠে দাঁড়াল জিনা। বলে এসেছিলাম আমি এখানে থাকব। তোমরা দেখা করবে চাচার সঙ্গে? খুব ভাল মানুষ, আমি খুব পছন্দ করি।

উঠল কিশোর।

বেরিয়ে এল ওরা চারজনেই।

এই যে, দেখেই বলে উঠলেন মেরিচাচী। গর্ত থেকে বেরিয়ে এসেছে শেয়াললো। এত চেষ্টা করলাম, গর্তটার মুখ খুজে পেলাম না আজক।

চাচী, কেমন আছেন? জিজ্ঞেস করল জিনা।

ভাল। তুমি কেমন?

শুধু মাথা কাত করে বোঝাল জিনা, ভালই আছে।

এগিয়ে এলেন মিস্টার উইলসন, একে একে হাত মেলালেন তিন কিশোরের সঙ্গে। আন্তরিক হাসিতে উদ্ভাসিত মুখ।

তোমরাই তাহলে তিন গোয়েন্দা। তোমাদের প্রশংসা এত করেছে জিনা…

দর, কই এত বললাম, লজ্জা পেয়েছে জিনা, অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

পকেট থেকে কার্ড বের করে বাড়িয়ে ধরল কিশোর। আমাদের কার্ড। যদি কখনও দরকার লাগে…

কার্ডটা পড়লেন উইলসন। ভুরু কোঁচকালেন, আশ্চর্যবোধকগুলো কেন?

আমাদের মনোগ্রাম, গভীর মুখে জবাব দিল কিশোর। সব রকম আজব রহস্যের কিনারা করতে আমরা প্রস্তুত, এটা তারই সঙ্কেত।

হুঁ, হাসলেন তিনি। রহস্য সমাধান করতে তোমাদের দরকার কখনও পড়বে না… তবে হ্যাঁ, অন্য একটা কাজে সাহায্য করতে পারো। মালির কাজ করেছ কখনও?

তা বোধহয় করেনি, হেসে বলল জিনা। তবে ইয়ার্ডে জোগালীর কাজ প্রায়ই করে। গুনেছি, তার জন্যে টাকাও নেয় আবার।

তাই নাকি? তাহলে তো খুব ভাল। তোমরা গাছ ছাঁটতে পারবে?

গাছ? রবিন বলল।

ক্রিস্টমাস গাছ, বললেন উইলসন। হেঁটে হেঁটে ডাল পাতা ঠিক রাখতে হয়, নইলে বড়দিনের সময় মাপমত থাকে না, বেয়াড়া রকম ছড়িয়ে যায় এদিক ওদিক। টুইন লেকসে লোক পাচ্ছি না। এখন তো তোমাদের ছুটি, চলো না কাল আমাদের সঙ্গে। দুই হপ্তায় অনেক উপকার হবে আমার।

চাচীর দিকে তাকাল কিশোর নীরবে।

ইঙ্গিতটা বুঝলেন উইলসন। মেরিচাচীকে বললেন, কোন অসুবিধে হবে না ওদের, মিসেস পাশ। অনেক ঘর খালি আছে আমার, খাওয়া-দাওয়ার কোন অসুবিধে নেই। কিশোরকে যাওয়ার অনুমতি দিন আপনি, মুসা আর রবিনের মায়ের সঙ্গে আমি নাহয় কথা বলবো।

আমি বললেও রাজি হবে, ভাবলেন মেরিচাচী। কিন্তু কথা সেটা না। ইয়ার্ডেও অনেক কাজ। ভাবছিলাম, জঞ্জাল অনেক জমেছে, ওদের স্কুল যখন ছুটি, সাফ করে ফেলত পারত।

চাল, এগিয়ে গিয়ে চাচীর দুই কাঁধে হাত রাখল কিশোর, তোমার কাজ পরেও করে দিতে পারব আমরা। মেকসিকোয় যাওয়ার শখ আমার অনেকদিনের, সুযোগ পাইনি। আঙ্কেল এত করে বলছেন,

চাচী, মানা করবেন না, প্লীজ, জিনাও কিশোরের সঙ্গে সুর মেলাল। ওদের খাওয়ার দিকে আমি খেয়াল রাখব, নিজে…

ঠিক আছে, আর অমত করলেন না মেরিচাচী।

কিশোরের দিকে চেয়ে চোখ টিপল জিনা, মুখে রহস্যময় হাসি।

হঠাৎ বুঝে ফেলল কিশোর, ফাদে ফেলেছে ওদেরকে জিনা। বেশ কায়দা করে রাজি করিয়ে নিয়েছে। গাছকাটা না ছাই, আসলে জিনার ইচ্ছে, একবার তিন গোয়েন্দাকে নিউ মেসিকোয় নিয়ে গিয়ে ফেলতে পারলে হয়, হারামী লোকটার রহস্য সমাধানে সাহায্য না করে যাবে কোথায়?

নিজের ওপর রেগে গেল কিশোর, এত সহজে ধরা দিল বলে। কিন্তু এখন আর পিছিয়ে আসার উপায় নেই, মেরিচাচীকে রাজী করাতে সে নিজেই চাপাচাপি করছে। তবে অখুশি হওয়ারও কোন কারণ নেই, রহস্যের পূজারী সে, রহস্যের গন্ধ পাচ্ছে, তাছাড়া রয়েছে নতুন দেশ দেখার উন্মাদনা।

চাচী, হাসিতে ঝকঝকে সাদা দাঁত বেরিয়ে পড়েছে মুসার, মাকে আগে আপনি ফোন করে দিন, তারপর আমি গিয়ে বলব।

যাই লাইব্রেরিতে গিয়ে ছটি নিয়ে আসি, রবিন বলল। চাচী, আমার মাকেও বলবেন। বাবাও মনে হয় বাসায় আছে এখন। সাইকেলের দিকে দৌড় দিল সে।

সেদিকে চেয়ে হাসলেন চাচী।

হ্যাঁ, মিসেস পাশা, বললেন উইলসন, কিছু ভাববেন না। বেশি খাটাব না ছেলেদের

মোটেও ভাবি না আমি, হেসে বললেন মেরিচাচী, আদৌ খাটাতে পারেন কিনা দেখেন। কি ভাবে যে ফাঁকি দেবে, টেরই পাবেন না। আপনার কি মনে হয়, গাছ কাটার জন্যে ওদের এত উৎসাহ? মোটেও না। মস্ত কোন ঘাপলা আছে কোথাও, জিনার দিকে তাকালেন তিনি।

চট করে অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে নিল জিনা।

ওই যে, টুইন লেকস, ঘোষণা করলেন মিস্টার উইলসন।

বড় একটা এয়ার-কণ্ডিশনড স্টেশন ওয়াগনে করে অ্যারিজোনা মরুভূমি পাড়ি দিচ্ছে ওরা। দক্ষিণ-পশ্চিমে মাথা চাড়া দিচ্ছে নিউ মেকসিকোর পাহাড়শ্রেণী। পেছনের সীটে বসে উৎসুক হয়ে জানালা দিয়ে দেখছে ছেলেরা। পাকা, চওড়া সড়কের শেষ মাথায় রুক্ষ পর্বতের কোলে সবুজে ছাওয়া একটা মরুদ্যান যেন হঠাৎ করে গজিয়েছে। ধুলোয় ধূসর পথের ধারে কাঠের বাড়িঘর চোখে পড়ছে এখান থেকেই।

আরও এগোলো গাড়ি। মেইন রোডের ধারে পথের দিকে মুখ করে রয়েছে মুদ দোকান, ওষুধের দোকান, খবরের কাগজের অফিস, আর ছোট একটা লোহালক্কড়ের দোকান।

শহরের কেন্দ্রে দোতলা একটা পাকা বাড়ি, কোর্টহাউস! বাড়িটা ছাড়িয়ে একটু দূরে পেট্রল স্টেশন, তারও পরে টুইন লেকসের দমকল বাহিনীর অফিস।

আগুন! হাত তুলে দেখাল মুসা।

শহরের বাইরে এক জায়গায় ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে কালো হয়ে গেছে বিকেলের আকাশ।

ভয় নেই, ফিরে বলল জিনা, সামনে, চাচার সীটের পাশে বসেছে। করাত কলের চুলোর ধোয়া।

এককালে খনিই ছিল এখানকার গরম ব্যবসা, গাড়ি চালাতে চালাতে বললেন মিস্টার উইলসন। এখন কাঠের কলই ভরসা। কাঠের ব্যবসাই টিকিয়ে রেখেছে শহরটাকে। অথচ, পয়তাল্লিশ বছর আগে কি জমজমাট শহরই না ছিল।

বেশি হট্টগোল আমার ভাল্লাগে না, বলল মুসা। মন টেকে না। শান্তই ভাল।

ক্ষণিকের জন্যে ফিরে তাকালেন মিস্টার উইলসন। শান্ত? জিনা, গপ্পো দুয়েকখান শোনাও তোমার বন্ধুকে। টুইন লেকস শান্ত, হাঁহ আমি বলতে চেয়েছি, আগের টাকার গরম আর নেই এখন শহরটার।

আমার গপ্পো এখন একটাই, সামনের দিকে চেয়ে থেমে গেল জিনা। হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে এক মহিলা। গাড়ি থামালেন মিস্টার উইলসন, জিনসের প্যান্ট আর লম্বা বুলিওয়ালা পশমী শার্ট পরা এক মিহলাকে রাস্তা পেরোতে দিলেন।

একটাই কথা,আবার বল জিনা, হ্যারি ম্যাকআরার একটা আস্ত ভণ্ড।

নাক দিয়ে হাসি আর গোঙানির মাঝামাঝি একটা বিচিত্র শব্দ করলেন মিস্টার উইলসন, ব্রেক চেপে রেখে ফিরলেন ছেলেদের দিকে। দেখো, জিনার কথায় মিস্টার ম্যাকআরবারের ওপর গোয়েন্দাগিরি করতে যেয়ো না। ও আমার পড়শী, আর পড়শীর সঙ্গে মুখ কালাকালি ভাল না। তাছাড়া সুখ্যাতি আছে তার। তার ওপর রয়েছে টাকা, প্রচুর টাকা। টুইন লেকস তার জন্মভূমি, এত বছর পরও তাই ফিরে এসেছে। আমাকে বলেছে, ছেলেবেলায় খনি শহরের অনেক রোমাঞ্চকর গল্প শুনেছে মা-বাবার মুখে, তখন থেকেই তার ইচ্ছে, সুযোগ হলেই সে ফিরে আসবে এখানে। খনিটা কিনেছে, তার কারণ, এককালে তার বাবা কাজ করত ওখানে। ওর কাজকর্ম আমার কাছে তো কই, অস্বাভাবিক ঠেকে না।

তাহলে খনির মুখ আবার খুলল কেন? তর্ক শুরু করল জিনা।

তাতে তোর মাথাব্যথা কিসের? বললেন চাচা। তার খনির মুখ সে খুলল না বন্ধ করল, তাতে কার কি? খোঁজ খবর নিয়েছি আমি অনেক, লোকটার কোন বদনাম শুনিনি।

ছেলেদের দিকে চেয়ে হাসলেন। কেন দেখতে পারে না জানো? জিনাকে শার্টের কলার চেপে ধরে বের করে দিয়েছিল ম্যাকআরথার, তারপর থেকেই যত রাগ। তবে অন্যায় কিছু করেনি সে, তাহলে আমিই তো গিয়ে ধরতাম। কয়েক বছর আগে ওই খনিতে পড়ে এক মহিলা মরেছে। দুর্ঘটনা আরও ঘটতে পারে। জিনাকে সেজন্যেই বের করে দিয়েছে সে।

হেসে ফেলল মুসা, কি শুনছি, জিনা? তোমাকে নাকি ঘাড় ধরে…

চুপ! রাগে কেঁপে উঠল জিনার গলা।

জিনাকে কলার ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে একজন লোক, দৃশ্যটা কল্পনা করে কিশোরও হাসি চাপতে পারছে না। বুঝতে পারছে, এজন্যেই চাচাকে ভজিয়েভাজিয়ে রকি বিচে নিয়ে গেছে জিনা, তিন গোয়েন্দাকে দাওয়াত করে এনেছে। ম্যাকআরথারের ওপর প্রতিশোধ নিতে, এক কুলিয়ে উঠতে পারেনি…

ব্যাটা আস্ত ভণ্ড! চেঁচিয়ে বলল আবার জিনা।

একআধটু পাগলাটে হতে পারে, কিশোর বলল। কোটিপতিদের কেউ কেউ যেমন হয়।

তাতে দোষের কিছু আছে? বললেন মিস্টার উইলসন, ৱেক ছেড়ে গাড়ি চালু করে দিলেন আবার। জিনা, আমি চাই না ভদ্রলোককে তুমি বিরক্ত করো। তোমাদেরও বলে রাখলাম, কিশোর।

একটা কাঠের ব্রিজের ওপর উঠল গাড়ি, ঝাঁকুনি খেতে খেতে এগোচ্ছে। নিচে রু খাল, দুই মাথা গিয়ে পড়েছে দুটো ক্ষুদে দে, পুকুরই বলা চলে। ছেলেরা অনুমান করল জোড়া হদের জন্যেই নাম হয়েছে টুইন লেকস।

পুলের পরে একটা কাঁচা রাস্তায় নামলো গাড়ি, পেছনে ধুলোর মেঘ উড়িয়ে চলল। মাইলখানেক দূরে পথের বাঁয়ে সবুজ খেত। আরও পরে একটা খোলা গেট দেখা গেল, তার ওপাশে কয়েকটা বাড়িঘর। একটা বাড়ি নতুন বঙ করা হয়েছে, বাকিগুলো পুরানো, দেখে মনে হয় না মানুষ থাকে।

গতি কমালেন মিস্টার উইলসন, হর্ন বাজালেন একজন লম্বা, হালকা-পাতলা মহিলাকে উদ্দেশ্য করে, ছোট একটা বাড়ির সামনে বাগানে পানি দিচ্ছেন তিনি।

মিসেস ফিলটার, ছেলেদেরকে বলল জিনা।

হেসে হাত নাড়লেন মহিলা। পরনে ঢিলা পাজামা, গায়ে সাদা শার্ট, গলায় নীলকান্তমনি, খচিত রুপার একটা বেশ বড়সড় হার। ধূসর চুলে রুপালি ছোপ লেগেছে, বয়েস ষাটের কাছাকাছি, কিন্তু হোস নেড়ে যেভাবে পানি দিচ্ছেন, ক্ষিপ্রতা দেখে মনে হয় না এত বয়েস।

এই শহরের সুদিন কালে এখানে জন্মেছিলেন মহিলা, জিনা বলল। খনির সুপারিনটেনডেন্টকে বিয়ে করেছিলেন। খনি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর চলে গিয়েছিলেন দুজনেই। স্বামীর মৃত্যুর পর ফিনিক্সে এক দোকানে কাজ নিলেন মহিলা, টাকাটুকা জমিয়ে, চাকরি ছেড়ে এখানে ফিরে এসেছেন বাকি জীবনটা শান্তিতে কাটাতে। যে বাড়িতে বৌ হয়ে ঢুকেছিলেন, বিক্রি করে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেটাই কিনে নিয়েছেন আবার। আরও কিছু জায়গা কিনেছেন মহিলা, বোধহয় পুরানো দিনের

স্মৃতি ধরে রাখার জন্যেই ভুলেও কখনও ব্যবহার করেন না ওগুলো।

ম্যাকআরবারের সঙ্গে মহিলার যথেষ্ট মিল দেখা যাচ্ছে, বলল রবিন।

না না, জোর গলায় বলল জিনা, মহিলা খুব ভাল।

আসলে, এখানে যারা ফিরে আসে তাদের একজনের সঙ্গে আরেকজনের মিল থাকেই, বললেন উইলসন, টুইন লেকসকে একবার ভালবেসে ফেললে দুনিয়ার আর কোথাও গিয়ে শান্তি নেই, ফিরে আসার জন্যে খালি আনচান করে মন। শেষ বয়েস কাটানোর এত চমৎকার জায়গা কমই আছে। গেটের সামনে এনে গাড়ি থামালেন। হাত তুলে দেখালেন, পথটা গিয়ে শেষ হয়েছে পর্বতের উপত্যকায়। ওটা পশ্চিম। তার বাঁয়ে পোয়াটাক মাইল দূরে কালো রঙ করা কাঠের বেড়া। ওটাই খনিমূখ। আর ওই যে কেবিনটা, ওটাতে থাকে ম্যাকআরথার। পেছনে যে বিল্ডিংটা, ওটাও তার। আগে ওখানে খনির নানারকম কাজকর্ম হত।

গেটের ভেতরে গাড়ি ঢোকালেন তিনি। মাটির রাস্তা, তাতে চাকার গভীর খাজ। চলার সময় আপনাআপনি চাকা ঢুকে যায় খাজের মধ্যে, সরানো কঠিন। পথের দুধারে সারি সারি নবীন ক্রিস্টমাস গাছ। বেড়া দেয়া একটা পশু রাখার খোয়াড়ের পাশ কাটিয়ে এল গাড়ি, ভেতরে গোটা চারেক ঘোড়া ঘাস খাচ্ছে, ওগুলোর মাঝে জিনার কমেটকে চিনতে পারল তিন গোয়েন্দা। আরও পরে, বায়ে সুন্দর একটা র‍্যাঞ্চ হাউস, ছোট ছোট গাছ ঘিরে রেখেছে। সীডার-লাল রঙের ওপর সাদা অলঙ্করণ, চার পাশের সবুজের মাঝে ছবির মত লাগছে বাড়িটাকে। পথের শেষ মাথায় ভাঙাচোরা পুরানো একটা গোলাবাড়ি, কতকাল আগে রঙ করা হয়েছিল এখন আর বোঝা যায় না।

র‍্যাঞ্চ-হাউসের সামনে এনে গাড়ি রাখলেন উইলসন, হাই তুললেন, আড়মোড়া ভাঙছেন। আউফ। বাড়ি এলাম।

গাড়ি থেকে নামল ছেলেরা, আশপাশ দেখছে। গোলাবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটা পিকআপ ট্রাক, ধুলোয় মাখামাখি। বাড়ির একপাশে তারের বেড়া দেয়া খানিকটা জায়গা, একাংশ চোখে পড়ছে, ভেতরে কয়েকটা মুরগী।

গাড়ি থেকে নামলেন উইলসন। তাজা ডিম পছন্দ আমার, মুরগীর খোঁয়াড় দেখিয়ে বললেন। সকালে মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙার মাঝে এক ধরনের আনন্দ আছে, খুব শান্তি। আমার মোরাটার ধারণা, রাত্রি তাড়ানোর দায়িত্বটা বুঝি তারই ওপর বর্তেছে, ভোর না হতেই চেঁচিয়ে পাড়া মাথায় করে। আমার খুব ভাল লাগে।

মনিবের কথার জবাবেই যেন বাড়ির পেছন থেকে শোনা গেল তার কণ্ঠ, ডাক নয়, উত্তেজিত চিৎকার।

এক সেকেন্ড পরেই যেন একসঙ্গে খেপে গেল সব কটা মোরগ-মুরগী, বাচ্চাকাচ্চা সব। পরক্ষণে শটগানের বিকট শব্দ।

চেঁচিয়ে উঠে হুমড়ি খেয়ে পড়ল মুসা, দুহাতে মাথা ঢাকল। গাড়ির আড়ালে মাথা নুইয়ে ফেলল কিশোর আর রবিন। মুরগীর খামারের ওদিক থেকে তীব্র গতিতে ছুটে আসছে একটা বিরাট ছায়া।

পলকের জন্যে কিশোরের চোখে পড়ল একসারি ঝকঝকে ধারাল দাঁত আর কালো দুটো চোখ। পরক্ষণেই ধাক্কা দিয়ে তাকে মাটিতে ফেলে গায়ের ওপর দিয়ে লাফিয়ে চলে গেল জানোয়ারটা, হারিয়ে গেল পশ্চিমে ক্রিস্টমাস খেতের ভেতরে।

শান্তির রাজ্যে স্বাগতম। বেদম হাসিতে দুলছে জিনা।

বিকেলের শান্ত নীরবতা ধীরে ধীরে নেমে এল আবার র‍্যাঞ্চ হাউসে।

উঠে দাঁড়িয়ে চোখ মিটমিট করল মুসা। খাইছিল! কি ওটা?

কিছু না, টিটকারির ভঙ্গিতে বলল জিনা, বিশিষ্ট ভদ্রলোক জনাব হ্যারি ম্যাকআরবারের শিকারী কুকুর, মুরগী চুরির তালে ছিল।

কিশোর উঠে দাঁড়াচ্ছে, সেদিকে তাকিয়ে বলল, বেড়ার নিচ দিয়ে সিধ কেটে ঢোকার চেষ্টা করে। কয়েকবারই করেছে এ-রকম। মুরগীগুলো চেচামেচি শুরু করে দেয়, শটগান নিয়ে ছুটে বেরোয় ভিকিখালা। আজও ফাকা গুলিই ছুঁড়েছে, কিন্তু এই অত্যাচার চলতে থাকলে কপালে দুঃখ আছে কুত্তাটার। ছররা দিয়ে পাছার চামড়া ঝাঝরা করে দেবে।

ভিকিখালা? জিজ্ঞেস করল রবিন।

আমাদের কাজের লোক, জানালেন উইলসন।

গোলাবাড়ির ওপাশ থেকে বেরিয়ে এল মোটাসোটা এবং মেকসিকান মহিলা, কালো চুল। সুতার পোশাক পরনে, গলা আর হাতার কাছটায় এমব্রয়ডারি করা উজ্জ্বল রঙের বড় বড় ফুল। হাতে একটা শটগান।

এই যে, সিনর উইলসন, চেঁচিয়ে বলল ভিকি। জিনাও এসেছ। খুব ভাল হয়েছে। তোমরা না থাকলে কেমন খালি খালি লাগে।

উইলসন হাসলেন। সেজন্যেই পূর্ণ করে রেখেছ নাকি?

ওই কুত্তাটার কথা আর বলবেন না, ঝাঁঝালো কন্ঠে বলল ভিকি। আস্ত চোর!

স্বভাব বদলে যাবে, ভেব না, হাসি মুখে বললেন উইলসন। আকাশে গোলাগুলি চালিয়ে যাও, চুরি না ছেড়ে যাবে কোথায় ব্যাটা। হ্যাঁ, ভিকি, এরা। জিনার বন্ধু। কিশোর পাশারবিন মিলফোর্ড মুসা আমান। হপ্তা দুই বেড়াবে আমাদের এখানে।

ওমা, তাই নাকি? উজ্জ্বল হয়ে উঠল ভিকির কালো চোখ। খুব ভাল, খুব ভাল। বাড়িতে এক দল বাচ্চা-কাচ্চা না থাকলে ভাল লাগে? এসো, আমি খাবার ব্যবস্থা করছি। এতদূর এসেছ, নিশ্চয় খিদে পেয়েছে।

র‍্যাঞ্চ হাউসের ভেতরে ঢুকে গেল ভিকি।

সত্যিই খিদে পেয়েছে তো তোমাদের? বললেন উইলসন। ভিকির সামনে কম খেলে চলবে না, রেগে যাবে।

কিছু ভাববেন না,অভয় দিল মুসা। আন্তরিক হাসিতে দাঁত বেরিয়ে পড়েছে। কখনও যাতে না রাগে সেই ব্যবস্থাই করব।

গাড়ি থেকে স্যুটকেসগুলো নামিয়ে বারান্দায় রাখতে শুরু করলেন উইলসন। তাড়াতাড়ি তাঁকে সাহায্য করতে এগোল তিন গোয়েন্দা। কয়েক মিনিট পর খোলামেলা বিশাল লিভিং রুমের ওপরে দোতলার বড় একটা বাংকমে জিনিস-পত্র নিয়ে এল ওরা। জিনার ঘর নিচে, চাচার ঘরের পাশে। ভিকির ছোট একটা অ্যাপার্টমেন্টই আছে, রান্নার্থরের পেছনে।

গোসল করবে তোমরা? জিজ্ঞেস করলেন উইলসন। বেশি দেরি কোরো। ডিনারের আগেই আশপাশটা ঘুরিয়ে দেখাতে চাই তোমাদের।

আলমারিতে কাপড় গোছাচ্ছিল মুসা, উইলসনের কথা শুনে গোছানোর আগ্রহ নষ্ট হয়ে গেল। টান দিয়ে বড় একটা তোয়ালে নিয়ে বলল, পরেও গোছানো যাবে। আগে আপনার সঙ্গেই যাই। বাথরুমের দিকে রওনা হলো সে।

খানিক বাদে জিনা আর তার চাচার সঙ্গে বেরোল তিন গোয়েন্দা। ওপরে নিউ মেকসিকোর পরিষ্কার নীল খোলা আকাশ। জিনার হাতে ইয়া বড় বড় দুই টুকরো চিনি, গাড়িপথ ধরে প্রায় দৌড়ে চলল ছোড়র খোয়াড়ের দিকে। ডাকহে, কমেট। কমেট?

ডাক শুনে ফিরে তাকাল ঘোড়াটা, দৌড়ে এল বেড়ার কাছে। গলা বাড়িয়ে দিল বেড়ার বাইরে। আনন্দে নাক দিয়ে বিচিত্র শব্দ করছে। গলা জড়িয়ে ধরে আদর করল জিনা।

দেখো না কাণ্ড, হাসলেন উইলসন, দুদিন মাত্র হয়েছে, অথচ মনে হচ্ছে কত যুগ একে দেখেনি। ওরা থাকুক। তোমরা এসো, গাছ ছাঁটার ছুরি দেখবে।

পিকআপের পাশ কাটিয়ে গোলাবাড়ির কাছে চলে এল ওরা। দরজা খুললেন উইলসন। শুকনো খড়ের গন্ধ লাগল নাকে। উঁকি দিয়ে দেখল ছেলেরা, ঘরের কোণে গাদা করে রাখা আছে খড়ের বোঝ। দোলের হুক থেকে ঝুলছে হোস পাইপের কয়েল। খন্তা, কোদাল, বেলচা, বড় কাঁচি আর নানা রকম দরকারী যন্ত্রপাতি সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে একটা ওয়ার্কবেঞ্চের পাশে। কাছেই। একটা র‍্যাঞ্চে রাখা আছে পাঁচটা বড় বড় ভোজালীর মত ছুরি।

বাড়িতে বাগানের গাছ তো কাঁচি দিয়েই হুঁটি, মুসা বলল।

সে অল্প কয়েকটা গাছের বেলায় সম্ভব, বুঝিয়ে বললেন উইলসন। কিন্তু হাজার হাজার ক্রিস্টমাস গাছ কাঁচি দিয়ে হাঁটতে অনেক সময় লাগবে, ছুরি দিয়ে কোপানো ছাড়া উপায় নেই। তাছাড়া ছুরি দিয়ে এক কোপে ওপর-নিচের অনেকগুলো ভাল তুমি ছেটে ফেলতে পারছ, তাতে সমান হয় বেশি, কাঁচি দিয়ে সেটা হয় না। র‍্যাঞ্চ থেকে একটা ছুরি নিয়ে এলেন তিনি। আপনা-আপনি সুন্দর হয় না ক্রিস্টমাস ট্ৰী, নিয়মিত যত্ন লাগে। বছর তিনেক আগে জায়গাটা যখন কিনলাম, তখন ভাবতাম, এ আর কি? কয়েকটা চারা মাটিতে পুঁতে দিলেই হলো, নিজে নিজেই বড় হয়ে সাইজমত হয়ে যাবে। এখন বুঝি কত কঠিন। নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার করতে হয়, ডাল পাতা ছাঁটতে হয়, আর বোজ পানি দেয়া তো আছেই। ছুরি চালানো কিন্তু সহজ ভেব না, কিভাবে চালাতে হয় দেখালেন তিনি। এই যে, এভাবে ধরে, ওপর থেকে নিচে এভাবে কোপ মারতে হয়, সাই করে বাতাস কাটল তীক্ষ্ণ ধার ফলা। খুব সাবধানে কোপাতে হয়। বেশি নিচে যদি নামিয়ে ফেলো, পায়ে এসে লাগবে। ফেড়ে যাবে। পারবে তো?

পারব, বলল মুসা।

সাবধানে আবার জায়গামত ছুরিটা রেখে দিলেন উইলসন।

গোলাবাড়ির একধারে ফেলে রাখা অনেক পুরানো একটা গাড়ি দেখালেন, নিরেট রবারে তৈরি চাকা, ফাঁপা টায়ার নয়। নতুন আরেকটা গোলাঘর বানাব। ওই গাড়িটারও একটা ব্যবস্থা করব তখন।

কাছে গিয়ে গাড়ির আধখোলা একটা জানালা দিয়ে ভেতরে উঁকি দিল কিশোর। কুচঁকে গেছে সীটের কালো চামড়ার কভার, নগ্ন হয়ে বেরিয়ে আছে কাঠের মেঝে। টি মডেলের ফোর্ড, না? ফিরে জিজ্ঞেস করল সে।

হ্যাঁ, বললেন উইলসন। বাড়িটা যখন কিনি তার আগে থেকেই ছিল, ফাউ পেয়েছি। ওখানেই ছিল ওটা, খড়ের তলায় চাপা পড়ে ছিল। খড় সরিয়েছি, কিন্তু গাড়িটার কিছু করতে পারিনি। সময়ই পাই না। তবে ঠিকঠাক করব, মডেল টি এখন প্রাগৈতিহাসিক জিনিস, সংরক্ষণের বস্তু।

দরজায় দেখা দিল জিনা, ঘোষণা করল, মহামান্য হ্যারি ম্যাকআরথার তশরিফ রাখছেন।

আহ, জিনা, একটু ভদ্রভাবে কথা বল, বিরক্ত হলেন উইলসন। দেখিস, তার সামনে আবার কিছু বলে বসিস না।

চুপ করে রইল জিনা।

বাইরে পায়ের আওয়াজ হলো। ডাক শোনা গেল, মিস্টার উইলসন?

এই যে, এখানে সাড়া দিলেন তিনি।

হালকা-পাতলা একজন লোক উঁকি দিল দরজায়। মাথায় সোনালি চুল, বয়েস চল্লিশের কাছাকাছি। পরনের জিনস এতই নতুন, কাপড়ের খসখসে ভাবও কাটেনি। চকচকে পালিশ করা বুটে মুখ দেখা যাবে যেন। গায়ের ওয়েস্টার্ন শার্টটা যেন এইমাত্র প্যাকেট ছিড়ে খুলে পরে এসেছে।

এগিয়ে গেলেন উইলসন। হাত মেলালেন দুজনে।

কুকুরের অসদাচরণের জন্যে ক্ষমা চাইল ম্যাকআরবার।

লোকটার পরিচ্ছদ আর কথাবার্তায় একটা ব্যাপারে শিওর হলো কিশোর, মেকি একটা ভাব রয়েছে তার মধ্যে। একেবারে বানিয়ে বলেনি জিনা। কিন্তু আরেকটা প্রশ্নও জাগছে কিশোরের মনে, টুইন লেকসের মত জায়গায়, এই সুন্দর বিকেলে এছাড়া আর কি পোশাক পরতে পারত ম্যাকআরখার? এমনও তো হতে পারে, এখানে আসার আগে ওরকম কাপড় আর কোনদিন পরেনি সে, আসার সময় নতুন কিনে নিয়ে এসেছে। ওগুলো পুরানো হতে তো সময় লাগবে।

শেকল দিয়ে বেঁধে রেখেছি শয়তানটাকে, বলল ম্যাকমারধার। আর জালাবে না আপনাকে।

আরে না না, এটা কিছু না, তাড়াতাড়ি বললেন উইলসন। পোষা জন্তুজানোয়ার থাকলে ওরকম একআধটু অত্যাচার করেই। সেটা নিয়ে মাইণ্ড করে বসে থাকলে চলে নাকি।

ছেলেদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন উইলসন।

ম্যাকআরবারের প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে রইল জিনা।

ব্যাপারটা লক্ষ করল ম্যাকআরথার, হাসি হাসি পরিষ্কার নীল চোখের তারা কঠিন হয়ে গেল চকিতের জন্যে। তারপর জিনার শরীর ভেদ করে যেন তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল মডেল টি-এর দিকে। আরে, দারুণ একটা গাড়ি! দুর্লভ জিনিস।

একটু আগে এটার কথাই বলছিলাম ছেলেদেরকে। সময় বের করে শিগগিরই ঠিকঠাক করে নেব।

এগিয়ে গিয়ে গাড়িটার গায়ে হাত রাখল ম্যাকআরবার।

হ্যারি ম্যাকআরথার! হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল মুসা। নামটা আগেও শুনেছি মনে হচ্ছে।

তাই নাকি? ফিরে তাকাল লোকটা।

সিনেমায় কাজ করে আমার বাবা। কিছু দিন আগে খাওয়ার টেবিলে বসে আপনার কথা বলছিল। একটা ছবি বানাচ্ছে এখন, তাতে নাকি একটা পুরানো রিও গাড়ি দরকার। কোথাও পায় না পায় না, শেষে নাকি আপনার কাছ থেকে চেয়ে এনেছে। পুরানো গাড়ি কালেকশনের বাতিক আছে আপনার।

তাই নাকি? ও হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিকই, অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল যেন ম্যাকআরথার।

আপনার সংগ্রহের কথা বলছিল বাবা। বিরাট এক প্রাইভেট গ্যারেজ নাকি আছে আপনার, একজন ফুলটাইম মেকানিক রেখে দিয়েছেন বেতন করে। ওর কাজ শুধু গাড়িগুলোকে সব সময় সচল রাখা। সাধারণ কাজ, কিন্তু গাড়ি এত বেশি তাতেই নাকি হিমশিম খেয়ে যায় বেচারা।

হ্যাঁ। সাধারণ বলছ কেন? কাজটা কঠিনই। পুরানো এঞ্জিন, আধুনিক

মেশিনের মত ভাল না, সচল রাখা যথেষ্ট কঠিন।

রানিং বাগ ছবিতে আপনার সিলভার ক্লাউডটাই তো ব্যবহার হয়েছিল?

সিলভার ক্লাউড? ও, হ্যাঁ। হ্যাঁ হ্যাঁ, একটা স্টুডিওকে ধার দিয়েছিলাম…বেশি দিন আগের কথা নয়।

সিলভার ক্লাউড? বলে উঠলেন উইলসন। আমার মডেল টি-ওতো ওটার কাছে নাতি।

শুরুতে অত কোনো গাড়ি আমারও ছিল না, বিনীত কণ্ঠে বলল ম্যাকারবার। তবে একবার নেশায় পেয়ে বসলে কোখেকে কোথেকে জানি জোগাড় হয়ে যায়। কেনা শুরু করলেই টের পাবেন, এই গোলাঘরে কুলাবে না তখন আর। হয় নতুন বানাতে হবে, কিংবা বাড়াতে হবে।

নতুন আরেকটা গোলাঘর বানানোর কথা এমনিতেও ভাবছি, বললেন উইলসন।

কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গেলেন দুজনে। হাত নেড়ে নেড়ে বোঝাচ্ছেন উইলসন, কোন জায়গায় কতবড় করে বানাবেন ঘরটা, পুরানোটার কি করবেন।

কি মনে হলো? দুজনে দূরে চলে গেলে বলল জিনা। এরকম ভণ্ড আর দেখেছ?

কাপড়-চোপড় নতুন, বলল মুসা, তাতে কি? নামটা চেনা চেনা লাগছিল, মডেল টি-র প্রতি আগ্রহ দেখে মনে পড়ে গেল। বাবা বলেছে, লোকটার অনেক টাকা, এমনিতেও পাগল, গাড়িরও পাগল। ম্যানডেভিল ক্যানিয়নে নাকি মস্ত বাড়ি আছে তার, দশ ফুট উঁচু দেয়ালে ঘেরা।

মৃদু কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে নিল কিশোর। কিন্তু রানিং বাগ এর জন্যে তার সিলভার ক্লাউড ধার দেয়নি, বলল সে। ফিল্ম ফান পত্রিকায় গাড়িটার ওপর একটা আরটিকেল বেরিয়েছিল। ম্যাকআরধারের গাড়ি নয়, ওটা ছিল জোনাথন হ্যামিলটনের। ছবির খরচও তিনিই দিয়েছেন। আর ছবিটা আজকের নয়, বহু আগের।

কেউ তর্ক করল না। ওরা জানে, না জেনে কোন কথা বলে না কিশোর, ও যখন বলছে, ঠিকই বলছে।

লাফিয়ে উঠল জিনা। কি বলেছিলাম? ব্যাটা একটা ভণ্ড। মিখক।

হাসল কিশোর। তা বলা যায় না, জিনা। হ্যারি ম্যাকআরবারের অনেকগুলো গাড়ি আছে। তার মধ্যে একটা গাড়ি কখন কাকে ধার দিল না দিল, মনে না থাকলে মোষ দেয়া যায় না। তাছাড়া তার কাছেই গাড়ি চেয়েছে স্টুডিও এমন না-ও হতে পারে। হয়তো তার কোন কর্মচারীই গাড়ির ব্যাপারগুলো দেখাশোনা করে, হয়তো তার মেকানিকের ওপরই রয়েছে দায়িত্ব।

আমার বিশ্বাস হয় না, গোয়ারের মত হাত নাড়ল জিনা।

অকস্মাৎ পরিবেশটাই কেমন জানি বদলে গেল। অস্বস্তিকর নীরবতা। সহজ করে দিল ভিকি, ডিনারের জন্যে ডাক দিয়ে।

আরে আরও কয়েকটা কেক নাও না, রান্নাঘরে লম্বা টেবিলের কিনার থেকে বলে মৃত্যু খনি উঠল ডিকি। খুব ভাল জিনিস, জ্যাম মেশানো।

মাথা নাড়ল কিশোর, না আর পারব না। অনেক খেয়েছি।

ভুরু কোঁচকাল ভিকি। অনেক খেয়েছ মানে? দিয়েছিই তো এই কটা। এজন্যেই এমন পাকাটির মত শুকনো, হাড় জিরজিরে। ওই জিনাটাও হয়েছে এমন। আজকালকার ছেলেপুলে, খালি ওজন নিয়ে ভাবে। আরে বাপু, ছেলেমানুষ তোমরা, অমন চড়ুইর খাবার খেয়ে বাড়বে কি করে?

আমাদের দিকে নজর দিও না, খালা, অনুরোধ করল জিনা। ওই ওকে খাওয়াও, শান্তি পাবে,মুসাকে দেখিয়ে দিল সে।

খাওয়াবই তো। খায় বলেই তো এমন চমৎকার স্বাস্থ্য। তোমাদের মত শোলা নাকি, ফুঁ দিলেই পড়ে যাবে। এই মুসা, কেকের ট্রে-টা ঠেলে দিল ভিকি,,

চট করে শেষ করে ফেলো তো এগুলো। আরও এনে দিচ্ছি।

ও-কি, উঠে যাচ্ছিস কেন, জিনা? বললেন উইলসন। তুই বাপ একেবারেই বেয়াড়া হয়ে গেছিস, তোর মাকে জানাতে হবে। বলি, আমরা সবাই রয়েছি টেবিলে, তুই উঠে যাচ্ছিস, ভদ্রতার খাতিরেও না হয় বসে থাক।

না খেলে বসে থেকে কি করবে? জিনার পক্ষ নিল ভিকি। ছেলেপিলের ওসব ভদ্রতার দরকার নেই। যাও, মুখ ধুয়ে ফেলো।

প্লেটটা নিয়ে সিংকে চুবাল জিনা।

হয়েছে হয়েছে, পেছন থেকে বলল ডিকি, ওটা তোমার ধুতে হবে না। আমিই সব খোব। তুমি মুখ ধুয়ে ফেলো।

রবিনও উঠল, হাতে এটো প্লেট।

তুমি এটা নিয়ে কোথায় যাচ্ছ? ডাক দিল ভিকি।

ধুয়ে ফেলি। কি হবে? বাড়িতে কি ধুই না?

যাও তো। খাওয়া শেষ, হাত ধুয়ে ভাগো। রান্নাঘরে ভিড় পছন্দ নয় আমার। কাউকেই কোন সাহায্য করতে দিল না ভিকি, প্রায় জোর করে তাড়াল রান্নাঘর থেকে।

লিভিং রুমে এসে বসল সবাই। টেলিভিশনের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে সোফায় বসেই ঘুমিয়ে পড়লেন উইলসন। ছেলেরাও হাই তুলতে শুরু করল।

সব বাচ্চা খোকা, ঝাঝাল কণ্ঠে বলল জিনা। বিকেল না হতেই ঘুম। নটাও তো বাজেনি।

ভোর পাঁচটায় উঠেছি, সে খেয়াল আছে? প্রতিবাদ করল রবিন।

আমিও তো উঠেছি। এসো, দাবা খেলি…

আমি বাদ, তাড়াতাড়ি হাত তুলল কিশোর। মাথার ভেতরে একটা ঘড়ি কানো আছে আমার। ওটা জানাচ্ছে : রাত সাড়ে দশটা, শুতে যাও। আমি চললাম।

আমিও কিশোরের পিছু নিয়ে সিঁড়ির দিকে রওনা হলো মুসা।

বড় করে আরেকবার হাই তুলে রবিনও আগের দুজনকে অনুসরণ করল।

ধ্যাত্তোর! রাগে সোফার হাতলে থাবা মারল জিনা। আলসের ধাড়ী সব।

এত কম খেয়েও এত এনার্জি পায় কোথায় জিনা? নিজেদের ঘর বাংরুমে কাপড় ছেড়ে বিছানায় উঠে বলল মুসা।

মাথার নিচে হাত দিয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল কিশোর। আনমনে বলল, আমি শিওর না।

টেলিভিশনের শব্দ থেমে গেল। শোনা গেল উইলসনের ঘুমজড়িত কণ্ঠ। একটা দরজা বন্ধ হওয়ার পর শাওয়ারে পানি ছাড়ার শব্দ হলো। বন্ধ হলো আরেকটা দরজা।

জিনাও ঘরে গেছে, বলল কিশোর।

কাত হয়ে বালিশে মাথা রেখে বেডসাইড ল্যাম্পটা নিভিয়ে দিল সে। অন্ধকার হয়ে গেল ঘর, কিন্তু পুরোপুরি নয়। জানালা দিয়ে জ্যোৎস্না আসছে। ঠাণ্ডা, জালি কাটা আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে কাঠের মেঝেতে।

চোখ মুদল কিশোর। ঘুমিয়ে পড়ল সঙ্গে সঙ্গে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল তার। ভোতা একটা শব্দ শুনেছে। ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল প্রতিধ্বনির রেশ।

বিছানায় উঠে বসল সে। কান পেতে অপেক্ষায় রইল আবার শব্দ হয় কিনা শোনার জন্যে।

নিজের বাংকে গুঙিয়ে উঠল মুসা। ভিকি। আবার গুলি করেছে কুকুরটাকে।

না, জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল কিশোর। গুলির শব্দই, কিন্তু ভিকি না। অনেক দূর থেকে এসেছে।

বিস্তৃত ক্রিস্টমাস ক্ষেতের দিকে তাকাল সে, চাদের আলোয় রহস্যময় মনে হচ্ছে গাছগুলোকে। ডানে মিসেস ফিলটারের বাড়ি আর পরিত্যক্ত বিশেষ স্থানগুলো। নাক বরাবর সোজা, ধীরে ধীরে উঠে যাওয়া উপত্যকার ম্যাকআরবারের সম্পত্তি। ছোট একটা ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে খনিমুখের কাছে। কেবিনের কাছে একটা ছায়ার নড়াচড়া। শেকলে বাধা কুকুরটা মাথা তুলে হউউউ করে উঠল।

উইলসনের এলাকায় ঢোকার গেটের ওধারে ছোট বাড়িটার এক ঘরে আলো জ্বলল, আলো এসে পড়ল গেটের কাছে। ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এল মিসেস ফিলটার, পরনে ড্রেসিং গাউন। বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাকাল, বোধহয় ম্যাকআরবারের

কেবিনের দিকেই।

নিচে লিভিং রুমে কথাবার্তা শোনা গেল। উইলসন উঠে পড়েছেন, ভিকিও।

আমি না, ভিকির কণ্ঠ, আমি গুলি করিনি।

সিঁড়িতে খালি-পায়ের শব্দ হলো। দরজায় করাঘাত। শুনছ, মশাইরা? জিনা। শুনেছ কিছু?

ড্রেসিং গাউন পরে দরজা খুলে বেরোল তিন গোয়েন্দা।

একটা জানালার চৌকাঠে হাতের ভর রেখে বাইরে মাথা বের করে দিয়েছে। জিনা। ফিসফিস করে বলল, ম্যাকআরথার। আমি শিওর, ওদিক থেকেই শব্দটা এসেছে। দেখে যাও।

জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল মুসা। কি? মৃত্যু খনি

রোজি ফিলটারের বাড়ির দিকে দেখাল জিনা। ঘুরে গিয়ে ঘরে ঢুকে আবার দরজা বন্ধ করে দিলেন মহিলা। মিসেস ফিলটারও জেগে গেছেন, জিনা বলল। ম্যাকআরবারের কুত্তাটাও। ইস, রাফিয়ানকে নিয়ে আসা উচিত ছিল। বাবার জন্যেই পারলাম না। এমনিতে দেখতে পারে না, অথচ এখন বাড়ি পাহারায় রেখে দিব্যি কেমন নিশ্চিন্তে বিদেশ চলে গেছে। ওই কুত্তাটা কি রকম ঘাউ দাউ করছে শুনছ? আগে থেকে ওরকম চেচালে ওর ডাকেই ঘুম ভেঙে যেত আমাদের। অথচ কানের কাছে থেকেও ম্যাকআরখারের ঘুম ভাঙছে না। তুমি আমি হলে কি করতাম? আলো জ্বেলে বাইরে বেরিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করতাম, কেন এমন করছে জানার চেষ্টা করতাম। অথচ ব্যাটা কিছুই করছে না। ও নিজেই তো গুলি করেছে, জানার চেষ্টা করবে কি?

জিনা? নিচ থেকে ডাকলেন উইলসন। তুই ওখানে কি করছিস?

দেখছি, জবাব দিয়ে বেয়ে সিঁড়ির মাথায় উঠে গেল জিনা। চাচা, দেখে যাও। ম্যাকআরথারই গুলি করেছে।

জিনা, কয়েক ধাপ উঠে এলেন উইলসন, নাহ, ম্যাকআর্যার রোগেই ধরল দেখি তোকে। মাথাটা খারাপ করে দিল। ও কিছু না, বুঝলি। কেউ খরগোশ মারছে। কিংবা কয়োট।

কে? প্রশ্ন করল জিনা। পুরো এলাকাটা দেখতে পাচ্ছি আমি। কাউকে দেখছি। কথােট হলে আমাদের মুরগীগুলো খেতে আসে না কেন?

কি করে আসবে? ওদিকেই আগে হানা দিয়েছিল, গুলি করে তরে ফেলেছে, বললেন উইলসন। যা, নিচে, শো গিয়ে। ওদেরকে ঘুমোতে দে।

ধ্যাত্তোর! বিরক্তি চাপতে পারল না জিনা। সিঁড়ি বেয়ে নামতে যাবে, জানালার কাছ থেকে ডাকল কিশোর।

এগিয়ে গেল জিনা।

কেবিনের বাইরের খোলা জায়গায় বেরিয়ে এসেছে ম্যাকআরথার। বগলতলায় চেপে ধরে রেখেছে শটগান। পাহাড়ের দিকে ফিরে কি দেখল সে, তারপর বন্দুক কাধে ঠেকিয়ে ফায়ার করল।

আরেকবার রাতের নীরবতা ভাঙল বন্দুকের গর্জন। আবার চেঁচিয়ে উঠল কুকুরটা। এগিয়ে গিয়ে ঝুঁকে ওটার মাথায় চাপড় দিল ম্যাকআরথার।

ঘেউ ঘেউ থামাল কুকুরটা, কেবিনে ঢুকে গেল তার মনিব। ঠিকই বলেছ, জিনা, মুসা বলল পাশ থেকে, ম্যাকআরথারই।

তোমার চাচা ঠিকই বলেছেন, বলল রবিন। কয়োটই। ওই যে তাড়াল ম্যাকআরথার।

নাক দিয়ে বিচিত্র শব্দ করল জিনা। নেমে গেল নিজের ঘরে।

ম্যাকআরবারের পেছনে ভালমত লেগেছে জিনা, বাংকে উঠে বলল রবিন। এখন যা-ই করুক লোকটা, জিনা তার অন্য অর্থ করবে। খালি বলবে কুমতলব আছে।

আমি যদি কখনও খনির মালিক হই, বিছানায় উঠতে উঠতে বলল কিশোর, আর জিনা যদি ভেতরে ঢুকে দেখতে চায়, সঙ্গে সঙ্গে দেখিয়ে দেব। ওর শত্রু হয়ে বিপদে পড়তে চাই না।

রসিকতায় হাসল তিনজনেই।

আবার ঘুমিয়ে পড়ল মুসা আর রবিন। কিশোরের চোখে ঘুম এল মা। অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে ভাবছে আর কান পেতে শুনছে ক্রিস্টমাস পাতার মরমর।

হঠাৎ উঠে বসল সে। জোরে জোরে বলল, পয়লা গুলিটার সময় কোথায় ছিল ম্যাকআরধার?।

উঁম? ঘুমের ঘোরে পাশ ফিরল মুসা।

আঁ…কী? রবিন জেগে গেছে।

বলছি পয়লা গুলিটা কোথা থেকে করেছে ম্যাকআরথার? আবার বলল কিশোর।

পয়লা গুলি? মুসার ঘুম ভেঙে গেছে। বাড়ির ভেতর থেকে।

বাড়ির ভেতর থেকে বেরোতে দেখেছ তাকে? প্রশ্ন করল কিশোর। দ্বিতীয় গুলিটা করার আগে কোথা থেকে বেরিয়েছে, দেখেছ?।

না তো। জিনা আর তার চাচার কথা শুনছিলাম তখন।

রবিন?

দেখেছি।

মাটি খুঁড়ে উদয় হয়নি নিশ্চয়, বলল কিশোর। মুসা দেখেনি-না হয় ধরলাম সে তাকায়নি। কিন্তু তুমিও দেখোনি, আমিও দেখিনি। তাছাড়া কোথা থেকে গুলি করলে ওরকম ভোতা শব্দ শোনা যাবে? খনির ভেতরে থেকে।

তাতে কি? বুঝতে পারছে না মুসা।

হয়তো কিছুই না, বলল কিশোর। তবে খনির ভেতর কয়োট ঢুকেছিল, এটাও বিশ্বাস করব না আমি। কয়োটের সাড়া পেলেই চেমোনো শুরু করত কুকুরটা। কিন্তু গুলির শব্দের আগে রা করেনি। এমনও তো হতে পারে, খনির ভেতরে গুলি ছুড়েছিল ম্যাকআরথার, তারপর বাইরে বেরিয়ে দেখল পড়শীরা জেগে উঠেছে। তা যদি হয়, আর সন্দেহমুক্ত হতে চায়, কি করবে তাহলে?

চুপ করে রইল অন্য দুজন।

বাইরে খোলা জায়গায় বেরিয়ে গুলি করবে না? নিজেকেই প্রশ্ন করছে কিশোর। বোঝাতে চাইবে না, কয়োট তাড়ানোর জন্যে গুলি করেছে?

জিনার মতই সন্দেহ রোগে ভুগতে শুরু করেছ তুমি, রবিন বলল।

হয়তো বা, অস্বীকার করল না কিশোর। তবে মিস্টার হ্যারি ম্যাকআরথারের আচার-আচরণও সন্দেহ করার মতই। মনে হচ্ছে, ধীরে ধীরে একটা কেস দাঁড়িয়ে যাচ্ছে তিন গোয়েন্দার জন্যে।

পরদিন সকালে বেলা করে ঘুম ভাঙল কিশোরের। জানালা দিয়ে বাইরের উজ্জ্বল রোদের দিকে চেয়ে গত রাতের কথা মনে পড়ল, সব কিছু এখন হাস্যকর মনে হলো। কাপড় পরে নেমে পড়ল, এল নিচে রান্নাঘরে। মুসা আর রবিন খাচ্ছে। টেবিলের এক মাথায় বসে আছেন উইলসন। ভিকি গরম কেক নামিয়ে বেড়ে দিচ্ছে টেবিলে।

কিশোরকে দেখে হাত তুলল মুসা, এসেছ। ডাকতে যাচ্ছিলাম। জিনা গেছে ঘোড়া দৌড়াতে। কয়েক কামড় কেক চিবিয়ে নিয়ে বলল কিশোর।

রুচি বদল হবে, বলল কিশোর।

ইয়ার্ডে মালপত্র গোছানো একঘেয়ে হয়ে গিয়েছিল।

ও। গাছকাটা মনে হয় ভালই লাগবে তোমাদের, হাসলেন উইলসন। আমার তো লাগে। এর মাঝে শিল্প আছে, অনেকটা নিজ হাতে গড়ার মত মজা। বেয়াড়া রকম বেড়ে ওঠা গাছকে হেঁটে নিজের মত সাজিয়ে নেয়া। দিনটা ভালই কাটবে তোমাদের। কিন্তু পয়লা দিনেই বেশি খাটাখাটনি কোরো না। ঘণ্টাখানেক পর পর কিছুক্ষণ করে জিরিয়ে নিও।

নাস্তা সেরে গোলাঘর থেকে তিনটে ছুরি নিয়ে এলেন উইলসন। ছেলেদেরকে নিয়ে খেতে চললেন।

র‍্যাঞ্চ হাউস আর পথের মাঝের একটা খেতে এল ওরা। ছুরি দিয়ে কুপিয়ে কেটে দেখিয়ে দিলেন উইলসন, কিভাবে কতখানি হাঁটতে হয়। বললেন, গাছের বেশি কাছে যেও না। দূরে দাঁড়িয়ে পাশ থেকে কোপ দেবে, যাতে পায়ে এসে না লাগে।

কোপাতে শুরু করল তিন কিশোর। দাঁড়িয়ে থেকে দেখলেন খানিকক্ষণ উইলসন। যখন বুঝলেন, ছেলেরা শিখে গেছে, বাড়িতে ফিরে গেলেন। কয়েক মিনিট পর ভিকিকে নিয়ে স্টেশন ওয়াগনে করে চলে গেলেন কোথাও।

নীরবে কাজ করে চলল তিন গোয়েন্দা। ঘোড়ার খুরের শব্দে চোখ তুলে তাকাল। ম্যাকআরথারের সীমানার ওদিক থেকে ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে জিনা। খোয়াড়ে ঢুকল, অ্যাপলুসাটাকে ওখানে রেখে চলে গেল বাড়ির ভেতরে।

খানিক পরে এঞ্জিনের শব্দ কানে এল ছেলেদের। গোলাবাড়ির দিকে চেয়ে বলে উঠল মুসা, খাইছে? কাণ্ড দেখো।

পিকআপের ড্রাইভিং সীটে দেখা যাচ্ছে জিনাকে। গিয়ার দেয়ার শব্দ হলে। এলোমেলো ভাবে দুলতে দুলতে পথ ধরে ছুটে এল গাড়িটা।

চেঁচিয়ে বলল মুসা, জিনা, পাগল হয়ে গেছ নাকি! করছ কি?

ট্রাকের নাক সোজা রাখতে পারছে না জিনা.। ছুটে এল ছেলেদের দিকে, শেষ মুহূর্তে ব্রেক প্যাডালে পা রেখে প্রায় দাঁড়িয়ে গেল। জোর কাশি দিয়ে থেমে গেল এঞ্জিন। পারছি, শোনা গেল জিনার আনন্দিত কণ্ঠ, চালাতে পারছি। খোলা জায়গায় ঠিকই পারব।

চালাতে হলে আরও বড় হওয়া লাগবে তোমার, রবিন বলল।

লাইসেন্স পেতে বড় হওয়া লাগবে, জিনা জবাব দিল। কিন্তু সীটে বসে প্যাডাল যখন ছুঁতে পারছি, চালাতেও পারব।

আবার এঞ্জিন স্টার্ট দেয়ার চেষ্টা করল, পারল না। হুঁ, গ্র্যাকটিস দরকার।

তোমার চাচা জানেন? জিজ্ঞেস করল মুসা।

নিশ্চই। চাচা বলে বড়রা যা করে, ছোটদেরও তা করতে পারা উচিত। আমার কোন কাজে চাচা বাধা দেয় না।

সেজন্যেই বুঝি চাচা আর ভিকি বেরিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় ছিলে? ওরা থাকতে সাহস পাওনি?

জানালা দিয়ে মুখ বের করল জিনা, চোখ উজ্জ্বল। মুসার কথার জবাব এড়িয়ে গিয়ে বলল, দুজনে বাজারে গেছে, ফিরতে দেরি হবে। ম্যাকআরথারও বাড়ি নেই, কুত্তাটাকে বেঁধে রেখে গেছে। চলো, এই সুযোগ।

খনিতে তো? একাই যাও, আমরা এর মাঝে নেই।

ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে চুপচাপ ভাবছে কিশোর। গতরাতে গুলির শব্দ কোথা থেকে এসেছিল, সে কথা।

ভীতুর ডিম, মুসার দিকে চেয়ে মুখ বাঁকাল জিনা। থাকো তোমরা, আমি চললাম। আবার চেষ্টা করল সে, এবার স্টার্ট নিল এঞ্জিন।

রাখো রাখো, হাত তুলল কিশোর, আমি যাব।

গুড, হাসল জিনা। ছুরিটা নিয়ে এসো। ম্যাকআরথার দেখে ফেললে তাড়াতাড়ি খেতে নেমে গাছ কাটার ভান করবে। কি, তোমরা দুজন যাবে না?

কিশোরের দিকে তাকাল মুসা, ভাবল কে জানে, কিন্তু আর আপত্তি না করে এসে উঠল গাড়িতে। রবিনও উঠল।

কাঁচা হাতে গিয়ার দিল জিনা। প্রচণ্ড প্রতিবাদ জানাল এঞ্জিন, ঝাঁকুনি দিয়ে চলতে শুরু করল গাড়ি। এবড়োখেবড়ো মাঠের ওপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে ছুটে চলল ম্যাকআরথারের সীমানার দিকে।

দারুণ একখান গাড়ি, উল্লাসে ফেটে পড়ছে জিনা। গাড়ি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্যে বাকা হচ্ছে, সোজা হচ্ছে, এদিকে কাত হচ্ছে, ওদিকে কাত হচ্ছে। এরই মাঝে এক ফাঁকে মুসার দিকে চেয়ে বলল, খুব সহজ, বুঝলে? কোন ব্যাপারই না, শুধু গিয়ারগুলো ঠিকমত ফেলতে পারলেই হলো…

তা তো দেখতেই পাচ্ছি, মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল মুসা। গাড়ি উল্টে ঘাড় না মটকালেই বাঁচি এখন। আস্ত এক কৌটা বাতের মলম লাগবে আজ আমার।

বেশি ভয় পাও তুমি…আঁউউ। ক্যাঙারুর মত আচমকা এক লাফ দিল গাড়ি, আলের মত একটা জায়গায় হোঁচট খেয়ে। আপনা আপনি জিনার হাত থেকে স্টিয়ারিং ছুটে গেল, পা সরে এল ক্লাচ থেকে। জোরে আরেকটা ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়ি থেমে গেল, এঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেছে আগেই। যাক, জায়গামতই এনে রেখেছি, মুসার দিকে তাকাচ্ছে না সে। এখান থেকেই ম্যাকআরবারের সীমানা শুরু।

সামনে রুক্ষ, অসমতল ভোলা জায়গা, হঠাৎ করে গিয়ে শেষ হয়েছে যেন, পর্বতের গোড়ায়। এক ধারে কালো বেড়া, খনির কালো মুখ দেখা যাচ্ছে। বেড়ার ওপর দিয়ে খনির ভেতরটা দেখতে অসুবিধে হচ্ছে, তবু কয়েক ফুট পর্যন্ত নজর চলে। সুড়ঙ্গের মেঝেতে সাদা মিহি বালি, এখান থেকেও বোঝা যায়। খনির ডানে ম্যাকআরথারের নোংরা কেবিন।

আস্ত মেথর, নাক কোচকাল জিনা। পরিষ্কার করার সময় পায়নি হয়তো, বলল রবিন। কদ্দিন হলো এসেছে?

প্রায় এক মাস। এসেছে তো একটা ফকিরের মত, বিছানা, হাঁড়ি-কড়াই আর কয়েকটা বাসন-পেয়ালা, ব্যস। নতুন আর কিছু কিনেছে বলে মনে হয় না। একেবারে চামার।…ওই যে বিল্ডিংটা ওতে খনির কাজকর্ম হত। খনি থেকে আকরিক তুলে নিয়ে জমা করা হত ওখানে, তারপর রুপা আলাদা করা হত।

শেকলের শব্দ শোনা গেল, কেবিনের কোণ থেকে বেরিয়ে এল কুকুরটা। ছুটন্ত অবস্থায় যতখানি বিশাল মনে হয়েছিল সেদিন কিশোরের তত বড় নয়, তবে বড়। শিকারী-লাব্রাডর আর জার্মান ভেড়া-তাড়ানো কুকুরের শঙ্কর। আগন্তুকদের দেখে চাপা গর্জন করে উঠল।

চেনটা শক্ত কিছুঁতে বাঁধা তো? বিড়বিড় করল মুসা।

হ্যাঁ,মুসার ভয় দেখে হেসে ফেলল জিনা। তখন চেতিয়ে দিয়ে পরীক্ষা করে দেখে গেছি। টানাটানি অনেক করেছে, ছুটতে পারেনি।

কখন করলে? জিজ্ঞেস করল রবিন।

এই তো খানিক আগে, কমেটকে নিয়ে এলাম না।

এত সাহস যে দেখালে, যদি ছুটে তে।

গেলে যেত। কমেন্টের সঙ্গে দৌড়ে পারত নাকি? লাথি খেলেও বাপের নাম ভুলে যেত। ভিকি খালা তো গুলি ছুঁড়ে ভুল করে, কমেটকে ডেকে এনে একটা লাথি খাওয়ানো দরকার ছিল। জিন্দেগীতে আর মুরগীর দিকে চোখ তুলে তাকাত না।

তুমি না কুকুর ভালবাস, জিনা? মুসা বলল, এটাকে দেখতে পারো না কেন? রাফিয়ানকে তো…

চুপ। কার সঙ্গে তুলনা। কোথায় ভদ্রলোকের বাচ্চা, আর কোথায় চোরা ম্যাকআরবারের মুরগীচোর।

কুকুর ভদ্রলোকের বাচ্চা হয় কি করে? ফস করে জিজ্ঞেস করল মুসা।

ভদ্রলোকের না হোক ভদ্ৰকুকুরের তো?

তা বলতে পারো…

আরে কি বকবক শুরু করলে তোমরা? বিরক্ত হয়ে বলল কিশোর, গভীর মনযোগে খনি আর তার আশপাশের অঞ্চল দেখছিল। জিনা, নামো, পথ দেখাও।

খনিমুখের ভেতরে ঢুকে টর্চ জ্বালল জিনা। চালু হয়ে নিচে নেমে গেছে সুড়ঙ্গ। দুপাশের দেয়াল ঘেঁষে পোতা হয়েছে রেললাইনের সীপারের মত বড় বড় মজবুত তক্তা, তার ওপর বীম লাগিয়ে পাথুরে ছাত সহজে যাতে ধসে না পড়ে সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সুড়ঙ্গের ভেতরে স্তব্ধ নীরবতা। সব কিছু শান্ত, তবু পরিবেশটা এমন, অকারণেই গা ছমছম করে।

খুব ধীরে ধীরে অমসৃণ ঢাল রেয়ে নামতে শুরু করল ওরা।

পর্বতের ভেতরে পঞ্চাশ গজমত ঢুকে দূ-ভাগ হয়ে গেছে সুড়ঙ্গ, একটা সোজা এগিয়েছে, আরেকটা বায়ে সামান্য মোড় নিয়েছে। এক মুহূর্ত দ্বিধা করে বায়ের পথটাই ধরল জিনা। তাকে অনুসরণ করল ছেলেরা। ঘুটঘুটে অন্ধকার। সুড়ঙ্গমুখ দিয়ে যে আবছা আলো আসছিল এতক্ষণ, মোড় নেয়ায় সেটাও হারিয়ে গেল।

পাথুরে মেঝেতে নিজেদের জুতোর শব্দই কেমন যেন ভুতুড়ে শোনাচ্ছে।

মহিলা পড়েছিল যেন কোথায়? নিচু গলায় বলল জিনা। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।

জিনা, দাঁড়াও, হাত তুলল কিশোর। সামনে মেঝেতে কিছু একটা চোখে পড়েছে। এই যে, এদিকে, আলো ফেরাও?

আলো ফেলল জিনা। আলগা পাথর, নুড়ির ছোট একটা স্কুপ। দেয়াল আর হাত থেকে খসে পড়ে জমা হয়েছে বোধহয়।

এগিয়ে গিয়ে তুলে নেয়ার জন্যে ঝুঁকল কিশোর, এই সময় আলো সরে গেল।

আরে আরে, যাচ্ছ কোথায়? চেঁচিয়ে উঠল মুসা। টর্চটা…এই জিনা?

কিন্তু জিনা থামল না। টর্চের আলো নাচতে নাচতে সরে যাচ্ছে দূরে। পাশের একটা করিডরে ঢুকে গেল সে।

জিনা! চেঁচিয়ে ডাকল রবিন।

হঠাৎ পেছনে আলো দেখা গেল, উজ্জ্বল আলো যেন নগ্ন করে দিল তাদেরকে! বুঝল, হঠাৎ কেন ছুটে পালিয়েছে জিনা।

এই এই, কি করছ ওখানে? ম্যাকআরথারের কড়া গলা।

মরেছি! ফিরে তাকানোর সাহস হচ্ছে না মুসার।

জিনার হাত থেকে টর্চ খসে পড়ার শব্দ হলো। ঝনঝন করে উঠল পাথরে বাড়ি খেয়ে, কাচ ভাঙল।

অন্ধকার করিডরের শেষ মাথা থেকে ভেসে এল জিনার রহিম-করা চিৎকার।

চেঁচিয়েই চলল সে, একনাগাড়ে।

জিনা? কি হয়েছে, জিনা? ডেকে জিজ্ঞেস করল কিশোর।

জবাবে শুধুই চিৎকার। মাথা খারাপ হয়ে গেছে যেন জিনার।

মরছে নাকি! আলো হাতে পাশ দিয়ে ছুটে চলে গেল ম্যাকআরখার, করিডরে গিয়ে ঢুকল।

পেছনে গেল ছেলেরা।

মস্ত এক কালো খাদের পাড়ে দাঁড়িয়ে চেঁচাচ্ছে জিনা। আরেক পা এগোলেই যেত পড়ে গর্তের মধ্যে।

থামো! এই মেয়ে, শুনছ? চুপ! ধমক দিল ম্যাকআরথার। হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে জিনাকে সরিয়ে আনল গর্তের ধার থেকে। কি, হয়েছে কি?

থরথর করে কাঁপছে জিনা, হাত তুলে ইঙ্গিত করল গর্তের দিকে। ও-ওখানে…নিচে…

সাবধানে খাদের পাড়ে এসে দাঁড়াল চারজনে। ভেতরে আলো ফেলল ম্যাকআরখার, উঁকি দিল ছেলেরা। বেশি গভীর নয়, দশ-বারো ফুট। তবে একেবারে খাড়া দেয়াল।

খাদের তলায় কি যেন পড়ে আছে। প্রথমে কাপড়ের স্তুপ বলে মনে হলো। কিন্তু ঠিকমত আলো ফেলে ভাল করে তাকাতেই দেখা গেল, একটা হাত বেরিয়ে আছে। কাপড়ের ভেতরে রয়েছে দেহটা, দুমড়ে-মুচড়ে বিকৃত। চোখের জায়গায়। দুটো শূন্য কোটর, মাথার চুল পাটের রুক্ষ আঁশের মত লেপটে রয়েছে খুলির সঙ্গে।

মরা! চেঁচিয়ে উঠল আবার জিনা। মরা!…মরে গেছে।

আহ, থামোতো। আবার ধমক লাগাল ম্যাকআরথার।

ঢোক গিলল জিনা, চুপ করল।

বেরোও, আদেশ দিল ম্যাকআরথার। সব্বাই।

দু-পাশ থেকে জিনার দু-হাত ধরে টেনে নিয়ে এগোেল কিশোর আর রবিন। পেছনে টলমল পায়ে চলল মুসা। সবার পেছনে আলো হাতে রয়েছে। ম্যাকআরথার।

খোলা আকাশের নিচে উজ্জ্বল রোদে বেরিয়ে এল ওরা।

কুকুরের পরিচিত ডাক অপার্থিব লাগছে কিশোরের কানে। যেন এইমাত্র ভয়ঙ্কর এক দুঃস্বপ্ন থেকে জেগে উঠেছে। গুহার তলায় কাপড়ের স্তুপের ভেতরে কোচকানো চামড়া আর হাড্ডি সর্বস্ব হাত, শূন্য কোটর, লেপটানো চুল…শিউরে উঠল সে, কড়া রোদের মাঝেও শীত শীত লাগছে।

যাও, বাড়ি যাও, বলল ম্যাকআরথার। খবরদার, আর কখনও এদিকে আসবে না। যদি আর কোনদিন দেখি…

গটমট করে গিয়ে কেবিনে ঢুকল সে, দড়াম করে বন্ধ করে দিল দরজা।

ধীর পায়ে এগোল ছেলেরা। খনিমুখের কাছে দাঁড়িয়ে আছে এখন একটা উজ্জা লাল শেভি সুবারব্যান ট্রাক, ম্যাকআরথারের। ওটার পাশ দিয়ে মাঠ পেরিয়ে এগোল। পিকআপের পাশ কাটিয়ে এল, চালানোর সাধ্য নেই আর এখন জিনার। হেঁটে চলল বাড়িতে।

র‍্যাঞ্চ হাউসে ফিরতে আবার স্বাভাবিক হয়ে এল জিনা। রক্ত ফিরল মুখে। শেরিফকে খরব দিতে হবে। ম্যাকআরথারের কাজ। আগেই বলেছি, বাটা নাম্বার ওয়ান শয়তান।

তোমার দরকার নেই, বলল কিশোর, সেই এতক্ষণে খবর দিয়ে ফেলেছে। শেরিফকে। শেরিফের কাছে ওর কথা উল্টো-পাল্টা কিছু বলবে না, সাবধান।

কেন বলব না? তর্ক শুরু করল জিনা। ওর খনিতে মানুষ মরে পড়ে আছে…

শহরের দিক থেকে ছুটে আসছে ছোট্ট একটা ধুলোর মেঘ। কয়েক সেকেন্ড পর ওদের পাশ কাটিয়ে গেল মেঘটা, বাদামী রঙের একটা সিডান গাড়ি। দরজায় বড় বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে ওশেরিফ। পলকের জন্যে ড্রাইভারকে দেখতে পেল ছেলেরা, বিশালদেহী লোক, মাথায় স্টেটসন হ্যাট! ম্যাকআরথারের কেবিনের সামনে গিয়ে থামল গাড়ি।

কি বলেছিলাম? জিনার দিকে চেয়ে হাসল কিশোর।

হাসিটা ফিরিয়ে দিল জিনা, কিন্তু তাতে প্রাণ নেই। শেরিফকে কি বলে ম্যাকআরথার কে জানে।

তোমার চাচাকে কি বলবে, তাই ভাববা, পথের দিকে নির্দেশ করল কিশোর। স্টেশন ওয়াগনটা ফিরছে।

গেটের কাছে পৌঁছে গেছে ছেলেরা, স্টেশন ওয়াগনও এসে ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষল। জানালা দিয়ে মুখ বের করে ডাকলেন উইলসন, জিনা? শেরিফকে। দেখলাম। কিছু হয়েছে?

ম্যাকআরথারের খনিতে একটা লাশ পড়ে আছে, আরেক দিকে চেয়ে জবাব দিল জিনা।

লাশ? খনিতে?

মাথা ঝোঁকাল জিনা।

মাদ্রে দু দিও! বিড় বিড় করল ভিকি, বেরিয়ে আসছে গাড়ি থেকে। জিনা, তুমি জানলে কিভাবে?

অস্বস্তিকর নীরবতা। ভাইঝির দিকে তাকিয়ে রয়েছেন উইলসন। জিনা, আবার ঢুকেছিলি খনিতে?

কোনমতে মুখ তুলে বলল জিনা, হ্যা…গতরাতে গুলির শব্দ শুনলাম তো…ভাবলাম…।

কোন কৈফিয়ত শুনতে চাই না, কড়া গলায় বললেন তিনি। যাও, বাড়ি যাও। খবরদার, আর বেরোবে না।

গাড়ি থেকে নেমে মাঠের ওপর দিয়ে ম্যাকআরবারের বাড়ির দিকে দৌড় দিলেন উইলসন। তার সঙ্গে যোগ দিলেন মিসেস ফিলটার, শেরিফের গাড়ি দেখেই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন।

র‍্যাঞ্চ হাউসের দোতলায় এক জানালা থেকে আরেক জানালায় গিয়ে উঁকি দিতে লাগল চারজনেই। বাইরে, ম্যাকআরথারের বাড়িতে কি হচ্ছে দেখার জন্যে উদগ্রীব। আরও কিছুক্ষণ পর একটা অ্যামবুলেন্স গিয়ে থামল খনিমুখের সামনে। ঘন্টাখানেক পর চলে গেল শহরের দিকে। ইতিমধ্যে আরও কয়েকটা গাড়ি এসেছে। তার একটা হাইওয়ে পেট্রল পুলিশের।

বেলা তিনটায় পিকআপটা নিয়ে ফিরে এলেন উইলসন।

চাচা, দেখেই বলে উঠল জিনা, ম্যাকআরথারকে অ্যারেস্ট করেছে?

তাকে কেন করবে? খনির ভেতর লোকটা অনেক আগে মরেছে। ময়না তদন্তের পর বোঝা যাবে কয় বছর আগে ঘাড় ভেঙেছিল। এতে ম্যাকআরথারের দোষ কি? খনির মুখ শিক দিয়ে বন্ধ করার আগেই মরেছে লোকটা।

পাঁচ বছর, উইলসনের সাড়া পেয়েই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে ভিকি। আহা, বেচারা। পাঁচ-পাঁচটি বছর ধরে মরে পড়ে আছে ওখানে, কেউ জানে না।

মাত্র পাঁচ? মুসা বলল। আমি তো ভেবেছি চল্লিশ বছর।

খনি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই, জানাল ভিকি, তবে মুখ বন্ধ করা হয়নি, লোক যাতায়াত থামেনি। অ্যাকসিডেন্টের ভয়ে শেষে বছর পাচেক আগে, বসন্তকালেই বুঝি…হা, হ্যাঁ, বসন্তকালে শিক দিয়ে শক্ত করে বন্ধ করে দেয়া হয়।

মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে আছে কিশোর, আনমনে একটা কিছু ছুঁড়ছে আর লুফে নিচ্ছে।

কি, ওটা? জিজ্ঞেস করল জিনা।

খপ করে ধরল আবার কিশোর। খনিতে পেয়েছি। এটার জন্যেই আলো ধরতে বলেছিলাম তোমাকে। ডান হাতের তর্জনী জিভে ঠেকিয়ে ভিজিয়ে নিয়ে পাথরের মত জিনিসটার গা ডলল। শুনেছি ওটা রুপার খনি ছিল। সোনাও ছিল নাকি?

না, শুনিনি তো? উইলসন বললেন।

পাথরটা আলোর দিকে ধরল কিশোর। উজ্জ্বল একটা দাগ। আয়রন পাইরাইট হতে পারে। ফুলস গোন্ড বলে একে। বাংলায় বলল, বোকার স্বর্ণ…না না, সোনালি ফাঁকি।

আয়রন পাইরাইট না কিসের পাইরাইট, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই আমার,বলে উঠল জিনা। আমি জানতে চাই, আগে কেন লাশটার কথা পুলিশকে বলেনি ম্যাকআরখার? আমরা দেখে ফেলায় জানাতে বাধ্য হয়েছে।

ধৈর্য হারালেন উইলসন। ম্যাকআরথার জানত নাকি, লাশ আছে? গত হপ্তায় মাত্র শিকগুলো সরিয়েছে সে, খনির ভেতরে পুরোপুরি দেখার সময়টা পেল কই? পাঁচ বছর আগের একটা মড়া লুকানোর কোন দরকার আছে তার? দেখো জিনা, বেশি মাথায় উঠে গেছ।

বাইরে একটা গাড়ি এসে থামল। শব্দ শুনেই দরজা খুলে দিল ভিকি।

বারান্দা পেরিয়ে ঘরে ঢুকলেন শেরিফ। সরাসরি তাকালেন জিনার দিকে। জিনা, তুমি জানো, খনিটার নাম কেন ডেথ ট্রাপ রাখা হয়েছে?

মাথা ঝাঁকাল জিনা। ওখানে অ্যাকসিডেন্টুে লোক মারা যায়। যায় তো?

আবার মাথা ঝাঁকাল জিনা। যায়। জানি।

আবার যদি ওখানে যাও, ধরে নিয়ে গিয়ে সোজা হাজতে ভরবো। কোর্টে যেতে হবে তোমার চাচাকে, তোমাকে ছাড়াতে। ছেলেরা, তোমাদেরও হুঁশিয়ার করে দিচ্ছি।

একটা চেয়ার টেনে বসলেন শেরিফ।

লোকটা কে, জানা গেছে? জিজ্ঞেস করলেন উইলসন।

বোধহয়, শেরিফ বললেন। পকেটে মানি ব্যাগ আর একটা আইডেনটিটি কার্ড পেয়েছি, তাতে স্যান ফ্রানসিসকোর ঠিকানা। ওখানে ফোন করলাম। পুলিশ জানাল, বছর পাঁচেক আগে জানুয়ারি মাসে বাড হিলারি নামে একটা লোক নিখোঁজ হয়েছে, রেকর্ড আছে। লোকটার অনেকগুলো ছদ্মনাম, এই যেমন, বেরি হারবার্ট, বন হিরাম, বার হুম্যান। ডাকাতি করতে গিয়ে ধরা পড়ে স্যান কুয়েনটিন-এ জেল খেটেছে ছয় বছর। ছাড়া পাওয়ার পর পুলিশ স্টেশনে নিয়মিত হাজিরা দিয়েছে মাত্র দুবার, তারপরই গায়েব। পুলিশের ওয়ানটেড লিস্টে আছে দীর্ঘ দিন ধরে। খনিতে পাওয়া লাশের সঙ্গে হিলারির চেহারার বর্ণনা মিলে যায়। বদ্ধ বাতাসে একই আবহাওয়ায় থেকে পচেনি দেহটা, মমি হয়ে গেছে। আরও শিওর হওয়ার জন্যে তার ডেন্টাল চার্ট চেক আপ করার নির্দেশ দিয়েছি।

বেচারা ম্যাকআরথার, ব্যঙ্গ প্রকাশ পেল জিনার কণ্ঠে, লাশটা যে আছে তার খনিতে, জানেই না।

জানেনা-ই তো। জানলে সঙ্গে সঙ্গে ফোন করত আমাকে, উঠে দাঁড়ালেন শেরিফ। তো, যা বলেছি মনে থাকে যেন, ইয়াং লেডি। খনির ধারে কাছে যাবে

শেরিফকে এগিয়ে দিতে বেরোলেন উইলসন।

শিক খোলার পর খনির ভেতরটা ঘুরে দেখেনি ম্যাকআরথার, অবাকই লাগে, বলল কিশোর। আমার খনি হলে আমি আগে ঘুরে দেখতাম।

বলছিই তো ব্যাটা আস্ত ইবলিস! জিনার সেই এক কথা।

পাঁচ বছর আগে, জানুয়ারি মাসে, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর, বাড হিলারি নামের এক ডাকাত, ছাড়া পেল জেল থেকে। এরপর নিয়মিত দুই বার দেখা করল সে স্যান ফ্রানসিসকো পুলিশ অফিসে, তারপর গায়েব। তখন ছিল বসন্তকাল, খনির মুখ বন্ধ করার সময়। পালিয়ে টুইন লেকসে চলে এসেছিল লোকটা, খনিতে পড়ে মরল। কিন্তু স্যান ফ্রানসিসকো থেকে পালানো আর খনিতে পড়ার আগে মাঝখানের সময়টা সে কোথায় ছিল? কি করেছিল? ভিকিখালা, বলতে পারো, টুইন লেকসেই কি ছিল সে।

মাথা নাড়ল ভিকি। টুইন লেকস খুব ছোট জায়গা, সবাই সবাইকে চেনে। নতুন কেউ এলে চোখে পড়েই।

মাথা ঝাঁকাল কিশোর। ঠিক পুলিশের নজর থেকে পালিয়ে এলে অন্য কারও. চোখে পড়তে চাইবে না। অথচ ইচ্ছে করেই যেন এখানে চোখে পড়তে এল সে।

পাঁচ বছর আগে টুইন লেকসে আসলে কি ঘটেছিল? কিশোরের কথার পিঠে বলল জিনা। একটা চোর ভেতরে থাকতেই বন্ধ করে দেয়া হলো খনির মুখ। এ ব্যাপারে কারও বিশেষ আগ্রহ ছিল না তো? হ্যারি ম্যাকআরথারের মত?

আমার মনে হয় না, টেবিলে শুপ করে রাখা সংবাদপত্রগুলো ঘটছে রবিন। তবু খোঁজ নিয়ে দেখতে পারি আমরা। তাতে যদি তোমার দুশ্চিন্তা দূর হয়, ভাল।

কি ভাবে?

স্থানীয় খবরের কাগজ, একটা কাগজ তুলে দেখাল রবিন। দি ডেইলী টুইন লেকস। শহরের কোথায় কি ঘটছে না ঘটছে সব ছাপা হয়। এমন কি কার বাড়িতে কবে কজন মেহমান এল সে খবর পর্যন্ত। পুরানো কাগজ ঘাটলে বাড হিলারির ব্যাপারে কিছু বেরিয়েও যেতে পারে।

দারুণ আইডিয়া! আনন্দে হাত তালি দিয়ে জিনা বলল, চলো এখুনি যাই। সম্পাদক সাহেবকে আমি চিনি। আমি আসার খবর পেয়েই এসে দেখা করেছিলেন, কেন এসেছি, কদিন থাকব, নানা রকম প্রশ্ন। ছেপে দিয়েছেন পত্রিকায়। তোমরা যে এসেছ, সে খবরও নিশ্চয় পেয়েছেন। এখনও আসছেন না কেন তাই ভাবছি।

বাড়ি থেকে বেরোতে দেবেন তোমার চাচা? মুসার প্রশ্ন।

দেবে না মানে, একশো বার দেবে। খনি ছাড়া অন্য যে কোন জায়গায় যেতে দেবে।

কিন্তু যেতে দিলেন না উইলসন, স্রেফ মানা করে দিলেন। উপরন্তু তিন গোয়েন্দাকে নিয়ে গিয়ে লাগিয়ে দিলেন গাছ ছাঁটার কাজে, কড়া নির্দেশ দিয়ে রাখলেন, ডিনারের আগে কতখানি জায়গার গাছ ছাঁটতে হবে। বাড়িতে একা একা বসে আঙুল চোষা ছাড়া আর কিছু করার থাকল না জিনার।

পর দিন সকালে মেজাজ ভাল হয়ে গেল উইলসনের। জিনা যখন বলল তিন গোয়েন্দাকে শহর দেখাতে নিয়ে যেতে চায়, শুধু বললেন, সারাদিন কাটিয়ে এসো না।

না, কাটাব না, বলল জিনা। আর টুইন লেকসে আছেই বা কি, এত সময় দেখবে?

ধুলো-ঢাকা কাঁচা সড়ক ধরে হেঁটে চলল ওরা। পর পর কয়েকটা গাড়ি পাশ কাটাল ওদের, ম্যাকআরথারের বাড়ি যাচ্ছে। একটা গাড়ি থেমে গেল কাছে এসে। জানালা দিয়ে মুখ বের করল একজন, জিজ্ঞেস করল, ডেথ ট্র্যাপ মাইনে কি এদিক দিয়েই যেতে হয়?

হ্যাঁ, বলল জিনা।

থ্যাংকিউ, গাড়ি ছাড়তে গিয়ে কি মনে করে আবার থেমে গেল লোকটা। এই শোনো, তোমরাই কি লাশটা আবিষ্কার করেছ?

হয়েছে! আঁতকে উঠল রবিন। তাড়াতাড়ি জিনার হাত ধরে টান দিল, জিনা, এসো, জলদি। খবরের কাগজ।

এই শোনো, শোনো, গাড়ি থেকে ক্যামেরা হাতে নামছে লোকটা। এই, এক সেকেণ্ড, তোমাদের একটা ছবি

লাগবে না, হাত নেড়ে জবাব দিয়েই হাঁটার গতি বাড়াল মুনা।

প্রায় ছুটতে শুরু করল ওরা। আরেকটা গাড়ি পাশ কাটাল। কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাদের দেখছে আরোহীরা।

জানতাম এরকমই হবে, গতি কমাল না কিশোর। গতরাতে টেলিভিশনে খবরে দেখিয়েছে, লোকের কৌতূহল হবেই। সব পাগল। যেন আর কোন কাজ নেই দুনিয়ায়।

খবরদার, ছবি তুলতে দিয়ো না, জিনাকে হুঁশিয়ার করল মুসা। তোমার চাচা রেগে যাবেন।

শহরের প্রধান সড়কে বেশ ভিড়। পথের ধারে গাড়ির মেলা। কোর্ট হাউসের সামনে ঠেলাঠেলি করছে নারী-পুরুষ, ওদেরকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন শেরিফ, ঘেমে নেয়ে উঠেছেন, মুখ-চোখ লাল। এক সঙ্গে কজনের প্রশ্নের জবাব দেবেন?

রিপোর্টারের দল, বলল রবিন। স্টোরি চায়।

ডেইলী টুইন লেকসের অফিসটা এককালে মুদী দোকান ছিল। ওটাকেই সামান্য পরিবর্তন করে প্রেস বসানো হয়েছে। পথের দিকে মুখ করা রয়েছে বিশাল কাচের জানালা, দোকান যে ছিল বোঝাই যায়। ভেতরে গোটা দুই পুরানো নড়বড়ে ডেস্ক। একটাতে বিভিন্ন অফিশিয়াল কাগজ আর পত্রিকা-ম্যাগাজিনের তুপ। আরেকটার সামনে বসে আছেন রোগাটে এক তালপাতার সিপাই, শরীরের যেখানে সেখানে দড়ির মত ফুলে আছে মোটা মোটা রগ। লালচে চুল, তীক্ষ্ণ চেহারা। মহাউত্তেজিত, টাইপ রাইটারের চাবিগুলোতে ঝড় তুলেছেন, একনাগাড়ে টিপে যাচ্ছেন।

আরে, জিনা! দেখেই বলে উঠলেন সম্পাদক। এসো, এসো। তোমার কথাই ভাবছি। লেখাটা শেষ করেই যেতাম। শেরিফের কাছে শুনলাম, তুমিই লাশটা খুঁজে পেয়েছ।

হাসল জিনা। আপনিই স্যার একমাত্র লোক, যিনি খুশি হলেন। ম্যাকআরথার তো পারলে ঘাড় মটকে দিত। শেরিফ বলল, জেলে ভরবে। আর আমার নিজের চাচা, পুরো চোদ্দ ঘন্টা আটকে রাখল বাড়িতে।

জানি জানি। সব ঠিক হয়ে যাবে, ভেব না। তবে এখন আর খনির কাছাকাছি যেও না। তা, ইন্টারভিউ দিতে আপত্তি আছে? তিন গোয়েন্দাকে দেখালেন। তোমার বন্ধুরা না? লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে এসেছে?

শুনে ফেলেছেন তাহলে। এ-হলো কিশোর পাশা, ও মুসা আমান। আর ও রবিন মিলফোর্ড, ওর বাবা লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের রিপোর্টার।

আহ্ পত্রিকা একখান! দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সম্পাদক।

ঠিকই বলেছেন, স্যার, পার্টিশনের ধার দিয়ে সরে যেতে লাগল রবিন, লক্ষ্য ওপাশের আধো অন্ধকার বড় ঘরটা। একটা ছোট রোটারি প্রেস আর লাইনোটাইপ মেশিন চোখে পড়েছে তার। ধুলোয় ভারি হয়ে আছে বাতাস, ছাপার কালির কড়া গন্ধ।

ঘুরে দেখতে চাও? জিজ্ঞেস করলেন সম্পাদক।

দেখালে খুব খুশি হব, স্যার, বলল রবিন। পত্রিকার কাজ খুব ভাল লাগে আমার। লাইনোটাইপটা কি আপনিই চালান?

কম্পোজ থেকে শুরু করে সবই আমি করি। তবে কাজ বিশেষ থাকে না। এ-হপ্তার কথা অবশ্য আলাদা। জিনা, বসো ওখানটায়। হ্যাঁ, এবার খুলে বলো তো সব। রবিন, তুমি গিয়ে দেখো। লাইট জ্বেলে নিও।

মুসা আর কিশোরও চলল রবিনের সঙ্গে। সুইচ খুঁজে বের করে টিপে দিল কিশোর। সিলিঙে লাগানো উজ্জল ফুরোসেন্ট আলোয় ভরে গেল ঘর। এক ধারে দেয়াল ঘেঁষে রয়েছে তাক, তাতে বড় বড় ড্রয়ার, প্রতিটি ড্রয়ারের হাতলের নিচে সাদা রঙে লেখা রয়েছে তারিখ, মাস, বছর।

পুরানো ইস্যুগুলো এদিকে, রবিন দেখাল।

পাঁচ বছর আগেরগুলো দরকার, কিশোর বলল।

কয়েকটা ড্রয়ার নামিয়ে নিল ওরা। খনির মুখ যখন বন্ধ করা হয়, তখনকার কপি আছে ওগুলোতে।

প্রত্যেকটা কপি দেখবে, বলল কিশোর। হেডলাইনগুলো পড়বে। আমাদের দরকারে লাগতে পারে এমন কোন কিছুই যেন চোখ এড়িয়ে না যায়।

পত্রিকার বোঝা নিয়ে মেঝেতেই পা ছড়িয়ে বসল ওরা। পাশের ঘর থেকে শোনা যাচ্ছে জিনার কথা।

ঘেঁটে চলেছে ওরা পত্রিকা। বিরক্তিকর কাজ। মজার কিছুই নেই, অতি সাধারণ কভার, কার বাড়িতে আগুন লেগেছিল, শেরিফ কবে নতুন গাড়ি কিনলেন, কোন আত্মীয় কবে টুইন লেকসে কার বাড়িতে বেড়াতে এল, ইত্যাদি। বাড হিলারির নাম-গন্ধও নেই। তবে ২৯ এপ্রিলের পত্রিকার এক জায়গায় এসে থমকে গেল কিশোর, বোধহয় কিছু পেলাম।

কি? জিজ্ঞেস করল রবিন।

পুরো এক মিনিট নীরবে পড়ল কিশোর। মুখ তুলে বলল, বাড়ি থেকে বেরিয়ে হারিয়ে গিয়েছিল পাঁচ বছরের একটা মেয়ে, তিন ঘণ্টা নিখোঁজ হয়ে ছিল। খুঁজতে খুঁজতে গিয়ে শেষে ডেথ ট্র্যাপ মাইনে পাওয়া গেছে তাকে। খনিতে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়েছিল মেয়েটা। আঁতকে উঠল লোকে, টনক নড়ল, মারাও যেতে পারত মেয়েটা। চাদা তুলতে শুরু করল তার বাবা-মা, খনির মুখ ভালমত বন্ধ করার জন্যে।

খুঁজল কিশোর। মে-র ছয় তারিখের পেপারটা কোথায়? দেখো তত তোমার ওখানে?

এই যে, বের করল রবিন। হ্যাঁ, পয়লা পাতায়ই আছে খনির খবর। টুইন লেকস মার্কেটের মালিক দোকানের সামনে পা গ্যালনের একটা ড্রাম রেখে দিয়েছিল, তার গায়ে লেখা ছিল? খনি বন্ধ করার জন্যে মুক্তহস্তে দান করুন। দুদিনেই লোহার গ্রিল কেনার টাকা উঠে গেল। লর্ডসবুর্গ থেকে অর্ডার দিয়ে বানিয়ে আনা হলো গ্রিল। ঠিক হলো, মে-র চোদ্দ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করা হবে খনির মুখ!

তেরো তারিখের পত্রিকায় আরও বিস্তারিত লেখা রয়েছে, কি ভাবে বন্ধ করা হবে মুখটা। প্রচণ্ড উত্তেজনা গিয়েছে কদিন ছোট্ট শহরটায়। অনেক তোড়জোড় করে নির্দিষ্ট দিনে সিমেন্ট গেঁথে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে গ্রিল—এসব কথা লেখা আছে। বিশ তারিখের পত্রিকায়।

বাপরে বাপ, যেন আমেরিকার জন্মদিন গেছে, বলল মুসা।

সম্পাদক সাহেব কি বললেন শুনেছ তো, রবিন মনে করিয়ে দিল। কাজ তেমন নেই তার। হোট শহর, হাতে গোণা কয়েকজন লোক, ওই খনি বন্ধ করার ব্যাপারটাই একটা বিরাট ঘটনা।

টুইন লেকসবাসীরা মিছিল করে যাচ্ছে খনির দিকে, ছবিটার দিকে চেয়ে রইল। রবিন। হঠাৎ বলে উঠল, আরে, এই তো। চার পৃষ্ঠায়। খনির সীমানার মধ্যে সেদিন পরিত্যক্ত একটা গাড়ি পাওয়া গিয়েছিল। একটা শেভ্রলে সেডান। পুলিশ পরে জেনেছে, লর্ডসবুর্গের সুপার মার্কেট থেকে তিন দিন আগে চুরি হয়েছিল ওটা। এই যে, শেরিফ থ্যাচারের মন্তব্যও কোট করা হয়েছে। তার ধারণা, টুইন লেকসের কোন তরুণের কাণ্ড। বিনে পয়সায় তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার জন্যে গাড়ি চুরি করেছে। হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন, এরপর যদি এ-ধরনের ঘটনা ঘটে, টুইন লেকসের সব উজ্জ্বল তরুণকে নিয়ে হাজতে ঢোকাবেন।

মুখ তুলল রবিন।

নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে কিশোর, গভীর ভাবনায় মগ্ন। বিড় বিড় করল, লর্ডসবুর্গ থেকে চুরি…পাওয়া গেল খনির কাছে। খনির ভেতরে তখন এক চোর, সে-ই চুরি করেছিল বললে অতিকল্পনা হয়ে যাবে? কোন কারণে খনির ভেতরে ঢুকেছিল…আর বেরোতে পারেনি।

তা না হয় হলো, কথাটা ধরল মুসা, কিন্তু তাতে আমাদের কি লাভ? আমরা তে যেখানে ছিলাম সেখানেই রয়ে যাচ্ছি। ধরে নিলাম, স্যান ফ্রানসিসকো থেকে পালিয়ে লর্ডসবুর্গে এসেছিল হিলারি, সেখান থেকে গাড়ি চুরি করে নিয়ে এসেছে টুইন লেকসে। কিন্তু কেন? কিসের তাগিদে?

মুখ বাকিয়ে কাঁধ ঝাঁকাল শুধু কিশোর।

পুরানো কাগজ ঘেঁটে চলল রবিন। এই রহস্যের সঙ্গে যোগাযোগ আছে, তো কিছুই আর চোখে পড়ছে না। হ্যারি ম্যাকআরথারের উল্লেখ নেই। জানা গেল, ওই বছরেরই অক্টোবর মাসে টুইন লেকসে এসেছিল মিসেস রোজি ফিলটার। পরে দুটো সংখ্যায় বিস্তারিত জানানো হয়েছে, কোথায় কবে কতখানি জায়গা কিনেছে মহিলা। জায়গাগুলো ছিল খনির সম্পত্তি।

ভাবছি, স্যান ফ্রানসিসকো থেকে পালিয়ে এসে কতদিন লর্ডসবুর্গে ছিল হিলারি? আনমনে বলল কিশোর।

লাইনোটাইপ মেশিনের গায়ে হেলান দিল মুসা। কে জানে? পুলিশকে না জানিয়ে পালিয়ে এসে আইন অমান্য করেছে সে, ঠিক। তবে সেটা পাঁচ বছর আগে। এতদিনে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে নিশ্চয় পরিস্থিতি।

হ্যাঁ, মাথা দোলাল কিশোর। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, বিনা কারণেই এসেছিল এখানে। খনিতে ঢুকেছিল। এমন একটা খনি, যেটা কিনেছে হ্যারি ম্যাকআরথার। লাশটা যে ছিল খনিতে, কেন জানল না সে? দুজনের মাঝে, ঘটনাগুলোর মাঝে কি কোন যোগসূত্র রয়েছে? একজন জেলফেরত দাগী আসামী আর একজন রহস্যময় ধনীর মাঝে? একটাই কাজ এখন করার কাছে আমাদের।

কী? আগ্রহে সামনে ঝুঁকল মুসা।

সময়কে পিছিয়ে নিতে পারি আমরা।

হাঁ হয়ে গেল মুসা। কি আবল-তাবল বকছ? এই কিশোর?

অ্যাঁ? সংবিৎ ফিরল যেন কিশোরের। হ্যাঁ, সময়কে পিছিয়ে নিতে পারি। হিলারির অতীত উদঘাটনের চেষ্টা করতে পারি। লর্ডসবুর্গে থেকে থাকলে, নিশ্চয় রাতে ঘুমাতে হয়েছে তাকে। কোথায়? এত বছর পর জানার চেষ্টা করা কঠিন, হয়তো বৃথাই হবে, তবু চেষ্টা করতে ক্ষতি নেই। পুরানো খবরের কাগজ আর টেলিফোন ডিরেকটরি ঘেটে দেখতে পারি। হ্যাঁ, এই একটাই কাজ করার আছে এখন আমাদের।

শেষ বিকেলে বাড়ি ফিরল ওরা।

বারান্দায় অস্থির ভাবে পায়চারি করছেন উইলসন। গাড়ি বারান্দায় তিনটে গাড়ি। জটলা করছে কয়েকজন লোক, কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে।

কারও সঙ্গে কথা বলবে না আমার ভাস্তি, রাগ করে বললেন উইলসন। এমনিতেই ও বদমেজাজী, তার ওপর এই ঘটনায় মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেছে… ছেলেদেরকে দেখে থেমে গেলেন। জিনা, ঢোকো। সোজা ওপরতলায়। লাফ দিয়ে সিঁড়ির কাছে এসে জিনার বাহু ধরে টেনে নিয়ে ঠেলে দিলেন ঘরের ভেতরে। পিঠে ধাক্কা দিয়ে ছেলেদেরও ঢুকিয়ে দিলেন তাড়াতাড়ি। নিজেও ঢুকে দড়াম করে বন্ধ করে দিলেন দরজা।

রিপোর্টার না জোক, লাল হয়ে গেছে তার মুখ। একটা কথাও বলবে না ওদের সঙ্গে।

কেন, কি হবে? প্রশ্ন না করে পারল না জিনা। আমি তো এখন মস্ত বড় খবর, তাই না?

কি হবে? তোমার মা শুনলে আমার মুণ্ডু কেটে নেবে, এই হবে।

আগে হুঁশিয়ার করলে না কেন? আমি তো সব বলে এসেছি সম্পাদক পিটারসনকে।

পিটারসনের কথা আলাদা, ছেলেদের অবাক করে দিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললেন উইলসন। সে চালায় একটা অখ্যাত পত্রিকা। জাপানে বসে এটা পাবে না তোর মা, জানবেও না কিছু। যা বলছি, শুনবি। বাড়ি থেকে একদম বেরোবি না আজ। কালও যদি জোকগুলো না যায়, কালও বেরোনো চলবে না।

আংকেল, কিশোর বলল, কাল আমরা লর্ডসবুর্গে যেতে চাই।

কেন?

পকেট থেকে নুড়িটা বের করল কিশোর, আগের দিন খনিতে যেটা কুড়িয়ে পেয়েছিল। দেখিয়ে বলল, জুয়েলারকে দেখাব।

হাসলেন উইলসন। সোনার টুকরো মনে করেছ? হতাশ হবে। ডেথ ট্র্যাপে সোনা নেই। যেতে পারো, তবে কাল নয়। এ-হপ্তায়ই আমি যাব, তুমি আর জিনা যেতে পারবে তখন। চাইলে, চারজনেই যাবে। তোমাদেরকে রেখে যাওয়ার চেয়ে নিয়ে যাওয়াই নিরাপদ।

রিপোর্টারদের বিদায় করার জন্যে আবার বেরোলেন উইলসন।

সারাটা বিকেল বই পড়ে আর আলোচনা করে কাটাল ওরা। খানিক পর পরই বাংরুমের লাগোয়া ঝোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাকাল ম্যাকআরথারের বাড়ির দিকে। জিনা এসে জানাল একবার, শটগান হাতে গুহা পাহারা দিচ্ছে ম্যাকআরথার। তার হারামী কুত্তাটা দর্শক তাড়াতে তাড়াতে এতই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, ঘেউ ঘেউ করারও আর শক্তি নেই। লম্বা হয়ে মাটিতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

রাতে সকাল সকাল খেয়ে বাংরুমে এসে ঢুকল ছেলেরা। ম্যাকআরবারের জানালায় আলো দেখতে পেল। কিন্তু ওরা বিছানায় ওঠার আগেই নিভে গেল আলো। একটু পরে মিসেস ফিলটারের বাড়ির আনোও নিভে গেল।

সবাই যেন আজ বেশি ক্লান্ত, বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে বলল মুসা। আমিও। কিন্তু কেন বুঝতে পারছি না।

উত্তেজনা, ব্যাখ্যা করল রবিন। প্রচণ্ড উত্তেজনায় দ্রুত ক্ষয় হয় শরীর, কাহিল হয়ে পড়ে। এখানকার সবার বেলায়ই তো আজ এই ঘটনা ঘটেছে। তাছাড়া কোন কারণে হঠাৎ বেশি চমকে গেলেও পরে অবসাদ আসে শরীরে। কাল খনিতে যা দেখলাম, ভয়ানক দৃশ্য। বড় কষ্ট পেয়ে মরেছে বেচারা।

কিন্তু কি করছিল সে ওখানে? সারা দিন নিজেকে অনেকবার প্রশ্নটা করেছে কিশোর। লর্ডসবুর্গে হয়তো কোন জবাব মিলবে।

জুয়েলারকে পাথর দেখাতে সত্যি যাচ্ছ? রবিন জিজ্ঞেস করল।

ক্ষতি কি? এটা একটা ভাল ছুতো, আংকেলের কাছ থেকে সরে যাওয়ার। যদি ঘুণাক্ষরেও টের পেয়ে যান, খনি-রহস্যের তদন্ত করছি আমরা, মুহূর্তের জন্যে কাছছাড়া করবেন না আর।

জিনা কিন্তু হিলারিকে নিয়ে মোটেও ভাবছে না। তার একটাই লক্ষ্য, ম্যাকআরথারকে ভণ্ড প্রমাণ করা।

কিন্তু লাশটাকে কেন আগে দেখল না ম্যাকআরথার? প্রশ্নটা খালি খোচাচ্ছে। আমাকে। নিজের খনি একটু ঘুরে দেখার কৌতুহলও হলো না?

নানারকম প্রশ্ন মনে নিয়ে একে একে ঘুমিয়ে পড়ল তিনজনেই।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল মুসার। অন্ধকারেই ভ্রুকুটি করে কান পাতল। কিছু একটা নড়ছে বাইরে, জানালার নিচে কোথাও। আরেকবার শোনা গেল, শব্দটা, মচমচ, ক্যাঁচকোচ। কনুয়ের ওপর ভর রেখে উঠল সে।

কিশোর, এই কিশোর? ফিসফিস করে ডাকল। রবিন? শুনছ?

উঁ…কি? পাশ ফিরল রবিন।

গোলাঘরের দরজা খুলল কে জানি, উঠে পা টিপে টিপে জানালার দিকে এগোল মুসা। চৌকাঠের ওপর দিয়ে ঝুঁকে তাকাল। পাশে এসে দাঁড়াল অন্য দুজন।

কই, দরজা তো বন্ধ, রবিন বলল।

পর মুহূর্তেই আলো দেখা গেল গোলাঘরের জানালার ময়লা কাচে, নাচছে। আলোটা মৃদু। নিভে গেল। জ্বলল আবার।

দেশলাই জ্বালছে, কিশোর বলল! চলো তো, দেখি।

দ্রুত শার্ট-প্যান্ট আর জুতো পরে নিল ওরা। নিঃশব্দে নেমে এল সিঁড়ি বেয়ে। সাবধানে খুলল সামনের দরজা।

চাঁদ ডুবে গেছে। বেশ অন্ধকার। আগে আগে এগোল গোয়েন্দাপ্রধান, তাকে অনুসরণ করল সহকারীরা। গোলাঘরের দরজার কাছে প্রায় পৌঁছে গেছে, এই সময় আলগা পাথরে পা পড়ে পিছলাল রবিন, গোড়ালি গেল মচকে, জোরে চিৎকার দিয়ে বসে পড়ল সে।

সঙ্গে সঙ্গে নিভে গেল ঘরের আলো। জানালা অন্ধকার।

খাইছে! জোরে কথা বলতে ভয় পাচ্ছে মুসা।

একটা পাথরে বসে গোড়ালি ডলতে শুরু করল রবিন, চোখ গোলাঘরের দিকে। খানিক পরেই উঠে দাঁড়াল সে। আবার এগোল তিনজনে। আস্তে করে দরজার বাইরে খিলে হাত রাখল কিশোর, মৃদু খড়খড় করে উঠল ওটা।

ঝটকা দিয়ে খুলে গেল দরজা। বুকে জোর ধাক্কা খেয়ে উল্টে মাটিতে পড়ে গেল কিশোর। মোটাসোটা মূর্তিটাকে দেখেই লাফিয়ে একপাশে সরে গেল মুসা। ওদের মাঝখান দিয়ে ছুটে চলে গেল লোকটা, হারিয়ে গেল গাড়ি পথের ওপাশের ক্রিস্টমাস খেতে।

কে? বাড়ির ভেতর থেকে ডাক শোনা গেল। কে ওখানে?

উঠে দাঁড়াল কিশোর। জবাব দিল, গোলাঘরে চোর ঢুকেছিল।

তাই নাকি? সর্বনাশ! বললেন উইলসন। এখুনি শেরিফকে ফোন করছি।

ম্যাকআরথারের বাড়ির দিকে হাত তুলে বলল মুসা, ব্যাট। ওদিকে গেছে।

কান পেতে রয়েছে ছেলেরা, কিন্তু আর কোন শব্দ শোনা গেল না। অন্ধকার খেত, গাছগুলো নিথর।

বেশি দূর যায়নি, বলল কিশোর।

ঢোক গিলল মুসা, পায়ে পায়ে এগোেল খেতের দিকে। কান খাড়া; কোন গাছ নড়ছে কিনা, অন্ধকারে বোঝার চেষ্টা করছে। তার পেছনেই রয়েছে কিশোর আর রবিন। আরেকটু এগিয়ে আস্তে করে বায়ে সরে গেল কিশোর, রবিন সরলো জানে। খেতে ঢুকে পড়ল মুসা, খুব সাবধানে এগোচ্ছে যাতে নিচের দিকের কোন ডালে পা বেধে হুমড়ি খেয়ে না পড়ে।

হঠাৎ থেমে গেল মুসা! দুরুদুরু করছে বুক, কানের কাছে শুনতে পাচ্ছে যেন রক্তের দ্রুত সঞ্চালন। আরেকটা শব্দ শুনতে পাচ্ছে সে, জোরে নিঃশ্বাস ফেলার আওয়াজ। জোর করে শব্দটা চেপে রাখতে চাইছে যে লোকটা। দৌড়ে এসে হাঁপিয়ে পড়েছে। রয়েছে কাছেই।

স্থির হয়ে গেছে মুসা, শুনছে ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস। তার কাছ থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে গাছের আড়ালে রয়েছে, হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারে। সঙ্গীদের ডাকার জন্যে মুখ খুলতে গিয়েও থেমে গেল সে। চোরটা ভাগবে তাহলে।

এই সময় গাড়ির আওয়াজ শুনে হাসি ফুটল মুসার মুখে। শেরিফ ছুটে আসছেন। চোরটাকে পাকড়াও করতে পারবে এবার।

গেটের কাছে মোড় নিল গাড়ি, হেডলাইটের আলো ঘুরে এসে পড়ল মুসা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। এক দৌড়ে গিয়ে আরেকটা ঘন ঝাড়ের ভেতরে ঢুকে গেল চোর। লাফিয়ে উঠে তার পিছু নিল মুসা। কিন্তু দুই পা এগিয়েই থেমে গৈল। ওপরের দিকে ভোলা একটা হাত দেখতে পাচ্ছে, নড়তে শুরু করেছে। হাতটা।

ঝট করে নিচু হয়ে গেল মুসা। শাঁ করে তার মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেল ধারাল লম্বা ফলা, একটা গাছের মাথা দু-টুকরো হয় গেল, আরেক মুহূর্ত দেরি করলে গাছের পরিণতি হত মুসার।

গাছপালা ভেঙে মাড়িয়ে আবার দৌড় দিল চোর।

সোজা হলো মুসা। হাঁটু কাঁপছে। বড় বাঁচা গেছে, আরেকটু হলেই আজ…আর ভাবতে পারল না সে।

পাশে এসে দাঁড়াল কিশোর।

ভোজালী! কোনমতে বলল মুসা। গাছ কাটার ছুরি! আরেকটু হলেই দিয়েছিল আমার মুণ্ডু আলাদা করে!

সঙ্গে করে এক যুবক সহকারীকে নিয়ে এসেছেন শেরিফ, নাম ডিক। সব কথা মন দিয়ে শুনল ওরা, তার পর জোরাল একটা টর্চ নিয়ে চোর খুঁজতে বেরোল। ক্রিস্টমাস খেতে পায়ের ছাপ পাওয়া গেল, মুসা যেখানে দাঁড়িয়েছিল তার কাছেই। ম্যাকআরবারের সীমানার ভেতরে অন্য অনেকগুলো ছাপের সঙ্গে গিয়ে মিশেছে। চোরের ছাপ। আর অনুসরণ করা গেল না, কোনটা যে কার বোঝাই মুশকিল।

দোতলায় দাঁড়িয়ে দেখছে ছেলেরা।

ম্যাকআরথারকে ডেকে তুলে তার কেবিনে ঢুকলেন শেরিফ আর তার সহকারী। কুকুরটা চেঁচাচ্ছে। কিন্তু কান দিল না ওরা, তিনজনে গিয়ে ঢুকল খনিতে।

মিসেস ফিলটার জেগে গেছেন, আলো দেখা যাচ্ছে তার জানালায়।

মহিলার বাড়িতেও ঢুকলেন শেরিফ, অব্যবহৃত ঘরগুলোতে ঢুকে দেখলেন।

ঘণ্টাখানেক পরে র‍্যাঞ্চহাউসে ফিরে এলেন শেরিফ আর ডিক।

চোরটা, উলইসনকে বললেন শেরিফ, পাহাড়ের ওদিকে চলে গেছে। অন্ধকারে খুঁজে বের করা যাবে না, তাই আর পিছু নিলাম না। রিপোর্টারদের কেউও হতে পারে। কিছু একটা ঘটলেই পঙ্গপালের মত এসে হেঁকে ধরে। কিন্তু। ছুরিটা কেন নিল বুঝলাম না।

সহকারীকে নিয়ে শহরে ফিরে গেলেন শেরিফ।

দরজা বন্ধ করলেন উইলসন, নিচ তলায় জানালাগুলোও সব বন্ধ করে দিলেন।

সকালে হো-হো হাসি শুনে ঘুম ভাঙল ছেলেদের। নিচে রান্নাঘরে নেমে দেখল বেশ জমিয়ে নিয়েছে জিনা আর ভিকি। টেবিলে বসে কফি খাচ্ছে জিনা।

কি ব্যাপার? খুব আনন্দে আছ মনে হচ্ছে? হেসে জিনাকে বলল কিশোর।

আনন্দই তো, জবাব দিল ভিকি। পুরানো দিনের কথা মনে করে দিচ্ছে। পঁয়তাল্লিশ বছর আগে টুইন লেকসে এ-রকম উত্তেজনাই ছিল। শনিবারে এমন কোন রাত যেত না, যেদিন মারপিট হত না। শেষে শেরিফকে এসে থামাতে হত।

খালা, জিনা বলল শিও ম্যাকআরখারকে দেখেছু?

দেখব না মানে? হেসে বলল ভিকি। ওসব ভোলা যায় নাকি?

সত্যি এখানে জন্মেছে?

তবে কোথায়? কোর্ট হাউসের কাছে ছোট একটা সবুজ বাড়িতে থাকত তার মা-বাবা। তার বাপ ছিল খনির ফোরম্যান। খনির কাজে ওস্তাদ। হ্যারির পরে আর কোন শিশুকে জন্মাতে দেখিনি এ-শহরে, তার আগেই চলে গিয়েছিলাম। খনিরও। তখন শেষ দশা, লোকে গাঁটরি গোছাতে শুরু করেছে। অনেক দিন পর আমি ফিরেছি। হ্যারিও ফিরল। তার বাবা-মা কেমন, কোথায় আছে, টুইন লেকস থেকে যাওয়ার পর কেমন কেটেছে, গিয়ে জিজ্ঞেস করব ভাবছি একদিন, সময়ই করে উঠতে পারি না। তাছাড়া হ্যারিও খুব ব্যস্ত। সারাক্ষণ লাল ট্রাকটা নিয়ে ঘোরে, কি করে, কে জানে। আজ ভোরে দেখলাম, তাড়াহুড়ো করে কোথায় যাচ্ছে, মাথায় সেই অদ্ভুত হ্যাট। কেন যে পরে, বুঝি না।

রাস্তায় গাড়ির শব্দ হলো।

দোতলায় ছুটল জিনা। নেমে এসে জানাল, ম্যাকআরথার ফিরেছে। সূঙ্গে আরও দুজন লোক। মনে হলো মেকসিকান,বলল সে। আবার কোন্ মতলব?

জিজ্ঞেস করলে না কেন? ভিকি বলে উঠল।

করলেই যেন বলবে। তাছাড়া ওকে বিরক্ত করলে চাচা যাবে রেগে। বলেছে, আমাকে ঘরে তালা দিয়ে রাখবে।

পারবে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে আমার, বলে, কোয়ার্টারের দিকে চলে গেল ভিকি।

নাস্তা সেরে খেতে কাজ করতে চলল তিন গোয়েন্দা। বড় একটা খেতের গাছ সব ছেটে আরেকটায় এসে ঢুকল। জিনাও এসে হাত লাগাচ্ছে মাঝে মাঝে, তবে ম্যাকারবারের বাড়ির দিকেই তার খেয়াল। কমেটের পিঠে চড়ে বারবার গিয়ে টু মেরে আসছে ওদিক থেকে। খবর জানাচ্ছে বন্ধুদেরকে। খনিমুখের কাছেই কাঠের ছোট একটা ছাউনি আছে, সেটার দরজায় নাকি এখন ঝকঝকে নতুন তালা ঝুলছে। ম্যাকআরথার তার বিচিত্র পোশাক আর হ্যাট পরে গাড়িতে করে ঘুরছে, সাংঘাতিক ব্যস্ত।

সেদিন নতুন কিছু ঘটল না।

দ্বিতীয় দিনে শ্রমিকেরা এল। ট্রাকে করে নিয়ে এসেছে সিমেন্টের বস্তা, স্টীলের খুঁটি। ম্যাকআরথারের সীমানা ঘিরে আট ফুট উঁচু বেড়া দিতে শুরু করল।

দুপুরে খাওয়ার সময় জিনা বলল, বাতিল একটা খনির জন্যে বেহুদা খরচ করছে লোকটা। ওটা নিয়ে কে মাথা ঘামাতে যাচ্ছে?

তুমি যাচ্ছ, সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিলেন তার চাচা। পাগল হয়ে আছ ভেতরে ঢোকার জন্যে। জোকগুলোর কথা বাদই দিলাম। করবে কি বেচারা? ক্রিস্টমাস গাছের প্রতি লোকে এত আগ্রহ দেখালে আমিও বেড়া দিতে বাধ্য হতাম।

খাওয়ার পর রাস্তার ধারের খেতে আগাছা বাছতে চলে গেলেন উইলসন।

চেয়ারে হেলান দিয়ে ভ্রুকুটি করল কিশোর। ক্রিস্টমাস গাছের ব্যাপারে যদি আগ্রহী না-ই হয়, গোলাঘরে ঢুকল কেন চোর?

কেউ জবাব দিল না।

এঁটো বাসনগুলো ঠেলে দিয়ে হাত ধুয়ে বেরিয়ে এল ওরা। গোলাঘরের দিকে চলল। ভালমত দেখবে।

কিচ্ছু নেই, মুসা বলল। খড়, কিছু যন্ত্রপাতি, হোস পাইপ আর একটা পুরানো অচল গাড়ি।

হয়তো ছুরির দরকার পড়েছিল ব্যাটার। খুব খারাপ কথা, রবিন মন্তব্য করল। যা একেকটা ছুরি, এক কোপে ধড় থেকে কল্লা নামিয়ে দেয়া যাবে। ওই জিনিস কার দরকার পড়ল?

গোলা থেকে বেরোল ওরা। গেটের সামনে দিয়ে চলে গেল ম্যাকআরথারের লাল শেভি সুবারব্যান। খনির দিকে চলেছে। ম্যাকআরথারের পাশে বসে আছে আরেকজন, হালকা সামার-সুট আর সাদা হ্যাটে বেশ ভান্ত মনে হচ্ছে।

দৌড়ে র‍্যাঞ্চ হাউসে চলে এল ছেলেরা, দুপদাপ করে সিঁড়ি বেয়ে এসে উঠল দোতলায়। বাকরুমের ঝোলা বারান্দায় এসে দাঁড়াল। ম্যাকআরথারের বাড়িতে কি ঘটে দেখার জন্যে উদগ্রীব।

শ্রমিক দুজন এখন বেড়া লাগাচ্ছে না। একজন বেরিয়ে এল খনির ভেতর থেকে, একটা ঠেলাগাড়ি ঠেলে নিয়ে, তাতে পাথর আর মাটি বোঝাই। কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে থামাল ম্যাকআরথার, গাড়ি থেকে এক মুঠো মাটি-পাথর তুলে নিয়ে মেলে ধরল তার সঙ্গীর চোখের সামনে। তারপর কিছু বলল শ্রমিককে।

গাড়িটা এক জায়গায় রেখে ওয়ার্কশপ বিল্ডিঙে চলে গেল শ্রমিক।

অতিথিকে নিয়ে ম্যাকআরথার ঢুকল খনিতে।

মিনিটখানেক পর চাপা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল খনির ভেতর থেকে। কয়েক সেকেণ্ড দূরাগত মেঘ গর্জনের মত গুমগুম করে মিলিয়ে গেল শব্দের রেশ।

আবার গুলি করছে, চেঁচিয়ে উঠল জিনা।

গুলি না, মাথা নাড়ল কিশোর। তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। ডিনামাইট।

বারান্দায় বেরিয়ে এলেন মিসেস ফিলটার। ম্যাকআরথারের বাড়ির দিকে নজর।

খনিমুখে দেখা দিল ম্যাকআরথার আর তার অতিথি। পেছনে বেরোল দ্বিতীয় শ্রমিকটা। সে-ও আরেকটা ঠেলাগাড়ি ভরে মাটি আর পাথর নিয়ে বেরিয়েছে।

খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে কয়েক মিনিট কথা বলল ম্যাকআরথার আর তার সঙ্গী। তারপর লাল ট্রাকে চড়ে এগিয়ে এল পথ ধরে।

বারান্দায় একই ভাবেড়িয়ে আছেন মিসেস ফিলটার, তার সামনে দিয়েই গেল ট্রাক, কিন্তু ফিরেও তাকাল না ম্যাকআরথার।

ট্রাকটা চলে যাওয়ার পর রাস্তা পেরিয়ে র‍্যাঞ্চ হাউসের দিকে এগিয়ে এলেন মিসেস ফিলটার, অধৈৰ্য্যভাবে নাড়ছেন হাতের চুড়ি।

তাড়াতাড়ি নিচে নেমে এল ছেলেরা। দরজা খুলে দিল জিনা।

কাণ্ড দেখেছ? যেন জিনাকে বলার জন্যেই এসেছেন মিসেস ফিলটার। খনিতে আবার কাজ শুরু করেছে মিস্টার ম্যাকআরথার।

রান্নাঘর থেকে বেরোল ভিকি। কিন্তু কি লাভ? ওই খনিতে আর কিছু নেই। সব রূপা শেষ।

কিন্তু তা-ও তো কাজ শুরু করল। ডিনামাইট ফাটাল। শোনোনি? আমার ভুল হতে পারে না। ওই শব্দ জীবনে এত বার শুনেছি, কোনদিন ভুলব না।

খেলাধুলা করছে আরকি, হালকা গলায় বলল মুসা। কিংবা টুরিস্ট আকৃষ্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছে। জানেনই তো, পুরানো ভূতুড়ে শহর কিনে ঠিকঠাক করে ব্যবসা ফেঁদে বসে লোকে। এ-ও হয়তো তেমনি কিছু।

অস্বস্তি ফুটল মিসেস ফিলটারের চোখে। জায়গাটার বারোটা বাজাবে লোকটা। শান্তি তাহলে শেষ।

তার জায়গা, সে যা খুশি করবে, ঠোঁট বাঁকাল জিনা, আসলে চাচাকে ভেঙাল, উইলসনও এমনি করেই বলেছিলেন।

বিরক্তি চাপতে পারলেন না মিসেস ফিলটার, নাক দিয়ে বিচিত্র একটা শব্দ করে ফিরে চললেন বাড়িতে।

আমার বিশ্বাস হয় না টুরিস্টদের জন্যে খনি ওপেন করতে যাচ্ছে ম্যাকআরথার, বলল কিশোর। টুইন লেকস অনেক দূর, রাস্তাও ভাল না।

কি করছে তাহলে? প্রশ্ন করল মুসা।

হাসল কিশোর। ওর মেকসিকান শ্রমিকদের জিজ্ঞেস করে দেখব। ম্যাকআরথার নেই এখন। চলো তো যাই।

মিনিট কয়েক পর নতুন ভোলা বেড়ার কাছে এসে দাঁড়াল ওরা। শ্রমিকদের ডাকল। ইংরেজিতে কথা বলল ওরা। জবাব নেই। ভাঙা ভাঙা প্যানিশ জানে কিশোর, চেষ্টা করে দেখল। তা-ও সাড়া মিলল না। সন্দিগ্ধ চোখে তাদের দিকে তাকাচ্ছে মেকসিকান দুজন।

হতাশ হয়ে ফিরে এল ওরা। ভিকির সাহায্য চাইল।

তুমি তো মেকসিকোর ভাষা জানো, ভিকিখালা, মুসা বলল। গিয়ে বলে দেখো না একটু। তোমাকে হয়তো বিশ্বাস করবে।

বেশ আগ্রহ নিয়েই গেল ভিকি। ফিরে এল একটু পরেই। ভার দিকে নাকি তাকিয়েও দেখেনি শ্রমিকেরা, তার ওপর রয়েছে কুকুরটা। দেখা মাত্র চিনে ফেলেছে শত্রুকে, ঘেউ ঘেউ করে তেড়ে এসেছে। চেঁচামেচির মাঝেও শ্রমিকদের নিজেদের আলোচনার একটা শব্দ কানে এসেছে, ওরো।

ওরো? ভিকির উচ্চারণের প্রতিধ্বনি করল কিশোর। মানে স্বর্ণ! ম্যাকআরথার কি সোনা খুঁজছে নাকি খনিতে?

কিন্তু ওটা তো রূপার খনি? প্রতিবাদ করল ভিকি।

সোনা আর রূপা অনেক সময় কাছাকাছিই পাওয়া যায়, পকেট থেকে নুড়িটা বের করল কিশোর। জিনা, তোমার চাচা কবে লর্ডসবুর্গ যাবেন, কিছু বলেছেন?

আগামীকাল, জানাল জিনা।

কালই বোঝা যাবে, কি মেশানো আছে নুড়িটাতে।

১০

লর্ডসবুর্গে পোস্ট অফিসের সামনে গাড়ি পার্ক করলেন উইলসন। স্যান জোসেতে চারার অর্ডার দিয়েছিলাম, বললেন তিনি। ওগুলো ডেলিভারি নিয়ে বিল্ডারস সাপ্লাই কোম্পানিতে যাব, কাজ আছে। ঠিক একটায় এখানে থাকব, তোমরাও

থেকো। লাঞ্চ সেরে তারপর বাড়ি রওনা হব।

চাচা, ওদের সঙ্গে আমি যাই? জিনা অনুরোধ করল।

যাবে? ঠিক আছে, যাও। কোন রকম গোলমাল পাকিও না আবার। এখানে অবশ্য খনি-টনি কিছু নেই, কিন্তু তোমাকে বিশ্বাস কি। কখন যে কোথায়… বাক্যটা শেষ করলেন না তিনি।

আর কিছু না বলে পোস্ট অফিসে ঢোকার দরজার দিকে এগোলেন উইলসন।

আগে নুড়িটা দেখাচ্ছ তো? কিশোরকে জিজ্ঞেস করল মুসা। তাতে সময় লাগবে। কোথায় পাওয়া গেছে, বলবে নাকি জুয়েলারকে?

পাগল। টুইন লেকসে সোনা আছে শুনলে মৌমাছির মত গিয়ে ভিড় করবে লোকে। রিপোর্টারদের জ্বালায় পালানো ছাড়া পথ থাকবে না। দেখি, কিছু একটা বানিয়ে বলে দেব জুয়েলারকে।

পোস্ট অফিসের দুটো ব্লক পরেই পাওয়া গেল জুয়েলারের দোকান। জানালায়। সাইনবোর্ড লেখা :

ঘড়ি মেরামত করা হয়।
পুরানো স্বর্ণ আর রৌপ্য
কেনা-বেচা করা হয়।

ঠিক এরকম কাউকেই খুঁজছিলাম, বলে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল কিশোর।

মোটা, প্রায় গোলাপী রঙের একটা লোক বসে আছে কাচের পার্টিশনের ওপাশে। চোখে একটা ঘড়ির মেকানিকের লেন্স, ঘড়ি মেরামত করছে লোকটা। তার পাশে একটা শো-কেসে সাজানো রয়েছে রূপার পুরানো জিনিসপত্র, কয়েকটা সোনার টাই-পিন আর আঙটি।

আপনিই মালিক? জিজ্ঞেস করল কিশোর।

হাতের ছোট ভ্রু-ড্রাইভারটা রেখে চোখ থেকে লেন্স খুলে রাখল লোকটা। হাসল।

পকেট থেকে নুড়িটা বের করল কিশোর। সিলভার সিটিতে বন্ধুর ওখানে বেড়াতে এসেছি আমরা। গতকাল পাহাড়ে ঘুরতে গিয়েছিলাম, এক বুড়োর সঙ্গে দেখা, খনিজ পদার্থের সন্ধানে পাহাড়ে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় সে।

মাথা ঝাঁকাল মালিক। আজকাল অনেকেই ঘোরে।

লোকটা বলল, তার টাকা দরকার। এটা বের করে দিল, নুড়িটা বাড়িয়ে দিল কিশোর। বলল, অনেক দিন ধরে আছে তার কাছে। টাকা লাগবে, তাই বিক্রি করে দিতে চায়।

চোখ তেরছা করে নুড়িটা দেখল মালিক, জোরে জোরে ডলল আঙুল দিয়ে। হাসিটা তেমনি রয়েছে। কত দিয়েছ?

পাঁচ ডলার, বলল কিশোর।

এটা আসল? জিজ্ঞেস করল জিনা।

মনে তো হচ্ছে, ঘুরিয়ে বলল লোকটা। স্বর্ণ আছে কিনা বোঝা যাবে এখুনি। ডুয়ার খুলে ছোট একটা শিশি আর একটা উখা বের করল সে। উখা দিয়ে ঘষে সরু একটা দাগ কাটল নুড়ির গায়ে, শিশি থেকে এক ফোঁটা তরল পদার্থ ফেলল খাজে। নাইট্রিক অ্যাসিড, জানাল সে। বেশির ভাগ ধাতুরই বিক্রিয়া ঘটায়, তবে সোনার কিছু হয় না। কয়েক সেকেণ্ড পর মাথা ঝাঁকাল। হ্যাঁ, সোনা আছে।

রেডিমেড সোনা মেলে প্রকৃতিতে? জিজ্ঞেস করল কিশোর। আমি বলতে চাইছি, প্রসেসিং ছাড়াই খাঁটি সোনা বের করা যায়?

সাধারণত অন্য ধাতুর সঙ্গে মেশানো থাকে স্বর্ণ। তবে এটা খুব ভাল পেয়েছ। কোথায় পেল লোকটা, কে জানে।

বলেনি, তাড়াতাড়ি জবাব দিল কিশোর।

হুঁ, নুড়িটা আবার ফিরিয়ে দিল জুয়েলার। কোন বাতিল খনিতে পেয়েছে বোধহয়, ক্যালিফোর্নিয়ার কোন জায়গায় হবে। খনি বন্ধ করে দেয়ার পরেও এসব খনিজ-সন্ধানীরা বহুদিন তার আশেপাশে ঘুরঘুর করে, ছিটেফোটা পায়ও মাঝে মাঝেই।

নুড়িটা পকেটে রাখতে রাখতে বলল কিশোর, অন্য ধাতুর সঙ্গে মেশানো থাকে বললেন। এটার সঙ্গে কি মেশানো আছে? রূপা-টুপা কিছু?

না। লালচে। তার মানে তামা। রূপা থাকলে সবজে দেখাত। বাক্স খুলে পুরানো একটা টাই-পিন বের করল জুয়েলার। ওক পাতার মত ডিজাইন, খুব হালকা সবুজ একটা ভাব রয়েছে। এই যে, এটাতে আছে। অনেকে সবুজ সোনা বলে একে। পঁচিশ পারসেন্ট রূপা, তারমানে এটা আঠারো-ক্যারাট স্বর্ণ। আর এই যে আঙটিগুলো, পঁচিশ-ক্যারাট। বাচ্চাদের জন্যে বানানো হয়েছে বড়দিনের উপহারের জন্যে কেনে লোকে। তবে খুব নরম, সেটা বলে দিই আমি বিক্রির। সময়। তোমার নুড়িটাতে এই জাতের স্বর্ণই আছে।

পাঁচ ডলার দাম ঠিক আছে?

তা আছে। আজকাল তো একটা প্ল্যাসটিকের টুকরোর দামও এর চেয়ে বেশি। যত্ন করে রেখে দাও। কখনও টাই-পিন বা আঙটি বানাতে ইচ্ছে হলে সোজা চলে এসো আমার কাছে।

জুয়েলারকে ধন্যবাদ জানিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এল ওরা।

খাইছে! উত্তেজনা আর চেপে রাখতে পারল না মুসা। খনিটাতে সত্যি সত্যি সোনা রয়েছে!

তামাও, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর। কিন্তু অবাক লাগছে, এটাতে রূপার বদলে তামা কেন? রূপা থাকাটাই তো স্বাভাবিক ছিল, কারণ পাওয়া গেছে রূপার খনিতে। সোনা আর রূপা এক খনিতে পাওয়া যায়, এটা জানি আমি, কিন্তু সোনা, রূপা, তামা…নাহ, মিলছে না।

মজার ব্যাপার,? জিনা বলল। শয়তানের চেলা তো ব্যাটা, ওর ওস্তাদই বোধহয় গোপনে ওকে জানিয়েছে, খনিটার ভেতরে সোনার স্তর লুকানো আছে। ওর বাপ ছিল ফোরম্যান, দক্ষ খনিকার। হয়তো সে-ই খোঁজ পেয়েছিল সোনার, চুপ থেকেছে, ছেলে বড় হওয়ার পর তাকে বলেছে। ব্যস, জনাব ম্যাকআরথার এসে কিনে নিয়েছেন খনিটা। গল্প ফেঁদেছেন, জন্মভূমির জন্যে কেঁদে কেঁদে তার অন্তত চুরচুর হয়ে গেছে, আহারে। মিথুকের বাচ্চা মিথ্যুক!

তাই যদি হয়, কিশোর বলল, তাহলে আরও আগেই এল না কেন? তার। বয়েস এখন চল্লিশ, আরও বিশ বছর আগেই আসতে পারত। কয়েক বছর আগে সোনার দাম চড়েছিল, তখনও তো আসতে পারত, আর আসার মোক্ষম সময় ছিল সেটাই। কেন এল না?

আসেনি যে সেটা জানছি কি করে? পাল্টা প্রশ্ন করল জিনা। পাঁচ বছর আগে যখন ডাকাত বাড হিলারি খনিতে পড়ে মরল, তখন ম্যাকআরথারও যে আসেনি সঙ্গে, শিওর হচ্ছি কিভাবে? দুজনে পার্টনার হিসেবেই হয়তো এসেছিল। কোন কারণে মতের মিল হয়নি, ঝগড়া লেগেছিল, তাই হয়তো লোকটাকে গর্তে ঠেলে ফেলে দিয়েছে ম্যাকআরথার।

খুব বেশি কল্পনা করছ, জিনা, প্রতিবাদ করল রবিন। একজন কোটিপতি পুরানো এক খনিতে এক ডাকাতের সঙ্গে ঝগড়া করতে আসবে কেন? কোন কারণ নেই। আর যদি ম্যাকআরথার জানেই খনিটাতে স্বর্ণ আছে, তাহলে পার্টনার নেয়ার কোন দরকার নেই। ওই স্বর্ণ তোলার সামর্থ্য তার একারই আছে। আর তার খনি থেকে সে যদি সোনা তোলেই, সেটা বেআইনী কিছু নয়, কাজেই গোপনে তোলার চেষ্টা করার তো কোন কারণ দেখছি না। ওসব বাদ দিয়ে এসো এখন কাজের কথা বলি, বা হিলারির খোঁজ লাগাই।

পকেট থেকে নোটবুক বের করে জোরে জোরে পড়ল রবিন বাড হিলারি, দাগী আসামী, নিয়মিত দুবার দেখা করেই গায়েব হয়েছে। অনেকগুলো ছদ্মনাম ব্যবহার করেছে সে, বেরি হারবার্ট, বন হিরাম, বার হুম্যান। স্যান কোয়েনটিন থেকে ছাড়া পেয়ে পাঁচ বছর আগে স্যান ফ্রানসিসকো থেকে নিখোঁজ হয়েছে। সেটা সম্ভবত জানুয়ারির শেষ কিংবা ফেব্রুয়ারির গোড়ার দিকে। টুইন লেকসে পৌচেছে হয়তো মে মাসের কোন এক সময়, লর্ডসবুর্গ থেকে গাড়ি চুরি করে নিয়ে।

খুব ভাল রের্কড লিখেছ, নথি, প্রশংসা করল কিশোর।

একটা ব্যাপার লক্ষ করার মত, বলে গেল রবিন, তার আসল নাম আর ছদ্মনাম, সবগুলোরই আদ্যাক্ষর বি এইচ। লর্ডসবুর্গেও যদি কোন ছদ্মনাম নিয়ে থাকে, এই দুটো অক্ষর দিয়েই হয়তো নাম বানিয়েছে। সেভাবেই খোঁজা দরকার আমাদের। কিশোর, পাবলিক লাইব্রেরি থেকে শুরু করব? ফোন বুক, সিটি ডিরেকটরি, পুরানো খবরের কাগজ, সবই পাওয়া যাবে ওখানে।

সায় দিল কিশোর।

জিনা চেনে লাইব্রেরিটা। পথ দেখিয়ে তিন গোয়েন্দাকে নিয়ে এল সেখানে। খুব ভদ্রভাবে লাইব্রেরিয়ানকে জানাল কিশোর, এই অঞ্চলে বেড়াতে এসেছে ওরা। তার এক মামা নাকি থাকে এখানে, অনেক দিন কোন খোঁজখবর নেই, তাই আসার সময় কিশোরের মা বলে দিয়েছে, পারলে মামার খোঁজ নিয়ে আসতে। লাইব্রেরিয়ান মানুষটা ভাল, তাছাড়া এমনভাবে অভিনয় করে বলেছে কিশোর, গলে গেলেন। নিজেই উঠে গিয়ে ফোন বুক, সিটি ডিরেকটরি বের করে দিলেন। পাঁচ বছরের পুরানো বই-পুত্র নিয়ে লম্বা একটা টেবিলে বসে গেল ওরা। নামের আদ্যাক্ষর বি এইচগুলো খুঁজছে।

বেশিক্ষণ লাগল না। দশ মিনিটেই যোলোটা নাম পেয়ে গেল। কিন্তু পনেরোজনই লর্ডসবুর্গের স্থায়ী বাসিন্দা। বাকি থাকল একজন, তার নাম বেকার। হেইম্যান। পাঁচ বছর আগেরর ডিরেকটরিতে আছে, মাঝখানে কয়েকটা বছর নেই, তারপর একেবারে চলতি বছরের বইতে আবার নাম উঠেছে।

মাঝখানে কোথাও চলে গিয়েছিল হয়তো, কিশোর বলল আবার ফিরেছে। আগে যে বাড়ির ঠিকানা ছিল, এখনও তাই আছে।

না, ও আমাদের চোর না, মাথা নাড়ল মুসা। বোঝা যাচ্ছে, কোথাও নামধাম না লিখিয়েই কেটে পড়েছে লর্ডসবুর্গ থেকে আমাদের বি এইচ।

থাকার তো কথা মাত্র কয়েক মাস, রবিন বলল।

পেয়েছ? নিজের ডেস্ক থেকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন লাইব্রেরিয়ান।

না, স্যার, হতাশ ভঙ্গিতে জবাব দিল কিশোর। মা বোধহয় ভুল অনুমান করেছে। এখানে আসেইনি মামা। আর এসে থাকলেও হয়তো ডিরেকটরিতে নাম তোলেনি, ফোন নেয়নি। একটা ব্যাপার অবশ্য…মামা যেখানে যায়, শুনেছি কিছু একটা করে মাত করে দেয়, খবরের কাগজে নাম উঠে যায়। পুরানো কাগজগুলো, স্যার…

দেখতে চাও? ওই যে, ওখানে, দেখিয়ে দিলেন লাইব্রেরিয়ান।

একের পর এক পাতা উল্টে চলল ওরা। কিছুই পাওয়া গেল না। অবশেষে, ১০ই মে-তে এসে থমকে গেল। ডেথ ট্র্যাপ মাইনের মুখ বন্ধ করার খবর ছেপেছে। পড়ে বলল রবিন, হুঁ, লর্ডসবুর্গের কাগজেও লিখেছে দেখা যাচ্ছে। হিলারির মৃত্যুর সঙ্গে এর কোন যোগাযোগ থাকতে পারে?

কি জানি, কাঁধ ঝাঁকাল কিশোর। হয়তো খবরটা পড়ে কোন কারণে টুইন লেকসে ছুটে গিয়েছিল হিলারি, খনির ভেতরটা দেখতে। গাড়িটা কবে চুরি হয়েছে, লিখে রেখেছ না?

নোটবুক দেখে জানাল রবিন, মে-র এগারো। লর্ডসবুর্গের কাগজে খবর বেরোনোর পরদিন। আর খনির মুখ বন্ধ করার তিন দিন আগে। যোগাযোগ আছে। মনে হচ্ছে।

কিন্তু কি যোগাযোগ? প্রায় চেঁচিয়ে উঠল জিনা। খনির মুখ বন্ধ করা হবে জানল চোরটা, তারপর এতই উত্তেজিত হয়ে পড়ল, গাড়ি চুরি করে নিয়ে ছুটে গেল ওখানে গর্তে পড়ে মরার জন্যে? যাতে পাঁচ বছর আর কোন খবর না থাকে তার? আমার মনে হয়, ম্যাকআরথারই তাকে ওখানে দেখা করতে…

দূর! বিরক্ত হয়ে বলল মুসা। মুহূর্তের জন্যেও ম্যাকআরথারকে তুলতে পারো না নাকি তুমি?

যে অন্ধকারে ছিলাম, সেখানেই রয়ে গেছি আমরা, রবিন বলল। আমরা জানি, বাড হিলারি লর্ডসবুর্গে এসেছিল, গাড়ি চুরি করেছিল, টুইন লেকমে সে-ই গাড়ি নিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু প্রমাণ করতে পারব না। সকালটাই মাটি।

পুরোপুরি মাটি না, সান্ত্বনা দিল কিশোর। নুড়িটা আবার বের করে দেখাল। যেদিন এই নুড়িটা পেলাম, সেদিনই বাড হিলারির লাশও আবিষ্কার করলাম। কি যোগাযোগ আছে জানি না, তবে এটুকু জোর দিয়ে বলতে পারি, যোগাযোগ কিছু একটা আছেই।

১১

বিকেল নাগাদ র‍্যাঞ্চে ফিরে এল ওরা। গাড়ি থেকে মালপত্র নামাতে উইলসনকে সাহায্য করল ছেলেরা। চারাগুলোকে গোলাঘরের কাছে রেখে পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখল। বাড়ির ভেতরে চলে গেছেন উইলসন।

মিসেস ফিলটারের বাড়ির দিকে তাকাল কিশোর। ডেথ ট্র্যাপ মাইনের কথা আর সবার চেয়ে ওই মহিলাই বেশি বলতে পারবেন।

মিসেস ফিলটার? জিনা বলল, হ্যাঁ, তা পারবেন।

চলো যাই তাহলে, তার সঙ্গে দেখা করে আসি।

অন্য দুজনও এক কথায় রাজি। রাস্তা পেরিয়ে মিসেস ফিলটারের বাড়িতে এসে দাঁড়াল চারজনে, দরজায় ধাক্কা দিল কিশোর।

সাড়া দিলেন মিসেস ফিলটার, ভেতরে যেতে বললেন ছেলেদেরকে।

ভেজানো দরজা, ঠেলা দিতেই খুলে গেল। পথ দেখিয়ে ছেলেদেরকে রান্নাঘরে নিয়ে এল জিনা। মিসেস ফিলটারকে জিজ্ঞেস করল, ব্যস্ত?

হাসলেন মহিলা, চোখের কোণের ভাঁজগুলো গভীরতর হলো। আজকাল আর ব্যস্ততা কোথায়? তবে আমাকে যদি একটু সাহায্য করতে, প্লীজ…আমার ট্রাকে কিছু মালপত্র আছে, যদি নামিয়ে দিতে। মুদীর কাছে গিয়েছিলাম।

ঠিক আছে, ঠিক আছে, এক্ষুণি দিচ্ছি নামিয়ে, বলল মুসা।

কাঁচা মাটির গাড়িবারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে মিসেস ফিলটারের ট্রাক। বড় একটা কার্ডবোর্ডের বাক্স বোঝাই বাদামী রঙের কাগজে মোড়া প্যাকেট। রান্নাঘরে বয়ে নিয়ে এল ওটা মুসা, নামিয়ে রাখল।

থ্যাংক ইউ, বললেন মিসেস ফিলটার। বয়েস হয়েছে তো, আগের মত কাজ আর করতে পারি না। প্যাকেট খুলে শাকসজি, রুটি ও টিনের খাবার বের করে তাকে সাজিয়ে রাখতে লাগলেন।

হঠাৎ চাপা বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল। জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন মিসেস ফিলটার। খনি-খনি খেলা শুরু করেছে আবার ম্যাকআরথার। এটাই আশা করছিলাম। আধ ঘন্টা আগে তার শহুরে বন্ধুকে নিয়ে ঢুকতে দেখেছি তো।

খনি খুঁড়ছে নাকি আবার? বলল কিশোর।

দেখেশুনে তা-ই মনে হয় বটে, সায় দিয়ে বললেন মিসেস ফিলটার। বিস্ফারণ ঘটাচ্ছে খনির ভেতরে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। এখানেই জন্মেছি তো, ওই শব্দ আমি চিনি, কোনদিন ভুলব না। এই বাড়িতেই বাস করেছি, যখন আমার স্বামী সুপারিনটেনডেন্ট ছিল। খনির সুড়ঙ্গে ডিনামাইট ফাটার শব্দ কয়েকদিন শুনলেই তোমরাও আর ভুলবে না। কিন্তু সব সময় খনিতে বোমা ফাটায়

ম্যাকআরথার, শুধু সঙ্গী থাকলেই ফাটায়। তার লস অ্যাঞ্জেলেসের বন্ধুকে দেখায় বোধহয়।

অদ্ভুত শখ, রনি মন্তব্য করল।

অনেকেরই থাকে এ-রকম, হাসলেন মিসেস ফিলটার। একটা লোককে চিনতাম, তার বাড়ির পেছনে মাঠে তিনশো গজ লম্বা এক লাইন বসিয়েছিল, পুরানো একটা রেলইঞ্জিন কিনে তাতে চালাত। বার বার সামনে-পেছনে করত, চালানোর সময় ড্রাইভারের পোশাক পরে নিত। বেশি টাকা থাকলেই এসব ভূত চাপে লোকের মাথায়। ম্যাকআরথারেরও হয়তো ওরকম কিছু হয়েছে। সারাজীবন বাপের মুখে খনির গল্প শুনে শুনে খনি-খোড়ার ভূত চেপেছে আর কি। সেই পুরানো দিনের স্বাদ পেতে চাইছে। এতে দোষের কিছু দেখি না।

এত নির্দোষ ভাবছেন ওকে? জিনার পছন্দ হলো না মিসেস ফিলটারের কথা।

দেখো, কিছু মনে করো না, একটা কথা বলি। কোন সময় সহজ ব্যাপারকে ঘোরাল করবে না। তুমি তার সব কাজেই দোষ দেখতে পাও, তাকে পছন্দ করো না বলে। তবে তোমাকেও দোষ দিই না। নোকটা তেমন মিশুক নয়। সীমানায় বেড়া লাগিয়ে ভালই করেছে। যা একটা কুত্তা পোষে, কখন কাকে কামড়ে দিয়ে বিপদ বাধাবে।

আবার শোনা গেল বিস্ফোরণের শব্দ।

মিসেস ফিলটার, কিশোর বলল, সত্যিই কিছু নেই তো খনিতে? মানে কাজের কাজ কিছু করছে না তো?

জোরে মাথা নাড়লেন মিসেস ফিলটার। ডেথ ট্র্যাপ মাইন শেষ, মরা। চল্লিশ বছর আগেই ফুরিয়ে গেছে রুপা। তোমরাও হয়তো জানো। খনি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অনেক দিন খুব দুঃসময় গিয়েছিল আমাদের। এখান থেকে চলেই যেতে হলো শেষে বাধ্য হয়ে। এখানে সামান্যতম সম্ভাবনা থাকলে যেতাম ভাবছ? তারপর রিচার্ড মারা গেল, সে-ও বাইশ বছর আগের ঘটনা। তার বীমার টাকা সব তুলে ফিনিক্সে একটা দোকান দিলাম। ইনডিয়ানদের কাছে মোকাসিন আর গহনা বিক্রি করতাম, কিন্তু ব্যবসার কিছুই বুঝি না, খোয়ালাম সব। দোকান-টোকান বেচে দিয়ে আবার ফিরে আসতে হলো যেখান থেকে গিয়েছিলাম সেখানে। টেনেটুনে চলছি কোনমতে এখন। ঘৃণা ফুটল চোখে, বোধহয় নিজের ওপরই। হঠাৎ করেই কোমল হলো তাঁর দৃষ্টি। তবে, এখানে আসার জন্যে ছটফট করছিলাম আমি। যেখানে জন্মেছি, অনেকগুলো সুখের বছর কাটিয়েছি, সেখানে জীবনের বাকি দিনগুলো কাটানোর ইচ্ছে কার না হয়? ম্যাকআররও বোধহয় তাই চায়। তার ছোটবেলা দেখেছি, নোঙরা, ললিপপ চুষত, রঙিন লালা লেগে থাকত সারা মুখে। তখনও অদ্ভুত কিছু ছিল ছেলেটার মধ্যে। কী, ঠিক মনে করতে পারছি না।

কিন্তু সত্যি যদি কিছু পাওয়ার আশা করে থাকে ম্যাকআরথার, কোন লাভ হবে না, এটা তো ঠিক? বলল কিশোর।

তা ঠিক। কিচ্ছু নেই আর ওই খনিতে।

রূপা নেই, কিন্তু যদি স্বর্ণ থাকে? দুটো ধাতু অনেক সময় পাশাপাশি থাকে তো।

থাকে। কিন্তু ডেথ ট্র্যাপ মাইনে নেই।

তামা?

না। শুধু রূপা ছিল, শেষ হয়ে গেছে, পুরানো দিনের স্মৃতি মনে করেই বোধহয় বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন মিসেস ফিলটার! সব শেষ। এক কালে কি শহরই না ছিল টুইন লেকস, কি আরামেই না ছিলাম আমরা। আবার যদি অলৌকিক কিছু ঘটত, সত্যি সত্যি কিছু পাওয়া যেত খনিটাতে, বুড়ো বয়েসে আবার হয়তো সুখের মুখ দেখতে পারতাম। কিন্তু তা-তো হবার নয়। যাকগে, এসো আমার ছোটখাট জমিদারী দেখাই তোমাদের, কথাগুলো তিক্ত শোনাল।

ছেলেদেরকে নিয়ে বাইরে বেরোলেন মিসেস ফিলটার। এখানে আসার পর ভেবেছিলাম, দরজায় তালা লাগানোর ব্যবস্থা করব, বললেন তিনি। কিন্তু পরে দেখলাম কোন দরকার নেই। জিনা লাশটা দেখার পর অবশ্য অবস্থা অন্য রকম হয়েছে। এখন অচেনা লোক আসছে। হ্যাঁ, জিনা, ভাল কথা, তোমার চাচার ছুরি পাওয়া গেছে?

নাহ্। নিয়ে গেলে আর কি পায়?

পাবে হয়তো কেউ একদিন পাহাড়ের ওদিকে, মরচে-টরচে পড়া অবস্থায়। হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির উত্তর ধারে পুরানো একটা ঘরের কাছে চলে এলেন মিসেস ফিলটার। বললেন, মিলানোর ঘর ছিল এটা। খনির পে-মাস্টার ছিল সে।

দরজায় ঠেলা দিলেন মিসেস ফিলটার। মৃদু ক্যাচকোচ প্রতিবাদ জানিয়ে খুলে গেল দরজা। সবাইকে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন। দীর্ঘ দিনের অব্যবহৃত আসবাবপত্র, দেয়ালের প্লাসটার খসা, আলমারির দরজা ভেঙে খুলে ঝুলে রয়েছে। ভেতরে নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র, কিছু ভাঙাচোরা, কিছু মোটামুটি ভাল।

অনেকেই অনেক কিছু ফেলে গেছে, বললেন মিসেস ফিলটার। নেয়ার দরকারই মনে করেনি, বোঝা মনে করে ফেলে গেছে।

বাড়িগুলো খালি ফেলে রেখেছেন কেন? জিনা জিজ্ঞেস করল।

তো কি করব?

ভাড়া দিয়ে দিলেই পারেন। অনেক ঝামেলা আছে অবশ্য, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা।

তা নাহয় করলাম। কিন্তু ভাড়া নেবে কে? তোক কোথায়?

ঘুরে ফিরে দেখছে ছেলেরা। বালি উড়ছে, বদ্ধ ঘরের পুরানো ভ্যাপসা গন্ধে বাতাস ভারি। জায়গায় জায়গায় ছাতের প্লাসটার খসে পড়েছে, বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়ে আরও বেশি করে নষ্ট হয়েছে ওসব জায়গা। মুসার ভয় হলো, গায়ের ওপরই ধসে পড়ে।

মরচে ধরা একটা স্টোভের কাছে একগাদা খবরের কাগজ স্কুপ হয়ে আছে, হলদে হয়ে গেছে পুরানো হতে হতে।

কাগজের স্তুপের পাশে গিয়ে বসে পড়ল রবিন। উল্টে দেখল দু-একটা। মিসেস ফিলটারকে জিজ্ঞেস করল, আপনি যখন জায়গাটা কেনেন, তার আগে থেকেই ছিল? মানে, পাঁচ বছর আগে যখন এলেন?

বোধহয় ছিল, মনে করার চেষ্টা করছেন মিসেস ফিলটার। হ্যাঁ, ছিলই। নইলে পরে আসবে কোত্থেকে? আমি তো রাখিনি।

ইনটারেসটিং, গালে আঙুল রাখল রবিন। আমি নিতে পারি এগুলো?

এই বস্তাপচা পুরানো খবরের কাগজ দিয়ে কি করবে? ভুরু কোঁচকালেন মিসেস ফিলটার।

ও খবরের কাগজের পোকা, হেসে বলল জিনা। পুরানো কাগজ জোগাড় করা হবি। কত রকম পাগলই তো আছে দুনিয়ায়। লাশটা পাওয়ার পর দি টুইন লেকসের অফিসে গিয়েছিলাম আমরা। জানার চেষ্টা করেছি কেন এসেছিল বাড হিলারি, কি করছিল। অনেক কিছুই জেনেছি, কিন্তু…

বার বার জিনার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপছে কিশোর, কিছু না বলার ইঙ্গিত করছে, কিন্তু দেখছেই না জিনা।

রবিন বুঝল ব্যাপারটা, তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বলল, আমার বাবা খবরের কাগজের লোক। পুরানো কাগজের প্রতি ভীষণ আগ্রহ। সে জন্যেই নিতে চাইছি। নেব?

কিছুটা বিস্মিত মনে হলো মিসেস ফিলটারকে। নাও। নিয়ে যাও।

সাবধানে, যেন না ছেড়ে এমনিভাবে সাজিয়ে কাগজের গাদা তুলে নিল রবিন। ঘর থেকে বেরিয়ে এল সবাই। বাইরে পড়ন্ত বিকেলের সোনালি রোদ।

কিছু খাবে তোমরা? জিজ্ঞেস করলেন মিসেস ফিলটার। ঠাণ্ডা কিছু?

মুসার আপত্তি নেই, হেসে বলল জিনা।

চলো। কমলার শরবত আছে।

মিসেস ফিলটারের ছোট রান্নাঘরে আবার ফিরে এল ওরা। ফ্রিজ খুললেন মহিলা। কিন্তু কমলার রসের বোতল নেই। তাক খোঁজা হলো, আলমারি খোঁজা হলো, কিন্তু কোথাও নেই। আরে, গেল কই? মহিলা তো অবাক। দু বোতল ছিল। আমি তো আজ খাইনি। তাহলে?

সব কিছুই খুঁটিয়ে দেখা কিশোরের স্বভাব। মুদী দোকান থেকে সদ্য আনা জিনিসগুলো যেখানে সাজিয়ে রাখা হয়েছে, সে-তাকের দিকে তীক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। বলল, রুটিও একটা কম। আর এক টিন মাছ। আপনি তখন, রেখেছিলেন, দেখেছি।

কিশোরের দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকালেন মহিলা, যেন কথা বুঝতে পারছেন। তাকের দিকে এক নজর চেয়েই দৌড়ে গেলেন দরজার দিকে, বাইরে তাকালেন। যেন দেখতে পাবেন, তার খাবারগুলো হাতে নিয়ে দ্রুত হেঁটে চলে যাচ্ছে কোন লোক।

খবরের কাগজের গাদা নামিয়ে রাখল রবিন। রান্নাঘরের সিংক থেকে তুলে আনল একটা পোড়া সিগারেটের টুকরো। মিসেস ফিলটার, আপনি নিশ্চয় সিগারেট খান না?

রবিনের হাতের দিকে চেয়ে রইলেন মিসেস ফিলটার। চেঁচিয়ে উঠলেন হঠাৎ, কিছুই তো বুঝতে পারছি না। এ-কার কাজ? কার এত খিদে পেয়েছে? আমার কাছে চাইলেই পারত, চুরি করল কেন?

শুধু খাবারই, মুসা বলল, হয়তো আরও এমন কিছু দরকার হয়েছে তার, যেটা চাইলে দিতেন না আপনি। আসুন না খুঁজে দেখি। এমনও হতে পারে, চোর এখনও বাড়িতেই লুকিয়ে আছে।

রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে এল সবাই। প্রতিটি ঘর, আলমারি, বিছানার তলা খুঁজে দেখল। চোর নেই।

তেমন মূল্যবান কিছু নেই আমার, চোরে নেয়ার মত, বললেন মিসেস ফিলটার। আর কিছু খোয়াও যায়নি।

শেষ পর্যন্ত তালা আপনাকে লাগাতেই হচ্ছে, মিসেস ফিলটার, বলল কিশোর। এখন থেকে বাইরে বেরোলে তালা লাগিয়ে বেরোরেন।

কিন্তু টুইন লেকসে কেউ তালা লাগায় না, করুণ কণ্ঠে বললেন মহিলা।

আগে অচেনা কেউ ছিল না, এখন অনেকেই আসা-যাওয়া করছে। কে ভাল কে খারাপ, কি করে বুঝবেন? এই তো, খাবার চুরি করে নিয়ে গেল। একবার যখন করেছে, খিদে পেলে আবারও আসতে পারে। হুশিয়ার থাকা ভাল না?

১২

র‍্যাঞ্চ হাউসে ফিরে এল ওরা। দু-হাতে পাজাকোলা করে খবরের কাগজের গাদা নিয়ে এসেছে রবিন।

কেন এনেছ এগুলো? মুসা জিজ্ঞেস করল। ইতিহাসে ডক্টরেট নেবে নাকি? থিসিস লিখবে?

আর আমাকেই বা চুপ করিয়ে দিয়েছিলে কেন তখন? জিনা অনুযোগ করল।

কারও কথারই জবাব না দিয়ে রবিন বলল, বেশির ভাগ কাগজই দা টুইন লেকস। চল্লিশ বছরের আগেও কপিও আছে। তবে এই যে, এটা, ফিনিক্স থেকে বেরোয়, পাঁচ বছর আগের, মে-র নয় তারিখের কপি। দেখো দেখো, হেডলাইনটা দেখো।

দেখে গভীর ভঙ্গিতে মাথা দোলাল কিশোর। হুম! নিরাপদ কোথাও বসে ভালমত পড়া দরকার।

গোপন আর নিরাপদ জায়গা এখানে একটাই গোলাঘরটা। ভেতরে ঢুকে মডেল টি-র ধারে এসে বসল ওরা। কাগজের গাদা নামিয়ে রেখে ফিনিক্স থেকে বেরোনো পেপারটা মেলল রবিন। চারপাশ থেকে ঝুকে এল সবাই ওটার ওপর।

জোরে জোরে পড়ল রবিন :

আর্মার্ড ট্রাক লুট
দশ লক্ষ ডলার নিয়ে পালিয়েছে
মুখোশধারী ডাকাতেরা।

আজ বিকেল তিনটায় নর্থ ইনডিয়ান হেড রোডে এক দুঃসাহসিক ডাকাতি হয়েছে। ট্রাকটা সিকিউরিটিস ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির! মুখখাশপরা তিনজন সশস্ত্র ডাকাত অতর্কিতে আক্রমণ করে ড্রাইভার হিনো মারকিং আর গার্ড ডিয়েগো পিটারকিনকে বেঁধে ফেলে, হাত-মুখ বেঁধে রাখে ট্রাকের পেছনে। তারপর দশ লক্ষ ডলার লুট করে নিয়ে পালিয়ে যায়। এখানে উল্লেখযোগ্য, ডাকাতদের হাতে ছিল কাটা-শটগান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য : সাদা একটা ক্রাইসলার সিডানে করে এসেছিল ডাকাতেরা। ফিনিশিয়ান লোন কর্পোরেশনের সামনে এসে আর্মার্ড ট্রাকটা থামার আগে থেকেই পথের ধারে দাঁড়িয়েছিল সাদা গাড়িটা। ডাকাতেরা মেঝেতে লুকিয়েছিল। টাকা লুট করে ওরা সাদা গাড়িতে তোলার পর পরই পাশের একটা কার্ড শপ থেকে এক মহিলা বেরিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসল, দ্রুত গাড়ি চালিয়ে চলে গেল ইনডিয়ান হেড রোডের উত্তর দিকে। মুখোশধারীদের চেহারার বর্ণনা পাওয়া যায়নি, তবে মহিলাকে ভালমতই দেখেছে প্রত্যক্ষদর্শী। মহিলার বয়েস পঞ্চাশ থেকে ষাটের মধ্যে, হালকা-পাতলা গড়ন, চুল হালকা ধূসর, গায়ের রঙ তামাটে। পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চিমত লম্বা, ওজন, আন্দাজ একশো তিরিশ পাউণ্ড। গাঢ় রঙের প্যান্ট ছিল পরনে, গায়ে টারটল-নেক সাদা শার্ট। গলায় অস্বাভাবিক বড় একটা ইনিডিয়ান হার ছিল, রূপার তৈরি, নীলকান্তমনি খচিত।

খাইছে! বলে উঠল মুসা। এক মিলিয়ন নিয়ে পালাল?

মে-র নয় তারিখ, বিড় বিড় করল কুিশোর। পাঁচ বছর আগে। রবিন, তার পরদিনই তো ডেথ ট্র্যাপ মাইনের মুখ সীল করার কথা বেরিয়েছিল লর্ডবুর্গের কাগজে?

হ্যাঁ, বলল রবিন। এবং এগারো তারিখ গাড়িটা চুরি গিয়েছিল।

সেই সময়, আপন মনেই বলে গেল কিশোর, মিসেস ফিলটারের বাড়ি ছিল খালি। আসেননি তখনও টুইন লেকসে। এলেন অক্টোবরে, জায়গা আর বাড়ি কিনলেন। কিন্তু কেউ একজন ছিল তখন ও-বাড়িতে, যে মে-র নয় তারিখে ফিনিক্সে ছিল, যে কাগজটা ফেলে গেছে।

বাড হিলারি! চেঁচিয়ে উঠল মুসা।

অসম্ভব নয়, সায় দিয়ে বলল কিশোর। লর্ডসবুর্গ থেকে বেশি দূরে না ফিনিক্স। ডেথ ট্র্যাপ মাইন সীল করার মাত্র কয়েক দিন আগে দশ লক্ষ ডলার ডাকাতি হলো, তারপর লর্ডর্সবুর্গে একটা গাড়ি চুরি হলো, পাঁচ বছর পর খনিতে পাওয়া গেল এক জেলখাটা দাগী আসামীর লাশ। হ্যাঁ, কল্পনা করতে দোষ নেই, হিলারি ওই ট্রাক ডাকাতদের একজন, নয় তারিখে ফিনিক্স ছিল, তারপর লর্ডসবুর্গ থেকে গাড়ি চুরি করে পালিয়ে এসে লুকিয়েছিল টুইন লেকসে। মনে হচ্ছে, বুঝতে পারছি, কেন সে এসেছিল এখানে।

লুকাতে, বলল মুসা।

না। টুইন লেকসে লুকানোর জায়গা নেই। এখানে নতুন কেউ এলেই সঙ্গে সঙ্গে চোখে পড়ে যাবে। ধরা যাক, হিলারি ডাকাতদের একজন, তার ভাগের টাকা লুকানোর জন্যে নিরাপদ একটা জায়গার খোঁজ করছিল। মুখ বন্ধ করে দেয়া হবে শিগগিরই, এমন একটা খনির চেয়ে টাকা লুকানোর ভাল জায়গা আর কোথায় হতে পারে?

চোখ বড় বড় করে ফেলেছে জিনা। কিন্তু রাখলে আবার বের করবে কি করে?

বাড হিলারির মত একটা ডাকাতের জন্যে সামান্য কয়েকটা লোহার শিক এমন কি বড় বাধা, রবিন জবাব দিল।

টাকাগুলো তাহলে ম্যাকআরথারই পেয়েছে। চেঁচিয়ে উঠল জিনা। খনিতে লুকানো থেকে থাকলে সে ছাড়া আর কেউ পায়নি। এজন্যেই কাউকে খনির ধারেকাছে ঘেঁষতে দেয়নি ব্যাটা। লাশটা আছে জেনেও বলেনি। সুযোগ মত লুকিয়ে ফেলত লাশটা, তাহলে টাকার কথা আর অনুমান করতে পারত না কেউ। কিন্তু তার কপাল খারাপ, আমরা তার আগেই গিয়ে দেখে ফেলেছি।

সেটা সম্ভব, বলল কিশোর। কিন্তু আপাতত ম্যাকআরবারের কথা ভাবছি। না আমরা। হিলারির টুইন লেকসে আসার আরও একটা কারণ থাকতে পারে।

কি? জিজ্ঞেস করল রবিন।

হতে পারে, লর্ডসবুর্গের খবরের কাগজে খনিটা সম্পর্কে যা যা বেরিয়েছে, তার চেয়ে বেশি জানত হিলারি। হতে পারে, কেউ তাকে বাতিল খনিটার কথা সব বলেছিল, বলেছিল খনির পরিত্যক্ত জায়গাগুলোর কথা। হতে পারে, সেই লোক হিলারির কুকাজের এক সহকারী।

কি বলতে চাইছ? বুঝতে পারছে না জিনা।

ফিনিক্সের ছোট একটা দোকানে কয়েক বছর চাকরি করে টুইন লেকসে ফিরে এলেন মিসেস ফিলটার, ডাকাতিটার কয়েক মাস পরে। বেশ বড় সাইজের একটা সম্পত্তি কেনার মত টাকা নিয়ে এলেন সঙ্গে করে। হিলারির সহকারী হতে পারেন না?

তু-ত্তুমি পাগল হয়ে গেছ! উত্তেজনায় কথা স্পষ্ট করে বলতে পারল না জিনা।

তু-তুমি পাগল হয়ে গেছ! উত্তেজনায় কথা স্পষ্ট করে বলতে পারল না

না, তা হইনি, হালকা গলায় বলুল কিশোর। যে গাড়িতে করে পালিয়েছিল ডাকাতেরা, সেটার ড্রাইভার ছিলেন মহিলা।

ঠিক! দু-আঙুলে চুটকি বাজাল রবিন। ঠিক বলেছ। মহিলার বয়েস ছিল পঞ্চান্ন থেকে ষাটের মধ্যে, হালকা ধূসর চুল, গায়ের রঙ তামাটে। পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি লম্বা, একশো তিরিশ পাউন্ড ওজন। গলায় রূপার হার, তাতে বসানো নীলকান্তমনি।

কি জিনা, ভুরু নাচাল কিশোর, এ-রকম কাউকে চিনি আমরা?

কিন্তু কিন্তু ওরকম আরও অনেক মহিলা থাকতে পারে, আর ওই হার একা মিসেস ফিলটার পরেন না, বাজারে আরও কিনতে পাওয়া যায়। মিসেস ফিলটার একজন অত্যন্ত ভাল মহিলা।

ব্যবহার ভাল, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু ডাকাতিটা যখন হয়, তখন মহিলা ফিনিক্সে ছিলেন, এটা তো ঠিক। ব্যবসায় নেমে জমানো টাকা সব খুইয়েছিলেন, তারপর চাকরি নিয়েছিলেন ছোট একটা দোকানে, সেখানে কত আর বেতন পেতেন?

খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার পর কত আর জমানো যায় ওই টাকা থেকে? কিন্তু দেখা গেল বেশ মোটা টাকা নিয়ে ফিরেছেন, ডাকাতির কয়েক মাস পর। কোন কাজ করেন না, অথচ বেশ আছেন এখানে। শান্ত, ভদ্র, আত্মবিশ্বাসী, এতবড় একটা ডাকাতির জন্যে পারফেক্ট চরিত্র। সব চেয়ে বড় কথা, প্রত্যক্ষ দর্শীর বিবরণের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যাচ্ছে সব কিছু।

তাতে কি! রেগে উঠল জিনা। দেখো কিশোর, কোন প্রমাণ নেই তোমার হাতে। কিছু প্রমাণ করতে পারবে না।

না তা পারব না, স্বীকার করল কিশোর, তবে কতগুলো অদ্ভুত যোগাযোগ দেখতে পাচ্ছি। প্রমাণ খোঁজা শুরু করতে পারি আমরা, নরম চোখে তাকাল জিনার দিকে। আরেকটা সম্ভাবনার কথা ভেবে দেখতে পারি। যদি মিসেস ফিলটার ডাকাতিটার সঙ্গে যুক্ত থাকেন… নাটকীয় ভঙ্গিতে চুপ করে গেল সে।

বলো। থামলে কেন? চেঁচাল জিনা।

তাহলে এমনও হতে পারে, বাড হিলারি একা আসেনি টুইন লেকসে। হয়তো…হয়তো টাকা লুকানোর সুযোগই পায়নি।

মিসেস ফিলটার ধাক্কা দিয়ে তাকে খাদে ফেলে দিয়েছেন, জিনার কণ্ঠ কাপছে, মুখচোখ লাল, এই তো বোঝাতে চাইছ? তুমি…তুমি বদ্ধ পাগল হয়ে গেছ, কিশোর পাশা। তোমার আর কোন কথা শুনতে চাই না, ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।

কিশোরের দিকে তাকাল রবিন। সত্যি তুমি ভাবছ, মিসেস ফিলটার হিলারিকে খুন করে তার ভাগের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন?

না, মাথা নাড়ল কিশোর। এমনি কথার কথা বলছিলাম জিনার সঙ্গে। তবে, ডাকাতিটায় ওই মহিলাও জড়িত থাকলে অবাক হব না।

১৩

পরদিন সকালে রান্নাঘরে নাস্তা সারল ছেলেরা। তাদের সঙ্গে রয়েছে কেবল জিনা। গভীরভাবে কি যেন ভাবছে কিশোর, তার আনমনা ভাব দেখেই বোঝা যায়। নিজের প্লেটের দিকে চেয়ে জিনাকে বলল, ফিনিক্সে মিসেস ফিলটার যে দোকানে কাজ করতেন, দোকানটার নাম জানো?

সেটা জেনে তোমার কোন লাভ নেই, কড়া গলায় জবাব দিল জিনা। দোকানটার নাম ছিল টিড-বিট। প্রথমে মিসেস ফিলটারই দোকানটা দিয়েছিলেন, ব্যবসায় লালবাতি জ্বালিয়ে পরে বিক্রি করে দেন মিসেস ম্যালকম নামে আরেক মহিলার কাছে। সেই মহিলা মিসেস ফিলটারকে ওই দোকানের সেলসউম্যান হিসেবে রেখে দেয়। মিসেস ম্যালকমেরও টাকাপয়সা বিশেষ ছিল না, দোকানও যা চলত, তাতে বেতন খুব একটা দিতে পারত না।

তাই নাকি? মিসেস ফিলটার জমি কেনার টাকা পেলেন কোথায় তাহলে? খোঁজখবর করতে হয়।

কিশোর! খবরদার! গলা ফাটিয়ে চিৎকার করল জিনা। মিসেস ফিলটারের ব্যাপারে নাক গলাবে না। খুব ভাল মহিলা। আমি পছন্দ করি।

এবং ম্যাকআরথারকে অপছন্দ করো, শান্ত কণ্ঠে বলল কিশোর, জানি। তাতে প্রমাণিত হয় না, হ্যারি ম্যাকআরথার চোর-ডাকাত, আর মিসেস ফিলটার সাধু-সন্ন্যাসী। সত্যি কথা কি জানো, মহিলাকে আমিও পছন্দ করি। কিন্তু একজন রহস্যভেদী হিসেবে আবেগকে প্রশ্রয় দিতে পারি না, দেয়া উচিতও নয়।

তাই নাকি। তীব্র ব্যঙ্গ ঝরল জিনার কণ্ঠে। খুব নীতিবান। নির্দোষ একজন ভদ্রমহিলাকে চোর ভাবতে তোমার লজ্জা হওয়া উচিত।

হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল কিশোর, শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেলল, বলল, দেখো, জিনা, মিসেস ফিলটার কি করেছেন না করেছেন, আমি জানি না। কিন্তু এটা তো জানি ডাকাতিটার সময় তিনি ফিনিক্সে বাস করতেন, এবং ঠিক তার মতই একজন মহিলা অংশ নিয়েছিল ডাকাতিতে। তারপর একটা লোক পড়ে মরল এমন একটা খনিতে, যেটা মিসেস ফিলটারের অতি-পরিচিত। যোগাযোগগুলো খুব বেশি মাত্রায় হয়ে যাচ্ছে না? সেজন্যেই খোঁজ নিতে চাইছি। শুরুতে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসতে চাই সেই দোকানটায়, টিড-বিটে। শুরুতেই জানা দরকার, টিড-বিটে সত্যি কাজ করতেন কিনা মহিলা।

ফোন করো না, দৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল জিনা। তাহলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। তোমারও মুখ বন্ধ হবে।

তাই করব, উঠে লিভিং রুমে রওনা হলো কিশোর, টেলিফোন করবে।

ডিরেকটরিতে নাম্বার পাওয়া গেল। ডায়াল করল কিশোর। ওপাশ থেকে সাড়া মিলতে নিজের কণ্ঠস্বর ভারি করে, বয়স্ক লোকের গলা নকল করে বলল, টিড-বিট? মিসেস ম্যালকমের সঙ্গে কথা বলতে পারি, প্লীজ?

দীর্ঘ নীরবতা।

মিসেস ম্যালকম? অবশেষে বলল কিশোর। লর্ডবুর্গের বিউটি পারলার থেকে বলছি, আমি হ্যারি কোলম্যান। একজন সেলস-উওম্যান চেয়েছিলাম, দরখাস্ত পেয়েছি, নাম মিসেস রোজ ফিলটার। অভিজ্ঞতার জায়গায় আপনার দোকানের রেফারেন্স দিয়েছে। পাঁচ বছর আগে টিড-বিট ছেড়েছিল, হ্যাঁ হ্যাঁ রিজাইন দিয়েছিল

চুপ হয়ে গেল কিশোর। মনযোগ দিয়ে শুনছে ওপাশের কথা।

পনেরো বছর পর? এক সময় বলল সে।

অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে অন্যেরা।

বলেছিলাম না? ফিসফিস করে বলল জিনা। মহিলা বাজে কথা বলেন না। জিনার দিকে ফিরেও তাকাল না কিশোর, শুনছে। তাই?…হ্যাঁ, বিশ্বাস করা শক্তহ্যাঁ হ্যাঁ। থ্যাংক ইউ মিসেস ম্যালকম, থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।

রিসিভার নামিয়ে রাখল কিশোর।

কি বলল? মুসা আর ধৈর্য রাখতে পারছে না।

পনেরো বছর কাজ করেছেন ওখানে, মিসেস ফিলটার, জানাল কিশোর। পাঁচ বছর আগে বসন্ত কালে চলে এসেছেন। মিসেস ম্যালকম বললেন, এপ্রিল কি মে মাসে হবে। পরিষ্কার মনে করতে পারলেন না। তবে, রিজাইন দিয়ে আসেনি মিসেস ফিলটার।

তাড়িয়ে দিয়েছে, যেন কিছুই না ব্যাপারটা, এমনি ভাবে বলল জিনা। তাতে কি?

তাড়ায়ওনি। ওয়ান ফাইন মরনিং জাস্ট কাজে যাননি। এমন কি টেলিফোনও করেননি। দোকানের এক লোক খোঁজ নিতে গিয়ে দেখে, বাসা ছেড়ে চলে গেছেন মিসেস ফিলটার। কোথায় গেছেন, কেউ বলতে পারল না। কাউকে জানিয়ে যাননি।

শূন্য চোখে তাকাল জিনা।

সোফায় হেলান দিয়ে ছিল রবিন, সামনে ঝুঁকল। পাঁচ বছর আগের বসন্তেই ডাকাতিটা হয়েছিল। কিশোর, বোধহয় তোমার কথাই ঠিক। হয়তো মিসেস ফিলটারই সাদা গাড়ি ড্রাইভ করেছিলেন। কিন্তু টিড-বিট ছাড়া ও টুইন লেকসে আসার মাঝের সময়টা কাটিয়েছেন কোথায়?

সেটা তাকেই গিয়ে জিজ্ঞেস করে দেখি না কেন? প্রস্তাব দিল কিশোর।

গল্পের ছলে কথা আদায়? মুসা হাসল। তা মন্দ হয় না। টেকনিকটা ভালই তোমার। চলো।

তোমাদের মন এত ছোট! কেঁদে ফেলবে যেন জিনা।

কিছু মনে করো না, জিনা, নরম গলায় বলল মুসা। তুমি থাকো।

না, জ্বলে উঠল জিনা, আমিও যাব। তোমাদের মুখ থুবড়ে পড়া না দেখে ছাড়ব ডেবেছ?

কিন্তু মিসেস ফিলটারের পিকআপটা গাড়িবারান্দায় নেই। ডেকে, দরজায় ধাক্কা দিয়েও সাড়া মিলল না।

মনে হয় শহরে গেছেন, জিনা অনুমান করল। এসো, ঢুকি। একটা নোট রেখে যাব, যেন আমাদের বাড়িতে দুপুরের খাওয়া খান।

দরজা ভেজানো রয়েছে। সোজা রান্নাঘরে চলে এল জিনা। পেছনে এল ছেলেরা।

মিসেস ফিলটার? ডাকল জিনা।

সাড়া নেই।

কাগজ-কলমের জন্যে লিভিং রুমে চলে গেল সে। গোয়েন্দারা রান্নাঘরেই রইল। রান্নাঘরটা আগের দিনের মত এত গোছানো নয়, অপরিষ্কার। স্টোডের ওপর হাঁড়ি চড়ানো, খাবারের টুকরো লেগে আছে। সিংকে ময়লা বাসন-কোসন, কোন কারণে ধোয়া হয়ে ওঠেনিবোঝা যায়।

কিশোর, লিভিং রুম থেকে জিনার ডাক শোনা গেল, মিসেস ফিলটার কোথাও বেড়াতে যাবেন মনে হচ্ছে।

দরজায় উঁকি দিয়ে কিশোর জিজ্ঞেস করল, কি করে বুঝলে?

বেডরুমের খোলা দরজা দেখাল জিনা। ছোট একটা স্যুটকেস উপড় হয়ে পড়ে আছে বিছানায়, পাশে এলোমেলো কিছু কাপড় চোপড়।

খোলা দরজার কাছে চলে এল কিশোর। এক নজর দেখেই বলল, তিনি অলরেডি চলে গেছেন।

চলে গেছেন? কিশোরের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মুসা।

হাত তুলে খোলা আলমারি দেখাল কিশোর। কাপড় কই? সব নিয়ে গেছেন। ড্রয়ারগুলো কিভাবে খুলে আছে, দেখেছ? খালি। তিনি গিয়েছেন, এবং খুব তড়িৎ-অন্তর্ধান।

মানে? জিনা ঠিক মেনে নিতে পারছে না কিশোরের টিটকারি।

দেখে কিছু বুঝতে পারছ না? গতকালও এ-ঘর দেখেছ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, ঝকঝকে তকতকে। এই ঘর তো ভালই, রান্নাঘরে গিয়ে ভালমত দেখো। নোংরা। এটো বাসনগুলো পর্যন্ত সিংকে ভেজানো রয়ে গেছে। কোন কারণে এক্সপ্রেস ট্রেনের গতিতে তিনি জেগেছেন।

কিডন্যাপ! হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল জিনা। তাকে ধরে নিয়ে গেছে! খাবার চুরি করেছিল যে, নিশ্চয় ওই ব্যাটা…

ঠিক তাই, মাথা দোলাল কিশোর। তা এজন্যেই বুঝি সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি করে লোকটার সঙ্গে কিডন্যাপ হয়েছেন? কেউ কিডন্যাপ করলে এভাবে স্যুটকেস গোছানোর সুযোগ দেয়?

বোধহয় বেড়াতেই গেছেন, মুসা বলল।

সন্দেহ আছে। বেড়াতে গেলে এভাবে নোংরা রেখে যেতেন না বাড়িঘর, এটা তার স্বভাববিরুদ্ধ। তাছাড়া গতকাল ঘুণাক্ষরেও জানাননি বেড়াতে যাবেন।

জরুরী কোন কারণে কোথাও যেতে পারেন, রবিন বলল। আমরা যাওয়ার পর হয়তো ফোন পেয়েছিলেন।

নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটল কিশোর, কুটি করল, হ্যাঁ, এটা হতে পারে। তবে আরও একটা কারণ হতে পারে। ফিনিক্স থেকে বেরোনো খবরের কাগজটা তুমি দেখে ফেলেছ।

কিন্তু কাগজে কি আছে তিনি জানেন না, প্রতিবাদ করল জিনা। তিনি বাড়ি কেনার আগে থেকেই ওগুলো ছিল ওখানে।

হয়তো ছিল, মেনে নেয়ার ভঙ্গি করল কিশোর। কিন্তু তিনি ডাকাতিতে জড়িত থাকলে আর রবিন হাতে নেয়ার পর কাগজটার হেডলাইন নজরে পড়ে থাকলে, জেনে গেছেন কি লেখা রয়েছে। বুঝে গেছেন, গোলমালে পড়তে যাচ্ছেন। কারণ, তুমি, জরজিনা পারকার, কথা বেশি বলতে গিয়ে বলে ফেলেছ মৃত লোকটার ব্যাপারে তদন্ত করছি আমরা। দুয়ে দুয়ে চার মেলাতে বেশি সময় যে লাগবে না আমাদের, এটা না বোঝার মত বোকা তিনি নন। এবং বোঝার পর তার কি করা উচিত?

পালানো, ফস করে বলে ফেলল মুসা।

মুখে কিছু আটকায় না তোমাদের। জিনার চোখে তিরষ্কার। এতই যদি আত্মবিশ্বাস, শেরিফকে ডাকছ না কেন?

ডেকে কি বলব? ভুরু নাচাল কিশোর। বলব, মিসেস ফিলটা চলে গেছেন? যে কোন স্বাধীন দেশে স্বাধীন ভাবে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার অধিকার আছে যে কোন স্বাধীন নাগরিকের। ডাকাতির সঙ্গে তিনি জড়িত, এর কোন প্রমাণ নেই আমাদের কাছে সবই অনুমান।

ধুলোয় ঢাকা গাড়িবারান্দায় বেরিয়ে এল কিশোর। মাটির দিকে চোখ রেখে এগোল। এক জায়গায় থেমে বালিতে চাকার দাগ পরীক্ষা করল। পিকআপের চাকার দাগের ওপর অন্য চাকার দাগও পড়েছে। পিছিয়ে গিয়ে রাস্তায় উঠে ম্যাকআরবারের বাড়িমুখো এগিয়েছে।

অদ্ভুত, আঙুল দিয়ে ঠোঁটে টোকা দিল কিশোর। শহরের দিকে যাননি। অন্য দিকে গেছেন।

যদি দাগগুলো তার গাড়ির চাকার হয়ে থাকে, জিনা বলল।

তার গাড়িবারান্দায় যে দাগ দেখেছি, তার সঙ্গে মিল তো রয়েছে।

ধুলোয় ঢাকা পথে চাকার দাগ ধরে ধরে এগোল ওরা। ম্যাকআরবারের গৌ ছাড়িয়ে এল। তাদেরকে দেখেই লাফ দিয়ে বেড়ার কাছে চলে এসেছে বিশাল কুকুরটা, বড় বড় লাফ মারছে পেরোনোর জন্যে, চেচাচ্ছে গলা ফাটিয়ে। বেগ থাকায় কুকুরটাকে আর বাধেনি ম্যাকআরথার। কিন্তু তাকে আর তার মেকসিকান শ্রমিকদেরকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।

ম্যাকআরবারের সীমানার পর শ-খানেক গজ দূরে মোড় নিয়েছে গাড়ি, অনেক আগে রাস্তা ছিল এখানে, ভাল করে না তাকালে বোঝাই যায় না এখন। একেবেঁকে তী কয়েকটা মোড় নিয়ে পাহাড়ের দিকে চলে গেছে পথটা।

কিন্তু কেন কেন তিনি পুরানো হ্যামবোনের পথে গেছেন? বলল জিনা।

হ্যামবোন? ফিরে তাকাল কিশোর।

ওই যে ওখানে, চূড়ার ওদিকে একটা সত্যি সত্যি ভূতুড়ে শহর আছে। ওটার নাম হ্যামবোন। আরেকটা খনি আছে ওখানে, ভেথ ট্র্যাপের মতই মৃত। ওখানে টুইন লেকসের মত স-মিলও নেই, তাই শহরটা পুরোপুরি মরে গেছে। কখনও যাইনি, রাস্তা নাকি খুব খারাপ। তবে ফোর-হুইল-ড্রাইভ জীপ বা ট্রাক হলে যাওয়া যায়।

মিসেস ফিলটারের গাড়িটা ফোর-হুইল-ড্রাইভ, কিশোর বলল। তিনি ওদিকেই গেছেন।

উত্তেজিত হয়ে পড়েছে মুসা। তাহলে আমরা যাচ্ছি না কেন? চিহ্ন ধরে ধরে তাকে অনুসরণ করতে পারি। জিনা তোমার চাচার একটা ফোর-হুইল-ড্রাইভ ট্রাক আছে, আর…

আর আমি সেটা চালাতেও পারি, মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল জিনা। তবে সেটা ব্যাঙ্ক এলাকার মধ্যে, সমতল জায়গায়। এখানে আমি তো দূরের কথা, আমার ওস্তাদ… হঠাৎ উজ্জল হলো তার চেহারা। ঘোড় নিতে পারি আমরা। মিসেস ফিলটারের কি অবস্থা কে জানে। গাড়ি খারাপ হয়ে গিয়ে থাকলে ভীষণ বিপদে পড়বেন। আমরা তাকে সাহায্য করতে পারব। ডিকিখালা এখন দয়া করে যদি কিছু খাবার গুছিয়ে দেয়, আর চাচাকেবোঝায়

…তাহলে সত্যিকারের একটা ভূতুড়ে শহরে দেখতে পাব আমরা, রবিনও উত্তেজিত।

ডিকিখালাকেবোঝানোর দায়িত্ব তোমার, জিনা, হেসে বলল মুসা। তুমি এক মিনিটে যতগুলো মিছে কথা বলতে পারবে, আমরা তিনজনে মিলে এক বছরেও তা পারব না।

১৪

খাবার গুছিয়ে দিতে কার্পণ্য করল না ভিকি। স্যাডল ব্যাগে সেগুলো ঠেসে ভরে নিতে হলো অভিযাত্রীদের।

খাবার গরম করার সময় খুব সাবধান, হুঁশিয়ার করে দিল ভিকি। পুরো পূর্বতটা জ্বালিয়ে এসো না আবার, বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানাল সে।

জিনা চড়েছে তার প্রিয় অ্যাপলুসায়। কিশোরেরটা মোটাসোটা মাদী ঘোড়া। মুসারটা হাড় জিরজিরে। হেসেই বাঁচে না জিনা, ঠাট্টা করে বলেছে, দেখো, তোমার যা ওজন, বেচারার মেরুদণ্ড না বাঁকিয়ে দাও। রবিনেরটা আংকেল উইলসনের তৃতীয় এবং সর্বশেষ, বেশ তেজী একটা ঘোড়া, ধূসর রঙের চামড়ায় সাদা ফুটকি।

মাঝারি কদমে ম্যাকআরথারের গেট পেরোল ওরা। ওদের দেখে যেন পাগল হয়ে গেল কুকুরটা, তার চিৎকারে ফিরে না চেয়ে পারল না দুই মেকসিকান শ্রমিক। ওরা এখন কেবিন রঙ করায় ব্যস্ত।

পাহাড়ী পথ ধরে আগে আগে চলেছে জিনা। তার কাছাকাছি রয়েছে কিশোর, কমেটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হিমশিম খাচ্ছে হোঁতকা মাদীটা। তাছাড়া তাল রাখার দিকে থােরাই নজর ঘোড়াটার, তার খেয়াল পথের দুপাশে কোথায় তাজা। ঘাস আছে। দেখলেই সেদিকে এগোনোর চেষ্টা। সামলাতে সামলাতে ইতিমধ্যেই ঘেমে উঠেছে কিশোর। এক সময় হাল ছেড়ে দিল। মনের ভাব : যা খুশি করগে মুটকির বেটি মুটকি।

বাধ্য হয়ে সাহায্যের হাত বাড়াতে হলো জিনাকে। কমেটকে ঘুরিয়ে এনে মাদীটার পাশাপাশি হলো, কিশোরের হাত থেকে রাশ নিয়ে জোরে টান দিয়ে দেখিয়ে দিল অবাধ্য ঘোড়াকে কি করে বাগ মানাতে হয়।

জোরে রাশ টেনে ধরে ঘোড়ার মাথা ওপরের দিকে তুলে রাখল কিশোর। কিন্তু কতক্ষণ আর এভাবে জোর জবরদস্তি করা যায়, কয়েক মিনিট পরই ঢিল দিয়ে দিল। আবার সেই একই কাণ্ড, হাঁটার চেয়ে ঘাস খাওয়ার দিকে মনযোগ বাড়াল ঘোড়া।

এভাবে গেলে তো সারা দিন লাগবে, বিরক্ত হয়ে বলল জিনা।

ঘোড়র পেটে জোরে লাথি লাগাল কিশোর, এই মুটকি, হাট।

বড় জোর দশ কদম ঠিকমত এগোল ঘোড়া, তারপর আবার এক পা বাড়ে তো দুপা পাশে সরে। একটা বাংলা কবিতা মনে পড়ে গেল কিশোরের, বিড়বিড় করল?

এক যে ছিল সাহেব তাহার
গুণের মধ্যে নাকের বাহার
তার যে গাধা বাহন সেটা
যেমন পেটুক তেমনি চেঁটা
ডাইনে বললে যায় সে বামে
তিন পা যেতে দুবার থামে…
ব্যাপার দেখে এমনি তরো
সাহেব বললেন সবুর করো
মূলোর কুঁটো ঝুলিয়ে নাকে…

এ পর্যন্ত বলেই আপনমনে হাসল কিশোর, বলল, দাঁড়াও, তোমার ব্যবস্থাও করছি, বলেই নেমে পড়ল ঘোড়া থেকে। রাশটা জিনার হাতে ধরিয়ে দিয়ে রাস্তার পাশ থেকে একটা লাঠি কুড়িয়ে নিল। খুব তাজা আর সবুজ দেখে এক আঁটি ঘাস তুলে নিয়ে বাঁধল লাঠির মাথায়। তারপর আবার ঘোড়ায় চেপে লাঠিটা ধরল ওটার নাকের সামনে, এমনভাবে, যাতে কোনমতেই নাগাল না পায় ঘোড়া।

ব্যস, কাজ হয়ে গেল। ঘাস ধরার জন্যে মাথা উঁচু করে ছুটল ঘোড়া, যতই ছোটে ততই আগে বাড়ে ঘাস, নাগাল আর মেলে না। হাসতে হাসতে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো মুসার। জিনা আর রবিনও হাসছে। হাসতে হাসতে রবিন বলল, জিনা, তোমার রাশ টানার চেয়ে কিশোরের ঘাস টানার বুদ্ধি

অনেক মোক্ষম হা-হা-হা!

টায়ারের দাগ ধরে এগিয়ে চলেছে ওরা। দু-ধারে পাইনবন, তার ওপাশে পর্বতের ঢালে কি আছে দেখা যায় না। বেলা একটার দিকে নয় চূড়ায় পৌঁছলো ওরা, দ্রুত নেমে চলল হ্যামবোনের ধুলোয় ঢাকা প্রধান সড়ক ধরে। চারপাশে খটখটে শুকনো কাঠের বাড়িঘর, ভাঙাচোরা জানালা, রঙচটা সানশেড়। সাইনবোর্ডগুলো পড়া যায় না। পথের ওপর পড়ে আছে বিছানা আর সোফায় মরচে ধরা স্প্রিং, ভাঙা আসবাবপত্র, কাচের টুকরো, ছড়িয়ে আছে বাড়ির সামনে, আনাচে-কানাচে।

একটা বাড়ির সামনে এসে ঘোড়া থেকে নামল জিনা। এককালে ওটা হ্যামবোনের জেনারেল স্টোর ছিল। বারান্দার রেলিঙের সঙ্গে ঘোড়াটাকে বাঁধল সে।

ছেলেরাও নামল। অনেকক্ষণ ঘোড়ার পিঠে বসে থেকে শক্ত হয়ে গেছে যেন শরীর। যার যার ঘোড়া বেঁধে, হাত-পা ঝাড়া দিল।

বাবারে, কি নির্জন, চার দিকে তাকাতে তাকাতে বলল মুসা, আশঙ্কা করছে যেন এখুনি একটা ভূত বেরিয়ে আসবে।

লোক থাকে না বলেই তো ভূতুড়ে শহর বলে, জিনা বলল। রাস্তার মাথায় বড় একটা ছাউনির দিকে হাত তুলল। বেড়া আর ছাত করোগেটেড টিনের, জায়গায় জায়গায় মস্ত কালো ফোকর। শ্রমিকরা নিশ্চয় কাজ করত ওখানে।

মস্ত ছাউনিটার দিকে এগোল ওরা।

দেখেশুনে চলবে, হুঁশিয়ার করল জিনা। ওই যে, টিনের টুকরো কাঠের টুকরো পড়ে আছে, ওগুলোর কাছে যাবে না, কোন জিনিস তোলার চেষ্টা করবে না। রোদ থেকে বাচার জন্যে র্যাটল স্নেক লুকিয়ে থাকে ওসবের নিচে। ভয় পেলে

জানি কি করে, বলল মুসা। ভেব না। জঞ্জালের ভেতর কিছু খুঁজতে যাচ্ছি না আমরা।

ছাউনির কাছে এসে দাঁড়াল ওরা। অনেক আগেই খসে পড়ে গেছে দরজার পান্না। উঁকি দিয়ে ভেতরের বিষণ্ণতা দেখল সবাই।

হুঁ, কাঠের মেঝে, রবিন বলল। আমাদের ভার সইতে পারবে?

সওয়াতে যাচ্ছে কে, কিশোর বলল। ভেতরে ঢুকছি না আমরা। ট্রাক নেই ওখানে। শুধু ভূতুড়ে শহর দেখতে আসিনি আমরা। রাস্তায় সরে এসে টায়ারের দাগ পরীক্ষা করল। দাগ ধরে ধরে গিয়ে থামল ছাউনির এক কোণে। উঁকি দিয়ে একবার তাকিয়েই বলে উঠল, ওই তো।

কি? ছুটে এল জিনা।

মুসা আর রবিনও এল।

পিকআপটা দাঁড়িয়ে রয়েছে।

মিসেস ফিলটার! চেঁচিয়ে ডাকল জিনা। ছুটে গেল গাড়ির দিকে, মিসেস ফিলটার! আপনি কোথায়?

গাড়ির কাছে প্রায় পৌঁছে গেছে জিনা, এই সময় শোনা গেল একটা বিচ্ছিরি টি-রু-র শব্দ।

জিনা! খবরদার! চেঁচিয়ে উঠল কিশোর।

লাফিয়ে পেছনে সরার চেষ্টা করল জিনা, কিন্তু তাড়াহুড়োয় পিছলে গেল পা। ধড়াস করে চিত হয়ে পড়ল বালিতে। ট্রাকের নিচ থেকে উড়ে এল যেন একটা মোটা দড়ি, ছোবল হানল এক মুহূর্ত আগে জিনার পা যেখানে ছিল ঠিক সেখানে। কুৎসিত একটা চ্যাপটা মাথা, হাঁ করা চওড়া চোয়ালে ভয়ঙ্কর দুটো বিষদাত।

পাথর হয়ে গেছে যেন জিনা।

পুরো এক সেকেণ্ড লম্বা হয়ে পড়ে রইল সাপটা, তারপর লেজের টি শব্দ তুলে গুটিয়ে নিতে লাগলু শরীর।

নড়ে না, জিনা, ফিসফিস করল মুসা। একটা পাথর তুলে নিয়ে নিশানা করে ছুঁড়ে মারল জোরে।

বাহ, এক্কেবারে বুলস-আই, হাততালি দিল রবিন। মাথা খতম। বড় বাঁচা বাচা গেছে জিনা।

কোনমতে উঠে দাঁড়াল জিনা, দুর্বল রোগীর মত রক্তশূন্য চেহারা। কাঁপা গলায় মুসার দিকে চেয়ে শুধু বলল, থ্যাংক।

মরে গেছে সাপটা, কিন্তু এখনও শরীর মোচড়াচ্ছে, পাক খাচ্ছে। ধীরে ধীরে থেমে এল নড়াচড়া।

ট্রাকের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে নিচু হয়ে তলায় উঁকি দিল মুসা। আর না থাকলেই বাঁচি।

সাপটার পাশ ঘুরে ট্রাকের একেবারে কাছে চলে এল ওরা। কেবিনের ভেতরে উঁকি দিল। মিসেস ফিলটার নেই। খালি। সামনে-পেছনে কোথাও মালপত্র নেই। ইগনিশনের চাবিটাও নেই।

এখানে এভাবে গাড়িটা ফেলে গেল, কানের পেছনে চুলকাল রবিন। কিছু বুঝতে পারছি না।

আমিও না, জিনা বলল, কোথায় যেতে পারে? মালপত্রই বা কোথায়?

কোথাও লুকিয়ে নেই তো? এদিক ওদিক তাকাল মুসা। শহরটা খুজে দেখল ওরা। জানালা-দরজায় দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখল ঘরের ভেতরে। কিন্তু ভাঙা আসবাব আর ময়লা জঞ্জাল ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ল না। এখানে ওখানে বালিতে পায়ের ছাপ আছে।

মিসেস ফিলটার নেই।

লোক যাতায়াত আছে, চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল কিশোর। আবার পিকআপের কাছে এল ওরা। ওদের পায়ের ছাপ ছাড়াও ছাপ আছে। ওগুলো অনুসরণ করে এগোল কিশোর। বিশ গজ দূরে আরেক সেট টায়ারের দাগ দেখা গেল।

জীপ কিংবা ট্রাক নিয়ে আরও কেউ এসেছিল, মুসা বলল।

দাগ ধরে এগোল ওরা। শহরের এক কিনারে চলে এল। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে গেছে আরেকটা সরু পথ, ওরা যেটা দিয়ে এসেছিল তার উল্টোদিকে, এই পথটা মোটামুটি ভাল অবস্থায়ই রয়েছে।

চুপ করে কিছু দেখছে কিশোর। বলল, কারও সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন কিনা কে জানে। টুইন লেকস থেকে এসেছেন নিজের গাড়ি নিয়ে। আগেই ঠিক করা ছিল অন্য কেউ এখানে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করবে। নিজের গাড়িটা এখানে ফেলে মালপত্র নিয়ে অন্য গাড়িতে করে চলে গেছেন মিসেস ফিলটার। জিনা, এ-পথটা কোথায় গেছে?

শিওর না, মাথা নাড়ল জিনা। শুনেছি, ওদিকে মরুভূমি।

নিচে গাছের মাথায় ধুলোর ঝড় দেখা গেল, ঢালের দিক থেকে ভেসে এল এঞ্জিনের শব্দ, লো-গীয়ারে চলছে গাড়ি, ফলে গোঁ গোঁ বেশি করছে।

ফিরে আসছে বোধহয়, ভুরু কুঁচকে পথের মোড়ের দিকে চেয়ে আছে মুসা।

কিন্তু মিসেস ফিলটার ফেরেনি। একটা জীপ। আলগা নুড়িতে ঠিকমত কামড় বসাতে পারছে না চাকা, এবড়োখেবড়ো পথের ঝুঁকুনি আর খাড়াই গাড়ির গতি একেবারে কমিয়ে দিয়েছে। ড্রাইভিং সিটে বসে আছে একজন বয়স্ক লোক, মাথায় ছড়ানোকানাওয়ালা খড়ের তৈরি হ্যাট। পাশে বসা এক মহিলা, পরনে ছাপার সুতি পোশাক।

হাই! পাশে এসে গাড়ি থামাল লোকটা। হাসল।

হাই, হাত তুলে জবাব দিল মুসা।

তোমরাই শুধু?

মাথা নোয়াল মুসা।

বোতল শিকারে এসেছ নিশ্চয়?

বোতল শিকার? জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল রবিন।

আমরা সেজন্যেই এসেছি, মহিলা বলল। সেই ক্যাসা ভারডে থেকে। এসব পুরানো জায়গায় মাঝেসাঝেই পুরানো আমলের চমৎকার সব বোতল পাওয়া যায়। তবে খোঁজার সময় সতর্ক থাকতে হয়। হাত দেয়া উচিত না। লাঠি দিয়ে সরিয়ে নেয়াটাই ভাল। নইলে সাপের যা আজ্ঞা এসব পোছড়া জায়গায়।

জানি, বলল কিশোর। আচ্ছা, আরও নোক আসে নাকি এখানে?

হয়তো আসে, জবাব দিল লোকটা। রাস্তা খুব খারাপ নয় সেটা একটা কারণ। আর বোতল না পাওয়া গেলেও, অন্যান্য জিনিস পাওয়া যায়। গত হপ্তায় অন্য একটা গোস্ট টাউনে গিয়েছিলাম। পুরানো আমলের একটা কেরোসিনের ল্যাম্প পেয়েছি, প্রায় নতুন।

জীপটা চালিয়ে নিয়ে জেনারেল স্টোরের সামনে রাখল সে।

টায়ারের দাগের ব্যাপারে আর শিওর হওয়া যাচ্ছে না, হাত নাড়ল রবিন। যে দাগ ধরে এলাম এখানে, সেটা কোন অ্যানটিক শিকারিরও হতে পারে।

হুঁ, ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল কিশোর। মিসেস ফিলটারকে খুঁজে বের করার আর কোন উপায় দেখছি না।

১৫

খাবার গরম করে খেয়ে আবার ঘোড়ায় চড়ল ওরা। গতি ধীর। রাস্তা খুব খারাপ, পিছলে পড়ে হাড়গোড় ভাঙার ইচ্ছে নেই কারও। কাছাকাছি রয়েছে ওরা। প্রাণের ভয় সবারই আছে, জানোয়ারগুলোও তাই খুব সর্তক, কিশোরের হোতকাটাও আর ঘাসের লোভ করছে না এখন।

বিশ্বাস হচ্ছে না, এক সময় বলল কিশোর। মিসেস ফিলটারের মত মহিলা আতঙ্কিত হয়ে পালাবেন…।

সব তোমার অনুমান, জিনা বলল। তার আসলে কি হয়েছে কে জানে।

একটা ব্যাপারই হয়েছে, জোর দিয়ে বলল কিশোর, যেই বুঝতে পেরেছেন তাকে সন্দেহ করা হচ্ছে, অমনি পোটলা বেঁধে পালিয়েছেন। এমনও হতে পারে, টুইন লেকসে তার কোন সঙ্গী ঘোরাঘুরি করছিল কদিন ধরে। ভুলে যাচ্ছ কেন, ছুরিটা এখনও পাওয়া যায়নি।

মুসার মুখ উজ্জ্বল হলো। হ্যাঁ, তাই তো। ওই ব্যাটাই চুরি করেছে। মিসেস ফিলটারই হয়তো সে-রাতে চোরটাকে নিজের বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছিলেন।

খাবার চুরির রহস্যটাই বা কি? রবিন বলল। আর সিগারেটের গোড়া?

কি? জিজ্ঞেস করল জিনা।

হতে পারে চোরটা তখনও মিসেস ফিলটারের ঘরেই ছিল, আমরা যেদিন তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। খিদে পেয়েছিল, তাই আমরা ঘর থেকে বেরোতেই খেয়ে নিয়েছে সে। মনে করে দেখো, খাবার নেই এ-ব্যাপারটা প্রথমে মিসেস ফিলটারের চোখে পড়েনি, কিশোর বলার পর

চমৎকার যুক্তি, রবিন, বলল কিশোর। ঠিক পথেই ভাবছ।

তোমাদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে! রেগে গেল জিনা।

উত্তেজিত হয়ো না জিনা, কিশোর বলল। সবই আমাদের অনুমা। অনেকগুলো উদ্ভট ব্যাপার ঘটছে তো। পাঁচ বছরের পুরানো একটা লাশ পেলাম খনিতে, পাঁচ বছর আগের এক ডাকাতির সঙ্গে জড়িত ছিল লোকটা। সন্দেহভাজন বিধবা মহিলা রহস্যজনক ভাবে নিখোঁজ হয়ে গেলেন। গাছ কাটার একটা ছুরি চুরি গেল, ডাকাতদের সঙ্গে এটারও কোন সম্পর্ক থাকতে পারে। একটা বাতিল রূপার খনির মুখ খুলে খনি-খনি খেলা শুরু করেছে এক আধপাগলা কোটিপতি। কুড়িয়ে পেলাম একটা সোনা মেশানো নুড়ি। অথচ, মিসেস ফিলটারের কথামত এক আউন্স সোনা থাকার কথা নয় খনিতে।

হয়তো মিছে কথা বলেছেন, মুসা বলল।

কেন বলবেন? ম্যাকআরবারের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক আছে বলে তো মনে হলো না।

যদি টাকাগুলো খনিতে লুকানো থাকে? মিসেস ফিলটারের সে কথা জানা থাকলে, ম্যাকআরবারের মতই চাইবেন খনিতে কেউ না ঢুকুক।

এরপর বাকি পথটা প্রায় নীরবে পেরোল ওরা, বিশেষ কোন কথা হলো না। শেষ বিকেলে এসে নামল উপত্যকায়। ম্যাকআরবারের লাল ট্রাকটা নেই। কেবিনের কাছে পড়ে রয়েছে রঙের বালতি, কিন্তু মেকসিকান শ্রমিকেরা অদৃশ্য। বিকেলের সোনালি রোদে লম্বা হয়ে শুয়ে ঘুমে অচেতন বিশাল কুকুরটা।

স্তব্ধ নীরবতার মাঝে শুধু ঘোড়ার খুরের খটাখট শব্দ, বেশি হয়ে কানে বাজছে। বেড়ার কিনার দিয়ে এল ওরা। কিন্তু কুকুরটার খবরই নেই যেন, ঘুমাচ্ছে।

অদ্ভুত তো, কিশোর বলল। এতক্ষণ তত বেড়া ভাঙার চেষ্টা করার কথা।

র‍্যাঞ্চে ফিরে ঘোড়াগুলো খেয়াড়ে ঢুকিয়ে রাখল ওরা। বাড়ির সদর দরজা খোলা। রান্নাঘরের টেবিলে একটা নোট পাওয়া গেল, মিস্টার উইলসন লিখে রেখে গেছেন?

ভিকির বোন জরুরী
খবর দিয়েছে। তাকে
নিয়ে সিলভার
সিটিতে গেলাম।
ফিরতে রাত হবে।
ঠাণ্ডা খাবার দিয়েই
কোনমতে আজ
ডিনার সেরে নিও।

-লাভ, আঙ্কেল
উইলসন।

দারুণ! উজ্জ্বল হয়ে উঠল কিশোরের মুখ।

আমার কাছে তো দারুণ লাগছে না, জিনা বলল তোমার হয়েছে কি, কিশোর, ডিকিখালার বোনের শরীর খারাপও তো হতে পারে?

না হলেই খুশি হব, অন্তর থেকেই বলল কিশোর।

খুশি হয়েছি কেউ নেই দেখে। মিসেস ফিলটার নেই, ম্যাকআরের ট্রাকটা নেই—তারমানে সে-ও নেই, তার শ্রমিকেরা নেই। আঙ্কেল উইলসন আর ভিকিখালাও নেই। দারুণ বলব না? খনিতে ঢোকার এর চেয়ে মোক্ষম সুযোগ আর পাব?

পকেট থেকে নুড়িটা বের করে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে খপ করে ধরল আবার সুে, সঙ্গীদের দিকে তাকাল। চলো, এখুনি। এমন সুযোগ আর পাব না। দেখি গিয়ে কি মেলে খনিতে।

কুত্তাটা? মনে করিয়ে দিল মুসা। কেউ না থাকলেও ওটা তো আছে।

ব্যবস্থা করছি, ফ্রিজের কাছে প্রায় উড়ে গিয়ে পড়ল জিনা। ভেড়ার আস্ত এক রান বের করে নিয়ে বলল, বাঘা কুত্তার ওষুধ। অনেকক্ষণ ব্যস্ত থাকবে।

কয়েক মিনিট পর ম্যাকআরথারের বেড়ার ধারে এসে দাঁড়াল ওরা। কুকুরটা এখনও ঘুমাচ্ছে।

সেৎসি মাছি কামড়েছে নাকি ব্যাটাকে? মুসা বলল।

সেৎসির কামড়ে কুকুরের কিছু হয় না, জানাল রবিন। শুধু মানুষ আর গাধার ওপর কাজ করে ওদের বিষ।

খাইছে! গাধা আর মানুষ তাহলে এক টাইপের প্রাণী? ইজ্জত গেল। হেই কুত্তা, হেই বাঘা। ওঠ, ওঠ।

এই যে তোর খাবার নিয়ে এসেছি, ভেড়ার ঠ্যাঙটা নাড়ল জিনা।

কিন্তু নড়লও না বাবা।

আবার ডাকল মুসা। কিন্তু সাড়া নেই। অশেষে বেড়া ডিঙাল সে, ওপরে চড়ে লাফিয়ে নামল অন্য পাশে, ম্যাকআরবারের সীমানা ভেতরে।

সাবধান, হুঁশিয়ার করল রবিন, জেগে উঠে কামড়ে দিতে পারে।

জিনা, দেখি রানটা দাও তো, বলল মুসা। ওপর দিয়ে ছুঁড়ে দাও। কুত্তা মিয়া কখন আবার লাফিয়ে ওঠে।

রানটা লুফে নিয়ে কুকুরটার দিকে ফিরল মুসা। মরে গেল নাকি?

মুসার মতই বেড়া ডিঙাল তিনজনে। রানটা নিয়ে নিল আবার জিনা। এক সঙ্গে চারজনে এগোল কুকুরটার দিকে।

এই তো ছেলে, লক্ষ্ণী ছেলে, রাগে না, কোমল গলায় বলতে বলতে হাঁটু মুড়ে বলল জিনা। কুকুরটার দিকে হাত বাড়াল।

হুঁশিয়ার! বাঘা কুত্তা কিন্তু, ফিসফিস করে বলল কিশোর।

কিন্তু বাঘা কুত্তার ঘুম ভাঙল না। জিনা গায়ে হাত বোলালে মৃদু লেজ নেড়ে শুধু গোঁ গোঁ করল ঘুমের মধ্যেই।

কুকুরের এত ঘুম? এদিক ওদিক তাকাল সে। বেড়ার কাছে একটা টিন দেখে এগিয়ে গেল। যা সন্দেহ করেছিল। খানিকটা মাংস অবশিষ্ট রয়েছে এখনও। ওখান থেকেই ঘোষণা করল, ঘুমের ওষুধ খাইয়েছে।

কে খাওয়াল, দেখার জন্যেই যেন চারদিকে তাকাল অন্য তিনজন। কিন্তু কাউকে চোখে পড়ল না।

মেকসিকানগুলো গেল কোথায়? নিচু কণ্ঠে বলল রবিন।

এই, শুনছেন? চেঁচিয়ে ডাকল মুসা। কেউ আছেন? প্রতিধ্বনি তুলে তার ডাকের সাড়া দিল শুধু পাহাড়।

বোঝা গেছে, কেউ নেই, উঠে দাঁড়াল জিনা। প্যান্টের পেছনের পকেট থেকে টর্চটা টেনে বের করে বলল, চলো, কেউ চলে আসার আগেই ঢুকে পড়ি।

খনিমুখের দিকে এগোল সে। অন্ধকার একটা কালো গহ্বর, ভেতরের কিছুই চোখে পড়ছে না। সূর্য ডোবেনি, তবে পাহাড়ের ওপারে অদৃশ্য হয়েছে। অন্ধকার নামছে তাই উপত্যকায়।

ভেতরে ঢুকল ওরা।

আলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল জিনা। কি করেছে ব্যাটারা? বোমা মেরেছে কোন জায়গায়?

আসিনি এখনও সেজায়গায়, কিশোর বলল। আরও ভেতরে ঢুকতে হবে। চাপা আওয়াজ হয়েছে, তারমানে অনেক গভীর থেকে বেরিয়েছে। চলো, যে জায়গায় নুড়িটা পেয়েছি সেখানে।

জিনার হাত থেকে টর্চটা নিয়ে আগে আগে চলল কিশোর। আগের বারের মত পরিষ্কার নয় আর এখন পথ, আলগা নুড়ি আর পাথরে বিছিয়ে আছে, জায়গায় জায়গায় ছোট ছোট খুপ। পঞ্চাশ ফুট মত এগিয়ে পাওয়া গেল ফোকরটা, এখানেই বোমা মারা হয়েছে। ভেতরে কি যেন চকচক করছে।

দেখো দেখো, চেঁচিয়ে উঠল মুসা, সোনা!

ফোকরে ঢুকল কিশোর। টর্চের আলোয় ঝকঝক করছে হলদে ধাতু। আঙুল দিয়ে খুঁচিয়ে টুকরোটা বের করে নিয়ে এল সে। আশ্চর্য!

মিসেস ফিলটার ভুল বলেছেন, জিনা বলল। খনিটাতে স্বর্ণ আছে।

হঠাৎ স্থির হয়ে গেল চারজনেই।

খনির বাইরে শব্দ। গুলি করেছে কেউ, কিংবা গাড়ির এঞ্জিনের মিসফায়ার।

কে যেন আসছে, ফিসফিস করল মুসা।

চলো ভাগি, জরুরী কণ্ঠে বলল জিনা। আবার ধরা পড়তে চাই না।

সোনার টুকরোটা পকেটে রেখে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এল কিশোর, অন্যেরাও বেরোল ফোকর থেকে। মোড় নিয়ে গলি থেকে বেরিয়ে প্রধান সুড়ঙ্গে ঢুকতেই অতি আবছা আলো চোখে পড়ল, খনিমুখ দিয়ে আসছে সঁঝের ফেকাসে সবুজ আলো। টর্চ নিভিয়ে দিল কিশোর। পায়ে পায়ে এগোল মুখের দিকে।

কুকুরটা তেমনি শুয়ে আছে, আবছা অন্ধকারে অস্পষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছে। বেড়ার বাইরে টায়ারের শব্দ তুলে থামল একটা গাড়ি। দুজন লোক বেয়োল গাড়ি থেকে।

হ্যারি, বলল একজন, পাথর দিয়ে বাড়ি মারো।

দরকার কি? খসখসে কণ্ঠস্বর দ্বিতীয় জনের। গুলি করলেই তো হয়।

তোমার যা কথা না। গুলির শব্দ শুনে ফেলুক কেউ, আর মোটকা শেরিফটাকে খবর দিয়ে দিক। নাও, পাথর নাও। দূর থেকেও তার নিঃশ্বাসের ফোঁস ফোঁস শব্দ শুনতে পাচ্ছে ছেলেরা।

কিশোর! ফিসফিসিয়ে বলল মুসা। এই ব্যাটাই! ও-ই ঢুকেছিল সেদিন গোলাঘরে। আমাকে কোপ মারার আগে ওরকম করেই শাস ফেলেছিল।

খনির অন্ধকারে পিছিয়ে এল আবার চারজনে।

কি করি এখন? জিনা বলল। দৌড় দিয়ে পেরোতে পারব না, ধরে ফেলবে। ভাসাব দেখে মোটেই ভাল লোক মনে হচ্ছে না।

পাথর দিয়ে বাড়ি মারার ঠনঠন শব্দ কানে এল। খানিক পরই ভেঙে পড়ল গেটের তালা।

এখনও থাকলে, ওই ঘরেই আছে, হ্যারির খসখসে কণ্ঠ। বিংগো, কি মনে হয় তোমার?

না-ও থাকতে পারে, জবাব দিল ফোঁস ফোঁস নিঃশ্বাস। উঠান পেরোচ্ছে ওরা। যথেষ্ট সময় পেয়েছে, সহজেই অন্য কোথাও লুকিয়ে ফেলতে পারে।

ঘরে না পেলে খনিতে খুঁজব।

সেখানে না পাওয়া গেলে চুপ করে গিয়ে লুকিয়ে বসে থাকব। সাহেব এলেই ধরব গলা টিপে।

রসিকতায় হাসন দুজনেই। দরজা খোলার শব্দ হলো। কেবিনে ঢুকছে।

আমাদের দেখে ফেলবে এখানে এনে, চি চি করে উঠল জিনার কণ্ঠ। কোনমতে পালানো দরকার। র‍্যাঞ্চে গিয়ে শেরিফকে ফোন করব।

পাগল নাকি? আঁতকে উঠল মুসা। ওদের সামনে দিয়ে? বন্দুক আছে।

হামাগুরি দিয়ে খনিমুখের কাছে গিয়ে সাবধানে বাইরে উঁকি দিল কিশোর। ছাউনিটার কাছে এক বালতি তরল পদার্থ পড়ে আছে। আরেকটু এগিয়ে তরলের গন্ধ শুকল সে, ছুঁয়ে দেখল ছাউনির খটখটে শুকনো কাঠের পাল্লা।

খনিতে ফিরে এল কিশোর। রঙ গোলানোর তেল, মেকসিকানরা ফেলে গেছে, বলল সে। ছাউনিতে আগুন ধরিয়ে দিলে শহরের কারও না কারও চোখে পড়বে। ফায়ার ব্রিগেডকে খবর দেবে। মুসা, দেশলাই আছে না তোমার কাছে? হ্যামবোনে খাবার গরম করেছিলে যে?

দেশলাই বের করে দিল মুসা।

ছাউনিতে গিয়ে পালা আর বেড়ার কাঠ তেল দিয়ে ভেজাল যতখানি পারল। কাঠি জ্বেলে তাতে দিল লাগিয়ে। দপ করে জ্বলে উঠল আগুন, চোখের পলকে ছড়িয়ে গেল। সময় মত সরে এল সে।

চমৎকার! হাসিমুখে কাল মুসা। কাজ না হয়েই যায় না।

কি মনে পড়তে আচমকা চেঁচিয়ে উঠল কিশোর। জলদি জলদি ঢোকো! ধাক্কা দিয়ে জিনাকে সরিয়ে দিল সে আরও ভেতরে, মুসা আর রবিনের হাত ধরে টান দিয়ে নিজে ডাইভ দিয়ে পড়ল মেঝেতে। বিচিত্র ভঙ্গিতে অনেকটা ব্যাঙের মত লাফিয়ে সরে গেল যতটা পারল।

কি ব্যাপার বলতে গিয়ে বাধা পেল মুসা।

ডিনামাইট, বলেই আরও ভেতরে সরে গেল কিশোর। নিশ্চয় ছাউনিতে রেখেছে ম্যাকআরথার।

তার কথার প্রমাণ দিতেই যেন প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল ধরণী।

১৬

একের পর এক বোমা ফাটতে লাগল, বাজ পড়ার মত প্রচণ্ড শব্দে কানে তালা লেগে যাবার জোগাড়।

এক সময় থামল সেটা। পাহাড়ে পাহাড়ে প্রতিধ্বনির রেশ মিলাতে আরও কয়েক সেকেন্ড লাগল।

হুমড়ি খেয়ে পড়তে পড়তে কোনমতে খনি থেকে বেরিয়ে এল ছেলেরা। খনিমুখের চারপাশে পোড়া কাঠ আর জ্বলন্ত অন্যান্য জিনিস।

শুধু আগুন চেয়েছিলাম… উত্তেজনায় কথা রুদ্ধ হয়ে গেল মুসার।

এরপর সাংঘাতিক দ্রুত ঘটতে শুরু করল ঘটনা। বিল্ডিঙের দরজা খুলে বেরিয়ে এল দুই মেকসিকান শ্রমিক। বেড়া ডিঙিয়ে ছুটে হারিয়ে গেল খনিমুখের ওপরে পাথরের স্তুপের আড়ালে। কেবিন থেকে লাফিয়ে বেরোল হ্যারি আর বিগো। ঠিক এই সময় গেট দিয়ে ঢুকতে শুরু করল ম্যাকআরবারের লাল ট্রাক।

মিস্টার ম্যাকআরথার, চেঁচিয়ে উঠে দৌড়ে গেল মুসা। সাবধান! ব্যাটাদের কাছে বন্দুক আছে।

ঝট করে ঘুরে তাকাল হ্যারি।

এক ঝটকায় দরজা খুলে গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামল ম্যাকআরথার, হাতে শটগান। থামো ওখানে! আর এক পা বাড়ালে

কিন্তু থামল না হ্যারি। ম্যাকআরথার বন্দুক সোজা করার আগেই মুসার কাধ খামচে ধরে হ্যাঁচকা টানে ঘুরিয়ে ফেলল, তার পেছনে চলে এল। গুলি খেলে এখন মুসা খাবে।

পিঠে কঠিন ধাতব স্পর্শ অনুভব করল মুসা।

বন্দুক ফেলে দাও ম্যাকআরখার, আদেশ দিল হ্যারি। নইলে ছেলেটার পিঠ ফুটো করে দেব।

ধীরে ধীরে বন্দুক নামাল ম্যাকআরখার, ছেড়ে দিল হাত থেকে।

ছুটে এসে বন্দুকটা কুড়িয়ে নিল বিংগো, মুখে কুৎসিত হাসি। জিনার দিকে চেয়ে বলল, এদিকে এসো, খুকি। জলদি!

না, যেও না, জিনার পথরোধ করে দাঁড়াল রবিন।

সরো, ধমক দিল বিগো। এগিয়ে এসে এক ধাক্কায় রবিনকে সরিয়ে জিনার কজি চেপে ধরল, মুচড়ে হাত নিয়ে এল পিঠের ওপর। ঠেলা দিয়ে বলল, হাঁটো।

দূরে শোনা গেল সাইরেনের তীক্ষ্ণ বিলাপ, ফায়ার ব্রিগেড আসছে।

একে অন্যের দিকে তাকাল হ্যারি আর বিংগো, জিম্মিদেরকে আরও শক্ত করে ধরল।

হ্যামবোনের দিকের পথটা ঠিকমত নজরে আসছে না, সেদিকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল বিগো, পথটা কোথায় গেছে, খুকি?

একটা…একটা ভূতুড়ে শহরে, জবাব দিল জিনা।

পাহাড়ের ওদিকে কি আছে?

শুধু মরুভূমি, ভয় পাচ্ছে জিনা, কিন্তু প্রকাশ করছে না।

ম্যাকআরধারের ট্রাকটা দেখাল বিংগো। এতে করেই যেতে পারব। ফোরহইল-ড্রাইভ।

এসব করে পার পাবে না। চেঁচিয়ে বলল জিনা।

চুপ! ফোঁস ফোঁস করে উঠল বিংগো।

এগিয়ে আসছে ফায়ার ব্রিগেডের সাইরেন।

জলদি। ট্রাকে। জিনাকে ঠেলা দিল বিংগো। তাকে সামনে তুলে দিয়ে নিজে

মুসাকে নিয়ে হ্যারি উঠল পেছনে।

অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল কিশোর, রবিন আর ম্যাকআরথার। তাদের চোখের সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছে ট্রাকটা, কিন্তু কিছুই করতে পারছে না।

গেটের বাইরে ছুটে গেল কিশোর আর রবিন। আলো না জেলেই গাড়ি চালাচ্ছে বিগো, অল্পক্ষণেই হারিয়ে গেল পাইনবনের আড়ালে।

উল্টো দিকে, আঙ্কেল উইলসনের গেটের আরও ওদিকে দেখা যাচ্ছে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ির লাল আলো।

কয়েক মিনিট পর ম্যাকআরথারের গেটের কাছে এসে থেমে গেল সাইরেন। পেছনেই এসেছেন শেরিফ, হঠাৎ ব্রেক কষায় স্কিড করে থেমে গেল গাড়ি।

ছাউনির ভস্মযুপ দেখলেন শেরিফ। ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ির হুইলে বসা লোকটাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, জরুরী অবস্থা শেষ। জুলার আর কিছু বাকি নেই। ম্যাকআরবারের দিকে এগোলেন। হয়েছিল কি? শহর থেকে তো মনে হলো পুরো পর্বত ধসে পড়ছে।

দ্রুত সামনে এসে দাঁড়াল কিশোর। ছাউনিতে আগুন দিয়েছিলাম আমি। দুটো লোক তালা ভেঙে মিস্টার ম্যাকআরবারের বাড়িতে ঢুকল, হাতে বন্দুক। আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যে আগুন লাগিয়েছি, আর কোন উপায় ছিল না। জিনা আর মুসাকে ধরে নিয়ে গেছে ওরা। হ্যামবোনের দিকে…লোকগুলোকে বেপরোয়া মনে হলো।

অন্ধকার পথের দিকে চেয়ে বললেন শেরিফ, জিনাকে নিয়ে গেছে?

আর আমার বন্ধু মুসা আমানকেও। গানপয়েন্টে।

নিজের গালে মত্ত থাবা বোলালেন শেরিফ। কতক্ষণ আগে?

এই কয়েক মিনিট। তাড়াতাড়ি করলে এখনও ধরা যায়। আলো জ্বলেনি, জোরে চালাতে পারবে না, বেশি দূরু যায়নি।

আমাকে পিছে দেখলে তখন ঠিকই চালাবে। এভাবে তাড়া করে লাভ নেই। বাচ্চাদুটোর বিপদ বাড়বে আরও।

তাইলে পথের ও-মুখে পাহারার ব্যবস্থা করুন, তাড়াতাড়ি। হ্যামবোনে থামবে না ওরা, ওপাশ দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করবে। তার আগেই যদি পথ আটকানো যায়…

কোন পথ?

হুঁ হয়ে গেল কিশোর। কয়টা পথ আছে?

হ্যামবোন থেকে ডজনখানেক সরু সরু পথ বেরিয়ে গেছে বিভিন্ন দিকে। কোনপথে যাবে ওরা কে জানে। ছোট ছোট কেবিন পাবে, যেখানে খুশি লুকাতে পারবে। মরুভূমির ওদিকেও যেতে পারে। খুব সহজেই এক হপ্তা লুকিয়ে থাকতে পারবে ওরা ইচ্ছে করলে।

তাহলে? চেঁচিয়ে উঠল রবিন।

গাড়ির কাছে গিয়ে পড়ালেন শেরিফ। জানালা দিয়ে টু-ওয়ে রেডিও বের করে বললেন, হাইওয়ে পেট্রোলকে জানাচ্ছি, হেলিকপ্টার নিয়ে আসুক। এছাড়া আর কোন পথ নেই। ঈশ্বরই জানে কি করবে ওরা। তাড়াহুড়ো করে পালানোর জন্যে বাচ্চাদুটোকে না, … বাক্যটা শেষ করলেন না তিনি।

১৭

সঙ্গে নেয়ার অনুরোধ জানাল কিশোর আর রবিন। হেসে মাথা ঝাঁকাল হেলিকপ্টারের পাইলট জ্যাক বোরম্যান।

তোমাদের যাওয়া ঠিক হচ্ছে না, বললেন শেরিফ। গোলাগুলি চলতে পারে। বললেন বটে, কিন্তু সরে দাঁড়িয়ে ছেলেদেরকে ওঠার জন্যে জায়গাও ছেড়ে দিলেন।

পাইলট আর প্যাসেঞ্জার সিটের মাঝের ছোট্ট পরিসরে গাদাগাদি করে বসল রবিন আর কিশোর। প্যাসেঞ্জার সিটে উঠে বসলেন শেরিফ, টেলিস্কোপিক সাইট লাগানো রাইফেলটা রাখলেন কোলের ওপর।

মস্ত ফড়িঙের মত ডানা ফড়ফড় করে আকাশে উঠল কপ্টার।

আকাশে চাঁদ, নিচে উপত্যকায় আলোর চেয়ে অন্ধকার বেশি। শূন্যে উঠেই সুইচ টিপল বোরম্যান, ফেকাসে অন্ধকারের চাদর যেন কুঁড়ে গেল সার্চলাইটের নীলচে-সাদা তীব্র আলোক-রশি। একটা লেভার দেখিয়ে শেরিফকে বলল, ওটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে যেখানে খুশি আলো ফেলতে পারবেন।

সামনে ঝুঁকলেন শেরিফ। এখনও হয়তো আলো জ্বালায়নি। লেভার ঘুরিয়ে নিচের ঢালে আলো ফেললেনু।

বড় বড় পাথরের চাঙড় কিভূত ছায়া সৃষ্টি করছে। ওপর থেকে আঁকাবাকা একটা ফিতের মত লাগছে হ্যামবোনের সড়কটাকে। সবুজ গাছপালার মাঝে এখন প্রায় সাদাই দেখাচ্ছে ওটা।

ট্রাকটা এখুনি ফেলে রেখে যাওয়ার চেষ্টা করবে না, বোরম্যান বলল। এই পথেই অন্তত হ্যামবোন পর্যন্ত যাবে।

হঠাৎ মোড় নিল কপ্টার। তৈরি ছিল না, পাক দিয়ে উঠল কিশোরের পেটের ভেতর, এক ধরনের অদ্ভুত শূন্যতা।

টুইন লেকস টু হ্যামবোন সড়কের প্রতিটি ইঞ্চি খুঁজে দেখা হলো, কিন্তু ট্রাকটা পাওয়া গেল না। এত তাড়াতাড়ি পেরিয়ে গেল? বিশ্বাস করতে পারছেন না শেরিফ। তা-ও আবার আলো না জেলে?

নড়ে উঠল রবিন।

তার দিকে তাকালেন শেরিফ, অভয় দিয়ে বললেন, ভেব না, থােকা। আমার অ্যাসিসটেন্ট জীপ নিয়ে আসছে। যাবে কোথায় ব্যাটারা?

হ্যামবোনে কপ্টার অনেক নিচুতে নামিয়ে আনল বোরম্যান। বাড়িঘরের প্রায় ছাত ছুঁয়ে উড়ে চলেছে।

ওটা কি? চেঁচিয়ে উঠলেন শেরিফ। একটা ট্রাক-খনির ছাউনিটার কাছে।

ঝুঁকে দেখে বলল কিশোর, ওটা মিসেস রোজি ফিলটারের। বিকেলেই দেখেছি আমরা, খালি। মহিলা নেই।

কি ঘটছে এসব?

আরও অনেক ব্যাপার আছে, পরে সব খুলে বলব। আগে জিনা আর মুসাকে খুঁজে বের করা দরকার।

হ্যামবোন পেরিয়ে গিয়ে থাকলে পশ্চিমের ঢালে কোথায় আছে, কোনও একটা সরু পথে। কিন্তু কোনটায় যে গেল, সেটা বোঝাই তো মুশকিল।

একটাই উপায় আছে, বলতে বলতেই কপ্টারের নাক পশ্চিমে ঘোরাল বোরম্যান। দ্রুত পেছনে পড়তে লাগল ভূতুড়ে শহর হ্যামবোন।

মাথার ওপরে হেলিকপ্টারের শব্দ শুনছে জিনা আর মুসা। গাছের পাতার ওপর দিয়ে গিয়ে রাস্তায় নামল সার্চলাইটের আলো।

কিন্তু আলো আর ফিরে এল না ওখানে চলে যাচ্ছে হেলিকপ্টার। দূর থেকে দূরে মিলিয়ে গেল এঞ্জিনের শব্দ।

খিকখিক করে হাসল বিংগো। এবার যাওয়া যায়। এঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে আবার পথে নামিয়ে আনল ট্রাক। আলো না জ্বেলেই আবার এগিয়ে চলল হ্যামবোনের দিকে।

একবার বেরোতে পারলে এই হতচ্ছাড়া পথে আর আসছি না, ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস টানল সে। এসে আর লাভও নেই। নিশ্চয় এতক্ষণে জোরেশোরে খুঁজতে শুরু করেছে ম্যাকআরখার, আগে না পেয়ে থাকলে কিছু যে খুঁজতে গেছি আমরা, নিশ্চয় বুঝে ফেলেছে।

দশ লাখ ডলারের বোঝাটা কতবড়? জিজ্ঞেস করে বসল জিনা।

ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষল বিংগো, ফিরে তাকাল। তোমাকে কে বলেছে?

চুপ করে রইল জিনা।

সিগারেট বের করে ধরাল বিংগো। হ্যারি, এ দুটোকে কোথাও ফেলে দেয়া দরকার। এমন কোথাও, যাতে তার বাড়ি ফিরতে না পারে।

কেশে উঠে হাত নেড়ে নাকের সামনে থেকে ধোয়া ত্যাভাল জিন। এত বাজে অভ্যাস, এই ধোয়া টানা, বলল সে। ফুসফুসের দফা রফা, গলাও শেষ, কথা বললে বঙের আওয়াজ বেরোয়। হ্যাঁ, কি যেন বলছিলে, আমাদের কোথাও ফেলে যাবে? তাতে কি লাভ? ফিনিক্সে যে তোমরা ডাকাতি করেছ, তিন ডাকাত আর এক ডাকাতনী মিলে, এটা আরও লোকে জানে।

গুঙিয়ে উঠল হ্যারি। অন্য ছেলে দুটো? বোকার মত রেখে এলাম।

বোকা নয়, শুধরে দিল জিনা, বলো, গাধার মত। গর্দভচন্দ্র।

বন্দুক তুলে পেছন থেকে হুমকি দিল হ্যারি। চুপ হয়ে গেল জিনা।

হ্যামবোন থেকে উল্টো দিকের পথ ধরে নেমে চলল ওরা। লো গীয়ারে চালাচ্ছে বিংগো এক জায়গায় এসে ডানে আরেকটা শাখাপথ বেরিয়েছে, সরু পথ, বেজায় রুক্ষ।

উপচে পড়া অ্যাশট্রেতে সিগারেট টিপে নেভাল বিংগো। মূল সড়ক, যেটাতে রয়েছে সেটা দেখিয়ে জিনাকে জিজ্ঞেস করল, এটা কোথায় গেছে?

জানি না।

পেছন থেকে ডেকে বলল হ্যারি, এটা দিয়ে যাওয়া উচিত না, মন সায় দিচ্ছে। নিচে হাজারখানেক পুলিশ নিশ্চয় ঘাপটি মেরে আছে। পাশের রাস্তায় নামো।

ঘোৎ-ঘোৎ করে কি বলল বিংগো, বোঝা গেল না। মোড় ঘুরে পাশের রাস্তায় গাড়ি নামাল। কাঁচা রাস্তা, অনেক কষ্টে যেন ওখানে জন্মানো থেকে নিজেদেরকে ঠেকিয়ে রেখেছে দুপাশের গাছের জঙ্গল। গভীর দুটো খাজ, টায়ারের দাগ, তার ওপর মাঝেমাঝেই পাথর পড়ে আছে। ফলে আটকে যেতে চাইছে চাকা; জোর করে সরিয়ে আনার চেষ্টা করলেই লাফিয়ে উঠছে ভীষণভাবে।

আরেকটা সিগারেট ধরাল বিংগো, কিন্তু টানতে পারল না। গাড়ি সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে। গাল দিয়ে জ্বলন্ত সিগারেটটা বাইরে ছুঁড়ে ফেলে শক্ত হাতে স্টিয়ারিং ধরল।

আগুনসহ তো ফেলেছ, বলল জিনা। দেখো, জঙ্গলে দাবানল লেগে যায় নাকি? তাহলে পুরো পুলিশ ফোর্স ছুটে আসবে তোমাদের নাকে লাগাম পরাতে।

তীক্ষ্ণ টিটকারি নীরবে হজম করল বিংগো, জবাব দেয়ার উপায় নেই, গাড়ি সামলাতে ব্যস্ত।

মুসা আর জিনার মনে হলো অনন্ত কাল ধরে চলেছে তারা ওই পাহাড়ী পথ ধরে। মাঝে মাঝে বনের ভেতর পরিত্যক্ত কেবিন চোখে পড়ছে, কি এক গোপন রহস্য লুকিয়ে রেখেছে যেন অন্ধকার ঘরগুলো। হ্যামবোনের চেয়ে ছোট আর বেশি ভূতুড়ে আরেকটা শহর পেরোলেন। সামনে এক জায়গায় একটা কথােট বসে ছিল রাস্তার ওপর, মহাগভীর, কিন্তু হেডলাইটের আলো চোখে পড়তেই ভীতু শেয়ালের মত কুঁই করে উঠে গিয়ে লুকালো পাশের অন্ধকার ঝোপে। মাথার ওপর কয়েক বার হেলিকপ্টারের আলো দেখা গেল। প্রতিবারেই জঙ্গলে ট্রাক ঢুকিয়ে ফেলল বিংগো। কপ্টার দূরে সরার আগে বেরোল না। ঘুমানোর চেষ্টা করল মুসা আর জিনা, কিন্তু যা ঝাঁকুনি ঝিমানোও সম্ভব নয়, ঘুম তো দূরে কথা।

ওপরের দিকে গাড়ি উঠছে তো উঠছেই। কিন্তু অবশেষে বাঁক নিল পথ। সাপের মত একেবেঁকে খানিক দূর নেমে গিয়ে সোজা হলো।

বোধহয় বাচলাম, ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলল বিংগো।

স্টিয়ারিঙে হাতের চাপ যদিও শিথিল করতে পারছে না। ঢিল পড়লেই নাক ঘুরিয়ে গাছের গায়ে গুতো মারার জন্যে রওনা দেয় গাড়ি।

চাঁদ ডুবে গেছে। আকাশে শুধু তারা মিটমিট করছে, ওপরেও ছায়াপথ, নিচেও ছায়াপথ বানিয়ে রেখেছে। যতই নামছে গাড়ি, দু-ধারে সরে যেন বেশি করে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে বন, পথ চওড়া হচ্ছে।

উপত্যকায় নামল গাড়ি। সামনে আড়াআড়ি চলে গেছে আরেকটা পাকা রাস্তা। তার ওপাশে বিস্তৃত মরুর খোলা শূন্যতা।

গাড়ি থামিয়ে ডানে-বাঁয়ে তাকাল বিংগো। অল্প অল্প হাঁপাচ্ছে, বেড়েছে। ফোঁসফোসানি।

হেসে বলল হ্যারি, পুলিশ নেই। বলেছিলাম না, মেইন রোডে থাকবে ওরা। এদিকে আসব আমরা, কল্পনাও করেনি।

এখনও বলা যায় না, বিংগো খুশি হতে পারছে না। রোড ধরে যাবই না। সোজা চালাল সে। ঝাঁকুনি খেয়ে পাকা রাস্তায় উঠল ট্রাক, রাস্তা পেরিয়ে আবার ঝাঁকুনি খেয়ে নামল মরুভূমিতে।

মাথায় বাড়ি খেয়ে আঁউক! করে উঠল জিনা। মস্ত এক গর্তে পড়ে ক্যাঙারুর মত লাফ দিয়ে আবার উঠে পড়েছে গাড়ি। জিন্দেগীতে জায়গামত যাবে না এই ট্রাক।

চুপ! ধমক দিল বিংগো। অস্বস্তিতে ভুগছে। ঝাল ঝাড়ল আধপোড়া সিগারেটের ওপর, অ্যাশট্রেতে পিয়ে মারল ওটাকে। যেতেই হবে। মরুভূমি পেরোলে সামনে অন্য পথ পাবই। ওখানে পুলিশ থাকবে না।

শেষ তারাটাও মলিন হলো, মিলাল মহাশূন্যে।

ফিরে তাকাল মুসা, পেছনে পাহাড়ের চূড়ায় লালচে আভা। আঁধার কাটছে দ্রুত। খানিক পরেই উঁকি দেবে টকটকে লাল সূর্য। পাকা রাস্তা এখন অনেক পেছনে।

সামনে শিগগিরই আরেকটা পথ পাব, বিড়বিড় করে নিজেকে আশ্বাস দিল যেন বিংগো। যেটাতে…হুঁক…

চোরা গর্তে পড়ে কাত হয়ে গেছে ট্রাক। জোর হিসহিস শোনা গেল, ধোয়া বেরোতে শুরু করল রেডিয়েটর থেকে।

সব্বোনাশ! এঞ্জিন বন্ধ করে, ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে বালিতে লাফিয়ে গিয়ে পড়ল বিংগো। ঘুরে গিয়ে উঁকি দিল ট্রাকের নিচে। এঞ্জিনের সামনের অংশ থেকে বালিতে পড়ছে মরচে রঙের পানি, ময়লা করছে ধবধবে সাদা বালি।

কি হলো? হ্যারির গলার ভেতরটা সিরিশ দিয়ে ঘষেছে যেন কেউ।

রেডিয়েটর খতম, অচেনা লাগছে বিংগোর কণ্ঠস্বর। অ্যাক্সেল দুই টুকরো। গুঙিয়ে উঠল হ্যারি। সর্বনাশ!

জানালার কাছে এসে জিনার দিকে পিস্তল তাক করল বিংগো। নামো। মুসাকে বলল, এই, তুমিও।

হলো তো এখন? কালো হয়ে গেছে জিনার মুখ।

চুপ। নামো।

নামল দুজনে। হ্যারিও নামল। শূন্য চোখে তাকাল ছড়ানো মরুর দিকে। সামনে দেখিয়ে বলল, ওদিকে পাহাড় পেছনে রেখে সোজা হাঁটব। আগে-পরে পথ পেয়ে যাবই।

না, জেদ ধরল জিনা। এখানে হাঁটতেই থাকবে, হাঁটতেই থাকবে, পথ আর পাবে না। তারপর সূর্য উঠলে টের পাবে মজাটা। দেখতে দেখতে একশো ডিগ্রী ছাড়িয়ে যাবে গরম, কাবাব হয়ে যাবে। ট্রাকে বসে থাকাই ভাল।

ট্রাকে থাকলে মরব, বলল হ্যারি।

বাজে কথা রেখে হাঁটো তো, আবার ধমক দিল বিংগো।

না, বালিতে বসে পড়ল জিনা। গুলি করে মেরে ফেললেও আমি যাব না। রোদে কাবাব হওয়ার চেয়ে গুলি খেয়ে মরা অনেক আরামের। গরমে মগজ গলে নাক দিয়ে বেরিয়ে আসবে।

দ্বিধা করল মুসা। তারপর বসে পড়ল জিনার পাশে।

ভীষণ দৃষ্টিতে তাকাল বিংগো। পিস্তলের হাতলে চাপ বাড়ছে, সাদা হয়ে যাচ্ছে আঙুল।

হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল হ্যারি, লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটতে শুরু করল সামনের দিকে।

জিনা আর মুসার ওপর বার দুই নজর সরাল বিংগো, কাঁধ ঝাঁকিয়ে পিস্তলটা ঢুকিয়ে রাখল পকেটে। ঘুরে রওনা হয়ে গেল সঙ্গীর পেছনে।

নীরবে চেয়ে আছে জিনা আর মুসা।

ছোট হতে হতে যেন ধোয়ার ভেতর মিলিয়ে গেল দুই ডাকাতের অবয়ব। দ্রুত চড়ছে সূর্য, গরম বাড়ছে। রাতের শিশিরে ভেজা বালি থেকে বাষ্প উঠতে শুরু করেছে ধোয়ার মত।

হতাশ হয়ে যদি ফিরে যায় ওরা? কোলা ব্যাঙের স্বর বেরোল মুসার কণ্ঠ থেকে। যদি খোঁজা বাদ দেয়? পিপাসার ছাতি ফেটে মরব।

১৮

জিনা আর মুসা যেখানে রয়েছে, তার থেকে অনেক ওপরে বসে কিশোর আর রবিন দেখল, পর্বতের চূড়া লাল হয়ে উঠছে ভোরের কাঁচা রোদে।

সুইচ টিপে সার্চ লাইট নিভিয়ে দিয়ে বড় করে হাই তুললেন শেরিফ। সারা রাত জেগে থেকে চোখ লাল।

নড়েচড়ে বসল বোরম্যান। সারারাত পাহাড়ের ওপরে আকাশে চক্কর দিয়েছে, আরেকবার দেয়ার জন্যে তৈরি হলো।

অবাক কাণ্ড! বলল সে। হাওয়া হয়ে গেল নাকি ওরা? কোনও জায়গা তো আর বাদ রাখিনি।

গেল কই? না ঘুমিয়ে আর দুশ্চিন্তায় শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে রবিনের মুখ। মেইন লোভ ধরে নামেনি, তাহলে পুলিশের চোখ এড়াতে পারত না। আরেকটা কপ্টার যে বেরিয়েছে, তারাও কোন খোঁজ পাচ্ছে না। বাতাসে তো আর মিলিয়ে যেতে পারে না।

পাহাড়ে জঙ্গলে কোথাও লুকিয়ে আছে, ক্লান্ত কণ্ঠে বলল কিশোর। অসংখ্য পোড়ো শহর আছে, ছাউনি আছে, তার মধ্যে ঢুকে বসে থাকলেও আকাশ থেকে দেখব না।

ঠিকই বলেছ, সায় দিলেন শেরিফ। দেখা যাবে না। কিন্তু আমি ভাবছি, মরুভূমিতে নেমে যায়নি তো? রোড ক্রস করে? সেটা করলে মরবে। পানিও নেই ওদের সঙ্গে, খাবারও নেই।

মরুভূমিতে নামলে দেখা যাবে? রবিন প্রশ্ন করল।

তা তো যাবেই। একেবারে খোলা। তবে অনেকখানি জুড়ে চক্কর দিতে হবে।

হেলিকপ্টারের নাক ঘুরে গেল পশ্চিমে। গাছপালার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলল মরুভূমির উদ্দেশে।

রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছল জিনা।

সাদা হচ্ছে সূর্য, রোদের তেজ বাড়ছে।

শরীরে প্রচণ্ড ক্লান্তি, কিন্তু উত্তেজনায় ঘুম আসছে না জিনার। পঞ্চমবারের মত ঘুরে এল ট্রাকের চারপাশে। ধপ করে বসে পড়ল মুসার পাশে।

ট্রাকের ছায়ায় বসে আছে মুসা। বেশিক্ষণ থাকবে না এই ছায়া, যে হারে দ্রুত সরছে।

দুপুর তো হয়ে এল, বলল জিনা। ওরা আসছে না কেন?

বিষণ্ণ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল মুসা। ইস, যা খিদে লেগেছে না। গতকাল দুপুরের পর আর কিছু পেটে পড়েনি।

তুমি তো ভাবছ খাওয়ার কথা। আমার যে গলা শুকিয়ে কাঠ, খাবার পেলেও এখন গলা দিয়ে নামবে না।

রেডিয়েটরটাও তো লীক হয়ে গেছে। নইলে ওখান থেকে পানি নিয়ে খেতে, পারতাম।

হুঁ, কাঁধ নিচু করল জিনা। ঝট করে সোজা হলে পরক্ষণেই, চেঁচিয়ে উঠল, ও মাই গড! হলো কি আমার?

লাফিয়ে উঠল সে। ইগনিশন থেকে খুলে বের করল ফাস্ট এইড কিটস। ভেতরে একটা ডাক্তারী কচি পাওয়া গেল। উজ্জ্বল হয়ে উঠল মুখচোখ।

এটা দিয়ে কি করবে? জিনার আনন্দের কারণ বুঝতে পারছে না মুসা।

কাছেই একটা ব্যারেল ক্যাকটাস দেখাল জিনা। ক্যাকটাসের ভেতরে পানি থাকেই। বৃষ্টির সময় শুঁষে নিয়ে জমিয়ে রাখে শরীরের ভেতর। শুকনো মৌসুমে কাজ চালায়, বেঁচে থাকে। আরও আগেই মনে পড়ল না কেন ভাবছি।

বেটার লেইট দ্যান নেভার, মুসা,বলল। রসাল জিনিসের সন্ধান যে পাওয়া গেছে এতেই আমি খুশি। কাঁচিটা নিয়ে দৌড় দিল সে। কুপিয়ে খুঁচিয়ে শক্ত চামড়া কেটে ভেতর থেকে দু-টুকরো নরম শাঁস বের করল। ফিরে এসে একটা দিল জিনার হাতে।

মুখে দিয়েই চেহারা বিকৃত করে ফেলল দুজনে।

বুঝতে পারছি না কোনটা খারাপ, তিক্ত কণ্ঠে বলল মুসা। পিপাসায় মৃত্যু…নাকি এটা?

চুষে চুষে সবটুকু রস খেয়ে ছোবড়াটা ফেলে দিল জিনা। মাথার ওপর উঠে এসেছে সূর্য। ছায়া নেই। ট্রাকের নিচে ঢুকতে হবে, আর কোন উপায় নেই, বলল সে। কপ্টার এলে ট্রাকটা দেখতে পাবে, আমরাও তখন বেরিয়ে আসতে পারব।

ক্রল করে ট্রাকের তলায় চলে এল দুজনে।

আরে, বেশ ঠাণ্ডা তো এখানে, হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল জিনা!

ক্যাকটাসের রস খেয়ে আর ছায়ায় শুয়ে সামান্য ভাল বোধ করছে ওরা। দূর থেকে ভেসে এল কি এক নাম না জানা মরু-পাখির বিষণ্ণ ডাক।

কনুই দিয়ে আস্তে করে জিনার পাজরে গুতো দিল মুসা, ইঙ্গিতে দেখাল।

বানির তলা থেকে মাথা তুলেছে একটা ক্যাংগারু-ইদুর, সতর্ক চোখে দেখল কয়েক মুহূর্ত, বিপদ নেই বুঝে বেরিয়ে এল। আরও কয়েক সেকেণ্ড চুপচাপ থেকে হঠাৎ মস্ত লাফ দিয়ে ছুটে গেল এক দিকে, বোধহয় খাবার দেখতে পেয়েছে।

কোথা থেকে জানি, যেন মাটি খুঁড়ে উদয় হলো কয়েকটা গিরগিটি, ট্রাকের নিচে এসে ঢুকল গুটিগুটি পায়ে, খাবার খুঁজছে।

চারপাশে সাদা বালির সমতল বিস্তার, আগুন হয়ে উঠেছে। মরুর তপ্ত বাতাসে একধরনের অদ্ভুত ঝিলিমিলি, মনে হচ্ছে যেন কাঁপছে বাতাস।

সময়ের হিসেব রাখেনি ওরা, ঠিক কতক্ষণ পর বলতে পারবে না, মাথা তুলল মুসা। কান পেতে শুনছে।

জিনাও মাথা তুলল। হ্যাঁ, আমিও শুনছি। অনেক দূরে। কপ্টারের এঞ্জিনই। চেঁচিয়ে উঠল, আসছে, ওরা আসছে!

তাড়াহুড়ো করে ট্রাকের নিচ থেকে বেরোল দুজনে। কিন্তু মিলিয়ে যাচ্ছে শব্দ।

আকাশের দিকে মুখ তুলে আঁতিপাতি করে খুঁজল, কিন্তু গাঢ় নীলের মাঝে কোথাও কোন কলঙ্ক নেই।

কিন্তু শুনলাম তো, হতাশ কণ্ঠে বলল জিনা।

শুনেছি আমিও, কান পেতে আছে মুসা।

শোনা যাচ্ছে না আর শব্দটা।

এদিকে কেন এল না? কেঁদে ফেলবে যেন জিনা। আর বেশিক্ষণ টেকা যাবে। মরব।

ভেঙে পড়ছ কেন এখনই? আসবে ওরা আমাদের খুঁজে বের করবে… বলল বটে, কিন্তু নিজেই ভরসা পাচ্ছে না মুসা, গলায় জোর নেই।

কয়েক মিনিট পর আবার শোনা গেল শব্দটা; দূরে, আওয়াজ বাড়ছে আস্তে আস্তে। সাদাটে-নীল দিগন্তে দেখা দিল কালো একটা বিন্দু।

এগিয়ে আসছে কপ্টার। লাফিয়ে উঠল জিন আর মুসা, পাগলের মত হাত নেড়ে, চেঁচিয়ে ওটার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালাল।

দেখতে পেল হেলিকপ্টার। দ্রুত নাক ঘুরিয়ে কাত হয়ে ছুটে এল সাঁ করে।

বালিতে ঘূর্ণিঝড় তুলল কপ্টারের পাখা, তার ভেতর দিয়েই মাথা নুইয়ে দৌড়ে গেল জিনা আর মুসা।

তাড়াতাড়ি নামতে গিয়ে হাঁসফাঁস করছেন সুলদেহী শেরিফ। তোমরা ঠিক আছ? চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

ধাক্কা দিয়ে আরেকটু হলে তাঁকে ফেলেই দিয়েছিল রবিন আর কিশোর, কে আগে নামবে সেই প্রতিযোগিতা। ছুটে এল দুহাত তুলে। আনন্দে কে যে কাকে জড়িয়ে ধরল সে হুঁশ থাকল না।

সবার আগে সামলে নিল জিনা। শেরিফকে বলল, ডাকাতদুটো ওদিকে পালিয়েছে। পায়ে হেঁটে গেছে।

ট্রাক ভেঙে পড়ার পরই ভেগেছে, যোগ করল মুসা!

তাড়াতাড়ি আবার গিয়ে কপ্টারে উঠলেন শেরিফ। পাশে কাত হয়ে কিছু বললেন পাইলটকে।

মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে রেডিওর ওপর ঝুঁকল বোরম্যান। বোধহয় হাইওয়ে পেট্রোলকে খবর জানাচ্ছে। জানালা দিয়ে মুখ বের করে এঞ্জিনের গর্জন ছাপিয়ে চেঁচিয়ে বলল, তোমরা থাকো এখানে। মেসেজ পাঠিয়ে দিয়েছি, আরেকটা হেলিকপ্টার আসছে। ব্যাটাদের ধরতে চললাম আমরা। পানির একটা ক্যান্টিন। বাড়িয়ে দিল মুসার দিকে।

উড়াল দিল আবার হেলিকপ্টার। সোজা পশ্চিমে রওনা হলো হ্যারি আর বিংগোর খোঁজে।

পরস্পরের দিকে চেয়ে হাসল জিনা আর মুসা।

আমি শিওর, বেশি দূর যেতে পারেনি ব্যাটারা, জিনার কষ্ঠে সন্তোষের আমেজ।

১৯

ঠিকই অনুমান করেছে জিনা।

বেশি দূর যেতে পারেনি হ্যারি আর বিংগো। এক ঘণ্টা পরই ওদেরকে হাতকড়া পরা অবস্থায় নামানো হলো ম্যাকআরবারের কেবিনের সামনে উঠানে। দুপাশে পাহারায় রইল পাইলট বোরম্যান আর শেরিফের সহকারী।

করুণ অবস্থা হয়েছে দুই ডাকাতের। রোদে পোড়া, চামড়া, জায়গায় জায়গায় ফোঁসকা পড়ে গেছে, এতই পরিশ্রান্ত-বসে বসে কুকুরের মত জিভ বের করে হাঁপাচ্ছে। ভাগ্য ভাল ওদের, হেলিকপ্টারের চোখে পড়েছে, নইলে মারাই যেত। ট্রাক ছেড়ে যাওয়ার পর মাত্র কয়েক মাইল এগিয়েছিল, তাতেই এ-দশা।

ডাকাতদের আগেই টুইন লেকসে ফিরে এসেছে ছেলেরা। হাতকড়া পরা ডাকাতদের নামতে দেখে আনন্দে হাত তালি দিয়ে উঠল জিনা। …

আঙ্কেল উইলসন আর ভিকিখালাও রয়েছে ওখানে। মেকসিকান শ্রমিকদের সহায়তায় সবাইকে স্যাণ্ডউইচ পরিবেশন করছে ভিকি, দিতে একটু দেরি করলেই রেগে যাচ্ছে শ্রমিকদের ওপর। …

আগের রাতেই ফিরে এসেছিল শ্রমিকেরা, সারারাত বসে কাটিয়েছে কেবিনের দাওয়ায়, ভয়ে কারও সঙ্গে কথা বলেনি। ছেলেদেরকে এখন ঠিকঠাকমত ফিরতে দেখে হাসি ফুটেছে মুখে, স্বেচ্ছায় মেনে নিয়েছে ভিকির তাবেদারী।

কেবিনের পাশে চুপচাপ শুয়ে আছে ম্যাকআরথারের কুকুর, দুই ডাকাতের মতই জিভ বের করে নীরবে হাঁপাচ্ছে। ওষুধের ক্রিয়া শেষ হয়নি এখনও পুরোপুরি।

ম্যাকআরথারকেও তার কুকুরটার মতই দেখাচ্ছে, বিধ্বস্ত, ক্লান্ত।

সবাই তো এল, যেন সভার কাজ শুরু করছে, এমনি ভঙ্গিতে বলল সে, দয়া করে কেউ কি বলবেন, ব্যাপারটা কি? দুই ডাকাতকে দেখিয়ে বলল, কি ঘটেছে এখানে?

ম্যাকআরথারের কথায় কান না দিয়ে কিশোরের দিকে তাকাল জিনা, বলল, ঠিকই আন্দাজ করেছিলে। বাড হিলারি সেই চার ডাকাতের একজন, আর এই যে এখানে দুজন। গতরাতে স্বীকার করেছে ওরা।

আমরা কিছুই স্বীকার করিনি, ঘোষণা করল হ্যারি।

করেছ, জোরে মাথা ঝাঁকাল জিনা। আমাদেরকে ফেলে দেয়ার কথাও বলেছিলে, যাতে কোনদিন ফিরে আসতে না পারি।

মিষ্টি করে হাসল কিশোর। আমাদের কেস প্রায় শেষ। সব কিছুই খাপে খাপে বসে যাচ্ছে।

মানে? জিজ্ঞেস করলেন শেরিফ।

কি ব্যাপার, কিশোর? আংকেল উইলসনও জানতে চাইলেন। আমি তো ঘোর অন্ধকারে। একটু খুলে বলো তো।

বলছি, হাতের বাকি স্যাণ্ডউইচটুকু দুই কামড়ে শেষ করল কিশোর। ঢকঢক করে পুরো এক গেলাস পানি খেয়ে মুখ মুছে শুরু করল, যখন জানলাম, খনিতে পাওয়া লাশটা পাঁচ বছর আগের এক দাগী আসামীর, মনে প্রশ্ন জাগল, ওর মত লোক টুইন লেসের নির্জন খনিতে কি করছিল? মাইনে কেন ঢুকেছিল? প্রথমেই মনে এল, টুইন লেকসের স্থানীয় পত্রিকাটার কথা। গিয়ে খুঁজতে শুরু করলাম।

জানা গেল, পাঁচ বছর আগে এসেছিল বাড হিলারি, খনিতে ঢুকে আর বেরোতে পারেনি, তার আগেই খনির মুখ সীল করে দেয়া হয়। সেদিন একটা পরিত্যক্ত গাড়ি পাওয়া গেল খনির কাছে, লর্ডনবুর্গ থেকে চুরি গিয়েছিল ওটা। অনুমান করলাম, ওই গাড়িতে করেই এসেছিল হিলারি। সুতরাং, গেলাম লর্ডসবুর্গে, তার খোঁজ নেয়ার জন্যে। ওখানকার একটা পত্রিকাতেই ডেথ ট্র্যাপ মাইনের মুখ সীল করার সংবাদ বেরিয়েছিল, জানলাম সেটা।

পাঁচ বছর আগে মিসেস রোজি ফিলটার টুইন লেকসে ফিরে এসে সম্পত্তি কিনেছেন। তার অব্যবহৃত একটা ঘরে আরেকটা পত্রিকা পেলাম, পাঁচ বছরের পুরানো, ফিনিক্স থেকে বেরোয়। সেই সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল একটা ডাকাতির খবর। পত্রিকাটা ছিল খনিমুখ সীল করার আগের দিনের। তার কয়েক মাস পর এসে সম্পত্তি কিনেছেন মিসেস ফিলটার। আন্দাজ করতে কষ্ট হলো না, পত্রিকাটা বাড হিলারিই: এনেছে, খনিতে ঢোকার আগের রাত ওই ঘরে কাটিয়েছে, পরদিন পত্রিকাটা অন্যান্য পত্রিকার স্তুপের ওপর ফেলে রেখে বেরিয়ে গেছে। ধরে নিলাম, চার ডাকাতের একজন সে। এখন তো জানি, ঠিকই আন্দাজ করেছি। বাকি দুজন এই যে, হ্যারি আর বিংগোর দিকে চেয়ে হাসল কিশোর। তারপর, গত হপ্তায় পাওয়া গেল হিলারির লাশ। কৌতূহলীরা ছুটে এল দলে দলে। খবরটা শুনে, তুমি, বিংগোও এসেছ। আঙ্কেল উইলসনের গোলাঘরে ঢুকেছিলে রাতে চুরি করে। আমরা যখন দেখে ফেললাম, ছুরি হাতে বেরিয়ে দৌড়ে গিয়ে লুকালে খেতে, মুসাকে আরেকটু হলেই শেষ করে দিয়েছিলে। কোন কিছু খুঁজতে ঢুকেছিলে তুমি গোলাঘরে। পাওনি। কাজেই বাধ্য হয়ে তোমাকে থাকতে হয়েছে টুইন লেকসে। কোথায় থাকবে। লোকে তো দেখে ফেলবে। ঠাই নিলে গিয়ে মিসেস ফিলটারের অব্যবহৃত ঘরে। তুমিই সেদিন তার রান্নাঘর থেকে খাবার চুরি করেছিলে, সিংকে পোড়া সিগারেটের টুকরো ফেলে গিয়েছিলে। নাকি মিসেস ফিলটারই তোমাকে খাবারগুলো দিয়েছিলেন?

জবাব দিল না বিংগো।

যাই হোক, আবার বলে গেল কিশোর, ধারে-কাছেই কোথাও ছিল হ্যারি। কিন্তু তোমার মত সূত্র রাখেনি। ও কোথায় ছিল কে জানে। যাকগে, তক্কে তক্কে ছিলে, গতকাল বিকেলে পেয়ে গেলে সুযোগ। আশেপাশে কেউ নেই। কুকুরটাকে ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়ালে। তারপর গিয়ে হ্যারিকে নিয়ে এসে দুজনে খোঁজাখুঁজি শুরু করলে। হ্যাঁ, ওই যে লুট করেছিলে দশ লাখ ডলার, সেগুলো। তোমাদেরকেও ঠকিয়েছিল হিলারি না? সব টাকা নিয়ে পালিয়ে এসেছিল এখানে। পাঁচ বছর পর খোঁজ পেলে।

ম্যাকআরআরের দিকে ফিরল কিশোর। খনিতে টাকাগুলো পেয়েছেন আপনি, না?

জোরে মাথা নাড়ল ম্যাকআরথার। না। বলেইছি তো, খনির ভেতরে ঢুকে দেখিনি ভালমত। লাশটা পাওয়া যাওয়ার পর অবশ্য শেরিফ তন্ন তন্ন করে খুঁজেছেন, কিন্তু টাকাটুকা কিছু পাওয়া যায়নি। আসলে কিছুই নেই খনিতে।

কিছুই না, মিস্টার ম্যাকরখার? পকেট থেকে সোনার টুকরো বের করে শূন্যে ছুঁড়ল কিশোর, লুফে নিয়ে বলল, এটাও না? খাটি সোনা।

বিস্মিত হলো ম্যাকআরথার।

স্বর্ণ? ভুরু কোঁচকালেন শেরিফ। ডেথ ট্র্যাপে সোনা আছে বলে তো শুনিনি?

কিন্তু এখন আছে, মুচকি হাসল কিশোর। এটা পেয়েছি…আরেকটা, পকেট থেকে মুড়ি বের করে দেখাল, এই যে, এটাও পেয়েছি। লর্ভর্সবুর্গে জুয়েলারের দোকানে গিয়ে পরীক্ষাও করিয়েছি, খাটি সোনা। তামার সঙ্গে মেশানো।

তাজ্জব হয়ে গেছেন শেরিফ। কিন্তু…কিন্তু ওই খনিতে তো সোনা ছিল না। থাকলে আগে তার চিহ্নও পাওয়া গেল না কেন?

সেটাই তো মজা, হাসল কিশোর। তখন আসলেই ছিল না। পরে পাওয়া সোনার টুকরোটা শেরিফের হাতে দিয়ে বলল, খনির দেয়ালে গেথে ছিল। ভাল করে দেখুন তো কিছু বুঝতে পারেন কিনা?

পারলেন না শেরিফ, মাথা নাড়লেন।

গতরাতে হেলিকপ্টারে বসে ভালমত ভেবেছি, বলল কিশোর। জানি, অন্যান্য ধাতু-এই যেমন, তামা, রূপার সঙ্গে থাকে অনেক সময় স্বর্ণ, কিন্তু তামাই হোক আর রূপাই হোক, এত গায়ে গায়ে মেশামেশি করে থাকে না, এত বেশি পরিমাণে। সন্দেহ হলো। মনে পড়ল টুইন লেকসে এসে পয়লা রাতে গুলির শব্দ শুনেছি।…শেরিফ, আরেকবার ভাল করে দেখুন তো টুকরোটা, কিছু চোখে পড়ে কিনা?

তালুতে রেখে আরেকবার দেখলেন শেরিফ। নকশা।…নকশার মত কি যেন…

নকশাই, মাথা কাত করল গোয়েন্দাপ্রধান। কমলা ফুলের কুঁড়ি আঁকা ছিল। বিয়ের আঙটি ছিল ওটা।

আগে বাড়ল ম্যাকআরথার। কোথায় পেয়েছ তুমি ওটা? খনিতে পেয়েছ, বিশ্বাস করতে বলো একথা?

আমার চেয়ে আপনিই তো ভাল জানেন। এত অসতর্ক হওয়া উচিত হয়নি আপনার। বাজারে সোনার টুকরোও কিনতে পাওয়া যায়। পুরানো গহনা কিনেই তো ভুলটা করেছেন। শেরিফের দিকে ফিরে বলল কিশোর, পুরানো এক খেলা খেলতে চেয়েছিলেন মিস্টার ম্যাকআরহার। শটগানের নলে অলঙ্কার ভরে, চেম্বারে গুলি ভরে ফায়ার করেছেন গিয়ে খনির দেয়ালে। তারপর লোক ডেকে এনেছেন দেখানোর জন্যে যে খনিতে সোনা আছে। যখনই কাউকে দেখাতে এনেছেন, মেকসিকান শ্রমিকদের দিয়ে ডিনামাইট ফাটিয়েছেন ভেতরে, যেন নিয়ম মাফিক খোঁজা হচ্ছে খনি। মনে হয়, বোকা টাকার কুমীরগুলোকে লর্ডসবুর্গে পাকড়াও করেছেন মিস্টার ম্যাকআরথার। ওদের ধরে নিয়ে এসেছেন। দেখিয়েছেন, ডেথ ট্র্যাপে সোনা আছে, টাকা ইনভেস্ট করতে রাজি করিয়েছেন।

কিন্তু একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না, বাধা দিয়ে বললেন আঙ্কেল উইলসন, ম্যাকআরথার এ-কাজ করতে যাবে কেন? সে তো কোটিপতি। টাকার অভাব নেই। কেন তৃতীয় শ্রেণীর ঠগবাজি কুরতে যাবে?

দাঁত বের করে হাসল, না হুমকি দিল ম্যাকআরথার, বোঝা গেল না। বলল, বুঝতে পারছেন না, কারণ আমি এসব করিনি। বাজে গল্প ফেঁদেছে।

খনিতে ঢুকলেই প্রমাণ হয়ে যাবে, বলল কিশোর। গল্প না, সত্যি…।

খবরুদার! রাগে জ্বলে উঠল ম্যাকআরথার। আমার খনিতে ঢুকবে না! আগে আমার উকিলকে ডাকছি…

হ্যাঁ হ্যাঁ, ডাকো, কঠিন কণ্ঠে বললেন শেরিফ। তোমাকে অ্যারেস্ট করছি আমি। দরকার হলে অফিসে গিয়ে সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে আসব।

শেরিফ, আপনি ওই পাগল ছেলেটার কথা বিশ্বাস করছেন?

আমার কাছে তো পাগল মনে হচ্ছে না।

থ্যাংক ইউ, শেরিফ, বলল কিশোর। আরেকটা ব্যাপার পরিষ্কার করে দিচ্ছি। হ্যারি আর বিংগোর দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল, মিসেস ফিলটার কোথায়? তোমাদের সঙ্গে কোথায় দেখা করার কথা?

মিসেস ফিলটার? শূন্য দৃষ্টিতে তাকাল হ্যারি।

আরে, ওই বুড়িটা, বলল বিংগো। ওই যে, ওদিকে ওই বাড়িটায় থাকে।

অবাক হলো কিশোর। তুমি তোমার মিসেস ফিলটার তোমাদের দলে ছিলেন না?

মাথা নাড়ল হ্যারি। ভাবে মনে হলো, সত্য কথাই বলছে।

জোরে জোরে কয়েকবার নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটল কিশোর। আমি তো ভেবেছিলাম, মিসেস ফিলটারও চারজনের একজন। কিন্তু কোন প্রমাণ পাইনি, শুধু সমস্ত বর্ণনা পুরোপুরি মিলে যায়। ডাকাতির পর পরই ফিনিক্স থেকে নিখোঁজ হয়ে যান। তারপর, বাড হিলারি আর ডাকাতির ব্যাপারটা যখন তদন্ত করছি আমরা, আবার গায়েব হলেন তিনি।

চেঁচিয়ে উঠল ম্যাকআরথার, তখন থেকেই বলছি, ছেলেটা পাগল। নইলে মিসেস ফিলটারের মত মহিলাকে সন্দেহ করে? চকিতের জন্যে খনিমুখের দিকে তাকাল সে, দৃষ্টিতে শঙ্কার ছায়া।

আমি না হয় পাগল, কিন্তু আপনি ঘামছেন কেন, মিস্টার ম্যাকআরথার? ভুরু নাচাল কিশোর। হঠাৎ চাপড় মারল নিজের কপালে। আমি একটা আস্ত গাধা, ক্ষমার অযোগ্য, বুদ্ধ। হায়, হায়, কি ভেবেছি? ডাকাতিতে জড়িত ছিলেন বলে তো গায়েব হননি মহিলা! তাকে গায়েব করা হয়েছে! মিস্টার ম্যাকআরথার, আপনাকে চিনে ফেলেছিলেন তিনি, না? আপনার ব্যাপারে অস্বাভাবিক কিছু মনে পড়ে গিয়েছিল তাঁর। কি করেছেন তাকে, কোথায় রেখেছেন?

ঢোক গিলল ম্যাকআরথার। আমি কি জানি? আবার খনিমুখের দিকে তাকাল।

লাফিয়ে উঠে দৌড় দিল কিশোর। শেরিফের গাড়ি থেকে একটা শক্তিশালী টর্চ নিয়ে ছুটল খনির দিকে।

ম্যাকআরথারকে দেখিয়ে গর্জে উঠলেন শেরিফ, এ-ব্যাটাকে আটকাও, সহকারীকে নির্দেশ দিয়েই দৌড় দিলেন কিশোরের পেছনে। তাদেরকে অনুসরণ করল জিনা, মুসা, রবিন, আংকেল উইলসন।

ঢালু সুড়ঙ্গ ধরে প্রায় দৌড়ে নামতে লাগল কিশোর। তার ঠিক পেছনেই রয়েছে অন্যেরা।

যে দেয়ালে সোনার টুকরো পাওয়া গেছে, তার পাশ কাটিয়ে এল ওরা। মোড় নিয়ে সেই করিডরে ঢুকে পড়ল, যেটার শেষ মাথায় রয়েছে গর্ত, যাতে পাওয়া গেছে হিলারির লাশ।

ঠিকই অনুমান করেছে কিশোর।

খাদের ভেতরে পড়ে আছেন মিসেস ফিলটার। হাত-পা বাঁধা, মুখে রুমাল গোজা। অসহায়।

২০

উজ্জ্বল হলো মিসেস ফিলটারের চোখ।

তাড়াতাড়ি ফিরে গিয়ে একটা মই এনে গর্তে নামলেন শেরিফ।

ইস্, খুব কষ্ট পেয়েছি, মুখ থেকে রুমাল সরাতেই বললেন মিসেস ফিলটার। আমি তো ভাবছিলাম আর বুঝি কেউ আসবেই না।

হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিতেই স্বচ্ছন্দে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। বাঁধা জায়গাগুলো বার কয়েক ডলে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করে নিলেন, হাত দিয়ে কাপড়ের ধুলো ঝেড়ে এসে মই ধরলেন।

মিসেস ফিলটারের সুটকেসটা তুলে আনলেন শেরিফ।

ঠগটা কোথায়? ওপরে উঠে জিজ্ঞেস করলেন মিসেস ফিলটার।

মিস্টার ম্যাকআরথার? পাল্টা প্রশ্ন করল কিশোর।

ও ম্যাকআরথার নয়। বাচ্চাটার মাঝে অদ্ভুত কি ছিল, পরে মনে হয়েছে। জন্মের সময়ই ওর চোখ ছিল বাদামী। এমনিতে, নীল চোখ নিয়ে জন্মায় যে কোন বাচ্চা, বড় হলে ধীরে ধীরে চোখের রঙ বদলায়, একেক জনের একেক রকম হয়। কিন্তু ম্যাকআরথারের জন্মের সময় যা ছিল, পরেও তাই রয়েছে, কয়েক বছর তো দেখেছি, এখনও নিশ্চয় ওরকমই আছে। নীল বদলে বাদামী হয়, কিন্তু বাদামী বদলে নীল হয়েছে শুনিনি।

লোকটাকে বলেছেন নাকি একথা?

বলেই তো পড়লাম বিপদে। বন্দুক ধরে রেখে আমাকে সুটকেস গোছাতে বাধ্য করল। এখানে এনে ফেলল। কোথায় সে?

বাইরে, জানালেন শেরিফ। আরেকটু পরেই হাজতে ঢুকবে।

হাজত তার জন্যে অনেক ভাল জায়গা, এই শাস্তি পছন্দ হচ্ছে না মিসেস ফিলটারের।

আপাতত এরচে খারাপ জায়গা আর পাচ্ছি না, মিসেস ফিলটার, হেসে বললেন শেরিফ। পরে অন্য ব্যবস্থা করব।

আসামীদেরকে হাজতে নিয়ে গেলেন শেরিফ।

সেই বিকেলেই ফিরে এলেন আবার আংকেল উইলসনের র‍্যাঞ্চে, একা। ইতিমধ্যে হ্যামবোনে গিয়ে মিসেস ফিলটারের পিকআপটা চালিয়ে নিয়ে এসেছেন উইলসন আর ভিকি।

উইলসনের ঘরেই রয়েছেন মিসেস ফিলটার, চা খাচ্ছেন বসে।

কি খবর, শেরিফ? শেরিফকে দেখে হাসলেন তিনি।

শেরিফও হাসলেন। একে একে তাকালেন তিন গোয়েন্দা আর জিনার দিকে। ঠিকই বলেছ তোমরা। ওই দুই ব্যাটা ডাকাতিতে জড়িত। একেবারে দাগী আসামী। অপকর্ম এর আগেও অনেক করেছে। চারটে স্টেটের পুলিশ খুঁজছে

ওদেরকে। আর হ্যাঁ, বাড হিলারিও ছিল ওদের দলে।

হারামীটার কি করলেন? জানতে চাইলেন মিসেস ফিলটার।

উকিলকে ফোন করেছে। লাভ হবে কচু। ওর আঙুলের ছাপ নিয়ে ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছি। আমার ধারণা, পুলিশের খাতায় রেকর্ড মিলবেই। লোক ঠকানোয় ওস্তাদ তো, সেটা একবারে হয়নি। ঠিকই ধরেছেন, ম্যাকআরথার নয় সে, আসল ম্যাকআরথারের সঙ্গে ফোনে কথা বলে এলাম।

শুরু থেকেই বলছি, ওটা একটা আস্ত ভণ্ড! সুযোগ পেয়ে ঝাল ঝাড়ল জিনা। কেউ শুনলেন না আমার কথা। পুরানো গাড়িটার কথা যখন মিথ্যে বলল, তখনই বোঝা উচিত ছিল আমার চাচারু।

যা হবার হয়েছে, মিস জিনা, ভুল স্বীকার করছি, যাও, হাত-জোড় করে দেখিয়ে জিনার রাগ কমালেন শেরিফ। এখন তো ধরা পড়েছে। সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে এসেছি, বাড়ি তল্লাশি করব ওর।

আরও প্রমাণ খুঁজছেন? জিজ্ঞেস করল রবিন।

হ্যাঁ। এবং দশ লাখ ডলার।

খবরটা হজম করার সময় দিলেন সবাইকে, তারপর বললেন, হ্যারি আর বিংগো মুখ খুলেছে। ওদের সঙ্গে যে মেয়েমানুষটা ছিল, তার নাম ভিকি নরমা…না না, ভিকি, তুমি চমকে ওঠো না, তুমি না। আরেকজন। জেলে পচছে এখন। ডাকাতি করে সোজা লঙর্সবুর্গে গিয়ে এক হোটেলে উঠেছিল চারজনে। কিন্তু পরদিন অন্য তিনজনকে ফাঁকি দিয়ে সব টাকা নিয়ে কেটে পরে চোরের সর্দার বাড হিলারি। পালিয়ে আসে টুইন লেকসে। তারপর থেকে তার আর কোন খবর পায়নি সহকারীরা। ইতিমধ্যে আরেক চুরির কেসে ফেঁসে গিয়ে ধরা পড়ল ভিকি। কিন্তু হ্যারি আর বিংগোকে ধরতে পারেনি পুলিশ। তারা হিলারির লাশ পাওয়া গেছে শুনে ছুটে এসেছে টুইন লেকসে, টাকার সন্ধানে।

কিন্তু ম্যাকআরথার পেয়ে গিয়ে যে কোথাও লুকিয়ে রাখেনি, কি করে জানছেন? প্রশ্ন রাখল মুসা।

না, তা মনে হয় না, মাথা নাড়ল কিশোর। এত টাকা পেলে ও ঠগবাজি করার জন্যে আর এখানে বসে থাকত না এক মুহূর্তও। টাকাগুলো নিয়ে সোজা, নিখোঁজ হয়ে যেত। আমি ডাকাত হলে অন্তত তাই করতাম।

আমিও, শেরিফ বললেন। সেজন্যেই ভাবছি, টাকাগুলো কাছাকাছিই কোথাও রয়েছে। কিন্তু কোথায়? খনিতে নেই, আমি শিওর। লাশটা পাওয়ার পর খনির ভেতরে কোথাও খোঁজা বাদ রাখিনি, টাকা খুঁজিনি অবশ্য, সূত্র খুঁজেছি।

মিসেস ফিলটারের কোন ঘরে লুকায়নি তো? বলে উঠল জিনা। ওখানেই তো প্রথমে উঠেছিল হিলারি।

অসম্ভব না, একমত হলো মুসা। চলো, খোঁজা শুরু করি। আরিব্বাপরে, দশ লাখ। জিন্দেগীতে এক সঙ্গে চোখে দেখিনি।

এর চেয়ে অনেক বেশি দেখেছ, জলদস্যুর দ্বীপে, মনে করিয়ে দিল জিনা।

সে তো সোনার মোহর, নগদ টাকা না।

প্রথমে মিসেস ফিলটারের বাড়ি থেকে শুরু করল ওরা। এক ঘরে একটা : সোফার নিচে পাওয়া গেল আঙ্কেল উইলসনের হারানো ছুরি। কিন্তু টাকা নেই।

খনিতে খোঁজা হলো আরেকবার!!

খনির কাজকর্মের বিল্ডিং, নকল ম্যাকআরথারের কেবিন, চিরুনি দিয়ে উকুন খোঁজার মত করে খোঁজা হলো। তার বিরুদ্ধে যায়, এমন কিছু কাগজপত্র পাওয়া গেল? বেশ কিছু ধনী লোকের নাম ঠিকানার তালিকা, ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট বই-ধাপ্পা দিয়ে লোকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ওসব অ্যাকাউন্টে জমা করত ঠগটা। কিন্তু লুটের টাকা পাওয়া গেল না।

কেবিনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঘনঘন নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটছে কিশোর। শেরিফ বেরিয়ে আসতেই বলল, আর একটা মাত্র জায়গা আছে।

কোথায়? ভুরু কোচকালেন শেরিফ।

আংকেল উইলসনের গোলাঘরে।

হই হই করে ছুটল সবাই।

ধুলো আর মাকড়সার জালে ঢাকা কোণা-ঘুপচি কিছুই বাদ দেয়া হলো না? কিন্তু পাওয়া গেল না টাকা।

নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে কাটতে পুরানো টি-মডেলের দিকে এগোল কিশোর। কি ভেবে ঢুকে গেল ভেতরে। শেরিফের কথা কানে আসছে, বোধহয় টাকাগুলো অন্য কোথাও রেখে এসেছিল ব্যাটা, টুইন লেকসে আনেইনি…

প্রথমেই পেছনের সীটে চাপ দিল কিশোর।

নড়ে উঠল গদি। আলগা।

হ্যাঁচকা টানে সরিয়ে আনল গদি। চেঁচিয়ে উঠল, পেয়েছি। পেয়েছি।

ছুটে এল সবাই। হুড়মুড় করে গাড়িতে উঠে পড়ল জিনা আর মুসা, অন্যেরা পারল না, জায়গা নেই।

আরিব্বাপরে! এত টাকা? চোখ বড় বড় করে ফেলল মুসা। যাক বাবা, চোখ সার্থক হলো।

সুন্দর পরিপাটি করে অনেকগুলো বাণ্ডিল করা হয়েছে নোটের তাড়া দিয়ে, যত্ন করে ভরেছে প্লাসটিকের ব্যাগে।…

একটা ব্যাগ ছিড়ল কিশোর। পাঁচ বছর পরেও আনকোরাই রয়েছে বিশ ডলারের নোটলো, তাজা গন্ধ আসছে।

গুণতে কদিন লাগবে? মুসার প্রশ্ন।

ঈশ্বরই জানে, হাত নাড়লেন শেরিফ। বাইরে দাঁড়িয়ে গাড়ির জানালায় নাকমুখ চেপে রেখেছেন, ধুলো-ময়লায় যে মাখামাখি হচ্ছে খেয়ালই নেই।

২১

কয়েক দিন পর রকি বীচে ফিরে এসেছে তিন গোয়েন্দা। বিখ্যাত চিত্রপরিচালক, মিস্টার ডেভিস ক্রিস্টোফারের অফিসে এসেছে দেখা করতে, সেই সাথে লেটেস্ট কেসের রিপোর্ট দিতে।

কি ব্যাপার? তিন গোয়েন্দাকে দেখে বললেন চিত্রপরিচালক। টেলিফোনে তো বললে মালির কাজ করতে গেছ? হাতে ফাইল কেন? জবাবটা নিজেই দিলেন। বুঝেছি। এমন একটা জায়গায় গেছ। রহস্য কি আর মিলবে না। তাছাড়া সঙ্গে ছিল জরজিনা পারকার…

হেসে ফাইলটা টেবিলের ওপর দিয়ে পরিচালকের দিকে ঠেলে দিল রবিন।

মন দিয়ে রিপোর্টের প্রতিটি শব্দ পড়লেন পরিচালক। তারপর মুখ তুললেন। মিসেস ফিলটারের কাছে মাপ চেয়েছ তো, কিশোর? ভাগ্য ভাল, বাড়ি গিয়ে তাকে পাওনি সেদিন, নইলে আরও লজ্জা পেতে।

পাইনি বলেই ভুলটা আরও বেশি হয়েছে, স্যার, স্বীকার করল কিশোর। নইলে জানতে পারতাম, নকল ম্যাকআরথারকে চিনে ফেলেছেন তিনি। আরও আগেই ধরা যেত হ্যারি আর বিংগোকে, জিনা আর মুসারও মরু-সফর হত না।

হুঁ, তা ঠিক, মাথা দোলালেন চিত্রপরিচালক। কিন্তু ডাকাতির পর পরই কোথায় গায়েব হয়ে গিয়েছিলেন মহিলা? টুইন লেকসে জায়গা কেনার টাকা পেলেন কোথায়?

ঘটনাগুলো অনেকটা, কি বলব, কোইনসিডেন্সই হয়ে গেছে। ডাকাতিও। হলো, সেই সময় মিসেস ফিলটার খবর পেলেন, তার এক ফুফু মরে মরে অবস্থা। দোকানে খবর দেয়ার সময় পাননি তিনি, আর কিছুটা গাফিলতিও বটে, দেননি। না দিয়েই চলে গেলেন ফুফুকে দেখতে, আল পেসোতে। সেটা মে আর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি। জান দিয়ে ফুফুর সেবা করলেন কয়েকদিন। কিন্তু বাঁচলেন না মহিলা, অনেক বয়েস হয়েছিল। চিরকুমারী ছিলেন, আর কোন আত্মীয় নেই। তাই, মৃত্যুর আগে যার কাছ থেকে সেবা পেয়েছেন, সমস্ত সম্পত্তি তাকেই দিয়ে গেছেন। তবে সেটা খুব বেশি কিছু ছিল না। তবু, সেটাই তখন ছিল মিসেস ফিলটারের কাছে অনেক বেশি। ফুফুর জায়গা বিক্রি করে দিয়ে টুইন লেকসে, তাঁর প্রিয় শহরে এসে জায়গা কিনলেন।

বুঝলাম।…তা, নকল ম্যাকআরথারকে কি আদালতে হাজির করেছে?

করেছে। তার আসল নাম জনি হারবার। অনেক জায়গায় তার নামে পুলিশ ওয়ারেন্ট আছে। অনেক জায়গায় ঠগবাজি করে এসেছে। শেষবার করতে চেয়েছে ডাৱাস-এর এক মস্ত ধনীর সঙ্গে। তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল ডেথ ট্র্যাপ মাইন দেখাতে। শুধু ধাপ্পাবাজই নয়, পাকা জালিয়াতও সে। ব্যাঙ্ক সার্টিফিকেট আর জায়গার দলিল জাল করে মক্কেলদের দেখিয়েছে, সে কত বড় লোক। একেক জায়গায় গিয়ে একেক সময় একেক পরিচয় দিয়েছে। শেষবার ম্যাকআরথার সেজে এসেছে।

তবে ডেথ ট্যাপ মাইনে বিশেষ সুবিধে করতে পারেনি জনি, সময়ও পায়নি অবশ্য। আংকেল উইলসনের কাছ থেকে জায়গা কিনেছে পঁচিশ হাজার ডলারের, কিন্তু দিয়েছে মাত্র এক হাজার। বুঝিয়েছে, স্টক মার্কেটে তার কোটি কোটি টাকা আটকে গেছে, এই ছুটল বলে, তারপর এক সঙ্গে বাকি চব্বিশ হাজার দিয়ে দেবে। আসলে আর এক পয়সাও দিত না। খালি সময় বাড়াত, ইতিমধ্যে বোকা কিছু মক্কেল জুটিয়ে ভাল রকম একটা দাও মেরে সরে পড়ত একদিন। আগেও এ-রকম করেছে বহুবার।

কিশোর থামতেই রবিন বলল, কিন্তু এবার বাদ সাধলেন মিসেস ফিলটার। বুঝে ফেললেন লোকটা ম্যাকআরথার নয়। ফলে তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে খনির মুখে গর্তে ফেলে রাখল জনি। পিকআপটা নিয়ে গিয়ে রেখে এল হ্যামবোনে। এমনভাবে সাজল, যেন হঠাৎ জরুরী খবর পেয়ে তাড়াহুড়ো করে বেড়াতে কিংবা অন্য কোন কারণে চলে গেছেন মিসেস ফিলটার, কাউকে কিছু জানানোর সুযোগ পাননি। পিকআপটা হ্যামবোনে নিয়ে ফেলে এসেছে যাতে কেউ খুঁজে না পায়। পার। পেয়েও যেত, কিন্তু এবারে জনির কপাল খারাপ। আমরা গিয়েছি টুইন লেকসে। তছাড়া হ্যারি আর বিংগোও গেছে লুটের টাকার খোঁজে।

মেকসিকান দুই শ্রমিকের ব্যাপারটা কি? জিজ্ঞেস করলেন পরিচালক। জনি হারবারের সহকারী ছিল?

না, জবাব দিল কিশোর। ওদেরকে শ্রমিকের কাজ করার জন্যেই ভাড়া করে এনেছে জনি। বেড়া দেয়া, বাড়িঘর রঙ করানো থেকে শুরু করে খনিতে ডিনামাইট ফাটানো, সব কাজই করত। তবে, ওরাও একেবারে সুধু নয়, সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে এসেছে, বেআইনী অনুপ্রবেশ, তাই জনির শয়তানী কিছুটা বুঝে থাকলেও মুখ বুজে ছিল। আর এ-কারণেই বেছে বেছে ওদেরকে ভাড়া করেছে জনি।

তবেলোকগুলোভাল, মেকসিকোয় কাজের আশায়ই এসেছে, ক্রিমিনাল নয়, রবিন বলল। সব খুলে বলেছে আংকেল উইলসনকে। কর্তৃপক্ষেরসঙ্গে যোগাযোগ করে ওদের কাগজপত্র ঠিক করেছেন আংকেল, নিজের র‍্যাঞ্চে কাজ দিয়ে রেখে দিয়েছেন। জনির কুকুরটা নিয়ে এসেছে ভিকিখালা। এনেই আগে পেট ভরে। খাইয়েছে, তার ভক্ত হয়ে গেছে কুকুরটা। রাতে তার বিছানার পাশে শোয়। পেট ভরা থাকে, ফলে মুরগীর দিকে ফিরেও তাকায় না আর, চুরির স্বভাবও চলে গেছে।

শুনে সুখি হলাম, চেয়ারে হেলান দিলেন পরিচালক। চমৎকার একটা কেস। কিন্তু পুরোপুরি মীমাংসা হলো না সব কিছুর।

কোনটা, স্যার? জিজ্ঞেস করল মুসা।

বাড হিলারি খনিতে পড়ে মরেছে, এতে কোন সন্দেহ নেই, বললেন পরিচালক। কিন্তু কেন মরেছে, জানা যাবে না। আর টাকাগুলোই বা কেন টিফোর্ডের সীটের তলায় লুকাল?

অনুমান করা যেতে পারে, বলল কিশোর। সাময়িকভাবে হয়তো গাড়িতে টাকাগুলো লুকিয়েছিল হিলারি, তারপর খনিতে গিয়ে ঢুকেছিল আরও ভাল কোন জায়গা খোঁজার আশায়। তারপর কোন কারণে আর বেরোতে পারেনি। কারণটা কি, কোনদিন জানা যাবে না। আরও একটা ব্যাপার জানা যাবে না, খনিমুখ যখন বন্ধ করা হয়, তখন সে জীবিত ছিল, না মৃত…।

মৃতই হবে, বাধা দিয়ে বলল মুসা। নইলে হাঁকডাক শুনে মুখের কাছে চলে আসত। দেখলে তো আর তখন তাকে ভেতরে রেখে সীল করা যেত না।

কিন্তু তার আগেই যদি গর্তে পড়ে গিয়ে থাকে? পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মরে গেলে তো বেঁচে গেছে, কিন্তু যদি জীবিত থাকে? ক্ষুধাতৃষ্ণায় ধুকে ধুকে মরেছে বেচারা…

এত বড় শাস্তি আল্লা পম শত্রুকেও না দিক, কথাটা অন্তর থেকে বেরোল মুসার।

আরেকটা ব্যাপার, বললেন পরিচালক, লাশটা নিশ্চয় আগেই দেখেছিল জনি?

হ্যাঁ, কিশোর বলল, এ-জন্যে কাউকে খনিতে ঢুকতে দিত না, জানাজানি হলেই লোক ছুটে আসবে দলে দলে। চোরের মন পুলিশ পুলিশ। জনির হয়েছে। তাই বেশি লোক যাতায়াত করলে কত রকম গোলমালই হতে পারে, তার আসল কাজে বাধা আসতে পারে, তাই ব্যাপারটা চেপে রাখতে চেয়েছিল।

হুঁম, মাষ্টা দোলালেন পরিচালক।

আপনার জন্যে একটা জিনিস নিয়ে এসেছি, স্যার, পকেটে হাত ঢোকাল কিশোর। একটা ছোট স্যুভনির। তামা মেশানো সোনার টুকরোটা বের করে দিল।

খুব আগ্রহ দেখিয়ে জিনিসটা নিলেন পরিচালক। থ্যাংক ইউ। খনি থেকে পাওয়া কাঁচা সোনার টুকরো বেশ কয়েকটা আছে আমার, কিন্তু ওগুলো কৃত্রিম, আসল একটাও নেই। তার ওপর আবার নকশা কাটা…আচ্ছা, তামা মিশল কি করে? কার্তুজের ভেতরে তো জানি, সীসা বা লোহার বল থাকে?

সেটাও জনি হারবারের কীর্তি, হেসে বলল কিশোর। নিজেই কার্তুজ বানিয়ে নিয়েছে সে, লোহার বলের জায়গায় ছোট ছোট তামার টুকরো ভরেছে।

হুঁ, চালাক ঠিকই। ফেঁসে গেছে কপাল খারাপ বলে।…নুড়িটা কি করেছ?

জিনাকে দিয়ে দিয়েছি।

ওটা ওর প্রাপ্য, মুসা বলল, আরিবারে, অনেক মেয়ে দেখেছি, কিন্তু ওর মত মেয়ে খুনে ডাকাতগুলোর সঙ্গেও যা…ইয়ে, যা…

গোয়ার্তুমি, শব্দটা ধরিয়ে দিলেন চিত্রপরিচালক।

হ্যাঁ, যা গোয়ার্তুমি করল। কিছুঁতেই হেঁটে যেতে রাজি হলো না ভাকাতগুলোর সঙ্গে। গেলে আর আমাদের খুঁজে পেত না হেলিকপ্টার। এই কেসই হত তিন গোয়েন্দার শেষ কেস।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *