কুয়াশা – ০২

কুয়াশা - ০২ - কাজী আনোয়ার হোসেন

০১. টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়েই চলেছে

টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়েই চলেছে আজ ছসাতদিন ধরে। শ্রাবণের মাঝামাঝি। একবার শুরু হলে আর থামতেই চায় না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। Dienfa Workshop-এ অষ্টিন এইট ফিটি গাড়িটা অয়েলিং করবার জন্যে রেখে শহীদ পায়ে হেটে বাড়ি ফিরছে। ওয়াটারপ্রুফ পরা, পায়ে গাম -বুট, মাথায় টুপি। ভিজবার কোনও...

০২. পরদিন বিকেল বেলা

পরদিন বিকেল বেলা। বৃষ্টি পড়েই চলেছে। মাঝে মাঝে দুই এক ঝলক ঠাণ্ডা বাতাস এসে ঢুকছে শহীদের ড্রইংরুমের খোলা জানালা দিয়ে। বৃষ্টির কণাও কিছু কিছু এসে দামী পুরু কার্পেটের খানিকটা ভিজিয়ে দিয়েছে। বাতাসের ঝাপটার সাথে সাথে খুব সূক্ষ্ণ বৃষ্টির কণা এসে লাগছে চোখে মুখে। লম্বা...

০৩. আমাদের জাহাজ কি কলম্বো ঘুরে যাবে

আমাদের জাহাজ কি কলম্বো ঘুরে যাবে? কামাল জিজ্ঞেস করলো। হাঁ। মধ্যেখানে মাত্র দুইটা হলটেজ। কলম্বো আর মরিশাস। কালকে আমরা চিটাগাং রওনা হচ্ছি। ঢাকায় আজই আমরা শেষ রাত কাটাবো। হয়তো আর কোনও দিন ফিরে আসবো না। চাচী আম্মার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এসেছিস তো? তুই রাতে আমাদের এখানে...

০৪. ফ্লেমিংগো জাহাজ ছাড়লো চিটাগাং থেকে

ফ্লেমিংগো জাহাজ ছাড়লো চিটাগাং থেকে। মস্তবড় জাহাজ। কলম্বো আর মরিশাস হয়ে সোজা দক্ষিণ-পূর্ব আফ্রিকার ডারব্যান বন্দরে যাবে। পাশাপাশি দুটো কেবিন পেয়ে গেছে শহীদরা। বড় কেবিনটায় শহীদ আর মহুয়া, আর মাঝারি কেবিনে কামাল। গফুর ডেকে ভালো ব্যবস্থা করে নিয়েছে। ফরিদপুরের মানুষ। যাত্রী...

০৫. লঞ্চের হালের নিচের দিকটা লোহার

লঞ্চের হালের নিচের দিকটা লোহার। কারণ জিজ্ঞেস করায় ড্রাইভার বললো, কুমীরগুলো অনেক রকম বুদ্ধি খাটায়। যখন বড় বড় ক্যানো উলটিয়ে ফেলতে পারে না, তখন হাল ভেঙে ফেলে লেজের বাড়ি মেরে। ফলে স্রোতের মুখে নৌকা যেদিক খুশি সেদিকে চলে। পাড়ের সাথে ধাক্কা লেগে হয় নৌকা ভাঙে এবং লোকগুলো...

০৬. এদিকে বিকেল বেলা

এদিকে বিকেল বেলা কামাল, মহুয়া, গফুর আর কুফুয়ার এক মেয়ে পেণ্ডা জায়গাটা ঘুরে ফিরে দেখে আসতে গেছে। শহীদ সকালে বেশ খানিকটা ঘুরে এসেছিল, তাই ও আর গেল না। গফুরেরও যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো না, দিদিমণি যখন যাচ্ছে তখন সেও চললো ওদের পিছু পিছু! জায়গাটা বেশ ছোটো। কিন্তু বহু লোকের বাস...

০৭. শহীদ আর কুফুয়া ঘরে ফিরে এসে

শহীদ আর কুফুয়া ঘরে ফিরে এসে একটা চৌকিতে বসলো। শহীদ জিজ্ঞেস করলো, ধরা পড়বেন না পুলিসের হাতে? না। ধরা পড়লেও ভয়ের কারণ নেই। কেন? যে লোকগুলোকে খুন করা হলো ওদের এদেশে প্রবেশাধিকার নেই। সরকারীভাবে বহু আগেই আইন পাস হয়েছে। এরা গায়ের জোরে প্রবেশ করে। আমাদের দেশের লোকের সাথে...

০৮. কামাল মহুয়া আর পেণ্ডাকে কাঁধে করে

কামাল মহুয়া আর পেণ্ডাকে কাঁধে করে লোকগুলো একটা ঘরে ঢুকলো। আলো জ্বেলে দিলো একজন। সেই আলোতে কামাল চেয়ে দেখলো পেণ্ডার চোখ বাঁধা। মহুয়ার চোখে আতঙ্কের স্পষ্ট ছাপ। তিনজনেরই মুখের মধ্যে কাপড় গোঁজা। কথা বলবার উপায় নেইI চারজন লোক বিদায় নিয়ে চলে গেল। একজন তাদের বিদায় দিয়ে দরজা...

০৯. ভােরের দিকে

ভােরের দিকে শহীদ, গফুর আর কুফুয়া লঞ্চে ফিরে এলো। সারা রাত্রির ধকলে শরীর অবশ হয়ে গেছে। ক্লান্তি নৈরাশ্য সব একসাথে ওদের যেন কাবু করে দিয়েছে। কিন্তু লঞ্চে উঠেই শহীদ দেখলো মহুয়া, কামাল, পেণ্ডা আর কুফুয়ার স্ত্রী বসে আছে। এক মুহর্তে শহীদের সমস্ত ক্লান্তি চলে গেল। সবকিছু...

১০. লিম্পোপো থেকে একটা খাল বের হয়ে

লিম্পোপো থেকে একটা খাল বের হয়ে বোঙ্কারা অঞ্চলে চলে গেছে। সেই খালের মুখের বেশ কিছু পশ্চিমে গিয়ে লঞ্চ নোঙর করা হলো। ঘাটের সাথে লঞ্চ লাগানো গেল না, জল খুব অল্প। লঞ্চ থেকে দুটো তক্তা নামিয়ে তার ওপর দিয়ে হেঁটে পাড়ে নামলো শহীদরা। মি. ব্লাইদ লঞ্চেই রইলো। এই বিকেল বেলা বনের...

১১. গভীর রাত

গভীর রাত। ঢাক, হৈ-হল্লা থেমে গেছে অনেকক্ষণ। জংলীরা বোধহয় যে যার ঘরে গিয়ে এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। মহুয়া আঘোরে ঘুমােচ্ছে। গফুর বসে বসে ঝিমাচ্ছে ডালের ওপর। কোন সময়ে ঝুল লেগে পড়ে যাবে মাটিতে, তাই কামাল একটা রশি দিয়ে আলগোছে ওকে গাছের সাথে বেঁধে রেখেছে। শহীদের ডিউটি শেষ করে...

১২. বড় সুন্দর ভাবে জংলীরা

বড় সুন্দর ভাবে জংলীরা ওদের আস্তানা সুরক্ষিত করেছে। চারপাশে খুব ঘন করে লাগিয়েছে গাছ। সে সব গাছ বড় হয় মােটা হয়েছে, ফলে একটার সাথে আরেকটা লেগে গেছে। ইউক্যালিপটাস গাছের মতো সাদা এই গাছগুলোর শরীর। কোনো বন্য জন্তুর পক্ষে এ প্রাচীর ভেদ করে ওধারে যাওয়া সম্ভব নয়। ওদের এলাকায়...

১৩. অনেকদূর পশ্চিমে চলে গেছে শহীদরা

অনেকদূর পশ্চিমে চলে গেছে শহীদরা। তারপর আবার উত্তরে। জংলী এলাকার কাছে এসে পড়েছে তারা। সেই সারি বাঁধা গাছগুলোর ধার দিয়ে তারা বাঁ দিকের পথ ধরে এগিয়ে চললো। হঠাৎ কাছেই একটা রাইফেলের শব্দ শুনে থমকে দাঁড়ালো শহীদ। পুবদিক থেকে এলো শব্দটা। আবার আওয়াজ। এবার আর একটু কাছে থেকে।...

১৪. ভোর পাঁচটা

ভোর পাঁচটা। অন্ধকার দ্রুত পরিষ্কার হয়ে আসছে। জংলী এলাকা থেকে প্রচণ্ড গোলমাল শোনা যাচ্ছে। অথচ শহীদরা এখনও পৌঁছতে পারলো না লঞ্চে। আরও আধ মাইল পথ যেতে হবে। পথে অনেকবার থামতে হয়েছে তাদের। শহীদের বাবা ঝাঁকুনি সহ্য করতে পারছেন না। কিছুক্ষণ পরই বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। মহুয়াকে...