২.১০ জ্যাকসনভিল পৌঁছল ওরা

দুপুরের একটু আগে জ্যাকসনভিল পৌঁছল ওরা। দেখেশুনে সৈকতের কাছাকাছি এক মোটেলে উঠল। একটা টিলার ওপর, আটলান্টিকের জলোচ্ছ্বাসের সর্বোচ্চ মাত্রারও পঞ্চাশ ফুট ওপরে সাগরের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে ধপধপে সাদা মোটেলটা। ইউ শেপড। দোতলা। স্পেনীয় ধাঁচের টাইলের ছাদ। ইউ এর দুই বাহুর মাঝখানে চমৎকার ঘাসমোড়া লাউঞ্জিং এরিয়া।

তার ঠিক মধ্যিখানে ছোট একটা সুইমিং পুল। ওঠার আগেই খোঁজ নিয়ে জেনেছে মাসুদ রানা, নিজস্ব কার রেন্টাল সার্ভিস তো বটেই, বোট রেন্টাল সার্ভিসও আছে এদের।

মোটেলের সামনে দাঁড়ালে, তিন-চারশো গজ দূরে সৈকতে এদের নিজস্ব রংচঙে জেটি ও তাতে বাধা ডজনখানেক বোট। চোখে পড়ে। মাঝারি সাইজের ইয়টও আছে ওর মধ্যে দুটো। আগে-পরে, আলাদা আলাদাভাবে মোটেলে উঠল ওরা। আগে। থেকে ঠিক করা পরিকল্পনা অনুযায়ী ফয়েজ ও বিল্লাহ বাইরে থেকে খেয়ে এল প্রথমে। পরে বেরুল মাসুদ রানা ও নাদিরা। লাঞ্চ সেরে ট্যাক্সি নিয়ে মোটেলে ফিরে এল মেয়েটি, রানা গেল জুয়েলারি মার্কেট। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে পাথরগুলো খসিয়ে ফেলল ও। তারপর ফোন করল আরমান্দো সোকারাসের নাম্বারে।

কাজ কতদূর?

কতদূর কি, বস্? সময়মতই কমপ্লিট হয়ে গেছে সব। আপনার ডাকের অপেক্ষায় বসে আছি।

কোথায় ওগুলো?

আমার সামনেই। টেবিলের ওপর।

ঠিক আছে। এখন শোনো, আগামীকাল সকাল দশটায়। জ্যাকসনভিল আটলান্টিক বুলেভার্ড পৌঁছবে তুমি।

জ্যাকসনভিল, বস্! ও প্রান্তে প্রায় গুঙিয়ে উঠল কিউবান। মাই গড! অতদূর যেতে হবে?

হ্যাঁ।

কিন্তু, বস্…

কোন কিন্তু নেই, আরমান্দো। ওখানেই কাগজপত্র আমার হাতে তুলে দিচ্ছ তুমি। পরিষ্কার?

কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে রাজি হয়ে গেল কিউবান। ঠিক আছে, বস্। আপনি যখন বলছেন, কি আর করা।

গুড।

বাকি টাকা?

আছে। ভয় নেই।

ছি ছি! আমি তা বলিনি। আচ্ছা যাক, বাদ দিন। ওখানে কোথায় পাব আপনাকে?

আটলান্টিক বুলেভার্ড থেকে শহরের দিকে যে রাস্তাটা এসেছে অরল্যাণ্ডের দিক থেকে, তার ঠিক মুখেই একটা ওপেন ফোন বুদ আছে। ওখানে থেকো। ঠিক সোয়া দশটায় ওটার নাম্বারে ফোন করব আমি।

ফোন করবেন! শহরের ও মাথায়? বিস্ময় ফুটল আরমান্দোর কণ্ঠে। আপনি থাকবেন না?

আমি কোথায় থাকব, তখনই জানতে পাবে তুমি।

 চুপ করে থাকল লোকটা।

আরমান্দো!

আমি শুনছি, বস্।

 যা বললাম, বুঝতে পেরেছ?

ফোস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল কিউবান। বস্, এত  সবের কি কোন প্রয়োজন ছিল? আশ্চর্য! আমার ওপর বিশ্বাস এতটাই চটে গেল আপনার?

বোকার মত কথা বোলো না! প্রয়োজন আছে কি নেই সেটা ব্যাখ্যা করার সময় আসবে পরে। আর এ নিয়ে আবেগপ্রবণ হওয়ারও কিছু নেই। তুমি ভালই জানো আমার কাজের পদ্ধতি। আর যতক্ষণ না উল্টোটা প্রমাণ হয়, ততক্ষণ কারও ওপর থেকে বিশ্বাস হারাই না আমি। তাই যদি হত, কাজটা আমি তোমাকে দিতামই না। ও কাজ করে দেয়ার মত সোর্সের অভাব নেই আমার, সেটাও তুমি জানো।

হা। জানি।

তবু কেন আমি তোমাকে বেছে নিলাম, ভেবে দেখ। উত্তরটা। নিজেই পেয়ে যাবে।

আবার খানিক বিরতি। সরি, বস্। ভুল হয়ে গেছে। আর হবে না কখনও।

ভেরি গুড। তাহলে ওই কথাই থাকল। ঠিক সোয়া দশটায়।

শিওর। ছবিগুলো আনতে ভুলবেন না, বস্।

না। ভুলব না। ওদের আর কোন খবর আছে?

মানে রবা…ইয়ে, ওদের? না, বস্। একদম সাড়া নেই। মনে হয় নেই ব্যাটারা এখানে। চলে গেছে বোধহয়।

সতর্ক থেকো পথে। ফেউ লাগে না যেন পিছনে।

ফেউ! আমার পিছনে? হাসালেন।

হাসালাম নাকি? তাহলে হেসে নাও খানিক। কিন্তু লক্ষ। রেখো, পরে যেন কাদতে না হয় আবার।

ওকে, বস্। সতর্ক করে দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ। আপনিও। গর্ত ছাড়ার আগে চারদিকটা দেখে নেবেন।

লোকটাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন ছেড়ে দিল মাসুদ রানা। ফিরে এল হোটেলে। আরমান্দোর টাকাটা আলাদা করে একটা রুমালে পেঁচিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখল। তারপর খানিক গড়াগড়ি করে উঠে পড়ল। বেরিয়ে এসে লাউঞ্জে বসল নাদিরাকে নিয়ে। ফয়েজ আর বিল্লাহও এসেছে। ওদের থেকে খানিকটা তফাতে। বসেছে তারা, যেন চেনে না। গল্প করতে করতে কফি খেলো ওরা।

 পাটে বসতে চলেছে সূর্য। মেঘের দাপটের কাছে আজ। সারাদিন এমনিতেই বেশ নিস্তেজ ছিল ওটা। মেঘ এখনও আছে। আকাশে, তবে ছেড়াফাটা। চলছে ধীর গতিতে, ড্রাগনের মত মোচড় খেতে খেতে। আলো-অ্যাঁধারীর চমৎকার খেলা চলছে সৈকতে। চলো, রানা, বীচে গিয়ে বসি।

চলো। রুম থেকে বড় দুটো তোয়ালে নিয়ে এল মাসুদ রানা। ফয়েজ আর বিল্লাহর পাশ কাটিয়ে আসার সময় চাপা গলায় বলল, রুমের দিকে খেয়াল রেখো।

হাঁটতে হাঁটতে একেবারে কিনারায় এসে দাঁড়াল রানানাদিরা। বালুকাবেলায় ভেঙে পড়ে গড়িয়ে এসে ওদের পা ভিজিয়ে দিচ্ছে সাগরের ফেনিল পানি। নাকেমুখে আছড়ে পড়ছে সূক্ষ্ম পানির কণা। নীরবে দাঁড়িয়ে বাতাসের মৃদু গোঙানি শুনল ওরা। রানা! দীর্ঘ সময় পর নীরবতা ভাঙল নাদিরা।

বলো।

এ দেশে আর আসা হবে না আমার, তাই না?

কেন আসা হবে না? চোখ কুঁচকে ওকে দেখল মাসুদ রানা।

আমি ফিরে এলে রবার্টো… থেমে গেল সে রানাকে মাথা নাড়তে দেখে।

রবার্টো তখন থাকবে না, দৃঢ়, নিশ্চিত কণ্ঠে বলল ও।

বুঝলাম না।

বেশি বুঝে কাজ নেই। মোট কথা রবার্টো তখন থাকবে না। নিশ্চিন্তে ফিরে এসো তুমি।

উম্‌ম্‌! ভাবছি…আর লেখাপড়া করব না। ছেড়ে দেব। কেন?

আর ইচ্ছে করে না। কি হবে পড়ে?

চোখ বড় করে ভাবুকের মত মাথা দোলাল রানা। তাইতো! কি হবে পড়ে?

যাও। হেসে উঠল নাদিরা। ঠাট্টা কোরো না। আমি সিরিয়াসলি বলছি।

আমিও সিরিয়াসলি জানতে চাইছি, লেখাপড়া না করলে তোমাকে যে না খেয়ে থাকতে হবে না তা আমি জানি, কিন্তু। করবেটা কি? সময় কাটাবে কি করে?

বিয়ে করে ফেলব।

বিয়ে?

হুম!

তা মন্দ নয়। আছে নাকি পছন্দের কেউ?

আছে, মিটিমিটি হাসছে নাদিরা। দারুণ স্মার্ট, হ্যাণ্ডসাম ছেলেটা।

তাহলে তো ভালই। সেরে ফেল কাজটা।

কিন্তু একটা মুশকিল আছে।

 প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল মাসুদ রানা।

আমি ছেলেটাকে ভালবাসলেও সে আমাকে বাসে কিনা জানি।।

একতরফা প্রেম?

মুখ নামিয়ে জুতোর ডগা দিয়ে বালি খুঁড়তে লাগল নাদিরা। রানা দেখল, ফরসা মুখটা লাল হয়ে উঠেছে তার। প্রথম প্রথম। কয়েকদিন তাই মনে হয়েছে আমার, নিচু কণ্ঠে বলল সে। কিন্তু…

কি?

কিন্তু পরশু আর কাল রাতে মনে হয়েছে বুঝি দুতরফাই।

আহাম্মকের মত তাকিয়ে থাকল মাসুদ রানা। পরশু আর কা… বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মত চমকে উঠল ও। নিশ্চয়ই গত দুরাতের ঘনিষ্ঠতার কথা বোঝাতে চাইছে নাদিরা। ব্যাপারটা এতই আচমকা শুরু হয়েছিল, যখন বুঝতে পেরেছে রানা, তখন দেরি হয়ে গেছে, অন্তত প্রথম রাতে। আর সে জন্যে ওর চেয়ে নাদিরাই বেশি দায়ী। নাদিরা! মাত্মক ভুল করছ তুমি!

কেন? আমি কি তোমার যোগ্য নই?

করুণ এক টুকরো হাসি ফুটল রানার মুখে। উল্টো বুঝলে, আসলে আমিই তোমার যোগ্য নই। তুমি কেন, কোন মেয়েরই স্বামী হওয়ার যোগ্যতা আমার নেই।

কেন নেই? কিসের অভাব তোমার?

বেঁচে থাকার নিশ্চয়তার অভাব। এ কয়দিন তো সঙ্গে থেকে নিজের চোখেই দেখলে প্রতি মুহূর্তে কি ভাবে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে হয় আমাকে। প্রতিবার আমরা জিতে গিয়েছি বলে এখনও বেঁচে আছি, নইলে বহু আগেই আমার লাশের বুকে পা রেখে গলা ছেড়ে হাসত রবার্টো গার্সিয়া। সারাক্ষণ এর মধ্যেই থাকতে হয় আমাকে, নাদিরা। আমি চাই না আমার সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে কেউ নিজের ধ্বংস ডেকে আনুক। তুমি আমাকে ভুল বুঝো না, প্লীজ!

তার মানে আমারই ভুল! একতরফাই ছিল তাহলে ব্যাপারটা!

না, তোমার ভুল হয়নি। ভাল আমিও বাসি তোমাকে।

 কি বললে? অবাক চোখে তাকাল নাদিরা।

ঠিকই বলেছি। হ্যাঁ, তোমাকে ভালবাসি আমি। ভালবাসি বলেই চাই না তুমি কোন অনিশ্চিত পথে পা বাড়াও। আর যাকে আমি ভালবাসি না, সে সেধে এলেও তাকে আমি গ্রহণ করি না।

অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল মেয়েটি। মন খারাপ হয়ে গেছে। পরে অবশ্য একটু একটু করে সহজ হয়ে উঠল। রানার দিকে চেয়ে থাকল কয়েক মুহূর্ত। সত্যি?

কি?

তুমি আমাকে সত্যি ভালবাস?

হাসল মাসুদ রানা। বিশ্বাস হলো না?

বাচ্চা মেয়ের মত মাথা দোলাল নাদিরা। হয়েছে। তবু। আবার শুনতে ইচ্ছে করছে। ওর প্রায় গা ঘেঁষে দাঁড়াল সে। বলো না!

শোনো মেয়ে, আমি তোমাকে ভালবাসি।

আরেকবার, আবেগে চোখ বুজে এল নাদিরার। প্লীজ!

আমি তোমাকে ভালবাসি।

চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল মেয়েটির। পাশাপাশি, গায়ে গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখল ওরা। দূর থেকে। একটা জাহাজ চলে গেল কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে। মাথার ওপর উড়ছে অনেকগুলো সী-গাল, রাতের মত আশ্রয়ের খোঁজে চলেছে ওরা। সৈকতও খালি হয়ে গেল একটু একটু করে, চলে। গেছে সৌন্দর্য পিপাসুরা।

রানা!

বলো।

এভাবেই কাটবে জীবন? কোনদিন কি ঘর-সংসার করা হবে না তোমার?

একটা দীর্ঘশ্বাস মোচন করল মাসুদ রানা। সময়ে যা হয় না, তা কি অসময়ে হয় কখনও?

ইচ্ছে করলেই তো সুযোগটা করে নিতে পারো।

কি ভাবে?

এই পেশা ছেড়ে দিয়ে।

 মাথা দোলাল মাসুদ রানা। বিষন্ন। পারি না।

কেন পারো না?

পায়ের কাছে এসে পড়া ছোট একটা মরা ডাল লাথি মেরে পানিতে ছুঁড়ে দিল ও। এ ছাড়া নিজেকে কল্পনাই করতে পারি না আমি। যদি কখনও এমন দিন আসে, ছেড়ে যেতে হবে আমাকে এ পেশা, তাহলে হয়তো…, শিউরে উঠে থেমে গেল মাসুদ রানা। ভাবতেও পারি না। তারচে মৃত্যুও অনেক ভাল।

ওর বাহু অ্যাঁকড়ে ধরে, কাঁধে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে থাকল নাদিরা। দিনের আলো ফুরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত।

.

আটলান্টিক বুলেভার্ড জংশন। সকাল দশটা।

টকটকে লাল একটা প্যাকার্ডের ড্রাইভিং সীটে বসে আছে আরমান্দো সোকারাস। পাশের সীটে বসা আণ্ডারটেকার, ম্যানুয়েল গার্সিয়া। আজ আরও বেশি নার্ভাস লাগছে লোকটাকে। ঘামছে সে। ঢোক গিলছে ঘন ঘন। হাতের তালু ঘামছে বেশি। থেকে থেকে প্যান্টে হাত ঘষছে লোকটা।

অস্থির চিত্তে স্টিয়ারিং হুইলে তবলা বাজাচ্ছে আরমান্দো। বার বার তাকাচ্ছে ডানদিকের ওপেন বুদটার দিকে। তার পাঁচ হাতের মধ্যে রয়েছে বুদটা। গার্সিয়ার নড়াচড়ায় এক সময় বিরক্ত হয়ে উঠল সে। একটু স্থির হয়ে থাকতে পারো না তুমি? চোখ গরম করে লোকটার দিকে তাকাল আরমান্দো। এত কিসের ভয় তোমার? এমন ভীতু মানুষ বাপের জন্মে দ্বিতীয়টি দেখিনি আমি! যত্তোসব!

মুখ খুলল না গার্সিয়া। এদিকে তাকালও না। তবে উসখুস খানিকটা কমল।

ঠিক সোয়া দশটায় বাজল ফোন। রিং কানে আসামাত্র সশব্দে দরজা খুলল আরমান্দো, ছুটে গিয়ে রিসিভার তুলল। হ্যালো!

আরমান্দো?

ইয়েস, বস্। হাসি ফুটল কিউবানের মুখে।

কেনসিংটন রোডের নেভাডা হোটেলের কাছের ফোন বুদে। এসো পনেরো মিনিটের মধ্যে। সাড়ে দশটায় ওখানে ফোন করব আবার।

অল রাইট, বস্, একটু ইতস্তত করে বলল সে। ফোন রেখে গাড়িতে উঠেই স্টার্ট দিল, ছুটল কেনসিংটন রোড। শহরের। একেবারে প্রাণকেন্দ্রে জায়গাটা। দশ মিনিট লাগবে পৌঁছতে।

 আরমান্দো কিছুদূর এগিয়ে যেতে একটা ডজ এসে দাঁড়াল। ওই পাবের সামনে। ফয়েজ নামল গাড়ি থেকে, একটা নাম্বারে ডায়াল করল। ফয়েজ বলছি।

বলো।

সন্দেহজনক কিছু মনে হলো না ওর আচরণে।

শিওর?

জ্বি। সোজা এসে গাড়িতেই বসে ছিল আপনার ফোন আসা পর্যন্ত। তারপর কথা সেরেই রওনা হয়ে গেছে। কোথাও কোন ফোন করেনি, কাউকে কোন সঙ্কেতও দেয়নি। কেউ অনুসরণও। করেনি ওকে।

যাক, সন্তোষ প্রকাশ পেল মাসুদ রানার কণ্ঠে। থার্ড। পোস্টে চলে যাও তুমি।

জ্বি। রিসিভার রেখে ডজে উঠল ফয়েজ আহমেদ। ছেড়ে দিল গাড়ি।

.

শহরের আরেক প্রান্তে বেজে উঠল আরেকটা টেলিফোন। সেনেয়র?

হোমার পিকিং পরিষ্কার? অন্য প্রান্ত থেকে ইটালিয়ানে প্রশ্ন করল গম্ভীর একটা কণ্ঠ।

একদম পরিষ্কার, সেনেয়র।

কোথায় আছে এখন ওরা?

একেবারে আমার হাতের মুঠোয়।

কীপ ওয়াচ। আমি ফোনের পাশেই আছি। ওদের লোকেশন বদল হলেই আমাকে জানাবে।

নিশ্চই, সেনেয়র।

.

আরমান্দো?

হ্যাঁ, বস্।

গ্র্যান্ড প্যালেস হোটেলের উল্টোদিকের পাবে এসো। পনেরো মিনিট পর যোগাযোগ করব আমি। পৌনে এগারোটায়।

বেকুবের মত রিসিভারের দিকে চেয়ে থাকল কিউবান। লাইন কেটে গেছে। বিড়বিড় করতে করতে প্যাকার্ডে এসে উঠল সে। গাড়িটা সামনের বাঁক ঘুরে অদৃশ্য হয়ে যেতে কাটলাস থেকে বেরিয়ে এল মুত্তাকিম বিল্লাহ, রিসিভার তুলল। পাবের দশ গজ সামনের একটা পার্কিং লটে আগে থেকেই বসে ছিল সে, ভিউ মিররে চোখ রেখে পিছনটা দেখছিল।

একদম ক্লীন, কোন সন্দেহ নেই।

ঠিক আছে। অপেক্ষা করো তুমি, আমরা আসছি।

পাঁচ মিনিট পর একটা ট্যাক্সি এসে থামল দাঁড়িয়ে থাকা ওল্ডসমোবাইল কাটলাসের পিছনে। মাসুদ রানা ও নাদিরা নামল ওটা থেকে। ট্যাক্সি নিয়ে চলে যাও জায়গামত, বিল্লাহর উদ্দেশে বলল রানা। পৌনে এগারোটায় শেষবার যোগাযোগ করল রানা কিউবানের সঙ্গে। হোটেল গোল্ডেন ভিউর অবস্থান ভাল করে বুঝিয়ে দিল তাকে। সোজা চলে যাও। ওখানে পাবে তুমি আমাকে।

ফোন রেখেই দ্রুত কাটলাস ছোটাল মাসুদ রানা। ওদের থেকে প্রায় দশ মিনিট এগিয়ে আছে আরমান্দো এবং ফয়েজরা, ওভারটেক করতে হবে তাদের।

.

হাঁ করে কিছু সময় ধ্বংসস্তুপটার দিকে তাকিয়ে থাকল নাদিরা। একটা ঢোক গিলল। এ যে ভূতুড়ে বাড়ি!

উত্তর দিল না মাসুদ রানা। গাড়ি ঘুরিয়ে গেটমুখো করে। রাখল ও, স্টার্ট বন্ধ করল। তবে চাবিটা বের করল না ইগনিশন। থেকে। দ্রুত কেটে পড়ার প্রয়োজন হতে পারে। নেমে এল ওরা। গাড়ি থেকে। অবাক চোখে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল। মেয়েটি। পাখির ডাক, আর মৃদু বাতাসে গাছপালার দুলুনি ছাড়া। আর কোন আওয়াজ নেই চারদিকে। গোল্ডেন ভিউর ভৌতিক কাঠামোর সঙ্গে চমৎকার মানিয়েছে পরিবেশটা।

ওদের আওয়াজ পেয়ে ফয়েই-এর ভাঙা দরজার সামনে এসে। দাঁড়াল ফয়েজ, কিন্তু বাইরে এল না। ঘুরে বোটটা দেখে নিল রানা। আছে ওটা জায়গামতই।

ওপরতলায় একটা স্যুইট পাওয়া যাবে না? হাসি মুখে বলল। নাদিরা। বারান্দাসহ লাক্সারি স্যুইট?

চলো, খুঁজে দেখা যাক।

পোর্টিকো অতিক্রম করে ওপরে উঠে এল ওরা হাত ধরাধরি করে। বারান্দায় উঠেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল নাদিরা। নাক কুঁচকে উঠল তার। ইয়াল্লা!

ভেতরের অবস্থা আরও খারাপ, বলল মাসুদ রানা। মুখ। দিয়ে দম নাও।

থাক তাহলে। আর গিয়ে কাজ নেই।

বেশ। এগিয়ে গেল মাসুদ রানা। ফয়েজের সঙ্গে নিচু গলায়। কথা বলল কিছুক্ষণ। পাঁচ মিনিটও হয়নি, গাড়ির আওয়াজ শোনা গেল। পিছিয়ে এল রানা, ফয়েজ চলে গেল আড়ালে। নাদিরাও শুনতে পেয়েছে শব্দটা। একটা গাড়ি, রানা।

মাথা দোলাল মাসুদ রানা। সামান্য সরে এসে সামনে। দাঁড়াল। পরক্ষণে টকটকে লাল একটা প্যাকার্ড চোখে পড়ল ওর। হোটেল কম্পাউণ্ডের বাইরে রাস্তার ওপর থেমে পড়েছে গাড়িটা, এদিকে ফিরে উঁকিঝুঁকি মারছে আরমান্দো। সিঁড়ি ভেঙে ছাদহীন পোর্টিকোয় নেমে এল মাসুদ রানা, যাতে লোকটা দেখতে পায়। কিন্তু তার দরকার হলো না, আগেই ওর ওল্ডসমোবাইলটা দেখে ফেলেছে সে।

সাৎ করে ভেতরে ঢুকে পড়ল আরমান্দো। রানাকে দেখামাত্র দাঁত বেরিয়ে পড়ল লোকটার, আনন্দে না স্বস্তিতে বোঝা গেল না। কাটলাসের মুখোমুখি দাঁড় করাতে যাচ্ছিল সে নিজের প্যাকার্ড, কিন্তু কি ভেবে শেষ মুহূর্তে সরে এল, পাশাপাশি থামল। লক্ষ করল রানা, গাড়িটা ঘোরাল না কিউবান। নেমে এল।

হাই, বস্! হাত নাড়ল উচ্ছ্বসিত আরমান্দো।

হাই!

নেমে এসো, পিছন ফিরে সঙ্গীর উদ্দেশে বলল কিউবান। ডানে তাকাতেই উঁচু বারান্দায় মিঙ্ক কোট পরা নাদিরার ওপর চোখ পড়তে একটু থমকাল। মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন করল সে তাকে। মাসুদ রানার মুখোমুখি দাঁড়াল এসে। পাশে তাকিয়ে গার্সিয়াকে না দেখে খেপে গেল কিউবান। ঘুরে তাকিয়ে খ্যাক খ্যাক করে উঠল। এখনও এলে না? তোমাকে নামাতে স্ট্রেচার লাগবে নাকি? রানার দিকে ফিরল সে। কী যে মুসিবতে পড়েছি একে নিয়ে! এমন ভীতু, টিকটিকির ডাক শুনেও লাফিয়ে ওঠে।

নেমে পড়ল ম্যানুয়েল গার্সিয়া। সেদিনের মত একই পোশাকে আছে লোকটা, হাতে একটা চামড়ার ব্যাগ। চেহারা তার আরও শোচনীয় লাগছে আজ। মুখটা চকের মত সাদা। কপালে চিকচিক করছে চিকন ঘাম। কাঁপা পায়ে ওদের কাছে এসে দাঁড়াল সে। চোখ কাঁপছে ঘন ঘন।

ক্যাটকেটে গাঢ় সবুজ রঙের কমপ্লিট সুট পরেছে আজ আরমান্দো সোকারাস। টু-টোনড, ভোতা নাকের জুতো, মাথার দিক বাদামী, বাকিটা হলুদ চকচকে নরম চামড়ার। গায়ে জংলা ছাপার শার্ট, গলায় বিঘৎখানেক চওড়া প্রিন্টের টাই। মাথায় সম্ভবত পমেড মেখেছে লোকটা, রোদের আলোয় চিকচিক করছে। চুল। দুহাতেই দুটো করে হীরের আংটি। এত কড়া পারফিউম মেখেছে যে দম আটকে আসছে মাসুদ রানার।

কিন্তু সেদিকে খেয়াল নেই। কি যেন একটা অসামঞ্জস্য চোখে পড়েছে রানার ম্যানুয়েল গার্সিয়ার মধ্যে, এতই সূক্ষ্ম যে ধরতে পারছে না। অস্বস্তিতে ফেলে দিল ওকে ব্যাপারটা। সেটা যে কি, বের করার জন্যে ফুল স্পীডে মাথা ঘামিয়েও সুবিধে করতে পারল না মাসুদ রানা। লোকটার পা থেকে মাথা পর্যন্ত কয়েকবার নজর বোলাল ও, কিন্তু লাভ হলো না। বিষয়টা ধরা গেল না।

অস্বস্তি লাগলেও ভাবনাটা আপাতত পাশে সরিয়ে রাখল মাসুদ রানা। কিউবানের দিকে ফিরল। তোমার গাড়ির বুট খোলো।

বিস্মিত হলো লোকটা। কেন, বস্?

আমল দিল না রানা। চেক করব।

ইশ! মাথা দোলাল লোকটা ঘন ঘন। ইজ্জত এতক্ষণে। যেটুকুও বা ছিল, বস্, দিলেন পাংচার করে।

বুট দেখল রানা, পিছনের সীটের ফ্লোরবোর্ডের ওপরও চোখ বোলাল একবার। বিজনেস ইজ বিজনেস। নাদিরার দিকে তাকাল রানা, আগের জায়গায়ই আছে সে।

নাও, গার্সিয়াকে বলল আরমান্দো। বের করো তোমার কাগজপত্র।

কাঁপা হাতে ব্যাগের চেইন খুলল আণ্ডারটেকার, একগাদা কাগজ-কার্ড ইত্যাদি বের করল। কাঁপুনির চোটে একটা কার্ড হাত ফসকে মাটিতে পড়ে গেল, চট করে তুলে ফেলল সে ওটা। ক্ষমা প্রার্থনার ভঙ্গিতে একবার রানা, একবার আরমান্দোর দিকে তাকাল। তারপর সব কাগজ এগিয়ে দিল রানার দিকে। মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের করেনি লোকটা এ পর্যন্ত।

একটা একটা করে পরখ করল রানা সবগুলো। পাসপোর্টের প্রতিটি পাতা, সোশাল সিকিউরিটি কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, বার্থ সার্টিফিকেট, একাধিকবার করে পরীক্ষা করল রানা সতর্ক চোখে। ঠিকই আছে সব, অন্তত কাস্টমসকে ধোঁকা দেয়ার জন্যে এগুলো যথেষ্ট। হঠাৎ করেই হাত থেমে গেল মাসুদ রানার, মাথা তুলল। ঝট করে।

একটা শব্দ পেলাম যেন? নাদিরার দিকে ফিরে বলল ও।

ভুরু কোচকাল মেয়েটি। দ্রুত এদিক ওদিক তাকাল। কই! শুনিনি তো!

মনে হলো যেন পানির শব্দ, বলে মাথা নামাল রানা। শেষবারের মত ওল্টাতে লাগল কাগজগুলো।

ছবি এনেছেন, বস?

এনেছি, বলল রানা মাথা দুলিয়ে। গতরাতে ডিনার খেয়ে ফেরার পথে নাদিরার ছবি তুলিয়ে একবারে ওয়াশ করিয়ে নিয়ে মোটেলে ফিরেছিল ও।

রানা! সোজা হয়ে গেল নাদিরা।

মুখ তুলল মাসুদ রানা।

আমিও শুনেছি একটা শব্দ! এইমাত্র!

উত্তর দিল না মাসুদ রানা। মাথাটা একটু কাত করে দাঁড়িয়ে থাকল, কিছু শোনার চেষ্টা করছে। দুই ধাপ সিঁড়ি ভাঙল নাদিরা অস্থির চিত্তে, তারপর আরও দুই ধাপ। মুখের রং পাল্টে যেতে। শুরু করেছে দ্রুত।

হঁদুর হবে হয়তো, নার্ভাস ভঙ্গিতে বলল আরমান্দো। অথবা কোন পাখি-টাখি। নয়তো আর কিসের আওয়াজ উঠবে এমন বাজপড়া জায়গায়?

কেউ কোন কথা বলল না। জমে গেছে সবাই, শুধু গার্সিয়া। বাদে। কাপুনি বেড়ে গেছে তার বহুগুণ। ঢোক গিলছে ঘন ঘন।

এই সময় আবার উঠল আওয়াজটা। পরিষ্কার শুনতে পেল সবাই। মনে হলো হাঁটতে গিয়ে কেউ যেন অসাবধানে পা দিয়ে। ফেলেছে পানি ভরা নরম গর্তে।

আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল নাদিরা, রানা!

কাগজগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিল মাসুদ রানা, মুহূর্তে ওয়ালথার। বেরিয়ে এসেছে হাতে। কর্কশ গলায় চেঁচিয়ে উঠল রানা, নাদিরা! ভেতরে যাও! বলেই আরমান্দোকে লক্ষ্য করে পিস্তল তুলল ও। বিশ্বাসঘাতক!

সশব্দে অ্যাঁতকে উঠল কিউবান। চোখ দুটো লাফিয়ে পড়ার জোগাড় কোটর ছেড়ে। দুহাত সামনে তুলে এক পা পিছিয়ে গেল সে। ঈশ্বরের কসম, বস্, আমি কিছু জানি না! আমি ট্রেইটর না! যিশুর কসম, বস, আমার বউ-বাচ্চার কসম! আমি কিছু জানি না! আমি কিছু জানি না! ভেউ ভেউ করে কেঁদে ফেলল লোকটা।

ডানদিকে কয়েক জোড়া ছুটন্ত পায়ের আওয়াজ উঠল। সৈকতের দিকে। পলকে বুঝে ফেলল রানা কি ঘটে গেছে। প্রথম থেকেই ওর নজর ছিল রাস্তার দিকে, শত্রু যে সাগরপথে আসতে পারে, ভাবেইনি। বরং রাস্তার দিক থেকে ধাওয়া এলে ওই পথে সরে পড়বে বলে একটা স্পীডবোট ভাড়া করেছে ও, সকালে ফয়েজ বেঁধে রেখে এসেছে বোটটা সৈকতে। অথচ, ওদিক থেকেই শত্রু এসে হাজির। ওদিকে মেয়েটির চিৎকার শুনে বুঝে গেছে গার্সিয়া, এখন আর লুকোছাপায় কাজ হবে না। টের পেয়ে গেছে ওরা। তাই কাদা-পানি মাড়িয়ে ছুটে আসছে সে দলবল নিয়ে।

টাশশ, টাশশ!

নাদিরার ডানদিকে পোর্টিকোর মোটা একটা থামে বিদ্ধ হলো গুলি দুটো। ভয়ে গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল মেয়েটি, চোখ কপালে তুলে প্রায় উড়ে পেরিয়ে এল বাকি ধাপগুলো। দিশা হারিয়ে ফেলেছে। ছুটে বেরিয়ে এল ফয়েজ ভেতর থেকে, বুঝে নিয়েছে আর লুকিয়ে থাকার সময় নেই। মাটিতে মুখ গুঁজে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েছে আরমান্দো, কাপছে এখনও সে। ওদিকে হাতের ব্যাগ ফেলে আড়াল নেয়ার উদ্দেশে ছুটতে শুরু করেছে। ম্যানুয়েল গার্সিয়া। চোখের কোণ দিয়ে রাস্তায় একটা নড়াচড়া দেখতে পেল রানা, বিল্লাহও পৌঁছে গেছে।

নাদিরার হাত ধরে বাঁ দিকের দেয়াল ঘেঁষে সিঁড়ি ভাঙতে লাগল মাসুদ রানা। খোলা জায়গায় থাকলে বুলেট খেতে হবে যে কোন মুহূর্তে। ওখানে থাকলে মরবে, ছুটতে ছুটতে আরমান্দোর উদ্দেশে বলল রানা। জলদি ভেতরে এসো!

দৌড়ের ফাঁকে গার্সিয়ার দিকে এক পলক তাকাল রানা, আরমান্দোর গাড়ির আড়ালে চার হাত-পায়ে ভর দিয়ে ব্যাঙের মত বসে আছে লোকটা। এক বিন্দু রক্তেরও আভাসও নেই মুখে। কেন যেন তাকে সতর্ক করার ইচ্ছে হলো না মাসুদ রানার। ফয়েই-এ পা রেখে অনেকটা নিরাপদ বোধ করল ও। ভেতরে এসেই আশ্রয় নিল দরজার পাশে। কাঁধ ধরে চেপে মাটিতে বসে পড়তে বাধ্য করল নাদিরাকে।

ওদের পাশ ঘেঁষে প্রায় উড়ে ভেতরের দিকে ছুটে গেল। আতঙ্কিত আরমান্দো। দূর থেকে করুণার চোখে লোকটাকে দেখল ফয়েজ এক পলক, তারপর একটা পাল্লাহীন জানালার। পাশে অবস্থান নিয়ে বাইরে তাকাল। উঁকি দিল মাসুদ রানাও। সৈকতের দিকের ঝোপঝাড় ঠেলে হোটেল কম্পাউণ্ডে ঢুকে। পড়েছে সাত-আটজন। দেখতে দেখতে কয়েকটা শ্রীহীন পাম গাছের আড়ালে গা ঢাকা দিল তাদের কয়েকজন। দুজন থামল না, কুঁজো হয়ে ছুটছে তারা, কম্পাউণ্ড ঘুরে হোটেলের পিছনে পৌঁছতে চাইছে সম্ভবত। ওদের আগে আগে যে আরও দুজন আছে, চোখেই পড়েনি কারও। টার্গেট দুটো খুব পছন্দ হলো। ফয়েজের। ছুটন্ত টার্গেট শুইয়ে ফেলার মজাই আলাদা। তার সাব মেশিনগানের আচমকা ঠা ঠা হুঙ্কারে চমকে উঠল বিরান সোনালী। সৈকত। মুখ থুবড়ে কাদামাটিতে আছড়ে পড়ল একটা টার্গেট, অন্যটা বিকট এক চিকার ছেড়েই বসে পড়ল, পর পর দুটো বুলেটের আঘাতে তার উরুর হাড় পাউডার হয়ে গেছে। তার সামনেই সঙ্গীর নিশ্চল দেহ পড়ে আছে। ওদিকে গার্সিয়া সহ। দলের অন্যরা মেশিনগানের আওয়াজে হতভম্ব হয়ে পড়েছে, অভ্যর্থনা জানাতে মাসুদ রানা যে এই মাল সঙ্গে নিয়ে এসেছে, এ। ছিল ওদের কল্পনার বাইরে। ক্ষণিকের জন্যে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল সে।

ওদিকে খুশিতে দাঁত বেরিয়ে পড়েছে বিল্লাহর। ও যে ছুটে। এসে হোটেলের গেটের কাছে এক ঝোপের আড়ালে আশ্রয় নিয়েছে, লক্ষই করেনি কেউ। দুটোকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে। সে নিজের অবস্থান থেকে। পিস্তল উঁচিয়ে বসে আছে মূর্তির মত, গাছের পিছনে, নজর সামনে। গলা বাড়াতে সাহস পাচ্ছে না। দূরেরটা একটু কঠিন, তাই ওটাকেই প্রথম পছন্দ করল বিল্লাহ। কাছেরটাকে পরেও নেয়া যাবে। ওর সরার উপায় নেই, কিন্তু দূরেরটা বিপদ কোন দিক থেকে আসছে টের পেয়ে যদি কয়েক ইঞ্চিও সরে বসে, তাহলে ওকে ঝোলায় পোরা সমস্যা হয়ে দেখা দেবে।

এসএমজি রেখে নিজের ভয়ঙ্করদর্শন লুগার তুলে নিল বিল্লাহ, সতর্কতার সাথে, প্রথম পছন্দের ডান কানের ওপরের খুলি তাক করল। বিকট টাশ! শব্দে তপ্ত মৃত্যুবর্ষণ করল তার পিস্তল, হেভি ক্যালিবার বুলেটের প্রচণ্ড ধাক্কায় শূন্যে নিক্ষিপ্ত হলো লোকটা। চুলসমেত এপাশের খুলির বড় একটা অংশ আকাশে উঠে পড়তে দেখা গেল তার, বাতাসে কয়েকটা এলোপাতাড়ি পাক খেয়ে ভেতরের রক্তাক্ত পেট মেলে দিয়ে চিত হয়ে পড়ল সেটা। কিসের আঘাতে মৃত্যু হলো, টেরও পায়নি সম্ভবত লোকটা।

তাই দেখে হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেল এ পাশের লোকটির। পক্ষাঘাতগ্রস্তের মত তাকিয়ে থাকল সে কয়েক গজ দূরে পড়ে থাকা দেহটার দিকে। চেহারা হয়েছে বেকুবের মত। এক মুহূর্ত, তারপরই ঝট করে এদিকে ফিরল সে, বুঝতে পেরেছে কোন দিক থেকে এসেছে বুলেটটা। বিল্লাহর লুকিয়ে থাকা অবস্থানের দিকে অস্ত্র তুলল সে দ্রুত, কিন্তু ভঙ্গি অনিশ্চিত। গুলি করবে কি করবে না, ভাবছে। ঠিক এই সময় কপালে তৃতীয় নয়ন সৃষ্টি হলো লোকটার। পিছন দিকে ভীষণ এক ঝাঁকি খেলো তার মাথা, এতই জোরে যে ঘাড়ের হাড় ফোটার মটু মটু আওয়াজও পরিষ্কার শুনতে পেল বিল্লাহ। বিস্ফারিত তিন চোখে আকাশ দেখতে দেখতে চিত হয়ে পড়ে গেল লোকটা। মুহূর্তকয়েক হাত-পা ছুঁড়ে স্থির হয়ে গেল।

ইয়াহু! উল্লাসে চাপা কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল ফয়েজ। আরও দুটো খরচ হয়ে গেছে, মাসুদ ভাই। নিশ্চই লম্বা আহাম্মক, তোবা, বিল্লাহ নিয়েছে ওদের।

টাশশ! টাশশ!

পর পর দুটো গুলি, তারপরই একটা কাতর, চাপা আর্ত। চিৎকারে চমকে উঠল মাসুদ রানা। গলাটা চিনতে পেরেছে ও, বিল্লাহর গলা। দ্বিতীয়জনকে গুলি করার সুবিধের জন্যে ঝোপের আড়াল থেকে ডান কাঁধ বের করতে হয়েছিল ওকে, কাজ সেরে আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়ার আগেই গুলি খেয়েছে সে। ঠিক কাঁধে লেগেছে গুলিটা। তার অবস্থান থেকে চোখ ফিরিয়ে সামনে তাকাল মাসুদ রানা। মুহূর্তের জন্যে একটা ছায়া দেখতে পেল। এক গাছের আড়াল থেকে আরেক গাছের আড়ালে চলে গেল সেটা বাদরের মত লাফ দিয়ে।

বিল্লাহ গুলি খেয়েছে! বলল রানা। রাগে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে চেহারা। পিস্তলটা কোমরে গুঁজল ও, পায়ের কাছে পড়ে থাকা। একটা মেশিন পিস্তল তুলে পিছনদিকে যাওয়ার জন্যে পা বাড়াল। ওপাশে দেয়ালঘেঁষে বসে থাকা আরমান্দো বলে উঠল, আমাকে। একটা কিছু দিন, বস্। যে কোন একটা অস্ত্র দিন।

তার দিকে তাকাল রানা। এখন আর আগের মত ভীত সন্ত্রস্ত। মনে হচ্ছে না কিউবানকে। বরং মনে হচ্ছে কার ওপর যেন। সাঙ্ঘাতিক রেগে আছে। মুহূর্তখানেক ভাবল ও, তারপর হাতের মেশিন পিস্তলটা দোলাল। এটা চালাতে জানো?

উঠে এল আরমান্দো। অস্ত্রটার দিকে তাকিয়ে মাথা দোলাল। চালাইনি কখনও, তবে জানি। দেখেছি কি ভাবে চালাতে হয়।

খুব সংক্ষেপে ব্যাপারটা তাকে বুঝিয়ে দিল মাসুদ রানা। বেশিক্ষণ ট্রিগার চেপে রাখবে না। গুলি করার সময় ব্যারেলটা ডানে বাঁয়ে এক ইঞ্চি ঘোরাবে। ওকে?

ওকে, বস্, দৃঢ় আস্থার সুরে বলল আরমান্দো।

এখানেই থেকো। ফয়েজ, খেয়াল রেখো। আরেকটা মেশিন পিস্তল তুলে নিয়ে আবার পা বাড়াল ও।

কোথায় যাচ্ছ? জানতে চাইল নাদিরা।

আসছি। তুমি নড়বে না জায়গা থেকে। ফয়েই থেকে বেরিয়ে এল রানা। কাদার মত জমে থাকা প্যাচপেচে নোংরার ওপর দিয়ে যথাসম্ভব নিঃশব্দে ছুটল। দূর থেকে কম্পাউণ্ড ঘুরে সামনের দিকে যেতে চায় ও। বিল্লাহর খোঁজ নেয়া জরুরী। ভেতরে আবার গর্জে উঠল ফয়েজের এসএমজি। লম্বা এক করিডর পড়ল সামনে, সেটা ধরে দশ পা মত এগোল মাসুদ রানা, তারপর জমে গেল। চাপা পায়ের আওয়াজ শুনতে পেয়েছে ও, সামনে থেকে আসছে কেউ। সৎ করে দেয়ালের সাথে মিশে নেই হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল রানা। হাতে উদ্যত মেশিন পিস্তল। প্রস্তুত। গার্সিয়া? ভাবল ও। কোথাও যে আড়াল নেবে, সে উপায় নেই। দুপাশেই টানা দেয়াল।

মনে মনে পাঁচ পর্যন্ত গুণল মাসুদ রানা, ছয় গোণার সময় পেল না। তার আগেই বাঁকের মুখে বেরিয়ে এল রবার্টো গার্সিয়া। হাতে পিস্তল, অনিশ্চিত ভঙ্গিতে ধরা। নল সিলিঙের দিকে। ঠিক পিছনেই আরও একজন রয়েছে। ঘুরে এদিকেই আসতে যাচ্ছিল গার্সিয়া, সামনে চোখ পড়তে থমকে গেল। এ নিশ্চয়ই দলের সাথে ছিল না, ভাবল ও। থাকলে চোখ এড়িয়ে এতদূর আসতে পারত না কিছুতেই। হয়তো আগে থেকেই…সন্দেহটা আবার উঁকি দিল রানার মনে।

হ্যালো, গার্সিয়া! অমায়িক হাসি দিল রানা। কেমন আছ?

আহত বাঘের মত লাফ দিল লোকটা। জবাবে বিশ্রী ক্যাট ক্যাট শব্দে হুঙ্কার ছাড়ল রানার জার্মান মেশিন পিস্তল। ব্যাপার বুঝে ওঠার আগেই গার্সিয়ার ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে গেল তার সঙ্গী, অবশ্য তার আগেই হালিখানেক গুলি হজম করতে হয়েছে। লোকটাকে। লাফ দিয়েই চোখের আড়ালে চলে গেল গার্সিয়া। পা বাড়াতে গেল রানা ঝোঁকের মাথায়, থেমে গেল শেষ পর্যন্ত। টিপে টিপে এগোল। কোন সাড়া নেই ওপাশে।

ওদিকে ফয়েই থেকে একযোগে দুটো আগ্নেয়াস্ত্রের শব্দ ভেসে। এল, পরমুহূর্তে কেঁপে উঠল হোটেল গোল্ডেন ভিউ বিস্ফোরণের ধাক্কায়। গ্রেনেড চার্জ করেছে ফয়েজ বা বিল্লাহ। বিল্লাহর অবস্থা। কি, ভাবল রানা, পরক্ষণে চিন্তাটা বিদায় করে দিল। পরে দেখা। যাবে, আগে গার্সিয়াকে চাই। বাকের মুখে এসে থেমে পড়ল ও, বসে উঁকি দিল। নেই কেউ। সামনে ফাঁকা। এটা আরেক। করিডর।

পরক্ষণেই চোখ কোচকাল মাসুদ রানা। মেঝেতে মোটা একটা রক্তের ধারা। পালাবার সময় পিছনে রেখে গেছে গার্সিয়া। আহত হয়েছে লোকটা মারগ্রকভাবে। ভেতরে ভেতরে নিঃশব্দ উল্লাস অনুভব করল ও। পায়ের কাছে পড়ে থাকা দেহটার ওপর চোখ বোলাল, বাকাচোরা হয়ে পড়ে আছে, নিঃশ্বাস পড়ছে কি না বোঝা দায়। পাশে পড়ে থাকা তার পিস্তলটা তুলে পকেটে ভরল মাসুদ রানা, তারপর রক্তের ধারা অনুসরণ করে এগোল। হাতের মেশিন পিস্তল পূর্ণ প্রস্তুত।

করিডরের শেষ মাথায় তিন ধাপ সিঁড়ি, তারপরই খোলা, কর্দমাক্ত প্রান্তর। চোখ তুলতেই ঝোপঝাড়ের ফাঁক দিয়ে গার্সিয়ার। ওপর চোখ পড়ল ওর। শখানেক গজ দূরে, উন্মুক্ত সৈকতের। দিকে প্রাণপণে ছুটছে লোকটা ডান পা টেনে টেনে। এগোবার ভঙ্গি দেখলে বুঝতে অসুবিধে হয় না ভালই জখম হয়েছে সে। এক লাফে বেরিয়ে এল মাসুদ রানা। যে গাছগুলোর আড়ালে আশ্রয় নিয়েছিল গার্সিয়ার লোকেরা, সেদিকে থেমে থেমে দুইতিন পশলা গুলি বর্ষণ করল। কোন জবাব এল না। নিশ্চিন্ত মনে ঘুরেই তীরবেগে ছুটল সে গার্সিয়ার দিকে। এরমধ্যেই অনেকটা পথ এগিয়ে গেছে লোকটা। আহত হলেও প্রাণের দায়ে ছুটছে, কাজেই পায়ের যন্ত্রণা এখন তুচ্ছ তার কাছে। আর এক-দেড়শো গজ যেতে পারলেই নিজের বোটে পৌঁছে যেতে পারবে গার্সিয়া।

দাঁত মুখ খিচিয়ে ছুটছে মাসুদ রানা। কিন্তু খুব একটা সুবিধে করতে পারছে না। কাদাপানি বড় একটা বাধা হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রায়ই পানিভরা গর্তে পা ঢুকে যাচ্ছে, আছড়ে পড়ার অবস্থা হচ্ছে ওর। পিছনে হৈ-হৈ শব্দে না থেমে ঘুরে তাকাল মাসুদ রানা। দীর্ঘদেহী এক যুবক ছুটে আসছিল ওর দিকে, কোণাকুণি। হোটেলের সীমানা দেয়ালের কাছে পাম গাছের সারির এপাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা ফয়েজ আর আরমান্দো দেখে ফেলেছে। চেঁচিয়ে সতর্ক করছে তারা রানাকে।

অবশ্য ওকে কিছু করতে হলো না। চেঁচিয়ে উঠেই গুলি করেছে ফয়েজ, হুড়মুড় করে আছড়ে পড়েছে যুবক। ওদের খোলা জায়গায় দেখে নিশ্চিন্ত হলো রানা, তার মানে ওদিক ফর্সা হয়ে গেছে। সামনে নজর দিল ও, ছপাৎ, ছপাৎ, প্যাচ, প্যাচ ইত্যাদি নানান আওয়াজ তুলে ছুটছে রবার্টো।

মাত্র দুমিনিটে শেষ হয়ে গেল অসম দৌড় প্রতিযোগিতা। তখনও একশো গজ-মত পথ বাকি নিজের বোটে পৌঁছতে, কোনদিনই তা অতিক্রম করা সম্ভব হবে না বুঝতে পেরে ঘুরে দাড়াল অসহায় রাগে ক্ষিপ্ত, ঘর্মাক্ত রবার্টো গার্সিয়া। সাথে সাথে রানাও ব্রেক কষল। দুজনের মাঝে পনেরো বিশ গজ ব্যবধান।

তোমার দৌড় শেষ, বুঝতে পারছ, গার্সিয়া? হাঁপাতে হাঁপাতে প্রশ্ন করল রানা। মেশিন পিস্তল ধরে আছে লোকটার বুক সোজা।

উত্তর দিল না সে। জ্বলন্ত চোখে দেখছে ওকে। ব্যারেলের। মত বুক প্রচণ্ড পরিশ্রমে ফুলে ফুলে উঠছে তার। ডান পায়ের কাছে রক্ত জমে জমে পুকুর হচ্ছে। প্যান্ট রক্তে ভিজে লেপটে। আছে গায়ের সাথে। হাঁটুর সামান্য ওপরে লেগেছে গুলি। কয়টা। কে জানে! পিছনে কয়েকজোড়া পায়ের শব্দ শোনা গেল। দৌড়ে আসছে। নাদিরার গলা শুনতে পেল রানা।

মৃত্যুর আগে কেন কি ঘটেছে তোমার জানা প্রয়োজন, গার্সিয়া, নরম গলায় বলল মাসুদ রানা। না কি জেনে গেছ তুমি?

উত্তর নেই। ধক ধক করে জ্বলছে লোকটার দুচোখ। পিস্তল ধরা হাত অসহায়ের মত ঝুলছে। তোলার সুযোগ হয়নি। রানার পাশে এসে দাঁড়াল ওরা। বিল্লাহও আছে দলে। শার্টের একটা হাতা নেই তার, ওটা দিয়ে বাঁধা আছে তার গুলি বিদ্ধ ডান বাহু।

নিজের সমস্ত সম্পদ কেউ ছিনিয়ে নিলে কেমন লাগে, গার্সিয়া? হাসল রানা। অনুমান করতে পারো? তোমার মত ডাকাতি করা নয়, কষ্ট করে অর্জিত সমস্ত ধনসম্পদ?

কাপতে কাপতে নিজের রক্তের পুকুরে বসে পড়ল গার্সিয়া। কাঁপুনিটা ভয়ের, না ক্লান্তির বোঝা গেল না।

একে তো তুমি চেনোই, নাদিরাকে দেখাল ও। আসল পরিচয় কি জানো এর? কেবল সামান্য বিস্ময় ফুটল লোকটার। চোখে। এবং প্রশ্ন।

শেখ জাবের আল উবায়েদের নাতনি। মনে পড়ে শেখ। জাবের নামটা? এবার বুঝেছ নিশ্চই, কেন এসব ঘটেছে?

চরম বিস্ময়ে একটু একটু করে হাঁ হয়ে গেল রবার্টো। নাদিরাকে দেখতে লাগল অবাক চোখে। এ সময় এমন চমক

হয়তো আশা করেনি। কিছুটা বিরতি দিল রানা। আর আমাকেও নিশ্চই চিনে ফেলেছ এতক্ষণে? অনির্দিষ্ট ইঙ্গিতে সাগর-আকাশ নির্দেশ করল ও। প্রকৃতি তোমাকে বিদায় জানাচ্ছে, গার্সিয়া। তোমার মত নরকের কীটের উপযুক্ত নয় এ স্থান। অতএব…

না! রানাকে অস্ত্র তুলতে দেখে অ্যাঁতকে উঠল গার্সিয়া। চোখ বিস্ফারিত। আমি..দুঃখিত! ক্ষমাপ্রার্থী! আমাকে…

মাথা দোলাল মাসুদ রানা। লজ্জা দিয়ো না। ক্ষমার থলেটা সাথে আনিনি, কোথায় যেন ফেলে এসেছি মনের ভুলে। জাহান্নামে যাও তুমি, রবার্টো গার্সিয়া।

ট্রিগারে তর্জনি চেপে বসল মাসুদ রানার। চার-পাঁচটা গুলি বেরিয়ে গেল মুহূর্তে। সবগুলোই প্রশস্ত বুক পেতে গ্রহণ করল গার্সিয়া। কাদার ওপর দিয়ে পিছলে কয়েক ফুট পিছিয়ে গেল সে, তারপর শুয়ে পড়ল পিঠ দিয়ে। চোখ খোলা। বাহুর ওপর হাতের চাপ অনুভব করে ঘুরে তাকাল রানা। নাদিরা খামচে ধরে আছে ওর হাত। দুচোখ বিস্ফারিত।

ঘুরে দাঁড়াল রানা। বিল্লাহকে দেখল। জখম কেমন তোমার?

ও কিছু না, মাসুদ ভাই, হাসল দানব। একটা বুলেট লেগেছে কেবল।

বুলেট?

বের করে ফেলেছে ফয়েজ।

গুড। আরমান্দো!

জ্বি, বস্?

তোমার আণ্ডারটেকার কোথায়?

হতভম্ব হয়ে গেল লোকটা। জ্বি?

ম্যানুয়েল গার্সিয়া?

ও-ও তো ওখানে, হাত তুলে গোল্ডেন ভিউ দেখাল সে।

চলো, ঘুরে দাঁড়াল মাসুদ রানা।

ফয়েজ ইতস্তত করতে লাগল। এটার কি হবে, মাসুদ ভাই? লাশটা দেখাল সে।

টেনে সাগরে নিয়ে ফেলে দাও।

ফয়েজ আর বিল্লাহ বাদে ওরা তিনজন ফিরে এল হোটেলে। খামটা কুড়িয়ে নিয়ে আরমান্দোর গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঢ্যাঙা লোকটা। মুখের ঘাম মুছছে ঘন ঘন। এখনও কাঁপছে একটু একটু। সোজা সামনে এসে দাঁড়াল মাসুদ রানা। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল তার চোখের দিকে।

ওর চাউনি সইতে না পেরে চোখ নামিয়ে নিল লোকটা। চট করে হাত বাড়াল রানা, তার কোর্টের একটা বোতাম টান মেরে ছিড়ে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। অবাক চোখে ওর কাজ। দেখছে নাদিরা-আরমান্দো। হুম! বলল রানা। তাহলে তুমি?

কি হয়েছে, বস্? তড়পে উঠল আরমান্দো। ঘন ঘন ওদের দুজনের দিকে তাকাচ্ছে সে।

 বোতামটা দেখাল রানা। এই লোকই পথ দেখিয়ে নিয়ে। এসেছে গার্সিয়াকে। এর কোটে হোমার প্ল্যান্ট করেছিল লোকটা। পায়ের নিচে ফেলে বোতামটা ভেঙে ফেলল ও এক চাপে। ভেতর থেকে চকচকে কি যেন বেরিয়ে পড়ল। আগেই সন্দেহ হয়েছে। আমার কোথাও কোন গণ্ডগোল ঘটে গেছে। কিন্তু ধরতে পারিনি। তখন। এখন বুঝলে তো, কেন এত সতর্ক…

 কথা শেষ করতে পারল না রানা, বাঘের মত ঢ্যাঙার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল আরমান্দো সোকারাস। শালা বেঈমানের বাচ্চা!

মনের সুখে লোকটাকে ধোলাই করল সে কিছুক্ষণ। এলোপাতাড়ি মেশিন পিস্তলের আঘাত, কিল, চড়, লাথি, ঘুসি বৃষ্টি করে শ্রান্ত হয়ে পড়ল নিজেই। মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে তখন রক্তাক্ত ম্যানুয়েল গার্সিয়া। হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে দাঁড়াল আরমান্দো। কাদা পানি মেখে ভূত। তারপর, কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই গর্জে উঠল তার মেশিনগান। বুক ঝাঁঝরা করে দিল সে আণ্ডারটেকারের।

আমি দুঃখিত, বস্। আমারই জন্যে…

বুঝতে পেরেছ বলে ধন্যবাদ, আরমান্দো। ভবিষ্যতে আজকের কথা মনে রেখো।

নিশ্চই! আর কখনও…

এবারও বাধা পেল সে। ছুটে এসে হাজির বিল্লাহ-ফয়েজ। কি হয়েছে? প্রশ্ন করল ফয়েজ। গুলি কিসের? পরক্ষণেই আরমান্দোর গাড়ির আড়ালে পড়ে থাকা মৃতদেহটা চোখে পড়ল। এ কি! পালা করে উপস্থিত তিনজনকে দেখল ওরা।

তখনই কেউ কোন জবাব দিল না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *