২.০৯ চলতে চলতে ভাবছে মাসুদ রানা

চলতে চলতে ভাবছে মাসুদ রানা। আরমান্দো সোকারাসের একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। প্রশ্নটা ছিল, কাগজপত্র কোথায় বসে। ডেলিভারি নিতে চায় ও। রানা বলে এসেছে, উপযুক্ত জায়গা ঠিক করে পরে তাকে ফোনে জানাবে। এবং কাগজপত্র নিয়ে একা। আরমান্দো যাবে সেখানে। সঙ্গে আর কেউ যাবে না।

প্রথমটা মেনে নিলেও শেষ পয়েন্টে আপত্তি জানিয়েছে কিউবান। বলেছে, আর কেউ না হোক, অন্তত ঢ্যাঙাকে থাকতেই হবে তার সঙ্গে। পাসপোর্ট ইত্যাদিতে ছবি সে-ই সেট করবে, প্রয়োজনে ছবির কিনারা ছাটতে হবে, ছবি বসিয়ে তাতে সীল। মারতে হবে ইত্যাদি অনেক কাজ। ঢ্যাঙার (পরে জেনেছে রানা তার নাম ম্যানুয়েল গার্সিয়া) কাজ ওসব, আরমান্দোর নয়, অতএব তাকে থাকতেই হবে। আর যদি বস্ এখনই ছবিগুলো দিয়ে দেন, তাহলে আরমান্দো একাই যাবে সেখানে।

অকাট্য যুক্তি, এরপর আর কোন কথা চলে না। অতএব মেনে নিয়েছে মাসুদ রানা। যেখানে ওকে কাগজপত্র হস্তান্তর। করবে, সেখানে থাকবে ম্যানুয়েল গার্সিয়া। তা-ও সই, তবু আগেভাগে নাদিরার ছবি হাতছাড়া করতে রাজি নয় রানা। তাতে বিপদে পড়ার মাত্নক ঝুঁকি আছে। একদিক থেকে নয়, অনেক দিক থেকে।

গরম ক্রমেই বাড়ছে। রাতে বৃষ্টি হবে মনে হয়েছিল। আকাশের অবস্থা দেখে, কিন্তু হয়নি। সারা আকাশ জুড়ে ব্যস্ত সমস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে ঘন কালো মেঘ, যেন মহাজরুরী কোন কাজ পড়ে আছে কোথাও, এখনই সেখানে না পৌঁছলেই নয়। মাঝেমধ্যে দূর থেকে মেঘ ডাকার গুড় গুড় আওয়াজ আসছে। যে-কোন মুহূর্তে শুরু হয়ে যেতে পারে ঝড়-বৃষ্টি। লক্ষণ সেরকমই। জানালার কাচ তুলে দিল মাসুদ রানা। শীত শীত লাগছে।

আরমান্দোর কথা ভাবতে বসল ও। লোকটা কি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে? রবার্টোকে জানিয়ে দিতে পারে? পারে। লোভ যখন গ্রাস করে মানুষকে, স্বাভাবিক যুক্তি-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলে সে। তখন এমন অনেক কিছু করে বসতে পারে মানুষ, সুস্থ স্বাভাবিক মাথায় যা ভাবাও যায় না। বেশি টাকার লোভে পড়ে রাবার্টোকে আরমান্দো সব কথা জানিয়ে দিতেও পারে।

তবে বেশ কয়েক বছর থেকে লোকটাকে চেনে মাসুদ রানা। অতীতে অনেকবার ওর কাজ করে দিয়েছে আরমান্দো, অনেক কাজ, কখনও তেড়িবেড়ি কিছু করেনি। এমন কোন রেকর্ডও নেই তার যে অমুকের সঙ্গে বেঈমানী করেছে। ওটাই যা ভরসা।

তাছাড়া… থেমে পড়েছে মাসুদ রানা। শুধু শুধু মাথা গরম করে লাভ আছে কিছু? ভবিষ্যৎ ভবিষ্যৎ-ই। বর্তমান নয়। এক মিনিট পরের ভবিষ্যৎও ভবিষ্যৎ, আবার এক যুগ পরের ভবিষ্যৎও ভবিষ্যৎ। দুটোই অজানা। কে নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারে আগামী এক মিনিটের মধ্যে মৃত্যু হবে না মাসুদ রানার? এই যে উল্টোদিক থেকে ঝড়ের বেগে একের পর এক বাস-লরি, কারট্যাক্সি আসছে, এর যে কোন একটা ছুটে এসে যদি আছড়ে পড়ে ওর গাড়ির ওপর?

কি হবে ফলাফল? মুহূর্তে মৃত্যু। তেমন কিছু এড়াতে হলে সতর্ক থাকা চাই, চোখ-কান খোলা রেখে চলা চাই। ব্যস। মানুষের দৌড় ওই পর্যন্তই। সতর্ক থাকার পরও যদি বিপদ। এড়ানো না যায়, করার আছেটা কি? উল্টোপাল্টা ভাবনার জন্যে। নিজেকে কষে কয়েকটা চড় লাগাল রানা কল্পনায়, তারপর সন্তুষ্ট হয়ে গাড়ি চালনায় মন দিল। সময়মত সতর্ক থাকবে ও, চোখকান খোলা রাখবে।

 বৃষ্টি নামল। বাতাসের তাড়নায় খানিক ডানে কাত হয়ে, খানিক বায়ে কাত হয়ে ঝরল। আস্তে আস্তে কমে এল বাতাস, কিন্তু বৃষ্টির বেগ বেড়ে গেল। চেপে আসছে ক্রমেই। গাড়ির ছাদে বড় ফোটার বৃষ্টি ড্রাম বিটের মত শব্দ তুলছে। সামনের কাচ। বেয়ে স্রোতের মত গড়িয়ে নামছে পানি। বন্যা দেখতে দেখতেই বুদ্ধিটা এল মাথায়। আরমান্দোর কাছ থেকে কাগজপত্র নেয়ার মত উপযুক্ত জায়গা পেয়ে গেছে মাসুদ রানা। কাটলাসের গতি। আরও বাড়াল ও, জায়গাটা একবার দেখে যাবে হুইটার যাওয়ার আগে। পথেই পড়বে।

জ্যাকসনভিল শহরের মাইল তিনেক আগে ডানে বাঁক নিল। মাসুদ রানা। মিনিট দশেক সোজা এগিয়ে কয়েকবার ডানে-বাঁয়ে। বাঁক নিল, পড়ল এসে মোটামুটি দুটো গাড়ি চলে এমন এক রাস্ত। Tয়। দুদিকটা ফাঁকা, কোন বাড়ি-ঘর বা আর কিছু নেই। রাস্ত। টিাও বেশ পুরানো, কার্পেটিং নষ্ট হয়ে গেছে জায়গায় জায়গায়। দেখলেই বোঝা যায় বহুদিন যত্ন নেয়া হয় না। বেশ কয়েক বছর আগে এসেছিল রানা এদিকে, বিশেষ এক কাজে।

সে সময়ে উপকূলে একটা ভাঙাচোরা, পরিত্যক্ত হোটেল। দেখেছিল, এখনও আছে কি না ওটা, দেখে যেতে চায়। থাকলে এখানেই আরমান্দোর সঙ্গে অ্যাপয়েনমেন্ট করবে মাসুদ রানা। বিরান রাস্তাটা ধরে পাঁচ মিনিট একটানা চালিয়ে গতি কমাল ও, এসে পড়েছে। আটলান্টিকের গর্জন শোনা যাচ্ছে সামনে। গতি আরও কমাল মাসুদ রানা, ডানের খোলা একটা গেটের ভেতর  ঢুকিয়ে দিল কাটলাসের নাক, তারপর একশো গজ এগিয়ে ব্রেক কষল।

বিরান এক কাঁটাতারের বেড়া দেয়া প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আছে। মাসুদ রানা। ডান দিকে তিনটে বিল্ডিঙের কঙ্কাল, দুদিকের দুটো সামান্য ছোট, মাঝখানেরটা বিশাল। বাঁ দিকে জংলা গাছ-পালা, ঝোপঝাড়ের আড়ালে আটলান্টিক মহাসাগর। সাদা ফেনার মুকুট পরা বিশাল একেকটা ঢেউ আছড়ে পড়ছে এসে তটে। গোল্ডেন বীচ জায়গাটার নাম। স্থানের নামে নাম রাখা হয়েছিল হোটেলটার, গোল্ডেন ভিউ।

চার একর জায়গা নিয়ে ১৯২০ সালে তৈরি হয় এটা। আমেরিকার নাম করা প্রথম শ্রেণীর হোটেলগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল। সে সব আজ ইতিহাস। মাঝখানের কাঠামোটা ছিল মূল হোটেল। ওটার সামনের ছাদ ধসে পড়া বিশাল পিলারড পোর্টিকো দেখলে মনে হয় চীনা রূপকথার দৈত্যাকার কোন ড্রাগন। বাঁ দিকের ছোট কাঠামোটায় আগুন লেগেছিল অতীতে কোন এক সময়, পোড়া কাঠ, পোড়া দেয়াল এখনও তার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

গোল্ডেন ভিউর সামনে সবুজ লন ছিল এক সময়, ছিল মনোরম বাগান, ফুলের ঝাড়-বেড, সারি সারি পাম গাছ-এখন কিছু নেই। কাদা মাটি, আর এখানে ওখানে গর্তে জমে থাকা পানি ছাড়া। মেইন বিল্ডিঙের ছাদের একাংশ খসে পড়েছে। জানালার ফ্রেম নেই একটাও। দরজার অবস্থাও প্রায় এক। একআধটা পাল্লা আছে, জং ধরা কবজার সঙ্গে ঝুলছে, সশব্দে এদিকওদিক দুলছে বাতাসে।

গাড়ি থেকে নেমে পড়ল মাসুদ রানা। শোল্ডার ব্যাগ দিয়ে। মাথা আড়াল করে এগোল মূল ভবনটার দিকে। ১৯৩৮ সালে প্রচণ্ড এক হ্যারিকেনের আঘাতে বিধ্বস্ত হয় গোল্ডেন ভিউ। ফুলে ফেঁপে তার দোতলা পর্যন্ত ডুবিয়ে দিয়েছিল আটলান্টিক। দেয়ালে এখনও আছে লবণ পানির সেই দাগ। পোর্টিকোর চওড়া সিঁড়ির। ধাপগুলো পেরিয়ে ওপরে উঠে এল মাসুদ রানা।

দেয়ালের গায়ে রং চটা একটা নোটিস দেখা গেল। নোটিসটার বক্তব্য উদ্ধার করতে বেশ বেগ পেতে হলো মাসুদ রানাকে। ওতে বলা হয়েছেও বেআইনী অনুপ্রবেশকারীকে আইনের হাতে সোপর্দ করা হবে। কিন্তু ওটা চোরদের নিরুৎসাহিত করতে পেরেছে বলে মনে হলো না ওর, কারণ গোল্ডেন ভিউর কড়ি-বরগা, দরজা-জানালা, কিছুই প্রায় রাখেনি। তারা। সব ফরসা করে আলো বাতাসের মুক্ত চলাচলের পথ করে দিয়েছে।

প্রকাণ্ড ফলেই-এর মেঝেতে স্থানীয় ছেলে-ছোকরাদের। পিকনিক, পট পার্টি ইত্যাদির প্রচুর আলামত চোখে পড়ল মাসুদ। রানার। কোথাও কোথাও স্থূপ হয়ে আছে থকথকে কাদার মত পচা আবর্জনা। আর আছে ঘেঁড়া-ফাটা, পানিতে বরবাদ হওয়া অজস্র ম্যাট্রেস, খালি বীয়ারের কৌটো আর পাখির মল। মাথার ওপর পাখির আনাগোনা টের পেল মাসুদ রানা। উঁচু সিলিঙের। ফাঁক-ফোকরে যেখানেই সুবিধে পেয়েছে, সেখানেই আবাস গেড়েছে ওরা। চারদিকের বাতাসে নোংরামি আর মৃত্যুর গন্ধ ভাসছে মনে হলো রানার।

সন্ধে হয়ে আসছে। বেরিয়ে এল রানা। যতটা সম্ভব কাদাপানি এড়িয়ে উল্টোদিকের ঝোপঝাড়ের কাছে এসে দাঁড়াল প্রশস্ত লন অতিক্রম করে। দুই আড়াইশো গজ দূরে দেখা যাচ্ছে গোল্ডেন বীচ। বহু আগেই পরিত্যক্ত। উলঙ্গ একটা জেটি দাঁড়িয়ে আছে তীর থেকে খানিকটা দূরে। ওটায় পৌছার কাঠের প্যাসেজের তক্তাগুলো গায়েব। এখানে-ওখানে জেটির লোহার দেহ খসে গেছে। ঢেউয়ের তোড়ে ভীষণভাবে দুলছে ওটা। গোল্ডেন ভিউর সঙ্গে গোল্ডেন বীচও ঠাই পেয়েছে ইতিহাসে। আটলান্টিকের নোংরা আবর্জনা বোঝাই পানি ক্রমাগত আছড়ে পড়ছে এসে ততোধিক নোংরা সোনালী সৈকতে।

আর দেরি করা যায় না। তাড়াতাড়ি গাড়িতে এসে উঠল মাসুদ রানা। শোল্ডার ব্যাগ থেকে ব্যবহৃত শার্ট-প্যান্ট বের করে পাল্টে ফেলল ভেজা পোশাক। তারপর নাক ঘুরিয়ে ছুটল গেটের  দিকে। গেট পেরিয়ে রাস্তায় উঠে বায়ে টার্ন নিল, অ্যাক্সিলারেটর দাবিয়ে গতি বাড়াল, ছুটে চলল ফিরতি পথে। এটা ছাড়া অন্য কোন পথ নেই গোল্ডেন ভিউ যাওয়ার বা আসার। হেড লাইট জ্বেলে দিল মাসুদ রানা, অ্যাঁধার হয়ে গেছে। জ্যাকসনভিলে ডিনার খেলো ও, সেই সঙ্গে দুপুরের হরিমটরের ক্ষতিটাও পুষিয়ে নিল। আজও মিস করেছে রানা দুপুরের খাওয়া, অবশ্য ইচ্ছে করেই। সময় বাচানোর জন্যে থামেনি কোথাও।

শহর ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার আগে একটা পাব থেকে মিসেস পার্ল হকের নাম্বারে টেলিফোন করল মাসুদ রানা। ওর দেয়া ডেড লাইন কাছিয়ে আসছে, তার আগে হুইটারে পৌছাতে পারবে না রানা কিছুতেই। কাজেই ফোন করে ওদের জানিয়ে দেয়া দরকার যে এদিকে সব ঠিক আছে, ও ফিরে আসছে। তা না হলে মেয়েটিকে নিয়ে হুইটার ছেড়ে বেরিয়ে পড়বে বিল্লাহ, ফয়েজ।

তুমি কেমন আছ, সানি?

বৃদ্ধার উল্লসিত কণ্ঠ শুনে আশ্বস্ত হলো মাসুদ রানা। হাসল নিঃশব্দে। ভাল।

থাকতেই হবে। আজ সারা সকাল তোমার জন্যে গির্জায়। বসে প্রার্থনা করেছি যে আমি।

মুহূর্তে মনটা ভিজে উঠল ওর। ধন্যবাদ, ম্যাম।

সন্তানের জন্যে মা প্রার্থনা করবে, এতে ধন্যবাদ দেয়ার কি। আছে? তুমি ধরো, আমি ওদের কাউকে ডেকে দিচ্ছি।

ফয়েজ আহমেদের সঙ্গে এক মিনিট কথা বলল মাসুদ রানা, তারপর লাইন কেটে দিয়ে আরমান্দোর নাম্বার ঘোরাল। কাগজপত্র তৈরি হতে ম্যানুয়েল গার্সিয়ার কতদিন লাগবে? ও প্রান্তে পরিচিত কণ্ঠের সাড়া পেয়ে প্রশ্ন করল ও।

তিন দিন সময় চেয়েছে ও, বস্।

মানে আজ, কাল আর পরশু?

হ্যাঁ।

তার পরদিন হাতে পাচ্ছি আমি ওগুলো?

নিশ্চই! কোথায় পৌঁছাতে হবে ওসব, বস্?

পরশু সন্ধের পর জানাব তোমাকে কোথায় ওগুলো ডেলিভারি নেব আমি। অল রাইট?

অল রাইট।

লাইন কেটে দিয়ে বেরিয়ে এল মাসুদ রানা। আড়াইটার দিকে হুইটার পৌঁছল ও। ওরা প্রত্যেকে, এমনকি মিসেস হক পর্যন্ত জেগে বসে ছিল রানার অপেক্ষায়। দুচোখ মেলে রাখতে। রীতিমত সংগ্রাম করতে হচ্ছে তখন ওকে। নিচে কিছু সময় কাটিয়ে ওপরতলায় চলে এল রানা। নাদিরা এল পিছন পিছন। দরজা বন্ধ করল সে। তারপর রানা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর বুকে ঝাপিয়ে পড়ল মেয়েটি। কাঁদছে ফুলে ফুলে। বাইরে প্রকৃতিও কাদছে অঝোর ধারায়। বাইরে প্রচণ্ড ঝড়ের মাতামাতি। বাতাস, বৃষ্টির এলোমেলো ছোটাছুটি আর ক্রুদ্ধ গর্জনে কান পাতা দায়। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ঘন ঘন বজ্রপাত। থেকে থেকে উজ্জ্বল নীলচে আলোয় ঝলসে উঠছে হুইটার, দুনিয়া কাঁপানো কড়-কড়-কড়াৎ শব্দে বাজ পড়ছে। পুরো রাত পার হয়ে গেছে, এখনও কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না অবস্থা পরিবর্তনের।

কাল বড়দিন। নিচতলার সিটিংরুমে ক্রিসমাস ট্রী সাজিয়েছে। মিসেস পার্ল হক। এখানকার একমাত্র জেনারেল স্টোরের মালিক হকিন্স গাছটা পৌঁছে দিয়ে গেছে গতরাতে। প্রতি বছরই এই উপকারটুকু করে থাকে সে বৃদ্ধার। ওটা অলংকরণের কাজে বেশ ব্যস্ত এখন মহিলা। কাজের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে তার মুখ। এমন আনন্দের দিনে ওরা থাকতে পারছে না জেনে মন খারাপ হয়ে গেছে, সেটাই বারে বারে বিভিন্নভাবে প্রকাশ করছে মহিলা।

একই রুমের আরেক প্রান্তে বসে আছে মাসুদ রানা, মুত্তাকিম বিল্লাহ, ফয়েজ আহমেদ ও নাদিরা। জরুরী আলোচনায় ব্যস্ত। মায়ামিতে আরমান্দোর সঙ্গে যোগাযোগ, তার ফলাফল এবং পরবর্তী প্ল্যান সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছে রানা ওদের। সেই নিয়েই চলছে আলোচনা। সামনে একটা কাগজে ম্যাপ অ্যাঁকায় ব্যস্ত এখন রানা, হোটেল গোল্ডেন ভিউর এবং তার আশপাশের এলাকার ম্যাপ। কাজটা শেষ হতে ম্যাপটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল ও, কোথাও কোন ভুল আছে কি না বোঝার চেষ্টা করল। না, নেই।

সন্তুষ্ট মনে ওটার দুই জায়গায় দুটো খুদে বৃত্ত অ্যাঁকল রানা। একটা গোল্ডেন ভিউ যাওয়ার সরু পথের পাশের, হাঁটাপথে আনুমানিক এক মিনিটের দূরত্বে, একটা বড় ঝোপের পিছনে, অন্যটা হোটেলের ফয়েই-এর ঠিক পাশের রুমের দেয়াল ঘেঁষে।

এখানে তুমি থাকবে, আগে থেকে, পরের বৃত্তটায় ঠুক ঠুক করে পেন্সিল ঠুকল মাসুদ রানা। তাকিয়ে আছে ফয়েজ আহমেদের দিকে। হোটেলের সামনে তোমাকে নামিয়ে গাড়ি নিয়ে ফিরে আসবে বিল্লাহ। গাড়িটা আগেভাগেই আরমান্দো এবং জালিয়াত গার্সিয়ার চোখে পড়া চলবে না।

ঠিক আছে, মাথা দোলাল গরিলা। তারপর?

 তারপর শহরের মাথায় গিয়ে শেষবারের মত আরমান্দোকে। ফোন করব আমি, জানাব কোথায় যেতে হবে তাকে কাগজপত্র নিয়ে।

মাথা দোলাল সে। জানালেন।

ফোন করে বসে থাকব আমি নাদিরাকে নিয়ে। আমাদের থেকে খানিকটা এগিয়ে থেকে বিল্লাহও অপেক্ষা করবে গাড়ি। নিয়ে, যতক্ষণ না ওকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায় আরমান্দো। এরপর, ওরা এগিয়ে যাওয়ার পর নিরাপদ দূরত্ব থেকে অনুসরণ করবে ওদের বিল্লাহ। ওরা হোটেল কম্পাউণ্ডে ঢুকে পড়বে, আর। বিল্লাহ ওর গাড়ি এই ঝোপের কাছে পথের ওপর আড়াআড়ি করে। রাখবে। যথেষ্ট লম্বা ডজটা, পুরো রাস্তা ব্লক হয়ে যাবে তাতে।

কেউ যদি আমাদের অনুসরণ করে, ওখানে এসে কিছুক্ষণের জন্যে হলেও আটকে যাবে। আড়ালে বসে তাদের আগমন সংবাদ। আগেভাগে আমাদের জানিয়ে দিতে পারবে তুমি, দানবের দিকে তাকাল মাসুদ রানা। সে ক্ষেত্রে ছুটে চলে আসবে তুমি আমাদের সংকেতটা জানিয়েই। লক্ষ রাখতে হবে কয়টা গাড়ি বা কতজন মানুষ আছে দলে। সংখ্যায় ওরা অল্প হলে লড়ব আমরা। যদি তা হয়, ছুটে সৈকতে গিয়ে বোটে উঠব। বোটের আইডিয়া। আজই সকালে ঢুকেছে মাসুদ রানার মাথায়।

কি চিন্তা করে প্রশ্ন করল বিল্লাহ, আপনি কি আশঙ্কা করছেন তেমন কিছু ঘটবে, বেঈমানী করবে কিউবানটা?

না। আশঙ্কা করছি না। কিন্তু ঘটতে পারে। তাই আগে থেকে সতর্ক থাকা ভাল। বলা যায় না কিছুই।

বুঝলাম। কিন্তু আমি রোড ব্লক করে দিলে আপনারা ঢুকছেন কিভাবে?

তুমি রওনা হয়ে যাওয়ার পর আমিও গাড়ি ছাড়ব। জোরে চালিয়ে তোমাকে, আরমান্দোকে ওভারটেক করব আমি গোল্ডেন ভিউর প্রাইভেট রাস্তায় প্রবেশ করার আগেই। আমরা জায়গাটা পার হওয়ার পর ব্লক বসছে তোমার, আগে নয়।

বুঝেছি। কিন্তু বোটের কি ব্যবস্থা?

জ্যাকসনভিলের যে কোন একটা বোট হাউস থেকে ভাড়া নিয়ে নেব।

কিন্তু যদি শেষ পর্যন্ত আরমান্দো না আসে? প্রশ্ন করল নাদিরা।

আসবে, দৃঢ় কণ্ঠে বলল মাসুদ রানা। তাতে কোন সন্দেহ নেই। নিচের ঠোঁট কামড়ে ভাবল ও। জ্যাকসনভিলে প্রথম কাজ হবে আমাদের আরও কিছু পাথর বিক্রি করা। এখনও সোয়া দুই বাকি রয়ে গেছে। আমার কাছে দেড়ের কিছু বেশি আছে, বাকিটা জোগাড় করতে হবে কালকের মধ্যে। তবে, সমস্যা একটা হতে পারে, যদি বড়দিন উপলক্ষে জুয়েলারি মার্কেট বন্ধ থাকে।

যদি থাকে? বলল নাদিরা।

 কি আর করা! এখানে থেকে মিসেস হকের টার্কি রোস্ট আর কেক খাব। ফোন করে আরমান্দোকে দুদিন অপেক্ষা করতে বলব।

কিন্তু, রানা, পাসপোর্ট-ভিসা হাতে পেলেও তো বিপদ কাটছে না আমাদের, তাই না? প্লেনে চড়তে হলে মায়ামি থেকেই চড়তে হবে। শেষ মুহূর্তে যদি ঝামেলা বেধে যায় ওখানে?

রহস্যময় এক টুকরো হাসি ফুটল মাসুদ রানার ঠোঁটে। কিন্তু কোনও উত্তর দিল না ও।

দুপুরে খেয়েদেয়ে এক ঘুমে সন্ধে করে দিল মাসুদ রানা। ঝড়ের বেগ অনেক কমে এসেছে এখন। বৃষ্টি প্রায় নেই বললেই চলে। শুধু দমকা বাতাস। আর থেকে থেকে দূরাগত মেঘের গর্জন। সিটিংরুমে কিছু সময় গল্প-গুজব করে কাটাল সবাই, মিসেস হককে রান্না-বান্নার কাজে সাহায্য করল কিছুক্ষণ। যদিও। বেশি সময় ওখানে টিকতে দিল না ওদের মুত্তাকিম বিল্লাহ। টার্কির রোস্ট তৈরির মশলার মধ্যে মনের সুখে গুঁড়ো গোল মরিচ মেশাতে গিয়ে কুকাজটা ঘটিয়ে বসল সে। মশলার লবণ ঠিক হয়েছে কি না চেখে দেখতে গিয়ে প্রথমে চোখ কপালে উঠল। বৃদ্ধার। তারপর হাঁ হয়ে গেল মুখ।

প্রচণ্ড ঝালে দিশেহারা হয়ে মিনিট দুয়েক কিচেনে প্রায় ছোটাছুটি করে বেড়াল মহিলা ওইভাবে। ঘামে ভিজে একাকার। অবস্থা। রেগেমেগে বিল্লাহকে ঘাড় ধরে কিচেন থেকে বের করে। দিতে গেল ফয়েজ, কিন্তু দেখা গেল ওর ঘাড় ঠিকমত হাতে পায় সে। পায় ঠিকই, তবে বেশি খাটো হওয়ার দরুন ওই অবস্থায়। তাল মিলিয়ে হাঁটতে পারে না সে দানবের সঙ্গে, হাঁটতে গেলেই। তার সঙ্গে পায়ে পায়ে জড়িয়ে যায়। শেষে বিরক্ত হয়ে মোষের। মত গুতো মারতে মারতে বের করে নিয়ে গেল ফয়েজ বিল্লাহকে।

হাতে করে এটা-ওটা মুখে তুলে দিয়ে বৃদ্ধাকে শান্ত করল রানা বহু কষ্টে। কিন্তু তারপর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বদলে উল্টে ওকেই বের করে দিল মহিলা কিচেন থেকে। কেবল নাদিরা বেঁচে গেল মেয়ে বলে। বেশ রাত পর্যন্ত চলল তাদের রাধাবাড়া, আর বাইরে ছেলেদের আড্ডা। বড়দিনের সব রান্না সেরে রাখল বৃদ্ধা, সকালে তাকে গির্জায় যেতে হবে। পরদিন রাত পোহাবার অনেক আগে, আরও কয়েকটা পাথর নিয়ে মাসুদ রানা একা চলে গেল জ্যাকসনভিল। একা গেল, কারণ ওর সন্দেহ ছিল আজ হয়তো মার্কেট খোলা পাওয়া যাবে না।

ওর আশঙ্কাই সত্য হলো। বড়দিন উপলক্ষে শহরের প্রায় সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। অতএব আরমান্দোকে আরও দুদিন পর ও যোগাযোগ করবে বলে জানিয়ে দিল রানা। শহর ত্যাগ করার আগে অনেক খুঁজেপেতে মিসেস হকের জন্যে ওদের চারজনের তরফ থেকে চারটে গিফট কিনে নিতে ভোলেনি মাসুদ রানা। চমৎকার এক জোড়া চামড়ার জুতো, একটা দামী কুইন্টেড বেড জ্যাকেট, পারফিউম, একটা পাঁচ পাউন্ডের চকলেট বক্স ইত্যাদি কিনেছে সে।

আরও কিছু কেনাকাটা করল রানা। ও জানে, ওদের খাওয়ার পিছনে প্রচুর ব্যয় হচ্ছে মিসেস হকের। দুধ, কফি, প্যানকেক ফ্লাওয়ার, বীফ, বীয়ার, কোলা, টনিক ওয়াটার ও কয়েক বোতল ভদকা কিনল রানা। ওল্ডসমোবাইল কাটলাসের বুট বোঝাই করে গভীর রাতে হুইটার ফিরে এল ও। এক সঙ্গে এতকিছু উপহার পেয়ে আনন্দে অস্থির হয়ে কেঁদেই ফেলল মহিলা।

হুইটার অবস্থানের শেষ দুটো দিনের স্মৃতি ওদের সবার জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

.

সাতাশ ডিসেম্বর।

অ্যাঁধার থাকতে উঠে যাত্রার জন্যে তৈরি হয়ে নিল ওরা। লোকজন জেগে ওঠার আগেই বেরিয়ে পড়া ভাল। অল্পক্ষণের মধ্যেই কেঁদে কেঁদে নাকমুখ ফুলিয়ে ফেলল মিসেস পার্ল হক। নাদিরার অবস্থাও এক। যতক্ষণ দেখা গেল, বার বার পিছনে তাকাল সে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাড়ির সীমানা প্রাচীরের গেটে এসে দাঁড়িয়ে থাকল বৃদ্ধা। হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে। ওদের সঙ্গে। কিছু দূর পর্যন্ত এল হাউণ্ডটা, তারপর ফিরে গেল। অন্ধকারে খুব দ্রুত হারিয়ে গেল হুইটার।

 আগে আগে ছুটছে ওল্ডসমোবাইল কাটলাস, পিছনে ডজ। সামনেরটায় রয়েছে মাসুদ রানা ও নাদিরা। উইগ পরেনি আজ নাদিরা, বারণ করেছে মাসুদ রানা। তার বদলে একটা প্রিন্টের স্কার্ফ পেঁচিয়েছে মাথায়। পরেছে জিনস, উলেন স্পাের্টস গেঞ্জি, পায়ে কেডস। সবার ওপর মিঙ্ক কোট। মাসুদ রানা পরেছে। সেদিনের কেনা মেরুন প্যাকস, স্পাের্টস শার্ট, তার ওপর কোট।

আগেরবারের মত ব্যাকরোড ধরে হোমারভিল চলল ওরা। একটু একটু করে ফরসা হয়ে উঠছে চারদিক, পাখিরা বেরিয়ে। পড়তে শুরু করেছে নীড় ছেড়ে।

মহিলা কদিন খুব কষ্ট পাবেন। কাত হয়ে রানার দিকে। সামান্য ঘুরে বসল নাদিরা। বেচারী!

হ্যাঁ। ঠিকই বলেছ।

অত বড় বাড়িতে কি করে বছরের পর বছর একা আছেন। মহিলা, ভেবে পাই না আমি।

এসবে অভ্যস্ত ওরা। খুব অসুবিধে হয় না, চলে যায় দিন।

আমিও অনেক বছর আছি এদেশে। কিন্তু এদের এই সমাজ ব্যবস্থা মন থেকে মেনে নিতে পারিনি আমি আজও। আমাদের দেশে এসব কল্পনাই করি না আমরা। তোমাদের সমাজ ব্যবস্থা কেমন, রানা?

ঐতিহ্যগতভাবে একান্নবর্তী। তবে এখন যুগের হাওয়া বদলেছে। এদের বাতাস আমাদের ওদিকেও যায়। মেয়েরা তো। আছেই, কোন কোন পরিবারে বিয়ের পর ছেলেরাও আলাদা হয়ে যায়। অবশ্য তাদের সংখ্যা এখনও কম।

তোমাদের পরিবার কি একান্নবর্তী?

হাসল মাসুদ রানা। কি উত্তর দেবে ভাবছে।

হাসছ কেন?

আমার কোন পরিবার নেই।

নেই মানে? বিস্মিত হলো নাদিরা।

নেই মানে? নেই মানে, কেউ নেই আমার।

বাবা-মা, ভাই-বোন, কেউ নেই?

মাথা দোলাল মাসুদ রানা। নাহ্। কেউ নেই।

অনেকক্ষণ চুপ করে থাকল মেয়েটি। একভাবে তাকিয়ে আছে রানার মুখের দিকে। বিয়ে করেননি?

শব্দ করে হেসে উঠল এবার ও। আমার মত বাজে একটা ভবঘুরেকে মেয়ে দেবে কে?

আর কিছু বলল না নাদিরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *