২.০৮ পা টিপে টিপে নিচে নেমে এল

গভীর রাত। পা টিপে টিপে নিচে নেমে এল ওরা সবাই। মাসুদ। রানা, বিল্লাহ ও ফয়েজ, সবার হাতে একটা পুঁটলি। নাদিরার হাত খালি। বেরিয়ে এল ওরা সাবধানে দরজা খুলে। ওটা আলতো করে ভিড়িয়ে দিয়ে গ্যারেজের দিকে চলল। গ্যারেজে একটা খন্তা দেখেছিল ফয়েজ গাড়ি রাখার সময়, ওটা দরকার।

কয়েক পা গিয়েই দাঁড়িয়ে পড়ল দলটা, পথ আগলে শুয়ে আছে প্রকাণ্ড এক হাউণ্ড। জ্বলজ্বলে চোখে দেখছে ওদের। ছোট করে একটা হাঁক ছাড়ল ওটা। চট করে দুপা পিছিয়ে এল নাদিরা। ভয় পেয়ো না, বলল মাসুদ রানা। আমি সামলাচ্ছি ওকে। এগোল ও ধীর পায়ে।

কান খাড়া হয়ে গেল হাউণ্ডের, জিভ বের করে হাঁপাচ্ছে শব্দ করে, সন্দেহ ভরা চোখে দেখছে সে রানাকে, দ্বিধান্বিত। কয়েক ঘণ্টা আগে এই মানুষটার সঙ্গে মোটামুটি আলাপ পরিচয় হয়েছে। তার। তখন তো বেশ ভদ্রলোক বলেই মনে হয়েছিল, ভাবছে হয়তো হাউণ্ড, এখন দেখি চোরের মত আচরণ করছে! কি ওগুলো ওদের হাতে? আবার হাঁক ছাড়তে গেল হাউণ্ড, কিন্তু সামলে নিল শেষ পর্যন্ত, অতি পরিচিত একটা আওয়াজ শুনতে পেয়েছে সে। শিস বাজাচ্ছে লোকটা তাকে উদ্দেশ করে, নিঃশব্দ শিস। শব্দটা কেবল কুকুরেরাই শুনতে পায়। অভয়বাণী ও বন্ধুত্বের আহ্বান। পাওয়া যাচ্ছে ওতে।

গলে গেল সারমেয়র আওলাদ। ঘন ঘন লেজ নাড়তে নাড়তে উঠে এল। খুশিতে হাত চেটে দিল মাসুদ রানার। ওর গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল রানা। এই ফাঁকে দ্রুত কাজ সারল ফয়েজ, নিয়ে এল জিনিসটা। পাঁচ মিনিটের মধ্যে খালপাড়ে পৌঁছে গেল ওরা। চাদ হেলে পড়েছে তখন, গাছপালার আড়ালে চলে গেছে। আবছা অন্ধকারে দ্রুত কাজে লেগে পড়ল ওরা।

জায়গা বাছাই করে প্রথমে কয়েক চাপড়া আস্ত মাটি তুলল বিল্লাহ ঘাস সমেত, তারপর তিন হাত গর্ত করে বোচকা তিনটে রাখল তার মধ্যে। গর্ত ভরাট করল ওরা চেপেচুপে, তার ওপর চাপড়াগুলো যত্নের সঙ্গে বসিয়ে দিল যার যার জায়গায়। পায়ের আলতো চাপে কিনারাগুলো মিলিয়ে দিল। খালের পানিতে খন্তাটা ধুয়ে নিল ফয়েজ, নইলে শুকিয়ে দাগ ফুটে উঠবে মাটির। কাজ সেরে আধ ঘণ্টার মধ্যে ফিরে এল ওরা।

একটা কথা ভাবছি, খানিক উসখুস করে বলল ফয়েজ।

কি? সিগারেট ধরিয়ে দীর্ঘ এক টানে ধোঁয়ায় ফুসফুস ভরে নিল রানা।

আমরাও আপনার সঙ্গে গেলে কেমন হয়? এখানে তো কাজ নেই আমাদের। অনর্থক…

ওখানেও কোন কাজ নেই তোমাদের। যে কাজে আমি যাচ্ছি, তাতে এতজনের যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তোমরা জানো, ওরা এখন চারজনের একটা দল খুঁজছে, তিনজন পুরুষ আর এক মেয়ের একটা গ্রুপ, ঠিক?

জ্বি।

কেন তাহলে শুধু শুধু এক্সপোজড হওয়ার ঝুঁকি নিতে যাব? এমনিতেও কিছু দূর পর্যন্ত সেই ঝুঁকি মাথায় করেই তো যেতে হবে আমাদের।

আর কিছু বলল না কেউ। পরদিন সকালে মিসেস হকের সঙ্গে একান্তে কথা বলল মাসুদ রানা, তারপর নয়টার সময় রওনা হয়ে গেল ওরা। শহরে গ্যাস স্টেশন থেকে তেল নিল রানা। যদিও দরকার ছিল না, আগের দিন বিকেলেই বুইকের ট্যাঙ্ক ভরে নিয়েছিল ও। তবু নিল যেটুকু অ্যাঁটে, যাতে তেল ভরার ফাঁকে স্টেশন অ্যাটেনডেন্ট ওদের জোর গলার আলোচনা শুনে বুঝতে। পারে যে ওরা ম্যাকন চলে যাচ্ছে।

ওখান থেকে হক্সিতে এল। নাস্তা খেল পেট ঠেসে। রাজকীয় নাস্তা। অরেঞ্জ জুস, ভেড়ার মাংস, ডিম, প্যান কেক, গ্রিটস, কর্ন। মাফিন, সুইট বাটার, জ্যাম এবং কফি। অর্ডার লিখতে গিয়ে চোখ কপালে উঠল রোজের। পেটে দেখছি সবার রাক্ষস ঢুকেছে। একটা করে।

তা বলতে পারো, হেসে উঠল রানা। তাছাড়া হুইটারের শেষ খাওয়াটা স্মরণীয় করে রাখতে চাই আমরা।

মানে? পেন্সিল কানে গুজে কপাল কোচকাল ওয়েট্রেস। রানার দিকে তাকাল। চলে যাচ্ছেন আপনারা?

হ্যাঁ। ম্যাকন যাচ্ছি, খুব জরুরী।

মুখ কালো হয়ে গেল মেয়েটির। রানা বুঝল, এতগুলো টাকা ফেরত দিতে হবে বুঝতে পেরে মন খারাপ হয়ে গেছে। ভেবো। টাকাটা ফেরত দিতে হবে না, রেখে দাও। ওটা তোমার।

কিন্তু, বিনা কাজে এতগুলো টাকা…

ভুলে যাও। খেতে দাও জলদি, পেট জ্বলছে।

প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে গিলল ওরা। তারপর তৃপ্তির ঢেকুর তুলে। চুমুক দিল কফির কাপে। দশটার সামান্য আগে হক্সি ত্যাগ করল ওরা, গড়াতে শুরু করল বুইক রিভেরা। বিল্লাহ ড্রাইভ করছে, মাসুদ রানা বসেছে তার পাশে, হাতে ম্যাপ। অনেকটা পথ ঘুরে হুইটারের ব্যাকরোডে উঠল গাড়ি, তারপর পঙ্খিরাজের মত ছুটল ইন্টারস্টেট হাইওয়ের উদ্দেশে।

একটার দিকে ফারগো অতিক্রম করল ওরা। পেটে কারও খিদের আলামত নেই দেখে থামতে বারণ করল মাসুদ রানা। টানা চালিয়ে সন্ধের আগে ফ্লোরিডার লেক সিটি পৌঁছল ওরা। পথে কেউই তেমন কথাবার্তা বলেনি নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া। নাদিরা সবচেয়ে বেশি চুপচাপ। গতরাতে রানার পরিকল্পনা শুনেই চুপ হয়ে গেছে মেয়েটি। রাতে ঘুম প্রায় হয়নি তার, জানে মাসুদ রানা। পাশের খাটে নাদিরার বারবার এপাশ ওপাশ করা টের পেয়েছে, কিন্তু এ নিয়ে কথা তোলেনি ও। ইচ্ছে হয়নি। ব্যস্ত ছিল ভবিষ্যৎ চিন্তায়। রানা জানে এ মুহূর্তে দুশ্চিন্তায় আছে নাদিরা, কিন্তু সে শুধুই রানার আর নিজেদের নিরাপত্তা সম্পর্কিত। আর মাসুদ রানার দুশ্চিন্তা আরও গভীর, আরও ব্যাপক। এক সঙ্গে অনেক কিছু নিয়ে মাথা ঘামাতে হচ্ছে। তাই মন চাইলেও কথা আসছে না মুখে।

লেক সিটিতে যাত্রাবিরতি করল মাসুদ রানা। মুখে রুচি নেই, তবু খেলো ওরা সবাই। খুঁজেপেতে একটা ইউজড কার লটে হাজির হলো। ছয় বছরের পুরানো একটা ডজ পছন্দ করল বিল্লাহ, দেখে শুনে কিনে ফেলা হলো ওটা। পুরানো হলেও লক্কড় মার্কা নয়, এঞ্জিনটা বুইক রিভেরার এঞ্জিনের চাইতে ভাল। সুটকেসগুলো চাপানো হলো ডজে। ওদের সঙ্গে দুমিনিট কথা বলল মাসুদ রানা। নাদিরার মনোভাব বুঝতে পেরে তার বাহুতে হাত বুলিয়ে দিল। ভেবো না। ঠিকই ফিরে আসব আমি।

মনের জমাট বাষ্প আচমকা গলে পানি হয়ে গেল মেয়েটির, মোটা ধারায় গড়িয়ে গড়িয়ে নামতে লাগল তার দুগাল বেয়ে। মাসুদ রানা, মুত্তাকিম বিল্লাহ, ফয়েজ আহমেদ, ওদেরও মন খারাপ, কিন্তু কারও চেহারায় তার প্রকাশ নেই। ওরা প্রফেশনাল, এসব মেয়েলী আবেগ ওদের প্রকাশ করতে নেই, মানায় না। কোন বিদায় সম্ভাষণ না, কিছু না, ঘুরে বুইকের দিকে হাঁটা ধরল মাসুদ রানা। ডজ ফিরে চলল হুইটার, বুইক ছুটল জ্যাকসনভিল।

পথে দুবার গাড়ি থামাল মাসুদ রানা। এক ড্রাগ স্টোর থেকে হেয়ার ব্লিচ, ডাই ইত্যাদি কিনল। আরেক ডিপার্টমেন্ট স্টোর থেকে কিনল মেরুন প্যাকস, সাদা মোজা, চামড়ার স্ট্র্যাপওয়ালা স্যাণ্ডেল, হাফ হাতা প্রিন্টেড স্পাের্টস শার্ট, মিররড সানগ্লাস ও একটা সস্তা ক্যামেরা।

বেশ রাত হয়ে গেল ওর পৌঁছতে। এক থ্রী স্টার হোটেলের। পার্কিং লটে বুইকটা বিসর্জন দিয়ে ট্যাক্সি চেপে মাইল দুয়েক। দূরের আরেক হোটেলে উঠল মাসুদ রানা। চুল এবং ভুরুর রং। পাল্টাতে গিয়ে ঝাড়া ছয় ঘণ্টা ব্যয় হলো ওর। ঘুমাবার সময় খুব কমই জুটল। সকালে ফোলা ফোলা চেহারা নিয়ে চেক আউট করল শুকনো খড় রঙের চুল, ভুরুওয়ালা, ট্যুরিস্টবেশী মাসুদ রানা। এক কাঁধে শোল্ডার ব্যাগ, আরেক কাঁধে ক্যামেরা। বাসে চেপে অরল্যাণ্ডো পৌঁছল ও দুপুরের পর।

পকেটের অবস্থা খুব একটা সুবিধের নয়, তাই প্রচুর দর কষাকষি করে দশ বছর বয়সী একটা ওল্ডসমোবাইল কাটলাস কিনল রানা এখান থেকে। ওটা নিয়ে উঠে এল আবার সেই রুট। নাইন্টি ফাইভে। একে একে কোকোয়া, পাম বে, ভেরো বীচ, পাম বীচের পাশ কাটিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটল মায়ামির দিকে। যতই শহরটা এগিয়ে আসছে, ততই ঘন হচ্ছে ট্রাফিক। প্রচণ্ড চাপ। গাড়ি ঘোড়ার। সীজনাল ট্রাফিক। গতি কমতে কমতে শামুক। গতিতে এসে ঠেকল। সামনে তাকালে মনে হয় স্থবির হয়ে গেছে ট্রাফিক, নড়ছে না।

শহরে ঢুকতেই লাগল দুই ঘণ্টা। অভিবাসী কিউবানদের সেকশনে চলে এল মাসুদ রানা। খুদে আরেক হাভানা যেন এলাকাটা। এদেশীরা তেমন একটা পাত্তা পায় না এখানে। এদের সঙ্গে আছে সাউথ আমেরিকান বিভিন্ন দেশের নাগরিক, এক জোট হয়ে হেন কুকাজ নেই যা করে না এরা। জুয়া, জালিয়াতি, বেশ্যাবৃত্তি, খুন-গুমখুন, ড্রাগ, সব খোলামেলাভাবে চলে এখানে। বিরাট এক সশস্ত্র গ্যাং পোষে এখানকার দুনম্বরি কিউবান ব্যবসায়ীরা। এতই শক্তিশালী এ গ্যাং যে স্থানীয় মাফিয়াও তার কাছে পাত্তা পায় না।

একটা পার্কিং লেখা সাইনের নিচে কাটলাস দাঁড় করাল মাসুদ রানা। দরজা লক করে ফুটপাথে উঠে পড়ল। ভিড় ঠেলে মিনিট পাঁচেক হাঁটল রানা, এরাস্তা ওরাস্তা ঘুরে একটা গলিতে এসে ঢুকল। বাঁ দিকের চারটে বাড়ি ছেড়ে পঞ্চমটার দরজায় মৃদু টোকা দিল। ঘিঞ্জি এলাকা, অনেকটা ঢাকার বনগ্রাম রোডের মত। বাড়িগুলো সব গায়ে গায়ে লাগানো।

দেরি দেখে আবার নক করতে যাচ্ছিল মাসুদ রানা, এই সময় দরজার ওপাশে পায়ের আওয়াজ শোনা গেল। খুলে গেল দরজা। সামনে দাঁড়িয়ে আছে ছোটখাট তাগড়া এক কিউবান। সাদামাঠা চেহারা, গায়ের রং প্রায় কালো। জিজ্ঞাসু চোখে মাসুদ রানার দিকে চেয়ে থাকল সে। চেহারা দেখে মনে হয় যেন ওকে চেনার চেষ্টা করছে কিউবান।

ডান তর্জনী পিস্তলের মত তার বুকে ঠেকাল মাসুদ রানা, চাপ দিয়ে দুপা পিছিয়ে যেতে বাধ্য করল তাকে। ভেতরে ঢুকতে দাও, আরমান্দো।

 এইবার চিনল ওকে কিউবান। বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল সে। মা…মা…!

শাটাপ! চাপা হুঙ্কার ছাড়ল ও। ভেতরে চলো।

অ্যাঁ-হ্যাঁ, আসুন আসুন! দ্রুত পিছিয়ে গেল আরমান্দো। কেমন এক দৃষ্টিতে দেখছে রানাকে। দরজা বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াল। লোকটা, আরেকবার আপাদমস্তক দেখল ওর। আসুন, ভেতরে। চলুন।

দশ বাই দশ একটা রুমে ঢোকাল রানাকে আরমান্দো। বসার। ঘর। এক সেট আধ ময়লা কভারের সোফা, একটা সেন্টার। টেবিল, দুটো কাঠের চেয়ার আর একটা রাইটিং টেবিল, এই হলো রুমটার আসবাব। দ্বিতীয় টেবিলের ওপর স্থূপ হয়ে আছে নানান হাবিজাবি। ওর মধ্যে একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাসও আছে। আর আছে একটা টেলিফোন।

বসুন।

একটা চেয়ারে বসল মাসুদ রানা। ভাল করে তাকাল কিউবানের দিকে। লোকটার পুরো নাম আরমান্দো সোকারাস। পেশা দালালি। যে কোন জিনিস কেনাবেচায় সমান পারঙ্গম আরমান্দো। সবার হাঁড়ির খবর রাখে। অতীতে অনেকবার অর্থের বিনিময়ে কাজ আদায় করেছে রানা এর কাছ থেকে।

আমাকে দেখে চমকে উঠলে মনে হলো? নাকি ভুল দেখেছি? স্থির দৃষ্টিতে লোকটাকে দেখছে মাসুদ রানা।

ধপ করে সোফায় বসল আরমান্দো সোকারাস। মাথা নাড়ল। জোরে জোরে। ভুল দেখেননি, বস্, ফাসফেঁসে গলায় বলল সে। ভুল দেখেননি। ঠিকই দেখেছেন।

চমকাবার কারণ?

মাই গড, বস্! আপনি…না জানার ভান করছেন?

কড়া চোখে লোকটাকে শাসাল রানা। ফালতু এবং বাড়তি কথা, কাজের সময় এর কোনটাই আমি পছন্দ করি না, তুমি জানো। যা বলতে চাও সরাসরি বলো, আরমান্দো।

খানিক আমতা আমতা করল কিউবান, মনে হলো কথা গুছিয়ে উঠতে পারছে না। ও-ওরা এসেছিল, বস!

বলে যাও।

রবার্টো গার্সিয়া। আজই এসেছিল। আপনার ব্যাপারটা বাজারে জানাজানি হয়ে গেছে, বস্। আমার মনে হয় এখনও যায়নি ওরা, মায়ামিতেই আছে। একটু বিরতি দিল আরমান্দো, মোনাজাতের মত ঘন ঘন মুখ ডলল দুহাতের তালু দিয়ে। হুমকি দিয়ে গেছে রবার্টো। বলে গেছে, যে মাসুদ রানাকে সাহায্য করার দুঃসাহস দেখাবে, সে যেন আগেই কথা বলে রাখে নিজের আণ্ডারটেকারের সঙ্গে। আজ সারাদিন আপনিই ছিলেন বাজারের আলোচনার বিষয়বস্তু, বস। একমাত্র বিষয়বস্তু। টোক গিলল কিউবান।

একটু চিন্তা করল মাসুদ রানা। তুমি কি ভয় পেয়েছ?

ঝট করে মুখ তুলল আরমান্দো। নিজের কথা ভেবে? রবার্টোকে? না, বস্। ওকে আমি ভয় পেতে যাব কেন? ওসব মাফিয়া-টাফিয়া কেয়ার করি না আমরা। আমি আপনার জন্যে ভয় পাচ্ছি। সবাইকে পরিষ্কার নির্দেশ দিয়ে গেছে রবার্টো, মাসুদ রানা গোজ নোহোয়্যার।

মাসুদ রানা গোজ এভরিহোয়্যার, দৃঢ় কণ্ঠে বলল রানা। মুখে কঠিন হাসি। তুমি সেটা ভাল করেই জানো।

থমকে গেল কিউবান। অপলক চোখে দেখল ওকে। মুখে হাসি হাসি ভাব, কিন্তু সেটার বিস্তার ঘটাতে সাহস পাচ্ছে না। হ্যাঁ, বস্। জানি।

গুড। এবার আমার দুটো প্রশ্নের সোজা উত্তর দাও। স্রেফ হ্যাঁ, অথবা না। একজনের নামে নতুন কাগজপত্র তৈরি করতে হবে। পাসপোর্ট, ভিসা, আইডি, সোস্যাল সিকিউরিটি কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদি। সম্ভব?

নাদিরার নামে?

উত্তর দিল না মাসুদ রানা। দুই ভুরুর মাঝখানে সামান্য কুঞ্চন দেখা দিল ওর।

সরি, বস্। অভ্যাসের দোষ। উত্তর হচ্ছে হ্যাঁ। এবং একটা প্লেন চার্টার করে দিতে হবে। সম্ভব?

খানিক দ্বিধাদ্বন্দ্বে দুলল আরমান্দো। হ্যাঁ। আশা করি। মাসুদ রানা বিরক্ত হতে পারে ভেবে দ্রুত যোগ করল তার সঙ্গে, এর কোনটাই আমি নিজে পরিচালনা করি না, বস্। ইউ নো। দুটোর ব্যাপারেই বিশ্বস্ত আউটফিটের সঙ্গে আগে আলোচনা করতে হবে আমাকে। তবে এটুকু নিশ্চিত থাকুন, আরমান্দো। জানে তার দৌড় কতদূর। সেই ভরসাতেই হ্যাঁ বলে দিয়েছি। আমি অলরেডি।

অল রাইট। খোঁজ নাও তাহলে। কথা বলো।

কাল সকালেই…

কাল নয়। আজই।

 আজই?

আমার তাড়া আছে, আরমান্দো।

একটু চিন্তা করল কিউবান। ওকে, বস্। আপনি যা বলেন। আলোচনার ফলাফল কোথায় জানাতে হবে? কোথায় পাব আপনাকে?

ঘড়ি দেখল মাসুদ রানা। ঠিক দুঘণ্টা পর তোমাকে টেলিফোন করব আমি।

ঠিক আছে, আসন ছাড়ল আরমান্দো। এখনই তাহলে বেরুতে হয়।

মাসুদ রানাও উঠল। আলতো করে একটা হাত রাখল কিউবানের কাঁধে। প্রায় চমকে উঠল লোকটা। কি!

আমার ব্যাপারে অনেক কিছুই জানো তুমি, কেবল একটা বিষয় ছাড়া, গম্ভীর, থমথমে গলায় বলল রানা। চাউনি শীতল।

রক্ত হিম হয়ে গেল আরমান্দোর। আতঙ্কে ঘাড়ের খাটো চুল দাঁড়িয়ে গেল তার। কি, বস্?

আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে বাঁচতে পারেনি কেউ কোনদিন। বিশ্বাসঘাতকদের নিজ হাতে যমের বাড়ি না পাঠানো পর্যন্ত বিশ্রাম নেই না আমি।

এ-এসব কি বলছেন, বস? ঘাম ছুটে গেল কিউবানের। আমি আপনার সঙ্গে…!

আমি কেবল যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে আমার সঙ্গে, তাদের পরিণতির কথা তোমাকে জানালাম। ফর ইওর ইনফর্মেশন। আর একটা কথা মনে রেখো, রবার্টোর সঙ্গে তোমার ব্যবসা হলে একবারই হবে, এবং সেটাই হবে তোমার শেষ ব্যবসা। আর আমার সঙ্গে হবে আজীবন। যদি লোভ সামলে বিশ্বস্ত থাকতে পারো তুমি। চলি। সময় হলে টেলিফোন করব। আর হ্যাঁ, কাজটা কার জন্যে করছ তা যেন কেউ না জানে।

বেরিয়ে পড়ল মাসুদ রানা। খিদেয় চো চো করছে পেট। মাথায় রবার্টোর চিন্তা। সত্যিই আছে সে এখানে? নাকি বাজারে হুমকি ছড়িয়ে দিয়ে ওদের খোঁজে ফিরে গেছে? কেমন ভ্যাপসা গরম লাগছে। আকাশের দিকে তাকাল মাসুদ রানা। মেঘ করেছে খুব। বাতাস আছে, তবে আর্দ্র। ঝড় উঠবে নাকি? একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে খেয়ে নিল রানা। দুপুরের খাওয়া মিস গেছে আজ, মোটামুটি পুষিয়ে নিল সেটা। ওখান থেকে বেরিয়ে ছুটল জুয়েলারি মার্কেট।

এক ঘণ্টায় তিনটে দোকান ঘুরল রানা, পাথরের বোঝা অর্ধেকের মত কমিয়ে ফেলল পঁচাশি হাজারে। নগদ টাকার ভ্রাম্যমাণ গুদামে পরিণত হলো ওর শোল্ডার ব্যাগ। তবে ব্যাটারা। বড়ো হারামী। তিন ভাগের দুভাগ দামও দেয়নি। ব্যাপারটা। টের পেয়েও বিশেষ ঝোলাঝুলি করেনি মাসুদ রানা। কারণ এই মুহূর্তে ক্যাশ প্রয়োজন, পকেট প্রায় খালি। আরমান্দো যদি কাজ দুটো করে দেয়ার উপযুক্ত আউটফিটের সন্ধান পেয়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গে অগ্রিম দিতে হবে তাকে। কাজ দুটোর জন্যে কত হেঁকে। বসে ব্যাটারা কে জানে!

যা-ই দাবি করুক, ভাবল মাসুদ রানা, ওর তাতে কিছু আসবে যাবে না। মাছের তেলে মাছ ভাজবে ও। টাকার এই ঘাটতি পরে অবশ্য আবার পূরণ করতে হবে রানাকে, কারণ ও স্থির করেই রেখেছে, এসব বিক্রির পুরো টাকাই বনোমোর নিহত হেলপারের। পরিবারকে দেবে। ঠিক সময়মত আরমান্দো সোকারাসের নাম্বারে টেলিফোন করল রানা। ফোনের কাছেই বসা ছিল লোকটা, রিসিভার তুলল প্রথম রিং পুরো হওয়ার আগেই।

ইয়েস!

আরমান্দো? মাসুদ রানার কর্তৃত্বপূর্ণ ভরাট, গম্ভীর কণ্ঠস্বর কাঁপিয়ে দিল কিউবানটিকে। একটা ঢোক গিলল সে নিঃশব্দে।

জ্বি, বস্।

 বলো।

 সম্ভব, বস্।

দুটোই?

জ্বি, দুটোই। ও, একটা কথা, বস্।

আমি শুনছি।

পাসপোর্টে কোন দেশী ভিসা স্ট্যাম্প করতে হবে?

অস্ট্রেলিয়া।

এই যা! আমি তো ধরে নিয়েছিলাম…ইউ নো, বস্, এখান থেকে অল দ্যা রোড গোজ টু হাভানা!

এদিক-ওদিক, যেদিকেই হোক, কিছু আসে-যায়?

না, বস্। পয়সা কিছু বেশি লাগবে, এই যা।

কত?

আবার ঢোক গিলল আরমান্দো। অনেক দাবি করছে ওরা, বস্।

প্রশ্নটার পুনরাবৃত্তি করল মাসুদ রানা। কত?

হাফ আ মিল।

কিছু সময় চুপ করে থাকল মাসুদ রানা। ভাবছে। বুঝে ফেলেছে, এই টাকায় যদি রাজি হয় ও, অর্ধেকের বেশিই আরমান্দোর পকেটে যাবে। ওর অর্ধেক।

কি বললেন, বস্?

ওদের বলো, দুলাখ পর্যন্ত দিতে রাজি আমি। তার বেশি এক পয়সাও নয়। আর কমিশন বাবদ তুমি পঞ্চাশ পাবে। ফিফটি থাউজেও। দ্যাটস অল।

কিন্তু…

কথা বলো ওদের সঙ্গে। তুমি নিশ্চই ওদেরকে আমার কথা বলোনি?

অ্যাঁতকে উঠল কিউবান।হোলি গড, নো!

তাহলে ওদের এত চার্জ করার কোন কারণ আমি দেখি না। স্বাভাবিক রেটের চাইতে বহুগুণ বেশি দাবি করছে ওরা।

সে আমিও খুব ভালই জানি, বস্। কিন্তু জেনেও কিছু করতে পারছি না। এ নিয়ে যত বেশি কথা বাড়াব, ততই কথা ছড়ানোর আশঙ্কা আছে। তাছাড়া, আমি নাম না বললেও ওরা হয়তো অনুমানে আপনাকেই মক্কেল ধরে নিয়েছে, যে জন্যে এত দাবি করে বসেছে। অ্যাজ দা সে গোজ, আপনার কাছে আছে। তাই। আজই ও এলো, আর আমিও মাঠে নামলাম, সন্দেহ তো করতেই। পারে, বস্!

আবার খানিক চুপ করে থাকল মাসুদ রানা। যুক্তি আছে। আরমান্দোর কথায়। ব্যাপারটা ভেবে দেখার বিষয়। ঠিক আছে। ওদের জন্যে আড়াই, তোমার জন্যে পঞ্চাশ। দ্যাটস ফাইনাল। আবার আলাপ করো। এখনই। এক ঘণ্টা পর আবার যোগাযোগ করব আমি।

 জানি না আলোচনার ফল কি হবে, তবে আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করব, বস্। যদি সফল হই, অগ্রিম প্রয়োজন হবে।

পাবে। রাখলাম।

বস?

বলো।

সতর্ক থাকবেন। বি ভেরি কেয়ারফুল, বস্।

 মনে করিয়ে দেয়ার জন্যে ধন্যবাদ। রাখি।

 রিসিভার রেখে পাব থেকে বেরিয়ে এল মাসুদ রানা। সাড়ে বারোটা বাজে। কমে এসেছে মানুষের ব্যস্ততা। কাটলাস ছোটাল রানা, মিশে গেল গাড়ির মিছিলে। আপাতত কোন কাজ নেই, অতএব কোথাও বসে সময়টা কাটাতে হবে। কোথায় যাওয়া যায়?

সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে গেল। গাড়ি ঘুরিয়ে কিউবান সেকশনে চলে এল মাসুদ রানা। আগের সেই সাইনটার নিচে পার্ক করল কাটলাসটা। লক করল বেরিয়ে এসে। তারপর দৃঢ় পায়ে এগিয়ে। চলল আরমান্দো সোকারাসের আস্তানার দিকে। কাঁধে ঝুলছে টাকার থলে। স্পাের্টস শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা। ভেতর থেকে উঁকি দিচ্ছে শোল্ডার হোলস্টার।

আরমান্দোর বাড়ির উল্টোদিকের এক বাড়ির বন্ধ ফটকের সামনে অন্ধকারে দাঁড়াল মাসুদ রানা। অনেকটা নিস্তেজ হয়ে পড়েছে এলাকা, মানুষজনের আনাগোনা তেমন চোখে পড়ছে না। হাত দিয়ে চেপে দরজাটা বন্ধ আছে কিনা দেখে নিল রানা। আছে। ওটার গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। তাকিয়ে থাকল আরমান্দোর বন্ধ দরজার দিকে। কোন আলো জ্বলছে না বাড়িটায়। অন্ধকার। অনড় দাঁড়িয়ে আছে মাসুদ রানা। ঘড়ির কাটা খুব ধীর গতিতে ঘুরছে। কয়েকবার পা বদল করল ও। চাপ পড়ছে নার্ভের ওপর।

পায়ের আওয়াজ পেল ও। গলা সামান্য বাড়িয়ে উঁকি দিল গলির মাথায়। দুটো ছায়ার ওপর চোখ পড়ল, এদিকেই আসছে। একটা ছায়া খাটো, অন্যটা লম্বা। ঢ্যাঙা। আরেকটু এগোতে খাটো ছায়াটাকে চিনল মাসুদ রানা, আরমান্দো। ওর সঙ্গে ওটা কে? আস্তানার দরজায় এসে থেমে দাঁড়াল কিউবান, দরজা খুলে ঢ্যাঙাকে ইঙ্গিতে ভেতরে ঢুকতে বলল। ঢুকে পড়ল লোকটা। পা বাড়াল মাসুদ রানা। ভেতরে গিয়ে দরজা বন্ধ করার জন্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল আরমান্দো, চমকে উঠল ওকে দেখে। জেসাস ক্রাইস্ট! আপনি?

ঢোকো ভেতরে। দরজাটা রানা নিজেই বন্ধ করল। চলো, ভেতরে বসা যাক।

ততক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়েছে কিউবান। নিশ্চই, আসুন। আপনি আসায় ভালই হলো, বস্।

তাই বুঝি?

হ্যাঁ। কাগজপত্র কার নামে, কোন ঠিকানায় হবে, টেলিফোনে জেনে ওকে জানাব ভেবেছিলাম। সে জন্যেই নিয়ে এসেছি ওকে। ওসব তৈরিতে ওস্তাদ মানুষ। ঢ্যাঙাকে দেখাল আরমান্দো চোখের ইশারায়।

তার মানে আমার প্রস্তাব গ্রহণ করেছে তোমার পার্টি?

করেছে। অনেক চাপাচাপির পর। জান খারাপ করে দিয়েছে ব্যাটারা আমার। মুখ দিয়ে ফেনা বের করে ছেড়েছে।

যাক, সফল হয়েছ শুনে খুশি হলাম। ঘুরে ঢ্যাঙার দিকে তাকাল মাসুদ রানা। ছয় ফুট চারের কম হবে না মানুষটা। বয়স ষাটের মত সম্ভবত। চকচকে কাপড়ের কালো রঙের সুট, কালো জুতো, কালো মোজায় আণ্ডারটেকারের মত লাগছে লোকটাকে। গায়ে আধ ময়লা সাদা শার্ট। গলায় জুতোর ফিতের মত সরু কালো টাই। মুখটা লম্বা, কফিন আকারের। গালে, কপালে ছোট ছোট বীচি আর স্মল পক্সের শুকনো দাগ।

রানার দিকে এক পলক তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিয়েছে। লোকটা। অস্থির দৃষ্টিতে ঘরের মেঝেতে কি যেন খুঁজছে সে, অন্তত চোখ দেখে তাই মনে হয়। মুহূর্তের জন্যেও স্থির থাকছে না নজর, মুহূর্তে মুহূর্তে ডানে-বাঁয়ে, ওপরে-নিচে করছে। অনেকের চোখের মণি কাঁপা রোগ আছে, রানা ভেবেছিল এর-ও আছে বুঝি। সে রোগ। কিন্তু একটু পরই ভুলটা ভাঙল। আসলে ভয়ে কাঁপছে। মানুষটা, আতঙ্কিত হয়ে আছে। নীল শিরা জেগে থাকা দুহাতে বাদামী রঙের একটা বড় খাম ধরে বসে আছে সে, কাপছে সেটা। এতই জোরে যে অনবরত খসর খসর আওয়াজ উঠছে।

মাসুদ রানার সঙ্গে তাকে পরিচয় করিয়ে দিল না আরমান্দো। সোকারাস। রানাও আগ্রহ দেখাল না।

তাহলে? কিউবানের দিকে তাকাল ও।

অর্ধেক টাকা অগ্রিম চায় ওরা।

সম্ভব না। অত টাকা নেই এখন আমার কাছে। ব্যাগ থেকে আগেই আলাদা করে রাখা পঁচাত্তর হাজার বের করল মাসুদ রানা। পঁচাত্তর আছে এখানে। রাখো এটা। বাকিটা পাসপোর্ট, চার্টারের ডকুমেন্টস ইত্যাদি নেয়ার সময় দেব।

কিন্তু, বস্…

তুমি জানো আমি ফালতু কথা বলি না, ফালতু ওয়াদা করি না। সময়মত পুরো টাকাই পাবে তুমি, আরমান্দো। নিশ্চিত থাকো।

কিছু সময় চুপ করে বসে থাকল আরমান্দো। হাতে ধরা টাকাগুলো দেখছে। ওকে, বস। হোয়াটএভার ইউ সে।

খুব সম্ভব টাকা দেখেই মণি কাঁপা রোগ সেরে গেছে ঢ্যাঙার। হাতের কাঁপুনিও কমে গেছে। পেপার্স যার নামে হবে, তার ছবি লাগবে। আর নাম-ঠিকানা… আর কখন ওসব ডেলিভারি দিতে হবে…।

ছবি কয় কপি? প্রশ্ন করল রানা।

হিসেব করল লোকটা। আঠারো কপি।

কাগজপত্র তৈরি করুন। যখন ডেলিভারি নেব, ছবি নিয়ে আসব সঙ্গে। তখন সাঁটিয়ে দেবেন শুধু। আর সব সেরে ফেলুন।

ঠিক আছে। খামের ভেতর থেকে কাগজ-কলম বের করল আণ্ডারটেকার। কি নামে হবে কাগজপত্র?

আধ ঘণ্টা পর বেরিয়ে এল মাসুদ রানা। গাড়ি নিয়ে তুফান বেগে ছুটল চল্লিশ মিনিট দূরত্বের পমপানো বীচের দিকে। ওখানকার এক মোটেলে রাত কাটিয়ে সকাল নটায় ফিরে এল মায়ামি। ঘণ্টা দুয়েক চষে বেড়াল জুয়েলারি মার্কেট। প্রায় লাখ দেড়েক ডলার রোজগার করে রওনা হয়ে গেল রানা হুইটারের দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *