২.০৭ ডিনারের জন্যে তৈরি

সাড়ে সাতটায় ডিনারের জন্যে তৈরি হয়ে নেমে এল ওরা। পার্লার থেকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বেরিয়ে এল মিসেস হক। টাউনে চললেন?

হ্যাঁ, ম্যাম, বলল মাসুদ রানা। লম্বা জার্নির ফলে খিদে লেগে গেছে খুব। তেমনি পাচ্ছে ঘুম।

সোজা হক্সিতে চলে যান। হুইটারে হক্সিই যা একটু রাধতে পারে।

ধন্যবাদ।

বেরিয়ে পড়ল ওরা। পাঁচ মিনিট ধুলো উড়িয়ে পৌঁছে গেল শহরে। এটা পথে পেরিয়ে আসা অন্য শহরগুলোর থেকেও ছোট। গ্যাস স্টেশন ছাড়া একটা জেনারেল স্টোর, একটা হোটেল, একটা হার্ডওয়্যার স্টোর, একটা ব্যাংক, একটা লিকার স্টোর। এবং হক্সিস রেস্টুরেন্ট। ব্যস।

গেম কক আর হক্সিস-এর গঠন প্রকৃতি অবিকল এক। যেন। একই ডিজাইনারের কাজ। সেই উলঙ্গ কাঠের ফ্লোর, বার, টেবিল-চেয়ার, বুদ, পিছনের কিচেন, খাড়া কফিন, ফোন বুদ, সব। একরকম। ভেতরের মশলার ঝাঁঝও। কেবল একটা জিনিস নেই এখানে, ভেনডিং মেশিন, এবং পাবলিক বুদ একটা কম। গেম। ককের মতই, ওরা ভেতরে ঢুকতে উপস্থিত অন্যদের আলাপহাসাহাসি বন্ধ হয়ে গেল। ঘাড় ফিরিয়ে দেখল ওদের প্রত্যেকে। দলটা একটা বুদে ঢুকে পড়তেই আবার নিজেদের ফিরে পেল। তারা।

এদের ওয়েট্রেসের সঙ্গে আগেরটার পার্থক্য কেবল বয়সের। চার-পাঁচ বছর বেশি হবে এর বয়স। একটু মোটাও। তবে বেশ। হাসিখুশি। ইভনিন, ফোকস, দাঁত বের করে হাসল মেয়েটি। ড্রিঙ্কিন, ইটিন, অর বোথ? আমি রোজ।

বোথ, পাল্টা দাঁত দেখাল মাসুদ রানা। প্রথমে ভদকা দাও, বরফসহ। তারপর তোমাদের মেন্যুতে চোখ বোলাব, অবশ্য যদি। থাকে।

অবশ্যই আছে! থাকবে না কেন? চোখ পাকাল রোজ। যাতা ভেবেছ নাকি আমাদের? রাখ, উত্তর দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই।

প্রপিতামহের আমলে ছাপানো চারটা মেন্যু দিয়ে গেল ওদের রোজি। তেল-মশলা আর হাতের ময়লায় লেখাগুলো অস্পষ্ট হয়ে। গেছে, ভাল করে পড়া যায় না সব। কাগজগুলো দেখে মনে হয় কোন মেমো প্যাড থেকে ছিড়ে আনা হয়েছে বুঝি। যেমন ময়লা, তেমনি মলিন। মলাটে লেখাগু হক্সিস হোয়্যার দি এলিট মীট টু ইট।

প্রথম আইটেম সুপ। তারপর ব্রেড অ্যাও বাটার। মিট। স্যালাড। পটস অ্যাও ভেজিটেবলস। আইসক্রীম অর জেল্লো। কফি। আইটেমগুলোর বিশদ এন্ট্রিতে চোখ বোলাতে লাগল ওরা। মলাটের নিচে বড় করে একটা সতর্কবাণী ডোন্ট টেক দিস মেন্যু ফর আ স্যুভেনিয়ার।

খুব খারাপ, ওটা পড়ে মন্তব্য করল ফয়েজ। স্মৃতির অ্যালবামে রাখব বলে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম।

ভদকা নিয়ে এল রোজ। প্যাড-পেন্সিল নিয়ে রানা ও নাদিরার দিকে তাকাল। ক্যাটফিশ বলস কি জিনিস? জিজ্ঞেস করল নাদিরা।

গোল করে কাটা ক্যাটফিশের মাংস, ডীপ ফ্রাইড। খেতে দারুণ! সঙ্গে সুপ।

কিসের সুপ? মুখ তুলল মাসুদ রানা।

টম্যাটো। এ অঞ্চলের সেরা সুপ।

ব্রেডেড ভীল কাটলেট?

 ডিল-লিশিয়াস!

ভীল খুঁজে পাওয়া যাবে তো ওতে?

ওয়েল, কিছু না কিছু পাবে।

টম্যাটো সুপ, কাটলেট, ক্যাটফিশ বলস্, ভেজিটেবলস্, বীন অর্ডার দিল ওরা। গলা পর্যন্ত খেলো সবাই। খিদেয় নাড়িভুড়ি হজম হওয়ার জোগাড় হয়েছিল, কাজেই রান্নার স্বাদ নিয়ে মাথা। ঘামাল না কেউ। তবে মন্দ নয় রান্না, ভালই লাগল খেতে। এরপর আইসক্রীম। এবং সবশেষে কফি। কফি রেখে বেরিয়ে যাচ্ছিল রোজ, রানার প্রশ্ন শুনে থেমে দাঁড়াল।

বারের ওপাশের লোকটি বুঝি হক্সি?

নাহ্। হক্সি ওর মত গাধা না, বুদ্ধি রাখে সে মাথায়। রাখে। বলেই এটা বেচে দিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় সটকে পড়েছে। নামটা। ইচ্ছে করেই বদলাইনি আমরা।

কি নাম ওর?

হাইম গোর।

তোমার একমাত্র প্রেমিক? হাসল মাসুদ রানা।

হ্যাঁ, ও তাই ভাবে বটে, রোজও হাসল।

তোমার কথা শোনে গোর?

ভুরু কোচকাল মেয়েটি। শুনবে না মানে? কিন্তু বিষয়টা কি, মিস্টার?

তোমাকে একটা কাজ করতে হবে আমাদের জন্যে। ওয়ালেট থেকে গুণে গুণে আড়াইশো ডলার বের করল মাসুদ রানা। এটা রাখো, অ্যাডভান্স। কাজ শেষ হলে আরও আড়াইশো পাবে।

প্রকাণ্ড এক ঢোক গিলল রোজ। চোখ কপালে তুলে চেয়ে থাকল নোটগুলোর দিকে। লোভ, সন্দেহ, ভয় ইত্যাদি ভাবের খেলা চেহারায়। কাজটা কি, মিস্টার?

কঠিন কিছু নয়। খুব সহজ কাজ। ধরো এটা।

কাঁপা হাতে টাকাগুলো নিল রোজ। এদিক ওদিক, বিশেষ করে হাইম গোরের দিকে তাকাল একবার আড়চোখে। তারপর। চট করে ব্লাউজের ভেতর পুরে ফেলল। বলুন, কি করতে হবে। আমাকে।

নিচু গলায় এক মিনিট কথা বলল মাসুদ রানা। ওর কথা শেষ হতে আবার ভুরু কোঁচকাল সে। ব্যস! আর কিছু না?

তুমি নিশ্চই স্বীকার করবে কাজের তুলনায় ফীটা অনেক বেশি দিচ্ছি আমি?

স্বীকার না করলে কি প্রশ্নের উত্তর অন্যরকম হতে পারে আশঙ্কা করছেন আপনি? হাসল রোজ। এ কাজে এত টাকা অবিশ্বাস্য। ভাববেন না, মিস্টার। খবরটা সময় থাকতে পাবেন। অবশ্য যদি ঘটে তেমন কিছু।

গুড। হ্যাঁ, তোমাদের রান্না ভালই লাগল।

হাসিটা আরও বিস্তার লাভ করল মেয়েটির। মিথ্যে বলার আর্ট আপনি খুব ভালই জানেন।

বিল মিটিয়ে বেরিয়ে এল ওরা, মন্থর গতিতে রওনা হলো মিসেস পার্ল হকের বাড়ির দিকে। মেয়েটিকে বিশ্বাস করো তুমি? প্রশ্ন করল নাদিরা।

না করে উপায় কি? আমাদের খোঁজাখুঁজি করা হলে গোরই প্রথম জানতে পারবে। গোর জানা মানেই রোজ জানা। তাছাড়া, আমার মনে হয়েছে, মেয়েটিকে বিশ্বাস করলে ঠকব না আমরা।

পোর্চে রকারে বসে আছে মহিলা। চাদের আলোয় হাসছে। যেন হুইটার। পরিষ্কার নীল আকাশ। নুড়ি বিছানো ড্রাইভওয়েতে গাড়ি রেখে নেমে এল ওরা। মাসুদ রানার হাতে বাদামী কাগজের একটা প্যাকেট। বেশ বড় প্যাকেটটা। বারোটা ঠাণ্ডা বীয়ারের ক্যান আছে ওতে।

ইভনিং, ম্যাম। সঙ্গীদের পিছনে ফেলে এগিয়ে গেল নাদিরা। কী সুন্দর চাঁদ উঠেছে, তাই না?

মুচকে হাসল কুড়ালমুখো মিসেস হক। মাথা দোলাল, হ্যাঁ। সে জন্যেই বাইরে এসে বসেছি। খুব ভাল লাগছে। তোমরা বসতে চাইলে বসতে পারো।

ওপাশে দেয়াল ঘেঁষে রাখা আছে কয়েকটা পোর্চ চেয়ার, নিয়ে এসে মহিলাকে ঘিরে গোল হয়ে বসল ওরা। আমরা স্মোক। করলে আপনার অসুবিধে নেই তো, মিসেস হক? বলল রানা।

না। ধূমপানের অভ্যেস আছে আমারও। তবে কম।

নাদিরা ছাড়া আর সবাই সিগারেট ধরাল। বৃদ্ধাকে সাহায্য। করল রানা সিগারেট ধরাতে। বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে ধরে ওটায় চুমুক দিতে লাগল মহিলা। ভঙ্গি দেখে মনে হয়। খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। বোঝা গেল পরিবেশটা খুব। উপভোগ করছে সে। খুশিই হয়েছে ওদের সঙ্গ পেয়ে। ঠিকই। ধারণা করেছিল রানা, ভাবল নাদিরা, মানুষের সঙ্গ চাইছিল বৃদ্ধা, টাকাটা মুখ্য ছিল না।

হক্সি থেকে কয়েক ক্যান বীয়ার এনেছি আমরা। আপনি আমাদের সঙ্গে পান করলে খুব খুশি হব। প্যাকেটটা হাঁটুর ওপর রাখল মাসুদ রানা। প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে থাকল মহিলার দিকে।

নিশ্চই! ধন্যবাদ।

কয়েক সেকেণ্ড পর। বাডওয়েইজারের ঠাণ্ডা ক্যানে চুমুক দেয়ার ফাঁকে ধূমপান করতে লাগল ওরা। এটা ওটা নিয়ে আলাপ করছে। এক সময় দেখা গেল, নিজের জীবন কাহিনী শুরু করে দিয়েছে মিসেস হক, ওরা শুনছে মন দিয়ে। তার বলার ব্যগ্রতা দেখে মনে হয় যেন ওদের এসব শোনাবার একটা সুযোগের অপেক্ষায় ছিল সে।

জানা গেল, আলবামার এভারগ্রীনের মেয়ে মিসেস পার্ল হক। আমেরিকার রাজ্যগুলো সে সময়ে পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, তখনই হুইটারে এসে বসবাস শুরু করে তার স্বামী, অ্যারনের পরিবার। অ্যারন ছিল বাবা-মার বড় ছেলে। জর্জিয়ার। এথেন্সে এক চার্চ কনভেনশনে পরিচয় হয় পার্ল-অ্যারনের। পরিচয় থেকে প্রণয়। বেশ কিছুকাল পত্র বিনিময় চলে তাদের। তারপর একদিন জর্জিয়া ছেড়ে আলবামা রওনা হয় অ্যারন, পার্লের পরিবারের কাছে, তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব নিয়ে।

এর এক বছর পর এভারগ্রীনে বিয়ে হয় তাদের, এবং স্বামীর সঙ্গে হুইটারে চলে আসে পার্ল। অ্যারনের মা বেঁচে ছিল তখন। মহিলার সঙ্গে বনিবনা হত না পার্লের, প্রায়ই এটা-ওটা নিয়ে খিটিমিটি লেগে থাকত। এই পর্যায়ে এসে বিরতি দিল বৃদ্ধা। অন্যমনস্কের মত চেয়ে থাকল সামনের দিকে। তারপর ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

মহিলা মারা গেছেন। তার ব্যাপারে কোন আলোচনা করতে চাই না আমি। তাঁর ভাল-মন্দ, সবকিছু সঙ্গে নিয়ে গেছেন তিনি। মৃতদের সমালোচনা করলে তাদের অম্রা কষ্ট পায়।

আরেকটা ক্যানের ট্যাব খুলে তার হাতে ধরিয়ে দিল মাসুদ রানা। হাসির ভঙ্গি করল মহিলা। থ্যাঙ্কস, সানি। লম্বা এক চুমুক দিয়ে ধীরে ধীরে গিলল পানীয়টুকু। আবার শুরু হলো কাহিনী।

দুই ছেলে, চার মেয়ের জন্ম হয় অ্যারন-পার্লের সংসারে, আট বছরের মধ্যে। প্রথম ছেলে, জন্মের পর পরই মারা যায়। তার পরের মেয়ে, সে-ও মারা যায় শ্বাসকষ্টজনিত রোগে, তিন মাস বয়সে। পরে ছোট ছেলেটিও মারা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নৌ-বাহিনীর পাইলট ছিল সে। জাপানে বোমা ফেলার সময় বিধ্বস্ত হয় তার বিমান। অবশিষ্ট তিন মেয়ে স্বামী-সন্তান নিয়ে ঘরকন্না করছে শিকাগো, অ্যারিজোনা আর টরোন্টোয়।

এগারো নাতি-নাতনীর নানী মিসেস পার্ল। আগে মাঝেমধ্যে মেয়েরা স্বামীদের নিয়ে বেড়াতে আসত, কিন্তু এখন আর আসে না। তবে চিঠি লেখে নিয়মিত। নাতি-নাতনীদের ছবি পাঠায়, বৃদ্ধার জন্মদিনে তাকে শুভেচ্ছা কার্ড, গিফট পাঠায়।

ওদের এবারের বড়দিনের উপহারও পেয়েছি। জমিয়ে রেখেছি সব। বড়দিনের দিন সকালে গির্জা থেকে ফিরে খুলব।

নীরবে কেটে গেল কয়েক মিনিট। চুপ করে বসে আছে সবাই। চাঁদের আলোর মোহনীয় রূপ দেখছে।

আপনার নিজের পরিবারের কেউ নেই? নরম গলায় জানতে। চাইল নাদিরা।

না। কেউ নেই? সবাই চলে গেছে। আমি ছিলাম পরিবারের একমাত্র সন্তান। বাবা-মা মারা গেছে অনেক আগে। তারপর। চাচা-চাচী, মামা-মামী, তাদের ছেলে-মেয়েরা, সবাই। দুই চাচাতো ভাই অবশ্য বেঁচে আছে এখনও, যতদূর জানি। কিন্তু কোথায় থাকে তারা, কি করে কিছুই জানি না। তারাও হয়তো জানে না আমার কথা। সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

মাথা দোলাল নাদিরা। একটা দীর্ঘশ্বাস মোচন করল। হ্যাঁ। হয় এরকম।

 কি জানি! চিন্তিত, অন্যমনস্ক মনে হলো বৃদ্ধাকে। কম তো দেখলাম না জীবনে। কিন্তু একটা পরিবার এত তাড়াতাড়ি অস্তি। ত্ব হারিয়ে ফেলে, আর কোথাও দেখিনি আমি। শুনিওনি। চোখের সামনে এখনও ভাসে, ওরা ছিল, অনেকেই ছিল। সংসার আলো করে ছিল। এখন কেউ নেই। দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল সব। দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মিসেস হক। কেউ থাকে না। এটাই নিয়ম। মানুষ আসে কেবল চলে যাওয়ার জন্যে। অথচ আমি? আটাত্তর বছর বয়স আমার, পৃথিবীকে দেয়ার মত অবশিষ্ট কিছুই নেই। যা ছিল, অনেক আগেই দিয়ে অবসর নিয়েছি। তবু বেঁচে আছি আমি। অথচ দেখো, যাদের বয়স ছিল, ক্ষমতা ছিল পৃথিবীকে কিছু দেয়ার, তাদের কেউ নেই। কী আজব খেলা ঈশ্বরের! মাঝেমধ্যে তাঁকে বড়ো খেয়ালী মনে হয় আমার। কেন যে এমন উল্টোপাল্টা করেন, ভেবে পাই না। যার সময় হয়নি, তাকে ছিনিয়ে নেন। আর যার কাজ ফুরিয়ে গেছে অনেক আগেই, তাকে ফেলে রাখেন।

স্তব্ধ হয়ে বসে থাকল সবাই। মনটা কেমন করে উঠল মাসুদ রানার। পৃথিবীর আরেক প্রান্তের অজানা-অচেনা এক গ্রাম্য বৃদ্ধার দুঃখে বুকের ভেতরটা টন টন করছে।

আসলে, অনেকক্ষণ পর বলে উঠল নাদিরা, মৃদু কণ্ঠে। সময় বদলে গেছে, মিসেস হক। তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে মানুষের জীবনও ওলোটপালট হয়ে গেছে। আগে যা স্বাভাবিক ছিল, এখন তা স্বাভাবিক নেই।

বুঝি। কিন্তু মেনে নিতে পারি না। দেখ, এত বড় একটা বাড়িতে ভূতের মত একলা পড়ে থাকি আমি। গ্রামের এক মহিলা সপ্তায় একবার আসে, ঘরদোর ঝাড়মোছ করে দিয়ে যায়। ও ছাড়া মাঝেমধ্যে যদি এক-আধজন ট্যুরিস্ট এল তো ভাল, নয়তো একাই থাকতে হয় আমাকে মাসের পর মাস। কথা বলার একজন সঙ্গীও নেই। অথচ ইচ্ছে করলে আমার তিন মেয়েই সপরিবারে থাকতে পারে আমার সঙ্গে। নাতি-নাতনীদের নিয়ে সময় কাটাতে পারি আমি। প্রচুর জমি আছে আমার, চাষ-বাস করে রাজার হালে চলতে পারবে ওরা, অথচ আসবে না।

শহরে কাজ করতে করতে নাকমুখ দিয়ে রক্ত ছোটাবে, ভেজাল খেয়ে আয়ু কমাবে। তবু গ্রামে আসবে না। তোমরা অল্প বয়সী, রক্ত গরম, তোমরা মেনে নিতে পারো এ সব, আমি পারি না। ওখানেই কষ্ট। তোমরা এসেছ বলে ভালই লাগছে আজ আমার। খুব ভাল লাগছে। ক্যানটা শেষ করল বৃদ্ধা। আরেকটা সিগারেট ধরাল রানার বাড়ানো প্যাকেট থেকে। পরমুহূর্তে বুড়ির প্রশ্ন শুনে চেয়ার উল্টে পড়ার দশা হলো ওর।

পুলিসের তাড়া খেয়ে পালাচ্ছ? সরাসরি মাসুদ রানার চোখে। চোখ রেখে প্রশ্ন করল মিসেস হক।

জ্বি! শিরদাড়া সোজা হয়ে গেল ওর।

কাদের তাড়া খেয়ে পালাচ্ছ, পুলিস, না আর কারও?

নড়ছে না কেউ একচুল। জমে গেছে সবাই যার যার আসনে। মাসুদ রানার ধারণা যে কতটা নির্ভুল, বুঝতে পেরে। ভড়কে গেছে নাদিরা। গেল বুঝি ছুটে এত সুন্দর একটা আশ্রয়, ভাবছে সে। এখনই বোধহয় আবার গাট্টি-বোচকা গোল করতে। হবে। কিন্তু নাদিরা জানে না, আরও কত চমক অপেক্ষা করছে সামনে। ওদিকে ভাষা হাতড়াচ্ছে মাসুদ রানা।

গাড়ি থেকে নামানোর সময় একটা সুটকেসের গায়ে ফুটো দেখেছিলাম তখন। কিসের ফুটো ওটা, বুলেটের না?

এবারও মুখ খুলল না কেউ।

কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল বৃদ্ধা উত্তরের আশায়। তারপর ফেঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ঠিক আছে, বলতে হবে না। আর আমি। কিছু একটা সন্দেহ করেছি বলে দুশ্চিন্তাও করতে হবে না। নিশ্চিন্তে থাকতে পারো এখানে তোমরা, যতদিন খুশি। তোমাদের উপস্থিতি ভাল লাগছে আমার। তারচেয়েও বড় কথা, আমার মন বলছে তোমরা অন্যায় কিছু করোনি। যারা অপরাধী, তাদের চেহারা দেখেই চিনতে পারি আমি। তোমাদের কারও মধ্যে। সেরকম কিছু নেই। সে জন্যেই তোমাদের থাকতে দিতে কোন আপত্তি নেই আমার। থাকো তোমরা। আর হ্যাঁ, কাল থেকে আর টাউনে যেতে হবে না তোমাদের। আমার এখানেই খাওয়া-দাওয়া করবে। নতুন মানুষ দেখলে সন্দেহ করবে মানুষ, ফাঁস হয়ে। যেতে পারে খবরটা।

আর তুমি, ফয়েজের দিকে তাকাল মিসেস হক। সত্যি রিচার্ড বা মিথ্যে রিচার্ড, যা-ই হও, একদম অভিনয় করতে পারো তুমি। অভিনেতা হিসেবে থার্ড ক্লাসও নও। খামোকা খোঁড়ার অভিনয় করতে হবে না আর। আমি জানি পায়ে কিছুই হয়নি তোমার। হাসি ফুটল বৃদ্ধার কুড়াল মুখে। এই খুঁড়িয়ে হাঁটো, পরক্ষণেই দেখি সোজা হয়ে হাঁটো।

মুখ ঘুরিয়ে প্রথমে নাদিরা, পরে মাসুদ রানার দিকে তাকাল সে। চমৎকার বীয়ারের জন্যে ধন্যবাদ তোমাকে, সানি। আমি চলি, ঘুম পাচ্ছে খুব। তোমরা বোসো যতক্ষণ মন চায়। ওরা কেউ কিছু বলল না। বলার মত খুঁজে পেল না কিছু। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পার্লারে গিয়ে ঢুকল বৃদ্ধা।

টানা পাঁচ মিনিট পর নীরবতা ভঙ্গ করল নাদিরা। সাংঘাতিক মহিলা তো!

মাসুদ রানা কোন মন্তব্য করল না, ঠোঁট টিপে হাসল কেবল।

ফয়েজই আসলে ডুবিয়েছে, বলল মুত্তাকিম বিল্লাহ। খোঁড়ানোর অভিনয় আমি করলে কিছুতেই ধরতে পারত না মহিলা।

ওরে আমার ইয়েরে! তেড়ে উঠল ফয়েজ আহমেদ। বড় আমার হেনরি ফণ্ডা এসেছেন! সুটকেসের ঘেঁদাটা দেখানোর সময়…

থামো তোমরা, বলল মাসুদ রানা। তোমরা কেউ দায়ী নও এ জন্যে। ওসব পরের ঘটনা। আসলে আমরা এখানে আসামাত্রই মহিলা ব্যাপারটা অ্যাঁচ করেছে। বুঝে ফেলেছে ভেতরে কোন ব্যাপার আছে। আমি যে মিথ্যে বলছি, তখনই টের পেয়েছে সে, অথচ ভান করেছে যেন বোঝেনি।

হা হয়ে গেল বিল্লাহ। অ্যা?

আপনি জানতেন? জানতে চাইল ফয়েজ।

জানতাম।

কি করে? মানে…

কঠিন কিছু নয় কাজটা। মাথা খাটালে তোমাদেরও বুঝতে অসুবিধে হবে না। নাদিরাকে যা বলেছিল, কথাগুলোর পুনরাবৃত্তি করল মাসুদ রানা। অতএব বুঝতেই পারছ, ভুল যা করার, করেছি আমি। আমিই দায়ী এ জন্যে।

আবার চুপ হয়ে গেল ওরা। চিন্তিত।

মহিলার কথা তো সবাই শুনলে তোমরা, কাজেই তাকে নিয়ে চিন্তার কিছু নেই, ওদের আশ্বস্ত করল রানা। আমাদের ব্যাপারে মুখ খুলবে না মিসেস হক। কাজেই ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্তে ভাবতে পারি এখন আমরা। কাল সকালে বেরুব আমি।

কোথায় যাবে? পরিষ্কার উদ্বেগ নাদিরার কণ্ঠে।

জ্যাকসনভিল যাওয়ার ইচ্ছে আছে।

কেন?

প্রথম কাজ বুইকটা খালাস করে আরেকটা গাড়ি জোগাড় করা। হার্ডিভিলে গাড়িটা চোখে পড়ে গিয়েছিল রবার্টোর, রেজিস্ট্রেশন নাম্বার মুখস্থ করে রেখেছে কি না, কে জানে। তোমরাও অবশ্য যাচ্ছ আমার সঙ্গে, কিছুদূর পর্যন্ত।

 মানে! হতভম্ব দেখাল মেয়েটিকে। ফয়েজ আর বিল্লাহও তাকিয়ে আছে।

চিন্তাটা হঠাৎ করেই মাথায় এল, মিসেস হকের নিশ্চয়তা পাওয়ার পর।

কি সেটা?

এতক্ষণে হুইটারের প্রায় সবাই জেনে গেছে আমাদের এখানে আসার কথা, মিসেস হকের বাড়িতে ওঠার কথা। ছোট্ট। শহর, কয়জনই বা থাকে এখানে, কানে কানে ছড়িয়ে গেছে কথাটা। তাই ঠিক করেছি, সবাইকে কাল সকালে আমরা দেখাব যে আমরা চলে যাচ্ছি হুইটার ছেড়ে। এখানে থাকছি না আমরা।

তাতে লাভ?

সোজা। কেউ যদি আমাদের খোঁজ জানতে আসে টাউনে, সবাই বলবে আমরা এসেছিলাম। এক রাত থেকে আবার চলে গিয়েছি।

অথচ?

অথচ আসলে আমরা যাইনি। এখানে ছিলাম, এবং আছি। ব্র্যানসউইক পর্যন্ত এক সঙ্গে থাকব আমরা। ওখান থেকে আরেকটা গাড়ি ম্যানেজ করে সন্ধের দিকে হুইটার রওনা হবে তোমরা, যাতে পৌঁছতে রাত হয়ে যায়। তোমাদের ফিরে আসা কারও চোখে না পড়ে। আর আমি ওখান থেকে বুইক নিয়ে চলে যাব। জ্যাকসনভিলের কাজ সেরে ওটা ওখানকার কোন হোটেলের সামনে রেখে ফিরে আসব।

জ্যাকসনভিলে কি কাজ তোমার?

প্রথম কাজ একটা প্লেন চার্টার করা, মনট্রিয়ল অথবা অটোয়া পর্যন্ত। যদি সেটা সম্ভব হয়, তাহলে কয়েকটা পাথর বিক্রি করতে হবে। কারণ ওদের অ্যাডভান্স দিতে হবে। অথচ এদিকে টাকা তেমন নেই। প্লেন চার্টার করা গেলে অনেক সহজে এবং নিরাপদে তোমাকে এ দেশ থেকে বের করে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। তা যদি কোন কারণে সম্ভব না হয়, একটা কিল কিনে নিয়ে ফিরে আসব আমি।

কিলন কি জিনিস? প্রশ্ন করল ফয়েজ।

সোনা গলানোর ইলেক্ট্রিক চুল্লি। সিগারেট ধরাল মাসুদ রানা। বিল্লাহ আর ফয়েজের দিকে তাকাল। পরশু রাত বারোটা ডেডলাইন। তার মধ্যে যদি ফিরে না আসি, বুঝবে গোলমাল হয়ে গেছে। এক মিনিটও দেরি না করে সরে পড়বে তোমরা। যদি। দেখো রবার্টোকে বাধা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না, এসওএস কল। পাঠাবে শওকতকে। তারপর যা করার ও করবে।

নড়াচড়া ভুলে বসে আছে ফয়েজ আর বিল্লাহ। এসওএস অর্থ চূড়ান্ত আঘাত হানার নির্দেশ, ওরা জানে। নিউ ইয়র্ক এজেন্সির বারোজন বেপরোয়া, দুর্ধর্ষ এজেন্ট বেরিয়ে আসবে তাদের গোপন আস্তানা ছেড়ে। এজেন্সির সুইসাইড স্কোয়াডের সদস্য। তারা ডন পাওলো গার্সিয়াকে যে ভাবে হোক, আটক করবে জিম্মি হিসেবে। প্রয়োজনে তার বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মাক ক্ষতি করে হলেও বাধ্য করবে তাকে রবার্টোকে ফিরিয়ে নিতে।

মাফিয়া আর যা-ই হোক, জাত ব্যবসায়ী। যেখানে বুঝবে লাভ নেই, সেখানে পা-ও এগোয় না ওরা। কাজেই ডন পাওলা যখন দেখবে প্রকাশ্যে সশস্ত্র লড়াইয়ে গড়িয়েছে বা গড়াতে যাচ্ছে ব্যাপারটা, একটা ব্যবসা বাঁচাতে গিয়ে রবার্টো তার আর দশটা ব্যবসাকে মাত্মক হুমকির মুখে নিয়ে ফেলেছে, লোকসানের পাহাড়। জমতে যাচ্ছে, এবং সবচেয়ে বড় কথা, নিউজ মিডিয়ার মাধ্যমে তার পুত্রধনের কীর্তি ফাঁস হয়ে মারাক কেলেঙ্কারি ঘটাতে চলেছে, তখন নিঃসন্দেহে রবার্টোকে ফিরে আসতে বাধ্য করবে সে।

জানা কথা, এই বিপদে ডন পাওলোকে সাহায্য করতে অন্য ডনদের কেউ এগিয়ে আসবে না। কারণ তাদের সঙ্গে পাওলোর। সম্পর্ক বর্তমানে খুব খারাপ। তারা বরং দূর থেকে মজা দেখবে, প্রতিদ্বন্দ্বী একজন কমে যাক, মনে মনে তাই চাইবে।

যেন বহু দূর থেকে কথা বলছে, এমনভাবে বলল ফয়েজ,। মালপত্র, আর্মস সব কি করব? সঙ্গে নিয়ে যাব?

সুটকেসগুলো নিয়ে যাব শুধু। আর সব বাড়ির সামনের ওই খালের পাশে মাটির নিচে পুঁতে রেখে যাব ভাল একটা জায়গা দেখে। রাত আরও গভীর হোক, তারপর। চোখ কোঁচকাল মাসুদ রানা।

ব্যাপারটা লক্ষ করল ফয়েজ। আর কিছু?

নাদিরার দিকে ফিরল ও। আমি টেলিফোন করে তোমাকে চাইতে পারি। হয়তো বলব, সব কিছু নিয়ে অমুক জায়গায় চলে এসো, কোন অসুবিধে নেই। সেক্ষেত্রে যদি কেবল নাদিরা সম্বােধন করি, তাহলে বুঝবে সত্যিই সব ঠিক আছে। আর যদি নামের আগে মিস যোগ করি, বুঝবে ঘাড়ে পিস্তল ঠেসে ধরে টেলিফোন করানো হচ্ছে আমাকে দিয়ে। সেক্ষেত্রেও এসওএস কল পাঠাবে তোমরা। শেষ বাক্যটা ফয়েজ আর বিল্লাহর উদ্দেশে বলল ও।

পাথর হয়ে বসে থাকল নাদিরা। এতক্ষণ ভুলেই ছিল যেন কী মাক বিপদে জড়িয়ে ফেলেছে সে এই সিংহ হৃদয় যুবককে। কত বড় এক হুমকির মুখে এনে ফেলেছে মাসুদ রানা এবং তার সঙ্গীদের। বুক কেঁপে উঠল নাদিরার, যদি কিছু ঘটে যায় মাসুদ রানার? আর ভাবতে পারল না সে, বাষ্পরুদ্ধ হয়ে গেছে দৃষ্টি। বুকের ভেতর শুরু হয়ে গেছে অজানা আবেগের উন্মত্ত মাতামাতি।

রানা, একটা কথা বলব? কোন রকমে উচ্চারণ করল সে।

 অবশ্যই! বলো।

মালপত্র যা আছে, সব ফিরিয়ে দিই আমরা রবার্টোকে। তাহলে নিশ্চই আমাদের পিছু লাগা বন্ধ করবে ও। ফিরে যাবে।

যাবে না। তুমি বন্ধু সেজে ওকে বোকা বানিয়েছ, আমি ওর ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করেছি। কাজেই আমাদের রক্ত দিয়ে গোসল না করা পর্যন্ত রবার্টো শান্ত হবে না। নো ওয়ে, নাদিরা। তুমি ওকে ছেড়ে দিলেও আমি ছাড়ব না। রবার্টো গার্সিয়ার ধ্বংস না দেখা পর্যন্ত শান্তি পাব না আমি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *