১৬-১৮. কার্লকে বাঁচাতে যথাসাধ্য চেষ্টা

কার্লকে বাঁচাতে যথাসাধ্য চেষ্টা করছে ডাক্তার। সুচিকিৎসার জন্য রোগীকে সন্ধ্যার আগেই শহরে নেয়া দরকার এই সিদ্ধান্ত দেয়ায় ওকে বাকবোর্ডের পাটাতনে শুইয়ে ধীরগতিতে রওনা হয়েছে ওরা। চালকের আসনে বসেছে গ্রীন।

পরীক্ষায় বোঝা গেছে কার্লের বুক ভেদ করে বেরিয়ে গেছে গুলি, গুরুত্বপূর্ণ কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গে চোট লাগেনি। 

ওর কপাল ভাল, ক্ষতে ব্যান্ডেজ বাঁধতে বাঁধতে বলেছে ডাক্তার। রক্তও বেশি হারায়নি। তবে এভাবে আঘাত লাগাটাই একটা মারাত্মক ধাক্কা, বিশেষ করে এরকম হালকা-পাতলা শরীরে।

ওরা যখন শহরে পৌঁছাল তখন সন্ধ্যে। ডাক্তারের বাসার দোতলায় ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়া হলো কার্লকে। মুমূর্ষ রোগীদের জন্য কয়েকটা বাড়তি ঘর আছে ওখানে।

হ্যাঁ, এবার ওর ওপর নজর রাখতে পারব আমি, বলে গ্রীনের উদ্দেশে ফিরল ডাক্তার। আর তোমার প্রেসক্রিপশন-টানা বারো ঘণ্টা ঘুম। মনে হচ্ছে এটা তোমার দরকারও।

তাই, অক্তার।

গ্রীন আর মারিয়া ফিরে গেল বাকরোর্ডে। স্টীলডাস্ট, কার্লের সোরেল দুটোই বাধা আছে পেছনে। মেয়েটাকে সীটে উঠতে সাহায্য করল গ্রীন, তারপর নিজে বসল চালকের আসনে। মার্শালের অফিসের পাশ দিয়ে যাবার সময় মক ভেতরে আছে দেখে রাশ টানল ও, নেমে লাগামটা মারিয়ার হাতে দিল।

তুমি যাও টেরিলের কাছে। মারিয়ার উরুতে চাপড় মারল গ্রীন। চট করে পা টেনে নিল,মেয়েটা, চোখ জ্বলে উঠল। গ্রীন হাসল একগাল। বাড়ি গিয়ে বিশ্রাম নাও। মকের সাথে কথা আছে আমার।

পরে আসছ? খাবে না?

আজ রাতে মনে হয় পারব না। খুব ক্লান্ত, মাথাটাও ব্যথা করছে। হোটেলেই কিছু একটা খেয়ে শুয়ে পড়ব।

নরম হয়ে এল মারিয়ার দৃষ্টি। মৃদু গলায় বলল, তুমি আসায় বেঁচে গেছি। খুব ভয় পেয়েছিলাম।

তুমি একটা বনবেড়ালি-সহজে মরবে না। তা হলে যাও এবার। অনেক ধকল গেছে তোমার ওপর দিয়ে। তা ছাড়া, খদ্দেররাও হয়তো অপেক্ষা করছে তোমার জন্য।

কর্মচারীরাই খুলবে ক্যান্টিনা। রাধা-বাড়া ওরাই করে, আমার না থাকলেও চলে।

যাই হোক, তোমাকে থাকতে হবে ওখানে, না হলে আমি আসব না।

সরে দাড়াল গ্রীন। অবাধ্য ঘোড়ার মত ওকে ভেংচি কাটল মারিয়া, হাসতে হাসতে চলে গেল। সাঁঝের অন্ধকারে ওকে মিলিয়ে যেতে দেখল গ্রীন, তারপর ফুটপাত মাড়িয়ে মার্শালের অফিসে গিয়ে ঢুকল।

ভ্রূকুটি করে গ্রীনের দিকে তাকাল মক। কার্ল বেঁচে আছে?

 এখনও। এইমাত্র নিয়ে এলাম ওকে।

মাথা ঝাঁকাল মার্শাল। দেখেছি তোমাদের। চুপ করল সে। হার্ভে মার গেছে। হালাম গুলি করেছিল।

অ্যাংকর র‍্যাঞ্চে কী ঘটেছে গম্ভীর মুখে গ্রীনকে জানাল মক। হালাম মদ খাচ্ছিল। ওর আচরণ একটু উদ্ভট মনে হয়েছে আমার কাছে। অবশ্য নেশা ছুটে গেলে হয়তো কেটে যাবে। ঠিক জানি না। এরকম অবস্থায় ওকে কখনও দেখিনি আমি। ও খুব শক্তিশালী-কী যেন শব্দটা?–দাম্ভিক মানুষ, নিজের নিয়মে চলে। এখন বদলে গেছে। তোমার কারণে, আমার বিশ্বাস।

আমি আবার কী–

এখানে আসার পর থেকেই অনবরত ওকে নাজেহাল করছ তুমি। হালামের মত মানুষের পক্ষে এটা হজম করা কঠিন। ওর ধারণা এখানে থাকার কোন অধিকার নেই তোমার। সবই তো জানো তুমি, প্রথম লোক লাগিয়ে মার দিয়েছে তোমাকে, তারপর খুন করার জন্য স্যাম ট্যানারকে পাঠিয়েছিল। একটাতেও সফল হয়নি

এখন ভয়ঙ্কর খেপে উঠেছে তোমার ওপর। কী করবে বলতে পারছি না, তবে সাংঘাতিক কিছু একটা করে বসতে পারে, যেটা হয়তো কল্পনাও করতে পারছ না তুমি। আমি হলে এখনই শহর ছাড়তাম। এখানে তোমার কাজ শেষ হয়েছে। কার্লকে এ অবস্থায় নিয়ে যেতে পারবে না টাওসে, আর তা ছাড়া ও পালাবে না আর।

জানি, শান্ত কণ্ঠে বলল গ্রীন। মারিয়া আমাকে বলেছে ও আত্মসমর্পণ করতেই আসছিল। বিবেকের দংশনে ভুগছে ছেলেটা। মনে করছে তার অপরাধের শাস্তি পাওয়া উচিত। এটা এখন একটা নৈতিক দায়িত্ব হয়ে উঠেছে ওর কাছে। আমার নিজেরই শ্রদ্ধা আসছে ছেলেটার ওপর।

ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মক। নাক চুলকে ঝট করে একবার তাকাল গ্রীনের দিকে তারপর অন্ধকার জানালার পানে চোখ ফেরাল।

আমার কী মনে হচ্ছে জানো? ইস্তফা দিই। দেয়াই উচিত।

প্রতিবাদ করতে গিয়েও মত পাল্টাল গ্রীন। আবার এর উদ্দেশে চোরা চাহনি হানল মক, তারপর অন্যদিকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল।

পুলিসের ব্যাজ কেউ ঝোলালে তার কর্তব্য একে সম্মান করা, ধীরে ধীরে শুরু করল মক, নিজের মনের কথা খুলে বলতে চাইছে। এটা পরার যোগ্যতা থাকা উচিত। আমার তা ছিল, আজকের আগে পর্যন্ত।

গ্রীন কাল ওর দিকে, জানে কী বলছে ও, কিন্তু কোন মন্তব্য করল না।

হার্ভেকে গ্রেফতার করতে চাইলাম আমি। ও আমাকে চ্যালেঞ্জ করল, শ্লেষভরা কণ্ঠে বলে চলে মক। বলল ও আমাকে গুলি করে ফেলে দেবে স্যাডল থেকে। পারতও তা। হালাম ওই সময় এসে না পড়লে কী করতাম, আমি নিজেই জানি না। হয়তো চলে আসতাম পালিয়ে। খোদা জানে, আমি মরতে চাই না; কিন্তু হালাম যদি তখন না আসত আর আমি আমার কর্তব্য পালন করতে চাইতাম, নির্ঘাত মারা পড়তাম। গ্রীনের দিকে তাকাল মার্শাল, স্পষ্ট ভাষায় বলল, আমি বোধহয় এ কাজের যোগ্য না, অথচ সেটা মেনে নিতেও কষ্ট হচ্ছে।

অল্পদিনের পরিচয় ওদের, কিন্তু একই পেশার লোক হওয়ায় পরস্পরকে বোঝে। গ্রীন চাঁছাছোলা কণ্ঠে জবাব দিল, খামোকা উতলা হচ্ছ। এদ্দিন যোগ্যতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছ তুমি; আজ হার্ভেকে ধরার আগেই হালাম ওকে মেরে ফেলার মানে এই নয় তোমার যোগ্যতা শেষ হয়ে গেছে। কাজেই

জেনেশুনে মরতে যেতাম? বাধা দিয়ে ম্লান গলায় বলল মক।

তাতে কী? এ কাজে ওরকম ঝুঁকি আছেই, তাই না? তুমি কি মনে কর তুমিই হতে প্রথম মাশল যে গুলি খেত? ঝেড়ে ফেল এসব ফালতু ভাবনা। আমার মনে হয়, যা ঘটেনি তা নিয়ে অযথা চিন্তা করছ তুমি।

মক শিরদাঁড়া সোজা করল। হয়তো তাই। মোকাবেলা না করা পর্যন্ত এসব ব্যাপারে কিছু বলা শক্ত। তা ছাড়া মানুষের বয়স যত বাড়ে, ততই সে হিসেব কষে চলাফেরা করে। যদিও কোন অর্থ হয় না এর। একজন তরুণ, যার সারাটা জীবনই ধরা আছে সামনে, সে পরোয়া করে না কোনকিছুর। অথচ আমরা বুড়োরা খুব হুঁশিয়ার কোন মানে হয় না এর।

দুবার বললে কথাটা। ঢের হয়েছে। গ্রীন উঠে দাড়াল। আজেবাজে চিন্তা করে নিজেকে আর কষ্ট দিও না। কিছু হয়নি তোমার! আমি যাই, আমার এখন একটু ঘুম দরকার। শুভ রাত্রি, মার্শাল।

মক কোন জবাব দিতে পারার আগেই বেরিয়ে গেল গ্রীন। হোটেল কামরায় ফিরে এসে কাপড়চোপড় পাল্টে বিছানায় গিয়ে ঢলে পড়ল ঘুমের কোলে।

.

গ্রীন যখন জেগে উঠল তখন সকল, রোদে ঝলমল করছে চারদিক। তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে বিছানা ছাড়ল সে, বেসিনে পানি ভর্তি করে তোয়ালে ডুবিয়ে দিল তাতে, তারপর দিগম্বর হয়ে ভেজা তোয়ালে দিয়ে ভালমত ঘষল সারা গা। গোসল সেরে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল ও, হাই তুলল কয়েকবার। তেমন জরুরি কোন কাজ ছিল না হাতে, কাজেই বিছানায় ফিরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল আবার।

ওর কাঁধে কিল মারল কেউ একজন, চোখ মেলে জানালার শার্সিতে গোধূলির রঙ খেল গ্রীন। পাশ ফিরল ও, হাই তুলে তাকাল, মারিয়ার দিকে। এর ওপর ঝুঁকে পড়েছিল মেয়েটা, ঢোলা জিপসি ব্লাউজের গলার ফাঁক দিয়ে ওর শরীরের অনেকটাই দেখতে পেল গ্রীন। ঢোক গিলল। ঢেউ খেলানো কালো চুলগুলো পিঠের ওপর বিছিয়ে দিয়েছে মারিয়া। গ্রীন এর কমনীয় মুখে উৎকণ্ঠা দেখল।

শরীর ঠিক আছে তোমার? সারা রাত ঘুমিয়েছ, দিনেও। অসুখ-বিসুখ করেনি তো?..

আলসেমি লাগছে, গ্রীন হাসল। অবশ্য এরকম কখনও হয় না আমার। কার কাছে শুনলে এত ঘুমাচ্ছি?

নীচতলায় : ঝাড়ুদার ঘর পরিষ্কার করতে এসে ফিরে গেছে।

মারিয়ার অহেতুক উকণ্ঠায় না হেসে পারল না গ্রীন, জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নিল ওকে। চেঁচিয়ে উঠে বাহুপাশ ছাড়বার প্রয়াস পেল মেয়েটা, আদরের চড় মারল ওর গালে।

মুখ বিকৃত করল গ্রীন, মারিয়াকে ছেড়ে দিল।

পরে আমার মাথায় মারতে পারবে তুমি। তবে এখন ব্যথা সহ্য করতে পারব না আমি।

সহসা ভয়ের ছায়া ঘনাল মারিয়ার চেহারায়, চোখ বড় বড় হয়ে গেল।

ব্যথা দিয়েছি? গ্রীনের গালে নিজের গাল ঘষল মারিয়া। ওহ, জেমস, আমি সত্যিই খুব দুঃখিত।

এই প্রথম আমার নাম ধরে ডাকলে তুমি। এর আগে ছিল শুধু গ্রিংগো।

তোমাকে আমি জেমস বলেই ডাকব-জেমস, জেমস, জেমস, অস্ফুট স্বরে জপল মারিয়া। চুমু দিল ওর গালে।

শোবে না?

ঝট করে উঠে দাঁড়াল মেয়েটা, দুচোখে আগুন ঝরিয়ে পিছিয়ে গেল, ক্ষিপ্ত বনবেড়ালির মত এমনভাবে মাখা ঝাঁকাল যে একগুচ্ছ চুল এসে পড়ল কপালে।

কেন শোব? প্রেম করতে? গ্রিংগোর সাথে? হাহ্! চেঁচিয়ে উঠল ও, মাথা ঝাঁকাল আবার। এর চেয়ে বরং ষাড়ের সঙ্গে প্রেম করা ভাল। না!

বিছানা থেকে ওকে স্বর্গীয় হাসি উপহার দিল গ্রীন, হাত বোলাল নিজের লোমশ বুকে।

অন্য সময়? শিগগিরই?

ও হো হো, শখ কত, ঠোঁট ওল্টাল মারিয়া। আমি তোমাকে ঘৃণা করি গ্রিংগো! আজ রাতে না, কাল না, কক্ষনো না। কী ভাব তুমি? গ্রিংগোরা বললেই আমি পটে যাই?

না। আমার কাছে আসবে-আসতে চাও বলে।

চাই না। এবার তুমি কাপড় পাল্টে নাও, তারপর আমরা কার্লকে দেখতে যাব।

আচ্ছা! তবে কিনা আমি জন্মদিনের পোশাকে আছি, তুমি হয় পেছন ফিরে থাক, নয়তো অপেক্ষা কর নীচে গিয়ে।

বিছানা ছাড়ার প্রয়াস পেল গ্রীন, মাগো বলে একটা চিৎকার দিয়ে দৌড়ে দরজার কাছে চলে গেল মারিয়া, ঝট করে ওর পানে একবার তাকিয়েই কপাট খুলল।

নীচে আছি আমি।

বেরিয়ে গেল ও। হো-হো করে একচোট হাসল গ্রীন, পোশাক পরতে শয্যা ত্যাগ করল। পরে, ডাক্তারের বাসায়, বলা হলো ওদের কার্ল এখন খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমাচ্ছে। ওর ফাড়া কেটে গেছে সেরে উঠবে, শুধু একটু সময়ের ব্যাপার। বাইরে এসে ফুটপাত ধরে হাঁটতে লাগল ওরা, সাঁঝের আলোয় গ্রীনের দিকে তাকাল মারিয়া।

খেতে আসবে না?

আসব। তবে আগে দাড়ি কামাতে হবে, আজ রাতে এক মেয়ের কাছে যাচ্ছি আমি।

থমকে দাঁড়াল মারিয়া, চকিতে সজাগ হয়ে উঠেছে।

কোন মেয়ে!

তুমি।

ওহ্। গ্রীনের কোমর জড়িয়ে ধরল শ্যামাঙ্গিনী। হোটেলের দিকে এগোচ্ছে ওরা, রাস্তায় পরিচিত কারোকে দেখতে পেলে আলতো করে মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মান জানাচ্ছে। আমি ভাবলাম কোন সাদা চামড়ার মেয়ে হয়তো।

আমার জন্য এক শ্যামলা মেয়ে অপেক্ষা করছে।

 কক্ষনো না কোন গ্রিংগোর জন্য আমি অপেক্ষা করি না।

ঠিক। কিন্তু একবার যদি তোমার ওই সুন্দর মাথায় ঢুকত

ঝট করে দাঁড়িয়ে পড়ল মারিয়া, তাকাল ফ্যালফ্যাল করে।

আমি? সুন্দর?

হ্যাঁ, তুমি, মৃদু গলায় জবাব দিল গ্রীন। খুব সুন্দর।

ওহ না, আমি না, বলল মারিয়া, হাসছে-গর্বের হাসি। আমি একটা বনবেড়ালি।

তোমার যখন খুশি আঁচড় কেট! মুচকি হাসল গ্রীন। মারিয়াও হেসে উঠল, গ্রীনে বাহু চেপে ধরল আরও শক্ত করে।

হোটেলের সামনে এসে পড়ল ওরা। বারান্দায় বসে আড্ডা মারছে, অনেক লোক। টুপি খুলে গ্রীন বিড়বিড় করে বলল, আধঘণ্টার মধ্যেই আসছি।

এস, গম্ভীর কণ্ঠে বলে বিদায় নিল মারিয়া। দোতলায়, নিজের কামরায় ফিরে গেল গ্রীন, জামা খুলে দাড়ি কমাবার সরঞ্জাম নিয়ে বসল। শ্যামাঙ্গিনীর কথা মনে পড়তে আপনমনে হাসল ও। মারিয়া। মিষ্টি মেয়ে! ছন্নছাড়া পুরুষকে বাধতে জানে।

 দাড়ি কামানোর পর, ধোঁয়া জামাকাপড় পরে নীচে নেমে এল গ্রীন, সন্ধ্যার রাস্তায় নেমে ক্যান্টিনার উদ্দেশে হাঁটা ধরল।

ও ঢুকতেই বারটেন্ডার জিজ্ঞেস করল, সিনর গ্রীন?

হ্যাঁ, আমি। মিস গার্সিয়া আছে ভেতরে?

ম্লান মুখে ওর হাতে একটা চিরকুট দিল বারটেন্ডার। সিনোরিটা ফেরেনি। এক লোক দিয়ে গেছে এটা, আগে কখনও দেখিনি। বলেছে, তোমাকে এটা দিতে।

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বারটেন্ডারের দিকে তাকাল গ্রীন, তারপর ভুরু কুঁচকে চিরকুটটা পড়লঃ

মেক্স ছুকরিকে ফেরত চাইলে আজ রাতেই সেজে আসবে।

গুম মেরে দাঁড়িয়ে রইল গ্রীন, অনুভব করছে ভয়ঙ্কর ক্রোধ জেগে উঠছে ওর মাঝে। মকের সাবধানবাণী মনে পড়ল ওর: কী করবে, বলতে পারছি না, তবে এমন একটা কিছু যা তুমি হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না।

তা হলে ওকে ওরা ধরে নিয়ে গেছে, গ্রীন ভাবল, বারটেন্ডারের উদ্বিগ্ন চোখের দিকে তাকাল ও।

সিনোরিটা ঠিক আছে? শঙ্কা ঝরে পড়ল কৃষ্ণকায় লোকটার গলায়।

ঠিক হয়ে যাবে। ধন্যবাদ, অ্যামিগো। এই চিঠি যে নিয়ে এসেছিল তুমি তবে চেন না তাকে?

না। খুব মোটা। বেঁটে, আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু অচেনা।

হাচ, গ্রীন ভাবল; অবশ্যই হাচ। দশাসই দাম্ভিক লোকটার চেহারা স্মরণ করল ও। দুবার ওকে ধরাশায়ী করেছিল সে-দ্বিতীয়বার শৌচাগারে। মারিয়াকে তা হলে ধরে নিয়ে গেছে ওরা; ওকে ফাঁদে ফেলার জন্য টোপ হিসেবে ব্যবহার করছে মেয়েটাকে।

এখন ওরা আমার অপেক্ষায় থাকবে; জানে, আমি নির্দ্বিধায় গিয়ে পা দেব ওই ফাঁদে।

কতজন লোকের মোকাবেলা করতে হবে ওকে? ভার্জিল রীভ থাকবে, সন্দেহ নেই; রীড তার স্যালুন ভাঙচুর করার জন্য মনেপ্রাণে ঘৃণা করে ওকে।

হাচ থাকবে, চেষ্টা করবে ফ্লিন্টের মৃত্যুর বদলা নিতে। আর থাকবে হালাম নিজে, এবং হয়তো আরও দু-তিনজন।

উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে গ্রীনকে জরিপ করছিল বারটেন্ডার। বলল, আমরা চাই না সিনোরিটার কোন ক্ষতি হোক। আমাদের যদি কিছু করার থাকে–

চিন্তা কর না, অ্যামিগো। এটা আমার দায়িত্ব।

বাইরে এসে লিভারি স্ট্যাবলের দিকে দ্রুত পা চালাল গ্রীন। মারিয়া ফাঁদে পড়েছে মনে হতেই খুন চড়ে যাচ্ছে ওর মাথায়, কিন্তু বুদ্ধি হারাচ্ছে না।

ওখানে গিয়ে ওকে উদ্ধার করে আনবে সে। হ্যাঁ, তাই, মনে মনে নিজেকে বলল গ্রীন। ওকে ফিরিয়ে দাও আমার কাছে–ও আমার।

১৭.

দীর্ঘ ঘটনাবহুল জীবন ভার্জিল রীডের। সহজে ভয় পাবার কে সে নয়। বারে সামনে অস্থিরভাবে হালামকে পায়চারি করতে দেখে এখনও ভয় পাচ্ছে না সে, কিন্তু গরু ব্যবসায়ীর অস্বাভাবিক রকমের উজ্জ্বল চোখ, ছেড়াখোড়া খ্যাপাটে হাসি আর স্বগত সংলাপে অস্বস্তি বোধ করছে।

হারিকেনের হলুদ আলোয় হালামের কপালে ঘামের ধারা দেখতে পাচ্ছে সে। সাহায্যের আশায় আজ বিকেলেই হালাম এসেছে এখানে। রীড জানত না মেক্সিকান মেয়েটিকে অপহরণ করতে চায় অ্যাংকর মালিক; জানলে সে অনুমোদন করত না ব্যাপারটা, এমনকী ওকে উদ্ধার করতে এসে জেমস গ্রীন মরার ঝুঁকি নেবে এটা বোঝার পরেও না।

গ্রীনের মৃত্যুতে তৃপ্তি পাবে রীড; স্যালুনের ভাঙা জানালার দিকে তাকালে ওর চোখের সামনে ভাসে কীভাবে ওই লোক তার সমস্ত বোতল চুরমার করে দিয়েছে। তখন উন্মত্ত ক্রোধ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে রীডের মাঝে! হ্যাঁ, তার সামনে মেঝের ওপর গ্রীনের লাশ পড়ে থাকতে দেখলে আনন্দিত হবে সে।

যাই হোক, গ্রীনের বিরুদ্ধে তারা মোট চারজন, তাকে ধরে। আস্তাবলে অসল্যারের সঙ্গে রয়েছে হাচ। আছে নতুন আমদানি তুর্ক। একতাড়া ডলার খরচ করে লোকটাকে কিনে নিয়েছে হালাম। তুর্ক পালিয়ে বেড়াচ্ছে; ফেরারি লোকের চেহারা দেখলেই চিনতে পারে ভার্জিল রীড।

বারে এসে নিজের গ্লাসে মদ ঢালল হালাম। রীডের দিকে তাকাল সে, একপাশে রাখা কাটাবন্দুকটা দেখল। বন্দুকটা তুলে নিল হালাম, নিশানা তাক করে জোড়া ট্রিগার টেপার ভান করল, দুটো ব্যারেলই ওর পেটে খালি করতে চাই আমি, ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল অ্যাংকর মালিক। তারপর দেখব ওর চিৎকার।

দেখি, গানটা দাও আমাকে, বলল, রীড। প্রয়োজন হলে তোমার নিজের বন্দুক ব্যবহার কর। তবে দুটো বাকশট লাগলে বাছাধনকে আর চিৎকার করতে হবে না-এমনিতেই ঝাঁঝরা হয়ে যাবে।

বিড়বিড় করে হালাম বলল কিছু। হার্ভে নামটা কানে গেল রীডের। গতকাল তার ফোরম্যানকে খুন করার পর থেকে ওই নামটা ঘুরছে গরু ব্যবসায়ীর মাথায়। হালামের স্বগতোক্তি থেকে একটু-একটু করে ব্যাপারটা জেনেছে রীড; বুঝেছে র‍্যাঞ্চার প্রকৃতিস্থ নেই।

আচমকা হনহন করে দরজার কাছে হেঁটে গেল হালাম, চৌকাঠে ঠেস দিয়ে রাখা, রাইফেলটা তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলল রীড। ছাতের দিকে অস্বস্তিভরে তাকাল সে, ছড়িতে ভর দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে দোতলায় উঠে গেল পেছনের সিঁড়ি বেয়ে, কষ্টেসৃষ্টে একেকটা ধাপ টপকাচ্ছে।

 শেষ ধাপে পৌঁছে হাঁপাতে লাগল রীড, ছড়িতে ভর রেখে জিরাল কিছুক্ষণ দেয়ালে বসানো ছোট্ট কুপির আলো ওর পাকা বাবরি চুলের জট আর তোবড়ানো গালে প্রতিফলিত হয়ে চকচক করছে। তারপর একসময় ডানের প্রথম দরজাটার দিকে এগোল সে। তালা খুলে ফিরে এল সিঁড়ির মাথায়, কুপি নিয়ে ঘরে ঢুকল। শতরঞ্চি বিছানো একটা লোহার খাটের ওপর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে মারিয়া, মুখে কাপড় গোঁজা যাতে চিৎকার করতে না পারে।

স্বভাবসিদ্ধ জ্বলন্ত দৃষ্টিতে ওর পানে তাকাল মেয়েটা, ঘৃণা আর আক্রোশে মুখ বিকৃত করল।

রুক্ষ সুরে রীড বলল, কেমন আছ মেয়ে?

হিসহিস একটা শব্দ করল মারিয়া, মুহূর্তের জন্য চোখ সরাচ্ছে না রীডের ওপর থেকে। ওই দৃষ্টির সামনে অস্বস্তি বোধ করল বুড়ো। ও জানে অকটিও এবং তার আশপাশে প্রচুর বন্ধুবান্ধব আছে মেয়েটার, এখানে যদি ওর কোন ক্ষতি হয় চড়া মশুল গুনতে হবে তাকে বিশেষ করে মেক্সিকানরা মরণকামড় দেবে।

তবে ভরসা একটাই: হালাম রয়েছে। মেক্সিকানদের সে দুচোখে দেখতে পারে না, মেষপালক বা তার চেয়েও খারাপ কিছু বলে গালি দেয়। মেয়েটাকে ধরে এনেছে, সম্ভবত গ্রীনের সাথে মাখামাখি আছে বলে। হালামের বোধহয় চোখ পড়েছে ওর ওপর, মনে মনে ভাবল ভার্জিল রীড। বিছানার সাথে মেয়েটাকে বাঁধার সময় ওর আচরণে লালসা দেখতে পেয়েছে সে।

সেরকম কিছু ঘটলে দেশ ছাড়তে হবে হালামকে, নইলে মেক্সিকান পুরুষরা ছাড়বে না ওকে, খুঁজে বের করে ওদের ধারাল ছুরি দিয়ে ফেড়ে ফেলবে ওর পেট। মেক্সিকান পুরুষরা ভীষণ আত্মাভিমানী, ওদের মা-বোনদের বেইজ্জতি সইতে পারে না।

ঠিক হয়ে যাবে সব, রুক্ষ সুরে মারিয়াকে সান্ত্বনা দিল রীড। গ্রীন এলেই তোমাকে ছেড়ে দেবে।

অপলকে ওর পানে চেয়ে রইল মারিয়া। দায়সারাভাবে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বেরিয়ে এল রীড, দরজা টেনে বন্ধ করে দিল পেছনে।

আচমকা অন্ধকার হয়ে গেল ঘর। বাঁধন ছেঁড়ার চেষ্টা করল মারিয়া। জানে কোন ফল হবে না, তবে এতে করে অন্তত ব্যস্ত থাকতে পারবে একটা কিছুতে, দুশ্চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়বেনা। তবু, যখনই ভাবছে ফাঁদে পা দিতে আসছে প্রীন, তখনই পাষাণভার চেপে বসছে ওর বুকে।

রীড বলেছে বটে ঠিক হয়ে যাবে সব কিন্তু, মারিয়া নিশ্চিত, গ্রীন বাঁচবে না-সেও। একবার অপহরণ করে, ওকে ছেড়ে দেয়ার মত ঝুঁকি নিতে পারবে না হালাম। স্রেফ গুম হয়ে যাবে সে, এবং হপ্তাখানেকের মধ্যেই তার কথা ভুলে যাবে লোকে। ওর ব্যাপারে ভাববে এমন কোন নিকটাত্মীয় নেই ওর, শুধু দু-চারজন, বন্ধুবান্ধব, কিছুদিন খোঁজ করেই হাল ছেড়ে দেবে তারা।

ভুল, অধৈর্য সুরে হঠাৎ নিজেকে বলল মারিয়া। গ্রিংগো গ্রীনের ওপর ভরসা রাখা উচিত তোমার। একে বিশ্বাস করতে পার, সত্যি। অন্ধের মৃত দে পা দেবার লোক ও না। বিশ্বাস রাখ।

সহসা একধরনের সাহস বোধ করল মারিয়া, হৃতশক্তি ফিরে পেল! ক্যান্টিনা থেকে মাত্র কয়েকটা বাড়ি দূরে ওকে পাকড়াও করে হালাম আর হাচ নামের এক লোক। বাধা দিতে চেষ্টা করেছিল সে, পারেনি। একটা ছালা দিয়ে ওর মুখ বেঁধে ফেলে ওরা যাতে চিৎকারে আওয়াজ ঢাকা পড়ে যায়। তবু আপ্রাণ লড়েছিল ও, কিন্তু হালাম ওর মাথায় আঘাত করতে প্রায়, অজ্ঞান হয়ে পড়ে। তারপর ওকে আড়াআড়িভাবে নিজের স্যাডলে তুলে নেয় হালাম। এর পরের ঘটনা দুঃস্বপ্নের মত। নোংরা, ছালার ভেতর দম আটকে আসছিল ওর। শক্ত করে ওকে এক হাতে স্যাডলে ধরে রেখে দ্রুতগতিতে ঘোড়া ছোটাল হালাম। তারপর ও যখন ক্রুদ্ধভাবে হাত-পা ছুঁড়তে শুরু করে তখন বসার সুযোগ দেয় ওকে। এক হাতে ওর কোমর জড়িয়ে ধরে ছুটতে থাকে হালাম। হাচ ওদের পাশাপাশি ছুটছিল। কয়েক ঘণ্টা পর সেজে পৌঁছায় ওর এবং হালাম তাকে বেঁধে রাখে এখানে। তখন তার মনে হচ্ছিল সমস্ত শক্তি বুঝি হারিয়ে ফেলেছে সে।

 অচিরেই আসবে গ্রীন, আস্থা রাখা উচিত তার। নিঃসাড়ে পড়ে রইল, মারিয়া, বুক ধড়ফড় করছে, মুখ বাঁধা থাকায় কষ্ট হচ্ছে শ্বাস নিতে, পট্টিটা ভিজে গেছে লালায়। চোখ বুজল মারিয়া, বাজুর সঙ্গে বাধা হাত দুটো ঢিলে করে দিল; ওর পা দুটোও বাধা, অসাড় হয়ে গেছে।

এমনভাবে বাঁধব যেন ছুটতে না পারিস, খোদার কসম! নির্দয় ব্যবহার করেছে হালাম, অকারণে ওকে ব্যথা দিচেছ। ভার্জিল রীড তখন উপস্থিত না থাকলে আর কী ঘটাত কার্লের বাবা ভাবতে গেলেই ওর গা শিউরে উঠছে।

কার্ল এখনও বেঁচে আছে কিনা জানে না মারিয়া কায়মনোবাক্যে কামনা করল যেন থাকে। তারপর শান্ত হয়ে পড়ে রইল ও, কান খাড়া, ঘোড়ার খুরের শব্দ, গুলির শব্দ শুনতে চেষ্টা করছে-এমন কোন আওয়াজ যা থেকে বুঝতে পারে গ্রীন এসেছে তাকে উদ্ধার করতে।

.

সন্দেহ নেই এটা একটা ফাঁদ, সেজের রাস্তায় জোরকদমে ছুটতে ছুটতে কথাটা আবারও ভাবল গ্রীন। দূরে স্যালুনের বাতি দেখতে পাচ্ছে সে, সাবেক মাইনিং ক্যাম্পের একমাত্র বাতি ওগুলো।

স্যালুনেই মারিয়াকে আটকে রাখবে ওরা, দোতলার একটা ঘরে। রাস্তার এ মাথায়, আস্তাবলের কাছে, পাহারায় থাকবে এক লোক, আরেকজন থাকবে অপর প্রান্তে-যদি আদৌ সেরকম কারোকে জোগাড় করে থাকে হালাম।

 ঘোড়ার গতি হাঁটার পর্যায়ে নামিয়ে আনল গ্রীন, গতযাত্রায় যে গিরিখাত ধরে সে দ্বিতীয় বার মাইনিং ক্যাম্পে ঢুকেছিল সেদিকে এগোল।

একটু বাদে স্যাডল থেকে নামল সে, ঘোড়াসমেত পায়ে হেঁটে স্যালুন ছাড়িয়ে বেশ কিছুদূর চলে এল। লাগামের খুঁটাটা মাটিতে পুঁতে রেখে, খাড়াই বেয়ে গিরিখাতের কিনারে উঠল গ্রীন, চোখ কুঁচকে তাকাল, বাড়িঘরের অন্ধকার কাঠামোগুলোর দিকে। ছায়ার ভেতর যা খুঁজছিল, খানিক বাদে দেখতে পেল সে। রাস্তার শেষ মাথায় অস্থিরভাবে পায়চারি করছে এক রাইফেলধারী!

একটা ঝুপড়ির আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে দীর্ঘ ঢাল বেয়ে কারবাইন হতে গলিতে নামল গ্রীন। গোটা দুতিনেক ঝুপড়ি পেরিয়ে চলে এল গলির মুখে, উঁকি মেরে দেখল লোকটাকে। হাচ নয়, এ বেশ লম্বা। নতুন কেউ? ওর দিকে এগিয়ে গেল গ্রীন। পেছনে পায়ের আওয়াজ শুনতে পেয়েছিল রাইফেলধারী, ঘাড় ফেরাল।

দেখতে পেলে কারোকে? ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল গ্রীন।

কিছু না, একটা শব্দ পর্যন্ত নেই। তুমি কোত্থেকে এলে? হালাম বলছিল আমরা মাত্র চারজন।

র‍্যাঞ্চ থেকে এসেছি। গ্রীনকে খুন করতে চায় ফ্রেন্ড, আজ রাতে বোধহয় সম্ভব হবে সেটা। মেয়েটাকে কোথায় রেখেছে ওরা?

কেন, তোমাকে বলেনি? রাইফেলধারীর কণ্ঠে সন্দেহ, এক কদম আগে বাড়ল সে, ভাল করে দেখার চেষ্টা করল অন্ধকারের ভেতর। চমকে উঠল পাহারাদার, অব্যক্ত একটা শব্দ বেরিয়ে এল ওর গলা চিরে। ইতিমধ্যে গ্রীন পৌঁছে গিয়েছিল ওর কাছে, কারবাইনের কুঁদো দিয়ে লোকটার মাখায় আঘাত করল সে।

হাঁটু দুমড়ে ধসে পড়ন্স রাইফেলধারী, গ্রীন আবার আঘাত করতে জ্ঞান হারাল।

ওকে নিরস্ত্র করল গ্রীন, কোমরের বেল্ট ধরে টানতে টানতে অদুরের একটা ঝুপড়ির ভেতর নিয়ে গিয়ে রাখল, বেরিয়ে এসে বাইরে থেকে শেকল তুলে দিল দরজায়। এরপর সে রাস্তার ওপাশে চলে গেল, বুকে হেঁটে স্যালুনের উল্টো দিকে এসে থামল ভাঙা জানালা দিয়ে আলোকিত ঘরটা জরিপ করল গ্রীন।

ভার্জিন রীডকে দেখতে পেল সে, বারের পেছনে ওর নিজের জায়গায় বসে আছে; ডান হাতের কাছে রাখা শটগানটাও চোখে পড়ল। কিন্তু মারিয়াকে দেখতে পেল না কোথাও, হালামকেও না।

শিরদাঁড়া সোজা করল গ্রীন, কাছেই এক জোড়া পদশব্দ শুনতে..পেয়ে দ্রুত পিছিয়ে গেল গাঢ়তর অন্ধকারে স্যালুনের দরজা-জানালা গলে আসা আলোয় এসে দাঁড়াল এক লোক, হাতে রাইফেল। ওকে চিনতে পারল গ্রীন-হালাম। র‍্যাঞ্চার স্যালুনের ভেতরে ঢুকে যাবার সময় ওর চওড়া পিঠ বরাবর কারবাইন তাক করল সে।

ওকে মারতে পারতাম আমি, যা করেছে ও তাতে অন্যায় হত না এটা, ভাবল গ্রীন। বুড়ো রীডকেও মারতে পারি। শেষ করে দাও ওদের, নিজেকে বলল গ্রীন, তারপর মারিয়াকে নিয়ে চলে যাও এখান থেকে।

কিন্তু গুলি করল না সে-ট্রিগার টেপার প্রবৃত্তি হলো না। হাচের কথা ভাবল গ্রীন, ব্যাপারটা কীভাবে সামলাবে মনস্থির করে ফেলেছে। কিন্তু হাচকে পেছনে রেখে কাজে নামতে চাইল না ও, ঠিক করল প্রথম ওর একটা ব্যবস্থা করবে।

নিঃশব্দে রাস্তার পাড় ধরে এগোল গ্রীন, চোখ অদূরবর্তী আস্তাবলটা জরিপ করছে। কোন বাতি দেখা যাচ্ছে না ওখানে। অসল্যারের মুখটা মনে করল, ও, জরাগ্রস্ত, নেহাত গোবেচারা মানুষ।

তখনও একশো ফুট দূরে আছে গ্রীন এমন সময় আস্তাবলের কোণে ফস করে একটা ম্যাচ জ্বলে উঠল, সিগারেট ধরানোর সময় লোকটার মুখ দেখতে পেল ও। হাচ। ম্যাচ নিভে যেতে আবার অন্ধকার হয়ে গেল সবকিছু।

একটু দোনোমনো করল গ্রীন। তারপর একদৌড়ে রাস্তা অতিক্রম করে আস্তাবলের পেছনে চলে এল। আবার ইতস্তত করল সে। একটা দরজা খোলা রয়েছে এপাশে, গোবর আর পচা খড়ের দুর্গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসছে। কপাটের পাশ দিয়ে সাবধানে সামনের বড় দরজাটার দিকে তাকাল গ্রীন; দেখল ওটাও খোলা, দোরগোড়ায় গোড়ালির ওপর বসে আছে এক লোক। নড়ে উঠল লোকটা, গলায় উপুড় করল একটা বোতল, কয়েক ঢোক খেয়ে নামিয়ে রাখল আবার, স্থির হয়ে, গেল।

পিস্তল বের করে আস্তাবলে ঢুকল গ্রীন, মেঝেতে খড় থাকায় ঢাকা পড়ে গেছে বুটের মচমচ আওয়াজ। অকস্মাৎ একজন মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে অস্থিরভাবে পা ঠুকল স্টলে বাধা ঘোড়াগুলো, খাওয়া থামিয়ে নাক ঝাড়ল ঘোৎ করে। ওদের পাশ কাটিয়ে এল সে, উৎকট গন্ধে বমি চলে আসছিল, এক হাতে নাক-মুখ চাপা দিল।

দরজার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে গ্রীন এই সময় হাই তুলে উঠে দাঁড়াল অসল্যার, বাইরে গেল। একলাফে দরজার পাশে চলে এল গ্রীন, শুনতে পেল জড়ানো গলায় অসল্যার বলছে, ওরা কেন ভাবছে ও আসবে বুঝতে পারছি না। গাধা না হলে যে কেউ বুঝবে এটা একটা ফাঁদ। আমি হলে তো আসতাম না, এমনকী দোতলার ঘরে যে মেয়েটাকে আটকে রেখেছে তার খাতিরেও না।

তুমি গ্রীন না, চাঁছাছোলা জবাব দিল হাচ। ও ঠিকই আসবে। লড়াই দেখে ভয় পাবার লোক না গ্রীন।

তাই বলে মরতে আসবে?

আসবে।

ওই মেক্স মেয়েটাকে নিয়ে কী করবে ওরা?

সেটা আমার মাথাব্যথা না। যাকগে, এবার তুমি চুপ কর। এরকম বকবক করলে শুনতে পাব কীভাবে ও আসছে কিনা?

মৃদু সুরে বিরক্তি প্রকাশ করল অসল্যার, দোরগোড়ায় ফিরে এসে আবার বোতল খুলে বসল। কপাটের পেছনে জমে গেল গ্রীন, মাকড়সার আঠাল জালে পড়ায় গা ঘিনঘিন করে উঠল। আরও এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল সে, তারপর নিঃশব্দে বেরিয়ে এসে পিস্তলের নল দিয়ে বাড়ি মারল অসল্যারের কানের পাশে। কলার ধরে ভেতরে টেনে এনে দেয়ালের পাশে শুইয়ে দিচ্ছে ওকে এই সময় হাচ এগিয়ে এসে বলল, অ্যাই, কোথায় তুমি? বোতলটা কই? আমি খাব এক ঢোক।

আরও এক কদম এগোল হাচ, ও পায়ে বেধে উল্টে পড়ল বোতল। গ্রীন কোথাও লুকাতে পারার আগেই নিচু স্বরে গাল বকে, ওটা কুড়িয়ে নিল সে।

শার্টের আস্তিনে বোতলের গলা মুছে নিল হাচ, উঁচু করে গলায় ঢালল। খেতে খেতে ওর দৃষ্টি সরে গেল আস্তাবলের ভেতর দিকে, দেয়ালের গায়ে গ্রীন আর অচেতন অসল্যারের ছায়া দেখতে পেল।

শালা–আঁতকে উঠেই গ্রীনের উদ্দেশে বোতলটা ছুঁড়ে মারল হাচ, কনুইয়ের ফাঁকে ধরা রাইফেলের ট্রিগার টিপল।

আচমকা এবং দ্রুত ঘটে গেল ব্যাপারটা। বুলেটের ঘষায় পুড়ে গেল গ্রীনের বাহু, ঝট করে বাঁ-হাতে দুবার গুলি ছুঁড়ল সে, পিছিয়ে গেল হাচ, তারপর টলতে টলতে দুকদম এগিয়ে এসে লুটিয়ে পড়ল ধুলোয়।

দৌড়ে আস্তাবলের বাইরে চলে এল গ্রীন, জানে গুলির আওয়াজে এক্ষুণি ছুটে আসবে হালাম। রাস্তা ধরে এগোল না সে, আস্তাবলের পাশ দিয়ে গলিতে ঢুকল, একটু থেমে খাড়া করল কান। ভারি বুটের আওয়াজ পেল গ্রীন, ঘুরে স্যালুনের পেছনে চলে গেল, লাথি মেরে দরজা ভেঙে ঢুকে পড়ল ভেতরে।

চমকে উঠে টুলের ওপর সোজা হলো, ভার্জিল রীড, শটগানের দিকে হাত বাড়াল।

যত্নের সঙ্গে নিশানা করে শয়তান বুড়োর কাঁধে গুলি করল গ্রীন। কর্কশ সুরে বলল, বাইরে যাও, রীড। তারপর শটগানটা তুলে নিয়ে দৌড়ে টপকাতে শুরু করল সিঁড়ির ধাপ।

দেয়ালে বসানো কুপির আলোয় করিডরের দুপাশে সারি সারি ঘর চোখে পড়ল। ওর। প্রথমে বায়ের দরজাটা খুলল গ্রীন। কারোকে দেখতে পেল না। তারপর উল্টো দিকের দরজা খুলেই বুঝতে পারল মারিয়া আছে এখানে। করিডর থেকে আসা ক্ষীণ আলোয় দেখল খাটের ওপর মুখ-হাত-পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে ও। ছুরি বের করে ঝটপট বাধন কাটতে শুরু করল গ্রীন।

১৮.

ছাড়া পেয়েই একটা খুশির চিৎকার দিয়ে গ্রীনের বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল মারিয়া। আস্তে করে ওকে ঠেলে সরিয়ে দিল গ্রীন।

দেখ, জানালা বেয়ে নীচে নামার মত দড়ি হবে কিনা। এটাই বোধহয় সবচেয়ে নিরাপদ রাস্তা।

কথা শেষ করে গ্রীন বেরিয়ে গেল, খাটের বাজু থেকে দড়ি খুলতে শুরু করল মারিয়া। সিঁড়ির মাথায় চলে এল গ্রীন। ওর পা দৃষ্টিপথে আসা মাত্র নীচ থেকে ছুটে এল তিনটে গুলি। লাফিয়ে পেছনে সরে গেল গ্রীন, একটু থেমে দেয়ালের কুপিটা নামাল। কেরোসিন ছিটাল সিঁড়ির ধাপে, জ্বলন্ত কুপিটা ছুঁড়ে মারল ওই তেলের ওপর।

নীল শিখা জ্বলে উঠল ধাপগুলোয়, তারপর শুকনো কাঠে ছড়িয়ে পড়ল আগুন। ক্ষিপ্রপায়ে ঘরে ফিরে এল গ্রীন। জানালা হাট করে খুলে দিয়েছে মারিয়া, খাট ঠেলে নিয়ে গেছে ওখানে। দড়ির এক মাথা বেঁধেছে খাটের বাজুর সাথে, অন্যপ্রান্ত ঝুলিয়ে দিয়েছে জানালার বাইরে। ওর হাতে শটগানটা দিল গ্রীন।

আমি নামছি আগে। বেশিক্ষণ লাগবে না। হালাম যদি আগুনের এপাশে চলে আসে, গুলি করতে দেরি কর না।

হাহ! খুন করব!

কুঁদো নীচমুখী করে রাইফেলটা জানালা গলিয়ে ফেলে দিল গ্রীন। তারপর চৌকাঠে বসে টেনে দেখল দড়িটা ওর ভার সইতে পারবে কিনা। সন্তুষ্ট হয়ে নামতে শুরু করল ও, মাঝামাঝি চলে এসেছে এই সময় শটগানের গর্জন শুনতে পেল সে, প্রথম একটা গুলি, তারপর আরেকটা।

এর এক সেকেন্ড পর দড়ির শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেল ও, ছেড়ে দিয়ে ধপ করে নামল মাটিতে। গোড়ালির ওপর পড়ে সামান্য ঝুঁকি খেল সে, তবে ভারসাম্য হারাল না।

ওপরে তাকিয়ে দেখল জানালার বাইরে শরীর গলিয়ে দিয়েছে মারিয়া, নামতে শুরু করেছে।

যখন দড়ির শেষমাথায় পৌঁছাল, পাঁজাকোলা করে ওকে মাটিতে নামিয়ে রাইফেলটা কুড়িয়ে নিল গ্রীন! চল, বলল ও। তুমি গুলি করেছ ওকে?

না। ছায়া দেখে মেরেছি। চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম না ভাল করে।

মারিয়ার হাত ধরে ছুটতে ছুটতে গলির মুখে এসে পড়ল গ্রীন, ডাইনে-বাঁয়ে একবার নজর বুলিয়ে রাস্তা পার হলো। ঘাড় ফিরিয়ে শেষবারের মত স্যালুনের, খিড়কি দোরের দিকে তাকাল ও, দেখল ভেতরে লকলক করছে আগুনের শিখা। পরক্ষণে দোরগোড়ায় বেরিয়ে এল হালাম, রাইফেল ছুঁড়ল ওদের উদ্দেশে। অনেকদূর দিয়ে চলে গেল গুলি, হালাম আসলে দেখতে পায়নি ওদের, আন্দাজে নিশানা করেছিল। গ্রীন পাল্টা জবাব দিল না, নিজেদের অবস্থান জানাতে চায় না বলে।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই খাড়াইয়ের মাথায় পৌঁছে গেল ওরা, পিছলে গিরিখাতে নেমে গিয়ে স্টীলডাস্টের উদ্দেশে ছুটল। স্যাডলে চাপল গ্রীন, মারিয়া পেছনে বসল, দুই হাতে ওর কোমর জড়িয়ে ধরেছে।

ঘোড়া ঘুরিয়ে গিরিখাতের বাইরে বেরিয়ে এল গ্রীন। আবার পেছনে তাকাল। ভার্জিল রীডের স্যালুনটা এখন দাউদাউ করে জ্বলছে। ওই আগুনে বহুদূর অবধি আলোকিত হয়ে উঠেছে রাতের আকাশ।

.

শহরে পৌঁছে মারিয়াকে ক্যান্টিনায় নামিয়ে দিল গ্রীন ওকে যেতে নিষেধ করল মারিয়া, লুকিয়ে থাকতে বলল।

এবার হালাম কী করবে কিছুই বলা যায় না, মার্শালকে সাবধান করা দরকার, মারিয়ার কথার পিঠে গ্রীন জবাব দিল।

পাগলা কুকুর হয়ে গেছে ও। তুমি সাবধান থেক, জেমস, না হলে ও তোমাকে খুন করবে।

 চেষ্টা করবে বোধহয়। আমার বিশ্বাস, শেষ একটা মোকাবেলা হবে আমাদের-তবে আমি ওর পিছু নেব না।

সেটা করলেই মনে হয় ভাল করতে, যুক্তি দেখাল মারিয়া। ভয় পেত তোমাকে।

ও ভয় পাবার লোক না, বলে মারিয়ার চোখের পানে তাকাল গ্রীন। এবার তুমি ভেতরে যাও-আর বেরোবে না।

তুমি আসছ পরে?

অবশ্যই। তবে তোমার উঠনে খাব না, অন্তত আজ রাতে না। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ঘেরা জায়গায় বসতে হবে, যেন দরজার ওপর চোখ রাখতে পারি।

সি- বলে ওর একটা হাত বুকে টেনে নিল মারিয়া, চাপ দিল আলতোভাবে। তুমি আসবে, গাঢ় স্বরে আমন্ত্রণ জানাল ও। মেয়েদের সম্মান বাঁচাতে জানো তুমি।

এভাবে ভেবে দেখিনি কখনও। যেটা উচিত মনে হয় করি-ব্যস।

অনাবিল হাসি হাসল গ্রীন। দেখল মারিয়ার দৃষ্টি নরম হয়ে এসেছে, চোখ ছলছল করছে। মেয়েটা ওর হাত ছেড়ে দিতে রওনা হলো গ্রীন, শহরের মূল অংশে ফিরে যাচ্ছে। মার্শালের দফতরের সামনে থামল ও। মক ছিল না, মাঝবয়সী এক লোক-সম্ভবত ডেপুটি-স্মিত হাসল ওকে দেখে। বেশ রাত হয়েছে, মককে খবর দিতে বলে বিদায় নিল গ্রীন।

চারটে বাড়ি পরেই টেরিলের আস্তাবল। সেখানে ঘোড়া রেখে রাইফেলটা নিয়ে হোটেলে ফিরে এল সে, জামাকাপড় না খুলেই টানটান হয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়। ঘুম চলে আসছিল, ঝট করে উঠে পড়ল গ্রীন, হাই তুলে বেসিনের ধারে গিয়ে হাত-মুখ রগড়ে সাফ করল পানি দিয়ে। তারপর ওর সর্বশেষ পরিষ্কার শার্টটা গায়ে চড়িয়ে বেরিয়ে এল করিডরে, ভাবছে হালাম এতক্ষণে বোধহয় পৌঁছে গেছে শহরে। করিডর ধরে পেছনের সিঁড়িতে চলে গেল গ্রীন, অন্ধকার গলিতে নামল। নানান গলিঘুচি হয়ে মেক্সটাউনের কিনারে পৌঁছে কিছুটা নিরাপদ বোধ করল ও। তবু, স্যাম ট্যানার ওকে অ্যামবুশ করেছিল মনে পড়তে, ক্যান্টিনার আশপাশের এলাকা জরিপ করল ভাল করে।

হালামের এখন যে মানসিক অবস্থা, বিশেষ করে সেজের ঘটনাবলীর পর, তাতে এর পক্ষে অ্যামবুশ করা বিচিত্র কিছুই নয়। ক্যান্টিনায় ঢুকল গ্রীন। বারটেন্ডার ছাড়া আর কেউ নেই, সাপারের সময় বহু আগেই পেরিয়ে গেছে। ওকে চওড়া একটা হাসি উপহার দিল বারটেন্ডার, বেশ অনেকটা মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানাল।

সিনর গ্রীন। সিনোরিটা গার্সিয়াকে নিরাপদে ফিরিয়ে এনেছ তুমি, সেজন্য আমি কৃতজ্ঞ। রান্নাঘরেই ওকে পাবে।

ধন্যবাদ। আর কতক্ষণ খোলা আছে ক্যান্টিনা?

বড়জোর ঘণ্টাখানেক, সিনর।

হালামকে চেন?

সি, দেখলেই চিনব।

বন্ধের আগেই যদি আসে, চিৎকার করবে।

তার চেয়েও ভাল কিছু করব, কঠিন গলায় জবাব দিল বারটেন্ডার। বারের নীচ থেকে বড় একটা পিস্তল বের করল সে। এর সাহায্যে চিৎকার করব, সিনর। সিনোরিটার গায়ে হাত তুলেছে ওই লোক, ওকে পেলে আমি ছাড়ব না।

ওপর-নীচ মাখা ঝাঁকাল গ্রীন। যথেষ্ট বলে রান্নাঘরে পা রাখল।

বাসায় ফিরে জামাকাপড় পাল্টেছে মারিয়া, চুল আঁচড়েছে নতুন করে। স্টোভে একটা কিছু ভাঁজছিল ও, গ্রীনকে দেখে স্মিত হাসল।

বুয়েন্স নচেস, শুভ সন্ধ্যা, সিনর জেমস গ্রীন। তুমি বস ওখানে, দেয়ালে পিঠ দিয়ে। অল্পক্ষণ আগে সাজানো দুটো চেয়ার আর টেবিল দেখিয়ে বলল মারিয়া। রান্না হয়ে এল, শিগগিরই আমরা খাব।

সত্যি, খুব খিদে পেয়েছে আমার, স্বীকার করল গ্রীন। তবে, আজ আর টেকুইলা না। মাথা পুরোপুরি সেরে না ওঠা পর্যন্ত ঠিক হবে না খাওয়া।

 মিনিট কয়েক বাদে টেবিলে খাওয়া দিল মারিয়া, গ্রীনের মুখোমুখি বসল। দুজনেই খাচ্ছে গোগ্রাসে, কথা হচ্ছে সামান্য। বলার বিশেষ কিছু নেই ওদের। যা ঘটে গেছে তা এতই সাম্প্রতিক যে নতুন করে আলোচনার অপেক্ষা রাখে না। তা ছাড়া গ্রীনের বিশ্বাস, ভবিষ্যতেও এ প্রসঙ্গ কখনও তুলবে না তারা।

পিপার মক যখন ঢুকল রান্নাঘরে তখন ওরা কফি খাচ্ছে। থমথমে হয়ে আছে মার্শালের মুখ, ওকে এত গম্ভীর এ যাবৎ কখনও দেখেনি গ্রীন।

গ্রীন বলল, তোমার অফিসে গিয়েছিলাম, কেবল ডেপুটি ছিল।

ওপর নীচ মাথা ঝাঁকিয়ে মক বলল, সেজের অসল্যার ভার্জিল রীডকে ডাক্তারের কাছে আনার পরপরই ও খবর দিয়েছে আমাকে। তোমার তলবও পেয়েছি তখন: অসল্যারের সাথে আলাপ হয়েছে আমার। ও বলল, হালাম তোমাকে খুঁজছে। 

আন্দাজ করেছিলাম। কোথায় আছে এখন, জানো কিছু?

 না। তবে অসল্যার বলল রীডকে নিয়ে ও আসার আগেই হালাম রওনা হয়েছে। কাজেই স্বচ্ছন্দে ধরে নিতে পার কাছেপিঠেই কোথাও ওত পেতে আছে তোমার জন্য।

মাথা ঝাঁকিয়ে উঠে দাঁড়াল গ্রীন।

অন্ধকারে অনেক গোলাগুলি হয়েছে–আর না। এবার আমি হোটেলে ফিরে ঘুমিয়ে পড়ব। প্রয়োজন হলে কাল সকালে আমাকে খুঁজে নিতে পারবে-যদি সেটাই চায় ও।

গ্রীনের দিকে তাকাল মার্শাল। এখনও কিন্তু শহর ছাড়ার সময় আছে, বলল রুক্ষ গলায়।

এই নিয়ে তিনবার কথাটা আমাকে বললে তুমি, কাঠখোট্টা গলায় জবাব দিল গ্রীন। ভাল করেই জানো, আমি তা করব না। কেন করব না-তাও জানো।

টুপি পরল গ্রীন। মক একদৃষ্টে তাকিয়েছিল, বলল, চল, হোটেল অবধি এগিয়ে দিই তোমাকে, তারপর অফিসে যাব।

বেশ, গ্রীন বলল।

খাবারের জন্য মারিয়াকে ধন্যবাদ দিল ও। এ পর্যন্ত মনে হয় একবারও দাম দেইনি, শাস্যে বলল। মুফতে খাচ্ছি। চলি, শুভ রাত্রি। ঘুমাও ভাল করে।

তোমার এরকম বিপদে আমার ঘুম হবে কীভাবে? জানতে চাইল, মারিয়া। রাতটা এখানেই থেকে যাও। বল থাকবে, থাকবে না।

আজ রাতে না, মারিয়ার গাল টিপে দিল গ্রীন। পরে, আমাদের বিয়ের পর।

ধাক্কা মেরে ওর হাত সরিয়ে দিল মেয়েটা, চোখ জ্বলছে।

 কে বিয়ে করছে তোমাকে? আমি না! বোকা গ্রিংগোকে কে করবে বিয়ে, মরা মানুষের সাথে ঘর করতে পারব না আমি।

বড় বড় হয়ে গেছে মারিয়ার চোখ, মুহূর্তের জন্য গ্রীনের মনে হলো মেয়েটা বুঝি কেঁদে ফেলবে।

ঝুঁকিটা নিয়েই দ্যাখ, বলে ক্যান্টিনার মূল ঘরে পা রাখল ও। একটু থেমে এক পেগ টেকুইলা পান করল মক, দাম চুকিয়ে বেরিয়ে এল দুজন।

 বাইরে রাতের রাজপথ নীরব, কোমল। ধীর পদক্ষেপে হাঁটছে ওরা। গ্রীন বিড়বিড় করে বলল, সেজে আরও দুজন লোক ছিল। একজনকে মেরে বেহুশ করেছিলাম আমি। দ্বিতীয়জন বোধহয় মারা গেছে-নাম হাচ।

অসল্যারের কথা অনুযায়ী, হাচ মারা গেছে। অপরজনের নাম তুর্ক। অসল্যারকে ও বলেছে সকালে হাচকে সে কবর দেবে। কিন্তু অসল্যারের ধারণা তার আগেই ভাগবে ব্যাটা, তাই ও নিজেই কবর দিয়ে আসবে গিয়ে।

তা হলে মিটে গেল এদিককার পাট। লাশ বেশিক্ষণ বাইরে ফেলে রাখতে নেই, অযথা কষ্ট দেয়া।

হাঁটার সময় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আশপাশের গলিঘুচি, ছায়াচ্ছন্ন এলাকা জরিপ করছে ওরা। এত রাতে একমাত্র স্যালুনগুলোই খোলা আছে। গোটা কয়েক পনি বাধা আছে ওগুলোর হিচরেইলে। হোটেলের খোলা দরজা দিয়েও আলো এসে পড়েছে বাইরে, হলুদ করে তুলেছে বারান্দা। এতক্ষণ স্নায়ুর চাপে ভুগছিল গ্রীন, বারান্দার ধাপে পৌঁছে হাঁপ ছাড়ল।

এগিয়ে দেয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ, মার্শাল। শুভ রাত্রি। দেখা হবে কাল, সম্ভবত।

হুঁশিয়ার থেক, গম্ভীর সুরে বলল মক। গ্রীন ওপর-নীচ মাথা ঝাঁকিয়ে উঠতে শুরু করল সিঁড়ি ভেঙে। প্রায় মাথায় পৌঁছে গেছে ও, স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ওকে হোটেলের বাড়িতে, এই সময় রাস্তা থেকে ভেসে এল একটা বাজখাই গলা।

আজ পর্যন্ত কারও পিঠে গুলি করিনি আমি-ঘুরে দাঁড়াও, গ্রীন!

সামনে, বারান্দার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল গ্রীন, প্রায় একই সময় নীচের রাস্তায় হালামের পিস্তল গর্জে উঠল। ক্রুদ্ধ গুঞ্জন তুলে মাথার ওপর দিয়ে লবির দিকে উড়ে গেল বুলেট। একটা আর্তচিৎকার ভেসে এল ভেতর থেকে। ইতিমধ্যে পিস্তল বের করে গড়িয়ে একপাশে সরে গিয়েছিল গ্রীন, অ্যাংকর মালিক আবার গুলি ছুঁড়তে তার পিস্তলের আগুন লক্ষ্য করে ট্রিগার টিপল ও!

তারপর মার্শাল মকের কর্কশ অথচ দৃঢ় কণ্ঠস্বর শুনতে পেল গ্রীন। পিস্তল ফেলে দাও, হালাম। খুনের চেষ্টা করার দায়ে গ্রেফতার করা হলো তোমাকে।

অশ্রাব্য খিস্তি করল হালাম, বিরক্ত হয়েছে।

 কেন, ব্যাটা বুড়ো গর্দভ, তুমি কেন এর মধ্যে অবজ্ঞার সুরে শুরু করল হালাম, আধপাক ঘুরে গুলি করল মার্শালকে।

 কিন্তু মক ততক্ষণে সরে গেছে অন্যপাশে, পাল্টা গুলি করল সে, বারান্দা থেকে গ্রীন তার দ্বিতীয় গুলিটা ছুঁড়ল।

হালামের তরফ থেকে আর কোন সাড়াশব্দ এল না, আচমকা গোলাগুলির পর থমথমে নীরবতা নেমে এসেছে, রাস্তার মাঝখানে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে একজন মানুষ। তারপর দূর থেকে কোলাহল ভেসে এল, লোকজন ছুটে আসছে। রাস্তায় নেমে গেল গ্রীন, হালামের লাশের কাছে মকের সঙ্গে মিলিত হলো।

চল, বাতিতে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা করি, বলল মক। সিঁড়ির গোড়ায় যেখানে সামান্য আলো এসে পড়েছে, ধরাধরি করে হালামের দেহ সেখানে নিয়ে গেল ওরা। লাশের ওপর ঝুঁকে পড়ল মার্শাল, জামার বোতাম খুলল। একসময় পরীক্ষা শেষ করে উঠে দাঁড়াল সে।

 একটাই গুলি লেগেছে। সোজা হৃৎপিণ্ডে, মনে হয়। তুমি অথবা আমি-কে তা জানার উপায় নেই। অবশ্য তাতে কিছু যায় আসে না।

ভিড় জমে উঠেছে চারপাশে, বিস্ফারিত চোখে দেখছে, অশি। ক্লান্ত সুরে মককে বলল গ্রীন, আমার কিছু করার থাকলে বৎ। না হলে আমি ঘুমাতে চললাম।

যাও। সকালে দেখা হবে।

দোতলায় নিজের কামরায় উঠে গেল গ্রীন, মাথা খালিখালি লাগছে। পরে এক সময়ে কিছুক্ষণ আগের ঘটনাটা সম্পর্কে ভাববে ও কাপড়চোপড় খুলে বিছানার চাদরের তলায় ঢুকল সে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘুমিয়ে পড়ল।

.

মারিয়া বলছিল, কাল রাতে গুলির শব্দ পেয়ে পাগলের মত ছুটে আসছিলাম আমি। ভয় হচ্ছিল তুমি মারা গেছ। তারপর দেখলাম লোকজন ভিড় করে একটা  লাশ দেখছে-হালামের। খুশিতে আমি চেঁচিয়ে উঠলাম। তারপর মার্শাল মক এসে বলল, তুমি ঘরে আছ, ঘুমাচ্ছ। তাই আর বিরক্ত করিনি, ফিরে গিয়ে আমিও ঘুমিয়ে পড়েছি।

 বেলা করে, হোটেলের খাবারঘরে বসে নাস্তা খাচ্ছে ওরা, এরপর কার্লকে দেখতে যাবে। মারিয়া ঠিক করেছে ছেলেটাকে তার বাবার মৃত্যুসংবাদ জানাবে ও। হাজার হলেও বাপ; সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করবে কার্লকে।

আমরা খুব আপন, কার্ল আর আমি। সেই ওর ছোটবেলা থেকে। আর এখন ও বড় হয়ে গেছে।

ওরা এখন হাঁটতে হাঁটতে ডাক্তারের বাসায় যাচ্ছিল, আড়চোখে গ্রীনকে একবার মাপল মারিয়া।

ছেলেটার ব্যাপারে ভাবলে কিছু?

তোমার কথাই ঠিক-বড় হয়ে গেছে।

কথা বলার জন্য মুখ খুলছিল মারিয়া, কিন্তু শেষ মুহূর্তে কি ভেবে চুপ করেই রইল।

দরজায় ওদের সঙ্গে মিলিত হলো ডাক্তার, ভেতরে নিয়ে গেল।

তোমরা বোধহয় কার্লের সাথে দেখা করতে এসেছ। জেগে আছে, তবে দু চার মিনিটের বেশি থেক না। খানিক আগে মার্শাল মক এসেছিল, ওর বাবার মৃত্যুর খবর জানিয়ে গেছে। শান্তভাবেই ব্যাপারটা নিয়েছে কাল, তবে দেরিতে প্রতিক্রিয়া হওয়া অসম্ভব না। ঠিক আছে, যাও তোমরা। করিডরের শেষ দরজা।

মারিয়া এগোল, কিন্তু গ্রীন আরেকটু থেমে জিজ্ঞেস করল, ভার্জিল রীড কেমন আছে, ডাক্তার? খারাপ চোট?

ওই বুড়ো মরবে না সহজে, এটুকু বলতে পারি, হাসল ডাক্তার। একটু মাংস উড়ে গেছে। তবে ওর দুঃখ স্যালুনটার জন্য। মনে হয় না আর কিছু অবশিষ্ট আছে।

সাধ করে নিজের সর্বনাশ করেছে রীড আচ্ছা, ধন্যবাদ, ডাক্তার।

ডাক্তার বেরিয়ে যেতে কার্লের ঘরে গেল গ্রীন। বিছানার পাশে বসে ওর একটা হাত ধরে আছে মারিয়া। ও ঢুকতে ম্লান হেসে ছেলেটা বলল, আপাতত বোধহয় তোমার সঙ্গে আমি টাওসে যেতে পারছি না, মিস্টার গ্রীন।

টুপি খুলে আগে বাড়ল গ্রীন। তুমি টাওসে যাচ্ছ না, কার্ল। এই মামলার কারণে না। আজই আমার রিপোর্ট পাঠাচ্ছি আমি, তোমার নাম থাকছে না।

আন্তরিক সুরে কথা বলছে ও। তোমার যা অপরাধ, আমার দৃষ্টিতে যথেষ্ট সাজা হয়েছে। তোমার সুস্থ হয়ে ব্যবসা দেখবে। এটাই গুরুত্বপূর্ণ। কাজই একজন মানুষের জীবনে সব।

অপলকে গ্রীনকে লক্ষ করছিল মারিয়া, দৃষ্টিতে আনন্দ। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল কার্ল, হাত টেন নিল মারিয়ার মুঠি থেকে, সিলিংয়ের পানে তাকাল।

হ্যাঁ, ব্যবসা দেখব আমি, একসময় বলল ও। মার্শালের সঙ্গে র‍্যাঞ্চের ব্যাপারে আলাপ হয়েছে আমার। লী কার্টারকে খবর দিতে পাহাড়ে লোক পাঠাবে সে। লী অস্থায়ী ফোরম্যান, ভাল মানুষ। আমি ওর নিয়োগ পাকা করব। এখন ও-ই দেখাশোনা করবে সবকিছু। স্বর্গীয় হাসিতে উদ্ভাসিত হলো কার্লের চেহারা। রাউন্ডআপের আগেই পুরোপুরি সুস্থ হতে চাই আমি।

খানিক বাদে বিদায় নিল গ্রীন আর মারিয়া! চলে আসার আগে মারিয়া প্রতিশ্রুতি দিল, ডাক্তার রাজি হলে, রোজ ওর প্রিয় মেক্সিক্যান খাবারগুলো নিজের হাতে রেঁধে নিয়ে আসবে সে।

রাস্তায় বেরোতে রোদের তীব্র ঝাঁঝ টের পেল ওরা। চারপাশে কর্মব্যস্ত মানুষের ভীড়। গ্রীন বলল, তুমি যাও। আমি মার্শালের সঙ্গে দেখা করব। হয়তো ওর অফিসে বসেই লিখে ফেলব আমার রিপোর্ট।

তারপর আসছ? দুপুরে খেতে?

 সি, সিনোরিটা, বলে টুপির কারনিসে হাত ছোঁয়াল গ্রীন, রাস্তা পেরিয়ে মার্শালের অফিসে গিয়ে ঢুকল।

ডেস্কে বসে কাজ করছিল মক, অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ বেশ তরতাজা দেখাচ্ছে ওকে।

ভালই করেছ এসে, বলল মার্শাল। কার্লকে দেখতে গিয়েছিলে? আমি সকালে ঘুরে এসেছি, ভাবলাম আমারই দায়িত্ব ওর বাবার মৃত্যুসংবাদটা ওকে দেয়া। চেয়ারে হেলান দিল মক। কার্লও আমাকে একটা মজার খবর জানাল। তোমার মনে আছে আমি বলেছিলাম, হালাম, হার্ভে স্টেজ আর ড্রাম ডার্লিংয়ের মধ্যে একটা, কিন্তু আছে? আসলেও তাই। লিউ নামে এক লোকের কাছে ব্যাপারটা জানে কার্ল-এর পরপরই মাতাল হয়ে ওইসব কাণ্ড করে ও। হালাম আর তার ওই তিন বন্ধু যুদ্ধের অল্প কদিন পর একটা আমি পে-রোল লুট করে। কয়েকজন অফিসারকে খুন করে টাকা নিয়ে সরে পড়ে এরা। লিউ তার বখরা নিয়ে চলে যায় নিজের পথে। কিন্তু হালাম, হার্ভে আর ড্রাম ঠিক করে তারা একসঙ্গে থাকবে, টাকাগুলো গরু ব্যবসায়ে খাটাবে। একপাল গরু কিনে এখানে চলে এল ওরা। একসময় আলাদা হয়ে গেল ডার্লিং।

তারপর, কিছুদিন আগে হঠাৎ একদিন বাথানে এসে হাজির হয় লিউ। কার্ল তখন ওখানে। মাতাল ছিল লিউ, নেশার ঘোরে সব ফাঁস করে দেয়। বাপকে ফেরেশতা মনে করত কাল, এবার তার আসল চেহারা জেনে মনে দারুণ আঘাত পেল। যাই হোক একটু বাদে ওর বাবা আর হার্ভে স্টেজ ফিরে এলে খড়ের গাদায় আত্মগোপন করে কার্ল। লিউর সাথে কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটি হয় ওদের, তারপর হার্ভে ওর মাথায় কোদালের বাড়ি মেরে খুন করে ওকে আমার বিশ্বাস, গুলি করার ঝুঁকি নিতে চায়নি ওরা। এরপর হালামকে পাহারায় রেখে লিভারি বার্নের যেখানে কেরোসিনের ব্যারেল রাখে ওরা সেখানে গর্ত খুঁড়ে লিউকে মাটিচাপা দেয় হার্ভে।

দম নিতে থামল মক, তারপর নিচু সুরে বলল, আমাদের মুর্দাফরাশকে সঙ্গে করে আমি ওখানে যাচ্ছি। লাশটা উঠিয়ে সৎকারের ব্যবস্থা করব। বিচ্ছিরি কাজ।

জিভ নেড়ে চুকচুক শব্দ করল গ্রীন, এপাশ-ওপাশ মাধা নাড়াল।

এ দেখছি, একেবারে বটতলার উপন্যাস, মার্শাল। অবশ্য যুদ্ধের পর হঠাৎ করে বেকার হয়ে গিয়ে প্রথম প্রথম অনেকেই চুরি-ডাকাতি করেছিল।

এখনও আছে অনেক চোর-ডাকাত, গম্ভীর সুরে বলল মক। নাহ্, আমি এবার যাই; দেরি করলে বেলাবেলি ফিরতে পারব না।

আমাকে আমার রিপোর্ট পাঠাতে হবে, মার্শাল। কার্লের নাম থাকবে না। তোমার অফিসটা ব্যবহার করলে আপত্তি আছে?

স্বচ্ছন্দে করতে পার। ডান দিকের ড্রয়ারে দোয়াত, কলম, কাগজ সবই পাবে। একটা ব্যাজ এঁটে দেব বুকে?

মার্শালের রসিকতায় মৃদু হাসল গ্রীন, মাথা নাড়াল।

মুচকি হেসে বেরিয়ে গেল মক, গ্রীন কাজে বসল। রিপোর্ট লেখা শেষ করে তলায় নিজের নাম সই করছে ও, এমন সময় ঘরে ঢুকল মারিয়া, ক্ষুব্ধ চেহারা।

আর কতক্ষণ লাগবে তোমার? দেরি সহ্য হচ্ছিল না, তাই চলে এলাম।

এইমাত্র শেষ করলাম, চেয়ার ছাড়তে ছাড়তে একগাল হেসে বলল গ্রীন। লাথি মেরে দরজাটা বন্ধ করে দিল সে, কাছে টেনে নিল মারিয়াকে। আচ্ছা, অস্থির হয়ে পড়েছ তা হলে? বিয়ে অবধি তর সইছে না?

চোখ কুঁচকে ওর দিকে তাকাল মারিয়া। কবে? জিজ্ঞেস করল।

রোববার?

হাহ্। তারপর ক্যালিফোর্নিয়া?

হ্যাঁ, তবে এক্ষুণি না। ক্যান্টিনাটা বিক্রি করতে হবে তোমাকে, তারপর আমরা ডেনভার হয়ে ক্যালিফোর্নিয়া যাব। ডেনভারে আমার একটা সম্পর্ক আছে, চুকিয়ে ফেলব সেটা।

দুম করে গ্রীনের বুকে কিল মারল মারিয়া। চোখ মটকে জিজ্ঞেস করল, কে? কোন মেয়ে বুঝি?

জবাব দিল না গ্রীন, ব্যস্ত হয়ে পড়েছে অন্য কাজে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *