১১-১৫. মার্শাল মক তার দফতরের দোরগোড়ায়

মার্শাল মক তার দফতরের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে পশ্চিমের পাহাড়ে সূর্যাস্ত দেখছিল। হঠাৎ চোখের কোণে লক্ষ করল সে গোধূলি আলোর ভেতর দিয়ে এক অশ্বারোহী এগিয়ে আসছে তার দিকে। ধক করে উঠল মার্শালের বুক, একটা হার্টবিট মিস করল

স্যাম ট্যানার কী করছে এখানে? অকটিওতে ওর কী কাজ?

মার্শলকে দেখতে পেয়েছিল স্যাম ট্যানার, এগিয়ে এল। লম্বা পায়ের তাগড়া একটা সোরেলে চড়েছে ও, চমৎকার জানোয়ার। কিন্তু স্যাম, যতটা মনে পড়ছে মকের, আগের মতই বদখত রয়েছে। খর্বকায় একটা মানুষ, পরনে ধুলোমলিন কাউবয় পোশক, সাদামাটা চেহারা। ব্যতিক্রম শুধু ওর ছাইরঙা চোখ দুটো–ভাবলেশহীন, মরা মানুষের চোখের মত নিষ্প্রাণ ।

চোখ আর পিস্তল, মক ভাবল। মোটামুটি একসাথে কাজ করে ওরা। মার্শাল লক্ষ্য করল ট্যানারের হাড্ডিসার উরুর সাথে তার অস্ত্রটা নিচু করে বাঁধা।

 রাশ টানল বন্দুকবাজ, একদৃষ্টে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল মকের দিকে, নীরবে। এটাই ওর রীতি, মকের মনে পড়ল। এমনকী কোন লোক যদি একটা সাধারণ প্রশ্নও করে, জবাব দেবার আগে ওই ধূসর চোখজোড়া মেলে দীর্ঘক্ষণ তার পানে অপলকে তাকিয়ে থাকবে স্যাম। যে কেউ এই দৃষ্টির সামনে কেঁপে উঠবে, যেমন এখন উঠল মার্শাল।

কেমন আছ, স্যাম? জিজ্ঞেস করল মক। আসলে সে বলতে চেয়েছিল, এখানে তুমি কী করছ? কিন্তু স্যাম ট্যানারকে ওই ধরনের প্রশ্ন করতে নেই।

ভাল, একটু বাদে জবাব দিল স্যাম ট্যানার। সেই বেলুরাইডের পর আর দেখিনি তোমাকে, তখন একটা লিভারি স্ট্যাবল চালাতে। তবে শুনলাম, এখানে তুমি মার্শাল।

এই শহরটা খুব শান্ত, স্যাম।

এমনভাবে মককে জরিপ করল বন্দুকবাজ যেন বহুদূর থেকে দেখছে।

তাই, একসময় জবাব দিল সে। ঠিক সীমান্তের দক্ষিণের মত, যেখানে আমি থাকি, ভদ্র, শান্ত-যেমনটা হওয়া উচিত। সিধে হলো স্যাম, আলতোভাবে নড করে চলে গেল। মক খেয়াল করল ও হোটেলের উদ্দেশে যাচ্ছে। অকটিওতে, তার শহরে, আস্তানা গাড়ছে স্যাম ট্যানার ভাবতেই মার্শালের গায়ে কাঁটা দিল!

পরক্ষণে আরেকটা চিন্তা আঘাত করল তার মগজে, কেবলমাত্র একজন মানুষই স্যাম ট্যানারকে ডেকে পাঠাবার ক্ষমতা রাখে-ফ্রেড হালাম।

এবং এর পেছনে কারণও একটাই: জেমস গ্রীনকে খুন করা। এই তল্লাটে আসার পর থেকেই হালামকে সে অনবরত নাকানি-চোবানি খাওয়াচ্ছে।

মক আন্দাজ করতে চেষ্টা করল এখন কোথায় গেলে পাওয়া যাবে গ্রীনকে, সাবধান করতে চায়। তার অনুমান যদি ঠিক হয়, গ্রীনকে গানফাইটে প্ররোচিত করবে স্যাম ট্যান্যার, এবং সামান্যতম সুযোগও পাবে না গ্রীন। ওর এখন শহর ত্যাগ করাই উত্তম, যদিও মকের দৃঢ়বিশ্বাস তা সে করবে না। পালাবার লোক না ও, এমনকী মৃত্যু নিশ্চিত একথা জেনেও।

ঠিক তখনই ভয়ঙ্কর সত্যটা অনুধাবন করতে পারল কি; একান্তই যদি কোন গোলাগুলি হয়, শেষ পর্যন্ত তাকেই মোকাবেলা করতে হবে সেটা-এবং স্যাম ট্যানারের বিরুদ্ধে সেও টিকবে না একমুহূর্ত।

.

মারিয়া ক্যান্টিনায় রাতের খাওয়া সেরে হোটেলে ফিরছে গ্রীন এমন সময় গুলি আওয়াজ শুনতে পেল সে।

মৌন রাতে আপনমনে হাঁটছিল গ্রীন, সকৌতুকে মারিয়ার কথা ভাবছিল। সারাটা সন্ধ্যে খুব নিরুত্তাপ ছিল ও, দূরে-দূরে থেকেছে, কথাবার্তা বিশেষ বলেনি, আর যাও বা বলেছে তার সবই ছিল ওর প্রতি ধিক্কারে ভরা।

তবু গ্রীনের বিশ্বাস মেয়েটাকে বোঝে সে, যদিও ওর তখনকার সেই মদিরাবেগের পাশাপাশি আচমকা খেপে ওঠার ব্যাপারটা একটু খাপছাড়া।

গুলির আওয়াজ নিমেষে সতর্ক করে তুলল গ্রীনকে। পিপার মকের অফিসের দিক থেকে এসেছে ওই আওয়াজ। দ্রুত পা চালাল ও, তারপর ঘটনাস্থলের দিকে আরও লোকজনকে ছুটে যেতে দেখে দৌড়াতে শুরু করল।

অফিসের সামনে ভিড় করেছে একদল মানুষ, উঁকি মারছে জানালা দিয়ে, ভেতরে একটা লণ্ঠন জ্বলছে। ভিড় ঠেলে এগোল গ্রীন, দরজা খুলে পা রাখল ঘরে। কারোকে দেখতে পেল না ও। পিস্তল বের করে দ্বিতীয় দরজা খুলে সেল ব্লকে গেল। দুটো কারাকক্ষ, মুখোমুখি, ডানেরটায় বিস্ফারিত চোখে এক লোক গরাদ আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়েছিল, গ্রীনকে দেখে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকাল। ফাঁসাসে গলায় কোনমতে বলল সে, কেউ ওকে গুলি করেছে।

মুহূর্তে ফ্যাকাসে হয়ে গেল গ্রীনের চেহারা। ঝট করে ঘাড় ফেরাল দ্বিতীয় সেলটার দিকে, দেখল পাথুরে মেঝেতে হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে আছে ডিউক রিপ, করিডরের বাতিতে নিপ্ৰভ দেখাচ্ছে চোখ, বুকের গর্ত থেকে রক্ত চোয়াচ্ছে।

অপর কয়েদির দিকে ঘুরল গ্রীন। লোকটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে গরাদ আঁকড়ে, লাশটা দেখছে।

কীভাবে ঘটেছে?

সচল হলো লোকটার মুখ, ঘাড়ের সংযোগস্থল থেকে নড়ছে মাথাটা।

অজ সকাল থেকে মদ খাচ্ছিলাম আমি, তাই ঘণ্টা দুয়েক আগে মার্শাল আমাকে কয়েদ করেছে। ঘোরের মধ্যে ছিলাম, ফলে বলতে পারব না ঠিক কী ঘটেছে। তবে একটা লোকের গলা শুনতে পেয়েছি। ডিউক, অ্যাই, ডিউক, বলে ডাকছিল। তারপর দুটো গুলি, পেছনের দেয়ালের ওই ছোট্ট জানালাটা দিয়ে।

খিড়কি দরজা খুলে বাইরে গেল গ্রীন। রুপালি জ্যোৎস্নায় দেখল জানালার ঠিক নীচে একটা কাঠের বেঞ্চ পাতা। বেঞ্চে উঠে দাঁড়াতেই ও বুঝে গেল এখান থেকে সেলের ভেতরটা দেখা যায়। এর অর্থ এখানে দাঁড়িয়ে খুনী ডাক দিয়েছিল ডিউক রিপকে, তারপর ও এগিয়ে এলে গুলি করেছে।

জেলহাজতে ফিরে এল গ্রীন। গরাদের ফাঁক দিয়ে বেশকিছু লোক অপলকে দেখছিল লাশটা! পিপার মক এসে ওদেরকে যখন রুক্ষ স্বরে বেরিয়ে যেতে আদেশ করল, অনিচ্ছাসত্ত্বেও সরে গেল লোকগুলো।

তালা খুতে খুলতে গ্রীনকে জিজ্ঞেস করল মার্শাল, তুমি খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছেছ। জানো, কীভাবে কী ঘটেছে?

মাতালের কাছে যা শুনেছে গ্রীন জানাল ওকে। একটা বাংকের ওপর লাশটা তুলল ওরা, মক কম্বল দিয়ে ঢেকে দিল।

হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়াল মার্শাল, দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

কার্লের বিরুদ্ধে তোমার একমাত্র সাক্ষী ছিল ও। এখন ছেলেটা একরকম বেঁচে গেল। প্রমাণ ছাড়া মামলা টিকবে না।

হিসেবি চাল, তাই না? গ্রীনের মুখ থমথমে। কার কাজ বলে মনে হয়? হালামের ফোরম্যান?

গম্ভীরভাবে এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়াল মার্শাল।

কে গুলি করেছে আমি জানি, হার্ভে স্টেজ না, ধীরে ধীরে বলল ও। তবে প্রমাণ করতে পারব না। চল, অফিসে যাওয়া যাক তোমার একটা কথা জানা দরকার।

করিডর ধরে ওরা রওনা হয়েছে, এই সময় চেঁচিয়ে উঠল মাতাল। অ্যাই, মক; তুমি আমাকে একটা লাশের সাথে রেখে যাচ্ছ নাকি?

তোমার কোন ক্ষতি করতে পারবে না ও, মক বিরক্ত।

এখন সুস্থ হয়ে গেছি আমি। কসম, সুস্থ হয়ে গেছি। গুলির আওয়াজে কেটে গেছে নেশা।

ধেত্তেরি, বলে সেলের তালা খুলল মক। এবারের মত ছেড়ে দিলাম, টোবি। বাড়ি যাও। আবার স্যালুনে থেমে সবাইকে বল না যেন কী জানো তুমি, বোঝা গেছে? তা হলে কিন্তু এরপর এক মাসের ঘানি।

ধন্যবাদ জানিয়ে একরকম ছুটে পালাল মাতাল। গ্রীন আর মক অফিস ঘরে গেল। সেখানে ওকে স্যাম ট্যানার সম্পর্কে অবহিত করল মক।

হালাম তলব করছে ওকে, আমার বিশ্বাস। এবং এরপর তোমার পালা-যদি আগেই চলে না যাও। আর যাবে না-ই বা কেন তাও বুঝতে পারছি না আমি। কার্ল মোটামুটি বেকসুর খালাস পেয়ে গেছে এখন, কেবল সময়ের ব্যাপার।

মৃদু হাসল গ্রীন। মোটামুটি। না, মক, ওকে আমার ধরতে হবে। এটাই আমার কাজ।

অস্বস্তিভরে মক বলল, আর আমার স্যাম ট্যানারের সঙ্গে দেখা করা।

তুমি না বললে প্রমাণ করতে পারবে না। যাই হোক, ওটা তোমার ব্যাপার, তবে আমি ওর পরবর্তী চালের অপেক্ষায় থাকব।

ঘোৎ করে বিরক্তিসূচক একটা শব্দ করল মার্শাল। দেখা যাক কী হয়। স্যাম ট্যানারের চেহারার বিবরণ দিল ও। জানি না কীভাবে সারবে, তবে কোন অন্ধকার গলিতে ঢুকবে না, খোলা দরজার দিকে পেছন ফিরবে না। এর বেশি কিছু বলতে পারব না আমি। হালামের ছেলের ব্যাপারে কী করবে ভেবেছ কিছু? কোথায় খুঁজবে ওকে? এজরে অন্ধকারে হাতড়ে লাভ হবে না কোন। ও যদি ধরা দিতে না চায়, ওকে খুঁজে পাবে না তুমি।

দুটো বুদ্ধি এসেছে মাথায়, বলে উঠে দাঁড়াল গ্রীন। প্রথমটায় যদি কাজ না হয়, আঙুল বাকাতে হবে। 

পিস্তলে তোমার হাত কেমন?

সেরা নই।

স্যাম ট্যানার তাই। অন্তত সেরাদের একজন।

এ ব্যাপারে মাথা ঘামাব না, এখন, এটুকু বলতে পারি। এসব কাজের সবচেয়ে খারাপ দিক এটাই-অযথা চিন্তা করা। দুর্বল করে ফেলে মানুষকে, নিজের ছায়া দেখলেও ভয় পায়। চলি, মক। শুভ রাত্রি। তুমিও খামোকা দুশ্চিন্তা কর না।

চেষ্টা করব, শুকনো গলায় বলল মার্শাল। ওকে স্বর্গীয় হাসি উপহার দিয়ে বেরিয়ে গেল গ্রীন।

১২.

অন্ধকার রাস্তায় বেরিয়ে এপাশ-ওপাশ তাকাল গ্রীন। খোলা দরজা-জানালা গলে ছেড়াখোঁড়া আলো এসে পড়েছে ফুটপাতে। এখন আর হাসছে না ও। জানে এখন থেকে সময় হুশিয়ার থাকতে হবে ওকে। খানিক ইতস্তত করল সে, তারপর ঘুরে মেক্সিক্যান পাড়ায় মারিয়ার ক্যান্টিনার উদ্দেশে রওনা হলো, আলোর বাইরে দিয়ে ফুটপাতের কিনার ঘেঁষে হাঁটছে।

মেক্সটাউনের প্রান্তে শেষ হয়ে গেল ফুটপাত। এখানকার চুন-সুরকির ঝুপড়িগুলোতে আলো কম, ম্লান। গির্জাটা পেরিয়ে গেল গ্রীন, দেখল ভেতরে মিটমিট করে মোম জ্বলছে, উপাসনা করছে জনাকয়েক লোক। জানালার কাছে লালচে আভা ছড়িয়েছে ক্যান্টিনার বাতি। ঢোকার আগে মুহূর্তের জন্য থামল গ্রীন, গতরাতে মারিয়ার বাসার ফটকের বাইরে এক লোক লুকিয়েছিল মনে পড়তে কানখাড়া করে বোঝার চেষ্টা করল আজও সেরকম কেউ আছে কিনা আশপাশে।

সন্দেহজনক কোনকিছু টের পেল না ও। ক্যান্টিনায় ঢুকল গ্রীল, বারে দাঁড়ানো। লোকটাকে দেখে ধক করে উঠল বুক।

লোকটাও তাকিয়েছিল ওর দিকে, বিদ্যুণ্ডমকের মত একটা পরিচয়ের আভাস বিনিময় হলো ওদের মাঝে। গ্রীন তার দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নিল। বারের দিকে এগোল সে, ক্ষুদ্রকায় লোকটা থেকে তিন ফুট দূরে থামল।

টেকুইলা,কৃষ্ণকায় বারটেন্ডারকে বলল গ্রীন। 

গ্লাসে মদ ঢেলে এগিয়ে দিল বারটেন্ডার, বারের ওপর একটা রৌপ্যমুদ্রা রাখল গ্রীন। একচুমুকে পানীয়টুকু শেষ করল ও, তারপর পাশে দাঁড়ানো লোকটার দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, তুমি স্যাম ট্যানার। এইমাত্র তোমার ভাষায় একটা কাজ সেরে এসেছ।

নির্লিপ্ত, চোখ দুটো স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে রইল ওর পানে, কিন্তু স্যাম ট্যানার মুখ খুলল না।

নিশ্চয় হালাম তোমাকে বলেছে আমাকে পাওয়া যাবে এখানে, গ্রীন বলল।

আর তুমিও বোধহয় ভেবেছিলে তোমাকে খুঁজে পাব না আমি, মৃদু গলায় বলল, ট্যানার, এক মুহূর্ত পর।

আমি চলে গেলে পেতে না।

হয়তো এখনও খুব দেরি হয়ে যায়নি।

আমাদের একজনের জন্য তাই যাবে, জবাব দিল গ্রীন, লক্ষ করল ঈষৎ কেঁপে উঠল স্যাম ট্যানারের চোখের পাতা। জীবনে বহু বন্দুকবাজক, দেখেছে গ্রীন, অনেকের সঙ্গে লড়াইও করেছে। তার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতায়, অন্যকিছু না হোক, একটি সত্য সে জেনেছে; অধিকাংশ বন্দুকবাজই হয় কাপুরুষ, প্রতিদ্বন্দ্বীকে মোকাবেলা করার চাইতে আড়াল থেকে গুলি করতেই পছন্দ করে বেশি।

কিন্তু স্যাম ট্যানারের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছে না ও। অতিসাধারণ চেহারা; কেরল অদ্ভুত ওর চোখ দুটো, নিরাসক্ত, ভাবলেশহীন-কোনরকম ভাবান্তর নেই।

গ্রীনের মনে পড়ল মক তাকে অন্ধকার গলি আর খোলা দরজা থেকে সরে থাকার পরামর্শ দিয়েছে।

বন্দুকবাজের উদ্দেশে আরেকবার শীতল চাহনি হানল সে, তারপর বারের কোনা ঘুরে রান্নাঘরের দিকে লম্বা লম্বা পা ফেলে হাঁটা দিল পুঁতির পর্দা সরিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় শিরদাড়ার কাছে শিরশিরে অনুভূতি হলো ওর।

রান্নাঘরেই মারিয়াকে পেয়ে গেল গ্রীন, কাজে ব্যস্তু ছিল। এত তাড়াতাড়ি ওকে ফিরে আসতে দেখে অবাক হলো মেয়েটা, কালো ভ্রূজোড়ায় ভাঁজ পড়ল।

আবার কী? শিগগিরই বন্ধ করে দেব, তখন এমনিতেও চলে যেতে হবে তোমাকে,

বিরাট দুই হাতের মুঠোয় গ্রীন তার টুপিটা নাচাল, অস্বস্তি বোধ করছে। শান্ত গলায় মেয়েটাকৈ জানাল ডিউক রিপ মারা গেছে।

আধঘন্টা আগে কেউ ওকে গুলি করেছে সেলের মধ্যে। তুমি হয়তো আওয়াজ শুনে থাকবে।

দুর্বোধ্য ভঙ্গিতে মাথা নাড়াল মেয়েটা, গভীর কালো চোখ দুটো চিকচিক করে উঠল।

ডিউক ভাল ছেলে ছিল, মোটামুটি। কে খুন করল? কেন?

কান্নায় ভেঙে পড়ল মারিয়া, বিস্ফারিত হয়ে গেছে চোখ, গাল ভেজা, মুখ ফ্যাকাসে।

কী ব্যাপার? গ্রীন জিজ্ঞেস করল। কী ভাবছ এত?

খুব দুঃখজনক এই মৃত্যু। তবে আমাকে জানাতে এসেছ তুমি, সেজন্য তোমাকে ধন্যবাদ।

জানাচ্ছি তার কারণ কার্লের সঙ্গে যদি তোমার দেখা হয় তাকে বলতে পারবে ঘটনাটা।

ভোতা হয়ে গেল মারিয়ার দৃষ্টি, গলার স্বর রুক্ষ হয়ে উঠল। কার্লের সঙ্গে আমার দেখা হবে এরকম ভাবছ কেন?

আমি বলেছি যদি দেখা হয়, বলল গ্রীন, মেয়েটার এই আকস্মিক মেজাজ পরিবর্তনে সন্দিগ্ধ হয়ে উঠেছে ওর মন।

দেখা হবে না আমার সাথে, ঝাঁঝের সাথে বলল মারিয়া। এবার তুমি যাও! আমি খুব ব্যস্ত। সারারাত ধরে গ্রিংগোর সাথে প্যাচাল পাড়ার মত সময় নেই।

বিদায় জানিয়ে ঘুরে দাঁড়াল গ্রীন। পর্দাটা সামান্য ফাঁক করে বারের দিকে অকিয়ে দেখল স্যাম ট্যানার নেই।

 দ্বিধায় পড়ল ও, বুঝতে পারছে মারিয়া লক্ষ করছে ওকে। বাইরে কোথাও হয়তো ওত পেতে অপেক্ষা করছে স্যাম ট্যানার, ও বেরোলেই গুলি করবে, পেছনে ক্যান্টিনার আলো থাকায় নিশানা করা সহজ হবে গুপ্তঘাতকের পক্ষে। মারিয়ার দিকে ফিরল গ্রীন।

পেছনের রাস্তা দিয়ে বেরোতে চাই আমি। তোমার ঘরের ভেতর দিয়ে যে দরজাটা উঠনে খোলে।

কী ব্যাপার? কার ভয় করছ?

ভয় পাচ্ছি না, গ্রীন বিরক্ত। সামনে দিয়ে বেরোলে একটা যুদ্ধ বাধতে পারে, তোমার খদ্দেররা তা হলে বিপদে পড়বে।

উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল মারিয়ার দৃষ্টি, গলা নেমে গেল খাদে।

কে আছে বাইরে?

ডিউক রিপকে যে লোকটা খুন করেছে। নাও, এবার আমাকে দেখাও

ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল মারিয়া, বাসায় ঢুকে শোবার ঘর হয়ে ওকে নিয়ে গেল দরজার কাছে। অন্ধকার ঘরে গ্রীনের হাত চেপে ধরল। অন্ধকারে ওর মুখাবয়ব, চকচকে চোখ দেখতে পেল গ্রীন।

সাবধান, নয়তো তুমিও খুন হয়ে যেতে পার, মৃদু গলায় বলল মারিয়া।

স্মিত হাসল গ্রীন। তাতে কি সত্যি তুমি খুব দুঃখ পাবে, মারিয়া?

সি। পাব।

ওর ক্ষীণ কটি জড়িয়ে ধরল গ্রীন, অনুভব করল শক্ত হয়ে গেল শরীর-সেই চাপা ইস্পাত। তারপর ঢিল দিল মারিয়া, চোখের পলকে ওর মাথাটা টেনে নামিয়ে চুমু খেল ক্ষুধার্ত কামনায়। সকালে সোনালি অ্যাসপেনের নীচে ঘাসের মধ্যে যেরকম অনুভূতি হয়েছিল গ্রীনের এখন আবার তেমনি আগুন ছড়াল ওর শিরায় শিরায়।

বাইরে যাবার বদলে রাতটা এখানে কাটাতে পারলেই বেশি খুশি হবে সে, চকিতে একবার ভাবল ও।

মারিয়াকে রেহাই দিল গ্রীন, তপ্ত একটা নিশ্বাস ছেড়ে সোজা হলো।.. তোমার মধ্যে বারুদ আছে, বলল ও।

তারপর ঘুরে দরজা খুলল সে, দ্রুত পা রাখল বাইরের: জাফরি কাটা মাচানের নীচে। চন্দ্রালোকিত উঠানটা জরিপ করার সময় মারিয়ার কথা পুরোপুরি ভুলে গেল ও, দেয়াল ঘেঁষে ফটকের দিকে এগোল উবু হয়ে। একটু ইতস্তত করে তুলল হুড়কোটা, নিঃশব্দে নামিয়ে রাখল একপাশে। তারপর পিস্তল বের করে ঠেলে ফাঁক করল গেট, অনুভব করল চিকন ঘাম দেখা দিয়েছে কপালে।

 অদূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠল এবং চুপ করল। পেলব রাতে আর কোন শব্দ নেই। গলিতে বেরিয়ে ফটকটা টেনে বন্ধ করে দিল গ্রীন, চোখ সতর্ক, আশপাশের রুপালি আঁধার,আর সামনের নিচ্ছিদ্র অন্ধকার রাস্তাটা জরিপ করছে।

আগে বাড়ল গ্রীন, গেল রাতে যে লোকটা দৌড়ে পাশের রাস্তায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল তার কথা ভাবছে।

দেয়ালের কোণে পৌঁছল সে। উবু হয়ে চলাফেরা করছে খেয়াল হতে সোজা হয়ে দাঁড়াল। পিস্তলটা রাখতে যাচ্ছে হোলস্টারে এই সময় আচমকা গুলির আওয়াজে। খানখান হয়ে গেল রাতের নিস্তব্ধতা। অন্ধকারের ভেতর উল্টো দিকে আগুনের ঝলক দেখতে পেল গ্রীন। নিক্ষিপ্ত পাথরখণ্ডের মত শক্ত একটা কিছু আঘাত করল ওর কোমরে, এক হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল ও। পরক্ষণে আরেকটা বুলেট উড়ে গেল মাথার ওপর দিয়ে, পেছনের দেয়ালে বিঁধল। আগুনের ঝলক নিশানা করে গুলি ছুঁড়ল গ্রীন, তারপর আরও দুটো গুলি করে উঠে দাঁড়িয়ে এগোল সামনে। হিমশীতল ভয়ঙ্কর ক্রোধে জেগে উঠেছে এর মাঝে।

এরপর আরেকটা গুলি বিস্ফোরিত হলো ওর মগজে। গ্রীন খেয়াল করছে না। ও সামনে এগোচ্ছে। শুধু বুঝতে পারছে প্রতিবার ট্রিগার টেপার সাথে সাধে পিস্তলটা লাফিয়ে উঠছে ওর হাতের মুঠোয়। এখন আর কোন পাল্টা গুলি ছুটে আসছে না। সামনে অন্ধকার রাস্তায় হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে থাকা মানুষটাকে ঝাপসা চোখে দেখতে পেল ও, পিস্তলের শেষ গুলিটা দুলিয়ে দিল ওর শরীরে। গ্রীনের মনে হলে ও একটা আর্তচিৎকার শুনতে পেয়েছে, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারার আগেই ওর মাথা ঘুরে উঠল, ভীষণভাবে, ভাঁজ হয়ে গেল হাঁটু, কিন্তু টের পেল না কখন মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে সে।

.

আবার যখন চেতনা ফিরে পেল গ্রীন তখন দেখল হোটেলে নিজের কামরায় শুয়ে আছে সে। নিঃসাড়ে পড়ে রইল ও, বুক ধড়ফড় করছে, শ্বাসপ্রশ্বাস চলছে দ্রুতলয়ে। গ্রীন বুঝে উঠতে পারল না এখানে সে কী করছে। তারপর, প্রথমে ধীরে ধীরে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চকিতে মনে পড়ে গেল সব। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল সে। চোখ পিটপিট করল, আচমকা টের পেয়েছে ঘরে সে একা নেই। আড়ষ্টভাবে বালিশের ওপর ঘাড় ফেরাল ও, দেখল, বিছানার পাশে মারিয়া বসে আছে। মেয়েটার চেহারায় স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠতে লক্ষ করল সে।

তারপর মারিয়া যখন খেয়াল করল গ্রীন লক্ষ করছে ওকে তখন ঠাট্টার সুরে বলল, এবার তা হলে বুঝতে পারছ তুমি বেঁচে আছ? অনেক সময় লাগল কিন্তু।

কত? ক্ষীণ শোনাল গ্রীনের কণ্ঠ, যেন গভীর কোন কুয়ো থেকে উঠে আসছে।

দুদিন। প্রায় তিন। আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো মারাই যাবে ডাক্তার বলেছে তোমার কনফিউশন হয়েছে।

আকর্ণ বিস্তৃত হাসি হাসল গ্রীন। মানে কনকাশন।

একই কথা। মাথা ঘুরবে তোমার। এখন কেমন লাগছে?

গ্রীন অনুভব করল ওর মাথার একপাশে এখন ব্যথা করছে, হাত ওঠাতে আঙুলে ব্যান্ডেজের স্পর্শ পেল। ঝিমঝিম করছে ভেতরটা, ভুরু কোঁচকাল ও।

খিদে পেয়েছে, বলল।

 ভাল, উঠে দাঁড়াল মারিয়া। চুপ করে শুয়ে থাক, আমি খাবার আনছি।

মারিয়া যখন দরজায় পৌঁছাল, গ্রীন ওর নাম ধরে ডাকল, মেয়েটা ঘুরে দাঁড়াতে বলল, এই দু-তিনদিন তুমি এখানেই বসেছিলে?

যে কারও জন্য এটা করব আমি।

বেরিয়ে গেল মারিয়া। জানালার দিকে পাশ ফিরতে গ্রীন দেখল বাইরে রোদ। তা হলে সে প্রায় তিন দিন অজ্ঞান হয়েছিল ও ভাবল। আস্তে আতে হাত-পা নাড়াল গ্রীন, তার, মাজার ব্যান্ডেজটা টিপে দেখল। তারপর চোখ মুদল সে এবং কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঘুমিয়ে পড়ল।

.

পরে, মারিয়া যখন ঢাকনা দেয়া খাবারের ট্রে নিয়ে এল জেগে উঠে গোগ্রাসে সেগুলো খেল গ্রীন। তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়ল। সন্ধ্যে নাগাদ ওকে দেখতে এল ডাক্তার, সংক্ষিপ্ত পরীক্ষার পর রায় দিল শিগগিরই ও সেরে উঠবে।

তবে তোমার চোটটা খারাপ, কাজেই আরও কটা দিন শুয়ে থাকতে হবে তোমাকে। এরপরও, দ্রুত চলাফেরা করতে গেলে মাথা ঘুরবে।

মারিয়া চলে গেছে কান্টিনায়। রাতের খাওয়া নিয়ে পিপার মককে আসতে দেখে অবাক হলো গ্রীন। ওর কোলের ওপর ট্রেটা রেখে গম্ভীর গলায় মার্শাল বলল, বুটহিলে তোমার জায়গায় স্যাম ট্যানারের স্থান হয়েছে সেজন্য আমি খুশি।

ধন্যবাদ, বলে খেতে শুরু করল গ্রীন।

দুবার ওর মাথায় গুলি লাগিয়েছ তুমি, জানো?

ওই পর্ব শেষ। আলাপ করে খামোকা সময় নষ্ট। কার্লের ব্যাপারে কিছু শুনলে?

না, একটু থামল মার্শাল। নতুন কোন খবর নেই-শুধু ড্রাম ডার্লিং সব ব্যবসা বেচে দিয়ে চলে যাচ্ছে।

এতে অবাক হবার কী আছে?

অপ্রত্যাশিত, এই পর্যন্ত। ভাল ব্যবসা করছিল, টাকা কামাচ্ছিল। আর টাকাটাই ওর কাছে সব। তা ছাড়া আগেই বলেছি, ফ্রেড হালাম আর হার্ভে স্টেজের সঙ্গে সেই প্রথম দিকে এখানে বসতি করে ও। স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কোন কারণ না ঘটলে মানুষ সাধারণত তার পুরানো জায়গা ছেড়ে নড়তে চায় না। তবে আমার কেন যেন মনে হয় ওই তিনজনের ভেতরে একটা গোপন কোন ব্যাপার আছে। আগেও এরকম মনে হয়েছে আমার।

তোমারটা ঠিক বলতে পারব না, তবে আমি একটা ব্যাপারে অনেক ভেবেও কূলকিনারা করতে পারিনি। এত ভাল ছেলে ছিল কার্ল হালাম, সে কেন হঠাৎ করে এমন মাতাল হয়ে স্টেজ ডাকাতি করতে গেল? তোমার মনে আছে আমরা একবার আলাপ করেছিলাম, ডিউক রিপ আমাকে বলেছিল কার্ল তার বাবার কাছে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে চাইছি? আমার কাছে ব্যাপারটা এখনও রহস্যময়। এই ঘর থেকে বেরোতে পারলেই ওকে খুঁজে বের করব আমি।

মামলাটা বন্ধ করে দেয়াই বোধহয় ভাল। একটা সাক্ষীও তো আর বেঁচে নেই।

না, তা সম্ভব না, সংক্ষেপে বলল গ্রীন। নীরবে খাওয়া সারল ও। মক উঠে খালি ট্রেটা তুলে নিল।

এবার নিশ্চয়ই ঘুম?

গ্রীন হাসল। খাওয়া আর ঘুম, সামনের কয়েকটা দিন কেবল এ দুটোই করব, বলল ও। শুভ রাত্রি, মার্শাল। এবং ধন্যবাদ।

মক অকপটে বলল, আমারই উচিত তোমাকে ধন্যবাদ দেয়া। তুমি স্যাম ট্যানারকে না মারলে ওকে মোকাবেলা করতে হত আমার। এবং এ মুহূর্তে আমিই থাকতাম বুটহিলে।

১৩.

পরদিন উঠে বসল গ্রীন। মাজার ক্ষতটা শুকিয়ে আসছে, খুব একটা সমস্যায় ফেলছে না ওকে। কিন্তু মাথার-টাই ভাবিয়ে তুলেছে। ঘরের ভেতর মাত্র তিনটে চক্কর দিতেই এমন ঝিমঝিম করে উঠল যে সময়মত বিছানায় বসে না পড়লে মেঝেতে পড়ে যেত ও।

 পরের দিনটা একটু ভাল কাটল। প্রচুর পুষ্টিকর খাবার আর ঘুম ওর শক্তি আর দম ফিরিয়ে এনেছে কিছুটা। অবসন্ন বোধ করার আগে প্রায় মিনিট পনের ঘরের মধ্যে পায়চারি করল, সে

একটু বেলা করে পিপার মক এল, মুখ থমথমে।

ঝামেলা। ডার্লিংকে আজ সকালে তার দোকানে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। পিঠে ছুরি মেরেছিল কেউ।

তাই নাকি! কারোকে সন্দেহ হয়?

মক ওপর-নীচ মাথা ঝাঁকাল, শ্বাস ফেল ক্লান্তভাবে।

আন্দাজ করছি, কিন্তু প্রমাণ নেই। লাইল ক্যানাডা মরেছিল ছুরিতে। এখন ড্রাম ডার্লিং। দুজনেরই একসময় যোগাযোগ ছিল হালামের সাথে। আর হার্ভে স্টেজ তার কোমরের বেল্টে সবসময় একটা ছুরি রাখে। দম নিতে চুপ করল মক। কাল রাতে শহরে ছিল হার্ভে, ডালিংয়ের স্যালুনে মদ খাচ্ছিল।

তার মানে ওকে বাদ দেয়া যায় সন্দেহের তালিকা থেকে। খুনী কখনও ঘটনাস্থলের আশপাশে দেখা দিতে চায় না।

জানি। তবে আমার বিশ্বাস, হার্ভে কাল সন্ধ্যায়ই স্যালুনে বসে ডার্লিংয়ের চলে যাওয়ার খবরটা জেনেছে।

কিন্তু একজন লোক তার ব্যবসা বেচে দিচ্ছে বলেই তাকে খুন করতে হবে কেন? বলল গ্রীন। এটা ঠিক ঢুকছে না আমার মাথায়।

কালই তোমাকে বলেছি ডার্লিংয়ের বিক্রি করার ব্যাপারটা একটু গোলমেলে। এবং হার্ভে, হালাম আর ওর মাঝে একটা গোপন কিছু আছে। এমন কিছু যেটা ঘটেছে এখানে আসার আগে। এখন ডার্সিং চলে যেতে চাইছিল এখান থেকে। ধরা যাক, হার্ভে ধারণা করে ও পালাবার মতলব করছে। ওর পছন্দ হয়নি সেটা-তাই খুন করেছে।

তোমার অনুমান হয়তো ঠিক, তবে ওদের সম্বন্ধে আমি বেশিকিছু জানি না। ফলে হুট করে একটা মন্তব্য করে বসা উচিত হবে না।

পাগল হয়ে যাব আমি, মক বলল। যাক, এখন আমি যাচ্ছি। কার আসব আবার।

মার্শাল চলে যাবার পর গ্রীন উঠে দাড়ি কামাল। ছোট্ট আয়নায় রক্তশূন্য দেখাল মুখ, তবে খোঁচা খোঁচা জঙ্গল সাফ করে বেশ আরাম বোধ করল ও। তারপর বিছানায় ফিরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।

ওর দুপুরের খাবার নিয়ে এল মারিয়া। বসে থেকে গ্রীনের খাওয়া দেখল সে, মুখ অন্ধকার।

তুমি তা হলে চলে যাচ্ছ? মানে যখন ঘোড়ায় চড়তে পারবে কোথায় যাবে?

নির্দিষ্ট করে কোন যাওয়ার জায়গা নেই, তবে কথাটা ইদানীং ভাবছি আমি। একটা সময় আসে যখন মানুষের কোথাও সুস্থির হতে হয়, নইলে পানিও পায় না মরার সময়। একবার ক্যালিফোর্নিয়ায় একটা কাজ করেছিলাম। সমুদ্রের কাছাকাছি, স্যানডিয়েগো নামে ছোট্ট এক শহরে। শহরের পুরে প্রচুর ঘাস মেলে। চমৎকার উপত্যকা, ঝরনা এসব আছে। সীমান্ত থেকে খুব বেশি দূরে না। ভাবছি ওখানে যাব। ঘোড়া পালব, ভাল জাতের। স্যাডল হর্সের দাম বাজারে সবসময়ই চড়া। আপাতত এরকমই ইচ্ছে আমার।

তেমনি মুখ কালো করে গ্রীনের দিকে তাকাল মারিয়া, বলছে না কিছু।

তবে সব পুরুষেরই বউ লাগে। একা থাকা ভাল না, কোন পুরুষই একা একা বাঁচতে পারে না বেশিদিন। তা ছাড়া ঘরদোর সাফ করা, রান্না, ছেলেপুলে মানুষ-এগুলোর জন্যেও মেয়েমানুষ দরকার একজন।

হাহ! বিদ্রুপের স্বরে বলল মারিয়া। তুমি বউ, চাওনা, বাদি চাও।

ওকে অনাবিল হাসি উপহার দিল গ্রীন।

প্রেম, যত্নআত্তি সব পাবে ওই মেয়ে, ঘরের টুকিটাকি কাজে সুন্দর কেটে যাবে সময়।

খুব বেশি কথা বল তুমি।

আমাকে তুমি বিয়ে করবে, মারিয়া? যাবে আমার সঙ্গে ক্যালিফোর্নিয়া?

উঠে পড়ল মেয়েটা, আগের মতই নির্বিকার, গ্রীনের কোল থেকে সরিয়ে নিল ট্রে।

তোমাকে বিয়ে করব? একজন গ্রিংগোকে? তুমি একটা বোকা। কোন সাদা চামড়ার মেয়েকে বিয়ে কর, আমাকে এসব বলে লাভ হবে না।

তবে ভুলে যেও না আমি তোমাকে প্রস্তাব দিয়েছি এবং মন থেকে।

ভোলা সোজা। যেমন তুমি ভুলে যাবে আমাকে।

হয়তো পারব না শেষ পর্যন্ত। যাই হোক, কাল আবার আসছ তো?

দোনোমনো করল মারিয়া, মাথা নিচু করে আছে।

কাল না, বলে বেরিয়ে গেল।

পুরানোগুলো বদলে নতুন ব্যান্ডেজ বাঁধতে সন্ধ্যায় ডাক্তার এল। মাথার জখমটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরখ করল সে।

ভাল, খুব ভাল, বিড়বিড় করে বলল ডাক্তার। আজ ছোট পট্টি বাঁধলেও চলবে। একটা দাগ থেকে যাবে, তবে তোমার চুল ঘন, ঢেকে রাখতে পারবে।

টাকমাথা ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে একগাল হাসল গ্রীন।

তোমাকে আমার মাথার কিছু চুল দিতে ইচ্ছে করছে, ডাক্তার। তোমার ফি হিসেবে।

নগদ পেলেই বেশি খুশি হব আমি, ধন্যবাদ। ডিম, মুরগি, গরুর রান এগুলো নিয়েছি। তাই বলে চুল-না। ব্যাগ বন্ধ করে মাথায় হ্যাট চাল ডাক্তার। দিন দুয়েক পরে আবার আসব, যদিও আমার মনে হয় না আমাকে আর লাগবে তোমার। বেশ সুস্থ দেখাচ্ছে, আশা করা যায়, আর দু-এক হপ্তার মধ্যেই চলাফেরা করতে পারবে তুমি।

ডাক্তার বিদায় নেয়ার পর আরেক দফা ঘুমাল গ্রীন। তারপর হরেকরকমের তরকারি দিয়ে রাতের খাওয়া সেরে আবার শুয়ে পড়ল।

পরদিন সকালে নাস্তা খেয়ে পায়জামা পরে ঘরের ভেতর পায়চারি করছে ও এই সময় দরজায় নক করে ভেতরে ঢুকল পিপার মক। গ্রীনকে দেখে হাসল মার্শাল।

উঠে পড়েছ? সকালের দিকে টেরিলের কাছে গিয়েছিলাম। তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিল।

বুড়ো খুব ভাল।

স্মিত হাসিল মক, মাথা ঝাঁকাল।

আমি থাকতেই মারিয়া আসে ওখানে। ওর বাকবোর্ড নিতে। ঠাট্টা করার চেষ্টা করেছিলাম। তোমার ব্যাপারে। সাড়া পেলাম না, মেজাজ বিগড়ে ছিল। বাকবোর্ডে মালপত্র চাপিয়ে কোথায় যেন গেল।

চিন্তার ভাঁজ পড়ল গ্রীনের কপালে।

কোথায় যাচ্ছে আন্দাজ পাচ্ছ কিছু?

কারও সাথে দেখা করতে, মনে হয়। শহরের বাইরে অনেক মেক্সিকান পরিবার আছে। সকলেই ওর বন্ধু।

তোমার কথাই হয়তো ঠিক, তবু আমি একটু নিশ্চিত হতে চাই। একটা উপকার কর, আমার ঘোড়াটা নিয়ে এস এখানে।

কী বলছ তুমি, গ্রীন। তোমার কোন কাজে আসবে না ঘোড়া। অন্তত এখনও না। নাকি তুমি আন্দাজ করেছ কোথায় যেতে পারে মারিয়া।

তাই। প্রথম যেদিন ওর ক্যান্টিনায় খেলাম–সেদিন থেকেই মেয়েটার ওপর আমার সন্দেহ। আমি কাপড় পরতে পরতে তুমি নিয়ে এস ঘোড়াটা। এখন আর সময় নষ্ট করা উচিত হবে না।

পা চালিয়ে বেরিয়ে গেল মক। দেয়াল আলমারি থেকে কাপড় বের করে তৈরি হতে শুরু করল গ্রীন। গানবেল্ট বাঁধছে কোমরে এই সময় আবার ঘুরে উঠল ওর মাথা। খাটের বাজু ধরে পতন ঠেকাল ও, সহজ হতে বলল নিজেকে, টুপি চাপাল। ব্যান্ডেজ থাকায় একটু আঁটসাট হল ওটা। সিঁড়ি বেয়ে গ্রীন যখন একতলায় নেমে গেল, ওকে দেখে চোখ কপালে তুলল হোটেলের কেরানি। লোকটাকে পাত্তা দিল না ও, বারান্দায় গিয়ে ফুসফুস ভরে নিল মুক্ত বাতাসে। কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘোড়া নিয়ে হাজির হলো মার্শাল মক। স্যাডল থেকে নেমে বলল, আমি আসব?

না, দরকার হবে না। স্ক্যাবার্ড থেকে রাইফেলটা টেনে বের করল গ্রীন, পরখ করে রেখে দিল যথাস্থানে। দোল খেয়ে স্যাভলে চাপল সে, মাথা ঘুরে উঠল আবার। একবার মনে হলো সে হয়তো আলেয়ার পেছনে ছুটছে। তবু নিশ্চিত হতে চাই আমি,আপনমনে ভাবল গ্রীন, তারপর মক্‌কে ঘাড় কাত করে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে গেল।

.

মারিয়া তার পুরানো বাড়ি, পরিত্যক্ত শীপ র‍্যাঞ্চে যাচ্ছে, জেমস গ্রীনের কথা ভাবছে ও। কখনও দারুণ আত্মাভিমান জেগে উঠছে ওর মাঝে নিজেকে পরিতৃপ্ত বলে মনে হচ্ছে; আবার পরক্ষণে ভয়ঙ্কর হতাশা ওর মনোবল ভেঙে দিচ্ছে, একলা বোধ করছে ভীষণ।

ওই লোক একটা পুরুষ বটে। বিয়ে করতে চেয়েছে তাকে, বলেছে প্রেম ভালবাসা পাবে সে। উফ! কিন্তু তা কী করে সম্ভব? একজন গ্রিংগোকে বিয়ে করে এই সীমান্ত শহর, তার জন্মস্থান ছেড়ে সে চলে যাবে কীভাবে? ক্যালিফোর্নিয়া হ্রদ, মেসো উপত্যকার কথা বলেছে লোকটা। সে কখনও হ্রদ দেখেনি। অকটিও থেকে বিশ মাইল দূরে, বেলুরাইড ছাড়া অন্য কোথাও জীবনে যায়নি ও। ক্যালিফোর্নিয়াকে মনে হচ্ছে বহুদূরে; যেন পৃথিবীর অপর প্রান্তে। আর কখনও তার দেশ, বন্ধুদের দেখতে পাবে না সে। তারপর ক্যান্টিনাটা আছে। ওটা গড়ে তোলার জন্য দারুণ পরিশ্রম করেছে ও। শুরুতে কোন বার ছিল না, শুধু ঘরে তৈরি স্মোকড টর্টিলা বিক্রি করত। ধীরে ধীরে তার টর্টিলার সুখ্যাতি বাড়ে, তারপর গ্রিংগোরাও খেতে আসতে শুরু করে।

এরপর থেকে ভালভাবেই চলছে সব। তার অবস্থার উন্নতি হয়েছে, শহরের মেক্সিক্যান প্রান্তের বাসিন্দারা সম্মান করে তাকে। চারপাশের ভয়াল অথচ সুন্দর মরুভূমির দিকে তাকাল মারিয়া। এই বুনো দেশ তার জন্মস্থান। একজন গ্রিংগো, যে তাকে সম্পূর্ণ অজানা অচেনা এক দেশে নিয়ে যেতে চায়, তাকে বিয়ে করার জন্য এর মায়া সে ত্যাগ করবে কীভাবে?

নিজের শরীরে গ্রীনের ছোঁয়া, তার শক্তিশালী দুই বাহুর কথা, ভাবল ও, দুর্বল বোধ করল।

অদূরে জরাজীর্ণ শীপ র‍্যাঞ্চটা চোখে পড়তে হাঁপ ছাড়ল মারিয়া, সতর্ক হয়ে উঠল ওদিকে এগোবার সময় ঝরনার পানে তাকাল ও, দেখল উইলো বন থেকে বেরিয়ে এসে ওর উদ্দেশে হাত নাড়ছে কার্ল। সেও জবাব দিল হাত নেড়ে, ঘোড়া ঘুরিয়ে বাড়ির একপাশে বাকবোর্ড থামাল।

বাকবোর্ডের পাটাতন থেকে মালপত্র তুলে নিল মারিয়া, বাসায় ঢুকল। স্টোভ জ্বেলে কফির পানি ছড়াচ্ছে এই সময় কার্ল হাজির হলো দোরগোড়ায়, হাসছে ম্লান মুখে। 

 গত কদিনে বদলে গেছে ছেলেটা, মারিয়া ভাবল। ডিউক রিপ খুন হবার পর এ পর্যন্ত মাত্র একবারই ওর সাথে দেখা করেছে সে। ডিউকের মৃত্যুতে দারুণ আঘাত পেয়েছে কার্ল; তবে গ্রীন আততায়ীকে মারতে সমর্থ হয়েছে শুনে শোক প্রশমিত, হয়েছে কিছুটা।

কার্লের উদ্দেশে হাসল মারি! বলল, আজ তুমি গরম খাবার খাবে! ফ্রিওলস আর টর্টিলা। এবং কফি।

 স্মিত হাসল কার্ল, পরক্ষণেই গম্ভীর হয়ে গেল আবার। বলল, অনেক ভাবনাচিন্তা করলাম। মনস্থির করে ফেলেছি এখন। খাওয়া-দাওয়া সেরেই বাসায় ফিরে গিয়ে বাবাকে বলব, আমি ধরা দিচ্ছি পুলিসের কাছে।

সঙ্গে আনা তাওয়াটা বের করছিল মারিয়া, ঝট করে ঘুরল কার্লের দিকে দৃষ্টিতে ক্রোধ।

বোকার মত কথা বল না। ডাকাতির সঙ্গে তুমি জড়িত ছিলে তার কোন প্রমাণ নেই। এখন তুমি নিরাপদ-মুক্ত। কেন শুধু শুধু ধরা দিয়ে বিপদ বাড়াবে?

 দীর্ঘশ্বাস ফেলল কার্ল। প্রথমত, অন্যায় করেছি। দুই, আমার দোষেই হয়েছে সব। বন্ধুরা মারা গেছে, তারপর আছে স্টেজের সেই নিরীহ যাত্রী। সবাই তাদের জীবন দিয়ে সাজা ভোগ করেছে। আমি কেন বাদ যাব? বুঝতে পারছ না, ভীষণ অন্যায় হবে এটা করা?

ছেলেটার অকপট আগ্রহে মারিয়ার দৃষ্টি নরম হয়ে এল।

প্রায়শ্চিত্ত করতে চাইছ। তাই না?

অনেকটা তাই, মুখ নিচু করল কার্ল। এভাবে বাঁচতে পারব না আমি। কিছু একটা সুরাহা না করলে সারাটা জীবন জ্বলে-পুড়ে মরব 

সি। বুঝতে পারছি। কিন্তু সেজন্য তোমার বাবার সাথে দেখা করবে কেন? তাকে বলার কী দরকার?

জানি না, তবে হয়তো এটা আমার অহঙ্কার। জানোই তো, বাবাকে সবসময় ভয় করতাম আমি, কিন্তু আর না। সেটাই প্রমাণ করতে চাই তার কাছে।

হ্যাঁ, তোমার সিদ্ধান্তই ঠিক। সি, যাবে তুমি।

তুমি খাওয়া গরম কর, এই ফাঁকে আমি আমার ঘোড়া নিয়ে আসছি, বলে বাইরে বেরিয়ে গেল কার্ল। দরজায় গিয়ে দাঁড়াল মারিয়া, দেখল দৃঢ় পদক্ষেপে ছেলেটা এগিয়ে যাচ্ছে ঝরনার দিকে, সংকল্পের ছাপ ওর চলাফেরায়।

উল্টো দিকের ঢালে দাঁড়ানো ঘোড়াসওয়ারকে লক্ষ করল না মারিয়া। কার্লকে দেখছিল লোকটা।

১৪.

কার্লও দেখেনি ওই অশ্বারোহীকে।

ঝরনার পাশ দিয়ে ছোট্ট একটা গুহামুখের কাছে গেল সে, ওর ঘোড়াটা বাধা আছে ওখানে। বাহনের পিঠে জিন চাপাচ্ছে কাল এমন সময় পেছন থেকে একটা রুক্ষ, ক্রুদ্ধ গলা বলে উঠল, ঠিকই ভেবেছিলাম, তোমাকে পাব এখানে। এর আগেও একবার খুঁজেছি, তারপর আর আসিনি। আজ ওই মেক্স ছুঁড়িটাকে দেখেই বুঝেছি বাগে পাব তোমাকে।

ধীরে ধীরে সোজা হলো কার্ল, বিতৃষ্ণায় বেঁকে গেছে ঠোঁট।

তা হলে তুমি আমাকে খুঁজছ, হার্ভে?

আলবত! ওই মেক্স মেয়েটাকে কী বলেছ তুমি?

চাপা গলায় বিদ্রুপের হাসি হাসল কার্ল।

আচ্ছা, তবে এজন্যই ভয় পাচ্ছ তুমি মাতাল অবস্থায় পোর্ক বসে লিউ য়া বলেছে আমাকে। তারপর কী ঘটেছে ওর কপালে? কোথায় ওকে পুঁতে ফেলেছ তুমি? ভয় পাচ্ছ, আমি ফাঁস করে দেব সব?

কঠিন চোখে তাকাল হার্ভে স্টেজ, সমস্ত রক্ত জমা হয়েছে মুখে। আমার সঙ্গে তামাশা কর না, বাছা কর্কশ গলায় বলল। তোমার বাবার হুকুম শুনছি, কিন্তু তাই বলে একটা দুধের বাচ্চার ঠাট্টা সহ্য করব না। এমনিতেও তোমাকে আমি পছন্দ করি না-ভেজা বেড়ালের মত ছোঁক-ছোঁক করে বেড়াও সবসময়।

তুমি কখনোই কারোকে পছন্দ কর না, হার্ভে। সেজন্যই কেউ তোমাকে দেখতে পারে না। আর পারবেই-বা কেন-।

চোপ। কার সাথে কথা বলছিলে তুমি? কজনকে বলেছ এ পর্যন্ত?

 নিঃশব্দে হাসল কার্ল, নিজেকে এখন অসীম ক্ষমতাবান মনে হচ্ছে ওর।

কেন, হার্ভে, বলিনি কারোকে… এখনও। ইচ্ছে করেই তুলে রেখেছি ভবিষ্যতের জন্য, তুমি ঘামতে থাকবে, মনে হবে এই বুঝি লোকজন ফাঁসি দেয়ার জন্য তোমাকে ধরতে আসছে।

কার্ল আবার হাসল, হার্ভের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। না, বলবে না তুমি! খেঁকিয়ে উঠল সে, পিস্তল বের করল।

মুহূর্তে বোবা হয়ে গেল কার্ল। আজন্ম এই লোককে চেনে সে; বন্ধুত্ব না থাকলেও, কল্পনা করতে পারেনি হার্ভে কখনও বন্দুক ধরবে তার দিকে। তবু ওর মনে হলো, হার্ভে হয়তো নিছক চোখ রাঙাচ্ছে, তাই নিজের পিস্তল বের করার কোন চেষ্টাই সে করল না।

খেলনাটা রেখে দাও, হার্ভে, বলল ও। আমাকে তুমি গুলি করতে পারবে না।

ছোটখাট কামান-সদৃশ পিস্তলটা কেঁপে উঠল হার্ভের হাতে, ভোতা ফ্যাকাসে হয়ে গেল ওর দৃষ্টি। ট্রিগার টিপল সে।

পিস্তলের গর্জন প্রতিধ্বনি তুলল রোদেলা মরুভূমিতে।

বিস্ফারিত হয়ে গেল কার্লের চোখ, টলতে টলতে দুকদম আগে বাড়ল সে, রক্তে ভিজে যাচ্ছে শার্ট। ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, আমি মারা যাচ্ছি।

তারপর ভাঁজ হয়ে গেল ওর হাঁটু, মুখ থুবড়ে পড়ল ধুলোয়।

.

লম্বা একটা কাঠের হাতা দিয়ে টর্টিলা নাড়ছিল মারিয়া গুলির শব্দে আপনাআপনি স্থির হয়ে গেল হাত, তারপর তাওয়া নামিয়ে রেখে দৌড়ে বেরিয়ে এল বাইরে।

উদ্বিগ্ন চোখে ঝরনার দিকে তাকাল ও, তারপর ছুটল ওই পথে মাঝামাঝি দূরত্বে পৌঁছে গেছে এমন সময় দেখতে পেল অশ্বারোহীকে।

একনজরেই হার্ভে স্টেজকে চিনতে পারল সে, ঘৃণিত লোকটাকে দেখতে পেয়ে ছোটার গতি কমাল।

পরমুহূর্তে একটা ভয়ের স্রোত বয়ে গেল মারিয়ার শরীরে, ঘোড়াসওয়ার তার উদ্দেশে ছুটে আসছে, চাপা দিতে চাইছে।

ঝট করে একপাশে ঝাঁপিয়ে পড়ল মারিয়া, ঘোড়ার তপ্ত নিশ্বাস লাগল গায়ে। ধুলোর মেঘের ভেতর দিয়ে হার্ভে স্টেজের হিংস্র মুখখানা দেখতে পেল সে, ওর হাতের পিস্তলটা সরাসরি তার পানেই চেয়ে আছে।

গর্জে উঠল পিস্তল, বুলেট লাগার আশঙ্কায় বুকফাটা চিৎকার করে গড়ান দিয়ে সরে গেল, মারিয়া। তবু, ঠিক ওই মুহূর্তে উপলব্ধি করল সে স্টেজ গুলি করেছে কার্লকে, এবং এখন তাকে, একমাত্র সাক্ষীকে খুন করতে চাইছে।

একশো ফুট দুরে ঘোড়ার রাশ টেনে ধরল হার্ভে, ক্রুদ্ধ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, এবার তোকে আমি শেষ করবু, মেক্সিক্যান কুত্তী।

আবার উঠে পড়েছে মারিয়া, কাপড়চোপড়, মুখ, আর চুল ধুলোয় মাখামাখি, দাঁড়িয়ে আছে ঈষৎ উবু হয়ে, আগুন ঝরছে দুচোখ থেকে। ওর উদ্দেশে ঘোড়া দাবড়াল হার্ভে।

 মেয়েটার ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে সে এমন সময় দুবার গর্জে উঠল একটা রাইফেল। মাথার ওপর বুলেটের হিংস্র গুঞ্জন শুনতে পেল মারিয়া। হার্ভে স্টেজের গায়ে লাগেনি ওগুলো, তবে দৌড় থামিয়ে বাউলি কেটে একপাশে সরে যেতে বাধ্য করেছে তাকে। যেদিক থেকে এসেছিল গুলি এখন সেদিকে তাকিয়ে আছে স্টেজ।

মারিয়াও তাকিয়েছিল ওইদিকে, তারপর গ্রীনের ধাবমান বিশালকায় স্টীলডাস্টকে যখন চিনতে পারল মনে মনে বলল, খোদা মেহেরবান।

জেমস গ্রীন যখন পয়লা গুলির আওয়াজ শুনতে পায় তখনও সে শীপ র‍্যাঞ্চ থেকে বেশ দূরে ছিল। ঝড়ের বেগে খাড়াইয়ের মাথায় ছুটে আসে ও, দেখে হার্ভে স্টেজ মারিয়াকে ঘোড়ার পায়ের তলায় পিষে মারার চেষ্টা করছে। ক্রোধ জেগে উঠল ওর মাঝে, বুট থেকে বের করল রাইফেল। তখনও দুশো গজ দূরে রয়েছে গ্রীন, হঠাৎ হার্ভেকে আবার ধেয়ে যেতে দেখে বুঝল, আর অপেক্ষা করা চলবে না। কড়া রোদে ছোটাছুটি করায় এমনিতেই মাথা ঝিমঝিম করছিল ওর, তার ওপর ধীরে-সুস্থে নিশানা করার সময় ছিল না। বাঁ হাতে লাগাম আর ডান হাতে পিস্তলের ঢঙে রাইফে ধরে গুলি করল সে-তারপর আরেকটা কার্তুজ চেম্বারে পাঠিয়ে আবার ট্রিগার টিপল।

তাড়া করে স্টেজকে ধরতে চেষ্টা করল ও, কিন্তু আচমকা ডানে মোড় নিল অ্যাংকর ফোরম্যান, দ্রুতগতিতে ছুটল দূরের ঢাল বরাবর, নুয়ে পড়েছে স্যাভলে।

গ্রীন ধাওয়া করল ওকে, ঘোড়ার পেটে অনবরত স্পার বসাচ্ছে, তারপর মারিয়ার কথা স্মরণ হতে রাশ টানল। যত্নের সঙ্গে লক্ষ্যস্থির করে তৃতীয়বার গুলি ছুড়ল সে। কিন্তু চোখ ধাঁধানো কমলা-হলুদ আলোয় নিশানা নড়ে গেল, ট্রিগার টানার সময়েই গ্রীন বুঝতে পেরেছিল এবারও ফসকে যাবে তার গুলি তারপর খাজের ওপাশে, অদৃশ্য হলো হার্ভে স্টেজ।

পরে ধরলেও চলবে একে, সখেদে ভাবল গ্রীন।

ঘোড়া ঘুরিয়ে নিল সে, লক্ষ করল ঝরনা-সংলগ্ন উইলো ঝোপের পেছনে হারিয়ে যাচ্ছে মারিয়া। ওকে অনুসরণ করল গ্রীন, মিনিট কয়েক পর দেখল একহারা গড়নের এক যুবকের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে আছে ও মুখ তুলল মারিয়া, তামাটে ত্বকের নীচে আশ্চর্যরকমের ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে ওকে। চোখ দুটো বিস্ফারিত, ছলছলে।

দোল খেয়ে মাটিতে নেমে ওর কাছে হেঁটে গেল গ্রীন।

কার্ল? জিজ্ঞেস করল সে।

অসাড় ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল মেয়েটা।

মারা গেছে?

বোধহয়

এক হাঁটুতে বসে নাড়ি দেখল গ্রীন। পেল না। এবার কার্লের পাতলা চিবুকের নীচে বুড়ো আঙুল, ঠেসে ধরুল সে। অনুভব করল খুব দ্রুতলয়ে অথচ দুর্বল সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। উঠে দাঁড়াল গ্রীন।

বেঁচে আছে এখনও। বাসায় নিয়ে যেতে হবে! আমি পারব বইতে, কিন্তু মারাত্মক ঝাঁকুনি লাগতে পারে। আমাদের আসলে এখন দরকার একটা স্ট্রেচার। বাশ-টাশ কিছু আছে বাড়িতে?

আছে, কোরালের।

চলবে, তুমি এখানেই থাক।

ফের স্যাডলে চেপে জোরকদমে বাড়ির দিকে ছুটল গ্রীন। একটু বাদে দুটো সরু খুঁটি আর একটা কম্বল নিয়ে ফিরে এল সে। দেখল মারিয়া তার পেটিকোটের একটা প্রান্ত ছিড়ে সেটা ভিজিয়ে কার্লের মুখ মুছে দিচেছ।

দৃক্ষহাতে কম্বলটা দুভাঁজ করল গ্রীন, প্রত্যেক কোণে ছুরি দিয়ে চিরে ফেলল খানিকটা অংশ, ফুটোগুলোর ভেতর সাবধানে ঢুকিয়ে দিল খুঁটি দুটো। ও আর মারিয়া ধরাধরি করে কার্লকে আলতোভাবে শোয়াল কম্বলের ওপর। তারপর চলনসই স্ট্রেচারটা দুজনে মিলে তুলে নিয়ে বাসার পথ ধরল। কার্লের ওজন বেশি না, ফলে কষ্ট হচ্ছে না তেমন।

বাসায় পৌঁছে কার্লকে একটা বাংকে শুইয়ে দিল ওরা। গ্রীন আড়মোড়া ভাঙল।

ওকে বাকবোর্ডে করে নেয়া যায় শহরে, তবে মনে হয় না ধকল সইতে পারবে। তার চেয়ে আমি বরং ডাক্তার ডাকতে যাই। একটু ইতস্তত করল সে, তারপর বলল, দাঁড়াও।

ঝরনার পাড় থেকে নিজের ঘোড়াটা আনতে ছুটে বেরিয়ে গেল গ্রীন। ও ফিরে আসতে দরজায় গিয়ে দাঁড়াল মারিয়া। গ্রীন বুট থেকে রাইফেলটা বের করে দিল ওর হাতে। এটা, ও যদি ফিরে আসে তার জন্য। এলে, আশা করি সোজা গুলি ছুঁড়তে পারবে তুমি।

গ্রীনের দিকে তাকাল মারিয়া, রাইফেল ধরে আছে, চকচক করছে চোখ।

তোমার বিছানায় থাকার কথা। তবু এসেছ তুমি? কেন?

শুনলাম বাকবোর্ড নিয়ে বেরিয়েছ, আমার সন্দেহ হলো কার্লের সঙ্গে দেখা করতে আসতে পার তুমি।

হাত বাড়াল মারিয়া, দুম করে একটা কিল বসাল গ্রীনের উরুতে।

বোকা গ্রিংগো। এখন কেমন আছ?

খুব খারাপ, গ্রীন হাসল, রওনা হয়ে গেল মারিয়ার চুলে একবার বিলি কেটে, ভাবছে মিথ্যে কথা বলেনি সে। আসলেও খারাপ লাগছে ওর, দুর্বল অবসন্ন বোধ। করছে। তবে, ও জানে, আস্তে আস্তে কেটে যাবে এটা। শহরে ঢোকার সময় গ্রীন কামনা করল ডাক্তারকে যেন তার চেম্বারেই পাওয়া যায়। জরুরি তলবে বাইরে কোথাও গিয়ে থাকলেই বিপত্তি।

.

চেম্বারে ঢুকে হাঁপ ছাড়ল গ্রীন। ডেস্কে বসে প্রেসক্রিপশন লিখছিল ডাক্তার, ফ্যালফ্যাল করে তাকাল ওর দিকে, অবাক হয়েছে।

বিছানা ছেড়ে উঠেছ কেন? কমপক্ষে আরও তিন দিন তোমার শুয়ে থাকা উচিত।

ও কিছু না ডক।

সংক্ষেপে এবং দ্রুত ডাক্তারকে বলল গ্রীন কী ঘটেছে। ওর বক্তব্য শেষ হবার আগেই তড়িঘড়ি তৈরি হয়ে নিল ডাক্তার। গ্রীন তাকাল তার দিকে।

বাড়িটা চেন?

অবশ্যই। মিস্টার গার্সিয়া মারা যাবার আগে কতবার দেখতে গেছি। মরতে অনেক সময় লেগেছিল বেচাররি। যাই হোক, এবার তুমি বিছানায় ফিরে যাও, নইলে এরপর আবার তোমাকে নিয়ে টানাটানি হবে।

যাব, ডাক্তার। তোমাকে ঘোড়া, বা বাকলোর্ড কিছু একটা এনে দেব?

লাগবে না, বাসার পেছনে আমার নিজেরই ছোট একটা আস্তাবল আছে। লোক রেখেছি, ওকে বললে ও-ই দেবে এনে। তুমি এখন বিছানায় যাও।

গুড লা ডক।

রাস্তায় নেমে হাঁটতে হাঁটতে হোটেলে ফিরে গেল গ্রীন। সরাসরি খাবার ঘরে ঢুকল ও। এখনও সন্ধ্যে হয়নি, জনা দু-তিনেক খদ্দের আছে মোটে। ওয়েট্রেস আসতে দিনের স্পেশাল মেনু, বিফ স্টয়ের ফরমার্স দিল সে। সবিস্ময়ে লক্ষ করল গ্রীন, যা ভেবেছিল তার বেশি খিদে পেয়েছিল ওর, অনায়াসে দুই বাটি স্টু আর দুকাপ কফি সাবাড় করল। খাওয়া সেরে সোজা রাস্তায় পিপার মকের দফতরে গেল ও, দেখল জানালা দিয়ে-আনমনে বাইরে তাকিয়ে আছে মার্শাল।

স্বীকার করছি বিছানা থেকে ওঠা উচিত হয়নি আমার, মার্শাল মুখ খুলতে পারার আগেই বলল গ্রীন। আমি

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওকে মাপছিল মক।

তোমার মাথা ঠিক আছে তো? সকালে আমি ঘোড়া এনে দিয়েছিলাম তোমাকে, মনে নেই?

সিলিংয়ের পানে তাকাল গ্রীন, ধীরে ধীরে মাথা নাড়াল।

ঠিক আছে, পয়লা জিত তোমার, মার্শাল। তবে এবার মন দিয়ে শোনো।

শীপ র‍্যাঞ্চের ঘটনা ওকে জানাল গ্রীন, বলল ডাক্তার রওনা হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।

মক উঠে দাঁড়াল, পাতলা ঠোঁটজোড়া পরস্পর চেপে বসেছে।

এবার তা হলে আমাকে খেলা শুরু করতে হয়, টুপি পরতে পরতে বলল ও। খোদা জানে, তুমি এমনিতেই অনেক করেছ।

ওটাই আমার দায়িত্ব, বলল গ্রীন, বিরক্ত হয়েছে। তুমি বাথানে যাচ্ছ?

হার্ভে ওখানেই যাবে, আমার ধারণা।

মারিয়া, আমি দুজনেই দেখে ফেলেছি ওকে, পালাবার চেষ্টা করাই স্বাভাবিক।

স্বাভাবিক। বাথানে গেলেই বুঝতে পারব।

নিশ্চয়ই। আমি গার্সিয়াদের র‍্যাঞ্চে ফিরে যাচ্ছি। জানা দরকার কেমন আছে ছেলেটা।

হলদেটে চোখ দুটো পিটপিট করে গ্রীনকে জরিপ করল মার্শাল। অসন্তুষ্ট গলায় বলল, বেঁচে গেলে নিশ্চয় ওকে টাওসে ধরে নিয়ে যাবে তুমি-আর ওরাও হয়তো ফাঁসি দেবে ওকে।

পকেট থেকে একটা চাবির গোছা বের করল মক, ডেস্কের পেছনের দেয়াল ঘেঁষে রাখা ক্যাবিনেট খুলে রাইফেল বের করে নিল একটা। ওটা পরখ করল সে, একটা বাক্স থেকে একমুঠো কার্তুজ নিয়ে কোটের সাইড পকেটে রাখল। তারপর বন্ধ করল ক্যাবিনেট, ক্লান্ত দেখাচ্ছে, মাত্র এই ক’মিনিটেই যেন বয়স বেড়ে গেছে কয়েক বছর।

সহজ হবার চেষ্টা কর, পরামর্শ দিল গ্রীন, রূঢ় স্বরে।

এই দায়িত্বটা নেয়ার পর থেকে আমি সহজভাবেই নিচ্ছি সবকিছু, কিন্তু এবার টাকাটা হালাল করা দরকার। তারপর বেরোবার মুখে গ্রীনের উদ্দেশে ঝাঝের সঙ্গে বলল, তুমি চেষ্টা কর সহজ হতে।

পেছন থেকে ওর পানে তাকিয়ে রইল গ্রীন; ধীরপায়ে টেরিলের আস্তাবলের দিকে হেঁটে যাচ্ছে মার্শাল, হাতে রাইফেল, গায়ে একটা কালো কোট,তারপর ও চোখের আড়াল হতে স্টীলডাস্টে চেপে শীপ র‍্যাঞ্চে পথ ধরল সে।

১৫.

হিংস্র মেজাজে অ্যাংকর ইয়ার্ডে প্রবেশ করল হার্ভে স্টেজ। স্যাডল থেকে নেমে হিচ রেইলে লাগাম বাঁধল ও, দুমদুম করে পা ফেলে অফিস-ঘরের দিকে এগোল। খোলাই ছিল দরজা, ভেতরে ঢুকে হার্ভে দেখল হালাম তার পুরু গদি আঁটা চেয়ারে ডুবে আছে, পাশেই মেঝের ওপর পড়ে আছে একটা আধখালি বোতল। দুদিন হলো দাড়ি কামায়নি হালাম, মুখ রক্তবর্ণ হয়ে আছে, ফোলা-ফোলা। ড্রাম ডার্লিংয়ের সঙ্গে ওদের সাক্ষাতের পর ফিরে এসে আর বেরোয়নি সে, র‍্যাঞ্চে বসে মদ খেয়েছে সারাক্ষণ। নিশ্চিত না হলেও, হার্ভে অনুমান করতে পারে এর কারণ-তবে এখন সে পরোয়া করে না কোনকিছুর।

বার দুই-তিনেক পিটপিট করে চোখের পাতা মেলল হালাম, ভুরু কোঁচকাল, সোজা হয়ে বসল চেয়ারে। মেঝে থেকে বোতলটা তুলে নিল সে, ছিপি খুলে ঢকঢক করে গলায় ঢেলে দিল খানিকটা তরল পদার্থ। তারপর একটা চেঁকুর তুলে বলল, ড্রামকে খুন করেছ তুমি। কেন?

ড্রাম মারা গেছে জানলে কীভাবে? হার্ভে সন্দিগ্ধ।

শহর থেকে সকালে একজন কাউহ্যান্ড ফিরেছে। শুনেই বুঝেছি কার কাজ। কেন খুন কুরতে গেলে ওকে?

মুখ বিকৃত করল হার্ভে, কোমরে গোঁজা ছুরির বাঁটটা চেপে ধরল।

ড্রাম সব বেচে দিয়ে পালাচ্ছিল দেশ ছেড়ে, গরগর করে উঠল হার্ভে। স্যালুনে খবরটা পাই আমি। দোকানের পেছন দিকে গিয়ে দরজা খোলাই ওকে ডেকে। তারপর কথা বলি। জ্বলজ্বল করছে ফোরম্যানের চোখ, ক্রুর ভঙ্গিতে বেঁকে আছে ঠোঁট। বলল ভাল দাম পাচ্ছে, বিক্রি করবে না কেন। এমনিতেও লোকটাকে দেখতে পারতাম না, দিয়েছি শেষ করে।

বিরক্তি প্রকাশ করল হালাম। মদ খেল আরেক ডোক। ওর কার্যকলাপ লক্ষ করছে হার্ভে, ভাবছে দিনের এই সময় কখনও এত মদ খেত না অ্যাংকর মালিক।

গ্রীনের খবর কিছু জানো? রুক্ষ স্বরে প্রশ্ন করল হালাম।

ওর দৃষ্টি এড়িয়ে গেল হার্ভে।

তুমি জানো সবই, ক্ষিপ্ত সুরে জবাব দিল সে। স্যাম ট্যানারকে খুন করেছে, ওর মাথায় আর কোমরে চোট লেগেছে। আমি যদ্দুর জানি, হোটেলের বিছানায় এখনও শুয়ে আছে ও।

আমি আশা করেছিলাম তুমি ওর মরার খবর দেবে, ম্লান গলায় বলল হালাম। এখানে এসেছিল সে, ফ্লিন্টকে খুন করে, ভার্জিল রীডের স্যালুন ভাঙচুর করেছে।

তারপর আমি যখন ওই মেক্স ছুকরির ক্যান্টিনায় গেলাম ও শাসাল আমাকে। হ্যাঁ, ওখানেও ছিল গ্রীন, মেয়েটার পাশেই দাড়িয়েছিল। আর সবশেষে স্যাম ট্যানারকে মারল–দেশের সেরা পিস্তলবাজদের একজন ছিল স্যাম। হারামির ভাগ্যটাই দারুণ। অ্যামবুশ না করে, স্যামের উচিত ছিল খোলা জায়গায় ওকে আক্রমণ করা।

নাক চুলকাল হার্ভে। ফ্রেডের বিচলিত হবার কারণ এখন বুঝতে পারছে সে। জেমস গ্রীন, এখানে আসার পর থেকেই লোকটা বারবার টেক্কা মারছে ওর ওপর। চুলোয় যাক ফ্রেড, ভাবল স্টেজ। এক পা এগিয়ে এল সে, বলল, ড্রামকে খুন করার দায়ে, মক, আমার পিছু নিয়েছে। সিন্দুকে যা আছে আপাতত তাই দাও আমাকে, কিছুদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকব কোথাও।

চোখ পিটপিট করল হালাম। বলল, কী?

আমার কথা শুনতে পেয়েছ তুমি। খেঁকিয়ে উঠল হার্ভে। এই র‍্যাঞ্চের অর্ধেক শেয়ার আমার। কিন্তু এখন সিন্দুকে যা আছে তাই দাও।

পাগল, এখানে তোমাকে আমার দরকার। হপ্তাখানেকের মধ্যে গরুবাছুরের খোঁজ নিতে যায়নি কেউই। কার্টার মন্দ না, কিন্তু কোনওরকম ঝামেলা হলে কতটা কি সামলাতে পারবে আমি জানি না। 

কার্টার সামলাতে পারবে না এমন ঝামেলা হবে না, জবাব দিল হার্ভে, মনে মনে পুলকিত হয়েছে কারণ জীবনে এই প্রথম ফ্রেড তার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করল। দেখল আবার মদ খাচ্ছে হালাম। একটা সুস্থ-সবল আত্মবিশ্বাসী মানুষ কত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যেতে পারে ভেবে অবাক হলো হার্ভে। হয়তো গ্রীন সম্পূর্ণ দায়ী নয় এর জন্য হয়তো বাপের ওপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে ছেলেটা যা করেছে, স্টেজ ডাকাতি, সেটাই শেষপর্যন্ত কুরে কুরে খাচ্ছে ওকে। ভেতরে ভেতরে হালামের প্রতি করুণা বোধ করল হার্ভে।

 টাকাটা আমার দরকার, এবং এক্ষুণি! কর্কশ গলায় বলল সে। সঙ্গে নেয়ার মত কিছু মালপত্র গোছাতে যাচ্ছি এই ফাঁকে টাকাটা তুমি বের করে রাখ।

হাজারখানেকের বেশি হবে না, বড়জোর।

চলবে, বলে বেরিয়ে গেল হার্ভে, ক্যারেজ হাউসে এর ঘরের দিকে যাচ্ছে।

পেছন থেকে ওকে একটুক্ষণ লক্ষ করল হালাম। তারপর আবার ভুরু কেঁচকাল সে, দাড়িতে হাত ঘষল জোরে জোরে, ভাবল আজই কেটে ফেলতে হবে। অতীতে মাঝে-মধ্যে মাতাল হয়েছে ও, তবে একেবারে ভিন্ন কারণে, একঘেয়েমি দূর করতে কিংবা হয়তো দুর্বিষহ ঠেকেছিল জীবন। উঠে সিন্দুক খুলতে গেল সে; টিনের ক্যাশবাক্সের ওপর থেকে ৪৫ কোল্টটা তুলে নিল হালাম, তারপর সিন্দুকের ভারি ডালা বন্ধ করে বাক্সসমেত ফিরে এল নিজের ডেস্কে।

টাকার তোড়াগুলোর দিকে তাকাল ও, কিন্তু গুনতে ইচ্ছে হলো না। চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে এক ঢোক মদ খেল হালাম, উপলব্ধি করছে হার্ভে চলে গেলে তার অপূরণীয় ক্ষতি হবে। জাহান্নামে যাক। ও ফিরে আসবে আবার, আসতে হবে, হালাম ভাবল। চিরকাল হার্ভে নীরবে আর সমস্ত হুকুম, এমনকী মানুষ খুন পর্যন্ত করে আসছে বলে ওর প্রতি একধরনের করুণা বোধ করে সে। বেশির ভাগ মানুষের মত, ওর জন্ম হয়েছে ব্যবহৃত হতে; খুব কমসংখ্যক লোকই আছে, যেমন সে নিজে হালাম ভাবল, যারা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হবার যোগ্যতা রাখে।

নিদারুণ তাচ্ছিল্যের সাথে হালাম তার ছেলের কথা ভাবল। ছেলেটা সবসময় তার বিরক্তির কারণ ঘটিয়েছে, ওর উপস্থিতি অসহিষ্ণু করে তুলত তাকে। ও কোথায় আছে হালাম জানে না, জানার আগ্রহও নেই, যদিও ওর ঘোড়াটা পাওয়া যাচ্ছে না শুনে বুঝেছে কার্ল এসেছিল বাসায়।

বোতলটা শেষ করল হালাম, তারপর ঘরের কোণে অন্যান্য খালি বোতলের সঙ্গে ওটা রেখে দিয়ে নতুন আরেকটা বের করল লিকার কেবিনেট থেকে।

ওটা থেকে এক ঢোক খাবে সে এমন সময় ডেস্কের পাশের খোলা জানালা দিয়ে দুজন মানুষের কথাবার্তা শুনতে পেল।

পর্দাটা একপাশে সরল হালাম, ফোরম্যানের সঙ্গে আলাপরত অশ্বারোহীকে দেখল ভাল করে, বুঝল এটা মার্শাল পিপার মক।

মাথা সাফ করার জন্য এপাশ-ওপাশ নাড়াল সে, কান খাড়া করল।

হার্ভে বলছিল, …মিথ্যেকথা।

হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল মক। তুমি ওকে গুলি করেছ, হার্ভে। মারিয়া গার্সিয়াকেও মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিলে। গ্রীন উপস্থিত না হলে, ঠিকই খুন করতে। এখন তোমাকে গ্রেফতার করতে এসেছি আমি।

বললাম তো, মিথ্যে বলছে ওরা!

এসব বলে তুমি বাঁচতে পারবে না, হার্ভে। আমার কাছে প্রমাণ নেই, কিন্তু জানি ডার্লিংকেও তুমিই খুন করেছ। লাইল ক্যানাডাকেও। তবে কার্লকে গুলি করার ব্যাপারটা প্রমাণ করটে পারব আমরা। ও যদি মারা যায় ফাঁসি হবে তোমার। আমি যতটুকু জানি বাচার আশা কম। এবার তোমার গানবেল্টটা খুলে

বজ্রাহতের মত কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল হালাম। তার ছেলে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে, হার্ভে বেঈমানি করেছে এই খবর দুটো ওর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে দারুণভাবে।

নিশিতে পাওয়া মানুষের মত সিন্দুকের কাছে এগিয়ে গেল সে, ঝট করে ডালা তুলে পিস্তলটা বের করে নিল।

পিঠের কাছে রেখে বাইরে বেরোল সে, বাসার কোনা ঘুরে এসে থামল।

…চেষ্টা কর না, বলছে হার্ভে ঈষৎ বাঁকা হয়ে আছে সে, ডান হাতটা ঝুলছে পিস্তলের বাঁটের ওপর। তুমি ড্র করার আগেই তোমাকে খুন করতে পারব আমি। বিশ্বাস না হয়, নিতে পার ঝুঁকি

হার্ভের ঘাড়ের পাশ দিয়ে সামনে তাকাল মক, দেখতে পেল হালামকে, কিছু বলল না।

হার্ভে, ডাকল হালাম।

ওর কণ্ঠে এমন কিছু ছিল যে আড়ষ্ট হয়ে গেল হার্ভে।

কী? বলল সে।

এদিকে ফের, হার্ভে।

হার্ভে ফিরল না-পাঁই করে ঘুরে গেল লাটিমের মত, এবং সেইসঙ্গে ঝাঁপ দিল একপাশে, হাত চলে গেছে পিস্তলে।

কোন লাভ হলো না। হালামের পয়লা গুলি ওর কাঁধে বিঁধল, হাঁটু ভেঙে পড়ে গেল সে। দ্বিতীয়টা ঢুকল পেটে, তিন নম্বর ওর বুকের খাঁচা খুঁড়িয়ে দিল।

হাঁটুতে ভর দিয়ে ওঠার প্রয়াস পেল হার্ভে, মুখ থুবড়ে পড়ল।

হালাম তার পিস্তল ফেলে দিল, হাঁটু গেড়ে বসল হার্ভের পাশে, চিত করে ওর মরা মুখে চড় মারল। মকের দিকে চোখ তুলে তাকাল অ্যাংকর মালিক, ওর চেহারায় যন্ত্রণার আভাস দেখে বিস্মিত হলো মার্শাল।

নিপাত যাক, হারামজাদা, নিপাত যাক, কর্কশ কন্ঠে বলল হালাম।

কী লাভ বলে। মারা গেছে ও, বলল মার্শাল।

আমি হার্ভের কথা বলছি না, বোকা গাধা কোথাকার! বলছি গ্রীনের কথা। ওই সব নষ্টের গোড়া, না হলে সব ঠিক করে ফেলতাম আমরা। কিন্তু বেজন্মটা এসেই ভণ্ডুল করে দিল।

একটা বিশেষ কাজেই এখানে এসেছে ও, কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল মক।

কাজ! ও এমনকী পুলিসের লোকও না। ওর মত লোক দরকার নেই আমাদের।

মুখ খুলতে গিয়েও আবার বন্ধ করল মক। বলল না কিছু।

বেজন্মা, হালাম খিস্তি-করল।

আমার বিশ্বাস, এবার তুমি ছেলের কথা জানতে চাইবে, বলল, মক। জানালা থেকে আমার কথা শুনতে পেয়েই হার্ভেকে খুন করেছ তুমি, তাই না?

না।

অ, একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল মক টুপি নাচিয়ে মাথা চুলকাল সে, তারপর আবার যথাস্থানে বসাল ওটা। স্রেফ রেকর্ডের খাতিরে, হার্ভেই ছুরি মেরেছে ডার্লিংকে?

এখন সে কথা জেনে লাভ নেই কোন। আছে?

বললাম তো রেকর্ডের খাতিরে।

ঠিক আছে। হ্যাঁ, ডার্লিংকে ও-ই খুন করেছে, মরা মুখের দিকে চোখ নামিয়ে জবাব দিল হালাম। ক্যানাডাকেও, যদি সেটাও জানতে চাও। মুখ তুলল সে, চোখের তারায় আগুন। ছুরিটা ও গ্রীনকে মারলেই আমি খুশি হতাম।

হালাম মাতাল হয়ে আছে, ভাবল মক। এরকম অবস্থায় এটাই স্বাভাবিক। তবু কোন মানুষের মাঝে এত পরিবর্তন সে দেখেনি কখনও। উন্মাদ মনে হচ্ছে ওকে।

আচ্ছা, ও তা হলে ক্যানাডাকেও মেরেছে, মক বলল। আমিও তাই, ভেবেছিলাম। তা এক্ষেত্রে তোমার অবস্থানটা কী দাঁড়াচ্ছে?

হালাম তখনও জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল মকের দিকে। যাই দাঁড়াক, আমাকে জেলে পুরতে পারছ না তুমি-এটুকু বলতে পারি!

ঠিক আছে, ফ্রেড। আমি কোন সাহায্যে আসতে পারি?

সরাসরি উত্তর দিল না হালাম। দুহাতে হার্ভের লাশটা তুলে নিয়ে সোজা হলো।

এই জঞ্জালটা সরাতে পার আমার বাড়ি থেকে। তুমি না এলে, এতক্ষণে চলে যেত ও। অনেক দেরিতে জানতে পেতাম আমি, ওকে খুন করতে হত না। যাও, বেরিয়ে যাও এবার।

ঘুরে হার্ভের লাশ অফিসে বয়ে নিয়ে গেল হালাম। অসহায় ভঙ্গিতে মাথা নাড়াল মক, শ্রাগ করল, ধীর পদক্ষেপে রওনা হলো শহরের উদ্দেশে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *