০৬-১০. উৎফুল্ল মনে অকটিওতে ফিরে যাচ্ছে

উৎফুল্ল মনে অকটিওতে ফিরে যাচ্ছে গ্রীন ভাবছে সেজের ঘটনাবলী যখন জানতে পাবে তখন কেমন হবে হালামের চেহারা। মাইলখানেক চলে এসেছে, চকিতে আরেকটা কথা খেয়াল হলো কার্ল গার্সিয়াদের শীপ র‍্যাঞ্চে লুকিয়ে থাকা বিচিত্র না। কার্লোস মৃত, ডিউক রিপ হাজতে-ফলে বাসাটা এখন ওর কাছে নিরাপদ মনে হওয়াই সঙ্গত।

হ্যাট ব্রিমের নীচ থেকে চোখ কুঁচকে সূর্যের দিকে তাকাল গ্রীন, অনুমান করল এখন বেলা দুটো হবে। ওর পেছনে, পশ্চিমে, অসংখ্য পাহাড়; হালামের অ্যাংকর র‍্যাঞ্চ এই পর্বতমালার গোড়ায় অবস্থিত। সামনে দিগন্তবিসারী উত্তপ্ত মরুভূমি, রোদে পুড়ছে। কমলা-হলুদ আলোয় উদাসী রূপ ধরে আছে বন্ধুর প্রান্তর। এখানে-সেখানে সেজ, কিওসোট আর ক্যাকটাসের ঝোঁপ। সূর্যের অবস্থান বিচার করে পথ নির্ণয় করল গ্রীন দক্ষিণপুবে বাঁক নিল, ভাবছে, এ পথে গন্তব্যের কতটা কাছে পৌঁছাতে পারবে ও, নাকি হারিয়ে যাবে মরুভূমিতে।

আরেকটু হলেই ভুল রাস্তায় চলে গিয়েছিল সে। দুই ঘণ্টা বাদে, ক্লান্ত দেহে দীর্ঘ একটা খাড়াই বেয়ে খা বরাবর ঘোড়া হটিয়ে উঠছে ও, হঠাৎ চোখের কোণে বা দিকে সবুজে ঘেরা ঝরনাটা দেখতে পেল। ঘোড়া ঘুরিয়ে ওদিকে এগোল গ্রীন; এক মিনিট পর বাসা আর নড়বড়ে কোরালটা চোখে পড়ল, কিন্তু এতদূর থেকে বোঝা সম্ভব হলো না কাছেপিঠে আর কেউ আছে কিনা।

তাড়াহুড়ো করল না ও, কোন প্রয়োজন নেই তার। জানোয়ারটা যখন পানির গন্ধ পেল তখন অপন:আপনি মাথা সামনে ঝুঁকিয়ে জোরকদমে ছুটতে শুরু করল। মিনিট কয়েক পর ঝোঁপঝাড় ভেঙে ঝরনায় পৌঁছে গেল সে, মুখ ডোবাল অগভীর পানিতে। গ্রীনেরও তেষ্টা পেয়েছিল, ছিলে নামল স্যাঙল থেকে।

উইলো ঝেপের ছায়ায় ঠাণ্ডা পানি খেয়ে প্রাণ জুড়িয়ে গেল ওর। যখন খাওয়া শেষ হলো ধীরে ধীরে উঠে দাড়িয়ে মাথায় হ্যাট চাপাল, তারপর আগের দিন, যে খাড়াইয়ের কিনার থেকে বাথানটা প্রথমে চোখে পড়েছিল সেটার পানে তাকাল। বেশ ঝরঝরে বোধ করছে ও।

ঘোড়ার দিকে ঘাড় ফেরাল গ্রীন। দেখল ঝরনার পাড়ে ঘেসো জমিতে মহানন্দে চরছে জানোয়ারটা। এবার পানি, ভেঙে অপর পাড়ে চলে গেল সে, উইলো ঝোঁপের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গিয়ে জরিপ করল দালানটা। কেউ নেই ধারেকাছে, কোরালটাও শূন্য। ছাতের ওপর আগের দিন কয়েকটা আগ্নেয়াস্ত্র ছুঁড়ে ফেলেছিল মনে পড়তে সিদ্ধান্ত নিল আজ সেগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে যাবে শহরে, মার্শালের দফতরে জমা দেবে। বাসার উদ্দেশে রওনা দিয়েছে ও, হঠাৎ বিকট শব্দে গর্জে উঠল একটা রাইফেল।

ভোমরার গুঞ্জন তুলে ওর কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেল বুলেট, চোয়ালের হাড়ে তপ্ত সীসার ঘঁাকা লাগল। পেছন দিকে, ঝোঁপের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল গ্রীন, প্রাণপণ প্রয়াস পেল রাইফেলের আওতা থেকে সরে যাবার। পরমুহূর্তে আরও দুটো গুলি, ছুটে এল। এবার কাছ থেকে। খুউব কাছে। একদিনে দুই-দুবার ফাঁদে পা দেয়ায় নিজেকে গাল দিল ও। দীর্ঘ পদক্ষেপে মাত্র চার কদমে ঝরনা অতিক্রম করল সে, ঝোঁপঝাড় : তুড়ানো-ছিটানো রোল্ডারের মাঝ দিয়ে ছুটতে ছুটতে চলে গেল পাহাড়ের ওপাশে, এই বেরঠে এল খাজের মাথায়।

চালের গায়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল গ্রীন, হাঁপাচ্ছে, কিনার থেকে সাবধানে মাথা জাগিয়ে দেখা দালানের একপাশে একটা বোর্ড রাখা। অনুমান করল, যে লোকই গুলি ছুড়ে থাকুক ওর উদ্দেশে সে এর পেছনে লুকিয়ে আছে।

গ্রীন এর পিস্তলটা বের করে দৌড়ে নেমে গেল ঢাল বেয়ে উর্ধ্বশ্বাসে ছুটল বাড়ির দিকে। পাটাতনের ওপর ভাঁজ করা কম্বল আর কিছু কাপড়চোপড় পড়ে আছে লক্ষ্য করে, নোনা ধরা দেয়াল আর বাকবোর্ডের মাঝামাঝি জায়গায় গুড়ি মেরে বসে পড়ল। ছাতের ওর যেসব অস্ত্রশস্ত্র ছুঁড়ে ফেলেছিল দেখেই সেগুলো চিনতে পেরেছে ও।

বাঁকবোর্ডের ছটফটে ঘোড়াগুলোকে পাশ কাটিয়ে দালানের কোণে চলে গেল সে। পরক্ষণে শ্যামলা একটা অবয়ব আচমক এসে পড়ল ওর সামনে, ঠোলকি হলো ওদের। তারপর গ্রীন অনুভব করল একজন ক্রুদ্ধ মহিলার গায়ে হাত পড়ে গেছে। তার।

ঘন কালো দীর্ঘ এক গোছা চুল দেখতে পেল সে, লম্বাটে শ্যামবর্ণ মুখের দুপাশ দিয়ে নেমে গেছে। চোখ দুটো ডাগর কালো; টানা টানা ভ্রূ, লম্বা পাপড়ি! গ্রীনকে চিনতে পেরে তীব্র আক্রোশে শ্যামাঙ্গিনীর পুরু ঠোঁটজোড়া উল্টে গেল। আমি খুন: করব তোমাকে সত্যিই খুন করব একদিন, আমার ভাইকে মেরেছ তুমি। ছুরির মত ধার ওর ঘৃণায়। খুনী! তুমি মেরেছ ওকে, তুমি!

মেয়েটাকে একপাশে সরিয়ে ওর হাত থেকে রাইফেলটা কেড়ে নেয়ার সময় এই সুডৌল পেলব শরীরের নীচে কাঠিন্যের আভাস পেল গ্রীন। ওর নিজের মুখ শক্ত হয়ে আছে। মার্শাল মকের সঙ্গে কথা হয়েছে তোমার। পাদ্রির সাথে আলাপ করেছ। নিশ্চয় শুনেছ লাইল ক্যানাডা খুন করেছে তোমার ভাইকে।

তুমি বা অন্য কেউ-একই কথা। হিসহিস করে উঠল শ্যামাঙ্গিনী। এখানে কেন এসেছ। কী চাই তোমার?

কার্ল হালামের খোঁজে, জবাব দিল গ্রীন, এখন ছেড়ে দিয়েছে মেয়েটাকে উদ্ধত বনবেড়ালির মত মাথা ঝাঁকিয়ে এক কদম পিছিয়ে গেল সে, দৃষ্টিতে আগুন

যাতে ওকেও খুন করতে পার! ঘৃণায় ভরে আছে শ্যামাঙ্গিনীর চোখ, তবু সকৌতূহলে গ্রীনের মুখখানা জরিপ করছে। মারামারি করেছ তুমি। কোথায়?

ইতস্তত করল গ্রীন, চোয়ালে বুলেটের হাত বোলাল। তোমার টিপ ভাল না, মিস গার্সিয়া। আর ইঞ্চি দুয়েক হলেই খুন হয়ে যেতাম আমি। কিন্তু আমি ভাবছি আমাকে তুমি চিনলে কীভাবে? কোন নিরীহ লোক মারা পড়তে পারত।

মার্শালের সাথে দেখেছি তোমাকে, ঘৃণার সুরে বলল, মারিয়া। তোমার ঘোড়া দেখেছি, ওই বিরাট স্টীলডাস্টটা। যাই হোক তোমাকে অবশ্যি খুন করতে চাইনি আমি। ভাইকে কবর দিয়ে ওর জিনিসপত্র নিতে এসেছিলাম এখানে। তোমাকে দেখে সামলাতে পারিনি রাগ।

চলে যাবার জন্য আধপাক ঘুরল মেয়েটা, হঠাৎ করেই যেন ওর শ্যামল সৌন্দর্যে বেদনা আর হতাশার ছায়া ঘনিয়েছে। পাশ থেকে ওর শরীরের বাঁধুনি লক্ষ্য করল গ্রীন, বিচিত্র অনুভূতি হলো হৃদয়ে। ঘটনাবহুল চল্লিশটা বসন্ত পাড়ি দিয়েছে সে। এই দীর্ঘ সময়ে কোন মেয়েই রেখাপাত করতে পারেনি ওর মনে, কিন্তু আজ প্রথম দর্শনেই শামাঙ্গিণীর আদর সেই উষর অন্তরকে ছুঁয়ে গেছে। ভেতরে ভেতরে ভীষণ আশ্চর্য হলো গ্রীন।

লম্বা একটা শ্বাস টানতে আন্দোলিত হলো মারিয়ার ভরাট বুক। গ্রীনের দিকে তাকিয়ে বলল, কী হলো বলছে না, কোথায় মারামারি করেছ?

ভার্জিল রীডের স্যালুণে, সেজে।

ওই শয়তান বুড়োটা। কিন্তু ওর সাথে লড়োনি তুমি। অন্য কেউ ছিল। মারিয়ার চোখ জ্বলে উঠল কার্ল হালামের খোঁজে গেছিলে, না? ভেবেছিলে ওখানে যাবে সে?

এখন আর ভাবছি না। তবে তুমি বোধহয় বলতে পারবে কোথায় পাওয়া যাবে ওকে।

নিদারুণ ঘৃণায় শ্যামাঙ্গিণীর ঠোঁট বেঁকে গেল। বলব না।

তা হলে আমি ধরে নিচিছ তুমি হালামদের বন্ধু, ওদের পক্ষে আছ।

হালামদের! ক্ষিপ্ত সুরে মেয়েটা চেঁচিয়ে উঠল। ভাবছ ফ্রেড হালামের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব আছে, যেখানে সে কখনও শান্তিতে থাকতে দেয়নি আমাদের? আমার প্রেমিককে খুন করেছে লবণ হ্রদে? যে লবণ ঈশ্বর সবার ব্যবহারের জন্যই দিয়েছেন। ফ্রেড হালমকে আমি খুন করতে পারি!

ওর উত্তেজিত মুখের দিকে তাকাল গ্রীন। শান্ত সুরে বলল, আমি জানতাম না।

উদ্ধত ভঙ্গিতে ঘাড় বাকল মারিয়া। গ্রিংগোরা যেমন হয়, তুমি একটা বোকা।

হাঁসি চাপতে পারল না গ্রীন ঠিক আছে, তবে সব গ্রিংগোকেই এক রকম ভেব না। আমরা সবাই বোকা না, তুমি জানো। যাই হোক, অতীতে এখানে কী হয়েছে আমি জানি না, কাজেই আমাকে দোষারোপ করার মানে হয় না কোনও। তুমি বলছ ফ্রেড হালামকে তুমি ঘৃণা কর, আমার ধারণা ওর ছেলে কোথায় লুকিয়ে আছে তুমি জানো, কিন্তু বলতে চাইছ না, কেন?

ওখানেই তো তফাত, থমথমে মুখে জবাব দিল মারিয়া।

ওর পানে ঝুঁকল গ্রীন, তখনও চোখ হাসছিল, নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, কী তফাত?

আড়ষ্ট হয়ে গেল মারিয়ার মুখ, আচমকা সজোরে চড় মারল ওর গালে, তারপর গ্রীবা বাঁকিয়ে পিছিয়ে গেল বনবেড়ালির মত।

আমাকে শিশু মনে কর না। কচিখুকী নই আমি। শিগগিরই বুড়ি হয়ে যাব, সবসময় এই কাপড় থাকবে গায়ে-উরু ঢাকা কাল স্কার্টের ওপর চাপড় মারল মারিয়া-শোকে।

নিজেকে গুটিয়ে নিল গ্রীন। ঠিক আছে, ভুলে যাও। বাঁকবোর্ডের পাটাতনটা দেখাল ও। অস্ত্রগুলো তুমি নামিয়েছ?

সহজ হয়ে এল শ্যামাঙ্গিনী। কেন নয়? পুরুষরা খুব অগোছাল হয় বাচ্চাছেলের মত। সব জায়গায় খুঁজেছি আমি, তারপর মই বেয়ে-ছতে উঠে পেয়েছি ওগুলো। কম্বল আর কাপড়চোপড় আমি নিচ্ছি, নয়তো অন্য কেউ এসে নিয়ে যাবে।

গ্রীনকে পাশ কাটিয়ে গর্বিত ভঙ্গিমায় বাকবোর্ডের আসনে উঠে বসল মেয়েটা, লাগাম তুলে নিল। তারপর এক মুহূর্ত বসে রইল নীরব হয়ে, চিন্তিত চেহারা, খাওয়া-দাওয়া করছ কোথায়?

আচমকা কথাগুলো বলল ও। সহানুভূতি বা বিদ্বেষ, কোন প্রতিক্রিয়াই প্রকাশ পেল না।

কেন; যেখানে উঠেছি সেখানেই খাচ্ছি, হোটেলে, গ্রীন জবাব দিল। বিস্মিত হয়েছে।

নাক সিটকাল মারিয়া, এখন অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। আজ রাতে আমার সঙ্গে খাবে–আমার ক্যান্টিনায়।

মেক্সটাউনে আমার যাওয়া বোধহয় পছন্দ করবে না ওখানকার কেউ, গ্রীন জানাল।

মেক্সটাউন! ঝাঁঝ ফুটে উঠল শ্যামাঙ্গিনীর গলায় দুশো বছর ধরে এদেশে বাস করছি আমরা, অথচ তোমাদের গ্রিংগোদের চোখে এখনও মেক্সিক্যন রয়ে গেছি। হয়তো ভাল ইংরেজি বলতে পারি না, কিন্তু-

থাম। মুচকি হেসে বাধা দিল গ্রীন। আমি যদ্দূর জানি ওই গ্রিংগো শব্দটা খুউব প্রশংসার না। তুমি আমাদের মানুষ মনে কর না, কর কি?

তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল মারিয়া। তফাত সবখানেই আছে।

আবার ওর দিকে জ্বলন্ত চাহনি হানল মেয়েটা, ওর কালো চোখের তারায় গ্রীন তপ্ত সূর্যালোকের ঝিলিক দেখতে পেল। ক্ষিপ্ত বুনো দৃষ্টি, তবে এখন সহানুভূতিও ফুটে উঠেছে। ওর উদ্দেশে অনাবিল হাসি হাসল গ্রীন, মুহূর্তের জন্য মিলিত হলো চার চোখ। মারিয়া বলল, সন্ধ্যে সাতটায় আমার ক্যান্টিনাতে। তারপর, ঘোড়া ছুটিয়ে বাকবোর্ডসহ হারিয়ে গেল দৃষ্টিসীমার আড়ালে।

ওর গমনপথের দিকে চেয়ে রইল গ্রীন। তারপর একসময় ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে, ঝরনার দিকে ফিরে রওনা হলো ওর ঘোড়ার কাছে। গ্রীনের মনে হচেছ এখনও যেন মেয়েটার নরম শরীরের ছোয়া লেগে আছে তার বাহুতে।

.

বহু পদ্ধতির পয়লা চাল এটা, গ্রীন বলল! অবসন্ন দেহে মার্শাল মকের দফতরে বসে আছে ও। পাইন টেবিল ডেস্কের ওপাশ থেকে ওর কথা শুনছে মার্শাল। আচ্ছামত ধোলাই দাও কোন লোককে, পালিয়ে যাবে সে। তারপর ঘুষ দিয়ে কেনার চেষ্টা কর। এতেও যদি কাজ না হয় মেরে ফেল ওকে।

তুমি ঠিক জানো এটা হালামের চক্রান্ত?

নয়তো আর আবার কে? হালাম আঁচ করেছিল আমি হয়তো সেজে যাব-গিয়েছিলাম। রীডের চ্যালা আমাকে আমার নাম ধরে ডেকেছে। অথচ ওদের আমি নাম বলিনি। তার মানে নিশ্চয় ফ্রেড হালার্মের কাছে শুনেছে।

ওপর নীচ মাধাঝাঁকাল মার্শাল। হুম,বলল সে। আমি বলছি না হালাম চক্রান্ত করেনি, কিন্তু আমার ধারণা সাদা চোখে যা দেখা যাচ্ছে ব্যাপারটা বোধহয় তার চেয়ে ঘোলা। তবে, মৃদু হেসে যোগ করল মক, রীডের স্যালুনে তুমি সত্যিই ঝড় তুলেছ। ওদিককার আরেকটা ক্লেইম থেকে দুই ছোকরা আসছিল সেজের ভেতর দিয়ে। ড্রিংক করতে ওখানে থেমেছিল ওরা–পায়নি। একটা হুইস্কির বোতলও আস্ত নেই। বুটহিলে ফ্লিন্টকে কবর দিচ্ছিল হাচ! ভার্জিল বসেছিল তখনও ধ্বংস্তুপের মাঝে! ওই ছেলে দুটোকে শেষ পর্যন্ত গলা ভেজাবার জন্য অ্যাদূর আসতে হয়েছে। তোমার নিশানা তুমি ভালমতই গেড়ে রেখে এসেছ ওখানে।

তবে সেজন্য আমি কিন্তু মোটেও গর্বিত বোধ করছি না। জানালার দিকে তাকল গ্রীন, শেষ বিকেলের আলোয় লাল দেখাচ্ছে শার্সি। উঠে দাঁড়াল ও। এখানে নাপিত কোথায় পাব? দাড়িটা কামানো দরকার, তারপর গোসল করব।

রাস্তার ওপাশে চারটে বাড়ি পরে। আমার ধারণা ছিল কাল রাতে হোটেলে গোসল করেছ তুমি?

করেছিলাম, তবে আজ আবার করব। রহস্যময় হাসি ফুটল গ্রীনের ক্ষতবিক্ষত মুখে। রাতে খাওয়ার দাওয়াত আছে। মিস গার্সিয়া। ওদের পুরানো শীপ ক্যাম্পে দেখ হয়েছে আমাদের! কার্ল হালামের খোঁজে গিয়েছিলাম আমি, আর ও কার্লোসের কম্বল আর কাপড়চোপড় আনতে। আর অল্পক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসবে নিশ্চয়।

তা আর বলতে, মৃদু গলায় ফোড়ন কাটল মক, অবাক হয়েছে। তোমাকে যে গুলি করেনি এটাই অবাক কাণ্ড।

মহিলা বেশ বিবেচক। একগাল হাসল গ্রীন। কার্লোসকে মনে হয় পছন্দ করে মেয়েটা। আমার বিশ্বাস ও জানে কোথায় লুকিয়ে আছে সে। আজ রাতে হয়তো আমি জানতে পারব কিছু। ওর ক্যান্টিনটা কোন দিকে?

মক জালাল। কার্লকে পছন্দ করলেও, ওর বাপকে কিন্তু করে না। ওরা যখন ভেড়া পালত তখন ফ্রেড খুব জ্বালিয়েছে ওদের। মারিয়ার বিয়ের হপ্তাখানেক আগে ওর হবু স্বামীকে খুন করে সে, কিংবা তার লোকেরা।

বলেছে আমাকে। দরজা খুলে রাস্তার এপাশ-ওপাশ দেখল গ্রীন। কাল সকালে এ ব্যাপারে আলাপ করতে হবে আমাদের, বলা যায় না, নতুন কোন তথ্য জানা যেতে পারে এতে। তোমার কয়েদির খবর কী?

ঘুমাচ্ছে পড়ে পড়ে। খায় দুজন লোকের সমান। শোন, উইলি আবার দোকান বন্ধ করে দেবে, তুমি দাড়িটা কামিয়ে ফেল গিয়ে।

যাচ্ছি, বলে বাইরে পা রাখল গ্রীন।

ভাল মানুষ, আপনা থেকেই কথাটা মনে হলে পিপার মকের; খুব ভাল। উঠে দোরগোড়ায় গিয়ে দাঁড়াল মার্শাল, ভাবছে অল্পক্ষণের মধ্যেই ডিউক রিপের খাবার নিয়ে এসে পড়বে ওর সহকারী। তারপর হোটেলে গিয়ে নিজের খাওয়া সেরে রাস্তায় কিছু সময় পায়চারি করবে ও। কোথাও কোন ঝামেলা নেই, কারও প্রয়োজন হবে না তাকে। কাজেই পুরানো দিনের লোকজনের সঙ্গে আড্ডা মারতে এরপর সে হোটেলের বারান্দায় যাবে এবং একসময় শুয়ে পড়বে গিয়ে ওর দোতলা ঘরে।

পুরানো আমলের সঙ্গে তুলনা কলে এখনকার জীবন ওর নিরানন্দ মনে হয়। তখন বিপদের আশঙ্কায় সর্বদা সজাগ থাকতে হত একজন মার্শালকে, রাখতে হত নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা।

আপনমনে হাসল মক, তারপর দেখতে পেল রাস্তা ধরে বাকবোর্ডটা সোজা এগিয়ে আসছে ওর পানে। ঘর্মাক্ত ঘোড়াগুলোর পিঠ চকচক করছে গোধূলি আলোয়।

জেলখানার সামনে বাকবোর্ড থামাল মারিয়া গার্সিয়া। মার্শালকে দেখে জোর করে হাসল, চেহারায় ক্লান্ত গাম্ভীর্যের ছাপ। মক এগিয়ে এল ওর পাশে, বলল, মারিয়া, কেমন আছ? এইমাত্র ফিরে এসেছে জেমস গ্রীন, বলল তোমার সঙ্গে শীপ রাঞ্চে দেখা হয়েছে ওর।

সন্দেহের ছায়া ঘনাল মারিয়ার চোখে। রুক্ষ স্বরে জিজ্ঞেস করল আর কী বলেছে?

কিচ্ছু না। মক ভাবল লাওবণ্য আছে মেয়েটার, আর সেই চপলা কিশোরীটি নেই ও, কিন্তু বখে যায়নি তাই বলে, বিশের কোঠায় পা দিলে বেশির ভাগই যেমন যায়।

পেছনে ঝুঁকে অস্ত্রগুলো দেখাল মারিয়া। ডিউক রিপের জিনিস।

রাইফেল, গানবেল্ট আর পিস্তলটা তুলে নিল মার্শাল। ধন্যবাদ, মারিয়া আমার মনে হয় না, আপাতত কিছুদিন এগুলো কোনও কাজে আসবে ওর

আড়ষ্ট হয়ে গেল মারিয়ার চোয়াল। সি, বুঝতে পেরেছি।

লাগাম গুছিয়ে রওনা হবে, ঠিক সেই মুহূর্তে পড়ন্ত রোদে দুজন অশ্বারোহীকে দেখতে পেল মারিয়া। ফ্রেড হালাম আর হার্ভে স্টেজ। ওর পানে তাকাল ওরা, কোনওরকম ভাবান্তর ঘটল না চেহারায়; সেও সমান তালে ওদের চোখে চোখ রাখল, দৃষ্টিতে সীমাহীন আক্রোশ। পিপার মকের উদ্দেশে থুতনি ঝাকাল হালাম, পরিচিতদের প্রতি অ্যাংকর মালিকের অভিবাদন জানানোর রীতি। পাশ কাটিয়ে চলে গেল দুই ঘোড়াসওয়ার। তিক্ত সুরে মারিয়া বলল, ওই স্টেজ! ও একটা খুনী। ভর করে আছে হালামের ওপর। আর হালায় ওর ওপর, বোধহয়–ঠিক জানি না।

চমৎকার কৌশল।

এসব মানুষকে বুঝতে পারি আমি, বলল মারিয়া। তার মৃদু হেসে বিদায় নিল বাকবোর্ড ছুটিয়ে।

রাস্তার কোণে যেখানে ডার্লিং মার্কেন্টাইলের হিচ রেইলে নিজেদের ঘোড়া বাঁধছিল হালাম আর হার্ভে, ঘাড় ফিরিয়ে সেদিকে তাকাল মক। দেখল হনহন করে ভেতরে ঢুকে গেল ওরা। ওদের আগমন অবাক করেছে মার্শালকে। শহরে ওরা কেউ বিশেষ আসে না। বছরে চার-পাঁচবার ক্যানসাস সিটিতে ফুর্তি করতে যায় হালাম। রটনা, ওখানে তার এক রক্ষিতা আছে। স্টেজ অবশ্য এই অর্থে নীরস-মদ, মেয়েছেলে কোনটাতেই ওর তেমন আকর্ষণ নেই। এখন ওরা ওদের সাবেক পার্টনার, ড্রাম ডার্লিংয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে। সত্যি, তামাক বা ওই জাতীয়, কোনকিছু কেনার জন্য আসতেই পারে ওরা, কিন্তু কেন যেন মক বিশ্বাস করতে পারছে না ব্যাপারটা তাই। অ্যাংকর থেকে ওদের এত দূরে আসার কারণ একটাই: ডার্লিংয়ের সাথে দেখা করা। মার্শাল সন্দিগ্ধমনা লোক, আন্দাজ করতে চেষ্টা করল ওদের আলাপের বিষয়বস্তু কী হতে পারে।

০৭.

হালাম আর হার্ভে স্টেজ মালপত্রে ঠালা বিভিন্ন কাউন্টারের মাঝ দিয়ে পথ করে, পেছনে ডার্লিংয়ের অফিস-ঘরের দিকে এগোল। কেরানি অপেক্ষা করতে বলেছিল ওদের, কিন্তু হালাম মাথা নেড়ে আপত্তি করায় চুপ করে গেল সে। ডার্লিংকে তার রোলটপ ডেস্ক বসে থাকতে দেখল ওরা, ছোট্ট একটা হ্যারিকেনের স্বল্প আলোয় হিসেবখাতা পরীক্ষা করছিল। অতিথি দুজন প্রবেশ করতে মুখ তুলে তাকাল সে, চেয়ারের পিঠে হেলান দিয়ে ব্রাস-রিমের চশমাটা নামাল চোখ থেকে, তারপর মুখে জোর করে হাসি টেনে বলল, কী সৌভাগ্য তোমরা হঠাৎ?

ওদের আকস্মিক আগমনে অস্বস্তি বোধ করছে ডার্লিং, এটা বুঝতে পেরে-হালাম মজা পেল। তোমার দোকান বন্ধর সময় হয়েছে না? জিজ্ঞেস করল সে।

আর মিনিট পনেরো। শেষবেলার খদ্দেরদের আমি হারাতে চাই না। পালা করে হালাম আর স্টেজের মুখ জরিপ করল ডালিং। তোমাদের খুব গম্ভীর দেখাচ্ছে।

তার কারণ ঘটেছে, তিক্ত সুরে জবাব দিল হার্ভে স্টেজ। আমি হলে কেরানীকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে সামনের দরজাটা বন্ধ করে দিতাম।

ঘোঁৎ করে সম্মতিসূচক শব্দ করল ডার্লিং, উঠে পা টেনে টেনে বেরিয়ে গেল অফিস থেকে। একে ভয় পাইয়ে দিয়েছি আমরা, বলল হালাম, হাসছে দাঁত বের করে। ঝাঁঝের সঙ্গে স্টেজ জানাল এতে আমোদ পাবার কিছুই নেই।

দায়সারাভাবে কাঁধ ঝাঁকাল হালাম। সেই দিনটির কথা মনে পড়ে গেছে ওর যেদিন ড্রাম তার বেতো ঘোড়ায় চেপে পাহাড়ে গিয়ে ওকে খবর দেয়, লিউ ড্রেক শহরে এসেছে। ভবঘুরেরা যেমন হয়, নিঃস্ব অবস্থায় শহরে এসেছিল লিউ, তারপর ডার্লিংয়ের সাইনবোর্ড দেখে দোকানে ঢোকে।

প্রায় বিশ বছর আগে একটা আর্মি পে রোল লুট করেছিল ওরা, তবু ওকে দেখামাত্র চিনতে পারে ডার্লিং। একগাল হেসে লিউ জানায় ওর বখরার টাকা টেকেনি বেশিদিন, এখন নিশ্চয় একজন পুরানো বন্ধুর কাছে কিছু ধার আশা করতে পারে সে। এরকম ইঙ্গিতও দেয় ও, নিজের অবস্থা যখন; মনে হয়, ফিরিয়ে ফেলেছে ডার্লিং, সবাই সম্মান করে তাকে কেউ জানে না তার অতীতের ইতিহাস, তখন শ-খানেক ডলার দিতে এমন কিছু অপত্তি হবার কথা নয় ওর।

পাব না জেনেও, একশোটা ডলার ওকে দিতে হয়েছে আমার, ক্ষিপ্ত সুরে বলেছিল ডার্লিং পাশেই আমার স্যালুনে গিয়ে ঢেকে ব্যাটা। সারা রাত ঘুমাতে পারিনি, কেবলই মনে হয়েছে নেশার ঝোঁকে সব ফাস করে দিল। তারপর কাল রাতে এসে আরও একশো দাবি করেছে রীতিমত দাবি করেছে। স্রেফ ব্ল্যাকমেইল। আমাকে বলল, স্যালুনে কার কাছে নাকি ও শুনেছে তোমরা দুজনও এদিকে আছ। তাই ঠিক করেছে আগামী দু-এক দিনের ভেতরেই অ্যাংকরে আসবে সে, একটু খোশগল্প করবে তার পুরানো বন্ধুদের সাথে। তাই ভাবলাম, তোমাকে আগেভাগে সাবধান করে দিই। অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে পালা করে হালাম আর হার্ভে স্টেজের দিকে তাকিয়েছিল ড্রাম। তোমরা হয়তো একটা ব্যবস্থা করতে পারবে ওর।

এখন নিচু স্বরে মুচকি হাসল হালাম। ব্যবস্থা বলতে ড্রাম কী বুঝিয়েছিল সেইদিনই বুঝতে পেরেছিল সে। খুনোখুনির ব্যাপারটা আবার ড্রামের ধাতে সয় না, যদিও টাকাটা ভোগ করতে পারে নির্দ্বিধায়।

দোকান বন্ধ করে ডার্লিং ফিরে আসতে ওর দিকে তাকাল হালাম। অভিযোগে সুরে দোকানি বলল, আশা করি লিউয়ের সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই। আমার বিশ্বাস তোমরা ওর একটা কিছু ব্যবস্থা করেছ?

কোদাল দিয়ে ব্যবস্থা করেছি, হার্ভে স্টেজ নির্বিকার।

বর্ণনা দেয়ার দরকার নেই, মুখ বিকৃত করল ডালিং! শুনতে চাইনি আমি।

বটে, বলল স্টেজ, তারপর আচমকা হাসল-নেকড়ের হাসি। ড্রামকে কখনোই দুচোখে দেখতে পারে না সে, এমনকী যখন সে ওদের সমস্ত অপকর্মের দোসর ছিল তখনও পারত না। তাই ইচ্ছা করে ওকে চটিয়ে মজা করতে চাই হার্ভে। ছফুট মাটির নীচে কবর দেয়ার সময়ও ওই কোদালটাই ব্যবহার করেছি।

অস্থিরভাবে ডার্লিং তার ঠোঁট ভেজল। ব্যাপারটা যদি লিউয়ের না হয়, তা হলে কেন খামোকা এখানে এসে একজন বুড়োমানুষকে চিন্তার মধ্যে ফেলছ তোমরা? জানতে চাইল সে। লিউ আসার আগে পর্যন্ত ব্যাপারটা একদম ভুলেই গিয়েছিলাম আমি, কিন্তু এখন নিজের ছায়া দেখলে চমকে উঠি। সবসময় মনে হয় কেউ অনুসরণ করছে আমাকে। ওই জেমস গ্রীনকে দেখে আমার সেরকম অনুভূতি হয়েছে। এখন শুনতে পাচ্ছি, কার্লকে খুঁজছে সে।

ব্যাপারটা তা হলে জানো তুমি? হালাম অবাক

শহরের সবাই জানে-মক তার ব্যবস্থা পাকা করেছে। ভাল কথা; তোমরা শুনেছ কিছু, জেমস গ্রীনের কী দশা হয়েছে সেজে?

সাগ্রহে সামনে ঝুঁকল হালাম; প্রত্যাশিত খবরটা জানতে চায়। কী?

আজ সকালে তোমার ওখান থেকে ফেরার পথে মাইনিং ক্যাম্পে যায় ও। সম্ভবত কার্লের খোঁজে গেছিল, ঠিক জানি না।

যাই হোক, রীডের স্যালুনে যে লোক দুটো থকে, তারা মারধর করে ওকে, তারপর ঘোড়ার পিঠে তুলে দিয়ে বলে এই তল্লাট ছেড়ে চলে যেতে-আর কখনও যেন ফিরে না আসে।

মন খুলে একচোট হাসল হালাম, তাই?

তাই, গোমড়া মুখে জবাব দিল ডার্লিং। কিন্তু ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ফিরে যায় ও, খুন করে ওদের একজনকে-নাম ফ্লিন্ট ডুয়েলে, তারপর রীডের স্যালুন লণ্ডভণ্ড করে চলে আসে।

হালাম তার চেয়ারে নড়েচতে বসল, ভেতরে ভেতরে ফুসছে। ও নিশ্চিত ছিল গ্রীনকে এমন ধোলাই দেয়া হবে যে এখানে থাকার ব্যাপারে আগুপিছু চিন্তা করবে সে। কিন্তু এখন দেখতে পাচ্ছে যা ভেবেছিল ও, লোকটা তার চেয়ে কঠিন। চিন্তিত হলো হালাম, তবে বাইরে তা প্রকাশ করল না।

কার্লের খোঁজ জানো? কর্কশ সুরে জানতে চাইল ফ্রেড।

সেই যে মাতলামি করছিল শহরে এসে, তার পর আর দেখিনি। আশ্চর্য, আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না। মানে, ছেলেটা মদ খাওয়ার ব্যাপারটা আরকী। কথা বলার জন্য ডাকলাম রাস্তায়, অথচ ও মুখ বাঁকিয়ে চলে গেল। ভাল ছেলে ছিল কার্ল, ভদ্র। হঠাৎ এমন বদলে গেল কেন?

লিউয়ের সাথে আলাপ হয়েছে ওর, সব জানে, থমথমে গলায় জবাব দিল হার্ভে স্টেজ।

ফ্যালফ্যাল করে একটুক্ষণ স্টেজের দিকে তাকিয়ে রইল ডার্লিং, তারপর কথাটা ওর মগজে ঢুকতে রক্তশূন্য হয়ে গেল মুখ। মানে লিউ ওকে বলে দিয়েছে আমাদের কীর্তিকলাপ।

তাই।

আচ্ছা, এটাই তা হলে পাগল করে তুলেছে ওকে, মৃদু সুরে বলল ডার্লিং, অভিযোগের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে হালামের দিকে। তোমাকে ভীষণ বিশ্বাস করত ও, ফেরেশতার মত জানত। তারপর এখন জানতে পেরেছে তোমার আসল চেহারা

তুমিও ছিলে এতে, রুক্ষ স্বরে মনে করিয়ে দিল হালাম। এভাবেই তুমি বড়লোক হয়েছ, ব্যবসার টাকা পেয়েছ।

ঠিক। কিন্তু ওই পাট চুকে গেছে অনেক আগেই। কার্ল হয় পালিয়ে বেড়াচ্ছে, নয়তো লুকিয়ে আছে কোথাও। তাই না? এখন যদি গ্রীন ধরতে পারে ওকে, তখন কী হবে?

সব বলে দেবে ও, সেটজ বলল রূঢ় স্বরে। আর তা হলেই ফেঁসে যাব আমরা।

নড়েচড়ে বসল ডার্লিং, অস্বস্তি বোধ করছে। আমার ভাল ঠেকছে না এটা। আমরা আর্মির লোককে খুন করেছিলাম-এখনও ব্যাপারটা ফাঁসিতে ঝোলাতে পারে আমাদের, কিংবা বিশ বছরের জেল  উঠে দাঁড়াল ড্রাম, প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে উত্তেজিতভাবে পায়চারি করল কামরার এমাথা-ওমাথা। অনেক সাধনা করে আমি ব্যবসা গড়ে তুলেছি, এখন ওই, ছোকরার জন্য সব রসাতলে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে আমিও-ভাবতেই আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে।

জাহান্নামে যাক তোমার ব্যবসা, খেঁকিয়ে উঠল হালাম, স্টেজ অর ডার্লিংয়ের কথাবার্তা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে ওর, রক্ত চড়ে গেছে মাথায়। আমরা তোমাকে সাবধান করতে এসেছিলাম, ব্যস। কারণ লিউয়ের ব্যাপারে তুমি আমাদের সাবধান করেছিলে তোমরা বলছ বটে, কিন্তু আমার মনে হয় না কার্ল ফাঁস করে দেবে সবকিছু। ডাকাতি মামলায় ওর নাম জড়িয়েছে ডিউক রিপ–বাকি সবাই মারা গেছে। এখন আমি রিপের একটা হিল্লে করতে পারলেই কার্ল রেহাই পেয়ে যাবে, ফিরে আসতে পারবে বাসায়।

অসম্ভব, ওই ছেলেকে শ্বিাস নেই। ও ঠিকই বলে দেবে, অসন্তোষের সুরে বলল হার্ভে।

আমার ইচ্ছে হচ্ছে সময় থাকতে সব বেচে দিয়ে ভাগি এই দেশ ছেড়ে, বিড়বিড় করল ডার্লিং।

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল, স্টেজ। সাবধান এক পালাবার চেষ্টা করলে ফল ভাল হবে না কিন্তু, হিসহিস করে উঠল ওর গলা। মনে রেখ, আমাদের সঙ্গে তুমিও ছিলে ডাকাতিতে, লিউকে খুন করার ব্যাপারেও। 

আমার কোন ভূমিকা ছিল না ওতে, মিনমিনে গলায় প্রতিবাদ করল ডার্লিং। মাথা নিচু করে এক মুহূর্ত ভাবল সে, তারপর হালামের দিকে তাকিয়ে বলল, শোনেন, তুমি যদি ছেলেটাকে ধরে ওর সাথে কথা বল, হয়তো এদিককার সবকিছু শান্ত না হওয়া পর্যন্তমেক্সিকো কিংবা অন্য কোথাও চলে যেতে রাজি হবে ও।

কোথায় পাব তাই জানি না, বিরক্তির সুরে বলে উঠে দাঁড়াল হালাম। দোরগোড়ায় গিয়ে ঘাড় ফিরিয়ে যোগ করল, ভুলে যাও আমরা এখানে এসেছিলাম, ড্রাম। আমার সমস্যা আমি একাই সামলাতে পারব।

 ভুলে যাব! বিস্ফোরিত হলো ড্রাম ডার্লিং। কীভাবে ভুলব? ঝামেলা না মেটা পর্যন্ত ঘামতে ঘামতে রক্ত পানি হয়ে যাবে আমার, খুব ভাল করেই তুমি তা জানো। ভাবছি আগামী হস্তী দুই বেলুরাইডে গিয়ে থাকব, আমার ফ্রেইটিং ব্যবসাটা দেখাশোনা করব। তা হলে হয়তো ভুলে থাকতে পারব এদিকে কী হচ্ছে না হচ্ছে।

নিদারুণ বিরক্ত হলো স্টেজ, খিস্তি করল। ভীতুর ডিম কোথাকার। সবসময় তোমাকে দেখে আসছি এরকম। ঝামেলা দেখলেই কেটে পড়তে চাও। এখন টাকা হওয়ায় সেই ভয় বেড়েছে আরও, খরগোশের ভয়ে পালাচ্ছে লেজ তুলে। কিন্তু মনে ক্লেখ, তোমার পেছনেই নেকড়ে আছে একটা। ডার্লিংয়ের দিকে আরেকবার জ্বলন্ত দৃষ্টি হেনে বাইরে বেরিয়ে গেল সে।

বেহায়ার মত হসিল হালাম। দোকানি বলল, খেপে উঠেছে। তুমি একটু নজর রেখ।

ভয় নেই। হার্ভে আগেও আমার বুড়ো আঙুলের নীচে ছিল, এখনও আছে, মুচকি হাসল হালাম, অনুসরণ করল তার ফোরম্যানকে।

পেছনে গোলাপি আভা রেখে ডুবে গেছে সূর্য। সাঁঝ নেমে এসেছে শহরে, বাড়িঘরের জানালাগুলো হলুদ করে তুলেছে লণ্ঠনের আলো। ডার্লিংয়ের সালুনের দিকে হাঁটা দিল হালাম। এস, গলা ভেজাবে, বলল স্টেজকে।

মদ, সিগারেটের ধোঁয়া আর পোড়া কেরোসিনের গন্ধ ভাসছে স্যালুনের বাতাসে। বিরাট ঘরটা মোটামুটি জনাকীর্ণ। সখেদে হালাম অনুভব করল ওরা ঢুকতেই থেমে গেছে সমস্ত গুঞ্জন। তার ছেলের ব্যাপারেই আলোচনা করছিল ওরা, অনুমান করল সে। মাইনিং ক্যাম্পে গিয়ে রীডের কী হাল করে এসেছে গ্রীন তাও নিশ্চয় জেনে গেছে শহরবাসীরা।

বারে দাঁড়ানো খদ্দেরদের পাশ কাটিয়ে যাবার সময় কোন ভাবান্তর ঘটল না হালামের চেহারায়। গম্ভীর মুখে পেছন দিকের একটা ফাঁকা টেবিলে গিয়ে বসল ওরা। বোতল আর দুটো গ্লাস হাতে তক্ষুণি ওদের সেবায় এগিয়ে এল বারটেন্ডার। নিজের জন্য খানিকটা পানীয় ঢালল হালাম, একঢেকে শেষ করল সবটুকু, আচমকা কড়া নির্জলা হুইস্কি পেটে পড়ায় কেঁপে উঠল সামান্য, আবার ভরে নিল গ্লাস। এরপর বোতলটা সে ঠেলে দিল হার্ভে স্টেজের দিকে। অনেকটা সময় নিয়ে নিজের গ্লাস ভরল অ্যাংকর ফোরম্যান, ওর রুক্ষ মুখে খেলা করছে কুটিল ভ্রূকুটি।

ফিসফিস করে হালাম বলল, আজ সন্ধ্যায় সেজে যাবে তুমি। ভার্জিল রীডকে বলবে স্যাম ট্যানারকে খবর দিতে। যদ্দুর জানি সীমান্তের ওপাশে একটা র‍্যাঞ্চে আছে ও। রীডকে বলবে আজ রাতেই যেন লোক পাঠায় সে। আর যদি সেরকম কোন লোক না থাকে, তুমি নিজেই যাবে। কাল দুপুরের মধ্যে রীডের আস্তানায় স্যামকে হাজির করা চাই আমি থাকব ওখানে।

নিচু গলায় শিস বাজাল স্টেজ, চোখ ছোট ছোট হয়ে এসেছে। একসময় বেলুরাইডে আস্তানা ছিল স্যাম ট্যানারের। তার মানে, এখানে ওকে দেখলেই চিনে ফেলবে পিপার মক। মক ঝানু লোক, অনেকদিন হলো মার্শালের কাজ করছে, বোকা না। স্যামকে দেখামাত্র বুঝে ফেলবে তুমি আছ এর পেছনেও জানে কাজ না থাকলে অহেতুক কোথাও ঘুরঘুর করে না স্যাম।

তাই পেতে যাচ্ছে স্যাম, সম্ভবত দুটো কাজ, কঠিন সুরে বলল হালাম। তোমার ওপর কখন নির্ভর করা যায় আমি বুঝি, কিন্তু

একটা লোকের কাছে কত আশা কর তুমি শুনি? তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল হার্ভে স্টেজ। কাল রাতেই একটা কাজ সেরেছি আমি, মনে নেই। তবে ওটাই শেষ।

আমরা একসুতোয় বাঁধা, যুক্তি দেখাল হালাম। কাজেই আমরা যে যা-ই করি কেন, দুজনের জন্যেই করি। তাই না?

সেজন্যেই বুঝি তুমি থাক প্রাসাদে, আর আমি আস্তাবলের বাংকে, তিক্ত সুরে বলল স্টেজ। তুমি ক্যানসাস সিটিতে গিয়ে ফুর্তি কর, আর আমি পচে মরি এই পচা শহরে।

আগে কখনও অভিযোগ করনি তুমি,জবাব দিল-হালাম, অবাক হয়েছে।

বলিনি কারণ সবকিছুই সুন্দরভাবে চলছিল। এখন অন্যরকম মনে হচ্ছে। ডার্লিংয়ের মত অবস্থা হচ্ছে আমার, খালি পেছনে তাকাতে ইচ্ছে করে, মনে হয় কেউ বুঝি তাড়া করছে আমাকে। পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে, ডার্লিংয়েরও বোধহয় সেরকমই তলব, মনে হচ্ছে অতীত কোণঠাসা করে ফেলেছে আমাকে। আর এর জন্য দায়ী-তোমার ছেলে।

তুমি আর ড্রাম শুধু শুধু ভয় পাও, হালাম বিরক্ত।

মনে হয় না। অন্তত গ্রীনকে না। তুমি ওর ব্যাপারে চিন্তিত, আর আমার বিশ্বাস ওকে কেনা যাবে। এই পেশায় যারা আছে তাদের টাকা পয়সা নেই বিশেষ। হাজারখানেক ডলার ধরিয়ে দিলেই আর থাকবে না এখানে আমরাও হাঁপ ছেড়ে বাঁচব।

বোকার মত কথা বল না, হালামের কণ্ঠে ঝাঁঝ। গ্রীনের মত লোককে কেনা যায় না-মেরে ফেলতে হয় :

স্যামকে বল!

তাই বলব। তুমি বরং এবার তোমার কাজে যাও।

ওঠার কোন চেষ্টাই করল না হার্ভে স্টেজ। সরাসরি তাকাল হালামের দিকে। আবার সেই বিদ্রোহের পূর্বাভাস পেল র্যাপার। আমাকে হুকুম করবে না, স্টেজ বলল। আরেক দফা মদ খাব, সাপার সারব হোটেলে গিয়ে-তারপর যাব।

বেশ,জবাব দিল হালমি। চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল সে। তোমার যেমন মর্জি, বলে গটগট করে বেরিয়ে গেল বার-কামরা ছেড়ে।

০৮.

ক্যান্টিনটা বিশেষ বড় নয়। নানারকমের শাকসবজি আর মশলার গন্ধ ভুরভুর করছে। একদিকের দেয়ালে সারবাধা টেবিল, মিটমিট করে জ্বলছে অনেকগুলো মোম। মেক্সিক্যান, আমেরিকান দুই ধরনের খাবারই পাওয়া যায়। পরিবেশনের দায়িতে, আছে একটি মেয়ে। গায়ে লাল জিপসি ব্লাউজ, মিষ্টি একটুকরো হাসি সারাক্ষণ লেগে থাকে মুখে। উল্টো দিকে বার। কৃষ্ণকায় সুদর্শন এক লোক আপনমনে, নিচু গলায় করুণ সুরে গান গাইছিল গিটার বাজিয়ে, মেক্সিক্যানদের অতি প্রিয় একটা প্রেমসংগীত। গ্রীন ঢুকতে বাজনা থামিয়ে গিটারটা বারের নীচে রেখে দিল সে। গ্রীনের আপাদমস্তক ভাল করে একবার জরিপ করে, পেছনের একটা পর্দার ওপাশে অদৃশ্য হলো।

ধীর পদক্ষেপে এগোল গ্রীন! নিচু সিলিং থেকে কয়েকটা তামার লণ্ঠন ঝুলছে। লালচে আলোয় ওর সদ্য দাড়ি কামানো মুখে গুটিকতক জখমের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে মাত্র। যখন টুপি সরাল ঘন কালো চুলে নাপিতের কাচির দাগ বেরিয়ে পড়ল।

অল্পক্ষণের মধ্যে বেরিয়ে এল মারিয়া। প্রশান্ত কমনীয় মুখশ্রী; ডাগর কালো চোখজোড়া উজ্জ্বল, গম্ভীর। পোশাক বদলে এখন ধূসর রঙের স্কার্ট পরেছে, গলা আর আস্তিনের মুড়ি সাদা। চুল টেনে আঁচড়ে বেনী করেছে পিঠের কাছে।

খুব সংক্ষেপে অভ্যর্থনা জানাল ও। এস।

পুঁথির পর্দা সরিয়ে ভেতরে যাবার সময় মাথা নিচু করল গ্রীন, বড়সড় রান্নাঘরে ঢুকল মারিয়াকে অনুসরণ করে। গরম গরম খাবারের গন্ধে পানি এসে গেল ওর জিভে। দেখল, হৃষ্টপুষ্ট বয়স্কা এক মহিলা ডিম দিয়ে ময়দা ছেনে কেক তৈরি করছে।

মারিয়া ভেতর বাড়ির দরজাটা খুলে দিতে, চুনসুরকির পাঁচিলে ঘেরা শান বাঁধানো ছোট্ট একটা উঠনে পা রাখল গ্রীন। দেয়াল জুড়ে বাগান। রকমারি মরু লতাপাতা আর ফুলের ঝাড় রয়েছে। ছোট বড় বিভিন্ন আকৃতির লাউ আর লাল, হলুদ গোলমরিচের ছড়া ঝুলছে জাফরি কাটা মাচান থেকে। একধারে ভারি ওক কাঠের টেবিল আর খানকতক চেয়ার পাতা। টেবিলের ওপর, মাচান থেকে চৌকোমত একটা লণ্ঠন জ্বলছে। তার আলোয় রঙিন মায়াবী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

সপ্রশংস দৃষ্টিতে বাগানটা দেখল গ্রীন। স্মিত হেসে মারিয়াকে বলল, চমৎকার। আমাকে তুমি দাওয়াত করেছ, সেজন্য আমি আনন্দিত।

আমি অতিথি পছন্দ করি। ঝট করে টেবিলের দিকে ঘুরল মারিয়া। টেকুইলার বোল আর দুটো বড় গ্লাস রাখা আছে ওখানে। পাশেই ছোট ছোট দুটো পিরিচে খানিকটা লবণ আর লেবুর কোয়া।

টেকুইলা ভালবাস তুমি?

খাইনি কখনও। আমাদের ওদিকে পাওয়া যায় না। শুধু হুইস্কি আর বিয়ার।

এভাবে খাবে।

বাঁ হাতের পিঠে একচিমটি লবণ রাখল মারিয়া, লেবুর একটা কোয়া তুলে নিল। লবণ চাখল ও, লেবু চুষল, তারপর টেকুইলার গ্লাস তুলে নিয়ে পান করল একঢোকে নির্জলা, চোখের পাতা না ফেলে। গ্রীনের দিকে তাকাল মারিয়া, এই প্রথম সামান্য হাসির রেখা ফুটেছে মুখে।

এবার তুমি খাও, বলল ও।

মারিয়ার অনুকরণে ছোট্ট আচার অনুষ্ঠানটি পালন করল গ্রীন; লবণ আর লেবুর স্বাদ বিদঘুঁটে ঠেকল জিভে জ্বালাময় পানীয়টা গলায় ঢেলে দিল ও, মুখ হাঁ করে গিলে ফেলার সময় ভয় হলো, আদৌ সে ওটা নীচে নামতে পারবে কিনা। মাথা পেছনে হেলিয়ে কিশোরীসুলভ হাসিতে ফেটে পড়ল মারিয়া। তোমার মুখ! খুব কড়া?

হয় মারা যাবে, নয়তো বুড়িয়ে যাবে অকালে, জবাবদিল গ্রীন, হাসি দুকান ছুঁয়েছে।

অন্যদিকে সরে গেল মেয়েটার চোখ, হাসি থেমে গেছে আচমকা।

তুমি বস এখান। অমি খাবার নিয়ে আসছি।

ওর গমনপথের দিকে তাকিয়ে রইল, গ্রীন, ভরাট যৌবনের হিল্লোল উপভোগ করল। আরেকবার টেকুইলা পান করল সে, এবার খাওয়া সহজ হলো অনেক। তারপর পা ছড়িয়ে আরাম করে বসল ও, সারা দিনে যে ধকল গেছে, পানীয়ের প্রভাবে তার ক্লান্তি দূর হয়ে যাচ্ছে।

নাপিতের চেয়ারে চোখ বুজে বসে থাকার সময় যে চিন্তাটা বিব্রত করেছিল ওকে এখন সেটা আবার ফিরে এল। গ্রীন কিছুতেই ভেবে পায় না যে মহিলা খুন করতে উদ্যত হয়েছিল ওকে; সে কেন হঠাৎ করে তাকে রাতে খাওয়ার দাওয়াত দিল।

এর একটাই জবাব পেল গ্রীন, একমাত্র সমাধান: মারিয়া গার্সিয়া কিছু চায় তার কাছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে একটা ভাপ ওঠা মাটির ডিশ হাতে ফিরে এল মারিয়া, রাখল টেবিলে।

ভেড়া। আর এক মিনিট অপেক্ষা কর।

ঘন সুবাসিত ঝোলের ওপর চাক চাক ভেড়ার মাংস ভাসছে। এরপর বড় প্লেটভর্তি ফ্রিওলস নিয়ে ফিরে এল মারিয়া, মাংস আর লাল গোলমরিচ দিয়ে ভুনা করা। এ ছাড়াও রয়েছে কয়েক থালা ট্যাকোস বা স্মোকড টর্টিলা। গ্রীনের পাতে ভেড়ার মাংস তুলে দিয়ে উল্টো দিকে বসল মারিয়া; সকালে নাস্তার পর থেকে আর কিছুই খায়নি গ্রীন, গোগ্রাসে খেতে শুরু করল। ফ্রিওলসটা খুব ঝাল, স্মোকড টর্টিলা আর মাংস গুরুপাক, সুস্বাদু। খাওয়ার মাঝপথে ক্ষমা প্রার্থনা করে উঠে গেল মারিয়া, ফিরে এল কয়েক বোতল ঠাণ্ডা বিয়ার হাতে। গ্রীন ভরে নিল একটা গ্লাস, পান করে ঝাল দূর করুল কিছুটা।

ধীরে ধীরে খাচ্ছে ও, সবশেষে টর্টিলা খেয়ে খালি করল প্লেট। মারিয়া খায়নি বিশেষ, এটা ওটা মুখে দিয়েছে শুধু গ্রীন যখন তৃপ্তির একটা সেঁকুর তুলে চেয়ারে হেলান দিল, আঁসি ফুটল ওর মুখে।

পেট ভরেছে?

মৃদু হেসে ঘাড় কাত করল গ্রীন। খাবার সুস্বাদু হলে জীবনটা খুব সুন্দর মনে হয়। তবে আমার বোধহয় এসব বলা ঠিক হচ্ছে না। তোমার জন্য খুব ভাল ছিল না, আজকে দিনটা

না।

রমণীয় ভঙ্গিমায় উঠে দাঁড়াল মারিয়া, এটো থালাবাসন গোছাতে শুরু করল। গ্রীন উপলব্ধি করল ওর সহ্যক্ষমতা অসীম, ব্যথা-বেদনা কাবু করতে পারবে না সহজে, কাজের মধ্যে ভুলে থাকবে সমস্ত জ্বালা।

খাওয়া-দাওয়ার পর এখন আর বিদায় নিতে মন চাইছিল না গ্রীনের। ও যখন উঠতে নিল, তীক্ষ্ণ সুরে মারিয়া জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাচ্ছ?

এই তোমার উঠনে পায়চারি করে একটু হাওয়া খাব।

টেকুইলা রেখে যাচ্ছি। খাও। হজমের জন্য উপকারী।

উঠে দাঁড়িয়ে টানটান পেটে আদরের চাপড় মারল গ্রীন, হেসে বলল, এই একটা জায়গা যেটা নিয়ে কখনও ঝামেলা হয়নি আমার।

দেয়ালের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফুলের গন্ধ শুকল ও। কড়া তবে মদির। প্রাচীরের গায়ে ফটকটা ভারি মজবুত কাঠের, বাদামি রঙ করা, গ্রীনের কাঁধ সমান উঁচু। ওপর দিয়ে অন্ধকারে তাকাল সে, রাস্তার ওপাশে কয়েকটা আলোকিত জানালা চোখে পড়ল।

অন্ধকারে প্রাচীন গির্জার গম্বুজটা সম্ভ্রম জাগায় মনে। ওপরে তারাজ্বলা আকাশ, লণ্ঠনের মত মিটমিট করে জ্বলছে। পুবের চাঁদ এখন মাথার ওপরে; পাহাড়ি বাতাস শীতল পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে মরুভূমির বুকে। বারটেন্ডারের গিটার বাজনা শুরু হয়েছে আবার, মৃদু সুরে।

চলে আসছিল গ্রীন, এই সময় হঠাৎ সে ছুটন্ত পদশব্দ শুনতে পেল।

পাই করে ঘুরে দাঁড়াল ও, ফটকের ভারি হুড়কোটা নামিয়ে বেরিয়ে এল গলিতে। এক দৌড়ে পৌঁছে গেল মোড়ে, চন্দ্রালোকিত রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে এক লোক, পা ফেলার অলে তালে, ভেসে আসছে ওর বুটের আওয়াজ। কোন তরুণ হবে, নইলে এত জোরে ছুটতে পারত না।

পরক্ষণে অদৃশ্য হলো ছায়ামূর্তি, আবার নিঝুম হয়ে গেল রাত… তবে গ্রীনের বুঝতে ভুল হয়নি। লোকটা ঘাপটি মেরে বসেছিল ফুটকের বাইরে, নজর রাখছিল, অপেক্ষা করছিল। হাচ? তাকে শেষ করতে কোন ভাড়াটে বন্দুকবাজ পাঠিয়েছিল ভার্জিল? বিশ্বাস হতে চাইল না গ্রীনের। লণ্ঠনের আলোয় বসে সে যখন আহার করছিল তখন তাকে গুলি করার মত যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছিল লোকটা।

তবে যে-ই হোক, সন্দেহ নেই, কারও নজরে পড়তে চায়নি সে।

ফিরে এল গ্রীন। হুড়কোটা জায়গামত বসিয়ে বন্ধ করল ফটক। ওর পেছন থেকে মারিয়া কড়া গলায় জানতে চাইল, কী করছ?

এই ঘুরে-ফিরে দেখছি একটু।

টেকুইলার বোতল বাদে আর সবকিছুই টেবিল থেকে সরিয়ে ফেলেছিল মারিয়া, লন্ঠনের আলোয় দাঁড়িয়ে জরিপ করে ওকে চোখে তিরস্কার।

মিথ্যে কথা বললে কেন? কারও পায়ের আওয়াজ পেয়েছ তুমি-আমি নিজেও শুনেছি। মিথ্যেকথা বললে কেন?

ইচ্ছে করে বলিনি, জবাব দিল গ্রীন, বিরক্তি বোধ করছে। আসলে তোমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলতে চাইনি আমি।

আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলতে চাওনি! পুরুষ্টু ঠোঁট দুটো ওলটাল মারিয়া। তোমার ধারণা আমি দুশ্চিন্তা করি? ঘৃণা করি, কিন্তু দুশ্চিন্তা–কক্ষনো না!

এগিয়ে এসে চেয়ারে বসল গ্রীন, তাকিয়ে আছে শ্যামাঙ্গিনীর দিকে।

জানি। ফ্রেড হালামকে ঘৃণা কর তুমি। কিন্তু ওর ছেলেকে না। বুরং, ওর পক্ষেই আছ, এমনকী স্টেজ ডাকাতির পরিকল্পনাটী ওর, তা জানার পরেও? ওর ওপর তোমার এত দরদ কেন?

আবহাওয়ার মত চকিতে বদলে গেল মারিয়ার মেজাজ। এক মুহূর্ত আগেও গ্রীনের ওপর ভয়ঙ্কর ক্ষিপ্ত হয়েছিল সে, কিন্তু এখন নারীসুলভ কোমলতায় নরম হয়ে গেল দৃষ্টি।

আমার চোখের সামনে ও বড় হয়েছে ওর নিঃসঙ্গতাকে বুঝতে পারি, বিশাল র‍্যাঞ্চ হাউসে ওই লোকটার সাথে একা থাকে, কোন মেয়ে নেই ওকে একটু স্নেহ মমতা দেবার জন্য। একটা পনি ছিল ওর, ছেলেবেলায় আমাদের শীপ ক্যাম্পে আসত কার্লোসের সঙ্গে খেলতে। একদিন আমার হাত চেপে ধরল ও তখন ওর বয়েস বছর দশেক হবে, বলল, তোমাকে ভালবাসি। এখন বুঝতে পারছ? ওই বাড়িতে ওকে ভালবাসার মত কেউ ছিল না।

আমাদের বাসায় আসতে নিষেধ করা হয়েছিল ওকে, তবু আসত। তারপর একদিন ওর বাবা এসে পনিটা কেড়ে নিয়ে গেল। কার্লকে বলল হেঁটে র‍্যাঞ্চে ফিরতে,.. মরুভূমি থেকে দীর্ঘ পথ। এই নোংরা মেক্সিকানদের কাছে যেন আর না আসিস। তাই শিক্ষা দিচ্ছি তোকে, আমাদের সবার সামনে ছেলেকে বলল সে। দক্ষিণে ওর ক্রীতদাস, তুলাবাগানে কাজ করে। আর এখানে ভেড়া চরায়-সব জংলী ভূত।

ঠিক এ কথাগুলোই বলেছিল সে। হেঁটে বাসায় ফিরল ছেলেটা। ওকে খবর আর পানির ক্যান্টিন দিয়েছিলাম আমি, আর কার্লোস এক জোড়া মোকাসিন কারণ কাউবয় বুট পরে বেশিদূর হাঁটতে পারবে না ও। আর কোনদিন ও আর্সেনি, বাবার ভয়ে কুঁকড়ে থেকেছে। তবে কার্লোসের সঙ্গে দেখা করত, মাঝে-মধ্যে আমিও কথাবার্তা বলেছি শহরে।

এবার বুঝেছ কেন-

রান্নাঘর থেকে আচমকা একটা চিৎকার ভেসে আসতে মাঝপথে চুপ করল মারিয়া। পরমুহূর্তে দড়াম করে দরজা খুলে উঠনে পা রাখল, ফ্রেড হালাম, শানের ওপর স্পার লাগানো বুটের শব্দ তুলে এগিয়ে এল হনহন করে, মুখ ঝোড়ো আকাশের মত অন্ধকার।

গ্রীনকে যখন চিনতে পারল মুহূর্তের জন্য বিস্ময়ের ছাপ ফুটল ওর চেহারায়

এখানে কী করছ তুমি? রূঢ় স্বরে জানতে চাইল হালাম।

ভার্জিল রীডের সাথে আজ কথা হয়েছে তোমার? পাল্টা প্রশ্ন করল গ্রীন।

 হালামের চোখ দুটো সংকুচিত, সতর্ক হয়ে উঠল।

এই মেক্সের বাড়িতে তোমার আসার সঙ্গে রীডের কী সম্পর্ক।

কিছু না। আমি শুধু ওকে বলেছিলাম তোমার সাথে দেখা হলে জানাতে, আমি বলেছি তুমি যেন আমাকে না ঘাঁটাও। যাক, এখন আমি নিজেই সাবধান করতে পারব। সাহস থাকলে, এরপর নিজে লড়তে এস-অন্যকে লেলিয়ে দিও না। তবে আগেই সাবধান করে দিচ্ছি, আমার পেছনে লাগলে তোমার খুলি উড়িয়ে দেব আমি।

চেয়ারের পিঠে হাত রেখে ধনুকের ছিলার মত সটান দাঁড়িয়ে আছে মারিয়া গার্সিয়া, কর্তৃত্বপূর্ণ চেহারা, চোখজোড় আত্মাভিমানী, হিংস্র। ঠোঁটের কোণে একটা সিগারের গোড়া কামড়ে ধরেছিল হালাম। ওটা ছুঁড়ে ফেলে দিল দিল সে, থুতু ফেলল, মেঘ গর্জনের সুরে বিদ্রুপের হাসি হাসল।

আমাকে হুমকি দিচ্ছ? হাহ, ইচ্ছা করলেই তোমাকে আমি একতুড়িতে উড়িয়ে দিতে পারি-তুমি একা। কেউ তোমাকে সাহায্য করতে আসবে না! মকও না-আমার বিরুদ্ধে যাবার সাহসই হবে না ওর। আবার সশব্দে হাসল হালাম। আর তুমি কিনা হুমকি দিচ্ছে আমাকে।

রীডের স্যালুনে কেউ সাহায্য করেনি আমাকে।

ছিলাম না ওখানে, কাজেই বলতে পারব না।

গ্রীন একা না। এই প্রথম মুখ খুলল মারিয়া। অহঙ্কার উঁচু করে রেখেছে ওর মাথা, অহঙ্কার আর নিদারুণ ঘৃণা। তুমি এখানে এসেছ কেন?

ওর পানে তাকাল হালাম, ব্যঙ্গের হাসি খেলে গেল মুখে। বলছি, মেক্স। তোমার, নাগরের সামনে বলতে আমি ভয় পাই না। কার্লকে খুঁজতে। দেখেছ ওকে?

না। ও এখানে আসবে কেন?

কারণ: ও সবসময় তোমার স্কার্টের ছায়ায় ঘুরঘুর করে, মারিয়ার আপাদবক্ষ নজর বুলিয়ে হালাম বলল। পুরুষমানুষের বুঝতে অসুবিধে হয় না এটা। তুমি সুন্দরী, পুরুষের মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার মত রূপ তোমার আছে। কাজেই ওর দোষ আমি দিই না, তোমার স্কার্ট চেপে ধরার

মুখ সামলে, হিসহিস করে উঠল গ্রীনের গলা।

জাহান্নামে যাও, হালাম জবাব দিল, তাকাচ্ছে না গ্রীনের দিকে। শুধু শুধু ভয়ে পালাচ্ছে কার্ল। তোমার সঙ্গে দেখা হলে বলবে, আমি তাকে বাসায় ফিরে আসতে বলেছি।

ও যাবে না। তোমাকে ও ঘৃণা করে কেন যাবে?

শ্রদ্ধা করে, এখন থেকে আরও বেশি করে করবে, খেঁকিয়ে উঠল হালাম।

ওর জন্য তোমার দরদ নেই, তোমার একমাত্র ছেলে। তুমি কেবল নিজের কথা ভাব। তোমার এত ভয় কীসের শুনি? কী লুকাতে চাও? যে ছেলের প্রতি দরদ নেই, তাকে খুঁজছ কেন?

 খবরদার! এভাবে কথা বলবে না আমার সাথে। কালো হয়ে গেল হালামের মুখ, রাগে কাঁপছে গল। আমাকে প্রশ্ন করবে না, বোঝা গেছে, মেক্স? হুকুম বক্সব আমি, আর তোমরা চুপ করে তামিল করবে। একদম চুপচাপ, বুঝেছ?

মাথা নাড়ল গ্রীন। সংক্ষেপে বলল, হালাম, তুমি একটা গর্দভ, কথাবার্তাও তেমনি।

স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে রইল মারিয়া, অদ্ভুতরকমের ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে শ্যামল চেহারা। বেরিয়ে যাও! এক্ষুণি! আর কক্ষনো আসবে না।

চকচক করছিল হালামের চোখ, ক্রুর হাসিতে ভরে উঠল মুখ। যাচ্ছি। ক্যান্টিন চালালে কী হবে, তোমার গায়ে এখনও ভেড়ার গন্ধ লেগে আছে। ওই একটা গন্ধ আবার আমার সহ্য হয় না।

ঝট করে টেবিলের ওপাশ থেকে পা বাড়াল মারিয়া, গ্রীন এগিয়ে যেতে ওর বাহু আঁকড়ে ধরে টাল সামলাল। হালামের হাসি চওড়া হলো!

তো, মেক্স, এখন আরেকজন নাগর ধরেছ তুমি। ভাল।

যাও! ক্ষিপ্ত সুরে বলল মারিয়া। খুন হয়ে যাওয়ার আগেই চলে যাও তুমি।

সশব্দে হেসে উঠল হালাম, ঘুরে রান্নাঘর হয়ে বেরিয়ে গেল। অস্ফুট স্বরে ফুপিয়ে উঠল মারিয়া, প্রগাঢ় আবেগে গ্রীন ওকে কাছে টেনে নিল।

অনুভব করল সে ঢিল পড়েছে মেয়েটার পেশীতে, উত্তেজনা কমে আসতে ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল একটা, কিন্তু সাড়া পেলনা কোন।

তোমার সাহায্য আমার লাগবে না। আমি তোমাকে বলেছি, কচিখুকি নই আমি। 

ওর শরীরের চড়াই-উতরাই নিজের বাহুতে অনুভব করতে পারছে গ্রীন। পেলবতার নীচে প্রচ্ছন্ন কাঠিন্যকে উপলব্ধি করছে। বহুকাল পর কোন মেয়েকে এভাবে বুকে টেনে নিয়েছে সে, মারিয়ার চিবুক উঁচু করে ওর বুনো সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে গ্রীন অনুভব করল তর হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেছে। কিন্তু শ্যামাঙ্গিনীর চোখে সামান্য কৌতূহল ছাড়া অন্যকিছুই নেই। তারপর ওর নিষ্ঠুর ঠোঁটজোড়া নেমে গেল ধীরে ধীরে-তবু সমর্পণের আভাস পেল না। গ্রীন যখন রেহাই দিল ওকে, আস্তে করে পিছিয়ে গেল মারিয়া, দুর্বলভাবে কাঁধ ঝাঁকাল।

আমি তোমাকে বন্ধুর মত মনে করেছিলাম।

বোধহয় না, জবাব দিল গ্রীন। ভাবছে মেয়েটার সাথে প্রেমের অভিনয় করার কোন অধিকার তার নেই। ও বারোয়ারি না। তুমি আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলে, হালামকে বলেছিলে আমি একা নই। আমার ভাল লেগেছে ওটা।

ওর বিরুদ্ধে যে লোকই দাঁড়াবে, তার হয়ে ওই কথা বলব আমি, অধৈর্য সুরে বল মরিয়া। তারপর, সহসা চড়া গলায় বলল, এখন আরও স্পষ্ট করে বলছি। খুন কর ওকে। সমস্ত খারাপের মূল ওই লোক, কাজেই ওকে মেরে ফেল।

–আচ্ছা, তা হলে এটাই চায় ও, গ্রীন ভাবল। মেয়েটা তবে ওর কাছে এটাই চইছে।

নির্লিপ্ত কণ্ঠে ও জবাব দিল, আমি এখানে এসেছি ছেলেটাকে ধরতে, ওর বাবাকে খুন করতে নয়।

ওর চোখ ভেদ করল মারিয়ার শীতল, অনুসন্ধিসু দৃষ্টি।

ভয় পাচ্ছ? আজ সেজে এক লোককে গুলি করেছ তুমি, তখন ভয় পাওনি। হালামকে খুন করা আলাদা কিছু না।

শক্ত হয়ে গেল গ্রীনের মন, রুক্ষতা ফিরে এল।

আমাকে ব্যবহার করার চেষ্টা কর না, সুন্দরী। বন্দুক ভাড়া করতে চাও, অন্য কোথাও খোঁজ কর। আমার-টা বিক্রির জন্য নয়।

তুমি একটা বোকা।

ঘুরে মাথায় হ্যাট চাপাল গ্রীন, মেয়েটার দিকে তাকাতে উপহাসের ভঙ্গিতে বেঁকে গেল ঠোঁট

হ্যা, বোধহয় তাই। তুমি কিছু চাও জেনেও এখানে আসার মত বোকা। তবে একজন মানুষের জীবননাশ করতে চাইবে তা আশা করিনি : ভালই গুলি চালাতে জানো তুমি-নিজেই চেষ্টা করছ বা কেন?

জ্বলন্ত দৃষ্টিতে ওর দিকে এক ঝলক তাকাল মারিয়া, তারপর চোখ সরিয়ে নিল।

আসলে আমরা বোধহয় একা নই। আমার শরীরে স্প্যানিশ রক্ত, আমরা অহঙ্কারী জাত। অপমানের প্রতিশোধ নিতে খুন করি আমরা, কিংবা যখন আমাদের পুরুষদের মেয়ে ফেলা হয়। গ্রিংগোরা বুঝবে না। ওরা অন্য মেয়েমানুষের কাছে চলে যায়।

মন্দ না, কখনও কখনও। তবে আমারও একধরনের অহঙ্কার আছে। নিছক তোমাকে প্রতিশোধের স্বাদ দেয়ার জন্য কারোকে খুন করতে পারব না আমি। স্থিরদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল গ্রীন, ভাবল আরও কিছু বলবে, তারপর মত পাল্টাল।

খাবারের জন্য ধন্যবাদ। শুভ রাত্রি।

ঘুরে রান্নাঘর আর ক্যান্টিনা হয়ে বাইরে বেরিয়ে এল গ্রীন, রাস্তায় নেমে শ্বাস টান বুকভরে। ভীষণ একলা বোধ করছে সে, জানে মাতাল হওয়া ছাড়া এ মুহূর্তে আর কিছুই এর করবার নেই। পরক্ষণে দুঃখের সঙ্গে উপলব্ধি করল ওর আত্মমর্যাদাবোধ টনটনে, স্রেফ আঁতে ঘা লেগেছে বলেই কোন স্যালুনে গিয়ে মাতলামি করা সম্ভবপর নয় তার পক্ষে।

০৯.

রাগে হতাশায় জর্জরিত হয়ে আছে মারিয়া। রাগ নিজের ওপর, অন্ধ ভাবাবেগে তার মনোভাব প্রকাশ করে ফেলায়; হতাশা জন্মসূত্রে পাওয়া উদ্ধত স্বভাবকে অবদমিত করতে না পারার কারণে।

টেকুইলার বোতল, গ্লাস আর অবশিষ্ট বাসনপত্র জড়ো করে সেগুলো ও রান্নাঘরে নিয়ে গেল, মন গ্রিংগো জেমস গ্রীনের কাছে পড়ে আছে। ওর বাহুস্পর্শের কথা মনে পড়তে মারিয়ার রক্ত নেচে উঠল। হুয়ানের পর আর কোন পুরুষ এভারে ওকে জড়িয়ে ধরে চুমু খায়নি। তবে হুয়ান এখন মৃত; শরীরের রক্ত ঝরিয়ে নিজের জীবন দিয়েছে সে লবণের শয্যায়, উত্তপ্ত মরু সূর্যের নীচে।

কার্লোস ওই অর্থহীন খুনের প্রত্যক্ষদর্শী ছিল। বাকবোর্ড চালিয়ে লবণ হ্রদে গিয়েছিল ওরা; মানুষের যেমন লাগে, ভেড়ার তেমনি প্রয়োজন হয় লবণ। অ্যাংকরের লোকজন তখন ছিল সেখানে, গরুবাছুরের জন্য কোদাল চালিয়ে বড় একটা ওয়াগনে লবণ বোঝাই করছিল। ওদের নেতৃত্বে ছিল হার্ভে স্টেজ।

মেক্সিকান আর মেষপালকদের সম্বন্ধে মৃদু টীকা-টিপ্পনি কাটে ওরা, এবং হুয়ান ছিল সশস্ত্র। তারপর আর হালকা থাকেনি অপমান, ছুঁচাল হয়ে উঠেছে। হুয়ানের তরুণ রক্তে সহ্য হয়নি তা।

কার্লোস ঠিক বলতে পারেনি কে শুরু করেছিল গোলাগুলি তবে হঠাৎ করেই গর্জে ওঠে কয়েকটা পিস্তল, হুয়ান লুটিয়ে পড়ে, এর রক্তে রঞ্জিত হয় লবণ হ্রদ। পরে, শহরে, হার্ভে স্টেজ আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা প্রচার করে, মেক্সই প্রথম গুলি করেছিল, তাই আত্মরক্ষা করতে হয়েছে আমাদের।

ওখানেই ধামাচাপা পড়ে যায় ব্যাপারটা; কোনরকম তদন্ত হয়নি। কেউ আশাও করেনি তা। বন্দুকের লড়াই হয়েছে এবং তাতে মারা গেছে একজন। সীমান্তের অতি পুরাতন চল এটা।

অধিকাংশ মানুষই হয় বোকা এবং খুনী।

কিন্তু গ্রিংগ গ্রীন নয়। সত্যিকারের মানুষ ও। সে প্রায় খুন করতে বলেছিল ওকে, কিন্তু গ্রীন শুধু ওর হাত থেকে রাইফেলটা ছিনিয়ে নিয়েই ক্ষান্ত হয়েছে! অন্য কেউ হলে মারধোর করত তাকে, মাতাল হয়ে বেশ্যাপড়ায় গ্রিংগোরা হরহামেশা যেমন করে।

গ্রীন স্পর্শ করেনি তাকে। প্রাথমিক রাগ পড়ে যাবার পর বন্ধু ভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে, এমনকী সে যখন মন্তব্য করেছে সব গ্রিংগোই বোকা তখন কৌতুক বোধ করেছে। সেজে একজন লোককে হত্যা করেছে ও, কিন্তু বিচলিত হয়নি সেজন্য। তবু খুনী ওকে বলা যাবে না।

বোকাও না, কারণ মুহূর্তে তার অন্তর দেখে নিয়েছে ও। সত্যি ওকে সে ব্যবহার করতে চেয়েছিল, এক গ্রিংগো আরেক গ্রিংগোকে খুন করলে কী আসে যায়? কিন্তু এখন লজ্জা পাচ্ছে সে, নিজের কাছেই। এই উপলব্ধি মোটেই স্বস্তিকর নয়; কোন লোককে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে গিয়ে তার কাছে ধরা পড়লে মাথা হেঁট হয়ে যায় আপনা থেকেই।

বন্ধের সময় হয়ে আসছিল, ক্যান্টিনায় একবার উঁকি মেরে ভেজা তোয়ালে হাতে উঠনে ফিরে এল মারিয়া। টেবিল মুছে, লণ্ঠনটা নেভাতে একটা চেয়ারের ওপর উঠে দাঁড়াল।

সবে, নেমেছে ও এই সময়ে একটা শব্দ সচকিত করে তুলল ওকে। তারপর ফিসফিসে গলায় একটা ব্যগ্র কণ্ঠ ভেসে এল, মারিয়া ধক করে উঠল ওর বুক, কার্ল হালামের গলা চিনতে পেরেছে।

তাড়াতাড়ি ফটক খুলে দিল সে ভেতরে পা রাখল কার্ল, মৃদু হেসে বলল, আরেকবার এসেছিলাম, কিন্তু তোমার কাছে লোক ছিল। আরেকটু হলেই ধরে ফেলেছিল আমাকে।

ভয় পেয়েছে কার্ল, কিন্তু ওর সামনে নিজের দুরবস্থা হালকা করার প্রয়াস পাচ্ছে। এর কারণ উপলব্ধি করতে পারে মারিয়া। পশ্চিম বেপরোয়া, সহসী লোকদের দেশ কিন্তু কার্ল বেপরোয়া বা সাহসী কোনটাই নয়। তবে মারিয়া জানে কেবলমাত্র এই কারণেই ওকে আগলে রাখতে চায় সে-অনেকটা মা যেমন ছেলেকে করে হতাশাগ্রস্ত বেপরোয়া মানুষের প্রতি ওর এক ধরনের টান আছে; ইন্দ্রিয়সুখে ও একদা আসক্ত ছিল। জ্যোৎস্নালোকে মারিয়া কার্লের চেহারায় ভাবান্তরক্ষ করল, গম্ভীর মুখে মাথা নিচু করে নখ খুঁটছে,

কার্লোস মারা গেছে আমি জানি। কিন্তু কী বলব বুঝতে পারছি না। দুঃখিত বললে সবটা বলা হবে না। পলক তুলল কার্ল, আত্মধিক্কারে কণ্ঠ তেতো হয়ে আছে, আমিই এজন্য দায়ী। সব দোষ আমার। কেউ মরলে, আমারই মরা উচিত ছিল।

শ। কার্লোসের কথা শুনলে কীভাবে?

যে রাতে লাইল ক্যানাডা ওদের বাথানে উপস্থিত হয়েছিল এবং আড়ি পেতে সে কী শুনেছিল তার কথা মারিয়াকে জানাল ও কার্লোস হত বা ডিউক রিপ হাজতে আছে তা নয়, শুনেছিল গ্রীন নামে এক গোয়েন্দা তাকে খুজছে।

সেই থেকে, পালিয়ে শীপ ক্যাম্পে গিয়ে সেখানে কারোকে না পেয়ে, কোথাও দুদণ্ড স্থির হয়ে বসেনি ও, কেবলই ভেবেছে এখন আর কী করণীয়।

মেক্সিকো পালিয়ে যাব না আশপাশেই লুকিয়ে থাকব কোথাও। ক্যানাডা যে ঘোড়াটা ভাড়া করেছিল, পালাবার সময়-ওটাই চুরি করেছিলাম আমি। তারপর আজ বিকেলে যখন বাথানের কাছেই একটা ঝোঁপের মধ্যে বসেছিলাম, তখন দেখলাম বাবা আর স্টেজ শহরে যাচ্ছে। সুযোগ বুঝে বাথানে ঢুকে পড়ে মাঠ থেকে আমার নিজের ঘোড়াটা ধরে এনেছি। আমাদের বাবুর্চি, বুড়ো টিম ছাড়া সে সময় কেউ ছিল না কাছেপিঠে। দিনের বেলায় বাজার করতে ও শহরে এসেছিল ওই বলল কার্লোস মারা গেছে, ডিউক রিপ হাজতে আছে।

লিভারি স্ট্যাবলের ঘোড়াটা কী করেছ?

শহরে এনে, সন্ধ্যের পর টেরিলের আস্তাবলের কাছে ছেড়ে দিয়েছি। তারপর এসেছি এখানে।

এস আমার সাথে। কোন শব্দ করবে না।

হাত ধরে মারিয়া ওকে রান্নাঘরের পাশ দিয়ে ওর বাসায় নিয়ে গেল।

চুপ করে বস এখানে। ক্যান্টিনা বন্ধ করে তোমার জন্য খাবার আনছি। খিদে পেয়েছে নিশ্চয়?

খেতে পারব।

কার্লকে ওখানে রেখে বেরিয়ে এল মারিয়া। কোন খদ্দের ছিল না ক্যন্টিনায়, টেবিলগুলো সাফ করছিল ওয়েট্রেস, বারটেন্ডার তখনও আপনমতে বাজিয়ে চলেছে, তার গিটার এদেরকে সে জানাল এবার চলে যেতে পারে ওরা। তারপর বারটেন্ডার যখন সমস্ত বাতি নিভিয়ে বিদায় নিল, দরজায় তালা ঝুলিয়ে রান্নাঘরে ফিরে এল মারিয়া।

ওর রাধুনি অনেক আগেই চলে গেছে। মোটামুটি গরম ছিল খাবার, একটা প্লেটে সাজিয়ে সেগুলে ওর বসার ঘরে নিয়ে গেল ও। লন্ঠন ধরতে দেখল গদি ভাঁটা সোফায় হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়েছে কার্ল, চোখে ঘুম।

খাও। পরে তোমার সঙ্গে আরও কিছু খাবার দিয়ে দেব। কিছুদিনের জন্য তোমার বোধহয় শীপ র‍্যাঞ্চে লুকিয়ে থাকাই ভাল। ঝরনায় পানি আছে, আমি একটা কম্বল দিচ্ছি।

বাসা থেকে আমি এক জোড়া কম্বল নিয়ে এসেছি।

বেশ। এখন খাও তারপর বল আমাকে, সেদিন ওরকম মাতলামি করেছিলে কেন তুমি। কীসের এত তিক্ততা, হতাশা তোমার মধ্যে? তুমি তো এরকম ছিলে না। হঠাৎ করে কী এমন ঘটল?

একটা টর্টিলা মুখে পুরল কার্ল, নিষ্প্রাণ সুরে হাসল।

বেশিকিছু না বলাই ভাল। কেবল এটুকু বলছি, আমি যা জেনেছি তাতে বাবার সম্বন্ধে আমার ধারণা চুরমার হয়ে গেছে। শ্রাগ করল কার্ল প্রথম যখন জানলাম, মাথা ঠিক রাখতে পারিনি তাই মদ খেতে শুরু করি। তারপর মনে হয় ওকে কষ্ট দিতে চেয়েছিলাম। জানি, পাগলামি করেছি। নিছক পাগলামি।

এখন কীরকম মনে হচ্ছে?

বুঝতে পারছি না ঠিক। একবার মনে হয় পালিয়ে যাই। পরক্ষণে যখন ভাবছি ব্যাপারটা, বুঝতে পারছি এভবে আমি বাঁচতে পারব না। বাবা কী করেছে এখন আর সেটা বড় না, আমি কী করেছি, এর পরিণতি মেনে নেয়ার সৎসাহস আমার আছে কিনা, কী করব শেষ পর্যন্ত, জানি না এখনও।

মারিয়ার দৃষ্টি না হয়ে এল। কার্লের খাওয়া দেখছে। কার্লোস, তার ভাই, মারা গেছে, কিন্তু সেজন্য ওকে দায়ী করতে পারছে না সে। এখন সে কার্লকে সাহায্য করতে চাইল।

তোমার বাবা এসেছিল। বাসায় ফিরে যেতে বলেছে তোমাকে। একটু ইতস্তুত করল মারিয়া। ধারণা করেছিল তুমি আসবে এখানে।

তুমি কী বললে?

তুমি ফিরে যাবে না। বলেছি, তুমি তাকে ঘৃণা করো, কাজেই কেন যাবে?

ঢেঁকুর তুলে প্লেটটা ঠেলে একপাশে সরিয়ে রাখল কার্ল।

আসলেও বোধহয় ঘৃণা করি, বিশেষ করে সত্যটা জানার পর। আগে ভয় পেতাম, শ্রদ্ধাও ছিল হয়ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভীষণ ভয় করতাম: পাছে কোন কারণে রেগে যায় আমার ওপর। ধারেকাছে থাকলে পা টিপে টিপে চলেছি, মুখ খুলিনি সহজে। জানি এরকমটা হওয়া উচিত ছিল না, কিন্তু বাবার চোখে ধিক্কার দেখেছি, আমি তাকে খুশি করতে চেয়েছি, অথচ বুঝতে পারিনি কীভাবে করব। এখন আর পরোয়া করি না–অন্তত বাবাকে না।

ওর দিকে তাকাল মারিয়া। ধরতে পারল তফাতটা। যা ঘটে গেছে তা বদলে দিচ্ছে কার্লকে। এখনও তার ভয় কাটেনি, তবু চেহারায় ফুটে উঠেছে একটা স্থিরসংকল্প-ইতিপূর্বে ওর মাঝে যা সে দেখেনি। সমস্যা মোকাবেলা করছে ও, এড়িয়ে, যাচ্ছে না।

তবে ওর হৃদয়হীন বাবা যে ক্ষতি করেছে ছেলের পরিণামে তা ওকে উচ্ছৃঙ্খল করেছে, অন্যদের নিয়ে গেছে পাপের পথে। গ্রীন যে লোকটাকে সাবেক মাইনিং ক্যাম্পে হত্যা করেছে তাঁর কথা ভাবল মারিয়া, ভাবল গ্রীনকে অন্ধ আক্রোশে সে নিজে যে গুলিটা করেছিল তার কথাও। মারিয়া উপলব্ধি করল ঘৃণাবশত নির্দ্বিধায় সে মানুষ খুন করতে পারবে এবং ন্যায়সঙ্গত মনে করবে ব্যাপারটাকে।

রান্নাঘরে ফিরে গিয়ে ন্যাকড়া জড়িয়ে খাবারের পোঁটলা বাধল ও, খানিকটা কফি আর ছোট্ট একটা কেতলির সঙ্গে ওটা একটা ময়দার থলেতে রাখল। তারপর চারটে ম্যাচবাক্স ভরে থলেটা নিয়ে ফিরে গেল বসার ঘরে।

এই তোমার খাবার। এবার তুমি যাও। আমি যতক্ষণ না ডাকছি বাসাতেই থেকো। সাবধান থাকবে, বাছা। খোদার নাম জপে রওনা হয়ে যাও।

কার্ল বিদায় নেবার পর মুহূর্তের জন্য দুঃখ, হতাশায় ম্রিয়মাণ হলো মারিয়া। তারপর উদ্ধত অহঙ্কার ভর করল ওর উপর, সহসা একটা কিছু সংকল্প করে কার্লোসের রাইফেলটা আনতে উঠে গেল।

১০.

জেমস গ্রীন যখন হোটেল থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পিপার মকের দফতরে গেল তখন অনেক বেলা, সূর্য তেতে উঠেছে।

মক তার ডেস্কে বসে একগাদা ওয়ান্টেড পোস্টার ঘাটছিল, কিন্তু গ্রীন ঢুকতে সেগুলো একধারে সরিয়ে রেখে বলল, টেরিল তার ঘোড়া ফিরে পেয়েছে, ক্যানাডা যেটা ভাড়া করেছিল। আজ সকালে ওর ওয়াগন ইয়ার্ডের গেটের সামনে পেয়েছে।

সেক্ষেত্রে কার্ল হালাম এখন কোথায়? চিন্তিত গলায় বলল গ্রীন। শহরেই কোথাও লুকিয়ে থাকা সম্ভব?

সম্ভব। তবে আমার তা মনে হয় না। আমার বিশ্বাস এখন আরেকটা ঘোড়া জোগাড় করেছে সে। স্মিত হাসল মক। রাতে দাওয়াত কেমন খেলে?

ভাল। কেবল শেষ দিকে হালাম এসে পড়েছিল, অল্পের জন্য আমাদের মধ্যে মারামারিটা হয়নি।

 গ্রীন খুলে বলল কী ঘটেছে, তবে মারিয়া ওকে দিয়ে হালামকে খুন করাতে চেয়েছিল সেটা এড়িয়ে গেল সযত্নে।

ওপর-নীচ মাথা ঝাঁকাল মার্শাল।

হালাম রাতে ছিল শহরে। আধঘণ্টাটেক আগে বাথানের দিকে রওনা দিয়েছে। উঠে দাঁড়িয়ে মক তার টুপি তুলে নিল। চল, আস্তাবলে যাই। ঘোড়াটা একবার দেখব আমি।

ওরা ওয়াগন ইয়ার্ডটা অতিক্রম করতেই টেরিল বেরিয়ে এল আস্তাবল থেকে। মককে বলল, আন্দাজ করেছিলাম ঘোড়াটা তুমি দেখতে চাইবে। যদিও জানি না কী লাভ হবে এতে।

কিছুই বলা যায় না।

তা অবশি। ও হ্যাঁ, ওই যে মেক্সিকান ছোকরা মারা গেছে, ওর ঘোড়াটা আজ সকালে নিয়ে গেছে ওর বোন। বাইরে যাচ্ছিল ও, আমি ভাবলাম ওটাই দিই, এমনিতেও ও-ই পাবে।

মক বলতে নিয়েছিল কিছু একটা, কিন্তু গ্রীন বাধা দিল।

কোথায় যাচ্ছে কিছু বলেছে?

না।

কতক্ষণ আগে?

টেরিল কাঁধ ঝাঁকাল।

মিনিট কুড়ি হবে।

আমার ঘোড়ায় জিন চাপাতে পারবে? এক্ষুণি?

নিশ্চয়, বলে ভেতরে ঢুকে গেল আস্তাবল মালিক।

চিন্তাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে মক তাকাল গ্রীনের দিকে। কোন ঝামেলা? জিজ্ঞেস করল।

তেমন কিছু না অধৈর্য সুরে জবাব দিল গ্রীন। কামনা করছে তা-ই যেন হয়। কিন্তু ও জানে হালামকে কোন চোখে দেখে মারিয়া। হালাম বাসার দিকে রওনা হবার পরপরই শহর ত্যাগ করেছে ও, ব্যাপারটা ভাল ঠেকছে না গ্রীনের!

কার্লের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে? মক জিজ্ঞেস করল।

কাঁধ ঝাঁকাল গ্রীন, টেরিলেতে দেরিতে বিরক্ত বোধ করছে। অসম্ভব না।

ও নিজেই ঘোড়ার পিঠে জিন চাপাতে পা বাড়িয়েছে এই সময় বিশাল লাগাম ধরে স্টীলডাস্টটা টেনে নিয়ে এল আস্তাবল মালিক। একলাফে ওর পিঠে চড়ে বসল গ্রীন, মার্শালকে, পরে দেখা করব, বলে ছুটে বেরিয়ে গেল ওয়াগন ইয়ার্ড থেকে।

ঝড়ের বেগে পশ্চিমের রাস্তা ধরল ও। ভাবছে এখনও হয়তো সময় আছে। পাথুরে রাস্তায় ঢাক পেটবার মত আওয়াজ তুলল ওর ঘোড়ার খুর। শঙ্কিত বোধ করছে গ্রীন, বুঝতে পারছে মারিয়া যদি খুন করতে চায় হালামকে নির্ঘাত অ্যামবুশ করবে। কোথায় হতে পারে জায়গাটা অনুমান করতে চেষ্টা করল।

আধঘণ্টা পর, যখন অনুভব করল হালাম আর বেশি দূরে নেই গতিবেগ মন্থর করল গ্রীন। পরমুহূর্তে সামনে ঘোড়ার পদশব্দ শুনতে পেল। রাস্তাটা যেখানে বাক নিয়েছে সেখানে পৌঁছে আধমাইল দূরে একজন অশ্বারোহীকে দেখতে পেল সে, বুঝল ওটাই হালাম।

রাস্তার ডান পাশে উঁচু খাড়াই ডগলাস ফার আর গ্রীষ্মঋতুর হলুদ অ্যাসপেনে ছাওয়া। মেয়েটা যদি অ্যামবুশ করতে চায় এই খাড়াইয়ের কোন জায়গা থেকে করবে, গ্রীন অনুমান করল। কারণ উঁচু বলে নিশানা করতে সুবিধে হবে।

এগোল সে, ট্রেইলের সন্ধানে, তাকাচ্ছে আশপাশে। যখন দেখতে পেল না ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে রওনা হলো খাড়াই বরাবর। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ছুটল দ্রুতগতিতে। একটু বাদে ঘেসো জমিতে বেরিয়ে এল সে, তারপর ট্রেইলটা চোখে পড়ল, রাস্তার সমান্তরলে সামনে এগিয়েছে। জোরকদমে ওটা অনুসরণ করল গ্রীন, ভাবছে আলেয়ার পেছনে ছুটছে কিনা। ঘন্টাখানেক এগোবার পর, যখন সে বুঝতে পারল হালামকে পেছনে ফেলে এসেছে সেই সময় হঠাৎ করেই ঘোড়াটা চোখে পড়ল ওর। একতা ঝোঁপের সঙ্গে বাধা অবস্থায় ঘাস খাচ্ছে।

মাটিতে নেমে নিজের ঘোড়াকে ঘেসো জমিতে ছেড়ে দিল গ্রীন, হলুদ অ্যাসপেন বনের ভেতর দিয়ে কোনাকুনি নামতে শুরু করল।

অচিরেই শ-খানেক গজ নীচের রাস্তাটা দেখতে গেল ও, তার অদূরে হাঁটু সমান ঘাসের মধ্যে বুক ডুবিয়ে কেউ একজন শুয়ে আছে লক্ষ্য করে বুক ভরে শ্বাস টানল। মারিয়া গার্সিয়াকে চিনতে পারল গ্রীন। ওর কাঁধে রাইফেলের কুঁদো ঠেকানো তাড়াতাড়ি পা চালাল ও, কাছেই একটা ঘোড়া ছুটে আসার শব্দ হতে দেখল গুলি ছোড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে মারিয়া।

দৌড়াতে শুরু করল গ্রীন। চমকে উঠে ঘাড় ফেরাল মারিয়া, পরক্ষণে ওর ওপর ঝাপিয়ে পড়ল গ্রীন, রাইফেলটা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল একপাশে, শ্যামাঙ্গিনী চেঁচাবার প্রয়াস পেতে ওর মুখে চেপে ধরল।

মারিয়া ছাড়া পাবার আপ্রাণ চেষ্টা করল, কিন্তু গ্রীন আরও শক্ত করে ধরে রইল ওকে। অনুভব কছে ঢিলেঢালা ব্লাউজ আর বাকষ্কিন রাইডিং স্কার্টের নীচ থেকে ওর উষ্ণ শরীর আর উদ্দাম যৌবনের স্পর্শে আগুন ছড়াচ্ছে তার দেহে। ক্রোধের তাপে তড়পাচেছ মারিয়ার হৃৎপিণ্ড। গ্রীনকে লাথি মারার চেষ্টা করল ও, কিন্তু গ্রীন তার ডান পায়ের ভর ওর দু-পায়ের ওপর চাপিয়ে দিল। তারপর হালাম যখন নীচের রাস্তা ধরে মাঝারি কদমে বেরিয়ে গেল তখন আড়ষ্ট হয়ে গেল মারিয়া, জ্বলন্ত দৃষ্টিতে পেছন থেকে চেয়ে রইল অশ্বারোহীর দিকে।

অবশেষে হালাম দৃষ্টির আড়ালে চলে যেতে ওর মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিল গ্রীন। একটুক্ষণ কাত হয়ে নিঃসাড়ে ঘাসের মধ্যে পড়ে রইল মারিয়া, মুখ আরক্ত, চোখ বোজা। টের পেল শিউরে উঠছে, মেয়েটা, বুঝল নিজের ভুল উপলব্ধি করেছে ও।

সব এখন ঠিক হয়ে গেছে, তবে আরেকটু হলেই হত না, গ্রীন বলল।

চিত হলো মারিয়া, ক্রুদ্ধ চোখে তাকাল ওর দিকে, খামচি দেয়ার চেষ্টা করল মুখে।

মনে করেছে ওকে খুন করলে আমার কী হবে ভেবে আমি ডরাই? তুমি এটা বোকা।

আবার ওকে চড় মারার প্রয়াস পেল মেয়েটা, ঝট করে ওর কজি দুটো চেপে ধরল গ্রীন।

বাঘিনী! বলল সে। এরকম করলে তুমি আউট-ল হয়ে যাবে।

ঝুঁকে ওর ঠোঁটে চুমু খেল সে, ফের ছাড়া পাবার ব্যর্থ চেষ্টা করল মারিয়া। তারপর, সহসাই, ফুপিয়ে উঠল, গ্রীনের ঘন চুল জাপটে ধরে বুনো আবেগে সাড়া দিল ভয়ঙ্করভাবে। ওর গায়ের সাথে সেঁটে গেল মারিয়া, গ্রীন সোহাগ করল। তারপর আবার বনবেড়ালির মত আচড়ে খামচে লড়তে শুরু করল মেয়েটা।

ওকে ছেড়ে দিল গ্রীন, কামনাবেগে ঝিমঝিম করছে শরীর।

উঠে বসল মারিয়া, হাঁপাচ্ছে, তপ্ত নিশ্বাসের তালে তালে দ্রুত ওঠানামা করছে ভরাট বুক, আগুন ঝরছে চোখ থেকে।

কী মনে কর তুমি? একজন গ্রিংগোর সাথে প্রেম করব আমি? বাহ! আমি কারোকে ভালবাসি না।

কোন একদিন করতেও পারো, পাল্টা জবাব দিল গ্রীন। রাইফেলটা তুলে নিল। আপাতত আমার কাছেই থাক, শহরে গিয়ে ফেরত পাবে। যেরকম বাঘিনী তুমি, আবার হয়তো তারা করবে ওকে।

ভেবেছ আমি তোমার সঙ্গে শহরে যাব? অবজ্ঞার সুরে বলল মেয়েটা। না! আমি একাই যাব, গ্রিংগোদের আমি বিশ্বাস করি না, কেবল প্রেম করতে চায়। তুমি একটা পশু। ফের যদি আমাকে চুমু দেয়ার চেষ্টা কর-খুন করব!

তোমার মধ্যেও একটা জানোয়ার বাস করে, থাবা আছে তার, গ্রীন বলল। কামনাও।

বোকা।

ওকে পাশ কাটিয়ে নিজের ঘোড়ার কাছে চলে গেল মারিয়া, মাথা উঁচু, অবাধ্য কালো চুল ছড়িয়ে আছে পিঠের ওপর। ওকে স্যাডলে চড়তে দেখল গ্রীন, তারপর যখন রওনা হল ধীরে ধীরে তখন কর্কশ সুরে চেঁচিয়ে বলল, তোমার রাইফেল নিয়ে আসছি আমি-আজ সন্ধ্যায়!

 একটিবারও পেছনে না তাকিয়ে চলে গেল মারিয়া। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল গ্রীন, ভাবছে মেয়েটার ভেতর নারীসুলভ সবকিছুই আছে, কেবল প্রয়োজন একটু বশ মানার। মুচকি হেসে ওর রাইফেলটা ক্যান্টেলের পেছনে বাঁধল সে, স্যাডলে চেপে রওনা হলো মারিয়ার ট্রেইল ধরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *