০১-০৫. সূর্য ওঠার ঘন্টাখানেক আগে

নিষ্পত্তি
রওশন জামিল
প্রথম প্রকাশ:
১৯৮৮

০১.

সূর্য ওঠার ঘন্টাখানেক আগে মরুভূমিতে এসে পড়ল ওরা। চারদিকে ফণীমনসার ঝাড় আঁর অসংখ্য বেলেপাথরের টিবি ছড়ানো ছিটানো। থোকা থোকা অন্ধকার জমে রয়েছে ফাঁকে-ফোকরে। তারই ছায়ায় এগিয়ে চলেছে দুই ঘোড়াসওয়ার। সতর্ক, কারণ এই গোলকধাঁধায় পথ হারাবার ভয় প্রতি পদে।

ঝড়ের বেগে চিন্তা করছে জেমস গ্রীন। যেখানে যাচ্ছে সেখানে পৌঁছাতে আর কতক্ষণ লাগবে ওদের? সকাল হবার আগেই ও গন্তব্যে উপস্থিত হতে চায়, পলাতক আসামীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার সেরা সময় ওটা, তখন তন্দ্রাচ্ছন্ন থাকে, শরীর আড়ষ্ট হয়ে থাকে।

নিঝুম ভোরে কোথাও কোনও শব্দ নেই। কেবল অবিশ্রাম ঘোড়ার খুরের ভোতা আওয়াজ আর স্যাডল লেদারের খসখস। অকস্মাৎ খাড়া একটা ঢালের গোড়ায় পৌঁছে রাশ টেনে মাটিতে নামল লাইল ক্যানাডা। যোৎ করে নাক ঝাড়ল ওর বুটিদার সোরেল, হেষাব করল। গলা খাকারি দিল কানাডা, গুতু ফেলল। তারপর জামার আস্তিনে শ্মশ্রুমণ্ডিত মুখ মুছে হাসল গ্রীনের দিকে তাকিয়ে।

বাপস! এসেছি শেষপর্যন্ত, খনখনে গলায় বলল সে। বলেছিলাম পারব, এখন হয়েছে বিশ্বাস? হাতের ইশারায় পাথরাইভরা, খাড়াইটা দেখাল ক্যানাডা। এই খাজের ওপাশে কেবিন, ছোকরাগুলো ওখানেই লুকিয়ে থাকে। ঝরনাও আছে একটা, ঠিক যেমনটা বলেছি তোমাকে। গার্সিয়া পরিবার আগে এখানে ভেড়া চরাত, বুড়ো পটল তোলার পর ছেলেপুলেরা শহরে উঠে গেছে। মাথা দুলিয়ে খিকখিক করে হাসল ও, স্যাডলবুটে রাখা রাইফেলের উদ্দেশে হাত বাড়াল। যাই, দেখে আসি গিয়ে ওরা আছে কিনা।

ফিকে আলোয় ঢালটা জরিপ করছিল গ্রীন। বলল, তুমি এখানেই থাকবে।

অসম্ভব! আমি তোমাকে পথ দেখিয়ে এনেছি, আনিনি? টাওসেই বলেছি একসময় এই সীমান্তে কাজ করেছি আমি, কাজেই এখানকার সবকিছু আমার–

চেঁচাবেনা, বাধা দিল গ্রীন, চোখ পাকিয়ে তাকাল সঙ্গীর পানে। গলা নামাও। বুট থেকে নিজের কারবাইনটা তুলে নিল সে, পরখ করে স্যাড ছাড়ল।

তা হলে আমরা দুজনেই যাব, বেজার মুখে বলল ক্যানাডা। ওদেরকে ওখানে না পেলে অকটিওতে গিয়ে মার্শাল মককে জানান ব্যাপারটা।

আমাকে পথ দেখিয়েছ তুমি, ব্যস, এন বিরক্ত। তোমার দায়িত্ব শেষ।

বললেই হলো! ওই তিন ছোকরাই হয়তো আছে ওখানে, ওদের–

লম্বা একটা শ্বাস টানল গ্রীন, ওর ভরাট বুকের ছাতি ফুলে উঠল। থাকতে পারে। কিন্তু তাতে প্রমাণ হয় না ডাকাতিটা ওরাই করেছে, আমার কাজ সেটা তদন্ত করা।

ক্যানাডা ইতিমধ্যে রাইফেল বের করেছে বুট থেকে। রাগের পাশাপাশি প্রচ্ছন্ন ধূর্ততা প্রকাশ গেল ওর কণ্ঠে। একাই পুরস্কারের টাকাগুলো তুমি হাতিয়ে নেয়ার তাল করছ না নিশ্চয়?

আস্তে আস্তে ঘুরে দাঁড়াল গ্রীন, মুখ থমথমে, চোখ দুটো সংকুচিত, নিষ্ঠুর। এখনও তুমি বেঁচে আছ কীভাবে সেটাই আশ্চর্য, নরম গলায় বলল ও। যাকগে, চুপচাপ এখানে থেকে ঘোড়াগুলো পাহারা দাও।

ইতস্তত-বিক্ষিপ্ত পাখরাইয়ের মাঝ দিয়ে, কোনাকুনিভাবে ছোট ছোট পা ফেলে দ্রুত ওপরে উঠতে শুরু করল গ্রীন। মেজাজ তেতো হয়ে গেছে, ঝগড়া করছে নিজের সঙ্গে। হামবাগ। লোকটাকে দেখেই তোমার বোঝা উচিত ছিল কেমন চিজ। মস্ত বোকামি করেছে ওকে সাথে এনে। একটু চেষ্টা করলে ওর সাহায্য ছাড়াই এ জায়গা খুঁজে বের করতে পারতে তুমি।

এই দায়িত্বটা নেয়া তার উচিত হয়নি, কথাটা আবারও ভাবল ও। পুরো ব্যাপারটা কেমন যেন খাপছাড়া। শুরু থেকেই খুঁতখুঁত করছে ওর মন। ক্যানাডার সঙ্গে দুই দিন দুই রাত কাটাবার পরেও তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের কোনও কারণ সে খুঁজে পায়নি। যাক, আজকের পর আর ওই লোককে প্রয়োজন হবে না তার। অন্তত কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যাবে এর ফলে।

দীর্ঘ দুরারোহ খাড়াই, খাজের মাথায় উঠে হাঁপাতে লাগল গ্রীন। ঘামছে দরদর করে, ব্যথা করছে ভর পেশীগুলো। একটা বোল্ডারে ঠেস দিয়ে বুকভরে শ্বাস টানল ও আকাশ ধূসর হয়ে এসেছে লক্ষ্য করে বুকে হেঁটে এগোল, কিনার থেকে আলগোছে উঁকি দিয়ে দেখল নীচের অবতল জমিটা।

প্রথমে ছোট্ট জরাজীর্ণ একটা বাড়ি চোখে পড়ল ওর। রোদে পোড়া ইটের তৈরি বড়সড় জানালা রয়েছে একটা গরাদবিহীন; দরজাটা ওর মুখোমুখি বন্ধ। একপাশে খড়ের চালাঘর, দুটো ঘোড়া বাধা আছে। বাসা থেকে শ-খানেক গজ দূরে, পাহাড়ের গোড়ায়, ঝরনা-প্রচুর ঘাস আর উইলো ঝাড়ে ঘেরা।

আবার ঘোড়া দুটোর দিকে তাকাল গ্রীন, ভাবছে তিনটে থাকা উচিত ছিল। তারপর আপনমনে কাঁধ ঝাঁকাল। ঘোড়াগুলো দুজন ভবঘুরের হওয়া বিচিত্র না, কাছেপিঠে পানি আছে দেখে পরিত্যক্ত বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। ব্যাপারটা আসলে কী, সেটা জানাই ওর কাজ।

সবে নামতে শুরু করেছে ও এই সময় আচমকা ভোরের আলো ফুটে উঠল, দূরের পাহাড়-পর্বতে ছড়িয়ে পড়ল নবারুণের উষ্ণ গোলাপি আভা! চট করে একটা পাথরচাঁইয়ের আড়ালে আত্মগোপন করল গ্রীন। ধেত্তোরি, বলল বিড়বিড় করে। মরুভূমিতে কত দ্রুত সকাল হয় ভুলে গিয়েছিল সে।

বেকায়দায় পড়ে গেছে ও, এখন সরাসরি বাড়িতে ঢুকে পড়তে হবে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে, ওখানে যারা আছে ঘুমন্ত অবস্থায়ই পাকড়াও করতে পাবে তাদের। তারপর বাসার পেছন দিকে দৃষ্টি গেল ওর, চুলোর চিমনি থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখল। গ্রীন অনুভব করছে তার এখন খাঁজের ওপাশে, আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া উচিত। একটু বাদে ক্যাচ শব্দে খুলে গেল নীচের দরজাটা, বুট আর জিন্স পরনে একহারা গড়নের এক যুবক পা রাখল বাইরে, হাই তুলল! লম্বা কালো চুল নেমে এসেছে ঘাড় অবধি, মুখমণ্ডল বাদামি, গাল তোবড়ানো। মেক্সিক্যান, প্রথম দর্শনেই বুঝতে পারল গ্রীন। অনুমান করুল ও-ই বোধহয় গার্সিয়াদের ছেলে, কার্লোস।

আরেকটু এগিয়ে এসে ছোকরা এবার প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিল; গ্রীন যেখানে লুকিয়ে আছে, ওর চোখ পাহাড়ের সেই অংশে ঘোরাফেরা করছে। হালকা হয়ে ঘোড়াগুলো দেখতে গেল ও। তারপর মুহূর্তের জন্য অদৃশ্য হলো বাসার পেছনে, ফিরে এল একটা গামলা হাতে, ঝরনায় যাচ্ছে।

ছোকরাকে পানি আনতে বার কয়েক আসা-যাওয়া করতে হবে, ভাবল গ্রীন। পিছিয়ে খাজের নীচে চলে গেল ও, ঘোরাপথে ঢাল ধরে এগোল। যা ভেবেছিল তার চেয়ে বেশি সময় লাগল এতে, ও যখন ঝরনার ধারে পৌঁছাল তখন ছেলেটা এসে আবার চলে গেছে। উইলো ঝাড়ের ফাঁক দিয়ে সন্তর্পণে উঁকি দিল সে, লক্ষ করল বাসায় ফিরে যাচ্ছে ও, পানিভর্তি গামলাটা টলমল করছে ওর দুই হাতে।

গোড়ালিতে ভর রেখে বসল গ্রীন। ঝরনাস্রোতটা ইঞ্চি দুয়েকের বেশি গভীর নয় দেখে বুঝতে পারল কেন ছেলেটা ঘোড়াগুলোকে পানি খাওয়াতে এখানে আনেনি। ও যেখানে বসে আছে, আর দশ-বারো কদম ওপাশে ভেজা বালুর বুকে ছোঁকরীর বুটের ছাপ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সে। প্রথমে ওকে কাবু করে তারপর বাসার ভেতরে যে আছে তার ওপর চড়াও হওয়াই সুবিধেজনক হবে, ভাবল ও। এতে করে অনেক সোজা হয়ে যাবে কাজ, জানতে পারবে তার তদন্ত কোন্ পর্যায়ে রয়েছে।

গ্রীনের এই চিন্তা তার অভিজ্ঞতার ফসল, যুক্তিসঙ্গত; জীবনে বহুবার এরকম চিন্তাভাবনা করেছে সে। কিছুক্ষণ আগে যেমন অনিশ্চয়তার মাঝে ছিল, পরিস্থিতি এখন তার চেয়ে ভাল, অনেকটাই তার আয়রে মাঝে এসে গেছে। এবার সে নিজের পছন্দমত পরিকল্পনা করতে পারবে, অন্যের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে হবে না। নিঃশব্দে, অপেক্ষা করছে ও! এ সময় ওকে দেখলে মনে হবে যেন ধৈর্যের প্রতিমূর্তি। চওড়া শরীর, তবে কোথাও বাড়তি মেদ নেই। লম্বা, কিন্তু ঢ্যাঙা একে বলা যাবে না। বয়সের ছাপ বলতে, কপালের কাছে সামান্য পাক ধরেছে চলে।

উবু হয়ে আঁজলাভরে টলটলে ঠাণ্ডা পানি তুলে নিয়ে ঘষে মুখ পরিষ্কার করল সে, দুদিনের দাড়ির জঙ্গলে খসখসে শব্দ হলো। ভাল করে কুলি করল, ঘাড় ফেরাল থুতু ফেলতে। আবার যখন তাকাল গ্রীন তখন দেখতে পেল ছেলেটা ঝরনার কাছাকাছি চলে এসেছে, আস্তে হাঁটছে, মিনিট কুড়ি আগে গ্রীনকে প্রথম যেখানে দেখা গিয়েছিল সেই খাঁজটা জরিপ করছে ওর চোখ।

হঠাৎ থমকে দাঁড়াল ছেলেটা, ঘুরে পালাবার জন্য টানটান হয়ে গেল পায়ের পাতার ওপর, যেন সন্দেহজনক কোন শব্দ ধরা পড়েছে ওর কানে। খাজের দিকে তাকাল গ্রীন, কিন্তু উজ্জ্বল সূর্যালোকে ক্ষণিকের তরে ধাধিয়ে গেল ওর চোখ। তারপর। দেখল একটা মনুষ্যমূর্তি বেরিয়ে এসেছে বোল্ডারের আড়াল থেকে, পরক্ষণে রাইফেলধারী ক্যানাডাকে চিনতে পেরে ওর বিস্ময় ক্রোধে রূপান্তরিত হলো।

ছেলেটাও দেখতে পেয়েছিল ক্যানাডাকে, ওর যে প্রতিক্রিয়া হলো তা কোন নিরীহ ভবঘুরের কাছে প্রত্যাশা করা যায় না। ঝট করে গামলাটা হাত থেকে ফেলে দিল সে, ঝেড়ে দৌড় দিল বাসার উদ্দেশে, চেঁচাচ্ছে, ডিউক! সাবধান! কে যেন আসছে!

লাফিয়ে ঝরনাটা পার হলো গ্রীন, চোখের কোণে লক্ষ্য করল ক্যানাডা কাঁধের নিষ্পত্তি কাছে রাইফেল তুলছে। গুলি কর না! চিৎকার করে বলল ও।

কিন্তু ক্যানাডা ট্রিগার টিপে দিল। ওর চিৎকার ছাপিয়ে শোনা গেল রাইফেলের গর্জন, প্রতিধ্বনিত হলো পাহাড়ে-পর্বতে। বুলেটের আঘাতে কোমরের কাছে বাকা হয়ে গেল ছোঁকর কৃশকায় শরীর, ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল। হাঁটুতে ভর দিয়ে উঠে বসল ও, টলতে টলতে সোজা হচ্ছে এমন সময় আরেকটা গুলি হলো। এবার লাটিমের মত একপাক ঘুরে গেল ছেলেটা, সটান আছাড় খেল চিত হয়ে। অসাড় দেহটাকে দৌড়ে পাশ কাটাল গ্রীন, রাগে জ্বলছে ওর ব্রহ্মতালু, ভাবছে এর চেয়ে জঘন্য কাজ আর কিছুই হতে পারে না। বাসার দিকে ছুটে গেল ও, কারবাইনটা ফেলে দিয়ে পিস্তল বের করল হেলস্টার থেকে। প্রথমে জানালা, তারপর দরজা লক্ষ্য করে গুলি করল দুবার। গরাদবিহীন জানালা দিয়ে ঘরের ভেতর ঝাপিয়ে পড়ল গ্রীন, দেখল পায়জামা পরিহিত হাড্ডিসার এক যুবক একটা বাংকের পাশে গুটিসুটি মেরে বসে আছে, হাতে রাইফেল। গুলি করল ছেলেটা, তাড়াহুড়োয় নিশানা নড়ে গেল, বদ্ধ ঘরে বিকট শোনাল রাইফেলের আওয়াজ। চকিতে পালটা জবাব দিল গ্রীন, প্রতিপক্ষের মাথার আধইঞ্চি ওপর দিয়ে উড়ে গেল বুলেট। তপ্ত সীসার ছ্যাকায় ভয়ে কুঁকড়ে গেল। ছেলেটা, চোখের পাতা ফেলল। ওকে হত্যা করা গ্রীনের ইচ্ছে নয়, জ্যান্ত ধরতে পারলে তদন্তের সুবিধা হবে, অপ্রত্যাশিত সুযোগটাকে তক্ষুণি কাজে লাগল সে। লাফিয়ে আগে বাড়ল ও, রাইফেলটা ছিনিয়ে নিল হাত থেকে, ছুঁড়ে ফেলে দিল ঘরের এককোণে।

শুরুতে হকচকিয়ে গেল অপরজন, তারপর আক্রমণ করল গ্রীনকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিল দেয়ালের ওপর। এমনিতেই যথেষ্ট শক্তি ধরে যুবক, তার ওপর ভয় ওকে মরিয়া করে তুলেছে। এলোপাতাড়ি ঘুসি হাঁকাল সে, গ্রীনের পিস্তল ধরা হাত লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিল।

বাংকের তলায় অস্ত্রটা ছুঁড়ে দিল গ্রীন, জানে আপাতত ওটার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। মাথা নিচু করল ও, এক কদম আগে বেড়ে সেঁটে গেল ছোরার গায়ের সাথে, ঝটকা মেরে ওর হাত দুটো সরিয়ে দিল দূরে, হাঁটু দিয়ে সজোরে আঘাত করল তলপেটে ব্যথায় ককিয়ে উঠল ছোকরা, পিছিয়ে গিয়ে দুহাতে চেপে ধরল পেট, হুমড়ি খেয়ে পড়ল দুরমুজ করা মেঝেতে ছটফট করছে যন্ত্রণায়, গোঙাচ্ছে।

এবার দক্ষতার সঙ্গে দ্রুত খানাতল্লাশি করল গ্রীন, দুটো রাইফেল, দুটো .৪৫ কোল্ট আর কার্তুজের বেল্ট উদ্ধার করল। বাংকের নীচ থেকে নিজের পিস্তলটা তুলে নিয়ে হোলস্টারে রাখল সে, বাকি অস্ত্রশস্ত্র বাইরে নিয়ে গিয়ে একে একে ছুঁড়ে ফেলল ছাতের ওপর। এরপর ওর কারবাইনটা কুড়িয়ে নিল সে, ক্যানাডা যেখানে ঝুঁকে পড়ে প্রথমজনের লাশ পরীক্ষা করছে সেখানে গেল।

মাত্র কৈশোর পেরিয়েছিল ছেলেটা, বছর আঠারো বয়েস হবে, হালকা-পাতলা শরীর। বুকের বাঁ পাশে দুটো গুলি লেগেছে, এখনও ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরছে ক্ষতস্থান থেকে। শক্ত হয়ে গেল গ্রীনের চোয়াল, কঠিন চোখে তাকাল ক্যানাডার দিকে। ওই দৃষ্টির সামনে চুপসে গেল অপরজন, কেশে গলা সাফ করে লাশটা দেখিয়ে বলল, কার্লোস গার্সিয়া। এও ছিল, মনে হয়। ডিউক নামের একজনকে ডাকছিল ও, শুনেছ নিশ্চয়? ওটা ডিউক রিপ, এদের আরেক সঙ্গী, সবসময় একসাথেই থাকে ওরা। ওকে মেরেছ তুমি?

আমি তোমাকে নিষেধ করেছিলাম আসতে, বলল গ্রীন, গলা অস্বাভাবিক রকমের শান্ত, হিমশীতল। ঘোড়া পাহারা দিতে বলেছিলাম।

উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম, অপেক্ষা করতে করতে।

গুলি করার দরকার ছিল না। আমার চিৎকার শুনতে পেয়েছিলে তুমি। তখনও যথেষ্ট সময় ছিল তোমার হাতে।

ও দৌড় দিয়েছিল; পালিয়ে যাচ্ছিল।

পারত না, আমি ওর পেছনেই ছিলাম। শুধু শুধু একটা লোককে খুন করলে, আরেকটু হলেই আমাকেও মেরে ফেলেছিলে।

এতটা আমি ভেবে দেখিনি।

স্বাভাবিক, বিরক্তির সুরে বলল গ্রীন। তুমি ভাবছিলে পুরস্কারের কথা।

গার্সিয়ার লাশের দিকে তাকাল ক্যানাডা। খনখনে গলায় বলল, যাই হোক, মড়া নিয়ে গেলেও টাকাটা পাওয়া যাবে, কি বল?

মুচকি হাসছিল ক্যানাডা, আচমকা ওর নাকের বাঁশিতে আঘাত করল গ্রীন। আরও দুবার চোয়ালে মারল সে, ভাঁজ হয়ে গেল ক্যানাডার হাঁটু, লুটিয়ে পড়ল। ঘুর ঘরে ফিরে গেল গ্রীন। ইতিমধ্যে খানিকটা ধাতস্থ হয়েছে ডিউক রিস, বাংকের কিনারে, বসে আছে নতমুখে। ঠিক আছে, রিপ, কঠিন সুরে সরাসরি প্রশ্ন করল গ্রীন, এবার বল অন্য লোকটার নাম কী? এখন কোথায় আছে?

পলক তুলল রিপ, চোখ দুটো জ্বলছে। কিন্তু গ্রীনের স্থিরদৃষ্টির সামনে টিকতে পারল না বেশিক্ষণ, আবার নিচু করল মাথা। কে তুমি? গোমড়া মুখে জিজ্ঞেস করল সে। হুট করে এসেই গুলি করলে, তারপর এখন উল্টোপাল্টা প্রশ্ন করছ?

আমার জবাব আমি এখনও পাইনি, রিপ! জবাব দাও–এক্ষুণি।

তাই? আমার নাম জানলে কীভাবে?

তা জেনে তোমার লাভ নেই কোন। তুমি বলতে শুরু কর।

লম্বা একটা শ্বাস টানল রিপ। তোমার কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না আমি, কাজেই আমারও কিছু বলার নেই তোমাকে।

গেল হপ্তায় তোমার বন্ধুরা টাওসে একটা স্টেজ ডাকাতির চেষ্টা করে। তুমিও ছিলে সেই দলে কোল্টার নামে এক লোককে খুন করেছ তোমরা। মোট চারজন ছিল। তোমাদের দলে। কোল্টার একজনকে গুলি করে। তার নাম স্কালি ব্রাওয়ারপরদিন। টাওসে ওর লাশ শনাক্ত করে একজন। তোমরা পালিয়ে চলে আস এখানে। একটু আগে গুলির আওয়াজ পেয়েছ, তাতে মারা গেছে কার্লোস গার্সিয়া। এর অর্থ, তোমাদের আরেকজন বাকি আছে এখনও। আমি তার নাম, এবং কোথায় গেলে পাব তা জানতে চাই।

মাথা নত করে শুনছিল রিপ, কিন্তু গার্সিয়ার নামটা কানে যেতেই চোখ তুলল, মুখ হাঁ হয়ে গেছে, চেহারায় অবিশ্বাসের ছাপ। কথা বলার সময় কেঁপে গেল ওর গলা, কার্লোসকে খুন করেছ তুমি?

বাইরে পড়ে আছে ওর লাশ।

চাপ সুরে ডুকরে উঠল রিপ, ঘুসি বাগিয়ে তেড়ে এল গ্রীনের দিকে। গ্রীনও দেখতে পেয়েছিল সেটা, একপাশে সরে গেল ও, পেশীবহুল, হাতের সমস্ত জোর খাটিয়ে চড় মারল রিপের মাথায়।

মুহূর্তের জন্য লোপ পেল রিপের বুদ্ধিশুদ্ধি, চোখে সর্ষের ফুল দেখল, কাত হয়ে পড়ে গেল বাংকের কিনারে। একটুক্ষণ অপেক্ষা করল গ্রীন। দম আটকে আসছে ঘরের ভেতর, রান্নাঘরের ধোঁয়ায় চারদিক অন্ধকার। কফি ফুটে ফুটে শুকিয়ে যাচ্ছিল, চট করে এগিয়ে গিয়ে কেতলিটা নামাল গ্রীন, চুলো বন্ধ করল। তারপর আবার আগের জায়গায় ফিরে এল সে। দেখল রিপ উঠে বসেছে, দুহাতে চেপে ধরে আছে মাথা।

গ্রীন এখন নিশ্চিত কার্লোসের সঙ্গে এই লোকও ডাকাতিতে জড়িত। সুতরাং কথা বলাতে হবে ওকে। কঠোর অথচ শান্ত সুরে ও বলল, আমাকে লোকটার নাম বল, রিপ।

জাহান্নামে যাও, রূঢ় স্বরে জবাব দিল রিপ, তাকাতে সাহস পাচ্ছে না।

নিকুচি করি, ভাবল গ্রীন। অনিচ্ছাসত্ত্বেও, শক্ত হয়ে গেল চোয়াল। রিপের চুলের গোছা চেপে ধরল সে, একঝটকায় পেছনে কতি করল মাথা, আবার চড় মারল, তারপর আরেকবার। প্রতিটা আঘাতে সাময়িকভাবে বিকৃত হয়ে গেল রিপের মুখাবয়ব।

থামল গ্রীন, তবে চুলের মুঠি ছাড়েনি, ভাবলেশহীন গলায় বলল, আমি সারাদিন এভাবে চালিয়ে যেতে পারব, বাছা।

আবার আঘাত করল ও ব্যথায় কেঁদে ফেলল রিপ, দুর্বলভাবে ককিয়ে উঠল। গ্রীনের কজি আঁকড়ে ধরতে হাত বাড়াল ও, কিন্তু তেমন জোর পেল না। কপালে আরও দুটো খুসি খেয়ে অবশেষে একেবারে ভেঙে পড়ল রিপ, গ্রীন ছেড়ে দিল ওকে। ধীরে সুস্থে একটা সিগারেট বানাল ও শুনতে পাচ্ছে লজ্জায় ফুপিয়ে কাঁদছে ছেলেটা, রক্তবর্ণ চোখজোড়ায় ফুটে উঠেছে অসীম হতাশা।

কষে একবার সিগারেট টানল গ্রীন, খানিক ইতস্তত করে, রুক্ষ ভঙ্গিতে বাড়িয়ে দিল রিপের উদ্দেশে। কাঁপা কাঁপা আঙুলে ওটা নিল সে, তাড়াহুড়ো করে টানতে গিয়ে বেশি ধোঁয়া গিলে ফেলায় কাশি এসে গেল। নিজের জন্য আরেকটা সিগারেট বানাল গ্রীন। নাও, শুরু কর এবার, গম্ভীর সুরে বলল।

রিপের নাকের পাটা ফুলে উঠেছে, ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। আমার মত লাল হয়ে গেছে একদিকের গাল। ঠোঁট ফেটে ক্ষীণ রক্তের ধারা গড়াচ্ছে কশ বেয়ে। দুহাতে মুখ ঢাকল ও, কম্পিত গলায় বলল, কার্ল হালাম। ওর বাবা অ্যাংকর র‍্যাঞ্চের মালিক, পশ্চিমের পাহাড়ে ওদের বাথান। ওখানে থাকতে পারে, আমি ঠিক জানি না।

সব মিথ্যে, দোরগোড়া থেকে একটা চাপা কণ্ঠস্বর ভেসে এল। গ্রীন ঘাড় ফিরিয়ে দেখল কখন যেন নিঃসাড়ে ক্যানাডা এসে দাঁড়িয়েছে, ব্যান্ডানা দিয়ে নাক চেপে ধরে আছে! রুমালটা নামাল ও, নাক ঝাড়ল, তারপর বলল খিটখিটে গলায়, আমি একসময় কাজ করেছি অ্যাংকরে। কার্ল এরকম ছেলেই না। বইয়ের পোকা বলা যায়। বাপকে অন্ধের মত ভক্তি করে। কেন জানি না, তবে হালা একটা আস্ত শয়তান।

চোখ কুঁচকে ক্যানাডাকে জরিপ করছিল রিপ হ্যাঁ, এবার চিনতে পেরেছি তোমাকে, বলল ও। র‍্যাংলার ছিলে। বেশি কথা বলার দায়ে হালাম তোমাকে বরখাস্ত করে। অন্তত আমরা তাই শুনেছি।

আবার নাক সিটকাল ক্যানাডা। ঠিক। হালাম সবাইকে কুকুর বেড়াল মনে করে, তার সামনে কারও মুখ খোলা চলবে না। একবার যদি

থাম! বলল রিপ, যেন আচমকা মনে পড়েছে কিছু। গ্রীনের দিকে ঘুরল ও। তুমি বলছিলে স্কালি ব্ৰাওয়ারের লাশ টাওসে শনাক্ত করা হয়েছে। নিশ্চয় ক্যানাডা করেছে?

আলবত, ধূর্ত হাসি হেসে বলল ক্যানাডা। লাশটা দেখেছিলাম আমি। কিন্তু কার্ল এসবের মধ্যে জড়াল কী করে?

তোমাকে মাথা ঘামাতে হবে না, বাধা দিল গ্রীন। অন্য একটা বাক থেকে কম্বল তুলে নিয়ে ক্যানাডার দিকে সেটা ছুঁড়ে দিল ও। লাশ জড়িয়ে নাও, তারপর আমাদের ঘোড়াগুলো নিয়ে এস এখানে।

আমি বরং মার্শাল মককে ডেকে আনি গিয়ে, ক্যানাডার গালে ভাঁজ পড়ল।

না। আমি যা বলছি তাই কর। কাল তুমি বলেছিলে শহর এখান থেকে বেশ দূরে, কাজেই সূর্য তেতে ওঠার আগেই রওনা হতে চাই আমি।

মুচকি হেসে বেরিয়ে গেল ক্যানাডা। গ্রীনের ধমক খেয়ে ও যদি অসন্তষ্ট হয়েও থাকে, বাইরে তা প্রকাশ করল না। কিন্তু ওর ধূর্ত হাবভাব বিচলিত করল গ্রীনকে; ধূর্ত লোককে বিশ্বাস করা যায় না কোনমতে।

রিপকে ঝটপট কাপড় পরে তৈরি হতে বলল ও। তারপর সংক্ষেপে নিজের পরিচয় দিল। ভাল কথা, আমার নাম জেমস গ্রীন, প্রাইভেট ডিটেকটিভ। ডাকাতির ব্যাপারটা তদন্ত করতে আমার সংস্থাকে হুইলার স্টেজ কোম্পানি নিয়োগ করেছে।

পায়ে বুট গলাচ্ছিল রিপ। চোখ তুলে তিক্ত সুরে বলল, মোটা পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে বোধহয়

হয়েছে।

তার মানে, একজন বাউন্টি হান্টারের সাথে তোমার কোনও তফাত নেই। উঠে দাঁড়িয়ে বিছানা থেকে রিপ ওর শার্টটা তুলে নিল। আমার বয়স মাত্র বাইশ, অথচ ফাঁসিতে ঝুলতে যাচ্ছি।

খুনের সাজা ফাঁসি-কথাটা আগে ভাবা উচিত ছিল। তোমরা হঠাৎ স্টেজ ডাকাতি করতে গেলে কেন?

শার্টের বোতাম লাগাচ্ছিল রিপ। মাঝপথে থেমে গেল হাত। মনে করার চেষ্টা করছে কিছু! মাতাল ছিলাম আমরা। শোন, তোমার মন গলাতে চেষ্টা করছি না আমি, যেটা সত্যি তাই বলছি। কার্লের কাছে কিছু টাকা ছিল। সেটা দিয়ে হপ্তাখানেক শহরে বসে ফুর্তি করি আমরা। তারপর একদিন মার্শাল পিপার মক এসে বলল, আমরা যদি না যাই, আমাদের সে হাজতে পুরবে। কাজেই শহর ছাড়লাম আমরা, উত্তরে যাচ্ছি, তখনও কিন্তু মদ লছে। এখনও স্বপ্ন মনে হয় সবকিছু। কার্ল বলল, চল স্টেজ ডাকাতি কিংবা ব্যাংক লুট করি

অর্থাৎ পুরোটাই কাল হালামের দোষ?

না, তা না। তবে ও শুধু একটা কথাই বলছিল, ওর বাবার কাছে নাকি ও নিজের ক্ষমতা প্রমাণ করতে চায়। মাতাল ছিলাম, সবকথা ঠিক বুঝতে পারিনি। জানোই তো, মাতাল মানুষ বোকার মত কতকিছুই না বলে

অনেকের মাতাল হরারও দরকার পড়ে না, চাঁছাছোল জবাব গ্রীনের।

তা অবশ্যি। যাই হোক, আমরা দেখলাম স্টেজ আসছে, এরপর কীভাবে যেন ঘটে গেল ব্যাপারগুলো। ঝোঁপের ভেতর ঘোড়া বেধে স্টেজ থামালাম, তারপর স্কালি যখন মাথায় গুলি খেয়ে পড়ে গেল, আমরা পালালাম। প্রথমে অবিশ্বাস্য মনে হলো সবকিছু, পরে যখন বুঝতে পারলাম কঠিন বিপদে পড়েছি, দিনরাত ঘোড়া ছুটিয়ে সোজা চলে এলাম এখানে। তারপর কার্ল বলল সে বাথানে যাচ্ছি, ঝামেলা না মেটা পর্যন্ত ওখানেই থাকবে গা ঢাকা দিয়ে।

থামল রিপ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মাপল গ্রীনকে, ধীরে ধীরে বলল, তোমার কথাই ঠিক-মাতাল না হয়েই অনেকে বোকার মত কথা বলে।

মৃদু হাসল গ্রীন। রিপ তৈরি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল সে, তারপর বাইরে যেতে আদেশ করল ওকে। যাও, তোমাদের ঘোড়া দুটোয় জিন চাপাও গিয়ে। চালাকির চেষ্টা করবে না, আমি নজর রাখব।

রিপের পেছন পেছন ও বাইরের কড়া রোদে বেরিয়ে এল। ওর বাড়ির কোনা ঘুরে পেছনে যেতেই থমকে দাড়াল রিপ, দালানের ছায়ায় রাখা কম্বল জড়ানো মৃতদেহটার দিকে তাকাল শোকার্ত দৃষ্টিতে। ভাল ছেলে ছিল কার্লোস, খুউব ভাল, অনুচ্চ স্বরে বলল, গলা কাঁপছে। খোদা! মারিয়া জানলে তখন কী হয় দেখ।

মারিয়া কে?

ওর বোন। মেক্সিক্যান পাড়ায় একটা ক্যাফে চালায়। কার্লোসের ব্যাপারে খুব চিন্তা করে ও। রিপের ক্রুদ্ধ চোখ দুটো যেন ভস্ম করতে চাইল গ্রীনকে। তুমি ওকে খুন করেছ। এখন মারিয়া হয়তো প্রতিশোধ নিতে চাইবে তোমাকে মেরে।

গার্সিয়াদের ছেলেকে ক্যানাডা খুন করেছে, তথ্যটা গ্রীন জানাবার প্রয়োজন বোধ করল না। এর মধ্যে ওর বোন আসবে কেন-এটা আইনের ব্যাপার, বলল ও। তুমি তোমার কাজে যাও।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে ওই বোন ওকে ভাবিয়ে তুলল! কানাডার দোষে কাজটা শুরুই হয়েছে খারাপভাবে, এটা মনে হতে ওর মেজাজ খিচড়ে গেল। এখন কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তা কেউ বলতে পারবো হলফ করে।

 ০২.

ওই যে অকটিও; ওখানে! একগাল হেসে বলল ক্যানাডা, মরুভূমির মাঝখানে কতকগুলো ছড়ানো ছিটানো বাড়িঘর দেখাল। অল্প কিছুক্ষণ আগে দুপুর পেরিয়ে গেছে, ধূসর আকাশে আগুন ছড়াচ্ছে হলুদ সূর্য শহরের ওপাশে, দিগন্তে, আবছাভাবে দেখা যাচ্ছে পাহাড় পর্বতের চূড়া। ঘাম ঝরানে প্রচণ্ড গরমে ধীরকদমে এগিয়েছে ওরা, ঘোড়াগুলোকে বিশ্রাম দিতে বার থেমেছে পথে। গ্রীন বিরক্ত হয়ে উঠেছিল।

এখান থেকে ভুতুড়ে শহর মনে হচ্ছে, বলে ব্যান্ডানা দিয়ে মুখ আর ঘাড়ের ঘা মুহল ও। কেন মানুষ দেখা যাচ্ছে না।

ঘুমাচ্ছে সবাই।

মার্শাল মকের অফিসটা কোথায়?

রাস্তার শেষ মাথায়। ওই যে, দূরে একটা কটনউড গাছ দেখতে পাচ্ছি না? শহরের একমাত্র গাছ-জেলখানার ঠিক পেছনেই। রিপের দিকে ধূর্ত দৃষ্টিতে তাকাল ক্যানাডা। এক সময় বহুলোকের ফাঁসি হয়েছে ওখানে।

আমাকে ফাঁসি দেবে না কেউ, বিড়বিড় করে বলল রিপ।

বল, এখানে না, কানাডা হাসল।

চুপ কর, দুজনেই, ধমক দিল গ্রীন। ঠিক আছে, আমরা ঘুরে জেলখানার পেছন দিয়ে আসব। শহরবাসীদের নজরে যত কম পড়া যায় এখন ততই ভাল।

লোকচক্ষুর অগোচরে জেলখানায় পৌঁছাতে পারবে ওরা এ আশা করেনি গ্রীন, বিশেষত ওদের সঙ্গে যখন স্যাডলে বাধা একটা লাশ রয়েছে। তবে মেক্সিক্যানদের সুউচ্চ প্রাচীন গির্জা, দোকানপট আর ক্যান্টিনাগুলো যেখানে অবস্থিত, শহরের সেই এলাকা পেরিয়ে আসার সময় কারও চেহারায় উদ্বেগ লক্ষ করল না ওরা। একজন আলোর দৃষ্টিতে এই অঞ্চলের পরিচয় মেক্সটাউন হিসেবে এখানেই কার্লোসের বেনি, মারিয়ার ক্যাফে রয়েছে, গ্রীনের মনে পড়ল। বাড়িঘর আর ব্যবসায়িক ভবনগুলোর পেছন দিয়ে এগোল ওরা, দু-এক জোড়া কৌতূহলী চোখ ছাড়া আর কেউ কোনরকম উৎসাহ দেখাল না ওদের ব্যাপারে। অবশেষে কটনউডের ছায়ায় থামল তিন অশ্বারোহী। সামনেই একটা চুনসুরকির চৌকো লাল দালান-অকটিওর কাগার। ঘোড়া থেকে নেমে হিচ রেইলে লাগাম বাঁধল গ্রীন, ইশারায় রিপকেও নামতে বলল। চল, ভেতরে গিয়ে মার্শালের সাথে দেখা করি। তারপর শহরবাসীরা জেগে ওঠার আগেই চোখের সামনে থেকে সরিয়ে ফেলব লাশটা।

.

নিজের চেয়ারে হেলান দিল মার্শাল পিপার মক। মাঝবয়সী, দড়ির মত পাকানো শরীর। ঘন ভারি পাপড়ির নীচে সুন্দর দুটো চোখ। হলদেটে জমির মাঝখানে পিঙ্গল তারা। শান্তভাবে বেসরকারি গোয়েন্দার বক্তব্য শুনল সে। তার ডেস্কের সামনে, একটা চেয়ারে বসে আছে গ্রীন, ক্লান্ত চরণযুগল মেলে দিয়েছে টানটান করে। হ্যাট আর স্যাডলব্যাগগুলো চেয়ারের একপাশে মেঝের ওপর পড়ে আছে। ঘর ভাড়া করাতে হোটেলে গেছে ক্যানাডা, তবে ও বিদায় নেয়ার আগে পিপার মক সাবধান.. করে দিয়েছে, যা ঘটেছে সে ব্যাপারে যেন কিছুই ফাঁস না করে ও।

লোকে যাই জিজ্ঞেস করুক, তুমি কিছু জানো না, বোঝা গেছে? এটা এখন শান্ত শহর, আমি চাই শান্তই থাক।

ভয় নেই, আমার মুখ আলগা হবে না, ক্যানাডা হেসেছে। এখানে আমার অন্য কাজ আছে।

কার্লোস গার্সিয়ার লাশ আপাতত পেছনের দুটো সেলের একটায় রাখা হয়েছে; অন্যটায় কয়েদ করা হয়েছে ডিউক রিপকে। গ্রীনের পরিচয়পত্র পরীক্ষা করেছে মক।

ডাকাতির ব্যাপারটা খুলে বলতে যাচ্ছিল গ্রীন, কিন্তু মার্শাল বাধা দিয়ে জানাল সে ইতিমধ্যেই পত্রিকায় ওই ঘটনার খবর পড়েছে। ডেস্কের ওপর রাখা একটা খবরকাগজ গ্রীনের দিকে ঠেলে দিল সে।

টাওস উইকলিতে ছাপা হয়েছে। ওরা আমাকে পাঠায় এক কপি। এটা এসেছে আজ দুপুরের স্টেজে। সম্ভবত তুমি আর ক্যানাডা যেদিন টাওস ছেড়েছ, সেদিনকার কাগজ।

পত্রিকাটা নিল গ্রীন। প্রথম পাতায় সুদীর্ঘ রিপোর্ট, বড় হরফের শিরোনাম।

ডাকাতের হাতে স্টুয়ার্ট কোস্টার নিহত

টাওস স্টেজে স্টুয়ার্ট কোল্টারের নিধুর হত্যাকাণ্ড স্থানীয় জনমনে ক্রোধের সঞ্চার, করিয়াছে। মিস্টার কোল্টার এই অঞ্চলে একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। গবাদি পশু, খনি এবং কাঠের ব্যবসা ছিল তার। পশ্চিমগামী স্টেজে চড়িয়া ঈগল পাস হইতে টাওসে আগমনকালে চারজন মুখোশধারী ডাকাতের আক্রমণে তিনি নিহত হন। স্টেজচালক টম ওয়েবস্টার ঘটনা সম্পর্কে আমাদের কাছে নিম্নলিখিত বিবৃতি প্রদান করেন।

এটা ছিল নিয়মিত কোচ, মিস্টার ওয়েবস্টার বলেন। গাড়িতে কোন মেইল ব্যাগ বা স্ট্রংবক্স ছিল না বলে আমি বন্দুকধারী পাহারাদার নিইনি সঙ্গে। মিস্টার কোল্টার ছিলেন একমাত্র যাত্রী।

স্টোন লজে, ঘোড়া বদলাই আমরা। দুপুরের খাওয়াও ওখানেই সারি। যাত্রার সময় মিস্টার কোল্টার জিজ্ঞেস করেন তিনি ওপরে এসে বসলে আমার কোন আপত্তি আছে কিনা, আমি বলি না। চমৎকার আবহাওয়া ছিল সেদিন। স্টোন লজের আট মাইল পশ্চিমে রক জর্জে মোড় নিচ্ছি আমরা এই সময় চারজন মুখোশধারী লোক একটা ঝোঁপের ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের পথরোধ করে দাঁড়ায়। ওদের দুজনের হাতে ছিল রাইফেল, অন্য দুজনের পিস্তল! এর আগেও স্টেজকোচ চালাতে গিয়ে বার কয়েক ডাকাতের কবলে পড়েছি আমি। জানি এরা কথা বলে কম, কাজ দ্রুত সারেবাধ্য না হলে গুলি করে না।

কিন্তু এদের ব্যাপারটা ছিল অন্যরকম। আমি দেখেই বুঝতে পেরেছিলাম এই চারজন পেশাদার লুটেরা না-আনাড়ি। অস্থির দেখাচ্ছিল ওদের, বোকার মত হাসাহাসি করছিল নিজেদের মধ্যে প্রথমে আমি ভেবেছিলাম ব্যাপারটা নিছক কৌতুক, তারপর দেখলাম ওরা মাতাল হয়ে আছে, দুজন তাদের প্যান্টের পকেট থেকে বোতল বের করছে।

তা সত্ত্বেও, আমি ভয়ের কারণ দেখিনি। আমি ওদের বললাম গাড়িতে কোন মূল্যবান জিনিসপত্র নেই, তবে ইচ্ছে করলে ওরা খুঁজে দেখতে পারে। দুজন তল্লাশি করে দেখল সবকিছু। এরপর নিজেদের মধ্যে শলাপরামর্শ করল ওরা, খুব নিচু স্বরে কথা বলছিল, ফলে আমি কিছুই শুনতে পাইনি। ইতিমধ্যে শেষ করেছিল একটা বোতল, এবার ওরা সেটা ছুড়ে ফেলে দিল ঝোঁপের ভেতর। তারপর রাইফেলের নল দিয়ে একজন খোঁচা মারল মিস্টার কোল্টারের বুকে। মিস্টার কোল্টারের ওয়েস্টকোটের পকেটে বাঁধা সোনার ঘড়ির চেইনটা চোখে পড়েছিল এর। মিস্টার কোল্টারের পার্সসহ ঘড়িটা চাইল সে।

এতক্ষণ একটা কথাও বলেননি মিস্টার কোল্টার। এবার তার মুখের দিকে অকিয়ে আমি বুঝলাম তিনি দারুণ রেগে গেছেন। তারপর উনি কঠোর ভাষায় নিন্দা করলেন ওদের। বললেন, সৎভাবে জীবনযাপনের বদলে যারা অন্যের ধন লুটে খায় তাদের উনি কোন চোখে দেখেন। ওরা শুনল তাঁর কথা, কিন্তু বেশিক্ষণ না। যে লোকটা রাইফেলের গুতো মেরে মিস্টার কোল্টারের পার্স আর ঘড়ি দাবি করেছিল, এবার সে তক্ষুণি ওটা দিয়ে দিতে বলল।

তো, মিস্টার কোল্টার তার কোটের তলায় হাত ঢোকালেন যেন পৃর্স বের করবেন, কিন্তু তিনি বের করলেন পিস্তল। মুখোশপরা লোকগুলো চমকে উঠে ছড়িয়ে পড়ল, তারপর শুরু হলো তুমুল গোলাগুলি। আমার কাঁধে গুলি লাগল। তারপর মিস্টার কোস্টার আঘাত পেয়ে সিট থেকে ছিটকে পড়ে গেলেন মাটিতে। তার অদুরেই একজন ডাকাত আহত হয়ে পড়েছিল, মিস্টার কোস্টারের গুলিতে মাথায় চোট লাগে তার! বাকি লোকগুলো এরপর তাদের ঘোড়ায় চেপে পালিয়ে যায়।

আমি যখন নেমে আসি, মিস্টার কোল্টার এবং ডাকাত দুজনেই মারা গেছে। ওদের লাশ কোচে তুলে টাওসে হাজির হই আমি।

মিস্টার ওয়েবস্টারের বিবরণ হইতে পরিষ্কার বোঝা যায় মুখোশধারী ডাকাতরা নিতান্তই আনাড়ি ছিল। নিহত দস্যুকেও তৎক্ষণাৎ শনাক্ত করা সম্ভব হয় নাই। শেরিফ শেভলিন লাশের ছবি তোলেন এবং সকল দায়িত্বশীল নাগরিককে অনুরোধ করেন মৃতদেহ শনাক্ত করিতে। অতঃপর মাত্র গতকাল স্থানীয় সানরাইজ কোরাল ও লিভারি বার্নের অসল্যার, লাইল ক্যানাডা, লাশ দেখিয়া শেরিফ শেভলিন ও হুইলার স্টেজ অ্যান্ড ফ্রেইট লাইন্সের সভাপতি ফ্র্যাংক হুপারের সহিত সাক্ষাৎ করিতে চান। তাহাদের আলাপের বিষয়বস্তু সম্পর্কে কিছু জানা যায় নাই, তবে মিস্টার হুপার ঘোষণা করেন বিষয়টি তদন্ত করিয়া দেখার জন্য তিনি একটি বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থাকে নিযুক্ত করিয়াছেন।

জেমস গ্রীন, সংস্থার সেরা অপারেটর, আজ সকালে শহরে উপস্থিত হন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনার পরপরই তিনি ও মিস্টার ক্যানাডা এক অজ্ঞাত গন্তব্যের উদ্দেশে টাওস ত্যাগ করেন। মিস্টার গ্রীন একজন সাবেক ইউ, এস, মার্শাল। গত বৎসর ডেনভারের কুখ্যাত ব্ল্যাক হ্যাক চক্রকে একক প্রচেষ্টায় নির্মূল করিয়া তিনি সুনাম অর্জন করেন।

তার বর্তমান দায়িত্ব প্রসঙ্গে মিস্টার গ্রীন সংক্ষেপে বলেন, এমন কিছু বিশেষত্ব নেই এতে। সম্ভবত অবসর নেয়ার আগে এটাই আমার শেষ অ্যাসাইনমেন্ট।

.

ডেস্কের ওপর পত্রিকাটা নামিয়ে রাখল গ্রীন। ঠিকই লিখেছে। স্কালি ব্রাওয়ারের লাশ শনাক্ত করে ক্যানাডা। জানত ওর বাড়ি এখানে। হুপারকে বলে, পথ দেখিয়ে আমাকে সে নিয়ে আসতে পারবে গার্সিয়াদের পুরানো বাসায়। ও জানায়, দরকার হলে ব্ৰীওয়ার তার বন্ধুদের সাথে লুকিয়ে থাকত ওখানে। হুপার রাজি হয়ে যায়। সমস্ত খরচপাতি সেই দিচ্ছে।

তরুণ গার্সিয়া কীভাবে নিহত হয়েছে এবং ডাকাতিতে কার্ল হালামের ভূমিকা সম্বন্ধে ডিউক রিপ যে জবানবন্দী দিয়েছে তা জানাল গ্রীন। খবরটা শুনে মার্শালের চেহারায় কোনরকম ভাবান্তর হলো না।

বলতে কী, মোটেই অবাক হচ্ছি না আমি। তবে লোকজন যখন জানবে, অনেকেই বিস্মিত হবে খুব। একটু থামল মার্শাল। ভাল ছেলে ছিল ওরা, সবাই। তরতাজা তরুণ একেকটা, নিষ্পাপ। আমি ডিউক রিপ আর বাকি দুজনের কথা বলছি, কার্লের না। ওর ব্যাপারটা একটু আলাদা।

ক্যানাডা বলছে ছেলেটা নাকি বইয়ের পোকা, বাপকে দেবতা মনে করে। অথচ রিপের কথা যদি সত্যি হয়, ডাকাতির পরিকল্পনাটা কার্লের, এর মাধ্যমে ওর বাবার কাছে ও কিছু একটা প্রমাণ করতে চাইছিল। ক্যানাডা বলেছে হালাম লোকটা ভীষণ নীচ।

কঠিন লোক। প্রথম যখন এখানে বসতি করে ও, আইন বলতে কিছু ছিল না এদিকে, কিন্তু হালাম মাটি কামড়ে পড়ে থাকে। সত্তর সালে, তখনও শেরিফ হইনি আমি, হালাম তার বাথানের কর্মচারীদের নিয়ে একদল গরুচোরকে ধাওয়া করে মেক্সিকোতে গিয়ে পাকড়াও করে। ওখানেই ওদের সে ফাঁসি দেয়। কঠিন, গোয়ার টাইপের লোক, নিজের খেয়ালখুশিমত চলতে চায় সবসময়। তুমি আগেও দেখেছ এধরনের মানুষ। থুতনিতে হাত ঘষল মক, দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তবে ছেলেটা যে ওকে দেবতা মনে করে বলছ, আমি কিছু জানি না এ ব্যাপারে। বোধহয় ভয় আর শ্রদ্ধা মিশে তৈরি হয়েছে এরকম কিছু একটা।

রিপ বলছে সম্ভবত ওদের বাথানে আছে ও

থাকতে পারে। হপ্তা দুয়েক হলো আমি আর দেখছি না ওকে। শহরে এসে পাগলামি করছিল। ব্যাংক থেকে টাকা তুলে তুমুল হট্টগোল শুরু করে। বিষণ্ণ সুরে হাসল মক। আঠারো বছরের ছেলে, এর আগে হয়তো এক ফোঁটা মদও খায়নি কোনদিন। আমরা সবাই খুব অবাক হয়েছিলাম। মেক্সটাউনে আড্ডা জমায়। ওখানেই কার্লোস এবং অন্যদের সঙ্গে দেখা হয় ওর। তবে ওখানে বেশিক্ষণ মদ খেতে পারেনি; কারণ গার্সিয়ার বোন, মারিয়া, চায়নি ওই ছেলে মদ খাক। ফলে স্যালুনে চলে আসে ওরা, ভাঙচুর করে জিনিসপত্র, কিন্তু ওদের মধ্যে একজন ফ্রেন্ড হালামের ছেলে বলে, কেউ কিছু করতে সাহস পায়নি। আমি ওদের বলি, ভদ্রভাবে না চললে হাজতে পুরে রাখব। তখন ওরা শহর ছেড়ে চলে যায়।

হালাম নিশ্চয় শুনেছে কী ঘটছে। আমায় মনে হয় যেকোন কড়া লোকই এমন অবস্থায় তার ছেলেকে চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাবে।

ওপর নীচ মাথা ঝাঁকাল মক। আমিও সেজন্যেই অপেক্ষা করছিলাম, কিন্তু আসেনি সে।

মাথায় হ্যাট চাপাল গ্রীন, স্যাভলব্যাগগুলো তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। এখানে যাওয়ার সেরা সময় কখন? আজ বিকেলে?

দেরি হয়ে গেছে অনেক। বেশ দূরের পথ, কাল সকালে যাব আমরা। চেয়ার ছাড়ল মক, হাত বাড়িয়ে ব্ল্যাক থেকে তার টুপিটা নিন। দুই জায়গায় যেতে হবে, আমাকে। প্রথমে পাদ্রি। তারপর দেখা করব মারিয়া গার্সিয়ার সঙ্গে।

বাইরে বেরিয়ে এল ওরা। রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখল ঘুম থেকে আবার জেগে উঠেছে শহর। ইশারায় ওপাশের হোটেলটা দেখাল মক। তোমার যা কিছু দরকার সব পাবে ওখানে-গোসলের ব্যবস্থাও আছে।

হ্যাঁ, গোসল করতে হবে, যা ধকল গেছে এই দুদিন। আরেকটা কথা, কাল ভোরেই বেরোব আমরা। দেরি করলে নাও পেতে পারি ওকে।

মাথা ঝাঁকিয়ে সায় জানাল মার্শাল। ভোরেই।

তারপর হাত মিলিয়ে দুদিকে চলে গেল দুজন।

০৩.

ঘোড়ার খুরের গুরুগম্ভীর আওয়াজে সচকিত হয়ে উঠল কার্ল হালাম। র‍্যাঞ্চ হাউসের দোতলার বারান্দায় অন্ধকারে বসে আছে ও। সামনে ঝুঁকল কার্ল, হাতুড়ির ঘা পড়ছে যেন বুকে, চোখ কুঁচকে তাকাল নীচে। রুপালি জ্যোত্যায় ভেসে যাচ্ছে আশপাশ। শুধু ঝোঁপঝাড় আর দালানের আনাচেকানাচে মৃদু ছায়া পড়েছে। উঠনের কিনারে একজন ঘোড়াসওয়ার দাঁড়িয়ে রয়েছে লক্ষ করে ভয়ের স্রোত বয়ে গেল ওর শরীরে, সতর্ক হয়ে উঠল।

র‍্যাঞ্চের দালানকোঠা একে একে জরিপ করছে ঘোড়াসওয়ার। পার্লারের পর্দার ফাঁক গলে, আলো আসছে। কার্ল বুবলি ওর বাবা জেগে আছে, তার শখের ঘোড়ার চামড়া, বিছানো আরাম কেদারায় বসে ফেনিমোর কুপারের কোন বই পড়ছে। বিরাট উঠনের আরেক পাশে ক্যারেজ হাউস, বার্ন, স্ট্যাবল আর কোরাল। সবশেষে, চত্বরের অপর প্রান্তে বাংকহাউস। এখন সেদিকে প্রসারিত হয়েছে ঘোড়াসওয়ারের দৃষ্টি। ভেজা খড় আর গরুবাছুর আর ঘোড়ার মলমূত্রের দুর্গন্ধে রাতের বাতাস ভারি হয়ে আছে। কাছের কোন পাহাড় থেকে কতির সুরে চাঁদের কাছে ফরিয়াদ জানাল একটা কয়ৌট এবং থামল।

ঘোড়াসওয়ার সামনে এগোতে, মোজা পায়ে নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল কার্ল, নিচ্ছিদ্র অন্ধকারের সন্ধানে তাকাল ডাইনে বাঁয়ে। ভবঘুরে না, ভাবল কার্ল, জানে ক্ষুধার্ত কাউহ্যান্ড সরাসরি বাবুর্চির, ঘরেই যাবে। বুড়ো টিম ওখানে বাসনকোসন ধুচ্ছে এখনও। পরক্ষণে ভীষণভাবে দমে গেল ও যখন দেখল নীচের পোর্ট থেকে দশ-বারো গজ দূরে, হিচ রেইলের সামনে থেমে স্যাডল থেকে নামছে অশ্বারোহী। আচমকা ভারমুক্ত হয়ে যাওয়ায় ঘোৎ শব্দে নাক ঝাড়ল ঘোড়াটা।

ওই আওয়াজে সতর্ক হয়ে উঠল একন। কার্ল জানে ওটা হার্ভে স্টেজ। সম্ভবত, এতক্ষণ ক্যারেজ হাউসের বাংকে বসে আগন্তুকের সমস্ত গতিবিধিই লক্ষ করেছে সে। নবাগত নিজেই তার উপস্থিতি জানান দেবে এই আশায় অপেক্ষা করছে। হার্ভের নাগালের মধ্যে নিশ্চয়ই একটা পিস্তল আছে এখন। শহরের অধিকাংশ লোক যেখানে আজকাল আর সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র রাখে না, সেখানে হার্লে কোমরের বেল্টে সর্বদা একটা পিস্তল আর ছুরি গোজা থাকে। এর কারণ জানতে জীবনের অনেকগুলো বছর ব্যয় করতে হয়েছে কার্লকে।

ও লক্ষ করল হার্ভের ছোট শরীরটা ধীরে ধীরে উঠনের কিনার ঘুরে আসছে। আগন্তুক আর নিজের মাঝখানে রেখেছে ঘোড়াটাকে। নবাগত এখন হিচ রেইলের নীচে বসে পর্যবেক্ষণ করছে চারদিক। কার্লের ক্ষীণ আশা ওর সাথে বা যা ঘটেছে তার সঙ্গে লোকটার আগমনের কোন সম্পর্ক নেই। দুঃস্বপ্নের মত ওই ঘটনা অহরহ তাড়িয়ে ফিরছে ওকে, তবু সে এই আশায় বুক বাঁধতে চাইল। কার্ল দেখল আগন্তুকের পেছনে চলে এসেছে হার্ভে, তারপর স্বস্তির সুরে ওকে বলতে শুনল, অ, তুমি। এখানে কী করছ?

সশব্দে হাসল লোকটা। তোমার খেলনাটা সরাও, হার্ভে, বলল সে, ফ্রেডের সাথে দেখা করতে এসেছি আমি।

মিস্টার হালাম বলরে। তার সাথে তোমার কী দরকার?

তুমি শুধু গিয়ে বল লাইল ক্যানাডা এসেছে, দেখা না করলে পরে আফসোস করতে হবে তাকে।

লাইল ক্যানাডা! হাঁপ ছাড়ল কার্ল, জাট অথচ কর্কশ কণ্ঠস্বরের মালিককে চিনতে পেরেছে, অ্যাংকরে একসময় কাজ করত ক্যানাডা। লোকটা ঘোড়া ভালবাসত খুব, আর ওরাও সহজে পোষ মানত ওর কাছে। কিন্তু ফালতু বকবক করার অভ্যাস আছে বলে কার্লের বাবা ওকে বরখাস্ত করে।

সামনের দরজাটা খোলার আওয়াজ পেল কার্ল। একচিলতে আলো ছড়িয়ে পড়ল বাইরে, তারপর ফ্রেড হালামের ছায়া এর অধিকাংশই দখল করে নিল। নীচের পোর্চে তার পা ফেলার শব্দ শোনা যাচ্ছে। কে? রূঢ় স্বরে প্রশ্ন করল সে। কথা বলছ না কেন?

আলোর কিনারে এগিয়ে এল হার্ভে, কার্ল দেখল ওর রুক্ষ, সন্দিহান চোখজোড়া কোটর ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। লাইল ক্যানাডা, তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায়।

ক্যানাডা? আমি তার সাথে দেখা করার কোন কারণ দেখছি না।

এখন আমাকে দেখছ তুমি, আলোয় এসে বলল ক্যানাডা। দাড়িগোঁফে ঢাকা মুখখানা এবার দেখতে পেল কার্ল, ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা অস্থির ধূর্ত হাসিটা চিনতে পারল। আমার কথা শুনলে তোমারই লাভ-এর সাথে আইনের প্রশ্ন জড়িত।

তুমি আইনের লোক নও।

আমিও তা বলিনি। টাওসের এক আস্তাবলে কাজ করি আমি, সেখানে

এ কথা বলতে তুমি ছুটে আসনি এতদূর।

পাগল! এত ভাল একটা চাকরি ছেড়ে এসেছি যখন ব্যাপার নিশ্চয় গুরুতর। লোক আছে আমার সঙ্গে-ডিটেকটিভ গ্রীন। টাওসের হুইলার স্টেজ কোম্পানি ডাকাত ধরার জন্য, ঠিক করেছে ওকে। ডাকাতরা ওদের একটা স্টেজ লুট করার সময় একজন যাত্রীকে খুন করে।

কথাগুলো আলোড়ন তুলল কার্লের মগজে; ওর বাবার বক্তব্য ও শুনতে পেল। ধড়ফড় করছে বুক, দ্রুত শ্বাস পড়ছে, আচমকা মাথা ঘুরে, উঠতে দেয়ালে হেলান দিয়ে টাল সামলাল ও। একসময় ক্যানাডার অট্টহাসি শুনতে পেল সে। লোকটা বলছে, জানতে চাইলে টাকা খরচ হবে তোমার। ইচ্ছে করলে আজ রাতেই কিনে নিতে পার তথ্যটা, নয়তো কাল সকালে মার্শালের কাছেই শুনবে। তবে তখন হয়তো কিছুই করার থাকবে না তোমার।

মুহূর্তের নীরবতা। তারপর ওর বাবা যখন মুখ খুলল কার্লের বাকি আশাভরসাও উবে গেল। কত? কর্কশ কণ্ঠে প্রশ্ন করল ফ্রেড ছালাম।

এক হাজার। নগদ। এখনকার বাজারে তোমার বিশটা গরুর দাম। টাকা না দেখা অবধি মুখ খুলছি না আমি। আর হ্যাঁ, কথাটা যেন আমাদের এই তিনজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

উদ্বিগ্ন স্বরে হারে প্রশ্ন করল, ছেলেটা কোথায়, ফ্রেড?

আজ সকালে বলল শহরে যাচ্ছে, রাতে বাইরেই থাকবে। তুমি ছিলে তখন, তুমিও শুনেছ।

আমরা যখন বাইরে ছিলাম তখন ফিরেও এসে থাকতে পারে। তুমি ঠিক জানো, ও ঘরে নেই?

হালাম বলল, দাঁড়াও, তারপর পারলার হয়ে সিঁড়িতে ওর পদশব্দ পাওয়া গেল। কার্ল! ল্যান্ডিং থেকে ভেসে এল ডাক। কার্ল!

বাবার ওপর টেক্কা দিয়েছে ভেবে চাপা উল্লাস বোধ করল কার্ল। সকালে শহরে যায়নি সে, গিয়েছিল কার্লোস আর ডিউকের সঙ্গে দেখা করতে গার্সিয়াদের পুরানো শীপ র‍্যাঞ্চে। ওরা ছিল না সেখানে অগত্যা বাসায় ফিরে আসে ও। টের পেয়েছে লোকজনসহ ফিরে এসেছে ওর বাবা, কিন্তু রাতের খাওয়া খেতে ও বেরোয়নি নিজের ঘর থেকে, বিষণ্ণ মনে কেবলই ভেবেছে কার্লোস আর ডিউক হয়তো শেষপর্যন্ত চলেই গেছে দেশ ছেড়ে।

ওর ঘরের দরজা খুলে গেছে শুনতে পেল ও, তারপর রুক্ষ কর্তৃত্বসুলভ গলায় আবার ডাকল ওর বাবাঃ কার্ল! থাকলে, জবাব দাও।

বাবাকে যেন দেখতে পাচ্ছে সে, মনে হলো ওর, বিশাল চওড়া শরীর, চৌকো মুখখানা,থমথম করছে, চোখ দুটো কঠিন। সহসা ভয়ে শুকিয়ে গেল ওর বুক, তারপর এক মুহূর্ত বাদে শুনতে পেল তাচ্ছিল্যের সুরে অব্যক্ত একটা শব্দ করল ওর বাবা, ঘুরে চলে গেল সিঁড়ির পানে।

সামনে ঝুঁকল কার্ল, দেখল হার্ভে জরিপ করছে উঠটা। আধো-অন্ধকারে অ্যাংকর ফোরম্যানের ক্ষুদ্রকায় অবয়বটা দেখে ওর মনে পড়ল গোলাঘরে মাটির নীচে কী পোঁতা রয়েছে। সেদিন প্রায় ঘণ্টাখানেক উন্মত্তের মত ওখানে মাটি খুঁড়েছিল হার্ভে, কোমর-সমান গভীর একটা গর্ত খুঁড়তে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠেছিল সে, গাল বকছিল অনবরত। পরে গর্তটা আবার বুজিয়ে ভালমত মাটি দুরমুজ করে হার্ভে, তারপর প্রচুর কেরোসিন ছিটিয়ে দেয় সেখানে যাতে কোন অস্বাভাবিক গন্ধ না বেরোয় ছালায় পুরে যে জিনিস, ওখানে মাটিচাপা দেয়া হয়েছে খোলা হাওয়ায় বেশিক্ষণ ফেলে রাখলে একশো গজ দূর থেকেও তার দুর্গন্ধে পরিবেশ বিষিয়ে উঠবে।

পোর্টে ফিরে এল ফ্রেড হালাম, রূঢ় গলায় বলল, পাশের দরজায় যাও। বাড়ির কোনা ঘুরে অদৃশ্য হলো হার্ভে আর ক্যানাডা। অ্যাংকরের অফিস-ঘর ওইদিকে অবস্থিত।

কার্ল দিশেহারা হয়ে ভাবতে থাকে কী করবে সে-বাবার অনুকম্পা চাইবে, না পালিয়ে যাবে। বাবার সামনে দাঁড়াবার কথা মনে হতেই সাহস হারিয়ে ফেলল ও, জানে কোনদিনই তা সম্ভবপর হবে না ওর পক্ষে। কাজেই এখানে আর কোন আশা নেই, পালাতে হবে ওকে। ঘোড়ার পিঠে জিন চাপানো সম্ভব নয়, হার্ভে টের পেয়ে ওকে পাকড়াও করবে এও সত্যি, বাকি রাতটুকু আজ জেগেই কাটাকে হার্ভে, শহর থেকে ওর ফেরার অপেক্ষায় থাকবে। এর বাইরে যেতে চাইল না ওর চিন্তাশক্তি, ওর ভবিষ্যৎ বিচার করতে অস্বীকার করল তার কি আইনের হাতে ধরা দেয়া উচিত কার্লোস আর ডিউক কোথায় গেছে একবার জানতে পারলে হত।

পা টিপে টিপে নিজের ঘরে ঢুকল কার্ল, বুট পরল, পালাবার আকুতিতে হাত কাঁপছে। সরু কোমরে পিস্তলসমেত গানবেল্ট জড়াল সে, অন্ধকারে হাতড়ে টুপি খুঁজে নিয়ে মাথায় চাপাল। ড্রয়ার থেকে ওর টাকার বাকফিনের থলেটা বের করল, এখন আর মাত্র শ-দুয়েক ডলার রয়েছে ওতে। এবার ব্যারান্দায় বেরিয়ে এসে রেইল টপকাল কার্ল, নিচু হয়ে লাফ দিল। মাটিতে পড়ে ভারসাম্য হারাল সে, হুমড়ি খেল, হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে গেল হিচ রেইলে বাঁধা, ক্যানাডার ঘোড়ার দিকে লাগাম খুলে ও যখন অপরিচিত স্যাডলে লাফিয়ে চড়ে বসল, ভয় পেয়ে হেষারব করল জানোয়ারটা। পরমুহূর্তে হার্ভের সচকিত চিৎকার পৌঁছাল ওর কানে।

ফিরে,এস, বাছা! ফিরে এস, শুনতে পাচ্ছ না?

গোড়ালির ছোঁয়ায় মাঝারিকদমে ঘোড়া ছোটাল কার্ল, পেছনে তাকিয়ে দেখতে পেল অফিস-ঘরের খোলা দরজা দিয়ে আলো এসে পড়েছে বাইরে, তিনজন লোক দাঁড়িয়ে রয়েছে ওখানে। ও বুঝতে পারল না, ওরা ধাওয়া করবে কিনা। নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে ভয়ানক শঙ্কিত হয়ে উঠল সে, অন্য সব অনুভূতি লোপ পেল। বাবার ওপর ওর শ্রদ্ধাবোধ বিশ্বাস যেদিন চুরমার হয়ে গেল সেদিন ও প্রচণ্ড মানসিক আঘাত পেয়েছিল, এবং সেজন্যই ডাকাতির পরিকল্পনা আঁটে কারণ ওর কোমল মন এভাবে প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল জন্মদাতার ওপর, কিন্তু ওর আজকের অবস্থার কাছে তাও যেন তুচ্ছ হয়ে গেছে। এখন শুধু একটা কথাই ভাবতে পারছে সে কোথায় যাবে। দশ মিনিট পর কাল যখন সদর রাস্তায় উঠল তখন মনস্থির করে ফেলেছে সে। ডানে মোড় নিল ও, মেঠোপথ ধরে পাহাড়ি এলাকার ভেতর দিয়ে ছুটে চলল মরুভূমির উদ্দেশে।

.

ক্যানাডা তার কাহিনি বলা শেষ করতে সবে হার্ভে স্টেজের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছে ফ্লেভ হালাম, এই সময় বাড়ির সামনের অংশে গোলযোগের আভাস পায় ওরা।

ঝটপট বাইরে বেরিয়ে এল লোক তিনজন, কী ঘটছে বুঝতে পেরে তক্ষুণি চেঁচিয়ে উঠল হার্ভে। ক্যানাডাও একই সিদ্ধান্তে পৌঁছাল। ও-ই, উদ্বিগ্ন সুরে বলল ও। আমার কথা শুনতে পেয়ে পালিয়ে গেল।

নিশ্চয় দোতলার বারান্দায় বসেছিল ঘাপটি মেরে, বিরক্তির সঙ্গে বলল হার্ভে। ঠিক আগের বারের মত

মানে? জিজ্ঞেস করল ক্যানাডা।

কিছু না, রুক্ষ সুরে জবাব দিল হার্ভে।

ঘোড়া চুরি নেহাত সমান্য ব্যাপার না। একসময় তোমার আইনে এর সাজা হত

ফাঁসি-তাই না, ফ্রেড? যাকগে, ঘোড়াটা আমার না টম টেরিলের আস্তাবল থেকে ভাড়া

টেরিল জানে তুমি এখানে আসছ? প্রশ্ন করল হালাম

না, জানে না। বলেছি সেজে এক লোকের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছি। এখানে আমরা হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছি কেন? ধরার চেষ্টা করবে না ওকে?

লাভ নেই, সংক্ষেপে বলে অফিস-ঘরে ঢুকে গেল হালাম। ভেতরে এস, আমি বাকিটাও শুনব।

ক্যানাডা এবার দ্রুত জেমস গ্রীন, কার্লোস গার্সিয়ার মৃত্যু এবং ডিউক রিপের জবানবন্দীর কথা বলে গেল। জানাল রিপ গোয়েন্দার কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছে, কার্লই ডাকাতির পরিকল্পনাটা করে।

কাল সকালেই গ্রীন আর মককে এখানে দেখতে পাবে তুমি। গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকবে ওদের সাথে। ছেলেটা পালিয়েই মুশকিল করল, নইলে সীমান্তের ওপাশে পাঠিয়ে দিতে পারতে।

আচ্ছা, এই গ্রীন লোকটা দেখতে কেমন? স্বভাব-চরিত্র?

ক্যানাডা তার পক্ষে যতটা সম্ভব নিখুঁতভাবে বর্ণনা দিল গ্রীনের। ইউ,এস, মার্শাল ছিল, কঠিন লোক। বোকা বানাতে পারবে না-এটুকু বলতে পারি।

অবজ্ঞার সুরে হাসল, হালাম। অ, ইউ,এস, মার্শাল? হুঃ! ঘুরে বিরাট সিন্দুকের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল সে, কম্বিনেশন লক ঘুরিয়ে ভারি ভালাটা খুলল। লোহার ক্যাশবাক্স থেকে গুনে এক হাজার ভলার বের করল হালাম, সিন্দুকটা বন্ধ করে কানাড়ার হাতে টাকাগুলো দিল। আত্মতুষ্টির জন্য আরেকবার সেটা গুনল ক্যানাডা, লোভে চকচক করছে চোখ।

আবারও হার্ভের উদ্দেশে তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টি হানল হালাম। আলতোভাবে একবার চোখের পাতা ফেলল হার্ভে, মুখ শক্ত হয়ে গেল।

দুটো ঘোড়া নিয়ে আসছি আমি, তারপর আমরা শহরে যাব, বলে বেরিয়ে গেল

ক্যানাডা তার প্যান্টের পকেটে রাখল টাকাগুলো। এখন ঘোড়ার ব্যাপারে টেরিলকে আমি কী কৈফিয়ত দেব? জিজ্ঞেস করল আবর উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে ওকে। আমার ঘোড়া ক্লান্ত, তাই ভাড়া করেছিলাম ওটা। কিন্তু স্যাভলটা আমার; তা ছাড়া

আহ! অধৈর্য সুরে বাধা দিল হালাম। একটা কিছু বানিয়ে বলে দিও। দোরগোড়ায় গিয়ে দাঁড়াল অ্যাংকর মালিক। তারপর হার্ভে যখন একটা লম্বা পায়ের সোরেলে চেপে আরেকটা বিশাল রোয়ানসহ হাজির হলো, একপাশে সরে দাঁড়াল সে।

দোল খেয়ে স্যাডলে উঠে বসল ক্যানাডা। শহরেই থাকছি আমি, দেখি তোমার জন্য নতুন কোন খবর জোগাড় করতে পারি কিনা, হালামকে বলল।

আচ্ছা, জবাব দিল হালাম। ঘোড়াসওয়ার দুজনকে উঠ ছেড়ে চলে যেতে দেখল সে, অফিসে ফিরে গিয়ে গ্লাসে ব্র্যান্ডি ঢালল। তারপর সিগার ধরিয়ে নিজের ডেস্কের চামড়ার গদি আঁটা চেয়ারে বসে ডুবে গেল গভীর চিন্তায়। অত্যন্ত কঠোর এবং বস্তিরবাদী মানুষ ফ্রেন্ড হালাম। যে কোন ভয়ঙ্কর সত্যকে সহজেই উপলব্ধি করতে পারে, ভাবাবেগের বালাই নেই ওর মাঝে এমকী যে ছেলেটি তার পরিচয় সে। বহন করছে তার ব্যাপারেও সে সম্পূর্ণ উদাসীন। স্বার্থপর বলতে যা বোঝায়, ফ্রেড হালাম এককথায় তাই। ছেলেটা স্বেচ্ছায় বিপদে জড়িয়েছে নিজেকে এতে মোটেও অবাক হয়নি সে; ও আঁচ করেছিল এরকম কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ভাগ্যকে তার আপন পথে চলতে দেবে। তবু যা আশা করেছিল সে ঘটনা তার চেয়ে খারাপের দিকে মোড় নিয়েছে। পরিণতি যা-ই হোক, এমনকী তা ফাঁসিতে গড়ালেও, ছেলেটি যদি একাই তার সমস্যা সামলাত খুশি হত সে। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু অন্যরকম, দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করতে বাধ্য হলো হালাম। তার নিজের ভালমন্দ তাকে বিবেচনা করতে হবে আগে।

লিভারি স্ট্যাবলের মালিক টম টেরিলকে কী বলেছে ক্যানাডা ওর মনে পড়ল; সেজে এক লোকের সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। জেমস গ্রীনের কথা ভাবল সে, কার্ল আর ডিউক রিপকে গ্রেফতার করে টাওসের আদালতে হাজির করার জন্য নিয়োগ করা হয়েছে ওকে। বলা যায় না, সেজে গিয়ে তদন্ত করতে পারে ও, আপনমনে বিড়বিড় করল হালাম।

উঠল সে, অসমাপ্ত সিগারটা ছুঁড়ে ফেলে দিল দরজার বাইরে। তারপর বাইরে যাবার পোশাক পরে ফু দিয়ে অফিসের বাতি নিভিয়ে কোরালে গেল। ঘোড়ায় চড়ে শেষবারের মত নজর বোলাল বাথানের অন্ধকার দালানকোঠার দিকে রওনা হলো!

.

হার্ভে প্রত্যাবর্তনের আগেই ফ্রেড হালাম আবার ফিরে এল তার অফিসে। কয়েক মিনিট পর গলা পাওয়া গেল ফোরম্যানের, ঘোড়া দুটো কোরালে রেখে এসে ক্লান্ত শরীরে অফিস ঘরে ঢুকল সে। ধপ করে চেয়ারে বসে ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, খতম।

কৌতুকের দৃষ্টিতে ফোরম্যানকে জরিপ করল হালাম। অসুস্থ দেখাচ্ছে তোমাকে বলল সে। কী ব্যাপার? আজকাল মনে হয় খুন করে আর মজা পাও না তুমি।

মজা নিকুচি করি। আমি ভাবছি আমার গর্দানের কথা মুখ তুলল হার্ভে, চোখ। সংকুচিত, ঝটপট বলল, ছেলেটাকে খুঁজে বের করা দরকার-আইনের হাতে পড়লেই.. সর্বনাশ।

তুমি যা ভাবছ সেরকম কিছু জানে না ও।

এটা কী বলছ তুমি? ও জানে লিউ এসেছিল এখানে, কী ঘটেছে তার কপালে। খামোকা আমাকে ভুল বোঝাবার চেষ্টা কর না। তুমি, আমি আর ডার্লিং গলা অবধি ডুবে আছি এতে, জানাজানি হলেই এখনও ফাঁসি হয়ে যেতে পারে আমাদের। সুতরাং যেভাবেই হোক খুঁজে বের করতে হবে ছেলেটাকে!

তারপর?

দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেব। আবার কী?

শীতল অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে হালাম তার ফোরম্যানকে জরিপ করল, যেন অনেকদিন ওকে দেখেনি সে। বুড়ো হয়ে যাচ্ছে, সখেদে ভাবল। এতদিনেও ভুলতে পারেনি ব্যাপারটা, এখন ছেলেটাকে নিয়ে সমস্যা দেখা দিতেই ওটাও ডালপালা মেলেছে।

তুমি একটু বেশি চিন্তা কর, বলল অ্যাংকর মালিক। ডার্লিং ভয় পায় না, ভুলেও মনে-টা পর্যন্ত করে না। ওর শুধু চিন্তা মরার আগে কত টাকা কামাতে পারবে। লিউ শহরে এসে হাজির হওয়ার আগে পর্যন্ত কোনওদিন আলাপও করেনি।

ছেলেটার কথা ভুলে যেও না। যেরকম মাতাল হয়েছিল, বন্ধুদের কী বলেছে। তার নেই ঠিক।

সবাই মারা গেছে, রিপ ছাড়া-এবং সেও হাজতে।

হার্ভে ঢোক গিলল। কদ্দিন্তের জন্য?

যদ্দিন ওকে ওরা টাওসের স্টেজে তুলে না দিচ্ছে, বলল হালাম। তারপর রসকষহীন গলায় যোগ করল, কার্লের ব্যাপারে একমাত্র ওর কথার ওপরই নির্ভর করতে হবে ওদের। আর গ্রীনকে ও যা বলেছে সেগুলোই যদি আবার না বলে কোর্টে গিয়ে মামলা টিকবে না।

একটা হাঁদাও বোঝে এটা, তিক্ত সুরে বলল হার্ভে। এরপরেও ছেলেটা থাকছে, সবকিছুই ও জানে। জেমস গ্রীনের কথা ভাব। ক্যানাড়া কী বলেছে মনে নেই-ওকে বোকা বানানো যাবে না।

গ্রীনকে নিয়ে চিন্তা কর না। ওর ব্যবস্থা আমি করছি।

কী ব্যবস্থা?

আপাতত তুমি ভুলে থাক ওটা।

মুখ বিকৃত করল হার্ভে। উঠে দাঁড়াল, হতাশ ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকিয়ে দুপ দুপ করে পা ফেলে এগোল দরজার দিকে।

তুমি ভুলে গেছ কিছু একটা, পেছন থেকে বলল হালাম।

আবার ভেংচি কাটল হার্ভে। ঘুরে দাঁড়িয়ে ওর রঙজ্বলা জিন্সের পকেট থেকে টাকার তোড়া বের করল একটা, ছুঁড়ে দিল ডেস্কের ওপর। হালামের উদ্দেশে একরার তাকাল সে, পরস্পর মিলিত হলো ওদের চোখ, তারপর হার্ভে ভাবলেশহীন চেহারায় কাঁধ ঝাঁকিয়ে দরজা বন্ধ না করেই বেরিয়ে গেল ঘর ছেড়ে।

খোলা দরজার দিকে তাকিয়ে স্থাণুর মত চুপ করে বসে রইল হালাম, ভাবছে এর একটা বিশেষ অর্থ রয়েছে। বিদ্রোহের পূর্বাভাস। হার্ভে কি তলে তলে নিজস্ব কোন মতলব আঁটছে? এতগুলো বছর একসাথে কাটাবার পর কেমন যেন অসম্ভব মনে হয় ব্যাপারটা, বিশেষত্ব চিরকাল যেখানে সাহায্যের জন্য ওর ওপর নির্ভর করে এসেছে। হার্ভে। অসম্ভব। হার্ভে তার বিরুদ্ধাচরণ করবে এটা অবা বোধহয় অন্যায় হচ্ছে, মনে মনে বলল হালাম। তবু, ওর সন্দেহ ঘুচল না। মানুষ চিনতে কখনও ভুল হয় না তার বিশেষ করে ওইসব লোক যারা শত্রুতে পরিণত হতে পারে।

০৪.

পোশাক পালটে হোটেল কামরা থেকে বেরোবে গ্রীন এমন সময় টোকা পড়ল দরজায়। ঘর আধো-অন্ধকার, বাইরে সবে আলো ফুটতে শুরু করেছে। কপাট খুলল গ্রীন, দেখল মার্শাল মক দাঁড়িয়ে, মুখ থমথমে।

বেরোবার জন্য তৈরি? বলল মার্শাল। ভাল। নাস্তা চুলোয়, রান্নাঘরে বসেই খেয়ে নেব আমরা। তারপর একটা জিনিস দেখাব তোমাকে।

টেবিলের ওপর থেকে গ্রীন ওর টুপি তুলে নিল। দাড়ি কামিয়ে গোসল করেছে ও, ফলে ঝরঝরে বোধ করছে। কী জিনিস? করিডরে বেরিয়ে জিজ্ঞেস করল ও।

দেখতেই পাবে, সংক্ষেপে জবাব দিল মক। নীচে নামল ওরা, লবি হয়ে গ্রীনকে রান্নাঘরে নিয়ে গেল মার্শাল। কেরোসিনের চুলের সামনে দাঁড়িয়ে হৃষ্টপুষ্ট গড়নের এক মেক্সিকান মহিলা তাওয়ায় ডিম ভাঁজছিল।ঝট করেগ্রীনের আপাদমস্তক মাপল সে, কালো চোখের তারায় ফুটে উঠল ঘৃণা আর আক্রোশ। ব্যাপার কী? ভাবল গ্রীন, তারপর ধারণা করল নিশ্চয় তরুণ গার্সিয়ার মৃত্যুর খবর জেনেছে মহিলা; এবং সে ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত বলে তাকেই দায়ী করছে এর জন্য।

পেছন দিকের একটা জানালার পাশে পাইন কাঠের একটা টেবিল দখল করল ওরা। গ্রীন বিড়বিড় করে বলল, কার্লোসের মৃত্যুর খবর তা হলে জেনে গেছে সবাই।

ওর বোন পাদ্রির কাছে লাশ দাবি করে ওর, তারপর আমি ওর সাথে কথা বলেছি, জানাল মক। প্লেটে করে মহিলা ওদের জন্য বেকন আর ডিমভাজা নিয়ে আসতে আর কথা বাড়াল না সে। তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ধাক্কা মেরে গ্রীনের প্লেটটা ঠেলে এগিয়ে দিল মহিলা, বিরক্তিসূচক একটা শব্দ করে বিদায় নিল। হাত বাড়িয়ে কাঁটাচামচ তুলে নিল গ্রীন।

মেক্সটাউনে বোধহয় এখন আর কেউ পছন্দ করবে না আমাকে, বলল ও। কিন্তু এরা কি জানে না ক্যানাডা খুন করেছে ছেলেটাকে?

তুমি বা ক্যানাডা, কথা সেই একই। মেয়েটাকে আমি বলেছি তার ভাই একটা স্টেজ ডাকাতির সঙ্গে জড়িত ছিল, তবে যেহেতু সে মারা গেছে আমাদের আর কোন বিরোধ নেই ওদের সাথে। মেয়েটা বুঝেছে আমার কথা।

হুঁ।

নীরবে নাস্তা সেরে বেরোবার উদৃযোগ করছে ওরা এই সময় মাঝবয়সী এক লোক ঢুকল রান্নাঘরে। বুকের নীচে দশাসই একটা উঁড়ি। পরনে গাঢ় রঙে ঢলঢলে প্যান্ট আর সস্তা কোট, মাথায় চ্যাপ্টা শক্ত শোলার টুপি মর্নিং, মার্শাল, বলল লোকটা। শুনলাম ঝামেলায় আছ তুমি। গার্সিয়াদের ছেলেটা মারা গেছে গুলিতে, ডিউক রিপ জেলে রয়েছে। ব্যাপার কী? আমি এ পর্যন্ত উড়ো-উড়ো কিছু খবর শুনেছি।

আপাতত ওতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে তোমাকে, বলল মক। গ্রীনের দিকে তাকাল সে। ইনি ড্রাম ডার্লিং। আর, ড্রাম, এ হচ্ছে জেমস গ্রীন।

দ্রুত হাত বাড়াল ডার্লিং, জোরে চাপ দিল করমর্দনের সময়ে তীক্ষ্ণ, চতুর দৃষ্টিতে মাপল গ্রীনকে। আরেকজন আইনের লোক? স্মিত হেসে জিজ্ঞেস করল সে। ব্যাপার–

গলা খাঁকারি দিল মক। দুঃখিত, ড্রাম, ক্ষমা করতে হবে। আমাদের কাজ আছে বাইরে।

দূরে কোথাও?

বলতে পার, জবাব দিয়ে পা বাড়াল মক। ঈষৎ মাথা হেলিয়ে ডার্লিয়ের কাছ থেকে বিদায় নিল গ্রীন, মার্শালকে অনুসরণ করল। শহরবাসীরা জেগে ওঠেনি এখনও, জনশূন্য রাস্তা ধরে টম টেরিলের আস্তাবলের দিকে এগোল ওরা। আগের দিন গ্রীন আর ক্যানভা ওখানেই রেখে এসেছে ওদের ঘোড়া।

কোণের জেনারেল স্টোরটা চোখে পড়ল গ্রীনের। বিরাট সাইনবোর্ড লেখা ডার্লিং-স্ মার্কেন্টাইল। একই ডার্লিং?

একই। হোটেল আর একটা স্যালুনের মালিক। এখানকার ফ্রেটিং ব্যবসাটাও ওর, বেলুরাইডে অফিস। এসময় ফ্রেড, হালামের পর্টিনার ছিল। একপাল গাছুরসহ এখানে আসে ওরা, তখনও শহর গড়ে ওঠেনি। বাড়ি বলতে কেবলমাত্র টেরিলের আস্তাবলটাই ছিল, স্টেজ ডিপো হিসেবে ব্যবহৃত হত ওটা। তবে ডার্লিং বেশিদিন থাকেনি গরু ব্যবসায় প্রথমে স্যালুন আর দোকানটা খোলে। তারপর যত লোক এসেছে ওরও উন্নতি হয়েছে। সে আমলের কথা টম টেরিল ভাল বলতে পারবে তোমাকে। ও এখানকার সবচেয়ে পুরানো বাসিন্দা স্টেজ ডিগোটা চালাত।

অনেকটা জায়গা জুড়ে লিভারি বার্ন। চুনসুরকির দেয়ালে ঘেরী। কাঠের ফটক পেরিয়ে বিরাট ওয়াগন ইয়ার্ডে প্রবেশ করল ওরা। আস্তাবল আর একার ওয়াগনের পাশ দিয়ে এগোবার সময় ঘোড়ার মলমূত্র, আর জিনের, চামড়ার কটু গন্ধের ঝাঁপটা লাগল নাকে। ওভরজল গায়ে লম্বা-পাতলা স্বাস্থ্যের এক বুড়ো আস্তাবল থেকে বেরিয়ে উঁকি দিল, তোমাদের ঘোড়া লাগবে? লোকটা টম টেরিল।

লাগবে, জানাল মক।

হাতছানি দিয়ে দুজনকে ডাকল টেরিল। ব্যবস্থা করছি, বলে ফের ভেতরে ঢুকে গেল সে।

একটা চুনসুরকির চালাঘরে দ্বীনকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল মক। দরজা খুলে সরে দাঁড়াল একপাশে। দেখে এস একবার, গম্ভীর সুরে বলল ও। গ্রীন পা রাখল ভেতরে।

ওটা একটা ছুতোরশালা। ওঅর্কবেঞ্চ আর যন্ত্রপাতি রয়েছে একদিকে। আরেক দেয়ালের পাশে শোভা পাচ্ছে নড়বড়ে একটা টেবিল, তার ওপর একটা লাশ শোয়ানো; উধ্বংশ রঙ আর কালিঝুলি মাখা একফালি ক্যানভাস দিয়ে ঢাকা। ক্যানভাসটা তুলে গ্রীন যখন লাইল ক্যানাডাকে আবিষ্কার করল, তখন কেন যেন মোটেও অবাক হলো না ও।

আমার শহরে খুন হতেই বোধহয় অ্যদ্র ছুটে এসেছিল টাওস থেকে, ঝাঁঝের সুরে বলল মার্শাল। আমার এসব ভাল লাগছে না, গ্রীন। আগে বলিনি, কিন্তু কাল তোমরা যখন গার্সিয়ার লাশ নিয়ে এলে তখনই ব্যাপারটা পছন্দ হয়নি আমার। তবে এরকম কিছু ঘটতে পারে আশা করিনি।

ঝট করে ওর পানে তাকাল গ্রীন। পুলিসের লোক হিসেবে এটা তোমার সমস্যা, বলল। গুলি?

ছুরি। আজ খুব ভোরে বাইরের দেয়ালের পাশে ওকে আবিষ্কার করেছে টম। কিন্তু কাল সন্ধ্যায় যে ঘোড়াটা ভাড়া করেছিল ও, সেটা দেখতে পায়নি।

কী করেছিল?

এখানে এসে টমকে বলে ওর সোরেলটা ক্লান্ত তাই একটা ঘোড়া দরকার। বলেছিল সেজে এক লোকের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে। অথচ, নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছ তুমি, মাঝরাত থেকে মরে পড়ে আছে, ঘোড়াটা উধাও হয়েছে।

চালাঘরের ভেতরটা গুমোট, পচা আলকাতরার গন্ধ আসছে। হাড্ডিসার দাড়িভর্তি মুখখানার দিকে চোখ নামাল গ্রীন। বলল, সম্ভবত এই ডাকাতির ব্যাপারে আলাপ করতেই কালরাতে গিয়েছিল কারও কাছে। লোকটা যে-ই হোক, ওর ঘড়ি। বন্ধ করে দিয়েছে। মুখটা ঢেকে দিয়ে ক্ষুব্ধ মার্শালের উদ্দেশে ঘুরল ও। সেজের কথা বলছিলে তুমি, কোথায় জায়গাটা?

এখান থেকে প্রায় আঠারো মাইল দক্ষিণে, মরুভূমিতে। মাইনিং ক্যাম্প ছিল, একসময়। আট-নয় বছর আগে সোনা পাওয়া যায়। যা হয় এসব ক্ষেত্রে, রাতারাতি একটা শহর গজিয়ে ওঠে ওখানে। এক বছর বাদেই সব শেষ। এখন একটা স্যালুন, মুদিখানা আর একটা আস্তাবল আছে। ভাঙাচোরা ঝুপড়ি আছে কয়েকটা। সবগুলোরই মালিক ভার্জিল রীড নামে এক লোক। এদিকে এখন আর স্টেজ যায় না। গুজব, অর্থের বিনিময়ে ইচ্ছে করলে যে কেউ গা ঢাকা দিয়ে থাকতে পারে ওখানে। নিশ্চয় বুঝতে পারছ কেমন হবে জায়গাটা, পশ্চিমে এরকম প্রচুর আছে। ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মক, ঘুরে দাঁড়াল। ক্যানাডার কী দরকার ওখানে আমার মগজে ঢুকছে না।

সম্ভবত আদপেই ওখানে যায়নি। পাছে ওর অনুপস্থিতি ধরা পড়ে যায় আমাদের কাছে, তাই ধুলে দেয়ার জন্য মিথ্যে কথা বলেছিল টেরিলকে।

জানি না, তবে তোমার আন্দাজই মনে হয় ঠিক, রুক্ষ সুরে বলল মার্শাল। গ্রীনের দিকে তাকাল সে। আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, চারজন ছেলে মাতাল হয়ে একটা অন্যায় করেছিল। দুজন তাদের জীবন দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করেছে। এবং আরও দুজন লোক অকারণে মারা গেছে এতে। আমি হলে অন্য ছেলেটাকে ছেড়ে দিয়ে এখানেই ইতি করতাম মামলার।

সেটা সম্ভব না, শান্তু কণ্ঠে জবাব দিল গ্রীন।

জানি, ক্লান্ত সুরে বলল মক। তোমার কথাই ঠিক ধরে নিলাম, কাল রাতে কারও সাথে দেখা করেছিল ব্যানাডা, এবং বেশি কথা বলতে গিয়ে খুন হয়েছে। কে হতে পারে লোকটা আমরা বোধহয় জানি, তাই না?

তার মানে তুমি বলছ ও অ্যাংকরে গিয়েছিল খবর বেচতে।

কিন্তু ওরা ওকে খুন করবে কেন?

কাষ্ঠ হাসি হাসল গ্রীন। ক্যানাডাকে চেন তুমি, বেঈমানি করবে না তোমার সাথে এ বিশ্বাস রাখতে পারতে ওর ওপর?

না।

পেয়ে গেলে তোমার উত্তর,বলল গ্রীন। চল, দেরি হয়ে গেল অনেক।

.

সকালের কড়া রোদে শহর ছাড়িয়ে পাহাড়ের রাস্তা ধরল ওরা; গ্রীন অনুভব করছে সূর্যের তাপ শার্ট ভেদ করে ওর পিঠ পুড়িয়ে দিচ্ছে, ঘাম গড়াচ্ছে বগল থেকে। জোরকদমে সমতল প্রান্তর পেরিয়ে এল ওরা, তারপর ঘাসঝোঁপ, পাইন আর জুনিপার বনের ভেতর দিয়ে রাস্তা ওপরে উঠে যেতে ঘোড়া হাঁটিয়ে এগোল।

দুরারোহ একটা খাড়াইয়ের মাথায় উঠে ঘোড়া দুটোকে বিশ্রাম দেয়ার জন্য একটুক্ষণ থামল ওরা। পেছনে উত্তপ্ত ধু-ধু মরুভূমির দিকে তাকাতে গ্রীনের চোখ ঝলসে গেল। দূরে ডাকিনীর মত, উদ্বাহু নৃত্য করছে কমলা-হলুদ তাপতরঙ্গ। গ্রীনের মনে হলো ভিন্ন এক জগতে এসে পড়েছে সে।

আঙুল তুলে বিপরীত দিকে ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করল মক, উত্তর থেকে দক্ষিণে সরে গেল ওর হাত। ওদিকে যতদূর দেখতে পাচ্ছ, পুরোটাই অ্যাংকর রেঞ্জ। এখানে কোন গরুবাছুর দেখতে পাবে না। ওরা এখন পাহাড়ি তৃণভূমিতে রয়েছে, জঙ্গলের কাছাকাছি। অ্যাংকরের লোকজনও ওখানেই থাকবে। কার্ল ওদের সাথে থাকলে কী করব বুঝতে পারছি না আমি। প্রায় তিন দিনের পথ। এত লম্বা সময় বাইরে থাকা সম্ভব না আমার পক্ষে।

বাথানে কেউ না থাকতে পারে এখন। গেলেই বোঝা যাবে। আর কদ্দূর?

মাইলখানেক। এরপর যে পাহাড়টা পড়বে, তার ওপাশে।

অ্যাংকরের বাড়িঘর সবে দৃষ্টিসীমায় এসেছে এই সময় ওরা দেখতে পেল গোলাঘর থেকে ক্ষুদ্রকায় একটা মানুষ বেরিয়ে এসে হনহন করে র‍্যাঞ্চ হাউসে ঢুকে গেল। ওটা হার্ভে স্টেজ, হালামের লাঠি: হালাম আর ডার্লিং যখন প্রথম আসে। এখানে স্টেজও ছিল ওদের সাথে। আশ্চর্য, কাউহ্যান্ডদের সঙ্গে আজ ও কাজে যায়নি। কেন? গ্রীনের দিকে অস্বস্তিভরে তাকাল মার্শাল। জঙ্গলে সশস্ত্র ডাকাত খুঁজতে হলেও এর চেয়ে বেশি খুশি হতাম আমি।

কাজটা সারতেই হবে

ওরা যখন বাথানে পৌঁছে হিচ রেইলের সামনে নামল, দরজা খুলে ভেতর থেকে বেরিয়ে এল ফ্রেড হালাম, পেছনে তার ফোরম্যান। ধাপের মাথায় থামল হালাম, চকিতে গ্রীনকে একনজর দেখে নিয়ে মকের উদ্দেশে বলল, আমাকে তুমি অবাক, করলে মার্শাল। তোমার এলাক: ছেড়ে চলে এসেছ দেখছি?

তাই, বলল মক। টুপি খুলে জামার আস্তিনে কপালের ঘাম মুছে আবার টুটি বসিয়ে দিল যথাস্থানে। কেমন আছ, ফ্রেড, হার্ভে? গ্রীনের পরিচয় দিতে ঘুরল সে। একটা দরকারে এসেছি আমরা; অপ্রীতিকর, কিন্তু গ্রীন যা বলেছে, কমজটা সারতেই হবে।

তোমার কথা কিছু বুঝতে পারছি না আমি, রূঢ় গলায় বলল হালাম, গ্রীনের দিকে তাকাল এবার। স্বল্প দূরত্বে কঠিন একজোড়া চোখের মুখোমুখি হলো গ্রীন, জীবনে এরকম নিষ্ঠুর, নির্দয় চেহারা কখনও দেখেনি সে। ইস্পাতের মত কঠিন আর, হিমশীতল দুটো চোখ, দৃঢ়বদ্ধ ভাবলেশহীন মুখ। এককথায় দুর্বোধ্য চেহারা, ঝানু জুয়াড়ি কিংবা ভয়ঙ্কর স্বার্থপর মানুষের যেমন থাকে। কৃপণ মানুষ, যে সারাক্ষণ যকের, মত আগলে রাখে তার ধন, পাছে একটু বেখেয়াল হলেই কেউ কেড়ে নিয়ে যায়। কিছুই না, আবারও কথাটা বল হালাম। যাই হোক গ্রীন যখন বলছে সারতে হবে, তখন সেরেই ফেল।

মানে- বলল মক, তারপর সরাসরি মূল প্রসঙ্গে চলে এল। অচঞ্চল দৃষ্টিতে হালামের দিকে তাকিয়ে রইল গ্রীন, প্রতিক্রিয়া দেখার আশায় নজর রাখছে। হার্ভে স্টেজ তার মনিবের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, ওর রুক্ষ দৃষ্টি গ্রীনের ওপর স্থির। ভাবান্তর, বলতে এটুকুই, মার্শালের কথা শুনতে শুনতে ক্রমশ শক্ত হয়ে উঠল, হালামের মুখ, এবং সে শেষ করার আগেই, তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিল অ্যাংকর মালিক।

কী সব আবোলতাবোল বলছ তুমি! কার্ল ওই ভিখারিগুলোর সঙ্গে মদ খেয়েছে। মানলাম খেয়েছে। ওদেরকে নিয়েই শহর ছাড়ে ও, কিন্তু সেটা ভেড়ার পালে একটু খোঁচা দেয়ার জন্য। ওই ডাকাতি যখন হয় ও তখন এখানে-বাসায়। এখন ওই, ডিউক, রিপ হতভাগাটা উল্টোপাল্টা কিছু বললেই তো আর সত্যি হয়ে যাচ্ছে না সেটা।

গম্ভীর গলায় মক বলল, কার্লকেই আমরা সেটা জিজ্ঞেস করব। ও কোথায়?

আমি আমার উকিলের সাথে কথা না বলা পর্যন্ত ওর দেখা পাবে না তোমরা, এটুকু বলতে পারি! আরেকটা কথা, এখানে আসার কোন অধিকার নেই তোমার। গ্রীনের উদ্দেশে তীব্র দৃষ্টি হানল হালাম, ওরও না।

শেরিফ কার্টারের সই করা ওয়ারেন্ট আছে গ্রীনের কাছে। এখানে আসার পথে পরশু বেলুরাইড কোর্টহাউসে থেমে নয়ে এসেছে। কাজেই তোমার বাসায় এসে বেআইনি কিছুই করিনি আমরা।

তাচ্ছিল্যের সঙ্গে সিঁড়ির পাশে থুতু ফেলল হালাম। হাহ, ওয়ারেন্ট, বলল। ওসব কাগজকে এক কানাকড়িও দাম দিই না আমি। এখন তোমরা ভাগ, আমার অনেক কাজ পড়ে আছে।

অ্যাংকর মালিক ঘুরে বাসায় ঢুকতে যাবে এমন সময় শান্ত গলায় গ্রীন জিজ্ঞেস করল, কাল রাতে ক্যানাডা কী বলতে এসেছিল এখানে?

ধীরে-সুস্থে পেছন ফিরল হালাম, চেহারা নির্লিপ্ত, কিন্তু হার্ভে স্টেজের চোখের পাতা বিস্ময়ে নড়ে গেল সামান্য। হালাম বলল, ওই নামে একজন লোককেই চিনি আমি, অনেক কাল আগে কাজ করত আমার এখানে। খুব বেশি কথা বলত, আমার সহ্য হয়নি, পাওনা গুণ্ডা মিটিয়ে বিদায় করে দিয়েছি।

গ্রীনের উদ্দেশে আরেকবার চ্যালেঞ্জের দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বাসার ভেতর ঢুকে গেল সে। হার্ভে স্টেজ অনুসরণ করল অসহায় ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল মক, তারপর দুজনেই স্যাড়লে চেপে মন্থর গতিতে বেরিয়ে গেল উঠন থেকে। মক বলল, অযথা সময় নষ্ট। তবে তোমার অবস্থানটা অন্তত জানতে পেলে তুমি।

ইচ্ছা করলে কেয়ামত অবধি ছেলেটাকে লুকিয়ে রাখতে পারে ও, আপনমনে বলল-গ্রীন। অথচ কাজটা আমি তাড়াতাড়ি সারতে চাই। পরের চালটা মনে হয় আমাকেই দিতে হবে

মানে?

শোরগোল তোলা, সংক্ষেপে জবাব দিল গ্রীন।

কীভাবে?

প্রথমত, রটিয়ে দেব কার্ল হালামকে আইন খুঁজছে। এ ব্যাপারে তুমি সাহায্য করতে পারবে আমাকে, শহরে। আমি সেজে যাচ্ছি, তোমার সেই প্রাক্তন মাইনিং ক্যাম্পট ঘুরে-ফিরে দেখব একটু। ঘোট পাকাবার জন্য এটাও একটা ভাল জায়গা।

শঙ্কার ছায়া ফুটল মকের চেহারায়, মাথা নাড়াল এপাশ-ওপাশ। সাবধান, চোখ কান খোলা রাখবে ওখানে গিয়ে! তোমাকে দেখলেই মনে হয় পুলিসের লোক, ওখানে এমন অনেক লোক আছে যারা পুলিস দেখামাত্র গুলি করতে দ্বিধা করবে না গ্রীনের দিকে তাকাল ও, বিরস সুরে যোগ করল, অবসর নেয়ার জন্য অন্তত আরও কিছুদিন বাঁচতে চাও তুমি কি চাও না? টাওসের ওই কাগজের কথা সত্যি হলে, এটাই তোমার শেষ অ্যাসাইনমেন্ট।

আমি বলেছি এই কাজটা সেরে অবসর নেয়ার ইচ্ছে আছে।

জাহান্নামে যাও, তিক্তকণ্ঠে বলল মক। তোমার চেয়ে বেশিদিন হলো ব্যাজ ঝোলাচ্ছি আমি, পশ্চিমে বহু জায়গায় মার্শালের দায়িত্ব পালন করেছি। ছবছর আগে একবার সিদ্ধান্ত নিলাম অনেক হয়েছে, আর না। বেলুরাইডে লিভারি স্ট্যাবল খুললাম একটা। মাস দুই যেতে না যেতেই বুঝলাম ব্যবসা হরে না আমার দ্বারা। তাই অকটিওতে এই কাজের প্রস্তাবটা যখন এল, লুফে নিলাম। ঠাণ্ডা মরুশহর, দাঙ্গা ফ্যাসাদ নেই বললেই হয়, কিন্তু তারাটা ঝোলাতে পেরে আমি খুশি। বিয়ে-থা করিনি, তুমি?

না।

স্বাভাবিক। আমাদের মত লোকেরা বাঁধা পড়ে না কোথাও। আমরা হয় গুলি খেয়ে মরি, নয়তো এত বুড়ো হয়ে যাই যে কিছু করার শক্তি থাকে না তখন, দম নিয়ে খেই ধরল, মক, এই কাজ শেষ হবার পর অবসর নিচ্ছ না তুমি। এখন যা-ই ভাব না কেন; অবসর তুমি নিচ্ছ না। পাগল হয়ে যাবে তা হলে।

অবসর নেব, সংক্ষেপে জবাব দিল গ্রীন, বিরক্ত বোধ করছে কারণ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে, কীভাবে ওই দিনগুলো কাটাবে সে ব্যাপারে ওর নিজের মনেই যথেষ্ট সংশয় আছে। অবসর নেব আমি, জেদের সুরে পুনরাবৃত্তি করল ও। এবার বল, সেজে যাবার পথ কোনটা?

০৫.

দিগন্তে সাবেক মাইনিং ক্যাম্পের বিরাট দালানটার আশপাশে ছোট ছোট ঝুপড়িগুলো যখন প্রথম দেখতে পেল গ্রীন, চোখ ধাঁধানো রোদে ওর মনে হলো মরুভূমির হলুদ তাপ-সমুদ্রে প্রাচীন সেজ শহরটা বুঝি ঝকমক করছে। ভাঙাচোরা মলিন ঝুপড়িগুলোর দিকে এগিয়ে গেল ও, লক্ষ করল মূল দালানের সামনে হিট রেইলে কোন ঘোড়া বাঁধা নেই। আশপাশে কোথাও বিন্দুমাত্র প্রাণচাঞ্চল্যের আভাস পেল না সে।

কোণের গোলাঘরটার পেছনের দেয়াল ভাঙা, রোদ বৃষ্টিতে দুপাশের কাঠের দেয়ালে পচন ধরেছে। আস্তাবলের অবস্থাও শোচনীয়। একধারে পানির গামলা রাখা একটা, শুকিয়ে খটখট করছে হাড়ের মত। গ্রীন যখন ভেতরে ঢুকে মাটিতে নামল বোটকা গন্ধে বমির ভাব হলো ওর।

ঝাপসা চোখের কৃশকায় এক লোক পেছন থেকে এগিয়ে আসতে গ্রীন তার ঘোড়ার লাগামটা ধরিয়ে দিল ওর হাতে, পানি আর কিছু শস্যদানা দিতে বলল ওকে। তারপর জিজ্ঞেস করল, ভার্জিল রীডকে কোথায় পাব?

স্যালুনে, জানাল অসল্যার, অনাবশ্যক ব্যগ্রতা প্রকাশ পেল কণ্ঠে।

গ্রীন ঘুরে ওপাশের কাঠের দোতলা বাড়িটার দিকে তাকাল। আড়ষ্ট হয়েছিল পা দুটো, বার কয়েক ঝাড়া দিয়ে স্বাভাবিক করল রক্ত চলাচল জিরিয়ে নিচ্ছে কারণ ও জানে না ওখানে কেমন অভ্যর্থনা অপেক্ষা করছে ওর জন্য। অবশেষে একসময় রাস্তা পেলোতে শুরু করল গ্রীন, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওপর-নীচ জরিপ করছে বাড়িটার। দোতলার একটা জানালার ধারে একজনকে দাড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হলো সে, ভেবে পেল না কোন্ দুঃখে কিছু কিছু মানুষ এরকম শ্রীহীন জায়গায় তাদের জীবন কাটাতে আসে। ভাবলেশহীন মুখে লোকটা ঝুঁকে ওর দিকে তাকাতে গ্রীন লক্ষ্য করল ওর চোয়ালের হাড় দুটো একটু বেশিমাত্রায় চওড়া, চামড়া ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। এক কানের লতি চুলকাল লোকটা, বিদ্বেষের হাসি হাসল, সরে গেল আড়ালে।

সন্দেহজনক ব্যাপার। ভুরু কুঁচকে, স্যালুনে ঢুকল গ্রীন। দোরগোড়ায় থেমে চারপাশে নজর বোলাল। একপাশে বিধ্বস্তপ্রায় পুরানো একটা বার। ঘুরে ওটার পেছনে চলে গেল এক লোক, হাঁটার সময় ঈষৎ খোড়াচ্ছে। প্রতি পদে মেঝেতে শব্দ তুলছে ওর ছড়িটা। শেষপ্রান্তের দেয়ালে কয়েকটা তাক। কিছু টিনজাত খাবার, আলু, পেঁয়াজ, শালগম আর মটরশুটি রাখা। বারটেন্ডার ইতিমধ্যে তার দেহের ত্র রেখেছে একটা উঁচু টুলে; নধর দেহ, পরনে নোংরা কাপড়চোপড়, মাথাভর্তি পাকা বাবরি চুলের জট। মুখের চামড়া ঝুলে পড়েছে, স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে লাল লাল শিরাগুলো। ভারি লাঠি-সদৃশ ছড়িটা বারের ওপর রাখল সে, পোড় খাওয়া দৃষ্টিতে জরিপ করল গ্রীনকে।

হুইস্কি?

মার্থা ঝাঁকাল গ্রীন, লক্ষ করল কাউন্টারের নীচ থেকে বোতল আর গ্লাস বের করছে অপরজন। হাত বাড়িয়ে ওগুলো কাছে টেনে নিল সে, গ্লাসে ঢেলে পান করল নির্জলা হুইস্কি, কটু ঝাঁঝে জিভ পুড়ে যেতে মুখ বিকৃত করল। তুমি ভার্জিল, রীড? জিজ্ঞেস করল গ্রীন।

ওই নামটাই ব্যবহার করছি আমি।

কাল রাতে লাইল ক্যানাডা এসেছিল?

ঝুলকালি মাখা জানালাটার দিকে রীড তার তিক্ত দৃষ্টি ফেরাল কবরের মত নীরব ছিল ক্যাম্পটা। তারপর তুমি এলে, একজন অচেনা লোক, আমার কাছে মনে হলো আবার যেন সেইসব দিনের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। অহরহ লোক আসছে যাচ্ছে, চোখের নিমেষে ভেঙে ফেলছে দালানকোঠা। জনাকীর্ণ রাস্তায় বন্ধুদের গাল দিচ্ছে মানুষ। যখন তখন গুলি হচ্ছে, কিন্তু কেউ আমল দিচ্ছে না তাতে। চিৎকার, হৈ-হুল্লোড়, তারপর মাতাল মানুষগুলো ঢলে পড়ছে বেশ্যার কোলে।

বারের ওপর সজোরে ছড়িটা কয়েকবার আছড়াল রীড। তখনকার দিনে কেউ কাউকে চিনত না, কিন্তু সেজন্য প্রশ্ন করত না কোন। সবকিছুই ছিল জ্যান্ত, আমিও। তারপর একটি শ্যাফটে পড়ে গিয়ে পা ভেঙে ফেললাম আমি, খোড়া হয়ে গেলাম জীবনের মত।

ছড়িটা তুলল ও, আবার আছড়াল বারে। দেহের ভর বদল করল গ্রীন, অস্বস্তি বোধ করছে। উদ্ভট আচরণ লোকটার, লুকোচুরি খেলছে। বাধ্য হয়ে এবার সরাসরি বলল ও, আমি কার্ল হালামকে খুঁজছি। ওকে দেখেছ?

হালামের কাজ কর তুমি?

না। তবে আইন ছেলেটাকে খুঁজছে। ধরিয়ে দিতে পারলে ইনাম আছে। তুমি বরং ছড়িয়ে দাও খবরটা কারও কিছু জানা থাকলে, তাকে বলবে অকটিওতে মার্শাল মকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে।

মুখ দিয়ে অবজ্ঞার ঢঙে বিজাতীয় একটা শব্দ করল রীড, তারপর বিরাট ঘরটার পেছনের অংশে অবস্থিত সিঁড়ির দিকে চোখ পড়তে ফিক করে হেসে ফেলল আচমকা, দুই সারি কালো কালো ভাঙা দাঁত বেরিয়ে পড়ল। কয়েক জোড়া বুটের শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল সিঁড়িতে; একটু বাদে একজন তোক আবির্ভূত হলো, ঠিক পেছনেই আরেকজন।

গ্রীন লক্ষ্য করল প্রথমজন সেই থ্যাবড়া চোয়ালের লোকটা, কিছুক্ষণ আগে। দোতলার একটা জানালা থেকে একগাল হাসি উপহার দিয়েছিল ওকে। দ্বিতীয়জনের মুখটা লালচে, তাগড়া শরীর, চলাফেরায় হামবড়াই ভাব রয়েছে। দুজনেই নিরস্ত্র, খেয়াল করল সে।

ওদের উদ্দেশে ঘুরল রড, চেহারায় উত্তেজনার ছাপ। তোমরা মদ খাচ্ছিলে? জিজ্ঞেস করল।

হাচের কথা জানি না, তবে আমি দুঢোক খেয়েছি, জবাব দিল থ্যাবড়া-চোয়াল, হাসি দুকান ছুঁয়েছে। আমার এই বন্ধুকে দাও এক পেগ, গ্রীনের দিকে থুতনি ঝাঁকিয়ে যোগ করল।

সন্দিগ্ধ হয়ে উঠল গ্রীনের মন, বলল, থাক, লাগবে না, ধন্যবাদ। আরও ঘনীভূত হলো ওর সন্দেহ যখন লাল-মুখ হাচ বলল যাত্রার ঢঙে, আমাদের চেহারা ওর পছন্দ হচ্ছে, ফ্লিন্ট। জাহান্নামে যাক শালা।

আমারও পছন্দ হয়নি ওকে, সে কথাই যদি বল, আচমকা বিদ্বেষে হিসহিস করে উঠল ফ্লিটের গলা। দেখলেই মনে হয় কোন বেয়াড়া শেরিফ।

গ্রীন অনুভূব করল সে ফাঁদে পড়েছে, এবং ব্যাপারটা পুরোপুরি সাজানো। ফ্লিন্টের চোখে কুমতলবের আভাস পেল ও, নিরুপায় ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ঠিক আছে, খাচ্ছি।

না, খাবে না–আপত্তি জানাল ফ্লিন্ট। কিন্তু গ্রীন ততক্ষণে ভরে ফেলেছে ওর গ্লাস। ওটা উঁচু করল সে, আবার কাঁধ ঝাঁকাল, তারপর ভেতরের তরল পদার্থটুকু ছুঁড়ে দিল ফ্রিন্টের চোখে-মুখে।

চমকে উঠল ফ্লিন্ট, পিছিয়ে গেল। হাচ খিস্তি করল, ক্ষিপ্তভাবে লাফ দিল গ্রীনের দিকে। চকিতে একপাশে সরে গেল শ্ৰীন, মদের বোতল দিয়ে বাড়ি মারল হাচের মাথায়। বেমক্কা আঘাতে টলে উঠল দুবৃত্ত, ভাঁজ হয়ে গেল হাঁটু।

ব্যান্ডানা দিয়ে চোখ মুছে পিটপিট করে গ্রীনের দিকে তাকাল দীর্ঘদেহী, ফ্লিন্ট, রাগে হাত আর কাঁধের পেশীগুলো ফুলে উঠেছে। বারে পিঠ ঠেকিয়ে ওদের পরবর্তী হামলার অপেক্ষায় রইল গ্রীন। টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল হাচ, এক হাতে চেপে ধরে আছে মাথা। খুকখুক করে কাশল ও, থুতু ফেলল, কুদ্ধ ভঙ্গিতে বুকে চাপড় মেরে বলল, ধোলাই খাওয়ার শখ হয়েছে মনে হয়।

দাঁত কেলিয়ে হাসল ফ্লিন্ট, তেড়ে এল। আচমকা পেছন থেকে হাত বাড়াল ভার্জিল রীড; গ্রীন কিছু বুঝে ওঠার আগেই শক্ত বেষ্টনীতে পেঁচিয়ে ধরল ওর গলা। এইবার! চিৎকার করল রীড, দুহাত আঁকড়ে ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বাঁকা করে ফেলেছে গ্রীনের ঘাড়, কজির হাড় ক্রমশ চেপে বসছে থুতনির নীচে।

বারের ওপর ধনুকের মত বাঁকা হয়ে আছে গ্রীনের পিঠ, অনুভব করছে ওর উক্ত পেটে দমাদম ঘুসি মারছে ফ্লিন্ট। এরপর হাচ যোগ দিল ফ্লিন্টের সঙ্গে, দুজনে মিলে অনবরত আঘাত করতে লাগল ওর শরীর আর মুখে। চোয়াল চেপে নরকযন্ত্রণা সহ্য করল গ্রীন, চোখে সর্ষের ফুল দেখছে। পায়ের পাতায় ভর দিয়ে কোমর সামান্য উঁচু করল ও, হাত উঠিয়ে চেপে ধরল রীডের দুই কব্জি। শুনতে পেল খিস্তি করছে রীড, বলছে, তাড়াতাড়ি কর! বেশিক্ষণ এভাবে ধরে রাখতে পারব না আমি। শালার শরীরে ষাড়ের শক্তি।

এখনই শেষ করছি, গরগর করে উঠল ফ্লিন্ট, বুট দিয়ে সজোরে আঘাত করল গ্রীনের দুই উরু সংযোগস্থলে। নিমেষে তীব্র যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ল ওর শরীরে, অসুস্থ বোধ করল। এবার মরিয়া হয়ে উঠল গ্রীন, রীডের কব্জি চেপে ধরে আচমকা লাফিয়ে আগে বাড়ল, ডিগবাজি দিল। বারের পেছন থেকে শূন্যে উঠে গেল রড, মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে ছিটকে পড়ল মাটিতে। ব্যথায় চিৎকার করল সে, কোকাতে লাগল।

হাচ আর ফ্লিন্ট এগিয়ে আসছিল আবার, দুপাশ থেকে। দাঁতে দাঁত চেপে ব্যথার খিচুনি সহ্য করল গ্রীন, এক হাঁটুতে ভর রেখে লাফিয়ে পড়ল হাচের পায়ের ওপর, হ্যাচকা টান মারল। সশব্দে আছাড় খেল হাচ, কাঠের মেঝে থেকে ধুলো উড়ল। তড়াক করে ওর বুকের ওপর চেপে বসল গ্রীন, দুবার ঘুসি মারল, মুখে, চুলের গোছা ধরে সর্বশক্তিতে মাথা ঠুকে দিল মেঝেতে। ওর দেহের ভারে ছটফট করছিল হাচ, এবার অসাড় হয়ে গেল।

তক্ষুণি গড়িয়ে সরে গেল গ্রীন, কষ্টেসৃষ্টে উঠে দাঁড়াল, দেখল বার থেকে রীডের ছড়িটা ছো মেরে তুলে নিয়েছে ফ্লিন্ট

ছড়ির চেয়ে মুগুরের সঙ্গেই এটার আত্মীয়তা বেশি। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের কজির মত মোটা, একপ্রান্তে গোলাকার একটা মুকুট রয়েছে। সংঘর্ষ হলে ওই মুকুট অনায়াসে যে কোন লোকের মাথার খুলি বা হাত গুড়িয়ে দিতে পারবে। হাপাতে হাঁপাতে এগিয়ে এল ফ্লিন্ট, নিশ্বাসের তালে তালে ভরাট বুক ওঠানামা করছে, মুকুট ধরে লাঠি খেলার ভঙ্গিতে ছড়িটা ধীরগতিতে ঘোরাচ্ছে। পিছিয়ে গেল গ্রীন, এ অবস্থায় প্রতিপক্ষের সঙ্গে সরাসরি মোকাবেলা করা নির্বুদ্ধিতার শামিল, তাই পিস্তলের শরণ নিল। হোলস্টার থেকে প্রায় বের করে এনেছে ওটা, এমন সময় খেঁকিয়ে উঠল রীড, বের কর-আমি তোমার হাঁটু উড়িয়ে দেব।

খোঁড়াতে খোঁড়াতে বারের পেছনে চলে গেছে শয়তান বুড়ো, একটা দোনলা কাটাবন্দুক হাতে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে গ্রীনের পানে।

ওকে ধর, ফ্লিন্ট, বলল রীড! কিন্তু খুন করবে না।

ফ্লিন্ট ব্যবধান কমিয়ে আনতে কামরার আরেক প্রান্তে সরে গেল গ্রীন। খিড়কিপথে বেরোনোর সুযোগ রয়েছে একটা, দেখতে পেল ও। একবার এখান থেকে বেরোতে পারলে পিস্তল ব্যবহারে আর কোন বাধা থাকবে না ও, পালিয়ে যেতে পারবে প্রাণ নিয়ে। কিন্তু ওর জেদ আর অকুতোভয় সাহস পালিয়ে যাওয়া থেকে বিরত করল ওকে।

আর এক কদম পিছু হটল সে, একটা চেয়ারের পিঠ স্পর্শ করল ওর কোমর। চট করে চেয়ারটা টেনে সামনে আনল গ্রীন। ফ্লিষ্ট ওর মাথা লক্ষ্য করে সবেগে ছড়ি যোগাতেই চেয়ার তুলে আঘাতটা মাঝপথে ঠেকিয়ে দিল। আচমকা বাধা পাওয়ায় দুড়িটা খসে পড়ল ফ্লিন্টের হাত থেকে, সুযোগ বুঝে চেয়ারটা ওর দিকে ছুড়ে দিল গ্রীন, তেড়ে গেল।

ফ্রিন্টের মুখে প্রচণ্ড একটা ঘুসি হকাল ও, চোয়ালের হাড়ে পিছলে বেরিয়ে গেল মুঠি। ফ্লিন্ট পাল্টা ঘুসি হানল কয়েকটা, কিন্তু গ্রীনের চেয়ে হাতে-পায়ে লম্বা বলে ওর অধিকাংশই লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো, গ্রীন একরকম সেঁটে গেল ওর গায়ের সাথে, ঝটপট আরও দুটো ঘুসি ঝাড়ল পেটে ওই আঘাতে দীর্ঘদেহীর দম বন্ধ হয়ে এল, পিছিয়ে গেল এলোমেলো পায়ে, গ্রীন ধাওয়া করল ওকে। লাফিয়ে উঠে ফ্লিন্টের নাকের বাঁশিতে আঘাত করল ও, তারপর সংক্ষিপ্ত অথচ শক্তিশালী কয়েকটা ঘুসি মারল চোয়াল লক্ষ্য করে, বুঝতে পারছে প্রতিপক্ষ কাহিল হয়ে পড়েছে। ফ্লিন্টের রক্তাক্ত মুখে আরও দুবার আঘাত হানল সে, তারপর ওকে ধরাশায়ী করতে হাত উঠিয়েছে এই সময় অকস্মাৎ কিছু একট: আছড়ে পড়ল ওর খুলিতে। ভয়ঙ্কর যন্ত্রণায় মাথা ঘুরে উঠল গ্রীনের, চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে গেল সবকিছু।

জ্ঞান ফিরে পেয়ে হাচ বুঝতে পেরেছিল কী ঘটতে যাচ্ছে, ভারি ছড়িটা তুলে নেয়। সে, গ্রীনের মাথার পেছনে আঘাত করে ওটা দিয়ে।

আবার যখন চেতনা ফিরে পেল গ্রীন তখন অনুভব করল ওর সারা শরীরে অজস্রধারায় ঘুসিবৃষ্টি হচ্ছে। অনবরত ওকে ঘুসি মারছে ফ্লিন্ট, আর পেছন থেকে ওর দুই হাত মাটিতে চেপে ধরেছে হাচ। আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে গেল গ্রীনের দেহ, ভীষণ দুর্বল বোধ করল-সে। রক্ত বেরোচ্ছে নাক-মুখ থেকে, চিবুক গড়িয়ে নীচে নামছে। মুক্ত হওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করল ও, কিন্তু মনে হলো সমস্ত শক্তি যেন ফুরিয়ে গেছে। ক্ষীণ, দুরাগতভাবে রীডকে বলতে শুনল ও, ঠিক আছে, ওতেই হবে। হাচ, জনকে ডেকে বল ওর ঘোড়া আনতে। আমার মনে হয় ঢের শিক্ষা হয়েছে ওর।

হ্যাঁ, আচ্ছা ধোলাই দিয়েছি, সদম্ভে বলল ফ্লিন্ট। আমার গায়ে হাত তোলার উচিত সাজা।

মাথা ঝিমঝিম করছিল গ্রীনের, ঝাঁকিয়ে অসাড় ভাবটা দূর করল সে, চোখ মেলে দেখল ফ্রিন্টের রক্তাক্ত মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠেছে। ভার্জিল রীডের দিকে তাকাল ও, তারপর মুহূর্তের জন্য আবার নিস্তেজ হয়ে পড়ল। শুনতে পেল রীড বলছে, এক্ষুণি ভাগ, গ্রীন। ওই ঘোড়ায় উঠে আর থামবে না। তোমার চেহারা দেখতে চাই না আমরা।

বাইরে থেকে হাক দিল হাচ, মাতালের মত টলতে টলতে গ্রীন এগোল দরজা অভিমুখে। রোদে চোখ ধাধিয়ে গেল ওর। তারপর হাচ ওর ঘোড়াটা ধরে রয়েছে দেখে সেদিকে এগোল। এক হাতে স্যাডহঁন এবং অন্যটা দিয়ে কেশর ধরে পা রাখল রেকাবে দুবার ছিলে গেল ওটা, দ্বিতীয়বার স্রেফ মাথা ঘুরে উঠতে শূন্যে ঝুলে রইল ও। তারপর অতিকষ্টে চড়ে বসল স্যান্ডলে, লাগাম গুছিয়ে নিয়ে রওনা হলো ধীরে ধীরে।

ক্যাম্পটা যখন দৃষ্টিসীমার আড়ালে চলে গেল রাশ টেনে নামল গ্রীন। খোলা হাওয়ায় মাথা অনেক পরিষ্কার হয়ে এসেছে এখন। স্যাডলব্যাগ থেকে ক্যান্টিনটা বের করল সে। ঠাণ্ডা হয়েছিল মোটা ক্যানভাসের পাত্রটা, ওর হাত জুড়িয়ে গেল। ছিপি খুলে এক ঢোক পানি খেল ও, কুলি করল ভাল করে। তারপর ব্যান্ডানা ভিজিয়ে ঘষে মুখ আর ঘাড় মুছল। ক্ষতবিক্ষত হয়ে আছে মুখ, আরাম পেল ভেজা কাপড়ের ছোয়ায়। আরেক ঢোক পানি খেল গ্রীন, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পরিষ্কার মাথায় নিবিষ্ট মনে ভাবল ওর পরবর্তী কর্মপন্থা। ঘাড় ফিরিয়ে যখন দেখল কেউ নেই পেছনে, আবার স্যাডলে চেপে একসার ভাঙাচোরা বেলেপাথরের টিবির দিকে এগোল। ওই ঢিবিগুলোর পাশ দিয়ে সরু একটা মেঠোপথ চলে গেছে ক্যাম্পের দিকে।

বালুময় ঢাল ধরে একটা গভীর গিরিখাতে নেমে গেল গ্রীন; খাতটা এত গভীর যে খুব সহজেই একজন অশ্বারোহী লুকিয়ে, চলাফেরা করতে পারবে। যখন সে বুঝতে পারল প্রয়োজনীয় দূরত্ব অতিক্রম করেছে, নেমে মাটিতে লাগামের খুটাটা পুঁতে দিল। গিরিখাতের খাড়াই বেয়ে কিনার অবধি উঠে গেল গ্রীন, সন্তর্পণে মাথা জাগিয়ে নীচের ধসে পড়া ঝুপড়ি আর দালানগুলো জরিপ করল। গরম বাতাসের ভাপ লাগল, ওর চোখে-মুখে, অনুভব করল সূর্যকিরণে পিঠ পুড়ে যাচ্ছে। একজনের কাশির আওয়াজ শুনতে পেল ও একটু বাদেই দেখা গেল অসল্যারকে, ধীর পদক্ষেপে আস্তাবলে। যাই।

এরপর আর কোনওরকম কর্মব্যস্ততা বা লোকজনের সাড়াশব্দ মিলল না নীচে। গ্রীন অনুমান করল ফ্লিন্ট আর হা এখনও স্যালুনেই আছে। নিজের পিস্তলটা পরখ কল সে, সাবধানে ঢাল গড়িয়ে নেমে গেল ক্যাম্পে, দৌড়ে গা ঢাকা দিল একটা ঝুপড়ির আড়ালে, তারপর সেখান থেকে একই কায়দায় আরও কয়েকটা কুটির পেরিয়ে স্যালনের ঠিক পেছনেই শৌচাগারের কাছে এসে থামল। গরম আর দুর্গন্ধ মিলেমিশে দম আটকে এল গ্রীনের, কিন্তু একটা অট্টহাসির আওয়াজ পেয়ে ঝট করে বসে পড়ল ঝোঁপঝাড়ের ভেতরে। স্যালুনের খিড়কি দোর খুলে বেরিয়ে এল হাচ, মুখে আকর্ণ বিস্তৃত হাসি ঘুরে জোর গলায় হেঁকে উঠল সে, ফ্লিন্ট ওপরে হাত-মুখ ধুতে ধুতে আমি আরেকটা কাজ সেরে ফেলছি। তুমি বরং আরও কিছুটা পনির আর শুকনো মাংস বের কর, ভার্জ। যে একখানা ধকল গেল, খিদেয় পেট চো-চোঁ করছে আমার।

দরজা খোলা রেখেই শৌচাগার অভিমুখে হাঁটা দিল ও। পিস্তল বের করল গ্রীন, উত্তেজনায় টানটান হয়ে আছে সমস্ত স্নায়ু। বেলে মাটিতে হাতের বুটের থপথপ শব্দ শুনতে পাচ্ছে। চট করে শৌচাগারের কোনা ঘুরে সামনে চলে এল গ্রীন হাচ তখন গোড়ালি অবধি প্যান্ট নামিয়ে বসতে যাচ্ছিল, গ্রীনকে দেখে কপালে উঠল, চোখ, চেঁচাবার জন্য মুখ হাঁ করল। পিস্তলের নল দিয়ে ওর চাঁদিতে বাড়ি মারল গ্রীন, জ্ঞান হারাল গাট্টাগোট্টা লোকটা, উলঙ্গ অবস্থায় নেতিয়ে পড়ল শৌচাগারের আসনে

গ্রীন আন্দাজ করল কিছুক্ষণ এভাবেই থাকবে ও, অন্তত কাজটা সারা পর্যন্ত। দৌড়ে মাঝের দূরত্বটুকু অতিক্রম করল গ্রীন, খোল! দরজার পাশ দিয়ে উঁকি মেরে দেখল বারের পেছনে বসে আছে ভার্জিল রীড, দৃষ্টি সামনের নোংরা জানালার দিকে নিবদ্ধ। ভেতরে পা রাখল গ্রীন, বারের কাছাকাছি চলে এসেছে এমন সময় পাই করে রীড তার ধূসর মাথাটা ঘোরাল, মুখ চালু হলো কথা বলার জন্য।

তারপর গ্রীনকে যখন চিনতে পারল ও কেবল ঘোৎ করে একটা শব্দ বেরোল, হাত চলে গেল বারের নীচে।

গ্রীন ওর পিস্তলটা নাচাল। বিড়বিড় করে বলল, চোখের সামনে রাখ, রীড, দুটোই। বারের ওপর। ছড়ি আছড়ে সংকেত দেয়ার চেষ্টাও করবে না।

এতে কী লাভ হবে তোমার বুঝতে পারছি না, ক্রুদ্ধ স্বরে বলল রীড।

প্রথমত, তৃপ্তি। বারের পেছনে চলে এল গ্রীন, কাটাবন্দুকটা তুলে নিল তাক থেকে। অস্ত্রটা বাঁকিয়ে ভেতরের কার্তুজ দুটো বের করে নিল ও, তারপর ওগুলো পকেটে ফেলে বন্দুকটা রেখে দিল আগের জায়গায়। এবার কাউন্টার ঘুরে রীডের সামনে এসে দাঁড়াল, ফোলা চোখ দুটো জ্বলছে অদ্ভুতভাবে।

ফ্লিন্ট নীচে না আসা পর্যন্ত একদম চুপ থাকবে, বোঝা গেছে?

চোখ কোঁচকাল রীড। খুন করতে চাও ওকে?

খুন করতে ফিরে আসিনি আমি, শুধু চোখের সামনে দেখতে চাই সবাইকে।

প্রতিশোধের ব্যাপার না হলে কেউই খুন করতে চায় না। অবশ্যি তাই বলে, সবসময় না। বেশির ভাগ খুনখারাপিই হয় মুহূর্তের রাগে। ভাল, হাসিখুশি একটা মানুষ, কারও সাতে-পাঁচে নেই। তারপর হঠাৎই একটা কিছু গোলমাল হয়ে যায়। কোন ফালতু কথা, কিংবা হয়তো কোন মেয়েছেলের ব্যাপার থাকে। এই ক্যাম্পটা যখন জমে উঠছে, অধিকাংশ সময় এমনটাই হত। তারপর লড়াই, হাতাহাতি না; খুব কম লোকই জানে এটা পিস্তল অথবা ছুরি, মার নয়তো মর। যোগ্য লোকই জিতবে এরকম কোন কথা নেই।

সময় চুরি করছে রীড, ভাবল গ্রীন।

এত কথা কীসের? জানতে চাইল একটা গলা। সিঁড়িতে দুপদাপ শব্দ তুলল এক জোড়া বুট। বুঝলে, এখন বেশ আরাম বোধ করছি আমি! পিস্তলটা আবার…ঝোলাতে পেরে ভাল লাগছে। ভেবেছিলে আমরা ওকে গুলি করব, না, ভার্জ? সে জন্যেই ওপরে রেখে আসতে বলেছিলে অস্ত্র? হা, হা!

সিঁড়িতে দেখা গেল ফ্লিন্টকে। বলছে, এখন পেটে খানিকটা মাল আর কিছু দানা পড়লেই তাজা হয়ে যাব আবার। তখন সুবিধে করতে পারব মেয়েছেলের সঙ্গে। ভার্জ, এখানে তোমার গোটা দুয়েক মেয়েছেলে রাখা উচিত, তবে না শরীরটা ঠিকঠাক-

গ্রীনকে চিনতে পেরে থমকে দাঁড়াল ও। মৃদু গলায় বলল, বাহ! লম্বা একটা শ্বাস টানল ফ্লিন্ট! সাহস আছে মানতে হবে। ও কী চায়, ভার্জ?

বলেনি।

একটু আগে আস্ত অবস্থায় বেরিয়ে গেছিল এখান থেকে। এখনকার কথা বলতে পারি না। কী ব্যাপার, গ্রীন? কী চাই তোমার?

রীডকে বলেইছি-তৃপ্তি। কিংবা বলতে পার আমার চিহ্ন রেখে যেতে চাই, অনেক বাচ্চাছেলে যেমন গাছের গায়ে নিজের নাম খোদাই করে। এবার তোমার গানবেল্টটা ফেলে দিয়ে ওই দেয়ালের কাছে যাও।

নিশ্চয়ই, বলেই পিস্তলের দিকে হাত বাড়াল ফ্লিন্ট।

ফ্লিন্টের পিস্তল গর্জে ওঠার এক সেকেন্ড আগে গ্রীন ওর অস্ত্রের ট্রিগার টিপল। বুকে ভারি বুলেটের ধান্ধা লেগে লাটুর মত একপাক ঘুরে গেলু ফ্লিস্ট, হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে গেল কাঠের মেঝেতে। ওর গুলি নিশানার অনেক দূর দিয়ে চলে গেছে। তিক্ত সুরে খিস্তি করল রীড।

না, তুমি কেন এখানে খুন করতে ফিরে আসবে।

দেখেইছ তুমি, কে আগে ড্র করেছে।

অবশ্যই। কিন্তু তুমি ফিরে না এলে কিছুই ঘটত না।

ও আর হাচ আমার ওপর ঝাঁপিয়ে না পড়লেও ঘটত না, গ্রীন বলল কর্কশ সুরে। নাও, এবার তুমি এদিকে এসে কোণের ওই টেবিলটায় চুপ করে বস।

তোমার মতলবটা কী?

দেখতেই পাবে, বুড়ো খোকা। কই, এস!

হাচের ব্যবস্থাও মনে হয় করে ফেলেছ আগেই, বিড়বিড় করে বলল রীড, ছড়িতে ভর দিয়ে মুখ বিকৃত করে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেরিয়ে এল বারের পেছন থেকে। তবে পার পাবে না তুমি, মনে রেখ। চেয়ারে বসে হিংস্র দৃষ্টিতে গ্রীনের দিকে তাকাল ও আইনের লোক হলৈই যা খুশি তাই করা যায় না।

হালাম বুঝি তাই বলেছে তোমাকে? মুখে কুলুপ এঁটে বসে রইল রীড, বলল না কিছু। আমি পুলিসের লোক না, খেই ধরল গ্রীন। একজন মুখচেনা আসামীর সঙ্গে বসে ড্রিংক করতে বাধরে না আমার। তোমার ব্যাপারটা কী, বুড়ো খোকা? দাঁগী চোর-বাটপারকে আশ্রয় দিয়ে পয়সা কামাও না তুমি? যদিও এখানে ওই টাকা-পয়সা তোমার কোন কাজেই আসবে না। উপহাসের ভঙ্গিতে মুখ বঁকিয়ে এগিয়ে গিয়ে ফ্লিন্টের পিস্তলটা তুলে নিল গ্রীন, আড়চোখে দেখল ভূলুষ্ঠিত লাশটাকে। অন্যখানেও না, বিদ্রুপের সুরে বলল।

প্রত্যেক মানুষেরই বাঁচার অধিকার আছে, মিনমিন করে বলল রীড। আইনের কবল থেকে লুকিয়ে থাকারও–যদি সেটাই চায় সে।

আরও অনেক কিছুরই অধিকার আছে। বিশেষ করে তার সাথে যদি অন্যায় করা হয়ে থাকে।

ঘুরে পিস্তলটা ছুঁড়ে মারল গ্রীন, সামনের জানালার কাঁচ ভেঙে বাইরে গিয়ে পড়ল সেটা। বারের পেছনে গিয়ে হাতের কাছে যতগুলো মদের বোতল পেল শটগানের ব্যারেল দিয়ে সব গুড়িয়ে দিল ও। তরল হুইস্কি সহস্র ধারায় ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে, ওর কাপড়চোপড়ে ছিটা লাগল।

এবার বারের ওপর ওর ভারি শরীরটা চাপাল গ্রীন, দেবে যাচ্ছে অনুভব করে দোল খেতে শুরু করল। মেহনত করতে হলো একটু, কিন্তু শেষ পর্যন্ত গোটা জিনিসটাই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল সামান্য ধুলোর মেঘ উড়িয়ে। নির্বিকার দৃষ্টিতে ওর কার্যকলাপ লক্ষ করতে লাগল রীড। আরও কিছু ক্ষতিসাধন করা যায় কিনা দেখতে চারপাশে নজর বোলাল গ্রীন। কিন্তু ইতিমধ্যে রাগ পড়ে এসেছে, ওর, ফলে অন্য এক অনুভূতি জাগল মনে, পুরো ব্যাপারটাই ছেলেমি হয়ে যাচ্ছে, অথচ তার বোঝা উচিত এখন সে আর ছোটটি নেই। বিরক্তির সঙ্গে কাঁধ ঝাঁকাল ও, রূঢ় স্বরে বলল, হালামের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ নিয়ে নিয়ো। ওর ইশারাতেই তো হয়েছে সব, তাই না?

রীডের মুখের মানচিত্র বদলে গেছে, ভেজা-ভেজা চোখ দুটো সংকুচিত; প্রখর, স্থির

আবার যখন হালাম আসবে তোমার কাছে, তাকে বলবে আমার সঙ্গে যেন লাগতে না আসে, বলে বেরিয়ে গেল গ্রীন। মাইনিং ক্যাম্পে তার যেজন্য আসা তা সফল হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *