১.০৪ বিশ্বের শেষ নিরপেক্ষ এলাকা

অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশকে বিশ্বের শেষ নিরপেক্ষ এলাকা মনে করেন বহু অ্যাকাডেমিক পর্যবেক্ষক। এই মহাদেশে প্রথাগত কোনও পবিত্র-ভূমি নেই যে সেজন্য ধর্ম-যুদ্ধ হবে, এখানে কোনও সীমানা নিয়ে লড়তে হয় না। সবার কাছে চাঁদের ভূমির মত এই সুদূর মহাদেশ, বিশাল-বিরান প্রান্তরে সবাই মিলেমিশে বাস করতে পারবে। অবশ্য, যদি এই চরম পরিবেশে টিকে থাকতে পারে!

ঊনিশ শ একষট্টি সালের অ্যান্টার্কটিকা চুক্তি দেখলে মনে হতে পারে, বিশাল এক পিঠা ভাগ করা হয়েছে। এক অংশ করে পেয়েছে প্রতিটি পক্ষ। এর ভিতর চিলি, আর্জেন্টিনা ও ব্রিটেন মিলে ভোগ করবে একই এলাকা। অন্যরাও বিশাল এলাকা পেয়েছে। অস্ট্রেলিয়া পেয়েছে একাই অ্যান্টার্কটিকার চার ভাগের এক ভাগ জমি। মহাদেশের এক অংশ অ্যামুসেন সাগর ও বায়ার্ড ল্যাণ্ড, এসব এলাকার কর্তৃত্ব কারও হাতেই নেই।

সাধারণ বুদ্ধি থেকে মনে হতে পারে: এই মহাদেশ আসলে সত্যিকারের আন্তর্জাতিক এলাকা। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি অত সহজ নয়। অনেকে বলবেন: অ্যান্টার্কটিকায় সবার রাজনৈতিক সম অধিকার আছে। কিন্তু তারা কথা দিয়ে যতই উড়িয়ে দিতে চান, : বাস্তব হচ্ছে: অ্যান্টার্কটিকার জমি নিয়ে প্রচণ্ড বিরোধ রয়েছে আর্জেন্টিনা ও গ্রেট ব্রিটেনের ভিতর। শক্তিশালী বেশ কয়েকটি দেশ মেনেও নেয়নি ঊনিশ শ পঁচাশি সালের ইউএন রেযোলিউশন, তারা কখনও মানবে না অ্যান্টার্কটিকার গোটা এলাকা হওয়া উচিত সমস্ত মানব-সভ্যতার জন্য মুক্ত। চুক্তিবদ্ধ দেশগুলো বেশ কিছু বিষয়ে একদম চুপ থেকেছে। ঊনিশ শ পঁচানব্বই সালে গ্রিনপিসের রিপোর্টে বলা হয়েছে: ফ্রেঞ্চ সরকার, ভিক্টোরিয়া ল্যাণ্ডের উপকূলে গোপনে নিউক্লিয়ার বোমার পরীক্ষা চালিয়েছে। বড়রা কেউ এ নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করেনি। আসল কথা হচ্ছে: সাধারণ সব দেশকে শক্তিশালী সব দেশের আঙুল শাসানি মেনেই চলতে হবে।

তার চেয়ে বড় কথা: সীমান্ত-বিহীন এই এলাকায় শত্রু হামলা হলে কীভাবে তা ঠেকানো হবে, সে বিষয়ে কোনও আইন বা নীতি প্রণয়ন করা হয়নি।

 হাজার মাইল দূরে একেকটা রিসার্চ স্টেশন, কিন্তু সেসব এলাকায় মাঝে মাঝেই আবিষ্কার হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ, দুস্প্রাপ্য ও মূল্যবান বস্তু–যেমন ইউরেনিয়াম, পুটোনিয়াম, সোনা ইত্যাদি। এমনও তো হতে পারে, ভিন কোনও দেশ বাধ্য হয়ে কাঁচা-রসদ বা মূল্যবান কিছুর খোঁজ পেলে দখল করতে সেনাবাহিনী: পাঠাবে। হয়তো সে জিনিস সম্বন্ধে সাধারণ মানুষ এখনও জানে না।

আগে কখনও দেশগুলোর ভিতর এমন ধরনের লড়াই শুরু হয়নি অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশে।

কিন্তু প্রথমবার বলে একটা কথা আছে।

উইলকক্স আইস স্টেশনের ভিতর ফ্রেঞ্চম্যান ম্যাথিউ ফ্যেনুয়্যার পাশে হাঁটতে গিয়ে এই কথাগুলোই ভাবছে মাসুদ রানা।

ম্যাকমার্ডোতে পৌঁছে রেকর্ড করা রাফায়লা ম্যাকানটায়ারের ডিসট্রেস সিগনাল শুনেছে. ও। মহিলা জানিয়েছে, উইলকক্স আইস স্টেশনের নীচে চাপা পড়ে আছে একটা স্পেসক্রাফট। এখন সত্যিই যদি ওই স্টেশনের বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করে থাকেন এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়াল স্পেসশিপ, সন্দেহ নেই অন্য দেশও ওই জিনিস দখল করতে আগ্রহী হয়ে উঠবে। কিন্তু তারা আমেরিকান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে স্ট্রাইক টিম পাঠাতে সাহস পাবে কি না, সেটা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

চিফ আমাকে সব ঘুরে দেখতে বলেছেন, মনে মনে বলল রানা। এখনও খচূ-খচ্‌ করছে ওর মন। আমেরিকান রিসার্চ স্টেশনের দরজায় ফ্রেঞ্চ লোক দেখে কু ডাকতে শুরু করেছে মন। বরফের টানেলের ভিতর হেঁটে চলেছে এখন। এক পা পিছনে আসছে ম্যাথিউ ফ্যেনুয়্যা। আগের চেয়ে একটু বেশি শক্ত করে অটোমেটিক পিস্তলের বাঁট ধরল রানা।

আঁধার টানেল ফুরিয়ে এল, সামনে আলোকিত ফাঁকা এক জায়গায় পৌঁছে গেল ওরা। দাঁড়িয়ে পড়ল রানা, পায়ের নীচে সরু, কালো, ধাতব ক্যাটওয়াক। চোখ ফেলল চারপাশে। জায়গাটা মস্ত এক ড্রামের মত। নীচে ফাঁকা শূন্যতা।

মাটির নীচে, থুক্ক, বরফের নীচে এটা বিশাল এক ব্যারেল, মনে মনে বলল রানা। ব্যারেলের চারদিকে গেছে কালো রঙের সরু সব ক্যাটওয়াক। মাঝে বিশাল শাফট। ওপাশে বোধহয় সায়েন্টিস্টদের ল্যাব ও কোয়ার্টার। এই ব্যারেলের অনেক নীচে গোলাকার পানির প্রকাও এক নীল পুল। তার মাঝখানে স্টেশনের ডাইভিং বেল ভাসছে।

এই পথে আসুন, হাতের ইশারা করে ডানদিক দেখাল ফ্যেনুয়্যা। সবাই ডাইনিংরুমে।

ফ্রেঞ্চ লোকটাকে এক ফুট পিছনে নিয়ে বিশ কদম যাওয়ার পর আলোকিত ঘরে পৌঁছে গেল রানা। ওর মনে হলো প্লে গ্রুপের ক্লাসরুমে ঢুকে পড়েছে। ও এমন এক আগন্তুক, যাকে দেখে ভয় পেতে পারে বাচ্চারা।

গোলাকার এক টেবিল ঘিরে বসা পাঁচজন পুরুষ ও নারী। পুরুষদের গালে খোঁচা-খোঁচা দাড়ি, ময়লা হয়ে গেছে মহিলার পোশাক। সবাইকে হতক্লান্ত মনে হলো। রানা দরজা দিয়ে ঢুকতেই ওর দিকে চাইল বিষন্ন চোখগুলো।

এরা কেউ বাঙালি নয়, বুঝল রানা। বাঙালি বিজ্ঞানীদের বোধহয় আগেই হোভারক্রাফট করে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

ঘরে আরও দুজন লোক, টেবিলের পিছনে। এরা আলাদা, পরনে নতুন পোশাক, চেহারায় কোনও ক্লান্তি নেই। বোধহয় ম্যাথিউ ফ্যেনুয়্যার সঙ্গে এসেছে। ডানদিকের লোকটার হাতে ধোঁয়া ওঠা কফি, সুপ বা চায়ের ট্রে। টেবিল ঘুরে এগুতে শুরু করেছিল, কিন্তু রানা ঘরে ঢুকতেই থমকে দাঁড়িয়েছে সে।

ডিসট্রেস সিগনাল পেয়ে এসেছে ডিখ-ঈলেখের ফ্রেঞ্চ বিজ্ঞানীরা, ভাবল রানা। অবশ্য, তা না-ও হতে পারে।

চুপ সবাই। চোখ রানার উপর। ওকে ভিনগ্রহের মানুষ মনে হচ্ছে তাদের কাছে। হেলমেট, বডি আর্মার, তুষারের ফেটিগ, কাঁধে এমপি-৫ মেশিন পিস্তল, হাতে .৪৪ অটোমেটিক পিস্তল।

রানা ও ফ্যেনুয়্যার পর ঘরে ঢুকেছে সার্জেন্ট পল সিংগার। এবার তার উপর স্থির হলো সবার চোখ। অন্য গ্রহের প্রাণী আরেকটা বেড়েছে। হেলমেটের ভাইযারের কারণে রানা ও ভাইপারকে মনে হচ্ছে যেন দুই যমজ ভাই। কিন্তু একজনের চামড়া বাদামি, অাজনের ত্বক ফকফকে সাদা।

আপনাদের কোনও ভয় নেই, নরম সুরে বলল ম্যাথিউ ফেয়্যা। এঁরা আমেরিকান মেরিন, সঙ্গে বাংলাদেশ আর্মির ইউনিট। এঁরা আপনাদেরকে সরিয়ে নেবেন।

ফোস করে দম ফেলল মহিলা। ওহ, যিশু, অস্পষ্ট সুরে বলল। কাঁদতে শুরু করেছে। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ!

আমেরিকান উচ্চারণ, খেয়াল করেছে রানা! চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল মহিলা, ওর দিকে এগিয়ে এল। গাল বেয়ে দরদর করে গড়াচ্ছে অশ্রু। ভেজা স্বরে বলল, জানতাম, আপনারা ঠিকই আসবেন।

রানার শোল্ডারপ্লেট আঁকড়ে ধরল মহিলা, ভিনদেশি সৈনিকের বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করেছে। কোনও সান্ত্বনা দিতে গেল না রানা। মহিলা থেকে একটু দূরে রেখেছে পিস্তল। প্রয়োজন পড়লে দেরি না করে ব্যবহার করবে।

ঠিক আছে, ম্যাম, নিচু স্বরে বলল রানা। তাকে পথ দেখিয়ে কাছের এক সিটের পাশে চলে গেল, হাতের ইশারা করল বসতে। চিন্তা করবেন না, ম্যাম। এখান থেকে আপনাদেরকে সরিয়ে নেয়া হবে।

মহিলা চেয়ারে বসবার পর সবাইকে দেখে নিল রানা। লেডিজ অ্যাণ্ড জেন্টলমেন, আমরা কজন বাংলাদেশ থেকে এসেছি, সঙ্গে ইউনাইটেড স্টেটসের মেরিন কর্পসের সাত নম্বর ইউনিটের কয়েকজন। হাতের ইশারায় সার্জেন্টকে দেখাল রানা। ও ইউএস মেরিন কর্পস্-এর গানারি সার্জেন্ট পল সিংগার। আমি বাংলাদেশের, মেজর মাসুদ রানা। আমরা ডিসট্রেস সিগনাল পেয়ে এসেছি। আপনাদেরকে এখান থেকে সরিয়ে নেব। তার আগে, সিকিউর করা হবে এই স্টেশন। আমাদের কাজ আপনাদেরকে নিরাপদ রাখা, এবং ম্যাকমার্জোয় পৌঁছে দেয়া।

টেবিলের ওপাশে স্বস্তির বড় শ্বাস ফেলল এক লোক।

আশা করি কোনও ভুল ধারণা করবেন না, বলল রানা, আমাদের সঙ্গী মেরিন সৈনিকরা রিকনিস্যান্স ইউনিট, তারা আপনাদেরকে এখান থেকে সরিয়ে নেবে না। তাদের কাজ স্টেশন পাহারা দেয়া। এদিকে বাংলাদেশ আর্মির দায়িত্ব আপনাদেরকে নিরাপদে ম্যাকমাৰ্ডোয় পৌঁছে দেয়া। ঝড় কমে এলেই এ কাজে হাত দেব আমরা। অবশ্য, ধারণা করছি তার আগেই পুরো ইকুইপৃড় এক্সট্রাকশন টিম পৌঁছে যাবে।

ম্যাথিউ ফ্যেনুয়্যা এবং টেবিলের পিছনে দাঁড়ানো দুই লোকের পকে চাইল রানা। আপনারা বিজ্ঞানী, এসেছেন ডিখ-ঈলেখ, থেকে। …ভুল ধারণা করেছি?

ট্রে হাতে লোকটা মস্ত ঢোক গিলল। বিস্ফারিত হয়ে উঠেছে দুই চোখ।

না, ঠিকই বলেছেন, বলল ফ্যেনুয়্যা। আমরা রেডিয়ো মেসেজ পেয়ে যত দ্রুত সম্ভব এখানে এসেছি। এঁদের সাহায্য করতে।

এক নারী-কণ্ঠ বলে উঠল রানার ইয়ারপিসে, ইউনিট টু। চারপাশ ঘুরে দেখেছি, সব ঠিক আছে, স্যর।

ইউনিট থ্রি। আমরা তিনটা… না, চারটে কন্ট্যাক্ট পেয়েছি ড্রিলিং রুমে। আমরা এখন তাদের নিয়ে উঠে আসছি।

ফ্যেনুয়্যার দিকে চাইল রানা। আপনাদের সবার নাম?

আমি প্রফেসর ম্যাথিউ ফ্যেনুয়্যা, বলল ফ্রেঞ্চম্যান। ইনি গ্যাসোয়া ভিভাদিয়েখ, আর ট্রে হাতে উনি ডক্টর স্যাঁ ডেনি পেঁয়েযি।

এদের নাম মিলে গেছে। ম্যাকমার্ডো থেকে দ্য মার্ভেল অভ গ্রিসে ফ্রেঞ্চ বিজ্ঞানীদের নামের লিস্ট পাঠানো হয়েছে, তার সঙ্গে মিলছে সব। সন্দেহ নেই, এঁরা ফেনুয়্যা, ভিভাদিয়েখ এবং পেয়েযি, এসেছেন ডিখ-ঈলেখ থেকেই।

দরজার উপর টোকা পড়তেই ঘুরে চাইল রানা।

খোলা দরজার উপর এসে দাঁড়িয়েছে সার্জেন্ট জনি ওয়াকার। গাঁট্টাগোট্টা লোক সে, বয়স ছিচল্লিশ, মেরিন দলে সবচেয়ে বয়স্ক। বেশিরভাগ সময় কুঁচকে রাখে নাক, দেখায় কুকুরের মত। বহুবছরের অভিজ্ঞতার ছাপ চেহারায়। তার দশ গজ পিছনে তার পার্টনার কর্পোরাল টনি কেলগ। স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ সে, চিকন-চাকন, কুচকুচে কালো চেহারা, বয়স মাত্র একুশ বছর।

দুই মেরিনের মাঝে তাদের খাটুনির ফসল: এক রূপবতী মহিলা, এক লোক, এক কিশোরী আর একটা সিল মাছ অবশ্য মাছ বলা হলেও আসলে এরা তিমির মতই স্তন্যপায়ী জন্তু, ম্যামাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *