১.০১ বিরান-বিশাল-শীতল-ধবল প্রান্তর

ডেথ ট্র্যাপ (দুই খণ্ড একত্রে)

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশা ও অস্ট্রেলিয়ার মত কয়েকটি দেশ মিলে ভাগ করে নিয়েছে ওই বিরান-বিশাল-শীতল-ধবল প্রান্তর। বছরের এক তৃতীয়াংশ সময়ে হয়ে ওঠে আকারে দ্বিগুণ। দিনের পর দিন বয় ওখানে তুমুল তুষার-ঝড়। তাপমাত্রা শূন্যের অনেক নীচে। বরফমোড়া কোনও সাধারণ দেশ নয় ওটি, বরং প্রকাণ্ড একটি জীবিত, জাগ্রত মহাদেশ। এবং সেখানেই শুরু হতে চলেছে মহা জটিল এক নাটকের প্রথম অংক।

উইলকক্স আইস স্টেশন, অ্যান্টার্কটিকা।

১৩ই জুলাই।

তিনঘণ্টা হলো স্টেশনের সঙ্গে রেডিয়ো যোগাযোগ বিচ্ছিন হয়ে গেছে দুই ডুবুরির।

গভীরে নামবার সময় ডাইভিং ছিল নিখুঁত। নেমেছে তারা অনেক নীচে। স্টেশনের দুই সেরা ডুবুরি স্টোন ও অ্যাডামস মাঝে মাঝেই আলাপ করেছে ইন্টারকমে।

আধাআধি নামবার পর রিপ্রেশারাইয করেছে, এরপর পুরো তিন হাজার ফুট নীচে গিয়ে থেমেছে। বেরিয়ে এসেছে ডাইভিং বেল থেকে, একপাশে সরু এক বরফের টানেল ধরে আবারও উঠে গেছে বিশাল এক গুহার দিকে।

পানির তাপমাত্রা ছিল এক দশমিক নয় ডিগ্রি সেলসিয়াস। দুবছর আগেও অ্যান্টার্কটিকায় ডাইভিং ছিল প্রায় অসম্ভব, দশ মিনিট পানিতে থাকলে হাইপোথারমিয়ায় মরতে হতো। কিন্তু এখন নেভির জন্য তৈরি থার্মাল-ইলেকট্রিক সুটের কারণে প্রায়জমে যাওয়া পানিতে তিন ঘণ্টারও বেশি ডুবে থাকা যায়।

গভীর পানির ভিতর সরু, খাড়া বরফের সুড়ঙ্গ দিয়ে উঠবার সময় রেডিয়োতে আলাপ করেছে ডুবুরিরা। বরফের দেয়ালের ফাটল ও রুক্ষতা নিয়ে মন্তব্য করেছে। তাদের কাছে স্বর্গীয় মনে হয়েছে চারপাশের বরফের দেয়াল, যেন গভীর সুনীল আকাশ।

তারপর হঠাৎ করেই থেমে গেছে সব কথা। উপরে দেখতে পেয়েছে স্থির পানি। ওখানে শুধু কালো কাঁচের মত নিথর, গাঢ় অন্ধকার। সাধারণত এত শান্ত হয় না পানি। চারপাশে আলো ফেলেছে ওদের, মিলিটারি-স্পেক হ্যালোজেন ফ্লাশলাইট। স্ফটিকের মত জ্বলজ্বল করেছে নীলচে বরফ। এরপর উপরের। দিকে উঠতে শুরু করেছে ডুবুরিরা।

আর ঠিক তখনই শুনতে পেয়েছে আওয়াজটা।

থেমে গেছে দুই ডুবুরি।

স্বচ্ছ ও বরফ-ঠাণ্ডা পানির ভিতর প্রথমে ওটা ছিল একটি মাত্র হুইসল। ওরা ভেবেছে, গান গাইছে কোনও তিমি।।

খুব সম্ভব ওটা কিলার ওয়েইল। কয়েক দিন হলো স্টেশনের ভিতর দেখা দিয়েছে একজোড়া তরুণ কিলার ওয়েইল। খুবই ছোট ঝক, বারবার উইলকক্স আইস স্টেশনের ভিতরের পুলে দম নিতে উঠছে ওগুলো।

অবশ্য, কিলার ওয়েইল না-ও হতে পারে, হয়তো ওই শিসের মালিক কোনও নীল তিমি, সঙ্গী জোগাড় করবার জন্য গান গাইছে পাঁচ কি ছয় মাইল দূরে। তিমির গান নিয়ে এই এক বড় সমস্যা। পানি এত ভাল কণ্ডাক্টার, কেউ বোঝে না তিমি এক মাইল দূরে, না দশ মাইল।

কয়েক সেকেণ্ড স্থির থেকে আবারও উপরে উঠতে শুরু করল দুই ডুবুরি।

আর ঠিক তখনই প্রথম শিসের জবাব দেয়া হলো।

এরপর বেজে উঠল আরও কমপক্ষে এক ডজন শিস। দুই। ডুবুরিকে ঘিরে চলেছে আওয়াজ। প্রথম শিসের চেয়ে অনেক কাছে পরের শিসগুলো।

গাঢ় নীল পানির ভিতর চরকির মত ঘুরে চারপাশে চোখ বুলালো দুই ডুবুরি।

কোথা থেকে আসছে এসব আওয়াজ?

কাঁধ থেকে হারপুন গান নামিয়ে নিয়েছে ডুবুরিদের একজন, দেরি হয়নি হ্যামার কক করতে। হঠাৎ থেমে গেছে তীক্ষ্ণ শিস, শুরু হয়েছে বেশ কিছু করুণ আর্তচিৎকার ও কুকুরের মত ঘেউঘেউ গর্জন।

তারপর হঠাৎ করেই জোরালো ধুপ-ধড়াস্ আওয়াজ হয়েছে। ঝট করে উপরে চেয়েছে দুই ডুবুরি। চারপাশ ছিল আয়নার মত পরিষ্কার, কোথাও কোনও কম্পন ছিল না, কিন্তু সেই নিথর পানি এখন বিস্ফোরিত হয়েছে হাজার টুকরোয়–উপর থেকে নেমে আসছে বিশাল কিছু!

.

জোর ছলাৎ আওয়াজ তুলে সারফেসে ভেসে উঠল প্রকাণ্ড ডাইভিং বেল।

গোলাকার পুলের ধারে পায়চারি করছে জন প্রাইস, ধমকের সুরে নির্দেশ দিয়ে চলেছে। সুঠাম দেহে পরনে তার কালো ইনসুলেটেড় ওয়েট সুট। প্রাইস মেরিন বায়োলজিস্ট, পাশ করেছে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে। এই উইলকক্স আইস স্টেশনের কর্ণধার সে।

সি-ডেকে উইঞ্চ কন্ট্রোল নিয়ে কাজ করছে তরুণ এক টেকনিশিয়ান, তাকে বলল সে, ঠিক আছে, ওখানেই রাখো! ওকে, লেডিজ অ্যাণ্ড জেন্টলমেন, হাতে সময় নেই। সবাই উঠে পড়ন।

পুলের ধারে হাজির হয়েছে ছজন ওয়েট সুট পরা ডাইভার, একে একে বরফ-ঠাণ্ডা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা। এক মিনিট পেরুনোর আগেই উঠে পড়ল ডাইভিং বেলে। পুলের মাঝে জিনিসটা গম্বুজ আকৃতির, অর্ধেক অংশ পানির নীচে।

বিশাল পুলের ধারে, পানির কাছে এসে দাঁড়িয়েছে প্রাইস। এই গোল পুল ঘিরে তৈরি হয়েছে উইলকক্স আইস স্টেশন। কঠিন বরফ খুঁড়ে তৈরি সিলিণ্ডারের মত পাঁচতলা গভীর ফ্যাসিলিটি, বহু দূরের উপকূলীয় রিসার্চ স্টেশন হিসাবে কাজ করছে। প্রকাণ্ড ব্যারেলের মত ফাঁকা জায়গার চারপাশে সরু ক্যাটওয়াক ও মই, সবই মিশেছে একেকটা করে দরজায় ওপাশে বরফের তৈরি দালান। আগে আসা বহু মানুষের মতই উইলকক্স আইস স্টেশনের বাসিন্দারা ভাল করেই জানে, পোলার ওয়েদারে বেঁচে থাকতে হলে বরফের প্রান্তরের নীচে বাস করতে হবে। 

দুই কাঁধে স্কুবা গিয়ার ঝুলিয়ে নিল জন প্রাইস, শতবারের মত হিসাব কষতে শুরু করেছে।

ডাইভারদের সঙ্গে তিনঘণ্টার বেশি রেডিয়ো লিঙ্ক বিচ্ছিন্ন। একঘণ্টা বরফের সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে উপরের দিকে উঠেছে স্টোন ও অ্যাডামস। তার আগে, একঘণ্টা ধরে ডাইভিং বেল চেপে নীচে নেমেছে।

নামবার সময় ফ্রি এয়ার পেয়েছে ওরা। উপর থেকে ডাইভিং বেলের ভিতর তাজা বাতাসের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু বেল থেকে বেরিয়ে আসবার পর থেকেই স্কুবা ট্যাঙ্কের অক্সিজেন ব্যবহার করেছে। ওই প্রথম মুহূর্ত থেকে প্রতিটি সেকেণ্ড হিসাব করতে হবে।

তার মানে, চারঘণ্টা হলো ওরা স্কুবা ট্যাঙ্কের অক্সিজেন ব্যবহার করছে..

কিন্তু সমস্যা: ওদের স্কুবা ট্যাঙ্কে আছে মাত্র তিনঘণ্টা চলবার বাতাস!

এ থেকে অনেক কিছুই আঁচ করে নেয়া যায়।

দুই ডুবুরির কাছ থেকে শেষ যে কথা ওরা শুনেছে, তার পর থেকে পাওয়া গেছে শুধু স্ট্যাটিকের আওয়াজ। সেই সঙ্গে অদ্ভুত কিছু শিসের শব্দ।

ওই শিস তৈরি করতে পারে নীল, মিঙ্কস বা অন্য কোনও নিরীহ তিমি। অথবা, আধ মাইল বরফ ও পানির কারণে তৈরি হয়েছে রেডিয়ো ইন্টারফেয়ারেন্স। প্রাইস আন্দাজ করছে, রেডিয়ো যোগাযোগে ছেদ পড়তেই ফিরতি পথ ধরেছে স্টোন ও অ্যাডামস, রওনা হয়েছে, ডাইভিং বেলের দিকে। তখন নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বেল টেনে তুললে সুড়ঙ্গের ভিতর আটকা পড়ত দুই ডুবুরি। তাদের কাছে যথেষ্ট অক্সিজেনও ছিল না।

কিন্তু, সত্যি যদি দুই ডুবুরি বিপদে পড়ে কিলার ওয়েইল বা লেপার্ড সিল হামলা করে প্রাইসের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল ডাইভিং বেল তুলে একদল ডাইভারকে পাঠানো।

শেষে প্রাইস ঠিক করেছে, ডাইভিং বেল টেনে তুলে ওটাতে করে আবারও কাউকে নীচে নামানোর সময় নেই। স্টোন ও অ্যাডামস্ যদি বেঁচে থাকে, হয়তো ওটাতে নিরাপদে উঠতে পারবে ওরা। এখন উচিত নীচেই রেখে দেয়া ডাইভিং বেল।

কিন্তু সেটা তিন ঘণ্টা আগের কথা। এই সময়টা ডুবুরিদের দিয়েছে প্রাইস। এরপর একঘণ্টা ধরে টেনে তুলেছে ডাইভিং বেল। আর এখন নতুন করে নামবার জন্য তৈরি হয়ে গেছে, দ্বিতীয় দলটি।

শুনুন।

ঘুরে চাইল জন প্রাইস। ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে স্টেশনের প্যালিয়োন্টোলজিস্ট, নিনা ভিসার। 

মহিলাকে পছন্দ করে প্রাইস। নিনা ভিসার বুদ্ধিমতী ও প্র্যাকটিক্যাল; প্রয়োজনে কঠোর হতে জানে, হাত নোংরা হবে ভেবে কাজ ফেলে রাখে না। মহিলার বারো বছরের একটা মেয়েও আছে জেনে খুব অবাক হয়নি প্রাইস। গত এক সপ্তাহ হলো এই স্টেশনে বেড়াতে এসেছে কিশোরী মেরি ভিসার।

কিছু বলবে? জানতে চাইল প্রাইস।

ঝড়ে ভেঙে পড়েছে উপরের অ্যান্টেনা, সিগনাল পাঠানো যাচ্ছে না, বলল নিনা ভিসার। আরও সমস্যা আছে, খুব কাছে চলে এসেছে একটা সোলার ফ্লেয়ার।

মুশকিল।

আমি রাফায়লাকে প্রতিটা মিলিটারি ফ্রিকোয়েন্সি স্ক্যান করতে বলেছি, কিন্তু আপনাকে আশাব্যঞ্জক কিছু শোনাতে পারছি না।

বাইরের অবস্থা কী?

খুবই খারাপ। সাগর-তীরের ক্লিফের উপর আছড়ে পড়ছে আশি ফুটি ঢেউ। সমতলের বরফ ছুঁয়ে বইছে এক শ নট গতিবেগের ঝড়। কেউ যদি আহত হয়, তাকে বাইরে নিয়ে, যেতে পারব না আমরা।

ডাইভিং বেলের দিকে ঘুরে চাইল প্রাইস। আর রাশেদ হাবিব?

তাকে তার ঘরে আটকে রাখা হয়েছে, নার্ভাস চোখে বিডেকের দিকে চাইল নিনা ভিসার।

আর দেরি করতে পারছি না, বলল প্রাইস। এবার যেতে হয়।

তার দিকে চাইল নিনা ভিসার। জন…

ভুলেও অনুরোধ করতে যেয়ো না, নিনা, মহিলার পাশ থেকে রওনা হয়ে গেল প্রাইস, চলেছে ডাইভিং বেলের দিকে। পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়বার আগে বলল, আমি চাই তুমি উপরেই থাকো। তোমার মেয়ের তোমাকে দরকার পড়তে পারে। চেষ্টা করো সিগনাল পাঠাতে। আমরা স্টোন আর অ্যাডামসকে নিয়েই ফিরব।

আমরা তিন হাজার ফুট গভীরতায় পৌঁছে গেছি, দেয়ালের আটকে রাখা স্পিকারে কড়-কড় করে উঠল জন প্রাইসের কর্কশ কণ্ঠ।

উইলকক্স আইস স্টেশনের অন্ধকার রেডিয়ো রুমে বসে আছে নিনা ভিসার। রজার দ্যাট, জন, সামনের মাইক্রোফোনে বলল সে।

বাইরে কোনও নড়াচড়া নেই, কন্ট্রোল। কোথাও কোনও অস্বাভাবিকতা দেখছি না। ঠিক আছে, লেডিজ অ্যাণ্ড জেন্টলমেন, আমরা উইঞ্চ বন্ধ করছি। এবার ডাইভিং বেল থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিন।

সাগরের এক কিলোমিটার নীচে একটা ঝাঁকি খেয়ে থামল ডাইভিং বেল। ওটার পেটের ভিতর ইন্টারকম ব্যবহার করল জন প্রাইস: কন্ট্রোল, প্লিয ২১৩২ আওয়ার্স কনফার্ম করো।

ডগলাস মওসন বেলের বদ্ধ পরিবেশে পরস্পরের দিকে চাইল সাত ডুবুরি, ধুকপুক করছে সবার বুক।

স্পিকারে ভেসে এল নিনা ভিসারের কণ্ঠ: আই কপি, ডাইভিং বেল। সময় কনফার্ম করা হলো, এখন রাত নয়টা বত্রিশ মিনিট।

কন্ট্রোল, মার্ক করতে হবে আমরা ২১৩২ আওয়ার্সে নিজেদের অক্সিজেন ব্যবহার করতে শুরু করছি।

মার্কড।

দেয়ালের হুক থেকে ভারী ফেস মাস্ক নিল সাত ডুবুরি, এক মিনিট পেরুনোর আগেই সুটের কলারবোনের গোলাকার বাকসে আটকে নিল মুখোশ।

কন্ট্রোল, আমরা এখন বেল থেকে বেরিয়ে পড়ছি।

সামনে বাড়ল জন প্রাইস, মুহূর্তের জন্য ডাইভিং বেলের অভ্যন্তরের পুলের কালো পানি দেখল, তারপর দুই কদম বেড়ে ঝপাস্ করে নেমে পড়ল গাঢ় অন্ধকারে।

    .

মাইক্রোফোনে বলে উঠল নিনা ভিসার, ডাইভার্স, ২২২০ আওয়ার্স, ডাইভ টাইম ফরটি-এইট মিনিটস্। রিপোর্ট।

রেডিয়ো রুমে নিনা ভিসারের পিছনে বসেছে রাফায়লা ম্যাকানটায়ার, সে স্টেশনের রেসিডেন্ট মিটিয়োরোলজিস্ট। গত দুই ঘণ্টা ধরে স্যাটালাইট রেডিয়ো কল্লোলের সামনে বসে আছে, কিন্তু বাইরে কোথাও একচুল ফ্রিকোয়েন্সি নেই।

খড়খড় আওয়াজ করে উঠল ইন্টারকম। এক সেকেণ্ড পর যোগাযোগ করল জন প্রাইস: কন্ট্রোল, আমরা এখনও বরফের সুড়ঙ্গ ধরে উপরের দিকে উঠছি। অস্বাভাবিক কিছু দেখিনি।

রজার, ডাইভার্স, বলল নিনা। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন।

ওর পিছনে আবারও টক বাটন টিপল রাফায়লা। কলিং অল ফ্রিকোয়েন্সি, দিস ইয় ফোর-ওয়ান-এইট স্টেশন। আই রিপিট, দিস ইয় ফোর-ওয়ান-এইট, রিকোয়েস্টিং ইমিডিয়েট অ্যাসিস্ট্যান্স। আমাদের এখানে দুজন আহত, সম্ভবত গুরুতর ভাবে। আমাদের ইমিডিয়েট সাপোর্ট দরকার। দয়া করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। আবারও বলছি, দয়া করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন। বাটনের উপর থেকে আঙুলের চাপ সরিয়ে নিয়ে বিড়বিড় করে বলল রাফায়লা, যে-কেউ, সাড়া দিন!

    .

বরফের সুড়ঙ্গের উপরের অংশ চওড়া হতে শুরু করেছে।

সবাইকে নিয়ে ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠছে জন প্রাইস, পানির নীচে প্রত্যেকের চোখে পড়েছে চার দেয়ালে মস্ত সব গর্ত।

প্রতিটা গর্ত একেবারেই গোল, ব্যাসে কমপক্ষে দশ ফুট। সব শেষ হয়েছে বরফের সুড়ঙ্গের ভিতর। একটা গর্তের ভিতর আলো ফেলল এক ডুবুরি। নিকষ কালো অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখা গেল না।

হঠাৎ ইন্টারকমে বলে উঠল জন প্রাইস, ঠিক আছে, সবাই কাছাকাছি থাকুন। আমরা সারফেসের কাছে চলে এসেছি।

ওদিকে স্টেশনের রেডিয়ো রুমে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল নিনা ভিসার। মনোযোগ দিয়ে শুনছে জন প্রাইসের কথা।

সারফেস খুব শান্ত মনে হচ্ছে। এখনও অ্যাডামস বা স্টোনের হদিশ মেলেনি।

পরস্পরের দিকে চাইল রাফায়লা ও নিনা। ইন্টারকমের বাটন টিপল নিনা। ডাইভার্স, কন্ট্রোল থেকে বলছি! ওসব আওয়াজ কীসের ছিল? এখন কি কোনও আওয়াজ পাচ্ছেন? বন্ধ হয়ে গেছে তিমি মাছের গান?

কোথাও কোনও আওয়াজ নেই। এক মিনিট, কন্ট্রোল। আমি সারফেসে উঠে আসছি।

মাত্র আধ মিনিট পর কাঁচের মত সারফেস ভেদ করে উঠে এল প্রাইসের হেলমেট। ফেসপ্লেট থেকে গড়িয়ে নামল বরফঠাণ্ডা পানি। পানির উপর প্রিন্সটন-টেক ডাইভ লাইট তুলল প্রাইস। চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল হ্যালোজেন বালবের আলো, গুহার দূরের কোণ আবছা ভাবে দেখা গেল।

চারপাশ দেখতে শুরু করেছে প্রাইস। বড়সড় এক পুকুরের মাঝে ভেসে উঠেছে সে। একটু দূরে বিশাল পাতাল গুহা।

একবার ঘুরে চারদিক দেখে নিল প্রাইস। এই বিশাল গুহার চার দেয়াল বরফ দিয়ে তৈরি, সত্যিকারের দেয়ালেরমতই খাড়া।

 চতুর্থ দেয়ালে চোখ আটকে গেল প্রাইসের, চমকে গেল। ইন্টারকমে বলে উঠল, কন্ট্রোল, আমি কী দেখছি তোমরা কেউ বিশ্বাস করবে না!

কী দেখেছেন, জন? মাইক্রোফোনে বলল নিনা ভিসার।

বিশাল গুহা। চারপাশে বরফের খাড়া দেয়াল। কোনও একসময়ে সাইসমিক অ্যাক্টিভিটির কারণে তৈরি হয়েছে। বলতে পারি না এই গুহা কোথায়। কিন্তু সমতল থেকে কমপক্ষে কয়েক শ ফুট নীচে হবে।

আচ্ছা!

আর হ্যা… ওদিকে কিছু একটা দেখতে পাচ্ছি, নিনা!

ভুরু কুঁচকে রাফায়লার দিকে চাইল নিনা ভিসার, ইন্টারকমের বাটন টিপল, বলুন কী ওটা, জন।

নিনা… দীর্ঘ বিরতি নিয়ে বলল প্রাইস, নিনা, আমার ভুল না হয়ে থাকলে, ওটা একটা স্পেসশিপ!

     .

বরফের দেয়ালের নীচে প্রায় চাপা পড়েছে ওটা। পুরো কালো রঙের। উইংস্প্যান নব্বই ফুট। অনেকটা উপরে উঠেছে। চকচকে ডর্সাল টেইল ফিন। আকাশযানের পিছনের অংশ ঢাকা পড়েছে বরফের প্রাচীরের নীচে। খুব পোক্ত তিনটে ল্যাণ্ডিং স্ট্রাট দেখা গেল। দারুণ সুন্দর কালো একটা আকাশযান। সাধারণ। বিমান এত অ্যারোডাইন্যামিক হয় না। জাহাজটা এতই অপূর্ব, দেখলে মনে হয় ওটার মালিক হতে পারলে আর কিছু চাওয়ার থাকত না।

পিছনে ঝপাৎ আওয়াজ হতেই চরকির মত ঘুরল জন প্রাইস। ডুবুরিরা ভেসে উঠেছে। সবার চোখ আটকে গেছে স্পেসশিপের উপর। কিন্তু তাদের পিছনের পানিতে যেন ঢিল পড়েছে, তৈরি হচ্ছে বড় একটা বৃত্ত। পানিতে ভারী কিছু পড়লে ওরকম গোলাকার ঢেউ হয়!

ঢেউ কীসের, উপর থেকে কী পড়ল? জানতে চাইল প্রাইস, হ্যানলন?

জানি না, মিস্টার প্রাইস। কিন্তু মনে হলো পাশ দিয়ে কী যেন গেল।

তার দিকে চেয়ে আছে প্রাইস, দুই সেকেণ্ড পর দেখল চোখের সামনে টুপ করে ডুবে গেল হ্যানলন।

হ্যানলন?

পরক্ষণে আরেকজন আর্তচিৎকার করে উঠল। লোকটার নাম টম সামার।

পানির ভিতর ঘুরে গেল প্রাইস, আর ঠিক তখনই এক পলকের জন্য দেখতে পেল চকচকে কালো একটা পিঠ। বিশাল কোনও প্রাণী, সারফেস ভেদ করে উঠে এসেছে, তারপর বিপুল ওজন নিয়ে ঝপাস করে পড়ল পানিতে। টম সামারের বুকের উপর চেপে বসেছে ওটা, পরক্ষণে তাকে নিয়ে তলিয়ে গেল।

এক সেকেণ্ড পর উন্মাদ হয়ে উঠল জন প্রাইস, যে করে হোক তীরে গিয়ে উঠতে হবে! পুলের সারফেসের নীচে মাথা তলিয়ে যেতেই অদ্ভুত কিছু আওয়াজ পেল। খুব জোরে শব্দ হচ্ছে। শুরু হয়েছে তীক্ষ্ণ চিৎকার। কর্কশ ধ্বনি ছাড়ছে কী যেন। সেই সঙ্গে কুকুরের ডাকের মত ঘেউ-ঘেউ গর্জন!

দ্বিতীয়বার যখন সারফেসে ভেসে উঠল প্রাইস, পুকুরের হিম-শীতল দেয়াল দেখতে পেল। সারফেস থেকে একটু উপরে, সামনে বিশাল এক গর্ত। ওই জিনিস আগেও দেখেছে সে, বরফের সুড়ঙ্গে, পানির নীচে।

তারপর হঠাৎ করেই একটা গর্ত থেকে কী যেন বেরিয়ে এল!

হায় যিশু! ফিসফিস করে বলল প্রাইস।

    .

ইণ্টাকমে ভেসে এল একের পর এক আর্তচিৎকার। আইস স্টেশনের রেডিয়ো রুমে ভীষণ চমকে গেছে নিনা ভিসার, চোখ পড়ে আছে কঙ্গোলের উপর। ওর পাশে বসে আছে রাফায়লা, এক হাতে চেপে ধরেছে মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে চেহারা। দেয়ালের স্পিকারে ভেসে আসছে একের পর এক করুণ আর্তনাদ ও ভয়ার্ত চেঁচামেচি।

জনসন!

ওকে নিয়ে গেছে!

হায় ঈশ্বর! নাহ!

যিশু, ওই দেয়াল থেকে… ওই দেয়াল থেকেই আসছে ওগুলো!

তারপর হঠাৎ জন প্রাইসের কণ্ঠ শোনা গেল; সবাই পানি থেকে উঠে যাও! পানি থেকে উঠে যাও!

আরেকটা আর্তচিৎকার ভেসে এল। পরক্ষণে আরেকটা। মাইক্রোফোন চেপে ধরল নিনা। মিস্টার প্রাইস! প্রাইস! কথা বলুন!

ইন্টারকমে কর্কশ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল প্রাইস, দ্রুত বলে চলেছে, তার ফাঁকে হাঁসফাস করছে: নিনা… শালার কপাল… আমি ওগুলোকে দেখছি না। আমাদের কেউ নেই। ওদের টেনে নিয়ে গেছে… বিরতি দিল প্রাইস, কয়েক সেকেণ্ড পর বলল, হায় যিশু। নিনা… সাহায্য চেয়ে রেডিয়ো করো। সবাইকে জানাও আমাদের সাহায্য দরকার…

পরক্ষণে ইন্টারকমে ভেসে এল কাঁচ ভাঙবার আওয়াজ। দীর্ঘ কয়েক মুহূর্ত পেরিয়ে গেল, আর যোগাযোগ করল না জন প্রাইস।

নতুন করে রেডিয়োর মাইক্রোফোনে বলতে শুরু করল রাফায়লা: গডস সেক, কেউ সাড়া দিন! দিস ইয ফোর-ওয়ানএইট স্টেশন, রিকোয়েস্টিং ইমিডিয়েট অ্যাস্টিস্ট্যান্স! আবারও বলছি, এটা ফোর-ওয়ান-এইট স্টেশন! আমাদের বেশ কয়েকজন পাতাল গুহার ভিতর মারা পড়েছে। আপনারা কেউ কি শুনতে পাচ্ছেন? দয়া করে সাড়া দিন! আমাদের ডাইভাররা… হায় যিশু… আমাদের ডাইভাররা বলেছে পাতাল গুহার ভিতর ওটা একটা স্পেসশিপ! ওদের উপর হামলা করেছে কারা যেন! আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন! পানির নীচে মেরে ফেলছে ওদেরকে!

কারও কাছ থেকে কোনও সাড়া পেল না উইলকক্স আইস স্টেশনের কেউ। বৃথা হলো ডিসট্রেস সিগনাল পাঠানো। কেউ কোনও জবাব দিল না।

কিন্তু আসলে অন্তত তিনটি রেডিয়ো ইন্সটলেশন থেকে শোনা গেছে রাফায়লার জরুরি বার্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *