৮. ঘটনাটা বিশ্বাস করতে পারছে না

ঘটনাটা বিশ্বাস করতে পারছে না মরগান। নিশ্চিত জানে কোন সূত্র রেখে আসেনি ও, তবু ঠিক ঠিক হাজির হয়েছে ওরা।

কি বলেছ ওদের? জানতে চাইল ও।

বলেছি বেরিয়ে গেছ তুমি। ওরা জানতে চেয়েছিল কোথায় যেতে পারো, এখানে থাকছ কেন। উত্তরগুলো শুনে সন্তুষ্ট হয়নি কেউ। কাউকে এখানে রাখার জন্যে পরামর্শ দিচ্ছিল একজন। অন্যরা প্রস্তাবটা মানেনি বলে রক্ষা, নয়তো। একেবারে পিস্তলের মুখে এসে পড়তে। সন্ত্রস্ত মনে হয়েছে লোকগুলোকে, বোধহয় আলাদাভাবে তোমার সামনে পড়ার ইচ্ছে নেই কারও।

কোন্ দিকে গেছে?

জেসন’স কর্নারে ঢুকতে দেখেছি। সম্ভবত ওখানেই আছে এখন, যদি পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে না থাকে।

ঘোড়াটা?

তৈরি আছে। নিয়ে আসব?

উত্তর দিল না মরগান,, ভাবছে। পেছনের স্টল থেকে সোরেলটাকে নিয়ে আসতে পাওনা মিটিয়ে দিল ও।

ওরা কারা? মনে হচ্ছে চেনো তুমি। ওদের সাথে তোমার সম্পর্কটা কি?

পুরানো শক্রতা।

বাছা, তোমার দেখছি শত্রুর অভাব নেই। এভাবে বেঁচে থাকা খুব কঠিন। এত শত্রু নিয়ে কি করে টিকে আছ, এটাই বেশি বিস্মিত করছে আমাকে। তুমি

কে, মরগান? উঁহু, চলনসই একটা উত্তরে আমাকে সন্তুষ্ট করতে পারবে না।

ওটাই আমার নাম, নিস্পৃহ সুরে বলল মরগান

অনেকক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল বুড়ো। বোঝার চেষ্টা করল মরগান মিথ্যে বলেছে কি-না। কি বুঝল কেবল সে-ই জানে, ঘুরে চলে গেল নিজের কামরায়। অ্যাডিওস, মরগান। আশা করি আবার দেখা হবে।

কাঁধ উঁচিয়ে অসহায় ভঙ্গি করল মরগান, মাথায় হ্যাট চাপিয়ে বেরিয়ে এল। আস্তাবল থেকে। সেলুনের হৈ-হল্লা কানে আসছে। মূল রাস্তাটা প্রায় জনশূন্য। স্যাডলে চেপে উত্তরে এগোল ও। ডানের গলিতে ঢুকে দুতিনটে বাড়ি পেরিয়ে খোলা জায়গা হয়ে ফের ডানে মোড় নিয়ে আস্তাবলের পেছনে চলে এল। স্যাডল ছেড়ে ঘোড়ার ঘাড়ে হাত বুলাল। এখানেই থাকিস, বাছা, ফিসফিস করে বলল ও।

পেছনের দরজা খুলে গেল। আধো অন্ধকারে হসল্যারের ভীত চোখজোড়া দেখল ও।

সমস্যায় পড়েছ নাকি? দ্রুত জানতে চাইল বুড়ো।

ভেতরে ঢুকে দরজা ভিড়িয়ে দিল মরগান। পকেট থেকে পঞ্চাশ ডলারের একটা মোট বের করে এগিয়ে দিল। দয়া করে এই কাজটা করে দাও। ওদেরকে গিয়ে বলো এখানেই আছি আমি।

সেধে ধরা দিতে চাইছ?

তামাক-কাগজ বের করে সিগারেট রোল করল ও। ভেবে দেখলাম ঝামেলা মিটিয়ে ফেলাই উচিত। তিনটে লোককে পেছন পেছন নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে নেই আমার। সেক্ষেত্রে আগ বাড়িয়ে আমারই ওদের মুখোমুখি হওয়া উচিত। ওরা তো লড়াই চায়, তাই না? আর আমিও সহজে ধরা দেব না। যদি পারে শ্রাগ করল ও, জিভ সহযোগে কাগজের শুকনো আঠায় ভিজিয়ে সিগারেট তৈরি করল।

ভেবে বলছ?

এরকম ছোটাছুটি ভাল লাগছে না আর। নিশ্চিন্তে এই শহর থেকে বেরুব নয়তো এখানকার বুটহিলে একটা জায়গা নেব।

স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল হসল্যার। শ্রাগ করে বেরিয়ে গেল এরপর।

ওদের সাথে তুমি নিজে এসো না আবার। কিছুক্ষণ অন্য কোথাও কাটিয়ে দাও।

সিগারেট ধরিয়ে আয়েশ করে টানতে শুরু করল মরগান। নিকট ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছে না। হাড়ে হাড়ে তিনটেকেই চেনে ও, মিসৌরির দিকে রওনা দিলেও আঠার মত পেছনে লেগে থাকবে ওরা, নরক পর্যন্ত ধাওয়া করবে। তারচেয়ে এখানে…একটু বাড়তি সুবিধে পাবে ও। ওরা জানে না তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছে মরগান। ভয় কেবল অ্যাবল টেনারিকে নিয়ে, প্রথম সুযোগে লোকটাকে কুপোকাত করতে না পারলে খারাবি আছে ওর কপালে।

ঠিক বিশ মিনিট পর বাইরে লোকজনের সাড়া পেল ও। দ্রুত, নিঃশব্দে একপাশে সরে এল মরগান, পেছনের কামরার দরজার কাছে এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়াল যাতে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি, মূল দরজা এবং অফিসরুমটা কাভার করতে পারে। হাতে দুটো পিস্তলই বেরিয়ে এসেছে। জানে ওকে দেখামাত্র গুলি করবে প্রতিপক্ষ। অ্যাবল টেনারিকে ভাল করেই চেনে, কথা বলার আগে গুলি ছেড়ে এ ভাড়াটে গানম্যান।

একসাথে দু’জন ঢুকল, দ্রুত ও নিঃশব্দে। দশাসই শরীর দেখে চেনা গেল অ্যাবল টেনারিকে। চোখের পলকে ভেতরে ঢুকে পড়ল সে, দরজার একপাশে দাড়িয়ে তাকে কাভার করছে অন্যজন। স্থির দাঁড়িয়ে থাকল টেনারি, ইন্দ্রিয়গুলোকে সজাগ করে তুলেছে পুরোপুরি। মরগানও তাই করেছে, এবং নিঃশ্বাস চেপে দাঁড়িয়ে আছে। বুকে আশঙ্কা হয়তো ওর অবস্থান আঁচ করে ফেলবে টেনারি, আন্দাজের ওপর গুলি শুরু করবে। একসঙ্গে দুজনকে সামলানো কঠিন হবে, যদি একজনকে বেচাল করা যায়, কিংবা খানিকটা অমনোযোগী করা যায়…নিদেনপক্ষে লাইন অভ ফায়ার থেকে যদি সরিয়ে দেয়া যায়-ওর সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়ত। তিন নম্বরটা কোথায়? বাইরে রেখে এসেছে, না পেছনের দরজা দিয়ে ঢোকার পায়তারা করছে ব্যাটা?

লণ্ঠনের আবছা আলোয় অশরীরীর মত মনে হচ্ছে বিশালদেহী টেনারিকে। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে এখনও। ফোঁস করে নিঃশ্বাস ছাড়ল, সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে-ওপরের তলায় আছে মরগান। চোখে পড়ে না, সঙ্গীর উদ্দেশে আলতোভাবে হাত নেড়ে ইঙ্গিত করল সে, হোলস্টার থেকে একটা পিস্তল তুলে সিঁড়ির দিকে এগোল। মরগানের দিকে পিছন ফিরে আছে এখন।

তার ছোট্ট এ ভুলটাই বাঁচিয়ে দিল মরগানকে।

তৃতীয় লোকটির অস্তিত্বের কথা ভুলে গেল ও, আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। মোক্ষম সময়-টেনারির মনোযোগ এখন ওপরের তলায়, আর কাভার দেয়া লোকটার মনোযোগ সিঁড়ির আশপাশে। কোন কিছু বলার আগেই দরজায় দাঁড়ানো লোকটাকে গুলি করল মরগান, দুটো পিস্তল থেকে একসঙ্গে। গুলির। ধাক্কায় দেয়ালের সাথে মিশে গেল লোকটার দেহ। কমলা আগুন ওগরাল হাতের পিস্তল, ছাদে গিয়ে বিধল গুলিটা।

চরকির মত ঘুরল অ্যারল টেনারি। মাঝপথে তাকে গুলি করল মরগান, ঘূর্ণন কিছুটা শ্লথ হয়ে গেল। পড়ন্ত অবস্থায় তীব্র গাল বল গানম্যান; কিন্তু বিরতি নেই গুলি চালানোয়, নিশানা ছাড়াই সমানে গুলি করছে। মেঝেয় পড়ার পর শেষ চেষ্টা করল সে, নির্দ্বিধায় তার কপালে একটা সীসা পাঠিয়ে দিল মরগান।

চটজলদি পাশে সরে গেল মরগান। বাম হাতের পিস্তল কোমরে গুঁজে অন্য পিস্তলে টোটা ভরতে শুরু করল, দরজার ওপর চোখ। জানে আরও একজন আছে। পিস্তল রিলোড করেছে, এসময়ে দরজায় দেখা গেল তাকে। খানিকটা অপ্রস্তুত অবস্থায় ওকে পেয়ে গেল লোকটা। শীর্ণ হাতে ভয়াল দর্শন কোল্টটাকে বেমানান লাগছে। সিঁড়ির দিকে তাক করা ছিল কোল্ট, ঘুরতে শুরু করেছে মরগানের দিকে। বিপদ বুঝে ডাইভ দিল মরগান, মেঝের সাথে শরীর মিশিয়ে দিল। শিকার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে দেখে তাড়াহুড়োয় গুলি করল তালপাতার সেপাই, ফস্কে গেল। তবে মরগানেরটা ফস্কাল না। ঝাঁপ দেয়ার সময় হ্যামার টেনেছে ও, উড়ন্ত অবস্থায় গুলি করল লোকটাকে। বাহুতে গিয়ে বিধল তপ্ত সীসা। গড়ান দিয়ে সরে গেল মরগান, শোয়া অবস্থায় পরের গুলি করল।

উঠে দাঁড়াতে যেতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল ও, ডান উরুর ভেতর যেন একটা গরম রড ঢুকে গেছে। ডান দিকে তাকাতে হুঁশ ফিরল। তালপাতার সেপাইকে নিয়ে এতক্ষণ ব্যস্ত থাকায় দরজার পাশের লোকটার কথা ভুলেই গিয়েছিল। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে সে, ওই অবস্থায় গুলি করেছে। মরগান আছে বেকায়দা অবস্থায়, পড়ে যাওয়ার সময় নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। পিস্তল ধরা হাত চলে গেছে ডান পাশে। লোকটাকে গুলি করতে হলে হাতটা সামনে আনতে হবে। দেখল ফের গুলি করার চেষ্টা করছে লোকটা। অসহায় বোধ করল মরাগন, মরিয়া হয়ে উঠল। শরীরের অসহ্য যন্ত্রণা ভুলে গড়ান দিল বাম পাশে। ওর চুলে সিঁথি কেটে চলে গেল একটা গুলি, আরেকটা পাশ দিয়ে। পিস্তলধরা হাতে যখন লোকটাকে নিশানা করছে দেখল হাঁসফাস করছে ওর শিকার, ট্রিগার টানার মত শক্তিও পাচ্ছে না আর। আড়চোখে অ্যাবল টেনারি আর তালপাতার সেপাইয়ের দিকে তাকাল মরগান, নিথর পড়ে আছে ওরা।

লোকটার ওপর চোখ রেখে উঠে দাঁড়াল মরগান। পিস্তল ছেড়ে দিয়েছে সে। যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখ হাঁ করে বাতাস নিচ্ছে। ডান বুকের ফুটো থেকে রক্ত গড়াচ্ছে। লোকটার দৃষ্টিতে কেবলই ঘৃণা; মৃত্যুর ভয়, বাঁচার আকুতি কিংবা অনুতাপ কোনটাই নেই।

হিসেবে একটু ভুল হয়ে গেল, তাই না, কার্লি?

রক্তে ভরা একদলা থুথু মাটিতে ফেলল সে। জাহান্নামে যাও!

তুমি তো এ লাইনের লোক নও, কার্লি। ওই শুটকির সাথে ভিড়লে কোন লোভে? আমার স্যাডলব্যাগের টাকাগুলো, তাই না? বোধহয় জানতে না এখানেই দেখা পেয়ে যাবে, নয়তো ভেবেছ অ্যাবল টেনারি সাথে থাকলে কোন কাজই কঠিন নয়। মনে আছে, কার্লি, তিনটে বছর একসঙ্গে ছিলাম আমরা, সারা পশ্চিম চষে বেড়িয়েছি?

কার্লি টেইমসের চোখে অসহায় দৃষ্টি ফুটে উঠল এবার। হসল্যার বলেছে ওপরে আছ তুমি।

আমিই পাঠিয়েছি ওকে। আমার দুর্ভাগ্য সবার আগে তোমাকেই গুলি করতে হলো। এসবে না এলেও পারতে, কার্লি।

কি যেন বলতে চেষ্টা করল কার্লি, রক্ত বেরিয়ে এল মুখে। অসহ্য যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল মুখ, তারপর হঠাৎ করেই ক্লান্ত, ফ্যাকাসে দেখাল। এখানে আয়রন হক আছে… শেষ করতে পারল না সে।

আয়রন হক!

শীতল একটা স্রোত বয়ে গেল মরগানের মেরুদণ্ড বরাবর, দিশেহারা বোধ করল ও। ইচ্ছে হলো এখুনি ঘোড়া ছোটায় মিসৌরির দিকে। এ কদিনের লাগাতার ছোটাছুটি আর মানসিক অস্থিরতায় নিজেকে ক্লান্ত, পর্যদস্ত মনে হচ্ছে। শরীরে একটা আঘাত নিয়ে আয়রন হকের মোকাবিলা করা সহজ হবে না।

মরে যাওয়ার আগে ওকে একটা ক্ষত দিয়ে গেছে কার্লি। উরুর মাংস ভেদ করে চলে গেছে বুলেট, অনবরত রক্তক্ষরণ হচ্ছে। বহুকষ্টে শরীর টেনে নিয়ে কলের কাছে চলে এল মরগান। মেঝেয় বসে ছুরি দিয়ে কেটে ফেলল প্যান্টের অংশ। ভাগ্য ভাল এক খাবলা মাংস তুলে নিয়ে বেরিয়ে গেছে বুলেটটা, ভেতরে থাকলে বের করার ধকল এ মুহূর্তে সহ্য করতে পারত না বোধহয়। প্রচুর পানি দিয়ে ক্ষতটা পরিষ্কার করল ও, তারপর গলা থেকে ব্যানডানা খুলে পটি বাধল। এটুকু কাজ করতেই হাঁপিয়ে উঠেছে, টের পেল মরগান

নড়ার ইচ্ছে হলো না, চোখ বুজে পড়ে থাকল কিছুক্ষণ। সিগারেট রোল করল। এক লহমায় মনে পড়ে গেল অনেক কিছু-রৌদ্রোজ্জ্বল একটা দুপুরে এখানে উপস্থিত হয়েছিল ও, ঘটনাচক্রে মেলিসা বডম্যানের সাথে পরিচয়…অসাধারণ সুন্দরী এক মহিলা, যাকে পাওয়ার লোভ মরগানেরও হয়েছিল; কপট আলফ্রেড টেনিসন, অদৃশ্য কার্টার আর বেপরোয়া কিছু লোক। হন্যে হয়ে ওকে খুন করতে চাইছে এরা, নাকি স্যাডলব্যাগের টাকাগুলো পেলেই বেশি খুশি হবে? এসবের মধ্যে আয়রন হকের ভূমিকা কি?

মিথ্যে বলেনি কার্লি, এ নিয়ে বাজি ধরতে রাজি মরগান। হারিয়ে যাওয়া আয়রন হকের অস্তিত্ব এখানে কে বহন করছে, কার্টার না টেনিসন? পশ্চিমে আয়রন হক একটা অতি পরিচিত নাম। নামটা এত বেশি উচ্চারিত হয়েছে যে লোকটার আসল নামই হারিয়ে গেছে। বহু আগে কলোরাডো, টেক্সাস আর মিসৌরির আশপাশে শোনা যেত ওর নাম। ডুয়েলে অনেক বিখ্যাত গানম্যানকে ধরাশায়ী করেছে সে-জেফরি লোগান, প্যাট সিমন্স, ইয়্যাট অ্যাপি, লো অ্যালেন…এদেরকে হটিয়ে দিয়েই তার পরিচিতি। একসময় বাউন্টি শিকারী। হিসেবে খুব নাম করেছিল, ওয়েলস ফারগোর স্টেজগার্ডের চাকুরি করেছে দুই বছর। কিন্তু ডাকাতিতে সাহায্য করার অজুহাতে চাকুরি হারায় সে। তারপর শেষবার, অ্যাবিলিনে ক্র্যাফটার আর ফ্ল্যাগানদের পারিবারিক যুদ্ধে দেখা যায় তাকে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই লাপাত্তা হয়ে যায় আয়রন হক। অনেকের ধারণা ওই যুদ্ধে মারা পড়েছিল কিংবদন্তীর এই বন্দুকবাজ।

অসাধারণ ক্ষিপ্রতা, নিখুঁত লক্ষ্যভেদ আর অপরিসীম ধৈর্য-এ তিনটি জিনিসের সমন্বয়ের নাম, আয়রন হক। তার সম্পর্কে অসংখ্য গল্প চালু ছিল একসময়, আসল লোকটা গায়েব হয়ে যাওয়ায় সেসব গল্পও পরে হারিয়ে গেছে। বরাবরই নিজেকে আড়াল করতে চেয়েছে এ গানম্যান, এবং সফলও হয়েছে। ছয়-সাত বছর তার হদিশ পায়নি কেউ, এবং সে নিজেও আড়াল থেকে বেরিয়ে আসেনি।

এখানে, ক্যাসল টাউনেও স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হবে না সে, জানে মরগান। সবকিছুর পেছনে রয়েছে ওই লোকটাই। খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করতে হবে তাকে।

বুড়ো হসল্যারের হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসার শব্দে বাস্তবে ফিরে এল মরগান। ওকে দেখে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল যেন। খোদার কসম, আমার ধারণাতেও আসেনি তোমাকে জীবিত দেখব! ওরা তিনজন… কথা শেষ না করে এগিয়ে এল সে, পরখ করল ওর জখম। ডাক্তারের কাছে যাওয়া দরকার। ওঠো, ওপরে পৌঁছে দেই তোমাকে। তারপর ডককে নিয়ে আসব এখানে।

বুড়োর সহায়তায় উঠে দাঁড়াল মরগান। পেছনের দরজায় পৌঁছে দাও আমাকে। স্যাডলে চাপব! অধৈর্য স্বরে বলল ও।

কি বলছ! এই অবস্থায় স্যাডিলে চাপার ধকল সইবে না তোমার। কথা না শুনলে জোর করে নিয়ে যাব। এখন বোধহয় আমার সাথে শক্তিতে কুলিয়ে উঠতে পারবে না। সহাস্যে হাত বাড়িয়ে দিল সে। বুড়োর কাঁধে ভর করে সিঁড়ির দিকে এগোল মরগান। টের পেল আসলেই দুর্বল বোধ করছে। হসল্যারের সাহায্য ছাড়া বোধহয় দশ-কদমও এগোতে পারত না।

প্রথম যখন এখানে এসেছিল, পাঁচটা মিনিটও ক্যাসল টাউনে থাকার ইচ্ছে ছিল না ওর, কিন্তু অন্তত একটা সপ্তাহ বাধ্য হয়ে থাকতে হয়েছে। কার্লি টেইমসের ক্ষত তার সাথে আরও চার দিন যোগ করল, নিতান্ত অনিচ্ছায় শুয়ে বসে দিনগুলো কাটিয়ে দিল জেমস মরগান

একসময় বিরক্ত হয়ে পড়ল ও। একরাশ দুশ্চিন্তা আর আশঙ্কা নিয়ে এভাবে বসে থাকতে ভাল লাগছে না। কাজ ছাড়া অযথা পাচটা মিনিটও কখনও কোথাও বসে থাকেনি ও। হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকার কথাও নয় এখন। যে কোন মুহূর্তে এখানে উপস্থিত হতে পারে আরেকটা দল, এসব ক্ষেত্রে এমনই হয়-এক দলের ওপর ভরসা রাখে না কেউ। অন্তত জেমস মরগানের ক্ষেত্রে এটা ঠিক।

একেকটা দিন গড়ানোর সাথে সাথে মরগানের অস্থিরতা কেবল বাড়ছেই। নিজেকে অসহায়ও মনে হচ্ছে। এতদিনে মিসৌরি পৌঁছে যাওয়ার কথা ওর, তাহলে টেনারি বা তার মত কেউ নাগাল পেত না। অথচ বোকার মত জড়িয়ে পড়েছে এখানে, যেখানে বিন্দুমাত্র স্বার্থ নেই ওর, বরং প্রতি মুহূর্তে পৈত্রিক প্রাণের ঝুঁকি কেবল বাড়ছেই। বারবার ভাগ্যের সহায়তা পাবে না। সবচেয়ে বড় কথা অস্থির এ পশ্চিমে হাজারো বন্দুকবাজের মধ্যে ওর চেয়ে সেরা লোক নেই, কে বলতে পারে? বন্দুকবাজ সাধারণত বন্দুকের গুলিতেই মরে।

নিজের এ জীবনকে ঘৃণা করে মরগান। কিন্তু পালানোর বা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় জানা নেই ওর। অনেক ঘটনার ওপরই কারও হাত থাকে না। এখানে যেমন হয়েছে, ওর সহজাত প্রবৃত্তিই মেলিসা বডম্যানকে বখাটে লোকের হাত থেকে উদ্ধার করেছে। তাতেই বিপত্তির শুরু। নইলে যে শান্তিপ্রিয় জীবনের হাতছানি দেখছিল ওর মন, মিসৌরি গিয়ে হয়তো এতদিনে তার প্রাথমিক কাজ শুরুও করতে পারত।

এ ঝামেলাটা অচিরেই শেষ করতে চায় মরগান। নির্জন প্রেয়ারির অনন্ত দিগন্ত হাতছানি দিচ্ছে ওকে, রুক্ষ ট্রেইল ধরে ছুটে যেতে চাইছে মন। কিন্তু জেদ আর পরিস্থিতি আটকে রাখছে ওকে। যার কারণে এতকিছু তাকে ছেড়ে দেয়ার মত মানুষ জেমস মরগান নয়। যারা ওকে চেনে, জানে ভাঙবে তবু মচকাবে না ও। একবার যা মনস্থির করে, সেটা করে ছাড়ে।

পঞ্চম দিন সকালে নিচে নেমে এল ও। কোন জড়তা নেই, কেবল খানিকটা আড়ষ্ট ভাব। জানে একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে। হসল্যারের কামরায় চলে এল।

স্টোভে কফির পানি চড়িয়েছিল বুড়ো, পদশব্দেও ফিরে তাকাল না। মরগান, একটা সিগারেট তৈরি করে দাও তো, আমার তামাক শেষ হয়ে গেছে, অনুরোধ করল সে।

কফির বিনিময়ে দেয়া যেতে পারে, একটা চেয়ারে বসে সিগারেট রোল করা শুরু করল মরগান। অদ্ভুত ব্যাপার, এখনও তোমার নামই জানা হলো না, অথচ দুটো সপ্তাহ তোমার ওপর ভূতের মত চেপে আছি।

আমিও কি তোমার নাম জানি?

বিষম খেল মরগান, তবে দ্রুতই সামলে নিল। না জানলেই ভাল, খানিক ভেবে বলল ও। নামটা হয়তো ভাল লাগবে না তোমার। তারচেয়ে জেমস মরগান নামটা কি চলনসই নয়? কাজ চললেই হলো।

হ্যাঁ, কাজ অবশ্য কোন নাম ছাড়াও চলতে পারে। আমার বেলায় ঘটল যেমন, আমার নাম জানো না তুমি।

তোমার ব্যাপারে কাউকে জিজ্ঞেস করিনি আমি, তোমার কাছেও জানতে চাইনি।

আমিও জানাইনি, কফি পরিবেশন করার সময় বলল হসল্যার। ঘরের ওপাশ থেকে একটা চেয়ার এনে ওর সামনে বসল। হাঁপিয়ে উঠেছ?

উত্তর না দিয়ে কফিতে চুমুক দিল মরগান

এখানে কেন পড়ে আছ ঠিক বুঝতে পারছি না। চলে গেলেই বেশি মানাত তোমাকে, আর এত ঝামেলাও হত না। যদূর বুঝেছি অনেক দূর থেকে এসেছ তুমি এবং ওই লিকলিকে লোকটাসহ তিনজন তোমার গন্ধ শুকে শুকে এখানে হাজির হয়েছিল। মরগান, কিসের জন্যে, তোমার পিছু লেগেছে ওরা? আর সবাইকে নিজের চাদমুখ দেখানোর জন্যে তুমিও যেন পণ করে বসে আছ, অথচ ভেতরে ভেতরে গন্তব্যে পৌঁছা’নোর জন্যেও অস্থির।

আমার মতই শত্রুকে কখনও ক্ষমা করে না ওরা, কোন অবস্থাতেই না।

অন্য কারও জন্যে অপেক্ষা করছ?

তা নয়, আসলে বুঝতে পারছি না ঠিক কে আমাকে কোণঠাসা করতে চাইছে। হতে পারে কার্টার, কিংবা টেনিসন

কিন্তু এ পর্যন্ত যত লোক মারা গেছে; তাদের কেউই বক্স-টির ক্রু নয়, বরং কার্টারের আউটফিটের হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

টেনিসনের সব লোককে চেনো তুমি?

বেশিরভাগ

ওদের মধ্যে এমন কেউ আছে যাকে অন্তত গত এক সপ্তাহ দেখোনি?

ওরা তো মাত্র একদিন আসে শহরে, পে-ডেতে। গত শনিবারে ঠিকমত খেয়াল করিনি। আস্তাবলে ঘোড়া রাখে না ওরা, বেশিরভাগ ক্রু সেলুনের হিচিং রেইল ব্যবহার করে।

হতাশ হলো না মরগান, তেমন কিছু আশাও করেনি। আয়রন হকের নাম শুনেছ?

বোধহয় ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে হকিন্সের কথাই জানতে চাইছ?

শুধু হকিন্স, আর কিছু না? উত্তেজিত হয়ে পড়ল মরগান, নিজের ওপর রাগও হচ্ছে। আয়রন হক শুধুমাত্র একটা উপাধি, দৃঢ়তা আর জেদী স্বভাবের জন্যে এ নামে খ্যাতি পেয়েছে সে। আগেই বোঝা উচিত ছিল নামটা হকিন্স থেকে এসেছে, অথচ ঘুণাক্ষরেও সম্ভাবনাটা আসেনি ওর মাথায়।

দুঃখিত, মরগান, বাকিটুকু জানি না। কিন্তু ওর কথা জিজ্ঞেস করছ কেন? সে তো বহু দিন নিখোঁজ। অনেকের ধারণা সত্যিই অ্যাবিলিনের যুদ্ধে মারা গেছে ও। আমার তো মনে হয় না নিজেকে আড়ালে রাখতে পেরেছে অসাধারণ এ লোকটা।

ক্যাসল টাউনের আশপাশেই আছে ওই লোক, হেসে বলল মরগান

লাফিয়ে উঠল বুড়ো, মেঝেয় পড়ে গেছে ঠোঁটের সিগারেট। কি বলছ! এখানে…এখানে আছে আয়রন হক!? কার পরিচয়ে?

যে কেউ হতে পারে। আমিও হতে পারি।

বোধহয় তামাশা করছ তুমি! বিহ্বল দেখাল বুড়োকে।

উঠে গিয়ে খালি মগ ভরে নিল মরগান। মোটেই ঠাট্টা করছি না। এখানে এমন এক পরিচয় ওর, যার সাথে আসলেই কোন সম্পর্ক নেই। কার্টার হতে পারে, আবার টেনিসনও হতে পারে। তবে কার্টারের সম্ভাবনাই বেশি।

কার্টারকে চিনি না আমি, কখনও দেখিওনি। আর টেনিসন কখনোই পিস্তল ঝোলায় না। ওকে দেখে বরং পাকা গরু ব্যবসায়ী মনে হয়। এখানে এসে তাই প্রমাণ করেছে ও। নিজের জমিতে ঘাস নেই, তবু ফ্রি রেঞ্জের সুবিধা নিয়ে সবচেয়ে বড় স্টক গড়ে তুলেছে। লোকটা জানে কি করে উন্নতি করতে হয়! মেঝেয় পড়ে যাওয়া সিগারেট নিভে গিয়েছিল, থেমে ফের ধরাল হসল্যার। অবশ্য ওর সম্পর্কে গুজব আছে, সে নাকি রাসলারদের নেতা। কিন্তু প্রমাণ করতে পারেনি কেউ। ম্যাকলয়ারীরা দোষারোপ করেছিল ওকে, দুদিন আগে ওদেরকে গুড়িয়ে দিয়ে দেশছাড়া করেছে টেনিসন। ডেভিড ম্যাকলয়ারী অবশ্য বেঁচে গেছে এ যাত্রা, পণ করেছে ফিরে আসবে সে, কড়ায়-গণ্ডায় শোধ নেবে।

গিয়ে দেখো ট্রেইলের কোথাও পড়ে আছে ওর লাশ। টেনিসন ওকে অ্যাম্বুশ করলে একটুও অবাক হব না।

তুমি শুধু ধারণাই করছ।

হয়তো দুদিন পর জানবে ধারণাটা মিথ্যে নয়। উঠে দাঁড়াল মরগান। কফির জন্যে ধন্যবাদ।

বেরুবে নাকি?

চারপাশে চক্কর দিয়ে আসি। বসে থেকে শরীরে খিল ধরে গেছে।

ফ্ল্যাগ-বিতে? হাসছে বুড়ো, চোখে কৌতুক। 

শ্রাগ করে ঘোড়ার কাছে এল মরগান। একটু পর স্যাডলে চেপে রাস্তায় বেরিয়ে এল। কোথায় যারে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না, একবার ভাবল নির্জন। প্রেয়ারি ধরে ঘোড়া ঘোটায়। আবিষ্কার করল ফ্ল্যাগ-বি বাথানের ট্রেইল ধরে এগোচ্ছে। শহরের ট্রেইল এড়িয়ে কয়েকদিন আগে যেটা ধরে গিয়েছিল। বাথানটার উদ্দেশে আড়াআড়িভাবে ঘোড়া ছোটাল, কিছু সময় তো বাঁচবেই। তবে কাজটা সহজ হলো না, মরগানের কেবলই মনে হচ্ছিল হয়তো পথ ভুল করবে। একমাত্র দিক নির্দেশনা ছিল দিগন্তের কাছে ক্যালটুপ মাউন্টেনের আবছা অবয়ব। জানে এর কোলেই ফ্ল্যাগ-বি র‍্যাঞ্চ-হাউস। সোজাসুজি যেতে থাকলে একসময় পৌঁছে যাবে।

ঘণ্টাখানেক পর গন্তব্যে পৌঁছল ও। র‍্যাঞ্চ হাউসটা তখন প্রায় জনশূন্য। পাশের স্টেবল খালি, শুধু একটা গ্রুলা আছে। সব পাঞ্চাররা কাজে বেরিয়ে গেছে, ধারণা করল মরগান। বোধহয় মেলিসা বডম্যানও বেরিয়েছে।

বারান্দায় দাঁড়ানো ক্লীভ অ্যালেন উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাল ওকে। ভেতরে এসো, কফি খাবে।

মাথা নাড়ল মরগান। মিস বডম্যানের কাছে এসেছিলাম, বোধহয় নেই ও?

দু’মাইল পুবে নদীর কাছে পাবে ওকে। কয়েকটা গরু পানি খেতে গিয়ে কাদায় আটকে গেছে। ওগুলোকে তুলে আনার কাজ তদারক করতে গেছে মেলিসা

আরও বেশ খানিকটা পথ পাড়ি দেয়ার আগে কফি হলে মন্দ হয় না-ভেবে স্যাডল ত্যাগ করল মরগান। কৃকের পিছু নিয়ে খাবার ঘরে এসে বসল। বোধহয় বডম্যানদের সাথে অনেকদিন আছ তুমি? টেনেসিতেও ছিলে, তাই না?

ওখানেই আমার জন্ম, গর্বভরে উত্তর দিল কুক।

টেনিসনকে তো চিনতে, কেমন মানুষ ও?

ভাল-মন্দে মেশাল, অন্তত এখন। যদিও ওকে পছন্দ হয় না আমার। কথাটা অবশ্য ওর সামনাসামনি বলার সাহস হবে না।

হাসল মরগান। ভয় পাও ওকে?

একসঙ্গে দু’জন লোককে পিটিয়ে প্রায় লাশ বানাতে দেখেছি ওকে। লোকটা। অসম্ভব জেদী, তাছাড়া…’

কুক থেমে যাওয়ায় চোখে প্রশ্ন নিয়ে তাকাল ও।

কিছু না বলে কফি পরিবেশন করল সে। চুমুক দিল মরগান। হকিন্স কে, জানো?

ওটা তো টেনিসনের নামের মাঝের অংশ।

কিছুটা বিস্মিত হলো মরগান। নামের মাঝের অংশ নিয়ে দেশজোড়া পরিচিতির ঘটনা বোধহয় একমাত্র এটাই। তা-ও পরিবর্তিত। আয়রন হক নামটার আড়াল থেকে টেনিসন এমনকি হকিন্সটুকু বের করাও দুঃসাধ্য। এটা সম্ভব হয়েছে পেশাগত কারণে লোকটার গোপনীয়তা রক্ষার কারণে। খ্যাতির চূড়ায় সে উঠেছে ঠিকই, কিন্তু সেইসাথে নিজেকে আড়াল করতে পেরেছে। মরগান ধারণা করল টেনিসন আর আয়রন হক যে একই ব্যক্তি তা হয়তো জানেই ফ্ল্যাগ-বি কুক

অনেকগুলো প্রশ্ন দোলা দিচ্ছে ওর মনে। ওকে মিথ্যে বলেছে মেলিসা! বলেছে হকিন্সকে চেনে না, টেনিসনের নির্দেশে করেছে কাজটা? লোকটাকে ভয় পায় মেয়েটি, অথচ টেনিসনের বাথানে একটা রাতও কাটিয়েছে। লোকটির সাথে ওর সম্পর্ক কি?

অজান্তে শ্রাগ করল মরগান। মেলিসা বডম্যানের ব্যাপারে কিছু আসে-যায় না ওর। এ মুহূর্তে টেনিসনের চেয়ে এ মেয়েটিকেই বেশি রহস্যময় মনে হচ্ছে।

কিছুটা নিরাশ হলো ও। মেলিসার সাথে শেষবারের মত কথা বলতে চেয়েছিল, কিন্তু আগ্রহ বোধ করছে না আর। তাছাড়া যা জানার দরকার ছিল, ইতোমধ্যে জেনে ফেলেছে। এখন কেবল শেষ মুহূর্তের অপেক্ষা। টেনিসনের টুটি চেপে ধরবে ও, হোক সে আয়রন হক। ওসবে পাত্তা দেয় না মরগান। নিজের ওপর যথেষ্ট আস্থা আছে ওর। দরকার হলে লোকটার বাথানে উপস্থিত হয়ে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করবে।

তবে কার্টারের অস্তিত্ব সম্পর্কে সন্দেহ ঘুচছে না। হয়তো টেনিসনই ক্যাকটাস হিলের হাইড-আউটে কার্টার নামে আউট-লদের একটা সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। তেমন হলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।

ড্যানিকে চিনতে নাকি?

টেনিসনের ক্রুদের মধ্যে এই ছেলেটাই বেশি উদ্ধত। মাসখানেক আগে শহরে এক ভবঘুরেকে খুন করার পর থেকে মাটিতে পা ফেলছে না ছোকরা। দুই কোমরে পিস্তল ঝুলিয়ে ভাব করে যেন অসাধারণ এক বন্দুকবাজ হয়ে গেছে। টেনিসন ছাঁটাই করে দেয়ার পর আর দেখিনি।

হতে পারে পুরো ব্যাপারটাই সাজানো। ড্যানি হয়তো আসলে টেনিসনেরই লোক। নিজের ওপর থেকে সন্দেহ সরানোর জন্যে ড্যানিকে ছাটাই করেছে, ভিড়তে দিয়েছে কার্টারের দলে। আর টেনিসন স্বয়ং কার্টার হয়ে থাকলে তো কথাই নেই।

কফির জন্যে ধন্যবাদ জানিয়ে উঠে দাঁড়াল মরগান। বেরিয়ে এসে স্যাডলে চেপে শহরের ট্রেইল ধরল।

মি. মরগান? পেছন থেকে ডাকল ক্লীভ অ্যালেন।

পেছন ফিরে দেখল পোর্চে এসে দাঁড়িয়েছে কুক।

রাস্তা ভুল করছ। মেলিসার সাথে দেখা করতে হলে পুবে যেতে হবে।

পরে আরেকদিন আসব, হয়তো, কুকের বিস্মিত মুখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে। ট্রেইলের দিকে মনোযোগ দিল মরগান। মাথায় একটা পরিকল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছে। কাটারের হাইড-আউটে গেলে কেমন হয়? গণ্ডায়-গণ্ডায় তোক লেলিয়ে দিয়েছে। সে, ওর গায়ের চামড়াকে খুব সস্তা ভেবেছিল এরা। ব্যাপারটা ভাল লাগেনি ওর। একবার ওখানে ঢুকতে পারলে কার্টারের সাথে মোলাকাত হয়ে যেতে পারে। তাছাড়া লোকটার আসল পরিচয় খোঁচাচ্ছে ওকে

মরগানের ধারণা ক্যানিয়নের ওই ট্রেইল ধরে যাওয়া-আসা করে আউট-লরা। ঘুরপথে যাওয়ার চেয়ে এটাই সহজ হবে। ঝুঁকি আছে তবু ওটা ধরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল ও।

সহসাই কোন কিছুতে আলোর প্রতিফলন চোখে পড়ল ওর। এসব পরিস্থিতিতে এই প্রথম পড়েনি, তাই জানে কি করতে হবে। সহজাত প্রবৃত্তি বশে তৎপর হয়ে উঠল ও। মাথা নিচু করে স্যাডলের সাথে মিশিয়ে দিল শরীর। সেইসাথে স্পার দাবাল। ওর দ্রুততম রিফ্লেক্সের কারণে বেঁচে গেল এ যাত্রা। সশব্দে পাশ দিয়ে ছুটে গেল তপ্ত সীসা।

পূর্ণগতিতে ছুটছে সোরেলটা। চোখ তুলে আততায়ীর অবস্থান আন্দাজ করার চেষ্টা করল ও। ট্রেইল ছেড়ে লজপোল পাইনের বনে চলে এসেছে, সম্ভবত কয়েকশো গজের মধ্যে আছে লোকটা। হয়তো ডান দিকে পাথরের চাঙড়ের আড়ালে অবস্থান নিয়েছে।

স্যাডল হর্ন থেকে রাইফেল তুলে নিল ও। এসময় আবারও চেষ্টা করল লোকটা, কিন্তু এবারও ব্যর্থ হলো। হাসি পেল মরগানের, ছুটন্ত ঘোড়সওয়ারকে লাগানো সহজ ব্যাপার নয়। অথচ ঠিক তাই করতে চাইছে নোকটা। ভয় পেয়েছে সে, কাউকে অ্যাম্বুশ করতে গিয়ে ব্যর্থ হলে দুজনের সম্ভাবনা সমান-সমান হয়ে যায়। লোকটির ভয় যুক্তিসঙ্গত, কারণ পাল্টা আঘাত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মরগান-সময় ও সুযোগমত।

কাছে-ধারে পায়ের শব্দ পেল ও, একটু পর ঘোড়ার খুরের শব্দ। বামে ওর সমান্তরালে ছুটছে একটা গ্রুলা, পাইনের ফাঁক দিয়ে এক ঝলকের জন্যে দেখতে পেল। সোরেলকে ফের তাগাদা দিল ও, জানে কোথায় যাবে লোকটা। আগেই সেখানে পৌঁছে যেতে চায়। একটা জুনিপার ঝোঁপ পেরিয়ে কোণাকুণিভাবে ঘোড়া ছোটাল মরগান। ঘোড়ায় চাপতে সময় লেগেছে লোকটির, এ সময়টুকু এগিয়ে থাকতে পারবে ও। ইতোমধ্যে আততায়ীর চেয়ে অন্তত বিশ গজ এগিয়ে গেছে।

আরও কিছুটা এগোল ও, তারপর ঘোড়ার ঘাড়ে আলতো চাপড় দিল। স্টির্যাপ থেকে পা আলগা করে ঝাঁপ দিল ডান দিকে, শক্ত মাটিতে পড়ল শরীর। দুই গড়ান দিয়ে অ্যাসপেন ঝোঁপের পেছনে সরে এল। তখনও একই গতিতে ছুটে চলেছে সোরেলটা।

রাইফেল হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল মরগান, কান পাতল। নিঃশব্দ প্রকৃতির সাড়াই শোনা যাচ্ছে কেবল। খুরের শব্দ না পাওয়ায় ধারণা করল ঘোড়া ত্যাগ করেছে লোকটা, নয়তো হাঁটিয়ে নিয়ে আসছে। চারপাশে কোথায় কি আছে মনে করার চেষ্টা করল ও, ধারণা করল ঝর্নার দিকে যাচ্ছে আততায়ী। লোকটার জায়গায় ও নিজে হলেও তাই করত। কার্টারের লোক হলে এ এলাকা ভাল করে চিনবে এবং ঝর্নার ওপরের ওই উপত্যকার কথাও জানবে নিশ্চয়ই। সেই পথ ধরে নেমে আসবে লোকটি, এবং ওর কাছাকাছি আসার চেষ্টা করবে। মরগানের মত সে-ও পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ফেলেছে-এখন থেকে লড়াই হবে সেয়ানে সেয়ানে। একজন অন্যজনকে খুঁজবে, বাগে পেলে হত্যা করবে।

মাটির সাথে শরীর মিশিয়ে দিয়ে ক্রল করে এগোল ও। এগোনোর সময় দু’হাতের ওপর পুরো শরীরের ভার পড়ছে। কান দুটো সজাগ ওর, যে কোন অস্বাভাবিক শব্দ শোনার আশায় সজাগ-ঘাসের ওপর দিয়ে হাত-পা হেঁচড়ে নেয়ার কিংবা ছোট্ট একটা নুড়িপাথর গড়ানোর শব্দ-যাতে আততায়ীর অবস্থান জানা যাবে। উল্টোটা যাতে না ঘটে, পুরোমাত্রায় সচেতন ও। সারাটা বছর ট্রেইলে কাটে ওর, অনেক বিপদ আর বিরূপ পরিস্থিতি সামাল দেয়ার অভিজ্ঞতার কারণে ভাল করেই জানে কি করে নিঃশব্দে চলতে হয়।

সময় গড়ানোর সাথে সাথে উদ্বেগ বাড়ছে ওর, ঘামছে দরদর করে। জানে অবস্থাটা যে কোন দিকে গড়াতে পারে, হয়তো হঠাৎ করে মুখোমুখি হয়ে পড়বে দু’জন, নয়তো ঠিক ওর পেছনে গিয়ে পৌঁছতে পারে লোকটা। এরপর কি হবে ভাবতেই গলা শুকিয়ে আসছে। মনে মনে নিজের ভাগ্যকে গাল দিল, কি অলক্ষুণেই না ক্যাসল টাউনে এসেছিল, থামার সিদ্ধান্ত নিয়ে কি চরম বোকামি করেছে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে এখন। এরকম অস্বস্তিকর আর বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আর পড়েছে কি-না মনে করতে পারল না-একগাদা লোক হন্যে হয়ে খুঁজেছে ওকে অথচ এদের কাউকেই চেনে না। কেবল অন্ধের মত লড়াই করা, আগাম কিছু বোঝার উপায় নেই, যৎ কালে তৎ বিবেচনা। এরকম কোণঠাসা হয়ে লড়াই করা মোটেও সহজ নয়। পশ্চিমে টিকে থাকার জন্যে যোগ্যতমদের একজন বলে এখনও টিকে আছে মরগান।

এমন একটা জায়গায় এসে পড়েছে ও যেটা ঝর্নার একেবারে কাছেই। পাশে ঘন জুনিপার ঝোঁপ আর ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা অনেকগুলো বোল্ডার। লজপোল পাইনের গাছগুলো কেবল নিরবিচ্ছিন্ন ছায়াই দেয়নি, আবছা অন্ধকারময় পরিবেশও সৃষ্টি করেছে। কিছু ক্যাকটাস আর জুনিপার পেরিয়ে এল মরগান, ধারণা করল সামনে কোথাও খোলা জায়গা আছে। একটা বোল্ডারের আড়ালে এসে নজর বুলাল চারপাশে, দশ হাত দূরে নিরেট পাথরের সারি, ওখানে পৌঁছতে পারলে সুবিধে পাবে।

ধৈর্য ধরে পড়ে থাকল ও, বিন্দুমাত্র নড়াচড়া করছে না। ধূমপান করার তীব্র ইচ্ছেটাকে গলা টিপে হত্যা করল। বারবার মনোযোগ সরে যেতে চাইছে ওর, কিন্তু জোর করে ধরে রেখেছে। ক্ষণিকের একটা ভুল চরম বিপদ ডেকে আনতে পারে। সেটা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না। ওর কাছে কিছু টাকা আছে, এবং তা কাজে লাগিয়ে বাকি জীবন উপভোগ করতে চায় মরগান। অনর্থক বেখেয়ালে প্রাণ দিয়ে সুযোগটা হাতছাড়া করার কোন মানে হয় না।

সহসা ত্রিশ গজ দূরে এক ঝলকের জন্যে লোকটাকে দেখতে পেল মরগান। বাম দিকে একটা অ্যাসপেনের পাশে সরে পড়ছে, মুহূর্তের জন্যে, তাই ভাল করে বুঝতে পারল না ঠিক দেখেছে কি-না। নিঃসাড় পড়ে থাকল, ও, অ্যাসপেন ঝোঁপের ওপর থেকে দৃষ্টি সরাল না। মিনিট দশেক এভাবেই কাটল, তারপর একসময় বেরিয়ে এল লোকটা, অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় ওর ফেলে আসা পথের দিকে এগোল। আপনমনে হাসল মরগান, ও এতটুকু চলে এসেছে এখনও টের পায়নি। ব্যাটা। চকিতে একটা পরিকল্পনা দোলা দিল মাথায়। লোকটাকে হাতে-নাতে ধরতে হলে এরচেয়ে ভাল কিছু আর হয় না।

কোন উদ্বেগ ছাড়াই পরের আধ-ঘণ্টা কেটে গেল। লোকটার ওপর চোখ রেখেছে ও, তার প্রতিটি নড়াচড়া মানসচক্ষে দেখতে পাচ্ছে। যখন বুঝল সময় হয়েছে, নিঃশব্দে উঠে দাঁড়াল। বিশ গজ দূরের একটা বোন্ডারের আড়ালে গা ঢাকা দিয়ে আছে লোকটা। ইচ্ছে করলে তার পিঠে একটা বুলেট ঢুকিয়ে দিতে পারে মরগান। কিন্তু তা না করে রাইফেলের লেভার টানল ও। কোন চালাকি নয়, ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াও। আদেশ করল ও।

শক্ত হয়ে গেল লোকটার ঘাড়ের পেশী, এতদূর থেকেও বুঝতে পারল। মরগান। কয়েক সেকেন্ড ঠায় পড়ে রইল সে। মরগানের আশঙ্কা হলো হয়তো হঠাৎ করে গড়িয়ে পাশে সরে কিংবা উঠে দাড়ানোর পর ঘুরে গুলি করার চেষ্টা করবে লোকটা। কিন্তু কোনটাই করল না সে, ওর দিকে পিছন ফিরে উঠে দাঁড়াল। যেভাবে আছ ওভাবে থেকে আগে রাইফেলটা ছুঁড়ে ফেলল। তারপর পিস্তল। বেচাল দেখলে…’ কথা শেষ না করে অপেক্ষায় থাকল ও, লোকটা নির্দেশ পালন করতে হাঁপ ছাড়ল। এবার ঘুরে মাটিতে বসে পড়ো। উঁহু, লাফ দিয়ে লাভ নেই, তোমার কাছ থেকে অন্তত দশ হাত দূরে আছি আমি।

ঘুরে দাঁড়াল লোকটা।

ব্লু আইকে দেখে বিস্মিত হলো মরগান। দো-আঁশলার চোখে যুগপৎ হতাশা আর ঘৃণা। ওর প্রতি লোকটির বিদ্বেষের কারণ বুঝতে পারল না। পা ছড়িয়ে বোসো, হলদে শেয়াল। চাপা স্বরে নির্দেশ দিল ও।

জ্বলে উঠল ব্লু আইয়ের চোখ, ঘৃণায় বিবর্ণ হয়ে আছে মুখ। তীব্র গাল বকে পায়ের কাছে একদলা থুথু ফেলল, তারপর পা ছড়িয়ে বসল। দুর্ভাগ্য, অল্পের জন্যে গুলিটা ফস্কে গেছে। এবার তো হলো না, পরের জন্মে ঠিকই খুন করব তোমাকে! তীব্র বিদ্বেষে কথাগুলো টানা বলে গেল সে।

হাসি পেল মরগানের। গাছের গুড়ির সাথে রাইফেল ঠেস দিয়ে রেখে পকেট থেকে তামাক আর কাগজ বের করে সিগারেট তৈরির আয়োজন করল। হয়তো, হয়তো বা না। যাকগে, এটুকু নিশ্চই বুঝেছ আমাকে খুন করা তোমার সাধ্যের বাইরে? এ নিয়ে দু’বার চেষ্টা করেছ, নাকি আরও বেশি? হাল ছেড়ে দাও, সবাই সবকিছু পারে না, ওই সৌভাগ্য নিয়ে জন্মাওনি তুমি। এবার ভালয় ভালয় কিছু প্রশ্নের জবাব দাও, বেচাল কিছু করার চিন্তা কোরো না। তোমার মাথায় যদি খুনোখুনির ভূতটা এখনও থাকে তো লাফিয়ে কিংবা ছুটে এসে আমাকে আক্রমণ করতে পারো, আমার হাতে রাইফেল নেই এখন।

তাকিয়ে থাকল লোকটা। জানে বেচাল দেখলে নিমেষে তাকে ছাঁদা করে ফেলতে পারবে মরগান।

আর কেউ আছে তোমার সাথে?

কথা বলল না লোকটা।

দেশলাইয়ের কাঠি বের করে নখে ঘষে সিগারেট ধরাল মরগান। একমুখ ধোয়া ছেড়ে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাল দো-আঁশলার দিকে। শোনো, হলদে শেয়াল, আমার ধৈর্য খুব কম। তোমাকে জানে মারব না তা ঠিক, ভাবছি দুউরুর মাঝখানে কিছু বুলেট পাঠাব। পরের জন্মে কিন্তু ওই জিনিসটা ছাড়াই চলতে হবে তোমাকে। তাই চাও তুমি, না কথা বলবে?

জাহান্নামে যাও তুমি!

আরেকবার জিজ্ঞেস করব না কিন্তু। সিগারেট শেষ করেই গুলি করব। যদি মুখ খোলো তাহলে ছেড়ে দেব, তবে ছোট্ট একটা কাজও দেব। একটা খবর পৌঁছে দিতে হবে একজনকে।

চিন্তিত দেখাল লোকটাকে।

দ্রুত সিগারেট ফুঁকছে মরগান। সিগারেট শেষ হয়ে যাচ্ছে, ব্লু আই! শীতল সুরে তাড়া দিল ও।

আছে, ছোট্ট করে উত্তর দিল সে।

ঠোঁটে সিগারেট রেখে হোলস্টার থেকে একটা পিস্তল তুলে আনল ও। কক করে দ্রুত গুলি করল, দো-আঁশলার দুই উরুর ফাঁকে মাটিতে গিয়ে বিঁধল গুলিটা। থরথর করে কেঁপে উঠল বু আইয়ের শরীর। ভয় ফুটে উঠল চোখে

ভাওতা দিচ্ছ তুমি, সহাস্যে বলল মরগান, হালকা সুরে বললেও লোকটি টের পেল এখন আর তামাশার পর্যায়ে নেই ব্যাপারটা। আর কেউ যে নেই নিশ্চিত জানি আমি, থাকলে এতক্ষণ গল্প করতে পারতাম না আমরা। যাকগে, আরেকটা মিথ্যে বললে সত্যিই খারাবি আছে তোমার কপালে।

মাথা ঝাঁকাল সে। নেই, দ্রুত উত্তর দিল।

কার্টারকে চেনো?

চিনি।

সে আর টেনিসন একই লোক?

না, তা হবে কেন! বরং ওকে পেলে খুন করবে টেনিসন।

রাসলিঙের জন্যে?

কার্টার রাসলারদের জায়গা দেয় সেজন্যে।

তুমি কার্টারের ক্রু?

মাথা নাড়ল ব্লু আই। কার্টারের ডেরায় থাকি আমি। টাকার বিনিময়ে সবকিছুর ব্যবস্থা করে সে, আমাদের নিরাপত্তার দিকটাও দেখে।

আমার পিছু নিয়েছ কেন তোমরা?

কার্টার আমাদের জানিয়েছিল অনেক টাকা আছে তোমার কাছে, কোনভাবে সাবাড় করতে পারলেই কেল্লাফতে। বলেছে তোমাকে ধরা সহজ হবে না, কিন্তু তুমি এতটা টাফ নোক বোধহয় ও নিজেই জানত না।

টাকার খবর কিভাবে জানল ও?

ড্যানি জানিয়েছে। আমার ধারণা টেনিসনই পাঠিয়েছিল ড্যানিকে, চালাকি করে কার্টারের কানে দিয়েছে খবরটা।

ড্যানিকে বলবে কেন সে?

টেনেসি থেকে একসঙ্গে এখানে এসেছিল ওরা। একসময় শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরত ড্যানি, নিজের বাথানে ওকে কাজ দিয়েছিল টেনিসন। পুরো পাঁচ বছর কাজ করেছে ও। মামুলি কারণে হঠাৎ ওকে ছাঁটাই করেছে বক্স-টি। আসলে ইচ্ছে করেই কার্টারের কাছে ড্যানিকে পাঠিয়েছিল টেনসন। সে চায়নি কার্টার কোন সন্দেহ করুক। কার্টার অবশ্য টের পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু ড্যানি বিপজ্জনক নয় বলে আমল দেয়নি। তাছাড়া সবকিছু শেষ হওয়ার পর ছেলেটাকে ঠিকই শায়েস্তা করত।

মন দিয়ে শোনো, ব্লু আই। একটা সুযোগ দিচ্ছি তোমাকে। যদি ঝামেলা না করো বেঁচে যাবে, থেমে লোকটাকে যাচাই করল মরগান। মুখ দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই, তবে বাদামী চোখে কিছুটা হলেও প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। টেনিসনের বাথানে যাবে প্রথমে, ওকে জানাবে আগামীকাল ক্যাসল টাউন ছাড়ব আমি। পাই প্যালেস বা ঢোকার মুখে যে আস্তাবল আছে ওখানে থাকব। সন্ধের আগে যে কোন সময়ে আমাকে পেতে পারে সে-বোলো ওকে আশা করব আমি এবং যেতেও বলেছি।

ওর প্রতি এত বিদ্বেষ কেন তোমার?

এ লোকটিই আমার পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে তোমাদের। এতগুলো লোক আমার হাতে মারা পড়ল যাদের সাথে আমার বিন্দুমাত্র শত্রুতা ছিল না, কাউকে এর আগে দেখিওনি। অথচ তোমাদের লোভ আর ওর চক্রান্ত সারাক্ষণ আমাদেরকে ব্যতিব্যস্ত রেখেছে ক’টা দিন।

আমাকে খুন করতে পারে টেনিসন।

যা বলছি তা না করলে আমিই করব, খোদার কসম! অধৈর্য হয়ে বলল মরগান। তোমার ওপর নজর রাখব আমি। যেখানেই যাও ধরে এনে ওখানটায় দুটো গুলি করব। বুঝেছ? এবার ঠিক করো আমার কথামত টেনিসনের বাথানে যাবে কি-না।

যাব।

তুমি রাসলার, জানে সে?

মনে হয় না।

তাহলে আর সমস্যা কি?

 তবুও, খবরটা দেয়ার পর যদি রেগে গিয়ে…’

তা করবে না ও। তাছাড়া তুমি যাচ্ছ নিরস্ত্র অবস্থায়। তোমার প্রতি বিদ্বেষ নেই ওর। আসলে ঠাণ্ডা মাথার আস্ত একটা শয়তান ও। নিজের বাথানে নিরস্ত্র কাউকে খুন করে সম্মান নষ্ট করবে না। এখানে এই জিনিসটাই ওর একমাত্র সম্বল।

ও যদি না আসে?

তাহলে চলে যাব আমি, জানব আলফ্রেড টেনিসন আসলে একটা কাপুরুষ। নিজের সমস্যা নিজে মেটানোর মুরোদ নেই তার। তবে আসবেই সে, যে কোন কিছুর বিনিময়ে বাজি ধরতে রাজি আমি। বিশ্বাস হচ্ছে না? ইচ্ছে হলে আমার স্যাডল ব্যাগের টাকাগুলো বাজি ধরতে পারো।

আমার কাছে পাঁচটা ডলারও নেই। কিন্তু মনে হচ্ছে ঠিকই বলছ তুমি।

রাইফেল তুলে নিল মরগান। ঘোড়া খুঁজে রওনা দাও, বু আই। আবারও বলছি, চালাকি কোরো না। সোজা বক্স-টিতে যাবে, টেনিসনকে খবরটা দিয়েই চলে আসবে। এখানে রইল তোমার অস্ত্রসস্ত্র, ফিরে এসে নিয়ে যাবে, তারপর এ তল্লাট ছাড়বে। তোমার ওপর নজর রাখব আমি।

মাথা ঝাঁকাল লোকটা, পাশের ঝোঁপ থেকে গ্রুলাটাকে বের করে আনল। ঠিক বুঝতে পারছি না লোক হিসেবে কেমন তুমি, মরগান, স্যাডলে চেপে বলল সে, কণ্ঠে দ্বিধার সুর। ইচ্ছে করলে খবরটা অন্য কাউকে দিয়ে পাঠাতে পারতে, কিংবা নিজেই বক্স-টিতে যেতে পারতে। যাকগে, একটা সুযোগ পেয়েছি আমি, ভাগ্য তোমার হাতে মারা পড়িনি। আর দ্বিধা করছি না, ব্যবসাটা ছেড়েই দেব। তবে এ তল্লাট ছাড়ার আগে তোমাদের ডুয়েলটা দেখে যাব ভাবছি। কাল শহরে থাকব আমি।

তোমার যা ইচ্ছে কোরো, কেবল খবরটা ওকে দাও, আর আমার সামনে এসো না। এলেও অস্ত্র থেকে হাত দূরে সরিয়ে রেখো।

ব্লু আইয়ের অবয়ব দিগন্তে মিলিয়ে যেতে ফিরে চলল মরগান। ক্লান্ত শরীর বিশ্রাম চাইছে। ক্যাসল টাউনে ফিরে গিয়ে বিশ্রাম নেবে সে, নিশ্চিত জানে ওর মুখোমুখি হতে আসবেই আলফ্রেড টেনিসন। কাল সকাল বা দুপুরে ক্যাসল টাউনের রাস্তায় দুর্ধর্ষ আয়রন হকের মোকাবিলা করতে যাচ্ছে ও, কিন্তু এ নিয়ে কোন উদ্বেগ নেই মরগানের। লোকটার প্রতি কেবল ঘৃণাই অনুভব করছে ও।

ছয় বছর আগে হারিয়ে গিয়েছিল আয়রন হক। আগামীকাল ক্যাসল টাউনে আবার জন্ম হবে তার, মরার জন্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *