৭. ভোরে জাগলেও সকাল পর্যন্ত বিছানায়

ভোরে জাগলেও সকাল পর্যন্ত বিছানায় শুয়ে-বসে কাটিয়ে দিল মরগান। হস্যারের কিনে দেয়া খাবার আর কফি দিয়ে নাস্তা সেরেছে। সূর্য যখন মাথার ওপর, সোরেলে চেপে উপত্যকা থেকে বেরিয়ে এল। যা করতে যাচ্ছে তাতে ঝুঁকি আছে, তবে সাফল্যের সম্ভাবনা একেবারে কমও নয়, ওর অন্তত তাই ধারণা। হয়তো ঘুরে বেড়ানোই সার হবে। তবে বসে থাকার চেয়ে ভাল। তিন দিন আগে যে পথে ঝর্না দিয়ে নেমে উইলিদের ক্যাম্পে এসেছিল, সেটা ধরে এগোল। ঘোড়াটা ওর এরকম অ্যাডভেঞ্চার পছন্দ করতে পারছে না। ধীর গতিতে এগোচ্ছে, কিছুটা সন্ত্রস্ত। পাহাড়ী র্যাটলগুলোকে নিয়ে ওটার যত ভয়। তবে কোন অসুবিধে ছাড়াই ঝর্নার কাছে পৌঁছে গেল ও।

ষাট ফুট নিচে ক্যানিয়নের তলা আবছাভাবে চোখে পড়ছে। তলায় কি আছে বোঝার উপায় নেই। হয়তো বহুদিনের জমাট পানি কিংবা নরম মাটি, চোরাবালি থাকাও বিচিত্র নয়। কয়েক জাতের র্যাটলের আড়াও থাকতে পারে। তবে পরোয়া করছে না মরগান। স্টির্যাপের ওপর ভর দিয়ে শরীর উচিয়ে তাকাল, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখল চারপাশ-এমন কোন পথ থাকতে পারে যেটা ধরে নেমে যাওয়া সহজ হবে। পথটা ঢালু হলেও সোরেলের ওপর ভরসা করা যায়, এরকম পথ ধরে বহুবার নেমেছে বা উঠেছে ঘোড়াটা। আসল সমস্যা হবে ক্যানিয়নের তলদেশে নেমে যাওয়ার পর। ওখানকার মাটি নরম হলে বিপদে পড়তে হবে ওকে।

ঝোপে পূর্ণ ঢালু পথ ধরে এগোচ্ছে ঘোড়াটা। গ্যানিটের মত শক্ত পাথুরে মাটি থাকায় সহজে নেমে যেতে পারছে। অন্তত পা হড়কানোর কোন সুযোগ নেই। মাঝে মাঝে নরম জায়গাও আছে, এড়িয়ে চলছে মরগান। তবু ষাট ফুট জায়গা নামতে প্রচুর সময় লাগল। নিচে স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ, মাটির সোঁদা গন্ধ আর কিছুটা বদ্ধ বাতাস। মাঝে মধ্যে থমকে দাড়িয়ে নিজের অপছন্দের কথা জানাচ্ছে ঘোড়াটা, অবশ্য ওর নিজেরও অস্বস্তি হচ্ছে। আবছা আলোয় মাটির ওপর চোখ বুলাল, গোড়ালি সমান পানি জমেছে পাথুরে মাটির ওপর। স্পরের মৃদু খোঁচায় এগোল ঘোড়াটা, খুরের আঘাতে পানি ছিটানোর শব্দ প্রতিধ্বনি। তুলছে খাড়া ক্লিফের দেয়ালে। বোন্ডার আর পাথুরে চাঙড়ের ফাঁক গলে এগোতে হলো। ভয় হচ্ছে হয়তো বেরুতে পারবে না ক্যানিয়ন থেকে। তেমন হলে একই পথে ফিরে যাওয়া বেশ কঠিনই হবে, কারণ এমনিতেই যথেষ্ট ধকল গেছে সোরেলটার ওপর দিয়ে।

মাথার ওপর খোলা আকাশের দিকে তাকাল মরগান। অনেক উঁচুতে নীল আকাশকে অচেনা মনে হচ্ছে। আলো-আঁধারি পরিবেশে অস্বস্তি বোধ করছে ও, কিছুক্ষণ পর দিক ও সময়জ্ঞান দুটোই হারিয়ে ফেলল। এমনকি কতটুকু এসেছে তা-ও নিশ্চিত বলতে পারবে না। তবু অনিশ্চিত পদক্ষেপে এগোচ্ছে ঘোড়াটা। ভরসার কথা ক্যানিয়নটা কানা নয়, যদ্র জানে মরগান, এবং এখান থেকে বেরুনোর অনেকগুলো পথ আছে।

কতক্ষণ পর বলতে পারবে না, ডান দিকে কিছুটা আলোকিত পথ দেখতে পেয়ে এগোল ও। টের পেল ঘোড়ার গতি বেড়ে গেছে। পথটার মুখে আসতে বাতাস লাগল গায়ে। দেখল সামনে ঢালু পথ বেশ উঁচুতে উঠে গেছে, ঝলমলে আকাশও দেখতে পাচ্ছে। লাগাম ঢিলে করে ইচ্ছেমত এগোতে দিল সোরেলকে। দ্রুত ছুটছে ওটা।

বিশ মিনিট পর ক্যানিয়নের বাইরে সিডার আর অ্যাসপেনের ঘন বনে এসে পড়ল ও। গাছের ফাঁক গলে নাক বরাবর এগোল। আসলে বলা উচিত নিজের ইচ্ছেমত এগোচ্ছে ঘোড়াটা। এসব ক্ষেত্রে ওর চেয়ে বোবা এ প্রাণীটির সহজাত প্রবৃত্তিই অনেক বেশি কাজে দেয়।

বন পেরিয়ে ট্রেইল চোখে পড়ল, মরগান ধারণা করল মিসৌরি যাওয়ার ট্রেইলের কাছাকাছি চলে এসেছে। কয়েক মাইল পর, ক্যাকটাস হিলের শেষ প্রান্তে ট্রেইলটার বাক, হয়তো ওখানেই আছে লোকগুলো। পেছন দিক দিয়ে উপস্থিত হয়ে ওদেরকে চমকে দিতে পারবে।

ট্রেইল ছেড়ে পাশের উঁচু জমিতে উঠে এল ও। ডানে একটা ছোট ঝর্না দেখতে পেয়েছে। একটা সিডারের ছায়ায় স্যাডল ছেড়ে কফির আয়োজন করল। তারপর, সবশেষে ঝর্নার পানিতে হাত-মুখ ধুয়ে লাঞ্চ করতে বসল।

মিনিট বিশ বিশ্রাম নিয়ে ফের ট্রেইলে উঠে এল ও। দুই মাইল আসার পর ক্যাকটাস হিলের প্রান্ত চোখে পড়ল, ঢালু জমির আকারে দিগন্তে তৃণভূমির সাথে মিশে গেছে। এখানেও প্রচুর সিডার আর স রয়েছে। সুবিধাই হলো ওর, নিজেকে লুকিয়ে রেখে শক্রর ওপর নজর রাখতে পারবে।

কয়েকশো গজ এগিয়ে ট্রেইল ছেড়ে ঢালু জমিতে নেমে পড়ল মরগান। ঠিক যেখানে ক্যাকটাস হিল শেষ হয়েছে, তার একটু আগে। লুকিয়ে থাকার মত যথেষ্ট আড়াল আছে এদিকে। স্ক্যাবার্ড থেকে রাইফেল তুলে নিয়ে স্যাডল ছাড়ল। সোরেলের ঘাড়ে চাপড় মারতে হেঁটে ঝোঁপের ভেতর ঢুকে পড়ল ওটা। নিঃশব্দে চিতার ক্ষিপ্রতায় এগোচ্ছে মরগান। জানে এখনও ফাস হয়নি ওর উপস্থিতি। শিগগিরই প্রতিপক্ষের দেখা পাবে। জুনিপার ঝোঁপ পাশে ফেলে উঁচু পাথুরে বোন্ডারের পাশে এসে দাঁড়াল ও। থেমে নজর চালাল সামনের দিকে। এখান থেকে বিস্তীর্ণ প্রান্তরের শুরু, আরও দূরে ক্যাসল টাউন চোখে পড়ছে। লোকগুলো রয়েছে ওর হাতের আরও বামে। নজর রাখতে হলে কিছুটা বামে সরতে হবে।

চুপিসারে এগোল ও, সময় নিয়ে কয়েকটা ঝোঁপ পেরুল। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পাইন আর বার্চের আশপাশে গুল্ম জাতীয় কিছু গাছ জন্মেছে। ওগুলোর ওপর ভর করেছে কিছু লতানো গাছ। পঁচিশ হাত দূরের একটা অ্যাসপেন ঝোঁপ মনঃপূত হলো ওর। পাহাড়ের ঢালু শরীর বেয়ে নামতে শুরু করল মরগান, হাতে। কক করা রাইফেল। ঝোঁপের পেছনে পৌঁছতে মিনিট খানেকের বেশি লাগল না। প্রথমে জিরিয়ে নিল, তারপর কিছুটা পাশে সরে এসে দৃষ্টি রাখল সামনের খোলা জায়গায়। পঞ্চাশ গজ দূরে মাটির সাথে মিশে গেছে ক্যাকটাস হিল, পাশেই মিসৌরির ট্রেইল। আড়াআড়িভাবে ওটাকে চিরে গেছে সরু নদীটা, ক্ষীণ ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর ওপর কাঠের সেতু। সেতু পেরিয়ে এগিয়ে আসছে এক ঘোড়সওয়ার। অন্যদের খুঁজে বের করার আশায় চারপাশে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখল মরগান। কষ্ট করতে হলো না, নিজেদের লুকিয়ে রাখার কোন চেষ্টা করেনি ওরা। দুজন, পাশাপাশি বসে আছে একটা সিডারের নিচে-গতরাতে শহর থেকে ফিল্ড গ্লাসের সাহায্যে যেমন দেখেছিল। পাশে বিশাল এক পাইনের গুড়িতে ঘোড়াগুলোর লাগাম বাঁধা।

এই, লেন্স, ওদিকের খবর কি? চেঁচিয়ে জানতে চাইল একজন।

পাত্তা নেই হারামজাদার, বিরক্তির সাথে বলল সেতু পেরিয়ে আসা লোকটা, লেন্স। অবশ্য ট্রেস করার চেষ্টা করছে ব্লু আই। গতকাল দুপুরের পর ফ্ল্যাগ-বিতে গিয়েছিল মরগান।

খোদার কসম, টেনিসন জানলে কিন্তু চিবিয়ে খাবে ওকে! শিস দিয়ে উঠল প্রথমজন। মেলিসা বডম্যানের নাম বলতে অজ্ঞান টেনিসন। মেয়েটা যত এড়ানোর চেষ্টা করে ওর আগ্রহ যেন ততই বাড়ে। আমার ধারণা কি জানো, খুব শিগগিরই ওই জমিটা কজা করবে সে।

গাধার মত কথা বোলো না, লসন! ক্যাসল টাউনের কেউ সেটা সহ্য করবে ভেবেছ?

তুমি তাহলে কিছুই জানো না, লেন্স। পরশু রাতে মেলিসা বডম্যান কোথায় ছিল, জানো?

কোথায়?

টেনিসনের বাথানে, ওর বিলাসবহুল র‍্যাঞ্চ-হাউসে।

প্রচণ্ড ধাক্কা খেল মরগান। মেলিসা বডম্যান, স্বেচ্ছায়?

ম্যাকলয়ারীদের খবর কি? জানতে চাইল লসন।

এবার বোধহয় ব্যবসা গোটাতেই হবে। ওরা নিজেরা তো ডুববেই, আমাদেরও ডোবাবে। টেনিসন এমন হারামজাদা যে সার্কেল-এমকে হটিয়ে দেয়ার পর আমাদের কথা ভাববে। দুই বাথান থেকে প্রতি মাসে একশোটা গরু, মন্দ চলছিল না, কি বলো? আমার তো দুঃখই হচ্ছে, মুফতে কামাই করার এমন সহজ উপায় হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। তবে শেষ দাওটা দু’একদিনের মধ্যেই মারব। আগে মরগানকে কব্জা করে নিই।

ব্যাপারটা মোটেই পছন্দ হচ্ছে না আমার, আলোচনায় যোগ দিল অন্যজন। মরগান যেন সাক্ষাৎ যম! এ পর্যন্ত প্রায় আট-ন’জনকে সাবাড় করে ফেলেছে, অথচ নিজে অক্ষতই রয়ে গেছে। খোঁজ-খবর নিয়ে দেখে হয়তো সেরাদের কেউ ও। লোকটার সঙ্গের টাকার কথা চিন্তা করলে কি তাই মনে হয়।

এবার আর পার পাবে না, সামনে-পেছনে দুদিকেই আছি আমরা। মরুভূমিতে মরতে না চাইলে আমাদের সামনে আসতেই হবে ওকে। একেবারে পানির মত সহজ কাজ। ট্রেইলে দেখতে পেলেই গুলি করব, ও জানে এখানে আছি আমরা, তবু কিছু করার থাকবে না ওর। ক্যাসল টাউন ছাড়তে হলে ওকে এই ট্রেইলে আসতেই হবে।

এত সহজ ভেব না, হালকা সুরে বলল লসন। যে সাত-আটজন মারা গেছে তোমার মতই ভেবেছিল ওরা। বুটহিলে শুয়ে ভুলটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে এখন

ওর চামড়া তো লোহার তৈরি নয় যে বুলেট ঢুকবে না! উন্মা প্রকাশ পেল। লেন্সের কণ্ঠে। উঁহু, মরগানের চেয়ে আমাদের চান্স বেশি।

লেন্স, আমি এমন কিছু লোককে চিনি যারা শরীরে অন্তত তিন-চারটে বুলেট নিয়ে একাধিক শত্রুকে ধরাশায়ী করেছে, এবং বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে এখনও।

ওসব কেবল গল্পই, কখনও এমন ঘটনা শুনিনি আমি।

ডরেসের নাম শুনেছ? সনোরায় ওকে ঘেরাও করেছিল চারজন বাউন্টি হান্টার। সেলুনের বাইরে অপেক্ষা করছিল ওরা, ডরেস বেরিয়ে আসতে চড়াও হলো। জোড়া পিস্তল বের করে একটার পর একটা গুলি করল ডরেস, শেষ না হওয়া পর্যন্ত থামেনি। লড়াই শেষ হতে দেখা গেল শরীরে চারটে বুলেট নিয়ে দাড়িয়ে আছে সে, আর মরা কুকুরের মত রাস্তায় পড়ে আছে শিকারীরা।

আচ্ছা, এ লোক ডরেস নয় তো? ভয়ার্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল তৃতীয়জন।

দূর, তা হতে যাবে কেন? গত দুই বছর ডরেসের কোন নাম-নিশানা নেই। আমার ধারণা, সনোরার ওই লড়াইয়ের পর শহর থেকে কেটে পড়তে পারলেও পরে ট্রেইলে কোথাও মারা গেছে সে। বেঁচে থাকলে ওর কথা শুনতে পেতাম।

শ্রাগ করল লসন। ডরেসের চেয়েও সরেস কেউ হতে পারে এ লোক। ওরকম না হলে অবশ্য খুশি হব আমি।

তোমার কথায় মনে হচ্ছে ও বিলি দ্য কিড় কিংবা হিকক।

খোদার কসম, লেন্স, ওর সামনে পড়লে ডুয়েলের সময় তাই মনে হবে। তোমার! কিন্তু দুঃখের কথা কি জানো, কাউকে কথাটা বলার সুযোগ পাবে না। তুমি।

তুমি একটা ভীতুর ডিম! স্পষ্ট বিরক্তি প্রকাশ করল লেন্স হারপার।

এসব লোককে ভয় পাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে খারাপ কিছু নয়, অপ্রতিভ বা ব্ৰিত হলো না লসন, বরং হাসল। এবং ফলদায়কও। হয়তো আমি ভুল ভাবছি, কিন্তু তোমার ভাবে মনে হচ্ছে নিজেকে ওর কাতারে ভাবতে শুরু করেছ তুমি।

সন্দেহ আছে?

মুখ না দেখেও লসনের প্রতিক্রিয়া আন্দাজ করতে পারল মরগান, কিছুটা হতচকিত হয়ে পড়েছে। ইতিবাচক উত্তর দিলে হয়তো তাকেই চ্যালেঞ্জ করে বসতে পারে লেন্স, আর উল্টোটা বললে মিথ্যে বলা হবে, অন্তত লেন্স তাই মনে করবে। তাকে বাঁচিয়ে দিল অন্য লোকটা। কি শুরু করেছ তোমরা? বিরক্ত স্বরে বলল সে। ধারে-কাছে নেই এমন লোককে নিয়ে তর্ক করছ। তারচেয়ে নিজেদের কাজ করে যাও, মরগান কখন এসে পড়ে তার ঠিক আছে?

শোনো, টোলবার্ট, এই ব্যাটা ভয়ে সিঁটিয়ে আছে, আমি শুধু…

হজম করে ফেলো, লেন্স! স্রেফ ভুলে যাও।

কিছু না বলে টোলবার্টের দিকে তাকিয়ে থাকল লেন্স হারপার। দৃষ্টি দিয়ে বিদ্ধ করার চেষ্টা করল তাকে, হাত নিশপিশ করছে। পা জোড়া ফাঁক করে দাড়িয়ে। সঙ্গীর চকচকে পিস্তলের বাটের দিকে চোখ পড়তে কলজে শুকিয়ে এল ওর। জানে সহজেই ওকে পেড়ে ফেলবে টোলবার্ট।

ভাল, খুশি হালাম, লেন্স হাল ছেড়ে দিতে নিস্পৃহ কণ্ঠে বলল টোলবার্ট। হাসল সে, লসনের দিকে ফিরল। যাও তো, কফির আয়োজন করো।

হিসেব কষল মরগান, পরস্পরের কাছাকাছি আছে ওরা। সন্তর্পণে খোলা জায়গায় বেরিয়ে এসে রাইফেল ক করল। চমকে উঠল তিনজনই। মরগান যা ভেবেছিল, তাই হলো একটু পর। চোখের কোণ দিয়ে লক্ষ্য করল হোলস্টারে হাত বাড়াচ্ছে লেন্স। বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে গুলি করল তাকে। ভারী বুলেটের ধাক্কায় পেছনে হেলে পড়ল লেন্স হারপারের দেহ, চোখে আফসোস এবং বাঁচার আকুতি। শিথিল হয়ে এল তার শরীর, পিস্তলসহ ডান হাত পড়ে থাকল দেহের পাশে।

অন্যদের দিকে তাকাল মরগান। চুপসে গেছে লসন, চোখে ভয়ার্ত চাহনি। দু’হাত তুলে দাঁড়িয়ে আছে। নিস্পৃহ দৃষ্টিতে লেন্সের লাশের দিকে তাকাল টোলবার্ট। জানতাম এভাবেই বোকামির মাসুল দেবে একদিন, বিড়বিড় করে বলল সে। হিসেবে বরাবরই কাঁচা ছিল ও।

লসন, তোমার কোমর খালি করো, গানবেল্টসহ, নির্দেশ দিল মরগান। এরপর টোলবার্টের পেছনে গিয়ে ওকেও নিরস্ত্র কোরো। কোন হেরফের হলে আগে তোমাকেই গুলি করব।

অক্ষরে অক্ষরে নির্দেশ পালন করল লোকটা, ভিজে বেড়ালের মত দাঁড়িয়ে থাকল এরপর। টোলবার্ট এমন ভাব করছে যেন কিছুই হয়নি। পকেট থেকে তামাক আর কাগজ বের করে সিগারেট রোল করল। ধরিয়ে একমুখ ধোয়া ছাড়ল। এর আগে কোথাও দেখেছি তোমাকে, সন্দিগ্ধ স্বরে মন্তব্য করল সে। আমার ধারণা জেমস মরগান নামটা ভুয়া।

মনে করার চেষ্টা করতে থাকো, শ্রাগ করল মরগান। তবে ভূলেও বেয়াড়া কিছু করার চিন্তা কোরো না। তুমি নিরস্ত্র কি-না গুলি করার সময় একটুও চিন্তা করব না।

এটা তো খুন! নিচু স্বরে বলল লসন।

মোটেই সাধু মনে হচ্ছে না তোমাকে। ট্রেইল ধরে এখানে এলে কোন সুযোগ দেয়া ছাড়াই আমাকে খুন করতে তোমরা। তাহলে এরচেয়ে ফেয়ার কিছু আশা করো কিভাবে?

চুপ করে থাকল লসন।

আমাদের নিয়ে কি করবে? জানতে চাইল টোলবার্ট। খুব বেশি সময় পাবে তুমি। কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে অন্যরা।

তাতে লাভ হবে না তোমার।

জাহান্নামে যাও!

উঁহু, শহরে যাচ্ছি আমরা। গরুচোরদের ধরার খুব ইচ্ছে ওদের, তোমাদেরকে পেলে খুশিই হবে। মার্শালকে তোমরাই খুন করেছ, তাই না?

টোলবার্ট! ঝটপট জানাল লসন।

তোমার জিভ,টেনে ছিড়ে ফেলব! হুমকি দিল টোলবার্ট।

নিজের কথা আগে ভাবছ না কেন? ওকে ছোঁয়ার সুযোগ তুমি পাবে, যদি আরও কয়েকটা দিন বেঁচে থাকতে পারো, তবেই।

তোমার কি মনে হয়?

কিছুই মনে হয় না আমার, শিস বাজাল মরগান, দূরে সোরেলের খুরের হালকা শব্দ শুনতে পেল। ঘুরে দাঁড়াও, ট্রেইল ধরে হাঁটতে শুরু করো।

হেঁটে যাব!?

নয়তো কি? ঘোড়ায় চড়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ চাও?

দু’জনের কেউই নড়ল না, ভাবছে কি যেন। টোলবার্টের পায়ের কাছে গুলি করল মরগান। তীব্র গাল বকে ঘুরে ক্যাসল টাউনের ট্রেইল ধরে এগোতে শুরু করল সে। পিছু নিল লসন।

সোরেলটা এসে গেছে। স্যাডলে চেপে দুই তস্করকে অনুসরণ করল মরগান। খেয়াল করল সমানে খিস্তি করছে টোলবার্ট। শোনো, বার্ট, তোমার গালাগাল থামাও, নইলে মুখে একটা বুলেট ঢুকিয়ে দেব, হুমকি দিল ও।

গোল্লায় যাও তুমি!

উত্তরে একটা বুলেট পাঠাল মরগান। টোলবার্টের চুলে সিঁথি কেটে চলে গেল ওটা। ঝট করে ঘুরল সে, শীতল দৃষ্টিতে তাকাল, তবে তার চোখে চাপা ভয়। ঠিকই দেখতে পেল মরগান। তোমার চোটপাট চলবে না এখানে, পরিষ্কার? হেসে বলল ও।

তবু নড়ল না সে, ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল।

হাঁটুর ওপর আড়াআড়িভাবে রাইফেল রেখে সিগারেট ধরাল মরগান। বার্ট, তুমি দেখছি একটা বেয়াড়া ঘোড়ার চেয়েও খারাপ। নিজের ভাল বোঝো না। সুযোগ চাও নাকি? তাহলে এখুনি ফয়সালা হয়ে যাক। কষ্ট করে ক্যাসল টাউনে যাওয়ার দরকার নেই। তোমার বগলে একটা পিস্তল আছে, বের করো ওটা। হয়তো হারাতে পারবে আমাকে।

ফাটা বেলুনের মত চুপসে গেল টোলবার্ট। নিজের জীবন নিয়ে জুয়া খেলি আমি।

ভাল কথা বলেছ। এগোও এবার। লসন অনেকটা এগিয়ে গেছে। ধরে ফেলো ওকে।

সশব্দে একদলা থুথু ফেলল টোলবার্ট। তোমাকে বোধহয় চিনতে পেরেছি। টমস্টোনে দেখা হয়েছিল আমাদের।

হয়তো। তবে সন্দেহ আছে আমার। যদূর মনে হচ্ছে ওদিকে যাইনি কখনও।

বিব্রত দেখাল তাকে। অস্বীকার করছ?

আমি বলেছি দেখা হয়নি আমাদের। তুমি তা মানতে চাও না, এই তো? কিন্তু মেনে নিলেই ভাল করবে। কেউ যখন আমার সাথে তর্ক করে, লোকটাকে র্যাটলের মত বিষাক্ত লাগে; র্যাটলকে ফণা তোলার আগেই গুলি করা উচিত, পশ্চিমের এ প্রবাদটা শুনেছ নিশ্চয়ই?

নিকুচি করি তোমার প্রবাদের! ঘুরে হাঁটতে শুরু করল টোলবার্ট। সময় হলে ঠিকই তোমাকে বুঝিয়ে দেব পিস্তল উচিয়ে এরকম বাহাদুরি আমিও দেখাতে পারি!

আগে তো মার্শালের খুনের অভিযোগ থেকে রেহাই পাও।

আমাদেরকে ধরিয়ে দিয়ে নিজে সাধু সাজতে চাও?

উঁহু, পথের কাঁটা পরিষ্কার করছি। রাইফেল হাতে কেউ ট্রেইলে অপেক্ষায় থাকবে এটা আমার কাছে একাধারে অস্বস্তিকর এবং বিরক্তিকর।

তোমার কথা শহরের লোকজনকে জানাব আমি।

মরগান হাসল কেবল, কিছু বলল না।

শহরে পৌঁছার পরপরই কয়েকজনের একটা দল ঘিরে ধরল ওদেরকে। উৎসাহী দু’জন এসে বেঁধে ফেলল দুই রাসলারকে।

ওর কাছে একটা লুকানো পিস্তল আছে, টোলবার্টকে দেখিয়ে জানাল মরগান

তোমাকে খুন করব আমি, মরগান! রাগে কুৎসিত দেখাল টোলবার্টের মুখ, হাত বাঁধা না থাকলে হয়তো এখুনি পিস্তল বের করার চেষ্টা করত।

জাজের কাছে নিয়ে চলো এদের, পরামর্শ দিল একজন, এইমাত্র নিরস্ত্র করেছে টোলবার্টকে।

সোৎসাহে ওদেরকে নিয়ে গেল লোকজন। একপাশে সরে এল মরগান, ফিরতি পথে ডান দিকের একটা সেলুনে ঢুকে পড়ল। সময় নিয়ে হুইস্কি পান করল, তারপর পাই-প্যালেসে লাঞ্চ সেরে আস্তাবলে এল। টুলে বসে যথারীতি ঝিমাচ্ছে বুড়ো হসল্যার। মরগান সামনে গিয়ে দাঁড়াতে চোখ খুলল, পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে জরিপ করল ওকে, দৃষ্টিতে ঘুমের রেশ নেই। ভালই আছ দেখছি, বিরস মুখে মন্তব্য করল। এবং চলেও যাওনি।

তাই আশা করেছিলে?

আমার আশা করা না-করায় কিছু যায়-আসে না তোমার। ভাবছি শেষ পর্যন্ত এখান থেকে বেরুতে পারবে কি-না।

সামনের পথ পরিষ্কার এখন।

এত সহজ ভেব না। কার্টারের দল তোমাকে সহজে ছাড়বে বলে মনে হয়। আচ্ছা, তোমার সাথে ওদের সম্পর্কটা কি? লোকগুলোর তাড়া দেখে মনে হচ্ছে একাই সবার পাছায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছ?

কার্টার কে?

আমার ধারণা এটা ওর নিজের দেয়া নাম। বছর দুই আগে ক্যাসল টাউনে। দুটো লোককে খুন করেছিল ও, তারপর ক্যাকটাস হিলের ওপাশে আস্তানা গেড়েছে। দুনিয়ার সব আউট-লরা যোগ দিতে লাগল ওর সাথে। টাকার বিনিময়ে নিরাপদ আশ্রয় আর খাবার সরবরাহ করে সে। তবে ওপারে যাই করুক ক্যাসল টাউনে এসে ঝামেলা করে না ওরা। নিজেদের আস্তানায় ছোটখাট একটা সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে।

গরুচুরির পেছনে হাত আছে ওদের, সম্ভবত এখানকার একটা বাথানও জড়িত। তোমাদের মার্শালকে খুন করেছে এদেরই একজন, টোলবার্ট নামের লোকটা

ভাল কথা মনে করেছ, শিগগিরই হয়তো আবার দেখা পেয়ে যাবে ওদের।

বুঝল না মরগান, কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ করল একরকম নিশ্চিত মনে হচ্ছে বুড়োকে।

এ জীবনে কম তো দেখিনি। গরুচোর ধরতে হয় হাতে-নাতে, মালসহ। তা করতে পারোনি তুমি, তাছাড়া শুধু তোমার কথায় চিড়ে ভিজবে না।

হকিন্স কে, তা-ও জানো নিশ্চয়ই?

মাথা নাড়ল হসল্যার। তোমার কাছ থেকে শুনলাম নামটা। শুধু হকিন্স নামে কয়েকজন লোক পাবে। একটু থামল সে, রাস্তা ধরে উত্তরে তাকিয়ে কি যেন দেখল। তবে বুঝতে পারছি লোকটা সাধারণ কেউ নয়। তোমার মত লোকের চিন্তায় ঘুরপাক খাওয়া চাট্টিখানি কথা?

তামাশা করছ?

তামাশা করব কেন! ফের মরগানের পেছনে নজর বুলাল সে। তোমাকে বোধহয় সাবধান করে দেয়া উচিত। এইমাত্র স্টোর থেকে বেরিয়েছে টোলবার্ট আর ওই লোকটা। সম্ভবত নতুন অস্ত্র পরখ করার সুযোগ খুঁজছে।

ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল মরগান, দেখল দু’জনকে। ষাট গজ দূরে পাশাপাশি এগিয়ে আসছে। তাড়াটা টোলবার্টের মধ্যে বেশি, সঙ্গীর চেয়ে এগিয়ে আছে। দুজনের মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ বাড়ছে। কৌতুক বোধ করল মরগান, খুব সহজ পথ বেছে নিয়েছে ওরা। ওকে ফাঁদে ফেলে কাজ সারতে চাইছে। টোলবার্ট থাকবে সামনে, আর লসন থাকবে ডান পাশে-টার্গেটের সাথে সমকোণী ত্রিভুজ তৈরি করে। কে প্রলুব্ধ করবে ওকে, টোলবার্ট না লসন?

ভেতরে চলে যাও, বুড়ো খোকা, হালকা সুরে বলল মরগান। দু’পা ডানে সরল, নিরেট দেয়ালের দিকে পিঠ। ঠিক ওর সামনে টোলবার্ট, আর লসন কিছুটা ডানে। রাস্তায় কাছাকাছি যেসব লোক ছিল, দ্রুত নিরাপদ দূরত্বে সরে গেল।

তারপর, মরগান, অবাক লাগছে না? হেসে জানতে চাইল টোলবার্ট।

কেন?

এই যে, জাজ লোকটা আমাদের আটকে রাখতে পারল না। আহা, কি কষ্টই করল! জাজ বলল, তোমরা রাসলার। উত্তরে আমি বললাম: তাহলে জাজ, তুমিও রাসলার, হাসছে সে, দু’কান পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে হাসিটা। এবং তুমিও, মরগান। তো ব্যাপারটা কি দাঁড়াল? কারও বিরুদ্ধে কোন প্রমাণ নেই।

যে লোকটা প্রমাণ করতে পারত, তাকে খুন করেছ তুমি।

আমি বলছি তুমিই মার্শালকে খুন করেছ, চাপা স্বরে বলল টোলবার্ট, লোকজনের দিকে তাকাল। তোমাদের মার্শালকে খুন করেছে এই লোক। আমি আর লসন এর সাক্ষী।

গুঞ্জন উঠল লোকজনের মধ্যে। মার্শাল খুন হওয়ার দু’দিন পর এখানে। এসেছে ও, ভিড়ের মধ্য থেকে মরগানের পক্ষে সাফাই গাইল একজন।

মার্শালকে খুন করার পর ঘুরে উত্তর দিকের ট্রেইল ধরে শহরে এসেছে ও, ব্যাখ্যা দিল টোলবার্ট, সন্তুষ্ট দেখাচ্ছে। তো মরগান, অবস্থাটা কি দাঁড়াচ্ছে? মার্শালের খুনের দায়ে ফেঁসে যাচ্ছ তুমি।

উহুঁ, ভুল করছ। শহরে আসার দুদিন আগের অ্যালিবাই আছে আমার। টুকসনে এক রাত কাটিয়েছি, ওখানকার হোটেলের রেজিস্ট্রারে আমার নাম পাওয়া যাবে। নিজের পাপের বোঝা আমার ঘাড়ে চাপাতে চাইছ কেন? ভাল করেই জানো ফাসাতে পারবে না আমাকে, তুমি বললেই তো প্রমাণিত হলো না।

এত সহজ কি?

মরগান সহসাই টের পেল ভিত্তিহীন একটা অভিযোগ তুলে কেন খোশ-গল্প করছে টোলবার্ট। আসলে সময় কাটাচ্ছে সে। ওদের পরিকল্পনায় আরেকজন শরীকদার জুটেছে। ডানে দু’পা সরে আসার সময় উল্টোদিকে, একটু বামে সেলুনের ছাদে দেখতে পেল লোকটাকে। পজিশন নিয়েছে। আসল কাজ সে-ই সারবে।

কিছুটা বিচলিত বোধ করল ও। এখানে ওর জেতার আশা কম, তিনজনে মিলে প্রায় নিচ্ছিদ্র একটা ফাঁদ পেতেছে। তবে আশার কথা একটাই, তৃতীয় লোকটার উপস্থিতি টের পেয়েছে মরগান যা জানে না ওরা।

না, সহজ নয়, শীতল কণ্ঠে স্বীকার করল ও। বাম দিকে সরে এসেছে। দুটো ইচ্ছে ছিল ওর, উল্টো টোলবার্টকে প্রলুব্ধ করা এবং রাস্তার দু’জনকে। একইসাথে মোকাবিলা করার জন্যে সুবিধাজনক একটা অবস্থান নেয়া। অন্তত এখন বোঝা যাচ্ছে, কথা চালিয়ে গেল ও। আমার জন্যে অপেক্ষা করছিলে, আবার দেখা হয়ে গেল এখন। বলতেই হয় নাছোড়বান্দা লোক তোমরা। আমিও খুব ভয়ে আছি, শক্রর সামনে পিঠ দিয়ে সমোরা যাওয়া খুব সহজ হবে না। ঠিক হত যদি পেছন দিকেও দুটো চোখ থাকত আমার।

কি বলছ?

শোনো, টেনিসনের শালা, বলছিলাম তোমার দিকে পিঠ দেয়া বোফামি, হবে।

রেগে কাই হয়ে গেল টোলবার্ট, হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। ওখানেই দাঁড়াও, মরগান, নোভড়া না! চাপা স্বরে নির্দেশ দিল সে। নিজে ডানে মরে যেতে পা বাড়াল।

এ সুযোগটাই নিল মরগান। চোখের পলকে পিস্তল উঠে এল এর দু’হাতে। ভুলে গেল সামনের দু’জনকে, সেলুনের ছাদে চলে গেছে দৃষ্টি। আয়েশ করে রাইফেল বাগিয়ে ধরে আছে লোকটি, গুলি করার জন্যে তৈরি। কোমরের কাছ থেকে গুলি করল ও। লোকটাকে নড়ে উঠতে দেখে দৃষ্টি নেমে এল ওর, আগুন ঝরাল ডান হাতের কোল্ট। নিশানা ছাড়াই গুলি করেছে, স্রেফ টোলবার্টকে ব্যস্ত রাখার জন্যে। সেটাই দারুণ কাজে দিল। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের ব্যবধানে বাম হাতের সিক্সশ্যটার থেকে গুলি করল ও। টোলবাটের বাম বুকে একটা ফুটো তৈরি। হলো, যখন ক্ষতটা থেকে রক্ত গড়াতে শুরু করল ততক্ষণে পাশে আরেকটা ফুটোর সৃষ্টি হয়েছে। পিস্তল হাতে নিয়েই মারা গেল টোলবাট, পড়ে যাওয়ার সময় একটা গুলি ছুঁড়েছিল, ওটা কোথায় গেল তা কেউই বলতে পারবে না।

ভেলকি দেখেই কাত জেফ লসন। মরগানকে মেরে ফেলার সুযোগ ওরই বেশি ছিল। পিস্তল বের করেছিল, কিন্তু গুলি করা হয়নি। কপালে ত্রিনয়নের সৃষ্টি হওয়ার পরও ঘটনাটা বিশ্বাস করতে পারছিল না সে। অদ্ভুত এক কষ্ট, মায়া আচ্ছন্ন করল তাকে। মরার আগেও নিজের ভুল বুঝতে পারেনি।

বিস্ময় কখনও কখনও মানুষকে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেয়, ভাবল মরগান। নিজের ভুলে মরেছে জেফ লসন, দৃঢ়তা ছিল না লোকটার। ডুয়েলের সময় চমকে যেতে নেই, এ শিক্ষা রপ্ত করতে পারেনি সে।

সশব্দে নিঃশ্বাস ছাড়ল মরগান। বড় বাঁচা বেঁচে গেছে এ যাত্রা। পিস্তল রিলোড করে জট পাকিয়ে থাকা লোকজনের দিকে তাকাল, গুঞ্জন উঠছে ওদের মাঝে। পেছনে হসল্যারের পদশব্দেও ফিরল না ও। রাস্তা ধরে দু’দিকে যদ্র দৃষ্টি যায়, খুঁটিয়ে দেখল। সন্তুষ্ট হয়ে, আর কোন বিপদের সম্ভাবনা নেই বুঝতে পেরে বুড়োর দিকে ফিরল।

খোদার কসম, এরচেয়ে সংক্ষিপ্ত ডুয়েল আর দেখিনি!

কফি হবে? হসল্যারকে থামিয়ে দিল মরগান

ওদের আগেই পিস্তলে হাত দিয়েছ তুমি! ভিড়ের মাঝখান থেকে অভিযোগ করল একজন। একসাথে তিনটা খুন করেছ!

ঝট করে ফিরল মরগান, ভিড়ের মধ্যে লোকটাকে খুঁজল। আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে কথাটা বলল, আহ্বান করল ও।

কেউ এল না, এমনকি টু শব্দও করল না।

সামনে এসে কথাটা বলার সাহস তোমরা রাখো না, অথচ আশা করছ। তিনজনের বিরুদ্ধে একা লড়াইয়ে ওদের পর পিস্তল বের করব আমি। জঘন্য ঘামাদের শহর এবং তোমরা! বলে আর দাঁড়াল না মরগান, সোরেলের লাগাম হাতে আস্তাবলে ঢুকে পড়ল।

ভেতরে, বুড়োর কামরায় এসে বসল ও। কোণের স্টোভে পানি চড়িয়ে দিয়েছে হসল্যার। না তাকিয়েও মরগান টের পেল ওকে দেখছে বুড়ো।

তোমার নাম জেমস মরগান নয়, নিশ্চিত আমি। ওরকম হলে অনেক আগেই নামটা শুনতাম। তোমার মত লোকেরা অন্যের গল্পের খোরাক না হয়ে পারে না।

নিরুত্ত থাকল মরগান।

বোধহয় চলে যাচ্ছ, না?

আজই নয়, দৃঢ় হলো ওর চোয়ালের পেশী। ব্যাপারটার শেষ না দেখে যাওয়ার ইচ্ছে মোটেও নেই। কার্টারের আর কত লোক আছে? এতগুলো প্রাণ তাকে দমানোর জন্যে যথেষ্ট নয় কি? খেলাটার আসল হোতা কে? কিছু টাকার লোভ দেখিয়ে কুকুরের মত এক ডজন লোককে লেলিয়ে দেয়া হয়েছে ওর পেছনে। অথচ টাকার কথা কাও জানার কথা নয়, কেবল একজন ছাড়া। তার পক্ষে আঁচ করা সম্ভব-মরগানের পরিচয়ের সাথে ওর স্যাডল ব্যাগের টাকাগুলোর। একটা যোগসূত্র আছে। আলফ্রেড টেনিসন।

চরম একটা সিদ্ধান্ত নিল ও। টেনিসনকে মোকাবিলা করা ছাড়া এখান থেকে এক পা-ও নড়বে না। তবে লোকটা অসম্ভব ধূর্ত। নিজের কাজ হাসিল করতে বিন্দুমাত্র কষ্ট করতে হয়নি তাকে, বরং তারই ইঙ্গিতে ঘটছে সবকিছু। ডজন খানেক লোকের মৃত্যুর কারণ এই লোকটাই।

ও বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে কি করবে টেনিসন? জানার উপায় নেই। আর কত কূট-কৌশল তার মাথায় আছে খোদা মালুম। একসময় বেরিয়ে আসতেই হবে তাকে, আসতে বাধ্য করবে মরগান। তারপর মোকাবিলা করবে লোকটাকে। খুব সম্ভব সে নিজেই কাটার নামে ক্যাকটাস হিলের ওপাশে রাজত্ব। করছে, আর এপাশে আলফ্রেড টেনিসন নামে ধনী এক র‍্যাঞ্চার। দারুণ এক খেলা! লোকটার বুদ্ধির তারিফ করতেই হয়।

তালে হকিন্স কে?

মরগান, কফি পরিবেশন করার পর সামনের চেয়ারে এসে বসল হসল্যার। বোধহয় চলে যাওয়াই উচিত তোমার। শনিবার আজ। সব বাথানের পাঞ্চারে ভরে যাবে শহর। ওই ফাঁকে কার্টারের লোকজনও অনায়াসে ঢুকে পড়তে পারবে। তেমন হলে তোমাকে ওরা খুঁজে নেবেই।

আমাকে থাকতে দেবে না নাকি?

না, তা কেন! তুমি থাকলে ভাড়া পাব। কিন্তু আজ রাতে ঝামেলা হলে নিরীহ লোকও হতাহত হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, সার্কেল-এম আর টেনিসনের পাঞ্চারদের মধ্যে যে কোন সময়ে লড়াই বেধে যেতে পারে।

বুড়োকে নিরীখ করল মরগান। ভয়-ডর বলতে কিছু নেই মুখে। ঝামেলা ভয়। পাও?

না, শুধু তোমার নিরাপত্তার দিকটা ভাবছি আমি, নিস্পৃহ কণ্ঠে বলল সে, ফের মগে কফি ঢালল। আরেকটা কাজ অবশ্য করতে পারো-ভাল হবে যদি আস্তাবল ছেড়ে কোথাও না যাও।

উঠে দাঁড়াল ও। এখানেই থাকছি আমি। ঠিকমত ঘোড়ার যত্ন কোরো স্যাডল চাপিয়ে রাখার দরকার নেই। কফির জন্যে ধন্যবাদ। বেরিয়ে এল ফুটপাথ ধরে উত্তরে এগোল মরগান। উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে হাঁটছে। পেছনে এল অশ্বারোহীর খুরের শব্দ পেয়ে ঘুরে তাকাল, এইমাত্র শহরে প্রবেশ করছে জন। পাঞ্চারের একটা দল।

ডানে ব্যাংকের দিকে দৃষ্টি চলে গেল ওর। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে মেলিসা। বডম্যান। বাইরে অপেক্ষারত চার পাঞ্চারের মুখে হাসি ফুটল, দ্রুতনজেদের পাওনা বুঝে নিয়ে সরে পড়ল ওরা। অপেক্ষা করার ফাঁকে এক সিগারেট রোল করল মরগান।

ওকে দেখতে পেয়ে হাসল মেলিসা। প্রত্যুত্তরে নড করল মরগান, এগোতে গিয়েও থেমে গেল। ব্যাংকের ভেতর থেকে বেরিয়ে মেলিসার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে আলফ্রেড টেনিসন। সহাস্যে মেলিসাকে কিছু জিজ্ঞেস করল সে, উত্তরে মৃদু মাথা ঝাঁকাল মেয়েটা। মরগানের ওপর চোখ পড়তে থমকে দাঁড়াল টেনিসন, আড়ষ্ট হয়ে গেল কাঁধ দুটো। চটজলদি নিজেকে সামলে নিল সে, নির্বিকার হয়ে গেল মুখ। লিসা, পাই প্যালেসে গিয়ে বসো, বেশ জোরেসোরেই বলল সে, মরগানের ওপর থেকে চোখ সরায়নি। দেরি হবে না আমার। সেলুনে গিয়ে পাঞ্চারদের পাওনা মিটিয়েই চলে আসব। মেলিসার ডান হাত ধরে চাপ দিল সে, তারপর সিঁড়ি ভেঙে নেমে এল।

কেমন আছ, মরগান? সামনে এসে সহাস্যে জানতে চাইল টেনিসন। আমাদের শহরটা বোধহয় ভাল লাগতে শুরু করেছে তোমার? নইলে এতদিন থাকতে না। যদ্র জানি যথেষ্ট তাড়া আছে তোমার।

নোংরা শহর, নিচু স্বরে বলল মরগান যাতে কেবল টেনিসনই শুনতে পায়। এবং এখানকার বেশিরভাগ মানুষই তোমার মত নোংরা ও কপট।

তুমি বোধহয় বলতে চাইছ…’ পেছনে মেলিসার উপস্থিতি টের পেয়ে থেমে গেল টেনিসন। শ্রাগ করে সরে গেল ওখান থেকে।

মেলিসা সামনে আসতে নড করল মরগান, সপ্রতিভ দেখাচ্ছে মেয়েটিকে। পাল্টা ওর কুশল জানতে চাইল বডম্যান-কন্যা।

পাঞ্চারদের একটা দল পেরিয়ে গেল ওদের, ধুলো ওড়ায় কিছুটা দূরে সরে এল ওরা।

চলো, পাই-প্যালেসে যাই, প্রস্তাব দিল মেলিসা।

ওখানে কি আমার যাওয়ার কথা? একটু পর টেনিসন আসবে, হলফ করে বলতে পারি তোমার সাথে আমাকে দেখলে খেপে যাবে ও।

এটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার, নয় কি? রূঢ় স্বরে বলল মেলিসা, বিরক্তি চেপে রাখার চেষ্টা করছে না। আমি তোমার সাথে এক কাপ কফি খেলে ওর অসুবিধে কি? ওর পছন্দ-অপছন্দে কিছু যায়-আসে না আমার।

ওকে যথেষ্ট সমীহ করে চলো তুমি, সম্ভবত ভয়ও পাও।

ম্লান হলো না মেলিসা বড়ম্যানের হাসি। খুবই সত্যি কথা, কিন্তু এটা তো ঠিক আমাদেরকে একসঙ্গে কফি খেতে দেখলে আমাকে বা তোমাকে, কাউকেই খুন করবে না ও! হালকা সুরে কথাগুলো বলে এগোল মেলিসা।

, দ্বিধান্বিত পায়ে অনুসরণ করল মরগান। রহস্যময় লাগছে মেলিসাকে, টেনিসনকে ভয় পায় অথচ র‍্যাঞ্চারকে কেয়ার না করে ওর সাথে কফি খেতে চাইছে। পরস্পরবিরোধী আচরণ। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, এ মেয়ে টেনিসনের বাথানে একটা রাত কাটিয়েছে বিশ্বাস করতে পারছে না মরগান; এবং দু’জনকে। পরস্পরের শত্রু বলা যাচ্ছে না এখন আর। ব্যাংকের সামনে টেনিসনের অপেক্ষায়। ছিল মেয়েটা, নিশ্চিত রিগান। যে লোককে ভয় পাওয়ার কথা তার সাথে এমন সহজ আচরণ করা অস্বাভাবিক।

মরগানের ধারণা যেভাবেই হোক মেয়েটাকে পটিয়ে ফেলেছে ধুরন্ধর লোকটা। সমালোচনার দৃষ্টিতে যাচাই করল দু’জনকে–মেলিসা বডম্যান যতটা ভাল, ততটাই খারাপ টেনিসন। লোকটির মধ্যে ভাল গুণ কেবল কয়েকটা-সাহসী, বুদ্ধিমান এবং সুদর্শন সে। মেলিসাও অকপটে স্বীকার করে এসব। ক্যাসল টাউনে প্রথম যেদিন এসেছিল মরগান, বক্স-টি ক্রুদের তোপের মুখে পড়েছিল মেলিসা, পরে ফ্ল্যাগ-বিতে গিয়ে হুমকি দিয়েছে টেনিসন। এসবের পরও কিভাবে তার সাথে সহজভাবে মিশছে মেয়েটি?

পাই প্যালেসে কোণের একটা টেবিলে বসল ওরা। কফির ফরমাশ দিয়ে উৎসুক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকাল মেলিসা। তোমার তো অনেক আগেই চলে যাওয়ার কথা।

পারছি না। তুমি যেমন টেনিসনকে এড়াতে পারছ না।

হোঁচট খেল যেন মেয়েটা, চোখ-মুখের ভাব দেখে তাই মনে হলো মরগানের। তবে দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। কিন্তু এটাও ঠিক, ওকে এত সহজে ছাড়ছি না আমি। ওর এখানে টিকে থাকা আমার ওপর নির্ভর করছে। লজপোল পাইনের জায়গাটা ছেড়ে দিলে নিশ্চিন্তে একটা সাম্রাজ্য গড়তে পারে ও।

সেজন্যেই কি তোমার সাথে সহজ হতে চাইছে?

উ…অনেকটা সেরকমই।

মিসেস উইলিয়ামস কফি পরিবেশন করার সময় আলাপে ছেদ পড়ল। নীরবে কফি পান করছে দু’জন, নীরবতা ভাঙছে না কেউ। দরজার দিকে মরগানের নজর। টেনিসন এখানে উপস্থিত হওয়ার আগেই চলে যেতে চায়।

তুমি তো টেনিসনকে চেনো, কিছুক্ষণ বাদে জানতে চাইল ও। টেনেসিতে ওর একটা বাথান ছিল, বেশ বড়সড়। অথচ ওটা ছেড়ে এসে মরুভূমির মত একটা জায়গা বেছে নিয়েছে এখানে। একটু অস্বাভাবিক না? বোধহয় কারণটা বলতে পারবে তুমি, ম্যাম। আমার ধারণা, টেনিসন শুধু একজন বাথান মালিকই ছিল না, অন্য কিছু

একই প্রশ্ন আবারও করলে, মি. মরগান, অসহিষ্ণু স্বরে বাধা দিল মেলিসা। এসব জানতে চাইছ কেন?

বিব্রত বোধ করল মরগান, মেলিসার কাছ থেকে এমন নির্লিপ্ত উত্তর আশা করেনি। ওর অতীত সম্পর্কে জানতে চাইছি।

সেটা কি খুব গুরুতুপূর্ণ?

অল্প সময়ের মধ্যে কোন লোককে বিচার করতে হলে তার অতীতটাই সবচেয়ে কাজের হয়ে দাঁড়ায়। এ দেশটা অনেক বড়, ম্যাম। এখানে ভালমানুষের পাশাপাশি খারাপ মানুষও আছে, নিজের অতীত ঢেকে রাখতে চায় কেবল খারাপ লোকেরাই।

কি যেন বলতে চেয়েছিল মেলিসা, মরগানের শেষ কথায় থেমে গেল। বিদ্রূপ আর কৌতুকভরা চাহনিতে দেখল ওকে। কথাটা বোধহয় পুরোপুরি ঠিক নয়। কারও কারও জন্যে অতীতটা একান্তই সমস্যার, শুধু তার নিজের জন্যে।

টেনিসন সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম, ম্যাম।

দুঃখিত, সাহায্য করতে পারছি না। এটা তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। অন্যের ব্যাপারে খোঁজ-খবর রাখি না আমি। তুমি যদি নাচার হও টেনেসিতে খোঁজ নিতে পারো। ওখানকার মার্শাল বোধহয় সাহায্য করতে পারবে তোমাকে। একটা তার করে দাও।

বিস্মিত হলো মরগান। টেনিসনের অতীত গোপন করতে চাইছে মেলিসা বডম্যান! ব্যাপারটা হজম করতে সময় লাগল ওর। টেবিলের ওপর থেকে হ্যাট তুলে নিয়ে উঠে দাড়াল ও, নড় করল। ধন্যবাদ, ম্যাম। তোমার পরামর্শ মনে থাকবে আমার।

মি, মরগান?

চলে আসছিল ও, থেমে ঘুরে তাকাল।

চেয়ার ছেড়ে এগিয়ে এল মেলিসা, কিছুটা বিচলিত এবং অনুতপ্ত দেখাচ্ছে। তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ আমি। যদি

শুধু ওর নামটা বলল, ম্যাম। আর কিছু জানার প্রয়োজন নেই আমার।

যুগপৎ বিস্ময় আর অস্বস্তি দেখা গেল বডম্যান-কন্যার চোখে। এটাই তো ওর নাম!

স্মিত হাসল মরগান, নিজের ওপর বিরক্ত-কৃতজ্ঞতার সুযোগেও নরম করতে পারেনি মেয়েটিকে। কোন লাভই হলো না।

আমি শুধু জানি…এখানে আসার আগে খারাপ কিছু করেনি ও। টেনেসিতে খুব কমই থাকত সে, কেবল শেষের দুটো বছর ছাড়া। এর আগে বাউণ্ডুলের মত এখানে-সেখানে কাটিয়ে দিত।

হতাশ হলো মরগান। ত্যাগ করে হাঁটতে শুরু করল, একরকম নিশ্চিত টেনিসনের ভয়ে মুখ খুলছে না মেয়েটা। ও কি ভুল করছে? টেনিসন হয়তো আদপে দোষী নয়, অন্তত ও যেরকম ভাবছে সেরকম না হলে? আনমনে মাথা নাড়ল মরগান, নিজের বিশ্বাসের ওপর আস্থা আছে ওর। হাজার মানুষ দেখেছে জীবনে, এদের ধাত বুঝতে শিখেছে। সাচ্চা লোক হতে পারে না টেনিসন, নিজের জীবন বাজি রেখে বলতে পারবে ও। বৈরী এ দেশটিতে একটা মানুষকে দেখে বা দু’একটা কথা শুনে বা আচরণে তার সম্পর্কে ধারণা করে নিতে হয়, মাঝে মাঝে দেখা যায় ওই ধারণাই দারুণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। চলার পথে যে কারও কাছ থেকে বিপদ আসতে পারে, মুহূর্তের ব্যবধানে বদলে যেতে পারে পরিস্থিতি। নিজের সম্পর্কে বলে বেড়ায় না কেউ, সুতরাং তার আচরণ আর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই লোকটিকে চিনে নিতে হয়; আগাম ধারণা করে নিতে হয়, লোকটি কতটা বিপজ্জনক হতে পারে। বছরের পর বছর হাজারো মানুষ সম্পর্কে এমন ধারণা করে অভ্য হয়ে গেছে মরগান, এবং তাতে যে ভুল হয় না এর বড় প্রমাণ এখনও ওর বেঁচে থাকা।

আলফ্রেড টেনিসনের মত লোকের অতীত পরিষ্কার হতে পারে না।

পাই প্যালেস থেকে বেরিয়ে একটা সেলুনে ঢুকল ও। তিন ঘণ্টা পোকার খেলার ফাঁকে নজর রাখল শোকজনের ওপর। সন্ধের পর ভিড় বাড়তে বেরিয়ে এসে আস্তাবলের দিকে এগোল মরগান। পোর্চে এসে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ, সিগারেট রোল করার ফাঁকে আশপাশে সতর্ক নজর চালাল। দুশ্চিন্তা করার মত কিছু নেই। আস্তাবলের ভেতর থেকেও কোন সাড়া আসছে না। সময় নিয়ে সিগারেট শেষ করল ও। মেলিসা বডম্যানের রহস্যময় আচরণ মনে পড়ছে বারবার, অনুমান আর বাস্তবের হিসাবের জের টানতে পারছে না বলে বিরক্তি লাগছে। অধৈর্য হয়ে হাল ছেড়ে দিল ও, আস্তাবলের ভেতরে ঢুকে পড়ল।

ওপরে উঠতে যাচ্ছিল মরগান, পেছনে হালকা পায়ের শব্দে ঘুরে তাকাল। হল্যার। লোকটাকে দেখেই টের পেল কিছু একটা হয়েছে, নিদেনপক্ষে ওর জন্যে একটা খবর আছে।

পালাও, মরগান! তোমাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে তিনজন লোক। এখানেও এসেছিল ওরা, মিথ্যে বলে বুঝ দিয়েছি ওদের।

কার্টারের দল, না টেনিসনের?

মনে হয় না। ওদের ঘোড়া দেখে মনে হলো অনেক দূর থেকে এসেছে। এদের অন্তত একজন বন্দুকবাজ। অন্যরা ওকে অ্যাবল বলে ডাকছিল।

পাগলাঘণ্টী বাজল মরগানের মনে। যা ভয় পেয়েছিল, তা-ই হয়েছে। কিন্তু কিভাবে ওর হদিস পেল ওরা?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *