৫. রাতে ঠিকমত ঘুম হয়নি

রাতে ঠিকমত ঘুম হয়নি মরগানের। অস্বীকার করতে পারবে না চাপা অস্বস্তি ঘিরে রেখেছে ওকে। কারণটা ধরতে পারল-ত্রু সম্পর্কে কিছুই জানা নেই, অথচ ওর সম্পর্কে সবই জানে শত্রু! এরকম খেলা মোটেও পছন্দ নয় মরগানের, শত্রুর চেয়ে এক ধাপ পিছিয়ে থাকা ওর ধাতে সয় না

সারাদিন শুয়ে-বসে কাটিয়ে দিল ও আস্তাবল থেকে বেরিয়েছে কেবল দু’বার, নাস্তা আর লাঞ্চ করার জন্যে। ভাব জমানোর চেষ্টা করেছে বুড়ো হস্যারের সাথে। কথা বলে সময় কাটানোই সার হয়েছে, কাজের কিছু জানতে পারেনি। টেনিসন বা ম্যাকলয়ারীদের প্রসঙ্গে কোন মন্তব্য করেনি বুড়ো। শেষে বিরক্ত হয়ে ওপরে উঠে ক্ষতের ড্রেসিং বদলেছে মরগান। স্টকে যা ছিল তার সবই ঝাড়ল বুড়োর উদ্দেশ্যে। খেয়ালী এ লোকটার কাছ থেকে কিছুই বের করা যাবে না, যতক্ষণ না সে নিজে মুখ খোলে।

নিজের বেহাল অবস্থা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে মরগান। অনায়াসে ওকে আটকে রেখেছে শত্রুপক্ষ। ক্যাসল টাউন থেকে বেরুতে গেলেই সদলে হামলে পড়বে। তবে এত সহজে সবকিছু ঘটতে দেবে না সে। কয়েকটাকে সাথে নিয়ে মরবে, হাড়ে হাড়ে টের পাবে ওরা। সিঁড়িতে পদশব্দ পেয়ে ভাবনার লাগাম। থামাল ও। শুয়ে থাকল একইভাবে, নড়ল না এতটুকু, শুধু ডান হাতে হোলস্টার থেকে তুলে নিয়েছে একটা সিক্সশূটার। পায়ের শব্দ দোতলায় উঠে আসতে তটস্থ পেশীতে ঢিল পড়ল। এ পায়ের শব্দ ওর চেনা, হসল্যার।

পাওনা নিতে এলাম, বরাবরের মত নিস্পৃহ কণ্ঠে বলল বুড়ো। আমার ধারণা আজই চলে যাচ্ছ তুমি।

অনেকগুলো প্রশ্ন ভিড় করল মরগানের মনে, কিন্তু কোনটাই জিজ্ঞেস করল। শুধু জরিপ করল লোকটাকে। অদ্ভুত মানুষ, তার পেশার লোকদের চেয়ে আলাদা সবকিছু আগে আগেই টের পায় সে। পাওনা মিটিয়ে দিল ও।

ঘোড়াটা তৈরি থাকবে।

বোসো। একা থাকতে বিরক্তি ধরে গেছে।

দাঁড়াল সে, তবে বসল না।

টাকা-পয়সার দরকার নেই নাকি তোমার? কিছু খবর দরকার আমার, আর সেগুলো জানো তুমি। আমাকে জানালে দুজনেই উপকৃত হতাম।

তোমাকে পছন্দ হচ্ছে না আমার

মোটেও অবাক হলোনা মরগান। পশ্চিমে এটাই স্বাভাবিক, এখানকার বেশিরভাগ লোক স্পষ্টভাষী এবং সাহসী। তাহলে টেনসনকেই তোমার পছন্দ? শ্লেষের সুরে জানতে চাইল ও, চাইছে লোকটা রেগে যাক, তাহলে বেস কিছু বলে ফেলতেও পারে।

না, তাকেও পছন্দ নয় আমার।

তাহলে নিশ্চই টেনিসনের কাছ থেকে পয়সা খেয়েছ?

হাসল বুড়ো, তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বেঁকে গেল ঠোঁটের কোণ। তোমার ধারণায় কিছু যায়-আসে না আমার। হাটতে শুরু করেও ঘুরে দাড়াল। শিগগির এখান থেকে চলে গেলে ভাল করবে। তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছে ওই লোকগুলো। ধৈর্যহারা হয়ে একসময় চলে আসবে ওরা, একা এত লোককে সামাল দিতে পারবে না।

পরামর্শ চাই না।

মাথা ঝাঁকাল সে, হাসল ফের

তুমি তো আমাকে পছন্দ করো না, তাহলে পরামর্শ দিচ্ছ কেন?

তোমাদের এ খেলাটা পছন্দ হচ্ছে না আমার।

মানে?

একজন লোককে এভাবে কোণঠাসা করা আমার ভাল লাগেনি।

পাশে এসে দাঁড়াবে তো না-ই, কিছু তথ্য দিয়েও সাহায্য করছ না আমাকে!

কারও ঝামেলায় নিজেকে জড়াই না আমি।

ইতোমধ্যে কমও জড়াওনি।

শ্রাগ করল লোকটা। ধরে নাও একজন শুভাকাঙ্ক্ষীর প্রত্যাশা।

ধন্যবাদ।

নড করে চলে গেল বুড়ো।

জালটা হেঁড়ার কয়েকটা পরিকল্পনা করল মরগান, কিন্তু একটাও মনে ধরল। শেষে বিরক্ত হয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এল। শহরটা জেগে উঠেছে। পাই প্যালেসে এল ও। খদ্দেরে পরিপূর্ণ, কিন্তু আজ আর এ নিয়ে ভাবল না মরগান। লুকিয়ে থেকে লাভটা কি! ওরা জানে কোথায় আছে সে, সুতরাং রাখ-ঢাক করে লাভ নেই আর। আপাতত একটা কাজই করার আছে, চোখ-কান খোলা রাখছে যাতে অতি উৎসাহী কেউ আচমকা ওর অসতর্কতার সুযোগ নিতে না পারে।

মিসেস উইলিয়ামসের সাথে নতুন এক লোককে দেখা গেল, সম্ভবত কুক। সে-ই মরগানের ফরমাশ নিল। খাওয়ার সময় ওর সামনে এসে দাঁড়াল মহিলা। মি. মরগান, দেরি হওয়ার জন্যে দুঃখিত। জেনি নেই তো, সব সামাল দিতে…’

কিছু বলল না মরগান, স্মিত হেসে অভয় দিল তাকে।

মেয়েটা জেদ ধরল ম্যাককার্থিদের ওখানে যাবেই, বাধা দেই কি করে! এমন। একটা অনুষ্ঠান তো মাসে মাসে হয় না, থেমে সামনের চেয়ারে বসে পড়ল। মি. মরগান, এবার নিচু হয়ে এল মহিলার কণ্ঠ। সকালে শহরে এসেছিল মেলিসা বডম্যান, তোমার সম্পর্কে জানতে চাইল।

বিষম খেল মরগান। দ্রুত নিজেকে সামলে নিল ও, গ্লাস তুলে পানিতে চুমুক দিল।

তোমাকে শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার অনুরোধ করেছে ও। তোমার ব্যাপারে বেশ চিন্তিত মনে হলো ওকে

ধন্যবাদ, ম্যাম।

কফি আসার পর সিগারেট ধরাল ও। পুলক অনুভব করছে, মেলিসা বডম্যান ওকে নিয়ে ভাবছে, এটা আশাতীত ব্যাপার। তবে এটাও ঠিক, এর সবটুকুই। কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। উপকারীর প্রতি শুভাকাঙক্ষা মাত্র। তার জায়গায় মরগান নিজে হলেও তাই করত।

একটা ব্যাপার পরিষ্কার, শহরে ওর উপস্থিতি সম্পর্কে জানে সবাই। এত রাখ-ঢাক সময়টাকে মোটেই দীর্ঘায়িত করতে পারেনি। হসল্যার মুখ খোলেনি, নিশ্চিত জানে ও, তাহলে এর কারণ কি টেনিসনের সাথে ওর গতরাতের সাক্ষাৎ? সতর্কতা অনুভব করল মরগান, অবচেতন মনে টের পাচ্ছে জালটা ছোট করে আনছে ওরা। হয়তো আজ রাতেই আস্তাবলে হানা দেবে, কিংবা একটা সেলুনে ইচ্ছে করেই ঝগড়া বাধিয়ে কাজ সেরে ফেলতে চাইবে। তবে দ্বিতীয়টির সম্ভাবনা কম, কারণ এ পর্যন্ত শহর এড়িয়ে চলেছে লোকগুলো।

তবে আজ সেলুনে যাবে ও। সারাদিন বসে থেকে বিরক্তির চরমে পৌঁছে গেছে। মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে আছে। সবচেয়ে বড় কথা, এভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়ে থাকা ওর একেবারেই অপছন্দ। আসুক ওরা, বুলেট কখনও ভাল-খারাপের বাছ-বিচার করে না। আজই এখান থেকে বেরিয়ে যাবে, সিদ্ধান্ত নিল মরগান, নয়তো কখনোই নয়।

সিদ্ধান্ত নিতে পেরে সন্তুষ্ট হলো ও। পাই-প্যালেস থেকে বেরিয়ে ইতস্তত ঘোরাঘুরি করল কিছুক্ষণ, তারপর আস্তাবলে ফিরে এসে স্যাডল ব্যাগটা আছে কি পরখ করল। সোরেলের কাছে গেল নামার পথে। বিশ্রাম পেয়ে তরতাজা হয়ে আছে ঘোড়াটা, ছোটার জন্যে উন্মুখ।

বাইরে থেকে সেলুনগুলোর ভেতরের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করল ও। তারপর আস্তাবলের সবচেয়ে কাছের সেলুনে ঢুকে পড়ল। সব মিলিয়ে দশ-বারোজন লোক। বারের কাছে এসে দাড়াল মরগান। বারটেন্ডারের হাসির জবাবে বিয়ারের ফরমাশ দিল। বিয়ারের ক্যান পেয়ে সরে এল পোকার টেবিলের কাছে। দাড়িয়ে খেলা দেখল মিনিট দুয়েক। দু’জন ব্যবসায়ী আর এক কাউহ্যান্ড খেলছে। ডিলার লোকটা পেশাদার জুয়াড়ী, একনজর দেখেই বুঝল ও।

খেলবে নাকি? একটু পর উঠে দাঁড়িয়ে জানতে চাইল কাউহ্যান্ড। ফতুর হয়ে গেছি আমি।

তার ছেড়ে দেওয়া চেয়ার দখল করল মরগান। দেয়ালের আয়নায় চোখ বুলাল একবার, সেলুনের প্রায় সবটাই চোখে পড়ছে।

তাস শাফল করছে ডিলার।

খেলা শুরুর দশ মিনিটের মধ্যেই মরগান টের পেল চুরি করছে লোকটা। তুমি বোধহয় বুঝতে পারোনি শুধু ভাগ্য আর নিজেদের বুদ্ধি দিয়ে খেলর আমরা লোকটাকে বলল ও। রাজি না থাকলে উঠে যাও, অন্য কোথাও গিয়ে চেষ্টা করো। আমি যা জানি, এরা যদি তা শোনে, বিপদ হবে তোমার।

তোমাকে পাত্তা দিচ্ছে কে? তড়পে উঠল ডিলার, মরগানের শীতল দৃষ্টিকে গ্রাহ্য করল না।

খোদার কসম, আরেকটা কথা বললে তোমার কোট খুলব!

চেষ্টা করেই দেখো!

পেছনে চেয়ার ঠেলে দিয়ে উঠে দাঁড়াল মরগান। প্রতিপক্ষের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে। টেবিলের পাশ ঘেঁষে দু’পা এগোল জুয়াড়ীর দিকে, ইতোমধ্যে উঠে দাঁড়িয়েছে সে। বন্ধুরা, এই লোকটাকে পছন্দ হচ্ছে না আমার, অন্যদের উদ্দেশে বলল ও। বাজে মতলবে আছে ও। ওর মাথা থেকে ভূতটা নামাতে হবে। নিমেষে হাত বাড়াল ও, জুয়াড়ীর কোটের কলার ধরে ঢ্যাঙা শরীর মেঝে থেকে কয়েক ইঞ্চি ওপরে তুলে ফেলল। শুনেছ কি বলেছি আমি। সোজা বেরিয়ে যাও, নয়তো পিটিয়ে রাস্তায় ফেলব তোমাকে।

কি করেছি আমি! প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠল জুয়াড়ী।

তেমন কিছু এখনও করোনি, তবে করতে পারো। সেজন্যে আগেই কেটে পড়তে বলছি। থাকতে পারো, বাজে মতলব বাদ দিতে হবে তাহলে।

থাকছি আমি, আপসের সুরে বলল সে, তোমাদের পছন্দমতই চলবে।

উল্টাপাল্টা কিছু করলে সোজা গুলি করব, ঠিক তাসগুলো যেখানে আছে ওসব জায়গায়, লোকটাকে ছেড়ে দেয়ার সময় চাপা স্বরে হুমকি দিল মরগান।খেয়াল করল মারামারি দেখার মজা থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে নিরাশ হয়েছে সেলুনের খদ্দেররা। ওদের দিকে মনোযোগ দেয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলল।

কোন জোচ্চোরের সাথে খেলব না আমি! উঠে দাঁড়াল একজন, চোখে ঘৃণা দেখা গেল। দুনিয়ায় এই পেশার লোকদের সহ্য হয় না আমার!

নতুন একজন বসার পর খেলা শুরু হলো। কাউহ্যান্ড বা ব্যবসায়ীরা কেউই পেশাদার নয়। অভিজ্ঞতা আর কৌশলের ঘাটতির কারণে কুলিয়ে উঠতে পারল না ওদের সাথে। জুয়াড়ী আর মরগানই জিতছে। ঘণ্টাখানেক পর নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীরা বসল। এরাও হারল।

মরগানের ইচ্ছে ছিল জুয়াড়ীর কিছু টাকা খসাবে। আজ রাতে যদিও ভাগ্য ওর অনুকূলে নেই বলা চলে। কিছুক্ষণ পর টের পেল ধীরে ধীরে হারতে শুরু করেছে, চুরি ছাড়াই জিতছে জুয়াড়ী! রাগ হলো ওর। মনোযোগ দিল খেলায়, নিজের টাকায় অন্য কেউ ফুর্তি করবে, সহ্য হবে না মরগানের। এমন ভাব করল যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে ও, ছোট কার্ডে ব্লাফ দিয়ে জিততে চাইছে। দু’বার ইচ্ছে করেই হারল, বেশ বড়সড় দান। মনে আশঙ্কা হয়তো বেশি ঝুঁকি নিয়ে ফেলেছে। জুয়াড়ীর পকেটে এখন ওর কয়েকশো ডলার রয়েছে।

নতুন করে তাস বাটা হলো। একনজর দেখে নামিয়ে রাখল মরগান। বিরক্ত হয়ে ড্রিঙ্ক চাইল। নিজের দানের সময় একটা কার্ড নিল, পরেরবার আরেকটা। তারপর শুরু করল আসল খেলা। ব্লাফ ভেবে দান বাড়াচ্ছে জুয়াড়ী : টেবিলে চিপসের তৃপ জমে গেছে। লাভে চকচক করছে জুয়াড়ীর দুই চোখ, আলতোভাবে টেবিলের ওপর রেখেছে হাত দুটো। টেবিলের মাঝখানে চিপস ঠেলে দেয়ার সময় কোনরকম জড়তা দেখা গেল না, হয়তো লাভের টাকায়। খেলছে বলেই। একটু পর অবস্থা এমন পর্যায়ে চলে গেল যে ওই দান জেতা দু’জনের জন্যেই জেদের ব্যাপার হয়ে দাড়াল।

চারপাশে দাঁড়িয়ে মজা দেখছে লোকজন। সিগারেট রোল করার ফাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বীকে জরিপ করল মরগান। শেষ চাল দিল এবার। ভাব দেখাল যেন শো করবে পরেরবার, নেহায়েত অনিচ্ছায় চিপস ফেলছে। ওর দ্বিধা দেখে টাকার অঙ্ক দ্বিগুণ করে দিল জুয়াড়ী। পরেরবারও একই কাণ্ড করল ও, নির্বিকার মুখে টাকা দিয়ে গেল লোকটা। তিন রাউন্ড এভাবে চলার পর হতাশ হয়ে পড়ল জুয়াড়ী, টের পেয়ে গেল সমূহ বিপদ, কিন্তু ফেরার উপায়ও নেই। শশা দিল সে।

চুরি করেছ তুমি! এটা কি করে সম্ভব? মরগান তাস উল্টে দেখানোর পর প্রায় আর্তনাদ করে উঠল সে, চোখে অবিশ্বাস।

তাই? ভুরু নাচিয়ে হেসে উঠল মরগান। তোমার তাসগুলো উল্টাও, ওখানে চারটে টেক্কা আছে। যার একটা অন্য সেটের। উল্টাও!

বাজে বকছ, বন্ধু, তাস উল্টানোর আগ্রহ দেখাল না জুয়াড়ী। পাচটা কার্ড একসাথে ভাজ করে রেখেছে টেবিলের ওপর। উঠে দল সে, কোমরের কছাকাছি চলে গেছে হাত।

সতর্কঘন্টা বাজল মরগানের ভেতর। স্থির দৃষ্টি সেঁটে আছে লোকটার ওপর। বব রবার্ট নামের পাশের প্রতিদ্বন্দ্বীর উদ্দেশে বলল ও। ওর কার্ডগুলো টেবিলের ওপর বিছিয়ে দাও তো।

কাউহ্যান্ড তাসের দিকে হাত বাড়াতে ছোঁ মারল নোকটা। একসঙ্গে দু’হাত চালাল। বাম হাতে টেবিল থেকে খাবলা মেরে তুলে নিল তাসগুলো, অন্য হাতে পিস্তল চলে এসেছে। পিস্তলের নলে কাভার করল সবাইকে। ঠিক আছে, আমরা দুজনেই জানি কি করেছি আমরা। ওই টাকার অর্ধেকের বেশি আমার, তো ওগুলো ফেলে যাই কিভাবে? তাসগুলো পকেটে ঢুকিয়ে চিপস নেয়ার জন্যে হাত বাড়াল সে। বোকামি কোরো না, মরগান, গুলি করার সুযোগ দিয়ো না আমাকে।

প্রমাদ গুণল মরগান। কাউহ্যান্ড লোকটা বোকার মত দু’জনের মাঝখানে বাধা হয়ে না দাড়ালে ড্র করার সাহস করত না জুয়াড়ী। ছক পাল্টে গেছে বুঝতে পেরে আহাম্মকের মত জুয়াড়ীর দিকে তাকিয়ে আছে কাউহ্যান্ড। মৃদু কাঁপছে তাস নিতে বাড়ানো হাত। ধপ করে চেয়ারে বসে বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলল। দুঃখিত, মরগান, চাপা স্বরে বিড়বিড় করল সে। বুঝতেই পারিনি হারামজাদা এত চালাক।

চিপস্ ভাঙিয়ে টাকা দাও তো, বাপু, বারকিপের উদ্দেশে হাঁক ছাড়ল জুয়াড়ী। জলদি!

নির্দেশ তামিল হতে সব টাকা পকেটে ভরল সে। হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিয়ে মরগানের দিকে তাকাল, তাচ্ছিল্যের হাসি মুখে। তো ভালই খেলা হলো, না? বলতেই হয় তোমার ভাগ্য খারাপ, শ্রাগ করার ভঙ্গিতে কাঁধ উঁচু করল সে। এত টাকা, কি করে ফেলে যাই!

ঠিকই তোমাকে খুঁজে নেব আমি।

উঁহু, আবার আমাদের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা কম।

ভাগ্যের ওপর নির্ভর করা হয়ে গেল না? ভাগ্যের প্রতি ভক্তি বা বিশ্বাস নেই তোমার

বিশ্বাস করি না বলেই নিশ্চিত জানি।

একটু পরেই আবার দেখা হবে আমাদের।

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওকে দেখল জুয়াড়ী। ঝেড়ে কাশো তো!

কিছুই না। টাকাগুলো হজম করতে পারবে না তুমি।

পরেরবার সুযোগ নেয়ার উপদেশ দিচ্ছি তোমাকে।

দ্রুত পিছিয়ে গেল সে, ব্যাটউইং দরজা ঠেলে বেরিয়ে গেল।

গুঞ্জন উঠল সেলুন জুড়ে। ততক্ষণে ছুটতে শুরু করেছে মরগান, তুফান বেগে চিন্তা চলছে মাথায়। পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল ও। কয়েকগজ এগোতে একটা গলি চোখে পড়ল, সেটা ধরে মূল রাস্তার কাছে এসে থামল। উঁকি দিয়ে দেখল ফাঁকা রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে জুয়াড়ী। হাতে এখনও সিক্সশ্যটার। অপেক্ষা করছে কখন বেরিয়ে আসবে মরগান, ধারণা করেছে সামনের দরজা দিয়ে বেরুবে ও।

অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষায় থাকল সে; কিন্তু সেলুন থেকে কেউই বেরুল না দেখে শেষে হাল ছেড়ে দিয়ে হোলস্টারে অস্ত্র ফেরত পাঠাল জুয়াড়ী। ফুটপাথ ধরে হাটতে শুরু করেছে, মরগানের দিকেই এগিয়ে আসছে। নিঃশব্দে মূল রাস্তায় উঠে এল মরগান, দালানের ছায়ায় দাঁড়াল, ঘুরেই যাতে ওকে দেখতে পেয়ে গুলি করতে না পারে লোকটা। তারপর ডাকল তাকে।

ঝটিতি আধ-পাক ঘুরল সে। ঘোরার সময় হোবল মারল হোলস্টারে, নিমেষে হাতে উঠে এল কোল্ট। আন্দাজের ওপর নির্ভর করে কোমরের কাছ থেকে গুলি করল। কিন্তু তাড়াহুড়োয় ফস্কে গেল, তাছাড়া ঠিকমত দেখেওনি ওকে। মরগানের। পাশে দেয়ালে চল্টা উঠাল গুলিটা। কামারের দোকানের জানালা দিয়ে আসা আলোয় জুয়াড়ীকে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে মরগান, সময় নিয়ে নিশানা করে গুলি করল ও। হাঁটু মুড়ে পড়ে গেল লোকটা। তাকে শেষ চেষ্টা করতে দেখে এবার কপালে গুলি করল মরগান। ধুলোমাখা ফুটপাথের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ল সে, মরার আগে উড়ন্ত ধুলোর মধ্যে নিজের হ্যাটটাকে ধীরে ধীরে নেমে আসতে দেখল।

খানিক অপেক্ষা করে এগোল মরগান। পোর্চে বেরিয়ে এসেছে সেলুনের লোকজন, বিভিন্ন মন্তব্য করছে। সেসবে আমল না দিয়ে লোকটার পকেট খালি করল ও, তারপর রাস্তা পেরিয়ে ফের সেলুনে ঢুকল। শেষ রাউন্ড পান করে আস্তাবলে ফিরবে, সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ঠিক বিশ মিনিট পর বেরিয়ে এল ও। কয়েকটা বাড়িতে আলো জ্বলছে এখনও, তারই কিছু রাস্তায় এসে পড়েছে। সিগারেট ফুকতে ফুকতে আস্তাবলের। দিকে এগোল মরগান। চিন্তিত। এতক্ষণ ভুলেই গিয়েছিল চারপাশে ছড়িয়ে থাকা জালের ব্যাপারটা। যেভাবে হোক এটা ছিন্ন করতে হবে। আস্তাবলের ভেতরে ঢুকে পড়ল। বুড়ো বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে, সাড়া নেই। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে যাবে, এসময় ওপরে কয়েকজনের পদশব্দ কানে এল ওর। কমপক্ষে তিনজন, ধারণা করল। নিমেষে হাতে চলে এল জোড়া পিস্তল। তারপর সহসা বাইরে আরও কয়েকজনের সাড়া পেল। টের পেল ফাঁদে আটকা পড়েছে, দুদিক থেকে ওকে ঘিরে ফেলেছে লোকগুলো।

.

ম্যাককার্থিরা এ তল্লাটে সবচেয়ে আমুদে পরিবার হিসেবে পরিচিত। পারিবারিক যে কোন একটা উপলক্ষ পেলেই নাচের আসর বসাবে ওরা, আমন্ত্রণ জানাবে আশপাশের বাথানের সবাইকে। আজ ওদের ছোট ছেলে ব্রায়ানের জন্মদিন।

আশপাশের সবগুলো বাথানের লোকজন এসেছে, বিশেষত মালিক পক্ষের পরিবারগুলো। ম্যাকলয়ারীরা দু’ভাইও এসেছে। অস্বস্তির সাথে আলফ্রেড : টেনিসনের উপস্থিতি লক্ষ করল মেলিসা বডম্যান। হলরুমে ঢোকার পথে দেখা হলো টেনিসনের সাথে। হাতে বিয়ারের গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সে, ওকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এল। সামনে এসে হ্যাট খুলে বাউ করল। কেমন আছ, লিসা?

ভাল, সংক্ষেপে জানাল ও, পাল্টা তার কুশল জানতে চাইল না। লোকটা কি ভাবে সে-নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে কেটে পড়ল। একপাশে ব্রায়ানকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল ম্যাককার্থিরা, সেদিকে এগোল মেলিসা। উচ্ছ্বাসভরে ওকে জড়িয়ে ধরল ডরোথি ম্যাককার্থি, কুশল জানতে চাইল

টেনিসনকে কিছু বলেছ নাকি? একপাশে ওকে টেনে নিয়ে গিয়ে চাপা স্বরে জানতে চাইল মহিলা। মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে আছে ও।

নাহ্, কিছুই তো বলিনি।

তোমার ব্যাপারে আগ্রহের কমতি নেই ওর, অথচ মোটেই সুযোগ দিচ্ছ না। বেচারাকে। লিসা, এ তল্লাটে ওর চেয়ে ভাল কাউকে পাবে না তুমি।

ওকে হাড়ে হাড়ে চিনি আমি

টেনেসিতে, তাই না? হাসল ডরোথি। আমার ধারণা তোমার কারণেই এখানে এসেছে ও। যদূর শুনেছি ওখানে একটা বড়সড় বাথান ছিল ওর।

একটা বাজে মেয়েও ছিল, এটা শোনোনি?

কি বলছ! বিস্ফারিত হলো ডরোথির চোখ।

ওকেই জিজ্ঞেস করে দেখো, ডোনা রাইস নামে কোন মেয়েকে চিনত কি না।

শ্যনকে আনলে না যে? প্রসঙ্গ পরিবর্তন করল ডরোথি।

শরীর ভাল যাচ্ছে না ওর, বাবা নিষেধ করল। তাছাড়া ফিরতে তো রাত হবে। এত রাত করে ফেরা ওর জন্যে ঠিক হবে না।

এরপর ম্যাকলয়ারীদের সাথে কথা বলল মেলিসা। চমৎকার মানুষ মনে হলো দু’ভাইকে। আমুদে এবং মিশুক। প্রতিবেশী হিসেবে ফ্ল্যাগ-বির সাথে সবসময়ই ভাল আচরণ করেছে ওরা, যেটা টেনিসন করেনি।

আড়চোখে কামরার কোণে টেনিসনের দিকে তাকাল মেলিসা, জেনিফার উইলিয়ামসের সাথে গল্প করছে সে। আগ্রহ ঝরে পড়ছে মেয়েটার চোখে। টেনিসন অবশ্য পছন্দ করার মত লোক, মেয়ে-মহলে আলাদা একটা আকর্ষণ আছে তার। জেনি নিজেও সুন্দরী, ভাবল মেলিসা, ওরা হয়তো…

খেতে এসো সবাই, ম্যাককার্থির ডাকে ছিন্ন হয়ে গেল ওর চিন্তা। আনমনে মাথা ঝাঁকাল ও, টেবিলে এসে বসল। পাশেই ডেভিড ম্যাকলয়ারী। মেলিসা খেয়াল করল উল্টোদিকে, একটু দূরে জেনির পাশে বসেছে টেনিসন। চোখাচোখি হতে স্মিত হাসল ও। টের পেল ঠিকমতই লোকটার আঁতে ঘা দিতে পেরেছে। গম্ভীর হয়ে গেছে টেনিসনের মুখ, রোষের সাথে একবার তাকাল ডেভিড় ম্যাকলয়ারীর দিকে, তারপর জেনির দিকে মনোযোগ দিল। একটু পর খানিকটা চমকে দেবে তাকে, সিদ্ধান্ত নিল মেলিসা।

খাওয়ার পর নাচের পর্ব শুরু হলো। প্রথমেই ম্যাকলয়ারীদের সাথে নাচল ও, তারপর ম্যাককার্থির সাথে। বিরতি পড়তে একটা চেয়ারে বসে অরেঞ্জ জুসে চুমুক দিচ্ছিল, দেখল ওর দিকে এগিয়ে আসছে টেনিসন। পাশে এসে বসল।

নাচবে আমার সাথে? কোমল সুরে জানতে চাইল সে।

কেন, জেনির সাথে নেচে আনন্দ পাওনি? তোমার সঙ্গ পেলে খুশিই হবে ও।

মেলিসার কটাক্ষ গায়ে মাখল না টেনিসন, হেসে পাল্টা জানতে চাইল: তুমি হবে না?

না।

ম্লান হয়ে গেল লোকটির হাসি, ধীরে ধীরে গাম্ভীর্য জায়গা করে নিল সেখানে। পুরো হলুরূমের ওপর চোখ বুলাল, তারপর হঠাৎ ফিরল ওর দিকে। ম্যাকলয়ারীদের সাথে নেচেছ তুমি! চাপা অসন্তোষ প্রকাশ পেল কণ্ঠে।

তাতে তোমার কি?

ওই গরুচোরগুলোর সাথে কোন ভদ্রমহিলার নাচা উচিত নয়।

রেগে গেল মেলিসা, বিরক্তি বোধ করছে। কিন্তু কোন জোচ্চোরের সাথে নাচব না আমি! অসহিষ্ণু স্বরে ঘোষণা করল ও। ওদেরকে মোটেও গরুচোর মনে হচ্ছে না আমার। বরং তোমার সম্পর্কে একই দাবি করে ওরা। নিজের দোষ ঢাকতে ওদেরকে উচ্ছেদ করতে চাইছ, সেজন্যে আমার জমিটা দরকার তোমার, যাতে ঝর্নার মুখ বন্ধ করে ওদের পানির উৎস বন্ধ করতে পারো। মি. টেনিসন, তুমি কি চাও আমি সবাইকে বলি যে নিজের ঘরে সুন্দরী স্ত্রী রেখে একটা বাজে মেয়ের পেছনে ঘুরেছ তুমি?

রাগ দেখা গেল টেনিসনের মুখে। তারপর বিব্রত বোধ করল সে, করুণ হয়ে উঠল মুখ। সত্যিই ভুল করেছি আমি, এবং অনুশোচনাও কম করিনি।

নিজেকে প্রবোধ দিচ্ছ?

ন-না। শুধু তুমি…’।

মরগানের পেছনে তুমিই লোক লাগিয়েছ, তাই না? প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলল মেলিসা, অজান্তে কর্কশ হয়ে গেল কণ্ঠ। তোমার ওই ছা-পোষা লোকটা ফেয়ার ফাইটে মারা গিয়েছিল, অথচ একগাদা লোক ওর পেছনে লেলিয়ে দিয়েছ!

ওর প্রেমে পড়েছ নাকি? উমা প্রকাশ পেল টেনিসনের কণ্ঠে।

গা জ্বলে উঠল মেলিসার। পড়লেই তোমার কি! মি. টেনিসন, তোমার মত যার-তার প্রেমে পড়ি না আমি।

খুশি হালাম।

তোমার খুশি হওয়ার কিছু নেই। বরং জেনিকে পটানোর চেষ্টা করো। যদিও আমি চাই না তোমাদের মধ্যে কোন অন্তরঙ্গ সম্পর্ক থোক।

কেন?

মেয়েটা বোকা। ও জানে না কতটা খারাপ লোক তুমি।

তিন বছর আগে একটা মেয়ের সাথে কি করেছি তাতেই খারাপ হয়ে গেলাম?

তোমার নাড়ি-নক্ষত্র খুব ভাল করেই জানি আমি। নিজের স্ত্রীকে বঞ্চিত করেছ তুমি, প্রতারণা করেছ, ওকে অপমান করেছ। তোমার চরিত্র বুঝতে এগুলোই কি যথেষ্ট নয়?

কিছু বলতে গিয়েও নিজেকে নিবৃত্ত করে নিল আলফ্রেড টেনিসন। অসহায়ভাবে কাঁধ উঁচাল। আমার মধ্যে কি ভাল কিছু নেই? প্রায় আপসের সুরে জানতে চাইল শেষে।

আছে। নিরপরাধ কারও পেছনে লাগতে পারো তুমি, জোর-জবরদস্তি করার মত মস্ত একটা গুণও তোমার আছে। আর হাঁ, তুমি অহরী, প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং সাহসী।

মাত্র একটা ভাল গুণ, তা-ই সই। ধন্যবাদ, লিসা। আমি ভালবাসতে পারি, সেটা বললে না?

খানিকটা বিব্ৰত বোধ করল মেলিসা। তুমি ভালবাসা বদল করতেও পারো।

তুমি পারো না, এবার হাসল আলফ্রেড টেনিসন। নিরীখ করছে মেলিসাকে। আমি জানি, এখনও স্বামীকে ভালবাসো তুমি।

কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না মেলিসা, অজান্তে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। গলার ভেতর কিছু একটা দলা পাকিয়ে আছে যেন। নিজেকে সামলে নিতে সময় লাগল ওর। সে একটা বাজে মানুষ! প্রায় আক্ষেপের সুরে স্বীকার করল শেষে।

মেলিসার সামনে এসে দাঁড়াল টেনিসন। এখানকার সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটির সাথে নাচার সৌভাগ্য আমার হবে কি? সহাস্যে, চোখে বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে ফের প্রস্তাব দিল সে।

তুমি একটা বেহায়া! আগেও বলেছি, তোমার সাথে নাচব না আমি। ফের জানতে চাইলে কেন? তোষামোদে গলে যাব ভেবেছ? শোনো, মি. টেনিসন, তোমার সম্পর্কে আমার ধারণা কখনোই পাল্টাবে না।

উঠতে যাচ্ছিল মেলিসা, কিন্তু সামনে থেকে নড়ল না টেনিসন। তার ছাইরঙা চোখজোড়া বিদ্ধ করল ওকে। অজানা কারণে অস্বস্তি বোধ করল মেলিসা, অজান্তে দু’পা সরে এল। চেয়ারের সাথে পা বেধে পড়ে যাচ্ছিল, কোমর ধরে ওকে দাড় করিয়ে দিল টেনিসন। মেলিসার সারা শরীরে বিদ্যুৎ সঞ্চারিত হলো, কেঁপে উঠল বুক। অজান্তে চোখ বুজে এল।

লিসা, ভরাট, আমুদে গলায় বলল টেনিসন। খুব শিগগিরই ধারণা পাল্টে যাবে তোমার, এইমাত্র নিশ্চিত হালাম আমি। হাসিতে উদ্ভাসিত হলো তার সুদর্শন মুখ, ঝকঝকে সাদা দাঁত দেখা গেল। তুমি এমন একটা মেয়ে যাকে সহজে পাওয়া যায় না, কেনাও যায় না। তোমাকে পাওয়ার বিনিময়ে নিজের সর্বস্ব হারাতে রাজি আমি, বিশ্বাস করো!

ধন্যবাদ, মি. টেনিসন! আন্তরিক কণ্ঠে বলল মেলিসা, সামলে নিয়েছে নিজেকে। লোকটা ওর বেসামাল অবস্থার সুযোগ নেয়নি বলে কৃতজ্ঞ বোধ করছে। চকিতে চারপাশে তাকাল ও, দেখল ওদের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে না কেউ। ছোট ছোট দল পাকিয়ে গল্পে মশগুল সবাই।

জায়গাটা আমাকে ছেড়ে দিচ্ছ তো?

না! টেনিসনের প্রতি ফের বিদ্বেষ অনুভব করল মেলিসা। বরং ক্যাটলম্যান এসোসিয়েশনকে একটা প্রস্তাব দিতে যাচ্ছি আমি। খুব শিগগিরই কাঁটাতার এনে আমার রেঞ্জে বেড়া দেব অন্যদেরকেও তাই করতে বলব। নিজের রেঞ্জে অন্যের হাজার হাজার গরু চরে বেড়াবে, এই উদারতা দেখানো আর পছন্দ হচ্ছে না আমার। তাছাড়া এতে রাসলিংও কমে যাবে।

টেনিসনের অবস্থা দেখে মনে হলো যেন তাকে লাথি মেরেছে মেলিসা। বিস্ময়ে ঝুলে পড়ল চওড়া পেশীবহুল কাঁধ, রাগে লাল হয়ে গেল ফর্সা মুখ। তুমি কি সত্যি তাই করবে? গলায় সন্দেহের সুর, অজান্তে কেঁপে উঠল কণ্ঠ। মানসচক্ষে দেখতে পাচ্ছে তেমন হলে এ তল্লাট ছাড়তে হবে ওকে, কারণ ওর রেঞ্জের জমিতে ঘাস নেই। একটা বছরও টিকবে না গরুগুলো। সত্যি কথা বলতে কি, ফ্রি রেঞ্জের সুবিধা আছে বলেই টিকে আছে এখানে।

নিশ্চিন্তে কয়েক হাজার ডলার বাজি ধরতে পারো, অনাবিল হাসি মেলিসার মুখে, টেনিসনের কোণঠাসা অবস্থা চুটিয়ে উপভোগ করছে। তোমার অসুবিধে কি, ম্যাকলয়ারীদেরকে তো দেশছাড়া করছই। ওদের ফেলে যাওয়া রেঞ্জ কিনে নিয়ে, গরু চরানোর জায়গা পেয়ে যাবে। তবে এরপর কিন্তু পানির উৎসটা বন্ধ করে দেব আমি। তোমাকে দেশছাড়া করার একটা সুযোগ আমারও আছে, তাই না?

বিশ্বাস করতে পারছি না…সত্যিই তাই করবে?

তুমি যদি ম্যাকলয়ারীদের ওপর জোর খাটাতে পারো, আমি কেন তোমার সাথে কৌশল বা জোর খাটাতে পারব না?

আমি তোমার কোন ক্ষতি করিনি!

তুমি একটা বেহায়া লোক এবং এ এলাকায় যদ্দিন থাকবে কেবল ঝামেলাই পাকাবে। তোমাকে উচ্ছেদ করতে পারলে আমার ওপর খবরদারি করার ঝুঁকিটা থাকে না, গরুচুরিও বোধহয় বন্ধ হয়।

আমাকে গরুচোর বলছ!? বিস্ফারিত হয়ে গেছে টেনিসনের চোখ, অজান্তে দৃঢ় হয়ে গেল মুঠি।

কখন বললাম! আকাশ থেকে পড়ার ভান করল মেলিসা। ম্যাকলয়ারীদেরকে তাড়াচ্ছ তুমি; পরে, তোমাকে তাড়াব আমি। সন্দেহজনক কোন আউটফিট এখানে থাকবে না আর। ব্যস, তাহলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়!

খোদার কসম, লিসা, কাঁটাতারের বেড়ার প্রচলন হলে সব গরু তোমার রেঞ্জে নিয়ে যাব আমি! জেনে-শুনে এরকম জঘন্য একটা কাজ করতে পারো না। তুমি। ফ্রি রেঞ্জ পশ্চিমের একটা স্বভাবসিদ্ধ ব্যাপার। তোমার প্রস্তাব মানবে না কেউ।

কিন্তু আমার ধারণা প্রস্তাবটা লুফে নেবেসবাই। কেউ না মানলেও নিজের এলাকায় বেড়া দেব আমি, সবকটা ঝর্না ফ্ল্যাগ-বির দিকে বইয়ে দেব। খরার। সময় পানি না পেলে আমার প্রস্তাব মানতে বাধ্য হবে ওরা। আর তুমি যদি আমার রেঞ্জে ঢোকার চেষ্টা করো, গুলি করার আগে সতর্ক করে দেব হয়তো, কিন্তু কথা শুনলে সত্যিই নিজের খারাবি ডেকে আনবে। নিজের এলাকায় উটকো ঝামেলা সহ্য হবে না আমার।

টেনিসন যেন বিশ্বাস করতে পারছে না, বড়বড় হয়ে গেছে চোখ। তোমাকে এভাবে জানতাম না আমি! হতাশ, ম্লান কণ্ঠে বলল সে একসময়। আড়ষ্ট হয়ে গেছে শরীর, আত্মবিশ্বাসী ভাবটা নেই আর এখন।

সবার ওপর ছড়ি ঘুরানোর একটা মজা আছে, তাই না? তোমার মত ধুরন্ধর লোকের ওপর হলে তো কথাই নেই! খোদার কসম, মি. টেনিসন, ব্যাপারটা খুব মজাদার হবে, দারুণ উপভোগ করব আমি!

চড়া কণ্ঠে সবাইকে ডাকল মিসেস ম্যাককার্থি। তৃতীয় রাউন্ড শুরু হবে এখন।

নাচবে আমার সাথে? হেসে জানতে চাইল মেলিসা, চোখে কৌতুক। নাকি ইচ্ছে নেই আর?

এরচেয়ে জরুরী কাজ পড়ে আছে, উদাসীন সুরে বলল সে, হ্যাট খুলে বো করল, কিন্তু ভঙ্গিটার মধ্যে আন্তরিকতার বালাই থাকল না। ধন্যবাদ, লিসা, স্বীকার করছি আমাকে কাঁপিয়ে দিয়েছ, মনে করিয়ে দিয়েছ সত্যিই নাজুক অবস্থায় আছি আমি। এরকম একটা ধাক্কা তোমারও দরকার! মেলিসার চোখে চোখ রাখল টেনিসন, দৃঢ় হয়ে গেছে চোয়ালের পেশী। রাগে দপদপ করছে কপালের পাশের একটা শিরা। চোখে কঠিন; বরফের মত ঠাণ্ডা চাহনি। তোমাকে এসব করতে দেব না আমি, লিসা, যেভাবে পারি ঠেকাব। বিশ্বাস করো, কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার আগেই সব সামলে নেব! বলেই ঘুরে দাড়াল সে, দ্রুত বেরিয়ে গেল হলরুম থেকে।

ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠেছিল মেলিসার ঠোঁটের কোণে, ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। টেনিসনের পিঠের ওপর স্থির হয়ে থাকল ওর দৃষ্টি, যতক্ষণ দেখা গেল তাকে। অবচেতন মনে ভয়ের একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছে, অজান্তে শিহরিত হলো ও। লোকটাকে ভাল করেই চেনে, জানে জেদ চাপলে টেনিসনের পক্ষে সবই সম্ভব। তবে ঝামেলায় যেতে চায় না মেলিসা, টেনিসন ওকে আর না ঘটালে কিছুই করবে না-সিদ্ধান্ত নিল। অস্বীকার করার উপায় নেই লোকটাকে দমানোর জন্যে দারুণ কয়েকটা অস্ত্র আছে ওর হাতে।

এই যে, লিসা, আরেক রাউন্ড হবে নাকি? রল ম্যাককার্থির ডাকে চৈতন্য হলো ওর, পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

হেসে সায় জানাল মেলিসা। দেখো আবার, শেষে তোমার বউ হয়তো নাখোশ হবে আমার ওপর। ওকে খেপালে এরকম নাচের আসরে আর নিমন্ত্রণ জানাবে না।

বাদ্য বেজে ওঠার আগেই ঘোড়ার খুরের শব্দ পেল মেলিসা, দ্রুত উত্তরে ছুটে যাচ্ছে। অস্বস্তি ঘিরে ধরল ওকে, ভয় লাগছে। হঠাৎ করে টেনিসনের আসর ছেড়ে চলে যাওয়ার কারণ কি? ওর হুমকি ঠেকাতে কি পরিকল্পনা করবে কে জানে! জোর করে টেনিসনের ভাবনা মন থেকে তাড়িয়ে ম্যাককার্থির সাথে ফ্লোরে চলে এল মেলিসা। টের পেল প্রায়ই ভুল করছে, মনোযোগ রাখতে পারছে না।

কোন সমস্যা, লিসা? আন্তরিক কণ্ঠে জানতে চাইল ম্যাককার্থি। নাচে মন দিতে পারছ না। টেনিসন বোধহয় আগ্রহী করে তুলেছে তোমাকে?

ন-না…ওহ, ঠিকই ধরেছ।

তাহলে আমরা আশা করতে পারি, তোমরা…

না! বাধা দিল মেলিসা, অস্বস্তির সাথে হাসল। ওরকম কিছু নয়। আমার জন্যে সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সে।

সেজন্যে টেনিসনকে দোষ দিতে পারো না তুমি! হালকা সুরে মন্তব্য করল ম্যাককার্থি। সব পুরুষই সৌন্দর্যের পূজারী। তোমার মত সুন্দরী মহিলার সঙ্গ পাওয়ার জন্যে ও যদি খানিকটা বেপরোয়াও হয়ে যায়, বিরক্ত না হয়ে হয়তো শিই হওয়া উচিত তোমার। কারণ পরোক্ষভাবে হলেও তোমার সৌন্দর্যের প্রশংসা করে এ।

তুমিও কি তাই?

অনেকটা। তবে ডরোথিকে নিয়ে সুখী আমি। একজন সুন্দরী লেডির সাথে নাচতে পারছি, তাতেই আনন্দিত এবং সন্তুষ্ট। ডরোথির সাথে নেচে বোধহয় একই আনন্দ পাবে অন্য কেউ।

হালকা কথা-বার্তা চালিয়ে গেল ওরা। পরের রাউন্ডে কারও আমন্ত্রণেই সাড়া দিল না মেলিসা, বসে থেকে নাচ দেখল। মিসেস ম্যাককার্থি এখন স্বামীর সাথে নাচছে। অতুলনীয় একটা জুটি। পুরো আসর ওরা দুজনেই মাতিয়ে রেখেছে।

ইচ্ছে করলেও আলফ্রেড টেনিসনকে ভুলতে পারছে না মেলিসা, লোকটার আঁতে ঘা দিয়ে বোধহয় ভুলই করেছে। এমনিতে একগুয়ে সে, জেদ চাপলে অন্যায় বা জোর করতেও দ্বিধা করবে না। ওর জীবনে অশান্তি বয়ে আনুক টেনিসন, চায় না মেলিসা, কারণ তাকে প্রতিরোধ বা দমন করার সামর্থ্য ওর নেই, এটা ওর চেয়ে আর কেউ ভাল জানে না। এমন বেপরোয়া লোক সত্যিই দেখেনি ও, আকাক্ষিত জিনিসটা আপসে না পেলে জোর করবে, সে, নিশ্চিত জানে মেলিসা এবং এখানেই ওর ভয়।

আসর শেষ হলো প্রায় মাঝরাতে, একে একে বিদায় নিতে লাগল অতিথিরা। বিদায় নেয়ার সময় পোর্চে ক্লীভ অ্যালেনকে দেখতে পেল, মেলিসা। বুড়োর মুখ থমথমে দেখে অজান্তে কেঁপে উঠল ওর বুক, কু গাইল মন। দ্রুত পোর্চে বেরিয়ে এল ও। কি হয়েছে, ক্লীভ?

কিছু না বলে একটা চিরকুট এগিয়ে দিল কূক।

কাগজটা নিয়ে পড়ল মেলিসা। মাত্র দুটো লাইন, কিন্তু সেগুলোই ওর ভিত কাপিয়ে দিল। ঘামতে শুরু করেছে, বুক ধড়ফড় করছে, গলা শুকিয়ে আসছে। কে দিয়েছে? কাঁপা স্বরে জানতে চাইল।

টেনিসনের এক পাঞ্চার। তোমাকে দিতে বলে চলে গেছে।

বাগিটা নিয়ে এসো।

বুড়ো চলে যেতে ফের চিরকুটটা পড়ল ও। বিশ্বাস হচ্ছে না, কিন্তু না করারও উপায় নেই। টেনিসনের হাতের লেখা চেনে ও।

শ্যন আমার এখানে আছে।
        জলদি চলে এসো।

.

টেনিসনের পক্ষে এমন একটা নোংরা কাজ সম্ভব। নাচের আসর ছেড়ে আগেভাগে চলে যাওয়ার কারণ বোঝা গেল এবার। ভবিষ্যৎ অনুমান করতে ভয় লাগছে ওর। জানে টেনিসনের বার্থানে যেতে হবে, নিজের তাগিদেই। অনিবার্য একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে সে, নোংরা কৌশল খাটিয়েছে ওর ওপর।

মেলিসা চড়ে বসতে বাগি ছেড়ে দিল বুড়ো। অখণ্ড নীরবতা ভাঙার চেষ্টা করল না কেউ। রুক্ষ ট্রেইলে খটখট শব্দে এগিয়ে চলেছে বাগি। ঘোড়াগুলোর ঘন, গভীর নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে মেলিসা। আশঙ্কা ওর মনে, বুক ঢিপঢিপ করছে, নিকট ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। চাঁদের মায়াবী আলোয় ভেসে যাচ্ছে প্রকৃতি, কিন্তু উপভোগ করার মানসিকতা নেই ওর, বরং শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল দূরের ক্যাকটাস হিলের আবছা অবয়বের দিকে। হালকা ঝিরঝিরে বাতাস বইছে। অজান্তে কেঁপে উঠল মেলিসার দেহ, ঠাণ্ডা লাগছে না বরং ভয়ে-আশঙ্কায় ভেতরটা বরফের মত শীতল হয়ে গেছে। হঠাৎ করেই শ্লথ হয়ে গেল বাগির গতি, ক্লীভ অ্যালেনের প্রশ্নে সংবিৎ ফিরল ওর, কিন্তু ধরতে পারল না প্রশ্নটা। দেখল মূল ট্রেইলে চলে এসেছে ওরা। ডানের ট্রেইল ধরে এগোলে ফ্ল্যাগ-বিতে পৌঁছে যাবে। ঘন্টাখানেকের মধ্যে।

বক্স-টিতে যাচ্ছি আমরা, ক্লীভ, মৃদু স্বরে নিজের সিদ্ধান্ত জানাল মেলিসা।

সেটা কি ঠিক হবে, ম্যাম?

শ্যনকে নিয়ে বাথানে ফিরব আমি!

নড করল সে। দ্রুত ছুটল বাগি।

ম্যাককার্থিদের বাথান থেকে মাইল চার পরে টেনিসনের বাথানের সীমানা। ঘাসহীন রুক্ষ প্রান্তরের শুরু বক্স-টি সীমানার কথা জানান দেয়। আরও মাইল দুই যাওয়ায় র‍্যাঞ্চ-হাউসটা চোখে পড়ল। কয়েকটা কামরায় আলো জ্বলছে। দূর থেকে চাঁদের আলোয় স্বপ্নপুরীর মত মনে হচ্ছে র‍্যাঞ্চ-হাউসটাকে। বাস্তবের সাথে কল্পনার অমিল অনুধাবন করে ক্ষীণ তিক্ততার হাসি ফুটল মেলিসার ঠোঁটে। বরং দুঃস্বপ্নপুরী বলা উচিত ভাবল ও, আজকের রাতটা এখানে কিভাবে কাটবে জানা নেই, কিংবা আলফ্রেড টেনিসনের চাহিদাও কি হতে পারে বুঝতে পারছে না। ভাবতেও ভয় লাগছে।

পাহাড়ের কোলে বড়সড় দালানের পাশে বার্ন আর করাল। দুই সারি ওঅটর ট্রাফের মাঝখান দিয়ে বিশাল র‍্যাঞ্চ-হাউসের সামনে এসে থামল বাগি। পোর্চের খুঁটির সাথে ঝুলন্ত দুটো লণ্ঠন ম্লান আলো ছড়িয়ে দিয়েছে আঙিনায়। বাম দিকের একটা কামরা থেকে বেরিয়ে এল আলফ্রেড টেনিসন। হাসি লেগে আছে মুখে।

ঠায় বসে আছে মেলিসা, যেন নামার শক্তি পাচ্ছে না।

নেমে এসো, ক্লীভ। ড্রিঙ্ক করে যাও। শেষে আবার যেন বলতে না পারো, আমার এখানে এসে ড্রিঙ্কের অফার পাওনি। সস্তা রসিকতায় হেসে উঠল সে, অন্যরা কেউ যোগ দিল না। তবে তাতে অসন্তুষ্ট মনে হলো না বক্স-টি মালিককে। এগিয়ে এসে মেলিসাকে নামতে সাহায্য করল। দোতলায় চলে যাও, লিসা। আসছি আমি।

ছুটল মেলিসা। সিঁড়ি ভেঙে চলে এল ওপরে।

ক্লীভ অ্যালেনকে নিয়ে নিচের অফিসরূমে এল টেনিসন। নির্জলা হুইস্কি অফার করল।

এসব কি হচ্ছে, টেনিসন? চেষ্টাকৃত কোমল কণ্ঠে জানতে চাইল কূক।

কিছুই না। ওরা মা-ছেলে আজ আমার অতিথি, ব্যস। কাল সকালে ওদেরকে পৌঁছে দেব আমি।

আমাকে চলে যেতে বলছ?

হ্যাঁ।

যদি না যাই?

থাকতে পারো, একজন অতিথি বাড়লে বরং খুশিই হব, অমায়িক হেসে বলল টেনিসন। কিন্তু ওরা এখানে থাকছে আজ, খবরটা জানা উচিত মি. বডম্যানের।

আমি তোমার চাকুরি করি না! শীতল শোনল কুকের কণ্ঠ। বিদ্বেষের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে টেনিসনের দিকে।

হ্যাঁ, নিশ্চই। বুঝতে পেরেছি মালিক ছাড়া অন্য কারও কথা মনে ধরবে না তোমার। একটু অপেক্ষা করো, ক্লীভ। মেলিসা নিজেই তোমাকে একই কথা বলবে।

কিছুই বুঝতে পারছে না ক্লীভ অ্যালেন। টেনিসনের ঘাড় মটকে দিতে ইচ্ছে করছে। বিষদৃষ্টিতে বক্স-টি মালিকের দিকে তাকাল, ও, কিন্তু ভ্রূক্ষেপ করছে না সে। তার হাসি গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে ওর।

বোতল আর সময়ের সদ্ব্যবহার করো, ক্লীভ, উদার ভঙ্গিতে হেসে কামরা ছেড়ে বেরিয়ে গেল টেনিসন

তাই করল ফ্ল্যাগ-বি কুক। বোতলটির সদ্ব্যবহার করা ছাড়া এখানে করার কিছুই নেই ওর, তিক্ত মনে ভাবল।

একটু পরই এল মেলিসা। শুকনো দেখাচ্ছে মুখ, আশঙ্কা আর ভয় ঢেকে রাখার চেষ্টা করেও পারছে না। ক্লীভ, বাবাকে বোলো কাল সকালে ফিরব আমরা।

কি বলছ, ম্যাম!?

ভয়ের কিছু নেই, ম্লান হাসল মেলিসা, ওর চোখ দেখে মনে হলো নিজেও কথাটা বিশ্বাস করছে না। শ্যন ভাল আছে। আমার ধারণা…জমিটা বেচতে আমাকে বাধ্য করবে ও

তুমি অনুমতি দিলে ঘটনাটা সবাইকে জানাতে পারি আমি। ম্যাককার্থিদের নাচের আসরে এখনও কিছু লোক আছে বোধহয়। খবর পেলে টেনিসনকে লটকাতে আসবে ওরা। ওর সাধের এই বাথান জ্বালিয়ে ছারখার করে দেবে।

শুধু শুধুই ভয় পাচ্ছ, ক্লীভ। আমি এখানে ভালই থাকব।

মি. বডম্যান হয়তো দুশ্চিন্তা করবে, ম্যাম।

তোমার ফিরতে দেরি হলে বাবা আরও বেশি দুশ্চিন্তা করবে।

হুইস্কির গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে বেরিয়ে গেল কুক। পিছু পিছু পোর্চ পর্যন্ত এল মেলিসা। বাগিটার অবয়ব দিগন্তে মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকল ও, তারপর দোতলায় উঠে এল।

ওপরে শুধু একটা কামরায় বাতি জ্বলছে, টেনিসনের বেডরূমে। বিছানার ওপর বসে সিগারেট ফুকছিল সে, দরজায় এসে দাঁড়াল মেলিসা। ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড ভয়ে বেসামাল অবস্থা, প্রাণপণ চেষ্টায় নিজেকে স্বাভাবিক রাখার প্রয়াস পাচেছ।

এসো, লিসা।

শ্যন কোথায়? তোমার কথা মত ক্লীভকে চলে যেতে বলেছি।

ঘুমোচ্ছে ও।

তোমার সাথে কথা বলার আগে ওকে দেখব আমি! একগুঁয়ে স্বরে দাবি করল মেলিসা।

অযথাই ভয় পাচ্ছ। এসো, বলে এগোল টেনিসন, পিছু নিল মেলিসা।

দুটো কামরা পেরিয়ে আরেকটায় ঢুকল সে, লণ্ঠন জ্বালাল। এটাও একটা বেডরূম, তবে ফাঁকা।

শ্যন কোথায়?

পাশের রূমে। জানালা দিয়ে দেখো।

ছুটে গেল ও, লণ্ঠনের ম্লান আলোয় পাশের কামরায় ঘুমন্ত শ্যনকে দেখতে পেল। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো ওর, শয়তানটা ওকে…। শ্যনের ছোট্ট বুক আর পেট নিয়মিতভাবে ওঠা-নামা করছে দেখে অজান্তে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। শ্যনের কাছে যাব আমি, ঘুরে বলল মেলিসা।

কাল সকালের আগে নয়।

আসলে কি চাও তুমি?

সকালে এ নিয়ে আলাপ করব আমরা, ঠিক আছে? ক্লান্ত হয়ে আছ, সন্ধেয় অনেক নেচেছ, বিশেষ করে ম্যাকলয়ারীদের সাথে।

প্রত্যাখ্যানের শোধ তুলছ?

তোমার কামরাটা দেখিয়ে দেই। ঘুমোও, সকালে উঠে সব বিদ্বেষ ভুলে যাবে।

তোমার ধারণা এখানে শান্তিতে ঘুমাতে পারব আমি? শ্লেষের সুরে জানতে চাইল মেলিসা।

উত্তর দিল না টেনিসন, দরজার দিকে এগোচ্ছে। অগত্যা পিছু নিল মেলিসা। দরজার কাছে এসে সরে গিয়ে ওকে বেরুনোর সুযোগ দিল সে, ফের কামরায় ঢুকে বাতি নিভিয়ে দিল। তারপর পাশের কামরায় এল ওরা। বাতি জ্বালাতে মেলিসা দেখল আগেরগুলোর চাইতে অনেক বেশি আরামদায়ক এবং বিলাসবহুল এটা।

ড্রিঙ্ক দেব তোমাকে? টেনশন কাটবে। দরজা ভিড়িয়ে দিল সে।

কিছু না বলে বিছানার কিনারায় বসল মেলিসা। ভয় পাচ্ছে, টেনিসন আসলে কি চাইছে? কাঁপা হাতে হুইস্কির গ্লাস নিল ও, খানিক দ্বিধার পর চুমুক দিল। অভ্যাস নেই বলে জ্বালা ধরে গেল বুকে। অজান্তে দাঁত-মুখ কুঁচকে উঠল। একটু হালকা লাগল নিজেকে।

হুইস্কি যেমন সইছে না, একা থাকাও সইছে না তোমার, লিসা, হেসে মন্তব্য করল টেনিসন।

চমকে উঠল মেলিসা। কি বলতে চাইছ?

তুমি অনিন্দ্যসুন্দর একটা মেয়ে, লিসা। তোমার দরকার একজন বলিষ্ঠ পুরুষের সঙ্গ। তা দিতে পারি আমি, পারি না? তুমি জানো আজ তোমাকে কত সুন্দর লাগছে?

উঠে দাঁড়াল মেলিসা। বেরিয়ে যাও, প্লীজ! নইলে চেঁচাব আমি!

কিছু বুঝে ওঠার আগেই দু’হাতে ওকে বেষ্টন করল টেনিসন। এই মেয়ে, আমাকে তোমার দরকার, তুমি স্বীকার না করলেও নিশ্চিত জানি আমি। ম্যাককার্থিদের বাড়িতে সন্ধ্যায়ই তা বুঝেছি। তুমি এখন না চাইলেও মানব না আমি। তুমি আমাকে পাগল করে তুলেছ, লিসা! দ্রুত মেলিসার পেলব ঠোঁটজোড়া দখল করল সে।

থরথর করে কেঁপে উঠল মেলিসার শরীর। দু’হাত টেনিসনের বুকে ঠেকিয়ে বাধা দিতে চাইছিল, খানিক পর শিথিল হয়ে এল সেগুলো। তারপর মৃণাল বাহু দিয়ে টেনিসনের গলা জড়িয়ে ধরল ও, নিজেকে আরও এগিয়ে দিল লোকটার আলিঙ্গনের মধ্যে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *