৩. পানি ডিঙানোর আওয়াজ

পানি ডিঙানোর আওয়াজ জোরাল হচ্ছে ক্রমশ। অনড় পড়ে আছে জেমস মরগান, ভাবছে ক’জন হতে পারে। নিজের অবস্থান যাচাই করল, সন্তোষজনক। উপত্যকায় ঢোকার পর প্রথমে ঘাসের ওপর পড়ে থাকা বেডরোল আর ক্যান্টিন চোখে পড়বে ওদের, কাছেই নিজ আহারে ব্যস্ত সোরেলটা। অস্বাভাবিক কিছু নেই। শূন্য বেডরোল প্রমাণ করে না এর মালিক হামলার আশঙ্কায় তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছে আশপাশে। একেবারে নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্যে অবশ্য বেডরোলের। পাশে রাইফেলটা রেখে আসা যায়, কিন্তু খুব বেশি ঝুঁকি নেয়া হয়ে যাবে। নাজুক অবস্থায় নিজের প্রাণ নিয়ে খেলতে পছন্দ করে না মরগান। কেউই পছন্দ করবে না।

কত দূরে আছে ওরা, শব্দ শুনে আঁচ করার চেষ্টা করল ও। নীরব হয়ে আছে সারা উপত্যকা। মৃদু বাতাস, পানি গড়ানোর শব্দ ছাপিয়েও সোরেলটার ঘাস টানার আওয়াজ পাচ্ছে। কিন্তু এসব স্বাভাবিক। একবার মনে হলো অন্য একটা ঘোড়ার নাক টানার শব্দ পেয়েছে, কিন্তু নিশ্চিত হতে পারল না। প্রতিপক্ষ বোধহয় থেমে পড়েছে। মরগানের ইচ্ছে করছে সামনে উপস্থিত হয়ে চমকে দেয় লোকগুলোকে। কিন্তু সন্দেহটা নিরসন করা দরকার আগে, হয়তো সত্যিই কোন বাথানের পাঞ্চার ওরা এবং ঘটনাচক্রে এখানে আসছে।

ঘুম ভাঙার পর এই প্রথম শরীর আর ক্ষতগুলোর দিকে নজর দেয়ার প্রয়াস পেল ও। এতক্ষণ অনায়াসে ডান বাহু নাড়াচাড়া করেছে, এ মুহূর্তে রাইফেল ধরে আছে, অথচ ভুলেই গিয়েছিল কাঁধে একটা ক্ষত আছে। বাম হাতে রাইফেল হস্তান্তর করল ও, তারপর ধীরে ধীরে নাড়ল ডান হাত, বিভিন্ন দিকে। ব্যথা পাচ্ছে তেমন। একদিনেই ভাল কাজ দেখিয়েছে ক্লিফ রোজ। উরুর দিকে নজর দিল এবার। ঠিকমত নড়াচড়া করতে না পারলেও হাঁটতে কিংবা ধীরে দৌড়াতেও পারবে, যদি ছোট ছোট পদক্ষেপ ফেলে। বেডরোল থেকে জুনিপার ঝোঁপ-দশ গজ দূরত্ব অনায়াসে হেঁটে এসেছে, টেরই পায়নি। অবশ্য অতিরিক্ত উত্তেজনার কারণেও তা হতে পারে।

ঘোড়া ছেড়ে পায়ে হেঁটে এগিয়ে আসছে লোকগুলো, এজন্যেই কোন সাড়া নেই, ভাবল মরগান। এলাকাটা বোধহয় পরিচিত ওদের, তাই নিশ্চিন্তে অনুসরণ করতে পেরেছে ওকে এবং খুব সম্ভব এ জায়গার কথাও জানে। চমকে দিয়ে বাড়তি সুবিধা পাবে জানলেও ওদেরকে খাটো করে দেখছে না মরগান, বরং যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। সংখ্যা নিয়ে খানিকটা ভাবনা অবশ্য রয়ে গেছে। একা ক’জনকে সামাল দেবে? কিন্তু এ-ও ঠিক কোণঠাসা হয়ে পড়েছে সে, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেও কাউকে ছেড়ে কথা বলার মানুষ নয় মরগান। যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। অন্তত দু’একজনকে সাথে না নিয়ে মরবে না।

প্রতিজ্ঞায় দৃঢ় হলো ওর চোয়ালের পেশী, দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। চকিতে একটা সম্ভাবনা মাথায় আসতে সামনের পাহাড়ের চূড়ার দিকে তাকাল, কেউ ঘাপটি মেরে আছে কি-না বোঝা যাচ্ছে না। ফেলে আসা পথ স্মরণ করার চেষ্টা করল-পাহাড়ে ওঠার কোন পথ কি দেখেছে? উঁহু, চোখে পড়েনি, তবে অন্য কোন পথে হয়তো ওঠা সম্ভব। সেক্ষেত্রে সময় একটা সমস্যা। তবু, নিজেকে বোঝাল মরগান, একটি চোখ সবসময় পাহাড়ের ওপর রেখো। উপত্যকার প্রবেশ পথ দিয়ে ঢুকবে ওরা, খোলা জায়গায় থাকবে, এ অবস্থায় ওকে কাবু করা সহজ হবে না। পাহাড়ের গায়ে অবস্থান নিতে না পারলে ওর জয়ের সম্ভাবনাই বেশি, যদি না শত্রুপক্ষ সংখ্যায় খুব বেশি হয়।

অগত্যা-অপেক্ষা।

ঠিক পাঁচ মিনিট পর একসঙ্গে উপত্যকায় ঢুকে পড়ল দু’জন। লম্বা তাগড়া শরীর ওদের, নোংরা কাপড় পরনে। হাতের রাইফেল বাগিয়ে ধরে আছে। চেনার চেষ্টা করল মরগান, হাটের কার্নিসের ছায়ায় ঢেকে আছে কপাল আর চোখ, তাছাড়া রয়েছে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। শূন্য বেডরোল থেকে জুনিপার ঝোঁপ হয়ে ওর ওপর স্থির হলো প্রথমজনের দৃষ্টি, মুহূর্তের জন্যে থমকে গেল। কিন্তু পরক্ষণে হাতের পেশীগুলো শক্ত হয়ে উঠল, গুলি করতে যাচ্ছে। যেটুকু সন্দেহ ছিল, তা-ও। এক লহমায় দূর হয়ে গেল। সম্ভাষণ দূরে থাক, একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। ওরা, নিশ্চিত জানে কি করতে যাচ্ছে। কারও ক্যাম্পে প্রবেশ করতে হলে সাড়া দিয়ে অনুমতি নিতে হয়-এটাই পশ্চিমের রীতি। তা করেনি ওরা। সুতরাং ও-ইবা দ্বিধা করবে কেন! টিকে থাকার প্রশ্ন এখানে, ন্যায়-অন্যায়ের কোন ব্যাপার নেই। সামনের লোকটাকে গুলি করে অন্যজনের দিকে মনোযোগ দিল মরগান।

সব মিলিয়ে চারটা গুলি খরচ হলো।

বিতৃষ্ণার সাথে পড়ে থাকা লাশ দুটো দেখল মরগান, তামাক আর কাগজ বের করে সিগারেট রোল করার সময় মনোযোগ দিয়ে গুলির শব্দের প্রতিধ্বনি শুনল। আপাতত প্রথম পর্যায়ের লড়াইয়ে জয়ী হয়েছে ও। সম্ভবত আরও লোক আছে। এবার নতুন ফন্দি আঁটবে ওরা। এ দু’জনের মত উপত্যকায় ঢুকে বেঘোরে প্রাণ হারানোর ঝুঁকি নেবে না। সুতরাং খানিকটা সময় পাওয়া গেল। ধূমপান শেষে ক্ষতের পরিচর্যা করল ও, হাত-মুখ ধুয়ে এরপর খাওয়া সেরে নিল।

আরও লোক আছে, একটু পরই নিশ্চিত হয়ে গেল মরগান, মাঝে মধ্যে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। এবার বোধহয় সামনের পাহাড় থেকে হামলার চেষ্টা করবে, কিংবা একবারে সহজ কাজটি করতে পারে-উপত্যকা অবরোধ করে রাখলেই হলো। একসময় ওকে বেরিয়ে যেতেই হবে। পানির ঘাটতি নেই, কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে খাবার। সাথে যে পরিমাণ খাবার আছে, খুব বেশি হলে চার-পাঁচ দিন চলবে। এরপর?

অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা জেমস মরগানের দারুণ অপছন্দ। বরাবরই সময় থাকতে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয় ও, এবারও তাই করবে। নির্দিষ্ট কোন পরিকল্পনা করেনি এখনও, তবে এ-নিয়ে খুব একটা ভাবছেও না। বরং সময়ে, মাথা থেকে কোন একটা উপায় বেরিয়ে আসবে এ আত্মবিশ্বাস আছে ওর। ঘাড়ের ওপর শরীরের ওই অংশটার ওপর মরগানের আস্থা সবচেয়ে বেশি। প্রখর বুদ্ধি, দূরদৃষ্টি আর বিচক্ষণতার জন্যেই এখনও বেঁচে আছে ও।

সহসা খুরের শব্দ শোনা যেতে সচকিত হলো মরগান, ভজ দেখা গেল ওর প্রশস্ত কপালে। প্রতিপক্ষের কৌশল বোঝার চেষ্টা করছে। সিক্সটার নিয়ে অপেক্ষায় থাকল, কাছাকাছি দূরত্বে রাইফেলের চেয়ে ওগুলোই কাজ দেয় বেশি-সহজে নাড়াচাড়া করা যায়, জরুরী মুহূর্তে নিশানা না করলেও চলে, তাছাড়া লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও কম।

একটু পর নিশ্চিত হলো মরগান। একসঙ্গে ঘোড়া ছুটিয়ে ঢোকার চেষ্টা করবে। ওরা, ইন্ডিয়ান কৌশল। শুরুতে দু’একজন ঘায়েল হলেও ঠিকই সফল হবে বাকিরা। আপনমনে হাসল ও, বিদ্রুপের ভঙ্গিতে বেঁকে গেল ঠোঁটের কোণ। চমক অপেক্ষা করছে ওদের জন্যে। ইন্ডিয়ান এই কৌশলটির সাফল্য নির্ভর করে প্রতিপক্ষকে ভড়কে দিয়ে তার সুযোগ নেয়ার ওপর, কিন্তু এটি কোন কাজে আসবে না যেহেতু তৈরিই আছে মরগান। বাড়তি পিস্তলটা লোড় করে পাশে রেখেছে ও, রাইফেল তো আছেই। দু’হাতে উদ্যত দুই পিস্তল নিয়ে অপেক্ষায় থাকল।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। আচমকা তীরবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে উপত্যকায় প্রবেশ করল তিন অশ্বারূঢ়। পানি ডিঙিয়ে আসছে ওরা, খুরের দাপটে এমনভাবে পানি ছিটকে পড়ছে যেন তিনটে দামাল ছেলে হুটোপুটি খাচ্ছে। সমানে গুলি করছে ওরা। সবার সামনে তাগড়া একটা কালো মাসট্যাঙ। ওটার আরোহীকে প্রথমে গুলি করল মরগান, পেছন দিকে ছিটকে পড়ল সে। ঝুপ করে পানিতে আছড়ে পড়ল লাশটা। পেছনের ঘোড়াগুলো মাড়িয়ে গেল তার দেহ, আর মাসট্যাঙটা তখনও ছুটছে।

বাম হাতের পিস্তল দিয়ে দ্বিতীয় লোকটাকে পরপর দুটো গুলি করল ও। রাইফেল তুলে নিশানা করছিল লোকটা, মুহূর্তে স্যাডলশূন্য হলো, তার পাঠানো গুলি মরগানের পাঁচ হাত দূর দিয়ে চলে গেল। অবস্থা বেগতিক দেখে চলার ওপর। গতিপথ বদল করার প্রয়াস পেল শেষজন, ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে। আরোহীর আচানক প্রয়াসে তাল সামলাতে পারল না ঘোড়াটা, হুড়মুড় করে পড়ে গেল। ঘাসের ওপর। বিপদ দেখে আগেই লাফ দিয়েছে লোকটা, মাটিতে পড়ার সাথে সাথে হোঁচট খেল। কোনরকমে উঠে দাঁড়িয়ে ঝেড়ে দৌড় লাগাল ফিরতি পথে। পিস্তলের নল দিয়ে ব্যাটার শিরদাঁড়া অনুসরণ করল সেকেন্ড খানেক, শেষে মত বদলে পিস্তল নামিয়ে ফেলল। পলায়নপর কোন শত্রুকে পেছন থেকে গুলি করা ওর ধাতে নেই, যদিও জানে এ লোকটিই হয়তো সুযোগ পেলে ঠিক এভাবেই ওকে খুন করতে দ্বিধা করত না।

সন্তুষ্টচিত্তে পরিস্থিতি আর ভবিষ্যৎ চিন্তা করল মরগান। প্রতিপক্ষকে ভাল একটা নাড়া দেয়া গেছে। ওকে শিকার করা যে সহজ হবে না, হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে লোকগুলো। এখন থেকে বুঝে-শুনে এগোবে, আগে নিশ্চিত হতে চাইবে, পতঙ্গের মত আগুনে ঝাঁপ দেয়ার মত বোকামি আর করবে না। নিজেকে ওদের। জায়গায় কল্পনা করল মরগান, এ অবস্থায় কি করত? উপত্যকা অবরোধ করে অপেক্ষায় থাকত।

নিবিষ্ট মনে কিছুক্ষণ ভাবল ও, শেষে সাফল্যের সম্ভাবনা বিচার করে মনস্থির করল। ঝুঁকিপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা করতে চাইছে সম্ভব কি-না জানে না, তবে এছাড়া উপায়ও নেই। নিচু সুরে শিস বাজাল ও। ঘাস খাচ্ছিল সোরেলটা, প্রভুর সাড়া পেয়ে কান খাড়া করল প্রথমে, তারপর কাছে চলে এল। ল্যাসো খুলে কোমরের সাথে এক প্রান্ত বাধল মরগান, স্যাডলের ওপর আড়াআড়িভাবে বাঁধল অপর প্রান্ত। জড়িয়ে ধরে আদর করল ঘোড়াটাকে, তারপর পেছনে ক্লিফের কাছে চলে এল। পানির উৎসটি দুই ভাগ হয়ে গেছে এখানে। শুভ্র জলরাশি ক্লিফের খাড়া গা বেয়ে নেমে গেছে কয়েকশো ফুট। ওটা বেয়ে নেমে যেতে হবে ওকে।

ঝুঁকি আছে, কিন্তু উপত্যকায় অবরুদ্ধ হয়ে থাকার চেয়ে ঢের ভাল। প্রতিপক্ষের চারজন প্রাণ হারিয়েছে ওর কারণে, আর এরা যদি আলফ্রেড টেনিসনের লোক হয় তো পাঁচজন। একবার নাগালের মধ্যে ওকে পেলে শকুনের মত খুবলে খাবে। উপত্যকায় থাকলে সে-পথ সুগম করাই হবে। তারচেয়ে ঝুঁকিটা নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে, আধাআধি সম্ভাবনা আছে। ওর ভাগ্য সুপ্রসন্ন। বলতে হবে, উপত্যকা থেকে চলে যায়নি মৃত লোকগুলোর ঘোড়া, ওগুলোর স্যাডল থেকে ল্যাসো সংগ্রহ করেছে। চারটে মিলে একশো ফুটের মত দাঁড়িয়েছে। অতটুকু পথ নামতে পারলে পরেরটুকু নিয়ে ভাববে। আপাতত শত্রুপক্ষের চোখের আড়ালে থাকতে পারলেই হলো।

সোরেলটার ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব একটা ভাবছে না মরগান। দুর্গম বৈরী এ দেশে বাহন ও বিশ্বস্ত প্রাণী হিসেবে ঘোড়া অপরিহার্য। অহেতুক ঘোড়ার প্রাণ হরণ করে না কেউ, সে যত বর্বরই হোক। খুব জোর ঘোড়াটাকে দখল করতে পারে।

দাঁড়িয়ে থাক, বাছা, চাপা স্বরে ঘোড়াটাকে আদেশ করল মরগান। স্যাডল ব্যাগ থেকে একটা অতিরিক্ত শার্ট বের করে রাইফেল বেঁধে গলায় ঝুলিয়ে দিল। কোমরের ওপর আড়াআড়ি বাধল স্যাডল ব্যাগটা। ল্যাসো ধরে নামতে শুরু করল এবার। ক্লিফের দেয়াল বরাবর ঝুলিয়ে দিয়েছে ল্যাসো। নিচে, একেবারে তলায় চলে গেল ওর দৃষ্টি-বোল্ডার আর বুনো ঝোপে ভরা রুক্ষ জায়গা। বোঝা যাচ্ছে এটা একটা গভীর ক্যানিয়ন। তৃণভূমি থেকে বেশ নিচুতে। ক্লিফের গা বেয়ে নেমে যাওয়া পানি জমা হয়েছে এক প্রান্তে, তারপর তীব্র স্রোতের আকারে উত্তরে চলে গেছে। সূর্যের আলো ঠিকমত পৌঁছতে পারেনি বলে ঘোলাটে দেখাচ্ছে পানির স্রোত।

কিছুক্ষণের মধ্যে ঘাম আর ক্লিফের গা থেকে ছলকে পড়া পানিতে ভিজে গেল ওর শরীর। যতটা কঠিন হবে ভেবেছিল তারচেয়ে সহজেই নামতে পারছে। কাঁধের ক্ষতটা না থাকলে দ্রুত নামতে পারত। এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও মাঝে মধ্যেই ডান কাঁধে টান পড়ছে। দুটো ক্ষতেই যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। ব্যান্ডেজ ভিজে থাকায় বুঝতে পারছে না রক্তপাত হচ্ছে কি-না। সোরেলটার ওপর দিয়ে যাচ্ছে সব ধকল, ওর ওজনের পুরোটাই সামলাতে হচ্ছে। কিন্তু একচুল নড়বে না। ঘোড়াটা, জানে ও।

পানির স্রোত থেকে কিছুটা ডানে সরে আড়াআড়ি নামতে শুরু করল মরগান। খানিক নিচে চাতালের মত এ্যানিটের চাঙড় চোখে পড়তে ওখানে নেমে বিশ্রাম নেওয়ার কথা ভাবল। ওই বিশ ফুট নামতে অনেক সময় লাগল, ক্লান্তি আর দুর্বলতার কারণে গতি কমে গেছে।

চাতালে বসে অনেকক্ষণ বিশ্রাম নিল মরগান। ভাল করে জরিপ করল ক্লিফের নেমে যাওয়া শরীর, আশায় আছে কোন ফাটল বা সঙ্কীর্ণ পথের সন্ধান পাবে যেটা ধরে সামনের লজপোল পাইনের উপত্যকায় যেতে পারবে। তাহলে ক্যানিয়ন অবধি নামতে হবে না; অতিরিক্ত কষ্ট থেকে ঘোড়াটাকে মুক্তি দেয়া যাবে, উপরন্তু ল্যামসা শেষ হয়ে যাওয়ার পর অমানুষিক পরিশ্রমও করতে হবে না। ওকে। হাত-পা ব্যবহার করে ক্লিফের গা বেয়ে নামতে হবে ভাবতেই শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসছে।

ভাগ্যদেবী সহায় হলো মরগানের ওপর। ফুট: ত্রিশেক নামার পর সরু উপত্যকাটা চোখে পড়ল, বুনো জুনিপার আর ক্লিফ রোজে ভরাট হয়ে আছে। উপত্যকার অন্য প্রান্তে কি আছে না-ভেবেই শক্ত মাটিতে পা রাখল ও। কোমর। থেকে ল্যাসোর বাধন খুলে ঝুলিয়ে দিল। লম্বা বিশ্রামের পর ক্লিফ রোজ আর ক্যান্টিনের পানি দিয়ে ক্ষতের পরিচর্যা করল।

ঘন জুনিপার ঝোঁপ ঠেলে এগোল ও। পায়ের তলায় ঢালু পাথুরে পথ, পা হড়কে গেলে বিপদ হতে পারে। র্যাটলের ভয় চিন্তিত করল ওকে, এরকম পরিবেশে ওগুলোর দেখা না পেলে অবাকই হবে। হাতে বাউই ছুরি তুলে নিয়েছে, প্রয়োজনে যাতে ব্যবহার করতে পারে। গুলি করে প্রতিপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এত কষ্ট মাটি হয়ে যাবে।

একটু পর ওর ধারণাই সত্যি হলো। দু’হাত দূরে একসাথে দেখতে পেল দুটো র্যাটলকে, ফণা না তুললেও ওর দিকেই মনোযোগ ব্যাটাদের। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল মরগান, ছুরি নিয়ে প্রস্তুত। আরেকটু এগোলে প্রথমটাকে আঘাত করবে। দরকার হলে চোখের পলকে ড্র করবে।

তেমন কিছুর প্রয়োজন অবশ্য পড়ল না। পথ থেকে সরে গেল সাপ দুটো। খানিক অপেক্ষার পর এগোল ও, সতর্ক। র্যাটল হচ্ছে কয়োটের মত, বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। হয়তো কোন ঝোঁপের ফাঁকে ওঁৎ পেতে আছে, কাছে গেলে ছোবল মারবে। পিস্তল হাতে জায়গাটা পেরিয়ে এসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল মরগান। সামনে ঢালু হয়ে নেমে গেছে পাহাড়ী ট্রেইল। হাটতে শুরু করল ও, ভাবছে বামে গেলে গতকালের মত উপত্যকায় পৌঁছানোর পথটা হয়তো পেয়ে যাবে।

প্রথম যেখানে নালাটা খুঁজে পেয়েছিল, ঘণ্টাখানেক পর ঘুরে-ফিরে সেখানে এসে উপস্থিত হলো ও। অনেক হাঁটায় ক্লান্তি লাগছে, বিশ্রাম নেয়ার ফাঁকে খুঁটিয়ে দেখে নিল চারপাশ। যখন নিশ্চিত হলো, আশপাশে কেউ নেই, নালার কাছে চলে এসে পানি পান করে ক্যান্টিন ভরে নিল। স্রোত ঠেলে এগোতে শুরু করল এরপর।

হয়তো উপত্যকা অবরোধ করে রেখেছে প্রতিপক্ষ, কিংবা শিকার পালিয়েছে দেখে ফিরে আসছে এখন। তেমন হলে দেখা হয়ে যেতে পারে ওর সাথে। চোখ কান খোলা রেখে এগোচ্ছে মরগান, সজাগ এবং তৈরি।

দূর থেকে কথা-বার্তার শব্দ শুনতে পেয়ে দ্বিগুণ সতর্ক হয়ে এগোল এবার। সামনে এক বয়স্ক সিডারের গোড়ায় অ্যাসপেনের ঝড়। ঘুরে ওটার পেছনে চলে এল মরগান। খোলা জায়গায় চোখ পড়তে উপত্যকার দিকে মুখ করে বসে থাকা লোকগুলোকে দেখতে পেল। পাঁচজন। কফি তৈরি করে নিশ্চিন্তে গলাধঃকরণ করছে। তাজা কফির সুবাসে তীব্র তেষ্টা পেল ওর, সম্মোহিতের মত তাকিয়ে থাকল আগুনের ওপর বসানো কেতলির দিকে। ইচ্ছে করছে ছুটে গিয়ে সামিল হয় ওদের সাথে, গল্প করতে করতে কফি পান করে। মনে পড়ল আগের দিন ফ্ল্যাগ বি বাথানে ক্লীভ অ্যালেনের তৈরি সুস্বাদু কফি পান করার পর লালচে ওই জিনিস আর পেটে পড়েনি। কফির গুঁড়ো এবং কেতলি সাথে ছিল, কিন্তু আগুন জ্বালালে উত্মক কারও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে ভেবে তৈরি করেনি।

আর কতক্ষণ অপেক্ষা করব? বিরক্তির সাথে বলল এক তরুণ। আমার ধারণা মহা আরামে ঘুমাচ্ছে শালা, আর এদিকে আমরা…

যাচ্ছ না কেন? বাধা দিল পাশের জন, কণ্ঠে শ্লেষ। তোমাকে আটকাবে না কেউ, উইলি। কাজটা সারতে পারলে পাচশো ডলার তো পাচ্ছোই।

তাহলে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে!

এতদূর থেকেও মরগান দেখতে পেল রক্ত সরে গেছে তরুণের মুখ থেকে। তবে বেশ দ্রুত নিজেকে সামলে নিল সে। তোমরা সাহায্য করলে ঠিকই পারব, আত্মবিশ্বাসের চেয়ে বরং জেদই প্রকাশ পেল তরুণের কন্ঠে। ভাল করেই জানো একা আমার পক্ষে ওকে সামলানো সম্ভব নয়।

একবার তো পালিয়ে এসেছ, সাথে আরও দু’জন ছিল তখন।  

লোকটা একটা পিশাচ! এবার আতঙ্কিত গলায় বলল উইলি। ম্যাট আর পিটকে নিমেষে খুন করে ফেলল! এত দ্রুত কাউকে গুলি করতে দেখিনি আমি।

এ লোক বিখ্যাত কেউ না হলে কান কেটে ফেলব।

চুপ করে থাকো, উইলি! চাপা স্বরে ধমকে উঠল আরেকজন। পাঁচ হাত দূরে জুনিপার ঝোঁপের পাশে বসে আছে লোকটা, রাইফেলের চেম্বার পরিষ্কার। করছে। ঠোঁটে চুরুট। চোখ তুলে তাকায়নি সে, কিন্তু চুপসে গেল তরুণ। মিনমিন করে কি যেন বলে কেতলির দিকে এগোল।

মোক্ষম সময়, ভাবল জেমস মরগান। কফি পান করার লোভ সামলাতে পারছে না। এটা অবশ্য বাড়তি পাওনা। নিঃশব্দে, সবার অগোচরে ঝোঁপ ছেড়ে বেরিয়ে এল ও। দলটার কাছ থেকে দশ হাত দূরে এসে দাড়িয়েছে, হাতে উদ্যত সিক্সশটার। জানে এখানে একটা ডিনামাইট ফাটাতে যাচ্ছে, এবং পাচজনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে পাঁচ রকম। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে দো-আঁশলা ছোটখাট লোকটি, দূরে বসে এতক্ষণ নিস্পৃহ দৃষ্টিতে সঙ্গীদের বাদানুবাদ দেখছিল। উইলিও বিপজ্জনক, কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্রেফ রিফ্লেক্সের বশে ড্র করতে পারে। ছোকরার কোমরে জোড়া পিস্তল, চকচকে বাট। নিয়মিত অনুশীলন করে বোধহয়। কিন্তু ধৈর্য কম, অসহিষ্ণু পদক্ষেপ আর অস্থিরতায় বোঝা যাচ্ছে এ জিনিসটা এখনও আত্মস্থ করতে পারেনি। পশ্চিমে টিকে থাকার জন্যে প্রথম শর্ত ওটাই।

মর্নিং, বয়েজ! বোমা ফাটাল মরগান, মৃদু হাসছে। শিকারীরা এখন শিকার বনে গেছে। পাঁচজনের বিরুদ্ধে একা, এ অবস্থায় ও নিজেই ধরাশায়ী হয়ে যেতে পারে। আশার কথা, প্রতিপক্ষকে চমকে দেয়ায় বাড়তি একটা সুবিধে পাবে।

লোকগুলোর প্রতিক্রিয়া চুটিয়ে উপভোগ করছে মরগান। রাইফেল পরিষ্কার করছিল চুরুটঅলা, এতটা চমকে গেছে যে ঠোঁট থেকে চুরুটটা পড়ে গেল। নিঃসাড় হয়ে গেছে দু’হাত, রাইফেল ধরে রাখল শক্ত হাতে। কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসছে উইলির চোখজোড়া, বিশ্বাস করতে পারছে না ওর উপস্থিতি। দো-আঁশলা লোকটা-মরগানের ধারণায় পাঁচজনের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন মানুষ-শুধু চোখ তুলে তাকাল, শীতল কালো চোখে কিংবা মুখে কোন অভিব্যক্তি নেই। মরগান নিশ্চিত হলো সবার আগে সে-ই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে, এরপর চুরুটঅলা। উইলির ব্যাপারটা বোঝা যাচ্ছে না এখন, একেবারে চুপসে গেছে যেন যমের সামনে উপস্থিত।

বোকার মত কিছু কোরো না কেউ, একটু পর বলল মরগান। থেমে পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝার সময় দিল, ততক্ষণে অনেকটা সামলে নিয়েছে ওরা। উইলি, তোমার হোলস্টারগুলো খালি করো, দূরে অ্যাসপেন ঝোঁপের ভেতর ফেলবে খেলনা দুটো, যাতে কেউ লাফ দিয়েও নাগাল না পায়। হ্যাঁ, দারুণ দেখিয়েছ! তরুণ নির্দেশ তামিল করতে বলল ও। এবার চুরুটঅলার হাত আর কোমর খালি করো, ওর হাতে বরং চুরুটটা ধরিয়ে দাও।

একে একে সবাইকে নিরস্ত্র করল উইলি, কাজ শেষে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল। বিপর্যস্ত অবস্থাটা নেই এখন, তবে ভয় লেগে রয়েছে চোখে।

খানিকটা পিছিয়ে এল মরগান। আমার দিকে মুখ করে বসো সবাই, আলাদা হয়ে দুহাত দূরে দূরে। উইলি, এক মগ কফি দাও আমাকে। সবাই বসতে সন্তষ্টির সাথে তাদেরকে দেখল ও, আড়চোখে তাকাল উইলির দিকে। সময় নিয়ে মগে কফি ঢালছে সে, ওর দিকে পিছন ফিরে। পলকের জন্যে তরুণের দিকে তাকাল দো-আঁশলা লোকটা, নির্বিকার মুখে মরগানের দিকে ফিরল এরপর। উজ্জ্বল দেখাচ্ছে তার চোখের তারা।

কি ঘটতে যাচ্ছে বুঝে ফেলল মরগান। কফির মগ হাতে ওর আর বন্ধুদের মাঝে এসে দাঁড়িয়েছে উইলি। সবাইকে না হলেও দু’জনকে আড়াল করতে পেরেছে। কিছু বলতে গিয়ে চেপে গেল ও, চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পেল। ঘাড়ের কাছে চলে যাচ্ছে দো-আঁশলার ডান হাত, লুকানো ছুরি বের করবে নিশ্চয়ই। চুরুটঅলা উঠে দাঁড়ানোর উপক্রম করেছে, হাতে ছোট্ট একটা ডেরিঞ্জার, কোত্থেকে বের করেছে আল্লা মালুম। আর গরম কফি ছুড়ে মারতে যাচ্ছে উইলি।

দিশেহারা বোধ করল মরগান। বুঝতে পারছে আবার কোণঠাসা হয়ে পড়েছে ও-শিকারী থেকে শিকার!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *