২.৯ প্রথমেই সন্দেহ জাগল

প্রথমেই সন্দেহ জাগল, স্যাবোটাজ? প্লেনটাকে অচল করে রেখেছে কেউ?

কি হলো? জানতে চাইল জেমসন। আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। সে।

থ্রটল টেনে নিল রানা, আবার ব্রেক অ্যাপ্লাই করল। স্যাবোটাজের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়নি, রাশিয়ানদের দোসর কেউ থাকতেও পারে আমেরিকান সাবমেরিনে, কিন্তু আরেকটা আশঙ্কার কথা ভাবছে ও।

হুড আর ফেস-মাস্ক খুলে মুখের সামনে হ্যান্ডসেট তুলল রানা, চিৎকার করে বলল, ক্যাপ্টেন-হোস পাইপ আনতে বলুন, কুইক!

কেন, কি হয়েছে…?

এদিকে এগিয়ে এসে দেখুন তো, তুষারে বোধহয় চাকা দেবে গেছে।

সর্বনাশ!

ক্যাপ্টেনের নির্দেশ পাবার আগেই দেখা গেল হাডসন আর। তার লোকেরা হোস পাইপ টেনে আনছে। জানালার দিকে ঝুঁকে রানা দেখল, ক্যাপ্টেন মুখ তুলে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। চারপাশে গরম বাশ্চ, তাকে প্রায় ঢেকে ফেলার উপক্রম করেছে। খোদ হাডসনের বগলের নিচে একটা হোস পাইপের মুখ দেখল। রানা, চাকার চারপাশে স্টীম স্প্রে করছে। সাবধান করতে চাইল। রানা, টায়ারে বেশি গরম স্টীম অনেকক্ষণ ধরে ব্যবহার করলে ওগুলো গলে যাবে। কিন্তু স্প্রে-র হিস হিস আওয়াজে ওর চিকার বোধহয় কারও কানে গেল না।

এক মিনিট পর ফিউজিলাজের নিচ থেকে বেরিয়ে এসে মুখ তুলে রানার দিকে তাকাল হাডসন। সব পরিষ্কার, মি. ডাভ। এবার দেখুন ডানা মেলতে পারেন কিনা।

হাডসনকে উদ্দেশ্য করে হাত নাড়ল রানা। আরেকবার হুড নামাল, গজগুলো চেক করল, তারপর খুলে দিল থ্রটল। আর-পিএম গজ ফিফটি ফাইভের ঘরে স্থির হলো। ব্রেক রিলিজ করল রানা, এবার সাথে সাথে মৃদু ঝাঁকি খেয়ে সামনে এগোল মিগ-৩১। ক্যাপ্টেন, হাডসন আর ক্রুরা সবাই দ্রুত পিছিয়ে গেল, হোস পাইপটা সাথে নিতে ভোলেনি।

এরই মধ্যে শার্ক থেকে নতুন পোশাক পরা লোকজন বেরিয়ে। এসেছে। প্রত্যেকের পরনে সিভিলিয়ান পার্কা, প্রত্যেকের হাতে বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম বা কাগজ পত্র। রাশিয়ানরা আসবে, তার জন্যে তৈরি হয়ে গেছে সবাই।

প্লেন ঘুরিয়ে নিয়ে বরফের শেষ প্রান্তের দিকে চলল রানা। একটা সরল রেখা ধরে এগোল মিগ-৩১, ফেরার সময় এই পথটাই ব্যবহার করবে ও।

ওই সামনে ধূসর রঙের সাগর। রাশিয়ান সাবমেরিনের খোঁজে এদিক ওদিক তাকাল ও। কোথায়! হয়তো শার্কের ক্যাপ্টেনকে চমকে দেয়ার জন্যে একেবারে কাছাকাছি এসে বরফের ওপর মাথা তুলবে বলে ঠিক করেছে ওরা।

এয়ারকিংকে আধ পাক ঘুরিয়ে নিল রানা। থ্রটল খুলে দিয়ে নতুন করে যাত্রা শুরু করল ও। প্রায় সাথে সাথেই টের পেল, জমে থাকা তুষারের বাধা পেয়ে প্লেনের গতি সাবলীল হতে পারছে না। মাত্রা ছাড়া পাওয়ার ব্যবহার করা যাবে না, তাতে তুষার ভেদ করে বরফের গায়ে চাকা ঢুকে যাবার ভয় আছে। যেখানে পার্ক করা ছিল এয়ারকিং, সেই জায়গাটা পেরিয়ে এল রানা। এখনও প্লেনের গতি সাবলীল নয়। এরপর শুরু হলো মসৃণ করা রানওয়ে। একটু পরই প্রেশার রিজটা চোখে পড়ল, ঝাপসা মত কি যেন একটা মাথা চাড়া দিয়ে রয়েছে। এদিকে তুষারের বাধা নেই, দ্রুত থেকে দ্রুততর হলো এয়ারকিঙের গতি। থ্রটল খুলে স্পীড আরও বাড়ল রানা।

প্রতিটি মুহূর্ত রানওয়ের ঠিক মাঝখানে থাকতে হবে ওকে, কারণ ভুল সংশোধনের জন্যে ব্রেক করে কোন লাভ হবে না–বরফের ওপর কাজ করবে না ব্রেক। রাডার ঠিকমত কাজ করবে পঁচাশি নট স্পীডে, এই মুহূর্তে এয়ারকিঙের স্পীড পঞ্চাশের কিছু বেশি।

কুয়াশার ভেতর দিয়ে সামনেটা দেখার চেষ্টা করছে রানা। এক সেকেন্ডকে মনে হলো এক যুগ। নব্বই নট পেরিয়ে গেল স্পীড, রানওয়ের ঠিক মাঝখান ধরে ছুটছে এয়ারকিং। থ্রটল আরও খুলে দিল রানা। আর-পি-এম কাটা দ্রুত ওপর দিকে উঠছে। প্রেশার রিজের ফাঁকটা ছুটে আসছে অবিশ্বাস্য গতিতে। ত্রিশ ফিট ফাঁক, একটু এদিক-ওদিক হলে ফিউজিলাজের সাথে বাড়ি খাবে প্রেশার রিজ। লাফ দিয়ে সামনে চলে এল ফাঁকটা, চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে গেল। একশো পঞ্চাশ নট। তারপর একশো সত্তর।

স্টিক টেনে নিল রানা। রানওয়ের শেষ প্রান্তটা দেখতে পাচ্ছে ও। ওদিকে মসৃণ করা হয়নি বরফ। স্টিক টেনে নেয়ার সাথে সাথে বরফ থেকে শূন্যে উঠে গেছে চাকা।

 

রিয়ার-ভিউ মিররে রানা দেখল, ওর পিছনে তুষারের বিশাল একটা মেঘ জমেছে। খুশি হলো ও, ইতোমধ্যে যদি বরফের ওপর উঠে এসে থাকে রাশিয়ান সাবমেরিন, তবু ওকে দেখতে পাবে না। ফ্ল্যাপস তুলে নিল ও, আন্ডারক্যারিজ বন্ধ হয়ে গেল। থ্রটল আরও খুলে দিতে অ্যান্টি জি স্যুট সেঁটে বসল গায়ে, পরমুহূর্তে। আবার ঢিল দিল। ফুয়েল প্রবাহ চেক করল রানা, দেখল, সবগুলো কাটা সবুজ ঘরে রয়েছে।

এবার আকাশের দিকে নাক তুলে প্রায় খাড়া উঠে যেতে শুরু করল মিগ-৩১। মাত্র কয়েক সেকেন্ডে মেঘের রাজ্য পিছনে ফেলে এল রানা। মাক মিটার উঠে যাচ্ছে-ওয়ান, ওয়ান পয়েন্ট ওয়ান, ওয়ান পয়েন্ট টু, ওয়ান পয়েন্ট থ্রী, ওয়ান পয়েন্ট ফোর…

বাইশ হাজার ফিট উঠে এসে আশপাশে কোথাও মেঘের ছিটেফোঁটাও দেখল না রানা। দিগন্ত রেখা পর্যন্ত শুধু গাঢ় নীল আকাশ।

উত্তর দিকে মুখ করে টেক-অফ করেছে রানা। নতুন কোর্স। ধরতে হবে, যেতে হবে ফিনিশ উপকূলের দিকে। ডানা কাত করে দুশো আশি ডিগ্রী ঘুরে বাঁক নিল মিগ-৩১, প্রতি মুহূর্তে উঠে যাচ্ছে আরও ওপরে।

ইচ্ছে করলে পঁচিশ মাইল পর্যন্ত উঠতে পারে রানা। এয়ারকিঙের এই ক্ষমতা দরকার হলে নিশ্চয়ই ব্যবহার করবে ও। যদিও অত উঁচুতে উঠলেও ইনফ্রা-রেড ডিটেকশন এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। তবে ব্যারেন্ট সী এক লাফে পেরিয়ে যাবে ও। ওর গতির সাথে পাল্লা দিয়ে কেউ পিছু নেয়ার কথা কল্পনাও করবে না। উপকূল পেরোবার খানিক আগে সী লেভেলে নেমে আসবে রানা, ফিনল্যান্ডের ওপর দিয়ে গালফ অভ বোথনিয়া আর স্টকহোমের দিকে ছুটবে। ফুলস্পীডে।

ওই স্পীডে অত নিচু দিয়ে উড়ে গেলে কোন প্লেন ওকে ছুঁতে পারবে না, কোন মিসাইলও ওকে স্পর্শ করতে পারবে না। অলটিমিটারের কাঁটা পঞ্চাশ হাজারের ঘর ছাড়িয়ে যাচ্ছে দেখে আপনমনে হাসল রানা। এটা ওর গর্বের হাসি। আমি অজেয়, এই রকম একটা অনুভূতি জাগল মনে। কারও সাধ্য নেই আমাকে ধরে। তুলনা হয় না আমার।

নিজের ভুল টের পেল সে খানিক বাদেই।

 

ষাট হাজার ফিটে রানাকে দেখতে পেল বেরেনকো।

মেঘের রাজ্যে একটা ফাঁক, সেই ফাঁক দিয়ে ধূসর রঙের সাগর দেখা যায়। ফাঁকটা বেরেনকোর সামনে আর অনেক নিচে। হঠাৎ সেই ফাঁকে ভেপার-ট্রেইল দেখল সে। দেখেই বুঝল, পিটি ডাভ না হয়ে যায় না। রাডার স্ক্রীনে কোন ইমেজ নেই। ওটা নিশ্চই চুরি করা মিগ-৩১।

সার্জিক্যাল ছুরির মত কাজ করছে এখন বেরেনকোর মাথা। কি করতে হবে, সে জানে। পিটি ডাভের ফাইল পড়েছে সে, কমব্যাটে লোকটা কি রকম জানা আছে। মিগ-৩১ নিয়ে খুব বেশি ওড়েনি বেরেনকো, কিন্তু মিগ-২৫ চালাবার প্রচুর অভিজ্ঞতা রয়েছে তার।

মিগ-৩১ চালিয়েছে বেরেনকো দুশো ঘণ্টার বেশি, আর পিটি ডাভ চালিয়েছে পাঁচ ঘণ্টা-আরও কম। পিটি ডাভ তার মিশন সম্পূর্ণ করতে চায়, তার মনে অপরাধবোধ রয়েছে, আর। বেরেনকো চায় প্রতিশোধ নিতে, তার মনে কোন অপরাধবোধ নেই। কে দুর্বল? জিজ্ঞেস করল বেরেনকো: আমি, না পিটি ডাভ?

ওকে আমি খুন করব।

পিপি-ওয়ানের ঠিক পিছনে থাকতে হবে তাকে, যাতে মিসাইলগুলো হিট সোর্সে আঘাত হানার সবচেয়ে ভাল সুযোগ। পায়। ঠিক পিছনে থাকলে একেবারে শেষ মুহূর্তে ইনফ্রা-রেডে। তাকে দেখতে পাবে পিপি-ওয়ানের পাইলট, তখন আর দেখতে পেলেও করার কিছু থাকবে না। বেরেনকো দেখল, একই গতিতে। একটানা ওপরে উঠে যাচ্ছে পিপি-ওয়ান। বুঝল, পাইলট তার উপস্থিতি টের পায়নি। বেরেনকোর সরল যাত্রাপথ পেরোচ্ছে পিপি-ওয়ান, তাছাড়া ওটার স্টারবোর্ড সাইডে রয়েছে পিপি-টু, এই দুই কারণে ইনফ্রা-রেডের ব্লাইন্ড স্পট কিছুক্ষণের জন্যে লুকিয়ে রেখেছে তাকে। দ্রুত পিপি-ওয়ানের পিছনে চলে যেতে হবে তাকে, আর তারপর…

 

রানার এয়ারফোন জোড়া ত্রাহি চিৎকার জুড়ে দিল। ই-সি-এম। ইকুইপমেন্ট ব্লিপ পাঠাচ্ছে। স্ক্রীনে মিসাইল দুটোকে দেখল রানা, কিন্তু নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। এ অসম্ভব! মিসাইল আসবে কোত্থেকে! অথচ স্ক্রীনের রেঞ্জিং বার-এর দিকে উঠে আসছে এক জোড়া মিসাইল, বিদ্যুৎগতিতে ছুটে আসছে ওর দিকে।

আত্মরক্ষার জন্যে নিজের অজান্তেই ইলেকট্রনিকের সাহায্য নিল। হাত দুটো, কিন্তু মন এখনও ব্যাপারটাকে মেনে নিতে পারছে না। হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগছে ওর।

ইনফ্রা-রেড মিসাইলকে এড়িয়ে যাবার একটাই মাত্র উপায় আছে এখন, জানে রানা। ইসরায়েলিরা মধ্যপ্রাচ্যে আর আমেরিকানরা ভিয়েৎনামে এই উপায়টা ব্যবহার করেছিল। ও যদি চোখের পলকে দিক বদলাতে পারে, তাহলে মিসাইলের নাকে বসানো ট্র্যাকিং সেনসর ওর ইঞ্জিনের হিট-সোর্স হারিয়ে ফেলবে, তারপর আর পিছু লেগে থাকা বা নতুন করে ধাওয়া করা সম্ভব হবে না।

গায়ের জোরে সামনের দিকে থ্রটল ঠেলে দিয়ে স্টিক পিছিয়ে আনল রানা, খাড়া ওপর দিকে উঠে যেতে চায়। মিগ-৩১ যেন সদ্য নিক্ষিপ্ত রকেট হয়ে গেল, তুমুল বেগে উঠে যাচ্ছে ওপর দিকে। পরমুহূর্তে ঘন ঘন ডিগবাজি খেতে শুরু করল এয়ারকিং। দ্রুত এগিয়ে আসা মিসাইলের সেনসর অস্থিরমতি হিট-সোর্স হারিয়ে ফেলেছে। আচমকা শেষ একটা ডিগবাজি খেয়ে এয়ারকিঙের নাক নিচের দিকে তাক করল রানা, ডান দিকে কাত হয়ে বৃত্তের খানিকটা অংশ তৈরি করে চলে এল মিসাইলগুলোর সরল যাত্রাপথের নিচে। বিপদটা এল আরেক দিক থেকে। জিএফেক্টের ফলে ঝাপসা হয়ে গেল রানার দৃষ্টি। চোখে ভয় নিয়ে জি মিটারের দিকে তাকিয়ে থাকল ও, দেখল, প্লাস এইট-জি তৈরি করেছে ও। দৃষ্টি আরও যদি ঝাপসা হয়, কিছুই দেখতে পাবে না। টেন জি মানে অন্ধ হয়ে যাওয়া, নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে প্লেন। জি-মিটার ছাড়া এখনই আর কিছুই দেখতে পাচ্ছে না ও। পা আর পেটের ওপর সেঁটে বসা জি-স্যুটের স্পর্শ পাচ্ছে কি পাচ্ছে না।

স্ক্রীনে মিসাইলগুলোর পজিশন বদলে গেছে। নিজেদের আগের কোর্সে বহাল থেকে ছুটে চলে গেল ওগুলো, প্রত্যাশিত সংঘর্ষের মুহূর্ত পেরিয়ে গেছে আগেই। হিট সোর্স হারিয়ে ছুটতেই থাকবে ওগুলো, ফুয়েল শেষ হয়ে গেলে সাগরে পড়ে ডুবে যাবে।

ধীরে ধীরে স্টিক ঠেলে দিল রানা, দৃষ্টিসীমা প্রসারিত হলো, কেটে গেল ঝাপসা ভাব, যেন ঘরের সবগুলো পর্দা সরিয়ে দেয়া হয়েছে। গতি কমে আসতে শুরু করার সাথে সাথে ঘামতে শুরু করল রানা। আর একটু হলেই ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে গিয়েছিল ওর!

স্ক্রীনে এখনও কিছু নেই। রানা এখনও জানে না, বেরেনকো। পিপি-টু নিয়ে ওর ঠিক পিছনে ইনফ্রা-রেড ডিটেকশন। ইকুইপমেন্টের নাগালের বাইরে, ব্লাইন্ড স্পটে রয়েছে।

অদৃশ্য শত্রু! যতটা না ভয় পেল রানা, তারচেয়ে বেশি ঘাবড়ে গেল। শত্রুকে ওর দেখতে পেতে হবে, তা না হলে এই যুদ্ধে টেকা দায়। এ কোন্ জাতের শত্রু, আন্দাজ করতে পারল রানা, কিন্তু বিশ্বাস করতে মন চাইল না। …তা কি করে সম্ভব!

ওটা নিশ্চই একটা প্লেন হবে, আর কিছু হতে পারে না। ওর পিছু নেয়ার জন্যে ওর চেয়ে ওপরে উঠে গেছে। চুপিচুপি হামলা চালিয়ে খুন করতে চেয়েছিল ওকে, প্রথম চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় নিশ্চই খেপে গেছে নিজের ওপর।

হঠাৎ চোখের কোণ দিয়ে রিয়ার-ভিউ মিররে দেখল, ঝিক করে উঠল একটা আলোচকচকে ধাতব কিছুর গায়ে রোদ লাগলে এমন হয়। রাডারে এখনও কিছু নেই। এতক্ষণে উপলব্ধি করল রানা। কোইভিসতু আর ইসরাফিলভ দ্বিতীয় মিগ-৩১-কে অচল করে দিতে পারেনি। আগুনে কোন ক্ষতি হয়নি। পিপি-টুর, কিংবা সামান্য যা হয়েছিল সেটা মেরামত করে ওর পিছনে লেলিয়ে দেয়া হয়েছে তাকে।

একটা চ্যালেঞ্জ অনুভব করল রানা। এখন আর সে অজেয় নয়, তার প্রতিদ্বন্দ্বী এসে গেছে। ওরটার মতই আরও একটা। মিগ-৩১ রয়েছে আকাশে। পিপি-টুর পাইলট ওর চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞ…।

ঠোঁটে বাঁকা এক চিলতে হাসি ফুটল রানার। পালানোর কথা ভাবছে না ও, ভাবছে না মৃত্যুর কথা, জিয়া ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে পিপি-ওয়ান নিয়ে নামতে না পারলে কতটুকু বিফল হবে ও, তা-ও ভাবছে না। এই মুহূর্তে গোটা ব্যাপারটা ওর আর পিপি-টুর পাইলটের মধ্যে ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে এসেছে। ডুয়েল লড়ছে ওরা, জয় পরাজয়ের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। একজন পুরুষের বিরুদ্ধে আরেকজন পুরুষ।

মিররে আবার ঝিক্ করে উঠল আলো। এক ঝটকায় থ্রটল খুলে দিল রানা অনেকখানি। জানে, ওকে এদিক ওদিক কিছু করতে দেখলে বাধা দেয়ার জন্যে ছুটে আসবে পিপি-টু। খানিকটা উঠে অকস্মাৎ বাঁ দিকে একটু ঘুরল এয়ারকিং। বাঁ দিকে পিপিটুকে পলকের জন্যে দেখতে পেল রানা, পিছু নিয়েছে ওর। আরও বাঁ দিকে ঘুরল এয়ারকিং, তারপর হঠাৎ সোজা হয়ে আগের কোর্সে ফিরে এল-ব্যাপারটা এত দ্রুত ঘটল যে সাবধান হবার আগেই ককপিটের সাথে হেলমেট ঠুকে গেল। হাত দিয়ে লিভার টানল রানা, ব্যাট্র পজিশনে চলে এল সীট। সীটের ওপর প্রায় শুয়ে আছে রানা এখন।

মিররে এখনও রয়েছে পিপি-টু। আদর্শ ফায়ারিং পজিশনের অপেক্ষায় রয়েছে বেরেনকো। চারটের মধ্যে দুটো মিসাইল নষ্ট হয়েছে তার, আন্দাজের ওপর নির্ভর করে আর কোন ঝুঁকি নেবে না সে।

স্ক্রীনে প্লেনটাকে দেখা গেল। নতুন কোন তথ্য নয়, আগেই জেনেছে রানা পিপি-টু পিছু নিয়েছে ওর। সূর্যের দিকে উঠে যাচ্ছে। বেরেনকো, কেউ যাতে ওকে দেখতে না পায়। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল রানা। বাঁ দিকে সরল একটু, তারপর গড়িয়ে দেয়া ড্রামের মত ডিগবাজি খেতে শুরু করল এয়ারকিং। ভিউ-মিররে স্থির হয়ে আছে রানার দৃষ্টি, পিপি-টুর ডানা থেকে সাদা একটু ধোঁয়া বেরুতে দেখল। কামান দাগছে রাশিয়ান পাইলট। কমলা রঙের খুদে বড়ি মন্থর বেগে রানার দিকে এগিয়ে আসছে, যেন অনেক কষ্টে সাঁতার কেটে এগোচ্ছে পানির ভেতর দিয়ে।

রাশিয়ান পাইলটের মনের অবস্থা আঁচ করতে পারল রানা। উত্তেজনার তুঙ্গে উঠে গেছে সে, আর ধৈর্য ধরতে না পেরে দ্রুত একটা পরিণতির আশায় কামান দেগেছে-লেগেও তো যেতে। পারে!

ডিগবাজির মধ্যে রয়েছে রানা, বুঝতে পারছে কামানের গোলা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। রাশিয়ান পাইলট এখন আশা করছে এবার। সূর্যের সাথে একই রেখায় চলে আসবে পিপি-ওয়ান। কিন্তু তা না। গিয়ে আরও নব্বই ডিগ্রী পর্যন্ত ডিগবাজি খেলো রানা, স্টিক টানল-আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত ঝুঁকি খেলো এয়ারকিং, রানার। তলপেটে খিল ধরল, কুঁকড়ে গেছে পেশী। আবার ঝাপসা হয়ে গেল দৃষ্টি। জি-ফোর্স এফেক্ট অসহ্য লাগল, ফেস-মাস্কের ভেতর। চিৎকার করে উঠল রানা। জি-মিটারে প্লাস নাইন, বিস্ফারিত। চোখে তাকিয়ে আছে রানা।

ডিগবাজি খাওয়া বন্ধ করে রানা দেখল, ওর সামনে চলে এসেছে পিপি-টু। একটু আগেই পরিস্থিতি উল্টে গেছে, এখন রানার পালা। ঠিক সময়ের জন্যে অপেক্ষা।

দৃষ্টিসীমা আবার প্রসারিত হয়েছে।

রাশিয়ান পাইলটের পিছনে রয়েছে রানা, ওর ছয়শো গজ। সামনে পিপি-টু। আঘাত হানার এইটাই ঠিক সময়। চিন্তার সাথে সাথে কেঁপে উঠল মিগ-৩১, এক জোড়া অ্যানাব মিসাইল স্যাঁৎ করে বেরিয়ে গেল। এইমিং সিস্টেমের সাহায্যে লক্ষ্যস্থির করেছে রানা, সিস্টেমটা বসানো আছে উইন্ডস্ক্রীনের সামনে। রাশিয়ান পাইলটের মত রানাও কোন গাইডেন্স পাবে না, কারণ থট। গাইডেড সিস্টেমের সাথে রাডারের সংযোগ আছে, ইনফ্রা-রেডের নেই।

রাডার ইমেজ না পাওয়ায় ছোড়ার পর বেরেনকো তার মিসাইলগুলোকে ইচ্ছেমত পরিচালিত করতে পারেনি। হতাশ হয়ে রানাও এখন উপলব্ধি করল, তারও সেই একই অবস্থা।

এই মুহূর্তে রানার কৌশলটাই ব্যবহার করছে রাশিয়ান পাইলট। থ্রটল সামনে ঠেলে দিয়ে খাড়াভাবে ওপর দিকে উঠে যাচ্ছে পিপি-টু, সেই সাথে ডিগবাজি খেতে খেতে সরে যাচ্ছে ডান দিকে। রানার ছুঁড়ে দেয়া মিসাইল দুটো লক্ষ্যভ্রষ্ট হলো।

দুজনই একজোড়া করে মিসাইল হারিয়েছে।

হাল ছাড়ল না রানা। পিপি-টুর পিছু ধাওয়া করল ও। থ্রটল সামনের দিকে ঠেলে দিতেই আবার জি-ফোর্স এফেক্ট অসহ্য হয়ে উঠল, সঙ্কীর্ণ হয়ে গেল দৃষ্টি।

আবার যখন দৃষ্টি ফিরে পেল, ছ্যাৎ করে উঠল বুক। সামনে দিগন্ত বিস্তৃত আর্কটিক ওশেন আর গাঢ় নীল আকাশ। কিন্তু পিপি-টুকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। এক দুই করে কয়েকটা সেকেন্ড পেরিয়ে গেল। আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে রানা। অদৃশ্য শত্রুর সাথে এঁটে ওঠা প্রায় অসম্ভব। এই সময় ভিউ-মিররে আবার ঝিক্ করে উঠল কি যেন। বুঝতে পারল রানা, ওরই কৌশল ব্যবহার করে আবার পিছনে চলে গেছে পিপি-টু। বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে আসছে, দুই প্লেনের মাঝখানের ফাঁকটা বিপজ্জনকভাবে কমে এল। আবার মিসাইল ছুঁড়বে রাশিয়ান পাইলট।

এবার তৈরি রয়েছে রানা, পিপি-টু থেকে মিসাইল বেরুতেই দেখতে পেল। উজ্জ্বল, গাঢ় কমলা রঙের। কলাম টেনে নিল রানা, অনুভব করল জি-ফোর্স ওকে সীটের গভীরে নামিয়ে দিচ্ছে। কুঁকড়ে যাচ্ছে শরীর, চিবুক ঠেকল বুকের ওপর…

শরীরের সমস্ত ব্যথা আর অস্বস্তিবোধ অগ্রাহ্য করে সচেতন থাকার প্রাণপণ চেষ্টা করল রানা। কন্ট্রোল কলামে হাত বুলাল অতি কষ্টে। কেঁপে উঠল প্লেন। পাক খেতে শুরু করল মিগ-৩১। ফ্ল্যাট স্পিনের ভঙ্গিতে দিগন্তরেখার নিচে আর ওপরে পনেরো ডিগ্রী ওঠা-নামা করছে পিপি-ওয়ানের নাক। রানার অনেকটা ওপর দিয়ে বেরিয়ে গেল মিসাইল। স্বস্তির একটা পরশ অনুভব করল রানা। কিন্তু জি-ফোর্স আবার বেড়ে ওঠায় বিচলিত বোধ। করল ও, সাড়ে আট থেকে নয়-জি-তে উঠে যাচ্ছে। একশো নট মার্কারে স্থির হয়ে রয়েছে স্পীডমিটারের কাটা।

হেডফোনে ওয়ার্নিং সিগন্যাল শুনল রানা, টারবাইনে আগুন ধরে যেতে পারে, তাই অটোমেটিক ইগনাইটার কাজ শুরু। করল-তারই সতর্ক-সঙ্কেত। প্লেন দ্রুত পাক খেতে শুরু করায় এয়ারফ্লো ইঞ্জিনকে বাধা দিচ্ছে। আর-পি-এম গজের ওপর চোখ বুলাল রানা, সিক্সটি পার্সেন্টে পৌঁছে থরথর করে কাপছে কাটা। টের পাবার আগেই আট হাজার ফিট নেমে এসেছে ও। দ্রুত নামছে আরও।

পিপি-টুকে রানা দেখতে না পেলেও, রাশিয়ান পাইলট চোখে চোখে রেখেছে রানাকে। পিপি-ওয়ানকে লক্ষ্য করে ডাইভ দিল বেরেনকো। ভাগ্য না হলে এমন চমৎকার, আদর্শ টার্গেট কেউ পায় না। এইবার শেষ করবে সে ইহুদি ব্যাটাকে।

প্লেনের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে রানা। ঝরা পাতার মত সাগরের দিকে হু হু করে নামছে এয়ারকিং। নামতে নামতে সাগরের অনেক কাছে চলে এসেছে ও, সাগর আর ত্রিশ হাজার ফিট নিচে। এখনও নামছে প্লেন। কন্ট্রোল কলামে হাত দিল রানা, অন্ধের মত এটা সেটা ধরে টান দিল। হঠাৎ করেই বন্ধ হলো পাক খাওয়া। অপজিট রাডার ব্যবহার করল রানা, খুলে দিল থ্রটল। সাগর থেকে বিশ হাজার ফিট ওপরে রয়েছে ও। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্যে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আবার ফিরে পেয়েছে। এয়ারকিংকে সিধে করে নিল ও। আটকে থাকা নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল সশব্দে।

স্ক্রীনে উজ্জ্বল একটা আভা দেখে চমকে উঠল রানা। ওরই সাথে কাছাকাছি নেমে এসেছে পিপি-টু। রানার সামান্য পিছনে, একটু ডানদিক ঘেঁষে তেড়ে আসছে। রাশিয়ান পাইলটের স্পীড হিসেব করল রানা-মাক ওয়ান পয়েন্ট সিক্স। অবিশ্বাস বেড়ে গেছে বেরেনকোর, একেবারে কাছাকাছি এসে হামলা চালাতে চাইছে সে, যাতে লক্ষ্যভ্রষ্ট হবার কোন সম্ভাবনা না থাকে।

ভিউ মিররে তাকে দেখতে পেল রানা। বুঝল, সিটিং ডাক হয়ে গেছে সে পিপি-টুর পাইলটের কাছে। আর বড় জোর দুই কি তিন মিনিট। তারপর হাজার টুকরো হয়ে ঝরে পড়বে পিপি-ওয়ান নিচের সাগরে।

কমলা রঙের বড়ি ছুটে এল। কামান দেগেছে বেরেনকো। এড়িয়ে যাবার জন্যে প্লেন একপাশে সরিয়ে নিল রানা। আয়নায় দেখল, কামানের গোলা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে বটে, পিছু ছাড়েনি পিপি-টু। ঠিক একই অবস্থানে থেকে অনুসরণ করছে ওকে। পিপি-ওয়ানের হিট-সোর্সের একেবারে কাছে চলে আসতে চাইছে বেরেনকো। হাতে আর মাত্র একটা মিসাইল রয়েছে-শিওর হয়ে মারতে চায়।

হঠাৎ বুদ্ধিটা খেলে গেল মাথায়। আকাশ-যুদ্ধের সমস্ত নিয়মের বাইরে একটা কাজ করে বসল রানা। যেন বাম দিকে সরে যাচ্ছে এমনি একটা ভঙ্গি করেই সাথে সাথে ফিরে এল আগের কোর্সে, হঠাৎ কমিয়ে দিল স্পীড, এবং রিয়ারওয়ার্ড ডিফেন্স পড় থেকে শেষ ডিকয় হিট সোর্সটা ফায়ার করল।

ফাইনাল কিল্-এর জন্যে একেবারে কাছে চলে এসেছিল বেরেনকো। পিপি-ওয়ানকে বামে সরে যেতে দেখে সে-ও বামে সরতে গেল, কিন্তু সামনের প্লেনটা যত দ্রুত আগের কোর্সে ফিরে এল তত দ্রুত ডানদিকে সরতে পারল না-ফলে সরাসরি পেছনে পড়ে গেল রানার। ঠিক এটাই চেয়েছিল রানা, ডিকয় হিট সোর্সটা ছেড়েই বুঝতে পারল কাজ হয়েছে।

উজ্জ্বল আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল রানার। পিপি-ওয়ানের পেছন থেকে বেরিয়ে শূন্যে ঝুলছে গোলাকার অগ্নিকুণ্ড।

কিছু বুঝে ওঠার আগেই পিপি-টুর বিশাল ইনটেক গিলে নিল রানার ফায়ার করা ডিকয় অগ্নিকুণ্ড-এবং সঙ্গে সঙ্গেই ঘটল প্রচণ্ড বিস্ফোরণ।

শক-ওয়েভ টের পেল রানা। দিক পরিবর্তন করল দ্রুত। রিয়ার মিররে চোখ রেখে দেখল পেছনে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী, তার ভেতর থেকে ঝরে পড়ছে পিপি-টুর হাজারটা টুকরো অংশ, কোন কোনটা ঝিক করে উঠছে রোদ লেগে। অনেক নিচে সুনীল সাগর।

এতক্ষণে টের পেল রানা, সারা শরীর থর থর করে কাঁপছে। কেমন যেন বোকা বোকা লাগছে নিজেকে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে। ফেলার আগেই চট করে কোর্স ঠিক করল ও, তারপর অটো। পাইলটের সুইচ অন করে দিয়ে চোখ বুজে এলিয়ে পড়ল সীটের ওপর। অন্তত বিশটা মিনিট বিশ্রাম নিতেই হবে ওকে।

 

পথে আর কোন ঝামেলা হয়নি। মাঝপথে একাধিকবার নিরাপদে ফুয়েল সাপ্লাই পেয়েছে রানা। শেষ বিকেল নাগাদ জিয়া আন্ত। র্জাতিক বিমান বন্দরে ল্যান্ড করল মিকোয়ান মিগ-৩১, আজ পর্যন্ত সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফাইটার প্লেন।

ককপিট থেকে নামল রানা। প্রচণ্ড একটা চমক অপেক্ষা। করছে ওর জন্যে, জানত না। স্বয়ং মেজর জেনারেল (অব.) রাহাত খান রিসিভ করতে এসেছেন ওকে!

যা কোনদিন করেনি, আজ অন্তরের উথলে ওঠা তাগিদ উপেক্ষা করতে না পেরে, ঝুঁকে পড়ে বুড়োর পা ছুঁয়ে সালাম করল রানা।

রানার এই অপ্রত্যাশিত আচরণের জন্যে তৈরি ছিলেন না রাহাত খান, তার চেহারা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে উঠল। এসো, জরুরী কথা আছে, বলে দ্রুত পিছন ফিরলেন রানার দিকে। চোখের পানি লুকাবার জন্যই কি!

টারমাকের ওপর দিয়ে একটা অ্যামফিবিয়ান প্লেনের দিকে হাঁটছেন রাহাত খান। তাকে অনুসরণ করছে রানা। ঘাড় ফিরিয়ে পিছন দিকে একবার তাকাল ও। এয়ারকিংকে ঘিরে দাঁড়িয়ে রয়েছে সশস্ত্র আর্মি গার্ড এবং বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের অনেক লোকজন। তাদের মধ্যে কয়েকজন বিদেশী, হাত-কাটা সোহেল আর শাড়ি পরিহিতা সোহানাকেও দেখতে পেল রানা। চোখাচোখি হতে হাত নাড়ল ও।

ছ্যাঁৎ করে উঠল রানার বুক। সোহানা ওভাবে কেন হাত নাড়ল? যেন বিদায় জানাচ্ছে ওকে!

ইতোমধ্যে নিজেকে সামলে নিয়েছেন রাহাত খান। ছোট্ট প্লেনের পাশে এসে দাঁড়ালেন তিনি, ফিরলেন রানার দিকে। মস্কো মেনে নিয়েছে আমাদের বক্তব্য। ওই দেখো ওদের লোক। ঢাকা থেকে মিগ-৩১ ডেলিভারি নেয়ার জন্যে রওনা হয়ে গেছে ওদের পাইলট। কিন্তু…

স্যার…

রানাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মেজর জেনারেল বললেন, কিন্তু চারদিক থেকে খবর আসছে, সি.আই.এ. এবং জিওনিস্ট ইন্টেলিজেন্স রেড সিগন্যাল ফ্ল্যাশ করছে-টার্গেট তুমি। লন্ডন, অ্যামস্টারডাম, প্যারিস, ওয়াশিংটন, সবগুলো বড় বড় রাজধানী থেকে রিপোর্ট পেয়েছি আমি-দুটো ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি তাদের প্রত্যেক এজেন্টকে একটাই নির্দেশ পাঠাচ্ছে, সমস্ত কাজ ফেলে যেভাবে পারো খুঁজে বের করো মাসুদ রানাকে। নির্দেশের নমুনা কপিও পেয়েছি আমরা, তাতে তিনবার শুধু একটাই কথা লেখা আছে: কিল হিম, কিল হিম, কিল হিম।

চুপ করে থাকল রানা। ভেবেছিল বাড়ি ফিরে ডাল-ভাত খেয়ে একটু বিশ্রাম নেবে, তারপর অফিসে গিয়ে বন্ধু-বান্ধবদের সাথে চুটিয়ে…

আমরা যে-কোন মুহূর্তে কমান্ডো হামলা আশঙ্কা করছি ঢাকা এয়ারপোর্টে, আবার বললেন রাহাত খান। এখানে এক মুহূর্ত থাকাও তোমার জন্যে নিরাপদ নয়। ক্ষ্যাপা কুকুর হয়ে গেছে ওরা, এই মুহূর্তে তোমাকে প্রোটেকশন দেয়া বি.সি.আই-এর পক্ষে সম্ভব নয়।

আমাকে কি করতে হবে, স্যার? শান্তস্বরে জিজ্ঞেস করল রানা।

সেটা তুমিই ঠিক করবে। আপাতত গা ঢাকা দিতে হবে তোমাকে। তিনমাস ছুটি। আমি এদিকটা দেখছি। তুমি কোথায়। যাবে, ঠিক করো। কেউ জানবে না কোথায় গেছ, এমন কি আমিও না। ইঙ্গিতে প্লেনটা দেখালেন। এটা তোমার জন্যেই তৈরি হয়ে আছে। কিছু নকল পরিচয়-পত্র আছে ওতে, হয়তো কাজে লাগাতে পারবে। কিছু ফরেন কারেন্সিও আছে। টাওয়ারকে বলা আছে, এই মুহূর্তে টেক-অফ করবে…

কিন্তু, স্যার, এভাবে..

খেপে গেলেন বৃদ্ধ। যা বলছি করো, তর্ক কোরো না। প্রতি মুহূর্তে বিপদ বাড়ছে আমাদের সবার। দয়া করে এবার রওনা হয়ে যাও…গেট লস্ট!

রাহাত খান নিজেই ঘুরে দাঁড়ালেন। তাঁর গমন পথের দিকে। বোবাদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল রানা। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে প্লেনের সিঁড়ির দিকে এগোল। চিন্তার ভারে নুয়ে আছে মাথা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *