দৃঢ় মনোবল নিয়ে ফার্স্ট সেক্রেটারির সামনে দাঁড়ালেন এয়ার মার্শাল ঝঝেনিৎসিন। অনেকক্ষণ ধরে ভোগাবার পর ধারণাটা তার মাথায় ধরা দিয়েছে। এখন তিনি জানেন, পিটি ডাভের জন্যে রিফুয়েলিঙের কি ব্যবস্থা করা হয়েছে। যদিও ধারণাটা তিনি খোলসা করে সরাসরি বলবেন না। কোন অবস্থাতেই ফার্স্ট সেক্রেটারির বিরাগভাজন হতে চান না তিনি। যুদ্ধমন্ত্রীর পদটা পাবার লোভে অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে ফার্স্ট সেক্রেটারির প্রিয়পাত্র হতে পেরেছেন, একটা ভুল করে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনতে রাজি নন। কিছুদিনের মধ্যে জেনারেল বাকুনিন অবসর নেবেন, তার স্বপ্ন বাস্তব হয়ে ধরা দিতে আর বেশি দিন নেই। মনে মনে ভাল করেই তিনি জানেন, পিটি ডাভ যদি মিগ-৩১ নিয়ে নিরাপদে পালিয়ে যেতে পারে, ব্যর্থতার জন্যে তাঁকেই দায়ী করা হবে।

আমার মনে হয়, নরম সুরে বললেন তিনি, ফার্স্ট সেক্রেটারি, এই কন্ট্যাক্ট, বরফের জন্য অস্পস্ট হলেও, তদন্ত করে দেখা দরকার।

ফার্স্ট সেক্রেটারি কিছু বললেন না। ডিম্বাকৃতি টেবিলে বসে ম্যাপে চোখ বুলাচ্ছেন তিনি। এক সময় মুখ তুললেন, আবার বলুন।

একটা সম্ভাবনার কথা ভাবছি, মৃদু কণ্ঠে বললেন ঝনঝেনিৎসিন। ওরা হয়তো বড় একটা বরফের মাঠকে পিটির রানওয়ে হিসেবে ঠিক করে রেখেছে। পিটি হয়তো মিগ-৩১ নিয়ে সেই রানওয়েতে ল্যান্ড করেছে।

কিন্তু রিফুয়েলিং?

বরফের একটা মাঠ…তার নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে না। একটা সাবমেরিন? এয়ার মার্শাল লক্ষ করলেন, ফার্স্ট সেক্রেটারির চোখ দুটো মুহূর্তের জন্যে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আর হয়তো সেই সাবমেরিনই রিগার সোনারে ধরা পড়েছে।

তারমানে আপনার ধারণা, এয়ার মার্শাল, পিপি-ওয়ান নিয়ে ল্যান্ড করেছে পিটি ডাভ?

না তাকিয়েও এয়ার মার্শাল বুঝতে পারলেন, অপারেটর থেকে শুরু করে যুদ্ধমন্ত্রী, সবাই তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে আছে। জ্বী, কমরেড ফার্স্ট সেক্রেটারি। মনে হচ্ছে, নর্থ কেপে যে আমেরিকানদের প্লেন আর সাবমেরিন রয়েছে, ওগুলো ডিকয়, ওরা চাইছে আমরা ওগুলোর পিছনে ছুটি। কিন্তু পিটি ডাভের রিফুয়েলিং পয়েন্ট ওদিকে নয়। আরও দেখুন…

বলে যান।

সোনার কন্ট্যাক্টটা কোন দিকে লক্ষ করেছেন? রিগা আর। তার এসকর্টদের রিপোর্ট বলছে, পিটি ডাভকে মিগ-৩১ নিয়ে। ওদিকেই যেতে দেখেছে তারা।

হুঁ। গম্ভীর আওয়াজ বেরুল ফার্স্ট সেক্রেটারির গলা থেকে। ম্যাপের দিকে নিবিষ্ট মনে তাকিয়ে আছেন তিনি। কয়েক সেকেন্ড। পেরিয়ে যাবার পর মুখ তুললেন, বললেন, ঠিক আছে, এত জোর দিয়ে যখন বলছেন, এসকর্টিং সাবমেরিনগুলোর একটাকে ওদিকে পাঠানো যেতে পারে তদন্ত করে দেখার জন্যে।

কিন্তু, কমরেড ফার্স্ট সেক্রেটারি, মাত্র একটা সাবমেরিন…ধরুন, যদি…

ঝনঝেনিৎসিনকে থামিয়ে দিলেন ফার্স্ট সেক্রেটারি। একটা, তার বেশি নয়, এয়ার মার্শাল। ওখানে পৌঁছুতে কতক্ষণ লাগবে?

চল্লিশ মিনিট।

বেশ। তদন্তে যদি দেখা যায় আপনার অনুমান মিথ্যে নয়, তখন অবশ্যই পিপি-টুকে ওখানে যেতে বলা হবে। কেপ থেকে ফুলস্পীডে চলে আসবে বেরেনকো।

স্বস্তি অনুভব করলেন ঝনঝেনিৎসিন। দ্রুত এগিয়ে গিয়ে এনকোডিং-কনসোলের সামনে দাঁড়ালেন, নিজেই নির্দেশ পাঠাতে শুরু করলেন রিগার ক্যাপ্টেনকে।

 

সবুজ সোনার স্ক্রীনের সচল বাহুগুলোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে চোখ ব্যথা করতে শুরু করল রানার। শার্কের কন্ট্রোল রুমে, অপারেটরের মাথার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে ও, সোনার থেকে বেরিয়ে আসা ওয়ার্নিং সিগন্যাল শুনে বুঝতে পারছে কি ঘটবে। স্ক্রীনের একটা ব্লিপ, একটা এসকর্ট সাবমেরিন, পশ্চিমমুখো কোর্স বদলে একাই এদিকে এগিয়ে আসছে। সোজা শার্কের দিকে।

এটা লং রেঞ্জ সোনার স্ক্রীন, এর আওতায় রয়েছে ত্রিশ মাইল। এই মুহূর্তে বিশ মাইল দূরে রয়েছে সাবমেরিনটা। স্ক্রীন থেকে বাকি দুটো ব্লিপ অদৃশ্য হয়ে গেছে রানা কন্ট্রোল রুমে ঢোকার আগেই।

আর কতক্ষণ লাগবে? নিস্তব্ধতা ভেঙে জানতে চাইল রানা। ওর হাতের তালু ঘামতে শুরু করেছে।

ঠিক বলা যাবে না, স্যার, অপারেটর জবাব দিল। লং রেঞ্জ সোনার স্ক্রীনে ক্লিপ দেখে কিছু বলা ভারি কঠিন-ডিসটরশন। ফ্যাক্টর টোয়েনটি পার্সেন্ট।

রাশিয়ান সাবমেরিনের স্পীড কত?

জানি না! গম্ভীর জেমসন। ওটা যে কি ধরনের সাবমেরিন তাও আমার জানা নেই। তার চেহারায় রাজ্যের উদ্বেগ। শর্ট রেঞ্জ সোনারে ধরা পড়ক, তখন জানা যাবে। একটা কমপিউটর ওটাকে আইডেনটিফাই করবে, কিন্তু আরও কাছে না এলে থি-ডি ইমেজ কমপিউটরের কাছ থেকে পাওয়া যাবে না।

কন্ট্যাক্ট বেয়ারিং রেড থ্রী-নাইনার, আরও কাছে চলে আসছে, ঠাণ্ডা, যান্ত্রিক সুরে বলল অপারেটর।

কি করবেন বলে ভাবছেন? জিজ্ঞেস করল রানা।

মুখ তুলে রানার দিকে তাকিয়ে থাকল ক্যাপ্টেন। তারপর কঠিন সুরে বলল, ভাবার কথা তো আপনার। আগেই তো বলেছি, আমরা নিরস্ত্র। এখন আপনার মর্জির ওপরই নির্ভর করছে এতগুলো লোকের জীবন-মরণ।

তার মানে?

আপনার মিগে দুটো মিসাইল ছিল, আরও দুটো সাপ্লাই দিয়েছি আমরা, বলল ক্যাপ্টেন। রাশিয়ানরা এসে পড়ার আগে রানওয়ে মেরামত হয়ে যাবে, আপনি নিরাপদে উঠে যেতে পারবেন আকাশে। তারপর আপনার যদি দয়া হয়, মিসাইল ছেড়ে সাবমেরিনটাকে ডুবিয়ে দিতে পারেন, তাহলে আমরা সবাই পালিয়ে যাবার সময় পাব। অবশ্য দুনিয়ায় এমন লোকের অভাব নেই যারা উপকারের বিনিময়ে উপকার করার গরজ দেখায় না…

অসম্ভব! তীব্র প্রতিবাদ জানাল রানা। এ হয় না!

কেন হয় না? জানতে চাইল ক্যাপ্টেন। রানার উত্তর শুনে অবাক হয়েছে তা মনে হলো না।

সাবমেরিনে একশোর ওপর লোক আছে, ওদের আমি মারতে পারব না!

কেন পারবেন না?

এটা যুদ্ধ নয়।

কিন্তু আপনি ওদের না মারলে ওরা আমাদের মারবে, মনে করিয়ে দিল জেমসন।

মারবেই, তা নাও হতে পারে, বলল রানা।

বেশ, তাহলে আকাশে উঠেই লেজ তুলে পালাবেন না দয়া করে, প্রস্তাব দিল জেমসন। অপেক্ষা করবেন, দেখবেন ওরা কি করে। যদি দেখেন ওরা হামলা চালাতে যাচ্ছে, তখন মিসাইল ছুঁড়বেন। রাজি?

কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল রানা। তারপর এদিক ওদিক মাথা নাড়ল।

মানে?

ওরা হামলা চালালে কি করব, আমি জানি না। আগে হামলা চালাক, তখন সিদ্ধান্ত নেব। আমি দুঃখিত, ক্যাপ্টেন। আমার ওপর নির্দেশ আছে শুধু আত্মরক্ষার একান্ত প্রয়োজন ছাড়া রাশিয়ানদের লক্ষ্য করে একটা গুলিও ছোড়া যাবে না।

তারমানে আপনার কাছে এতগুলো লোকের প্রাণের কোন মূল্য নেই!

রানা চুপ করে থাকল।

জানতে পারি এই নির্দেশ কে দিয়েছে আপনাকে?

মেজর জেনারেল রাহাত খান, মনে মনে বলল রানা। দুঃখিত, ক্যাপ্টেন।

কিছুক্ষণ আপন মনে চিন্তা ভাবনা করল জেমসন, তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ঠিক আছে, নিজেদের ব্যবস্থা আমরা নিজেরাই করে নেব।

কি রকম? দ্রুত জানতে চাইল রানা।

আপনাকে দেয়ার জন্যে সীল করা একটা প্যাকেট আছে। আমার কাছে, বলল ক্যাপ্টেন। সময়মত চেয়ে নেবেন ওটা। ওতে সম্ভবত আপনার রুটের কথা বলা আছে।

আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দেননি, ক্যাপ্টেন।

নিজেদের ব্যবস্থা মানে…ওয়ারড্রোব থেকে কাপড়চোপড় বের করে ছদ্মবেশ নিতে হবে আমাদের, বলল জেমসন।

কন্ট্যাক্ট বেয়ারিং এখনও রেড থ্রী-নাইনার, কাছে চলে আসছে, রিপোর্ট করল অপারেটর। তার চেহারা বা কণ্ঠস্বরে ভয় বা দুশ্চিন্তার কোন ছাপ নেই।

ব্লোয়ার দাও আমাকে, হুকুম করল ক্যাপ্টেন। গার্ডনার তার। হাতে একটা মাইক্রোফোন ধরিয়ে দিল, ট্রান্সমিটারের বোতাম। টিপে চালু করে দিল সেটা।

মাইক্রোফোনে জেমসন বলল, আমি ক্যাপ্টেন বলছি, মন দিয়ে শোনো তোমরা। গোবেচারা-র ভূমিকায় নামছি আমরা, এই মুহূর্তে কাজে ঝাপিয়ে পড়ো সবাই। এক সেকেন্ড বিরতি নিল সে, তারপর আবার শুরু করল, আর হয়তো ত্রিশ মিনিট সময় আছে, কমও হতে পারে, কাজেই…

রানাকে পিছু নেয়ার ইঙ্গিত দিয়ে নিজের কেবিনে ফিরে এল ক্যাপ্টেন।

গোবেচারা মানে?

কেবিনের দরজায় তালা লাগাল জেমসন। ওয়াল-সেফ খুলে। সেলোফেন কাগজে মোড়া একটা প্যাকেট বের করে ধরিয়ে দিল রানার হাতে। প্যাকেটটা সীল করা। নেড়েচেড়ে দেখছে রানা, এই সময় চোখের কোণ দিয়ে লক্ষ করল, ওয়াল-সেফের ভেতর। থেকে একটা ক্যাপসুল বের করে পকেটে ভরল জেমসন।

কি ওটা? অস্ফূটে জানতে চাইল রানা।

ডেথ পিল, বলে ক্ষীণ একটু হাসল জেমসন।

সবই বুঝল রানা। মুখে কথা যোগাল না।

ওয়াল-সেফ বন্ধ করল ক্যাপ্টেন।

রানা মৃদু গলায় আবার জানতে চাইল, গোবেচারা কি? প্যাকেটের সীল খুলতে শুরু করেছে ও।

একটু পরই তো ওপরে যাব, তখন নিজের চোখেই দেখতে পাবেন। এই গোবেচারার ভূমিকাই আমাদেরকে বাঁচিয়ে দেবে।

সীল করা প্যাকেটের ভেতর যে ম্যাপ, নকশা আর নির্দেশ রয়েছে সেগুলো পিটি ডাভের কাজে লাগত, কারণ পিটি ডাভ আর্কটিক থেকে ইসরায়েলে যেত। কিন্তু রানা যাবে বাংলাদেশে। তবে আবার রিফুয়েলিঙের জন্যে পিটি যেখানে নামত, রানাও সেখানেই নামবে। ফিনিশ উপকূল পেরিয়ে স্টকহোমের দিকে যাবে ও। ওখান থেকে এশিয়ার দিকে যাবার জন্যে বিদেশী এয়ারলাইনসের প্লেনের ঠিক পিছনে থাকতে হবে ওকে। একটা প্লেনের পিছনে আর একটু নিচে থাকলে প্যাসেঞ্জার-প্লেনের আরোহীরা ওকে দেখতে পাবে না, সেই সাথে ইনফ্রারেড স্ক্রীনেও ধরা পড়বে না। ইনফ্রারেড হিট-সোর্সের সন্ধান ঠিকই পাবে, কিন্তু সেটার উৎস প্যাসেঞ্জার প্লেন বলে ধরে নেবে রাশিয়ানরা। এ-সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশ আগেই পেয়েছে রানা। জানে, রাশিয়ানরা শেষ চেষ্টা হিসেবে তাকে অনেক দূর পর্যন্ত ধাওয়া করতে পারে। ইউরোপ আর এশিয়ার কোন্ এয়ারপোর্ট থেকে কোন প্লেন কখন টেক-অফ করে কোনদিকে যাবে, সব মুখস্থ করতে হয়েছে ওকে। একটা ছাইদানী দিল জেমসন, কাগজ আর ম্যাপ সব তাতে ফেলে পুড়িয়ে ফেলল রানা। বলল, চলুন, রানওয়ে মেরামত হয়েছে কিনা দেখি।

 

সি.আই.এ. হেডকোয়ার্টারের অপারেশন রুমে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। নর্থ কেপ এলাকায় যে টোপ ফেলা হয়েছিল, রাশিয়ানরা সেটা গিলেছে, এসকর্টসহ ওদের মিসাইল ক্রুজার রিগা রওনা হয়ে গেছে সেদিকে। জননী-১ থেকে ক্যাপ্টেন জেমসন ঝুঁকি নিয়ে একটা রিপোর্ট পাঠিয়েছে, জানা গেছে এয়ারকিং নিয়ে নিরাপদেই। ল্যান্ড করেছে পিটি ডাভ, রিফুয়েলিঙের কাজও শেষ।

সাফল্যের আনন্দে পালা করে পরস্পরের পিঠ চাপড়াচ্ছেন। মরগ্যান আর ময়নিহান। জিওনিস্ট ইন্টেলিজেন্স চীফ ময়নিহানের বেসুরো গলার খ্যাক খ্যাক হাসি থামতেই চাইছে না, সারাক্ষণ দুই কান পর্যন্ত লম্বা হয়ে আছে তার ঠোঁট। নিজের ঢাক নিজেই পেটাচ্ছেন তিনি, নির্লজ্জ অপ্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছেন,। বলেছিলাম না, জিওনিস্ট ইন্টেলিজেন্স রাশিয়াকে এক হাত দেখিয়ে দেবে! আর পিটি, ও তো সুপারম্যান!

কোন সন্দেহ নেই, গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিলেন সি.আই.এ. চীফ মরগ্যান। জেমস বণ্ডকেও ম্লান করে দিয়েছে ও।

আমি তো বলি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ স্পাই পিটি, কথাটা। বলে একে একে সবার দিকে তাকালেন তিনি, যেন চ্যালেঞ্জ। করছেন।

যখন ওরা জানবে, মিগ-৩১ ইসরায়েলের দিকে যাচ্ছে না, বা যখন জানবে ইসরায়েলি পাইলট পিটি ডাভ রাশিয়ায় ঢুকতেই। পারেনি, রানা ইনভেস্টিগেশনের এজেন্টরা তাকে লন্ডনে বন্দী। করে রেখেছিল, কি রকম দেখতে হবে ওদের চেহারা? কল্পনা করতে গিয়ে হেসে ফেললেন অ্যাডমিরাল জর্জ হ্যামিলটন। কামরার মাঝখানে একটা টেবিলে বসে আছেন তিনি। কল্পনায় দেখলেন, রবার্ট মরগ্যান নিজের মাথার চুল ছিড়ছেন, আর ভেউ। ভেউ করে কাঁদছেন ময়নিহান।

ছোটখাট একটা উৎসব করা যায় না? প্রস্তাব দিলেন ময়নিহান। আড়চোখে ঘরের কোণে তাকালেন তিনি, ওখানে। একটা ট্রলি রয়েছে, তাতে হুইস্কির বোতল, বরফ ইত্যাদি সাজানো।

অবশ্যই, অবশ্যই! শশব্যস্ত হয়ে লিলিয়ানকে ডাকলেন মরগ্যান। কিচেন থেকে লিলিয়ান আর আইলিন বেরিয়ে এল, এখনও তারা আঁটসাঁট ট্রাউজার আর শার্ট পরে আছে।

হুইস্কির গ্লাস হাতে নিয়ে তিনজন পরস্পরের দিকে তাকালেন। নিজের গ্লাসটা উঁচু করে ধরলেন ময়নিহান, বললেন, এয়ারকিঙের শুভকামনায়, আর পিটি ডাভের স্বাস্থ্যকামনায়।

মরগ্যানও তাই বললেন, কিন্তু হ্যামিলটন কি বললেন কিছু বোঝা গেল না।

জননী-১ লক্ষ্য করে রাশিয়ান সাবমেরিন আসছে, ক্যাপ্টেন জেমসন আবার একবার ঝুঁকি নিয়ে যদি এই খবরটা দিত ওঁদের, হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিতে গিয়ে বিষম খেতেন সবাই।

 

রানা আর জেমসনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে চীফ ইঞ্জিনিয়ার হাডসন। তার হুডের চারপাশে ঘাম জমেছিল, সাথে সাথে তা বরফ হয়ে গেছে। তার ঠোঁটের ওপর গোঁফেও বরফ কুচি লেগে রয়েছে। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত চেহারা।

বলো, হাডসন, প্রশ্ন করল ক্যাপ্টেন, মইয়ের গায়ে হাত রেখে শার্কের সেইলে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে।

কাজ প্রায় শেষ, বলল হাডসন। ত্রিশ ফিট রিজ ভেঙে দিয়েছি আমরা।

ভেরি গুড…।

নট সো গুড, ক্যাপ্টেনকে বাধা দিয়ে বলল চীফ ইঞ্জিনিয়ার। কারণ, আসল কাজটাই এখনও বাকি। টারবাইন থেকে হোস টেনে নিয়ে যেতে হবে ওখানে, প্রচুর পাইপ দরকার। এতে সময় লাগবে খুব বেশি।

রানা আর জেমসন পরস্পরের দিকে তাকাল। রাশিয়ান সাবমেরিন কাছে চলে এসেছে, হাতে সময় নেই।

কতক্ষণ লাগবে?

আমার লোকেরা ক্লান্ত, ঠাণ্ডায় নড়াচড়া করতে পারছে না, তার ওপর কুয়াশা আগের চেয়ে বেড়েছে…কতক্ষণ লাগবে। আন্দাজ করে বলা কঠিন।

যত তাড়াতাড়ি পারো শেষ করো, নির্দেশ দিল জেমসন। রানওয়ে কোথাও উঁচু-নিচু থাকলে চলবে না, মখমলের মত মসৃণ। হওয়া চাই-দেড়শো নট স্পীডে ওই জায়গাটা পেরোবে এয়ারকিং, কিছুর সাথে ধাক্কা লাগলে স্রেফ উল্টে যাবে। কোদাল দিয়ে চাঁছলেই হবে না, স্টীম স্প্রে করতে হবে। যদি সময় পাও, রানওয়ের এ-মাথা থেকে সে-মাথা পর্যন্ত।

কিন্তু তার কি কোন দরকার আছে, ক্যাপ্টেন? প্রতিবাদের। সুরে জিজ্ঞেস করল হাডসন।

আছে। প্রচুর তুষার জমেছে, এয়ারকিঙের চাকা তাতে। আটকে যেতে পারে।

চেহারায় অসন্তুষ্ট ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল হাডসন।

আমরা গোবেচারার ভূমিকায় নামছি, বলল জেমসন। এদিকটা তদারক করে তোমাদের কাজ দেখতে যাব আমি।

নিঃশব্দে কাঁধ ঝাঁকাল হাডসন, শার্কের গা ঘেঁষে সামনের দিকে এগোল। টারবাইনের ওপরের হ্যাচ থেকে দুজন ক্রু হোস পাইপের বিশাল আকৃতির লুপ টেনে-হিঁচড়ে বের করে আনছে।

আসুন, রানাকে বলল ক্যাপ্টেন, আপনাকে এবার গোবেচারা কি দেখাই।

রানাকে স্বীকার করতেই হলো, গোবেচারা একটা চমৎকার বুদ্ধি। প্রথমে মনে হলো, ক্রুদের এই দলটা কোন নিয়ম মানছে না, এক একজন এক একটা অকাজে খামোকাই ব্যস্ত হয়ে ছুটোছুটি করছে। সবার কাজ শেষ হলে যে একটা কিছু দাঁড়াবে, দেখে মনেই হলো না। কিন্তু কিছুক্ষণ দেখার পর ব্যাপারটা উপলব্ধি করল রানা।

সাবমেরিনটা বদলে গিয়ে একটা আর্কটিক ওয়েদার স্টেশনে পরিণত হয়েছে। পকেট থেকে ট্রান্সমিটার বের করে দ্রুত নির্দেশ দিল জেমসন, টর্পেডো-টিউব আর ফরওয়ার্ড ক্রু কোয়ার্টার সাগরের লোনা পানি দিয়ে ভাল করে ধুয়ে ফেলতে হবে, কোনমতেই যেন কেরোসিনের গন্ধ না থাকে। রাশিয়ানরা ওই জায়গাগুলো ভিজে কেন জিজ্ঞেস করলে কি জবাব দেয়া হবে, তাও জানিয়ে দিল সে-খোল কোথাও লিক করছে। বরফের ওপর তড়িঘড়ি খাড়া করা হয়েছে একটা বিশাল ঘর, ঘরের ভেতর ভোতা চেহারার কাঠের ফার্নিচার সাজানো হয়েছে। জানালা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে রানা দেখল, সদ্য খাড়া করা দেয়ালে ক্রুরা ম্যাপ, আর চার্ট ঝোলাচ্ছে। ঘরের ভেতর অনেকগুলো ক্লিপবোর্ড, প্রতিটি ক্লিপবোর্ডে কাগজ আটকানো হয়েছে, প্রতিটি কাগজে জ্যামিতিক রেখা আর সংখ্যা ঠাসা। ঘরের বাইরে দুটো আকাশ ছোঁয়া মাস্তুল দাঁড় করানো হয়েছে। সবচেয়ে লম্বাটা রেডিও মাস্ট হিসেবে ব্যবহার করা হবে, অপরটার মাথায় ঘুরবে অ্যানিমোমিটার। আরও অনেক যন্ত্রপাতি বসানো হয়েছে এখানে সেখানে, কোনটা বাতাসের গতিবেগ মাপবে, কোনটা তুষারের ঘনত্ব। মোট কথা, একটা ওয়েদার-স্টেশনে যা যা থাকা দরকার, সবই আছে। এমন কি বিশাল আকৃতির ওয়েদার-বেলুন পর্যন্ত বাদ যায়নি।

পনেরো মিনিটের মধ্যে যে-টুকু কাজ বাকি ছিল শেষ হয়ে গেল। এটা যে একটা ওয়েদার-স্টেশন, একবাক্যে স্বীকার করতে হবে সবাইকে।

সাবমেরিনে ফিরে আসার সময় রানা ভাবল, এ তবু মন্দের ভাল। সাবমেরিন আর তার ক্রুদের অসহায় অবস্থায় ফেলে যেতে খারাপ লাগত ওর, হয়তো শেষ পর্যন্ত ফেলে যেতে পারতই না।

এখন আপনার চলে যাওয়ার ওপর সব কিছু নির্ভর করছে, সাবমেরিনের দিকে ফিরে আসার সময় রানাকে বলল জেমসন। ওরা এসে পড়ার আগেই যদি আপনি কেটে পড়তে পারেন, তাহলে কিছুই ওরা প্রমাণ করতে পারবে না।

কিন্তু আপনি তখন বললেন…

মুচকি হাসল জেমসন। কি বলেছি, ভুলে যান। আপনি যদি সত্যি সত্যি মাথার ওপর চক্কর দিতে থাকেন, সেটাই আমাদের জন্যে বিপদ ডেকে আনবে, ওরা বুঝে নেবে আমরাই আপনাকে ফুয়েল সাপ্লাই দিয়েছি। আকাশে হারিয়ে যেতে কতক্ষণ লাগবে আপনার?

উত্তর না দিয়ে রানা জিজ্ঞেস করল, কিন্তু এই বরফে। হিটসোর্সের সন্ধান পেয়েছে ওরা। প্রশ্ন করলে কি বলবেন?

কি বলব সেটা আপনার মাথাব্যথা নয়। জানি না-এরপর আর কথা থাকে?

কিন্তু…

আমাদের কি হবে সেটা আমরা বুঝব, আপনি শুধু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গায়েব হয়ে যাবেন।

কাঁধ ঝাঁকাল রানা।

বেশ।

পার্কার পকেট থেকে আবার ট্রান্সমিটারটা বের করে বোতাম টিপল জেমসন। ক্যাপ্টেন বলছি-গার্ডনার আছ?

গার্ডনারের যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল, স্যার।

বন্ধুদের খবর কি?

সাথে সাথে জবাব এল না, তারপর গার্ডনার বলল, এখন। আমরা কমপিউটর-প্রেডিকশন পাচ্ছি, স্যার। সোনার-কন্ট্যাক্ট, শতকরা সাত পার্সেন্ট ভুল হবার সম্ভাবনা…।

বলে যাও। খারাপ খবরের জন্যে আমি তৈরি।

আর সতেরো মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবে রাশিয়ান সাবমেরিন।

জেসাস! আঁতকে উঠল ক্যাপ্টেন।

কোর্স আর স্পীড দেখে বোঝা যাচ্ছে, সরাসরি আমাদের দিকে আসছে, স্যার।

ঝট করে রানার দিকে ফিরল জেমসন। শুনলেন তো? মাথা ঝাঁকাল রানা। ঠিক আছে, গার্ডনার-আমার সেট অন করা থাকছে, এক মিনিট পর পর খবর দেবে তুমি।

স্যার।

ক্লোজ-রেঞ্জ সোনারে ধরা পড়লে, মিনিটে দুবার রিপোর্ট চাই।

স্যার।

বুক পকেটে ক্লিপ দিয়ে সেটটা আটকে নিল জেমসন। দুটো হোস পাইপ এগিয়ে গিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে কুয়াশার ভেতর, রানাকে নিয়ে সেদিকে এগোল সে। প্রেশার রিজ এখনও অনেক দূরে, তবু স্টীমের হিস হিস আওয়াজ এল কানে। ঘাড় ফিরিয়ে এয়ারকিংকে একবার দেখল রানা। আর ষোলো কি পনেরো মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাবে রাশিয়ান সাবমেরিন, তার আগে পালানো সম্ভব হবে কি? শেষ মুহূর্তে কোন বাধা পড়ায় বরফের ওপর থেকে যেতে হবে না তো?

দুজন লোক হোসের মুখ বগলদাবা করে ভাঙা পাঁচিলের ওপর স্টীম স্প্রে করছে। এবড়োখেবড়ো হয়ে আছে বরফের গা, তবে মসৃণ করার কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।

হাডসন ওদের উপস্থিতি টের পেল, কিন্তু একবারও তাকাল না। কাজ শেষ হতে হুঙ্কার ছাড়ল সে, এবার রানওয়ের ওপর স্প্রে করতে হবে, জলদি!

কেন, স্যার? জানতে চাইল একজন ক্রু।

আমি বলছি, আবার কেন! ধমক লাগাল হাডসন।

ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়া হলো হোস পাইপ, কুয়াশার ভেতর আবার অদৃশ্য হয়ে গেল লোকগুলো। ওদের সামনে একবার। থামল হাডসন, কিছু বলতে যাবে এই সময় জ্যান্ত হয়ে উঠল খুদে। ট্রান্সমিটার। জেমসনের বুক পকেটের কাছ থেকে গার্ডনারের। যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

বলো? জেমসনের মুখের পেশী টান টান হয়ে উঠল।

কমপিউটর আইডেনটিফিকেশন: রাশিয়ান, হান্টার কিলার টাইপ সাবমেরিন, রেঞ্জ ফোর পয়েন্ট সিক্স মাইল। পৌঁছুতে আর। নয় মিনিট লাগবে…

হোয়াট! হুঙ্কার ছাড়ল জেমসন।

দুঃখিত, স্যার-আমরা যা ধরেছিলাম সোনার তার চেয়ে বেশি ভুল করেছে…

এতক্ষণে বলছ! কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল ক্যাপ্টেন। সেট অফ করো! হাডসন?

স্যার?

শুনলে?

ইয়েস, স্যার। স্যার, রানওয়ে সমান করা এখন আর সম্ভব নয়। ত্রিশ গজ চওড়া, রানওয়ের সবটুকু…অসম্ভব!

রানার দিকে ফিরল ক্যাপ্টেন। শুনলেন?

ভাঙা পাঁচিলের এদিকটা দেখাল রানা। এদিকটা একশো গজ পরিষ্কার করলেই হবে।

ঠিক জানেন? ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল ক্যাপ্টেন। অসুবিধে হবে না তো?

মাথা নাড়ল রানা।

হাডসন তবু সন্দেহ প্রকাশ করল, একশো গজ মসৃণ করাও। হয়তো সম্ভব হবে না। নিজের লোকদের কাছে চলে গেল সে, নতুন করে কাজটা বুঝিয়ে দেবে। খানিক পর লোকগুলোকে নিয়ে কাছাকাছি ফিরে এল আবার। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওদের কাজ দেখল রানা আর জেমসন। দুজনেই জানে টেক-অফ করার জন্যে প্রয়োজনীয় স্পীড তুলতে হলে বরফের গা মসৃণ হতেই হবে। তা না হলে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা পনেরো আনা।

অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।

খুদে ট্রান্সমিটারে আবার কথা বলছে জেমসন, গোবেচারা সম্পর্কে রিপোর্ট করো। আর মনে রেখো সবাই, এখন থেকে আবহাওয়া ছাড়া আর কোন বিষয়ে মুখ খোলা সম্পূর্ণ নিষেধ। অপরপ্রান্তের রিপোর্ট শুনল সে। সন্তুষ্ট দেখাল তাকে। রানার দিকে ফিরে বলল, সব ঠিক আছে। এখন শুধু আপনি চলে গেলেই আমরা নিশ্চিন্ত হতে পারি।

অস্থির, আতঙ্কিত শোনাল গার্ডনারের কণ্ঠস্বর, আর সাত মিনিট, স্যার!

কিন্তু ক্যাপ্টেনকে অবিচলিত দেখাল। ওরা যোগাযোগ করলে কি বলতে হবে, তুমি জানো।

স্যার।

হাডসনের নেতৃত্বে বিদ্যুৎগতিতে কাজ করছে ক্রুরা। এঁকেবেঁকে এগিয়ে আসছে হোস পাইপ, কুয়াশা মেশানো বাতাসে তুষারকণা উড়ছে। আরও একদল ক্রু এসে ঝাপিয়ে পড়ল কাজে, রেডিওযোগে এদের ডেকে নিয়েছে হাডসন। সাদা তুষারকণা ঘন ধোঁয়া হয়ে উঠল, ঘিরে ফেলল ওদের সবাইকে।

আর ছয় মিনিট, স্যার!

রেডিও কন্ট্যাক্ট?

এখনও হয়নি, স্যার।

হোস পাইপ ভাঙা পাঁচিলের দিকে এগিয়ে আসছে।

প্লেনে ওঠার সময় হয়েছে আপনার, বলল জেমসন। ওরা বোধহয় কাজটা শেষ করতে পারল না।

মাথা ঝাঁকাল রানা। আর এক মিনিট দেখি।

হাতে যে সময় থাকবে তাতে চোখের আড়ালে চলে যেতে পারবেন?

এতই দূরে, আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না।

 

কন্ট্যাক্ট কনফার্মড, ফার্স্ট সেক্রেটারি, ঝনঝেনিৎসিনের গলায় বিজয়ের উল্লাস প্রকাশ পেল।

জেনারেল বাকুনিন তাঁর পিঠ চাপড়ে দিলেন।

মৃদু হাসি দেখা গেল ফার্স্ট সেক্রেটারির ঠোঁটে। এখন কি করতে চান আপনি, এয়ার মার্শাল?

নর্থ কেপে পিপি-টুর সাথে যোগাযোগ করতে চাই, বললেন এয়ার মার্শাল। বেরেনকোকে সঠিক পজিশন দিয়ে বলব, যেকোন ভাবে পিপি-ওয়ানকে ধ্বংস করো।

সায় দিয়ে মাথা ঝাঁকালেন ফার্স্ট সেক্রেটারি। তবে, প্রথমে বেরেনকো পিটি ডাভকে একটা সুযোগ দেবে। সে যদি আত্মসমর্পণ করতে রাজি না হয়, তখন আর কোন উপায় থাকবে না।

একটু ইতস্তত করলেন ঝনঝেনিৎসিন, তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে কনসোলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। পিপি-টুর সাথে যোগাযোগ হলো। বেরেনকোকে পরিষ্কার নির্দেশ দিলেন এয়ার মার্শাল-ঘণ্টায় চার হাজার মাইল গতিতে ছুটতে হবে তাকে। নতুন কোর্স কি হবে, ম্যাপে চোখ রেখে তাও জানিয়ে দিলেন।

অপর প্রান্ত থেকে অবিশ্বাসের সাথে বেরেনকো জানাল, ধরে নিন পিপি-ওয়ান নেই।

 

ওরা ডাকছে, স্যার-এই মুহূর্তে পরিচয় জানাতে বলছে, ক্যাপ্টেনের বুক পকেট থেকে গার্ডনারের যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল।

কি বলতে হবে তুমি জানো, আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন?

রাশিয়ানরা আপনার সাথে কথা বলতে চাইছে, স্যার।

বলো, আসছি। বরফের আরেক প্রান্তে জরুরী একটা এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে ব্যস্ত রয়েছি আমি। বলো, ডাকতে পাঠানো হয়েছে।

স্যার। আর তিন মিনিট চোদ্দ সেকেন্ডের মধ্যে পৌঁছে যাবে ওরা।

রানাকে নিয়ে এয়ারকিঙের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে জেমসন। ক্রুরা হোস পাইপ নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে প্লেনের দিকে, সেদিকে তাকিয়ে আছে ওরা। আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ককপিটে উঠতে হবে রানাকে।

বাইরে থেকে শান্ত দেখালেও, দুশ্চিন্তা আর উদ্বেগে ভেঙে পড়ার মত অবস্থা হয়েছে জেমসনের। শেষ মুহূর্তে কোন বাধা পড়ে কিনা সেটাই তার ভয়। এয়ারকিং নিয়ে পিটি ডাভ চলে যাবার পর তাদের কপালে কি আছে আপাতত সেটা ভাবতে চাইছে না সে। মনে মনে জানে, রাশিয়ানদের বোকা বানানো অত সহজ নয়। থার্মোমিটার, মাস্ট, চার্ট ইত্যাদি দেখতে পেলেই যে বিশ্বাস করবে এটা একটা ওয়েদার-স্টেশন তা নাও হতে পারে।

নিস্তব্ধতা অসহ্য হয়ে উঠলে রানা বলল, আপনাদের এভাবে ফেলে যেতে খারাপ লাগছে আমার। আমার যদি কিছু করার থাকে, বলুন।

জেমসন যেন রানার কথা শুনতেই পায়নি। হাডসন আর তার লোকদের দিকে তাকিয়ে থেকে সে বলল, ওরা কাজটা শেষ করতে পারল না।

ওদের আমি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সময় দেব, বলল রানা।

আচ্ছা, রাশিয়ানরা যদি আপনাদের কোন ক্ষতি করে আমাকে সেটা জানাতে পারবেন?

সেট অন করে রাখবেন।

আমি তাহলে ফিরে আসব, কথা দিল রানা।

এসে হয়তো দেখবেন আমরা নেই, বিপ্ন একটু হাসি ফুটল জেমসনের ঠোঁটে।

হামলা করতে যাচ্ছে বুঝতে পারলেই আমাকে…

এমন তো হতে পারে, ওরা আমাদেরকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাবে?

সেক্ষেত্রে আমি ফিরে এসে আপনাদেরকে উদ্ধার করতে পারি।

কিভাবে? রাশিয়ান সাবমেরিন ডুবিয়ে দিয়ে? তাহলে তো। আমরাও ডুবে মরব। আমাদেরকে ওরা জিম্মি হিসেবে পেলে আপনার কোন হুকুমই কানে তুলবে না। তাছাড়া, আপনি ফিরে। আসার আগেই পানির নিচে ডুব দেবে ওরা।

হাসল রানা।

হাসছেন যে?

ওদের মিসাইল ক্রুজার কোথায় আছে খুঁজে নিতে অসুবিধে হবে না আমার, বলল রানা। যদি বলি, ওটাকে ডুবিয়ে দেব, তবু আমার কথা কানে তুলবে না?

কোন মিসাইল ক্রুজারের কথা বলছেন আপনি? রিগা?

নাম জানি না।

রিগাই। হাজার মাইলের মধ্যে আর কোন সোভিয়েত ক্রুজার নেই। ওটাকে আপনি ডুবিয়ে দিতে পারবেন? চোখে অবিশ্বাস নিয়ে রানার দিকে তাকিয়ে থাকল জেমসন।

আমি পারব মানে, মিগ-৩১ পারবে, বলল রানা। এই প্লেনের উইপনস সিস্টেম সম্পর্কে আপনার কোন ধারণা নেই। সাধে কি আমরা এটা চুরি করছি?

ঘর্মাক্ত কলেবরে ওদের সামনে এসে দাঁড়াল হাডসন। চেহারায় রাগ আর ক্লান্তি। পারলাম না, মি. ডাভ, দুঃখিত। রাশিয়ানদের এসে পড়ার সময় হয়ে গেছে। এরপরও যদি এখানে দেরি করেন আপনি, আমাদের সবার কপালে খারাবি আছে।

রানা কিন্তু ব্যস্ত হলো না। আরও এক মিনিট সময় দিলাম আপনাদের, বলল ও। এর মধ্যে আরও যতটুকু পারেন করুন।

হাঁ করে রানার দিকে তাকিয়ে থাকল জেমসন। বড় বেশি ঝুঁকি নেয়া হয়ে যাচ্ছে, মি. ডাভ।

অভয় দিয়ে হাসল রানা।

কাঁধ ঝাঁকিয়ে চলে গেল হাডসন।

আর দুমিনিট ত্রিশ সেকেন্ড, স্যার, গার্ডনারের কণ্ঠস্বর ভেসে এল। ওদের ক্যাপ্টেন বার বার আপনাকে চাইছে।

অপেক্ষা করিয়ে রাখো, বলল ক্যাপ্টেন। বরফ কুঁড়ে উঠে আসবে, মনে হচ্ছে?

না। সাধারণ কৌতূহল দেখাচ্ছে ওরা, একটু হয়তো সন্দেহও করছে, কিন্তু নির্দিষ্ট কিছু খুঁজছে বলে মনে হয় না-অন্তত কোন রকম চোটপাট দেখাচ্ছে না।

মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল রানা। একে কুয়াশা, তার ওপর মেঘে মেঘে ঢাকা পড়ে আছে আকাশ। কাঁধে একটা হাত পড়তে মুখ নামিয়ে জেমসনের দিকে তাকাল ও।

আর আপনাকে দেরি করতে দিতে পারি না, বলল ক্যাপ্টেন। শুধু যে নিজেদের কথা ভাবছি, তা নয়-আমরাও চাই, এয়ারকিং নিয়ে আপনি নিরাপদে চলে যান। বিপদ কোনদিক থেকে আসে বলা যায় না, হাতে কিছুটা বেশি সময় রাখা উচিত ছিল, কিন্তু তা আপনি রাখেননি। এবার যান।

গা থেকে পার্কা খুলতে শুরু করল রানা। আর হয়তো দেখা হবে না। আপনাদের সবাইকে আমার অসংখ্য ধন্যবাদ।

গেট আউট অভ হিয়ার, কৃত্রিম ধমক লাগাল জেমসন। ভাল কথা, হঠাৎ গলা খাদে নামিয়ে বলল সে, আপনাকে ব্যাপারটা বলি। একটাই ছেলে আমার, ইউ-এস এয়ারফোর্সের। পাইলট। তাকে আমি আপনার গল্প শোনাব…যদি বাড়ি ফিরতে পারি।

ততদিনে দুনিয়ার সবাই জেনে যাবে, আমেরিকানদের মুখের। গ্রাস কেড়ে নিয়ে গেছি আমি, ভাবল রানা। সবাই বুঝবে, রাশিয়ানদের ক্ষতি নয়, মস্ত উপকার করেছি। ছেলেকে তুমি গল্প। শোনাবে বটে, কিন্তু সে গল্প হবে মাসুদ রানার নিন্দার বয়ান।

ফিউজিলাজের সামনে এসে দাঁড়াল রানা, একটা পা রাখল। মইয়ের প্রথম ধাপে। একটা নিঃশ্বাস চাপল ও, তারপর উঠতে শুরু করল ওপর দিকে।

ককপিটে চড়ল রানা।

হেলমেট পরল ও। সকেটে অক্সিজেন, উইপনস্-কন্ট্রোল আর কমিউনিকেশন ইকুইপমেন্টের প্লাগ লাগাল। প্রথমে ধীরে ধীরে বরফের সর্ব দক্ষিণ প্রান্তে নিয়ে যেতে হবে এয়ারকিংকে, কারণ। প্রেশার রিজ আর প্লেনের মাঝখানে যতটা সম্ভব বেশি রানওয়ে দরকার হবে ওর। জানে, বরফের ওদিকটা মসৃণ করা হয়নি। দ্রুত হাতে প্রস্তুতি নিল ও। প্রি-স্টার্ট চেক সারতে বেরিয়ে গেল মূল্যবান কয়েকটা সেকেন্ড। অ্যান্টি জি স্যুটের প্লাগ সকেটে ঢোকাল, চোখ বুলিয়ে দেখে নিল গজগুলো, তাতে ফ্ল্যাপ, ব্রেক আর ফুয়েল কি অবস্থায় আছে জানা গেল। ফুয়েল ট্যাংক কানায় কানায় ভরে আছে, আপনমনে হাসল রানা। হুড কন্ট্রোলে চাপ দিতে অটোমেটিক্যালি লক হয়ে গেল সেটা, তা সত্ত্বেও ম্যানুয়ালি লক করল ও। জেমসনের দেয়া হ্যান্ডসেটটা প্রেশার স্যুটের বুক। পকেটে রয়েছে, গার্ডনারের গলা পেল ও।

রাশিয়ান সাবমেরিন…এক মিনিট ত্রিশ সেকেন্ড…

শুনলেন, মি. ডাভ? জেমসনের যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর শুনল রানা। গুড লাক, ম্যান। হোস পাইপ সরিয়ে ফেলছি আমরা। বিদায়!

ইগনিশন গ্যাং-লোড করল রানা, স্টার্টার-মটরের বোতামে চাপ দিল। জোড়া বিস্ফোরণের আওয়াজের সাথে চালু হয়ে গেল কার্ট্রিজ। গম্ভীর একটা গুঞ্জন শোনা গেল, ধীরে ধীরে বাড়ছে আওয়াজটা। ফুয়েল-বুস্টারের বোতাম টিপল ও, সন্তর্পণে খুলতে শুরু করল থ্রটল, যতক্ষণ না আর-পি-এম গজের কাঁটা টোয়েনটি সেভেন পার্সেন্টে স্থির হলো।

এরপর ব্রেক রিলিজ করে দিল রানা।

ছ্যাৎ করে উঠল বুক। নড়ল না মিগ-৩১।

Share This