কি ঘটেছে বুঝতে পারল রানা। টেমপারেচার হঠাৎ করে নেমে যাওয়ায় শিশির বিন্দুগুলো তুষার কণা হয়ে গেছে। মেরু প্রদেশে আবহাওয়ার এই আকস্মিক পরিবর্তন অপ্রত্যাশিত নয়। নিরেট বরফের ওপর তুষার জমে আছে, তাতে বাধা পেয়ে দ্রুত কমে আসছে এয়ারকিঙের গতি। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে ও, জানার উপায় নেই। ককপিট থেকে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। উত্তর-দক্ষিণে ছুটছে প্লেন, সরাসরি সাগরের দিকে। হিসেবে যদি ভুল হয়ে থাকে, সাগর যদি আর দুশো গজ দূরে না হয়ে বিশ গজ দূরে হয়, বরফের মাঠটা যদি খুব ছোট হয়…।

তুষারের পুরু আবরণের নিচে বরফের গা এবড়োখেবড়ো, গতি কমে আসায় ঝাঁকি খেতে শুরু করল প্লেন। কুয়াশা এরই মধ্যে ঘন হয়ে উঠেছে, ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। ঘাড় ফিরিয়ে। পিছন দিকে তাকাল রানা, কমলা রঙের বেলুন কোথাও দেখা গেল না। সাবমেরিনটাকে হারিয়ে ফেলেছে ও।

পোর্টের দিকে প্লেনটাকে একশো আশি ডিগ্রী ঘোরাল ও, ফিরতি পথ ধরে এগোল। এয়ারকিঙের গতি মন্থর। রানার চোখ দুটো চঞ্চল, কুয়াশার ভেতর যদি কোন ছায়ামূর্তি দেখা যায়, বা কোন আলোক সঙ্কেত।

কুয়াশা কোথাও কোথাও আবার হালকা হতে শুরু করল। খানিকটা দূরে গাঢ় রঙের কি যেন দেখল ও, মনে হলো একটা মানুষের আকৃতি, কিন্তু তারপরই হারিয়ে গেল সেটা। বোতাম টিপে ককপিটের ঢাকনি তুলে দিল ও। গরম বাতাস বেরিয়ে গেল, ভেতরে ঢুকল মেরুদেশের হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা, একদল মৌমাছি যেন অ্যান্টি-জি স্যুট ফুটো করে কামড় বসাল সারা গায়ে। দাঁতের সাথে দাঁতের বাড়ি লেগে খটাখট আওয়াজ হলো। কন্ট্রোল ধরা হাত দুটো থরথর করে কাঁপছে। হেলমেটের তালা খুলে মাথাটাকে ভারমুক্ত করল ও। খুলিতে যেন ঠাণ্ডা আগুন ধরে গেল। দাঁতের খটাখট অগ্রাহ্য করে কান পাতল ও, কুয়াশার ভেতর কিছু নড়ছে কিনা খুঁজল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে।

বাঁ দিকে…হ্যাঁ, আওয়াজটা বা দিক থেকেই আসছে। কানের ভুল? সরু গলা, অনেকটা পাখির ডাকের মত। তারপর মনে হলো, না, বাঁ দিক থেকে নয়, আওয়াজটা আসছে ওর পিছন থেকে। হতে পারে, ভাবল ও, সার্চ-পার্টি প্লেনের খোঁজে ওদিকে গিয়েছিল, এখন আবার ফিরে আসছে। রানা যে একশো আশি ডিগ্রী বাক নিয়ে এদিকে ফিরে এসেছে, এতক্ষণে জানতে পেরেছে ওরা।

প্রথমে চোখে পড়ল ল্যাম্পের ম্লান আলো। আলোটা কারও হাতে দুলছে। আলোর পিছনে মানুষের একটা আকৃতি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হলো। পিটি ডাভের নাম ধরে কে যেন ডাকছে।

সাড়া দিল না রানা। ডাকটা আবার কানে এল। উচ্চারণ আর বাচনভঙ্গি শুনে বোঝা যায়, লোকটা আমেরিকান। পিটি ডাভকে ওরা কেউ চেনে? সামনে থেকে কখনও দেখেছে?

একটু পরই জানা যাবে।

সাড়া দিল রানা, এদিকে-প্লেন এদিকে।

আপনি…মি. পিটি ডাভ? আমেরিকান লোকটা এত বড় এয়ারকিংকে এখনও দেখতে পায়নি। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে খুশি লাগল রানার, অন্তত ওই ব্যাটার চেয়ে তার চোখ ভাল।

ব্রেক ব্যবহার করার দরকার হয়নি, নরম তুষারের বাধা পেয়ে আপনাআপনি দাঁড়িয়ে পড়েছে মিগ-৩১। পার্কা পরে থাকায় চলমান একটা তাঁবুর মত দেখাল লোকটাকে। মুখের সামনে আর/টি সেট তুলে সাবমেরিনের কারও সাথে কথা বলছে। অ্যাই, তোমরা সবাই চলে এসো এদিকে, ভদ্রলোককে পেয়েছি আমি।

মূর্তিটা আরও এগিয়ে এল, এতক্ষণে তার লম্বাটে, সরু মুখ দেখতে পেল রানা। পার্কা হুডের নিচে নেভী ক্যাপে সোনালি পাত রয়েছে, তারমানে এই লোকই ক্যাপ্টেন। চোখাচোখি হতে মৃদু হাসল রানা। পিটি ডাভকে চেনো নাকি হে?

দস্তানা পরা হাত দিয়ে প্লেনের ফিউজিলাজে একটা চাপড় দিল ক্যাপ্টেন জেমসন। তারপর রানার দিকে তাকিয়ে বলল, হাই!

জবাব না দিয়ে শুধু হাত নাড়ল রানা। কুয়াশার ভেতর আলো, লোকজন দেখা গেল, এদিকে এগিয়ে আসছে। প্রত্যেকের হাতে একটা করে ল্যাম্প, সবাই ফার দিয়ে কিনারা মোড়া পার্কা পরে আছে। তাদের মধ্যে থেকে একজন জানতে চাইল, ক্যাপ্টেন, এখুনি লাইন দিতে বলেন আপনি?

ঘাড় ফিরিয়ে সহকারীদের দিকে ফিরল জেমসন। হ্যা…পাখির বাচ্চাটাকে তার মায়ের কাছে নিয়ে চলো-বেচারি তেষ্টায় মারা যাচ্ছে। রানার দিকে ফিরল সে, নিচু গলায় বলল, কংগ্রাচুলেশন্স, মি. ডাভ। আপনি অসাধ্য সাধন করেছেন।

আপনিও তার চেয়ে কম কিছু করেননি, বলল রানা।

মাথা ঝাঁকাল ক্যাপ্টেন, তারপর হ্যান্ডসেটটা মুখের সামনে তুলে বলল, ক্যাপ্টেন বলছি। রোল-কল। নাম্বার বলে যাও।

নাম্বারগুলো শুনল জেমসন। আবার যখন নিস্তব্ধতা নামল, রানার দিকে ফিরল সে। এই নরকে আমার অর্ধেক লোক দাঁড়িয়ে আছে, দুটো সরল রেখা ধরে, একেবারে সেই সাবমেরিন পর্যন্ত। দুই রেখার মাঝখান দিয়ে যেতে পারবেন তো?

অনায়াসে। মনের ভাব চেপে রাখার চেষ্টা করলেও, ক্যাপ্টেনকে রানার অস্থির মনে হলো।

দ্রুত পিছিয়ে গেল ক্যাপ্টেন। ব্রেক রিলিজ করল রানা। ধীরে ধীরে সামনে এগোল এয়ারকিং। দুই রেখার মুখে প্রথম দুজন লোককে দেখতে পেল ও, মাথার ওপর ল্যাম্প তুলে দাঁড়িয়ে আছে। একে একে আরও ল্যাম্প চোখে পড়ল, ওগুলোর মাঝখানে কুয়াশার ভেতর একটা টানেল। টানেলের দিকে প্লেনের নাক সিধে করে নিল রানা। এক এক করে পিছিয়ে যেতে লাগল ল্যাম্পের আলো। ক্যাপ্টেনের উত্তেজিত গলা শুনতে পেল ও। আরে, পিছনে তোমরা দাঁড়িয়ে থাকছ কি মনে করে? ছোটো! এটা আমাদের প্লেন, কামান দাগবে না!

ক্যাপ্টেনের কণ্ঠস্বরই বলে দেয়, আতঙ্কের মধ্যে আছে সে। লম্বা আকৃতি একটা সেইল দেখতে পেল রানা। ক্যাপ্টেন বলল, ওই দেখা যায়।

হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি।

ঠিক পাশে দাঁড় করান প্লেনটাকে। কার-এ বসে খাবেন, নাকি ভেতরে ঢুকবেন?

চুরুট আকৃতির সাবমেরিনের পাশে, সমান্তরাল রেখায় এয়ারকিংকে দাঁড় করাল রানা। জননী-১ বরফের নিচে অর্ধেক ডেবে আছে এখনও। ইঞ্জিন বন্ধ করল ও। অখণ্ড নিস্তব্ধতা নেমে এল। হঠাৎ করেই এয়ারকিঙের ওপর আশ্চর্য একটা হে অনুভব করল রানা। এটা শুধু একটা চুরি করা প্লেন নয়, নয় শুধু সি.আই.এ. আর জিওনিস্ট ইন্টেলিজেন্সের কেড়ে নেয়া মুখের গ্রাস-মিগ-৩১ রাশিয়া থেকে পালিয়ে আসতে সাহায্য করেছে। ওকে, মিসাইল-ক্রুজারকে এড়িয়ে আসতে সাহায্য করেছে…ক্যাপ্টেন জেমসনের কথায় রানার চিন্তায় বাধা পড়ল।

নেমে পড়ন, মি. ডাভ। সময়ের বড় অভাব।

ককপিট থেকে নামতে গিয়ে চমকে উঠল রানা। সারা শরীরে। তীব্র ব্যথা, হাড়ের জোড়াগুলো প্রতিবাদ করে উঠল। ঠাণ্ডায় ঠক। ঠক করে কাঁপতে শুরু করল ও! ধন্যবাদ, বিড়বিড় করে বলল। একবার। ককপিট থেকে নেমে বোকার মত দাঁড়িয়ে থাকল বরফের ওপর। সত্যি সত্যি পালিয়ে আসতে পেরেছে, বিপদ। কেটে গেছে, বিশ্বাস করতে পারছে না ও।

কারণ, অন্তরের অন্তস্তলে জানে ও, আসলে বিপদ কাটেনি।

 

ডাকো ওদের! গর্জে উঠলেন এয়ার মার্শাল ঝনঝেনিৎসিন। প্রতিটি পোলার সার্চ স্কোয়াড্রনকে রিপোর্ট করতে বলো!

সবগুলো রিপোর্ট এসে পৌঁছুতে মূল্যবান চারটে মিনিট পেরিয়ে গেল। এই চার মিনিটে পিটি ডাভ কত দূরে সরে গেল কে জানে, ভাবলেন এয়ার মার্শাল। শেষ সার্চ-প্লেনের রিপোর্ট পাবার পর আর কোন সন্দেহ থাকল না-বরফের ওপর আমেরিকানরা কোন ফুয়েল সাপ্লাইয়ের আয়োজন করেনি, বা কোন মার্কিং-এর সাহায্যে বা অন্য কোনভাবে বরফের ওপর রানওয়ে তৈরি করারও চেষ্টা চালায়নি।

ঠাণ্ডা চোখে এয়ার মার্শালের দিকে তাকিয়ে আছেন ফার্স্ট সেক্রেটারি। কফির কাপে ছোট্ট একটা চুমুক দিলেন তিনি। সবগুলো ইউনিটকে নর্থ কেপের দিকে যেতে বলুন।

মাথা ঝাঁকালেন ঝনুঝেনিৎসিন। নর্থ কেপ সেক্টরের মৌমাছিস্কোয়াড্রনগুলোকে টেক-অফ করতে বলো। ম্যাপের দিকে একবারও তাকালেন না, কোথায় কি আছে সব তার নখদর্পণে। ওতোভ আর পাভোনিকে নির্দেশ দাও, কোর্স বদলে নর্থ কেপের দিকে রওনা দেবে ওরা! নির্দেশ দাও, ফুল স্পীড।

এয়ার মার্শাল।

ব্যারেন্ট সী ম্যাপে যতগুলো সাবমেরিন দেখছ, সবগুলোকে অর্ডার করো, কোর্স বদলে নর্থ কেপে যেতে হবে। টপ স্পীড।

এয়ার মার্শাল।

রিগাকে নির্দেশ দাও, এসকর্ট সহ কোর্স বদলে নর্থ কেপের দিকে যেতে হবে। রিগাকে বলো, তার হেলিকপ্টারগুলো এই মুহূর্তে টেক-অফ করুক।

এয়ার মার্শাল।

তিনি ভাবলেন, এ হলো চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে, সেই অবস্থা। ব্যারেন্ট সী-র পানি আর তার ওপর আকাশে যা কিছু আছে সব তিনি নর্থ কেপের দিকে ঠেলে দিয়েছেন।

ম্যাপে এখন ব্যারেন্ট সী-র পশ্চিম দিকটা দেখা যাচ্ছে, এয়ার মার্শালের প্রতিটি অর্ডারের সাথে সাথে টেবিলের ম্যাপ বদলে গেছে। ঝনঝেনিৎসিন অনুভব করলেন, তিনি ঘামছেন। পা দুটো হঠাৎ করে দুর্বল লাগল, মনে হলো তার ভার বইতে চাইছে না। ধীরে ধীরে পিছু হটে একটা চেয়ারে বসে পড়লেন তিনি, মুখ তুলে দেখলেন তাঁর দিকে চেয়ে মৃদু হাসছেন ফার্স্ট সেক্রেটারি।

পরাজয় যদি মানতেই হয়, একদিক থেকে সেটা ভালই হবে, ফার্স্ট সেক্রেটারি বললেন। আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এর আগে এরকম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়নি। নিজেদের দুর্বলতা কোথায়, কি ধরনের, সব পরিষ্কার জানা যাচ্ছে, ঠিক না?

নিঃশব্দে মাথা ঝাঁকালেন ঝনঝেনিৎসিন। ভাবলেন, কিন্তু এই দুর্বলতার জন্যে নিশ্চয়ই কাউকে না কাউকে দায়ী করা হবে। একটা সবিনয় কণ্ঠস্বর শোনা গেল, কমরেড বেরেনকো রিপোর্ট করছেন-পিপি-টু উপকূল পেরোচ্ছে-ইনডিয়ার কাছে, পঞ্চাশ। ডিগ্রী লংগিচ্যুড রেখা বরাবর।

খবরটা নিস্তরঙ্গ পুকুরে ঢিল পড়ার মত। মিগ-৩১-এর প্রচণ্ড ক্ষমতা সম্পর্কে সবাই যেন নতুন করে সচেতন হয়ে উঠল। বেরেনকো টেক-অফ করেছে মাত্র পঁচিশ মিনিট হয়েছে, আর। বিলিয়ারস্ক থেকে উপকূল উত্তর দিকে বারোশো পঞ্চাশ মাইল দূরে। বিশ্বাসই করা যায় না। এত তাড়াতাড়ি উপকূল পেরিয়ে। ট্যাংকার-এয়ারক্রাফটের সাথে মিলিত হওয়ার জন্যে ব্যারেন্ট সীর ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে পিপি-টু।

এক সেকেন্ড ইতস্তত করে ঝঝেনিৎসিন জানতে চাইলেন,। বেরেনকোকে কোর্স বদলাতে বলব, ফার্স্ট সেক্রেটারি? তাঁকে। ক্লান্ত দেখাল।

মাথা নাড়লেন ফার্স্ট সেক্রেটারি, মৃদু হাসিটুকু এখনও লেগে। আছে ঠোঁটে। এখুনি নয়, আগে ট্যাংকারের সাথে দেখা হোক। তার, পিপি-ওয়ান কোথায় জানি, তখন বললেই তীরের মত পিছু। নেবে।

 

ল্যান্ড করার বিশ মিনিট পর সাবমেরিন থেকে বরফে বেরিয়ে এল। রানা, রিফুয়েলিঙের কাজ কি রকম এগোচ্ছে দেখতে চায়। বেরিয়ে আসার সাথে সাথে আবার দুসারি দাঁত খটাখট আওয়াজ শুরু করে দিল। বাতাসের বেগ বেড়েছে, ঘন মেঘের মত কুয়াশা হালকা হতে শুরু করেছে। এয়ারকিঙের পাশে দাঁড়িয়ে নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে লাগল রানা। ধার করা একটা পার্কা পরেছে ও, দাঁড়িয়ে আছে কুঁজো হয়ে, হাত দুটো পকেটে। সাবমেরিনের ক্রুরা খাটছে, রিফুয়েলিঙের কাজে ঝামেলা কম নয়।

ক্যাপ্টেন জেমসনের সাথে দুমিনিট আলাপ করেই বুঝে নিয়েছে রানা, পিটি ডাভকে ওরা কেউ কখনও দেখেনি, এমন কি তার একটা ফটো পর্যন্ত পায়নি।

দুটো হোস, প্রতিটি ডায়ামিটারে চার ইঞ্চি, বরফের ওপর দিয়ে এঁকেবেঁকে প্লেনের দিকে এগিয়ে এসেছে। ঠেলে নিয়ে আসা হয়েছে একটা ট্রলি-পাম্প, সাবমেরিনের ফরওয়ার্ড হ্যাচ থেকে উইঞ্চের সাহায্যে নামানো হয়েছে ওটাকে। ছোট আরও একটা হ্যাচের মুখ খোলা হয়েছে, সেটা ফরওয়ার্ড ডেকে। ওদিক থেকে তেলের গন্ধ ভেসে এল রানার নাকে। ফরওয়ার্ড ক্রু কোয়ার্টারের ওপরের হ্যাচের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেছে একটা হেভী-ডিউটি হোস।

রিফুয়েলের কাজ শেষ হতে আরও বিশ মিনিট লাগবে, জানে রানা। এয়ারবেসে যে-ধরনের প্রেশার-পাম্প থাকে তার সাহায্যে একটা যুদ্ধবিমানে প্রতি মিনিটে তিন হাজার গ্যালন ফুয়েল ভরা যায়, আর এখানে যে ট্রলি-পাম্পটা রয়েছে সেটা মান্ধাতা আমলের, একটু একটু করে দম ফেলে।

কাজের শুরুতেই বাধা পড়েছিল, রানা তখন সাবমেরিনে বসে হালকা নাস্তা সারছে। ট্রলি-পাম্পটা ঠিকমত কাজ করছে কিনা পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখা গেল, কয়েক জায়গায় ওয়্যারিং ঢিলে হয়ে আছে। তারপর দেখা গেল, বন্ডিং ওয়্যার লম্বায় অনেক ছোট। সব ঠিকঠাক করে নিয়ে কাজ শুরু করতে বেরিয়ে গেছে। মূল্যবান বিশটা মিনিট।

ইউ.এস.এস. শার্কে দুজন সিভিলিয়ান রয়েছে, একজন ইঞ্জিনিয়ার, অপরজন ইলেকট্রনিক এক্সপার্ট। রিফুয়েলিঙের কাজ তদারক করছে তারা। তাদের আশ্বাস পেয়ে ক্যাপ্টেনের কেবিনে ফিরে এল রানা।

খোশ-গল্প করার মেজাজ নেই কারও, কাজেই চুপচাপ বসে থাকল দুজন। রানা শুধু এক সময় বলল, দশ মিনিট।

জ্বী।

দশ মিনিটের মধ্যে রিফুয়েলিঙের কাজ শেষ হবে তো? জানতে চাইল রানা।

কোনরকম নিশ্চয়তাও দিল না ক্যাপ্টেন, আবার রানাকে হতাশও করল না, শুধু কাঁধ ঝাঁকাল। এই সময় নক হলো। দরজায়। কেবিনে উঁকি দিল লে. কর্নেল জন গার্ডনার। ক্যাপ্টেনকে বলল, ওয়েদার রিপোর্ট, স্যার।

গার্ডনারের গলার সুরে এমন একটা কিছু ছিল, সটান উঠে দাঁড়াল রানা। কি হয়েছে?

বাতাসের বেগ বাড়ছে, স্যার, রানার দিকে নয়, ক্যাপ্টেনের দিকে তাকিয়ে কথা বলছে গার্ডনার। প্রায়ই পনেরো নট পর্যন্ত উঠে যাচ্ছে।

ক্যাপ্টেন মাথা ঝাঁকাল। শান্ত হলো রানা। পনেরো নট। বাতাসে টেক-অফ করা তেমন বিপজ্জনক নয়।

কাজ কতদূর? জানতে চাইল জেমসন।

প্রায় হয়ে এসেছে, স্যার-আর সাত কি আট মিনিট লাগবে, হাডসন তো তাই বলল।

আবার মাথা ঝাঁকাল ক্যাপ্টেন। শার্কের চীফ ইঞ্জিনিয়ার। হাডসন, তার হিসেবে ভুল হতে পারে না।

দরজা থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল গার্ডনার। আবার বসতে যাবে রানা, প্রচণ্ড এক ঝাঁকি খেয়ে টেবিলের ওপর দিয়ে উড়ে এসে। পড়ল বাল্কহেডের গায়ে। পলকের জন্যে জেমসনকে দেখতে পেল ও, বাঙ্ক থেকে ছিটকে পড়ে যাচ্ছে। দুবার দপদপ করে উঠে নিভে গেল সাবমেরিনের আলো, তারপর আবার ফিরে এল। কাঁধ। সহ শরীরের একটা অংশ প্রায় অবশ হয়ে গেছে রানার, ডেক  থেকে উঠতে গিয়ে আবিষ্কার করল ওর বুকের ওপর পদ্মাসনে বসে আছে ক্যাপ্টেন। খোলা দরজা দিয়ে একটা গোঙানির আওয়াজ ভেসে আসছে, কম্প্যানিয়নওয়েতে আছাড় খেয়ে আর উঠতে পারছে না গার্ডনার। রানার বুক থেকে নামল ক্যাপ্টেন জেমসন, রানাও উঠে বসল।

কি? ব্যথায় চোখ-মুখ কুঁচকে আছে রানার।

ঠোঁটের কোণ কেটে রক্ত বেরুচ্ছে, হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে সেটুকু মুছে নিয়ে টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল জেমসন। বাইরে ছুটন্ত পায়ের আওয়াজ। টলতে টলতে দরজার দিকে এগোল সে। হুঙ্কার ছেড়ে জানতে চাইল, কি ঘটছে কি, সেইলর?

দাঁড়াতে পারল রানা, কিন্তু হাঁটতে গিয়ে টের পেল, গোড়ালি মচকে গেছে, খোড়াচ্ছে একটু একটু। এক হাত দিয়ে বা কাঁধটা ডলছে, অবশ ভাবটা দূর হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। তবু ভাল যে কোন হাড় ভাঙেনি বা অন্য কোনদিকে সরে যায়নি।

স্যার…আমরা জানি না!

কি? জানো না? তাহলে তোমরা আছ কি করতে? জানো না–জানো!

স্যার! কম্প্যানিয়নওয়ে ধরে ফিরতি পথে আবার ছুটল নাবিক।

এয়ারকিং …

রানার কথা শেষ না হতেই জেমসন বলল, রাখুন আপনার এয়ারকিং! আমি আমার বোটের কথা ভাবছি।

জেমসনের পিছু পিছু কেবিন থেকে বেরিয়ে এল রানা। বাল্কহেডে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে গার্ডনার, তার কপাল কেটে রক্ত গড়াচ্ছে। তার দিকে একবারও না তাকিয়ে পাশ কাটিয়ে এগোল ক্যাপ্টেন। একবার থেমে গার্ডনারের ক্ষতটা পরীক্ষা করল রানা, সেটা তেমন মাক নয় দেখে লে. কর্নেলের পিঠ চাপড়ে দিয়ে ক্যাপ্টেনের পিছু পিছু ঢুকে পড়ল কন্ট্রোল রুমে।

কন্ট্রোল রুমে এখনও সবাই উঠে বসতে বা দাঁড়াতে পারেনি। উল্টে পড়া ফার্নিচার তুলছে কয়েকজন। হ্যাচ ল্যাডার ধরে ব্রিজে উঠে এল রানা।

ড্যামেজ রিপোর্ট দাও আমাকে, জলদি! ঠোঁটে আঙুল বুলিয়ে। লাল আঙুলটা চোখের সামনে ধরল ক্যাপ্টেন।

হিম বাতাস পরনের পার্কা ভেদ করে গায়ে হুল ফোটাচ্ছে। সেইলের মাথা থেকে এয়ারকিংকে দেখা গেল। দেখে মনে হলো প্লেনের কোন ক্ষতি হয়নি। রিফুয়েলিঙের কাজে যারা ব্যস্ত ছিল তারা সবাই এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে, দুএকজন এখনও বরফ থেকে উঠে দাঁড়াতে পারেনি। চিৎকার করে একজন। নাবিকের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করল রানা, লোকটা এয়ারকিঙের। কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওহে, কি হয়েছে জানো কিছু?

মুখ তুলে এদিকে তাকাল লোকটা, রানার পাশে ক্যাপ্টেনকে। দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। ঠিক বলতে পারব না, স্যার-বিদঘুটে একটা শব্দ শুনলাম, তারপর দেখি বরফের ওপর পড়ে আছি। মনে হলো বোটে বোধহয় মাছ ঢুকেছে…

বেকুব? গাল পাড়ল ক্যাপ্টেন। কোথেকে আসবে টর্পেডো? হাডসন কোথায়!

ওদিকে গেছেন, স্যার। লোকটা হাত তুলে ভাসমান বরফের উত্তর দিকটা দেখাল।

উত্তর দিকে এখনও কুয়াশা রয়েছে, তবে হালকা। কিন্তু দেড়শো ফিটের বেশি দৃষ্টি চলে। কি হয়েছে জানার জন্যে লোক পাঠানো হয়েছে, রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ওরা দুজনেই একটা ব্যাপার লক্ষ করল, সময়ের সাথে সাথে বাতাসের বেগ আরও বাড়ছে। চোখে-মুখে ঝাপটা লাগায় দুজনেরই চোখ ছলছলে হয়ে উঠল।

ভয় হচ্ছে রানার। বিপদটা কি হতে পারে আঁচ করতে পারছে ও। বাতাসের বেগ বাড়ছে সেটা তেমন বিপদ হয়ে দেখা নাও দিতে পারে। কিন্তু ভাসমান বরফের মাঠ যদি গলতে শুরু করে বা বরফের গায়ে কোথাও যদি ফাটল দেখা দেয় অথবা বরফ যদি চাপ খেয়ে ফুলে ওঠে…

কুয়াশার ভেতর হাডসনকে দেখা গেল। অস্পষ্ট, মন্থর গতি একটা ছায়ামূর্তি। তাকে লক্ষ্য করে ছুটল রানা। কি হয়েছে? রুদ্ধশ্বাসে জানতে চাইল ও। চীফ ইঞ্জিনিয়ারের পথ আগলে তার কাঁধ খামচে ধরল। বলুন কি হয়েছে!

শান্তচোখে রানার মুখের দিকে তাকিয়ে এক সেকেন্ড চুপ করে থাকল চীফ ইঞ্জিনিয়ার, তারপর মৃদু গলায় বলল, প্রেশার রিজ! রানা যা আশঙ্কা করেছিল তাই। বরফের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত।

হতাশায় কালো হয়ে গেল রানার চেহারা, বাঁ হাতের তালুতে ডান হাত দিয়ে ঘুসি মারল ও। কত চওড়া?

তিন কি চার ফিট…

কোথায়…চলুন আমাকে দেখাবেন! হাডসনের কজি ধরে টান দিল রানা। ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রকাণ্ডদেহী চীফ ইঞ্জিনিয়ার অনুসরণ করল ওকে। ওদের পিছু নিল হতভম্ব জেমসন।

দুপাশের প্রচণ্ড চাপে ভাসমান বরফের মাঝখানটা ফুলে উঠেছে-প্রেশার রিজ। প্রায় চার ফিট উঁচু ওটা, সাগর থেকে উঠে এসে নিচু পাঁচিলের মত বরফের ওপর দিয়ে আড়াআড়ি ভাবে সোজা চলে গেছে দৃষ্টি সীমার বাইরে।

ঠিক জানো এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত গেছে? জিজ্ঞেস করল জেমসন।

হ্যাঁ, দুদিকেই আমি অনেক দূর পর্যন্ত গেছি।

টেক-অফ করার জন্যে প্রেশার রিজ কি রকম বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, চীফ ইঞ্জিনিয়ার তা বোঝে, সেজন্যেই বাতাস উপেক্ষা করে যতদূর সম্ভব দুদিকটা দেখে এসেছে সে, তার কথা অবিশ্বাস করা যায় না।

আতঙ্কিত বোধ করল রানা। ঘটল কিভাবে? অস্কুটে। জানতে চাইল ও।

দমকা বাতাস, হাডসন বলল। বরফের ছোট একটা মাঠকে। তাড়িয়ে নিয়ে এসেছে বাতাস, আমাদের মাঠের সাথে ধাক্কা। খেয়েছে-দুটো গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষের মত। ফলাফল, এই। প্রেশার রিজ।

হাডসনের আস্তিন চেপে ধরল রানা। এর অর্থ আপনি বোঝেন? আমি টেক-অফ করতে পারব না! মিগ-৩১ এখানে। আটকা পড়ে গেল!

 

বেরেনকো? আমি ঝনঝেনিৎসিন, কনসোলের সামনে দাঁড়িয়ে। কথা বলছেন এয়ার মার্শাল। সময় বাঁচাবার জন্যে কোড ব্যবহার করছেন না তিনি, তবে পাইলটের নাম ছাড়া নিজের বা প্লেনের সম্পূর্ণ পরিচয়ও প্রকাশ করছেন না।

এই মুহূর্তে বেরেনকো, মিকোয়ান মিগ-৩১ প্রজেক্টের দ্বিতীয় পাইলট, মাটি থেকে পঞ্চাশ হাজার ফিট ওপরে রয়েছে, তার পিপি-টু-র নোজ প্রোব ঢুকে রয়েছে একটা রিফুয়েলিং প্লেনের ভেতর।

কনসোল স্পীকার থেকে জট পাকানো শো শো শব্দ ভেসে এল। অস্পষ্টভাবে শোনা গেল, বেরেনকো-ওভার।

বেরেনকোকে ঝনুঝেনিৎসিন। রিফুয়েলিং শেষ হবার সাথে সাথে নর্থ কেপের দিকে যেতে হবে তোমাকে।

পাইলট হতভম্ব হয়ে পড়ল। হঠাৎ করে প্ল্যান বদল হলো কেন! নর্থ কেপ? কিন্তু…

 

হ্যাঁ, নর্থ কেপ! যা বলছি শোনো! দুটো ইউনিটের সাথে রেডিও যোগাযোগ করো-মিসাইল ক্রুজার রিগা, আর গ্রাউন্ড কন্ট্রোল মৌমাছি মারমানস্ক। কপি করছ?

কিছুক্ষণ পর জবাব এল।বেরেনকো-হ্যাঁ, কপি করেছি। নর্থ কেপের দিকে যাব, যোগাযোগ করব রিগা আর গ্রাউন্ড কন্ট্রোল মারমানস্কের সাথে। ওভার।

ধন্যবাদ। পরবর্তী নির্দেশের জন্যে তৈরি থাকো। ওভার অ্যান্ড আউট। আঙুলের বাড়ি দিয়ে সুইচ অফ করলেন ঝনঝেনিৎসিন, ট্রান্সমিটারের দিকে পিছন ফিরলেন। আমেরিকানরা ওদের দুজনের কথাবার্তা নির্ঘাত শুনতে পাবে, ভাবলেন তিনি-পাক, তাতে কিছু এসে যায় না। নর্থ কেপের দিকে তিনি শুধু আরও একটা ইউনিটকে যেতে বলেছেন।

ফার্স্ট সেক্রেটারির দিকে তাকালেন এয়ার মার্শাল। ফার্স্ট সেক্রেটারি যুদ্ধমন্ত্রী জেনারেল বাকুনিনের কানে কানে কি যেন বলছেন। পায়চারি শুরু করলেন ঝনঝেনিৎসিন। পিটি ডাভের রিফুয়েলিং পয়েন্ট সম্পর্কে তাদের প্রতিটি ধারণা মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে। ওই এলাকায় কোন ট্যাংকার-প্লেন নেই। রাডারে কোন সাবমেরিনও ধরা পড়েনি।

অথচ রিফুয়েলিং ছাড়া বাঁচার কোন আশা নেই পিটি ডাভের।

কেন যেন মনে হচ্ছে এই রহস্যের সমাধান তার জানা আছে, কিন্তু সমাধানটা পেটে আছে, মুখে আসছে না। সম্ভাব্য আর একটা উপায়ে ফুয়েল সাপ্লাই পেতে পারে পিটি ডাভ…কি সেটা? মনে পড়ছে না কেন?

 

বরফের মাঠ খুঁটিয়ে পরীক্ষা করল ওরা। চীফ ইঞ্জিনিয়ারের কথাই ঠিক, চার ফিট উঁচু পাঁচিলটা পুব মাথা থেকে পশ্চিম মাথা পর্যন্ত লম্বা। মাঠের ঠিক মাঝখানে গজিয়েছে ওটা, তার মানে এয়ারকিং যে অংশটাকে রানওয়ে হিসেবে ব্যবহার করবে তারও ঠিক মাঝখানে। ওই পাঁচিল থাকলে মিগ-৩১ নিয়ে টেক-অফ করা রানার পক্ষে কোন ভাবেই সম্ভব নয়। বরফের মাঠে সত্যি সত্যি আটকা পড়ে গেছে ও।

এতে কাজ হবে, স্যার, আবার বলল হাডসন। সামনের দিকে ঝুঁকে আছে সে, রোগা-পাতলা জেমসনের চেয়ে অনেক

লম্বা দেখাল তাকে।

লে. কর্নেল জন গার্ডনার এ-ধরনের পরিস্থিতির সাথে তেমন পরিচিত নয়, কাজেই চুপ করে থাকল সে। হাডসনের সহকারী, সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার ফেয়ারম্যান সময় আর শ্রমের হিসেব উল্লেখ করে চীফ ইঞ্জিনিয়ারের বক্তব্য সমর্থন করল। রানার সাথে ওরা পাঁচজন হিম বাতাসের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে এখনও কুয়াশা রয়েছে, বেশিদূর দৃষ্টি চলে। দমকা বাতাস এখনও আসছে, তবে গতিবেগ একটু যেন কমেছে বলে মনে হলো।

কিন্তু, জ্যাক, হাডসনকে বলল জেমসন, আমাদের সাথে। কি অত কোদাল আর শাবল আছে? রানার দিকে তাকাল সে, লক্ষ করল ওদের আলোচনার দিকে মন নেই পাইলটের, গভীর মনোযোগের সাথে চারদিকের বরফ দেখছে।

স্যার, জবাবে বলল চীফ ইঞ্জিনিয়ার, শাবল, কোদাল, হেভী স্কু-ড্রাইভার সবই আছে আমাদের। দরকার হলে নাহয় খুদে দুএকটা বিস্ফোরণ ঘটানো যাবে। আপনি কি বলেন?

জ্যাক, তোমার কি মাথা খারাপ হলো! আঁতকে উঠল ক্যাপ্টেন।

না, স্যার। ঠিকমত বসাতে পারলে বরফের তাতে কোন। ক্ষতি হবে না।

প্লেনের হুইল-ট্র্যাক কতটা চওড়া, মি. ডাভ? জানতে চাইল জেমসন।

বাইশ ফিট।

ঠিক জানেন?

রিজের দিকে চোখ রেখে রানা শুধু ছোট্ট করে মাথা ঝাঁকাল। বুট পরা পা দিয়ে রিজের গায়ে লাথি মারল একটা। আলগা কিছু তুষার খসে পড়ল, সাদা হয়ে গেল বুটের ডগা, কিন্তু রিজের গায়ে কোন দাগ পড়ল না।

কতটা দরকার আপনার-পাঁচিলের কতটা ভেঙে দিলে আপনার চলে? জিজ্ঞেস করল চীফ ইঞ্জিনিয়ার।

ঘাড় ফিরিয়ে তার দিকে তাকাল রানা। ত্রিশ ফিট।

বেশ। আপনি তাহলে জায়গাটা দেখিয়ে দিন, ঠিক কোথায় ভাঙতে হবে পাচিল। আপনার হয়ে ওরাই করে দেবে কাজটা।

খোঁচাটা নিঃশব্দে হজম করল রানা। ধীর পায়ে এগোল ও, বাকি পাঁচজন বাতাসের দিকে ঝুঁকে পিছু নিল। এক জায়গায় থামল রানা, বলল, এখানে। কোমর সমান উঁচু পাঁচিলের মাথায় একটা লাথি কষাল ও। পাচিলের মাথা সামান্য একটু খসল মাত্র।

পার্কার পকেট থেকে অ্যারোসল ক্যান বের করল হাডসন, স্প্রে করল বরফের গায়ে। অ্যালকোহল-বেসড তরল ডি-আইসিং পড়ায় থেঁতলানো পাচিলের মাথা কয়েক ইঞ্চি দেবে গেল। গুনে গুনে ত্রিশ ফিট এগোল রানা, হাডসন এসে জায়গাটা চিত্তি করার অপেক্ষায় থাকল।

জেমসন আন্দাজ করল, রিজের প্রায় মাঝখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওরা, মধ্য-মাঠের কাছাকাছি। উত্তর-দক্ষিণে দীর্ঘতম বিস্ত তিটা বেছে নিয়েছে রানা। হাডসনের দিকে ফিরল ক্যাপ্টেন। কতক্ষণ লাগবে?

এক ঘণ্টা, স্যার-প্রেইং-ডাউনের কাজটাও তার মধ্যে সারা যাবে।

এক ঘণ্টা খুব বেশি হয়ে যায়, প্রতিবাদ করতে ইচ্ছে হলো। রানার। কিন্তু জানে, লাভ নেই। অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছে ও, শুধু এয়ারকিঙের কথা ভাবছে না, ওকে সাহায্য করতে আসা সাবমেরিন আর তার ক্রুদের কথাও ভাবছে। পাঁচিল ভাঙতে এক। ঘণ্টা লাগবে, তারমানে সাবমেরিনকেও বরফের ওপর ওই এক ঘণ্টা থাকতে হবে। বিপদ যে কোন দিক থেকে কখন আসবে, কেউ বলতে পারে না। রাশিয়ানরা যদি ওদের অস্তিত্ব একবার। টের পায়, বিপদ হবে, অথচ সাবমেরিনে কোদাল আর শাবল। ছাড়া কোন অস্ত্র নেই। আপনি, ক্যাপ্টেন, আপনার লোকজনদের সাবধান করে দেবেন না? মৃদু কণ্ঠে প্রশ্ন করল ও।

ধন্যবাদ, গম্ভীর ক্যাপ্টেন জেমসন। কিন্তু আমার কাজ আমি। ভালই বুঝি, মনে না করিয়ে দিলেও চলত।

লোকটা ওর ওপর চটে আছে, সেটা আগেই টের পেয়েছে। রানা। ভাল একজন ক্যাপ্টেন সবসময় নিজের ক্রুদের নিরাপত্তার কথাই আগে চিন্তা করে। রানার জন্যে সবাই বিপদে পড়ে গেছে, কাজেই ওর ওপর রাগ হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু, ভাবল রানা, এর জন্যে আমি দায়ী নই। মিগ-৩১ চুরি করার ষড়যন্ত্র তোমাদের সি.আই.এ-র। রবার্ট মরগ্যান কলকাঠি নাড়াতেই তোমাদেরকে এখানে আসতে হয়েছে।

পকেট থেকে হ্যান্ডসেটটা বের করল জেমসন, বোতাম টিপে বলল, বুশ? সাবমেরিনের অ্যাড্রেস সিস্টেমের সাথে কানেকশন। দাও।

যোগাযোগ হলো, ক্রুদের উদ্দেশ্যে কথা বলতে শুরু করল। ক্যাপ্টেন, ক্যাপ্টেন বলছি,মন দিয়ে শোনো সবাই। প্রেশার রিজ। ভেঙে ফেলতে এক ঘণ্টা লাগবে, তারমানে সাবমেরিন নিয়ে আমরাও বরফের ওপর এক ঘণ্টা থাকছি। সবাই চোখ-কান। খোলা রাখুক, এই আমি চাই। বরফের ওপর, বরফের নিচে আর আকাশে যদি কিছু আসে, সাথে সাথে সেটাকে দেখতে পেতে হবে। একটা কিছু এল, অথচ তোমরা সেটাকে দেখতে পেলে না, এর অর্থ হবে আমাদের সবার মৃত্যু।

বিরতি নিল জেমসন, তারপর আবার শুরু করল, তোমরা যারা প্লেনে কাজ করছ যত তাড়াতাড়ি পারো শেষ করো তোমাদের কাজ। রিফুয়েলিং ছাড়াও আরও কাজ আছে। তোমাদের। মুহূর্তের নোটিশে যাতে প্লেন নিয়ে আকাশে উঠতে পারে পাইলট তার জন্যে যা যা করা দরকার সব করে রাখবে তোমরা। প্লেনের গায়ে তুষার থাকলে সরিয়ে ফেলবে।

খানিক বিরতি, তারপর আবার, রিজ ভাঙার জন্যে চীফ ইঞ্জিনিয়ার হাডসন কিছু লোককে নিয়ে কাজ করবে, তার দলে কে কে স্বেচ্ছাসেবক হতে পারবে সে-ই জানাবে তোমাদের। যন্ত্রপাতি কি কি দরকার, তাও তার কাছ থেকে জানতে পারবে। তোমরা। একটু অপেক্ষা করো, তার আগে ডাক্তারের সাথে কথা বলে নিই আমি।

ইয়েস, স্কিপার? ডাক্তারের গলা ভেসে এল।

কে কি রকম জখম হয়েছে? জানতে চাইল জেমসন।

ফিলবি-র মাথা ফেটে গেছে, তবে মাত্মক কিছু না, মাত্র একটা সেলাই পড়েছে খুলির চামড়ায়। আর কটউড তার নিচের পাটির দুটো দাঁত হারিয়েছে। কমবেশি প্রায় সবাই এক-আধটু আহত হয়েছে বটে, তবে শুধু এরা দুজনই…

ধন্যবাদ, ডাক্তার। ফিলবিকে বলো, এই ধাক্কায় ওর মাথা আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে, আর কটউডের চেহারা নির্ঘাত আরও সুন্দর দেখাবে! ঠিক আছে, চীফ ইঞ্জিনিয়ার হাডসন কথা বলবে এবার। তার কথা মন দিয়ে শোনো সবাই। ধন্যবাদ।

বোতাম টিপে নিজের হ্যান্ডসেট পকেটে ভরল ক্যাপ্টেন। রানার পাশে এসে দাঁড়াল সে। এক মুহূর্ত পাইলটের মুখের দিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকার পর সংক্ষেপে জানতে চাইল, ঠিক জানেন তো?

মাথা ঝাঁকাল রানা। দুশ্চিন্তা করবেন না, ত্রিশ ফিট যথেষ্ট।

কুয়াশা কিন্তু এখনও রয়েছে।

বাড়লেও অসুবিধে হবে না।

কাঁধ ঝাঁকাল জেমসন। আমার কি, মরলে আপনি মরবেন।

কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ কাটল, তারপর রানা বলল, এই এক। ঘণ্টার জন্যে ধন্যবাদ, মি. জেমসন।

অপ্রতিভ বোধ করল জেমসন। মনে মনে রানাকে দায়ী করলেও, জানে সত্যি সত্যি রানা দায়ী নয়, প্রকৃতির খামখেয়ালীর ওপর কারও কোন হাত নেই। বলল, আর কারও জন্যে এতবড় ঝুঁকি আমি নিতাম না, মি. ডাভ।

আমার কাজ এখনও শেষ হয়নি, বলল রানা। আপনাদের সাহায্য ছাড়া কাজটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

বিনয়ের অবতার, তিক্ত মনে ভাবল জেমসন।

যাই, প্লেনটাকে একবার দেখে আসি, বলল রানা।

ঠিক আছে।

সাবমেরিন আর এয়ারকিঙের কাছে ফিরে এল রানা। সাবমেরিন থেকে বেরিয়ে এল একদল ত্রু, ওকে পাশ কাটিয়ে। কুয়াশার ভেতর দিয়ে হন হন করে এগিয়ে চলল, তাদেরকে ঘিরে। আছে তাদেরই সাদা নিঃশ্বাস। চীফ ইঞ্জিনিয়ার কাজের লোক, ভাবল রানা, ওর ওপর ভরসা করা যায়।

পরামর্শটা রানাই দিয়েছিল ওদেরকে। রিজের একটা অংশ ভাঙা, তারপর ভাঙা জায়গাটুকু সমতল করা। প্রথম কাজটায় শাবল কোদাল আর গায়ের জোর লাগবে, দ্বিতীয় কাজে লাগবে সুপারহিটের স্টীম, যার সাহায্যে সাবমেরিনের টারবাইন চালানো হয়-প্রেশার হোস দিয়ে বরফের গায়ে স্প্রে করতে হবে।

এয়ারকিঙের গা থেকে তুষার পরিষ্কার করা হচ্ছে। প্লেনের পাশে দশ ফুটি একটা ইকুইপমেন্ট রয়েছে, দেখতে অনেকটা গার্ডেন-স্প্রের মত, ওটা থেকে একটা হোস বেরিয়ে এসে ঢুকেছে। সাবমেরিনের সেইলে রাখা একটা ট্যাংকে। ছোট একটা ইলেকট্রিক মটরের সাহায্যে প্লেনের গায়ে পাম্প করা হচ্ছে। অ্যালকোহল-বেসড তরল অ্যান্টি-আইসিং মিক্সচার। প্লেনের ডানা আর ফিউজিলাজকে সম্পূর্ণ বরফমুক্ত করেছে এই তরল পদার্থ। স্পেয়ার অপারেট করছে চারজন ক্রু, দুজন হোস টেনে নিয়ে গেছে আন্ডার ক্যারিজে, অপর দুজন হোসের দুটো মুখ বগলের নিচে আটকে নিয়ে যেখানে যেখানে দরকার স্প্রে করছে।

অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে প্লেনটাকে দেখল রানা, ওটা যেন ওকে জাদু করেছে। এর আগে বাইরের চেহারা ভাল করে দেখার সুযোগ হয়নি। দুচোখ দিয়ে গিলছে যেন ও। সরু কোমরের মত ফিউজিলাজ, প্রচুর জায়গা দখল করে রাখা ভারী ইঞ্জিনগুলোর সামনে ফুলে থাকা এয়ার-ইনটেকস–ইনটারসেপটর-অ্যাটাক প্লেনে এর চেয়ে বড় আকারের এয়ার-ইনটেকসের কথা ভাবা যায় না–অসম্ভব ছোট আর মোটা ডানা, ডানার নিচে ঝুলে থাকা অ্যাডভান্সড অ্যানাব মিসাইল..হঠাৎ মনে হলো, সুন্দরী নারীর সাথে কোথায় যেন মিল আছে এয়ারকিঙের। কে যেন বলেছিল, সব সুন্দর শিল্পকর্মের ভেতরই যৌনাবেদন থাকে, অন্তত এয়ারকিঙের বেলায় কথাটা মিথ্যে নয়। খুঁজলে মিগ-৩১-এর আকার আকৃতির মধ্যে নারীদেহের বিভিন্ন অংশের আদল পাওয়া যাবে। রূপকথায় যেমন থাকে, দৈত্যদের আস্তানা থেকে রাজকন্যাকে ছিনিয়ে নিয়ে এল রাজপুত্র, ওর অভিযানও তার চেয়ে আলাদা কিছু নয়। কিন্তু যত যৌনাবেদনই থাকুক, নিস্ক্রাণ একটা মেশিন বৈ তো নয়, ওর মনের কথা ওটা বুঝবে না। যন্ত্রের সাথে প্রেম হয় না।

প্রেম।

নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসছিল, চট করে। সেটা চেপে মুচকি হাসল রানা। ওর পেশায় যে ঝুঁকি, তাতে প্রেম। করা চলে, কিন্তু ঘর-সংসার চলে না। তাছাড়া, বন্ধনহীন জীবনের প্রতি ওর রয়েছে দুর্নিবার আকর্ষণ। সোহানাকে ভালবাসে ও, সোহানা যদি তেমন করে চেপে ধরে হয়তো তাকে বিয়েও করে। ফেলবে, কিন্তু সোহানার অমর্যাদা বোধ আর অভিমান বড্ড বেশি, রানার মন বুঝতে পারার পর বিয়ের জন্যে কোনদিনই চাপ। দেয়নি, দেবেও না কখনও। সেজন্যেই আরও বেশি করে ভাল লাগে তাকে ওর।

ভাগ্যবান পুরুষ, প্রেম তো জীবনে কম আসেনি। কত মেয়ে ওর পথ চেয়ে এখনও বসে আছে। জানে, রানাকে বাধতে পারবে না, তবু যৌবনের শেষ দিন পর্যন্ত ওর জন্যে অপেক্ষা করবে কেউ কেউ।

রেবেকার কথা মনে পড়ল। ওই একটা মেয়ে, শুধু ওই একজন। ওকে প্রায় বেঁধে ফেলেছিল। আশ্চর্য এক মেয়ে! নিজের। প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে এগিয়ে এসে দাঁড়িয়েছিল ওর পাশে।

মাটির সাথে মিশে মাটি হয়ে গেছে, তবু তাকে পেতে ইচ্ছে করে। মনের ভেতর থেকে ডাক অনুভব করল রানা-চলো, জিম্বাবুই চলো।

মৃত্যুর মাত্র কদিন আগে রেবেকা বলেছিল, তোমার আগে আমি যদি মারা যাই, আর তখন যদি খুব বেশি করে আমার কথা মনে পড়ে তোমার, আমাকে যদি পেতে ইচ্ছে করে, ছুঁতে ইচ্ছে করে, জিম্বাবুইয়ে চলে যেয়ো। আমার কৈশোর আর যৌবনের কিছুটা সময় ওখানে কেটেছে। ওখানে আমাদের বিশাল সম্পত্তি। আছে, বাড়ি আছে, আমার নিজের হাতে সাজানো…ওখানে তুমি আমার গন্ধ, আমার স্পর্শ পাবে, আমাকেও পাবে…।

যাব, আমি যাব…।

 

দুটো আঁচড়ের দাগ দেখে বাস্তবে ফিরে এল রানা। চারটে অ্যানাব মিসাইলের মধ্যে দুটো ছুঁড়েছিল ও-একটা ব্যাজারকে ফেলার জন্যে, অপরটা মিসাইল ক্রুজার রিগাকে বিভ্রান্ত করার জন্যে। বাকি আর দুটো থাকার কথা। কিন্তু চারটে রয়েছে দেখেও আশ্চর্য হলো না ও।

এই অ্যাসাইনমেন্টের জন্যে সি.আই.এ. কাঠখড় কম পোড়ায়নি। সিরিয়ানদের কাছ থেকে একটা মিগ-২৫ কেড়ে আনার ব্যবস্থা করেছিল তারা। সেটা থেকে দুটো অ্যানাব মিসাইল জোগাড় হয়েছে। রবার্ট মরগ্যানের নির্দেশে মিসাইল দুটো ডেলিভারি দেয়ার জন্যে সাথে করে নিয়ে এসেছে সাবমেরিনের ক্যাপ্টেন জেমসন।

রিফুয়েলিঙের কাজ শেষ হলো। ক্রু যারা এই কাজে ছিল, তাড়াহুড়ো করে রওনা দিল রিজের দিকে, রিজ ভাঙতে সাহায্য করবে এবার।

মিগ-৩১-কে পিছনে ফেলে হাঁটতে শুরু করল রানা। প্রায় আধঘণ্টা পর দক্ষিণ প্রান্তে চলে এল ও। তারপর উত্তর দিকে এগোল। রানওয়ে হিসেবে এই উত্তর-দক্ষিণ বিস্তৃতিটুকু ব্যবহার করবে ও। দুটো ভাসমান বরফের সংঘর্ষে রানওয়ের কোন ক্ষতি হয়নি, শুধু ওই একটাই প্রেশার রিজ মাথাচাড়া দিয়েছে। বরফের উত্তর প্রান্ত থেকে ফিরছে ও, গার্ডনারের গছিয়ে দেয়া হ্যান্ডসেটটা পকেটের ভেতর পিপ পিপ করে উঠল।

ইয়েস?

মি. ডাভ? কঠিন শোনাল ক্যাপ্টেন জেমসনের কণ্ঠস্বর। আপনি যে পথ ধরে এখানে এসেছেন, ওদিকে তিনটে সোনার কন্ট্যাক্ট। এর মানে বোঝেন?

কয়েক সেকেন্ড মুখে কথা যোগাল না, তারপর নিচু গলায় বলল রানা, হ্যাঁ। মিসাইল ক্রুজার আর তার দুটো।

এসকর্ট-হান্টার-কিলার সাব।

এর জন্যে আপনি দায়ী, সরাসরি রানাকে অভিযুক্ত করল ক্যাপ্টেন। আপনিই ওদেরকে পথ দেখিয়ে এনেছেন।

এক সেকেন্ড পর জানতে চাইল রানা, এখানে পৌঁছুতে কতক্ষণ লাগবে ওদের?

চল্লিশ বা পঁয়তাল্লিশ মিনিট।

তাহলে চিন্তার কিছু নেই, বলল রানা। যথেষ্ট সময় পাওয়া যাবে।

আশ্চর্য! শুধু নিজের নিরাপত্তার কথাটা ভাবছেন? আমার ক্রুদের কি হবে, যারা আপনাকে পালানোর সুযোগ করে দেয়ার জন্যে জান-জীবন দিয়ে রানওয়ে তৈরি করছে?

আমি দুঃখিত, ক্যাপ্টেন, বলল রানা। সত্যি দুঃখিত। একটু থেমে আরও নরম সুরে আবার বলল, প্রশ্নটা আসলে আপনার কমান্ডিং অফিসারকে করা উচিত, তাই না?

অপরপ্রান্ত থেকে ক্যাপ্টেন কথা বলল না।

আপনি আছেন, ক্যাপ্টেন? জিজ্ঞেস করল রানা।

আর কোন উপদেশ আছে? তিক্ত কণ্ঠে জানতে চাইল জেমসন।

আপনি ঠিক জানেন, ওরা এদিকেই আসছে?

তা আসছে না, বলল জেমসন।

আসছে না, মানে?

ওরা পশ্চিম দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু আমরা যখন ওদেরকে দেখতে পাচ্ছি, ওরাও তেমনি আমাদেরকে দেখতে পাচ্ছে। কোর্স। বদলে এদিকেই আসবে।

Share This