একটা ট্রান্সমিটার থেকে পাঠানো সিগন্যাল রিসিভ করছে পিকআপ। ট্রান্সমিটারটা এখনও নব্বই মাইল দূরে। ওখানে পৌঁছুতে হবে রানাকে।

কিন্তু ফুয়েল গজ শূন্য হয়ে গেছে।

আকাশের অনেক ওপরে উঠে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় দেখছে না রানা। ইমার্জেন্সী ট্যাংকে কতটুকু ফুয়েল আছে ও জানে না, কিন্তু জানে যতটুকুই থাকুক, নব্বই মাইল পাড়ি দেয়ার অনেক আগেই তা নিঃশেষ হয়ে যাবে। এই নব্বই মাইল গ্লাইড করে যেতে হবে ওকে। ওটাই ওর একমাত্র ভরসা। চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার ফিট উঠে যেতে পারলে গ্লাইড করে নব্বই মাইল পেরোতে ফুয়েল লাগবে সামান্যই। একবার শুধু উঠে যেতে পারলেই হয়।

খাড়া উঠতে শুরু করল মিগ-৩১। একে ফুয়েল কম, তার ওপর হু হু করে খরচ হয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতরটা টিপ টিপ করছে রানার। সামনে, অনেকটা দূরে ঘন কালো মেঘ চোখে পড়ল। মেঘের নিচে সাদা একটা ঝাপসা রেখা-পোলার-প্যাক।

ষাট হাজার ফিট উঠে এসেছে মিগ-৩১। শুরু হলো নিঃশব্দ। গ্লাইড।

রাডার স্ক্রীন এখনও ফাঁকা।

 

মার্কিন নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন হার্বার্ট জেমসন ইউ.এস.এস, শার্কএর একটা বাঙ্কে শুয়ে আছে। ইউ.এস.এস. শার্ক আণবিক শক্তি চালিত স্টারজিওন শ্রেণীর সাবমেরিন। বিশাল একটা বরফের মাঠ দক্ষিণ দিকে ভেসে চলেছে, আজ পাঁচ দিন তার তলায় গা ঢাকা দিয়ে আছে শার্ক।

শার্কের এই অভিযানকে তিনটে পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। কানেকটিকাট উপকূলে ছিল ওটা, নির্দেশ পেয়ে টপ স্পীডে আর্কটিক এলাকায় চলে আসে। পোলার প্যাকের তলায় ঢুকে আবার বেরিয়ে আসতে হয়েছে ওটাকে, ঢুকেছিল গ্রীনল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলের কাছে, বেরিয়ে এসেছে ব্যারেন্ট সী-তে। সেটা ছিল অভিযানের দ্বিতীয় পর্যায়। তারপর থেকে ভাসমান বরফের নিচে আশ্রয় নিয়েছে শার্ক, ইঞ্জিন বন্ধ করে নিঃশব্দে এগিয়ে। চলেছে দক্ষিণ দিকে। এটাই অভিযানের শেষ এবং তৃতীয়। পর্যায়। একদিনে তিন দশমিক এক মাইল এগোচ্ছে শার্ক। এই। মন্থরগতি শুধু বিরক্তিকর নয়, বিপজ্জনকও হয়ে উঠতে পারে। অফিসার আর ক্রুরা প্রচণ্ড একঘেয়েমিতে ভুগছেনায়ুর ওপর চাপও কম পড়ছে না।

হার্বার্ট জেমসনের আরেকটা দুশ্চিন্তা, শার্ক নিরস্ত্র। সাবমেরিনের টর্পেডো রুম আর ফরওয়ার্ড কোয়ার্টারে ভরা হয়েছে। হাই-অকটেন কেরোসিন। রাশিয়ার বিস্ময়, সুপার-প্লেন, মিগ ৩১-এ সাপ্লাই দেয়া হবে এই কেরোসিন।

অবশ্য পিটি ডাভ যদি ওটা চুরি করে আনতে পারে।

বয়স পঁয়তাল্লিশ, বিশ বছরের বেশি ইউ.এস. নেভীতে কাজ করছে জেমসন। চিরকুমার, অটুট স্বাস্থ্য, তার কাছে নিজের সাবমেরিন আর ক্রুদের নিরাপত্তার চেয়ে বড় কিছু নেই। প্রথম থেকেই ধারণাটা তার পছন্দ হয়নি। তাই সি.আই.এ-র অনুরোধ এড়িয়ে গিয়েছিল সে। কিন্তু তার পরই এল নৌ-বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ, কাজেই অনিচ্ছাসত্ত্বেও দায়িত্বটা কাঁধে নিতে হলো।

বাঙ্কের ওপর উঠে বসল জেমসন। মনটা তার অস্থির হয়ে আছে। তার ক্রুদেরকে একটা পরীক্ষার মধ্যে ফেলা হয়েছে, অসুস্থ হয়ে পড়েছে তারা। এদিকে পিটি ডাভেরও কোন দেখা নেই।

মৃদু শব্দে নক হলো দরজায়। অনুমতি পেয়ে কেবিনে ঢুকল একজন ক্রু। ওয়েদার-অফিসার রিপোর্ট পাঠিয়েছে। কাগজটা ক্রুর হাত থেকে নিয়ে পড়ল জেমসন। চেহারা গম্ভীর হয়ে উঠল। বরফের ওপর বাতাসের গতি দ্রুত মন্থর হয়ে আসছে। লক্ষণ খারাপ। গোটা এলাকা জুড়ে মেঘ জমছে।

আবহাওয়া পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে গেলে আকাশ থেকে বরফের মাঠ দেখতেই পাবে না পিটি ডাভ, ভাবল জেমসন। ক্রুকে বিদায় করে দিল সে। কন্ট্রোল রুমে তার থাকা দরকার, কিন্তু ওখানে যেতে ভাল লাগছে না। তেমন কোন জরুরী খবর থাকলে ডিউটি অফিসাররা ঠিকই তাকে জানাবে। ভাল-মন্দ যাই হোক, খবরের জন্যে সবাই উন্মুখ হয়ে আছে। তবে বসে নেই কেউ, সবাই কাজে ব্যস্ত। বরফের সারফেস টেমপারেচারের ওপর কড়া নজর রাখতে হচ্ছে, টর্পেডো রুম আর ফরওয়ার্ড কোয়ার্টারে রাখা কেরোসিন কোথাও লিক করছে কিনা দেখতে হচ্ছে, আরও কত কাজ।

শুধু যে বাতাসের গতি কমে আসছে তাই নয়, সেই সাথে টেমপারেচারও নামছে। এই কদিন অস্বাভাবিক ভাল ছিল আবহাওয়া, এমন দিনে যা আশা করা যায় না। এখন তা বদলাতে শুরু করেছে।

পিটি ডাভ যদি বরফের ওপর ল্যান্ড করতে না পারে…

কে মরল, কি হারাল, এসবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাবমেরিন আর ক্রুদের নিয়ে রাশিয়ানদের চোখ ফাঁকি দিতে পারা। তার। ওপর নির্দেশ আছে, যে-কোন মূল্যে গ্রেফতার হওয়া এড়িয়ে যেতে হবে। মিগ-৩১ চুরির ব্যাপারে মার্কিন নৌ-বাহিনী জড়িত, এটা প্রকাশ পাওয়া চলবে না। তেমন প্রয়োজন দেখা দিলে, যদি আর কোন উপায় না থাকে, ইউ.এস.এস. শার্ক ডুবিয়ে দিতে হবে তাকে। তারমানে, আত্মহত্যা করতে বলা হয়েছে তাদের সবাইকে।

অভিযানে বেরিয়ে অর্ধেক দূরত্ব পেরিয়ে আসার পর গোপন নির্দেশে আরও জানানো হয়েছে তাকে, বরফের ওপর পিটি যদি ল্যান্ড করতে ব্যর্থ হয়, কিংবা এয়ারকিং যদি বরফে বা সাগরে বিধ্বস্ত হয়, শার্ক কাছাকাছি থাকলে অবশ্যই পাইলট আর প্লেনের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করতে হবে তাকে। প্লেনটাকে উদ্ধার করা সম্ভব হলে আইস প্যাকের তলা দিয়ে টেনে আনতে হবে কাছাকাছি মার্কিন নৌ ঘাঁটিতে।

হয়তো এসবের দরকার হবে না, পিটি ডাভ ঠিকই নিরাপদে ল্যান্ড করবে বরফের ওপর।

কিন্তু মুশকিল হলো, পাইলট দেরি করে ফেলেছে। এয়ারকিঙের রেঞ্জ আর ফুয়েলের অবস্থা সম্পর্কে জেমসন জানে। এরই মধ্যে কয়েক মিনিট দেরি হয়ে গেছে। এয়ারকিঙের জন্যে কয়েক মিনিট মানে সময়ের ভয়ঙ্কর একটা ফাঁক—এই ফাঁক পাইলটের মৃত্যু ডেকে আনতে পারে।

তথ্য বলতে প্রায় কিছুই জানা নেই জেমসনের। বিলিয়ারস্ক থেকে পিটি ডাভ এয়ারকিং চুরি করতে পেরেছে কিনা তা-ও সে জানে না। প্লেনটা যদি আসে, কিংবা যদি না আসে, অথবা যদি সাবমেরিনের ইনফ্রা-রেডে ধরা পড়ে কিছু, তাহলেই ভাল-মন্দ কিছু একটা জানতে পারবে সে।

সাবমেরিন থেকে বরফ ভেদ করে ওপরে উঠে গেছে একটা সাদাটে মেটাল স্পাইক, বরফের গায়ে আলাদাভাবে চেনার উপায় নেই, স্পাইকের ডগায় রয়েছে বিশেষ ধরনের একটা ট্রান্সমিটার, পিটি ডাভের পিক-আপ সেটা থেকে সিগন্যাল রিসিভ করছে। ইসরায়েলি পাইলটের সাথে জেমসনের এটা একতরফা যোগাযোগ। পাইলটের পিক-আপ সিগন্যাল রিসিভ করবে, কিন্তু পাল্টা সিগন্যাল পাঠাতে পারবে না।

বরফের ওপর এয়ারকিং পৌঁছুলে পিটি যে সিগন্যাল পাচ্ছে। সেটা বদলে যাবে। সিগন্যাল বদল হতে দেখেই পাইলট বুঝবে ঠিক নিচের বরফের ওপর ল্যান্ড করতে হবে তাকে।

কিন্তু আকাশে এখন ঘন কালো মেঘ। কিভাবে ল্যান্ড করবে পাইলট? আচমকা ঘন কুয়াশায় চারদিক ঢাকাও পড়ে যেতে পারে। আর্কটিকের আবহাওয়া সম্পর্কে কসেকেন্ড আগেও কিছু বলা যায় না।

কথাটা হাতুড়ি পেটার মত আঘাত করছে মনে, দেরি করে ফেলেছে পাইলট। মাত্র কয়েক মিনিট, কিন্তু লেট। এতক্ষণে নিশ্চই তার ফুয়েল নিঃশেষ হয়ে গেছে। তাই তো হবার কথা। বাঙ্ক থেকে নেমে পায়চারি শুরু করল ক্যাপ্টেন জেমসন।

 

সি.আই.এ. হেডকোয়ার্টারের ইমার্জেন্সী অপারেশন রুমে চাপা উত্তেজনা। খালি ব্রেকফাস্ট ট্রে নিয়ে কামরা থেকে বেরিয়ে গেছে। লিলিয়ান আর আইলিন, কর্তাদের গম্ভীর চেহারা দেখে ফিরে আসতে সাহস পায়নি। খুদে কিচেনে কান খাড়া করে অপেক্ষায় আছে ওরা দুজন, ডাক পড়লেই ছুটে আসবে।

কামরার একপাশে অস্থির ভাবে পায়চারি করছেন সি.আই.এ. চীফ রবার্ট মরগ্যান, আরেক পাশে পায়চারি করছেন জিওনিস্ট ইন্টেলিজেন্স চীফ আইজাক ময়নিহান। ঘরের মাঝখানে একটা টেবিল সামনে নিয়ে চেয়ারে বসে ওদের দুজনকে লক্ষ করছেন। অ্যাডমিরাল জর্জ হ্যামিলটন, হাতে জ্বলন্ত পাইপ। টলব্যাট। টেলিফোনে কথা বলছে, কিন্তু একেবারে নিচু স্বরে।

রিসিভার নামিয়ে রেখে মাথা নিচু করে কি যেন চিন্তা করল টলব্যাট, দুএকবার মুখ তুলে চীফের দিকে তাকাল, তারপর সাহস করে বলে ফেলল, স্যার, ওই এলাকায় এবার আমরা ডিকয় সাবমেরিন…?

পায়চারি থামিয়ে কর্কশ সুরে জানতে চাইলেন মরগ্যান, কি লাভ?

পায়চারি থামিয়েছেন ময়নিহানও। কি লাভ মানে? ঘন ভুরু কুঁচকে সি.আই.এ. চীফের দিকে তাকালেন তিনি। পিটি মারা। গেছে তা এখনও আমরা জানি না…।

ও, এখনও বুঝি আশা করছেন আপনি? তিক্ত হাসলেন মরগ্যান। বিলিয়ারস্ক আর রিগার মাঝখানে যে কথাগুলো হলো, তার তাহলে অর্থ কি, আমাকে একটু বুঝিয়ে দেবেন? আমি বলছি, আপনার পিটি আর নেই। মিগ-৩১ ধ্বংস করে দিয়েছে। ওরা…

মেসেজটা স্পষ্ট নয়, ঘরের মাঝখান থেকে বললেন অ্যাডমিরাল হ্যামিলটন। এয়ারকিং ধ্বংস হয়নি, এই অর্থও করা যেতে পারে।

অ্যাডমিরালের সমর্থন পেয়ে ময়নিহানের দুচোখে আশার। আলো জ্বলে উঠল। ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা, সবাই মরগ্যানের দিকে তাকিয়ে আছেন। অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর মরগ্যান। ছোট্ট একটা শব্দ উচ্চারণ করলেন, ডিকয়।

ছোঁ দিয়ে আবার টেলিফোনের রিসিভার তুলে নিল টলব্যাট, একটা নম্বরে ডায়াল করে কথা বলল। এই মুহূর্তে ডিকয় সাবমেরিন স্পিটবারজেনের পশ্চিমে রয়েছে, আর ডিকয় প্লেন সম্ভবত গ্রীনল্যান্ডে অথবা এরই মধ্যে পুবদিকের জমাট বরফের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। টলব্যাট ফোন করল এম.ও-ডি-র অপারেশন রুমে, সেখান থেকে প্লেন আর সাবমেরিনে পৌঁছে যাবে নির্দেশ। টলব্যাট রিসিভার নামিয়ে রাখল, ম্যাপের সামনে। এসে দাঁড়ালেন মরগ্যান। রাশিয়ানদের মাটি আর সাগরের রাডারে ডিকয় প্লেনগুলো কয়েক মিনিটের মধ্যে ধরা পড়ে যাবে, রাডারে দেখে বোঝা যাবে ওগুলো নর্থ কেপ-এর দিকে দ্রুত ছুটে চলেছে। আর ডিকয় সাবমেরিনগুলো রাশিয়ানদের সারফেস ভেসেল আর সাবমেরিনগুলোর চোখে ধরা দিয়ে পিছু নিতে প্ররোচিত করবে, গাধার সামনে মুলো ঝোলাবার মত করে ওগুলোকে শার্ক-এর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবে। কাজেই শার্ক বরফের তলা থেকে পানির ওপর ভেসে উঠলে কাছেপিঠে কোন রাশিয়ান ভেসেল থাকবে না।

রবার্ট মরগ্যান বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। এখন তার মনে হচ্ছে, এই অ্যাসাইনমেন্টে হাত দেয়াই উচিত হয়নি, রাশিয়ান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে একজন পাইলটের পক্ষে পালিয়ে আসা সম্ভব নয়। এক এক করে কত আশঙ্কাই জাগছে তার মনে। ভাবছেন, শার্কের হয়তো বরফের ওপর উঠে আসার দরকারই পড়বে না। পিটি ডাভ হয়তো পৌঁছুতেই পারবে না আইসপ্যাকে।

এখন শুধু চূড়ান্ত দুঃসংবাদের জন্যে অপেক্ষা। আবার তিনি পায়চারি শুরু করলেন।

 

বাইশ হাজার ফিট ওপরে অন্ধকার হয়ে গেল আকাশ। গ্লাইড করে ঘন মেঘের ভেতর নামল মিগ-৩১, কয়েকশো ফিটের বেশি দৃষ্টি চলে। মেঘের এই বিস্তার ওপর নিচে কতটা চওড়া, রানা। জানে না। প্রায় শূন্যে ছেড়ে দেয়া পাথরের মত নেমে যাচ্ছে প্লেন। এই মেঘ সাগরের পিঠ ছুঁয়ে থাকলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। টার্গেট আর চার মিনিটের পথ, প্রতি মিনিটে নিচের দিকে। নামছে প্লেন সাড়ে তিন হাজার ফিট, একশো আশি নট গতি, প্রতি মিনিটে তিন মাইল এগোচ্ছে। টার্গেট লোকেশনে যখন পৌঁছুবে,

স্ক্রীনে লেভেল থেকে আট হাজার ফিট ওপরে থাকবে ও। স্ক্রীনে কিছু নেই, টি-এফ-আর থেকে শুধু জানা যাচ্ছে ওর নিচে সাগরে বরফের মাঠ একের পর এক ভেসে যাচ্ছে। সাগরে জাহাজ আকৃতির কিছু নেই, আকাশও ফাঁকা।

পিক আপ থেকে একঘেয়ে সিগন্যাল বেরিয়ে আসছে।

আবছা অন্ধকারে বসে ঠাণ্ডায় হি হি করছে রানা।

 

ক্যাপ্টেন হার্বার্ট জেমসন পায়চারি থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। দরজায় নক করে কেবিনের ভেতর উঁকি দিল তার প্রধান সহকারী লে. কর্নেল জন গার্ডনার। গার্ডনারের চোখে-মুখে চাপা উত্তেজনা। কম্প্যানিয়নওয়ে ধরে ছুটে এসেছে সে, হাঁপাচ্ছে। রুদ্ধশ্বাসে বলল, এয়ারক্রাফট, কন্ট্যাক্ট, স্যার-এদিকেই আসছে।

হাত দুটো শক্ত মুঠো হয়ে গেল ক্যাপ্টেনের। এক পা সামনে এগোল সে, রেঞ্জ? ধমকের মত শোনাল তার কণ্ঠস্বর। উত্তরের জন্যে অপেক্ষায় থাকল না। ক্যাপটা মাথায় ঠিকমত বসাতে বসাতে লে. কর্নেলকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে পড়ল কেবিন থেকে।

চার মাইলেরও কম, স্যার, ক্যাপ্টেনের পিছু পিছু হন হন করে এগোচ্ছে গার্ডনার। বারো হাজার ফিট ওপরে রয়েছে। শি ইজ অন দি বেয়ারিং, স্যার। আর কোন রাডার কন্ট্যাক্টও নেই শুধু অস্পষ্ট একটু ইনফ্রা-রেড। হয় একেবারে কম পাওয়ারে রয়েছে, তা নয়তো ইঞ্জিন ব্যবহারই করছে না।

সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে দ্রুত হাঁটছে জেমসন। তাহলে সে-ই। বরফের সারফেস টেম্পারেচার কত?

এখনও কমছে, স্যার। আর দুডিগ্রী কমলেই পানি বরফ হতে শুরু করবে।

হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে সহকারীর দিকে ফিরল জেমসন। মাত্র দুডিগ্রী?

জ্বী, স্যার।

বাতাস?

পাঁচ থেকে দশ নট, ওঠা-নামা করছে।

তারমানে ইনসাফিশিয়েন্ট টারবুলেন্স, তাই না?

মাথা ঝাঁকাল লে. কর্নেল।

সাবমেরিনের কন্ট্রোল-রুমে ঝড়ের বেগে ঢুকল ওরা। কোথায় সে? জানতে চাইল ক্যাপ্টেন।

তিন মাইল দূরে, এগারো হাজার ফিটের একটু বেশি ওপরে, স্যার! রাডার অপারেটর বলল।

একই বেয়ারিঙে রয়েছে এখনও? স্যার। বরফের মাঠটা সে দেখতে পাচ্ছে?

জ্বী, স্যার। মেঘ এখান থেকে সাড়ে তেরো হাজার ফিট দূরে।

তাহলে এসো, ভদ্রলোককে আমরা অবাক করে দিই, গম্ভীর এক চিলতে হাসি ফুটল ক্যাপ্টেনের ঠোঁটে। ব্লো অল ট্যাংকস-হিট ইট!

 

বরফের মাঠটা ছাড়া আর কিছু দেখছে না রানা। সাগর থেকে তেরো হাজার ফিট ওপরে মেঘের নিচে নেমে এসেছে এয়ারকিং। বরফের মাঠটাকে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করল ও। উত্তর-দক্ষিণে দুমাইল লম্বা হবে ওটা, চওড়ায় একটু যদি কম হয়। সরাসরি ওর পথের সামনে রয়েছে। রাডার স্ক্রীনে কোন প্লেন নেই। অথচ টার্গেট রয়েছে মাত্র ছয় মাইলেরও কম দূরে। বরফের মাঠটাও প্রায় ওই রকম দূরে। কিন্তু রিফুয়েলিং পয়েন্ট কোথায়? কিছুই তো দেখতে পাচ্ছে না ও!

এই প্রথম সাবমেরিনের কথা মনে হলো ওর। হয়তো বরফের তলায় গা ঢাকা দিয়ে আছে।

যদি ল্যান্ড করতে হয়, ওই বরফের ওপরই, বুঝে নিল রানা। সামনেটা তন্ন তন্ন করে খুঁজছে চোখ দুটো, কিছু নেই। প্রথমে হতাশ, তারপর আতঙ্ক বোধ করল ও। আশা করেছিল, ট্যাংকারএয়ারক্রাফট থেকে ফুয়েল সাপ্লাই পাবে। সে-সম্ভাবনা বাতিল হয়ে যাচ্ছে। রিফুয়েলিং পয়েন্ট সাবমেরিন হলে বরফের ওপর ল্যান্ড করতেই হবে ওকে। আর মরু এলাকার বরফ কি রকম হয়, জানা আছে ওর। ওপর থেকে দেখে, কেউ বলতে পারে না ওটা আসলে কি ধরনের বরফ। দেখে হয়তো মনে হবে, নিরেট, কিন্তু কয়েক ইঞ্চি নিচেই ঝুরঝুরে বরফ, পা পড়লেই দেবে যায়-এভাবে স্যাঁৎ করে নেমে গিয়ে চিরতরে অনেক লোককে হারিয়ে যেতে দেখেছে ও।

দৈত্যাকার একটা বরফ, আশপাশে প্রাণের কোন চিহ্ন নেই। আশপাশের টুকরোগুলো ছোট ছোট, ওটার চার ভাগের এক ভাগও নয় কোনটা।

তারপর ব্যাপারটা ঘটল। হঠাৎ বদলে গেল সিগন্যালের। আওয়াজ। পিপ পিপ আওয়াজ শুরু করল পিক-আপ। প্রতি সেকেন্ডে একজোড়া শব্দ। প্রতি মুহূর্তে তীক্ষ্ণ আর তীব্র হচ্ছে সিগন্যাল। টার্গেটের আরও কাছে চলে আসছে ও। সাগরের অবস্থা আরও একবার পরীক্ষা করল ও। বাতাসের গতিবেগ পাঁচ থেকে দশ নট, তার বেশি না। বরফে যদি নামতেই হয়, ল্যান্ড করার জন্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে রাখল রানা।

বরফের গা মোটামুটি সমতলই বলা চলে। সম্ভাব্য রানওয়ে কোন দিক থেকে কোন দিকে হবে বেছে নেয়ার চেষ্টা করল। এই সময় বরফের পশ্চিম কিনারায়, এয়ারকিঙের পোর্ট সাইডে প্রথমে ফুলে উঠল, বরফের গায়ে ফাটল ধরল, তারপর ফাটলের কিনারাগুলো ভঁজ হয়ে গেল। একটা নিউক্লিয়ার সাবমেরিনের রিইনফোর্সড সেইল উঠে এল বরফের তলা থেকে। সেইলের নিচে সাবমেরিনের আকৃতি। বরফের ছোট-বড় টুকরো, কুচি ঝরে পড়ছে গা থেকে।

সেইল থেকে কমলা রঙের বেলুন ছাড়া হলো। সুতো বাঁধা বেলুনটা খানিকদূর এগিয়ে বাতাসের চাপে কাত হয়ে স্থির থাকল।

রাডার পরীক্ষা করল। স্ক্রীন ফাঁকা। থ্রটল একটু ঠেলে দিয়ে প্লেনের নাক নিচের দিকে নামাল রানা। দুশো ষাট নট স্পীড তুলে এয়ার ব্রেক স্পর্শ করল ও।

কেরোসিন ভর্তি সাবমেরিন ওর ঠিক নিচে এখন। প্লেনের ট্যাংকে ফুয়েল ভরতে ঘণ্টাখানেকের মত লাগবে, তারপর আবার আকাশে উঠতে পারবে রানা। বরফের মাঠটাকে একবার চক্কর দিয়ে ল্যান্ড করার জন্যে তৈরি হয়ে গেল ও।

আন্ডারক্যারিজ নামাল ও, সেই সাথে তালা লেগে গেল চাকাগুলোয়। স্পীড কমিয়ে দুশো বিশে নামিয়ে আনল, সিধে। করল ডানা জোড়া। বরফের মাঠ সামনে, তার গায়ে গাঁথা রয়েছে কালো চুরুট আকৃতির সাবমেরিন। অলটিচ্যুড চেক করল রানা, এক হাজার ফিট। স্পীড আরও কমিয়ে একশো আশিতে নামাল।

প্রতি মিনিটে তিনশো পঞ্চাশ ফিট নামছে ও। ওপরে উঠে আসছে বরফ। থ্রটল পিছিয়ে আনল ও, স্পীড একশো পঁচাত্তর নটে নামাল। বরফের সাদা আভা চোখ ধাধিয়ে দিচ্ছে।

অনেকটা থ্রটল টানল রানা। ছেড়ে দেয়া পাথরের মত খসে। পড়তে শুরু করল মিগ-৩১। বরফের গায়ে ধাক্কা খেলো চাকা। মুহূর্তের জন্যে সামনে কিছুই দেখতে পেল না রানা।

বিপদটা এল আরেক দিক থেকে। হালকা কুয়াশা ছিল, টেমপারেচার হঠাৎ কমে যাওয়ায় বরফ কুচি হয়ে গেল শিশির বিন্দু। মুহূর্তের জন্যে পরিষ্কার হয়েছিল স্ক্রীন, আবার সেটা

ঝাপসা হয়ে গেল। সগর্জনে ছুটছে প্লেন। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে। জানে না রানা। সামনে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না ও।

Share This