২.৫ টার্গেট আর পঁচিশ সেকেন্ডের পথ

টার্গেট আর পঁচিশ সেকেন্ডের পথ।

ঠাণ্ডা মাথায় পরিস্থিতিটা বুঝতে চেষ্টা করল রানা। পিক-আপ রিড-আউট থেকে জানা গেল, সরাসরি মিসাইল ক্রুজারের পিছন থেকে সিগন্যাল পাঠানো হচ্ছে। ফুয়েল গজে চোখ বুলিয়ে বুঝল, ঘুরপথে যাবার ঝুঁকি নেয়া চলে না। কাজেই মিসাইল ক্রুজারের ভয়াবহ-ফায়ার পাওয়ার অগ্রাহ্য করে দুই বিন্দুর মধ্যবর্তী সরল রেখা ধরেই যেতে হবে তাকে। রাডার থেকে জানা গেল, মিসাইল ক্রুজারের পোর্ট আর স্টারবোর্ড সাইডে রয়েছে সাবমেরিন দুটো, প্রতিটি প্রায় তিন মাইল তফাতে। ওগুলো এখন পানির ওপর ভেসে উঠে যার যার ইনফ্রারেড সিস্টেম এয়ারকিঙের দিকে তাক করে রেখেছে। রানা যদি জিরো ফিটেই থাকে, ওর দিগন্তরেখার। ওপর ওগুলোকে দেখা যাবে, কিন্তু ওগুলোর ফায়ার-কন্ট্রোল সিস্টেম এয়ারকিঙের দিকে লক্ষ্যস্থির করতে সমস্যার মধ্যে পড়বে। তার মানে, রানার দুশ্চিন্তা শুধু মিসাইল ক্রুজারটাকে নিয়ে। ওর সবচেয়ে কাছে যে সাবমেরিনটা থাকবে সেটা, কোনটা থাকবে তা নির্ভর করবে ক্রুজারের কোন পাশ দিয়ে যাবে ও, ইনফ্রা-রেড মিসাইল ছোঁড়ার ঝুঁকি নেবে বলে মনে হয় না, কারণ এত কাছে ক্রুজার আর তার বিশাল টারবাইন থাকায় সেইম-সাইড হয়ে যাবার ভয় আছে।

এয়ারকিঙের বিরুদ্ধে ক্রুজার থেকে কি কি অস্ত্র ব্যবহার করা হতে পারে তার একটা হিসেব করল রানা। ওর যা গতি, চোখে দেখে কামান দাগার প্রশ্ন ওঠে না। টর্পেডো-টিউব শুধু সাবমেরিনের বিরুদ্ধে কাজ করবে, জোড়া মাউন্টিংয়ে চারটে মর্টারও তাই। হান্টার কিলার হেলিকপ্টার দুটো আকাশে থাকতে পারে, কিন্তু ওগুলোয় এয়ার-টু-এয়ার উইপনস নাও থাকতে পারে। ষাট মিলিমিটার কামানগুলো রয়েছে ব্রিজের সামনে, ইলেকট্রনিক কমপিউটারাইজড ফায়ার-কন্ট্রোল সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করে ওগুলো। কামানগুলোর সাথে সার্চ রাডার সংযোগ আছে। সার্চ রাডার ইনফ্রা-রেডেও পরিচালিত হয়। তবু এসব ভীতিকর কিছু নয়-অন্তত রানার জন্যে। এই স্পীডে, এই জিরো ফিটে, ক্রুজারের খুব কাছ দিয়ে মিগ-৩১ উড়ে গেলে এগুলোর কোনটাই লক্ষ্যস্থির করার জন্যে যথেষ্ট নোয়ানো যাবে না।

ক্রুজারের অস্ত্রগুলো এক এক করে বাতিল করে দিল রানা, শুধু সারফেস টু-এয়ার মিসাইল লঞ্চার চারটে বাদে। ওগুলো এস.এ.এন-থ্রী শ্রেণীর। সারফেস-টু-সারফেস অ্যান্টি-সাবমিসাইল ওর জন্যে কোন হুমকি নয়। কিন্তু এস.এ. মিসাইলে ইনফ্রা-রেড আছে, ওগুলো তাপ-উৎস সন্ধানী।

ভরসা রিয়ার ওয়ার্ড ডিফেন্স পড। মনে মনে রানা প্রার্থনা করল, ওটা যেন কাজ করে। এস.এ. মিসাইল লঞ্চারগুলো ব্রিজ সুপারস্ট্রাকচারের সামনে, জাহাজের আফটার কোয়ার্টার চারটে কামোভ হেলিকপ্টারের জন্যে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

ক্রুজারের ক্যাপ্টেন ঠিক কি ধরনের নির্দেশ পেয়েছে, জানা থাকলে ভাল হত। ক্যাপ্টেন কি মিগ-৩১-এর টেইল-ইউনিট, ফায়ার-পাওয়ার বা স্পীড সম্পর্কে সব তথ্য জানে?

এতসব ভাবতে মাত্র চার সেকেন্ড লাগল রানার। রিড-আউটটার্গেট আর একুশ সেকেন্ডের পথ। মাইলের হিসেবে দুই পয়েন্ট। দুই মাইল দূরে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সামনে জাহাজের আকৃতি দেখতে পাবে ও।

এয়ারকিঙের পেটের নিচ দিয়ে বরফের একটা বিশাল চাদর। পিছলে বেরিয়ে গেল, ধূসর সাগরের গায়ে চোখ ধাঁধানো সাদা। তার রঙ। কয়েক মিনিট আগে থেকেই এ ধরনের বরফের দেখা পাওয়া যাচ্ছে। হঠাৎ করেই দেখতে পেল ক্রুজারটাকে। দিগন্ত রেখার ওপর নিচু একটা আকৃতি, ভয়াবহ গতিতে কাছে চলে আসছে। গায়ে কাঁটা দিল রানার। জানে ব্রিজের লোকজন। এয়ারকিংকে দেখতে পাচ্ছে-ওদের চোখে ধূসর রঙের একটা। সামুদ্রিক পাখি, হিম-শীতল পানির ঠিক ওপরে যেন স্থির হয়ে। আছে। রানার চোখ স্ক্রীনের দিকে, জাহাজের গা থেকে মিসাইল ছুটলেই অকস্মাৎ রঙ ফুটে উঠবে স্ক্রীনে। ঘোড়ার মুহূর্তে এস.এ. মিসাইল উজ্জ্বল কমলা রঙের একটা বিন্দু হয়ে ধরা পড়বে।

রাডারে একটা বিন্দু ফুটে উঠল, ওটা সম্ভবত ক্রুজারের একটা কামোভ হেলিকপ্টার। ই-সি-এম রিড-আউট দেখে হাইট আর। রেঞ্জ কত জানা গেল। একটা এ.এ. মিসাইল ছোড়ার সিদ্ধান্ত নিল রানা, তাতে ক্রুজারের ফায়ার-কন্ট্রোল কমপিউটর বিভ্রান্ত হলেও হতে পারে।

মিসাইল ছুঁড়ল রানা। প্লেন থেকে বেরিয়ে এক মুহূর্ত ইতস্তত করল সেটা, প্লেনকে ছাড়িয়ে ওপরে উঠে গেল, তারপর স্যাঁৎ করে অদৃশ্য হয়ে গেল সামনের দিকে। স্ক্রীনে চোখ রেখে মিসাইলটাকে দেখছে রানা।

ক্রুজারের ডেক ম্লান আলোয় ঝলসে উঠল, স্ক্রীনে সেটা ধরা পড়ল উজ্জ্বল আলো হয়ে। এতক্ষণ ওরা অপেক্ষা করছিল, ধরে নিয়েছিল সাবমেরিন আর হেলিকপ্টারের ভয়ে দিক বদল করবে ও। অথচ সেই আগের কোর্সেই স্থির থাকল রানা, সরাসরি ওদের দিকে ছুটল মিগ-৩১। যেমন আশা করেছিল ও, ওর তরফ থেকে হেলিকপ্টারের ওপর হামলা হতে দেখে ব্রিজের ফায়ার-কন্ট্রোলের ট্রিগার টেনে দেয়া হয়েছে। ওর মাথার ওপর বিস্ফোরিত হলো। হেলিকপ্টার, আকাশে যেন আচমকা একটা উজ্জ্বল কমলা রঙের ফুল ফুটল, পাপড়িগুলো ডিগবাজি খেতে খেতে নিচের দিকে নামছে।

ওরা চেয়েছিল ক্রুজার আর একটা সাবমেরিনের মাঝখান দিয়ে উড়ে যাবে মিগ-৩১, আশা করেছিল দিক বদলে অনেক ওপর দিয়ে ওদেরকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করবে পাইলট। কিন্তু ঘটল ঠিক উল্টোটা। রানাকে হামলা চালাতে দেখে সাথে সাথে পাল্টা হামলা চালিয়ে বসেছে ক্যাপ্টেন।

আর মাত্র কয়েকশো গজ সামনে জাহাজটা। ব্রিজের সামনের অংশ থেকে এক জোড়া এস.এ. মিসাইল উঠে এল। প্লেন কাত করল রানা, পোর্ট সাইডের দিকে মেলে দিল প্লেনের পেট, এই ভঙ্গিতে ক্রুজারটাকে পাশ কাটিয়ে ছুটে যাবে। ওর সামনের স্ক্রীনে দেখা গেল নিজেদের কোর্স থেকে সামান্য একটু সরে এসেছে। মিসাইলগুলো, ধাওয়া শুরু করেছে এয়ারকিংকে।

প্রতি মুহূর্তে কাছে চলে আসছে মিসাইলগুলো।

ধ্যান-মগ্ন যেন রানা। আগেই থট গাইডেড উইপনস সিস্টেমের সুইচ অন করে রেখেছে, এই মুহূর্তে আদর্শ সময়ের জন্যে অপেক্ষা করছে ও, সেই সাথে আনুষঙ্গিক সমস্ত চিন্তা ভাবনা বাদ দিয়ে শুধু নির্জলা নির্দেশ আর সিদ্ধান্তগুলো অন্তরের অন্তস্তলে গুছিয়ে নিচ্ছে।

মিসাইলগুলো কোথায় রয়েছে জানে রানা, জানে প্লেনের সাথে ওগুলোর দূরত্ব কতটুকু। প্লেন আর মিসাইলের গতির মধ্যে তফাৎ। কতটা তাও অজানা নয়। সমস্ত তথ্য সাজিয়ে অপেক্ষা করছে ও।

মনে হলো, এখনই আদর্শ সময়। নির্দেশটা নিঃশব্দে দিল রানা।

থট-গাইডেড উইপনস-সিস্টেম টেইল-ইউনিটের ট্রিগার টেনে। দিল। অকস্মাৎ ওর পিছনে বিশাল এক ঝলক আলো বিস্ফোরিত হলো, ম্লান হয়ে গেল সূর্য। এক ঝটকায় থ্রটল সামনের দিকে ঠেলে দিল রানা, প্রচণ্ড এক লাফ দিয়ে পানির ওপর দিয়ে তীরবেগে ছুটল মিগ-৩১। সাগরের ঢেউ আলাদা ভাবে চেনা গেল, পলকের জন্যে ককপিটের ওপরে ঝুলে থাকতে দেখা গেল জাহাজের বো। জাহাজের পাটাতন থেকে পঞ্চাশ গজ ওপর দিয়ে উড়ে এল এয়ারকিং।

ওর পিছনে টেইল-ইউনিট থেকে বেরিয়ে গেছে একটা হিটসোর্স-ঝাড়া চার সেকেন্ড ধরে প্লেনের দুটো টারমানস্কি টারবো। জেটের চেয়ে বেশি তাপ নিয়ে জ্বলল সেটা, তাপ-সন্ধানী মিসাইল। দুটোকে সাদরে কাছে টেনে নিল। আগুনের গোলা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হলো স্ক্রীনে, চোখ ধাঁধিয়ে গেল রানার। তারপর হঠাৎ করেই নিভে গেল আলোটা। স্ক্রীনে এখন ক্রুজারটা এক মাইলেরও বেশি পিছনে পড়ে গেছে, স্পীড সুপারসোনিকে তুলে দিয়েছে রানা।

ফুয়েল গজের কাঁটা শূন্যের ঘরে স্থির হয়ে আছে। মাক। কাউন্টারে স্থির হয়ে আছে মাক ওয়ান পয়েন্ট সিক্স। অলটিমিটার রিডিং-সাগরের পিঠ থেকে পঞ্চাশ গজ ওপরে রয়েছে মিগ-৩১। এত নিচে থাকায় সাবমেরিন দুটোর দৃষ্টি আর ইনফ্রারেড থেকে বেঁচে আছে ও। তবে ইতোমধ্যে ক্রুজারের কাছ থেকে প্লেনের রেঞ্জ আর বেয়ারিং পেয়ে গেছে ওরা।

স্ক্রীনের দিকে তাকাল রানা। আরও দুটো এস.এ. মিসাইল আসছে। সন্দেহ নেই, ক্রুজারের ক্যাপ্টেন হতভম্ব হয়ে পড়েছে। ভাল টার্গেট পাবার অপেক্ষায় ছিল সে, কিন্তু রানাকে হেলিকপ্টারের ওপর হামলা চালাতে দেখে তড়িঘড়ি পাল্টা হামলা চালাতে হয়েছে তাকে। আরও একটা ধাক্কা খেয়েছে সে এয়ারকিঙের টেইল-ইউনিটের কাছ থেকে। তা সত্ত্বেও আরও দুটো মিসাইল ছুঁড়েছে সে, যদিও জানে এ-দুটোরও একই অবস্থা হতে পারে…

স্ক্রীনের পোর্ট সাইডের কিনারায় আরও এক জোড়া স্লান বিন্দু দেখল রানা। ওর সবচেয়ে কাছের সাবমেরিনটা থেকে আরও এক জোড়া মিসাইল ছোঁড়া হয়েছে, এয়ারকিঙের এগজস্ট লক্ষ্য করে তীব্র বেগে ছুটে আসছে সেগুলোও।

পিক-আপ সিগন্যাল চেক করল রানা। এখনও নাক বরাবর সামনে থেকে আসছে সিগন্যালটা। সিগন্যালের উৎস এখনও একশো ষাট মাইল দূরে।

স্পীড কমানো উচিত নয়, তবু কমাল রানা। দূর থেকে স্ক্রীনের চারটে বিন্দু আরও দ্রুত গতিতে ছুটে এল। টেইল-ইউনিট নিখুঁতভাবে কাজ করেছে, কিন্তু এবার ওটার সাহায্য এখুনি না নিয়ে নতুন একটা পরীক্ষা চালাতে চায় রানা। জানে জুয়া খেলার মত ঝুঁকি নেয়া হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থাটা পরখ না করলেই নয়। দৌড় প্রতিযোগিতায় মিসাইলগুলোকে পরাজিত করতে চাইছে ও।

থ্রটল সামনে ঠেলে দিতেই চমকে ওঠা হরিণের মত সাফ দিল এয়ারকিং, উড়ে চলল আতঙ্কিত একটা পাখি যেন।

পিছিয়ে পড়ছে মিসাইলগুলো, কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে অন্য কোন দিকে সরে যাচ্ছে না। পিছু নিয়ে আসছে, আসতেই থাকবে। দশ মাইল এগোল রানা। বিশ মাইল। ত্রিশ, চল্লিশ, পঞ্চাশ…আরও পিছিয়ে পড়ল চারটে মিসাইল, কিন্তু তাড়া করে আসছে এখনও।

অপেক্ষার কোন মানে হয় না। তৈরি হয়ে নিল রানা।

টেইল ইউনিট আবার মিসাইল ছাড়ল। বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনতে পেল রানা, শক-ওয়েভ কাঁপিয়ে দিল প্লেনটাকে। থ্রটল নিজের দিকে টেনে নিল রানা, একশো সত্তর নটে নেমে এল গতি।

ফুয়েল গজের দিকে আর তাকাল না ও। পিক-আপ আগের মতই সিগন্যাল দিয়ে যাচ্ছে। রিফুয়েলিং পয়েন্ট আর একশো। মাইলও দূরে নয়। কিন্তু রিজার্ভ ট্যাংকে ফুয়েল যা আছে তাতে

আর দুচার মাইলও যেতে পারবে কিনা সন্দেহ। রিজার্ভ ট্যাংকের। ধারণ ক্ষমতা সম্পর্কে কোইভিসতু ওকে কিছুই বলতে পারেনি।

বরফের বিশাল খণ্ড এখন ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে। কোনটা। লম্বায় কয়েকশো গজ, কোনটা আরও অনেক ছোট বা আরও অনেক বড়।

উত্তর দিকে ছুটছে মিগ-৩১। ভাগ্যের ওপর ঠিক রাগ নয়, অভিমান হলো রানার-রিফুয়েলিং পয়েন্টের এত কাছে এসে ফুয়েলের অভাবে বিধ্বস্ত হবে এয়ারকিং? মরতে হয় মরবে, বিপজ্জনক একটা দায়িত্ব কাঁধে নিলে সে ঝুঁকি তো সব সময়ই থাকে, কিন্তু বাংলাদেশের মাটিতে মিগ-৩১ নিয়ে নামতে না পারলে মনে একটা দুঃখ থেকে যাবে ওর। মরেও শান্তি পাবে না।

 

পিপি-ওয়ানকে পিপি-টু ধাওয়া করবে, ধারণাটা এয়ার মার্শালের। পছন্দ না হলেও, পিপি-টুর পাইলট মেজর বোরিস বেরেনকোকে তিনিই ব্রিফ করলেন। ফুল স্পীডে উত্তর দিকে যাবে বেরেনকো, মিগ-৩১-এর বিস্ময়কর শক্তির সবটুকু ব্যবহার করবে। রাশিয়ার উত্তর উপকূল রেখার কাছে একটা ট্যাংকার-প্লেনের সাথে মিলিত হবে পিপি-টু, ওখান থেকে মিসাইল ক্রুজার রিগার বর্তমান পজিশনের দিকে যাবে। রিগা থেকে এখনও কোন রিপোর্ট আসেনি, সেজন্যে দুশ্চিন্তায় আছেন ঝনঝেনিৎসিন। রিগার কাছাকাছি আরও একটা ট্যাংকার অপেক্ষায় থাকবে, আবার যদি পিপি-টুর ফুয়েল দরকার হয়। ওই ট্যাংকার থেকে সাপ্লাই পাওয়া যাবে। ট্যাংকারগুলো এরই মধ্যে যার যার নির্দিষ্ট পয়েন্টে পৌঁছুনোর জন্যে রওনা হয়ে গেছে।

বেরেনকো রেড এয়ারফোর্সের সিনিয়র টেস্ট পাইলট, বিলিয়ারস্ক প্রজেক্টে কর্নেল বেনিনের সাথেই কাজ করছে, যদিও বেনিনের ফ্লাইটআওয়ার রেকর্ড তারচেয়ে অনেক ওপরে। বেরেনকো তরুণ, প্রাণ শক্তিতে ভরপুর, সুদর্শন এবং পাইলট হিসেবেও সুদক্ষ। ফার্স্ট সেক্রেটারি নিজে তার সাথে দুটো কথা বললেন। বেরেনকোর অবিশ্বাস আর উৎসাহ লক্ষ করে খুশি হলেন তিনি। বললেন, আমি শুধু তোমাকে একটা কথাই বলব, বেরেনকো-সোভিয়েত রাশিয়ার মর্যাদা ক্ষুন্ন হতে চলেছে, যেভাবে পারো ঠেকাও সেটা। তোমার ওপর আমার আস্থা আছে।

এত বড় দায়িত্ব পেয়ে, খোদ ফার্স্ট সেক্রেটারির মুখ থেকে নিজের প্রশংসা শুনে গর্বে বেরেনকোর বুক ফুলে উঠল। যদি সম্ভব হয় সাধ্যের বেশি চেষ্টা করব আমি, বলে ওঅর কমান্ড সেন্টার থেকে বেরিয়ে গেল বেরেনকো।

কর্নেল বেনিন সম্পর্কে একটা খবর এল। পাইলটদের রেস্টরুমে আগেই পাওয়া গেছে তাকে। অজ্ঞান করে একটা লকারে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছিল বেচারাকে। কে.জি.বি-র ডাক্তাররা পরীক্ষা করে জানিয়েছে, জ্ঞান ফিরতে আরও কয়েক ঘণ্টা সময় লাগবে।

দ্বিতীয় মিগ-৩১ তৈরি হয়ে মেইন রানওয়ের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। টাওয়ারের কাছ থেকে চূড়ান্ত অনুমতি পাবার অপেক্ষায় রয়েছে ওটা। ডিম্বাকৃতি টেবিল থেকে উঠে গিয়ে একটা জানালার পাশের সীটে বসেছেন ফার্স্ট সেক্রেটারি পিপি-টুর টেক-অফ দেখবেন বলে।

টেবিল ছেড়ে নড়েননি ঝঝেনিৎসিন। তাঁর পাশে যুদ্ধমন্ত্রী বাকুনিনও রয়েছেন। কে.জি.বি. চীফ উলরিখ বিয়েগলেভ অনেক আগেই ফিরে গেছেন মস্কোয়, দযেরঝিনস্কি স্ট্রীটের অফিসে বসে। এই ব্যর্থতার জন্যে যারা দায়ী তাদের একটা তালিকা তৈরি। করছেন তিনি। তালিকার প্রথম নামটা তার নিজেরই হওয়া উচিত, কারণ জিওনিস্ট ইন্টেলিজেন্স মিগ-৩১ চুরি করার প্ল্যান। করছে এই গোপন খবরটা বাংলাদেশের তরফ থেকে তাঁকে একাধিকবার জানানো হয়েছিল, কিন্তু খবরটাকে তিনি ভিত্তিহীন বলে হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিলেন। নিজের তৈরি তালিকায় তাঁর নাম থাকবে না, কিন্তু আসল সত্য ঠিকই এক সময় প্রকাশ পাবে। বলাই বাহুল্য, তার শত্রুরা তখন তাঁর বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে লাগবে।

মনে মনে একটা হিসেব করলেন ঝনঝেনিৎসিন। মিসাইল ক্রুজার আর তার দুটো সাবমেরিনের কাছে পৌঁছুবার সময় হয়ে এসেছে পিটি ডাভের। মিগ-৩১-কে ধ্বংস করার এটাই তাদের শেষ সুযোগ। এখনও তিনি ধারণা করতে পারছেন না পিটি ডাভের রিফুয়েলিং পয়েন্ট আসলে কি। ওটা সাবমেরিন হতে পারে না। কারণ মিগ-৩১-কে সাবমেরিনে ল্যান্ড করার উপযোগী করে তৈরি করা হয়নি। ওটা কোন প্লেন হতে পারে না, কারণ রাডার থেকে জানা যাচ্ছে ওই এলাকায় অচেনা কোন প্লেন নেই। মিগ নিয়ে সাগরে ঝাঁপ দেবে পিটি, তারপর একটা সাবমেরিন ওটাকে টেনে নিয়ে যাবে? সাগরের নোনা পানিতে ক্ষতি হবে প্লেনের, কিন্তু তবু আমেরিকানরা ক্ষতিগ্রস্ত প্লেন দেখে যা জানতে পারবে তাও কম নয়।

অথচ ওই এলাকায় অচেনা কোন সাবমেরিনও নেই।

এরপর থাকে নিরেট পোলার-প্যাক। কিন্তু অতদূর পর্যন্ত যেতে হলে যে ফুয়েল দরকার মিগ-৩১-এ তা নেই। হঠাৎ একটা সম্ভাবনা উঁকি দিল তার মনে। শেষ যেটুকু ফুয়েল আছে সেটুকু ব্যবহার করে যতটা সম্ভব আকাশের ওপর দিকে খাড়া উঠে যেতে পারে পিটি ডাভ, তারপর গ্লাইড করে নামবে-শুধু জেনারেটরগুলো চালু রাখলেই চলবে তখন, ফুয়েল খরচ হবে ধর্তব্যের বাইরে।

সন্দেহ নেই, এই চেষ্টার মধ্যে মস্ত ঝুঁকি থাকবে। হয়তো যতটা ওপরে ওঠা দরকার তার অর্ধেক ওঠার পরই নিঃশেষ হয়ে যাবে ফুয়েল। তার মনে পড়ল, প্রতি হাজার ফিটে দুমাইল গ্লাইড করতে পারবে মিগ-৩১। ফুয়েল থাকলে গ্লাইড করে পোলার প্যাকে পৌঁছুবার জন্যে যথেষ্ট ওপরে উঠতে পারবে পিটি ডাভ।

রিগা থেকে মেসেজ এসেছে, এয়ার মর্শাল! ঝনুঝেনিৎসিনের কানে অপারেটরের কণ্ঠস্বর নিস্তেজ শোনাল। হাত দুটো মুঠো করে ঘুরলেন তিনি।

অচেনা একটা প্লেনের দেখা পেয়েছে ওরা। ক্রুজার থেকে মিসাইল ছোঁড়া হয়েছিল, ইনফ্রারেড টাইপ, দুই গ্রুপে দুটো করে আর সাবমেরিন এসকর্ট থেকে এক গ্রুপে দুটো করে…

তারপর?

মিগের টেইল ইউনিট থেকে হিট সোর্স বেরিয়ে আসে, এয়ার মার্শাল। মিগ ধ্বংস হয়েছে কিনা ওরা বলতে পারছে না। প্লেনের সাথে মিসাইলের কন্ট্যাক্ট টাইমের আগেই রাডার থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় প্লেন, কিন্তু কন্ট্যাক্ট হয়েছে কিনা ক্যাপ্টেন নিশ্চিত ভাবে কিছু বলতে পারছেন না। যে প্লেনটাকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছেন উনি সেটার টাইপ আর কেপ্যাবিলিটি সম্পর্কে জানতে চাইছেন…

নিয়ম ভাঙতে চাইলেন না এয়ার মার্শাল। সমর-কৌশল সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য গোপন রাখা রাষ্ট্রীয় নীতিমালার একটা অঙ্গ। শুধু যাকে না জানালেই নয় সে জানবে। বলো, সব কথা জানার তার দরকার নেই। চেষ্টা করেছে, সেজন্যে তাকে আমার তরফ থেকে ধন্যবাদ দাও। আর বলো, পরবর্তী নির্দেশের জন্যে যেন। তৈরি থাকে। একমুহূর্ত ইতস্তত করলেন ঝনঝেনিৎসিন। তারপর একের পর এক নির্দেশ দিতে শুরু করলেন। টাওয়ারকে নির্দেশ। দাও, এই মুহূর্তে টেক-অফ করবে পিপি-টু।

রেডিও অপারেটর নির্দেশ ট্রান্সমিট করল।

রিগা আর তার সাবমেরিন এসকর্টকে কোর্স বদলাতে বলো, ফুল স্পীডে উত্তর দিকে যাবে ওরা, মিগ যেদিকে গেছে।

এনকোডিং-কনসোল তৎপর হয়ে উঠল।

ম্যাপের দিকে ফিরলেন ঝনঝনিৎসিন। ঘামতে শুরু করেছেন তিনি। রিগা ব্যর্থ হয়েছে, এটা তাঁর কাছে একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার। পিটি ডাভ রাশিয়ান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দূরে সরে যাচ্ছে, অথচ সত্যিকার অর্থে তার বিরুদ্ধে এখন তাদের আর প্রায় কিছুই করার নেই। কিন্তু তিনিও একজন অভিজ্ঞ যুদ্ধবিশারদ, শেষ চেষ্টা নিষ্ফল হওয়ার পরও পরাজয়। মানেন না, আরেকটা সুযোগ কাজে লাগাবার চেষ্টায় থাকেন।

পোলার সার্চ স্কোয়াড্রনগুলোকে ইমিডিয়েটলি টেক-অফ করতে বলো, নির্দেশ দিয়ে চললেন তিনি। মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ওতোভ আর পাভোনিকে নির্দেশ দাও, ফুল স্পীডে পোলারপ্যাকের দিকে যেতে হবে। পোলার প্যাকের সম্ভাব্য কোন্ জায়গায় পিটি ল্যান্ড করতে পারে কমপিউটর সেটা জানিয়েছে, লোকেশনটা ওদেরকে জানিয়ে দাও।

নির্দেশ লিখে নিয়ে কোড করা শুরু হলো।

ওই একই কোর্স ধরে যেতে হবে তিনটে ভি টাইপ সাবমেরিনকে।

বাইরে, রানওয়েতে স্টার্ট নিল পিপি-টু। ইঞ্জিনের আওয়াজ পেয়ে বড় করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন ঝনঝেনিৎসিন। সব শেষ হয়ে যায়নি এখনও, নিজেকে তিনি সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করলেন। দরকার হলে পিটি ডাভের পিছু পিছু যত দূর যেতে হয়। যাবেন তারা। দরকার হলে আমেরিকানদের নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়ে ধ্বংস করে দিয়ে আসা হবে মিগ-৩১-কে। দরকার হলে রাশিয়া যুদ্ধ…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *