২.৪ আর সাত সেকেন্ড পর সংঘর্ষ

আর সাত সেকেন্ড পর সংঘর্ষ।

কমলা রঙের ফোঁটা তিনটে থেকে চোখ সরিয়ে নিল রানা। রাডার স্ক্রীনে আরও একটা সবুজ ব্লিপ দেখা যাচ্ছে, ব্যাজারের অস্তিত্ব প্রকাশ করছে ওটা। আর মাত্র কয়েক মাইল দূরে রিকনিস্যাত্ প্লেনটা, ওর নিচের দিকে, দ্রুত একপাশে সরে যাচ্ছে। একই স্ক্রীনে মিগ-৩১-এর ইলেকট্রনিক চোখ রয়েছে, ইনফ্রা-রেড-এর অস্তিত্ব ধরা পড়বে কমলা রঙের ফোঁটা হয়ে, রাডার স্ক্রীন হিসেবেও কাজ করবে এটা, ব্লিপ ধরা পড়বে সবুজ রঙের ফোঁটা হয়ে। ওর পিছনে রয়েছে মিসাইল তিনটে, স্ক্রীনের মধ্যরেখার নিচের অংশে। মিগ-৩১ এখনও ব্যাজারের দিকেই ছুটছে, ব্যাজার রয়েছে স্ক্রীনের সেন্ট্রাল রেঞ্জিং বার-এর ওপর।

ব্যাজারই ওর নিরাপত্তার চাবি, উপলব্ধি করেছে রানা। মিসাইলগুলোকে বিপথে যেতে সাহায্য করবে ও। আকাশে ওর ইঞ্জিনের চেয়ে বেশি গরম একটা কিছু সৃষ্টি করতে পারলেই মিসাইলগুলো সেদিকে ছুটবে। ব্যাজারকে ধ্বংস না করে উপায় নেই কোন, নিজেকে তো বাঁচতে হবে।

কোর্স একটু বদলাল রানা, সরাসরি ছুটল মিগ-৩১, যেন ধাক্কা দেবে ব্যাজারকে। স্ক্রীনের মাঝখানে সরে আসছে কমলা ফোটা, কিন্তু ওগুলোর কথা ভুলে থাকার চেষ্টা করল রানা।

আর পাঁচ সেকেন্ড পর সংঘর্ষ।

থ্রটল আরও খুলে দিল রানা। নিজের একটা মিসাইল রিলিজ করার আগে ব্যাজারের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছুতে হবে ওকে। শরীরের চারদিকে অ্যান্টি-জি স্যুট আঁট হয়ে চেপে বসল, তারপরই ঢিল দিল। কমলা রঙের তিনটে ফোটা পিছিয়ে পড়ল। মুহূর্তের জন্যে, পরক্ষণে আবার তাদেরকে দেখা গেল স্ক্রীনের মাঝখানে, অর্থাৎ পিছু ছাড়ছে না। সবুজ ফোটাটা বড় হতে শুরু করল। বাঁ দিকে হাত বাড়িয়ে কনসোলের গায়ে ফিট করা উইপন আর্মিং বোতাম টিপে দিল রানা। এরপর দ্রুতহাতে কয়েকটা বোতামে চাপ দিয়ে চালু করে দিল থট-ট্রিগার আর গাইডেন্সসিস্টেম। অসাবধানে যাতে উইপনস-সিস্টেম চালু না হয়ে যায়, সেজন্যেই এই বোতামের ব্যবস্থা। মিসাইল আর টার্গেট চোখে দেখে নিজের মিসাইল গাইড করতে পারে রানা, আবার স্ক্রীনে। ওগুলোকে দেখেও তা পারে। চোখে ও যা দেখবে, দেখার পর মিসাইলকে দিয়ে যা করাতে চাইবে, ব্রেনের ভেতর সেই দেখা আর ইচ্ছেটা ইলেকট্রিক্যাল ইমপালসে পরিণত হবে, ইমপালস্। ডিটেক্ট করবে ওর হেলমেটে বসানো ইলেকট্রোড, ওখান থেকে সঙ্কেতগুলো পৌঁছে যাবে উইপনস্-সিস্টেমে, উইপন্স-সিস্টেম একটা স্টিয়ারিং সিগন্যাল ট্রান্সমিট করবে মিসাইলে। ডিসট্যান্সটু-টার্গেট রিড আউট যেই মাত্র ইঙ্গিত দেবে আঘাত হানার এটাই আদর্শ মুহূর্ত, সেই মুহূর্তে থট-গাইডেড সিস্টেম উইং-এর তলা থেকে একটা মিসাইল ছুঁড়বে।

নিজের ব্র্যাকেট থেকে বেরিয়ে এল মিসাইলটা, তারপর এয়ারকিঙের ফেলে আসা পথ থেকে ওপরে আর একপাশে সরে। গেল। মুহূর্তের জন্যে আলোর একটা ঝলক দেখতে পেল রানা, মিসাইলের মটর চালু হয়ে গেছে।

আর তিন সেকেন্ড পর সংঘর্ষ।

আশা আর উত্তেজনায় বুকের ভেতরটা দুলছে। ব্যাজারের আউটলাইন পরিষ্কার দেখতে পেল রানা, ওর নাক বরাবর সোজা, আকারে দ্রুত বড় হচ্ছে। ডান দিকে অকস্মাৎ বাঁক নিল, ব্যাজারের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, কিন্তু যতটা সম্ভব ওটার। গা ঘেঁষে যেতে চাইছে ও। আর মাত্র দুসেকেন্ড। স্ক্রীনে কমলা রঙের ফোঁটাগুলো সবুজ ফোটার সাথে এই মিলল বলে।

স্ক্রীনের ঠিক মাঝখানে ব্যাজার। মনে হলো ওটা একটা ফুলের কুঁড়ি, পাপড়ি মেলে ফুলের আকৃতি নিচ্ছে। তার সবুজ রঙ অদৃশ্য হয়েছে, এয়ারকিঙের মিসাইল ওটার গায়ে লেগে। বিস্ফোরিত হওয়ায় স্ক্রীনে এখন ওটা কমলা রঙ পেয়েছে-আকাশে এখন ওই জায়গাটাই সবচেয়ে উত্তপ্ত।

জিরো সেকেন্ড।

আরও, আরও বড় হলো ফুলটা, তিনটে মিসাইল সদ্য বিধ্বস্ত। ব্যাজারের গায়ে লেগে একই সাথে বিস্ফোরিত হয়েছে। শব্দ, আগুন আর ধোঁয়া পিছনে রেখে ছুটে পালাচ্ছে মিগ-৩১, রাডার স্ক্রীনের মধ্যরেখার একটু নিচে এখনও পাপড়ি মেলছে কমলা রঙের ফুল। হঠাৎ খেয়াল করল ও, প্রেশার স্যুটের ভেতর দরদর করে ঘামছে ও। স্বস্তির পরম একটা শীতল পরশ দেহ মন জুড়িয়ে দিল। মাটি থেকে যারা ইনফ্রা-রেড ব্যবহার করে ওকে আবিষ্কার করে ফেলেছিল, এই ঘটনার পর তারা বিভ্রান্ত হবে। ওদের ইনফ্রারেড স্ক্রীনে সংঘর্ষের বিশাল ব্লিপ ছাড়া এই মুহূর্তে আর কিছুই ধরা পড়বে না। ব্যাজার আকাশ থেকে মাটিতে পড়বে, আগুনও নিভবে, কিন্তু ততক্ষণে রেঞ্জের বাইরে চলে যাবে মিগ-৩১। রানা আশা করল, ওরা ধরে নেবে, বিস্ফোরণের ফলে মিগ-৩১-ও ভস্ম হয়ে গেছে।

স্পীড চেক করল রানা। ঘণ্টায় সাতশো মাইলের একটু নিচে। উপকূলের কাছে চলে আসছে, কাজেই গতি সুপারসোনিকে তুলতে পারে না। ট্রেনিং পাওয়া কান নিয়ে নিচে অপেক্ষা করছে লোকজন।

এ-যাত্রা প্রাণে বেঁচে গেছে, তাই কোইভিসতুকে স্মরণ করে কৃতজ্ঞ বোধ করল রানা। থট-গাইডেড উইপনস-সিস্টেম কোইভিসতুর প্রজেক্ট, প্রমাণ হয়ে গেল সিস্টেমটা নিখুঁতভাবে কাজ করে। গোটা ব্যাপারটা প্রায় চোখের পলকে ঘটে গেল, কিন্তু এই অল্প সময়েও একটা সুনির্দিষ্ট ছক বাধা নিয়মের ভেতর দিয়ে আসতে হয়েছে ওকে। চিন্তার মত দ্রুত গতিতে রিয়্যাক্ট করতে বা সাড়া দিতে হয়নি ওকে, তার কোন দরকার ছিল না। তবে সচেতনভাবে একটা সিদ্ধান্তে আসতে হয়েছে। পোর্ট উইংটিপ মিসাইল সম্পর্কে ওর সিদ্ধান্ত দৃঢ় আর গোছাল হবার সাথে সাথে এ.এ.এম-এর অ্যানাব-টাইপ মিসাইল ফায়ার হয়েছে। মিসাইল বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় শুধু একটা ঝকি অনুভব করেছিল ও, আর কিছু না।

চোখ বুলিয়ে-টি-এফ আর দেখল রানা। উপকূলের নিচু এলাকা পেরোচ্ছে মিগ-৩১। ওর চারপাশে সী-ফগ-হালকা, মনে হচ্ছে এই বুঝি ছড়িয়ে পড়ে মিলিয়ে যাবে, তবে আড়াল হিসেবে কাজ চলে। সবচেয়ে বড় কথা, এই সী-ফগ সাউন্ড মাফলার। হিসেবেও কাজ করছে, এয়ারকিঙের আওয়াজ তো আর বিকৃত শোনাবে রাশিয়ানদের সাউন্ড ডিটেকটিং ইকুইপমেন্টে। ইঞ্জিনের আওয়াজও প্রতিধ্বনিত হবে।

টি-এফ-আর স্ক্রীনে উপকূল ধরা পড়ল। সাগরের সরু গলা। ভুখণ্ডের অনেকটা দূর পর্যন্ত ঢুকে এসেছে। গালফ অভ কারা। পানির ওপর দিয়ে উড়ে যাবার সময় এয়ারকিঙের নাক আরও একবার নিচু হলো। কখনও হালকা, কখনও গাঢ় সী-ফগ। কেবিনের পাশ দিয়ে তুষার ঝড়ের মত সরে যাচ্ছে। যেদিকে। যেতে চায় রানা, রিড-আউটে সেদিকটাই দেখা যাচ্ছে। নোভাইয়া। জেমলাইয়ার জোড়া দ্বীপের দিকে ছুটল মিগ-৩১, বর্তমান পজিশন থেকে উত্তর পশ্চিমে।

প্রতি ঘণ্টায় দুশো পঞ্চাশ মাইল স্পীড। ট্রানজিসটর রেডিওর পিছনের খুদে ঢাকনি, যেটা ব্লিপার হিসেবে কাজ করেছিল, দেখতে ছোট সার্কিট-বোর্ডের মত, কন্ট্রোল প্যানেলের এক কোণে সাঁটা রয়েছে। ওটার দিকে একবার তাকাল রানা। এটা এখন হোমার পিক-আপ হিসেবে কাজ করবে। দেখতে ছোট হলে হবে। কি, অত্যন্ত জটিল মেকানিজমের সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে। জিনিসটা। সেট করা একটা ফ্রিকোয়েন্সি প্যাটার্ন আছে, সেই একই প্যাটার্ন থেকে ট্রান্সমিট করা বীকন ধরার চেষ্টা করবে ওটা। সিগন্যালটা মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হবে, রানা ছাড়া আর কারও কানে গেলে দুর্বোধ্য স্ট্যাটিক আওয়াজ ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারবে না সে। সুইচ অন করা থাকলে ঠিক কোন পয়েন্টে সিকোয়েন্সে প্রবেশ করবে প্লেন হোমার পিক-আপ তা জানতে পারবে। খুদে বোতামটা টিপে দিয়ে পিক-আপ চালু করল রানা।

পরিচিত সিগন্যাল এল না।

রিফুয়েলিং পয়েন্ট থেকে ট্রান্সমিট করা সিগন্যাল না পেলে, এয়ারকিং নিয়ে আর্কটিক ওশেনে চিরতরে হারিয়ে যাবে রানা। ফুয়েল শেষ হবে, সেই সাথে পৈত্রিক প্রাণটাও।

জননী-র কথা কিছুই জানানো হয়নি পিটি ডাভকে, কাজেই রানাও জানে না। পাইলট ধরা পড়ে গেলে তার কাছ থেকে সমস্ত তথ্য আদায় করা হবে, সেজন্যেই সি.আই.এ-এর এই সাবধানতা। তারা চায়নি তাদের জননী রাশিয়ানদের হাতে ধরা পড়ার কোন সুযোগ থাকুক।

ফুয়েল গজের দিকে তাকাল রানা। চার ভাগের এক ভাগ ফুয়েলও অবশিষ্ট নেই। আর কত দূর যেতে হবে, জানে না। সিগন্যাল পেলে বুঝবে রিফুয়েলিং পয়েন্ট থেকে মাত্র তিনশো মাইল দূরে রয়েছে ও।

অটো পাইলটের হাতে প্লেন ছেড়ে দিল ও, বোতাম টিপে টি-এফ-আর চালু করে দিল। অভিযানের দুরূহতম যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে,য়ুর ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়বে। এটা স্রেফ আসলে ভাগ্য পরীক্ষা, কারণ আগে কখনও এই হোমার পিক-আপ ব্যবহার করা হয়নি। ওটা যদি কাজ না করে, রানার কোন আশা নেই।

নিচে বরফ আর নদী, ফ্যাকাসে আর একঘেয়ে। খালি চোখে কোথাও একটা জলযানের দেখা নেই, রাডারও ফাঁকা। আবার একবার ফুয়েল গজের দিকে তাকাল ও। রিফুয়েলিং পয়েন্ট নিশ্চয়ই রুশ সীমান্ত থেকে কয়েকশো মাইল দূরে হবে, কারণ নিরাপত্তার প্রশ্ন আছে। তেল ফুরিয়ে আসছে।

কোন সিগন্যাল এল না।

ব্যারেন্ট সী-র ম্যাপ দাও, আদেশ করলেন এয়ার মার্শাল ঝনঝেনিৎসিন। ট্রলার, এলিন্ট ভেসেলসহ ন্যাভাল গতিবিধি দেখতে চাই। ডিম্বাকৃতি টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, চিন্তিতভাবে দুআঙুল দিয়ে চিবুক টানছেন।

টেবিল থেকে রাশিয়ার উত্তর উপকূল প্রজেকশন অদৃশ্য হয়ে গেল, বদলে ফুটে উঠল ব্যারেন্ট-সী।

অনেকক্ষণ ধরে ম্যাপটা দেখলেন ঝনঝেনিৎসিন। প্রিন্টআউট কোথায়? জানতে চাইলেন তিনি। কমপিউটর-কনসোল থেকে উঠে এসে তার হাতে একটা ছাপা কাগজ ধরিয়ে দিল অপারেটর। প্রজেকশন আলোকিত যে-সব ফোটা রয়েছে সেগুলোর প্রত্যেকটির পরিচয় আর সর্বশেষ অবস্থান উল্লেখ করা আছে এই প্রিন্ট-আউটে। বারবার ম্যাপে চোখ ফেলে কাগজটা। পরীক্ষা করলেন এয়ার মার্শাল।

কলুয়েভ-এর উত্তরে আর নোভাইয়া জেমলাইয়ার পশ্চিমে গা। ঘেঁষাঘেঁষি করে রয়েছে অনেকগুলো সাদা ফোঁটা, ওগুলো ট্রলার। একটু দূরে রয়েছে গাঢ় নীল রঙের একজোড়া ফোটা, এলিন্ট। ভেসেল অর্থাৎ স্পাই ট্রলার। স্পাই ট্রলারগুলোয় রয়েছে এরিয়াল, সারফেস আর সাব-সারফেস ডিটেকশন ইকুইপমেন্ট। এই মুহূর্তে। ট্রলার দুটো তাদের ইনফ্রা-রেড ডিটেকটরের সাহায্যে আকাশে। মিগ-৩১-কে তন্ন তন্ন করে খুঁজছে।

প্রজেকশনের উত্তর দিকে তাকালেন এয়ার মার্শাল। ওখানে একটা ন্যাভাল ভেসেল রয়েছে, লাল রঙের ফোটা। হাতের তালিকা দেখে বুঝলেন, ওটা একটা মস্কোভা শ্রেণীর হেলিকপ্টার এবং মিসাইল ক্রুজার, রিগা-রেড ব্যানার নর্দার্ন ফ্লিট-এর গর্ব। আঠারো হাজার টন পানির জায়গা দখল করে ভাসছে ওটা, সাথে। রয়েছে দুটো সারফেস টু-এয়ার মিসাইল লঞ্চার আর দুটো। সারফেস অথবা অ্যান্টি সাবমেরিন লঞ্চার সহ চারটে সিক্সটি-মিলিমিটার গান, মর্টার, চারটে টর্পেডো টিউব আর চারটে হান্টারকিলার হেলিকপ্টার। এই মুহূর্তে পুব দিকে যাচ্ছে ওটা। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে নোভাইয়া জেমলাইয়ার কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।

ম্যাপের আরেক জায়গায় দুটো মিসাইল-ডেস্ট্রয়ার দেখলেন এয়ার মার্শাল। একটা নোভাইয়া জেমলাইয়ার প্রায় উত্তরে, চিরস্থায়ী বরফের চাদরে ঢাকা ফ্র্যাঞ্জ যোশেফ ল্যান্ডের কাছাকাছি। অপরটা দক্ষিণ আর পুব দিকে যাচ্ছে, স্পিটবারজেনের দিক থেকে। রেড ব্যানার ফ্লিটের বেশিরভাগ সারফেস ভেসেল রয়েছে। ক্রনস্টাড-এ, ওটা নেভার মোহনায় বিশাল একটা আইল্যান্ড বেস, লেনিনগ্রাদের কাছাকাছি।

ম্যাপের গায়ে বেশ কয়েকটা হলুদ ফোঁটা দেখে স্বস্তি বোধ করলেন ঝনঝেনিৎসিন। ওগুলো সোভিয়েত সাবমেরিন। তালিকা দেখে কোন্টা কি টাইপের জেনে নিলেন তিনি, কোন্টায় কি ধরনের অস্ত্রপাতি আছে আর কোন্টার অনুসন্ধান ক্ষমতা কতটুকু এক এক করে স্মরণ করলেন।

আপাতত তিনটে আণবিক শক্তিচালিত ভি টাইপ আর দুটো ব্যালেস্টিক-মিসাইল অ্যান্টি-সাবমেরিন সাব-এর প্রতি মনোযোগ দিলেন না। ক্ৰনস্টাড থেকে রুটিন স্ট্রাইক-পেট্রল সেরে ফিরছে। ওগুলো, তার কোন কাজে লাগবে না। তার আসলে দরকার প্লেন খুঁজে বের করতে এবং বের করার পর সেটাকে ধ্বংস করতে পারে এমন সাবমেরিন।

বিধ্বস্ত প্লেন সম্পর্ক কোন রিপোর্ট এল? জানতে চাইলেন তিনি।

বিশদ কিছু এখনও আসেনি, এয়ার মার্শাল, অপারেটর জানাল। সার্চ পার্টি এখনও সাইটে পৌছায়নি। ওপর দিয়ে আমাদের সার্চ প্লেন উড়ে যাবার সময় যা দেখেছে-ব্যাজার ছাড়া আর কিছু বিধ্বস্ত হয়নি বলেই মনে হয়।

রিফুয়েলিং পয়েন্ট সম্পর্কে কোন রিপোর্ট থাকলে বলো।

কয়েক সেকেন্ড পর অপর একজন অপারেটর বলল, নেগেটিভ, এয়ার মার্শাল। মিগ-৩১-এর রেঞ্জের মধ্যে অচেনা কোন সারফেস ভেসেল বা প্লেন নেই।

চেহারায় রাগ আর দিশেহারা ভাব নিয়ে ম্যাপের দিকে তাকিয়ে থাকলেন ঝনুঝেনিৎসিন। রিফুয়েলিং পয়েন্ট থাকতেই হবে, তা না হলে মিগ-৩১-নিয়ে মারা পড়বে পিটি ডাভ। কোথায় ওটা?

ফার্স্ট সেক্রেটারি নড়েচড়ে বসলেন। এয়ার মার্শালের অস্থিরতা লক্ষ করে তিনি গম্ভীর।

আরও পশ্চিম থেকে কোন রিপোর্ট নেই? জানতে চাইলেন এয়ার মার্শাল। শিখা-মালা বা কোস্টাল পেট্রল-এর ইনফ্রা-রেড বা সাউন্ড-ডিটেক্টর থেকে?

ওঅর কমান্ড সেন্টারে নিস্তব্ধতা নেমে এল। তারপর একজন। অপারেটরের মৃদু কণ্ঠস্বর শোনা গেল, নেগেটিভ, এয়ার মার্শাল। শুধু আমাদের স্কোয়াড্রনগুলো ছাড়া আর কিছু নেই ওদিকে।

ম্যাপে চোখ রেখে গ্রীনল্যান্ড আর বিয়ার আইল্যান্ড দেখলেন এয়ার মার্শাল। উঁহু, মিগ-৩১ অত দূরে যেতে পারবে না, তার আগেই ফুয়েল শেষ হয়ে যাবে। ওদিকে একটা ব্রিটিশ ট্রলার ফ্লিট রয়েছে বটে, কিন্তু ওই ফ্লিটের পক্ষে একটা মিগ-কে আশ্রয় দেয়া। সম্ভব নয়।

না, ম্যাপে আসলে উত্তর নেই। কোথায় সে? আবার তিনি বিড়বিড় করে বললেন।

অনেকক্ষণ পর এবার মুখ খুললেন ফার্স্ট সেক্রেটারি, আপনার নিশ্চিত বিশ্বাস সে বেঁচে আছে?

মুখ তুলে তাকালেন ঝনঝনিৎসিন, মাথা ঝাঁকালেন। হ্যাঁ, কমরেড ফার্স্ট সেক্রেটারি। বেঁচে আছে লোকটা।

 

ওই ওটা, ভাবলেন সি.আই.এ. চীফ রবার্ট মরগ্যান, জননী-১। বিশাল ওয়াল ম্যাপে নিঃসঙ্গ একটা কমলা রঙের বিন্দু। নিরস্ত্র একটা সাবমেরিন, ভাসমান বরফের তলায় গা ঢাকা দিয়ে পুব দিকে এগিয়ে চলেছে।

খাবার ভরা দুটো ট্রে নিয়ে ভেতরে ঢুকল লিলিয়ান আর আইলিন।

একটা টেবিলে বসলেন সবাই। খেতে শুরু করে জর্জ হ্যামিলটন সি.আই.এ. এজেন্ট (প্রাক্তন নেভী অফিসার) টলব্যাটের দিকে ফিরলেন। জানতে চাইলেন, আমাদের ফুয়েলট্যাঙ্কারের ওপর বরফ রয়েছে, ওই বরফের অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলুন দেখি।

মুখ থেকে কাঁটা-চামচ নামিয়ে টলব্যাট বলল, বরফের গভীরতা আর সারফেস কন্ডিশন সম্পর্কে শেষ যে রিপোর্টটা পেয়েছি তাতে বলা যায় ল্যান্ডিং করতে কোন অসুবিধে নেই।

তুমি ঠিক জানো? প্রশ্ন করলেন মরগ্যান।

আপনি তো, স্যার, জানেনই, জননী-১ থেকে সিগন্যাল আসে সবচেয়ে কাছের স্থায়ী ওয়েদার স্টেশন হয়ে, বলল টলব্যাট। কেউ যদি ওই সিগন্যাল ধরে, তার কাছে ওটা সাধারণ ওয়েদার রিপোর্ট বা আইস সাউন্ডিং বলে মনে হবে। কাজেই, সাবমেরিনে বসে হার্বার্ট জেমসন কি ভাবছে আমরা তা জানতে পারছি না, শুধু সিগন্যালে বলছে তাই জানতে পারছি। তবে, পরিস্থিতি ভাল মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে।

কি রকম?

বরফের ওপরটা বদলায়নি, এখনও শক্ত আছে, তাই বাতাসের ধাক্কায় কোথাও গর্ত তৈরি হয়নি, বলল টলব্যাট। তাছাড়া, আকারে ওটা এখনও ছোট হতে শুরু করেনি। আরও দক্ষিণে গিয়ে গলতে শুরু করবে, তাও তিন চার দিনের আগে নয়।

তুমি বলছ, যথেষ্ট পুরু ওটা? বারবার প্রশ্ন করে নিশ্চিত হতে চাইছেন মরগ্যান।

যথেষ্ট। লম্বা-চওড়ায়ও বিশাল-পিটি যদি আদৌ পাইলট হয়, প্লেন নিয়ে ল্যান্ড করতে তার কোন অসুবিধা হবে না।

আর আবহাওয়া?

এই মুহূর্তে চমৎকার আবহাওয়া রয়েছে ওখানে, স্যার। কয়েক সেকেন্ড কি যেন চিন্তা করল টলব্যাট, তারপর আবার। বলল, এটা একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার, স্যার। বছরের এই। সময়টা এত ভাল আবহাওয়া সাধারণত দেখা যায় না।

অস্বাভাবিক?

জ্বী, স্যার। তারমানেই, যে-কোন মুহূর্তে আবহাওয়া বদলে। যেতে পারে ওখানে।

সাবমেরিন থেকে পাঠানো রিপোর্টে কি বলা হয়েছে, আবহাওয়ার ব্যাপারে?

চিন্তিত হবার মত কিছু নয়। আবহাওয়া ভাল। সাবমেরিনের সেইল থেকে খানিক পর পর বরফ ভেদ করে পানির ওপর তোলা হচ্ছে সেনসর।

খাওয়ায় মন দিতে চেষ্টা করলেন মরগ্যান। অ্যাডমিরাল হ্যামিলটন বললেন, এটা কিন্তু এক ধরনের পাগলামি। গোটা অ্যাসাইনমেন্টের কথা বলছি আমি।

কিন্তু এই পাগলামির প্রয়োজন ছিল, জোর দিয়ে বললেন ময়নিহান।

প্রেসিডেন্ট আমাদের প্ল্যান অনুমোদন করেছেন, এটা আমার। জন্যে বিরাট একটা স্বস্তি, মরগ্যান বললেন।

থামো, ভালয় ভালয় রানা বাংলাদেশে ফিরুক, তখন টের পাবে-ভাবলেন হ্যামিলটন।

টলব্যাট বলল, রিফুয়েলিং আমার দায়িত্ব, স্যার। এ-ব্যাপারে আপনারা দুশ্চিন্তা করবেন না, প্লীজ। বরফের ওপর প্লেনটাকে নামানো, সাবমেরিন থেকে ফুয়েল সাপ্লাই দেয়া, হ্যাঁ, ঝুঁকি আছে। স্বীকার করি কিন্তু সম্ভব।

যদি কোন বিপদ হয়…

এই মুহূর্তে ওদের চোখে সাবমেরিন ধরা পড়ছে না, কারণ বরফের নিচে রয়েছে ওটা, টলব্যাট পট থেকে কাপে কফি ঢালতে ঢালতে বলল। সোনার স্ক্রীনে ওটা ধরা পড়ছে না। বরফের নিচ থেকে একবার উঠে এসে এয়ারকিঙের ট্যাংক ভরে দিয়ে আবার লুকাবে, কাকপক্ষীও টের পাবে না। আমি তো কোন বিপদ দেখছি না…

হ্যামিলটন কফির কাপে চুমুক দিলেন। সাবমেরিনে যারা আছে তারা কেউ পিটি ডাভকে চেনে?

না। তার কোন দরকারও নেই।

দরকার ছিল, তোমরা সেটা টের পাওনি, ভাবলেন হ্যামিলটন। মনে মনে স্বস্তি বোধ করলেন তিনি। মার্কিন সাবমেরিনের ক্রুরা রানার জন্যে কোন বিপদ হয়ে দেখা দেবে না।

 

নোভাইয়া জেমলাইয়ার জোড়া দ্বীপের দিকে ছুটছে মিগ-৩১। গতি ঘণ্টায় দুশো মাইলের কিছু বেশি।

অনেক আগে থেকেই কমতে শুরু করেছে কুয়াশা, তারপর একেবারেই অদৃশ্য হয়ে গেল। নিচে ধূসর রঙের ব্যারেন্ট সী, ঝাপসা, নীল আকাশের কোন ছাপ পড়েনি তার বুকে। কুয়াশা থেকে বেরিয়ে আসার পর মাত্র কয়েকটা সেকেন্ড পেরিয়েছে, আচমকা প্রায় সরাসরি ওর নিচে এসে পড়ল ট্রলারটা। ডেকের ওপর দিয়ে স্যাঁৎ করে উড়ে আসার সময় সাদা একটা মুখ দেখতে পেল রানা, ওপর দিকে তাকিয়ে আছে। একশো ফিটেরও কম ওপর থেকে তাকে দেখল ও, হাতের বালতি উপুড় করে কি যেন ফেলছিল নদীতে। পলক ফেলার আগেই অদৃশ্য হয়ে গেল ট্রলার, শুধু রাডার স্ক্রীনে সবুজ একটা বিন্দু হয়ে থাকল। নিজের ওপর। রাগ হলো রানার, উপকূল রেখা পেরোবার পর বোকার মত অফ করে রেখেছিল ফরওয়ার্ড-লুকিং রাডার। এখন আবার সেটা অন করল ও।

এক মুহূর্ত পর বিপদের আসল চেহারা ধরা পড়ল। ই.সি.এম. রিড-আউট থেকে জানা গেল ওর ঠিক পেছনে রাডার। অ্যাকটিভিটি তুঙ্গে উঠেছে। একটা এলিন্ট শিপের ওপর দিয়ে উড়ে এসেছে ও-ওটা একটা স্পাই ট্রলার। ইনফ্রা-রেডের সাহায্যে ওরা তার যাত্রাপথ অনুসরণ করতে পারছে।

স্টিক সামনে ঠেলে দিল রানা, লাফ দিয়ে কাছে চলে এল। সাগর। সাগরের পিঠ থেকে পঞ্চাশ ফিট ওপরে থামল মিগ-৩১। ভাগ্য বিরূপ না হলে ইলেকট্রনিক চোখের আড়ালে চলে এসেছে। এয়ারকিং। এতটা নিচে ইনফ্রা-রেডও খুঁজে নিতে পারবে না। এলিন্ট শিপের অপারেটররা তাদের স্ক্রীন থেকে মিগ-৩১-কে। অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখেছে। কিন্তু তবু বিপদ কাটেনি, কারণ ওরা। জেনে ফেলেছে কোন্ দিকে যাচ্ছে ও। মিগ-৩১ নোভাইয়া জেমলাইয়ার দিকে যাচ্ছে, এই খবরটা বিলিয়ারস্কে পৌঁছে যাবে।

ফুয়েল গজের দিকে তাকাল রানা। দ্রুত কমে আসছে ফুয়েল। কোন কারণে যদি রিফুয়েলিং পয়েন্ট খুঁজে পেতে দেরি। হয়, বাঁচার কোন আশা নেই।

থ্রটলটা মুঠো করে ধরল রানা। নোভাইয়া জেমলাইয়ায় রুশ আণবিক অস্ত্র পরীক্ষা করা হত, এখন সেখানে মিসাইল ঘাঁটি বসানো হয়েছে। রাশিয়ান ডি.ই.ডব্লিউ. লাইন-এর সর্বউত্তর বিস্তৃতিও ওদিকে, সাথে প্রথম শিখা-মালা সংযোগ। রানা জানে, সীলেভেলে এয়ারকিং মাক টু পয়েন্ট সিক্স স্পীডে ছুটতে পারে। কিন্তু আসলে এর গতি কত রানা জানে না। ওকে বলা হয়েছে  শেষ সীমা মাক ফাইভ, কিন্তু ওর ধারণা মাক সিক্সে তোলা যেতে পারে স্পীড। তার মানে, প্রতি ঘণ্টায় সাড়ে চার হাজার মাইলেরও বেশি আর সী-লেভেলে সম্ভবত দুই পয়েন্ট দুই হাজার মাইল।

পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগামী প্লেন।

থ্রটল খুলে দিল রানা। মহামূল্যবান ফুয়েল বেশি বেশি করে খরচ না করে এখন আর কোন উপায় নেই। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করছে ও। মাক কাউন্টার ওপর দিকে উঠে যাচ্ছে-মাক ওয়ান পয়েন্ট থ্রী, ওয়ান পয়েন্ট ফোর, ওয়ান পয়েন্ট ফাইভ…

লম্বাটে এক জোড়া দ্বীপ, মাঝখানে সরু একটা চ্যানেল। চ্যানেলের দক্ষিণ-পুর্ব কোণে ম্যাটোচকিন শার মিসাইল ঘাঁটি। নোভাইয়া জেমলাইয়ায় পৌঁছে গেছে রানা। মিসাইল ঘাঁটি থেকে কেউ যদি ওকে দেখে থাকে, স্ক্রীনে শুধু আলোর একটা ঝলক ছাড়া আর কিছু দেখতে পায়নি, তাও মাত্র পলকের জন্যে। তবে ঘাঁটি পেরিয়ে আসার পর ফেলে আসা পথে যে আওয়াজটা রেখে আসবে এয়ারকিং সেটা ওরা শুনতে পাবে।

সাগর থেকে দুশো ফিটেরও কম ওপরে রয়েছে রানা। প্লেনের দায়িত্ব রয়েছে টি-এফ-আর এবং অটো-পাইলটের ওপর। সরু চ্যানেলে যদি কোন জাহাজ থাকে, দেখার পর সময় পাবে না ও, এক সেকেন্ডের দশ ভাগের এক ভাগের চেয়ে কম হতে পারে সেটা, দিক বদলে সংঘর্ষ এড়াবার তখন আর কোন উপায় থাকবে না। সেজন্যেই টি-এফ-আর চালু করে দিয়েছে ও, কমপিউটর হয়তো শেষ মুহূর্তে এড়িয়ে যেতে পারে সংঘর্ষ। স্ক্রীনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে রানা, রঙিন আলো দেখার অপেক্ষায় রয়েছে। কিন্তু কোন মিসাইল ছুটে এল না।

চ্যানেলের মুখে পাহাড়, খাড়া একটা পাঁচিল যেন-স্যাঁৎ করে পিছিয়ে গেল, সেই সাথে আবার উন্মুক্ত হলো প্রশস্ত সাগর। স্বস্তি। র নিঃশ্বাস ফেলল রানা, প্লেনের দায়িত্ব নিজের হাতে নিয়ে কোর্স বদল করল।

সাব-সোনিকে নেমে এল প্লেনের গতি। ওকে লক্ষ্য করে। মিসাইল ছোঁড়া হয়নি, কারণটা বুঝতে পারল রানা। এত নিচু। দিয়ে এসেছে ও, মিসাইল ছুঁড়লে সেটা পাথরের পাঁচিলে গিয়ে আঘাত করত।

নতুন কোর্স ধরে উত্তর-পশ্চিম দিক যাচ্ছে মিগ-৩১। এই কোর্স ধরে গেলে স্পিটবারজেন আর ফ্র্যাঞ্জ যোশেফ ল্যান্ডের মাঝখানে আইসপ্যাকের কিনারায় পৌঁছুবে ও। তার অনেক আগেই অবশ্য এয়ারকিঙের ফুয়েল শেষ হয়ে যাবে। পৌঁছুবার অনেক আগেই মারা যাবে রানা। ধূসর রঙের সাগর দেখতে অনেকটা কার্পেটের মত লাগল, প্রায় নিরেট।

নিঃসঙ্গতা অস্থির করে তুলল ওকে। পিক-আপ কোন সিগন্যাল দিচ্ছে না। খারাপ দিকগুলোই বারবার উঁকি দিল। মনে। ওটা কি নষ্ট হয়ে গেছে? রাশিয়ানদের চোখে ধরা পড়ার ভয়ে দূরে কোথাও সরে গিয়ে গা ঢাকা দিয়েছে রিফুয়েলিং ভেসেল? ওকে ফুয়েল সাপ্লাই দেয়ার জন্যে সত্যিই কি কেউ আছে। সামনের দিকে?

স্ক্রীন ফাঁকা, মাথার ওপর আকাশ শূন্য, নিচে সাগর খালি।

ধোঁয়াটে সাগরের ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে মিগ-৩১, দ্রুত। ফুরিয়ে আসছে ফুয়েল।

কেউ জানে না কি আছে ওর ভাগ্যে।

 

স্পাই ট্রলার থেকে রিপোর্ট এল, তারপর ম্যাটোচকিন শার থেকে এল কনফারমেশন রিপোর্ট-মিগ-৩১ দেখা গেছে। ওঁরা সবাই এতক্ষণে নিশ্চিতভাবে জানলেন, পিটি ডাভ বেঁচে আছে। ব্যাজার বিস্ফোরণে মারা যায়নি সে।

টেবিলে আর্কটিক ম্যাপ।

বিস্ফোরিত হতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিয়েছেন ফার্স্ট সেক্রেটারি। পিটি ডাভ এখনও বেঁচে আছে, মিগ-৩১-কে এখনও ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। নিজেকে সামলে নিয়ে উপস্থিত সবাইকে তিনি শুধু একটা কথাই বলেছেন, কিভাবে কি করবেন আমি জানি না, আমি চাই ও যেন মিগ-৩১ নিয়ে পালিয়ে যেতে না পারে।

তটস্থ একটা ভাব লক্ষ করা গেল যুদ্ধমন্ত্রী জেনারেল বাকুনিনের চেহারায়। কিন্তু এয়ার মার্শাল ঝনঝেনিৎসিনকে নির্লিপ্ত মনে হচ্ছে। তিনি তাঁর কাজ নিয়ে ব্যস্ত, আর কোনদিকে খেয়াল দেয়ার সময় নেই।

টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ম্যাপ দেখছেন তিনি। নোভাইয়া জেমলাইয়া পেরুবার পর পিটি ডাভ যে কোর্স ধরেছে তা আন্দাজ করতে যদি ভুল না হয়ে থাকে, পিটি ডাভ এখনও জানে না, সরাসরি মিসাইল ক্রুজার আর তার দুই অ্যাটেনড্যান্ট হান্টারকিলার সাবমেরিনের দিকে যাচ্ছে সে। এটা একটা ফাঁদ হিসেবে কাজ করবে। আরও একটা ফাঁদ তৈরি করতে পারেন তিনি।

মিগ-৩১ চিরস্থায়ী নিরেট বরফের দিকে যাচ্ছে, সম্ভাব্য ল্যান্ডিং ফিল্ড ওদিকেই কোথাও হবে। ওই এলাকায় সার্চ প্লেন পাঠাবার নির্দেশ দিলেন তিনি।

পিটি ডাভকে থামানো সম্ভব। রিগার বর্তমান অবস্থানের ওপর আঙুল দিয়ে টোকা দিলেন তিনি। এই মুহূর্তে রিগার দুই অ্যাটেনড্যান্ট–মিসাইলবাহী, ডিজেল চালিত, এফ শ্রেণীর অ্যান্টি-সাবমেরিন সাবমেরিন–পানির নিচে গা ঢাকা দিয়ে আছে। মিসাইল ক্রুজারকে রক্ষার জন্যে ওগুলো সাব-সারফেস-টু-এয়ার। মিসাইল বহন করে। যদিও বিমান হামলা থেকে বাঁচার জন্যে। রিগার নিজস্ব ফায়ার-পাওয়ারই যথেষ্ট।

নির্দেশ দাও রিগা যেন তার বর্তমান পজিশনে থাকে, বললেন তিনি। এসকর্ট দুটোকে এই মুহূর্তে পানির ওপর উঠতে বলো।

নির্দেশ পাঠানো হলো, এয়ার মার্শাল, অপারেটর বলল।

জেনারেল অ্যালার্ট, রেড ব্যানার ফ্লিটের সব জাহাজের জন্যে, একের পর এক নির্দেশ দিয়ে চলেছেন ঝনঝেনিৎসিন। পিটি ডাভের আন্দাজ করা কোর্স বদল হতে পারে, সেজন্যে। জাহাজগুলোকে তৈরি থাকতে বলো। ওই কোর্সটা জানিয়ে দাও ওদের।

নির্দেশ পাঠানো হলো, এয়ার মার্শাল।

পিটি ডাভের ফুয়েল সাপ্লাই সম্পর্কে কি জানি আমরা?

অপর একটা কণ্ঠস্বর থেকে ত্বরিৎ জবাব এল, কমপিউটর বলছে আর দুশো মাইলও যেতে পারবে না।

এই হিসেব কতটা নির্ভুল?

ভুল হবার সম্ভাবনা শতকরা ত্রিশ ভাগ, তার বেশি নয়, এয়ার মার্শাল।

তারমানে যে ফুয়েল আছে তাতে পিটি ডাভ হয় একশো। চল্লিশ মাইল, অথবা প্রায় তিনশো মাইল যেতে পারবে। চিবুকে আঙুল ঘষলেন ঝনঝেনিৎসিন। অর্থাৎ পোলার-প্যাকের কাছাকাছি পৌঁছুতে পারছে না মিগ-৩১। আর পোলার-প্যাকে পৌঁছুতে না পারলে সাগরে বিধ্বস্ত হবে প্লেনটা। এর দ্বিতীয় কোন উত্তর নেই। আবার ম্যাপটা পরীক্ষা করলেন তিনি। এলাকায় অচেনা কোন এরিয়াল অ্যাকটিভিটি আছে?

নেই, এয়ার মার্শাল। আকাশ এখন পরিষ্কার।

ঠিক আছে। ম্যাপে চোখ রেখে ভাবছেন এয়ার মার্শাল, পিটি ডাভ এখন বেশি ওপরে উঠবে না, ফুয়েলের কথা ভেবে স্পীড বাড়াবার সাহস হবে না তার। যতটা সম্ভব সাগরের গা ঘেঁষে থাকতে হবে তাকে। তা যদি হয়, ভাগ্য ভালই বলতে হবে, কারণ ক্রুজার থেকে খালি চোখে দেখে মিসাইল ছোঁড়া যাবে, ক্লোজ রেঞ্জে। আর তা না হলে ইনফ্রারেড উইপনস এইমিং-এর ওপর নির্ভর করতে হবে। মনটা খুঁত খুঁত করছে এয়ার মার্শালের। রিগায় যে ফায়ার-কন্ট্রোল সিস্টেম রয়েছে সেটা অত্যাধুনিক নয়। তবে, কাজ চালানো যায়, কাজ চালাতেই হবে…

চিন্তায় বাধা পড়ল। কে একজন বলল, এয়ার মার্শাল, টাওয়ার থেকে রিপোর্ট-মেজর মিখাইল রাভিক। পিপি-টু টেকঅফ করার জন্যে তৈরি হয়ে গেছে।

মুখ তুলে ফার্স্ট সেক্রেটারির দিকে তাকালেন এয়ার মার্শাল। ফার্স্ট সেক্রেটারি তাঁরই দিকে ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে আছেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, তার কাছ থেকে কিছু আশা করা হচ্ছে, কিন্তু সেটা যে কি তিনি জানেন না। এখন আর দ্বিতীয় মিগ-৩১-কে প্রথমটার পিছনে পাঠিয়ে কোন লাভ নেই। পিটি ডাভ তিন হাজার মাইল দূরে চলে গেছে। তাছাড়া, তার ফুয়েলও তো প্রায় শেষ হয়ে এল। তার আর জ্বালানি পাবার কোন উপায় নেই, কাজেই কেউ বাধা না দিলেও সাগরে ধ্বংস হয়ে যাবে পিপি-ওয়ান।

নিস্তব্ধতা ভাঙলেন ফার্স্ট সেক্রেটারি, পাইলট কে?

আমি…আমার ঠিক জানা নেই… প্রশ্নটা শুনে বিস্মিত হলেন ঝনঝেনিৎসিন।

বেরেনকো, জেনারেল বাকুনিন বললেন। মেজর বোরিস বেরেনকো।

সময় কম, আমি সেটা বুঝি, ফার্স্ট সেক্রেটারি বললেন, তবু ওর সাথে কথা বলব আমি।

ফার্স্ট সেক্রেটারি কি চাইছেন, বুঝতে পারলেন এয়ার মার্শাল। বেরেনকোকে এখুনি টেক-অফ করতে বলবেন তিনি, ম্যাক্সিমাম স্পীড তুলে পিপি-ওয়ানকে ধাওয়া করার নির্দেশ দেবেন। নোভাইয়া জেমলাইয়াতে পৌঁছুতে বেরেনকোর এক ঘণ্টারও কম সময় লাগবে। তার ধারণা, সময় আর জীবনী-শক্তির অপব্যয় ছাড়া আর কিছু হবে না সেটা। তবু, কর্তার ইচ্ছায় কর্ম। তিনি বললেন, অবশ্যই, ফার্স্ট সেক্রেটারি। অপারেটরের দিকে ফিরলেন। এখুনি তলব করো বেরেনকোকে। টাওয়ারকে বলো, টেক-অফের জন্যে সব রকম প্রস্তুতি নিক। রিফুয়েলিং। প্লেনগুলোকে সতর্ক করে দিতে হবে, পিটি ডাভ যেখানে উপকূল। পেরিয়েছে তার খানিক পশ্চিমে পিপি-টু-র জন্যে অপেক্ষা করবে ওগুলো। প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিলেন তিনি। একটা প্রহসন ছাড়া। এ আর কিছুই নয়, মনে মনে হাসলেন। পিটি ডাভ তার রিফুয়েলিং পয়েন্টে কোনদিনই পৌঁছুতে পারবে না, পিপি-ওয়ানকে মিসাইল ছুঁড়ে ঠিকই ধ্বংস করে দেবে রিগা…কিন্তু এসব কথা বলে কোন লাভ নেই। বলার পর যদি অন্য রকম কিছু ঘটে, হিতে বিপরীত হবে।

 

পিক-আপ এখনও কোন সিগন্যাল দিচ্ছে না। ফুয়েল গজের কাঁটা। লাল বিপদ সঙ্কেতের ওপর কাঁপছে, রিজার্ভ ফুয়েলও শেষ হয়ে এল বলে। বেশ কয়েক মিনিট হয়ে গেছে রিজার্ভ ট্যাংকের সুইচ অন করেছে রানা, কিন্তু ধারণ ক্ষমতা সম্পর্কে ওর কোন ধারণা নেই। কিন্তু জানে আর মিনিট দুয়েকের মধ্যে রিফুয়েলিং পয়েন্ট থেকে পাঠানো সিগন্যাল না পেলে মারা যাবে ও। শুধু সিগন্যাল পেলে হবে না, কাছাকাছি কোথাও থেকে পাঠানো হলে তবেই সেখানে পৌঁছুতে পারবে ও। তা না হলে পৌঁছুবার আগেই নিঃশেষ হয়ে যাবে রিজার্ভ ফুয়েল।

সাগর এখনও ফাঁকা। রাডার স্ক্রীন অর্থাৎ আকাশও খালি।

এখনও বেঁচে আছে ও, শ্বাস নিচ্ছে, কিন্তু মৃত্যু আর বেশি দূর নয়।

সি.আই.এ-র রিফুয়েলিং পয়েন্ট জাহাজ নাকি প্লেন, জানা নেই ওর। প্লেন হবারই সম্ভাবনা বেশি। প্লেনটা হয়তো রাশিয়ান ডি.ই.ডব্লিউ. লাইন পেরোবার চেষ্টা করেছিল, ধরা পড়ে বিধ্বস্ত হয়েছে।

রাডারে বড় আকারের একটা সারফেস ভেসেল দেখা গেল। কোর্স সামান্য বদল করার জন্যে হাত দুটো তৎপর হয়ে উঠল, লক্ষ করল, স্ক্রীনে আরও দুটো ব্লিপসারফেস ভেসেলের দুপাশে। ছ্যাঁৎ করে উঠল বুক। নিশ্চই রাশিয়ান মিসাইল ক্রুজার, সাথে এক জোড়া অ্যাটেনড্যান্ট সাবমেরিন। সরাসরি ক্রুজারের দিকে এগোচ্ছে এয়ারকিং।

বর্তমান স্পীডে এক মিনিট লাগবে টার্গেটে পৌঁছুতে। আপনমনে হাসল রানা। টার্গেট! মিসাইল ক্রুজার! টার্গেট তো আসলে সে নিজেই। কোন সন্দেহ নেই, জাহাজের ইনফ্রা-রেড এরই মধ্যে ওকে সনাক্ত করতে পেরেছে। হাইট, রেঞ্জ ইত্যাদি যাবতীয় তথ্য ফায়ার-কন্ট্রোল কমপিউটরে চলে গেছে।

মরতেই যদি হয়, এয়ারকিং সত্যি কি করতে পারে সেটা দেখে মরবে। বর্তমান কোর্সে স্থির থেকে আত্মহত্যার কোন ইচ্ছে নেই ওর। মরতে হবে জানে, কিন্তু হাল ছেড়ে দেয়ার বান্দা মাসুদ রানা নয়।

ওর কাছে এটা রক্ষার যুদ্ধ। সামনে টার্গেট-এক মিনিটের পথ।

এই সময় পিক-আপ সিগন্যাল দিল। ওটার দিকে তাকাল না রানা, দেখল না সিগন্যালটা কতদূর থেকে আসছে। জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে কতটা দূরত্ব, জানার সময় নেই। মিসাইল ক্রুজার আর সাবমেরিন দুটো এগিয়ে আসছে, চোখের পলক না ফেলে রাডারের দিকে তাকিয়ে আছে রানা। ডিসট্যান্স-টু-টার্গেট রিড-আউট-ত্রিশ সেকেন্ড। প্রায় জিরো হাইটে রয়েছে ও, তাই। কিছু বোঝার আগেই ওগুলোর ঠিক ওপরে চলে এল মিগ-৩১।

এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। পিক-আপ থেকে বিরতিহীন যান্ত্রিক আওয়াজ বেরুচ্ছে, ত্রাহি চিৎকারের মত শোনাল কানে। একদৃষ্টে সামনে তাকিয়ে আছে রানা, খালি চোখে মিসাইল ক্রুজারকে দেখতে পাবার আশায়।

মৃত্যু এসে আলিঙ্গন করবে, এখন তারই অপেক্ষা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *