২.২৫ হাওয়াই দ্বীপের পার্ল হারবারে

পাঁচদিন পর হাওয়াই দ্বীপের পার্ল হারবারে ভিড়ল দ্য অরিগন।

টিভি ক্যামেরা নিয়ে ডকে ভিড় করে অপেক্ষা করছে বেশ কয়েকটি চ্যানেলের সাংবাদিকরা। দৈনিক পত্রিকার কলাম ও ফিচার লেখকদের ভিড় কম হয়নি। ক্লিক-ক্লিক আওয়াজ উঠছে ফটো সাংবাদিকদের ক্যামেরা থেকে। দুদিন আগে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে একটা চার্টার বিমান নিয়ে দ্য অরিগনের পোভা ডেকের ছবি তুলে এনেছে এরা। একজনের সঙ্গে ভিডিয়ো ক্যামেরা ছিল। সে এখন রাজা। নিউজ চ্যানেলগুলো লাখ লাখ ডলারে ওই দৃশ্য কিনে নিয়েছে। এবার নুমার সবর পেট থেকে গল্পটা বের করতে ডকে হাজির হয়েছে সবাই।

গ্যাংওয়ের উপর এসে দাঁড়িয়েছে রানা। দেখছে, দুই মিডশিপমেন স্ট্রেচারে করে সরিয়ে নিয়ে গেল তিশাকে। বেচারি এখনও কোমায়। কাছের এক মিলিটারি হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে। ওকে।

রানার পাশে এসে দাঁড়াল রাশেদ হাবিব ও মেরি।

কী খবর, মেরি? বলল রানা।

হাই, হাসল পিচ্চি মেয়ে। বিপদ কেটে যাওয়ায় উচ্ছল। একহাতে ধরে রেখেছে হাবিবের কবজি, যেন বাচ্চার হাত ছাড়বে

মা। মার্লন ব্যাণ্ডোকে নকল করল হাবিব, কে জানত? আমি একদিন সত্যিই গডফাদার হয়ে উঠব!

মৃদু হাসল রানা।

ঝট করে পিছনে ঘুরে চাইল মেরি। আরেহ, গেল কোথায়…

এক সেকেণ্ড পর ডোরওয়েতে দেখা দিল লিলি, থপথপ করে এসে থামল রানার পাশে। নাক গিয়ে গুঁতো দিতে শুরু করেছে হাতে। একেবারে চুপচুপে ভেজা।

জাহাজের ডাইভ প্রিপারেশন পুলে আনন্দে কেটেছে ওর দিন, বলল হাবিব।

তাই তো মনে হচ্ছে, আলতো করে লিলির কান চাপড়ে দিল রানা। খুশিতে জিভ বের করে নাক চেটে নিল লিলি, তারপর গড়িয়ে পড়ে গেল। আর উপায় নেই, কাজেই এক হাঁটু গেড়ে বসল রানা, পেট চুলকে দিতে লাগল।

অ্যাডমিরাল বলেছেন, ও, আপাতত এখানে থাকতে পারে, পরে ভাল কোনও বাড়ি খুঁজে দেবেন, বলল মেরি।

গুড, সায় দিল রানা। শেষবারের মত লিলির পেট চুলকে দেয়ার পর উঠে দাড়াল। সঙ্গে সঙ্গে উঠে পড়ল লিলিও, ফিরে চলল পছন্দের পুলের দিকে। 

রাশেদ হাবিবের চোখে চাইল রানা। মিস্টার হাবিব, আমার একটা প্রশ্ন ছিল।

বলুন?

স্টেশনের ডুবুরিরা পাতাল-গুহায় যেতে কোন সময়ে ডাইভ দিয়েছিল?

কোন সময়?

হ্যাঁ, সময়টা জানতে চাইছি। তখন দিন ছিল, না রাত?

উমম, যতটা মনে পড়ে রাত! ধরুন, রাত নয়টার দিকে।

আস্তে করে মাথা দোলাল রানা।

বলুন তো কেন জানতে চাইলেন? বলল হাবিব।

আমি বোধহয় জানি কেন ওই সময়ে হামলা করেছিল এলিফ্যান্ট সিল।

বলুন তো দেখি?

মনে আছে আপনার, একমাত্র তিশার দলের কেউ আক্রান্ত হয়নি।

হ্যাঁ। তা ঠিক।

আর আমি তখন বলেছিলাম, ওরা লো-অডিবিলিটি ব্রিদিং গিয়ার ব্যবহার করেছে।

তা আপনি বলেছেন, বলল হাবিব। তো? আমরাও তো ওই, একই জিনিস ব্যবহার করেছি। তারপরও তো হামলা করল।

তা ঠিক, দুষ্টু হাসল রানা। কিন্তু এখন জানি কেন হামলা করেছে। আমরা ডাইভ দিয়েছি রাতে।

তো?

বিজ্ঞানী, গুণ্ডারসনের ডাইভার বা আমরা রাতেই নেমেছি। বিজ্ঞানীরা নয়টার সময়, গুণ্ডারসনের লোক আটটার সময়, কিন্তু তিশার দল নেমেছে দুপুর দুটোয়। শুধু ওরাই দিনে নেমেছে।

বুঝতে শুরু করেছে হাবিব। তা হলে আপনি বলতে চাইছেন ওইসব সিল নকটারনাল?

হ্যাঁ, আমার ধারণা ওরা দিনে ঘুমায়।

আস্তে করে মাথা দোলাল হাবিব। সাধারণত দেখা যায়, হিংস্র বা বিষাক্ত প্রাণী রাতেই জেগে থাকে, দিন কাটিয়ে দেয় ঘুমিয়ে।

ভাল কথাই বলেছেন, বলল হাবিব। আবার কখনও রেডিয়েশন-ইনফেক্টেড এলিফ্যান্ট সিলের ডেরায় গেলে কথাটা মনে রাখব।

হাসছে মেরি। রানা গ্যাংওয়ে বেয়ে নামতে শুরু করতেই ওরা দুজনও পিছু নিল।

সিঁড়ির নীচে দাঁড়িয়ে আছে মাঝ বয়সী এক মেরিন সার্জেন্ট।

রানা নেমে আসতেই খটাস করে স্যালিউট দিল সে। স্যর, আপনার জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

সার্জেন্ট, আমি এখন লেফটেন্যান্ট তিশা করিমকে দেখতে হাসপাতালে যাব। কেউ যদি মনে করে অন্য কোথাও যাব, ভুল ভাবছে।

তাতে আমার কোনও অসুবিধে নেই, স্যর, হাসল সার্জেন্ট। আমাকে বলে দেয়া হয়েছে, আপনি, মিস্টার হাবিব আর মিস মেরি কোথাও যেতে চাইলে, আপনাদেরকে পৌঁছে দিতে হবে।

আস্তে করে মাথা দোলাল রানা, চাইল হাবিব ও মেরির দিকে। কাঁধ ঝাঁকিয়ে ওরা জানিয়ে দিল, ওদের কোনও আপত্তি নেই।

গাড়ি পেলে তো ভালই, বলল রানা। পথ দেখান, সার্জেন্ট।

ওদেরকে নীল এক বুইকের দিকে নিয়ে চলেছে সার্জেন্ট। ওই গাড়ির জানালা কালো রঙের পৌঁছে গিয়ে দরজা খুলে ধরল লোকটা। ভিতরে ঢুকে পড়ল রানী।

আগেই ওপাশে বসে আছে আরেক লোক। তার হাতে উদ্যত পিস্তল দেখে আড়ষ্ট হয়ে গেল রানা।

চুপ করে বসুন, মিস্টার রানা, চাপা স্বরে বলল সার্জেন্টমেজর অ্যা লিলিওয়েলেন! সাবধানে সিটে বসল রানা। সামনের সিটে উঠেছে রাশেদ হাবিব ও মেরি, লোকটার হাতে পিস্তল দেখে চমকে গেছে ওরা।

বেঁটে লোক লিলিওয়েলেন, ক্লিন-শেভ করা মুখ। ঘন কালো ভুরু দুটো ঝোপের মত। পরনে দিনের খাকি মেরিন ইউনিফর্ম।

যে, সার্জেন্ট রানাদের এখানে এনেছে, সে ড্রাইভিং সিটে বসে। পড়েছে, গাড়ি চালু করে রওনা হয়ে গেল।

মেরিন কর্পসের নন-কমিশণ্ড সর্বোচ্চ পদের অফিসার বলল, আমরা খুবই দুঃখিত, মিস্টার রানা। কিন্তু আপনি বা আপনার সঙ্গে এরা ছেড়া সুতোর মত! আমরা এসব সুতোয় গিঠ দেব।

আসলে কী বলতে চান? জানতে চাইল রানা।

আপনি জানেন আমরা আইসিজি।

আমি নুমার চিফ অ্যাডমিরাল জর্জ হ্যামিলটনকে আপনাদের কথা বলেছি, বলল রানা। আপনারা আমাদেরকে মেরে ফেলতে চাইলে সেটা সহজ হবে না।

হয়তো এখনই মেরে ফেলব না, বলল লিলিওয়েলেন। কিন্তু ঠিক সময়ে… হা। ..আবার এদিকটাও ভেবে দেখুন, আপনি আমাদের জন্য মস্ত হুমকি। আমরা চাই না আপনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলুন। আপনি হয়তো বলে দেবেন উইলকক্স আইস স্টেশনে কী ঘটেছে। তা আমরা হতে দিতে পারি না। মিডিয়া সে তথ্য পাবে, যেটা আমরা আইসিজি ওদেরকে দেব।

আমরা তো অন্য দেশের লোক, কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে, আপনারা নিজেদের লোকই মেরে সাফ করছেন, বলল রানা।

আপনি আমাদের কাজ বোঝেননি, মিস্টার রানা, বলল লিলিওয়েলেন।

বুঝেছি। আপনারা নিজের লোক খুন করে দেশ ও দশের উন্নতি করছেন তিক্ত হাসল রানা।

হা যিশু, আপনার মুখে এসব শুনতে ভাল লাগছে না। আপনার তো ওখানে থাকারই কথা নয়। কর্কশ স্বরে হাসল লোকটা। এভাবে দেখুন, অন্য সবার আগে কীভাবে উইলকক্স আইস স্টেশনে পৌঁছলেন?

চট করে রানার মনে পড়ল, জর্জ হ্যামিলটন ওর বসের মাধ্যমে সাহায্য চেয়েছিলেন নুমার বিজ্ঞানীদেরকে সরিয়ে নেয়ার জন্য। পরে ম্যাকমার্ডো স্টেশনে আণ্ডারসেক্রেটারি অভ ডিফেন্স ব্রিফ করেন ওকে।

যেন ওর মন পড়ছে লিলিওয়েলেন, আবারও হাসল। এসব সিভিলিয়ান কী-ই বা বোঝে, বলুন?

জর্জ হ্যামিলটন আপনাদেরই অ্যাডমিরাল ছিলেন, বলল রানা।

যখন ছিলেন তখন ছিলেন, এখন তো তিনি সিভিলিয়ান। আসলে এসব সিভিলিয়ানরা আপনাকে শেষ করে দিল। আপনি ওই স্টেশনে যাওয়ার ছয়ঘণ্টা পর গোটা স্টেশন দখল করে নিতে পারতাম আমরা আইসিজি ভরা আর্মি রেঞ্জার দিয়ে। অনেক আগেই শেষ করে দিতে পারতাম ফ্রেঞ্চদেরকে। ব্রিটিশরা ওদিকে ভুলেও যেত না। কিন্তু ফ্রেঞ্চদের সঙ্গে লড়াই শুরু হলে আমাদের আমেরিকান সৈনিক বেশি মরত। সেই ক্ষতির ভিতর পড়তে হলো না। মাথা নাড়ল লোকটা। আপনি আপনার লোক নিয়ে ওখানে ছিলেন। আপনার সঙ্গে আইসিজির লোক দিয়ে দিয়েছিলাম আমরা। প্রথম কথা, সেরা জিনিস আমাদের হাতে আসতে হবে। তা যদি সম্ভব না হয়, ওই জিনিসের প্রমাণ উধাও করে দিতে হবে। এটা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই দরকার।

আপনারা নিজেদের দেশের ছেলেদেরও মেরেছেন, বলল রানা।

সেটা বাধ্য হয়ে। কেউ ভুল জায়গায় ভুল সময়ে চলে গেলে শাস্তি পাবে, এটাই স্বাভাবিক!….যাক, আপনাকে এসব বলছি কেন, একটু পরই তো আপনাকে মেরে ফেলব।

ডক ইয়ার্ডের বাইরের বেড়ার সামনে গার্ড স্টেশন, ওখানে পৌঁছে গেছে বুইক। কিন্তু বুম গেট নামানো। জানালার কাঁচ নিচু করল ড্রাইভার সার্জেন্ট। বুম গেটের গার্ডের সঙ্গে কথা বলল।

কিন্তু তিন সেকেণ্ড পর হঠাৎ করেই লিলিওয়েলেনের ওদিকের দরজা হ্যাঁচকা টানে খুলে গেল। বাইরে দাঁড়িয়ে আছে কমপক্ষে দশজন সশস্ত্র নেভাল পুলিশ। প্রত্যেকের অস্ত্র তাক করা দুই আমেরিকানের কপালে।

এই যে স্যর, আপনি বেরিয়ে আসুন দেখি, সামনের লোকটা বলল।

মুখ কালো হয়ে গেল সার্জেন্ট-মেজর লিলিওয়েলেনের। বাছা, তুমি জানো কার সঙ্গে কথা বলছ? ঘড়ঘড় করে উঠল তার কণ্ঠ।

না, ও জানে না, গাড়ির বাইরে পরিচিত কণ্ঠ শুনল রানা। কিন্তু আমি জানি তুমি কে? দরজার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন নুমা চিফ জর্জ হ্যামিলটন। রানার চোখে চাইলেন, দৃষ্টিতে স্নেহ। মাই বয়, তুমি ঠিকই বলেছিলে। এবার একটা একটা করে কান ধরে মিলিটারি থেকে এদেরকে বের করার ব্যবস্থা নেব আমরা সবাই।

অ্যাডমিরাল, ও কি এসেছে? গাড়ি থেকে নেমে এল রানা।

রাশেদ হাবিব ও মেরিও নেমে পড়েছে।

ওই যে দেখো! হাসলেন হ্যামিলটন।

তাঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘুরে গেল রানা। নেভাল পুলিশদের মাঝ দিয়ে হেঁটে আসছে রবিন কাটন, ঠোঁটে চওড়া হাসি।

সার্জেন্ট-মেজর অ্যাণ্ডু লিলিওয়েলেন এবং সঙ্গে আসা সার্জেন্টকে বের করে আনা হলো গাড়ি থেকে। হাতে আটকে দেয়া হলো হ্যাণ্ডকাফ। সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো তাদেরকে।

বন্ধুর দিকে পা বাড়াল রানা।

অবশ্য তিন পা যেতে না যেতেই পরস্পরকে জড়িয়ে ধরল ওরা। ওদের পাশে এসে থেমেছে এক দম্পতি।

এদেরকে আগে কখনও দেখেনি রানা।

ওকে আরেকবার বুকে পিষে ছেড়ে দিল রবিন কার্লটন, বলল, এঁরা অ্যাডোনিস ও সাহু ক্যাসেডিন। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক। আর ইনি মাসুদ রানা।

অ্যাডোনিস হাত বাড়িয়ে দিতেই করমর্দন করল রানা।

আগেই ওদের পরিচয় হয়েছে মোবাইল ফোনে। রানার কাছ থেকে তথ্য পেয়ে একটা চার্টার বিমান ভাড়া নেয় অ্যাডোনিস ও সান্থা, ঘুরে আসে দ্য অরিগনের উপর দিয়ে। ভিডিয়ো করেছে মিসাইলের আঘাত করা জায়গার।

এবার সব ভালভাবে শেষ হলে হয়, বলল অ্যাডোনিস।

মৃদু হাসছেন নুমা চিফ। খারাপ সব কিছুই শেষ হয়, বললেন। রানা আগে থেকে না বললে ওই দুই পীরকে ধরা যেত না। ওদের পেট থেকে অনেক কিছুই বেরুবে। …আর কার্লটন, তোমাকে কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে, তারপর আবার যোগ দেবে চাকরিতে।

এবার আপনাদেরকে নিয়ে ফিচার লিখছি আমরা দ্য ওয়াশিংটন পোস্টে, বলল অ্যাডোনিস। আশা করি আপনাদের সাক্ষাৎকার দেবেন।

আমার আপত্তি নেই, বললেন জর্জ হ্যামিলটন। তবে রানার বোধহয় আপত্তি থাকতে পারে। ওর বস্ অনুমতি না দিলে…

আগ্রহ নিয়ে রানার দিকে চেয়ে আছে অ্যাডোনিস।

পরে বসের সঙ্গে আলাপ করে জানাব, বলল রানা। মেরি ও হাবিবকে দেখাল। এরা উইলকক্স আইস স্টেশনের বিষয়ে দারুণ সব তথ্য দিতে পারবে।

খুশি হয়ে হেসে ফেলল দম্পতি।

.

জুলাইয়ের পঁচিশ তারিখে দুনিয়ার সবচেয়ে বিক্রিত–দৈনিক

পত্রিকা দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রথম পাতায় ছাপা হলো রানার বন্ধু রবিন কার্লটনের ছবি। বুকের সামনে ধরেছে একটা ছবি, সঙ্গে ইউনাইটেড স্টেটস মেরিন কর্পসের দেয়া অফিশিয়াল ডেথ সার্টিফিকেট।

হেডলাইনে লেখা:

ইউএস মিলিটারির বক্তব্য অনুযায়ী, ইনি অফিশিয়ালি মৃত

রাশেদ হাবিব ও মেরির কাছ থেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে উইলকক্স আইস স্টেশনের উপর তিন পাতা লেখা হয়েছে। পরের দুই, পাতা আইসিজি সম্পর্কে। পাঠকদের জানানো হয়েছে, কীভাবে এলিট মিলিটারির ভিতর নিজেদের নোক ঢুকিয়ে দেয়া হয়। কীভাবে খুন করা হয় সাধারণ অফিসার ও সৈনিকদেরকে।

এই বিশাল ফিচারে ফ্রেঞ্চ বা ব্রিটিশ হামলার কথা বেমালুম ভুলে যাওয়া হয়েছে।

নানা ট্যাবলয়েডে অবশ্য বলা হয়েছে, উইলকক্স আইস স্টেশনে নিজেদের মিলিটারি পাঠিয়েছিল অন্য কয়েকটি দেশ।

দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিযোগী এক পত্রিকায় লেখা হলো: দ্য ওয়াশিটন পোস্টের মালিক ক্যাথারিন গ্রাহামের সঙ্গে দেখা করেছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট স্বয়ং, তিনি অনুরোধ করেছেন, উইলকক্স আইস স্টেশনের কারণে যেন বিশেষ কিছু দেশের সঙ্গে আমেরিকার কূটনৈতিক সম্পর্ক ব্যাহত না হয়, তা দেখবেন।

হয়তো সেকারণেই একবারও ব্রিটেন বা ফ্রান্সের বিষয়ে সামান্যতম মন্তব্য আসেনি দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় লেখা হয়েছে, উইলকক্স আইস স্টেশনে তুমুল লড়াই হয়েছে। কিন্তু জানা যায়নি শত্রুপক্ষ কারা ছিল।

মাসুদ রানা সম্পর্কেও একটি লাইনও লেখা হয়নি।

সাংবাদিকরা হিংসা করতে শুরু করেছে অ্যাডোনিস এবং ওর স্ত্রীকে! সবাই বুঝে গেছে, ওই কাহিনি কমপক্ষে দেড় মাস ধরে সেরা কলামে ছাপা হবে। এই সম্মান দশ জনমেও পায় না বেশির ভাগ সাংবাদিক।

.

পরদিন পার্ল হারবার ত্যাগ করল নুমা জাহাজ দ্য অরিগন। সেই দিনই ওয়াশিংটনে শেষ হলো ন্যাটো কনফারেন্স।

প্রতিটি টিভি চ্যানেল ও দৈনিক পত্রিকায় আর্টিকেল বেরুল। আমেরিকান, ব্রিটিশ ও ফ্রেঞ্চ কূটনীতিকরা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন ক্যাপিটল বিল্ডিঙের সিঁড়ির ধাপে। হাসি মুখে করমর্দন করছেন, পাশেই তাঁদের জাতীয় পতাকা। তারা বলেছেন, কমপক্ষে আরও বিশ বছর চলবে এই মহান ন্যাটো সংগঠন।

ফ্রেঞ্চ রিপ্রেসেন্টেটিভ অ্যা পিয়েরে কুই-র কথা কোট করা হয়েছে: দুনিয়ার সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী সংগঠন আমাদের এই ন্যাটো। কেন এই সংগঠন এতদিন টিকবে, জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান: আমরা সবাই ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের কারণে পরস্পরকে গভীর ভাবে বিশ্বাস করি।

.

পার্ল হারবার নেভাল হসপিটালে প্রাইভেট একটা রুমে নিথর শুয়ে আছে তিশা। বুজে আছে চোখ। জানালা দিয়ে সামান্য রোদ আসছে। তিশা এখনও কোমার ভিতর।

তিশা! তিশা? বলে উঠল এক মহিলা কণ্ঠ।

আবছা কণ্ঠ শুনতে পেল তিশা। খুব ধীরে মেলল চোখ। পাশের কটে শুয়ে ওর প্রিয় নিশাত আপা।

আর ঘুমায় না, তিশা। মিষ্টি করে হাসল নিশাত।

চোখ বুজে এসেছিল, আবারও জোর করে নিশাতের দিকে চাইল তিশা। কেমন আছেন, আপা? আমরা কোথায়?

তার চেয়ে বড় কথা, দেখো কে এসেছে তোমাকে দেখতে, হাসছে নিশাত।

কে?

বামদিকে মাথা কাত করল নিশাত। জানালার পাশে অতিথির চেয়ারে বসে আছে মাসুদ রানা। ঘুমিয়ে কাদা।

ওঁর পাজর মেরামত হওয়ার পর থেকে ঠায় বসে আছেন, নিচু স্বরে বলল নিশাত। বলেছেন, তুমি জেগে না ওঠা পর্যন্ত থাকবেন এখানেই।

রানার দিকে অপলক চেয়ে রইল তিশা। ওর মনে হলো, দুনিয়ার সেরা মিষ্টি একটা শিশু ঘুমাচ্ছে অকাতরে।

মৃদু হেসে ফেলল তিশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *