২.২৪ কিছুক্ষণ আগে অরিগনের ব্রিজে

কিছুক্ষণ আগে অরিগনের ব্রিজে এসেছেন নুমা চিফ, অ্যাডমিরাল (অব.) জর্জ হ্যামিলটন। জাহাজ দক্ষিণ-সাগর চিরে পুরে চলেছে। ওদিক থেকে ভোরের সূর্য ওঠে।

রানার হাতে ধোঁয়া ওঠা কালো কফির মগ, একবার চুমুক দিল।

তিনঘণ্টা হলো নিজ মিসাইলের আঘাতে বিস্ফোরিত হয়েছে কালো বিমান, দ্য শ্যাডো।

ইনফারমারিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তিশাকে। আরও খারাপ হয়েছে ওর শারীরিক অবস্থা। প্রচুর রক্ত হারিয়েছে, আধঘণ্টা হলো কোমার ভিতর চলে গেছে।

নুমা চিফের স্টেটরুমে উঠেছে রাশেদ হাবিব ও মেরি ভিসার, দশমিনিট পেরুবার আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে

ডেকের নীচে ডাইভ প্রিপারেশন পুলে মহানন্দে জলকেলী করছে বাচ্চা সিল লিলি।

ডেক থেকে সুপারস্ট্রাকচারে ঢুকে প্রথমেই বাথরুমে গিয়ে হট শাওয়ার নিয়েছে রানা, তারপর ধার পাওয়া ট্রাকসুট পরে বেরিয়ে এসেছে।

নুমা চিফ জর্জ হ্যামিলটনের নির্দেশে অপেক্ষা করছিলেন দক্ষ ডাক্তার, রানাকে জোর করে ধরে নিয়ে গেছেন ইনফারমারিতে। ক্ষতগুলো পরিষ্কার করেছেন, তারপর মেরামত করেছেন পাঁজরের ভাঙা হাড়। রানাকে বলেছেন, উন্নত চিকিৎসা দরকার। একবার হাওয়াই দ্বীপে পৌঁছে গেলেই হাসপাতালে ভর্তি করে দেবেন। আপাতত কয়েকটা পেইন কিলার দিয়েছেন। ওগুলো গিলে নেয়ার কিছুক্ষণ পর রানার মনে হয়েছে, নাহ্, কোথায়, কখনও কোনও সমস্যা ছিল না ওর।

ডাক্তারের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে অচেতন তিশার কটের পাশে থেমেছে রানা। চুপ করে ওখানেই বসে ছিল, তারপর ব্রিজে আসতে খবর পাঠালেন নুমা চিফ।

ব্রিজে পৌঁছে রানা দেখল, নুমা চিফ চেয়ে আছেন দূরসাগরে। পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই ঘুরে দাঁড়ালেন উনি, বললেন, ম্যাকমার্ডো থেকে খবর এসেছে, রানা। প্রায় বিধ্বস্ত এক মেরিন হোভারক্রাফট ওখানে পৌচেছে। পাঁচজন আরোহী ছিল : ড্রাইভার এক বাঙালি সৈনিক, সঙ্গে চারজন বিজ্ঞানী। এঁরা জানিয়েছেন, উইলকক্স আইস স্টেশন থেকেই এসেছেন। …দুজন নুমার বিজ্ঞানী। থ্যাঙ্কস্, রানা।

আস্তে করে মাথা দুলিয়েছে রানা। নাজমুল ওর দায়িত্ব ঠিক ভাবেই পালন করেছে।

নরম স্বরে জর্জ হ্যামিলটন বললেন, অ্যান্টার্কটিকায় কী ঘটেছে খুলে বলবে আমাকে?

মনে মনে কথাগুলো গুছিয়ে নিল রানা, তারপর বলতে শুরু করল। প্রথমে এল ফ্রেঞ্চ কমাণ্ডো, তারপর ব্রিটিশ এসএএস, শেষে হাজির হলো আইসিজি। দ্য শ্যাডোকে খুঁজে পেল ওরা। বাদ দিল না প্রাক্তন মেরিন মেজর রবিন কার্লটনের কথাও।

সব শুনবার পর থেকে চুপ হয়ে গেছেন জর্জ হ্যামিলটন, কী যেন ভাবছেন। থমথম করছে ব্রিজ, কেউ কিছু বলছে না।

আরেক চুমুক কফি নিল রানা। ব্রিজের পিছনে প্যানোরামিক জানালা, ওদিক দিয়ে দূরে চোখ গেল ওর। স্টার্নের ডেকে মস্ত এক কালো গর্ত। দ্য শ্যাডোর উপর ওখানে পড়েছিল মিসাইল। পুড়ে কালো হয়ে গেছে ধাতব ডেক, এখানে ওখানে ঝুলছে তার ও কেবল।

ডেকের দুরবস্থার জন্য নুমা চিফের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেছে। রানা! অখুশি মনে হয়নি ভদ্রলোককে। অ্যাডমিরাল চাক হিউবার্ট জোর করে তার জাহাজ দখল করে নিয়েছিল। তারপর যখন হ্যামিলটন শুনলেন রানা এবং ওর দলের সবাইকে মেরে ফেলতে চেয়েছে আইসিজি, ওই অ্যাডমিরাল বা আইসিজির জন্য সামান্যতম করুণা আসেনি তাঁর মনে।

হেলিপ্যাডের গর্তটার দিকে চেয়ে আছে রানা। একটু আগে শেষ হওয়া মিশনের কথা আবারও ভাবতে শুরু করেছে। প্রিয় কয়েকজনকে হারাতে হয়েছে। খচখচ করছে ওর মন। ওদের তো এখানে আসবারই কথা ছিল না। আমেরিকাকে নেতৃত্ব দেয়া একদল বদমাসের জন্য সাদা মনের কয়েকজন মানুষ মারা গেল।

স্যর,ডাকল এক তরুণ রেডিয়ো-ম্যান।

একইসঙ্গে ওদিকে ঘুরে চাইলেন হ্যামিলটন ও রানা।

ব্রিজের সঙ্গে সংযুক্ত কমিউনিকেশন রুমে আলোকিত টেবিলের ওপাশ থেকে বলে উঠেছে তরুণ: স্যর, অদ্ভুত একটা তার পেলাম।

কে এবং কী লিখেছে? ওদিকে পা বাড়ালেন হ্যামিলটন, পাশে রানা। আলোকিত টেবিলের সামনে গিয়ে থামল ওরা।

কোনও জিপিএস ট্র্যান্সপণ্ডার সিগনাল, স্যর, বুলল তরুণ। অ্যান্টার্কটিকার একেবারে তীর থেকে আসছে। মেরিন কোড সিগনাল, স্যর।

একটু সামনে ঝুঁকে গেল রানা। আলোকিত টেবিলের উপর কমপিউটার-জেনারেটেড ম্যাপ। একটা লাল বিন্দু টিপটিপ করছে উপকূলের কাছে। পাশে লেখা: ০২।

ভুরু কুঁচকে গেল রানার। ওর মনে পড়ছে, পরিত্যক্ত লিটল আমেরিকা-৪ স্টেশনের কাছে নিজের ন্যাভিস্টার গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম ট্রান্সপণ্ডার চালু করেছিল। দলের নেতা হিসাবে ওর জিপিএস ট্র্যান্সপণ্ডারের কোড ছিল ০১। দবির ছিল ০৫। এক সেকেণ্ড পর রানা মনে পড়ল ওই কোড ০২ কার জিপিএস ট্রান্সপণ্ডার।

মিস্টার হ্যামিলটন, উত্তেজিত স্বরে বলল রান। আমার সেকেণ্ড ইন কমাণ্ড নিশাত সুলতানা বেঁচে আছে!

.

পুবে সূর্যোদয়ের দিকে ছুটে চলেছে দ্য অরিগন।

রানার বক্তব্য শুনে ম্যাকমার্ডো স্টেশনে যোগাযোগ করেছেন নুমা চিফ জর্জ হ্যামিলটন। ওই স্টেশনে তার বিশ্বস্ত মেরিন দল রয়েছে, দেরি না করে তারা একটা প্যাট্রল বোট নিয়ে উপকূলে চলে গেছে নিশাত সুলতানাকে তুলে নেয়ার জন্য।

তার পর দিন প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশ করল দ্য অরিগন। প্যাট্রল বোট থেকে একটা কল পেল রানা। তারা উপকূল থেকে সামান্য দূরে এক আইসবার্গের উপর পুরনো এক স্টেশনে নিশাতকে পেয়েছে। এই দলের সবার পরনে ছিল এয়ারটাইট রেডিয়েশন সুট।

প্যাট্রল বোটের স্কিপার আরও জানাল, নিশাত সুলতানা প্রচণ্ড হাইপোথারমিয়ায় ভুগছে। সামান্য রেডিয়েশনও লেগেছে। তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে।

কথাগুলো শুনছে রানা, এমন সময় তীক্ষ্ণ চিঙ্কার শুনতে পেল। ওদিকে ক্ষেপে উঠেছে কেউ। এক সেকেণ্ড পর কণ্ঠ চিনতে পারল রানা।

কার সঙ্গে কথা বলছেন? মাসুদ রানা? আপনার মাইক্রোফোন আর মাইক দিন?

পাঁচ সেকেও পর লাইনে এল নিশাত।

রানা সুস্থ আছে শুনে খুশিতে কেঁদে ফেলল সে।

রানা জানতে চাওয়ায় বলল, প্রথমে এলিভেটার শাফটে লুকিয়ে ছিল, তারপর চেতনা হারায়। ঘুম ভাঙে গুলির আওয়াজে। সিল টিম চিৎকার করে কথা বলছিল। তারপর শুনতে পেয়েছে কিং আর্থার ওরফে রন হিগিন্সের সঙ্গে রানার কথা। নিউক্লিয়ারটিপড ক্রুজ মিসাইল আসছে উইলকক্স আইস স্টেশন লক্ষ্য করে।

এরপর এলিভেটার শাফট থেকে বেরিয়ে এসেছে নিশাত, তখনও স্টেশনের ভিতর সিল টিম, কিন্তু মস্ত ঝুঁকি নিয়ে চলে গেছে পুল ডেকে। তার আগে স্টোররুম থেকে জোগাড় করেছে কয়েকটা ফ্লুইড ব্যাগ। পুল ডেকে পৌঁছবার পর পেয়ে গেল রাশেদ হাবিবের পুরনো স্কুবা গিয়ার। ওটা ড়ে ছিল পুলের ধারে। ট্যাঙ্কের সঙ্গে তখনও ভাল করেই জড়িয়ে রাখা ছিল কেবল।

ওই কেবল ও শেষ ব্রিটিশ সি স্লেড নিয়ে নেমে পড়ল পুলে। তার অনুসরণ করে একসময় পৌঁছে গেল এক মাইল দূরের লিটল আমেরিকা-৪-এ।

নিশাতের কথা শুনে হতবাক হয়ে গেছে রানা। কয়েক সেকেণ্ড পর বলল, আপা, এটা শুধু আপনার পক্ষেই সম্ভব।

এবার জানিয়ে দিল, ওদের দেখা হবে পার্ল হারবারে।

নিশাত বলল, আমি আসছি, স্যর!

আপনাকে কিন্তু ঘুমের কড়া ওষুধ দেয়া হয়েছে, ডাক্তারের আপত্তির কণ্ঠ এল। এভাবে না ঘুমালে…।

প্রায় ধমকে উঠল নিশাত, আমার ভাইকে খুঁজে পেয়েছি, এখন ঘুম হবে আমার? আপনি বোঝেন…

অবশ্য ডাক্তারের অনুরোধে, শেষপর্যন্ত রানার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লাইন কেটে দিল সে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *