২.২৩ কয়েক সেকেণ্ড পর যা ঘটল

কয়েক সেকেণ্ড পর যা ঘটল, তা অবিশ্বাস্য।

ছয় যুদ্ধ-বিমান বহরের নেতা ক্যাপ্টেন জন সিমন তার এফ২২-র ক্যানোপি দিয়ে সামনে চেয়ে আছে। সাগরের উপরের আকাশে ভোতা কমলা আলো। কালো এয়ারক্রাফটের টেইল থ্রাস্টার জ্বলজ্বল করছে।

জন সিমনের বিমানের ডানা থেকে রওনা হয়েছে বাষ্পের মত সাদা আগুন নিয়ে মিসাইল, চলেছে কালো ফাইটারের দিকে। এবার টার্গেটে গিয়ে লাগবে।

কিন্তু টলমল করে ওঠা আলোয় হঠাৎ করেই নীচে নামতে শুরু করল কালো বিমান। ওটার চারপাশে যেন ভাপ উঠছে। দুপুরের রোদে দূরের পাল্লা সড়কে এমন মরীচিকা দেখা যায়। পরক্ষণে হঠাৎ করেই হারিয়ে গেল কালো বিমানটা। যেন কোনও পর্দা নেমে এসে আড়াল করে দিয়েছে ওটাকে।

এক সেকেণ্ড পর দেখা গেল, ওই বিমান আর ওখানে নেই।

টার্গেট হারিয়ে পাগল হয়ে উঠেছে ক্যাপ্টেন সিমনের মিসাইল।

প্রথম টার্গেট হারিয়ে দ্বিতীয় টার্গেট খুঁজতে শুরু করেছে।

রানার দ্য শ্যাডোর সামনে ভাসছিল দুই এফ-২২-র একটা, সোজা গিয়ে ওটার টেইলপাইপের ভিতর সেঁধে গেল মিসাইল। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরিত হলো ফাইটার। অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশে চারপাশে ছিটকে গেল উজ্জ্বল কমলা আগুন।

থতমত খেল সিমন, হেডসেটে চিৎকার করে আলাপ শুরু করেছে অন্যান্য পাইলট।

..স্রেফ মিলিয়ে গেল।

কী করে…।

…গেল কই?

শালা হঠাৎ করে…

নিজের স্কোপ দেখল সিমন। রেইডারে কালো বিমান নেই। ওটা খুঁজতে শুরু করল তার চোখ। আকাশে কালো বিমানকে থাকতেই হবে। কোথায় গেল? কিন্তু কোথাও তো…

তারপর দেখতে পেল সে। 

অন্তত ভাবল, দেখতে পেয়েছে।

কমলা রঙের দূর-দিগন্তে মরীচিকার মত কী যেন দুলতে দুলতে হারিয়ে গেল। ওটা যেন ঘষে দেয়া কাচের লেন্স, দিগন্তের উপর। ওখানে বারবার বলকে উঠছে বাতাস।

নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না জন সিমন।

.

দ্য শ্যাডোর ভিতর এরই ভিতর একের পর এক সুইচ টিপতে শুরু করেছে মাসুদ রানা।

ওই মিসাইল ওকে শেষ করতে পারেনি। রেডিয়োতে শুনতে পেল পাইলটদের বক্তব্য। পাঁচ এফ-২২ ওকে দেখছে না। এবার সময় হয়েছে পাল্টা জবাব দেয়ার।

মিস্টার হাবিব, তিশাকে এখানে নিয়ে আসুন! লিলিকেও!

নুমা শিপ দ্য অরিগন মাত্র পঁচাশি নটিক্যাল মাইল দূরে। বারো মিনিট লাগবে ওখানে পৌঁছুতে।

ঝলমলে সবুজ আলোআসছে ডায়ালগুলো থেকে, কমলারঙা দূর-দিগন্তের দিকে চেয়ে আছে রানা। ক্লোকিং ডিভাইস অফ করে দিল। চালু করল অটোপাইলট। বড় করে শ্বাস ফেলল। ভেঁড়াছেড়া ভাবে মনে পড়ছে গত চব্বিশ ঘণ্টার সমস্ত ঘটনা।

প্রথমে এল ফ্রেঞ্চরা। তারপর ব্রিটিশ। এল আইসিজি। ওর নিজের লোক একে একে মরল। এমন এক মিশনে ওকে পাঠানো হলো, যা কখনও সফল হবার নয়। একের পর এক প্রিয় মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠছে। দবির, নিশাত আপা, মোরশেদ, হাক্সলে…।

এই মানুষগুলো মরল আমেরিকার জনা কয়েক ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের নীচতার কারণে। তাদের চাই এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়াল টেকনোলজি বন্ধু-শত্রু সবাইকে খুন করে হলেও।

বুকটা ভারী হয়ে উঠল রানার। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে বসে রইল, তারপর সামনে ঝুঁকে কয়েকটা সুইচ টিপল। স্ক্রিনে দপদপ করতে লাগল লেখা:

মিসাইল আমর্ড। টার্গেটিং.

আরেকটা সুইচ টিপল রানা।

ম্যানুয়াল টার্গেটিং সিলেক্টার।

স্ক্রিনে নিজ হাতে ঠিক করে দিল টার্গেট। জয়স্টিকের বাটন টিপে সিলেক্ট নিশ্চিত করল।

স্ক্রিনে আরও কয়েকটা অপশন এসেছে। ঠাণ্ডা মগজে নিজের পছন্দের অপশন সিলেক্ট করল রানা।

এবার টিপে দিল জয়স্টিকের ট্রিগার।

মিসাইল বে-র র‍্যাক ঘুরতে শুরু করেছে। এক সেকেণ্ড পর ষষ্ঠ মিসাইল নেমে গেল নীচের আকাশে চালু হয়ে গেছে থ্রাস্টার, কয়েক মুহূর্ত পর দূর-দিগন্তের আকাশে হারিয়ে গেল মিসাইল। সোজা উঠে চলেছে কালো মহাশূন্যের দিকে।

.

দক্ষিণ সাগরের মাঝে চুপ করে দুলছে নুমার জাহাজ দ্য অরিগন।

মাঝারি আকারের জাহাজ ওটা। দৈর্ঘ্য পাঁচ শ বিশ ফুট। জাহাজের মাঝে সুপারস্ট্রাকচার। নুমার টেকনিশিয়ানরা ওই অংশের নাম রেখেছে দ্বীপ। পিছনের ডেকে নামতে পারে দুটো কপ্টার। এমনিতে যে যার কাজে ব্যস্ত থাকে ডেক হ্যারা। কিন্তু আজ গোটা ডেক ফাঁকা। কোথাও কিছু নড়ছে না।

ভুতুড়ে মনে হচ্ছে জাহাজটাকে।

পিছনের হেলিপ্যাডে খুব ধীরে নামছে দ্য শ্যাডো। ডেকের দিকে আগুনের মত গরম গ্যাস ছুঁড়ছে আট রেট্রো। মাত্র এক মিনিটের মাথায় আলতো ভাবে হেলিপ্যাডে নেমে এল কালো যুদ্ধবিমান।

ক্যানোপির ভিতর দিয়ে চাইল রানা।

কোথাও কোনও নড়াচড়া নেই। যেন সবাই চলে গেছে জাহাজ ত্যাগ করে। দীর্ঘশ্বাস ফেলল রানা। এমনই হবে, ভেবেছিল।

ঠিক আছে, এবার নেমে পড়তে হবে, বলল।

রাশেদ হাবিব ও মেরি ককপিট থেকে বেরিয়ে গেল। তাদের পিছু নিয়েছে লিলি। রানা আগেই বলে দিয়েছে, তিশাকে নিয়ে নিজে নামবে।

ককপিট থেকে বেরিয়ে আসবার আগে, কাঁধে ঝুলন্ত স্যাচেল থেকে রুপালি একটা ক্যানিস্টার নিল রানা।

ওই ট্রাইটোনাল চার্জের টাইমার দশ মিনিটে স্থির করল, তারপর রেখে দিল পাইলটের সিটে। এবার পাজাকোলা করে তুলে নিল তিশাকে, ককপিট থেকে বেরিয়ে এল মিসাইল বে-তে। সাবধানে দ্য শ্যাডো থেকে নেমে পড়ল।

জাহাজের ডেকে ওরা এই কজন ছাড়া কেউ নেই।

ম্লান কমলা গোধূলীর আলোয় কালো বিমানের সামনে দাঁড়িয়ে ওরা। ওদের সঙ্গে যারা উইলকক্স আইস স্টেশনে গিয়েছিল, তাদের কেউ আর নেই।

নাক নিচু করে চেয়ে আছে বিশাল শিকারি পাখির মত দ্য শ্যাডো। কালো ডানা নীচের দিকে নেমে এসেছে। অ্যান্টার্কটিকার ম্লান আলোয় একবার ওটার দিকে চাইল রানা, তারপর দীর্ঘশ্বাস চেপে সবাইকে হাতের ইশারা করল। সুপারস্ট্রাকারের দিকে হাঁটতে শুরু করল মেরি ও হাবিব। তিশাকে বুকে তুলে সাবধানে চলেছে রানা। সবার পিছনে থপথপ করে আসছে লিলি, এদিক ওদিক চেয়ে অবাক হয়ে দেখছে বিশাল জাহাজ।

প্রায় পৌঁছে গেল ওরা দ্বীপ নামের সুপারস্ট্রাকচারের পিছন অংশে। তখনই বড় একটা দরজা খুলে গেল, উজ্জ্বল আলো এসে পড়ল ডেকের উপর। একজন বেরিয়ে এসেছে। ছায়ার মত, তবুও বয়স্ক ভদ্রলোককে চিনতে দেরি হলো না রানার।

নুমার চিফ, অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল জর্জ হ্যামিলটন।

চার বছর আগে আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট তাঁকে নিজ ভাইস-প্রেসিডেন্ট করতে চেয়েছিলেন। নুমা ত্যাগ করতে রাজি হননি হ্যামিলটন।

রানা সামনে এসে দাঁড়াতেই ক্লান্ত হাসলেন তিনি। তোমাকে নিয়ে আলাপ করছে অনেকে।

ভুরু কুঁচকে গেল রানার। এমন শীতল অভ্যর্থনা আশা করেনি। সাধারণত ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেন হ্যামিলটন। বলেন, মাই বয়, কেমন চলছে?

জাহাজের আর সবাই কোথায়, অ্যাডমিরাল? জানতে চাইল রানা।

ওদেরকে ওরা… বলতে শুরু করেও থেমে গেলেন হ্যামিলটন। হঠাৎ দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসেছে এক লোক। অ্যাডমিরালকে ঘষা দিয়ে রানার সামনে গিয়ে দাড়াল।

এই লোককে আগে কখনও দেখেনি রানা। মাথা ভরা পাকা চুল, সাদা গোঁফ, ঢালের মত বুক। লোকটার পরনে নেভির নীল ইউনিফর্ম। বুক পকেটের উপর অসংখ্য মেডেল। লোকটার বয়স হবে ষাট মত, আন্দাজ করল রানা।

ও, তা হলে এই সেই মাসুদ রানা, বিধ্বস্ত যুবককে আপাদমস্তক দেখল সে। দুহাতের ভাঁজে তিশাকে রেখেছে রানা।

রানা, আড়ষ্ট স্বরে বললেন হ্যামিলটন, ইনি অ্যাডমিরাল চাক হিউবার্ট, জয়েন্ট চিফস অভ স্টাফে নেভির রিপ্রেযেন্টেটিভ। চারঘণ্টা আগে জাহাজের কমাণ্ড নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। থমথম করছে হ্যামিলটনের মুখ।

নিঃশব্দে শ্বাস ফেলল রানা।

জয়েন্ট চিফস অভ স্টাফ, অ্যাডমিরাল ভাল।

আইসিজি সম্পর্কে যা বুঝেছে, ওই সংগঠনের মাথা বা মগজ বলতে জয়েন্ট চিফস। ও এখন চেয়ে আছে আইসিজির এক প্রধান হর্তাকর্তার দিকে।

ঠিক আছে! গলা উঁচু করল অ্যাডমিরাল চাক হিউবার্ট, এবার বেরিয়ে এসো তোমরা!

পরক্ষণে হুড়মুড় করে সুপারস্ট্রাকচারের ভিতর থেকে বেরিয়ে এল একদল লোক। পরনে তাদের নীল কভারল, হাতে উদ্যত অস্ত্র। দ্রুত চলে গেল তারা দ্য শ্যাডোর সামনে, ঘিরে ফেলল।

কড়া চোখে রানাকে দেখল অ্যাডমিরাল হিউবার্ট। দেখা যাচ্ছে এই মিশন সময়ের পুরোপুরি অপচয় নয়। আপনার সঙ্গে এফ-২২-র ডগফাইটের কমেন্টারি শুনেছি। ক্লোকিং ডিভাইস, না? ভালই! বিনিময়ে আপনাদেরকে সহজ মৃত্যু উপহার দেয়া হবে।

পিছনের ডেকের দিকে চাইল রানা। নীল কভারল পরা লোকগুলোর কয়েকজন উঠে গেছে দ্য শ্যাডোর ভিতরে।

মিস্টার হ্যামিলটন, বলল রানা, আমার সঙ্গের এই মেয়েটি গুরুতরভাবে আহত।

আস্তে করে মাথা দোলালেন নুমা চিফ। গলা সামান্য উঁচু করে বললেন, ডেক হ্যাণ্ড, মেয়েটিকে ইনফারমারিতে নিয়ে যাও।

দরজার ওপাশ থেকে এল এক তরুণ নুমা হ্যাণ্ড, রানার হাত, থেকে সাবধানে তুলে নিল তিশাকে, চলে গেল সুপারস্ট্রাকচারের ভিতর।

মেরি ও হাবিবের দিকে চাইল রানা। আপনারা ওর সঙ্গে যান। লিলিকেও নেবেন।

আস্তে করে মাথা ঝাঁকাল হাবিব, মেরিকে নিয়ে ঢুকে পড়ল দ্বীপের বুকে। দরজা পেরুনোর সময় একটু ইতস্তত করল লিলি, তারপর থপথপ আওয়াজ তুলে চলে গেল। নিজেও ওদিকে পা বাড়াল রানা, কিন্তু তখনই দ্য শ্যাডোর নীচ থেকে চিৎকার শোনা গেল।

অ্যাডমিরাল! হেঁড়ে গলায় ডাক দিয়েছে নীল কভারল পরা এক লোক। আঙুল তুলে কালো বিমান দেখাল সে।

কী? দ্রুত পায়ে বিমানের দিকে চলেছে চাক হিউবার্ট।

তার অনুচরের হাতে ট্রাইটোনাল ৮০/২০ চার্জ। ওটা পাইলট সিটে ফেলে এসেছিল রানা। কভারল পরা লোকটার সামনে পৌঁছে গেল অ্যাডমিরাল, মনে হলো না ওই বোমা দেখে বিচলিত হয়েছে। পঞ্চাশ গজ দূরে দাঁড়িয়ে আছে রানা, ওর দিকে ঘুরে চাইল সে। প্রমাণ নষ্ট করতে চাও, না?

লোকটার হাত থেকে চার্জ নিল অ্যাডমিরাল, প্রেসারাইযড ঢাকনি খুলল, শান্ত ভঙ্গিতে ডিজআর্ম সুইচ টিপে দিল।

রানার দিকে চেয়ে হাসল। বহুবার জিতেছ, মাসুদ রানা, অনেক মানুষ মেরেছ, কিন্তু আমাকে হারানো এত সহজ নয়।

কালো বিমানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে অ্যাডমিরাল। নিষ্পলক চেয়ে রইল রানা। স্যর, আপনার জাহাজের ডেক নষ্ট করার জন্য দুঃখিত, নিচু স্বরে বলল জর্জ হ্যামিলটনকে।

গভীর ভাবে চিন্তা করছিলেন নুমা চিফ, জানতে চাইলেন, কী যেন বললে, মাই বয়?

জবাব দিল না রানা। ঠিক তখনই তীক্ষ্ণ একটা আওয়াজ শুরু হলো। পরক্ষণে কেউ বুঝবার আগেই দশগুণ বেড়ে গেল আওয়াজ। যেন দুনিয়ার বুকে ভয়ঙ্কর কোনও বজ্র পাঠিয়েছেন। স্বয়ং স্রষ্টা। এর এক সেকেণ্ড পর দ্য শ্যাডোর ষষ্ঠ মিসাইল আকাশ চিরে চার শ মাইল বেগে নেমে এল।

ফেটে পড়ল কালো বিমান, চারপাশে ছিটকে গেল লক্ষ টুকরো। ওটার উপর ওঠা লোক, বা দশ গজের ভিতর যারা ছিল, মুহূর্তে মারা গেল সবাই। দ্বিতীয় বিস্ফোরণ হলো বিমানের ফিউয়েল ট্যাঙ্কের কারণে। লাল আগুনের মস্ত বল উঠে গেল আকাশে। নানাদিকে ছুটতে লাগল আগুনের গোলা। মনে হলো খপ করে গিলে ফেলল অ্যাডমিরাল চাক হিউবার্টকে। আগুনের তাপ এতই বেশি, মুহূর্তে পুড়ে গেল লোকটার সারাশরীরের চামড়া।

মুরগির কাবারের মত ভাজা ভাজা হয়ে ডেকের উপর আছড়ে পড়ল লোকটা, তার আগেই মারা পড়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *