২.২২ বহু নীচে সাগর রেখে

বহু নীচে সাগর রেখে ছুটে চলেছে দ্য শ্যাডো, নাক তাক করেছে উত্তরদিকে। চারপাশে কুচকুচে আঁধার, বহু দূর-দিগন্তে আবছা কমলা আলো। প্রকাণ্ড ব্যাঙের ছাতার মত মেঘ পিছন দিগন্তে ফেলে এসেছে রানা।

কিছুক্ষণ পর অটোপাইলট বাটন পেল, ওটা এনগেজ করে মিসাইল বে-তে ফিরল তিশার খবর নেয়ার জন্য।

ও কেমন আছে? জানতে চাইল রাশেদ হাবিবের কাছে। মেঝেতে শুয়ে আছে তিশা, ভীষণ ফ্যাকাসে মুখ। জলপাইয়ের মত ত্বকের রং কেমন ম্লান। চোখ বুজে আছে।

অনেক রক্ত হারিয়েছে, বলল হাবিব। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া জরুরি।

ঠিক তখন চোখ মেলল তিশা। আস্তে করে বলল, আমরা জিতলাম তো?

অবাক চোখে ওকে দেখল রানা ও হাবিব।

মৃদু হাসল রানা, হ্যাঁ, আমরাই জিতেছি, তিশা। কেমন বোধ করছ?

ভয়ঙ্কর খারাপ, স্যর, আবারও চোখ বুজে ফেলল তিশা।

চাপা শ্বাস ফেলল রানা। ভাবতে শুরু করেছে কোথায় যাবে। সবচেয়ে ভাল হয় কোনও জাহাজে নামতে পারলে। সেক্ষেত্রে…

হা… সাগরের ওদিকে কোথাও আছে নুমার জাহাজ। ওখানে থাকবেন নুমা চিফ জর্জ হ্যামিলটন। ওখানে ওদের কোনও বিপদ হবে না।

ঘুরে ককপিটের দিকে রওনা হবে, এমন সময় তিশার বুক পকেটে ডায়েরি দেখল রানা।ওটা অর্ধেক বেরিয়ে আছে।

ওটা নিল ও, দ্রুত ফিরে এল ককপিটে। দেরি না করে বসল পাইলটের সিটে। দ্য শ্যাডোর রেডিয়ো চালু করল। নুমা ভেসেল। নুমা ভেসেল। মাসুদ রানা… মাসুদ রানা বলছি। ডু ইউ কপি?

অন্য দিক থেকে কোনও সাড়া নেই।

আবারও রেডিয়ো করল রানা। কোনও জবাব এল না। ডায়েরির উপর চোখ পড়ল ওর। ভাজের ভিতর কয়েকটা আলগা কাগজ। তিশা বোধহয় জরুরি কোনও কাগজ রেখেছে।

একটা পাতা বের করে চোখ বোলাল। ওখানে লেখা:

ডিজাইন প্যারামিটার্স ফর দ্য বি-৭এ দ্য শ্যাডো এই অ্যাটাক এয়ারক্রাফটের রয়েছে সম্পূর্ণ কনভেনশনাল এবং ইলেকট্রনিক ইনভিযিবিলিটির ক্ষমতা। এটি রেট্রোগ্রেড থ্রাস্টার সিস্টেম ব্যবহার করে, অর্থাৎ এসটিভিএল। রয়েছে মালটিপল-লঞ্চ বিভিআর মিডিয়াম-টু-লং-রেঞ্জ (২৫০ এনএম) এয়ার-টু-এয়ার/এয়ার-টু-গ্রাউণ্ড মিসাইল। ঊনিশ শ সাতাত্তর সালের প্রথম দিন এই যুদ্ধ-বিমানের জন্য ২৫৩-৭৭২-১ টেণ্ডারে যোগ দিয়েছে জেনারেল অ্যারোনটিক্স লিমিটেড এবং হাইটেক লিমিটেড।

পাতার নীচে সংক্ষিপ্ত অক্ষরগুলো লিখে দেয়া হয়েছে।

এসটিওভিএল অর্থাৎ, শর্টটেক-অফভার্টিকেল-ল্যাণ্ডিং। বিভিআর অর্থাৎ, বিঅণ্ড ভিশু্যয়াল রেঞ্জ।

বুঝতে দেরি হয়নি রানার, অনেক দূর থেকে মিসাইল পৌঁছবে টার্গেটে, এবং লক্ষ্যভেদ করতে কোনও অসুবিধাও থাকবে না। বিমান অদৃশ্য বলতে বোধহয় রেইডার এই বিমানকে কখনও ধরবে না।

ভুরু কুঁচকে গেল রানার। আবার পড়ল প্রথম লাইন। কনভেনশনাল ইনভিসিবিলিটি বলতে কী বোঝাতে চাইছে?

পরের কাগজে চোখ বোলাল। মনে হলো হাইটেক লিমিটেডের টেণ্ডার পেপার। ওখানে লেখা:

হাইটেক লিমিটেডের দেয়া বিশেষ কিছু সুবিধা
মাঠ পর্যায়ে হাইটেক লিমিটেডের বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, রেইডার থেকে অদৃশ্য হওয়ার জন্য নানা কাজ করা যেতে পারে। রেইডার ধরতে পারে না এমন রং ব্যবহার করা যেতে পারে। এফ-১১৭এ স্টেলথ ফাইটারের মত খাড়া ফিউজেলাজ তৈরি সম্ভব। রেইডার ক্রস-সেকশন কমিয়ে আনা যায়। কিন্তু কনভেনশনাল ইনভিযিবিলিটি অর্জন এখনও পর্যন্ত অসম্ভব। কিন্তু ঠিক তাই করবে যুদ্ধবিমান বি-৭এ দ্য শ্যাডো।
হাইটেক লিমিটেড এমনই একটি সিস্টেম তৈরি করেছে। ওই ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড সম্পূর্ণ আড়াল দেবে বিমানকে। মানুষ দেখবে না কিছুই। ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড পাল্টে দেবে বিমানের চারপাশের মলিকিউয়াল স্ট্রাকচার, অর্থাৎ নির্দিষ্ট আলোর কারণে নকল দৃশ্য দেখবে সবাই। একইসঙ্গে এই বিমান এড়িয়ে যাবে রেইডার তরঙ্গকে। শুধু তাই নয়, এই বিমান…

চমকে গেছে রানা, চোখ সরু করে পড়তে শুরু করেছে। কিছুক্ষণ পর যা খুঁজছে, পেয়ে গেল।

হাইটেক ওটার নাম দিয়েছে, ক্লোকিং ডিভাইস।

এই সিস্টেম ব্যবহার করলে বিমান থাকবে রেইডারের আওতার বাইরে, একইসঙ্গে কেউ দেখবে না এই বিমানকে উড়তে। এতদিন ধরে শত্রু রেইডার ফাঁকি দিয়েছে স্টেলথ বিমান, কিন্তু লোকের চোখ এড়াতে পারেনি। চল্লিশ মাইল দূর থেকেও বিলিয়ন ডলারের স্টেলথ অ্যাওয়্যাক্স দেখা যায় বাড়ির জানালা দিয়েও।

কিন্তু এই বিমান সব উল্টে দেবে। নকল আলো বেরুবে এটা থেকে, পরিষ্কার আকাশ দেখবে মানুষ, কিন্তু পাইলট তখন চোখের সামনে দিয়ে চলেছে নিজের মিশনে।

বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে রানার। কিন্তু মনের গভীরে টের পেল, এই অদ্ভুত ঘটনা ঘটতেও পারে। অত্যন্ত জোর দিয়ে লেখা হয়েছে টেণ্ডারে।

রেফ্র্যাকশন, মনে মনে বলল রানা। ফিশবাউলে এমন দেখা যায়। আলো ওখানে পড়ে অন্যরকম হয়ে যায়। এটা হয় কারণ

ওই পানির চেয়ে বাতাস অনেক হালকা। বিকৃত হয় আলল, দেখা যায় মাছ আছে অন্য জায়গায়।

কিন্তু বাতাসে রেফ্র্যাকশন?

হয়তো সম্ভব। ভারী বাতাসকে আর্টিফিশিয়ালি ইলেকট্রিসিটি দিয়ে বদলে দেয়া হবে।

কিন্তু করবে কীভাবে?

নিশ্চয়ই কোনও কৌশল বের করেছে।

তারপর ওর মনে পড়ল প্লুটোনিয়াম কোরের কথা।

এই নতুন বৈপ্লবিক সিস্টেমে নিউক্লিয়ার মলিকিউল দিয়ে পাল্টে দেয়া হবে বাতাস?

পরের প্যারাগ্রাফ পড়তে শুরু করল রানা। ওর মনে হলো সরকারী টেণ্ডার জিতে নেয়ার জন্য কথাগুলো লেখা হয়েছে:

এটা মেনে নিতে হবে, দ্য শ্যাডোর ক্লোকিং সিস্টেম ব্যবহার করতে বিপুল পরিমাণ নিজ পাওয়ার লাগবে। জেনারেল অ্যারোনটিক্স লিমিটেড ও হাইটেক লিমিটেডের পরীক্ষায় দেখা গেছে, ছুটন্ত বিমানের চারপাশের বাতাস বদলে নেয়ার জন্য প্রয়োজন দুই দশমিক একাত্তর গেগাওয়াট ইলেকট্রোম্যাগনেটিক এনার্জি। এটা পাওয়া সম্ভব শুধু নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক রিয়্যাকশন থেকে। এই কারণে…

নিচু সুরে শিস বাজাল রানা। জেনারেল অ্যারোনটিক্স আর হাইটেক ইউএস এয়ার ফোর্সের জন্য যে বিমান দিতে চেয়েছে, ওটার ভিতর থাকবে নিউক্লিয়ার রিয়্যাক্টর। কোনও সন্দেহ নেই বিমানটা তৈরি করেছে অ্যান্টার্কটিকায় গিয়ে।

ডকুমেন্টেশন নামিয়ে রাখল ও, আবারও রেডিয়ো চালু করল।

নুমা শিপ… নুমা শিপ… মাসুদ রানা বলছি। রিপিট করছি, . নুমা শিপ, আমি মাসুদ রানা। দয়া করে…

হঠাৎ করেই ককপিট রেডিয়োতে ভেসে এল একটা কর্কশ কণ্ঠ: আনআইডেন্টিফায়েড এয়ারক্রাফট, আপনি বলছেন নিজের নাম মাসুদ রানা। ধরে নিচ্ছি আপনি ওই বিমানের পাইলট। আমি গোল্ডেন লিডার, ইউএস এয়ার ফোর্স।

রেইডার স্ক্রিনে চাইল রানা। অ্যান্টার্কটিকার উপকূল থেকে প্রায় দুই শ নটিকাল মাইল সরে এসেছে, কিন্তু রেইডার স্ক্রিনে কিছুই নেই।

চমকে গেছে রানা, দূরের ওই বিমান স্টেলথ মোড অপারেট করছে।

গোল্ডেন লিডার; আমি ইউএস এয়ার ফোর্সের আনমার্কড প্রোটোটাইপ ফাইটার-বম্বার নিয়ে উড়ছি। কারও ক্ষতি করব না।

ক্যানোপির বামদিকে চোখ পড়ল ওর। দিগন্তে ছয়টি বিন্দু ভাসছে।

আনআইডেনটিফায়েড এয়ারক্রাফট, আপনি আমাদের এস্কোর্টে ফিরবেন ইউএস নেভি ক্যারিয়ার লিংকনে, ওখানে নামবেন আপনি।

গোল্ডেন লিডার, আমি আপনাদের এস্কোর্ট চাইছি না, বলল। রানা। আমি…

আনআইডেনটিফায়েড এয়ারক্রাফট, সেক্ষেত্রে আমরা মিসাইল ছুঁড়তে বাধ্য হব।

এক সেকেণ্ড দ্বিধা করল রানা, তারপর বলল, গোল্ডেন লিডার, নিজেকে আইডেন্টিফাই করুন।

কী বললেন? ত্যাড়া স্বরে বলল লোকটা।

আপনার নাম কী, গোল্ডেন লিডার?

আমার নাম ক্যাপ্টেন জন সিমন, ইউনাইটেড স্টেটস এয়ার ফোর্স। এবং হুকুম করছি: আপনি এখনই আত্মসমর্পণ করুন। আমরা আপনাকে ঘিরে ফেলছি।

সিমন, ভাবল রানা। পকেট থেকে কাগজ বের করল। দ্রুত চোখ বোলাতে শুরু করেছে। চোখ আটকে গেল ওর শেষের লাইনে:

জন সিমন।

ইউএসএএফ। ক্যাপ্টেন।?

এটা কি আইসিজিদের কনভেনশন?

বুকের ভিতর হিম হয়ে এল রানার।

আর ঠিক তখনই ছয়টি এফ-২২ ফাইটার বিমান চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলল ওকে। দুটো সামনে, দুটো দুপাশে, পিছনে দুটো। যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রাখছে। আন্দাজ দুই শ গজ সরে চলছে সমান্তরালে। রানার রেইডার স্ক্রিনে কোনও ফোঁটা নেই, কিন্তু নিজ চোখে দেখছে ওগুলোকে।

কয়েক সেকেণ্ড পর তীক্ষ্ণ গুঞ্জন এল ককপিট স্পিকার থেকে। একটা এফ-২২ ওর উপর মিসাইল লক করেছে। আপনি কি চান, ক্যাপ্টেন সিমন? জানতে চাইল রানা।

আমাদের কাজ আপনাকে নিরাপদে ইউনাইটেড স্টেটস ক্যারিয়ার লিংকনে পৌঁছে দেয়া।

আপনি কি মিসাইল ছুঁড়বেন?

আমাদের কাজ আরও কঠিন করে তুলবেন না, মিস্টার রানা।

জানতে পারি কেন মিসাইল লক করলেন?

বাধ্য হলে মিসাইল ছুঁড়ব আমরা। কর্কশভাবে হাসছে লোকটা। আপনি শেষ, মাসুদ রানা।

রানার চোখ ফিরল ডিসপ্লের উপর। তিন সেকেণ্ড পর-টিপে দিল ক্লোক মোড।

মনে মনে বলল, আমাদের হারাবার কিছুই নেই।

মাত্র এক সেকেণ্ড পর দুই শ গজ পিছনে একটা এফ-২২, যুদ্ধ-বিমান উগরে দিল মিসাইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *