২.২১ নিনা অস্টিনের বুক থেকে

নিনা অস্টিনের বুক থেকে ফোয়ারার মত রক্ত ছিটকে বেরুতে দেখেছে রানা। কাঁচাগোল্লা হয়ে গেছে মেয়েটার দুই বিস্ফারিত চোখ, হাঁটু ভেঙে ধুপ করে বসল, ওখান থেকে মেঝেতে শুয়ে পড়ল, মৃত।

ডেযার্ট ঈগলের নল থেকে এখনও ধোঁয়া বেরুচ্ছে, রানার ঊরুতে ঝুলন্ত হোলস্টারে পিস্তলটা রেখে দিল তিশা। অস্ত্র বের করবার সুযোগ হয়নি রানার, কিন্তু সুযোগ ছিল তিশার, হাঁটু গেড়ে বসে আছে ও। 

অবাক হয়ে দৃশ্যটা দেখছে মেরি, হাঁ হয়ে গেছে মুখ। চট করে ওর পাশে চলে গেল রানা, নরম স্বরে বলর, ঠিক আছ তো? তোমার মা…

ও আমার মা ছিল না, বড় শান্ত স্বরে বলল মেরি।

আমরা না হয় এ নিয়ে পরে আলাপ করব? বলল রানা। বাইশ মিনিট পর গোটা এলাকা হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে।

আস্তে করে মাথা দোলাল মেরি।

মিস্টার হাবিব, বলল রানা, চারপাশের দেয়াল থরথর করে কাঁপতে দেখছে। জানেন কী ঘটছে?

না, বুঝতে পারছি না, বলল রাশেদ হাবিব।

কথাটা মাত্র শেষ করেছে, হঠাৎ কাত হয়ে গেল সুড়ঙ্গ, ডেবে গেল দশ ইঞ্চি।

মনে হচ্ছে মেইন ল্যাণ্ড থেকে খসে পড়েছে আইস শেলফ, বলল হাবিব। এটা আইসবার্গ হয়ে উঠেছে।

আইসবার্গ… বিড়বিড় করল রানা। মগজ খাটাতে শুরু করেছে। কয়েক সেকেণ্ড পর হাবিবের দিকে চাইল। সিলগুলো এখনও রয়ে গেছে গুহার ভিতর? .,

ফাটলের ভিতর দিয়ে উঁকি দিল হাবিব। কয়েক সেকেণ্ড পর বলল, না, নেই। পালিয়েছে।

আবার তিশার সামনে থামল রানা, পাঁজাকোলা করে মেয়েটিতে তুলে নিল, চলে এল ফাটলের সামনে। আমি ধারণা করেছি ওরা থাকবে না। পালের সর্দার মরেছে। ওরা এখন তাকে খুঁজতে গেছে। …

আমরা এখান থেকে বেরুব কী করে? জানতে চাইল হাবিব।

ফাটল দিয়ে তিশাকে বাইরে ঠেলে দিল রানা, মুখ ফেরাল রাশেদ হাবিবের দিকে। চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে।

আমরা উড়ে বেরুব। মেরি, এসো, এবার বেরুতে হবে।

মেরি চলে আসতেই ওকে ফাটলের কাছে তুলে ধরল রানা।

মেয়েটা ওদিকে চলে যেতেই এবার প্রধান গুহায় উঠল হাবিব। সবার শেষে রানা।

বিশাল, কালো বিমান রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে আছে পাত্তালগুহার মাঝে। নীচে নেমেছে ঈগলের চঞ্চুর মত ওটার নাক। পিছনে কনকর্ডের ডানার মত সংযুক্ত ডানা। গুহার ছাত থেকে পড়ছে বরফ-খণ্ড, ফিউজেলাজে পড়ে নানা দিকে ছিটকে যাচ্ছে।

মেরি ও রাশেদ হাবিবকে এগুতে ইশারা করেছে রানা, নিজে তিশাকে দুই হাতে তুলে পিছু নিয়েছে। থরথর করে কাঁপছে মেঝে। দুই মিনিট পেরুবার আগেই কালো বিমানের পেটের নীচে পৌঁছে গেল ওরা।

তিশা আঙুল তুলে কিপ্যাড দেখিয়ে দিল। এই যে কিপ্যাড।

সবুজ রঙে জ্বলজ্বল করছে এন্ট্রি কোড স্ক্রিন:

২৪১৫৭৮১৭——–

এণ্টার অথারাইযড এন্ট্রি কোড

তোমরা কেউ কোড বুক পেয়েছ? তিশাকে প্রশ্ন করল রানা।

না, কোড ভাঙার চেষ্টা করছিল নিনা অস্টিন, কিন্তু মনে হলো জানে না কিছুই।

তার মানে কোড আমরা জানি না, বলল রানা।

না, জানি না, সায় দিল তিশা।

এখন? বলল রাশেদ হাবিব।

রানার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে মেরি, চোখ রেখেছে স্ক্রিনে। কয়েক সেকেণ্ড পর বলে উঠল, আরে, এটা তো ফিবোনাচ্চি নাম্বার।

কী নাম্বার? একই সময়ে জানতে চাইল রানা ও তিশা।

গম্ভীর মুখে কাঁধ ঝাঁকাল মেরি ভিসার। ২৪১৫৭৮১৭। এটা ফিবোনাচ্চি নাম্বার।

সেটা কী? জানতে চাইল রানা।

ফিবোনাচ্চি এক ধরনের সিকোয়েন্সের নাম্বার, বলল মেরি। এই সিকোয়েন্সে প্রতিটা সংখ্যা হয় আগের দুটো সংখ্যার যোগ ফল। অবাক চোখে ওকে দেখছে অন্যরা। আমার বাবা আমাকে শিখিয়েছিলেন। কারও কাছে কলম আর কাগজ আছে?

হ্যাঙারে পাওয়া ডায়েরি পকেট থেকে বের করে দিল তিশা। হাবিবের কাছে কলম আছে। প্রথমে ওটা থেকে কালো রঙের পানি বেরুল, তারপর কাজ করতে লাগল কালি। ডায়েরিতে সংখ্যা লিখতে শুরু করেছে মেরি।

কাজের ফাঁকে বলল, এই সিকোয়েন্স হয় এরকম: ০, ১, ১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩। এভাবে বাড়তে থাকে সংখ্যা। আগের দুটো সংখ্যা যোগ দিয়ে বের হয় তৃতীয় সংখ্যা। তারপর দ্বিতীয় আর তৃতীয় সংখ্যা থেকে বের হয় চতুর্থ সংখ্যা। দাড়ান, কোড বের করতে আমার একমিনিট লাগবে… অঙ্ক কষতে শুরু করেছে মেধাবী মেয়েটি।

রানা একবার দেখে নিল ঘড়ি: ১০:৪০

আর মাত্র বিশ মিনিট, তারপর আসছে নিউক্লিয়ার মিসাইল।

ডায়েরিতে হিসাব কষছে মেরি। রানাকে হাবিব বলল, আপনি এখান থেকে বিমান নিয়ে বেরুবেন কী করে?

আনমনে বলল রানা, ওদিকের পুকুরের ভিতর দিয়ে। তার আগে গুহার আকাশে ভেসে উঠতে হবে।

কী বললেন? অবাক চোখে রানাকে দেখল হাবিব।

কিন্তু এখন আর তার দিকে মন নেই রানার। মেরির হাতের ডায়েরি দেখছে। সংখ্যাগুলো পড়তে শুরু করেছে:

০, ১, ১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩, ২১, ৩৪, ৫৫, ৮৯, ১১৪, ২৩৩, ৩৭৭, ৬১০, ৯৮৭, ১,৫৯৭, ২,৫৮৪, ৪,১৮১, ৬,৭৬৫, ১০,৯৪৬, ১৭,৭১১, ২৮,৬৫৭, ৪৬,৩৬৭, ৭৫,০২৫, ১,২১,৩৯৩, ১,৯৬,৪১৮, ৩,১৭,৮১১, ৫,১৪,২২৯, ৮,৩২,০৪০, ১৩,৪৬,২৬৯, ৩৫,২৪,৫৭৮, ৫৭,০২,৮৮৭, ৯২,২৭,৪৬৫, ১,৪৯,৩০,৩৫২, ২,৪১,৫৭,৮১৭

তা হলে আমরা পেলাম আপনার এই সংখ্যা, ক্লাস টিচারের মত ভঙ্গি করে বলল মেরি: ২,৪১,৫৭,৮১৭।

সিকোয়েন্সের শেষের অন্য সব সংখ্যা? জানতে চাইল রানা। আবারও অঙ্ক কষতে শুরু করল মেরি। ৩,৯০,৮৮,১৬৯, ৬,৩২,৪৫,৯৮৬… কিছুক্ষণ পর নিশ্চিত কণ্ঠে বলল, হ্যাঁ, এটাই।

ডায়েরি নিল রানা, সংখ্যাগুলোর দিকে চাইল। সবমিলে মোলোটা সংখ্যা। কিপ্যাডে মোলাটা শূন্যস্থান। কিপ্যাডের বাটন এবার টিপতে শুরু করল রানা। কাজটা শেষ হতেই স্ক্রিনে বিঈপ! আওয়াজ হলো।

স্ক্রিনে এখন চব্বিশটা সংখ্যা:

২৪১৫৭৮১৭৩৯০৮৮১৬৯৬৩২৪৫৯৮৬

এন্ট্রি কোড অ্যাকসেপটেড। ওপেনিং দ্য শ্যাডো

অদ্ভুত সুন্দর কালো বিমানের ভিতর থেকে ইলেকট্রনিক ভ্রম আওয়াজ হলো। রানা দেখতে পেল; বিমানের পেটের কাছ থেকে নেমে আসছে সরু এক সিঁড়ি।

চট করে মেরির কপালে চুমু দিল হাবিব, মৃদু হেসে বলল, কখনও ভাবিনি অঙ্ক আমার প্রাণ বাঁচাবে। জলদি চলো।

অন্য সবাই বিমানের পেটে উঠে যেতে তিশাকে নিয়ে উঠল রানা। চারপাশ দেখে নিল। এটা কোনও মিসাইল বে। দুটো ত্রিকোণ র‍্যাকের ভিতর ছয়টা মিসাইল। একেক র‍্যাকে তিনটে করে।

মিসাইল বের একপাশের মেঝেতে তিশাকে শুইয়ে দিল ও।

সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দেখল, বেকায়দা ভাবে থপথপ করে সিঁড়ি বেয়ে উঠেছে লিলি। পাশের দেয়ালে বাটন পেয়ে টিপে দিল রাশেদ হাবিব, নিঃশব্দে উঠে এল কালো সিঁড়ি। সামনে বেড়ে ককপিটের দিকে চলল রানা। তিশা, এই বিমানের নাম কী?

পিছনের মেঝে থেকে বলে উঠল তিশা, কণ্ঠে ব্যথার ছাপ: দ্য শ্যাডো। এটা স্টেলথ বিমান। কীভাবে লুকিয়ে থাকবে জানি, না। বোধহয় পুটোনিয়ামের কারণেই।

ককপিটে ঢুকে চমকে গেল রানা।

ককপিট যেন ভবিষ্যতের কোনও মহাকাশযানের। উনিশ শ ঊনআশি সালের বিমান, বুঝবার উপায় নেই। অবশ্য, যুদ্ধ-বিমান গত কয়েক দশকে খুব উন্নত হয়নি। হয়তো এক্সপেরিমেন্ট করতে গেলে হাজার হাজার কোটি টাকা লাগে বলেই। ডানদিকে একটা সিট। অন্যটা বামে এবং পিছনে। ওখানে বসবে রেইডার অপারেটার বা গানার। ককপিট বেশ ঝুঁকে আছে নীচের দিকে। গানারের দেড় ফুট নীচে পাইলটের সিট। ওখান থেকে চার পাশ পরিষ্কার দেখবে পাইলট।

দেরি না করে পাইলটের সিটে বসল রানা। ধুপ আওয়াজ শুনল। ছাত থেকে বড় এক খণ্ড বরফ পড়েছে ক্যানোপির উপর।

কন্সোলের দিকে চাইল রানা। চারটে কমপিউটার মনিটর, স্ট্যাণ্ডার্ড কন্ট্রোল জয়স্টিক, সামনে অসংখ্য বাটুন, ডায়াল ও ইণ্ডিকেটার।

ওর মনে হলো হাই-টেক কোনও জিগসও পাযলের ভিতর ঢুকেছে। ভয় পেয়ে গেল, বুঝতে পারছে এই জিনিস চালাতে পারবে না। শিখতে অনেক সময় লাগবে। আঠারো মিনিটে, তা সম্ভব নয়।

অবশ্য, দ্বিতীয়বার মনোযোগ দিয়ে কন্সোলের দিকে চেয়ে বুঝল, বসনিয়ায় যে হ্যারিয়ার নিয়ে আকাশে উঠত, ওটার সঙ্গে অনেক মিল আছে এই বিমানের কন্সোলের। মনে মনে বলল, মানুষ তৈরি করেছে এটা। একেবারে অন্য রকম হবে কেন?

ইগনিশন সুইচ খুঁজে নিতে মোলো সেকেণ্ড লাগল। বিমান চালু করতে চাইল, কিন্তু কিছুই ঘটল না।

ফিউয়েল ফিড, বিড়বিড় করে বলল রানা। ফিউয়েল ফিড পাম্প করতে হবে।

ফিউয়েল ফিড বাটন খুঁজতে শুরু করেছে রানা। কয়েক সেকেণ্ড পর পেয়েও গেল। পাম্প করল ওটা! এবার ইগনিশন সুইচ আবারও টিপল।

কিছুই ঘটছে না।

তারপর হঠাৎ করেই বিকট ভ্রুমমমম আওয়াজ শুরু হলো।

দ্য শ্যাডোর দুই টারবাইন ইঞ্জিন গর্জে উঠেছে। রক্তে অ্যাড্রেনালিনের বান টের পেল রানা। ওর মনে হলো, জেট ইঞ্জিনের আওয়াজ আগে কখনও শোনেনি।

ইঞ্জিন রেভ করতে শুরু করল। খুব দ্রুত তপ্ত করে তুলতে হবে ইঞ্জিনগুলোকে।

আর সময় নেই।

হাত-ঘড়ি দেখল: ১০:৪৫

ইঞ্জিন গরম করছে। সাধারণত বিশ মিনিট সময় দিতে হয়, কিন্তু দ্য শ্যাডোর জন্য দশ মিনিট বরাদ্দ করল। মনের ভেতর থেকে তাগিদ: দেরি হলে এখন যে-কোনও সময়ে মরবে ওরা।

ইঞ্জিন তপ্ত হয়ে উঠছে, গুহার এদিকের বরফ-দেয়াল গলতে শুরু করেছে। ঝরঝর করে পানি ঝরে পড়ছে কালো বিমানের উপর। পাঁচ মিনিট রেভ করবার পর ভার্টিকাল টেক-অফ সুইচ খুঁজল রানা।

ভেক্টর থ্রাস্ট কোথায়?

আধুনিক ভার্টিকাল-টেক-অফ হ্যারিয়ারের মত ফাইটার বিমানে ডিরেক্টেবল বা ভেক্টর থ্রাস্টার থাকে।

থ্রাস্টার কই, তিশা? ব্যস্ত হয়ে জানতে চাইল রানা।

নেই, স্যর, পিছন থেকে বলল আহত মেয়েটি। তার বদলে রেট্রো-ফায়ারিং জেট আছে! রেট্রো চালু করার বাটন খুঁজুন!

খুঁজতে শুরু করেছে রানা। ওর চোখ পড়ল আরেকটা সুইচের উপর। ওখানে লেখা: ক্লোক মোড।

ভুরু কুঁচকে গেল রানার।

জিনিসটা কী?

দু সেকেণ্ড পর অন্য একটা বাটন দেখল। ওটার উপর লেখা: রেট্রোস।

বাটন টিপে দিল রানা।

এক সেকেণ্ড পর ভেসে উঠতে শুরু করল বিমান। কিন্তু পরের সেকেণ্ডে একটা ঝাঁকি খেল। পিছন থেকে গোঙানির মত আওয়াজ এল। আর নড়ছে না বিমান।

ঘুরে ককপিটের ক্যানোপি দিয়ে, চাইল রানা। বিমানের দুই টেইল ফিন ভাল ভাবেই আটকা পড়েছে বরফের দেয়ালের ভিতর।

দশ সেকেণ্ড পর আফটারৰার্নার বাটন পেল। টিপে দিল বাটন।

টুইন থ্রাস্টারের ভিতর থেকে ছিটকে বেরুল তপ্ত বাষ্প। বিমানের পিছনের বরফের দেয়াল গলতে শুরু করেছে।

মৃদু কাঁপছে দ্য শ্যাডো।

খুব দ্রুত গলে গেল পিছনের বরফ-দেয়াল। ছাড়া পেয়ে গেছে বিমান।

আরেকবার ঘড়ি দেখল রানা।

১০:৫৩

আবারও নীচের দিকে কাত হলো গোটা গুহা।

এখনই না! মনে মনে বলল রানা। আর মাত্র কয়েক মিনিট চাই! মাত্র কয়েক মিনিট!

ইঞ্জিন গরম করে তুলছে। ঘড়ির দিকে চেয়ে রইল: ১০:৫৪

তারপর পেরিয়ে গেল আরেকটা মিনিট।

১০:৫৫

সময় হয়েছে, নিজেকে বলল রানা। এবার…

আবারও রেট্রো বাটন টিপল। বিমানের পেটের নীচে আট রেট্রো জেট একইসঙ্গে চালু হলো। নীচের দিকে ছিটকে দিল দীর্ঘ সাদা গ্যাসের বাম্প।

এবার প্রকাণ্ড পাতাল-গুহার ভিতর বরফ-মেঝে থেকে ভেসে উঠল দ্য শ্যাডো। পঞ্চাশ ফুট উপরে উঠে থামল রানা। বাইরে মড়মড় আওয়াজ শুরু হয়েছে। থরথর করে কাপছে গুহা। ছাত থেকে খসে পড়ছে বড় বড় বরফের চাই। ধুপধাপ পড়ছে বিমানের উপর।

চারপাশে যেন কেয়ামত শুরু হয়েছে।

রানা ঘড়ি দেখল: ১০:৫৬

দ্য শ্যাডোর টিনটেড-গ্লাস ক্যানোপির ভিতর দিয়ে চেয়ে রয়েছে। মাতালের মত টলছে প্রকাণ্ড গুহা। ওর মনে হলো, গোটা আইস শেলফ গিয়ে পড়েছে সাগরে। সরে গেছে মেইনল্যাণ্ড থেকে

আপনি কী করছেন, ভাই? মিসাইল বে-র পিছন থেকে বলল হাবিব।

আগে উল্টে যাক আইসবার্গ, সেজন্য অপেক্ষা করছি, বলল রানা।

হঠাৎ তিশার গোঙানির আওয়াজ শুনল। প্রায় ধমকে উঠল: ডক্টর হাবিব! ওকে চিকিৎসা দিন! …মেরি! তুমি এখানে চলে এসো! তোমার সাহায্য দরকার

বিমানের ককপিটে এসে ঢুকল মেরি। চেপে বসল গানার সিটে। আমাকে কী করতে হবে, আঙ্কেল?

ওদিকের ওই স্টিক দেখো, বলল রানা। ওটার সঙ্গে ট্রিগার আছে।

সামনেই কন্ট্রোল স্টিক দেখল মেরি। পেয়েছি।

এবার ওটার ট্রিগারে চাপ দাও।

কন্ট্রোল স্টিকের ট্রিগারে চাপ দিল মেরি।

বিমানের দুই ডানার নীচ থেকে অতি উজ্জ্বল দুটো আলো ছিটকে গেল। গুহার সামনের দিকের দেয়ালে লাগল দুটো ট্রেসার বুলেট, ওখান থেকে ছিটকে বেরুল সাদা দুটো মেঘ।

গুড শুটিং, উৎসাহ দিল রানা। সবাই সতর্ক থাকো, শক্ত করে কিছু ধরো, যে-কোনও সময়ে উল্টে যাবে গুহা ..মেরি, আমি বললে ট্রিগার টিপে ধরবে। না বলা পর্যন্ত ছাড়বে না।

জী, ছোট্ট করে বলল মেরি।

ক্যানোপি দিয়ে বাইরে চাইল রানী। ভেঙে পড়ছে বরফের ছাত। ওরা যে সুড়ঙ্গ দিয়ে এখানে এসে উঠেছে, সেই লবণাক্ত

পুকুরের পানি ছলকে গিয়ে লাগছে বরফের দেয়ালে।

মাত্র এক সেকেণ্ড পর অকল্পনীয় ভাবে নীচে নামল গোটা গুহা। সোজা নীচে নামছে সব। নাটকীয়ভাবে কাত হতে লাগল গুহা। ওই মুহূর্তে রানা বুঝল, গোটা উইলকক্স আইস স্টেশন নিয়ে মেইনল্যাণ্ড থেকে আলাদা হয়ে গেছে আইস শেলফ।

ওটা এখন হয়ে উঠছে আইসবার্গ

অপেক্ষা করো, নিজেকে বলল রানা।

এখন যে-কোনও সময়ে।

আবারও কাত হলো গুহা।

এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি কাত হয়েছে। মাত্র তিন সেকেণ্ডে একশ আশি ডিগ্রি উল্টে গেল পুরো গুহা।

মাঝে মৌমাছির মত ভাসছে দ্য শ্যাডো!

পুরো উল্টে গেছে আইসবার্গ!

পুরো ডিগবাজি দিয়েছে পাতাল-গুহা।

হঠাৎ উপরের চওড়া সুড়ঙ্গ দিয়ে নামতে লাগল বিপুল পানি। একটু আগে পাতাল-গুহায় ঢুকতে ওই পথে আসতে হতো।

বরফের সুড়ঙ্গ এখন আর সাগরের সঙ্গে যুক্ত নয়, ওটার মুখ . তাক করা আকাশে। ওই পথেই বেরুতে হবে রানাকে।

বরফ-সুড়ঙ্গ দিয়ে জলপ্রপাতের মত পানি নেমে আসতেই একপাশে বিমান সরিয়ে নিয়েছে। ত্রিশ সেকেণ্ড পর থামল পানির বর্ষণ। দুই ডানার হ্যালোজেন সার্চ লাইট জ্বেলে নিল রানা, জয়স্টিক টেনে নিল নিজের দিকে। সাড়া দিল যুদ্ধ-বিমান, একটু দুলতে দুলতে পিছিয়ে গেল।

ছাতের দিকে বিমানের নাক তাক করেছে রানা।

ঠিক আছে, মেরি! এবার গুলি শুরু করো!

ট্রিগার টিপে ধরল মেয়েটি।

দ্য শ্যাডোর দুই ডানা থেকে ছিটকে বেরুল ধপধপে সাদা। আগুন, অতি উত্তপ্ত ট্রেসার বুলেট ছিড়েখুঁড়ে দিচ্ছে সুড়ঙ্গের দেয়াল। টানেলের ভিতর বরফের বাড়তি অংশ থাকলে তা উড়ে যাবে।

মেরি গুলি শুরু করতেই থ্রাস্টার ব্যবহার করেছে, রান। চড়ুই পাখির মতু সুড়ঙ্গে ঢুকেই আকাশের দিকে নাক তুলেছে যুদ্ধবিমান। ঠিক তখনই পিছনে বিকট আওয়াজে ধসে পড়ল প্রকাণ্ড গুহার বর্তমানের ছাত।

দ্য শ্যাডোর দুই ডানার মেশিনগান থেকে বেরুচ্ছে অজস্র ট্রেসার বুলেট। বরফ-সুড়ঙ্গের বাধা ছিটকে দেবে। মসৃণ হতে হবে সামনের পথ। খাড়া ভাবে উঠছে কালো বিমান।

সুড়ঙ্গের ভিতর রানা পিছনে ফেলছে সাদা মেঘ। সামনের সুড়ঙ্গ চেপে এলেই কাত করছে বিমানকে। আশা করছে, মেরির ট্রেসার বুলেট বাধা দূর করবে।

বিমানের মিসাইল বে-র পিছন-দেয়ালে গুটিসুটি মেরে শুয়েছে তিশা ও হাবিব, কিছুই করবার নেই ওদের। বিমান থেকে ছুটছে অসংখ্য বুলেট। চারপাশে বিস্ফোরণের আওয়াজ। টানেল বেয়ে উঠছে দ্য শ্যাডো। রানা যেন রেসের গাড়ির ড্রাইভার। ভয়ের অনুভূতি হারিয়েছে, চাপা উত্তেজনা নিয়ে ছুটছে প্রচণ্ড গতি তুলে।

হঠাৎ বিমানের পিছনে শুরু হলো সুড়ঙ্গে বিপুল ধস, ভেঙে পড়ছে চারপাশের বরফ-দেয়াল। যে-কোনও সময়ে বিমানটাকে গিলে নেবে ওই বরফ-ধস।

চারপাশে বুম! বুম! বুম! আওয়াজ।

দ্রুতগামী বিমানের পিছনে সুড়ঙ্গ-প্রাচীর থেকে নীচে পড়ছে মস্ত সব বরফের চাই। এদিকে টানেলের উপর অংশে লাগছে বুলেট, পরিষ্কার করছে পথ, কিন্তু পিছন থেকে ধেয়ে আসছে। সুড়ঙ্গের ভয়ঙ্কর ধস।

ককপিটে রানার মনে হলো, কোনও ভিডিয়ো-গেম খেলছে ও। পিছন সিটে চোখ বুজে ট্রিগার টিপে বসে আছে মেরি। সাঁইসাঁই করে পিছনে পড়ছে সুড়ঙ্গ। উপর থেকে বড় চাই পড়তে দেখলে বিমানকে কাত করে নিচ্ছে রানা।

সরু চোখ করে সামনে চেয়ে আছে। সুড়ঙ্গের দেয়াল মসৃণ করছে বুলেট, তৈরি করছে পগ্ন। পরের সেকেণ্ডে দেখা যাচ্ছে ওই পথ পেরিয়ে এল যুদ্ধ-বিমান। হঠাৎ বুম! করে বিকট আওয়াজ হলো। ধসে পড়েছে গোটা সুড়ঙ্গ। আর ওই একই সময়ে রানা দেখল চারপাশে আকাশ।

আইসবার্গের সুড়ঙ্গ থেকে ছিটকে বেরিয়েছে দ্য শ্যাডো, খাড়া ভাবে উঠতে লাগল আকাশে। একবার কাঁধের উপর দিয়ে পিছনে চাইল রানা। এখন আর উইলকক্স আইস স্টেশন নেই। ওখানে উল্টে যাওয়া প্রকাণ্ড এক আইসবার্গ।

আগে যেটা আইস শেলফ ছিল, এখন তা হিমশৈল। পানির শত শত ফুট তলের বরফের তীক্ষ্ণ সব চূড়া এখন আকাশের দিকে মাথা তুলেছে, যেন পাহাড়ের শৃঙ্গ।

অনেক নীচে কালো এক মস্ত গর্ত। ওটাই সেই সুড়ঙ্গ। ওখান থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসেছে ওদের যুদ্ধ-বিমান।

হঠাৎ সাগরের কাছে নড়াচড়া দেখল রানা। জিনিসটা সরু এবং সাদা, লেজে দীর্ঘ আগুন নিয়ে ছুটে চলেছে নতুন আইসবার্গ লক্ষ্য করে।

ক্রুজ মিসাইল।

গর্জন ছাড়তে ছাড়তে উঠছে দ্য শ্যাডো, এবার বিমান সোজা করে নিল রানা। নীরবে নীচে চেয়ে রইল। . এক সেকেণ্ড পর আইসবার্গের বুকে গিয়ে বিধল নিউক্লিয়ারটিপড মিসাইল। তিন সেকেণ্ড কিছুই হলো না, তারপর ডেটোনেট করল নিউক্লিয়ার ডিভাইস।

দ্য শ্যাডোর অনেক নীচে বিস্ফোরিত হলো পারমাণবিক বোমা, অত্যুজ্জ্বল আলো ধাধিয়ে দিল ওদের চোখকে।

মুহূর্তে খুঁড়ো হয়ে গেল জমাট-বাঁধা বরফের পাহাড়, ভয়ঙ্কর শক ওয়েভে বাতাসে মিলিয়ে গেল সুড়ঙ্গ। ব্লাস্ট ওয়েভ নেমে গেল সাগরের দিকে। পথে যা পেল, বাষ্প করে দিল। প্রকাণ্ড সব ঢেউ তৈরি হলো সাগরে। তীরের দিকে ছুটল ভয়ঙ্কর বান। ভয়ানক ভাবে দুলিয়ে দিতে লাগল প্রকাণ্ড আইসবার্গকে, যেন ভঙ্গুর খেলনা নিয়ে খেলছে দুই বাচ্চা। মস্ত কোনও নিউক্লিয়ার ব্লাস্ট হয়নি, মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার র্যাডিয়াসের। কিন্তু আসলে ছোট কোনও নিউক্লিয়ার এক্সপ্লোশন বলতে কিছুই নেই।

ওটার কাজ শেষ হয়নি।

হঠাৎ প্রকাণ্ড এক ব্যাঙের ছাতা তৈরি হলো নীচে। অস্বাভাবিক দ্রুত গতি তুলে উঠে আসতে লাগল আকাশ বেয়ে। মনে হলো যে-কোনও সময়ে খপ করে ধরবে যুদ্ধ-বিমানকে।

আবারও বিমান খাড়া করে নিল রানা, তীর বেগে উঠতে লাগল উপরে। যেভাবে তোক ওই ব্যাঙের ছাতা পিছনে ফেলতে হবে। তীব্র গতিতে ছুটে আসছে কালো মেঘ। আকাশ চিরে গর্জন ছাড়তে ছাড়তে উঠছে দ্য শ্যাডো। পূর্ণগতি নিয়ে কাজ করছে দুই জেট ইঞ্জিন। রানা বুঝল, ওরা হারতে বসেছে। ভীষণ গতি তুলে উঠছে ব্যাঙের ছাতা, যে-কোনও সময়ে গিলে নেবে ওদেরকে।

তারপর ঘন কালো মেঘের চূড়া শেষসীমায় পৌঁছে গেল। মাত্র পঁচিশ ফুট উপরে রইল বিমান, এখনও উঠছে নিরাপদ দূরত্বে যাওয়ার জন্য।

কয়েক সেকেণ্ড পর বাঁক নিল রানা, সোজা রওনা হয়ে গেল সাগরের দিকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *